Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ১৫ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

অক্টোবরের শেষের দিকে যখন পাকিস্তান সরকার উপনির্বাচন করারা ঘোষণা দেয় তখন সর্বদলীয় সিদ্ধান্তে আমাকে ফেনীর আসন থেকে এম এন এ প্রার্থী মনোনীত করা হয়। সে কথা শুনে মফিজ আমার কাছে ছুটে আসেন। তিনি আমাকে বললেন, দোস্ত তুমি এসব বিপদের মধ্যে নিজেকে জড়িও না। পাকিস্তান থাকবে না, পাকিস্তানকে আমরাই শেষ করে দিয়েছি। এখন কেন এভাবে বিপদের ঝুঁকি নিচ্ছ?
আমি তাঁকে বললাম আমার রক্তের বিনিময়ে হলেও পাকিস্তানের আদর্শ রক্ষার জন্য লড়াই করব। এ কথা বলা প্রয়োজন, পশ্চিম পাকিস্তানী কিছু নেতা ও আমলা এক পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন না। পূর্ব বাংলার শতকরা ৯৭ জন-এর ভোটে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল। সন্তানের মত জনকের স্নেহ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান গড়েছি। ভারতের ষড়যন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করব না। আদর্শ রক্ষা করব, আমি তাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই।

বাংলাদেশ হওয়ার পর আমি যখন জেলে তখন মফিজ আমার মুক্তির জন্য অনেক ছোটাছুটি করেছিলেন। মফিজের মত এ সময় নোয়াখালীর ওবায়দুল্লাহ মজুমদার ইন্ডিয়া থেকে পালিয়ে চলে আসেন। তিনি ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকেটে ছাগলনাইয়া-পরশুরাম-ফুলগাজী এলাকা থেকে এম এন এ হয়েছিলেন। এটা ছিল আমার নির্বাচনী এলাকা। ২৫শে মার্চের পর তিনি সীমান্তের ওপারে চলে যান। এ এলাকারই সীমান্তের ওপারে মুক্তিবাহিনীর নেতৃত্ব দেন মেজর জিয়াউর রহমান।

এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা আমার নির্বাচনী এলাকার ভিতর শুভপুর ও রেজু মিয়া ব্রিজ বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেয়। এ দুটো খুব দীর্ঘ সেতু ছিল। মুহুরী নদীর উপর ছিল এ দুটো সেতু। এক শুক্রবারে তারা শুভপুর ব্রিজ উড়িয়ে দেয়। পরের শুক্রবার রেজু মিয়ার ব্রিজ। ব্রিজ দুটো ওড়ানোর পর স্বাভাবিকভাবে এ এলাকায় আর্মির চলাচল বেড়ে যায়। রেজু মিয়া ব্রিজ ওড়ানোর পরের দিন রাস্তায় পুঁতে রাখা মাইনে আর্মির একটা ট্রাক ওড়ে যায়। এতে ৯ জন পাকিস্তানী সৈন্য মারা যায়। আরও হতাহত হতে পারত। কিন্তু আর্মি সে দিন সামনের দিকে মুভ না করে ফেরীতে ফিরে যায়। পরের দিন এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় যেখানে ট্রাক উড়ে গিয়েছিল তার দুপাশের গ্রামে আর্মি ঢুকে পড়ে। এক পাশে ছিল আমাদের পানুয়া। অন্যদিকে হরিপুর পানুয়া। আমাদের বাড়ীর সামনে এসেও আর্মি ফিরে যায়। আমাদের বাড়ীর সামনে দীঘির পাড়ে ছিল গোরস্থান। ওখানে আমার বাবা-দাদারা শুয়ে আছেন। কবরগুলো পাথর দিয়ে খোদাই করা। কবরের গায়ে কোরআন শরীফের আয়াত খোদাই করা আছে। আর্মি বোধ হয় এসব দেখে কি মনে করে ফিরে যায় এবং হরিপুর গ্রামে গিয়ে ঢুকে পড়ে। প্রতিহিংসার কারণে কিছু নিরপরাধ গ্রামের মানুষকে মেরে ফেলেছিল তাতে আমি অবাক হয়ে যাই। আমি এদের অনেককেই চিনতাম। এ ঘটনা সে সময়কার তৈরী পরিস্থিতিতে গ্রামবাসীদের মনে আর্মি সম্বন্ধে স্রেফ বিরূপ ধারণাই জন্ম দিয়েছিল।

এরকম সময়েই ওবায়দুল্লাহ মজুমদার একদিন দেখতে পান আমাদের এলাকার কতিপয় আলেমকে চোখ বাধা, হাত বাধা অবস্থায় হত্যা করার জন্য ভারতে নেয়া হয়েছে। ওবায়দুল্লাহ গিয়ে দেখতে পান পাহাড়ের কাছে লাইন দিয়ে পড়ে আছে তাঁরই এলাকার কিছু পরিচিত লোক এবং সম্মানিত কিছু আলেমের লাশ। হাজার হোক ওবায়দুল্লাহ ছিলেন রাজনীতিবিদ। এসব কান্ড তাঁর ভাল লাগেনি। তিনি তাদের কাছে বললেন আমি একটু ঘুরে আসি। তিনি তাড়াতাড়ি করে ফিরে এসে তাঁর স্ত্রীকে লোক দিয়ে ফেনী পাঠিয়ে দেন এবং নিজেও অন্য রাস্তা দিয়ে ফেনী চলে আসেন। ফেনীতে তিনি একদিন থাকার পর ঢাকায় এসে অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক আবদুস সালাম সাহেবের সাথে দেখা করেন। সালাম তাঁকে হামিদুল হক চৌধুরীর কাছে নিয়ে যান। ওবায়দুল্লাহ পরে সবুর সাহেবের সাথেও দেখা করেন। আমার সাথেও তাঁর দেখা হয়। তাঁর কাছেই শুনি এই লোমহর্ষক ঘটনা। তিনি আক্ষেপ করে বলতে থাকেন আমি বহুদিন ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা যে গোপনে এত বড় ষড়যন্ত্র করেছে তার কিছুই বুঝতে পারিনি। শুধু আলেম হওয়ার অপরাধে তাদেরকে বাংলাদেশ বিরোধী চিহ্নিত করে এমন কাজ করতে পারে তা আমি কখনও স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।

ওবায়দুল্লাহ পরে হামিদুল হক চৌধুরী ও সবুর সাহেবের সহযোগিতায় আর্মির বড় কর্তাদের সাথেও দেখা করেন। সেখানে তিনি আর্মিকে বলেছিলেন আপনারা পাকিস্তানের স্বার্থে আমাকে যে কোন কাজে লাগাতে পারেন।

পরবর্তীকালে পাকিস্তান সরকার যখন পূর্ব পাকিস্তানে মালেক সাহেবের নেতৃত্বে একটা অসামরিক সরকার গঠন করে তখন ওবায়দুল্লাহ ডা. মালেক মন্ত্রীসভার সদস্য হয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আওয়ামী লীগের রাজনীতির অর্থই যে ছিল ভারতের অনুকূলে কাজ করা অর্থাৎ পাকিস্তান ভাঙ্গা ওবায়দুল্লাহর সেই চৈতন্য হয়েছিল অনেক দেরীতে, যখন পাকিস্তান মৃত্যু শয্যায় শায়িত। মফিজ ও ওবায়দুল্লাহর মত আওয়ামী লীগের অনেক এমপি ও এমএনএ কেবল ভারতে গিয়েই ষড়যন্ত্রটা টের পেয়েছিলেন। তাঁর আগে তারা কিছুই বুঝতে পারেননি। ভারত গিয়ে অনেকে অনেক কিছু বুঝেও তেমন কিছু করে উঠতে সাহস পায় নি। কেননা তাতে তাদের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশংকা ছিল। তাই তারা নিয়তিকেই এক রকম মেনে নিতে বাধ্য হয়। প্রবাসী সরকারকে সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করত ইন্ডিয়া। তাদের নির্দেশের বাইরে আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের রা’ করবারও উপায় ছিল না। যত দিন যেতে থাকল ইন্ডিয়ার পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকল।

আমার বাড়ী থেকে কয়েক শ’ গজ দূরে গণেশের এক প্রাসাদোপম বাড়ী ছিল। এই বাড়ী নিয়ে এক কাহিনী আছে। ভাওয়ালের রাজা নিরুদ্দেশ হওয়ার ১২ বছর পর যখন জন সমক্ষে সন্যাসী হিসেবে আবির্ভূত হন তখন তিনি এখানে এসে উঠেছিলেন। গণেশ চক্রবর্তী ছিল তাঁর পূর্ব পরিচিত। ভাওয়ালের রাজার নিরুদ্দেশ হওয়ার চমকপ্রদ গল্প, মামলা করে তাঁর জমিদারী এস্টেট ফিরে পাওয়ার অভিনব কাহিনী আমি পরে গণেশের কাছ থেকে শুনেছিলাম। গণেশ ২৫শে মার্চের পর ভারতে পালিয়ে যায়। আর্মি যখন খাজুকে নিয়ে আসে তখন বিহারীরা লুটতরাজ চালাচ্ছিল গণেশের বাড়ীতে। আমি মেজর নাসিমকে বললাম এগুলো তোমাদের চোখে পড়ে না? সে তখন তার ফোর্স নিয়ে গণেশের বাড়ীর দিকে ছুটে যায়। বিহারীরা আর্মি আসার কথা শুনে তাড়াতাড়ি গা ঢাকা দেয়। বিহারীদের হাত থেকে গণেশের বাড়ীতে লুটতরাজ তখনকার মত ঠেকাতে পারলেও বাংলাদেশ হওয়ার পর গণেশের বাড়ী আবার লুটতরাজের শিকার হয়। এবার তার বাড়ীতে লুটতরাজ চালায় আওয়ামী লীগাররা। এই গণেশ কয়েকটা বড় বড় গরু পুষত। এই গরুগুলো জবাই করে তারা বিজয় উৎসব পালন করে। এইভাবে গণেশের বাড়ী দুবার লুট হয়।

আওয়ামী লীগ মনে করেছিল এভাবে যদি হত্যা ও সন্ত্রাস চালানো হতে থাকে তাহলে আর্মি অবশ্যই নেমে আসবে এবং তাদের উপর আক্রমণ করবে। আর্মির সেই আক্রমণকে পুঁজি করে তখন সকলের কাছে নিপীড়নের কাহিনী বলে রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়া যাবে। আওয়ামী লীগের এ কৌশল অনেকখানি সফল হয়েছিল।

এ সময় একদিন আর্মি এসে আমার বাড়ী সার্চ করে। কি করে যেন আর্মি খবর পেয়েছিল আমার শ্যালক সাহাদত চৌধুরী সাধন আওয়ামী লীগের সমর্থক। আর্মির ধারণা হয়েছিল আমি কিছু আওয়ামী লীগের সমর্থকদের প্রোটেকশন দিচ্ছি। প্রকৃত ঘটনা ছিল সাধনসহ তার কয়েকজন বন্ধু বিপদ টের পেলে আমার বাসায় এসে উঠত। জানতাম এরা পাকিস্তানী আদর্শে বিশ্বাসী নয়। পাকিস্তানের যে কোন বড় ক্ষতি হতে পারে এদের দ্বারা। সশস্ত্র অবস্থায়ই এরা সব সময় ঘোরাফেরা করত। তবুও একটা লোককে আর্মি মেরে ফেলবে তার দোষ যত প্রমাণিতই হোক না কেন এটা আমি কখনও মেনে নিতে পারিনি। সাধনের সাথে জনকন্ঠের মাসুদ খান, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, রাজা আর ঝিলু ঘোরাফেরা করত। আর্মি যেদিন আমার বাড়ী এসেছিল সেদিন সকালে সাধন ও মাসুদ আমার বাড়ীতে অবস্থান করছিল। আর্মির ঘোরাফেরা দেখে কলাবাগানে এক আত্মীয়ের বাসায় তাদের সরিয়ে দিয়েছিলাম।

সেদিন বিকেলেই দেখি আমার বাড়ীর সামনে আর্মির একটা ট্রাক এসে থামল। তারপর ট্রাক থেকে চোখ বাধা অবস্থায় এক তরুণকে নামানো হল। সম্ভবত আর্মি চেয়েছিল ছেলেটিকে গুলি করে লাশটা রাস্তার উপর ফেলে যাবে। চোখ বাধা হলেও ছেলেটাকে আমার কাছে পরিচিত মনে হল। কাছে গিয়ে দেখি এতো আমাদের খাজু। রাজার ছোট ভাই। খাজু ছিল আমার প্রতিবেশী প্রাক্তন মন্ত্রী গিয়াসউদ্দিন আহমদের ছেলে। তিনি আমার চেয়ে বয়সে কিছু বড় হলেও আমার সাথে তাঁর বরাবর একটা ঘনিষ্ঠতা ছিল। গিয়াসউদ্দিন যুক্তফ্রন্টের সময় খাদ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। মোহন মিয়া যখন মুসলিম লীগ ত্যাগ করে যুক্তফ্রন্টে যোগ দেন তখন তাঁর সাথে তিনিও মুসলিম লীগ ছাড়েন। আর্মি ট্রাকে বসা মেজর নাসিমকে বললাম এ তোমরা কি করছ? খাজু আমার মুসলিম লীগের কর্মী। তাকে নিয়ে আমি কাইয়ুম খানের সাথে মিটিং পর্যন্ত করেছি। আরও অনেক লোক জমা হয়ে গিয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেক বিহারীও ছিল। তাঁরাও বলল খাজু মুসলিম লীগের লোক। আর্মি খাজুকে ছেড়ে দিল। আমি তখন নাসিমকে বললাম, তোমরা কেন এভাবে পাকিস্তানের শত্রু খুঁজে বেড়াচ্ছ। এভাবে কি দেশকে শত্রু মুক্ত করা যাবে।

ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের প্রেক্ষাপটে এক মহান আদর্শের অনুপ্রেরণায় আমরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম পাকিস্তান আন্দোলনে। বৈষয়িক স্বার্থের গ্লানি আমাদেরকে সেদিন স্পর্শ করেনি। ত্যাগের মহিমায় সমুজ্জল সে সব দিনের স্মৃতি আজও যখন মনের আয়নায় ভেসে ওঠে তখন আপ্লুত না হয়ে পারা যায় না। কেননা, আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল একটি স্বাধীন স্বদেশ ভূমির স্বপ্ন। আমরা চেয়েছিলাম এমন এক রাষ্ট্র কাঠামো যা কোন ভৌগোলিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার মধ্যেই সীমিত থাকবে না। সেদিন আমাদের প্রত্যয়ের ভাষা মূর্ত হয়েছিল কবিকন্ঠেঃ ‘মোরা মুসলিম সারা জাহান ভরিয়া গড়িব পাকিস্তান।’ শুধু কি তাই। আমরা চেয়েছিলাম কাঙ্খিত রাষ্ট্র হবে ‘যারা নীড় হারা’ ‘যারা আশ্বাস হারা’ তাদের আবাসভূমি। এক কথায় পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি হবে ‘সারা জাহানের মজলুমানের মঞ্জিল মহীয়ান’। সেদিন চাঁদ তারা খচিত পতাকার তলে জড় হয়েছিল সর্বস্তরের মানুষ। কত শত ত্যাগ তিতিক্ষা আর জানমালের কোরবানীর বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল ৪৭-এর স্বাধীনতা-তার মূল্যায়ন সম্ভব নয় এই সীমিত পরিসরে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে আজাদী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে শেখ মুজিবরসহ আওয়ামী লীগের অনেককেই পেয়েছি সংগ্রামের সাথী হিসেবে। পাকিস্তান আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী পটভূমি সম্পর্কে তাঁরা অবহিত নন এমনটি ভাবতে কুন্ঠা জাগে। আরও যেটা বিস্ময়কর সেটা হল ৪৭-এর পূর্বে যাদের ভান্ড ছিল শূন্য অথচ পাকিস্তানের বদৌলতে ধানমন্ডি-গুলশানে যারা জাঁকিয়ে বসেছেন, তারাই রাতের আঁধারে হাত মিলিয়েছে প্রতিবেশী দেশটির-হোমরা চোমড়াদের সাথে। সাতচল্লিশের স্বাধীনতা অর্জনের পরক্ষণেই ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত পাকিস্তান নামক কষ্টার্জিত রাষ্ট্রটি ধ্বংসের প্রমত্ত নেশায় মেতে ওঠে। শিক্ষকের ছদ্মবেশে বন্ধুর মুখোশে অনবরত প্রচার চালাতে থাকে দুগ্ধপোষ্য রাষ্ট্রটির বিরুদ্ধে। আমার বন্ধুরা ষাটের দশকের ঢাকার সাথে তুলনা দিতেন পিন্ডি, লাহোরের। আফসোসের বিষয় ৪৭-এর পূর্বে ঢাকার চিত্র তাদের স্মৃতি থেকে কেন জানি চিরতরে হারিয়ে গিয়েছিল। আমার কাছে পুরো বিষয়টা আজ অবধি অবোধগম্য রয়ে গেছে।

সত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে মনে হত বাঙ্গালী খুব আবেগপ্রবণ জাতি। পিছনের কথা তারা বেশীদিন মনে রাখে না। বারবার তাই তাদের জীবনে বিপর্যয় ধেয়ে আসে।

একাত্তরের জুলাই মাসের দিকে রাও ফরমান আলী একবার মুসলিম লীগসহ পাকিস্তানপন্থী কয়েকটা দলের নেতাদের তাঁর অফিসে ডাকেন। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলোচনা করার জন্যই তিনি আমাদের ডেকেছিলেন। এ সভায় আর্মির কয়েকজন সিনিয়র জেনারেলও ছিলেন। আলোচনা প্রসঙ্গে জেনারেল রহীম একটা দামী কথা বলেছিলেন। মোমেনশাহীর হালুয়াঘাট সীমান্তের একটা উদাহরণ টেনে জেনারেল রহিম বললেন, সেখানে আমাদের আর্মি আছে। তারা বর্ডার পাহারা দিচ্ছে। ট্রেঞ্চ খুঁড়েছে। সবই চলছিল ঠিকঠাকভাবে। হঠাৎ একদিন রসদ সরবরাহে বাধা সৃষ্টি হল। কতিপয় তরুণ পথ দেখিয়ে নিয়ে এলো ইন্ডিয়ান আর্মিকে। জেনারেল রহীম বললেন, আমরা কাদের সাথে তাহলে যুদ্ধ করব। আমরা কাদের জন্য বুকের রক্ত দেব। একদিকে ইন্ডিয়ান আর্মি অন্যদিকে আমরা দেশের বিভ্রান্ত তরুণেরা। এরকম অবস্থায় কি যুদ্ধ চলতে পারে? দেশের সর্বত্রই তখন হালুয়াঘাট সীমান্তের অবস্থা বিরাজ করছিল। তাছাড়া আমার মনে হয় আর্মির মধ্যেও কোন সংহত পরিকল্পনা ছিল না। এর কারণ ছিল আর্মি হেড কোয়ার্টারের সিদ্ধান্তহীনতা। আর্মি হেড কোয়ার্টারের সিনিয়র জেনারেলদের যে অংশ ভুট্টোর সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন তাঁরা কখনোই চাননি পূর্ব পাকিস্তানে আর্মি কোন সুষ্ঠু প্রতিরোধ গড়ে তুলুক। ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তানের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা চেয়েছিলেন। পাক আর্মির কয়েকজন জেনারেলও এ চক্রান্ত বাস্তবায়নে ভুট্টোর সহযোগী হন। ফলে পূর্বাঞ্চলে আর্মি যত অপারেশন চালিয়েছে, সীমান্তে যুদ্ধ করেছে তা অনেকটা সিদ্ধান্তহীনভাবে হয়েছে। তারা একদিকে দেখেছে দেশের মানুষ তাদের প্রতি মোটেই সহানুভূতিশীল নয়, অন্যদিকে হেড কোয়ার্টারের কোন দিক নির্দেশনা নেই। এরকম পরিস্থিতিতে পূর্বাঞ্চলের আর্মি হয়ে পড়েছিল অসহায়। অন্যদিকে আমরা পাকিস্তানপন্থীরা নিজেদের বিপন্ন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যথার্থই আন্দাজ করতে পারছিলাম। এসত্ত্বেও পাকিস্তানের প্রতি গভীর অনুরাগ আমাদেরকে সচল রেখেছিল। পাকিস্তানের জন্য সন্তান প্রতিম ভালবাসাই আমাদের পরিচালিত করেছিল। এসময় ইয়াহিয়া হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিলেন পূর্ব পাকিস্তানে একটা বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার। তাঁকে এ বুদ্ধি কে দিয়েছিল জানি না। তবে আর্মির মধ্যে এ অনুভুতি জেগে থাকতে পারে যে সামরিক সরকারের স্থলে কোন বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা করা গেলে হয়ত পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তাছাড়া ইন্ডিয়া এ সময় শরণার্থী সমস্যা ও পাকিস্তান বাহিনীর নিপীড়নের মিথ্যা কাহিনী প্রচার করায় বিদেশে পাকিস্তান বিরোধী প্রোপাগান্ডা বৃদ্ধি পায়। তার মোকাবেলার জন্য হয়ত আর্মি এ ধরণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

কিন্তু এরকম সিদ্ধান্তে তখনকার বিস্ফোরনন্মুখ পরিস্থিতিতে কোন পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। কারণ দেশের দু’অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্যের নামে আওয়ামী লীগ যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছিল তা দূর করা সহজ সাধ্য ছিল না।

জেনারেল টিক্কা খানের স্থলে নতুন গভর্ণর নিযুক্ত হলেন ডাক্তার এএম মালেক। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন দাঁতের ডাক্তার। রাজনীতিতে তাঁর হাতেখড়ি শ্রমিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কলকাতার ডক শ্রমিকদের তিনি ছিলেন নেতা। পাকিস্তান হাসিলের পর মালেক সাহেব লিয়াকত আলী খানের মন্ত্রীসভার সদস্য হয়েছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর পর আমি যখন ঢাকায় রিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি তখন মালেক সাহেব আমাকে বিভিন্ন উপদেশ দিয়ে উৎসাহিত করতেন।

১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন আসার ঠিক আগে আগে একবার এ.এম. মালেক ঢাকায় এলেন। দ্বিধাবিভক্ত মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মীদের একত্রিত করার জন্য তিনি পাকিস্তান ফ্রিডম ফাইটার্স মুভমেন্ট নামে একটা বৈঠক ডাকেন হোটেল শাহবাগে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি অঞ্চল থেকে এ বৈঠকে পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মী ও নেতারা উপস্থিত হয়েছিলেন। বৈঠকে আমি সেদিন মোহন মিয়াকে সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলাম। মালেক সাহেবের সাথে আমি সে সময় পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরেছিলাম অনুষ্ঠানটি সফল করার জন্য। তখনই টের পেয়েছিলাম তিনি একজন উঁচু মানের সংগঠক। রাজনীতিবিদদের জন্য যা অবশ্যই একটা বড় গুণ। মালেক সাহেব ফ্রিডম ফাইটার্স মুভমেন্টের সভাপতি আর আমি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। পাকিস্তান আন্দোলনের ইতিহাস যাতে তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছায় তার একটা পরিকল্পনা তখন আমরা নিয়েছিলাম। মনে পড়ে তিনি সভাপতির বক্তৃতায় দুঃখ করে বলেছিলেন, যারা পাকিস্তান আন্দোলন করেছিল তারা কি উদ্দেশ্যে আজ পাকিস্তানের আদর্শের বিরুদ্ধে কাজ করছে তা বোঝা খুব মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুঃখের বিষয় সংগঠনটা আমরা বেশীদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি।

এ.এম. মালেক বিভিন্ন সময় পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিষিক্ত হয়েছেন। কখনও মন্ত্রী হয়েছেন, কখনও রাষ্ট্রদূত। কিন্তু তিনি যখন পূর্ব পাকিস্তানের দুর্যোগপূর্ণ রাজনৈতিক আবহাওয়ায় গভর্ণর হয়ে এলেন তখন অনেকেই বলাবলি করতে লাগল মালেক সাহেব তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করে বসলেন।

তিনি আসলেই কোন ভুল করেছিলেন কিনা তা বিচার করবে ভবিষ্যতকাল। তবে একথা আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে দুর্যোগপূর্ণ সময়ে তিনি প্রদেশের গভর্ণরের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পর্বত প্রমাণ যে গুরু দায়িত্ব নিয়ে তিনি গভর্ণর হয়েছিলেন সেই গুরুভার পালনে তাৎক্ষণিকভাবে সফলকাম হতে পারেননি। তবে পাকিস্তানের জন্য তিনি যে এতবড় ঝুঁকি নিতে পেরেছিলেন সেটা তার প্রগাঢ় আদর্শবাদী চরিত্রের জন্যই সম্ভব হয়েছিল। ইতিহাসের পাতায় পরাজিতদের জন্য কিছুই বরাদ্দ থাকে না বললেই চলে। একারণে বাংলাদেশ হওয়ার পর রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে তিনি অনেকটা মুছে গেছেন। কিন্তু ইতিহাসে তো আদর্শবাদীদের একটা স্থান থাকে। সে স্থান অবশ্যই তাঁর প্রাপ্য। পাকিস্তানের আদর্শের জন্য জনাব মালেক সব রকমের ঝুঁকি নিয়ে গভর্ণরের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনের জেহাদে তিনি যেমন ছিলেন সক্রিয়, পাকিস্তান রক্ষার জেহাদেও তাঁকে দেখা গেল সম্মুখ সারিতে। মালেক সাহেব তাঁর ক্যাবিনেটে ইসলামপন্থী দলগুলো থেকে কয়েকজন সদস্য গ্রহণ করেছিলেন। সবগুলো দলের নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করেই তিনি এটা করেছিলেন। আওয়ামী লীগের এমন দু’জন সদস্যকেও মন্ত্রীসভার সদস্য করেছিলেন তিনি যাঁরা মুজিবের ষড়যন্ত্রকে মনে প্রাণে মেনে নিতে পারেননি।

ভেবে হতবাক হতে হয়, পূর্ব পাকিস্তানের শেষ দিনগুলোতে যখন ভারতীয় জঙ্গী বিমান গভর্ণর হাউসের উপর অনবরত বোমা বর্ষণ করত তখনও গভর্ণর মালেক সকাল-বিকাল ক্যাবিনেট মিটিং করে সামগ্রিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা করতেন। জীবনবাজী রেখে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে গেছেন। ব্যক্তি জীবনে মালেক সাহেব খুবই আল্লাহওয়ালা মানুষ ছিলেন। নামাজ আদায়ের ব্যাপারে তাঁর কোন শৈথিল্য ছিল না। দুনিয়াবী কোন চাওয়া-পাওয়া কখনই তাঁকে স্পর্শ করতে পারেনি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য জীবনে বহু উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হলেও মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে সামান্য একটি বাড়ীও তিনি নির্মাণ করেননি। এর চেয়ে দুর্লভ চরিত্র এ যুগে আর কি হতে পারে!

পাকিস্তান হওয়ার পর আমরা যখন জেলে তখন তিনি মাঝে মাঝে বলতেনঃ দেখ ইব্রাহিম জীবন মৃত্যুর মালিক তো মুজিব নয়। আল্লাহতাআলার মেহেরবানী সাথে থাকলে আমাদের কেউ কিছু করতে পারবে না। আর মৃত্যু যদি ভাগ্যে থাকে সেটিও কেউ রুখতে পারবে না।

সে সময় পাকিস্তানের জন্য দিনরাত খেটেছেন এরকম একজন দক্ষ অফিসারের কথা না বলে পারছিনা। তিনি ছিলেন শফিউল আজম। সব রকম ভীতি ও ঝুঁকি উপেক্ষা করে দুর্যোগময় দিনগুলোতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনকে সচল রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তানের চীফ সেক্রেটারী।

শফিউল আজম সারা পাকিস্তান সুপিরিয়র সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর নতুন সরকার তাঁর দক্ষতা মূল্যায়ন করেনি। মূল্যায়ন করেছিল তাঁর পাকিস্তান প্রীতিকে। এ কারণে প্রশাসন থেকে তাঁকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিল।

পূর্ব পাকিস্তানে অসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি আর্মি সিদ্ধান্ত নিল নতুন করে গণপরিষদ আহ্বান করার। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল পূর্ব পাকিস্তানের যে সমস্ত আসনে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সদস্যরা ভারতে পাড়ি দিয়েছিলেন তাদের সিটগুলো নিয়ে। কিছু আওয়ামী লীগ সদস্য অবশ্য পাকিস্তানেই ছিলেন। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এসব জায়গায় নির্বাচন করার মত অবস্থা ছিল না। তাই আর্মি সিদ্ধান্ত নিল পূর্ব পাকিস্তানের সব কটি ইসলামপন্থী দলের যৌথ মতামতের ভিত্তিতে সিলেকশনের মাধ্যমে উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের। এ ব্যবস্থাটা তখনকার পরিস্থিতিতে সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট ছিল না।

সরকারের তরফ থেকে উপনির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ঘোষণা দেয়া হলে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে সিটগুলো ভাগ করে নেয়। ফেনীর আসনটা নিয়ে রাজনৈতিক নেতারা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিলেন। কাকে এ আসনটা দেয়া যায় তা নিয়ে একদিন সকালে দেখি ফেনীর আমিনুল ইসলাম চৌধুরী আমার বাসায় হাজির। আইয়ুবের আমলে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে এম এন এ নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু মুজিব তাঁকে ৭০ সালে জানিনা কি কারণে নমিনেশন দেননি। তিনি ভারতেও যাননি।

আমিনুল আমাকে এসে বললেন এ সিট থেকে তো একবার আমি এমএনএ হয়েছিলাম। তোমার তো সব নেতার সাথে খাতির। তুমি যদি তাঁদের একটু গিয়ে বল, তাহলে আর্মি আমাকে সিলেকশন দিতে পারে। আমি আমিনুল ইসলামকে নিয়ে নেতাদের বাড়ীতে ঘুরলাম। নেতারা আমিনুলকে নিয়ে যাওয়ায় প্রকাশ্যে কিছু বলেননি কিন্তু পিছনে অসন্তোষ জাহির করেছিলেন। সবুর সাহেব আমাকে তাঁর বাসার ভিতরে ডেকে নিয়ে বললেনঃ ইব্রাহিম, তুমি কাকে নিয়ে এসেছ। ওর কি কোন ঠিক আছে। পাকিস্তানের এ দুর্দিনে আমাদের সাচ্চা লোক চাই। তুমি ওখান থেকে দাঁড়িয়ে যাও। আমি ইতস্ততঃ করছিলাম। কিন্তু সবুর সাহেব আরও বললেন, ইব্রাহিম আমার কথায় না করো না। আমি যখন সবুর সাহেবের বাসায় যাই তখন দেখি আরও কয়েকজন এমএনএ পদপ্রার্থী সবুর সাহেবের অনুগ্রহ লাভের জন্য অপেক্ষা করছেন। এদের মধ্যে সাবেক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য শামসুদ্দীন আহমদ, এডভোকেট মোসলেহউদ্দিন প্রমুখ রয়েছেন। তাঁরা সবাই মুসলিম লীগের নেতা ও কর্মী। আমার তখন মনে হয়েছিল পাকিস্তান ভেঙ্গে যাচ্ছে আর মুসলিম লীগের কর্মীরা পরিষদ সদস্যের সিট ভাগাভাগি করার জন্য কামড়াকামড়ি করছেন। এই মুসলিম লীগ দিয়ে কি পাকিস্তানের বিপর্যয় রোধ করা যাবে?

নমিনেশন পেপার জমা দেওয়ার জন্য আমাকে যেতে হয়েছিল নোয়াখালীতে। প্রথমে যাই ফেনীতে। ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইওয়ের মাঝখান থেকে ফেনীর দিকে যে ডাইভারশন রোড চলে গেছে সেই রাস্তার ওপরে তখন অবিরাম যুদ্ধ চলছে। ইন্ডিয়ান আর্মি একাধারে শেলিং করে চলেছে। সীমান্তের ধার ঘেঁষা এ রাস্তা তখন প্রায় বন্ধ।

আমার ভাগ্নে বদরুল আহসানের গাড়ী নিয়ে আমি প্রথমে লাকসাম হয়ে নোয়াখালী যাই, সেখান থেকে ফেনী পৌঁছি। ফেনীতে গিয়ে নমিনেশন পেপারের জন্য প্রথমে প্রস্তাবক ও সমর্থক জোগাড় করি। তারপর সেই নমিনেশন পেপার জমা দেই নোয়াখালীর রিটার্নিং অফিসারের কাছে। আমি যখন নোয়াখালী কোর্ট বিল্ডিং এ নমিনেশন পেপার জমা দিতে যাই তখন আমার দেখা হয় এডভোকেট লুৎফুর রহমানের সাথে। তিনি আমাকে বললেন ইব্রাহিম ভাই, আপনি তো আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দিতে চাচ্ছেন। কি হবে কিছুই বুঝতে পারছি না।

আমি তাঁকে বললাম, পাকিস্তানের আদর্শের জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে আমি প্রস্তুত আছি। তোমার আব্বা সারাজীবন মুসলিম লীগ করেছেন। তোমার মুখে এ কথা শোভা পায় না। লুৎফর ছিলেন খান বাহাদুর আব্দুল গোফরানের ছেলে।
নমিনেশন পেপার নিয়ে যখন রিটার্নিং অফিসারের রুমে গিয়েছি তখন আমার জন্য আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। দেখি একজন সামরিক পোষাক পরিহিত অবসরপ্রাপ্ত আর্মি অফিসারও এসেছেন নমিনেশন পেপার জমা দিতে। দুর্যোগময় আবহাওয়াতেও নির্বাচনের উন্মাদনা দেখতে মন্দ লাগেনি।

নোয়াখালী থেকে পুনরায় ফেনী গিয়েছিলাম আত্মীয়-স্বজনসহ বন্ধুবান্ধবের সাথে দেখা করতে। তাদেরকে বলেছিলাম পাকিস্তানের আদর্শের লড়াই হিসেবে এ নির্বাচনকে আমি নিয়েছি। এর মধ্যে আমার আর কোন উদ্দেশ্য নেই। ফেরার সময় আমি ট্রেনে করে চট্টগ্রাম পৌঁছেছিলাম। ট্রেন চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। যত্রতত্র ট্রেনে বোমাবাজী হচ্ছিল। কোথাও রেল লাইনের ফিস প্লেট তুলে ফেলছিল তরুণেরা। চট্টগ্রাম থেকে আমি কিছু চান্দা মাছের শুটকী কিনেছিলাম। শুটকী মাছের গন্ধ যাতে প্লেনের যাত্রীদের বিব্রত করতে না পারে সেজন্য কার্টুনে খুব ভাল করে মাছগুলো কাপড় দিয়ে বেঁধে নিয়েছিলাম। কিন্তু গোল বাধলো অবশেষে ঐ কার্টুনটি নিয়ে।

এয়ারপোর্টে তখন আর্মি যাত্রীদের ব্যাগ খুলে সার্চ করত। বাক্স দেখে তাদের সন্দেহ হল হয়ত আমি এর মধ্যে বোমা জাতীয় কিছু লুকিয়ে রেখেছি। তারা আমাকে জিজ্ঞাসা করায় বললাম, এর মধ্যে শুটকী ছাড়া অন্য কিছু নেই। দরকার হলে তোমাদের আমি খুলেও দেখাতে পারি। তারা আমার কথা শুনল না। তারা আমাকে প্লেন থেকে নামিয়ে দিল। অবশেষে সেই শুটকী আমাকে ফেলে রেখে আসতে হয়েছিল। পরের দিন প্লেনে করে আমি ঢাকা পৌঁছেছিলাম। আর্মি তখন কাউকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। আর্মির এই অবিশ্বাসের যথেষ্ট কারণ ছিল। কেননা, তখন তারা নিজের দেশেই পরবাসী হয়ে উঠেছিল। ঢাকায় আসার চারদিন পর গেজেটে আমার নাম পাকিস্তানের গণপরিষদ সদস্য হিসেবে প্রকাশিত হল।

কিন্তু সেই গণপরিষদ সদস্য হিসেবে কাজ করার আমার আর সৌভাগ্য হয়নি। এর মধ্যে একদিন খবর পেলাম মোহন মিয়া করাচী যাচ্ছেন। যেদিন তিনি যাবেন সেদিন আমি তাঁর আরমানীটোলার বাসায় দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি বললেন, আমি ভূট্টো ও মুজিব দু’জনের সাথেই দেখা করব। একটা রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া পাকিস্তান রক্ষা করা যাবে না। মোহন মিয়ার সে ইচ্ছা পূরণ হয়নি। তিনি করাচীতে যাওয়ার কয়েকদিন পরেই ইন্তেকাল করেন। তাঁর লাশ এনে ফরিদপুরেই দাফন করা হয়।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh