Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ১ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

জন্মেছিলাম আমলার ঘরে। কিন্তু আমলার ঘরের সন্তানদের সাধারণত যেসব বদ অভ্যাস থাকে, আল্লাহর মেহেরবানীতে, আমি ছিলাম সেসব থেকে মুক্ত। সব সময় আম-জনতার পাশে থাকতাম। রাজনীতির কারণে সব শ্রেণীর লোকের সাথে মিশতে হত। জীবনের একটা বিরাট অংশ রাজনীতিতে কাটিয়েছি। কি পেলাম আর না পেলাম সেটা কখনই আমার কাছে ছিল না। মানুষের খেদমত করতে পেরেছি কিনা সেটাই ছিল আমার প্রধান বিবেচ্য। সে জন্যই রাজনীতির দাবা খেলায় আমি কখনও ভাল প্লেয়ার হতে পারিনি। অবশ্য সে জন্য আমার কোন আফসোস নেই।

আব্বা চাইতেন না রাজনীতি করি। রাজনীতি করলে ছেলেপেলে মানুষ হয় না। হয়ত এই ছিল তার ধারণা। তাছাড়া আমলাসুলভ দ্বিধা-সংকোচ তো ছিলই। ১৯৩৪ সাল। আব্বা তখন ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। সময়টা ছিল ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের যুগ। মিছিল-মিটিং-এ প্রায়ই নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর ধ্বনি উচ্চারিত হত। মন রোমাঞ্চিত হয়ে উঠত। তখন আমি ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জর্জ স্কুলে ক্লাস ফাইভের ছাত্র। একবার হঠাৎ করেই এমনি একটি মিছিলে চলে গিয়েছিলাম। তখনও বুঝতাম না কাদের মিছিল, কিসের মিছিল। মিছিল শেষে বাড়ি ফিরে আসার পর আব্বা একথা শুনে খুব ক্ষেপে গিয়েছিলেন। তখন থেকেই বোধ হয় মনের মধ্যে রাজনীতির জন্য একটা স্থান তৈরী হয়ে গিয়েছিল।

৯ ভাই-বোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। ফেনীতে আমাদের গ্রামের বাড়ী। ছাগলনাইয়া থানায় পানুয়া গ্রামে আমার জন্ম ১৯২৪ সালে। কিন্তু কখনও সেখানে আমার থাকা হয়নি। আব্বার বদলির চাকরিতে সারা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছি। আব্বা যখন কলকাতার আলীপুর কোর্টে ম্যাজিষ্ট্রেট তখন আমি ভর্তি হই সেন্ট বার্নাবাস স্কুলে। এটা ছিল খ্রিষ্টানদের পরিচালনাধীন। ক্লাস শুরু হত বাইবেল থেকে কিছু অংশ পাঠ করে। অধিকাংশ শিক্ষকই ছিলেন খ্রিষ্টান। এ স্কুলে বসেই প্রথম টের পাই সাম্প্রদায়িকতা কি জিনিস। আমার ক্লাসে মুসলমান ছাত্র ছিল গোটা আস্টেক। হিন্দুরা আমাদের বলত ‘মোচলমান’; কেউ কেউ ভেংচিয়ে বলত ‘মোছলা’, ‘নেড়ে’। কিন্তু হিন্দুরা পরিচিত ছিল বাঙ্গালী বলে। খ্রিষ্টানরা ছিল এসব বিবাদের বাইরে। তাদের খ্রিষ্টান ছাড়া অন্য কিছু বলা হত না। এই পার্থক্যটা সেকালে আরও বোঝা যেত খেলার মাঠে বিশেষ কোন ক্লাবের সাপোর্টারের ভিত্তিতে। যারা মোহনবাগান সাপোর্ট করত তারা বাঙ্গালী। যারা মোহামেডানের পক্ষে তারা মুসলমান। আর ক্যালকাটা স্পোর্টিং ক্লাব ছিল ইংরেজদের। সুতরাং তাদের সাপোর্ট করত খ্রিষ্টানরা।

হিন্দুরা ইচ্ছে করেই মুসলমান নামগুলোকে বিকৃত করত। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মত নেতাকে তারা বলত ‘সুরাবর্দী’। আর আকরাম খাঁকে বলত ‘আক্রমণ খাঁ’।
কলকাতা থেকে আব্বা ডি এম হিসেবে মালদায় বদলী হন। মালদা ছিল সুস্বাদু আমের জায়গা। সুলতানী বাংলার রাজধানী গৌড় ছিল মালদা শহর থেকে ৭ মাইল দূরে। মুসলিম সুলতানদের অসংখ্য কীর্তি গৌড় শহরে দেখেছি। শহরটা ছিল চারদিক থেকে গড় দিয়ে ঘেরা। গড় মানে হচ্ছে পরিখা। এখানে ছিল পানিপূর্ণ খাদ। সামরিক নিরাপত্তার জন্য কৃত্রিমভাবে এই গড় তৈরী করা হয়েছিল। গড় থেকেই গৌড় শব্দটা এসেছে।

বখতিয়ার খলজী যখন নদীয়া আক্রমণ করে বাংলাদেশ অধিকারের সূচনা করেন তখন তিনি এই গৌড়েই প্রথম রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন মুসলমান সুলতানদের রাজধানী ছিল গৌড়। গৌড়ের ফিরোজ মিনার তৈরী করেছিলেন সুলতান ফিরোজ শাহ। প্রায় ২৫০ ফুট উঁচু এ মিনারটি ব্যবহৃত হত রাজধানীর নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে। এখানে উঠে নিরাপত্তা রক্ষীরা চারিদিকে নজর রাখত। মালদার অদূরে আদিনা মসজিদটি ছিল খুবই বড়। বাংলার মুসলিম স্থাপত্যের এটা ছিল অত্যুজ্বল নিদর্শন। এটা তৈরী করেছিলেন রাজা গণেশের ছেলে যদু। গণেশ ছিলেন একজন হিন্দু জমিদার। তিনি একবার সুলতানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। এই বিদ্রোহ দমন করতে জৌনপুর থেকে সুলতান ইব্রাহিম শার্কী আসেন। তাঁকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছিলেন সোনারগাঁর বিখ্যাত আলেম নূর কুতুবুল আলম। বিদ্রোহ দমনের পর গণেশ ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান এবং তাঁর ছেলে যদু মুসলমান হয়ে যান। তিনি তখন এই মসজিদটি তৈরী করেন। আমি বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়-স্বজনের সাথে বহুবার মুসলিম সুলতানদের এসব কীর্তি দেখে বেড়িয়েছি। তখন থেকেই বোধ হয় ঐতিহ্য সম্পর্কে আমার একটা ধারণা গড়ে উঠেছিল। আমি তখন ক্লাস টেনের ছাত্র। স্কুলের বার্ষিক স্পোর্টসে দৌঁড় প্রতিযোগিতায় সাত মাইল দৌড়ে আমি একবার গৌড় গিয়েছিলাম। তখন আমি বেশ খেলাধুলা করতাম।

মালদা শহরটার মাঝখান দিয়ে মহানন্দা নদী বয়ে গেছে। এরই একপারে নতুন মালদা শহর গড়ে উঠেছে। অপর পারে সুলতানী বাংলার মালদা। সেখানে আছে বহু দিনের পুরনো মসজিদ আর মাযার। এই মাযারে একটা টিয়া পাখির কবরও ছিল। শোনা যায় টিয়াটি ছিল কোরাআনে হাফেজ। প্রতিদিন শত শত লোক এই মাযারে আসতেন।

মালদার খুব কাছেই ছিল বিহারের সীমানা। পলাশীর বিপর্যয়ের পর মহানন্দা নদী দিয়ে নৌকাযোগে এ পথ দিয়েই সিরাজদ্দৌলাহ বিহারের উদ্দেশ্যে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। শোনা যায় মেয়ে আমিনার খুব ক্ষিধে পেয়েছিল। তাকে খাওয়ানোর জন্য তিনি উপরে উঠেছিলেন। সেখানে ছিল এক ফকিরের আস্তানা। ফকিরই সিরাজদ্দৌলাহকে পুরস্কারের লোভে ধরিয়ে দেয়। সিরাজদ্দৌলাহর পায়ের জুতো দেখে সে তাকে চিনে ফেলে। এই জাতিদ্রোহী ফকিরের আস্তানা দেখতে আমি তখন বহুবার সেখানে গিয়েছি। মুসলমানরা গেলেই সেই ফকিরের আস্তানায় থুথু নিক্ষেপ করে নিজেদের ঘৃণা প্রকাশ করে থাকে। সেই ঘৃণায় আমি যে কতবার শরীক হয়েছি তার ইয়ত্তা নেই।

একবার মালদায় একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। আমরা স্কুলের পক্ষ থেকে ইন্টার স্কুল ফুটবল চ্যাম্পিয়নশীপ প্রতিযোগীতায় অংশ নেয়ার জন্য রংপুর গিয়েছিলাম। খেলা শেষে রংপুর থেকে যখন মালদায় ফিরে আসি তখন প্রায় রাত ১১টা। আমার সাথে এম এইচ খানও ছিলেন। তিনি পরে বাংলাদেশের নৌ-বাহিনী প্রধান হয়েছিলেন। তার আব্বা মোয়াজ্জেম হোসেন খান ছিলেন তখন মালদার এসপি।

আমাদের সবারই খুব ক্ষিধে পেয়েছিল। ভাবলাম যার যার বাড়ী যাওয়ার আগে একটু মিষ্টি খেয়ে যাই। সবাই মিলে আমরা যখন একটা হিন্দু মিষ্টির দোকানে ঢুকতে গেছি অমনি বাঁধা। হাত বাড়িয়ে মালিক বেশ উঁচু গলায় জানতে চাইলেন হিন্দু না মুসলমান? আমাদের তখন তরুণ বয়স। তাঁর কথায় আমাদের মাথায় আগুন উঠে গেল। আমরা সবাই তখন তাঁকে গালি দিয়ে তাঁর দোকানে ঢুকে পড়ি। ইচ্ছামত মিষ্টি খেয়ে বাকি সব মিষ্টির পাত্র রাস্তায় নিক্ষেপ করি। দোকানের মালিক এ ঘটনা দেখে পালিয়ে যান। পরে শুনছি তিনি আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়ার ফন্দি এঁটেছিলেন কিন্তু তিনি যখন শুনতে পান ঘটনার সাথে ডিএমও, এসপি সাহেবের ছেলেরা জড়িত তখন একেবারে চুপসে যান। এ ঘটনা নিয়ে অবশ্য মালদা শহরে সে সময়ে খুব হৈচৈ হয়। কিন্তু পরে আর কিছু হয়নি। তবে একটা পরিবর্তন এসেছিল বোধ হয়। এরপর থেকে হিন্দুরা আর কোনদিন মিষ্টির দোকানে মুসলমানদের সাথে দুর্ব্যবহার করেনি।

এসময় আমার আব্বা মালদার ডিষ্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচনে জহুর আহমদ চৌধুরীকে সহযোগিতা করেছিলেন। জহুর সাহেব ছিলেন যুক্ত বঙ্গ পরিষদের চীফ হুইপ। তখন ফজলুল হক মুসলিম লীগের সাথে মিলে মন্ত্রীসভা তৈরী করেছিলেন। পরে যখন তিনি শ্যামা-হক মন্ত্রীসভা গঠন করেন তখন জহুর সাহেব মুসলিম লীগেই থেকে যান এবং মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে নির্বাচনে দাঁড়ান। জহুর আহমদ চৌধুরীকে নির্বাচনে সহযোগিতা করার জন্য আমার পিতা শ্যামা-হক মন্ত্রীসভার রোষানলে পড়েন এবং চাকরীতে তাঁর পদাবনতি হয়। তিনি মালদার ডিষ্ট্রিক্ট ম্যাজিষ্ট্রেট থেকে ঢাকা সদরের এসডিও হিসেবে বদলী হন। ইতিমধ্যে আমি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় পাস করে আইএতে ভর্তি হবার প্রস্তুতি নিচ্ছি।

তখন ঢাকা কলেজ ছিল আজকের পুরাতন হাইকোর্ট বিল্ডিংয়ে। ১৯৪১ সালে আমি আইএতে ভর্তি হলাম। এসময় আমার ক্লাসমেটদের মধ্যে পরবর্তীতে আইজি আব্দুর রহীম, (অর্থ সচিব) কফিলুদ্দিন মাহমুদের নাম মনে পড়েছে। তখন এই হাইকোর্ট বিল্ডিং নিয়ে অনেক কাহিনী শুনতে পেতাম। এই বিল্ডিং তৈরী হয়েছিল বঙ্গ বিভাগ উত্তরকালে নতুন প্রদেশের গভর্নরের বাসভবন হিসেবে। এখানে ইংরেজ সাহেব-সুবারা গভীর রাত পর্যন্ত নাচ-গান ও পানাহার নিয়ে আসর গুলজার করত। বিল্ডিং সংলগ্ন যে মাযার বর্তমানে যা হাইকোর্ট মাযার নামে সুপরিচিত সেখান থেকে এক রাতে কেউ বেরিয়ে আসেন। তিনি অসামাজিক কার্যকলাপে অসন্তুষ্ট হয়ে গভীর রাতে খাট-পালংকসহ সমস্ত ইংরেজকে বাইরে নিক্ষেপ করেন। ফলে তারা ভীত হয়ে পালিয়ে যায়। তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে। মিত্র বাহিনীর সৈন্যরা পুরো ঢাকা শহর ছেয়ে ফেলেছে। একদিন শুনতে পেলাম মিত্র বাহিনীর হেড কোয়ার্টার হিসেবে আমাদের কলেজ বিল্ডিংটি রিকুইজিশন করা হবে। সরকার সিদ্ধান্ত নিলেন কলেজটি হিন্দু অধ্যুষিত ফরাশগঞ্জ এলাকার একটি পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতে স্থানান্তর করা হবে। তখন ঢাকা কলেজের অধিকাংশ ছাত্রই ছিল মুসলমান। এরা মনে করেছিল হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় কলেজ করতে গেলে তাদের জীবন বিপন্ন হতে পারে। আর তাছাড়া ঢাকায় তখন অহরহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছিল। আমার বিশ্বাস, এ সমস্ত দাঙ্গায় শ্যামা-হক মন্ত্রীসভার সুস্পষ্ট ইন্ধন ছিল। তখন আমি ঢাকা কলেজের নির্বাচিত জি.এস। কলেজ স্থানান্তরের প্রতিবাদে আমরা মুসলমান ছাত্ররা সংগঠিত হতে শুরু করি। আমাদের এ প্রতিবাদ আন্দোলনে প্রখ্যাত ছাত্রনেতা শহীদ নজির, ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র, হাইকোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি বিএ সিদ্দিকী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভিসি ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন অনেক সহযোগিতা করেছিলেন। প্রতিবাদের মুখে সরকার কলেজ স্থানান্তর স্থগিত রাখে। এখানে বলে রাখা ভাল, সেদিন শহীদ নজিরের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ঢাকায় পাকিস্তান আন্দোলন তীব্র গতি অর্জন করে। ঢাকাবাসীর মধ্যে শহীদ নজিরের অসাধারণ জনপ্রিয়তা দেখেছি। মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে পাকিস্তানী আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা এই তরুণ ছাত্রনেতা ব্যাখ্যা করেছেন। তখন ঢাকার নওয়াব হাবিবুল্লাহ মুসলমানদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে শ্যামা-হক মন্ত্রীসভায় যোগ দেন। ঢাকার নওয়াব পরিবারের বরাবরই একটি প্রতিপত্তি ছিল। সুতরাং মন্ত্রীসভায় তাঁর যোগদান পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য একটি বড় আঘাত বলে আমাদের কাছে মনে হয়েছিল।

নওয়াবের বিরুদ্ধে শহীদ নজিরের নেতৃত্বে ঢাকার মানুষ তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। তিনি ঢাকায় এলে ফুলবাড়ীয়া ষ্টেশনে শহীদ নজিরের নেতৃত্বে নওয়াবকে কাল পতাকা দেখান হয়েছিল। সেদিন নওয়াবের সফর সঙ্গী ছিলেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী ফজলুল হক। ষ্টেশনে শহীদ নজিরের সাথে আমরা ছাড়াও স্বয়ং নওয়াব বাহাদুরের ছোট ভাই নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ, সৈয়দ আব্দুস সেলিম এবং পুরাতন ঢাকার উল্লেখযোগ্য কয়েকজন সর্দারও ছিলেন। এঁদের মধ্যে ইলিয়াস সর্দার, মতি সর্দার, আহসানুল্লাহ সর্দারের নাম মনে পড়ছে। ষ্টেশনে নওয়াবের কিছু ভাড়াটিয়া লোকজন আমাদের প্রতিরোধের চেষ্টা করলেও সকলের দৃঢ়তার মুখে তারা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।

এরপর একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। ইউনিভার্সিটির কার্জন হলে একটি মিটিং এ হায়দ্রাবাদের একজন কংগ্রেসী মুসলমান বক্তৃতা করতে আসেন। শহীদ নজিরের নেতৃত্বে মুসলমান ছাত্ররা এ অনুষ্ঠান বর্জন করেন। কংগ্রেসী বিশেষতঃ হিন্দু ছাত্ররা এ ঘটনায় মারমুখী হয়ে ওঠে এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত করে। সেদিন আমি আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগীতার অনুষ্ঠানস্থলে ছিলাম। খেলা চলাকালীন সময়ে দাঙ্গার খবর শুনতে পাই। তাড়াতাড়ি করে কিছু মুসলমান ছাত্রকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছি। জায়গাটা ছিল বর্তমান মেডিকেল কলেজের আউটডোর বরাবর। তখন এ জায়গায় বিরাট নর্দমা ছিল। আমি এসে দেখি নর্দমার পারেই হিন্দু ও মুসলমান দুই পক্ষ সাজ সাজ রবে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ায়ে আছে। নজির কোন পক্ষে না গিয়ে সরাসরি উভয় পক্ষের মাঝামাঝি এসে দাঙ্গা থামানোর চেষ্টা করতে থাকেন। আমি নজিরের পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। চোখের নিমিষে কোন কিছু বুঝতে না বুঝতেই একটি হিন্দু ছেলে আচমকা নজিরের পৃষ্ঠদেশে ধারাল ছোরা বসিয়ে দেয়। সাথে সাথে নজির মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্পষ্ট মনে আছে ঐ অবস্থায়ও ছোরাটি তাঁর পিঠে বিদ্ধ ছিল। পরক্ষনে চারদিকে হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। সবাই প্রাণ ভয়ে এদিকে সেদিকে ছুটতে থাকে। আমরা নজিরকে ধরাধরি করে ঘোড়ার গাড়িতে করে মিডফোর্ট হাসপাতালে নিয়ে যাই। শহীদ নজিরের আহত হবার ঘটনা শুনে ড. আব্দুল্লাহ, ড. নুরুর রহমান, ড. আবিদ উদ্দীনসহ প্রায় দু’হাজার মুসলমান ছুটে আসেন। যখন নজিরের পিঠ থেকে ছুরি টেনে বের করা হয় তখন ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই নজির ইন্তেকাল করেন। সরাসরি পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি ছিলেন প্রথম শহীদ। পরে শুনেছি নজিরকে যে আঘাত করেছিল সে ছিল একজন পেশাদার খুনী। তাই তার আঘাত মোটেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়নি।

নজিরের অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতা ও বাগ্মিতা প্রতিপক্ষের কাছে ছিল রীতিমত ভীতির কারণ। মুসলমানদের নেতৃত্বহীন করবার জন্য হিন্দুরা সেদিন তাঁকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়। নজির ইন্তেকালের পর ঢাকায় এক অভূতপূর্ব অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারী করে। প্রশাসনিক বাধা সত্ত্বেও ঢাকার জনসাধারণ প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসে এবং তাঁর লাশ বহন করে আজিমপুর গোরস্তানে দাফন করা হয়।

নজিরের মৃত্যু ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য একটি বিরাট ক্ষতি। দীর্ঘদিন ঢাকার জনসাধারণ এ দুঃখ-বেদনা বহন করে নিয়ে বেড়িয়েছে। নজিরের মৃত্যুর ভিতর দিয়ে তৎকালীন মুসলিম রাজনীতির একটি দিক নির্দেশনা রচিত হয়। হিন্দুদের সাথে মুসলমানদের যে সমন্বয়ের রাজনীতি আর সম্ভব নয় সেদিন সাধারণ মুসলমানের মাঝে এ অনুভূতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শহীদ নজির প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে আবদুল গণি হাজারীর একটা উদ্ধৃতি না দিয়ে পারছি নাঃ
‘এখন নজিরকে শহীদ বলে অভিহিত করতে হলে অন্ততঃ দুটি বিষয় আমাদের স্পষ্টভাবে দেখতে হবেঃ একটি হচ্ছে যে আন্দোলনের সংগে নজির জড়িত ছিল, তাকে সত্যি জেহাদ বলা চলে কি না; আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে তার মৃত্যু ঠিক এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিল কিনা- এই জেহাদের অঙ্গীভূত ছিল কিনা। প্রথম প্রশ্নের জবাব এই ক্ষেত্রে না দিলেও চলবে। কেননা, পাকিস্তান আন্দোলন যে ভারতীয় মুসলিম জাতির-তথা ইসলামের অস্তিত্বকে ভারতে অক্ষুন্ন রাখবার একটি প্রচেষ্টা, সে বিষয়ে আজ আর কারও কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। ইসলামের ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক আদর্শকে ব্রিটিশ ও হিন্দুর লোলুপ গ্রাস থেকে বাঁচিয়ে ভারতে তাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবার প্রচেষ্টার অন্য নামই হচ্ছে পাকিস্তান আন্দোলন এবং এই আন্দোলনের পথে যে সব বাধা অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে, তাকে জয় করে অগ্রসর হবার চেষ্টাকে জেহাদ বলে অভিহিত করলে একটুও বেশী বলা হবে না। কাজেই দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান আন্দোলনকে জেহাদ বলায় এতটুকুও আতিশয্য হয় না। এই আন্দোলনের সঙ্গে নজির ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। পাকিস্তানই যে ছিল তার জীবনের ধ্যান ও ধারণা, ইসলামের অস্তিত্বকে সগৌরবে বজায় রাখবার চেষ্টাই যে ছিল জীবনের একমাত্র কর্ম, তা’তার জীবনের কথা থেকেই আমরা নিঃসন্দেহভাবে প্রমাণ করতে পারি।

শহীদ নজির কি ভাবতেন, তাঁর চিন্তা চেতনা কেমন ছিল ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেনের লেখায় আমরা তার পরিচয় পাইঃ
‘সেদিন ফিরবার পথে অনেক কথা হল ‘পাকিস্তান’ সম্পর্কে। নজির জিজ্ঞাসা করলেন, শেষ পর্যন্ত আমরা তাঁর সাহচর্যে কাজ করতে স্বীকৃত হব কিনা। বললাম, এ প্রশ্ন অত্যন্ত অহেতুক মনে হচ্ছে। এর উত্তরে নজির যে কথা বলেছিলেন, সে আমার আজও স্পষ্ট মনে পড়ছে। তিনি বলেছিলেন যে, পাকিস্তান কথাটিকে তিনি একটা রাজনৈতিক বুলি হিসেবে গ্রহণ করেননি। পাকিস্তান আনতে হলে একটা রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক বিপ্লবের প্রয়োজন হবে। আমরা মৌখিকভাবে ইসলামের আনুগত্য স্বীকার করলেও আমাদের সমাজনীতি ও অর্থনীতি দুটোই ইসলামী আদর্শ থেকে বিচ্যুতে হয়ে পড়েছে। ধনতন্ত্রবাদের সমর্থন কি ইসলামের কোথাও আছে? যদি সত্য সত্যই পাকিস্তানে আমাদের আস্থা থাকে, তবে এ বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। আমরা সে জন্য সত্যই প্রস্তুত হয়ে রয়েছি কি? তাঁর সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি। আজও পারবনা। কিন্তু একথা দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে পারি যে, নজিরের সে প্রশ্নের উত্তর যতদিন বাংলার তরুণ সমাজ দিতে না পারছে, ততদিন পাকিস্তানের স্বপ্ন অবাস্তব থেকে যাবে।’



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh