Home EBooks দুই পলাশী দুই মীরজাফর অধ্যায় ১৬: গনেশ উল্টে দে মা লুটেপুটে খাই

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১৬: গনেশ উল্টে দে মা লুটেপুটে খাই Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Saturday, 15 August 2009 00:26
গনেশ উল্টে দে মা লুটেপুটে খাই
দক্ষ নটদের মত সুনিপুণ অভিনয়ের মাধ্যমে রাজনীতির দৌড়ে শেখ মুজিব ও তার দল প্রকৃত দেশ-প্রেমিকদের পিছু হটিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল, বললে ভুল হবে, দেশ-প্রেমিক দল নেতা কর্মী ও জনগণকে রাজনীতির ময়দান থেকে বিতাড়তি করেছিল। এরপর শূন্য ময়দানে মার্চের শুরু থেকে লুটপাট এবং সন্ত্রাসের মহড়া চলতে থাকে। অনেক টালবাহানা, অনেক আবেগ আর উত্তাপ ছড়িয়ে শেখ মুজিব গনেশ উল্টে দিলেন। পরিকল্পিতভাবে ঝড় ডেকে এনেছিলেন শেখ মুজিব। বাংলার মানুষকে রক্তাক্ত মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে আত্মসমর্পন করেছিলেন। তার অনুগামীরা যারা চেয়েছিল ‘গনেশ উল্টে দে মা’ তারা শুরু করেছিল লুট। ভয়াবহ লুণ্ঠনের নেশা আওয়ামী নেতা কর্মীদের গ্রাস করেছিল। লূণ্ঠন আর ভোগ বিলাসের দৃষ্টান্ত একজন মুক্তি যোদ্ধা পরবর্তীতে রাষ্ট্রদূত লেঃ কর্নেল শরীফুল হক ডালিম তার গ্রন্থে (যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি) লিখেছেন- ‘তারা কোলকাতায় বেশ আরাম আয়েশেই সময় কাটাচ্ছিলেন। কিন্তু ক্রমান্বয়ে তাদের অসৎ উপায়ে লুটপাট করার কথা প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছিল, এতে তাদের সম্মানেরই শুধু হানি হচ্ছিল তা নয়, তাদের অনেকেরই প্রতি বিক্ষুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। তারা যেখানে অনাহারে অস্ত্রহীন বস্ত্রহীন অবস্থায় দেশকে স্বাধীন করার জন্য জীবন বাজি রেখে রণাঙ্গনে লড়ছেন তখন এ সমস্ত অসৎ রাজনীতিবিদ ও লুটেরার দল লুটপাটের বেশুমার টাকায় বিলাসী জীবন যাপন করে বাঙালিদের বদনাম করছিলেন অতি নির্লজ্জভাবে। কোটি কোটি টাকা তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তান থেকে লুটে আনা হয়েছিল। শুধুমাত্র বগুড়ার স্টেট ব্যাংক থেকে লুট করা হয়েছিল ৫৬ কোটি টাকার উপর। এ সমস্ত লুটপাটের সাথে জড়িত ছিল রাজনৈতিক নেতা এবং আমলাদের একটি অংশ।

লুটপাট সমিতির সদস্যরা (আওয়ামী লীগাররা) তখন কোলকাতার অভিজাত পাড়াগুলোতে এবং বিশেষ করে পার্ক ষ্ট্রীটের হোটেল বার এবং রেস্তোঁরাগুলোতে তাদের বেহিসাবী খরচার জন্য জয় বাংলার শেঠ বলে পরিচিত। যেখানে তারা যান মুক্তহস্তে বেশুমার খরচ করেন। থাকেন বিলাসবহুল ফ্লাট কিংবা হোটেলে। সন্ধ্যার পর হোটেল গ্রান্ড, প্রিন্সেস, ম্যাগস, ট্রিংকাস, ব্লু ফকস, মলিন রুৎ, হিন্দুস্থান ইন্টার ন্যাশনাল প্রভৃতি বার রেষ্টুরেন্টগুলো জয় বাংলার শেঠদের ভিড়ে জমে উঠে। দামী পানীয় খাবারের সাথে সাথে পাশ্চাত্য সংগীতের আমেজে রঙিন হয়ে উঠে তাদের আয়েশী জীবন। বয় বাবুর্চিরাও তাদের আগমনে ভীষণ খুশী হয়। এমনই একজন নেতা তার দলবল নিয়ে প্রত্যেক দিন হোটেল গ্রান্ডের বারে মদ্যপান করতেন। তিনি বগুড়া ব্যাংক লুটের টাকার একটা বিরাট অংশ কবজা করেছেন কোনভাবে। তার কাছে রয়েছে প্রায় ৪ কোটি টাকা। একদিন মধ্যরাতে তিনি হোটেল বারে গিয়ে মদ পরিবেশন করার জন্য বারম্যানদের হুকুম দেন। বারম্যান্যরা কাচু মাচু জবাব দেয়, সময় শেষ হয়ে যাওযায় বার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। জবাব শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন বাঙালি শেঠ। টলমল অবস্থায় চিৎকার করে বলতে থাকেন তিনি হোটেলটাই পুরো কিনে নিতে চান। বেসামাল কিন্তু শাসাল খদ্দের, তাই বারম্যানরা চুপ করে সবকিছু হজম করে যাচ্ছিল। শেঠ আবোল তাবোল বকে পরে একজন বারম্যানকে হুকুম  দেন ‘কাল বার খোলার সময় থেকে বন্ধ  করার আগে পর্যন্ত তিনি ও তার সংগীদের ছাড়া অন্য কাউকে মদ পরিবেশন করা যাবে না। তারাই শুধু থাকবে বারে। তার হুকুম শুনে বারম্যানরা ম্যানেজারকে ডেকে পাঠায়। ম্যানেজার এলে শেঠ তাকে প্রশ্ন করেন রোজ আপনার বারে সেল কত টাকা? ম্যানেজার একটা অংক তাকে জানায়। শেঠ তখন তাকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বলেন পুরোদিনের সেলের টাকাই তিনি পরিশোধ করবেন, পুরো টাকার মদ খেয়ে ওরা শেষ করতে না পারলে বাকি মদ যেন তার বাথরুমের টাবে ভরে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। তিনি তাতে গোসল করবেন।’

আর একদিন আর এক জন জয় বাংলার শেঠ তার পুত্রের প্রথমারের মত জুতা পরার দিনটি উদযাপন করার জন্য ব্লু ফকস রেষ্টুরেন্টের ১০০ জনের একটি শানদার পার্টি দেন। এ ছাড়া অনেক শেঠ দিল্লী ও বোম্বেতে গিয়ে বাড়ী ঘর কিনতে থাকেন। অনেকে আবার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়ে উঠেন। তাদের এ সমস্ত কীর্তিকলাপের উপর শহীদ জহির রায়হান একটি প্রামাণ্য চিত্র তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তার এ অভিপ্রায়ে অনেকেই ভীষণ অসন্তুষ্ট ছিলেন তার উপর, অনেকেই তার ঔদ্ধত্যে ক্ষেপে গিয়েছিলেন। তার রহস্যজনক মৃত্যুর পেছনে এটাও একটা কারণ হতে পারে। কোন এক নায়িকার জন্মদিনে তখনকার দিনে তার এক গুণমুগ্ধ তাকে ৯ লক্ষ টাকা দামের হীরের নেকলেস উপহার দিয়েছিলেন।

দারগা রোডের বিশু বাবুর বাড়িতে থাকতেন মন্ত্রী পরিষদের পরিবারবর্গ। প্রবাসী সরকারের টাকার প্রায় সবটাই কালো কালো ট্রাঙ্কে ভরে রাখা হয়েছিল বিশুবাবুর বাড়ীতে এবং ৩নং সোহরাওয়ার্দী এভিন্যুর তিনতলা ছাদের দুটো কামরায়। সেখানে থাকতেন অর্থ সচিব জনাব শামসুজ্জামান, তার পরিবার ও রাফিয়া আকতার ডলি। এ টাকার কোন হিসেব ছিল না।
কোলকাতার বড় বাজারের মারোয়ারিদের সাহায্যে এগুলো এক্সচেঞ্জ করা হত। এ কাজের দালালী করেও অনেকেই কোটিপতি হয়ে উঠেন রাতারাতি। কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা লোভ সম্বরণ করতে না পেরে অসৎ হয়ে উঠেন।

কোন এক সেক্টর কমান্ডার এক পাকিস্তানী সিএসপি অফিসারের অন্তসত্ত্বা স্ত্রীকে বেয়নটের আঘাতে মেরে তার গা থেকে সোনার অলঙ্কার খুলে নিয়েছিলেন এমন ঘটনাও ঘটেছে।
যুব শিবির, শরণার্থী শিবিরগুলো নিয়ে কেলেঙ্কারি হয়েছে অনেক। তাদের জন্য সারা বিশ্ব থেকে রিলিফ সামগ্রী, যানবাহন ভারতীয় সরকারের প্রযত্নে এসেছিল। কিন্তু তার কতটুকু বা দেয়া হয়েছিল শরণার্থীদের প্রয়োজন মেটাতে। এসব রিলিফ সামগ্রী বিতরণের দায়িত্ব ছিল যৌথভাবে ভারত ও প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের । বগুড়ার স্টেট ব্যাঙ্ক ছাড়াও মোটা অংকের টাকা নিয়ে আসা হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম, ভৈরব ও পাবনার ট্রেজারী থেকে, সে টাকারও কোন সুষ্ঠু হিসাব পাওয়া যায়নি।’ (যা দেখেছি যা বুঝেছি যা করেছি, পৃঃ ২২০-২২৩)

দিল্লীর সক্রিয় অবস্থান
১৯৭১ সালে প্রকাশিত পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্রের সূত্র থেকে জানা যায়- ‘মার্চে উদ্ভূত সংকটের আগেই পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে শিকারী জঙ্গী বিমান ও অতিরিক্ত পরিবহন বিমান মোতায়েন করা হল পূর্ব পাকিস্তানের পশ্চিম ও উত্তর সীমা সংলগ্ন ঘাঁটিগুলোতে প্রস্তুতি আরো জোরদার করা হল। বঙ্গোপসাগরে পাকিস্তানী জাহাজগুলোর চলাচল পর্যবেক্ষণ করার জন্য কোলকাতার কাছে ব্যারাক পুরে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ বিমান মোতায়েন করা হল। মার্চ মাসের শেষ দিকে হিন্দুস্থানী সেনাবাহিনীর সদস্যরা ইপিআর এবং সেনাবাহিনীর ছদ্মাবরণে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশ করে। হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে পাকিস্তান অভিযোগ করে যে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বি এস এফ-এর ৭৬, ৮১, ৮৩, ১০১, ১০৩ ও ১০৪ নং ব্যাটেলিয়ান ছাড়াও আরো দুটো ব্যাটেলিয়ানকে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের শেষে পূর্বে পাকিস্তানে কাজে লাগান হয়েছিল

পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ইসলামাবাদ সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার সাথে সাথে রাজনীতিকরা চঞ্চল হয়ে উঠল- এবং সেখানকার হিন্দু জনগণ সরব হয়ে উঠল যেন তাদের কাঙ্খিত শুভ দিন আসন্ন। ২৬ মার্চ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী লোক সভায় বললেন- ‘আমরা এ আন্দোলনের ঐতিহাসিক গুরুত্বের ব্যাপারে গভীরভাবে সজাগ। যারা জানতে চেয়েছিল সময়মত পদক্ষেপ নেয়া হবে কিনা, আমি সেই সমস্ত সম্মানিত সদস্যবর্গকে আশ্বস্ত করতে চাই যে, তা করাই হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য সময় পার হয়ে গেলে সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন লাভ নেই।’ রাজ্যসভায় একই দিনে তিনি বলেন- ‘বহু কারণে ব্যাপারটায় আমরা আগ্রহী। প্রথম যেমনটা একজন সদস্য বলেছেন শ্রী মুজিবর রহমান সেসব মূল্যবোধের পক্ষেই দাঁড়িয়েছেন, যেগুলো আমরা নিজেরাও সযত্নে লালন করি।’

১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ হিন্দুস্থানী পার্লামেন্টের উভয় পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবের পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি গভীর ভালবাসা ও সহানুভূতি প্রকাশ করা হয় এবং তাদের আশ্বাস দেয়া হয় যে হিন্দুস্তানী জনগণ তাদের সংগ্রামে সর্বান্তকরণে সহানুভূতি জানাবে এবং সমর্থন যোগাবে। এই প্রস্তাবটি ৪ এপ্রিল সর্ব সম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এ প্রস্তাব সম্পর্কে বক্তৃতা প্রসঙ্গে অল ইনডিয়া কংগ্রেস কমিটির পশ্চিম বাংলা ইউনিটের সেক্রেটারী মিঃ কেকে শুক্লা বললেন- ‘শেখ মুজিবর রহমান যে যুদ্ধ করছেন সেটা হিন্দুস্থানেরই যুদ্ধ।’

বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে ভারতের প্রাদেশিক পরিষদ গুলোতে সরকারীভাবে প্রস্তাব গৃহীত হয়। পশ্চিম বঙ্গের ডিপুটি মূখ্যমন্ত্রী বললেন- ‘যদিও কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানায়নি কিন্তু পশ্চিম বাংলায় আমরা বাংলাদেশের প্রতি এখন থেকে স্বীকৃতি জানাচ্ছি।’

৩১ মার্চ ইনডিয়ান কাউন্সিল ফর ওয়ার্ল্ড এ্যাফেয়ার্স কর্তৃক আয়োজিত এক সিম্পোজিয়ামে ভারতের প্রতিরক্ষা ইনস্টিটিউটের ডাইরেক্টর কে সুব্রামানিয়াম বললেন- ‘ভারতকে এ সত্য উপলব্ধি করতে হবে যে, পাকিস্তানের ভাঙ্গন আমাদের স্বার্থের অনুকূলে। এমন সুযোগ আর আসবে না। ...... বাংলাদেশের সংকট পাকিস্তানকে ধ্বংস করার ব্যাপারে ভারতের জন্য এ শতাব্দীর সুযোগ এনে দিয়েছে।’ বিহার প্রদেশের মূখ্য মন্ত্রী কর্পুরী ঠাকুর সাহায্য তহবিলে ২৫ লাখ টাকা দান করে বললেন- ‘বাংলাদেশে অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহের ব্যাপারে আমরা অটল।’

২ এপ্রিল (৭১) হিন্দুস্থানী পত্রিকা ফ্রি প্রেস জার্নালে লেখা হল- ‘আমাদের হিন্দুস্থানের কার্যকলাপকে সচেতন ভাবে এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে পাকিস্তানকে দুর্বল করার লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করতে হবে।
১৫ জুন দৈনিক মাদার ল্যান্ডে প্রকাশিত নিবন্ধে ভারতের একজন ভাষ্যকার সুব্রানিয়াম স্বামী লিখলেন- ‘পাকিস্তানের আঞ্চলিক অখণ্ডতার দিকে লক্ষ্য রাখা আমাদের কাজ নয়। সেটা পাকিস্তানের মাথা ব্যাথা। আমাদের শুধু দুটো প্রশ্ন বিবেচনা করতে হবে- পাকিস্তান খণ্ড-বিখণ্ড হওয়া কি আমাদের দীর্ঘ মেয়াদী স্বার্থের অনুকূলে? আর যদি তা সত্যি আমাদের স্বার্থের অনুকূল হয় তাহলে এ ব্যাপারে আমাদের কি কিছু করার রয়েছে?

পাকিস্তানকে খণ্ড-বিখণ্ড করা কেবল আমাদের বাইরের নিরাপত্তার জন্য অনুকূল নয়, তা আমাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার অনুকূল। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে হিন্দুস্থানকে একটি মহা শক্তি রূপে গড়ে ওঠা উচিত এবং এই ভূমিকা পালনের জন্য আমাদেরকে জাতীয় পর্যায়ে আমাদের নাগরিকদের সুসংবদ্ধ করতে হবে আর এজন্য অপরিহার্য পূর্ব শর্ত হচ্ছে পাকিস্তানকে ছিন্ন ভিন্ন করা।’ ভারতের তাৎক্ষণিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলে এটা স্পষ্ট হয়ে  ওঠে যে পূর্ব পাকিস্তানের সংকটের অন্তরালে ছিল দিল্লীর সক্রিয় ভূমিকা। হিন্দু নেতৃবৃন্দ  বিশেষ করে এম কে গান্ধী মনে করতেন পূর্ব পাকিস্তান নিজস্ব যন্ত্রণায় ভারতে ফিরে আসবে। নেহেরু মাউন্ট ব্যাটেনের ধারণা ছিল পূর্ব-পাকিস্তান ভায়াবল নয়, যে কারণে ২৫ বছরের মধ্যে সে ভারতের সাথে একাকার হতে চাইবে। যে ভূখণ্ড ভায়াবল ছিল না সেটাকে ভায়াবল করেছিল পাকিস্তান পঞ্চম বাহিনী সৃষ্ট যন্ত্রণাকর পরিস্থিতির মধ্যে। দিল্লী উন্নয়নমুখী পূর্ব পাকিস্তানকে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে ধাপে ধাপে ক্রমশ ২৫ বছর নয় ২৪ বছরের মধ্যে কলাপ্স করে দিল রক্তাক্ত পরিস্থিতির মুখোমুখী দাঁড় করিয়ে।

দায়ী কে?
একাত্তরের মর্মান্তিক সংকটের জন্য দায়ী কে? ইয়হিয়া না শেখ মুজিব। ইয়াহিয়া নয় শেখ মুজিবই একাত্তরের উত্তাল মার্চে সমঝোতা প্রয়াস ভণ্ডুল হওয়ার জন্য দায়ী।  সীমাহীন জনপ্রিয়তা নিয়ে শেখ মুজিব পরিণতির কথা না ভেবে হটকারী সিদ্ধান্ত জাতির কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছিলেন এক অদৃশ্য সুতোর টানে। কোন পঞ্চমবাহিনী চক্রের পক্ষে শত্রু পক্ষের পেতে রাখা ফাঁদে পা রাখা ছাড়া ভিন্ন কোন পথ খোলা থাকে না। একাত্তরে আন্তর্জাতিক চক্রের ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণায় বিভ্রান্ত ও সম্মোহিত জাতি তখন না বুঝলেও পরবর্তী তত্ত্ব উপাত্ত থেকে অনুধাবন করেছে যে শেখ মুজিব স্বয়ং বিপর্যয় ডেকে এনে ছিলেন। শেখ মুজিবের একজন লেপটেন্যাণ্ট আব্দুর রাজ্জাকের স্বাধীনতার ১৫ বছর পর দেয়া একটি সাক্ষাৎকারই প্রমাণ করে যে, তিনি স্বয়ং একাত্তরের সংকট জাতির কাঁধে চাপিয়ে দিয়েছিলেন।
১৯৮৭ সালে সাপ্তাহিক মেঘনায় দেয়া সাক্ষাৎকারটি ছিল এমন- ‘...এরপর শুরু হল ডায়ালগ। ডাইলগে বঙ্গবন্ধু আপোসের সিদ্ধান্ত নিলেন। ইয়াহিয়া এমন একটি অফার দেন, যা একটি কনফেডাশেনের মধ্যে এসে গেল। অফারটা ছিল বঙ্গবন্ধু প্রাইম মিনিস্টার, জুলফিকার আলী ভূট্টো ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার এবং ফরেন মিনিস্টারের চার্জ পাবেন। এ ছাড়াও বঙ্গবন্ধু যে ৬ দফা দিয়েছিলেন তার মধ্যে একমাত্র ডাবল কারেন্সী বাদ দিয়ে বাকি আর পাঁচটা দাবিও ইয়াহিয়া খান মেনে নিলেন।... ২৩ মার্চ এ প্রস্তাবকে চূড়ান্ত রূপ দেবার কথা।... তবুও সেদিন বললাম বঙ্গবন্ধু আর যাইহোক ভুট্টোর সাথে সরকার গঠন করা যাবে না। এই যেই বলেছি, অমনি তিনি ভীষণ জোরে চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, চুপ কর। আমার চেয়ে বেশী বোঝ? ভূট্টোর সাথে সরকার গঠন করব কিনা আমাকে ভাবতে দাও।... পরে বললেন, আমি ওদের সাথে খেলতে চাই। আমাকে খেলতে দাও। তোমরা একদিনেই সব খেতে চাও।... কিছুক্ষণ পর বঙ্গবন্ধু আমাকে উপরে যেতে বললেন। কাছে গিয়ে বসলে বললেন, আমি যা বলব পৃথিবীর কারো কাছে বলবে না, নট ইভেন টু ইউর কমরেডস।’ আমি ঘাড় নাড়লাম। তারপর বললেন, তোরা ঠিক বলেছিস। কাল সারারাত ধরে আমি চিন্তা করলাম, নো রিক্স নো গেইন। তোরা পারবি না প্রাথমিক অবস্থা চালাতে। খবরদার তোরা কাউকে বলবি না, ইয়াহিয়া খানকে কি বলব ঠিক করে ফেলেছি। আমি বললাম, প্রাথমিকভাবে আমরা চালাতে পারব তারপর যদি আপনি ভারতের সাহায্য করার ব্যবস্থা করে যেতে পারেন আরো ভাল হয়।... বঙ্গবন্ধু নিচে নেমে নজরুল ইসলাম সাহেবকে ডাকলেন। তাজুদ্দিন মুশতাক সাহেবকেও। তারপর তাদের লাইব্রেরী রুমে নিয়ে গেলেন। ওরা মুখ অন্ধকার করে ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমি বের হলাম গাড়ীতে। তারপর তাকে প্রেসিডেন্ট হাউসে পৌঁছে দিলাম। আমি চলে এলাম। ২৩ তারিখে আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেলাম। সেখানে আগের দিনে দেয়া কথা বঙ্গবন্ধু প্রত্যাহার করলেন। বললেন, পূর্বপাকিস্তান এ্যাসেম্বলীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর কর।”

সাক্ষাৎকারে বলা হয়েছে, (মুজিব) বললেন, আমি তাদের সাথে খেলতে চাই। শেখ ওদের সাথে খেলেননি খেলেছিলেন সাড়ে সাত কোটি পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভাগ্য নিয়ে।  

বিপর্যয় এড়ানো যেত
নিরোদ সি চৌধুরী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বুদ্ধিজীবী যদিও তিনি কিশোর গঞ্জের সন্তান। একাত্তরে তিনি ছিলেন বৃটিশ নাগরিক ও লণ্ডনেই বসবাস করতেন। সেই নিরোদ সি চৌধুরী ভারতের হিন্দুস্থান টান্ডার্ড পত্রিকার (১০মে ১৯৭১) এক নিবন্ধে লিখেছিলেন- ‘...আমি আবারও বলতে চাই যে, এই বিপর্যয় অবশ্যই এড়ান যেত। আমি কোলকাতা থেকে একটা চিঠি পেয়েছি। তাতে বলা হয়েছে যে, শেখ মুজিবর রহমান তার দাবীর কিছু ছাড় দিলেও পাকিস্তান সরকার কঠোর ভাবে বদলা নিতেই কেবল তারা একটা অজুহাত খুঁজে বেড়াচ্ছিল মাত্র। আর এটাই হচ্ছে প্রত্যেকটি বাঙ্গালীর নিজের অপরাধ বা ত্রুটি ঢাকা দেবার চিরাচরিত বাহানা। তাই যদি হবে তাহলে ইয়াহিয়া খান ১৫ তারিখে ঢাকা আসতে যাবেন কেন? সেই সময়কার অবস্থাতো এমনি দাঁড়িয়ে ছিল যে, একটা প্রদেশ কেন্দ্রীয় শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চলেছে বলেই মনে হচ্ছিল। মার্কিন গৃহযুদ্ধ শুরু হবার সময়ের যে অবস্থা সেটাও এতটা খারাপ ছিল না। মার্চ মাসের ছয় তারিখ থেকে শেখতো সরকারের বাঙ্গালী কর্মচারীদের সহযোগিতায় পূর্ব বাংলা সরকারের সমস্ত কর্ত্তৃত্ব দখল করে নিয়ে ছিলেন- বাস্তবে বিচ্ছিন্নতাতো ঘটেই গিয়েছিল, তাই ৬ই মার্চ এর পর যে কোন সময় তো কেন্দ্রীয় সরকার সামরিক অভিযান চালাতে পারত অতি সহজে। ২৩শে মার্চ ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক মশিয়র রহমান (জাদুমিঞা) এক জনসভায় ঘোষণা দিলেন যে, পূর্ব বাংলা ইতিমধ্যেই স্বাধীন হয়ে গেছে এবং বাঙ্গালীরা যে কোন মূল্যে সে স্বাধীনতা রক্ষা করবে। তিনি আরো বললেন- ‘জনসাধারণ সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং আওয়ামী লীগ উভয়ের কাছ থেকে হুকুম পেয়েছে- আর তারা আর্মির হুকুম উপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ সুতরাং সামরিক অভিযান শুরু করার জন্য শেখ আর ইয়াহিয়া খানের মধ্যেকার আলোচনা ভেঙ্গে যাওয়ার জন্য বসে থাকার কোন প্রয়োজন ছিল না। আমার এই মন্তব্যের কি জবাব দেওয়া হবে তা আমার জানা আছে- বলা হবে যে আওয়ামী লীগকে ভুল পথে চালিত করার জন্য ইয়াহিয়া খান সমঝোতা করার ভান করে চলেছিল। কিন্তু তাই যদি হয় তাহলে শেখ মুজিব ইয়াহিয়া খানের দেওয়া যে কোন একটি প্রস্তাব মেনে নিলেন না কেন?
১। শর্তসাপেক্ষে চার দফা মেনে নিয়ে সংসদে যাওয়া।
২। বিনা শর্তে সংসদে যাওয়া।
৩। কেন্দ্রে বেসামরিক শাসন পুনঃ প্রতিষ্ঠা করার পক্ষে সাময়িক ভাবে সামরিক সরকারকে মেনে নেওয়া।

উপরের এই শর্তগুলোর যে কোন একটা মেনে নিলে কি মুখোমুখি সংঘর্ষের পথে যে পরিণত হচ্ছে তার চেয়ে ফল খারাপ হত কি?

এখন আরও একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই, অতীত এবং ভবিষ্যৎ উভয়ের জন্য এটা প্রযোজ্য- বাঙ্গালী হিন্দুরা কোন কিছু করতে চাইলে তারা তখনই তা করতে চায় ধৈর্য ধরতে পারে না।- আর এটাই তাদের চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। এর জন্য তারা চরম ভাবে উত্তেজিত হয় আর না হয় চরম ভাবে মুষড়ে পড়ে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, নতুন বাঙ্গালী মুসলমান বুদ্ধিজীবীরাও এই রোগে আক্রান্ত, যদিও তারা ভিন্ন ধাতুর তৈরী অর্থাৎ তারা অবশ্যই দৃঢ়চেতা হওয়ারই কথা। অন্য কথায় বলা যায় যে, বাঙালী মুসলমানরা রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন করতে গিয়ে হিন্দু চরিত্রের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে বসেছে। কিন্তু বাঙ্গালী হিন্দুর রাজনৈতিক আন্দোলনের অভিজ্ঞতা না থাকায় বাঙ্গালী মুসলিমরা কোথায় থামতে হবে তা জানতো না। যদি প্রতিবাদের কথাই ধরা যায় তাহলে স্বীকার করতে হবে যে, পশ্চিম বঙ্গের হিন্দুদের ভারত সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ পূর্ব বঙ্গের মুসলিমদের পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। তবু পশ্চিম বঙ্গের হিন্দুরা তাদের নির্বাচিত দু’দুটো সরকার কেন্দ্র কর্তৃক বাতিল হতে দেখলেও চুপচাপ। তারা এর জন্য কোন বিদ্রোহ ঘোষণা করেনি। কিন্তু হালে গজিয়ে উঠা মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের অজ্ঞতা ও অনভিজ্ঞতাই তাঁদের চূড়ান্ত বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাড়াল।

(বইটির pdf version download করুন এখানে)

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh