Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ১১ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

টাঙ্গাইলে জনসভা করার পর কাইয়ুম খান গেলেন মওলানা ভাসানীর সাথে দেখা করতে। আমিও তাঁর সাথে ছিলাম। মওলানার সেই টিনের ঘরে গিয়ে তিনি প্রায় পাঁচ ঘন্টা কাটান। আমি তখন মওলানার নির্মীয়মাণ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক রুমে বসে ছিলাম। তখন বেশ রাত নেমে এসেছিল। কাইয়ুম খান মওলানার কাছ থেকে ফিরে এসেই বললেন ইব্রাহিম মশার কামড়ে একেবারে শেষ হয়ে গিয়েছি। মওলানা ওয়ান ওয়ে ট্রাফিক। শুধু তাঁর কথা শুনতে হয়, বলার সুযোগ পাওয়া যায় খুব কম। এরপর আবদুল কাইয়ুম খান দেখলাম মওলানার বেশ তারিফ শুরু করলেন। বিশেষ করে তাঁর আধ্যাত্মিক কর্মকান্ডের কথা বলতে গিয়ে তিনি তাঁর প্রশংসা করলেন। বললেন মওলানা খুব দীনদার মানুষ। তারপর কাইয়ুম খান বললেন মওলানা যা বলেছেন তাতো সাংঘাতিক কথা। আমি বাঙ্গালী হলে এসব কথা জোরেশোরে বলতে পারতাম। আমি বললে সবাই ভুল বুঝবে। মওলানা বললেন, নির্বাচনে তিনি কেন যোগ দিচ্ছেন না। এতো সব সাজানো নাকট। আর্মির সাথে মুজিবের বোঝাপড়ার পরে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ষড়যন্ত্রের পিছনে মদদ যোগাচ্ছেন ভুট্টো। যদিও তিনি আমার খুব ঘনিষ্ঠ। ইন্ডিয়া আছে সুযোগের অপেক্ষায়। এই ভাগাভাগির নির্বাচনে যদি কোন উল্টাপাল্টা হয় তখন ইন্ডিয়া এগিয়ে আসবে। কাইয়ুম খানের কথাগুলো এখনও আমার কানে বাজে। সন্তোষের ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি যা বলেছিলেন তা শুধুমাত্র কয়েকদিনের মাথায় পাকিস্তানের উত্তাল রাজনৈতিক মঞ্চে অভিনীত হয়েছিল। কাইয়ুম খানের মত তেজোদ্দীপ্ত নেতাও মওলানার সাথে আলোচনার পর সেদিন আমার কাছে পাকিস্তানের ভবিষ্যতের ব্যাপারে শুধু হতাশাই ব্যক্ত করেছিলেন।

এরমধ্যে বাসায় একদিন আমার এক আত্মীয় নাদের হোসেন এল। সে ইপিআর-এ চাকরি করত। খাওয়া-দাওয়ার পর সে আমাকে বলল সব তো ঠিক হয়ে গেছে ভাই, কেন শুধু শুধু মুসলিম লীগ করছেন। পাকিস্তানের দালালী করে এখন আর কি হবে! আমরা তো ভিতরে ভিতরে সব প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি। প্রয়োজনে যুদ্ধ করে বেরিয়ে আসব।

আমি বললাম নাদের তুমি এসব কি বলছ? মানুষের কল্যাণের জন্য আমরা পাকিস্তান বানিয়েছিলাম। এখনও মুসলমানদের স্বার্থে রাজনীতি করছি। এই চাঁদ তারা-পতাকার জন্যে কত রক্ত ঝরেছে তাকি তোমরা জানো? আমি নাদেরকে আরও বললাম কায়েদে আযম, শেরে-ই-বাংলা, সোহরাওয়ার্দীরা পাকিস্তান বানিয়েছিলেন। তাঁদের মত নেতারা পশ্চিম পাকিস্তানীদের ষড়যন্ত্র ধরতে পারলেন না। ধরলেন গিয়ে তোর মুজিব। নাদের অবশ্য সেদিন আর কোন কথা বাড়ায়নি। কিন্তু ষড়যন্ত্রের গভীরতা টের পেলাম যখন মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণের পর পূর্ব পাকিস্তানের ইপিআর বাহিনীর সদস্যরা দল বেধে বিদ্রোহ করে বসল। শুধু তাই নয় পুলিশ ও আর্মির রিটায়ার্ড বাঙ্গালী সদস্যরাও একই ধুয়া তুলে বিদ্রোহ শুরু করল।

সর্বত্রই মুজিব তাঁর ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে ফেলেছিলেন। পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন চলছিল পরিকল্পিত এক ছক কায়েমের জন্য। নাদেরের কথাবার্তা কোন বিচ্ছিন্ন উপাখ্যান নয়, বাংলাদেশ হওয়ার পর ভারতীয় কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন ’৭০-এর নির্বাচনের আগে তারা মুজিবকে টাকা ও অন্যান্য বৈষয়িক সাহায্য দিয়েছেন। তখন পুরোপুরি বুঝতে পেরেছিলাম নাদেরের কথার তাৎপর্য।

নভেম্বর মাসের ঘটনাবহুল দিনগুলোতেই পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলে ঘটল স্মরণকালের ভয়াবহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এক সাইক্লোন। প্রাকৃতিক আক্রোশের কবলে পড়ে প্রায় ১০ লাখ বনি আদম প্রাণ হারায়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তখন চীন সফরে ছিলেন। তাই তাৎক্ষণিকভাবে তিনি উপদ্রুত অঞ্চলে পৌঁছতে পারেননি। মুজিবের আওয়ামী লীগ এটা নিয়ে বলাবলি শুরু করল কেউ বাঙ্গালীদের দেখতে আসেনি। উপদ্রুত অঞ্চলে গিয়ে মুজিব প্রচার করতে লাগলেন, আমার বাঙ্গালীদের এই দুর্দশার দিনে যারা পাশে এসে দাঁড়ায়নি তারা বাঙ্গালীদের শত্রু। অথচ আমি জানি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ব্যক্তিগতভাবে নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রশাসনকে উপদ্রুত অঞ্চলে ব্যাপকভাবে ত্রাণ তৎপরতা চালাতে। বিদেশ থেকে এত বিপুল সাহায্য এসেছিল যা কল্পনাই করা যায় না। প্রকৃতির রূদ্র রোষের বিরুদ্ধে মানুষ এমনি খুব অসহায়। তারপর আরম্ভ হল নজিরবিহীন একের পর এক ঝড়-বৃষ্টি। কিন্তু ’৭০-এর সাইক্লোনকে পুঁজি করে শেখ মুজিব মিথ্যাচারের যত রকমের কৌশল আছে সব ব্যবহার করলেন। তাঁর সব প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য একটাই ছিল, সে হল পশ্চিম পাকিস্তান।

পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে এত বিদ্বেষ ছড়ান হচ্ছিল যে ব্যক্তিগতভাবে আমি জানি পশ্চিম পাকিস্তানের সাধারণ জনগণের মধ্যে আমাদের সম্পর্কে তিলমাত্র বৈরীভাব ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানে বহু বাঙ্গালী স্থায়ীভাবে থেকে যেতে শুরু করেছিল। করাচীর বহু বাঙ্গালী পরিবারকে আমি ব্যক্তিগতভাবে জানতাম যারা সেখানেই স্থায়ীভাবে থেকে গিয়েছিল। এখনও প্রায় বিশ লাখ বাঙ্গালী গোলাম মোহাম্মদ ব্যারেজে বসবাস করছে। এরা নানা পেশায় নিয়োজিত। কখনও তাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানীরা টু শব্দটিও করেনি। বাংলাদেশ হওয়ার পর ১৯৯০ সালে আমি যখন রাষ্ট্রীয় অতিথী হিসেবে পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মীদের এক পুরষ্কার প্রদান অনুষ্ঠানে যোগদান করি, তখন করাচী লাহোর ও পিন্ডির ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে ছিলাম। লিফটম্যান, কুক, বেয়ারার সার্ভিস বয় অনেককেই দেখলাম বাঙ্গালী, জিজ্ঞাসা করলে বলল আমরা আর ফিরে যাইনি। আসলে এখন বোঝায় যায় না এরা বাঙ্গালী। মনে আছে ’৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের পর যখন লাহোরে যাই তখন আমাদের বাঙ্গালীদের নিয়ে ওখানকার লোকের কি উচ্ছাস। ভারতের সাথে যুদ্ধে বাঙ্গালীদের বীরত্বে তারা অবাক হয়ে গিয়েছিল। আমাদের প্রতি তাদের শ্রদ্ধাও বেড়ে গিয়েছিল অনেক গুণ। আমি যখন লাহোরের বিখ্যাত আনারকলি মার্কেটে যাই কেনাকাটার জন্য তখন ইস্ট পাকিস্তান থেকে এসেছি শুনে তাদের সে কি সমাদর! বিনা পয়সায় নানা ফল আমার হাতে তুলে দিল। হোটেলে খেতে গিয়েছি পয়সা নিল না। এমন কি কাপড়ের দোকানেও প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে আমার কাছে কাপড় বিক্রি করল।

লাহোরে ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ দেখতে গেলাম। আমার সাথে ক’জন বাঙ্গালী বন্ধু ছিলেন। মসজিদ দেখার পর মনে হলো এখানে না এলে লাহোর সফরই বৃথা যেত। কিন্তু সেখানে যে আরেকটি অবাক করা ঘটনা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল তা আগে ভাবতে পারিনি। মসজিদের সিঁড়িতে দু’জন লোক দেখলাম আমাদের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। এঁদের একজন শুভ্র কেশ আর অন্যজন মধ্যবয়সী। আমরা তাঁদের পাশ দিয়ে যাবার সময় শুভ্রকেশী ভদ্রলোক বিনয়ের সাথে আমাকে জিজ্ঞাস করলেন, ‘কিয়া আপলোগ মাশরেকি পাকিস্তানছে তশরিফ লায়ে হ্যায়?’ আমি বললাম, জ্বি হ্যাঁ, কিউ কই খাস বাত? ভদ্রলোক মনে হল একটু বিব্রত বোধ করলেন আমার কথায়। বললেন, ‘নেহি এইসি কই খাস বাত নেহি। লেকিন মাশরেকি পাকিস্তানী ভাইয়োছে মিলনে কো লিয়ে হাম দো রোজছে ইহা চক্কর লাগা রাহা হ্যায়। ইস জংমে আপ লোগোকা বাহাদুরি, জুরত, হিম্মত আওর আল্লাহ্কা রাহমে কোরবান হোনেকা জো জজবা দেখা হ্যায় উসকা কই মিসাল নেহি হ্যায়। হামারা দিলমে এক খায়েশ পয়দা হুয়া হ্যায় কে হাম আপনা মাশরেকি পাকিস্তানী ভাইয়োকো মেহমান বানায়ে। আল্লাহ্পাককে হুকুমছে আপ লোগ মিল গেয়ে।’

ওরা দু’জন আমাদের পেছনে এমনভাবে লাগল যে শেষ পর্যন্ত ওদের সাথে ওদের বাসায় যেতে হল। রীতিমত ভিআইপি ট্রিটমেন্ট। ওদের মেহমানদারীর কোন তুলনা হয় না। আজও যখন এসব কথা মনে হয় তখন এই বিনম্র দুই পশ্চিম পাকিস্তানী মুসলমান ভাইয়ের যে মহানুভবতা আমি নিজের চোখে দেখেছি তা কোন অর্থ কিংবা বৈষয়িক সুবিধার বিনিময়ে পাওয়া যেতে পারে না। পশ্চিম পাকিস্তানীদের এরকম ব্যবহারের ভুরি ভুরি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

লাহোরে বসেই শুনেছিলাম বাঙ্গালী সৈনিকদেও বীরত্বের কথা। ডিনামাইট বুকে বেঁধে শিয়ালকোটে ভারতীয় ট্যাংকের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা রক্ত দিয়ে পাকিস্তানের জমিন রক্ষা করেছিল সেদিন। আমি আজও আশ্চর্য হয়ে ভাবি মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বাঙ্গালীদের সেই আত্মত্যাগের ইতিহাস কি করে প্রতিহিংসা পরায়ণতায় পর্যবসিত হল।

১৯৬৫ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের সীমান্তে বাঙ্গালী সৈন্যরা যখন রক্ত দিচ্ছে তখন পশ্চিম পাকিস্তানীরা বাঙ্গালী বীরত্বকে নিজের বিজয় গাঁথা হিসেবে মেনে নিয়েছিল। ইতিহাসের পরিহাস, পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যরা যখন ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে শত্রুর বিরুদ্ধে রক্ত ঝরাতে শুরু করল তখন উল্টো ব্যাখ্যা দেয়া হতে থাকল। ’৬৫ সালের যুদ্ধের পর যখন ভারত দেখল সামনা সামনি যুদ্ধে পাকিস্তানকে কাবু করা যাবে না তখন তারা নিল চানক্যের পথ। ভাই ভাইয়ের মধ্যে বিরোধী উসকে দিয়ে তারা ইতিহাসের সুবর্ণ সুযোগ লুফে নিল।

নভেম্বরের প্রলয়ংকরী ঝড়ের পর পূর্ব পাকিস্তানের অনেক নেতাই নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। এঁদের মধ্যে মওলানা ভাসানী ছিলেন অন্যতম। সাইক্লোনের পর উপকূল অঞ্চলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের অবস্থাও ছিল না। কিন্তু মুজিব নির্বাচন পিছানোর ব্যাপারে মোটেই আগ্রহী ছিলেন না। তিনি একে ষড়যন্ত্র বলে রা রা করে উঠলেন। পাকিস্তানের সামরিক কর্তারা নির্বাচন পিছানোর গোপন সিদ্ধান্ত নিয়েও পরে সেখানে থেকে পিছিয়ে গেল। পরে শুনেছি এর পিছনে অনেক দুরভিসন্ধি কাজ করেছিল। মুজিবের সাথে ইয়াহিয়ার এই মর্মে একটা আঁতাত হয়েছিল নির্বাচনে জিতলে তিনি হবেন প্রধানমন্ত্রী আর ইয়াহিয়া প্রেসিডেন্টই থেকে যাবেন। মুজিব তাতে বাদ সাধবেন না। ক্ষমতার রাজনীতিতে কত বিচিত্র ও অদ্ভুত ঘটনা ঘটে তা ভেবেই পাওয়া যায় না। এই জন্যই দেখেছি পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সে সময় আর্মি যেন একটা গা ছাড়া ভাব দেখাতে শুরু করল। আমরা বলেছিলাম ভোট কেন্দ্রগুলোতে আর্মি দিতে। যাতে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা যায়। সামরিক প্রশাসন আমাদের কথায় আমল দেয়নি। যার ফলে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে ব্যাপক গুন্ডামী করেছে। ভোট কারচুপি করেছে। নির্বাচনের সময় বিরোধী দলগুলোর মিটিংএ হামলা করেছে। যেহেতু নির্বাচনের ফলাফলে আওয়ামী লীগ জিতেছিল এবং তখনকার রাজনৈতিক পরিবেশ হয়ে গিয়েছিল বিষাক্ত সে কারণে এ সব কথা চাপা পড়ে গিয়েছে। সাধারণ মানুষ শুধু এটুকুই বুঝতে পেরেছে। নির্বাচনের রায়ের পর কেন ক্ষমতা আওয়ামী লীগের হাতে হস্তান্তার করা হচ্ছে না। এ সময় ইয়াহিয়া খান নিজেই অনেকবার পূর্ব পাকিস্তানকে অধিকতর স্বায়ত্বশাসন দেয়ার কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগ এতকাল স্বায়ত্বশাসনের কথা বলত। দেশের মানুষ দেখল স্বয়ং প্রেসিডেন্টই যখন স্বায়ত্বশাসনের কথা বলছেন তখন আওয়ামী লীগের দোষ কি। ইয়াহিয়ার এ ধরণের ভূমিকা প্রকারান্তরে মুজিবের বিচ্ছিন্নতার দাবীকেই পুষ্ট করেছে মাত্র।

ডিসেম্বর মাসে নির্বাচন হল। আর্মির অদূরদর্শিতা ও মুজিবের ব্যাপারে সীমাহীন উদাসীন মনোভাব এবং ডানপন্থী দলগুলোর নজিরবিহীন অনৈক্যের মুখে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬০টি আসনের মধ্যে ১৫৮টিতেই জয় লাভ করল। বাকী দুটো আসনের একটিতে জিতেছিলেন নূরুল আমীন আর অন্যটিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের ভোটে জিতেছিলেন রাজা ত্রিদিব রায়।

পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। এই নির্বাচন ছিল অবিভক্ত পাকিস্তানের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতাই অবিভক্ত পাকিস্তানকে বিভক্তির দিকে ঠেলে দিল। নির্বাচনে জিতেই মুজিব ও ভুট্টো দু’জনেই তাঁদের গোপন পরিকল্পনা নিয়ে আগ্রসর হলেন। পশ্চিম পাকিস্তানে যেমন আওয়ামী লীগের কোন অস্তিত্ব ছিল না তেমনি পূর্ব পাকিস্তানেও পিপিপি কোন সমর্থন পায়নি। যার ফলে পূর্ব পাকিস্তানে বসে মুজিব ও পশ্চিম পাকিস্তানে বসে ভুট্টো ষড়যন্ত্র শুরু করলেন।

মুজিবের দাবী ছিল সামরিক আইন প্রত্যাহার করে অবিলম্বে ক্ষমতা তাঁর কাছে হস্তান্তর করা। ইয়াহিয়া মুজিবের সাথে তাঁর ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র বিষয়ে খোলাখুলি আলাপ করতে চেয়েছিলেন। এই ব্যাপারটি নিয়েই বাধল গোলযোগ। মুজিব বললেন সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে ইয়াহিয়ার উচিত তাঁর কাছে ক্ষমতা দিয়ে দেওয়া। শাসনতন্ত্র নিয়ে আলাপ করার ইয়াহিয়ার কোন এক্তিয়ার নেই। আপাতদৃষ্টিতে কথাটা সত্য হলেও এর মধ্যেই ছিল মুজিবের গোপন ইচ্ছা। ড. কামাল হোসেন প্রমুখকে দিয়ে তিনি একটা শাসনতন্ত্রের খসড়া তৈরী করে ফেলেছিলেন। এটা ছিল তাঁর গোপন স্বাধীন বাংলাদেশের পরিকল্পনার ভিত্তিতে প্রণীত যার মানে অবিভক্ত পাকিস্তানের দাফন-কাফন সম্পন্ন করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ওদিকে ভুট্টো আরও এক পা এগিয়ে দুটো কনস্টিটিউয়েন্ট এ্যাসেম্বলীর কথা ঘোষণা করলেন। দু’জন প্রধানমন্ত্রীর কথাও বললেন। যার মানে পাকিস্তান দ্বিখন্ডিত হয়ে যাওয়া।

মুজিব ও ভুট্টো দু’জনের কেউই পাকিস্তানের সংহতি কামনা করেননি। দু’জনেই আপাতদৃষ্টিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন গরীবের বন্ধু ও ত্রাতা হিসেবে। মূলতঃ এরা ছিলেন মীর জাফর। নির্বাচনের পর পরই একদিন আমি আবুল হাশিমের বাসায় বসা। হঠাৎ দেখি মুজিব ও জহিরুদ্দীন হাশিম সাহেবের সাথে দেখা করতে এসেছেন। বোধ হয় নির্বাচনে জিতে সৌজন্য সাক্ষাত করতে এসেছিলেন তাঁরা।

হাশিম সাহেব চোখে দেখতেন না। মুজিবের গলার আওয়াজ পেয়েই তিনি বললেন মুজিব তুমি এসেছ। আমি খুব খুশী হয়েছি।
পাকিস্তান আন্দোলনের সময় মুজিব হাশিম সাহেবের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে এসেছিলেন। সোহরাওয়ার্দী সাহেবের পর তিনি তাঁকেই গুরু হিসেবে মানতেন। হাশিম সাহেবকে তিনি সব সময় স্যার স্যার বলে ডাকতেন। হাশিম সাহেব বললেন মুজিব আমি শুনেছি কাইয়ুম ও দৌলতানার মুসলিম লীগ তোমাকে ভুট্টোর বিরুদ্ধে সমর্থন দিতে রাজি হয়েছে। খেলার মাঠে ভাল দল কখনও মারামারি করে না। তুমিতো ভাল খেলেছো এবং সামনেও ভাল খেলবে আশা করি। তোমার প্রতি আমার অনুরোধ তুমি কোন প্রোভোকোশনে যাবে না। আমি দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছি। আমি জানি তোমাকে অসৎ পরামর্শ দেয়ার লোকের অভাব নেই, আশা করি সেটা থেকে তুমি দূরে থাকবে। তুমি তো জান আমি এখানে এসেছি সর্বহারা মুহাজির হয়ে। পশ্চিমবঙ্গে আমার সবই ছিল। ওখানে আমি থাকতে পারিনি। আমার আত্মীয়-স্বজনরাও ওখানে অনেকে আছে। যতদূর জানি তাদের অবস্থা ভাল না। তুমি নিজেও পাকিস্তান আন্দোলন করেছ। হয়ত পাকিস্তান পেয়েও আমাদের অনেকের অনেক স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। তা সত্ত্বেও এ দেশ আমরাই তৈরী করেছি। আমাদের সকলের প্রচেষ্টায় এটা আরও সুন্দর হবে।

আবু হাশিম মুহাম্মদ (সাঃ)-এর একটা বাণী শুনালেন, দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। তোমরা পাকিস্তানের কোন ক্ষতি করো না।
আমার মনে পড়ছে মুজিব যতক্ষণ ছিলেন তিনি প্রায় নীরব ছিলেন। হাশিম সাহেবের কথার কোন প্রতিবাদ বা বিরোধিতা করেন নি। তবে এসব উপদেশ শোনার মত তাঁর কোন অবস্থা ছিল বলে মনে হয় না।

দিন যত যেতে লাগল মুজিবের আচরণ তত জঙ্গী হয়ে উঠতে লাগল। একদিকে তিনি ইয়াহিয়ার সাথে বারগেনিং করছেন অন্যদিকে তাঁর লোকজন কুচকাওয়াজ করছে, সশস্ত্র ট্রেনিং নিচ্ছে, আওয়ামী লীগের তরুণ কর্মীরা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তৈরী করছে। এসব কিন্তু চলেছে মুজিবের প্রশ্রয়ে ও ইন্ধনে। ২রা মার্চ ইউনিভার্সিটিতে নোয়াখালীর আ স ম রব, স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তুলল। ইউনিভার্সিটিতে সে রাজনীতি করতে করতে বড় নেতা হয়ে ওঠে।

এই সার্বিক অব্যবস্থা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ৩রা মার্চ ’৭১ সালে ইয়াহিয়া ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করেছিলেন। সে অধিবেশনের পরিপ্রেক্ষিতে ভুট্টো ডিগবাজী দিলেন। তিনি অধিবেশন স্থাগিত করে দিলেন। পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা ভুট্টো। পরিষদ সদস্যদের এই মর্মে হুঁশিয়ার করলেন, যে ঢাকার অধিবেশনে যোগ দেবে তার পা ভেঙ্গে দেয়া হবে। তিনি বলেছিলেন অধিবেশন ডেকে কোন লাভ নেই। এমন কি তা যদি পাকিস্তানের স্বার্থের বিরুদ্ধেও যায়। আপাতদৃষ্টিতে ভুট্টোর কথায় যুক্তি ছিল কিন্তু তাঁর প্রাণপণ চেষ্টা ছিল মুজিব যাতে কোনভাবেই ক্ষমতায় যেতে না পারেন। ভুট্টো পাকিস্তানের তরক্কির জন্য এ দাবী করেননি। তাঁকে ইন্ধন যুগিয়েছিল সামরিক বাহিনীর কিছু উচ্চাভিলাষী জেনারেল। মুজিব আর ভুট্টো কেউ কাউকে বিশ্বাস করতেন না। দু’জন একে অপরকে অবিশ্বাস করতেন।
ভুট্টোর চাপে ইয়াহিয়া পরিষদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। ইয়াহিয়ার এই সিদ্ধান্তই পূর্ব পাকিস্তানে আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
ইয়াহিয়া তখন বাঘের পিঠে সওয়ার। তিনি না পারছিলেন ভুট্টোকে খুশী করতে না পারছিলেন মুজিবের দাবী মানতে। কারও দাবীই মানার মত ছিল না। কেননা তাঁদের যে কারও দাবী মানতে গেলেই অবিভক্ত পাকিস্তান থাকত না। ইয়াহিয়া মুজিবের সাথে পরামর্শ করে পরিষদের অধিবেশন দিয়েছিলেন। কিন্তু মুজিব রাজপথে এসে তাঁর সুর পাল্টে ফেললেন। তিনি আবার তাঁর স্বভাবসুলভ মিথ্যাচার করে বললেন এটা বাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। তিনি তাঁর কর্মীদের আইন ভাঙ্গার জন্য উসকে দিতে শুরু করলেন।

এরমধ্যে একদিন সবুর সাহেব মুজিবকে টেলিফোন করে তাঁর ধানমন্ডির বাসায় নিয়ে আসেন। আমি তখন সেখানে উপস্থিত ছিলাম। সবুর সাহেব বললেন, মুজিব তোমার সাথে পরামর্শ করেইতো ইয়াহিয়া অধিবেশনের দিন পিছিয়েছেন। এখন তুমি কেন এটাকে পুঁজি করে অরাজকতা সৃষ্টি করছ? তুমি ইয়াহিয়ার সাথে কোন ভাষায় কথা বলেছিলে? বাংলা, ইংরেজী না উর্দুতে? মুজিব এসব প্রশ্নের সরাসরি কোন উত্তর দিলেন না। তিনি দেখলাম এক অস্পস্টতার মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখলেন।

৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে মুজিব উত্তেজনা সৃষ্টিকারী এক ভাষণ দিলেন। মুজিবের ভাষণের মধ্যে রাজনীতিসূলভ তেমন কোন বক্তব্য ছিল না। যা ছিল তা উত্তেজনা ও বিশৃঙ্খলার বারূদে আগুন জ্বালাবার জন্য যথেষ্ট। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা এই ভাষণকেই স্বাধীনতার ভাষণ বলে চালিয়েছিল। এই ভাষণের পর দেখলাম আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতার দাবীতে জ্বালাও পোড়াও শুরু করল। অনেক জায়গায় আর্মির সাথে তারা রীতিমত সশস্ত্র লড়াইয়ে অবতীর্ণ হল। পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এ সময় আওয়ামী লীগের টার্গেটে পরিণত হল। একদিন শুনতে পেলাম আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীরা ঢাকার আর্মসের দোকানগুলো লুট করে নিয়ে গেছে। বুঝতে বাকী থাকল না এসব কিছুর জন্য দায়ী হচ্ছে আওয়ামী লীগ। শাহবাগে হাসান আসকারী, সুলতানুদ্দীনের (সাবেক গভর্ণর) মত মুসলিম লীগ নেতাদের বাসায় আওয়ামী কর্মীরা আগুন লাগিয়ে সব কিছু লুট করে নিয়ে যায়।

আমার মনে পড়ছে টঙ্গী ও গাজীপুরে বিনা উস্কানীতেই সশস্ত্র আওয়ামী লীগ কর্মীরা আর্মির উপর হামলা চালিয়েছিল। আর্মির পাল্টা হামলায় কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত হয়। পরবর্তীকালে গাজীপুরের আওয়ামী লীগ কর্মীরা একে স্বাধীনতার যুদ্ধ বলে দাবী করে এবং গাজীপুর চৌরাস্তার কেন্দ্রস্থলে এই ঘটনার স্মরণে একটা মূর্তি নির্মাণ করে। একেই বলা হয়ে থাকে মুক্তিযুদ্ধ ভাস্কর্য।

আর একটা আশ্চর্যের ব্যাপার আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীরা যেন পরিকল্পিতভাবেই অবাঙ্গালী মুসলমান ভাইদের উপর এ সময় হামলা শুরু করল। তাদের বাড়ী ঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনাগুলো যেন বেছে বেছে আওয়ামী লীগের ক্যাডার কর্মীদের আক্রমণের বস্তু হয়ে দাঁড়াল। এ সবের উদ্দেশ্য একটা বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। খুলনার খালিশপুর, যশোরের ঝুমঝুমপুর, রংপুরের সৈয়দপুরের মত এলাকায় বিহারীরা অধিক সংখ্যায় বাস করত, তাদের উপর নির্বিচারে আওয়ামী লীগ গণহত্যা চালিয়েছিল। এমনকি ময়মনসিংহে মসজিদে আশ্রয় নেয়া বিহারীদের উপর গিয়ে চড়াও হয়েছে আওয়ামী সন্ত্রাসীরা। চাটগাঁয়ে রেল স্টেশনের নিকটবর্তী রেস্ট হাউসে নিয়ে বিহারীদের যেভাবে জবাই করা হয়েছে তা শুনে আমি পরবর্তীকালে হতবাক হয়ে গিয়েছি। শুধু তাই নয়, বিহারী মেয়েদের উপর চালান হয়েছে পাশবিক নির্যাতন। এগুলো ২৫শে মার্চ রাতে আর্মি ক্র্যাক ডাউনের বেশ আগের ঘটনা।

মার্চ মাসের এই অরাজক দিনগুলোতে ইয়াহিয়া ঢাকায় এলেন মুবিজের সাথে শেষ বোঝাপড়া করতে। পূর্ব পাকিস্তানে অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে এটা ছিল তাঁর শেষ সফর। সারা পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে তখন চলছে হরতাল, মিছিল আর অসহযোগ। বেসামরিক প্রশাসন বলতে কিছু ছিল না। পুলিশ আর ইপিআর সদস্যরা ছিল সবাই বাঙ্গালী। দেশের সর্বত্র গোপনে আওয়ামী ক্যাডাররা সশস্ত্রভাবে ঘোরাফেরা করতে লাগল, পাশাপাশি তারা বিভ্রান্ত তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করল। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যে বাংলাদেশ তৈরী হবে তার প্রস্তুতি তখনই শুরু হয়ে গিয়েছিল। ইয়াহিয়া মুজিবের সাথে ১৬ থেকে ২৪শে মার্চ পর্যন্ত আলাপ-আলোচনা চালিয়েছিলেন। এ আলোচনায় ইয়াহিয়া মুজিবকে সব রকমের ছাড় দিয়ে শুধু অখন্ড পাকিস্তান অক্ষত রাখতে চেয়েছিলেন। ছয় দফার দাবীগুলোও ইয়াহিয়া মেনে নিতে রাজী হয়েছিলেন।

ইয়াহিয়া পাকিস্তান ভাঙ্গতে চাননি তবে মুজিবের দাবীর প্রতি ছিলেন সহানুভুতিশীল। মুজিব গোপনে পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্র করেছিলেন এটা আজ ঐতিহাসিক সত্য। কিন্তু প্রকাশ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেয়ার মত মানসিক শক্তি তাঁর ছিল না। ফলে ইয়াহিয়ার সাথে আলোচনার প্রথম দিকে মুজিব আপাতদৃষ্টিতে হলেও একটা রফা করতে চেয়েছিলেন সেটা ছিল এরকমঃ মুজিব হবেন প্রধানমন্ত্রী। ভুট্টো হবেন উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ৫ জন করে মন্ত্রীসভার সদস্য থাকবেন। পাকিস্তানের আপদকালীন সময়ে পাকিস্তানের অখন্ডতা রক্ষাকারী এর চেয়ে উত্তম কোন ফর্মূলা হতে পারত বলে আমার মনে হয় না। এরকম একটা আপোস ফর্মুলা নিয়ে যখন মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা এগুচ্ছিল তখন আওয়ামী লীগের হার্ড লাইনার নেতারা বাদ সেধে বসলেন। এদের মধ্যে তাজউদ্দীন ছিলেন অন্যতম। তিনি আমার ছোট ভাইয়ের সাথে লেখাপড়া করতেন।

পাকিস্তান আন্দোলনের সময় ঢাকায় তিনি আমার সাথে কাজ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি হয়ে যান ভারতপন্থী। এমনই ভারতপন্থী তিনি হয়ে গিয়েছিলেন যে বাংলাদেশ হওয়ার পর মুজিবের মত মানুষও তাঁর ভারতপ্রীতির জন্য বিরক্ত হয়ে মন্ত্রীসভা থেকে তাঁকে সরিয়ে দেন।
আলোচনা চলাকালে এই তাজুদ্দীন ও তাঁর সহযোগীদের চাপে মুজিব হঠাৎ করেই একদিন (২১শে মার্চ) ইয়াহিয়ার সাথে এক অনির্ধারিত বৈঠকে মিলিত হন। এ সময় তাঁর সাথে তাজউদ্দীনও ছিলেন। তাঁরা ইয়াহিয়াকে সোজাসুজি জানিয়ে দেন আওয়ামী লীগ এখন আর কোন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার ধারণায় বিশ্বাসী নয়। তাঁরা চান পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে ভিন্ন ভিন্নভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক। এর মানে হচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়া। এইভাবেই মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা ব্যর্থ হয়ে যায়।

এ আলোচনার পুরো বিষয়বস্তু নিয়ে আজ দেশের মধ্যে এক ধরণের বিভ্রান্তি রয়েছে। যারা বলে থাকেন আর্মি মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি বলেই পাকিস্তান ভেঙ্গে গিয়েছে-এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা। আর্মি ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চেয়েছিল। অন্যদিকে মুজিব পাকিস্তান ভাঙ্গতে চেয়েছিলেন। এরকম একটা অবস্থায় যাঁরা অখন্ড পাকিস্তান দেখতে চেয়েছিলেন তাঁরা কোনক্রমেই মুজিবের দাবী মেনে নিতে পারতেন না।
আমার মনে আছে ২৩শে মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস। এ দিনেই ফজলুল হক ১৯৪০ সালে লাহোরের মুসলিম লীগ সম্মেলনের উদ্বোধন করেন। তিনি মুসলমানদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের জন্য লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলেন। তখন কাইয়ুম খান ঢাকায়। উনি উঠেছিলেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে, আমি তাঁর সাথে দেখা করতে গেলাম। চারদিকে আর্মি সশস্ত্র অবস্থায় পাহারা দিচ্ছে। কাইয়ুম খান আমাকে নিয়ে হোটেলের ছাদে উঠে ঢাকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আক্ষেপের সাথে বললেন দেখো ইব্রাহিম আজ পাকিস্তান দিবস। একটাও পাকিস্তানের চাঁদ তারা পতাকা দেখছ? বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলাম হ্যা, তাঁর কথাই সত্যি।

পরের দিন ২৪শে মার্চ যখন কাইয়ুম খান চলে যান তখন আমি প্রথম জানতে পারি আর্মিকে বিদ্রোহ দমনে নামানোর সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।
কাইয়ুম খান চলে যাওয়ার আগে আমাকে বললেন মুজিবকে এত করে বুঝালাম পাকিস্তানের কোন ক্ষতি করো না। তিনি একেবারে বেপরোয়া, আমাদের কথায় সাড়া দিলেন না। তারপর আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন ইব্রাহীম আর ঢাকায় আসতে পারব কিনা জানি না। তোমাদের সাথে আর কখনও দেখা হবে কিনা বলতে পারছি না। তোমাদের আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়ে গেলাম।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh