Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ১৩ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

রুহুল আমিন নিজামী ছিলেন আমার খুবই ঘনিষ্ঠ বন্ধু। পাকিস্তান আন্দোলনের সময় তাঁর সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। তাঁর বাড়ী ছিল চাটগাঁর মীরেশ্বরাই। ঢাকায় তিনি স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স ও ঝিনুক পুস্তিকা নামে দুটো বড় পুস্তক প্রকাশনীর মালিক ছিলেন।

নিজামী পাকিস্তান আন্দোলনের সময় চাটগাঁর ফজলুল কাদের চৌধুরীর সাথে বহু কাজ করেছেন। তিনি আমাদের মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। পরে তিনি লাল হয়ে যান। মানে কমিউনিস্ট চিন্তা ভাবনার দিকে ঝুঁকে পড়েন।

আমার মনে আছে ১৯৫০ সালের শেষের দিকে আমি যখন কৃষি দফতরে কাজ করছি তখন আমাকে ঢাকা থেকে বদলী করে একবার চাটগাঁয়ে পাঠানো হয়। আমি চাটগাঁয়ে যেয়ে প্রথমে উঠি নিজামীর কাছে। নিজামী ও কয়েকজন মিলে চাটগাঁ শহরের লাভলেনে একটা বাড়ীতে মেস করে থাকেন। সেই মেসে অন্য অনেকের সঙ্গে আমিও ছিলাম।

নিজামীর সাথে থাকবার সময়ই লক্ষ্য করি মূলত কমিউনিস্ট পার্টির কাজ কর্ম চলে সেখানে। মাঝে মাঝে কর্মীদের জন্য মার্কসবাদের ক্লাস নেওয়া হতো। দেখতাম নিজামীর ভারত ও রাশিয়া থেকে আনা কিছু ফিল্ম স্থানীয় সিনেমা মালিকদের সাথে বিশেষ ব্যবস্থায় চাটগাঁর ছবিঘরগুলোতে দেখানো হতো। মূলত মার্কসবাদের প্রচারই ছিল এসব প্রদর্শনের লক্ষ্য।

আমি লক্ষ্য করলাম নিজামী আর আগের মত নেই। তিনি পুরোপুরি কমিউনিজমের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। এই মেস থেকেই সেকালে নিজামী মাসিক উদয়ন নামে একটা সিনেমা পত্রিকা চালাতেন।

আমাদের চাটগাঁ সার্কেলের কৃষি অফিসের পরিচালক ছিলেন আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী। তিনি ছিলেন সিলেটের মুসলিম লীগ নেতা আবুল মতিন চৌধুরীর ছোট ভাই। মুয়ীদ ছিলেন অত্যন্ত পরহেজগার ব্যক্তি। তাঁর ছিল আবার তাবলীগ জামাতের প্রতি আগ্রহ। তিনি যখন কোথাও যেতেন যিকির করতে করতে যেতেন। আমাকে সাথে পেলে তিনি আমাকেও যিকির করতে নির্দেশ দিতেন। তিনি আমাকে কয়েকবার তাবলীগ জামাতের চিল্লায় নিয়ে গেছেন।

রাতে কমিউনিস্টদের গোপন আস্তানায় কাটানো, দিনে তাবলীগ জামাতের লোকদের সাথে উঠাবসা এবং চাকরী করা, সেই তরুণ বয়সে আমার জন্য কষ্টকর হত। এরমধ্যে একদিন চাটগাঁর উপর দিয়ে বড় এক ঝড় বয়ে গেল। ঝড়টা হয়েছিল বিকেলের দিকে। খুব কালো মেঘ করে ঝড়টা এসেছিল মনে আছে। আমি তখন নিজামীর মেসের দোতলায় বসে আছি। চারদিকে মেঘের গুড়ুম গুড়ুম আওয়াজ আর বজ্রবিদ্যুতের ঘনঘটা। এর মধ্যে শুনলাম কে যেন নাম ধরে ডাকছেঃ ইব্রাহিম, দেখে যাও মধুবালা আমাদের পত্রিকায় চিঠি লিখেছেন আর তাঁর ছবি পাঠিয়েছেন। মধুবালা ছিলেন সেকালের বিখ্যাত নায়িকা। আমি ডাক শুনে যখন তাড়াতাড়ি নীচে নেমে এসেছি, অমনি ঝড়ের তান্ডবে নিজামীর মেসের উপর তলার ছাদ বিরাট শব্দ করে ভেঙ্গে পড়ল। আর সামান্য একটু দেরি হলেই আমার জীবন বিপন্ন হতে পারত। আশ্চর্যের ব্যাপার এত বড় ঝড় হয়ে গেল অথচ লাভলেন ও তার আশেপাশের কোন বাড়ীই সেদিন ক্ষতিগ্রস্থ হয়নি। শুধু নিজামীর মেসটা ছাড়া। ঝড় শেষ হলে বাড়ীটার চার পাশে অনেক লোক জমায়েত হল। দেখলাম তারা বলাবলি করছে কমিউনিস্টদের উপর আল্লাহর গজব নাজিল হয়েছে। নইলে অন্য কোথাও ক্ষতি হল না কেন! আমি পরদিন সেই ভাঙ্গাবাড়ীর স্তূপ থেকে সামান্য জিনিসপত্র উদ্ধার করে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় গিয়ে উঠি। কিছুদিন পর আমি অবশ্য চাকরী ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় ফিরে আসি। নিজামীর সাথে আমার সম্পর্ক তখনকার মত ছিন্ন হয়ে যায়। একদিন শুনলাম তিনি ইন্ডিয়া চলে গেছেন। তিনি কেন গেলেন কি জন্য গেলেন কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে আন্দাজ করেছিলাম তিনি তাঁর বামপন্থী রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট কোন কাজের সূত্র ধরে ইন্ডিয়া যেতে পারেন। বেশ কিছুদিন এভাবে চলে গেল। প্রায় বছর তিনেক হবে। একদিন হঠাৎ দেখি ভারত থেকে এসে আমার কাছে উপস্থিত। আমি তখন জি ঘোষ লেনের উল্টো দিকে কারকুনবাড়ী লেনে মুসলিম লীগের কর্মীদের নিয়ে একটা নাইট স্কুল খুলেছিলাম। অনেক শ্রমজীবী মেহনতী মানুষ এই স্কুলে ভর্তি হয়েছিল। কারকুনবাড়ী লেনের প্রখ্যাত তিলের তেলের ব্যবসায়ী জি ঘোষের বাড়ীর একটা অংশ ছিল এটি। নিজামীর কোন থাকার জায়গা ছিল না, তাঁকে সেই স্কুলে থাকার ব্যবস্থা করে দিলাম।

সারাদিন তিনি বাইরে থাকতেন। রাতে সেখানে এসে শুয়ে থাকতেন। কি করতেন কিছুই বুঝতে পারতাম না। শুনলাম নিজামী প্রকাশনার লাইনে জড়িত হয়ে কাজ করার চেষ্টা করছেন। মাঝে মাঝে ক্লাবে তাঁর সাথে গুটিকয় অপরিচিত লোকের আনাগোনা দেখতাম। কিন্তু কিছুই ধরতে পারতাম না। একদিন দেখলাম তিনি বাহাদুর শাহ পার্কের উল্টো দিকে এখন যেখানে কো-অপারেটিভ ব্যাংক বিল্ডিং তার তিন তলা ভাড়া নিয়ে স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স খুলে বসেছেন। তবে তাঁর কোন প্রেস ছিল না। তাঁর কাজ ছিল শুধু ভারতীয় হিন্দু সাহিত্যিকদের বই-পত্র ছাপিয়ে বাজারজাত করা। তার পাশাপাশি তিনি পূর্ব পাকিস্তানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সব ধরনের বইয়ের এজেন্সী নিয়ে নিলেন। বলতে গেলে ভারতীয় ও রুশ বইয়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বাজার সয়লাব করে ফেললেন। এছাড়া কলকাতা থেকে প্রকাশিত বেতার জগৎ পত্রিকারও এজেন্ট ছিলেন নিজামী। অনেকেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করতেন ভারতীয় লেখকদের কোন অনুমোদন ছাড়াই কিভাবে তিনি বই প্রকাশ করেন? তিনি কোন রকম দ্বিরুক্তি না করেই বলতেন সব বইয়ের কপিরাইট আমি কিনে নিয়েছি। প্রকৃতপক্ষে সেটা ছিল সর্বৈব মিথ্যা। নিজামী ভারতে থাকাকালে দাদাদের পরামর্শ অনুযায়ীই এ জাতীয় ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মূলত পাকিস্তানের মুসলিম সংস্কৃতির বুনিয়াদকে বরবাদ করে দেওয়ার গোপন পরিকল্পনা নিয়েই ভারত থেকে ফিরে এসেছিলেন নিজামী।

আমি মুসলিম লীগ করতাম এ কথা তিনি ভাল করেই জানতেন। তবু তিনি আমার সাথে সম্পর্ক বরাবরের মত উষ্ণ রেখেছিলেন। আমার ধারণা আমার মত লোকের সাহায্য নিয়ে পাকিস্তান বিরোধী কাজ চালানো যত সহজ হত হয়ত অন্যভাবে সেটা সম্ভব হত না।

নিজামী যখন কো-অপারেটিভ বিল্ডিংয়ে তাঁর স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের অফিস করেন তখন তাঁর অফিসে আমার জন্য একটা রুম ছেড়ে দেন। রুমটা আমি ভাড়া নিয়েছিলাম আমার ব্যবসায়িক কাজ চালানোর জন্য। কাকতালীয়ভাবে হলেও আমরা দু’জন দুমেরুর লোক হওয়া সত্ত্বেও পাশাপাশি দিন কাটাচ্ছিলাম শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে। আমি লক্ষ্য করেছিলাম ভারতীয় বই প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল না। আর সে বইগুলো এত সস্তায় বাজারজাত করতেন যে অন্য কোন প্রকাশকের পক্ষে তা করা মোটেও সম্ভব হত না। আমার এখন মনে হয় রীতিমত ভারতীয় সাবসিডি পেতেন তিনি।

একদিন তাঁকে বললামঃ নিজামী তুই তো ভারতীয় বই-এ দেশটা শেষ করে দিচ্ছিস। তুই তো কিছু ইসলামী বই বের করতে পারিস। তিনি আমার কথায় রাজী হলেন।

মওলানা আকরাম খাঁর কোরআনের বাংলা তরজমা ছাড়াও স্বল্পমূল্যে নামাজ শিক্ষাও অবশেষে তিনি বের করলেন। আসলে এগুলো ছিল তাঁর আইওয়াশ। তাঁর গোপন কাজকর্ম চালিয়ে যাবার জন্য এগুলো সাইন বোর্ডের মত কাজ করেছিল। এরপর তিনি স্টেডিয়াম মার্কেটে স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের জন্য বিরাট এক বিক্রয় কেন্দ্র খুলে বসলেন। খোলার আগে আমাকে বললেন, ইব্রাহিম তুই যদি সবুর সাহেবকে দিকে দোকানের উদ্বোধনটা করিয়ে দিতে পারিস তাহলে খুব ভাল হয়। সবুর সাহেব আমার অনেক কথাই শুনতেন। আমার অনুরোধে তিনি স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের দোকান উদ্বোধন করেন। সবুর সাহেব তখন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নেতা ও যোগাযোগ মন্ত্রী।

এর কিছুদিন পর ঘটল বিপত্তি। পাকিস্তান ইন্টেলিজেন্স-এর কাছে সব খবর পৌঁছেছিল। নিজামীর দেশ বিরোধী চক্রান্তের কথা তারা যেন কি করে জেনে ফেলেছিল। মোহন মিয়া সাহেবের বড় ভাই আবদুল্লাহ জহিরুদ্দিন লাল মিয়া তখন কেন্দ্রের শিক্ষামন্ত্রী। ইন্টেলিজেন্স বোধ হয় তাঁকে সব কথা বলেছিল। তিনি ঢাকায় এসে খুব কড়া একটি স্ট্যান্ড নেন। তাঁর নির্দেশে নিজামীর সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয় এবং সে সময় প্রায় ৫ লক্ষ টাকার বই সরকার সিজ করে।

নিজামী কি করে যেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে হাত করে পূর্ব পাকিস্তানের সব রেলওয়ে স্টেশনের বুক স্টলগুলো লিজ নিয়েছিলেন। সেখানেও তিনি মার্কস, লেনিনের বই বিক্রি করতেন।

পূর্ব পাকিস্তানের কয়েক জায়গায় স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের বড় বড় শাখা ছিল। লাল মিয়া নির্দেশ দিয়েছিলেন নিজামীর যেখানে যা আছে সব বাজেয়াফত করার। এরপর তাঁকে সরকার গ্রেফতার করে। পরে বহুদিন দরবার করে আমি তাঁকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনি। সরকারী পদক্ষেপের ফলে নিজামী সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। বাকীতে অনেক বই ছাপানোর কারণে অনেক টাকা দেনা হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। প্রেসের দেনায় আর বাইন্ডারের তাগাদার ভয়ে তিনি পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতেন।

আমার কাছে একদিন তিনি এসে বললেন ইব্রাহিম আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। আমার আর কোন উপায় নেই। জানতাম তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কাজ করছেন। ভারতীয় ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের জন্য এদেশে তিনি ছিলেন এক শক্ত শিখন্ডি। তারপরেও অবচেতন ভাবেই তাঁর প্রতি আমি কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়তাম। আমাদের বন্ধুত্বটা এত শক্ত ছিল যে তাঁর দুর্দিনে তাঁর উপকার করা যায় কিনা সেই ভেবে আমি নিজামীকে নিয়ে ইসলামাবাদ গেলাম জহিরুদ্দিন লাল মিয়ার সাথে দেখা করতে। তাঁর দফতরে ঢুকতেই তিনি আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে বললেন ইব্রাহিম তোমার সম্পর্কে ঢাকায় এসব কি শুনে আসলাম। তুমি আমাদের মুসলিম লীগের এত বড় ওয়ার্কার, তুমি নাকি নিজামীকে প্রোটেকশন দিচ্ছ? কোথায় সে ভারতীয় স্পাই রুহুল আমীন নিজামী-সে পাকিস্তানের কত বড় সর্বনাশ করেছে সেকি তুমি জান? মুসলিম কালচারটা শেষ করার জন্য সে এত বড় ফাঁদ পেতেছে।

নিজামী তখন আমার পাশে বসা ছিলেন। আমি বললাম, জহির ভাই, আমি এসব কিছু জানি না। তিনি আমাকে বলেছেন সস্তা দামে বই লোকে বেশ খাচ্ছে। লাল মিয়া যেন ফুঁসে উঠলেন আমার কথায়। সস্তা দামে বই খাচ্ছে। সে বেতার জগৎ পত্রিকার ভারতের সোল এজেন্ট। ইন্ডিয়ায় তার দোকান আছে, ইন্ডিয়া থেকেই সে সব টাকা পয়সা পায়। সে শুধু পূর্ব পাকিস্তানে নয় পশ্চিম পাকিস্তানেও স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের শাখা খুলেছে। সর্বত্রই বিস্তার করছে ষড়যন্ত্রের জাল।

আমি তখন জানতাম না নিজামী পশ্চিম পাকিস্তানেও তাঁর শ্যেন দৃষ্টি দিয়েছেন। আমি লাল মিয়ার দৃঢ়তার সামনে তেমন কিছু বলতে পারলাম না। শুধু বললাম ইসলামাবাদে অন্য কাজে এসেছিলাম, ভাবলাম আপনার সাথে দেখা করেই যাই। এক পর্যায়ে লাল মিয়া নিজামীর দিকে লক্ষ্য করে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন ভদ্রলোক কে? আমি বললাম উনি আমার বন্ধু। পশ্চিম পাকিস্তানেই ব্যবসা করেন। লাল মিয়া নিজামীকে চিনতেন না। আমি যদি নিজামীর সত্যিকার পরিচয় দিতাম তাহলে হয়ত লাল মিয়া তখুনি নিজামীকে জেলে পুরতেন।

আসবার সময় লাল মিয়া আমাকে বললেন, বুঝলে ইব্রাহিম, আমি যত দিন আছি নিজামীকে আমি ছাড়ব না। সে পাকিস্তানের দুশমন।
নিজামীর উপকারের জন্য আমি লাল মিয়ার কাছে গিয়েছিলাম। তাঁর জীবন বাঁচাবার জন্যও এবার বশীরের সামনে কৌশলী ভূমিকা নিতে হল আমাকে। বশীরের ওখান থেকে ফেরার পর আমার বাসার জানালা দিয়ে তাঁকে বললাম নিজামী তোকে মেরে ফেলবে। তুই তাড়াতাড়ি সরে পড়। নিজামী তখন আমার বাসার পাশেই থাকতেন।

ওয়ারীতে আমার গলির পরের গলি ওয়ার স্ট্রীটে লায়লা মঞ্জিল বলে একটা বাড়ী ছিল। ঐ বাড়ীতে থাকতেন চিত্র পরিচালক সুভাষ দত্ত। ২৫শে মার্চের ক্রাকডাউনের পর তিনি চলে যান অন্যত্র। বাড়ীটার মালিক ছিলেন এক এসপি। তিনি তখন বরিশালে। তাঁর ছেলেকে বললাম তোমাদের বাড়ীটাতো ফাঁকা। আমার এক বন্ধু বিপদে পড়েছেন তাঁকে একটু থাকতে দাও। তারা কোন আপত্তি করলনা। সন্ধ্যার মধ্যে নিজামী তাঁর বৌ ছেলেমেয়েসহ ঐ বাড়ীতে চলে গেলেন। কিন্তু নিজামীর ভাগ্য আদৌ প্রসন্ন ছিল না।

আমার মনে হয় আর্মির লোকজন আগে থেকেই এ পাড়ায় ঘোরাঘুরি করছিল। নিজামী যে বাড়ীতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তা তারা সময় মত জেনে গিয়েছিল। রাত ১২টার দিকে নিজামীর বৌ পাশের এক বাড়ী থেকে আমার কাছে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে টেলিফোন করে জানালেন আপনার বন্ধুকে আর্মি উঠিয়ে নিয়ে গেছে। এখন কি হবে? ঐ রাতে আমি তখন কি করব, অনেকটা হতবুদ্ধি হয়ে যাওয়ার মত অবস্থা। এডভোকেট আবু সালেক আমার পাড়াতেই থাকতেন। আমি তাঁকে নিয়ে রাত দেড়টার দিকে বের হলাম। তখন জগন্নাথ কলেজে আর্মি একটা ক্যাম্প করেছিল। এই ক্যাম্পের চার্জে ছিলেন মেজর নাসিম। নাসিমকে আমি আগে থেকেই চিনতাম।

আমরা দু’জন এত রাতে আর্মি ক্যাম্পে যাওয়ায় সবাই হতবাক। আমাদের হাতে কারফিউ পাস ছিল। মেজর নাসিম তখন ছিলেন না। এক সেপাইকে জিজ্ঞাসা করলাম নাসিম সাহেব কোথায়? তাঁর সাথে আমাদের জরুরী কথা আছে। সে বলল কিছু আসামী নিয়ে সদরঘাটে নদীর পাড়ে গেছেন? আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। নিজামী এতক্ষণ আছেত?

গিয়ে দেখি নদীর পাড়ে তাঁর অচেতন দেহ ফেলে রাখা হয়েছে। মনে হয় পানির মধ্যে তাঁকে ভাল করে চুবানো হয়েছিল স্বীকারোক্তি আদায় করার জন্য। দেখলাম নাক মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। আর্মি তাঁকে মেরে ফেলার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিল। আর কিছুক্ষণ পরে গেলেই হয়ত তাঁকে গুলি করে নদীতে ভাসিয়ে দিত।

আমি নাসিমকে বললাম ওকে তো মেরেই ফেলেছেন। ওরতো আর কিছু নেই। ও আমার আত্মীয়। ওকে আমার কাছে দিয়ে দিন। বশীরকে বলবেন নিজামীকে মেরে ভাসিয়ে দিয়েছি।

আমার কাকুতি মিনতিতে নাসিম নিজামীকে ফেরত দিয়ে দিলেন। কিন্তু আসবার সময় বললেন দেখো আমাকে বিপদে ফেল না। নিজামী একটা ইন্ডিয়ান স্পাই, ওকে শুধু তোমার কথায় ছেড়ে দিলাম।

আমি বললাম, নাসিম তোমার কোন অসুবিধা হবে না। তুমি নিশ্চিত থাকো। আমি তাঁকে এদেশেই রাখব না। তারপর আমি আর সালেক নিজামীকে কোন রকম ধরাধরি করে ওয়ারীতে আমার বাসায় নিয়ে এলাম। আমাদের পাড়ায় এক ডাক্তার থাকতেন। সেই রাতে তাঁকে ডেকে নিয়ে এলাম। নিজামীকে তিনি ভাল করে দেখে বললেন আঘাত এত গুরুতর নয়। ভাল হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।

আমরা সারারাত ধরে তাঁকে নার্সিং করলাম। পেট আর বুক চেপে তাঁর ভিতরের পানি বের করলাম। ভোরবেলা দেখি তিনি চোখ মেললেন। আমি সেইদিনই তাঁকে পিআইএর ফ্লাইটে করাচী পাঠিয়ে দিলাম। সঙ্গে তাঁর ভাই গিয়েছিল। করাচীতে তিনি কয়েকদিন ছিলেন। ওখান থেকে তিনি লন্ডন চলে যান।

এর কিছুদিন পর তিনি দেখি লন্ডন থেকে আমার কাছে এক চিঠি লিখেছেন। অনেক কথার মধ্যে চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, লন্ডনে এসে তিনি যা দেখেছেন এবং বাংলাদেশ পন্থীদের কথায় যা বুঝেছেন তাতে তিনি নিশ্চিত পাকিস্তান টিকবে না। তিনি লিখেছিলেন, তুই সরে পড়, না হলে আমার চেয়েও তোর খারাপ পরিণতি হবে।

বাংলাদেশ হওয়ার পর নিজামী ঢাকায় ফিরে আসেন। আমি তখন জেলে। তিনি সস্ত্রীক বেশ কয়েকবার কারাগারে আমার সাথে দেখা করেছিলেন। প্রতিবারেই নিয়ে আসতেন পর্যাপ্ত খাবার ও দামী সিগারেট। আমি জেলে থাকতেই আমার মেয়ে লায়লা খায়রুন্নাহার ম্যাট্রিক পরীক্ষায় খুব ভাল ফল করে। এই খবর শুনেও নিজামী অনেক মিষ্টি নিয়ে আমার সাথে জেলে দেখা করতে আসেন।

নিজামীর জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাথে আমি জড়িত ছিলাম। তাঁর জীবনের অনেক ওঠানামার সাথেও আমি একাকার হয়ে মিশে গিয়েছিলাম। নিজামী ১৯৮৬ সালে মারা যান। তাঁর ব্রেন টিউমার হয়েছিল। চিকিৎসার জন্য কমিউনিস্টরা তাঁকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিল। কিন্তু তেমন কোন অগ্রগতি হয়নি। তাঁর মৃত্যুর পর কাকতালীয়ভাবে আমি তাঁকে দেখতে গিয়েছিলাম। তাঁর কমিউনিস্ট বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কাঠ দিয়ে বানানো এক কফিন বক্সে ঢুকিয়ে মাটি চাপা দিয়ে রাখবে। সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্টরা মারা গেলে যেমনভাবে শেষকৃত্য করা হয়। অনেক টাকা দিয়ে তাঁর বন্ধুরা সেগুন কাঠের এক কফিন বানিয়েছিল। এ ব্যবস্থা মনপুত না হওয়ায় তাঁর কয়েকজন আত্মীয় আমাকে এসে ধরল এই বলে যে, তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন ভাল কথা। তাই বলে তাঁর জানাযাটাও হবে না? এমন হতেই পারে না। আমি তাড়াতাড়ি করে চলে গেলাম বনানী গোরস্থানে। ওখানেই তাঁরা নিজামীকে মাটি চাপা দিবার আয়োজন করছিলেন।

আমি তাঁদেরকে বললাম, নিজামী আমার বহুকালের পুরনো বন্ধু। তাঁর জানাযা ছাড়া বনানীতে আমি তাঁর লাশ দাফন করতে দেবো না। তাঁর অনেক কমিউনিস্ট বন্ধুই আমাকে চিনতেন। তাঁরা আমার কথায় থতমত খেয়ে গেলেন। অনেকে ভাবলেন এ আবার কোথা থেকে এল?
চাপের মুখে তাঁরা আমার কথা শুনতে বাধ্য হলেন। আমি এক মওলানা সাহেবকে ডেকে নিয়ে এলাম। তিনি তার জানাযা পড়ালেন এবং ইসলামী কায়দায় তাঁকে অবশেষে দাফন করা হল। এভাবেই নিজামীর মৃত্যুতেও আমি তাঁর সাথে একাত্ম হয়ে রইলাম।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh