Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর

eBooks

Latest Comments

দুই পলাশী দুই মীরজাফর
অধ্যায় ১৮: স্বাধীনতার দৃশ্যপট Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:28
স্বাধীনতার দৃশ্যপট
পলাশী যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি এবং পূর্বপাকিস্তানের পতনোত্তর পরিস্থিতির মধ্য পার্থক্য মোটেও ছিল না। পলাশীর যুদ্ধে যারা সক্রিয় ছিল, যারা ইংরেজদের দুরভিসন্ধি আঁচ করে পরিস্থিতির মুকাবিলা করতে চেয়েছিল, তাদেরকে নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছিল মীরজাফরের কারাগারে। বৃটিশদের নির্দেশ মত অথবা আত্মগোপন করতে হয়েছিল নির্যাতনমূলক উৎকট পরিস্থিতি থেকে আত্মরক্ষার জন্য। সেদিন শুধু তরুণ নবাবকে নির্মমভাবে নিহত হতে হয়নি, স্বাধীনতা ও সংহতির পক্ষে থাকা অসংখ্য দেশপ্রেমিককে আলিঙ্গন করতে হয়েছিল অমানবিক মৃত্যু। সিরাজের লাশ মাড়িয়ে নবাবের কোষাগার লুণ্ঠিত হল- যা ছিল বাংলার জনগণের সম্পদ। সেদিন ছিল পলাশী নাটকের শেষ পরিণতির মূল প্রযোজক বর্ণবাদী হিন্দু চক্র, শিখণ্ডি মীর জাফর ও তার সহগামীদের ঘরে ঘরে উৎকট আনন্দের উচ্ছলতা। হয়তোবা জনগণ ও উল্লসিত হয়েছিল নিছক ক্ষমতার পালাবদল মনে করে। অনুরূপ একই চিত্র আমরা প্রত্যক্ষ করেছি পূর্বপাকিস্তান পতনের পর এই বাংলার প্রতিটি জনপদে।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝিতে পূর্বপাকিস্তানে পাকিস্তানী বাহিনীর পতন পর্যায় থেকে  এই অঞ্চলে যেমন সর্বব্যাপী লূণ্ঠন শুরু হল, অন্যদিকে তেমনি চলল হত্যাযজ্ঞ; আওয়ামী পরিভাষায় দালাল নিধন। এদেশী হিন্দু শুধু নয়- হিন্দুস্থানের প্রতিটি ঘরে সেদিন চলছিল দেয়ালীর মহোৎসব। একদিকে ছিল অবারিত উল্লাস অন্যদিকে কারবালার মাতম। চলছিল হত্যাযজ্ঞ, সত্যিকার দেশপ্রেমিকদের উপর নির্মম নিপীড়ন দালাল অপবাদের বোঝা চাপিয়ে। আওয়ামী পান্ডাদের ধর্ষণের দায় চাপিয়ে দেয়া হল সবটুকু পাক বাহিনীর উপর এবং ধর্ষিতাদের বেআব্রু করার জন্য বীরাঙ্গনার তিলক পরিয়ে কলঙ্কিত করা হল এদেশের তরুনীদের। দেশের মাটি আকড়ে থেকে ৯০ শতাংশ জনগণকে রক্ষা করার জন্য যারা আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, তাদেরকে লাঞ্ছিত করা হল এবং লুট করা হল তাদের সম্পদ। এদের অধিকাংশ হত্যাযজ্ঞের শিকার হল অথবা নিক্ষিপ্ত হল কারাগারে।
 
অধ্যায় ১৯: দুঃশাসনের যবনিকাপাত Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:29

দুঃশাসনের যবনিকাপাত
শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে সোনার বাংলা স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। সেই স্বপ্নের ঘোর কেটেছিল বাংলাদেশের সূচনা পর্বে। হ্যামিলনের বাঁশির সুরে যেমন সম্মোহন ছিল অনুরূপ সম্মোহন ছিল মুজিবের ভাষণে। মুজিব আঞ্চলিকতার আবেশ ছড়িয়ে শোষণ বঞ্চনার কল্প কাহিনী দিয়ে সহজ সরল বাংলার মানুষকে যখন ক্ষুধা দারিদ্র আর সন্ত্রাসের দ্বার প্রান্তে টেনে আনলেন তখনই তাদের সম্মোহন কেটে যায়। কাটলেও নিরূপায় ছিল সকলে। পিছু হটবার সব পথ রুদ্ধ থাকার কারণে শয়তানকে আলিঙ্গন করে জপ করতে হয়েছিল এক নেতা একদেশ বঙ্গ বন্ধু বাংলা দেশ। শেখ মুজিব বাংলার লুণ্ঠিত শোষিত ক্ষুধার্ত মানুষকে দেবতার মত বলেছিলেন, তিন বছর কিছুই দিবার পারুমনা’। কোন বাদ প্রতিবাদ না করে তিন বছর অপেক্ষা করেছিল মানুষ। মুজিব তিন বছর বাংলার মানুষকে দিয়েছিলেন সন্ত্রাস বিশৃংখলা মৃত্যু ও ক্ষুধা। ১০ লক্ষ ক্ষুধিত মানুষ আলিঙ্গন করেছিল মৃত্যুকে। তবুও বাংলার জনগণ তলা বিহীন ঝুড়িকে আঁকড়ে ধরে উত্তম সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু তিন বছর পরে শেখ মুজিব তার সাড়ে সাত কোটি অনুরাগী ভক্তকে কি দিলেন? মুজিব তার জনগণকে সেটাই  দিলেন যা একজন আত্মসর্বস্ব নির্মম একনায়ক তার জনগণকে দিয়ে থাকে।

১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারী পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রের শেষ চিহ্নটুকু লাথি মেরে গুড়িয়ে দিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে মাত্র ১৩ মিনিটের মধ্যে শাসনতন্ত্র বদলে দিলেন। বাকশাল গঠন করলেন। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করলেন। সামরিক বেসামরিক সকলকে বাকশালে যোগদানে বাধ্য করলেন। বাকশালে যোগদান ছাড়া নির্বাচিত এমপিদের সদস্য পদ বাতিল করলেন। সুপ্রিম কোর্টের মৌলিক মানবাধিকার প্রয়োগের ক্ষমতা খর্ব করলেন। স্বাধীন চেতা রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীদের শায়েস্তা করার জন্য ৬১টি জেলায় গভর্ণর নিয়োগ করলেন বরকন্দাজী করার জন্য। মুজিব দেবতার প্রশংসা করার জন্য বাঁচিয়ে রাখা হল মাত্র চারটি পত্রিকা। ভারতীয় মেজর জেনারেল সুজান সিং উবান পরিচালিত রক্ষী বাহিনীকে শক্তিশালী করা হল জনগণকে ঠেকানোর জন্য। সেনাবাহিনীকে ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত করা হল। অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সামাজিক ভাবে বিধ্বস্ত জাতিকে গোলামীর জিঞ্চিরে আবদ্ধ করে শেখ মুজিব মস্কো ও দিল্লীর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য স্বাধীন বাংলার মহান অধিপতির মেকি লেবাস পড়ে ক্ষমতার রাজ প্রাসাদে প্রবেশ করলেন কিন্তু বেরিয়ে আসার পথ খুলে রাখলেন না।

 
উপসংহার Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:30
জাতির ক্রমবর্ধমান অধঃপতন নৈতিক অবক্ষয় ও স্বাধীনতা উত্তর প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিস্তর ব্যাবধান থেকে উৎসারিত গভীর হতাশা সমগ্র জাতিকে টেনে নিয়ে চলেছে সীমাহীন সংকটের দিকে। দেশের অতি সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সর্বস্তরের বুদ্ধিজীবী চিন্তাবিদ রাজনীতিবিদ শিক্ষক সমাজসেবী সকলকে গ্রাস করেছে একই হতাশায়। আমাদের কারোই গন্তব্য জানা নেই, দুর্গতির অতল গহ্বরের দিকে চোখ বন্ধ করে আমরা এগিয়ে চলছি। টাইটানিক ডুবছে, ডুবছে এর নাবিক আরোহী সকলে।

ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন আল মুকাদ্দিমার দ্বিতীয় খণ্ডে লিখেছেন- জনগণের ওপর অর্থনৈতিক শোষণ ও নির্যাতন চালানো হলে তাদের সম্পদ উপার্জনের স্পৃহা নস্যাৎ হয়ে যায়। যখন স্পৃহা নষ্ট হয়ে যায় তখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শ্রম ও সাধনা থেকে তারা হাত গুটিয়ে নেয়। আর জনপদ যখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে শ্রম বিমুখ হয়ে পড়ে তখন বাজারে মন্দা দেখা যায়। দেশের বাসিন্দা হয়ে ওঠে কর্ম বিমূখ এবং উজাড় হয়ে যায় নগর বন্দর আর জনপদ। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায় ১৭৫৭ সালে সিরাজের পতনের পর যে সীমাহীন শোষণ ও জুলুম চলে এর প্রতিক্রিয়ায় মাত্র ১ যুগের ব্যবধানে বাংলার মন্বন্তরে দেড় কোটি অর্থাৎ সমগ্র জনগোষ্ঠীর এক তৃতীয়াংশ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এই মৃত্যু ও ধ্বংসের অন্তরালে সক্রিয় ছিল ঔপনিবেশিক শক্তি ও তাদের দালালদের সীমাহীন শোষণ ও দুর্নীতি। একাত্তরোত্তর বাংলার পরিস্থিতির দিকে তাকালে একই চিত্র আমরা দেখতে পাব। একাত্তরোত্তর ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ও তাদের সহযোগীদের নির্বিচার লুণ্ঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে মাত্র ৩ বছরের মধ্যে মন্বন্ত্বরের মুখোমুখি হতে হয়েছিল এদেশের মানুষকে। ভিয়েতনাম আমাদের অনেক পরে স্বাধীনতা লাভ করেও তাদের অগ্রগতির পালে হাওয়া লাগাতে সক্ষম হয়েছে, মাহাথিরের গতিশীল নেতৃত্ব মালয়েশিয়াকে বিশ্বের উন্নত জাতিতে পরিণত করেছে। শুধুমাত্র আমরা স্বাধীনতার মেকি চেতনা থেকে প্রেরণা লাভের চেষ্টা করছি আর দুর্নীতির বিষাক্ত উদ্ভুত অবয়ব ধারণ করে মৃত্যু যন্ত্রণায় ধুকছি।

আমরা ২শ’ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকারী হয়ে সাবেকী কাঠামোর ক্ষয়ে যাওয়া খোলসটা আকড়ে মুক্তি ও প্রগতির পথ অন্বেষণ করছি। কিন্তু মরীচিকার মত উন্নতি ও প্রগতির স্বপ্ন ক্রমশ দুরে সরে যাচ্ছে। যতদিন যাচ্ছে ততই অধঃপতিত হচ্ছি। সর্বগ্রাসা দুর্নীতি জাতির সর্বনাশ ত্বরান্বিত করে চলেছে। দুর্নীতিবাজ ঔপনিবেশিক দালাল ও তাদের সহযোগীরা জনগণের সম্পদ অব্যাহত শোষণ এবং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় লুণ্ঠণের মধ্য দিয়ে এদেশের ৯০ শতাংশ মানুষকে দারিদ্র্য সীমার নীচে টেনে নিয়ে চলছে। সরকার পৃষ্ঠাপোকতা দান করে চলেছে সে সব লুটেরাদেরকে যারা সরকারকে ক্ষমতাসীন করেছে লুণ্ঠিত সম্পদের ক্ষুদ্রাংশ বিনিয়োগ করে। ক্ষমতাসীনরা যদিও জনগণের ভোটে নির্বাচিত তা সত্ত্বেও গণ স্বার্থের ব্যাপারে ভ্রুক্ষেপ হীন হয়ে দুর্নীতিবাজ লুটেরাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করে চলেছে। লুটেরাদের স্বার্থ এবং ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতা বহির্ভূত নেতৃবৃন্দের স্বার্থের অভিন্নতা রয়েছে।
 
«StartPrev123NextEnd»

Page 3 of 3