Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ১৪ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

সবুর সাহেব যেদিন লোকমানের জন্য জেনারেল আকবরের সাথে দেখা করেন তার কয়েকদিন পর তিনি আমাকে নিয়ে আবার আর্মি ইন্টেলিজেন্সের মেজর জেনারেল আকবরের সাথে দেখা করলেন। আমাদের সাথে ছিলেন শাহ আজিজুর রহমান ও খাজা খায়রুদ্দীন। আর্মি শাহ সাহেবের বাসায় হামলা করেছিল। এর একটা কারণ ছিল ৩রা মার্চ জাতীয় পরিষদের  অধিবেশন ইয়াহিয়া স্থগিত করলে হাইকোর্টের আইনজাীবীরা তার প্রতিবাদে এক দীর্ঘ মিছিল করে। সেই মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন শাহ সাহেব। শাহ সাহেব এটা কেন করেছিলেন আজও আমি তা বলতে পারব না। আমার অনেক আইনজীবী বন্ধুকে এখনও প্রশ্ন করতে শুনি শাহ সাহেব এটা কেন করেছিলেন? এতে পাকিস্তানের কি ফায়দা হয়েছিল? শাহ সাহেব কি তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাতারাতি হিরো বনবার চেষ্টা করেছিলেন না গণতান্ত্রিক রাজনীতির খাতিরে করেছিলেন তা এখনও একটা রহস্য হয়ে আছে। কিন্তু একথা স্বীকার করতেই হবে সেদিন তাঁর ভূমিকা মুজিবের হাতকেই শক্তিশালী করেছিল মাত্র। আর্মি শাহ সাহেবের এই ভূমিকা লক্ষ্য করে থাকবে। তাঁর এই কার্যকলাপের জন্য আর্মি একদিন রাত দেড়টার সময় তাঁর বাড়ী আক্রমণ করে। তিনি তখন সচিবালয়ের উল্টোদিকে এস এন বাকের নামে এক ব্যবসায়ীর বাড়ীতে ভাড়া থাকতেন। আর্মি গোলাগুলি শুরু করলে শাহ সাহেবের গাড়ীর ড্রাইভার এবং বাড়ীর ভৃত্য গুলিতে নিহত হয়। তিনি বাড়ির পিছন দরজা দিয়ে কোনক্রমে নিজের জীবন হাতে নিয়ে বেরিয়ে এসে বাড়ীওয়ালার বাড়ীতে উঠেন। বাকেরই তাঁকে নিয়ে সবুর সাহেবের বাসায় যান। বাকের সবুরের ঘনিষ্ঠ লোক ছিলেন।

আমরা সবাই মিলে মেজর জেনারেল আকবরের সাথে দেখা করলাম। সবুর সাহেব শাহ সাহেবকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বললেন, আর্মি ওঁর বাড়িতে হামলা করেছে। ওতো আমাদের লোক। এরপর শাহ সাহেব নিজেই আকবরের সাথে আলাপ জমিয়ে ফেললেন। পাকিস্তান আন্দোলনে কি কি করেছিলেন, জিন্নাহ সাহেবের মিটিংয়ে তিনি সভাপতিত্ব করেছিলেন, এসবের একটা ফিরিস্তিও দিলেন। অবশেষে শাহ সাহেব বললেন, সবুর সাহেব ও খায়রুদ্দীন সাহেব আমাকে জানেন। তাঁদের থেকেও আমার সম্পর্কে জানতে পারেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমি কাজ করতে যাব কেন? পাকিস্তান আমি নিজ হাতে গড়েছি। আমার সম্পর্কে বোধ হয় আপনাদের একটা ভুল বুঝাবুঝি হয়ে গেছে। পাকিস্তানের কল্যাণে আমি সবকিছু করতে রাজী।

মেজর আকবর শাহ সাহেবের কথায় খুশীই হলেন বোধ হয়। তিনি তখন তাঁকে বললেন, Go and stay at your home. এরপর অবশ্য শাহ সাহেবের আর কোন অসুবিধা হয়নি। পরে সরকার তাঁকে জাতিসংঘে পাঠিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা নিয়ে কথা বলবার জন্য। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন হামিদুল হক চৌধুরী।

আর্মি এখন পাকিস্তান বিরোধী লোকদের খুঁজে খুঁজে বের করছে। এরমধ্যে খবর পেলাম ঢাকা ইউনিভার্সিটির বাংলার প্রফেসার আহমদ শরীফকে আর্মি খুঁজছে। আহমদ শরীফ ছিলেন আমার অনেকদিনের পরিচিত। তাঁর বড় ভাই উকিল আহমদ সোবহান ছিলেন আমার বন্ধু। সোবহান আমাদের সাথে পাকিস্তান আন্দোলনের সময় মুসলিম লীগের কর্মী ছিলেন এবং পরবর্তীকালে অনেকের ভাবনায় রূপান্তর ঘটলেও সোবহান পুরোপুরি পাকিস্তানের আদর্শে অটুট রয়ে যান। বাংলাদেশ হওয়ার পর মুজিব যখন বেরুবাড়ী ভারতের হাতে তুলে দেন তখন সোবহান হাইকোর্টে এর বিরুদ্ধে কেস করে দিয়েছিলেন।

ঘটনাক্রমে আহমদ শরীফ পরবর্তীকালে আমার আত্মীয় হয়ে যান। এ আত্মীয় হওয়ার পিছনে একটা ছোট মজার গল্প আছে। আমার চেয়ে বয়সে ছোট আমার এক খালাত ভাই ছিল। নাম সাদত হোসেন চৌধুরী। সাদত ছিল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইংরেজীর শিক্ষক। তার চেহারা ছিল খুব সুন্দর। ঢাকা এলে সে আমার বাসায় উঠত। একবার ঢাকায় এলে দেখলাম তাঁর মুখে একটা ফোঁড়া তাই তাকে নিয়ে মিটফোর্ড হাসপাতালে যেতে হল। যেই না হাসপাতালের গেটের সামনে গিয়েছি অমনি আমাদের রিকশার সাথে অন্য একটা রিকশার ধাক্কা লগল। তাতে সাদত নীচে পড়ে যায়। সাদতের দুর্ভাগ্য, পড়ে গিয়ে তার আঘাতটা লাগে ফোঁড়ার উপর। ফলে প্রচন্ড ব্যথা পায়। ফোঁড়া ফেটে পুঁজ ও রক্ত একসাথে বের হতে থাকে। আমি তাড়াতাড়ি তাকে ধরে নিয়ে হাসপাতালের উল্টো দিকে আমার পরিচিত ডা. আব্দুল্লাহর চেম্বারে যাই।

হাসপাতালে আর আমাদের যাওয়া হয়নি। ডা. আব্দুল্লাহ সাদতের ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে ওষুধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দেন। কিন্তু সে ডা. আব্দুল্লাহর নজরে পড়ে যায়। আব্দুল্লাহ আমাকে জিজ্ঞাসা করেন এই সুন্দর ছেলেটি আপনার কি হয়? আমি বললাম আমার খালাতো ভাই। তিনি যখন শুনলেন সে অবিবাহিত তখন চটজলদি সাদতের জন্য একটা বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে দেন। আব্দুল্লাহর বোনের জামাই ছিলেন আহমদ শরীফ। আব্দুল্লাহর অবিবাহিত দুই বোন ছিল। এরা আহমদ শরীফের আরমানিটোলার বাসায় থেকে ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া করত। এদের মধ্যে যে বড় তার জন্য আব্দুল্লাহ পাত্র খুঁজছিল। আব্দুল্লাহর বড় ভাই ছিল বাফার মাহমুদ নুরুল হুদা। পরে আমি আমার স্ত্রীসহ আহমদ শরীফের বাসায় তাঁর শালীকে দেখতে গিয়েছিলাম। সাদতের বিয়ে সেখানেই হয়েছিল। আহমদ শরীফের আর এক ভায়রা উকিল আহমুদের রহমান থাকতেন আমাদের পাড়ায় ওয়ার স্ট্রিটে। চিত্র নায়ক মাহমুদ কলি আহমেদুর রহমানের ছেলে।

আর্মি ক্র্যাকডাউনের পর আহমদ শরীফ তাঁর ভায়রা আহমেদুর রহমানের বাসায় এসে ওঠেন। ডা. আব্দুল্লাহর  ছোট ভাই হঠাৎ টেলিফোন করে বললেন ইব্রাহিম ভাই আহমদ শরীফকে তো আর্মি খুঁজছে। তাঁর ইউনিভার্সিটির বাসায় আর্মি হানা দিয়েছে। আপনাদের সাথে তো আর্মির যোগাযোগ আছে। ওনার জন্য কিছু একটা করেন। না হলে ওঁর জীবন বিপন্ন হতে পারে।

আহমদ শরীফ ছিলেন নাস্তিক। আল্লাহ্-রাসুল কোন কিছুই বিশ্বাস করতেন না। ইউনিভার্সিটিতে তিনি উল্টাপাল্টা বক্তব্য দিয়ে ছাত্রদের বিভ্রান্ত করতেন বলে জানতাম। ইসলাম আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষোভটা ছিল সবচেয়ে বেশী। এরকম একটা লোক পাকিস্তানের জন্য বিপদজনক হতে বাধ্য।

আদর্শের দিক দিয়ে বিন্দুমাত্র মিল ছিল না তাঁর সাথে আমার। কিন্তু একটা লোকের ক্ষতি হতে পারে সেটা আমি কখনও মেনে নিতে পারিনি।
আমি তখনই আহমদ শরীফকে নিয়ে আব্দুল্লাহর ছোট ভাইকে আমার বাসায় আসতে বললাম। আহমদ শরীফ আমার বাসায় এলেন। তাঁকে খুব বিপর্যস্ত দেখাচ্ছিল। তিনি আমাকে বললেন ইব্রাহিম আর্মিতো আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। ইউনিভার্সিটিতে আমার বাসায় রেড করেছে। আমি এখন কি করি বলুন? আমার তো পালানোরও তেমন জায়গা নেই। আপনাদের অনেক যোগাযোগ আছে। যদি একটা কিছু করতে পারেন আমার জন্য। আমি তাঁকে বললাম আত্মীয় হিসেবে আপনার জন্য যতটুকু করার দরকার তা অবশ্যই করব। কিন্তু আপনার নীতি ও আদর্শ আমাদের কারও পছন্দ নয়। আপনার বড় ভাই একজন ঈমানদার মুসলমান। আপনার আব্বাকেও আমি জানতাম। আপনাদের পুরো পরিবারের কেউই এরকম নয়। খামোখা কেন আপনি এভাবে ঈমানদার মানুষের মনে ব্যথা দেন।

আহমদ শরীফ তখন বললেন, এ সব কথা কে আপনাকে বলেছে? আমার বিরুদ্ধে কে এসব রটনা করে? আমি কেন আল্লাহর বিরুদ্ধে যাব? আমি তো তাঁর কথা শুনে অবাক। বললাম পত্র পত্রিকায় তো এসব দেখি। আহমদ শরীফ তাঁর বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করলেন।
আমি জানিনা তিনি জান বাঁচানোর জন্য এসব বলেছিলেন কিনা। তবে লক্ষ্য করলাম মৃত্যু ভয় কেমন করে একজন নিষ্ঠাবান নাস্তিককে বিচলিত করে। আমি তাকে বললাম আল্লাহ রহমত থাকলে আর্মি আপনাকে কিছুই করতে পারবে না। আর্মির সাথে দেন-দরবার নিয়ে আমি কয়েকবার সবুর সাহেবকে বিরক্ত করেছিলাম আহমদ শরীফের ব্যাপারে। তাই এবার ফরিদ আহমদের সাথে যোগাযোগ করি। টেলিফোনে পুরো ব্যাপারটি অবহিত করতেই তিনি আমাকে বললেন শরীফকে আমার কাছে নিয়ে এসো। কোন অসুবিধা হবে না। শরীফের বড় ভাই আহমদ সোবহান ছিলেন মৌলভী ফরিদ আহমদের পূর্ব পরিচিত। শরীফের ব্যাপারে তাই তাঁর আন্তরিকতার অভাব হল না। মৌলভী ফরিদ আহমদের কাছে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে তিনি বললেন প্রফেসর সাহেব আপনার কোন চিন্তা নেই। নাস্তিক্যবাদী বিশ্বাস ছাড়া আপনার অনেক কিছুই আমার পছন্দ। আপনি কেন আল্লাহর সাথে শত্রুতা করেন? এই বিপদে আল্লাহ ছাড়া আপনাকে আর কেউ বাঁচাতে পারবে না। তারপর ফরিদ আহমদ অনর্গল উর্দু আর ইংরেজীতে আর্মির কারও সাথে ফোনে কথা বললেন। বোধ হয় ব্রিগেডিয়ার বশীরই হবেন। তিনি আর্মির কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়েছিলেন তারা শরীফের বিরুদ্ধে কোন এ্যাকশনে যাবে না এবং তাঁর ইউনিভার্সিটি গমনাগমনে কোন বাঁধা দেবে না। শরীফও মৌলভী ফরিদ আহমদকে আশ্বস্ত করলেন তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোন কথা বলবেন না বা কোন কাজে অংশ নিবেন না।

মৌলভী ফরিদ আহমদ আমাকে আর আহমদ শরীফকে নিয়ে ইউনিভার্সিটির বাংলা ডিপার্টমেন্টে গেলেন। সেখানে প্রফেসর মুনীর চৌধুরী, ড. কাজী দীন মোহাম্মদ ও ড. নীলিমা ইব্রাহিম বসা ছিলেন। তাঁরা তখন নিয়মিত ইউনিভার্সিটিতে আসা-যাওয়া করতেন। ক্লাসও নিচ্ছেন। মৌলভী ফরিদ আহমদ আসছেন শুনে সেখানে এ্যারাবিক ডিপার্টমেন্টের ড. মুস্তাফিজুর রহমান ও হিস্ট্রির ড. মোহর আলীসহ আরও অনেক প্রফেসর এলেন। তিনি তাঁদের সবাইকে বললেন আপনাদের কোন অসুবিধা নেই। কোন প্রয়োজন বোধ করলেই আমাকে জানাবেন। পাকিস্তানের স্বার্থে আপনারা ইউনিভার্সিটি চালু রাখুন। আহমদ শরীফ সম্বন্ধে তিনি বললেন, তাঁর ব্যাপারে আমি পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে আর্মির সাথে কথা বলেছি। ইনশাআল্লাহ তাঁর কোন অসুবিধা হবে না। তিনি এখন থেকে আপনাদের সাথেই থাকবেন। উল্লেখ্য, পরবর্তীকালে আহমদ শরীফ তাঁর লেখা একটা বই আমার নামে উৎসর্গ করেছিলেন। মৌলভী ফরিদ আহমদ এসময় যে কত অসংখ্য মানুষকে আর্মির হাত থেকে উদ্ধার করে এনেছেন তার লেখাজোখা নেই। তাছাড়া এমনিতে তিনি ছিলেন মহৎপ্রাণ রাজনীতিবিদ। মানুষের উপকার করা তাঁর অভ্যাসে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।
ইউনিভার্সিটিতে তিনি যখন ছাত্র তখন থেকেই তিনি বাগ্মী ও ভাল এ্যাথলেট হিসেবে নাম করে ফেলেছিলেন।

পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন জানবাজ সৈনিক। পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি নেজামে ইসলাম পার্টির টিকেটে কয়েকবার জাতীয় পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। চুন্দ্রীগড়ের ক্যাবিনেটেও জনশক্তি মন্ত্রী ছিলেন। তিনি পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবেও অসাধারণ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। একবার হল কি ফজলুর রহমান জোয়ার্দার নামে আমার এক পরিচিত শিল্পপতিকে আর্মি তাঁর ভাই ও দুই ছেলেসহ ধরে নিয়ে গেল। তাঁর বাড়ী ছিল কুষ্টিয়ায়। তিনি থাকতেন ঢাকা কলেজের কাছে আমার এক বোনের বাড়ীর পাশে। নওয়াবপুর রোডে তাঁর একটা মার্কেট ছিল। সেই মার্কেটের এক অংশ আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা ’৭০-এর নির্বাচনের সময় দখল করে নির্বাচনী ক্যাম্প বানায়। আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের মাস্তানীর সামনে জোয়ার্দার সাহেব কিছুই বলতে পারেননি। আর্মি এই জিনিসটা লক্ষ্য করেছিল। তাদের ধারণা হয়েছিল আওয়ামী লীগ অফিস করার জন্য যে দোকান ছেড়ে দেয় সে নিশ্চয় বড় আওয়ামী লীগার। কিন্তু আর্মি ভিতরের খবর জানত না। আর তাছাড়া আর্মি যে তথ্যের উপর জোয়ার্দারকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল তাও পুরোপুরি সঠিক ছিল না।

জোয়ার্দারের পাশের বাড়ী থেকে আমার বোন আমাকে টেলিফোন করে সব জানাল। আমার বোন গাড়ীতে করে জোয়ার্দারের স্ত্রীকে নিয়ে আমার কাছে হাজির হল।

আমি এর মধ্যে হেকিম ইরতেজাউর রহমানকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিলাম।
আমার বোন আর হেকিম সাহেবকে নিয়ে গাড়ীতে করে আবার মৌলভী ফরিদ আহমদের কাছে হাজির হলাম। তাঁকে বললাম সর্বনাশ হয়ে গেছে, জোয়ার্দার আমাদের লোক। তাঁর মার্কেটকে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা জোর করে অফিস বানিয়েছিল। এই অপরাধে তাঁকে, তাঁর ছেলে ও তাঁর ভাইকে নিয়ে গেছে। ফরিদ ভাই আপনি কিছু একটা করুন।

তাড়াতাড়ি করে তিনি ব্রিগেডিয়ার বশীরের কাছে টেলিফোন করলেন আর বললেন আমি এক্ষুণি আসছি। মৌলভী ফরিদ আহমদ আমাদের সবাইকে নিয়ে ব্রিগেডিয়ার বশীরের কাছে গেলেন। তিনি প্রায় কৈফিয়তের স্বরে তাঁকে বললেন তোমরা যদি এভাবে নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে আসো তাহলে আমরা পাকিস্তান বাঁচাবো কি করে? তোমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যারা কাজ করছে তাদেরকে নিয়ে যা খুশি তাই করো। আমরা কিছু বলব না। তাঁর মার্কেট আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা দখল করেছে তাদের তোমরা কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারনি। তোমরা ধরে নিয়ে এসেছ নির্দোষ মালিককে। একজনের অপরাধে কি আর একজনকে শাস্তি দেয়া যায়?

ফরিদ আহমদের কথাবার্তায় সেখানকার যত আর্মি অফিসার ছিলেন সবাই প্রায় জড়ো হয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ছোটখাটো বক্তৃতা দেখলাম দারুণ কাজ করল। সেদিন রাত ১১টার দিকে আর্মি জোয়ার্দারসহ সকলকে ছেড়ে দিলে আমরা তাদের নিয়ে চলে এলাম। মৌলভী ফরিদ আহমদ সেই রাত পর্যন্ত আমাদের সাথে ছিলেন। মৌলভী ফরিদ আহমদের জনহিতৈষনার সামুদ্রিক ব্যপ্তির মধ্যে এ হচ্ছে দু একটা ছোটখাটো ফোটা মাত্র। বাংলাদেশ হওয়ার পর পাকিস্তানীপন্থী হিসেবে মৌলভী ফরিদ আহমদকে হত্যার মধ্যে দিয়ে এ জাতি একজন মহৎ সন্তানের সেবা থেকে বঞ্চিত হল।

২৫শে মার্চ রাতে আর্মি যত লোক না মেরেছিল তার চেয়ে বিভীষিকা সৃষ্টি করেছিল অনেক বেশী। আমার মনে হয় তারা প্রাথমিকভাবে একটা ভীতি সৃষ্টি করে  বাংলাদেশপন্থীদের মনে তাদের আন্দোলনের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে শংকা সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। ওয়ারীতে আমার জানা মত কোন লোক মারা যায়নি। পুরাতন ঢাকার দক্ষিণ মৈষুন্ডি, নারিন্দা, রোকনপুর, কলতা বাজার, রায় সাহেব বাজার, লক্ষ্মী বাজার, ফরাশগঞ্জ, গেন্ডারিয়া, ফরিদাবাদ, ধুপখোলা, বংশাল, নাজিরা বাজার, নয়াবাজার, ইসলামপুর, পাটুয়াটুলী, বাবুবাজার, চকবাজার, নওয়াবগঞ্জ, পুরো লালবাগ থানা এলাকায় কোন লোক মারা যায়নি। এমনকি কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি। গোপীবাগে ৩জন, স্টেডিয়াম হল ঘরে এবং নিকটবর্তী ক্লাব সমূহে ৭/৮জন মারা গিয়েছিল। ৩০জনের মত মারা গিয়েছিল বলে আমি খবর পেয়েছিলাম। আর কিছু লোক মারা গিয়েছিল ইউনিভার্সিটি এলাকায়। কিছু পিলখানার ইপিআর ও রাজারবাগের পুলিশ হতাহত হয়েছিল। তারা অবশ্য আর্মির বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল।
২৫শে মার্চের পর আওয়ামী লীগ নেতারা তাদের পূর্ব পারিকল্পনা মাফিক ভারতে পাড়ি দিতে শুরু করেন। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ও বিএসফ-এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তাঁরা ভারত পৌঁছেছিলেন। এ ব্যাপারে বিএসএফ-এর গোলকনাথ বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। আওয়ামী লীগ নেতারা ভারতে গিয়েই সংগঠিত হতে শুরু করেন। তাজুদ্দীন, কামরুজ্জামান ইন্দিরা গান্ধীর সাথে কথা বলেছিলেন। তাঁরা বলেন ইন্দিরা গান্ধীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার গঠিত হয়। ২৫শে মার্চে ক্র্যাকডাউনের পর মাত্র দুসপ্তাহের মধ্যে কাজ শুরু হয়। এত অল্প সময়ে সংগঠিত হয়ে সরকার গঠন ও স্বাধীনতা যুদ্ধ করা পৃথিবীর ইতিহাসে খুবই বিরল। ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানেও দীর্ঘস্থায়ী স্বাধীনতার যুদ্ধ হয়েছে। কিন্তু এত দ্রুততার সাথে প্রবাসী সরকার তারা গঠন করতে পারেনি।

একাত্তর পরবর্তীতে পাকিস্তানপন্থী বিবেচনায় নিজ হাতে নিজের বাপ-চাচা-খালু-ফুপা এবং ভাইকে হত্যা করেছে অনেকে। এ রকম উদাহরণ আমি ভুরি ভুরি দিতে পারি। আমাদের নোয়াখালীর ফুলগাজী থানার মুসলিম লীগ সভাপতিকেও নিকট জনেরা হত্যা করে।

নোয়াখালীর রামগঞ্জ থানার রোস্তম আলী নামে এক গেরিলা নিজ হাতে গুলি করে হত্যা করে তার ফুপাকে। তাঁর দোষ ছিল তিনি মুসলিম লীগ করতেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর আমি যখন ঢাকা জেল থেকে নোয়াখালী জেলে স্থানান্তরিত হয়েছিলাম তখন এই রোস্তম আলীর সাথে আমার পরিচয় হয়। বাংলাদেশ হওয়ার পর রোস্তম তার থানায় এত লুটতরাজ চালিয়েছিল যে আওয়ামী লীগের জামানায়ও প্রশাসন তাকে জেলে পাঠাতে বাধ্য হয়। জেলের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের সংস্পর্শে এসে তাদের চিন্তা ভাবনায় বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। সে পরে দাড়িও রেখেছিল। শুনেছি সে এখন জামায়াতের বিশিষ্ট কর্মী। ২৫ তারিখের তিনদিন পর আমার মনে আছে নরসিংদীর মুসলিম লীগের সভাপতি মিয়া আব্দুল মজিদ এলেন আমার বাসায় দেখা করতে। তিনি ২৫ তারিখের ঘটনার মধ্যে ঢাকায় আটকা পড়েছিলেন। আমি তাঁকে বললাম তুমি আরও দু’তিন দিন ঢাকায় থেকে যাও। দেশের অবস্থা তো ভাল না। তিনি আমার কথা না শুনে একরকম জোর করে নরসিংদী চলে গেলেন। পরে শুনেছি ঐ রাতেই আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীরা গুলি করে তাঁকে হত্যা করে।

একই রাতে নরসিংদী মুসলিম লীগের জয়েন্ট সেক্রেটারী আব্দুল কুদ্দুসের বাড়ী ঘেরাও করে ওরা। পাশের বাড়ীতে থাকতেন তাঁর ভগ্নিপতি। তিনিও মুসলিম লীগের কর্মী ছিলেন। তাঁকেও তারা হত্যা করে।

২৮শে মার্চ দিবাগত রাতে নারায়ণগঞ্জ মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীকে তাঁর বাসায় সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা হত্যা করে। মোহাম্মদ আলী ছিলেন বাংলাদেশ মুসলিম লীগের এক নিবেদিত প্রাণ কর্মী। প্রায় একই সময় মুন্সীগঞ্জের মুসলিম লীগের ভাইস প্রেসিডেন্ট খলিল শিকদার ও জয়েন্ট সেক্রেটারী দুদু মিয়াকে হত্যা করে সেসব লোক। খলিল শিকদারের বাড়ী প্রথমে লুটপাট করা হয়, তাঁর গোলা থেকে ধান নিয়ে যাওয়া হয়, অবশেষে তাঁর বন্দুক দিয়েই তাঁকে হত্যা করা হয়।

এ রকম উদাহরণ অনেক দেওয়া যেতে পারে। ২৫শে মার্চের অব্যবহিত আগে এবং ২৫শে মার্চের পর আর্মি ক্র্যাকডাউনের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানপন্থীদের উপর হত্যাযজ্ঞ ও নিপীড়ন নেমে এসেছিল। ২৫শে মার্চের পর আর্মি যখন বগুড়া শহরে ঢোকে তখন একটা বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটে। বগুড়া মুসলিম লীগের তখন সভাপতি ছিলেন ফজলুল বারী। বারী সাহেব মোনায়েম খানের সময় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী হয়েছিলেন। তাঁর বাড়ীর সামনে রাস্তা থেকে আওয়ামী লীগের কর্মীরা আর্মির উদ্দেশ্যে গুলি ছুঁড়ে। আর্মি তাদের ধাওয়া করলে তারা বারী সাহেবের বাসায় গিয়ে ওঠে।

আর্মি তাদের খুঁজতে গিয়ে বারীর বাসায় হামলা করে। শুনেছি, বারী সাহেব বাড়ীর বাইরে এসে আর্মির কাছে নিজের পরিচয় পর্যন্ত দিয়েছিলেন। আর্মি তাঁর কথায় কর্ণপাত না করে সেখানেই তাঁকে গুলি করে। তিনি এক দুঃখজনক মৃত্যুবরণ করেন। এভাবে পাকিস্তানের আদর্শের এক নিষ্ঠাবান সৈনিক পাকিস্তান আর্মির হাতেই মারা যান। এটা আর্মির এক চরম নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। আর্মির এরকম নির্বুদ্ধিতার নজির একেবারে কম ছিল না। নিজের দেশের মানুষের সাথে মানবিক সম্পর্ক আর্মির গড়ে ওঠার কথা ছিল। আসলে তা কখনই হয়নি। এসময় একদিন খবর পেলাম আর্মি যশোর আওয়ামী লীগের নেতা মশিউর রহমানকে মেরে ফেলেছে। তিনি আমার পুরনো বন্ধু। ৭০-এর নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে এমএনএ হয়েছিলেন। ৫৪ সালে তিনি একবার এমপি হন। আতাউর রহমান খান যখন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী তখন তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্য হয়েছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনে আমাদের সাথে কাজ করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে আমি উৎসুক হয়ে জানার চেষ্টা করেছি আর্মি কেন তাঁকে মারতে গেল।

২৫শে মার্চের আগে অসহযোগের সময় তিনি তাঁর দলবল নিয়ে যশোর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে ফেলেন। এ সময় যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিদ্রোহ করে মেজর জলিল বের হয়ে তাদের সাথে যোগ দেন। মশিউর রহমানের উস্কানিতে শুধু যশোর ক্যান্টনমেন্ট ঘিরেই রাখা হয়নি, বাইরে থেকে ক্যান্টনমেন্টের ভিতরে সব খাবার ও রসদ সরবরাহও বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ রকম অবস্থায় যশোর ক্যান্টনমেন্টের পাক আর্মির প্রধান ব্রিগেডিয়ার হায়াত তাঁকে অনুনয়-বিনয় করে বলেছিলেন আমরা তো আপনার দেশের সৈনিক। আমাদের কারও বিরুদ্ধে শত্রুতা নেই। যেই সরকারে যাবে আমরা তাকেই সার্ভ করব। আপনারা ক্ষমতায় আসেন আমরা আপনাদের আদেশ পালন করব। খামোখা আমাদের বৌ-ছেলেমেয়ে-বাচ্চার খাবার বন্ধ করে দিয়ে কেন আমাদের কষ্ট দিচ্ছেন? এটি কি কোন ইনসাফ হল? মশিউর ব্রিগেডিয়ার হায়াতের কথায় কোন কর্ণপাতই করেননি।

আমি আজও ভেবে কুল পাই না মশিউরের মত একজন শিক্ষিত মানুষের দ্বারা এরকম অর্বাচীনের মত কাজ কি করে সম্ভব হল! আসলে আওয়ামী লীগারদের মাঝে সে সময় এমন একটা অদ্ভুত ক্রেজ তৈরী হয়েছিল অবাঙ্গালী হলেই খারাপ। সুতরাং তাকে যেভাবে হোক মারতে হবে।

মশিউর শুধু যশোর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করেই ক্ষান্ত হননি, নিকটবর্তী ঝুমঝুমপুরে বিহারীদের উপর নির্মম হত্যাকান্ডের উস্কানিও দিয়েছিলেন। ২৫শে মার্চের পর আর্মি যখন যশোর শহরে বিদ্রোহ দমন করতে ঢুকে তিনি তখন আর্মির হাতে ধরা পড়েন। পুরনো বন্ধু হিসেবে তাঁর মৃত্যুতে দুঃখিত হয়েছিলাম। শুনেছি আর্মি তাঁকে খুব নির্যাতন করে হত্যা করেছিল। এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি একদিন আমার বাসায় কুমিল্লার আওয়ামী লীগ নেতা এডভোকেট মফিজুল ইসলাম এসে হাজির। তিনি ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন। ২৫শে মার্চের পর অনেকের মত তিনিও ভারতে পালিয়ে যান। কুমিল্লা থেকে তিনি চলে যান আগরতলায়। তাঁর সাথে তার স্ত্রীও ছিলেন।

মফিজও আমাদের সাথে পাকিস্তান আন্দোলন করেছিলেন। মফিজের নিজামীর সাথে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। কুমিল্লায় তিনি মুসলিম ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি চাটগাঁর মীরেশ্বরাই আবুতোরাব হাইস্কুলের হেডমাস্টার হয়েছিলেন। হেডমাস্টার হিসেবে তিনি বেশ নামও করেছিলেন। পরে কি মনে করে শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে ওকালতি পাস করে কুমিল্লা বারে যোগ দেন। তখন তিনি মুসলিম লীগ করতেন। তাঁর দল পরিবর্তনের পিছনে একটা কারণ আছে। কুমিল্লায় মুসলিম লীগের নেতা নুরুদ্দীন মোহাম্মদ আবাদের সাথে তিনি একটা ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। এর পরিণতিতে তিনি মুসলিম লীগ থেকে সরে যান এবং আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

সেই মফিজ যখন আমার কাছে এলেন তখন আমি তো অবাক। তিনি হাউ মাউ করে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন দোস্ত কি ভুল যে করেছি ইন্ডিয়া গিয়ে। সব নিজ চোখে দেখে এসেছি।

আমি বললাম সবকিছু খুলে বলুন। মফিজ বললেন, আগরতলা গিয়েছিলাম। সেখানে গিয়ে উঠি আমার এক আত্মীয়ের বাসায়। সেই আত্মীয় আমার চৈতন্য জাগিয়ে দিয়েছে। সে আমাকে বলেছে এটা কি করছ? পাকিস্তান ভেঙ্গে তোমাদের কি লাভ? আমরা এখানকার মুসলমানরা তো তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছি। কি সর্বনাশ করতে যাচ্ছ তোমরা। শুধু তাই নয়, সে আমাকে আগরতলার অনেক মুসলমান পরিবারের কাছে নিয়ে গেছে। তাদের মুখেও একই কথা। এটা নাকি মুসলমানদের বিরুদ্ধ ষড়যন্ত্র। তারা আমাকে বলেছে দেখেছ এখানকার মুসলমানদের অবস্থা! তোমরা এসেছ এটা আমাদের জন্য কোন আনন্দের সংবাদ নয়। আনন্দে মেতে উঠেছে এদেশের হিন্দুরা কারণ তারা এর মধ্যে পাকিস্তান ভাঙ্গার আলামত দেখতে পাচ্ছে। মফিজ আরও বললেন ইন্ডিয়ার মুসলমানরা পূর্ব পাকিস্তানীদের সুনজরে দেখছেনা মোটেই। তাদের ধারণা আমরা নাকি গাদ্দার।

শুধু এইটুকু হলেও তো ভাল ছিল। আগরতলা থেকে কলকাতা যাব ভাবছি এ সময় এক পত্রিকায় দেখলাম আমাদের প্রবাসী সরকার ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তির ধারাগুলো দেখেই আমি আঁৎকে উঠেছি। ইব্রাহিম এরপর কোন স্বাধীনতা থাকে? তিনি আমাকে পত্রিকার কাটিং দেখালেন। আমি চুক্তিগুলোর ধারা পড়ে দেখলাম। তখন আমার মানসিক অবস্থা যে কি তা বুঝাতে পারব না।
মনে মনে তখন ভাবছি মুজিব কি এই স্বাধীনতার কথা আমাদের কাছে বলেছিলেন। চুক্তিগুলো এরকমঃ
১.    মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ভারতীয় সেনাবাহিনীর কমান্ডে থাকবে।
২.    বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে দেশে ভারতীয় বাহিনী থাকবে।
৩.    বাংলাদেশের নিজস্ব কোন সেনাবাহিনী থাকবে না।
৪.    অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বিধানের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটা প্যারামিলিশিয়া গঠিত হবে।
৫.    দুদেশের মধ্যে অবাধ সীমান্ত বাণিজ্য চালু থাকবে।
৬.    মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়নি এমন সব সরকারী কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হবে এবং শূন্যস্থান প্রয়োজন বোধে ভারতীয় কর্মকর্তাদের দিয়ে পূরণ করা হবে।
৭.    বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি প্রণয়নকালে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাহায্য গ্রহণ করা হবে।

এ চুক্তির পুরোটা পরবর্তীকালে ভারত সরকার বিশ্ব জনমতের চাপে কার্যকর করতে পারেনি এটা সত্য। তবে এ চুক্তি পড়লে বোঝা যাবে ভারত কেন আওয়ামী লীগকে সাহায্য করেছিল।

আমি তখন মফিজকে সবুর সাহেবের কাছে নিয়ে গেলাম। তিনি তাঁর কাহিনী সবুর সাহেবের কাছে খুলে বললেন। সবুর সাহেব সব শুনে বললেন মফিজ তুমি এতদূর যখন এসেছ তখন আমি তোমাকে আর্মির কাছে নিয়ে যাই চল। তাদের কাছে গিয়ে যদি পুরো ঘটনাটা বল তাহলে ষড়যন্ত্রের গতিপ্রকৃতি তাদের কিছুটা বুঝতে সুবিধা হবে। মফিজ কিন্তু তাতে না করে বসলেন। বললেন ওরা আর আমাকে আস্ত রাখবে না।
মফিজকে আমি তখন নিয়ে আসি। পুরো যুদ্ধের সময়টা তিনি আমার কাছেই কাটান। লক্ষ্মীবাজারে রুচিরা বলে আমার একটা আবাসিক হোটেল ছিল। সেই হোটেলের একটা রুমে আমি তাঁকে রেখে দিয়েছিলাম। কয়েকদিন পর তিনি তাঁর স্ত্রীকে কুমিল্লা থেকে নিয়ে এসেছিলেন।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh