Home Blog Dr Firoz Mahboob Kamal একাত্তরের চেতনার মরণছোবল

eBooks

Latest Comments

একাত্তরের চেতনার মরণছোবল PDF Print E-mail
Dr Firoz Mahboob Kamal
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 10 January 2010 20:15

রক্তপাত কোনদেশেই সৌহার্দ, সম্পৃতি ও একতা গড়ে না। শান্তিও আনে না। যা গড়ে তা হলো পরস্পরের মাঝে গভীর ঘৃনা, বিভক্তি ও সে সাথে নতুন নতুন রক্তপাতের প্রেক্ষাপট। রক্তের স্মৃতি সহজে মুছে না, বরং সেটি বেঁচে থাকে যুগ যুগ ধরে। এবং গভীরতর করে ঘৃনা। রক্তের স্মৃতি ধরেই জাহেলী যুগের আরবগণ একই যুদ্ধ চালিয়ে যেত শত শত বছর ধরে। রাজনীতিতে রক্তাক্ষয়ী পথ তাই প্রজ্ঞাবান নেতাগণ এড়িয়ে চলেন। বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তান গড়তে তাই কোন রক্তাক্ষয়ী যুদ্ধ লড়তে হয়নি। অথচ মুজিব জেনেশুনেই ভয়ানক রক্তপাতের পথ বেছে নেয়। তবে তাতে মুজিবের স্বার্থ যাই থাক, ভারতে স্বার্থ ছিল বিরাট। পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই ভারতের লক্ষ্য ছিল, নানা ভাষার ও নানা অঞ্চলের মুসলমানদের মাঝে তীব্রতর ঘৃনা ও বিভেদ সৃষ্টি হোক। আর সে ঘৃনায় ভেঙ্গে যাক উপমহাদেশের মুসলমানদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল পাকিস্তান। এ লক্ষ্যে মুজিবের উপরের অর্পিত দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ভারতীয় বাহিনীর ঢুকার উপযোগী প্রেক্ষাপট তৈরী করা। তবে মুসলমানদের মাঝে ঘৃণা ও বিভক্তিকে তীব্রতর ও স্থায়ী করার স্বার্থে মুজিব ও তার সমর্থকগণ শুধু পাকিস্তান ভাঙ্গা নিয়েই খুশি ছিল না। তাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় নিরস্ত্র পাকিস্তানপন্থিদের হত্যা, তাদের উপর নির্মম নির্যাতন, তাদের সম্পদ লুট, বাড়ী দখল ও তাদের বিরুদ্ধে লাগাতর ঘৃনা সৃষ্টির মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরো বিষাক্ত ও বীভৎস করা।


একাত্তরের যুদ্ধ শেষ হলেও তাই ঘৃণার আগুন ইচ্ছা করেই থামতে দেওয়া হয়নি। বরং সে ঘৃনাকে তীব্রতর করা হয়েছে শুধু একাত্তরের পাকিস্তানপন্থিদের বিরুদ্ধেই নয়, আজকের ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধেও। মুজিবের সে সিদ্ধান্তের কারণেই বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শুরু করে প্রায় অধিকাংশ পৃষ্ঠাই রক্তাত্ব। অসংখ্য মানুষ এতে নিহত হয়েছে, বহু নারী ধর্ষিতা হয়েছে এবং লুন্ঠিত হয়েছে লক্ষ লক্ষ ঘর-বাড়ী ও দোকানপাট। সে ঘৃনার আগুন শুধু বাংলাদেশের হাজার হাজার মানুষের জীবনই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে মুজিরেব নিজের জীবনও। বাঁচেনি তাঁর নিজের পরিবার। জীবন কেড়ে নিয়েছে জিয়াউর রহমানসহ আরো অনেকের। আজ সে আগুনেই অবিরাম পেট্রোল ঢালা হচ্ছে। ফলে মৃত্যুও অবিরাম হানা দিচ্ছে বাংলাদেশের আনাচে কাঁনাচে। ফলে দেশ দ্রুত এগিয়ে চলেছে আরেক ভয়াবহ বিভক্তি ও রক্তক্ষরণের দিকে। 

রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের শান্তিপূর্ণ মাধ্যম হলো নির্বাচন। পাকিস্তানে সত্তরের নির্বাচন হয়েছিল তেমনি একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে। অথচ যাদের লক্ষ্যই ছিল, পাকিস্তানের বিনাশ তাদের কাছে কি এমন নির্বাচনের কোন গুরুত্ব থাকে? তাই সত্তরের নির্বাচন মুজিবের কাছে ছিল বাহানা মাত্র। নির্বাচনকে তিনি মোক্ষম অস্ত্র রূপে ব্যাবহার করেন পাকিস্তানপন্থি ও ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে সারা দেশ জুড়ে মনে বিষ ছড়ানোর কাজে। পাকিস্তানের বিনাশে মুজিবের লড়াইয়ের শুরু একাত্তর থেকে নয়, শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ সাল থেকে –সেটি ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারিতে পাকিস্তানের জেল থেকে ফেরার পর সোহরোওয়ার্দী ময়দানের জনসভায় দম্ভভরে তিনি বলেছিলেন। সে জন্য ভারতের সাথে তাঁর আগরতলা ষড়যন্ত্র চুক্তি হয়েছিল বহু আগেই। সে কাঙ্খিত লক্ষে পৌছবার জন্য প্রয়োজন ছিল জনসমর্থন। প্রয়োজন ছিল, পাকিস্তান ও পাকিস্তানপন্থিদের বিরুদ্ধে মানুষের মগজকে এতটা ঘৃণাপূর্ণ করা যেন বিনা দ্বিধায় তারা তাদেরকে হত্যা করতে পারে এবং লুণ্ঠন করতে পারে তাদের সহায়-সম্পদ। কোন পরিবারকে শিশুসন্তান ও মহিলাসহ বসতবাড়ি থেকে গাছতলায় নামানোর মত কুৎসিত মানসিকতা সবার থাকে না। এমন কি নিষ্ঠুর চোর-ডাকাতদেরও থাকে না। তারাও হাতের কাছে যা পায় তা নিয়েই ভেগে যায়, বসতঘর বা দোকানপাটের উপর দখলদারি নেয়না। কিন্তু মুজিবের সমর্থকদের নিষ্ঠুরতা ছিল বহুগুণ বীভৎস ও বর্বর। তাদের সংখ্যা দুয়েক হাজার ছিল না, ছিল বহু লক্ষ। তারা বহু লক্ষ বিহারী ও পাকিস্তানপন্থিদের রাস্তায় নামিয়ে তাদের ঘরবাড়ীর উপর দখল নিয়েছে। কবজা করে নিয়েছে তাদের ব্যবসাবাণিজ্য। তারই ফলশ্রুতিতে বহু লক্ষ বিহারী বাংলাদেশের বহু শহরে আজও বস্তিতে বাস করে। আর শেখ মুজিব তাদের পুরস্কৃত করেছেন সে অপরাধের আইনি বৈধতা দিয়ে। ফল দাঁড়ালো, বাংলাদেশের হাজারো বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ানক দস্যুবৃত্তির ইতিহাস সৃষ্টি হলো, অথচ তা নিয়ে বাংলাদেশের আদালতে কোন বিচারই বসলো না, কারো শাস্তিও হলো না। বাংলাদেশ যে পরবর্তীতে দুর্বৃত্তিতে বিশ্বের প্রায় দুই শতটি দেশকে পিছনে ফেলে বার বার শিরোপা পেয়েছে তার প্রস্তুতির কাজটি মূলতঃ সে সময়েই হয়েছে। যারা সে সময় বিহারী বা পাকিস্তানপন্থিদের সম্পদে হাত দিয়েছে তারাই পরবর্তীতে দেশের সম্পদে হাত দিচ্ছে। 

শেখ মুজিবকে  জনসমর্থণ পেতেও বেগ পেতে হয়নি। সত্তরের নির্বাচনে তিনি ২০টাকা মণ দরে চাউল খাওয়াবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন সোনার বাংলার। যে দেশের মানুষের ঘরে শত শত বছর ধরে টিন নেই, ঘরে দরজা নেই, দু’বেলা খাবার নেই, সেদেশের মানুষ এমন প্রতিশ্রুতি পেলে মুজিবকে ভোট দিবে না সেটি কি ভাবা যায়? পরবর্তীতে এ সব প্রতিশ্রুতিই মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বিশ টাকা মন চাউলের পরিবর্তে শেখ মুজিবের উপহার ছিল দূর্ভীক্ষ। দেশ পরিণত হয়েছিল তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে। মহিলারা কাপড়ের অভাবে মাছধরা জাল পড়তে বাধ্য হয়েছিল। দুর্বৃত্ত ও ধোকাবাজদের কাছে নির্বাচন যে কতটা মারাত্মক হাতিয়ার রূপে ব্যবহৃত হতে পারে সত্তরের নির্বাচনে সেটিই প্রমাণিত হয়েছিল। নির্বাচন শেষে পাকিস্তানের সংবিধান তৈরী বা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া -এসব নিয়ে শেখ মুজিবের কোন মাথা-ব্যাথা ছিল না। বরং প্রবল আগ্রহ ছিল এবং সে সাথে পরিকল্পিত স্ট্রাটেজীও ছিল, কি করে ভারতীয় সেনাবাহিনীকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ডেকে আনার উপযোগী প্রেক্ষাপট তৈরী করা যায়। তাকে সে মোক্ষম সুযোগটিই দেয় নির্বাচন। শেখ মুজিব নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল নিছক পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ষড়যন্ত্রের ফাঁদে ফেলার জন্য। সে লক্ষ্যে তিনি সফলও হয়েছিলেন। ইয়াহিয়া খানকে বলেছিলেন, আমি মুসলিম লীগ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় অংশ নিয়েছি। আমি কি করে পাকিস্তান ভাঙ্গতে পারি। টোপ ফেলেছিলেন, বিজয়ী হলে ইয়াহিয়া খানকে প্রেসিডেন্ট বানাবেন। আর ইয়াহিয়া খান তাকে বিশ্বাস করেছিলেন। আর মৃত্যুর আগে তিনি বলে গেছেন, মুজিব কে বিশ্বাস করেই তিনি বড় ভূল করেছেন। এসব কথা আজ আর কোন গোপন বিষয় নয়। বাংলাদেশীদের ন্যায় সাধারণ পাকিস্তানীরাও সেটি জানে। ফলে বাংলাদেশীদের কাছে মুজিব যেরূপেই চিত্রিত হোন না কেন, পাকিস্তানীদের কাছে মুজিব চিত্রিত হয়েছেন একজন বিশ্বাসভঙ্গকারী গাদ্দার রূপে। এমনকি ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মুসলমানদের কাছেও মুজিব কোন ভাল পরিচয় পাননি। কারণ, একটি মুসলিম দেশ বিভক্ত হোক সেটি কোন মুসলমান চায় না। আজকের বিপর্যস্ত ইরাক ও সুদান খন্ডিত হোক – সেটি কি কোন মুসলমান কামনা করে? ফলে সেদিন পাকিস্তানের বিভক্তিও তারা চায়নি। ভারতের ন্যায় একটি কাফের রাষ্ট্রের হাতে ৯০ হাজার মুসলমান বন্দী হোক সেটিও কোন মুসলমানের কাছে আনন্দদায়ক ছিল না। ফলে ভারতের সাহায্য নিয়ে বাংলাদেশের সৃষ্টি বিশ্বের মুসলমানেরা সুনজরে দেখেনি। ফলে শেখ মুজিব ঘৃনীত হয়েছেন সমগ্র মুসলিম বিশ্বজুড়ে। সেদিন তিনি চিত্রিত হয়েছিলেন হিন্দুপ্রধান ভারতের এজেন্ট রূপে। এজন্যই বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন দেশরূপে স্বীকৃতি দিতে মুসলিম দেশগুলো ইতস্ততঃ করেছে। বরং তাদের সহানুভূতি ও সহমর্মিতা গিয়ে পড়ে পরাজিত পাকিস্তানের প্রতি। সত্তরের দশকের প্রথম দিকে ইসরাইলের পৃষ্ঠপোষক পশ্চিমা বিশ্বকে শায়েস্তা করতে আরব দেশগুলোর চাপে ওপেক হঠাৎ তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়। ফলে সৌদিআরব, ইরান, কুয়েত, দুবাই, বাহরাইন, কাতারের মত দেশে সৃষ্টি হয় বিপুল অর্থভান্ডার। শুরু হয় ব্যপক উন্নয়ন কাজ এবং সৃষ্টি হয় লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ। আরব দেশগুলো তখন গভীর সহানুভুতি নিয়ে চাকুরীর দোয়ার বিশেষ ভাবে খুলে দেয় সামরিক ভাবে পরাজিত ও মানসিক ভাবে আহত পাকিস্তানীদের জন্য। বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের ন্যায় লক্ষ লক্ষ পাকিস্তানী তখন সেখানে গিয়ে হাজির হয়। অথচ মুজিবের নেতৃত্বে ভারতের একটি তাঁবেদার সরকারের কারণে সে শ্রম-বাজারে ঢুকা অসম্ভব হয় বাংলাদেশীদের জন্য। বাংলাদেশীদের জন্য দরজা খোলা দূরে থাক, আরবদেশগুলো তখনও বাংলাদেশকে স্বীকৃতিই দেয়নি। একাত্তরের যুদ্ধ শুধু দেশে নয় বিদেশেও কীরূপ বিদ্বেষ ও ঘৃণা বাড়িয়েছিল এ হলো তার নমুনা। অপর দিকে একাত্তরের যুদ্ধ শেষে সাহায্যের বন্যা শুরু হয়ে পাকিস্তানে। পাকিস্তানের বন্ধুরাষ্ট্রগুলো ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দেশটির অখন্ডতা বাঁচাতে না পারলেও যুদ্ধ শেষে আর্থিক ভাবে পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ফলে যুদ্ধে পাকিস্তানের যা ক্ষতি হয়েছিল তার চেয়ে বহুগুণ বেশী পেয়েছিল বন্ধু রাষ্ট্রগুলো থেকে। অপরদিকে ভারত সাহায্য না করে মনযোগী হয় বাংলাদেশে যা কিছু সম্পদ ছিল তা ত্বড়িৎ লুন্ঠনে। সীমান্ত বাণিজ্যের নামে শুরু হয় বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে অর্থনৈতিক ফুটো সৃষ্টির কাজ। এভাবে দেশটির তলা ধ্বসিয়ে দেয়। ফলে অসম্ভব হয়ে পড়ে বিদেশ থেকে প্রাপ্ত রিলিফের মালামাল ধরে রাখাও। এরূপ অবস্থা দেখে হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে “তলাহীন ভিক্ষার ঝুলি” আখ্যা দিয়েছিলেন। এ খেতাবে বাংলাদেশ তখন পরিচিতি পায় বিশ্ব জুড়ে। এভাবেই নেমে আসে ভয়ানক দুর্ভীক্ষ। ফলে ১৯৪৭য়ে যে বিশাল বৈষম্য নিয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান যাত্রা শুরু হয়েছিল তা পাকিস্তানের ২৩ বছরে অনেকটা কমে আসলেও মুজিব শাসনে দুই দেশের মধ্যে সেটি আবার দ্রুত বেড়ে যায়। মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ তখন দ্রুত ধাবিত হয় দূর্ভীক্ষ ও “তলাহীন ভিক্ষার ঝুড়ি” হতে, আর পাকিস্তান ধাবিত হয় বিশ্বের সপ্তম আণবিক শক্তি হতে। 

বাংলাদেশ আজ বিভক্ত শুধু রাজনৈতিক ভাবেই নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আদর্শিক ভাবেও। এক শিবিরে অবস্থান নিয়েছে ভারত-ভক্ত ইসলাম-বিরোধী পক্ষ, অপর শিবিরে তাদের বিরোধীরা। দুই পক্ষের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলী যে ভিন্ন তাই নয়, ভিন্ন তাদের নেতা, বীর, কবি-সাহিত্যিক ও গর্বের বিষয়গুলোও। সে ভিন্নতা প্রকাশ পায় তাদের রাজনৈতিক শ্লোগানেই শুধু নয়, বরং তাদের ছেলেমেয়েদের নামকরণ, পোশাকপরিচ্ছদ ও রীতি-নীতির মধ্যেও। একপক্ষ ভালবাসে তাদের সন্তানদের নাম হোক এবং সে সাথে মহান আদর্শ হোক আবু বকর, ওমর, আলী, ওসমান, হাসান, হোসেন, খালেদ, খাদিজা, ফাতিমা ও সুমাইয়া। অপর পক্ষের অতি পছন্দীয় নাম হলো জয়, পুতুল, আকাশ, বাতাস, সাগর, সমুদ্র ইত্যাদী। একদলের কাছে বীর হলো সূর্য সেন, প্রীতিলতা ও ক্ষুদিরাম, আর অনুপ্রেরণার উৎস লালন ফকির ও রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য। অপর পক্ষটি অনুপ্রেরণা পায় পবিত্র কোরআন-হাদীস ও ইসলামী দর্শন থেকে। সাধারণতঃ এমন গভীর বিভক্তি গড়ে উঠে যুদ্ধরত দু'টি জাতির মাঝে। আর যুদ্ধ না থাকলে, এমন বিভক্তি যুদ্ধকেই অনিবার্য করে তুলে। অথচ বাংলাদেশে এমন বিভক্তি পাকিস্তান আমলে ছিল না। ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলেও ছিল না। বাংলায় মুসলিম জাগরণ এসেছিল উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দুই দশকে, হিন্দুদের মাঝে নবজাগরণে শুরুর প্রায় দুই দশক পরেই। সে জাগরণের মূল সূর ছিল ঐক্য। সে ঐক্যই বাংলার রাজনীতিতে তাদের বিজয় এনে দিয়েছিল, এবং সেটি প্রতিপত্তিশালী হিন্দুদের বিরুদ্ধে। সে ঐক্যে ঈর্ষান্বীত হয়েছিল এমন কি হিন্দুরাও। বাংলায় প্রথম সংসদীয় নির্বাচন হয় ১৯৩৭ সালে। এরপর হয় ১৯৪৬ সালে। দুই নির্বাচনেই মুসলমানগণই বিজয়ী হয়। তখন বাংলার জনসংখ্যার প্রায় শতকরা ৪৫ জন ছিল হিন্দু। শিক্ষাদীক্ষা, ব্যবসাবাণিজ্য ও ধনসম্পদে তারা ছিল মুসলমানদের থেকে বহুগুণ এগিয়ে। কোলকাতার প্রায় ৭০ ভাগ বাসিন্দাই ছিল তারা। কিন্তু এরপরও মুসলমানগণ ১৯৩৭ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এক যুগের বেশী কাল ধরে অখন্ড বাংলার রাজধানী কোলকাতায় প্রধানমন্ত্রীর আসনে কোন হিন্দুকে বসতে দেয়নি। অথচ আজ বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা ৯০জন মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও দেশটি পরিণত হয়েছে ভারতের আজ্ঞাবহ এক তাঁবেদার রাষ্ট্রে। তখন বাংলার মুসলমানদের দুইটি প্রধান দল ছিল। একটি ছিল মুসলিম লীগ এবং অপরটি ছিল শেরে বাংলার নেতৃত্বাধীন কৃষক-প্রজা পার্টি। তাদের মাঝে রাজনৈতিক বিরোধ থাকলেও মুসলমানদের কল্যাণের মাঝে ঐক্যও ছিল। কংগ্রেস ছিল মূলতঃ হিন্দুদের দল, যদিও তাতে কিছু সেকুলার মুসলমানও ছিল। ১৯৩৭ সালে মুসলিম লীগ ও কৃষক-প্রজা পার্টি মিলে প্রথমে কোয়ালিশন সরকার গঠন করে, পরবর্তীতে মুসলিম লীগের পতাকা তলে একীভূত হয়ে যায়। নেতাগণ তখন একতার গুরুত্ব বুঝেছিলেন, এবং বুঝেছিলেন বিভক্তির কুফলগুলোও। শুধু বাংলার মুসলমান নয়, একতার গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন উপমহাদেশের মুসলমানগনও। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মূলতঃ সে একতার বলেই। আজকের মত এত বিভক্তি এবং হিন্দু সম্প্রসারণবাদীদের প্রতি এত আনুগত্য থাকলে বাংলাদেশ সেদিন আরেক কাশ্মির হতো। মুসলমানদের সে ঐক্য দেখে হিন্দুরা টের পায়, বাংলার উপর তাদের আধিপত্যের দিন শেষ। সে হতাশা থেকেই আধিপত্যবাদী হিন্দুগণ অখন্ড বাংলাকে খন্ডিত করার দাবী তোলে। দাবী তোলে হিন্দুসংখ্যাগরিষ্ঠ পশ্চিম বাংলাকে ভারতভূক্ত করার। 

পাকিস্তান আমলেও অবস্থা এতটা খারাপ ছিল না। দেশে তখনও বহু দল ছিল। তাদের মাঝেও নানা বিরোধ এবং বিতন্ডা ছিল। কিন্তু সে বিরোধ সত্ত্বেও বিভিন্ন দলের সদস্যরা পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে একসাথে বসেছে। নানা বিষয়ে তখন গোলটেবিল বৈঠকও হয়েছে। নেতারা একে অপরের মুখ দেখেনি বা মাসের পর মাস লাগাতর সংসদ-বর্জন করেছে, এমন ইতিহাস তখন নির্মিত হয়নি। কিন্তু সে ইতিহাস লাগাতর নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশে। দেশটিতে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই হলো, বিভক্তি ও বিবাদকে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী করা। বিভক্তির রাজনীতি শুধু দেশই ভাঙ্গে না, বিভক্ত করে জনগণকেও। তখন বাড়ে ঘৃণা, বাড়ে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার জজবা। ঘৃণার বশে তখন আগুন ধরে রক্তে। এটাই হলো একাত্তরের চেতনা। ইসলামী চেতনায় একতা গড়া ফরজ। এটা ইবাদত। আর একাত্তরের চেতনায় জরুরী হলো বিভেদ ও বিভক্তি। ১৯৭১ য়ের ১৬ই ডিসেম্বরে অখন্ড পাকিস্তানের মৃত্যু ঘটেছে। কিন্তু ঘৃনা বেঁচে আছে। তাই বেঁচে আছে সে ঘৃনা নিয়ে প্রতিপক্ষ হত্যার নেশাও। তাই যে ঘৃনা নিয়ে তখন আওয়ামী ক্যাডার, মুক্তি বাহিনী সদস্য, মুজিব বাহিনী, সেনা-সদস্যগণ পাক-সেনা ও পাকিস্তান-পন্থিদের হত্যায় নেমেছিল সে ঘৃনা নিয়েই পরে তারা একে অপরকে হত্যা করেছে। তাদের এখনকার গবেষণা, সে ঘৃনাকে কি করে যুগ যুগ বাঁচিয়ে রাখা যায় তা নিয়ে। ফলে বাংলাদেশের বিপর্যয় বাড়াতে বিদেশী শত্রুকে একটি তীরও ছুড়তে হচ্ছে না। 

অথচ স্বাধীনতা আন্দোলন যে কোন দেশেই জনগণের মাঝে প্রবল একতার জন্ম দেয়। সে একতার বলেই ক্ষুদ্র দেশ প্রবল শত্রুর কবল থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। স্বাধীনতা এমনকি পশু-পাখিরাও পছন্দ করে। কিন্তু বাংলাদেশে তেমন একতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বরং একাত্তরের লড়াই থেকেই বিভক্তির শুরু। ফলে শুরু দেশটির দূর্বলতারও। প্রায় ১২০০ মাইলে বিভক্ত দূর্বল পাকিস্তানকে খন্ডিত করতে বিশাল ভারতীয় বাহিনীর প্রয়োজন পড়েছিল। অথচ আফগানিস্তানে রাশিয়া বা ভিয়েতনামে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যায় বিশ্বশক্তিকে পরাজিত করতে অন্য দেশের যুদ্ধ করার প্রয়োজন পড়েনি। একাত্তর নিয়ে বাংলাদেশে যে বিভাজন গড়ে উঠেছিল সে বিভাজনই আজ দিন দিন গভীরতর হচ্ছে। ফলে দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে আরেক সংঘাতের দিকে। বিবদমান দু’পক্ষের দর্শন ও শ্লোগান দিন দিন আরো উগ্রমূ্র্তি ধারণ করছে। শেখ মুজিবকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী বলে একাত্তরের পূর্বে বা পরে কেউ দাবী করতো না। কিন্তু এখন সে দাবী উচ্চকন্ঠে করছে। এবং ভারতকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্ধু। ভারত না হলে বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না সে কথাও তারা নিঃসংকোচে বলে। তারা দাবী করে, একাত্তরের ভূমিকার জন্য প্রতিটি বাংলাদেশীর দায়িত্ব হলো ভারতের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ থাকা। একথাগুলো সত্তরের দশকেও কেউ বলেনি, কিন্তু এখন অনেকেই বলছে। তারা বলে, টিঁপাই মুখ বাঁধ দেওয়া হলে মেঘনায় পানির প্লাবন বইবে। বেরুবাড়িকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার সময় অন্ততঃ তিন বিঘা করিডোর বাংলাদেশের হাতে দেওয়ার দাবী তুলেছিল, এখন সেটিও আর মুখে আনে না। বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে এরাই বরং ভারতকে ট্রানজিট দিতে চায়। ভারতের প্রতি শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ নেতাদের এমন একটি ধারণা নিছক একাত্তরে নয়, সেটির জন্ম হয়েছিল বহু পূর্ব থেকেই। তবে একাত্তরের পূর্বে শেখ মুজিব নিজেও সে কথাগুলো প্রকাশ্যে বলার সাহস পাননি। আর এখন সে কথাগুলোই জনসম্মুখে জোরেশোরে বলা হয়ে। এখন ভারতের প্রতি আত্মসমর্পণ ও আনুগত্যের নীতিই হলো তাদের রাজনীতির মূল সূর। একাত্তরের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটাই হলো সবচেয়ে বড় গুণগত পরিবর্তন। তবে আওয়ামী লীগের ন্যায় ভারতমুখী দলগুলোর নেতারা তাদের মনের সব কথা শুরুতে খুলে বলে না, বরং সেটি প্রকাশ করে আস্তে আস্তে। তাই ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে তারা মিথ্যা বললেও এখন আর তা বলে না। বরং তা নিয়ে এখন গর্ব করে। 

মানুষের ভাগ্যবদলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর ভারতপন্থি জোটের আসল কাজ এখন মানুষের ঈমান বদল। তাদের লক্ষ্য, সাংস্কৃতিক কনভার্শন। কারণ তারা বুঝে, মানুষের মন ও রাজনীতি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে নিয়ন্ত্রিত হয় না, নিয়ন্ত্রিত হয় তার সাংস্কৃতিক অভ্যাস থেকেও। যার আসক্তি নাচগান ও স্বেচ্ছাচারি জীবন-উপভোগে, তার রাজনীতিতে ইসলাম ও মুসলমানের কল্যাণ-চিন্তা গুরুত্ব পায় না। সে বরং এ দেশ ভারত হলেই খুশি। কারণ সে সুযোগ সেদেশেই বেশী। তাই ভারতীয় হিন্দুদের স্ট্রাটেজী মুসলমানদের হিন্দু করা নয়, বরং সেকুলার সংস্কৃতিতে অভ্যস্থ করা। এভাবে ডি-ইসলামাইজড করা। সংস্কৃতি চর্চার নামে ভারতভক্তরা বাংলাদেশে সেটিই ব্যাপকতর করছে। এমন কনভার্শনের মাধ্যমে বাংলাদেশীদের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং কর্মসূচীকে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা ভারতের পছন্দসই করতে চায়। এ পথে বড় বাঁধা হলো ইসলাম। ১৯৪৭ সালে ভারত ভেঙ্গে যে কারণে পাকিস্তানে সৃষ্টি হয়েছিল এবং পূর্ব বাংলার মানুষ পশ্চিম বাংলার সাথে ভারতে না গিয়ে পাকিস্তানে যোগ দিয়েছিল সেটি ভাষা, গায়ের রং বা ভূগোল ছিল না, সেটি ছিল ইসলাম। এখন সে ইসলামকেই তারা জনগণের চেতনা থেকে সরাতে চায়। রাজনীতিতে ইসলামের অনুসরণকে বলছে সাম্প্রদায়িকতা। বলছে অনাকাঙ্খিত। ফলে তাদের ধারণা, ইসলামী চেতনা বিলুপ্ত হলে বা দূর্বল হলে সবল হবে ভারতের সাথে সম্পর্ক। এজন্যই তারা বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে শত শত মাঠকর্মী নামিয়েছে, পত্র-পত্রিকা ও টিভি চালু করেছে ইসলামী চেতনার বিনাশে। তারা ভেবেছে, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন ধর্মমতের ন্যায় ইসলাম একটি ধর্মমাত্র। তাই ভাবছে, অন্যদের ন্যায় মুসলমানগণও ভারতে লীন হয়ে যাবে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে ভারতীয় মুসলমানদের প্রতি এটিই ছিল কংগ্রেসী নেতা ও হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের নসিহত। মুসলমানগণ যে অন্যদের ন্যায় হিন্দুদের সাথে মিশে যায়নি সেটিকেই মুসলমানদের সবচেয়ে বড় অপরাধ মনে করতো। আজ সে একই নসিহত নিয়ে ময়দানে নেমেছে একাত্তরের চেতনার পক্ষটি। ভারতীয় হিন্দুদের ন্যায় তাদের মুখেও আজ রবীন্দ্র সঙ্গীত, হাতে মঙ্গলঘট এবং রাজনীতিতে ভারতের প্রতি আনুগত্য। 

মানুষের ব্যক্তিত্বের ন্যায় তার রাজনীতির বিষয়টিও গোপন থাকে না। ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে ব্যক্তির কথা, কর্ম ও আচরণে। তেমনি রাজনীতি প্রকাশ পায় তার নীতি, কর্মসূচী ও মিত্রদের দেখে। তাই মুজিবের রাজনৈতিক গোপন মতলবটি অনেকের কাছে অজানা থাকলেও বহু লোক সেটি শুরু থেকেই জানতো। প্রায অর্ধশত বছর পর আওয়ামী লীগের নেতাগণ আজ আগরতলা ষড়যন্ত্রের সাথে শেখ মুজিবের সংশ্লিষ্ঠতাকে একশভাগ সত্য বলছেন। কিন্তু সেটি শুরু থেকেই সত্য জানতেন বহু মানুষ। মুজিবের ফ্যাসীবাদী চরিত্রও তাদের কাছে অজানা ছিল না। তারা সেটি দেখেছে ১৯৭০ সালে নির্বাচনকালে অন্যদলের নির্বাচনী সভা পন্ড করার মধ্যে, তেমনি দেখেছে তার আগে ও পরে। এমন একজন ফ্যাসীবাদী বিদেশী চর যে দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের রক্ষক হবে সেটি অসংখ্য মানুষ বিশ্বাস করেনি। যারা বিশ্বাস করেননি তারাই পরে শতভাগ সঠিক প্রমাণিত হয়েছেন। আর এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী প্রজ্ঞা দেখিয়েছেন ইসলামপন্থিগণ। ১৯৭০ এর নির্বাচনে হারলেও তাঁরা জিতেছেন সত্যবিচার ও দেশের শত্রু-মিত্র চেনায়। মুজিবের ন্যায় বিদেশীর তাঁবেদার, মানবাধিকারের শত্রু এবং মিথ্যাবাদীর ভন্ডামী ধরতে তাঁরা আদৌ ভূল করেননি। আর সে প্রজ্ঞার কারণেই স্বাধীনতার নামে তারা ভারতের ন্যায় আগ্রাসী শক্তির কোলে গিয়ে উঠেনি। জোয়ারে ভাসার ন্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্রোতে তারা ভেসে যাননি। আগামী দিনের ইতিহাসে ইসলামপন্থি ও পাকিস্তানপন্থি নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীগন অন্ততঃ সে প্রজ্ঞার জন্য যুগ যুগ ধরে প্রশংসিত হবেন। তবে এমন প্রজ্ঞা তাদের মাঝেই স্বাভাবিক যারা কোরআনী জ্ঞানের সাথে পরিচিত। কারণ, “সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ভূল করে না” এমন তত্ত্বকথায় তাদের বিশ্বাস নেই। পবিত্র কোরআনে মহাজ্ঞানী আল্লাহতায়ালা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিচারবোধের যে মূল্যায়ন করেছেন সেটি আদৌ সুখদায়ক নয়। এ বিষয়ে মহান আল্লাহর রায় হলো, ‘আকছারাহুম কা’ফিরুন’ (তাদের অধিকাংশই কাফির), ‘আকছারাহুম ফাসিকুন’ (অর্থঃ তাদের অধিকাংশই দুর্বৃত্ত), ‘আকছারাহুম গাফিলুন’ (তাদের অধিকাংশই গাফেল), ‘আকছারাহুম লা’ইয়াশকুরুন’ (তাদের অধিকাংশই শোকর আদায় করে না), ‘আকছারাহুম লা’ইয়ালামুন’ (তাদের অধিকাংশই জানে না)। একটি সেকুলার সমাজের এই হলো অধিকাংশের অবস্থা। অধিকাংশ মানুষের ভোটে বিজয়ী হওয়া এজন্যই খুনি, ব্যভিচারী ও অতিশয় দুর্বৃত্তদের জন্যও অসম্ভব নয়। বিপুল ভোটে বিজয়ী দুর্বৃত্তকে তাই দেশ-ধ্বংস, ঈমান-ধ্বংস, অর্থনীতি-ধ্বংস, স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌত্বের বিনাশ, বাকশাল-প্রতিষ্ঠা ও নাগরিক অধিকারের বিলোপ –এমন কার্যক্রমের অধিকার দেওয়া যায় না। কারণ, এমন কাজ যেমন ইসলাম-বিরুদ্ধ তেমনি মানবতা-বিরুদ্ধও। এমন কুকর্ম নির্বাচনে জায়েজ হয় না। একাত্তরে পাকিস্তানপন্থিগণ এজন্যই মুজিবের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। 

সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে তাই কে ভাল আর কে জঘন্য দুর্বৃত্ত সে বিচার হয় না। শেখ মুজিবই তার একমাত্র উদাহরণ নয়। নির্বাচনের মাধ্যমেই হিটলারের ন্যায় মানব-ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য স্বৈরাচারির উদ্ভব ঘটেছিল। বেড়ে উঠেছে ফ্যাসীবাদ। মানব হত্যাকে দ্রুততর ও সহজতর করতে সে গ্যাস চেম্বার নির্মাণ করেছিল। এজন্যই বিশ্বের কোন আদালতে ভোটের জোরে বিচার-আচার হয় না। ভোটে বিজয়ী হওয়ার কারণেই মুজিব ও তার দল দেশকে একটি যুদ্ধ উপহার দিবে, দেশকে ভারতের গোলাম রাষ্ট্রে পরিণত করবে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কেড়ে নিবে -মুজিবকে সে অধিকার দিতে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাজী ছিল না। বিপুল ভোটে বিজয়ী হিটলারকে সরাতে বিশ্ববাসীর জন্য একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। মুজিব তেমনি একটি যুদ্ধ অনিবার্য করে তুলে পাকিস্তানেও। যারা মুজিবের ভারতপ্রীতি এবং তার ফ্যাসীবাদী চরিত্রের সাথে পরিচিত ছিল তাঁরা একাত্তরে তাঁকে বিশ্বাস করেনি, আজও করছে না। ফলে একাত্তর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুরু হয় গভীর বিভক্তি। ইউরোপের সৌভাগ্য যে হিটলারের নাৎসী দল ও তার ফ্যাসীবাদ কবরস্থ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য যে আওয়ামী লীগ ও তারা মুজিবী ফ্যাসীবাদ এখনও বেঁচে আছে। তারা ক্ষমতাসীনও হচ্ছে। ফলে প্রবল ভাবে বাড়ছে আত্মঘাতী বিভক্তিও। 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিভক্তির শুরু ১৯৭১ থেকে নয়, আরো অতীতে। উপমহাদেশে বহু পূর্ব থেকেই মুসলিম রাজনীতির দু'টি ধারা। একটি ইসলামের প্রতি অঙ্গিকারের। অপরটি ইসলামের প্রতি অঙ্গিকার বিলুপ্ত করে ভারতীয় হিন্দু আধিপত্যের প্রতি আনুগত্যের ধারা। এ শেষাক্ত ধারা ছিল ভারতীয় কংগ্রেসের। ১৯৪৭ সালে এ দু'টি ধারা ভারত ও পাকিস্তান -এ দুটি ভিন্ন দেশের জন্ম দেয়। মুজিবের কোয়ালিশন গড়ে উঠে কংগ্রেসী ধারার সাথে। আর তারই ফলে বাংলার ইতিহাসে নেমে আসে রক্তাত্ব একাত্তর। ভারত বিশাল বাহিনী নিয়ে দাঁড়ায় মুজিবের পাশে। ভারতকে একাত্তরে যারা বন্ধু রূপে গ্রহণ করতে পারেনি তারা আজও পারছে না। তারা পারেনি ১৯৪৭ সালেও। আর এদের সংখ্যা বাংলাদেশে আজও কম নয়। বরং যতই বাড়ছে ভারতের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভূ-প্রাকৃতিক আগ্রাসন ততই এরা দলে ভারী হচ্ছে। দেশটিতে এভাবেই মেরুকরণ হয়েছে প্রচন্ডভাবে। ফলে দেশ এগিয়ে চলছে সংঘাতের দিকে। ভারতের লক্ষ্য শুধু পাকিস্তানকেই দূর্বল করা নয়। বিনাশ করতে চায় উপমহাদেশের মুসলিম জাগরণকেও। তাই বাবরী মসজিদের ন্যায় মসজিদগুলো জমিনে মিশিয়ে দেওয়াই আগ্রাসী ভারতীয়দের একমাত্র লক্ষ্য নয়, গুড়িয়ে দিতে চায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিও। সে লক্ষ্যে পাকিস্তানকে খন্তিত করাই ভারতের একমাত্র স্ট্রাটেজী ছিল না, স্ট্রাটেজী হলো বাংলাদেশকে তলাহীন করাও। একাত্তরের পর ভারতীয় বাহিনী যে ব্যাপক লুটপাট করেছিল ও শিল্পকে ধ্বংস করেছিল তার মূল কারণ তো ছিল সেটাই। অপরদিকে পাকিস্তানকে খন্ডিত করার মধ্য দিয়েই আওয়ামী রাজনীতি শেষ হয়নি। পরবর্তী স্ট্রাটেজী, বাংলাদেশের জনগণকে ইসলামে অঙ্গিকারহীন করা। ফলে ভারতের কাছে আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যায়নি। একারণেই উভয়ের মাঝে গড়ে উঠেছে দীর্ঘকালীন কোয়ালিশন। আওয়ামী লীগ তাই একাত্তরে যেমন ভারতের পার্টনার ছিল, এখনও পার্টনার। 

বাংলাদেশে আজ যে বিভক্তি তা নিয়ে ইতিহাস-বিকৃতি হয়েছে বিচিত্র ভাবে। বিকৃত সে ইতিহাসের ভাষ্য হলো, মুষ্টিমেয় কিছু রাজাকার ছাড়া সবাই একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে ছিল। কিন্তু প্রকৃত সত্য কি তাই? শেখ মুজিব সেদিন বাঙ্গালী জাতীয়তার জোয়ার সৃ্ষ্টি করেছিলেন ঠিকই, কিন্তু সবাই সে জোয়ারে ভেসে যায়নি। আওয়ামী লীগের বিপক্ষে শুধু রাজাকারগণই ছিল না, ছিল এক বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিপক্ষও। পাকিস্তান খন্ডিত হওয়াতে বাংলার মুসলমানদেরই শুধু নয়, বিশ্বের মুসলমানদেরও যে অপুরণীয় শক্তিহানী হবে সেটি যে শুধু ইসলামী দলের নেতাকর্মী, উলামা ও রাজাকারগণ অনুধাবন করেছিলেন তা নয়। তাদের পাশাপাশি সে সময়ের বহু প্রথম সারির বুদ্ধিজীবীরাও বুঝতে পেরেছিলেন। তাদের যু্ক্তি ছিল, পাকিস্তানে সমস্যা আছে, সমাধানের রাস্তাও আছে। পাত্রে ময়লা ধরলে ধুয়ে মুছে সেটি পরিস্কার করাই বুদ্ধিমত্তা, ভেঙ্গে ফেলা নয়। পাত্রে ময়লা ধরার ন্যায় দেশে দুর্বৃত্তরাও শাসক হয়। বিশ্বের প্রতিদেশেই সেটি হয়ে। প্রকৃত বুদ্ধিমানদের কাজ দুর্বৃত্ত তাড়ানো, দেশ ভাঙ্গা নয়। বাহাদুরী তো গড়াতে, ভাঙ্গাতে নয়। দেশের সীমান্ত এক মাইল বাড়াতে হলেও প্রকান্ড যুদ্ধ লড়তে হয়। ফলে দেশ ভেঙ্গে উৎসব করা তো আহাম্মকদের কাজ। তাছাড়া মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গার কাজে কি একটি তীর ছুড়ারও প্রয়োজন আছে? একাজ করার জন্য অতীতের ন্যায় আজও কি শত্রুর অভাব আছে? ভাঙ্গার আওয়াজ উঠালে বহু কাফের রাষ্ট্র সেটি নিজ খরচে করে দিতে দুই পায়ে খাড়া। কুয়েত, কাতার, আবুধাবি, দুবাই, বাহরাইনের মত তথাকথিত স্বাধীন দেশ সৃষ্টি করতে কি আরবদের অর্থব্যয়, শ্রমব্যয় বা রক্তব্যয় হয়েছে? কারও একটি তীরও কি ছুঁড়তে হয়েছে? মুসলমানদের শক্তিহীন করা, ইসরাইলের নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করা এবং আরবদের তেল সম্পদকে লুন্ঠন করার স্বার্থে পাশ্চাত্য দেশগুলো নিজ খরচে এ দেশগুলোকে সৃষ্টি করেছে। শুধু ভাঙ্গা কেন, পাকিস্তানের জন্ম বন্ধ করার জন্য ভারতীয় আধিপত্যবাদীদের চেষ্টা কি কম ছিল? একারণেই পাকিস্তান ভাঙ্গার যুদ্ধে আওয়ামী লীগকে একটি টাকাও ব্যয় করতে হয়নি। নিজ খরচে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রও খুলতে হয়নি। কোন অস্ত্রও কিনতে হয়নি। ভারতই সে কাজ নিজ খরচে ও নিজ উদ্যোগে করে দিয়েছে। এমন সহজ সত্যটি একাত্তরে অনেকেই বুঝতেন। ফলে তারা পাকিস্তানের বিরাজমান সমস্যার সমাধানে ভারতের মত একটি চিহ্নিত শত্রুদেশের হস্তক্ষেপ চাননি। চাননি ভারতীয় বাহিনীর বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ। তারা চাইতেন শান্তিপূর্ণ ভাবে একটি নিস্পতির, এবং কখনই সেটি পাকিস্তানেকে বিভক্ত করে নয়। পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে আলেমদের মাঝে সে সময় যারা প্রথম সারিতে ছিলেন তারা হলেন কিশোরগঞ্জের প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা আতাহার আলী, চট্টগ্রামের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা সিদ্দিক আহম্মদ, ঢাকার প্রখ্যাত মাওলানা মোস্তাফা আল মাদানী, লালবাগ মাদ্রাসার মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজজী হুজুর, পীর মোহসীন উদ্দিন দুদু মিয়া, শর্শিনার পীর আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ এবং তার অনুসারিরা। পক্ষ নিয়েছে বাংলাদেশের প্রায় সকল গণ্যমান্য আলেম। সে সময় কোন প্রসিদ্ধ আলেম পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নিয়েছে এ প্রমাণ নেই। তাদের যু্ক্তিটি ছিল, একটি মুসলিম দেশ ভাঙ্গলে মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানী হয়। আর মুসলিম উম্মাহর শক্তিহানী তো কবিরা গুনাহ। একাজ তো কাফেরদের। অথচ বাংলাদেশের সেকুলারিষ্টদের কাছে মহান আল্লাহতায়ালা বা তাঁর রাসূল (সাঃ) কি বললেন সেটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কোনটি কুফরি ও কোনটি জায়েজ সেটিও তাদের কাছে বিচার্য বিষয় ছিল না। এসব গুরুতর বিষয় গুরুত্ব পায়নি সেসব স্বৈরাচারি আরবদের কাছেও যারা অখন্ড আরব ভূখন্ড বিশেরও বেশী টুকরায় বিভক্ত করতে সাম্রাজ্যবাদী কাফের শক্তিকে সাহায্য করেছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ আজও এসব শাসকদের সবচেয়ে বড় রক্ষক। একইভাবে মুজিব ও তাঁর অনুসারিদের রক্ষকের ভূমিকা নিয়েছে ভারত।

শুধু আলেম, ইসলামী দলগুলীর নেতাকর্মী ও রাজাকারগণই নয়, তাদের সাথে অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিযেছিলেন বহু বুদ্ধিজীবীও। অথচ সে প্রকট সত্যটিকে আজ ভূলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। যে মিথ্যাটি আজ জোরে শোরে বলা হচ্ছে তা হলো, পাকিস্তানের বিভক্তির বিরোধী করেছিল মুষ্টিমেয় রাজাকার। অতএব কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক। সে সময় ৫৫ জন কবি, শিল্পি ও বুদ্ধিজীবী একটি বিবৃতি দেন। তাতে পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপের বিরোধীতা ও নিন্দা করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন, নাট্যকার ও লেখক প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিভাগের প্রধান এম, কবীর, মনস্তত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. মীর ফখরুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের রিডার ড. কাজী দীন মোহাম্মদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার ও নাট্যকার নুরুল মোমেন, কবি আহসান হাবীব, চিত্র পরিচালক খান আতাউর রহমান, গায়িকা শাহনাজ বেগম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র লেকচেরার ও নাট্যকার আশকার ইবনে শাইখ, গায়িকা ফরিদা ইয়াসমিন, পল্লী গীতির গায়ক আব্দুল হালিম, চিত্র পরিচালক এ. এইচ. চৌধুরি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের রিডার ড. মোহর আলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রধান মুনীর চৌধুরী, বাংলা উন্নয়ন বোর্ডের ড. আশরাফ সিদ্দিকী, গায়ক খোন্দকার ফারুক আহমদ, গায়ক এস, এ, হাদী গায়িকা নীনা হামিদ, গায়িকা লায়লা আর্জুমান্দ বানু, শামশুল হুদা চৌধুরী (জিয়া ক্যাবিনেটের মন্ত্রী এবং এরশাদ সরকারের পার্লামেন্ট স্পীকার), গায়ীকা সাবিনা ইয়াসমীন, গায়িকা ফেরদৌসী রহমান, গায়ক মোস্তাফা জামান আব্বাসী, ছোটগল্পকার সরদার জয়েদ উদ্দীন, লেখক সৈয়দ মুর্তুজা আলী, কবি তালিম হোসেন, ছোটগল্পকার শাহেদ আলী, মাসিক মাহে নও সম্পাদক কবি আব্দুস সাত্তার, নাট্যকার ফররুখ শীয়র, কবি ফররুখ আহম্মদ, পাকিস্তান অবজারভার (আজকের বাংলাদেশে অবজারভার) পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল সালাম, অধুনা বিলুপ্ত ঢাকার মর্নিং নিউজ পত্রিকার সম্পাদক এস, জি, এম বদরুদ্দীন, দৈনিক পাকিস্তান (পরবর্তী কালের দৈনিক বাংলা)সম্পাদক আবুল কালাম সামসুদ্দীন, অভিনেতা ও চিত্র পরিচালক ফতেহ লোহানী, কবি হেমায়েত হোসেন, লেখক আকবর উদ্দীন, লেখক আকবর হোসেন, লেখক কাজী আফসার উদ্দীন আহমেদ, লেখক ও সাংবাদিক সানাউল্লাহ নূরী, লেখক ও কবি শাসসুল হক, লেখক সরদার ফজলুল করিম, গায়িকা ফওজিয়া খান প্রমুখ।– (সুত্রঃ দৈনিক পাকিস্তান (অধুনালিপ্ত দৈনিক বাংলার পাকিস্তান আমলের নাম), ১৭ই মে, ১৯৭১ সাল)।

বিবৃতিতে উল্লিখিত স্বাক্ষরকারীগণ বলেন, “পাকিস্তানী শাসন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আমাদের নিজস্ব অভাব-অভিযোগ রয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আমাদের যেটা প্রাপ্য সেটা না পেয়ে আমরা অসুখী। আমাদের এই অসন্তোষ আমরা প্রকাশ করেছি একই রাষ্ট্র কাঠামোর আওতায় পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ব্যাপক স্বায়ত্বশাসনের পক্ষে ভোট দিয়ে। কিন্তু আওয়ামী লীগের চরমপন্থিরা এই সহজ সরল আইনসঙ্গত দাবীকে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার দাবীতে রুপান্তরিত করায় আমরা হতাশ ও দুঃখিত হয়েছি। আমরা কখনও এটা চাইনি, ফলে যা ঘটেছে আমরা তাতে হতাশ ও দুঃখিত হয়েছি। বাঙালী হিন্দু বিশেষ করে কোলকাতার মারোয়াড়ীদের আধিপত্য ও শোষণ এড়ানোর জন্যেই আমরা বাংলার মুসলমানেরা প্রথমে ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ রাজত্বকালে পৃথক পূর্ববাংলা প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত নেই। এবং আবার ১৯৪৭ সালে ভোটের মাধ্যমেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রদেশের মুসলিম ভাইদের সাথে যুক্ত হওয়ার সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। উক্ত সিদ্ধান্তে অনুতপ্ত হওয়ার আমাদের কোন কারণ নেই। পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু প্রদেশ হিসেবে সারা পাকিস্তানকে শাসন করার অধিকার আমাদের আছে। আর সেটা আয়ত্তের মধ্যেই এসে গিয়েছিল। ঠিক তখনই চরমপন্থিদের দুরাশায় পেয়ে বসল এবং তারা জাতীয় অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া দেশে সাধারণ নির্বাচন দিলেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া আলোচনাকালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া আওয়ামী লীগকে সংখ্যাগুরু দল হিসাবে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কিন্তু উল্টোটাই ঘটে গেল এবং নেমে এল জাতীয় দুর্যোগ। .. কিন্তু আমরা আমাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কোন বড় রকমের হস্তক্ষেপের বিরোধীতা ও নিন্দা করছি।”

সে সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পক্ষ থেকেও পত্রিকায় আরেকটি বিবৃতি ছাপা হয়। তারা বলেন, “আমরা নিম্নস্বাক্ষরকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ পাকিস্তানের সাম্প্রতিক ঘটনায় গভীর বেদনা বোধ করছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে, ভারতীয় যুদ্ধবাজ যারা মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি হিসেবে পাকিস্তান সৃষ্টিকে কখনো গ্রহণ করেনি প্রধানত তাদের চক্রান্তের ফলেই এটা হয়েছে। …আমরা আমাদের প্রিয় স্বদেশ ভূমির সংহতি এবং অখন্ডতা রক্ষার জন্য আমাদের সেনাবাহিনীর সময়োচিত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রশংসা করছি।.. আমরা দেশের সংহতি ও অখন্ডতা বিপন্ন করার জন্য চরমপন্থিদের অপপ্রয়াসের নিন্দা করছি। বহির্বিশ্বের চোখে পাকিস্তানের মর্যদা হ্রাস ও পাকিস্তানকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার অপচেষ্টা এবং সীমান্তে সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে আমাদের ঘরোয়া ব্যাপারে ভারতীয় হস্তক্ষেপের আমরা নিন্দা করছি। আমরা ভারতের ভিত্তিহীন ও দুরভিসন্ধিমূলক প্রচারণার নিন্দা করছি। ভারতীয় বেতারে প্রচারিত একটি খবরের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। উক্ত খবরে বলা হয়েছে যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ধ্বংস করে দিয়েছে। আমরা দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করছি, এটা নির্লজ্জ মিথ্যা প্রচারণা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণের সকল ভবন অক্ষত অবস্থায় রয়েছে এবং কোন ভবনের কোনরূপ ক্ষতিসাধন হয়নি। আমরা দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি, বর্তমান মুহুর্তে সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন আমাদের সকলের মধ্যে ঐক্য ও শৃঙ্খলা। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রেখে আমরা বর্তমান সংকট হতে মুক্ত হতে পারব।” বিবৃতিটিতে স্বাক্ষর করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত ভিসি এবং আইন ফ্যাকাল্টির ডিন ইউ, এন, সিদ্দিকী, ইতিহাস বিভাগের প্রধান ও সাবেক ভিসি ড. আব্দুল করিম, সমাজ বিজ্ঞানের ডিন ড. এম, বদরুজ্জা, ইসলামের ইতিহাস বিভাগের লেকচেরার মোহাম্মদ ইনামুল হক, রাষ্ট্র বিজ্ঞানের প্রধান ড. রফিকুল ইসলাম চৌধুরী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রিডার মোঃ আনিসুজ্জামান, ইংরাজী বিভাগের সিনিয়র লেকচেরার খোন্দকার রেজাউর রহমান, রাষ্টবিজ্ঞানের লেকচেরার সৈয়দ কামাল মোস্তফা, রাষ্টবিজ্ঞানের লেকচেরার এম, এ, জিন্নাহ, ইতিহাসের সিনিয়র লেকচেরার রফিউদ্দীন, রসায়ন বিভাগের প্রধান এ, কে, এম, আহমদ, সমাজ বিজ্ঞানের সিনিয়র লেকচেরার রুহুল আমীন, বাণিজ্য বিভাগের প্রধান মোঃ আলী ইমদাদ খান, ইতিহাসের সিনিয়র লেকচেরার হোসেন মোঃ ফজলে দাইয়ান, বাংলা বিভাগের সিনিয়র লেকচেরার মোঃ দিলওয়ার হোসেন, সংখ্যাতত্ত্বের সিনিয়র লেকচেরার আব্দুর রশিদ, ইতিহাস বিভাগের রিডার মুকাদ্দাসুর রহমান, ইতিহাসের লেকচেরার আহসানুল কবীর, অর্থনীতি বিভাগের লেকচারার শাহ মোঃ হুজ্জাতুল ইসলাম, ইংরাজী বিভাগের প্রধান মোহম্মদ আলী, পদার্থ বিভাগের রিডার এজাজ আহমেদ, গণিতের লেকচারার জনাব এস, এম, হোসেন, গণিত বিভাগের রিডার জেড, এইচ চৌধুরী, সংখ্যাতত্ত্বের জনাব হাতেম আলী হাওলাদার, বাংলা বিভাগের রিডার ড. মোঃ আব্দুল আওয়াল, বাংলা বিভাগের সিনিয়র লেকচারার মোঃ মনিরুজ্জামান, বাংলা বিভাগের সিনিয়র লেকচারার মোঃ মনিরুজ্জামান হায়াত (লেখক হায়াত মাহমুদ), ইতিহাস বিভাগের গবেষণা সহকারী আব্দুস সায়ীদ, অর্থনীতির লেকচারার মোহাম্মদ মোস্তাফা, ইতিহাসের লেকচারার সুলতানা নিজাম, ইতিহাসের রিডার ড. জাকিউদ্দীন আহমদ এবং ফাইন আর্টের লেকচেরার আব্দুর রশীদ হায়দার। -(সুত্রঃ দৈনিক পাকিস্তান, ২৭শে জুন, ১৯৭১)

সেকুলার চেতনার বুদ্ধিজীবীগণও তখন বসে থাকেনি। আওয়ামী ক্যাডারদের সশস্ত্র যুদ্ধের প্রতি সর্বাত্মক সমর্থণ নিয়ে তারা এগিয়ে আসেন। তাদের মিশন হয়, যেভাবেই হোক পাকিস্তানের আশু ধ্বংস। ভারত, রাশিয়াসহ যে কোন দেশের সাহায্য লাভও তাদের কাছে অতি কাম্য হয়ে দাঁড়ায়। তাদেরই ক’জন হলেনঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আবু সায়ীদ চৌধুরী, বাংলার অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, অধ্যাপক ড. মাযহারুল ইসলাম, ড. এ, আর, মল্লিক, কবি আল মাহমুদ, রণেশ দাস গুপ্ত, অধ্যাপক ড. এবনে গোলাম সামাদ, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, শওকত ওসমান, আসাদ চৌধুরী, সরোয়ার মুর্শেদ। এদের অনেকে ভারতেও পাড়ি জমান।            

দেখা যাক, সে সেময় যেসব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন তাদের দর্শন ও উদ্দেশ্যটি কি ছিল? আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী-বুদ্ধিজীবীগণ তাদেরকে চিত্রিত করেছে পাকিস্তানের দালাল রূপে। কিন্তু তারা কি সত্যই দালাল ছিলেন? দালালের সংজ্ঞা কি? দালাল তাদেরকে বলা হয়, যারা কাজ করে অন্যের স্বার্থে। এবং সেটা করে অর্থলাভ বা সুবিধা লাভের আশায়। কিন্তু যারা সেদিন পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন তারা তো বিদেশের স্বার্থে কাজ করেননি। পাকিস্তান তাদের কাছে বিদেশ ছিল না, ছিল একান্ত নিজেদের দেশ। তারা কাজ করেছেন সে দেশটির স্বার্থে যে দেশটিকে তারা ১৯৪৬ সালে ভোট দিয়ে নিজেরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ দেশটির একতা ও সংহতি রক্ষার শপথ নিয়ে এমনকি শেখ মুজিবও অতীতে মন্ত্রী হয়েছেন। এমনকি সে অঙ্গিকার ব্যক্ত করে শেখ মুজিব ১৯৭০ সনের নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। নির্বাচনী ভাষণে পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনিও দিয়েছেন। তাদের অপরাধ (?) শুধু এ হতে পারে, মুজিবের ন্যায় তারা সে অঙ্গিকারের সাথে গাদ্দারী করেননি। বরং অখন্ড পাকিস্তানের মধ্যে তারা নিজেদের কল্যাণ ও সে সাথে বিশ্ব-মুসলিমের কল্যাণ দেখেছেন। আর অর্থ লাভের বিষয়? তারা তো বরং পাকিস্তানের প্রতিরক্ষায় এবং ভারতের মোকাবেলায় নিজেদের মেধা, শ্রম এমনকি প্রাণদানে হাজির হয়েছিলেন। সে চেতনা নিয়ে হাজার হাজার রাজাকার শহীদও হয়েছেন। কোন দালাল কি কারো খাতিরে প্রাণ দেয়? দেখা যাক, সে সময়ে পাকিস্তানপন্থি নেতাদের নিজেদের অভিমত কি ছিল। পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ অবজারভার পত্রিকার মালিক জনাব হামিদুল হক চৌধুরী ১৯৭১ সালের ৬ই এপ্রিলে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ভারতীয় প্রচরণার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা এবং তার দ্বারা একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে এদেশের অস্তিত্ব বিলোপ করে নিজস্ব সম্প্রসারণবাদী মনোভাব চরিতার্থ করা। এ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য এবং বিশ্বকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা তাদের সকল প্রচার মাধ্যমের দ্বারা বিশ্ববাসীর নিকট হাজার হাজার নরহত্যা ও বোমাবর্ষণের ফলে শহর ধ্বংসের ভিত্তিহীন অভিযোগ প্রচার করছে।”-(সুত্রঃ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়?)। ১৯৭১ সালের ৬ই এপ্রিলে দেওয়া এক বিবৃতিতে জনাব শাহ আজিজুর রহমান (বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী) বলেন, “প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া প্রবল উৎকন্ঠার সঙ্গে রাজনৈতিক দলসমূহের অধিকতর স্বাধীনতা প্রদান পূর্বক দেশে পূর্ণ ও বাধাহীন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন। … আওয়ামী লীগ এই সুযোগের ভূল অর্থ করে বল প্রয়োগের … মাধ্যমে নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসাবে জয়লাভ করে নিজেদের খেয়ালখুশীতে দেশ শাসনের দাবী করে এবং এভাবেই অহমিকা, অধৈর্য এবং ঔদ্ধত্যের ফলে নিজেদের ভাসিয়ে দেয়। …আমি সাম্রাজ্যবাদী ভারতের দুরভিসন্ধি নস্যাৎ করার উদ্দেশ্যে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে সাহায্য করার জন্য জনগণের প্রতি আবেদন জানাচ্ছি।”-(সুত্রঃ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়?)। পূর্ব পাকিস্তান মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি মাওলানা আব্দুল মান্নান ১৯৭১ য়ের ২৭ শে এপ্রিল এক বিবৃতিতে বলেন, “সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমূলে উচ্ছেদ করার উদ্দেশ্যে পূর্ব পাকিস্তানের দেশপ্রেমিক জনগণ আজ জেহাদের জোশে আগাইয় আসিয়াছে।” -(সুত্রঃ একাত্তরের ঘাতক ও দালালেরা কে কোথায়?)। পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর জনাব গোলাম আযম এক বিবৃতিতে বলেন, “পূর্ব পাকিস্তানীরা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী ভারতকে ছিনিমিনি খেলতে দেব না। … পূর্ব পাকিস্তানীরা কখনই হিন্দু ভারতের দ্বারা প্রভাবিত হবে না। ভারতীয়রা কি মনে করেছে যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের এতদূর অধঃপতন হয়েছে যে তারা ভারতকে তাদের বন্ধু ভাববে।” –(দৈনিক সংগ্রাম, ৮ই এপ্রিল, ১৯৭১)। পাকিস্তান ডেমোক্রাটিক পার্টির সভাপতি এবং পুর্ব পাকিস্তানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জনাব নুরুল আমীন বলেন, “পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য আমরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি এবং সে সংগ্রামে জয়ী হয়েছি। আজও পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষার জন্য আমাদের বিরুদ্ধে শক্তির মোকাবেলা করতে হবে। -(দৈনিক পাকিস্তান, ১৬ই আগষ্ট, ১৯৭১)। পাকিস্তান ডিমোক্রাটিক পার্টির সহসভাপতি ও প্রখ্যাত পার্লামেন্টারীয়ান জনাব মৌলবী ফরিদ আহমদ বলেন, “পাকিস্তানকে খন্তিত করা এবং মুসলমানদের হিন্দু-ব্রাহ্মণ্য ফ্যাসীবাদীদের ক্রীতদাসে পরিণত করার ভারতীয় চক্রান্ত বর্তমানে নিরপেক্ষ বিশ্ববাসীর কাছে সুস্পষ্ট হয়ে গেছে।… একমাত্র ইসলামের নামে এদেশের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নিষ্ঠুর পরিহাস ভারতীয় এজেন্টরা তথাকথিত সাংস্কৃতিক বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের নামে এমন জঘন্য কাজ সম্পাদনে সক্ষম হয়েছে যা করতে হিটলারের ঘাতকদের বর্বরতাও লজ্জা পাবে। (সম্ভবতঃ এখানে তিনি ১লা মার্চ থেকে ২০ শে এপ্রিল পর্যন্ত দেশ আওয়ামী লীগ ক্যাডারদের দখলে থাকার সময় অবাঙ্গালীদের উপর যে গণহত্যা, ধর্ষণ ও লুটতরাজ নেমে আসে সেটি বুঝিয়েছেন)-(দৈনিক পাকিস্তান ১৬ই আগষ্ট, ১৯৭১)। মুসলিম লীগ নেতা এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সাবেক স্পীকার জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, “জাতি আজ তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের মারাত্মক সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। ..পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা ৯৬ জন লোক পাকিস্তানের জন্য ভোট দিয়েছিল …ভারতীয় এজেন্টদের দ্বারা পরিচালিত তথাকথিত বাংলাদেশ বেতার থেকে দিনরাত তাঁর ও অন্যান্য মুসলিম লীগ নেতার মৃত্যুদন্ডের কথা তারস্বরে ঘোষণা করা হচ্ছে। …পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করে যাব। কারণ পাকিস্তানই যদি না থাকে তাহলে অধিকারের জন্য সংগ্রামের অবকাশ কোথায়?”-(দৈনিক পাকিস্তান, ১৮ই জুলাই, ১৯৭১)। 

কথা হলো, যারা এমন এক প্রবল চেতনা নিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন তাদেরকে কি বিদেশীদের দালাল বলা যায়? তারা যদি দালালী করেই থাকেন তবে সেটি করেছেন তাদের নিজস্ব চেতনা-বিশ্বাস ও স্বার্থের সাথে। তারা লড়াই করেছিলেন এবং প্রাণ দিয়েছিলেন নিজদেশের প্রতিরক্ষায়। আজও একই চেতনা নিয়ে তারা কাজ করছেন বাংলাদেশে। দু'টি ভিন্ন চেতনা আবার সেদিনের মত মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে বাংলাদেশে। তাই বাংলাদেশে বিভক্তির রাজনীতি একাত্তরে শেষ হয়নি। শেষ হয়নি ভারতীয় আগ্রাসনও। বাংলাদেশের আজকের সমস্যা মূলতঃ ভারতপন্থিদের সৃষ্টি। তবে খেলা এখন বাংলাদেশের ঘরে নেই। বাংলাদেশ চাইলেও সেটি থামানোর সামর্থ তার নেই। নিয়ন্ত্রন নেই এমনকি আওয়ামী লীগেরও। বরং এ দলটি নিজেই খেলছে ভারতের ক্রীড়নক হিসাবে। একাত্তরেও একই অবস্থা ছিল। মুজিবের হাত থেকে খেলা আগেই ভারত নিয়ে নিয়েছিল। ফলে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও ভূট্টোর সাথে আলোপ আলোচনার সময় মুজিব শুধু তাই বলেছে যখন যা ভারত তাঁকে বলতে বলেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধেই ইতিমধ্যেই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ঢাকার রাজপথে। অবশেষে বাকি খেলার পুরা দায়িত্ব ভারতকে দিয়ে জেনে বুঝে মুজিব পাকিস্তানের জেলে গিয়ে উঠেন। মুজিবনগর সরকার নামে যে পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার সামান্যই সামর্থ ছিল ভারতকে প্রভাবিত করার। বরং সে সরকার নিজের অস্তিত্ব নির্ভর করছিল ভারত সরকারের করুণার উপর। 

ভারতের  স্ট্রাটেজী হলো, বাংলাদেশকে একটি দূর্বল রাষ্ট্র রূপে কোন মত বাঁচিয়ে রাখা। কারণ, ভারতের জন্য এটি এক রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। একাত্তরের যুদ্ধে ভারত বিপুল অর্থ বিণিয়োগ করেছিল এবং তার হাজার হাজার সৈন্য প্রাণ দিয়েছিল সেটিও ছিল এ লক্ষেই। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী বাংলাদেশ নির্মাণে ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল -সেটি কিছু বাংলাদেশী বেওকুফ বিশ্বাস করলেও কোন ভারতীয় বিশ্বাস করেনি। তারা বুঝে, বাংলাদেশ সবল হওয়ার মধ্যেই ভারতের বিপদ। তখন বল পাবে ভারতীয় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যের বিদ্রোহীরা। বল পাবে ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলিম। ভারতের কাছে সেটি অসহনীয়। তাই আরেক পাকিস্তানকে কখনই তারা ভারতের পূর্ব সীমান্তে বেড়ে উঠতে দিবে না। এ নিয়ে তাদের আপোষ নেই। এজন্যই প্রতিদিনের পানাহারের ন্যায় তাদের কাছে অতি অপরিহার্য হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিবাদ ও সংঘাত টিকিয়ে রাখা। তাই বিভক্তির সূত্রগুলো খুঁজে খুঁজে বের করে তাকে তারা অবিরাম পরিচর্যা দিচ্ছে। তাই একাত্তরের বিবাদ ও বিভক্তি বিলুপ্ত হওয়ার নয়। বরং দিন দিন সেটি প্রবলভাবে বেড়ে উঠছে। তাই মুজিব যা নিয়ে আর এগুনোর সাহস পায়নি, সে একাত্তর নিয়ে তার কন্যা তার হাজার হাজার রাজনৈতিক বিরোধীদের উপর আবার পুলিশী হয়রানী ও দলীয় নির্যাতন চাপিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতীয় বিশাল পুঁজি বিণিয়োগের মূল হেতু তো এখানেই। তবে ভারত এবার সব ডিম এক থলিতে রাখেনি। বিস্তর পুঁজি বিণিয়োগ হয়েছে আওয়ামী লীগের বাইরেও। সেটি বোঝা যায় মিডিয়া ও এনজিও জগতের দিকে তাকালে। মুজিব আমলেও এত পত্রিকা ও এত বুদ্ধিজীবী ভারতের পক্ষ নেয়নি যা আজ নিচ্ছে। এরাই আজ আরেকটি যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরী করছে। সেটি পত্র-পত্রিকা ও টিভির মাধ্যমে ঘৃণার বীজ ছড়িয়ে। তাদের পক্ষ থেকেই বার বার দাবী উঠছে, “শুরু হোক আরেক একাত্তর” এবং “আবার গর্জে উঠুক একাত্তরের হাতিয়ার”। কথা হলো, একাত্তরের এক যুদ্ধই বাংলাদেশকে তলাহীন ভিক্ষার ঝুলিতে পরিণত করেছিল, আরেক যুদ্ধের ব্যয়ভার বহনের সামর্থ কি বাংলাদেশের আছে? তাছাড়া আরেক যুদ্ধ শুরু হলে সেটি কি নয় মাসে শেষ হবে? সেটি হবে গৃহযুদ্ধ। আর গৃহযুদ্ধে কোন পক্ষ জিতে না, হারে সমগ্র দেশ। সেটি হবে বাংলাদেশের জন্য বড় আত্মঘাত। ভারত তো সেটাই চায়। ভারতের লক্ষ্যই হলো মুসলমানদের বিভক্ত করা এবং শাসন করা। যে কোন শত্রুর এটিই হলো অভিন্ন স্ট্রাটেজী। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে বিজয়ী করার চেয়ে এটিই তাদের কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। বরং আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার লক্ষ্যও সেটিই যাতে এ বিভক্তিকে আরো দীর্ঘজীবী ও প্রবলতর করা যায়। 

বাংলাদেশীদের  মাঝে বিভক্তি গড়ার সবচেয়ে বড় কাজটি করছে মিডিয়া। ভারতের পক্ষে আজকের বুদ্ধিবৃত্তিক মূল যুদ্ধটি করছে তারাই। আর আওয়ামী লীগের ন্যায় ভারতপন্থি দলগুলীর মূল কাজ হয়েছে সে বিভক্তিকে একটি রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ দেওয়া। কারণ, এ পথেই বাড়ে ভারতের অর্থলাভ ও রাজনৈতিক সাহায্যলাভ। তাই বাংলাদেশের অধিকাংশ মিডিয়া ও ভারতপন্থি দলগুলো এক ও অভিন্ন লক্ষ্যে কাজ করছে। ইসলামপন্থি এবং একাত্তরের পাকিস্তানপন্থিদের বিরুদ্ধে ভারতপন্থিদের আজকের আক্রমণ এজন্যই আজ নতুন মাত্রা পাচ্ছে। ফলে যে রাজনৈতিক বিভক্তি ও সংঘাতের আগুন জ্বলে উঠেছিল একাত্তরে, ৪০ বছর পর আজও সেটি নিভছে না। একাত্তরে তাদের কামানের মুখ ছিল পাকিস্তানের দিকে, কিন্ত এবারের রণাঙ্গণে পাকিস্তান নেই। কামানের নল এবার খোদ বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। একাত্তরের চেতনার এটিই মরণছোবল। এমন একটি মাস্টার প্লান নিয়ে ভারত ১৯৪৭ থেকেই ময়দানে নেমেছিল। একাত্তরে সেটি অর্ধেক সফল হয়েছিল। এবার সফল করতে চায় বাঁকিটুকু।

 

Comments  

 
0 # 2010-01-26 03:38

Dear Writer, I love you for the sake of Allah and your effort to tell the truth infront of all the liars. I like your work but I have different point of view. I would ask your readers to watch my videos at youtube.

Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh