Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর অধ্যায় ১১: ভাষা আন্দোলন একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১১: ভাষা আন্দোলন একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:21

ভাষা আন্দোলন একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র

পঞ্চাশ দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যেটা ঘটেছিল সেটা হলো ৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। সময়ের দাবীর প্রেক্ষিতে আন্দোলন, আইন-শৃংখলার অবনতি, প্রশাসনের সাথে সংঘাত, গুলী বর্ষণ, খুন জখম, আন্দোলনের সাফল্য অথবা ব্যর্থতা তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতির চলমান ঘটনা প্রবাহ। কিন্তু ভাষা আন্দোলন ও অন্যান্য ঘটনা প্রবাহের মধ্য মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। অন্য সব আন্দোলনের দাবী স্বীকৃত হলে প্রেক্ষিত গৌণ হয়ে পড়ে। কিন্তু ভাষা আন্দোলনে সেটা হয়নি। হিন্দু এবং বৃটিশ বেনিয়াচক্রের যৌথ ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে অনেক ত্যাগ তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত জাতিসত্তার বিভাজন হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনে ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে ভাষার দাবী স্বীকৃত হলেও ভাষা আন্দোলন কেন্দ্রিক যে ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি হয়েছিল সেটা ৫৪ সালে মুসলিম লীগ সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করেছিল এবং প্রশাসনকে দুর্বল করেছিল। এর ধারাবাহিকতার মধ্যদিয়ে বৈরীতা তুঙ্গে উঠেছিল, গণ বিদ্রোহ সূচিত হয়েছিল, অসহিষ্ণুতার সূচনা হয়েছিল, উগ্র আঞ্চলিকতার বিকাশ হয়েছিল এবং জঙ্গী মনোভাব এবং অস্থিরতা বেড়ে গিয়েছিল। যা থেকে আজো জাতির নিষ্কৃতি মিলেনি। একারণে ভাষা আন্দোলন বৃটিশ পরবর্তী উপমহাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।


উপমহাদেশে ভাষা নিয়ে বিরোধ ছিল, কিন্তু সেটা খুব পুরনো বলা যাবে না। শুরু হয়েছিল ঊনিশ শতকের শেষ পর্যায়ে, উর্দু, এবং হিন্দি নিয়ে বিরোধ। মুসলিম শাসনামলে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালিত হত ফারসীর মাধ্যমে। বৃটিশরা তাদের সুবিধার জন্য ফারসীর বদলে ইংরেজীকে অফিস আদালতের মাধ্যম হিসেবে চালু করে। কিন্তু কোন সময়ই ভাষা নিয়ে বিরোধ হয়েছে এমনটি ইতিহাস বলে না।
১৯৩৭ সালের নির্বাচনোত্তর কংগ্রেস শাসিত প্রদেশসমূহে হিন্দুচেতনাকে সামগ্রিক জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা নেয়া হয়। এই সাথে দেবনাগরী লিপির প্রচলন করা হয়। এটা করা হয় এ কারণে যে, তারা উর্দুকে মুসলমানদের ভাষা হিসেবে মনে করত। কেননা উর্দুর স্বরলিপি আরবীর অনুরূপ। উর্দূতে আরবী শব্দ এবং পরিভাষায় প্রাচুর্য থাকায় বর্ণবাদী হিন্দুচক্র এটাকে মনে করতো মুসলমানী ভাষা। এরা ত্রিশ দশকের শেষার্ধে সীমিত ক্ষমতা পেয়েই উর্দু লিপির ব্যবহার অচল করার লক্ষ্যে দেবনাগরী লিপির প্রচলন করে। তখন থেকেই ভাষা নিয়ে হিন্দু মুসলিম বিরোধের সূচনা হয়।

‘ইংরেজ আমলে আমাদের দেশে ভাষা সমস্যা বলতে মনে করা হতো হিন্দি- উর্দুর সমস্যা। হিন্দুরা সমর্থন করতো হিন্দির দাবীকে। আর মুসলমানরা সমর্থন করতো উর্দুর দাবীকে। বিখ্যাত ভাষা তাত্ত্বিক সুনীতি কুমার চট্টপাধ্যায় তার বহুল পঠিত ‘ভারতের ভাষা ও ভাষা সমস্যা’ নামক পুস্তকে সমর্থন করেন হিন্দিকে ভবিষ্যতে স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার। রবীন্দ্রনাথ সুনীতি কুমারের সঙ্গে এ বিষয়ে একমত ছিলেন। সুনীতি কুমার বাবুর বইটি প্রকাশিত হয় বিশ্বভারতী থেকে। পক্ষান্তরে মুসলমানরা সমর্থন করতে থাকেন উর্দুর দাবীকে। ১৯৩৭ সালে লক্ষ্ণৌ অধিবেশনে মুসলিম লীগ তার ১১নং প্রস্তাবে উর্দুর উপর গুরুত্ব আরোপ করে এবং এটাকে টিকিয়ে রাখার জন্য মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানান হয়। ১৯৩৮ সালে বাংলার বিখ্যাত মুসলিম নেতা একে ফজলুল হক, All India Muslim Educational Conference- এর সভাপতির ভাষণে বলেন, হিন্দি নয়, উর্দুকেই গ্রহণ করতে হবে ভারতের সাধারণ ভাষা বা লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা (Lingua Franca) হিসেবে। বাংলা যে কোনো সময় কোনো দেশের রাষ্ট্রভাষা হতে পারে, তা সে সময় কেউ কল্পনাই করতে পারেনি। (এবনে গোলাম সামাদ, দৈনিক ইনকিলাব ২১ ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৮)

সর্বোপরি ১৯৪৭ সালে সাধারণ মত ছিল, হিন্দি ও উর্দু হবে ভারত ও পাকিস্তানের সরকারী ভাষা। শুধুমাত্র মুসলিম জাতীয়তাবাদী নয় কমিউনিস্টরাও এটাকে সেটেল্ড ফ্যাক্ট হিসেবে মনে করতো।
উপমহাদেশের মুসলমানদের দাবী ও আন্দোলনের কারণে ভারত খণ্ডিত হলে হিন্দি ও উর্দুর বিরোধ স্তিমিত আঙ্গিকে ভাষা সংক্রান্ত বিরোধের সূচনা হয়। এ প্রসঙ্গে ভাষা আন্দোলনের একজন সৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুর সাহেব লিখেছেন- ‘একথা এখন নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, পার্টিশন না হলে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত না হলে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবী তোলা সম্ভব হতো না। লাহোর প্রস্তাব পূর্ণভাবে বাস্তাবায়িত হলে পূর্ব পাকিস্তান নামেই হোক, আর যে নামেই হোক উপমহাদেশের মুসলিম অধ্যুষিত পূর্বাঞ্চলে যে রাষ্ট্র গঠিত হত, বাংলাই হত সেই রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা এবং এ নিয়ে কোন দ্বন্দ্ব সৃষ্টির কোন অবকাশই আসত না। সাতচল্লিশের পার্টিশনের প্রাক্কালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শরৎচন্দ্র বসু প্রমুখের প্রস্তাবিত সার্বভৌম বৃহত্তর বাংলার রাষ্ট্রভাষা হত বাংলা। কোন আন্দোলনের প্রয়োজন পড়ত না। সাতচল্লিশে লাহোর প্রস্তাবের আংশিক বাস্তবায়ন হয়েছিল এবং পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার মেজরিটির মাতৃভাষা বাংলা ছিল বলেই সেদিন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবী তোলা সম্ভব হয়েছিল। ভারতবর্ষ অখণ্ড থাকলে সেখানে মেজরিটি জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা এ যুক্তিতে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবী তোলা যেত না। এমনকি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত স্বাধীন (অখণ্ড) ভারতের সরকারী ভাষা হিসেবে হিন্দির বাইরে ইংরেজি ছাড়া অন্য কোন ভাষার কথা চিন্তা করতে পারেননি এবং এ প্রশ্নে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর সঙ্গে তাঁর যে মতবিরোধ হয়েছিল তা অভিজ্ঞ ব্যক্তি মাত্রেরই জানা থাকার কথা। ভারতবর্ষ অখণ্ড থাকলে বরং হিন্দির বিপরীতে মুসলমানদের উর্দুকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবীই অধিকতর হত। কারণ নিখিল ভারতীয় সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে হিন্দুদের হিন্দির বিপরীতে মুসলমানরা উর্দুকেই তাদের নিজেদের ভাষা বিবেচনা করত। যারা উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করতে চেয়েছিলেন তারা বঙ্গদেশেরও বাংলাভাষার বৈশিষ্ট্যের কথা ভুলে অখণ্ড ভারতীয় পরিবেশে হিন্দি উর্দুর দ্বন্দ্বকেই যে অধিক স্মরণে রেখেছিলেন, তা সুস্পষ্ট।

১৯৪৬ সালের দিল্লী সম্মেলনের আগ পর্যন্ত লাহোর প্রস্তাবকেই মনে করা হত পাকিস্তান আন্দোলনের মূলমন্ত্র। সেই হিসেবে চল্লিশের দশকে ঢাকার পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ ও কলিকাতার পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটিতে “পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা” হিসেবে বাংলার কথাই আলোচিত হত। ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান দাবীর সপক্ষে জনগণের সুস্পষ্ট রায় ব্যক্ত হবার এবং দিল্লীর কনভেনশনে লাহোর প্রস্তাবের আংশিক সংশোধন করে উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় একটি মাত্র (পাকিস্তান) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পরই প্রস্তাবিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে কথাবার্তা ও লেখালেখি শুরু হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অনতিপূর্বে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ডঃ জিয়াউদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিলে তার প্রতিবাদ জানান ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। (দৈনিক ইনকিলাব, ১১ মার্চ, ১৯৯৮)

বিভিন্ন দিক থেকে ভিন্ন ভিন্ন দাবী উচ্চারিত হলেও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব সমূহের অধিকাংশ তা সে মুসলিম জাতীয়তাবাদী হোক কমিউনিস্ট অথবা ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্রী হোক তাদের প্রায় সকলে লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হিসেবে উর্দু এর পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক এবং গণ নির্দেশনার ভাষা বাংলার পক্ষে মতামত প্রকাশ করেন। (এ এন জিল ২০০০ : ১৩৫) এটাই ছিল মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের সুদূর প্রসারী বৃহত্তর অবস্থান। এ সত্ত্বেও একটি জিজ্ঞাসা প্রকট হয়ে উঠে, ১৯৪৮ সালের এপ্রিলে বাংলা ভাষাকে প্রাদেশিক ভাষা ঘোষণার পরও কেন আন্দোলন? এই প্রশ্নের আলোকে আর এক জিজ্ঞাসা এসে যায়, আঞ্চলিকতার বিষবাষ্প থেকে এবং পঞ্চম বাহিনীর অপতৎপরতা এবং তাদের ক্রীড়নক হওয়া থেকে সতর্ক থাকার ব্যাপারে কায়দে আযমের মুখে মুহুর্মুহু সতর্কবাণী উচ্চারিত হচ্ছিল কেন? এটা কি শুধুমাত্র রাজনৈতিক চাপাবাজি?

না, অর্থহীন রাজনৈতিক চাপাবাজির ইতিহাস জিন্নাহর জীবনে কখনই ছিল না। বর্ণবাদী হিন্দুদের নিচ্ছিদ্র ষড়যন্ত্রের বেড়া ভেঙে এবং অখণ্ড ভারত ভেঙে যে মহামানুষ মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাস ভূমি পাকিস্তান ছিনিয়ে এনেছিলেন একমাত্র তার পক্ষেই জানা সম্ভব সমকালীন ষড়যন্ত্রের গভীরতা। সময়ের প্রেক্ষিতে বর্ণবাদী হিন্দু নেতৃত্ব বাংলাকে পাকিস্তানের একটি অংশ হিসেবে মেনে নেয় এই আশায় যে, পূর্ববাংলাকে এক সময় গ্রাস করা সম্ভব হবে। অথবা পূর্বপাকিস্তানীরা নিজস্ব যন্ত্রণায় ভারতের সাথে স্বেচ্ছায় একীভূত হতে চাইবে। এ কারণে তারা পূর্ব পাকিস্তানীদের জন্য যন্ত্রণাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে থাকে প্রথম থেকেই। পাকিস্তান সৃষ্টির আগেই কতিপয় বুদ্ধিজীবীকে কিনে ফেলে ওরা। দীর্ঘদিনের বুদ্ধিবৃত্তিক অভিজ্ঞতা দিয়ে লাঙ্গলের পেছন থেকে আসা হালে গজিয়ে ওঠা বুদ্ধিজীবীদের প্রভাবিত করে অতি সহজে। পূর্ব বাংলায় আগ্রাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইন্ডিয়ান ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর প্রধান হিসেবে অতিরিক্ত নিয়োগ দেয়া হয় একজন বাঙালী বর্ণবাদী এন মল্লিককে। তিনি প্রধানমন্ত্রী মতিলাল নেহেরুর সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রাখতেন। (দি সানডে কোলকাতা ১৮-২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৮৮) তদুপরি বিশেষ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ১৯৪৯ সালে কোলকাতার সন্নিকটে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞজনদের একটি সেল সংগঠিত করা হয় ত্রিগুণা সেনের নেতৃত্বে। একই অবস্থান থেকে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা সম্প্রীতি সমিতি গঠন করা হয় অজিত রায়ের নেতৃত্বে এবং তাদের পত্রিকা এপার বাংলা ওপার বাংলা প্রকাশ করা হয়। একাত্তরের পরে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং এপার বাংলা ওপর বাংলার কো এডিটর ১৯৭১ এর পরে লিখেছেন- ‘অজিত রায় এক সময় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নির্দেশনায় ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য জাপান ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশসমূহে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বাত্মকভাবে আত্ম নিয়োগ করেন। বাংলাদেশে তার রাজনৈতিক স্বার্থ ছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার নীরব ও সক্রিয় ভূমিকা অনেকেরই অজানা। (জিপি ভট্টাচার্য, ১৯৭৩)

পৃথিবীর মানচিত্রে পাকিস্তান দৃশ্যমান হওয়ার আগেই অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার স্বপ্নাবিষ্ট বর্ণ হিন্দুরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সম্ভাব্য টার্গেট সামনে রেখে পূর্ব পাকিস্তানের কিছু কিছু তরুণকে হরেক রকম আশা ও আশ্বাস দিয়ে অখণ্ড ভারতের সপক্ষে প্রভাবিত করে। ১৯৪৭ সালে ১৪ই আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দুই সপ্তাহ আগে কতিপয় তরুণ গণ আজাদী লীগ গঠন করেন। এদের মধ্যে ছিলেন কামরুদ্দিন আহমদ, মোহম্মদ তোহা, অলি আহাদ এবং তাজুদ্দিন আহম্মদ। এরা পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন করার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন একাত্তর পর্যন্ত। এখন প্রশ্ন এসে যায়, সুদীর্ঘ ১৯০ বছর পরাধীনতার পর স্বাধীনতায় উত্তরণের ক্রান্তিকালে কোন্ অশুভ শক্তির ইশারায় পূর্ব পাকিস্তানের মাটিকে উত্তপ্ত করার লক্ষ্যে তারা একটি রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য সক্রিয় হল। দলের মেনিফেষ্টোতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের বাঙালীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই তাদের লক্ষ্য। এদের কি বলা যাবে, হয় তারা নির্বোধ অথবা কোন অপশক্তির দালাল এরা। নির্বোধ বলা হচ্ছে এই কারণে যে, সদ্য মুক্ত দেশ পাকিস্তানের প্রশাসন চালানোর মত লোকবল, অর্থবল কিছুই ছিল না, মুসলিম বিশ্বের সহানুভূতিশীলদের অর্থ সাহায্যে সরকারী কর্মচারীদের বেতন ভাতা দিতে হত, এমতবস্থায় তাদের আবার অর্থনৈতিক মাথা ব্যাথা শুরু হল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগেই। কি বিচিত্র! অশুভ শক্তির দালাল বলা হল এই কারণে, যারা পাকিস্তানকে সহ্য করতে পারেনি, যারা পাকিস্তানের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেছে এই উদ্দেশ্যে যে, পূর্ব পাকিস্তান যেন নিজস্ব যন্ত্রণায় ভারতের সাথে একীভূত হতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য যদি কেউ সক্রিয় হয় তাকে দালাল ও পঞ্চমবাহিনী ছাড়া কি বলা যাবে! এদের পরবর্তী কর্মকাণ্ড এটাই প্রমাণ করেছে, এই অপশক্তির ক্রীড়নকরা বাংলা ভাষা দাবীর জন্য সোচ্চার হয়েছিল।

পাকিস্তানের বয়স যখন ২ সপ্তাহ তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিদ্যার প্রভাষক গণ আজাদী লীগের অন্যতম সদস্য আবুল কাশেম তমুদ্দুন মজলিস গঠন করেন। যদিও এর উদ্দেশ্য লক্ষ্য ছিল ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করা এবং এই সাথে এদের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবী আদায় করা। শামসুল আলম, একে এম আহসান এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম তমুদ্দুন মজলিসকে দিক নির্দেশনা দেন। কিন্তু এরা মজলিসের কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী কামরুদ্দিন এবং কমিউনিস্ট তোহা মজলিসের সাথে জড়িত ছিলেন। আবুল কাশেম মজলিস প্রতিষ্ঠার ১৫ দিনের মধ্যে একটি পুস্তক প্রকাশ করেন বাংলা ও উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা দাবী করে। একটি হিন্দু প্রেস পুস্তকটি ছাপিয়ে দেয়। একজন হিন্দু ম্যাজেসিয়ান পিসি সরকার তহবিল সংগ্রহ করে দেন। এই পুস্তিকার জন্য চাঁদা প্রদান করে আবুল মনসুর আহমদ এবং ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন। ডক্টর শহীদুল্লাহ, ডক্টর এনামুল সহ অন্যান্য প্রায় সব বুদ্ধিজীবী দূরদর্শী ভাবনা পরিত্যাগ করে হালকা হাওয়ায় ভাসতে থাকেন। আসলে উপমহাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং বর্ণবাদী হিন্দুদের গভীর চক্রান্ত আঁচ করার মেধা সম্ভবত এদের কারো ছিল না। বাংলা ভাষার পক্ষে সংসদে সোচ্চার কণ্ঠ শোনা যায় ধীরেন্দ্র নাথ দত্তসহ অন্যান্য কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের। মুসলিম সাংসদরা ছিলেন নির্বাক দর্শক। তারা স্বাধীনতার প্রথম প্রভাতে অনাহুত সমস্যার উটকো যন্ত্রণায় বিব্রত বোধ করছিলেন। হিন্দু সাংসদরা যা করছিলেন সেটা ছিল দ্বিজাতি তত্ত্বকে অকার্যকর করা এবং বর্ণ হিন্দুদের অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রথম সোপান হিসেবে ব্যবহার করতে। কোন এক বর্ণবাদী বাঙালী বুদ্ধিজীবি কথা প্রসঙ্গে বলেছেন, 'What Bengal thinks today, all India thinks tomorrow’ এখানে বাঙালী বলতে বুঝানো হয়েছে পশ্চিম বঙ্গের উচ্চ বর্ণের হিন্দুদের। যারা আমাদের চেয়ে দেড়শত বছর আগে শিক্ষা এবং জ্ঞানের জগতে প্রবেশ করেছে। আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে তাদের চেয়ে দেড় শত বছর পর। তাদের মেধা তাদের জ্ঞান চর্চা, তাদের উপলব্ধি তাদের বোধ শক্তি ও চেতনা আমাদের চেয়ে সন্দেহাতীত ভাবে অগ্রসর হবে এটাই স্বাভাবিক। তারা শুধু বাংলার মুসলমানদের চেয়ে অগ্রসর ছিল তা নয়, দলমত নির্বিশেষে সমগ্র ভারতের মধ্যে অগ্রসর ছিলেন সামাজিক, রাজনৈতিক, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রে। এ সত্ত্বেও তারা অকপটে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিয়েছেন কোন রকম বাদ প্রতিবাদ না করে। অথচ তারাই পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলনে ইন্ধন যুগিয়েছে অর্থ ও কৌশল সরবরাহ করেছে। আর আমাদের লাঙ্গলের পেছনে থেকে আসা সদ্য শিক্ষাপ্রাপ্ত তরুণদের মন মস্তিষ্কে গরল ঢেলে আত্ম হননের দিকে টেনে নিয়ে গেছে। অন্যদিকে আমাদের অগ্রজ অপরিণামদর্শী বুড়োরা হয় নীরব দর্শকের ভূমিকা নিয়েছে অথবা বুদ্ধি পরামর্শ এবং পৃষ্ঠপোষকতা দান করে পূর্ব বাংলার তরুণদের অপ্রতিরোধ্য আত্মঘাতী করে তুলেছে।

ওরা এখানকার দেশ প্রেম নয় ভাষা প্রেমের রাজনৈতিক উন্মাদনায় উদ্দীপ্ত করেছে বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনের জন্য। ভাষা কেন্দ্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ২শ বছরের বঞ্চনার ধকল কাটিয়ে ওঠার আগেই আর এক শোষণ বঞ্চনার কৃত্রিম আবহ সৃষ্টি করে ওরা সম্ভাবনাময় তরুণদের মারমুখো মরিয়া করে তোলার নীল নক্সা বাস্তবায়নে অনেকটা অগ্রসর হয়েছে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কংগ্রেস নেতৃত্বের দাবী হল ধর্ম নিরপেক্ষ গণতন্ত্রী গণ প্রজাতন্ত্র এবং কমিউনিস্টরা চেয়েছে ইউনাইটেড ষ্টেট অব সোসালিষ্ট রিপাবলিক। যদিও বাহ্যিক দিক দিয়ে দুটো পরিভাষার মধ্যে বিশাল পার্থক্য অনুভূত হবে। কিন্তু পাকিস্তানের ইসলামী পরিচিতি এবং মুসলমানদের আশা আকাঙ্খা কেড়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে প্রাদেশিক স্বায়ত্বশাসনের নামে কেন্দ্রকে দুর্বল করার ব্যাপারে কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি ছিল ঐক্যবদ্ধ। দুই সংগঠনেরই অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধি বৃত্তিক উৎস ছিল কোলকাতা। কমিউনিস্ট পার্টির মুসলিম সদস্যরা তখনও, সম্ভবত এখনও জানেন না যে উপমহাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ছিলেন বর্ণবাদী হিন্দুরা। এদের সাম্যবাদী শ্লোগান ও উম্মাদনা থাকলেও কংগ্রেসের মত আধিপত্যবাদী লক্ষ্য রয়েছে তাদের মুখোশের অন্তরালে। যেহেতু কোলকাতা থেকে চালিত হত কমিউনিস্ট পার্টি, কংগ্রেস এ কারণে উভয় শক্তিই বিঘূর্ণিত হয়েছে একই লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে। সেই লক্ষ্য আর কিছু নয় অখণ্ড ভারতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং এর অর্জিত সব কিছুকে ধ্বংস করা। একারণে তারা ভাষাভিত্তিক ঐক্য যে কোন মূল্যে টিকিয়ে রাখতে চাইল। কিন্তু সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপের ফলে ভাষা আন্দোলন অনেকটা স্তিমিত হয়ে এল। দীর্ঘ আলাপ আলোচনা এবং বাদ প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে একটি রেজাল্ট বেরিয়ে এল পূর্ব পাকিস্তানের আইন প্রশাসনের মাধ্যম হবে বাংলা। কিন্তু পাকিস্তানের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা হবে উর্দু।

এতদ্সত্ত্বেও তমুদ্দুন মজলিস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এক প্রতিবাদ সভায় প্রকাশ্যে সরকারকে দোষারোপ করল। ক্ষমতাসীন পার্টি মুসলিম লীগের প্রাদেশিক সভাপতি হিসেবে মাওলানা আকরম খা একটি বিবৃতি দিয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ভাষণ দিয়ে বললেন, পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে উৎখাত করে উর্দু চাপিয়ে দেয়ার কোন প্রশ্নই নেই। বাংলাই হবে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা ও প্রশাসনের ভাষা। ওদিকে মজলিস, নতুন ছাত্র সংগঠন ছাত্র লীগ, ছাত্র ফেডারেশন এবং গণতান্ত্রিক যুব লীগকে নিয়ে ভাষা কমিটি নতুন করে সংগঠিত করল। এ সময় পূর্ব পাকিস্তান জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম রাষ্ট্র ভাষা উর্দুর দাবীতে তাদের নিরন্তর প্রয়াস অব্যাহত রাখে। উর্দুর দাবীতে তারা সিগনেচার ক্যাম্পেইন শুরু করে। ইতোমধ্যে সেক্রেটারিয়েটের কেরানীদের মধ্যে বাংলা ও উর্দুর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে কমিউনিস্ট পার্টি পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা ও প্রশাসনের ভাষা হিসেবে বাংলাকে মেনে নিয়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষার দাবী পরিহার করে এবং সেটা জনগণের সিদ্ধান্তের উপর ছেড়ে দেয়। (তোহা ১৯৮১)। গণ আজাদী লীগও অনুরূপ সিদ্ধান্ত নেয়। ১৯৪৮ সালে ২৭ ফেব্রুয়ারী তমুদ্দুন মজলিস মুসিলম ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে বর্ধিত কলেবরে সংগ্রাম কমিটি পুনর্গঠিত হল। ১১ মার্চ প্রতিবাদ দিবস সফলভাবে পালিত হল। হরতাল ও বিক্ষোভ প্রদর্শিত হল। মিছিলে পুলিশের হামলা হল। গ্রেপ্তার হলেন অনেকে। কিন্তু বিক্ষোভ থামল না। ১৪ই মার্চ পর্যন্ত বিক্ষোভ অব্যাহত রইল। ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হল। ১৯ মার্চ কায়দে আযম ঢাকায় এলেন।

এ সময় সবচেয়ে বেশী দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিলেন লঘুচেতা শেরে বাংলা একে ফজলুল হক তার অতীত কর্মকাণ্ড থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে। তিনি তখন এডভোকেট জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ১১ মার্চের বিক্ষোভ মিছিলে আকস্মিকভাবে যোগ দিলেন তার বার্ধক্য সত্ত্বেও। তিনি ১৯৩৯ সালে কোলকাতা নিখিল ভারত মুসলিম কনফারেন্সে উর্দুর উপর গুরুত্বারোপ করেন। এমনকি তিনি আরবী বর্ণমালায় বাংলা লেখার পক্ষপাতি ছিলেন। ১৯৪৭ সালের ৫ ডিসেম্বর পূর্ব বাংলা মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সভায় পরিষ্কার করে দেয়া হয়, বাংলা হবে প্রদেশের শিক্ষা নির্দেশনা ও প্রশাসনের ভাষা। এর কয়েক মাস পর কায়েদে আযম ২১ মার্চ ঢাকায় এক ভাষণে বললেন- “Whether Bengali shall be the state language of this province is a matter for the elected representative of the people of this province to decide... let me tell you in the clearest language that there is no truth that your normal life is going to be touched or disturbed as for your Bengali language is concern.” জিন্নাহর দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যের স্বল্প সময়ের ব্যবধানে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারী ভাষা হিসেবে অনুমোদন করে।

অদূরদর্শী তারুণ্যের আবেগজনিত কর্মকাণ্ডকে যৌক্তিকতার প্রলেপ দিয়ে আজকের প্রবীণ নেতা জনাব অলি আহাদ লিখেছেন- ‘স্বাধীনতার পর কায়েদে আযম প্রথম পূর্ববঙ্গ সফর উপলক্ষে ১৯ মার্চ ঢাকা বিমান বন্দরে অবতরণ করিলে তাহাকে অশ্রুত ও স্বতস্ফূর্ত ঐতিহাসিক সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। ঢাকা বিমান বন্দর হইতে রেসকোর্স পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য ছিল। তিল ধারণের স্থান কোথাও ছিল না। হর্ষোৎফুল্ল জনতার এই ঢল দেখিয়া কে বলিবে, মাত্র দুই দিন পূর্বেও ঢাকা শহরে সরকার বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গ ঢাকার কর্তাব্যক্তিদের মসনদকে টলটলায়মান করিয়া তুলিয়াছিল। দেশবাসীর কি অকৃত্রিম ভালবাসাই না ছিল রাষ্ট্রের জনকের প্রতি। অতি পরিতাপের বিষয় কায়দে আযম ২১শে মার্চ রেসকোর্সে অনুষ্ঠিত জন সমাবেশে ভাষণ দানকালে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করিলেন যে, উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হইবে এবং ভাষা আন্দোলন বিদেশী চক্রান্ত বিশেষ।

কায়দে আযমের আমন্ত্রণে ২৪শ মার্চ সর্বজনাব শামসুল হক, নইমুদ্দিন আহমদ, আজিজ আহমদ, কামরুদ্দিন আহমদ, শামসুল আলম, তাজুদ্দিন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, অধ্যাপক আবুল কাশেম, মোঃ তোয়াহা এবং আমি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ হইতে তাহার সহিত পূর্ববঙ্গ সরকারের চীফ সেক্রেটারী আজিজ আহমদের বাসভনে (পরবর্তী মিণ্টু রোডস্থ গণভবন) এক বৈঠকে মিলিত হই। পরস্পরের শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর কায়দে আযমের সহিত আলাপ আলোচনা শুরু হয়। আলোচনার প্রারম্ভে কায়দে আযম মন্তব্য করেন যে, একাধিক রাষ্ট্রভাষা রাষ্ট্রের সংহতির পক্ষে ক্ষতিকর। ইহার জবাবে কামরুদ্দিন আহমদ বলেন যে, সুইজারল্যান্ড ও কানাডায় একাধিক রাষ্ট্রভাষা জাতীয় সংহতি বৃদ্ধি করিয়াছে।

কায়েদে আযম তদুত্তরে অসহিষ্ণু স্বরে বলেন যে, তাহাকে ইতিহাস শিখাইতে হইবে না, তিনি ইতিহাস জানেন। অবচেতনভাবে আমি প্রতিউত্তরে বলিয়া ফেলিলাম যে, ইতিহাস নিশ্চয় আপনি জানেন, তবে রাষ্ট্রভাষা বিষয়ে ঐতিহাসিক সত্যকে অস্বীকার করছেন। অতঃপর কায়দে আযম ধীরস্থির শান্ত কণ্ঠে পাকিস্তান সংগ্রামের ইতিবৃত্ত চুম্বুক ভাষায় বিবৃত করিয়া আবেগের মুহূর্তে আমাদের ইংরেজিতে বলিলেন- In the interest of integrity of Pakistan, if necessary you will have to change your mother tongue অর্থাৎ পাকিস্তানের সংহতির খাতিরে প্রয়োজনবোধে তোমাদিগকে মাতৃভাষা পরিবর্তন করিতে হইবে।’

অতি সম্প্রতি (দৈনিক ইনকিলাব, ৪ মার্চ, ১৯৯৮) এক সাক্ষাৎকারে জনাব অলি আহাদ বলেছেন- ‘কায়দে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন সত্যবাদী স্পষ্টভাষী। ধোকা কাকে বলে তিনি জানতেন না। গান্ধীজি, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরুসহ ভারতের নামকরা প্রায় সব রাজনীতিবিদদেরই জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তারা ছিলেন প্রতারক। কায়দে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সমগ্র অখন্ড ভারতের কোন প্রসঙ্গে যার মধ্যে দোদুল্যমানতা ছিল না। ছিল সত্যবাদিতা, স্পষ্টবাদিতা। আমরা তার নেতৃত্বে কাজ করছি। কিন্তু পরবর্তীকালে সে মানের নেতৃত্ব আমরা পাইনি।’
আর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন- ‘একমাত্র কায়দে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর অনুসারী আমি।’ (দৈনিক ইনকিলাব, ৪ মার্চ, ১৯৯৮)

পূর্ব পাকিস্তানের সরকারী ভাষা হিসেবে বাংলাকে অনুমোদন দানের পর পরিস্থিতি বলতে গেলে নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবী কিছু সংখ্যক ছাত্র এবং বুদ্ধিজীবীর সীমিত পরিসরে বিঘূর্ণিত হতে থাকে। কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক অঙ্গনে এ সংক্রান্ত আলাপ আলোচনা অব্যাহত থাকলেও এর অবস্থান শক্তি সঞ্চার করতে পারেনি। ভাবাবেগ জোরদার হয়ে উঠে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী কমিউনিস্টদের উদ্যোগে আহুত ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে তিন জনের মৃত্যুর পর। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত ছিলেন। এই ঘটনা সংঘটিত হয় জিন্নাহ এবং লিয়াকত আলী খানের মৃত্যুর পর। তখন থেকে স্বার্থবাদী রাজনীতির ধারা শুরু হয়। শুরু হয় ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। মুসলিম লীগের গতিশীলতা ক্রমশ ক্ষীয়মান হতে থাকে। মুসলিম লীগের সম্প্রসারণ ও সদস্য সংগ্রহ সীমাবদ্ধ করা হয়। তাদের ছাত্র ফ্রন্টের তৎপরতা বন্ধ হয়ে যায়। উপনির্বাচনে মুসলিম লীগের নিদারুণ পরাজয় সাধারণ মানুষকে স্তম্বিত করে দেয়। এসবের মধ্য দিয়ে মুসলিম লীগ গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

কংগ্রেস কমিউনিস্ট পার্টি এবং নব গঠিত সেকুলার দল আওয়ামী মুসলিম লীগ কেন্দ্রকে দুর্বল করার জন্য তৎপর হয়ে উঠে। মিথ্যাচার গুজব অপপ্রচার গণমনে স্থান পেতে থাকে। এর পেছনে কারণ ছিল একটি, সেটা হল সংবাপত্র ও পত্র পত্রিকা সবগুলো ছিল কমিউনিষ্ট অথবা সেকুলারিষ্টদের দখলে। পাকিস্তান বিরোধী প্রচারণা, ষড়যন্ত্র ও তৎপরতা চলাকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে ফেললেন। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারী ঢাকায় সফরে এলে তিনি বলেন, জাতীয় পরিষদের মূল নীতি নির্ধারক কমিটি পাকিস্তানের সরকারী ভাষা হিসেবে উর্দুকে অনুমোদন দিয়েছে।

এই ঘোষণার প্রতিবাদে ছাত্ররা অনেক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। একটি সভার সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রেসিন্ডেন্ট আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। তিনি এর আগে বাংলাভাষা আন্দোলনের জন্য অঙ্গীকারবদ্ধ হয়েছিলেন। একটি সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি গঠিত হল। এই কমিটি ২১ ফেব্রুয়ারী সাধারণ ধর্মঘট পালনের ডাক দিল। এই দিন প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন হওয়ার কথা। সরকার ২১ ফেব্রুয়ারী সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। ২০ ফেব্রুয়ারী আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর অবর্তমানে আবুল হাশিম-এর সভাপতিত্বে সংগ্রাম কমিটির সভা হল। এতে আইনের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শনের জন্য ২১ ফেব্রুয়ারীর পরিবর্তে ২২ ফেব্রয়ারী বিক্ষোভ সমাবেশের সিদ্ধান্ত নেয়া হল। কিন্তু ২০ ফেব্রুয়ারী রাত্রিতে যুব লীগের নেতারা তাদের কমিউনিষ্ট গুরুদের প্ররোচনায় সংগ্রাম কমিটির সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করার সিদ্ধান্ত নিল এবং বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে অগ্রসর হল এবং খুন জখমের মধ্য দিয়ে মিছিলের সমাপ্তি হল। কংগ্রেস সদস্যরা সরকারকে দোষারোপ করে পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করলেন। বেশ কিছু মুসলিম সদস্য তাদের অনুসরণ করলেন। দৈনিক আজাদের সম্পাদক মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করলেন এবং দৈনিকটিও সরকার বিরোধী অবস্থান নিল। যদিও আজাদের মালিক তখনও মুসলিম লীগের প্রাদেশিক প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখলেন। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারী মুসলিম লীগ সমর্থিত দৈনিক মর্নিং নিউজ এবং সংবাদের কার্যালয় আক্রমণ করে পুড়িয়ে দেয়া হল। যেখানে পুলিশের গুলি বর্ষণ করা হয়েছিল সেখানে শহীদ মিনার গজিয়ে উঠল। সরকার উদ্যোক্তাদের অনেককে গ্রেপ্তার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনল এবং হাইকোর্টের একজন ইংরেজ বিচারকের উপর বিচার বিভাগীয় তদন্তের দায়িত্ব অর্পন করা হল। ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির ঘোষণা দিলেন। (ডন করাচী, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ১৯৫২)

এক মাস পর মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন প্রাদেশিক পরিষদে কমিউনিস্ট এবং ভারতীয় এজেন্টদের রাজনীতির ছদ্মাবরণে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত থাকার অভিযোগ তুলে তৎকালীন পরিস্থিতির বিস্তৃত বিবরণ দেন। তিনি বলেন, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে ব্যাপক পরিমাণ ধ্বংসাত্মক প্রচার পত্র উদ্ধার করা হয়। নারায়ণগঞ্জের মিছিলে জয়হিন্দ এবং যুক্ত বাংলা চাই শ্লোগান দেয়া হয়। নব গঠিত আওয়ামী লীগের নেতা এবং এম এল এ এবং জনৈক মারোয়ারীর সাথে সম্পৃক্ত পাট ব্যবসায়ী ওসমান আলীর বাসগৃহ থেকে ধ্বংসাত্মক লিফলেট উদ্ধার করা হয় এবং একই অবস্থান থেকে ভারতীয় হিন্দু যুবকদের গ্রেফতার করা হয়। একই ধরনের গ্রেফতার হয় চট্টগ্রাম, রাজশাহী এবং আরো কিছু স্থানে। (বি আল হেলাল ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, ৪৪৯-৫০)। ছাত্র লীগের নেতৃবৃন্দ যারা বিক্ষোভে অংশ নিত তারা প্রতিদিন বুলেটিন প্রকাশ করত। বুলেটিনের হেড লাইন ছিল এ ধরনের- পূর্ব বঙ্গে রক্তাক্ত বিপ্লবের প্রথম পদক্ষেপ, পূর্ব বঙ্গ কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ভাষা আন্দোলনের ব্যাপক অগ্রগতি ইত্যাদি। (এম, এ মোহাইমেন, ১৯৮৬ : ২১)।

কোলকাতার কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র নিয়মিত এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করতো এবং তাদের এক সম্পাদকীয়তে জেলা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কমিউনিস্টদের দিক নির্দেশনার দাবী করা হয়। (স্বাধীনতা, কলিকাতা, ১০ এবং ১১ মার্চ ১৯৫২) তমদ্দুন মজলিসের মুখপত্র দৈনিকটি একথা স্বীকার করে যে, রাজনৈতিক সুযোগ সন্ধানী এবং পাকিস্তান বিরোধী চক্র ভাষা আন্দোলনকে তাদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে। (ঢাকা, ২৬ ফেব্রুয়ারী, ১৯৫২)। সমকালীন চীফ সেক্রেটারী প্রায় দু’দশক পর স্বীকার করেন যে, গোয়েন্দা পুলিশের রিপোর্টে বলা হয়েছিল বেশ কিছু ভারতীয় অনুপ্রবেশ করেছে এবং কমিউনিস্টরা অত্যন্ত তৎপর। (এ এন্ড এ দীল ২০০০: ১৮৩) অর্থপূর্ণ কারণে ২১ ফেব্রুয়ারী গুলিবর্ষণকারী পুলিশ অফিসারদের চিহ্নিত করার ব্যাপারে সহায়তা করার পরিবর্তে নেতৃস্থানীয় আন্দোলনকারীদের অধিকাংশ এলিস কমিশন থেকে দূরে অবস্থান করে। জাস্টিস এলিস বলেন, আন্দোলনকারী নেতৃবৃন্দ সকলে সহযোগিতা করলে তদন্ত যথাযথ হতে পারত। (এ ওহাব, বি ওমর ১৯৮৫ : ১৬৬-৭০) জাতীয় প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক অবশেষে আলোড়ন সৃষ্টিকারী তথ্য প্রকাশ করেন। সেটা হল ২১ ফেব্রুয়ারী যার মৃত্যুর কারণে সংকটের সূচনা হয়েছে সেই আবুল বরকত পুলিশের ইনফরমার ছিল। পুলিশের উপর প্রবল আক্রমণের সময় তার মৃত্যু হয়। (বিচিত্রা ঈদ সংখ্যা ১৯৮৮)

দীর্ঘকালের অভিজ্ঞতা এবং সময়ের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অনেকেই কায়দে আযমকে নতুন করে উপলব্ধি করছে। ১৯৪৮ সালে ভাষার প্রশ্নে জনাব অলি আহাদ এবং আরো অনেকেই কায়দে আযমকে বিব্রত করেছিলেন। উপমহাদেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে কোনটা সঠিক ছিল এখনো সেটা নিরূপিত না হলেও আগামী দিনের ইতিহাস নিরূপণ সেটা করবে। কায়দে আযম এ কারণেই অসহযোগ আন্দোলন এবং খিলাফত আন্দোলনকে সমর্থন দেননি। সময় বলে দিয়েছে জিন্নাহর সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। জিন্নাহ ছিলেন ভাবাবেগ বর্জিত নিঃস্বার্থ দূরদর্শী মহান নেতা। জিন্নাহর ভাষা উর্দু ছিল না এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষাও উর্দু ছিল না। তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষাকে বাঙালীদের উপর চাপিয়ে দেননি এবং বাংলাকে আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার করতেও নিষেধ করেননি। তিনি রাষ্ট্রীয় ঐক্য এবং সংহতির জন্য একটি ভাষার উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। যদিও অন্যান্য অনেক দেশে একাধিক ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চালু রয়েছে। কিন্তু অন্যদেশ এবং পাকিস্তানের প্রেক্ষিত ছিল ভিন্ন। পাকিস্তানের অস্তিত্ব অস্বীকারকারী শত্রু পরিবেষ্টিত ছিল পাকিস্তান। দুই অংশের ব্যবধান ছিল ১২০০ মাইল। তিনি সবকিছু বিবেচনা করে রাষ্ট্রীয় ভাষা উর্দু করার চেষ্টা নিয়েছিলেন। ভারতের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিন্দি হওয়াতে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালীরা আন্দোলন করেনি কারণ জাতীয় সংহতির জন্য সেটা ছিল অপরিহার্য। অথচ পূর্ববাংলার মানুষের চেয়ে পশ্চিম বাংলার মানুষ শিক্ষা দীক্ষা কৃষ্টি কালচারের দিক দিয়ে ছিল অগ্রগামী। আজো ভাষার প্রশ্নে হিন্দুস্থানের কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। অথচ কোলকাতার পত্রিকাগুলো ভাষা আন্দোলন জোরদার করার জন্য আমাদেরকে অনুপ্রেরণা ও নির্দেশনা খয়রাত করতো। কিন্তু কেন এটুকু তলিয়ে দেখেনি আমাদের আবেগপ্রবণ লঘুচেতা নেতৃবৃন্দ।

ভাষার প্রশ্নে কায়দে আযমের সিদ্ধান্তকে অনেকেই এখন আবেগহীন বাস্তবতা দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখার চেষ্টা করেছেন। যেমন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা এবং এমপি জনাব এম এ মোহাইমেন তার প্রকাশিত ফেব্রুয়ারী ১৯৯৪ প্রথম সংস্করণ ইতিহাসের আলোকে দেশ বিভাগ কায়দে আযম জিন্নাহ শুরুতেই তাঁর গ্রন্থে লিখেছেন-

‘উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার পীড়াপীড়ির পিছনে জিন্নাহ বিরোধীরা তাঁর বাঙ্গালী বিদ্বেষী মনোভাব ও পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থ রক্ষার ঐকান্তিক আগ্রহের প্রমাণ বলে মনে করেন। পূর্ব বাংলার অধিকাংশ মানুষের ধারণা জিন্নাহ সাহেবের মাতৃভাষা ছিল উর্দু। তাই উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির পিছনে জিন্নাহ সাহেবের স্বীয় ভাষার প্রতি পক্ষপাতিত্বের নিদর্শন মনে করে বাঙ্গালী মাত্রই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। কিন্তু অধিকাংশ বাঙ্গালীই জানেনা যে, জিন্নাহ সাহেবের মাতৃভাষা ছিল গুজরাটি; উর্দু নয়। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পিছনে তাঁর উদ্দেশ্যে ছিল পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী পাঁচটি রাষ্ট্রকে একই ভাষার মাধ্যমে এক জাতিতে পরিণত করা। ভাষা যেহেতু জাতি গঠনের মাধ্যম হিসেবে অনন্য অবদান রাখতে সক্ষম তাই এক ভাষার মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতিসম্পন্ন মানুষগুলোকে একজাতীয়তা ও ভ্রাতৃত্ববোধে উদ্বুদ্ধ করার জন্যও উর্দুকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর ধারণা ছিল উর্দু যেহেতু বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধু, সীমান্ত প্রদেশ ও বেলুচিস্তান কারোই ভাষা নয়, তবে সব প্রদেশগুলোতেই এ ভাষা মোটামুটি বোধগম্য তাই এ ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করলে অন্যান্য প্রদেশ থেকেও তাদের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উঠবে না। উর্দু যেহেতু পাকিস্তানের কোন প্রদেশের ভাষা নয়, এটি যুক্তপ্রদেশের মুসলমানদের ভাষা যার সঙ্গে সারা ভারতের মুসলমানরা মোটামুটি পরিচিতি তাই এ ভাষা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে পাকিস্তানের সকল অংশের মানুষ সহজে রাজি হবে।'

এক জাতি গঠনের লক্ষ্যে জিন্নাহ সাহেব যে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এর পিছনে তার কোন সংকীর্ণ মনোভাব ছিল না- এর প্রমাণ পাওয়া যায় ভারতে কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত থেকে। হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার পিছনে কি উদ্দেশ্য ও মনোভাব প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জওহরলালের চিন্তাকে প্রভাবিত করেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায় তাঁর রচিত Glimpses of World History থেকে। তিনি যখন ১৯১২ সনে সানইয়াং সেনের সঙ্গে দেখা করার জন্য চীন যান তখন তাঁর অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে তিনি লিখেছেন, চীনের উত্তর অঞ্চল মানচুরিয়া থেকে দক্ষিণে নানকিং পর্যন্ত এ সাড়ে তিন হাজার মাইলের বিরাট দেশে সমস্ত মানুষই চীনা ভাষার কথা বলে, যদিও উত্তর আর দক্ষিণের মধ্যে উচ্চারণে স্থানীয় কিছু কিছু পার্থক্য রয়েছে। এ পার্থক্য সত্ত্বেও উত্তর থেকে দক্ষিণ পর্যন্ত এ বিরাট দেশের লোক একজনের কথা আরেকজন সহজে বুঝতে পারে। এর ফলে এই বিরাট দেশের মানুষগুলোর মধ্যে একটা অখণ্ড জাতীয়তা ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে উঠেছে যেটা ভারতে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। চীনের ঐক্য ও জাতীয়তাবোধের প্রেক্ষিতে তিনি দুঃখ করে বলেছেন, হায়রে আমার ভারতবর্ষ সেখানে বাঙ্গালী গুজরাটির ভাষা বুঝে না, গুজরাটি আবার মারাঠিদের ভাষা বুঝে না, মারাঠিরা আবার তামিলদের ভাষা বুঝে না। তারা প্রত্যেকে একজন থেকে আর একজন সম্পূর্ণ আলাদা স্বতন্ত্র জীবন-যাপন করছে। কারও মধ্যে ভাষার বিভিন্নতার কারণে চিন্তার দিক থেকে কোন ঐক্যবোধ নেই। এক জাতি হিসেবে নিজেদেরকে এরা চিন্তাই করতে পারে না। চীনের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি লিখেছিলেন, ভারত যদি কখনো স্বাধীন হয় তবে এই বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষগুলোকে এক জাতিতে পরিণত করার জন্য ভাষাই হবে একমাত্র বন্ধন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার পিছনে খুব সম্ভব তাঁর এ মনোভাবই কাজ করেছিল। তিনি ভেবেছিলেন, হিন্দি মোটামুটি সকলে বুঝতে পারে তাই তিনি ভারতের বিভিন্ন ভাষাভাষী অঞ্চলের মানুষদেরকে এক ভারতীয় জাতি হিসেবে গড়ে তুলবার মানসে হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ ভারতের উত্তর অঞ্চলে তিনি সফল হলেও দক্ষিণ অঞ্চলে অদ্যাবধি সফল হন নাই। দক্ষিণের তামিল তেলেগু অর্থাৎ বৃহত্তর মাদ্রাজ অঞ্চল আজও হিন্দিকে গ্রহণ করেনি। যেমন বাংলাদেশ উর্দুকে গ্রহণ করেনি। হিন্দিকে ভারতে রাষ্ট্রভাষা করার পিছনে জওহরলালের যেমন সদিচ্ছাই ছিল, কোন কু-মতলব ছিল না, তেমনিই আমাদের মনে হয় উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পিছনে জিন্নাহ সাহেবেরও সৎ উদ্দেশ্যই ছিল, কোন প্রকার উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দুরভিসন্ধি ছিল না। তাঁর গৃহীত নীতি হয়তো ভুল হতে পারে তবে এর পিছনে যে তাঁর কোন অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না এটা নিঃসন্দেহে বলা চলে।

জিন্নাহ সাহেবের প্রতি দ্বিতীয় অভিযোগ হল যে, তিনি ১৯৪৬ সনের মার্চ মাসে দিল্লীতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগ কনভেনশনে দুই সার্বভৌম স্টেট্সকে এক স্টেটে রূপান্তরিক করেন। ’৪০ সনের মূল লাহোর প্রস্তাবে ছিল পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে দুইটি সার্বভৌম স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠন হবে। ‘৪৬ সনে তিনি দুই রাষ্ট্রের জায়গায় এক রাষ্ট্র করে বাংলার মুসলমানদের পশ্চিম পাকিস্তানীদের অধীন করার ষড়যন্ত্র করেছিলেন। আমাদের পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা জিন্নাহর ’৪৬ সনের এই পরিবর্তনকে বাঙালী জাতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁকে বাঙালীর শত্রু হিসেবে প্রতিপন্ন করার প্রয়াস চালিয়ে আসছিল।

জিন্নাহ সাহেবের গণতন্ত্রের চেতনা, তাঁর নির্লোভ চরিত্র ও যুক্তিবাদী চিন্তার সঙ্গে যারা পরিচিত তাদেরকে তাঁর শেষ মুহূর্তে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনে জাতীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে কোন তাগিদ ছিল কিনা এ ব্যাপারে গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। জিন্নাহ্ সাহেব জন্মসূত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের লোক ছিলেন না। তাঁর মাতৃভাষা উর্দু ছিল না। ধন দৌলতের প্রতি তাঁর কোন মোহ ছিল না। খ্যাতনামা ব্যারিস্টার হিসেবে বিপুল অর্থ উপার্জনের মারফত যে অগাধ সম্পত্তির মালিক তিনি হয়েছিলেন সে অর্থ নিজের একমাত্র কন্যাকে দান না করে দেশের জন্য তিনি দান করে গিয়েছিলেন। এহেন ব্যক্তির কাছে পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তানের স্বার্থকে আলাদা চোখে দেখার কোন কারণ ছিল বলে মনে হয় না। দুই অঞ্চলের লোকের স্বার্থকে তাঁর মত সচ্চরিত্র ও ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তির সমান দৃষ্টিতে দেখাই ছিল স্বাভাবিক। এই সম্পর্কে গভীরভাবে যারা চিন্তা করেছেন তাদের কাছে এটাই মনে হয়েছে পূর্বাঞ্চলের অধিবাসীদের স্বার্থেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। (নতুন সফর, ১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৯৭)

বলশেভিকরা সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তাদের আদর্শ সুমুন্নত করার জন্য বর্ণমালা এবং পরিভাষার পরিবর্তন করে। এর কারণ আবিষ্কারের জন্য কোন ষড়যন্ত্র তালাশ না করে বরং বলা যায়, নতুন প্রজন্মকে সাবেকী আমলের বুর্জোয়া সাহিত্যের আবিলতা মুক্ত রাখার মহৎ উদ্দেশ্য ছিল এর পেছনে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল নির্ভেজাল কমিউনিস্ট গড়ে তোলো। (শিক্ষা দীক্ষা নাজেদা ক্রুপস্কায়া)

অনুরূপভাবে তুরস্কে কামাল আতার্তুক ক্ষমতা দখল করে আরবী বর্ণমালা পরিবর্তন করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ইসলাম নয়, পাশ্চাত্যের চিন্তাধারায় তার দেশের মানুষকে গড়ে তোলা। তার এ পদক্ষেপ সঠিক ছিল না বেঠিক ছিল আমরা সেই আলোচনার অবতারণা না করে বলতে পারি যে, সেকুলার চিন্তাধারা বাস্তাবায়নের জন্য কামাল পাশার এই পদক্ষেপ অপরিহার্য ছিল। প্রত্যেকটি জাতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। এই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে  সেই দেশের নীতি কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। পাকিস্তান আন্দোলনের পিছনে ছিল একটি আদর্শ এবং চেতনা। এই চেতনাকে সমুন্নত করার দায়িত্ব ছিল তারই যিনি হিন্দু ও বৃটিশ ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করে উপমহাদেশের নিগৃহীত মুসলমানদের জন্য ছিনিয়ে এনেছিলেন স্বাধীন স্বতন্ত্র আবাসভূমি। কায়দে আযম জানতেন ষড়যন্ত্রের গভীরতা। তিনি মুসলমানদের স্বার্থ সমুন্নত করার জন্য তাদের কাছ থেকে পাকিস্তান ছিনিয়ে এনেছিলেন। যারা মুসলমানদের স্থায়ীভাবে গোলাম বানিয়ে রাখার জন্য অখন্ড ভারতের অকৃত্রিম প্রবক্তা হয়ে পাকিস্তান আন্দোলনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন, কোন অবস্থায় তারা পাকিস্তানের দাবীকে স্বীকার করে নেয়নি। একান্ত বাধ্য হয়ে যখন ভারতকে খন্ডিত করতে হলো, তখন তারা পরিকল্পনা নিল, যে কোন মূল্যের বিনিময়ে পাকিস্তানকে অখন্ড ভারতের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। কায়েদে আযম তার ধীশক্তি এবং দূরদর্শী অনুভব দিয়ে ভাষা আন্দোলনের অনিবার্য পরিণতি আঁচ করেছিলেন। তিনি জানতেন বাঙলার মুসলমানদের দৈন্য ও অশিক্ষার সুযোগে হিন্দুরা ভাষার উপর যে দখলীস্বত্ব কায়েম করে আছে, যেভাবে হিন্দু সভ্যতা ও সংস্কৃতি দ্বারা মুসলমানরা প্রভাবিত হয়ে আছে, তা থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচিয়ে রাখা অসম্ভব হয়ে উঠবে এবং এ অঞ্চলের মুসলমানরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা লাভ করেও এক ধরনের গোলামীকে স্বেচ্ছায় বরণ করে নিবে। পরবর্তী ঘটনা প্রবাহ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, কায়েদে আযমের অনুভব এবং দূরদর্শিতা কত গভীর ছিল।

ডঃ এবনে গোলাম সামাদ লিখেছেন- ‘ভাষা আন্দোলন বিশ্লেষণ হওয়া উচিত বাংলাভাষী মুসলমানদের ইতিহাসের ধারায়, কারণ কেবল তারাই করেছিলেন এই আন্দোলন। (দৈনিক ইনকিলাব, ২১ ফেব্রুয়ারী, ১৯৯৮)

জনাব এবনে গোলাম সামাদের প্রত্যাশিত ঔচিত্যবোধের সীমা অতিক্রম করেছিল পঞ্চাশের দশকেই। এই আন্দোলন শুরু করেছিলেন সেই মুসলমানরা যারা আন্তরিক-ভাবে ইসলামী তাহজিব তমুদ্দুনে বিশ্বাসী ছিলেন। মজলিসের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে মুসলিম ছাত্রলীগ ও অন্যান্য সংগঠনের সম্মিলিত আন্দোলন ’৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী কতিপয় মূল্যবান জীবনের বিনিময়ে যে সাফল্য অর্জন করেছিল সেটা তাদের সামনেই প্রবাহিত হয়েছিল ভিন্ন খাতে। নিরুপায় অবস্থান থেকে তাদের অনেককেই আমি লোকচক্ষুর অন্তরালে কাঁদতে দেখেছি। আজকের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এদের অনেকেরই নাম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা নেয়া হচ্ছে। যেমন করে জামায়াতে ইসলামীর কেয়ারটেকার ফর্মূলার পথ ধরে জামায়াতের ঘাড়ে পা রেখে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হয়ে জামায়াতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। মসনদকে সুসংহত করে হাসিনা এখন জামায়াতকে ডাণ্ডা দেখাতেও কসুর করেনি। আর জামায়াতে ইসলামী উদ্বেগ হতাশা এবং বঞ্চনার তীরে দাঁড়িয়ে অধ্যাপক গোলাম আযমকে কেয়ারটেকার সরকারের রূপকার হিসেবে উপস্থাপন করে নির্বোধোচিত আত্মতৃপ্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে। অনুরূপভাবে তমুদ্দন মজলিসের সাথে সংশ্লিষ্টরা এবং সমকালীন দেশপ্রেমিক ইসলামপন্থী তরুণ নেতৃত্ব প্রৌঢ়ত্বের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেদের ভাষা আন্দোলনের উদ্যোক্তা হিসেবে কল্পনা করে আত্মপ্রবঞ্চনার অতৃপ্ত আনন্দ পেতে চাচ্ছেন।

তমুদ্দন মজলিস, মুসলিম ছাত্রলীগ এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবি ও সংগঠনসমূহের উদ্যোগে সৃষ্ট ’৫২ সালের ভাষা আন্দোলন সফলতার দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত হলে ছাত্র ইউনিয়ন নামে একটি নতুন ছাত্র সংগঠন ছাত্র আন্দোলনে আবির্ভূত হয়। এই সংগঠনটি ছিলো কমিউনিস্ট আন্দোলনের ছাত্র শাখা। কমিউনিস্টদের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ছিলেন হিন্দু। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির দিক নির্দেশনায় এদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন পরিচালিত হতো। আর কমিউনিস্টরা রাজনৈতিক দিক দিয়ে ছিল অত্যন্ত সচেতন। হাওয়াকে নিজেদের দিকে প্রবাহিত করার অসীম দক্ষতা ছিল এদের। এর কারণ হলো রাজনীতির শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মীদের সচেতন এবং দক্ষ করে তোলার প্রক্রিয়া এ সংগঠনে শুরু থেকেই অব্যাহত ছিল। আবেগপ্রবণ উঠতি বয়সের তরুণদের তারা মহান আদর্শবাদের ইউটোপিয়া দিয়ে আচ্ছন্ন করে ফেলতো। তাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ ছিল মুসলিম তরুণদেরকে ইসলাম বিমুখ করে তোলা। ভাষা আন্দোলনের ছিদ্রপথ দিয়ে, ভাষা আন্দোলন কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক ব্যঞ্জনা দিয়ে অতি সহজেই তারা তরুণদের উপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলে। তাদেরই পরোক্ষ ইন্ধনে মুসলিম ছাত্রলীগের লেজ কাটা হয় অর্থাৎ মুসলিম শব্দ বাদ দিয়ে হিন্দুদের সন্তুষ্ট করার উদ্যোগ নেয়া হয়। ’১৯৬৮ সালে ছাত্রলীগের ষোঘণাপত্রে বলা হয়- রক্তক্ষয়ী বায়ান্নর পর ১৯৫৩ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে এ প্রস্তাব (মুসলিম শব্দটি পরিহার করা) চূড়ান্তভাবে কার্যকরী করা হয়। (বাংলাদেশে ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, ডক্টর এম এ হান্নান, পৃ.-১৯)

আওয়ামী লীগও নামের আগে মুসলিম শব্দটি পরিহার করে। কাজী জাফর আহমদের প্রতিবেদনে (১৯৬৩) এ বিষয়ে একটি বিবরণ রয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়- ’১৯৫৬ সালে আমাদের তৃতীয় কেন্দ্রীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সময়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম বৃহৎ রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের অসাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানরূপে ঘোষণা করে এবং দলের নাম হতে মুসলিম শব্দটি উঠিয়ে দেয়া হয়।’

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর আদর্শিক কার্যকারণে পরিত্যক্ত অপসৃয়মান হিন্দুস্থানী জাতীয় বীর ও মনীষী এবং বুদ্ধিজীবীরা ধীরে ধীরে এদেশের জাতীয় বীরের আসনে সমাসীন হতে থাকে। কাগমারী সম্মেলনের মধ্য দিয়েই এ কাজের উদ্বোধন হয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই বাঙালী সংস্কৃতির নামে হিন্দু কালচার প্রথমত কোমলমতি তরুণদের, পরবর্তীতে সমগ্র জাতিকে গ্রাস করে। প্রথম দিকে শহীদ দিবস পালিত হত মিলাদ মাহফিলের মাধ্যমে। পরবর্তীতে হিন্দু কালচার এসে শহীদ মিনার পূজার মন্ডপে পরিণত করে। যে রবীন্দ্রনাথ পূর্ববাংলার স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে স্বীকার করতে পারেনি এবং বংশ পরম্পরায় পূর্ববাংলায় জমিদারীর সুবাদে এদেশের মানুষকে লুট করেছিল সেই রবীন্দ্রনাথ আত্মার আত্মীয়ে পরিণত হল ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। সবকিছু সংঘটিত হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে তরুণদের আবেগকে প্রভাবিত করে। এর পেছনে ছিল বিত্তবান হিন্দুদের সাহায্য এবং ইন্ধন। এছাড়াও এর পেছনে ছিল ভারতীয় দূতাবাসের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহযোগিতা। কিন্তু যারা সত্যিকার অর্থে পাকিস্তানে বিশ্বাসী ছিল, কায়েদে আযমের নেতৃত্বের প্রতি যাদের ছিল গভীর আস্থা তারা আবেগের বাইরে থেকে নীরবে অশ্রুপাত করেছে। নজরুলের ভাষায় তাদের অবস্থা হয়েছিল ‘বাহিরে ঝড় বহে, নয়নে বারি ঝরে।’

কায়দে আযমের দিক নির্দেশনার প্রতি পূর্ববাংলার মানুষের অনাস্থাও আনুগত্যহীনতাকে মূসা (আ) ও তার কাওমের কর্মকাণ্ডের সাথে তুলনা করা যায়। ফেরাউনের জুলুম নিপীড়ন ও গোলামী থেকে মুক্ত করে মূসা (আ) তার কওমকে শান্তি স্বস্তি এবং মুক্তির নতুন উপত্যকায় নিয়ে এলেন। বনি ইসরাইলীরা সুখ সমৃদ্ধির দিগন্ত রচনা করল। সেখানে তারা পেল আযাদীর মুক্ত হাওয়ার সন্ধান। অতপর যখন মূসা (আ) আল্লাহর নির্দেশে স্বীয় জাতিকে ডেকে বললেন- ‘হে আমার জাতি! খোদার অবদান স্মরণ কর। তিনি তোমাদের মধ্যে অনেক নবীর জন্ম দিয়েছেন। এখন তিনি তোমাদের বাদশাহী দান করেছেন। যা আজ পর্যন্ত কাউকে দেয়া হয়নি। তাই সাহস ও দৃঢ়তার সাথে এগিয়ে চল। তার শাসনভার শুধু তোমারদেরই ভাগ্যে লেখা হয়েছে। কখনো পৃষ্ঠ প্রদর্শন করো না। এর পরিণাম ব্যর্থতা এবং হতাশা ছাড়া কিছু নয়। (সূরা মায়েদা ২০-২১)
মূসার (আ) জাতি জবাব দিল, কোরআনের ভাষায়- ‘হে মূসা তুমি তোমাদের খোদাকে নিয়ে লড়াই করো আমরা এখানে বসে তামাশা দেখব।’ (সূরা মায়েদা ২৪)
নবীর আদেশ এবং নেতার নির্দেশ অগ্রাহ্য করার জন্য সমগ্র কওমের উপর শাস্তির ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ বললেন, বাইতুল মোকাদ্দাসে প্রবেশ তাদের জন্য ৪০ বছর নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হল। এখন থেকে এই এলাকায় তারা নত মস্তকে চলবে। (সূরা মায়েদা)

দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে বর্ণবাদী হিন্দু ও বৃটিশদের সম্মিলিত চক্রান্ত নস্যাৎ করে কায়দে আযম যে জাতিকে শৃংখল মুক্ত করলেন, একটানা ২শ’ বছরের গোলামী থেকে যে জাতিকে আযাদ করলেন, এই সদ্যমুক্ত জাতিকে তিনি যখন তার সুদূর প্রসারী ভাবনা ও প্রজ্ঞা দিয়ে দিক নির্দেশণা দিলেন তখন সেটা প্রত্যাখ্যান করল। তিনি পাকিস্তান আন্দোলনের পটভূমি বিশ্লেষণ করে বললেন- ‘পাকিস্তানের সংহতির খাতিরে প্রয়োজনবোধে মাতৃভাষা পরিবর্তন করতে হবে।’ কায়েদে আযমের এই দিকনির্দেশনা অগ্রাহ্য করা হল। ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাকিস্তানকে ধ্বংস করা হল। সাতচল্লিশের কাংখিত উপত্যকা পরিত্যাগ করে আমরা নতুন উপত্যকায় এলাম। এখানে এই উপত্যকায় এসে আমাদের প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির যোগ হলো না। এখানে ‘আমতো মিললইনা ছালা হারানো’র সম্মুখীন হলাম। এখানে স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার, অর্থনীতি এবং রাজনীতি প্রশ্নবোধক চিহ্নের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। অহির নির্দেশে বনি ইসরাইলীদের বাইতুল মোকাদ্দাস প্রবেশ ৪০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল, গর্বিত বনি ইসরাইলীদের মাথা হেট হয়েছিল। জাতির দুর্দিনে খোদার দান হিসেবে যে নেতাকে আমরা পেয়েছিলাম, তার নির্দেশ উপেক্ষা এবং অগ্রাহ্য করার কাফফারা হিসেবে সত্যিকার স্বাধীনতার তোরণদ্বারে প্রবেশ করার জন্য এ জাতিকে কত বছর অপেক্ষা করতে হবে আল্লাহই ভাল জানেন।

(বইটির pdf version download করুন এখানে)

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh