Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ১৬ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

একদিন রাত দশটার দিকে হঠাৎ করে টেলিফোন কল পেলাম। মোনেম খানকে গেরিলারা তাঁর বনানীর বাসায় গুলি করেছে। মোনেম খান তখন অবসর জীবন যাপন করছিলেন। রাজনীতির সাথে তাঁর কোন সংশ্রব ছিল না বললেই চলে। গেরিলারা তাঁকে টার্গেট করার বোধ হয় এটাই কারণ ছিল যে, তিনি আইয়ুব খানের প্রিয়ভাজন ছিলেন এবং আগাগোড়া পাকিস্তানী আদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন। মোনেম খানকে পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নেয়া হয়। সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন।

এ মানুষটি এ ভূ-খন্ডে উন্নতির এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। আজও তাঁর উন্নয়নের স্বাক্ষর সর্বত্র নজরে পড়ে।

নভেম্বরের শেষের দিকে পরিস্থিতির নিদারুণ অবনতি হল। গেরিলারা চারিদিক থেকে পূর্ব পাকিস্তানের ভিতর ঢুকে পড়ছিল। আমার কাছে মনে হল আর্মি তাদের সামনে কেমন যেন নিস্ক্রিয় হয়ে পড়েছে। ঢাকা শহরের বেশ কিছু জায়গায় গেরিলারা বোমাবাজী করে বিভীষিকা সৃষ্টি করে। দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে উদ্বেগজনকভাবে হত্যার খবর আসতে থাকে। কলকাতা বেতার থেকে অবিরতভাবে পাকবাহিনীকে আত্মসমর্পন করার উপদেশ দেয়া হয়। মনে হচ্ছিল পুরো পূর্ব পাকিস্তানের আকাশসীমা ইন্ডিয়ার কব্জায় চলে গেছে।

ডিসেম্বরের তিন তারিখে ইয়াহিয়া ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। যুদ্ধ ঘোষণা ইয়াহিয়া কেন করেছিলেন তা বলতে পারব না। এতদিন ইন্ডিয়া গেরিলাদের বুদ্ধি-পরামর্শ ও ট্রেনিং দিয়েছে। গেরিলাদের সাথে মিলে মিশে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু প্রকাশ্যে সে সব কথা অস্বীকার করেছে। এখন ইয়াহিয়ার য্দ্ধু ঘোষণার পর ইন্ডিয়া প্রকাশ্যে হামলা করার সুযোগ পেয়ে গেল।

ইয়াহিয়ার পরামর্শদাতারা পাকিস্তানের মঙ্গল চাইত কিনা জানিনা। তবে এটা নিশ্চিত যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে ইয়াহিয়া অন্ততঃ তাৎক্ষণিকভাবে কোন সুবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছিলেন বলে মনে হয় না।

পাক আর্মির উপর আমাদের যে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল তা লোপ পেতে শুরু করল। আমরা এটুকু বিশ্বাস করতাম যুদ্ধে জয় না হোক ইন্ডিয়ান আর্মিকে অন্তত আমাদের আর্মি ঠেকিয়ে রাখতে পারবে। আসলে ’৬৫সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময় আর্মি যে নেতৃত্ব ও দিক নির্দেশনা পেয়েছিল ’৭১ সালের যুদ্ধে তার কিছুই পায়নি।

এসময় আমার কাজ ছিল সকালে সবুর সাহেবের বাসায় যাওয়া, বিকালে ফিরে আসা। সারাদিন তাঁর সাথে যুদ্ধের গতি-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করতাম। রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবতাম সারা ভারতবর্ষের মুসলমানরা পাকিস্তান বানিয়েছিল। আজ আমার দেশের তরুণরা তাদের পূর্ব পুরুষের ইতিহাসকে কেমন করে মুছে দিতে চাইছে?

ডিসেম্বরের ৭ তারিখ রাতে খবর পেলাম ইন্ডিয়ান আর্মি যশোর শহরে ঢুকে পড়েছে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম যশোর টাউন হলে জনসভা করেছেন। সৈয়দ নজরুল নাকি সেদিনই ঘোষণা দিয়েছিলেন আজ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাংলাদেশের মূলনীতি করা হল।

৮ তারিখ সন্ধ্যায় সবুর সাহেবের কাছ থেকে বাসায় ফিরেই কান্নার রোল আর আহাজারি শুনতে পেলাম। অনেকটা ভড়কে গিয়েছিলাম এই ভেবে কেউ আবার বোমা টোমা ছুঁড়েছে কি না। ঘরে ঢুকেই দেখি আমার পাশের বাড়ীর এক অবাঙ্গালী পড়শীর বৌ বুক চাপড়ে কাঁদছেন আর বলছেন হামারে লাল কো লে আইয়ে। মুক্তি লোগ উসকো মার দিয়া। অর্থাৎ আমার ছেলেকে এনে দাও। মুক্তিবাহিনীর লোকেরা তাকে মেরে ফেলেছে। ঘটনাটা ঘটেছিল এরকম: ছেলেটার নাম ছিল আমিন। গেরিলারা তাকে কিভাবে ধরে নিয়ে সায়দাবাদের কাছে গুলি করে মেরে ফেলে। আর্মিকে বিপদে ফেলার জন্য এটা ছিল এক ফাঁদ, পরে জেনেছিলাম।  গেরিলাদেরই কেউ আমিনকে মারার পর খুব সন্তর্পণে এসে আমিনের মাকে বলে যায়, তোমার ছেলের লাশ সায়দাবাদে পড়ে আছে। আমিনের মা তো কেঁদে আকুল। আমিনের মা যখন আগন্তুক ছেলেটাকে অকুস্থলে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন সে তখন বলে, আমাকে চিনে ফেললে আমার সর্বনাশ হয়ে যাবে। তুমি একটা শাড়ী দাও। সেই শাড়ী পরে আমিনের মার সাথে ছেলেটা রিক্সায় করে সায়দাবাদ পর্যন্ত যায়। তারপর ছেলেটা উধাও হয়ে যায়। ছেলের লাশের পাশে বসে আমিনের মা একা একা হাউমাউ করে কাঁদতে থাকে। তখন বোধ হয় কোন রিকশাওয়ালার মনে দয়ার উদ্রেক ঘটে। সে আমিনের মাকে সায়দাবাদে রেখে তাদের বাড়ীতে এসে খবর দেয়। আমিনের মার খোঁজে বাড়ীতে সবাই উৎকন্ঠিত হয়ে বসেছিল। তখন আত্মীয়-স্বজন মিলে আমিনের মাকে আনতে পুনরায় সায়দাবাদ যায়। সায়দাবাদ তখন একটা বিরান এলাকা। এত জনবসতি সেখানে গড়ে ওঠেনি। যারা আমিনের মাকে আনতে গিয়েছিল তারা লক্ষ্য করে লাশটার আশেপাশে কিছু সন্দেহজনক লোক ঘোরাফেরা করছে। তাদেরও সন্দেহ হয় এখানে নিশ্চয় কোন ষড়যন্ত্র আছে। তাই তারা লাশ না নিয়েই আমিনের মাকে তাড়াতাড়ি করে বাড়ী নিয়ে আসে।

আমি সব ঘটনা শুনে জগন্নাথ কলেজের আর্মি ক্যাপ্টেন মেজর নাসিমকে টেলিফোন করি। নাসিম টেলিফোন পেয়েই আমার বাসায় চলে আসে। কিন্তু সে তৎক্ষণাৎ সায়েদাবাদ না গিয়ে আর্মি হেড কোয়ার্টারের সাথে যোগাযোগ করে। সেখান থেকেই সে বোধ হয় খবর পায় এটা একটা ফাঁদ। লাশ উদ্ধার করতে গেলে বিপদ হতে পারে। আসলে গেরিলারা মনে করেছিল অবাঙ্গালী আমিনের মৃত্যুর খবর পেয়েই আর্মি আসবে এবং তখনই তাদের উপর অতর্কিত হামলা চালানো হবে। নাসিম আমাকে বলল আমার কাছে খবর আছে এটা একটা ট্র্র্যাপ। কাল আমি ওসিকে বলব মিউনিসিপ্যালটির ট্রাকে করে যেন লাশটা নিয়ে আসে। নাসিম আরও বলল আমার নিশ্চিত বিশ্বাস সকালে গিয়ে লাশ পাওয়া যাবে না। আসলেই পরদিন কোন লাশ পাওয়া যায়নি।

আমিনের মা জানতেন না তাঁর ছেলের মত তিনিও দিন কয়েকের মধ্যেই লাশ হয়ে যেতে পারেন।
১৩ তারিখ দুপুরে সবুর সাহেবের বাসায় বসে আছি। চারদিক থেকে পাক আর্মির পরাজয়ের খবর আসছিল। এমন সময় খুলনা থেকে মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী সবুর সাহেবের কাছে টেলিফোন করে এক উদ্বেগজনক খবর দিলেন। তিনি জানালেন ইন্ডিয়ান আর্মি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। দৌলতপুর পর্যন্ত ইন্ডিয়ান আর্মি চলে এসেছে। শুধু শেলিং হচ্ছে। পাক আর্মি তাদেরকে ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু বোধ হয় বেশীক্ষণ প্রতিরোধ টিকবে না।

সবুর সাহেবকে খুব বিচলিত মনে হল। এতদিন তাঁর সাথে চলেছি তবে তাঁর মধ্যে কখনও এরকম অস্থিরতা দেখিনি। খুলনা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে একথা বোধ হয় তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। চিৎকার করে মোহাম্মদ আলীর সাথে কথা বলছিলেন। আমার মনে হচ্ছিল তিনি বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন।

টেলিফোনে সবুর খান মোহাম্মদ আলীকে বললেন তোমরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়ে যাও। ইন্ডিয়ার কাছে তোমরা আত্মসমর্পন করো না। দেখো মোহাম্মদ আলী খুলনায় আমি পাকিস্তানের পতাকা উড়িয়েছিলাম। খুলনা কখনও পাকিস্তানে আসত না। ওখানে ইন্ডিয়ার পতাকা উড়েছিল। খুলনার ডিএমসি বসাক আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করেছিল। আমি পালিয়ে কলকাতায় গিয়ে বাউন্ডারী কমিশনের সামনে খুলনার দাবী তুলে ধরি। তারপরই খুলনা পাকিস্তানভূক্ত হয়। সেই খুলনায় ইন্ডিয়ার পতাকা উড়বে এ আমি সহ্য করব কি করে! আমার চাঁদতারা পতাকার তোমরা কোন অসম্মান হতে দিওনা...।

টেলিফোন রেখে দিয়ে সবুর সাহেব আমার সামনের সোফায় ধপাস করে বসে পড়লেন। মনে হচ্ছিল তিনি যেন থরথর করে কাঁপছেন। আমার পাশে তখন রংপুরের সাঈদুর রহমান বসা। আমাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন খুলনাকে আমি পাকিস্তানভূক্ত করেছিলাম। সেই খুলনার মানুষ এখন আলাদা হতে চায়। পাকিস্তানে আসার জন্য খুলনার মুসলমানরা রোজা রেখেছিল। নামাজ পড়েছিল। এখন তারা পাকিস্তানের বাইরে চলে যেতে চায়। খুলনা ইন্ডিয়ায় থাকলে এদের স্বাধীনতা কোথায় থাকত? আমি কাদের জন্য সংগ্রাম করেছিলাম? ৭০-এর নির্বাচনের সময় এরা আমাকে ভোটও দেয়নি। অথচ খুলনার মানুষের জন্য আমি কি না করেছি।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh