Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ১৭ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

রাত একটার দিকে শাহ আজিজুর রহমানের বাসা থেকে টেলিফোন পেলাম। শাহ সাহেব নিজেই কথা বলছিলেন। আমাকে বললেন ইব্রাহিম, সবুর ভাইয়ের অবস্থা খারাপ। ঢাকা মেডিকেল কলেজে আছেন। এখন তাঁকে দেখতে যেতে হবে। আমি বললাম, এত রাতে যাই কি করে? আমার তো কোন গাড়ী নেই। তাছাড়া রাস্তাঘাট বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। শাহ সাহেব বললেন, আমি গাড়ী নিয়ে আসছি তুমি রেডি থেকো।
শাহ সাহেবের সাথে যখন আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজে পৌঁছি তখন সবুর সাহেব বেডে শুয়ে আছেন। আসার সময় দেখি রাস্তার মোড়ে মোড়ে পাক আর্মি দাঁড়িয়ে আছে। সেই রাতে হাসপাতালের ডাক্তাররা আন্তরিকভাবে সুবর সাহেবকে বাঁচাবার চেষ্টা করছিলেন। বারবার এসে খোঁজ নিচ্ছিলেন কখন তাঁর জ্ঞান ফেরে। সারারাত শাহ সাহেব, সাঈদুর রহমান আর আমি সবুর সাহেবের খাটের পাশে বিনিদ্র বসেছিলাম। চারদিকে তখন শেলিং এর আওয়াজ। ইন্ডিয়ান আর্মি ঢাকার উপকণ্ঠে প্রায় পৌঁছে গেছে। হাসপাতালের মেঝেতে দেখলাম বহুসংখ্যক লাশ পড়ে আছে। সব শেলিং এর শিকার। এদের মধ্যে গেন্ডারিয়ার মুসলিম লীগ নেতা আহসানুল্লাহ সর্দার আর তাঁর ছেলের লাশ চিনতে পারলাম।

ফজরের সময় মেডিকেল কলেজের পাশেই ইন্ডিয়ান প্লেনগুলো বোমা বর্ষণ করল। বোধহয় সবুর সাহেবের কথা তারা জেনে ফেলেছিল। কখন কোথায় কি ঘটত আওয়ামী লীগারদের কল্যাণে ইন্ডিয়ান আর্মি সব জেনে যেত। ইন্ডিয়ান প্লেনগুলো আরও বোমাবর্ষণ করল গভর্ণর হাউসে।
আমাদের তখন জীবন মৃত্যুর সীমানা খুব নিকটতর হয়ে এসেছে। সামনের দিনগুলো যে অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে তা স্পষ্টই টের পাচ্ছিলাম। ভোরের আলো ফুটতেই খাজা খয়রুদ্দীন আর পিডিপি’র শফিকুর রহমান ও আবু সালেক এলেন সবুর সাহেবকে দেখতে। এর মধ্যে সবুর সাহেবের অবশ্য জ্ঞান ফিরেছে। একটু একটু কথা বলছিলেন তিনি।

বোমা বর্ষণের পর আমাদের কাছে মনে হল সবুর সাহেবকে আর হাসপাতালে রাখা নিরাপদ নয়। ব্যাপার হল তাঁর মত মানুষকে যেখানেই রাখা হোক না কেন প্রতিপক্ষ অবশ্যই সেটা জেনে যেতে পারে। পরে আমরা সবাই মিলে অনেক চিন্তা-ভাবনা করে মোহাম্মদপুরে মর্নিং নিউজ পত্রিকার সম্পাদক আজিজুর রহমানের বাসায় তাঁকে রাখার সিদ্ধান্ত নেই। হাসপাতাল থেকে সবুর সাহেবকে ডিসচার্জ করে তাঁকে আজিজুর রহমানের বাসায় রেখে তারপর প্রথমে সবুর সাহেবের ধানমন্ডির বাসায় যাই। তাঁর বাড়ীর কাজের লোকদের ভালভাবে বলে আসি দরজা জানালা সব বন্ধ রাখতে। আর কেউ যদি সবুর সাহেবকে খোঁজ করতে আসে তাহলে পরিষ্কার ‘জানিনা’ বলে দিতে।

সবুর সাহেবের বাসা থেকে আমি শাহ আজিজের বাসায় গেলাম। তাঁকে খুবই উদ্বিগ্ন মনে হল। তাঁকে বললাম, আমাদের তো দিন ফুরিয়ে আসছে। শাহ সাহেব আল্লাহর উপর ভবিষ্যৎ ছেড়ে দেয়ার কথা বললেন।

শাহ সাহেবের বাসা থেকে ফিরে এবার আমার পাড়ার বন্ধু আবু সালেকের বাসায় ঢুঁ দিলাম। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সরে যেতে হলে দু’জনেই একসাথে সরে যাব।

১৪ ডিসেম্বর পুরো ঢাকা শহর থমথম করছিল। কে যে কোন পক্ষে, কার গতিবিধি কি রকম বোঝা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। পাক আর্মি তখন প্রকৃতপক্ষে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। পরে শুনেছি তারা তখন ইন্ডিয়ান আর্মির কাছে সারেন্ডার করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

১৪ তারিখ রাত পার হল উদ্বেগ ও আশঙ্কার মধ্যে। ১৫ তারিখ সকালে আজিমপুর সরকারী কলোনীতে আমার এক ভগ্নিপতি ওহাব সাহেবের বাসায় গেলাম। বোনের খোঁজ নেয়ার জন্যই আমি সেখানে গিয়েছিলাম। ওহাব তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব। তাঁর বাসায় পরিচয় হল একই মন্ত্রণালয়ের অরবিন্দু বাবু নামে আর এক উপ-সচিবের সাথে। অবস্থার কারণে তিনি এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

আমি মুসলিম লীগ করি শুনে তিনি যেন সাপ দেখার মত আঁতকে উঠলেন। অনেকটা ফোঁস করে বলে উঠলেন: এখনও মুসলিম লীগ! আমি বললাম, অরবিন্দু বাবু কেন এসব কথা বলছেন? পাল্টা তিনি বললেন, বলব না কেন? মুসলিম লীগই তো এদেশটাকে শেষ করেছে।
বুঝতে পারছিলাম অরবিন্দু বাবু হাওয়ার গতি দেখে কথা বলা শুরু করেছেন। আমি তাঁকে বললাম দেখেন কারা শেষ করেছে বা করেনি সেটা এখন বিচার করার সময় নয়। আমি আজও বিশ্বাস করি মুসলিম লীগ একটা আদর্শ। এই আদর্শের জন্য আমি চিরদিন কাজ করেছি। এতে আমার সামান্যতম লজ্জা নেই। মুসলিম লীগ এ দেশের মানুষের জন্য কি করেছে তা ইতিহাস বিচার করবে। এদেশে যদি মুসলিম থাকে মুসলিম লীগও থাকবে।

জানিনা অরবিন্দু বাবু আমার কথায় খুশী হতে পেরেছিলেন কি না। তবে তখনকার পরিস্থিতিতে যে তিনি আমার কথায় মনে মনে কৌতুকের হাসি হেসেছিলেন তা এখন স্পষ্ট বুঝতে পারি।
বাসায় ফিরে এসে ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবের কাছে টেলিফোন করলাম। হেকিম ইরতেজাউর রহমান বললেন ইব্রাহিম, আমার তো পালাবার কোন জায়গা নেই। তাছাড়া বৌ ছেলেমেয়ে নিয়ে কোথায় যাব! আমি তো কোন অন্যায় করিনি। পাকিস্তান আমার আদর্শ, তার জন্য আমি কাজ করেছি। এটা কোন অপরাধ নয়।

হেকিম সাহেব পরে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পন করেছিলেন। তারা তাঁকে জেলে পাঠিয়ে দিয়েছিল।  তিনি ছিলেন বাংলাদেশে দ্বিতীয় পাকিস্তানপন্থী কারাবন্দী। প্রথমজন ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হকের ছেলে ফয়জুল হক। ফিরোজ আহমদ ডগলাসের কাছে টেলিফোন করার পর তিনি আমাকে বললেন, ইব্রাহিম ভাই আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আমি আমার এক মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুর সাথে ব্যবস্থা করে ফেলেছি। আমি ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছি। ডগলাসের সাথে আমাদের মুসলিম লীগের এক কর্মী আবদুল বারীও ছিল।

ইসলামপুরে আমাদের এক কর্মী মোবারকের বাসায় টেলিফোন করলাম। তিনি একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতেন। কিন্তু কর্মী হিসেবে তাঁর তুলনা ছিল না। তিনি আমার কাছে তাঁর অসহায়ত্বের কথা জানালেন। বললেন, ইব্রাহিম ভাই কোথায় আর যেতে পারি। পাকিস্তানের জন্য যদি মৃত্যু হয় তবে আল্লাহ যেন তা কবুল করেন।

কয়েকদিন পর আমি তাঁর দুঃখজনক মৃত্যুর কথা শুনে মনে প্রচন্ড আঘাত পাই। পাক আর্মির আত্মসমর্পনের পরপরই এলাকার গেরিলারা তাঁকে খুঁজতে শুরু করে। বাঁচবার জন্য তিনি তাঁর বাড়ীর এক রুমের ফ্লোর খুঁড়ে গর্ত করেছিলেন। তিনি সেই গর্তের মধ্যে লুকিয়েছিলেন। কিন্তু মৃত্যু বোধ হয় তাঁকে তাড়া করে ফিরছিল। খোঁড়া হওয়ায় চলাফেরার জন্য তাঁকে একটি লাঠি ব্যবহার করতে হত। সেই লাঠিটা দেখেই গেরিলাদের সন্দেহ জাগে নিশ্চয় মোবারক বাসার ভিতর কোথাও লুকিয়ে আছেন। পরে খুঁজতে খুঁজতে তারা তাঁকে পেয়ে যায়।

রিভলবারের গুলিতে তাঁর শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল। লাশ তারা সদরঘাটে কয়েকদিন ফেলে রেখেছিল প্রদর্শনীর জন্য। আমার তখন মনে হয়েছিল এই সদরঘাটে বাহাদুর শাহ পার্কে ১৯৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের সময় ইংরেজরাও মুসলমানদের লাশ ঝুলিয়ে রেখেছিল।

১৬ ডিসেম্বর সকালে শুনতে পেলাম পাক আর্মি আত্মসমর্পন করবে। দুঃখ ও বিষাদের মধ্যে আমি নির্মমভাবে উপলব্ধি করলাম ত্রিশ বছর ধরে যে আদর্শের জন্য কাজ করেছি, যে পাকিস্তানের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েছি, মৃত্যুর সাথে জানবাজী রেখেছি, কোন ত্যাগ স্বীকারে পিছপা হইনি, আজ আমাকেই দেখতে হচ্ছে পাকিস্তানের করুণ পরিণতি।

সে সকালে আরও ভেবেছিলাম পাকিস্তানের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় হয়ত অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি ছিল। হয়ত আমাদের অনেকের স্বপ্ন পাকিস্তানের মাধ্যমে পরিপূর্ণ হতে পারেনি কিন্তু তাই বলে পাকিস্তানের প্রতি ভালবাসায় আমাদের কোন খাদ ছিল না।  পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়া সেদিন আমার মত অনেকের কাছেই ছিল দুঃস্বপ্নের দীর্ঘ রজনীর মত।

সে দিন সকালে সবুর সাহেব টেলিফোন করে আমাকে বললেন, সর্বনাশ হয়ে গেছে ইব্রাহিম। তোমরা সব বেরিয়ে পড়। ইন্ডিয়ান আর্মি আর তার সহযোগী গেরিলারা এবার মুসলমানদের কচুকাটা করবে।

আমি মালেক সাহেবের কাছে টেলিফোন করে বললাম এখনতো বাসায় থাকাটা নিরাপদ নয়। আপনি আমার বাসায় চলে আসুন।
আমার বাড়ীর কাছে মুসলিম লীগের এক প্রাক্তন এমএনএ মাহতাবউদ্দিন থাকতেন। তাঁর কাছে টেলিফোন করলাম। মাহতাব বললেন, ইব্রাহিম ভাই আমি রায়ের বাজারের কাছে এক আত্মীয়ের বাসায় যাচ্ছি। ইনশাআল্লাহ কোন অসুবিধা হবে না। ১৬ তারিখ সকালেই আমার পরিচিত আর্মির এক ক্যাপ্টেন নাজির হোসেন এল আমার বাসায়। সে ডিআইটির টেলিভিশন কেন্দ্র পাহারা দিত। সে বলল, আর্মি সারেন্ডার করতে যাচ্ছে। আপনিও আমাদের সাথে চলুন। নয়ত আপনার অনেক বিপদ হবে।
আমি বললাম, ধন্যবাদ। আমার জন্য ভেবো না। আমি আমার সব ব্যবস্থা করব। যাওয়ার সময় সে তার কাপড় চোপড়ের স্যুটকেসটা বাসায় রেখে গেলো। বলল পরে নিয়ে যাব।

আর্মির সারেন্ডারের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমার বাসার পাশে ছিল বিপুল সংখ্যক বিহারীর বাস। সারেন্ডারের কথা শুনে তাদের বাসা থেকে যে গগণবিদারী কান্নার রোল উঠল তা কখনই ভুলবার নয়। গেরিলারা যে তাদের সর্বস্ব শেষ করে দেবে তা তারা তখনই বুঝতে পেরেছিল।

সকাল ৯টার দিকে সালেক এলেন। আমরা দু’জন আমারই পরিচিত এক বন্ধু ও আত্মীয় দক্ষিণ মৈষুন্ডীর এস.এ. চৌধুরীর বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। এতদিন ঢাকা শহরে আছি। কোনদিন এভাবে জীবন বাঁচানোর জন্য নিরূপায় অসহায়ত্বের মধ্যে অন্যের আশ্রয় ভিক্ষা করতে হবে সে কথা ক্ষণিকের জন্যও চিন্তা করিনি। কোনদিন ভাবতেও পারিনি নিজের দেশের মাটিতে এমনি করে পরবাসী হয়ে উঠব।

এস.এ. চৌধুরীর বাসায় গেলাম অনাহুতের মত। যতখানি আশা করেছিলাম চৌধুরী ঠিক ততখানি আন্তরিকভাবে আমাদের গ্রহণ করলেন না। পরিস্থিতিই এজন্য দায়ী। চৌধুরীর ব্যবসা-বাণিজ্যে আমি এতদিন তাঁকে সহযোগিতা করেছি।

চৌধুরীর চেয়ে তাঁর স্ত্রীকে দেখলাম এক হাত বাড়া। মহিলা হয়ত আমাদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার জন্য আজগুবি সব কথা বলতে লাগলেন।
তাদের বাসায় আমরা বিকাল পর্যন্ত ছিলাম। মনে মনে শঙ্কিত হয়ে উঠেছিলাম এখানে থাকা নিরাপদ নয় ভেবে। হয়ত এরাই শেষে আমাদের প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দিবে। আমরা তখন পুরানো পল্টনের এস.এম. ইউসুফের সাথে যোগাযোগ করলাম। তখন তিনি ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব। তাঁর দু’ছেলে গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। একবার আর্মি তাদের ধরে ফেললে আমি আর সালেক ছেলে দু’টোকে উদ্ধার করেছিলাম। সালেক বললেন হয়ত কৃতজ্ঞতার খাতিরে তিনি আমাদের আশ্রয় দিবেন। ইউসুফ দেখলাম আমাদের ভোলেননি। তিনি একটা জীপ পাঠিয়ে দিলেন। জীপটা চালিয়ে নিয়ে এসেছিল কয়েকজন গেরিলা। বিপদে পড়লে মানুষের যে কত রকমের চেহারা দেখা যায় তখন তা বুঝতে পারলাম।

ইউসুফের পাঠান জীপে করে যখন গভর্ণর হাউসের পাশ দিয়ে যাচ্ছি তখন দেখলাম ইন্ডিয়ান আর্মির কনভয় ডেমরার দিক দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে ক্যান্টনমেন্টের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আর আমাদের জীপের গেরিলারা ‘জয় বাংলা’ বলে এক একবার চিৎকার করছে। কয়েকবার গাড়ী থামিয়ে গেরিলারা ইন্ডিয়ান আর্মিকে অভিনন্দন জানাতে ছুটে গেল। তারা কয়েকবার ইন্ডিয়ান সৈন্যদের বুকে জড়িয়ে ধরল। আমরা স্থবির হয়ে বসে রইলাম। মনে হল স্বপ্ন দেখছিনাতো! আমরা কি এখনও বেঁচে আছি?

ইউসুফের বাসায় গিয়ে পৌঁছেছিলাম সন্ধ্যার দিকে। তিনি আমাদেরকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেললেন। বললেন, একি সর্বনাশ হয়ে গেল। আমার ছেলেরা আজকে যে মোহে ডুবে আছে, কিছুদিনের মধ্যেই সে মোহ ভঙ্গ হবে ইব্রাহিম ভাই। ওরা জানেনা ওরা মুসলমানদের কত বড় ক্ষতি করল। কথায় কথায় তিনি বললেন তাঁর ছেলে দুটো এখনও ঢাকায় পৌঁছেনি। সাভার হয়ে যে ইন্ডিয়ান আর্মির কনভয় আসছে তাদের সাথেই ওরা আসবে।

রাত ১১টার দিকে হঠাৎ হৈ চৈ আর কান্নার রোল শুনতে পেলাম। ইউসুফের বাসার সামনে ছিল একটা খোলা জায়গা। দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলাম সেই খোলা জায়গায় কিছু সংখ্যক অবাঙ্গালীকে দাঁড় করানো হয়েছে গুলি করে মারার জন্য। কয়েকজন গেরিলা স্টেনগান তাক করে আছে তাদের বুক ও মাথা বরাবর।

অবাঙ্গালীদের পোষাক-আশাক দেখে মনে হল তারা খুব সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকজন হবে। তাদের বৌ ছেলে-মেয়েরা তখন গেরিলাদের কাছে মিনতি করে চলেছে সব কিছুর বিনিময়ে প্রাণ ভিক্ষা দেওয়ার। নিজের চোখে দেখলাম এই সব মেয়ে নিজেদের অলঙ্কার ছুঁড়ে দিচ্ছে গেরিলাদের দিকে। কিন্তু গেরিলাদের অন্তরে সামান্যতম করুণার উদ্রেক হয়নি। এক এক করে তারা সেই রাতে সবগুলো পুরুষকে গুলি করে মেরে ফেলল। নিহতদের বৌ ছেলে মেয়ের ভাগ্যে পরে কি ঘটেছিল তা আর কখনও জানতে পারিনি। এদের অপরাধ ছিল এরা অবাঙ্গালী। এই হত্যাকান্ডের নির্মম দৃশ্য দেখে আমি হতচকিত হয়ে পড়েছিলাম। সালেক বললেন, এখানে আমাদের অবস্থান বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে যে কোন সময়। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ধানমন্ডিতে সালেকের ভায়রা শামসুল আলমের বাসায় চলে যাব। ইউসুফকে বললাম ভাই এখানে তো আমরা আর কোনভাবেই নিরাপদ বোধ করছি না। তাছাড়া আপনার গেরিলারা কখন এসে পড়বে তাও বুঝতে পারছি না। তারা কিভাবে আসবে, কিভাবে আমাদের গ্রহণ করবে একেবারেই বলা মুশকিল। ইউসুফ আমাদের কথার গুরুত্ব বুঝতে পারলেন। তিনি নিজে সেই রাতে তার শ্যালক মাহফুজুর ইসলামকে ডেকে নিয়ে আসলেন। মাহফুজ রেডিও পাকিস্তানের উচ্চ পদস্থ কর্মচারী ছিলেন। ইউসুফ তাঁকে বললেন, ভোর চারটার দিকে আমাদের দু’জনকে ধানমন্ডিতে পৌঁছে দিতে হবে। মানুষ যেমন মানুষের শত্রু হয় কখনও কখনও তেমনি মানুষই মানুষের কল্যাণে এগিয়ে আসে-সেই রাতে মাহফুজ সাহেবের ব্যবহারে অন্তত তাই মনে হল। তিনি আমাদেরকে তখনি তাঁর নিজের বাসায় নিয়ে গেলেন। ইউসুফের বাসার কাছেই ছিল তাঁর বাসা। দীর্ঘক্ষণ তিনি আমাদের সময় দিলেন। ভোর সাড়ে তিনটার সময় নিজের গাড়ীতে করে আমাদের নিয়ে চললেন ধানমন্ডির দিকে। পুরানো পল্টন থেকে তিনি সোজাসুজি ধানমন্ডি না গিয়ে ইউনিভার্সিটির ভিতর দিয়ে রওনা হলেন। শীতের রাত। হঠাৎ হঠাৎ গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। বুঝলাম কোথাও কোন অঘটন ঘটছে। তবে আমাদের জন্য আরও বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছিল। রাত চারটার দিকে শামসুল আলমের বাসায় গিয়ে যখন উঠলাম তখন দেখি তিনি আমাদের দেখে ভূত দেখার মত কেঁপে উঠলেন। আমাদের দেখেই তিনি সোজাসুজি বলে ফেললেন আপনারা এখানে কেন?

সালেক তাঁর আপন ভায়রা। আত্মীয়ের সাথে মানুষ কত প্রীতিহীন আচরণ করতে পারে সেটা আবার নতুন করে দেখলাম। শামসুল আলম বললেন, আপনারা আমাকে খুব বড় বিপদে ফেললেন। আপাতত থাকেন কিন্তু বেশীক্ষণ আমি আপনাদের আশ্রয় দিতে পারব না।
তারপর তিনি তাঁর বাড়ীর পিছনের একটা ছোট্ট ঘরে অত্যন্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের থাকার ব্যবস্থা করলেন।

ভোরে উঠে বুঝলাম এ বাড়ীটা মূলতঃ আওয়ামী লীগের আস্তানা। আমরা ঘরের মধ্যে চুপচাপ বসে ছিলাম। হঠাৎ দেখি ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি দিতে দিতে দুই গাড়ী ভর্তি  কতকগুলো তরুণ তরুণী এসে বাড়ীটার সামনে থামল। তাঁরা বলাবলি করছে রেসকোর্সে গিয়েছিলাম। অমুক কর্ণেলকে মালা পরিয়েছি। অমুক ক্যাপ্টেনকে মিষ্টি খাইয়েছি। আমরা ভাবছিলাম এ কোথায় এসে পড়লাম। এর মধ্যে শামসুল আলম আমাদের ঘরে ঢুকলেন। আমার কাছে ছিল একটা ছোট্ট রেডিও। আমি তখন পাকিস্তানের খবর শুনছিলাম। রেডিওর আওয়াজ পেয়েই বোধ হয় তিনি ঢুকেছিলেন।

আমাকে অনেকটা ধমকানোর সুরে বললেন, এখনও পাকিস্তান! এসব বন্ধ করুন। এখানে আপনাদের থাকা মোটেই নিরাপদ নয়।
উপায়ান্তর না দেখে টেলিফোন করলাম আমার এক আত্মীয় ইঞ্জিনীয়ার এস আর খানের বাসায়। বললাম নিজেদের অসহায়ত্বের কথা। তিনি আধা ঘন্টার মধ্যে আসছেন বলে টেলিফোন রেখে দিলেন। সত্যি সত্যি কিছুক্ষণের মধ্যে এস আর খানের স্ত্রী-যিনি সম্পর্কে আমার বোন-গাড়ী নিয়ে হাজির হলেন। তাঁর বাসা ছিল জিগাতলা মোড়ের কাছাকাছি। আমি আর সালেক আমাদের নতুন আশ্রয়ে গিয়ে উঠলাম। এস আর খান নিজে সমাদর করা শুরু করলেন। আমাদের যাতে কোন অসুবিধা না হয় সব সময় তার খোঁজ-খবরও নিতে লাগলেন। তাঁর এক কথা আমাদের উপকার করতে পারলে তিনি আনন্দিত হবেন।

যেদিন এস আর খানের বাসায় এসে উঠেছিলাম তার পরের দিন বিকেলের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। হঠাৎ বাইরে হৈ চৈ শুনে বারান্দায় গিয়ে দেখি ইন্ডিয়ান আর্মি কিছু লোককে ধরে বেদম প্রহার করছে। জায়গাটা ঠিক বর্তমানের ইন্ডিয়ান হাইকমিশনের উল্টো দিকে। আজকের ইন্ডিয়ান হাই-কমিশন বিল্ডিংগুলো ছিল বিখ্যাত তিব্বত কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রির মালিকের। মালিক অবাঙ্গালী ছিলেন। শুধু এ অপরাধে ইন্ডিয়ান আর্মি ও গেরিলারা বাড়ীর মালিককে উৎখাত করে এবং নির্বিচারে লুটতরাজ করে। পরে শেখ মুজিব এ বাড়ীগুলো ইন্ডিয়ান হাইকমিশনকে বরাদ্দ দেন। ইন্ডিয়ানরা যখন লুটতরাজ চালাচ্ছিল তখন ঐ বাড়ীর সামনে দিয়ে কিছু লোক কতকগুলো গরু নিয়ে যাচ্ছিল পিলখানার দিকে। দীর্ঘদিন ধরেই পিলখানায় এই এলাকার গরু জবাই হত ব্যবসায়িক ভিত্তিতে। গরু জবাইয়ের কথা শুনে ইন্ডিয়ান আর্মি দারুণ ক্ষেপে যায় এবং গোশত ব্যবসায়ীদের উপর তখন চড়াও হয়।

গরুগুলো ইন্ডিয়ান আর্মি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ছেড়ে দেয় আর ব্যবসায়ীরা প্রাণভয়ে দ্রুত ঐ স্থান ত্যাগ করে। বুঝলাম মানুষের চেয়ে এখন গরুর ইজ্জত অনেক বেশী।

এস আর খানের বাসায় আমাদের কোন অসুবিধা হয়নি। রেডিও শুনে, খবরের কাগজ পড়ে আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভাবনায় আমাদের দিনগুলো কাটছিল। এর মধ্যে হঠাৎ দেখি ইন্ডিয়া ফেরৎ খালেদ মোশাররফ এস আর খানের বাসায় হাজির। তিনি ছিলেন এস আর খানের আপন ভাগ্নে। যুদ্ধ থেকে ফিরে মামার বাসায় উঠলেন।

একই বাসায় আমরা আর খালেদ মোশাররফ কয়েকদিন কাটিয়েছিলাম। আমরা তাঁর পরিচয় জানলেও তিনি আমাদের সম্পর্কে বিন্দু-বিসর্গও জানতেন না। আমরা দু’জন তাঁর মামীর দিকের আত্মীয় এটুকু তিনি শুনেছিলেন। দেখলাম খালেদ মোশাররফের মাথার সামনের দিকে একটা গুলির দাগ। শুনলাম যুদ্ধেই গুলিটা এসে লেগেছিল। অল্পের জন্য তিনি রক্ষা পান। ইন্ডিয়াতে চিকিৎসা করিয়ে আসতে তাই একটু দেরী হয়েছে। তাঁর সাথে আমাদের দেখা হত খাওয়ার টেবিলে। তখন তাঁর সাথে কিছু কিছু আলাপ হত। তাঁর সাথে আলাপে যেটুকু আমার কাছে পরিষ্কার হয়েছিল যে খালেদ মোশাররফ ইন্ডিয়ান আর্মির ব্যাপক লুটতরাজ পছন্দ করতে পারছিলেন না। পাক আর্মির ফেলে যাওয়া কোটি কোটি টাকার সমরাস্ত্র যেভাবে ইন্ডিয়া লুটে নিচ্ছিল তাঁর কথায় মনে হত তিনি এসবের বিরোধী।

এদিকে বাসায় অনুপস্থিত থাকায় আমার এলাকার গেরিলারা আমাকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে। গেরিলারা অবশ্য কোন কুমতলবে আমাকে খোঁজেনি। যুদ্ধের সময় আর্মির হাত থেকে যে সব গেরিলাকে আমি উদ্ধার করেছিলাম তারাই কৃতজ্ঞতা বশতঃ আমাকে বাসায় ফিরিয়ে নিতে উদ্যোগী হল। এদের মধ্যে আবার আমার শ্যালক সাধনও ছিল। আর ছিল মাসুদ খান। জিলু, রাজা আমার স্ত্রীর কাছ থেকে কিভাবে ঠিকানা বের করে একদিন বিকেলের দিকে ৫/৬ জন গেরিলা অস্ত্রশস্ত্রসহ জীপে করে এস আর খানের বাসায় হাজির। এস আর খানের স্ত্রী এতগুলো সশস্ত্র মানুষকে দেখে ঘাবড়ে গেলেন। বাড়ীর সামনের গেটেই গেরিলাদের সাথে তার তর্ক বেধে গেল। তিনি যতই বলেন ইব্রাহিম সাহেব বলে এখানে কেউ নেই ততই গেরিলারা বলতে লাগল আমরা সব খবর নিয়েই এসেছি। এস আর খানের স্ত্রী তবুও অনড়। এর মধ্যে খালেদ মোশাররফ এসে হাজির। তিনি গেরিলাদের উদ্দেশ্য করে বললেন, তোমরা এখানে কি চাও? তাঁর কথা শেষ না হতেই আগত তরুণেরা বলল, এখানে আমাদের এক মুরুব্বী আছেন। তিনি আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছেন। আমরা তাঁকে নিতে এসেছি।
এবার খালেদ মোশাররফের পাল্টা প্রশ্ন, কে তোমাদের মুরুব্বী?
তাদের কণ্ঠে নিষ্কম্প উচ্চারণঃ ইব্রাহিম হোসেন।
খালেদ মোশাররফ তখন বললেন, ও তিনি তো উপরেই আছেন। তোমরা উপরে এসো। সবকিছু যেন নাটকীয়ভাবে ঘটে যাচ্ছিল। এস আর খানের স্ত্রী ঘটনার আকস্মিকতায় হতচকিত।

গেরিলারা উপরে উঠে এসে প্রথমেই আমাকে কদমবুসী করল। তারপর প্রায় সবাই এক সাথেই বলল, আপনি কেন এখানে এসেছেন। আপনি না হলে আমাদের অনেকেই জানে বাঁচত না। অনেকের সর্বস্ব শেষ হয়ে যেত। আপনার জন্য আমাদের এখন কিছু করবার সময় এসেছে।

গেরিলারা খালেদ মোশাররফের কাছে আমার পরিচয় দিয়ে বলল, ইনি মুসলিম লীগের খুব বড় নেতা। তাঁর জন্যই আমরা বেঁচে আছি। খালেদ মোশাররফ একটু অবাক হয়ে বললেন: মুসলিম লীগের নেতা তোমাদের উপকার করেছে? একরাশ বিস্ময় ঝরে পড়ল তাঁর চোখ থেকে।
আমি তখন খালেদ মোশাররফকে বললাম দেশের মানুষের জন্য আমরা রাজনীতি করেছি। দেশের মানুষকে বাঁচাবোনা তো কাকে বাঁচাবো? তবে ভারতীয় ষড়যন্ত্রকে আমরা কখনও মেনে নিতে পারিনি।

খালেদ মোশাররফ তখন আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন আপনাদের সম্পর্কে আমার ভুল ধারণা ছিল। আজ বুঝলাম আপনারাও দেশপ্রেমিক। দেশপ্রেম কারও একচেটিয়া সম্পত্তি নয়।

সেদিন ২৮শে ডিসেম্বর সন্ধ্যাবেলায় গেরিলারা আমাকে বাসায় নিয়ে এল। এতদিন অনেক কিছুর খবর রাখতে পারিনি। আমাদের দলের কে কোথায় আছেন তাও বুঝতে পারছিলাম না। খালি মনে হচ্ছিল আমি যেন অন্ধকারের বাসিন্দা হয়ে গেছি। বাসায় ফিরে আসার পর আশেপাশের কিছু অবাঙ্গালী প্রতিবেশী আমার সাথে দেখা করতে আসে। তাদের চোখে মুখে উদ্বেগের কালো ছায়া। তাদের মুখেই শুনলাম গেরিলারা তাদের উপরে কয়েক দফা চড়াও হয়েছে। তাদের বাড়ীঘর লুটতরাজ করেছে। শুনলাম তাদের অনেক আত্মীয়-স্বজনকে গেরিলারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে।

ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের লোকজন ইন্ডিয়া থেকে ফিরে আসতে শুরু করেছে। একদিন শুনলাম মুজিবও পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে ঢাকার দিকে রওনা দিয়েছেন। বলা প্রয়োজন মুজিব পাকিস্তান থেকে সরাসরি ঢাকায় আসেননি। তিনি প্রথমে যান লন্ডন সেখান থেকে দিল্লী, পরিশেষে ঢাকা। দিল্লীতে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার মুজিবকে বিরাট সম্বর্ধনা দেয়। এটা খুবই স্বাভাবিক ছিল। কেননা ইন্ডিয়া যা কোনদিন চিন্তা করতে পারেনি, মুজিবের কারণে তাদের সেই স্বপ্ন সফল হয়েছিল। ১৬ই ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের পতনের পর ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় দেয়া এক বক্তৃতায় বলেছিলেন আমরা হাজার বছরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছি। এই হাজার বছর বলতে ইন্দিরা মুসলমানদের হাতে বারবার হিন্দুর পরাজয়ের কথা বুঝিয়েছিলেন। একথা সত্য হাজার বছরে হিন্দুরা কখনও সম্মুখ যুদ্ধে মুসলমানদের পরাজিত করতে পারেনি। ইন্দিরার এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠে গেরিলাদের পরিচালিত ‘স্বাধীনতার যুদ্ধে’ কেন ইন্ডিয়া নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিল। কারও স্বাধীনতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রতি যদি ইন্ডিয়ার শ্রদ্ধাই থাকত তাহলে ইন্ডিয়ার ভিতরে স্বাধীনতাকামী অনেক জাতি গোষ্ঠী রয়েছে তাদেরকে তারা মুক্ত করে দিত। দিল্লীর রামলীলা ময়দানে মুজিবের সম্মানে আয়োজিত এক বিরাট জনসভায় বক্তৃতার সময় প্রথমে তিনি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র সম্বন্ধে একটা আভাস দেন। ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শেই মুজিব ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্রের মূলনীতি হিসাবে এই জনসভায় সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ এবং গণতন্ত্রের কথা বলেছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতারা যে কয়েকদিন ঢাকায় এসে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেনি সে কয়েকদিন প্রশাসন চলতে থাকে ইন্ডিয়ান আর্মির নির্দেশে। কয়েকজন ইন্ডিয়ান আমলাও এসেছিলেন নতুন দেশের প্রশাসনিক কাঠামো কিভাবে গড়ে উঠবে সে সম্পর্কে গাইড লাইন দিতে। এদের মধ্যে পি.এন.হাসকার ও ডি.পি. ধরের নাম মনে পড়ছে।

রেডিও এবং কাগজে এ সময়ে সমানে প্রচার চালানো হচ্ছিল আমরা যারা পাকিস্তানপন্থী তাদেরকে দালাল বলে। যত রকম মিথ্যা ভাষণ ও মিথ্যা প্রচার চলতে পারে তাই চলছিল আমাদেরকে নিয়ে অব্যাহত গতিতে।

একদিন শুনলাম উপনির্বাচনে যাঁরা এমএনএ ও এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন তাঁদেরকে আত্মসমর্পন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাঁদের জন্য সময়ও বেধে দেয়া হয়েছিল। কেউ আত্মসমর্পন না করলে তাঁর যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয়েছিল।

আমার গ্রামের বাড়ীতে থানা থেকে পুলিশ গিয়ে আমার সম্পত্তির খোঁজ খবর নিয়ে এসেছে শুনতে পেলাম। এদিকে গেরিলারা যদিও আমাকে নিয়ে এসেছিল কিন্তু তারাতো আমাকে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা কখনও দিতে পারত না। তাছাড়া কয়েকজন গেরিলা কি করতে পারে! কে কখন আমার উপর চড়াও হয় সে ব্যাপারে কিছুই বলা সম্ভব ছিল না। এরকম অরাজক পরিস্থিতিতে বাড়ীর সবার নিরাপত্তার কথা ভেবে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিলাম। এ সময় ঢাকার এসপি আব্দুস সালাম ছিলেন আমার পূর্ব পরিচিত। তাঁকে আমার স্ত্রী সব কথা খুলে বললে তিনি বললেন, কাল সকাল ১০টায় আপনার বাড়ীতে আসব। তারিখটা ছিল ১৯শে জানুয়ারী ১৯৭২। এসপি সাহেব ১০টার দিকে আসতে পারেননি। আমিত সকাল থেকে প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি। সাড়ে বারোটার দিকে তিনি টেলিফোন করে বললেন, জেলের ভিতর একটা গন্ডগোল হয়েছিল, মিটমাট করতে দেরী হয়ে গেছে। আমি এখুনি আসছি। আমাকে বিদায় দেওয়ার জন্য আমার আত্মীয়-স্বজন অনেকেই এসেছিল। আমার প্রতিবেশীরাও কেউ কেউ এসেছিল। সবচেয়ে অসুবিধা হল আমার বাচ্চাগুলোকে নিয়ে। মাসুম বাচ্চারা যখন তাদের আব্বার জেলে যাওয়ার কথা শুনে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল তখন পরিস্থিতিটা সত্যিই অন্যরকম হয়ে গেল। রাজনীতির জন্য বাচ্চাদের কখনোই সময় দিতে পারিনি, আজ তাদের চোখের পানিতে আমার বুকটাও কেমন যেন সবকিছুর অজান্তে মোচড় দিয়ে উঠল।

আমার জেলে যাওয়ার দৃশ্য দেখে আর যারা সবচেয়ে বেশী ব্যথিত হয়েছিল তারা হল অবাঙ্গালী প্রতিবেশীরা। এতদিন তারা সুদিনে-দুর্দিনে আমাকে নির্ভরযোগ্য বন্ধু মনে করত। আজ আমাদের সবার এ ভাগ্য বিপর্যয়ের দিনে আমার জেলে চলে যাওয়াকে তারা অত্যন্ত মর্মঘাতী হিসেবেই বিবেচনা করছিল।

এসপি সাহেব আমাকে নিয়ে জেলে পৌঁছলেন। তখন জেলার ছিলেন নির্মল রায় বলে এক হিন্দু ভদ্রলোক। রায় বাবুকে আমি আগের একটি ঘটনার কারণে কিছুটা চিনতাম। এবার এসপি সাহেব তাঁর কাছে নতুন করে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন তাঁর আত্মীয় এবং সাবেক এমএনএ হিসেবে। রায় বাবু শুনেছি আমাদের মত পাকিস্তানপন্থীদের মনে মনে পছন্দ করতেন না। কিন্তু উপরে উপরে আমার সাথে ভাল ব্যবহারই করলেন। হতে পারে এসপি সাহেবের সুবাদে তিনি এমনটি করেছিলেন। এসপি সাহেব রায়কে বললেন জেলের মধ্যে আমাকে যেন একটা ভাল জায়গা দেয়া হয়। রায় বাবু বললেন, জেলের ধারণক্ষমতা এক হাজার ৯শ জনের অথচ কয়েদী ঢুকানো হয়েছে ১২ হাজার। কোথায় যে কাকে জায়গা দেব কিছুই বুঝতে পারছি না। রায় বাবু তবুও এসপি সাহেবের খাতিরে একটা জায়গায় আমাকে দেয়ার কথা বললেন।

আমি কয়েদী হিসেবে জেলের মধ্যে ঢুকলাম। এতদিন শুনে এসেছি রাজনীতিবিদদের অভিজ্ঞতা ও পরিপক্কতা অর্জনের জন্য জেল একটা উত্তম স্থান। পৃথিবীর অনেক বড় বড় রাজনীতিবিদই জেলের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন-সেটুকু ভেবে এই দুর্বিপাকের দিনে সান্তনা পাওয়ার চেষ্টা করলাম।

রায় বাবু তাঁর এক সুবেদারকে ডেকে আমাকে একটা ভাল জায়গার ব্যবস্থা করে দিতে বললেন। সুবেদার আমাকে নিয়ে গেল ফাঁসির সেলে। পাকিস্তানপন্থীদের জেলে ঢুকানোর আগে এসব জায়গায় সাধারণত ফাঁসির আসামীদের রাখা হত। একটা ছোট্ট রুম। জানালা নেই। সামনের দিকে একটা বড় লোহার দরজা। শ্বাস-প্রশ্বাস নিতেও কষ্ট হয় সেখানে।

সেই ঘরের ভিতর দেখলাম এক পাশে কম্বল পাতা। ভাবলাম আমার মতই কোন দালালের শোয়ার জায়গা হবে। ঘরের অন্য পাশে আমার বিছানা করার চিন্তা করছি। এমন সময় এক তরুণ এসে আমাকে বলল আমি সবকিছু করে দিচ্ছি। কিচ্ছু ভাববেন না। তারপর সে আমাকে আর কিছু ভাববার সুযোগ না দিয়ে সুন্দর পরিপাটি করে বিছানা তৈরী করে দিল। তরুণটির এ অযাচিত বদান্যতা দেখে অবাক হলাম। তার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই সে আমাকে বলল আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। দেশের জন্য কি না করেছি। অথচ ইন্ডিয়ান আর্মি আমাদের জেলে ঢুকিয়ে দিল। আমি তখন বুঝলাম এরা দেশ স্বাধীনের দোহাই দিয়ে এমন লুটপাট শুরু করেছিল যে, ইন্ডিয়ান আর্মি পর্যন্ত বাধ্য হয়ে শান্তি-শৃঙ্খলার স্বার্থে এদের জেলে ঢুকিয়েছে। আজ আমার জেলে আসতে দেরী হয়েছিল এদের জন্যই। এসপি সাহেব এদের গন্ডগোলের কথাই বলেছিলেন। জেলে ঢুকেও এরা পুলিশের সাথে গন্ডগোল করছিল। দেশ স্বাধীন করেছে তারা। আর তাদেরই জেলে ঢুকানো হয়েছে। এত বড় স্পর্ধা। পুলিশ গন্ডগোল থামানোর জন্য গুলিও চালিয়েছিল।

তরুণটির বদান্যতার কারণ কিছুক্ষণ পর পরিষ্কার হল। সে আমাকে বলল আমি খালি হাতে জেলে এসেছি। আমাকে আপনার একটা লুঙ্গি দিন। তার কাতর মিনতি দেখে আমি তখন নিজের জন্য আনা একটা লুঙ্গি তাকে দেই। ঘরের মধ্যে পাতা বিছানায় কেবল বসেছি এমন সময় দেখি আমার খুবই ঘনিষ্ঠ ফরিদপুরের ফায়েকুজ্জামান খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আসছেন। এতক্ষণে বুঝলাম ঘরের অন্য বিছানাটা তাঁরই।

তিনি আমাকে দেখে আবেগে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, কি খবর, ইব্রাহিম? বাইরের অবস্থা কি? আমাকে তো এক কাপড়ে ধরে এনে জেলে পুরেছে। কিছুই বুঝতে পারছি না। ফায়েকুজ্জামানকে দেখে আমার গলার স্বর ধরে এল। আমি কালই মাত্র শুনেছি তাঁর ছেলে নুরুজ্জামানকে ফরিদপুরের জালালুদ্দীন নামের এক কুখ্যাত ব্যক্তি ধরে নিয়ে মিরপুর ব্রীজের উপর গুলি করে মেরে ফেলেছে। দেখে মনে হল ফায়েকুজ্জামানের কাছে সে খবর এখনও পৌঁছেনি। ফায়েকুজ্জামান ছিলেন আইয়ুব খানের এককালীন বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াহিদুজ্জামানের ছোট ভাই। তিনি নিজেও ফরিদপুর থেকে মুসলিম লীগের এমএনএ হয়েছিলেন।

তাঁর চেহারা দেখে খুব খারাপ লাগল। কিন্তু তাঁর ছেলের ব্যাপারে তাঁকে আমি কিছু বলিনি। একদিকে আমার ঘরের সামনে দৃশ্যমান ফাঁসির মঞ্চ অন্যদিকে পুত্রহারা পিতার এই মর্মান্তিক অবস্থার মধ্যে আমি কি করব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। একেই বলে নিয়তি।

ফায়েকুজ্জামান যতদিন জেলে ছিলেন তাঁর পরিবারের কেউ তাঁকে ছেলের মৃত্যুর সংবাদ দেয়নি। পাছে তিনি জেলের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন এই আশঙ্কায়। তাঁর ছেলে নুরুজ্জামানকে আমি চিনতাম। সুদর্শন চেহারার তরুণ। ঢাকা ইউনিভার্সিটির মেধাবী ছাত্র। ছেলেটি এম.এ. পাশ করে অন্য পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ইউনিভার্সিটিতে সে এনএসএফ করত। ১৯৬৯-এর দিকে যখন ইউনিভার্সিটিতে আইউব বিরোধী ছাত্ররা ১১দফার আন্দোলন গড়ে তুলে তখন সে একবার এনএসএফ-এর ইব্রাহিম খলিলের সাথে সবুর সাহেবের বাসায় আসে। আমার সাথে সে সময় তার পরিচয় হয়। সে সময় সে উপস্থিত কিছু ছাত্রের উদ্দেশ্যে বক্তৃতাও দিয়েছিল মনে পড়ছে। তার কথা বলার ভঙ্গি, প্রাঞ্জল উচ্চারণ আমাদের দারুণভাবে মুগ্ধ করে। ঐ বক্তৃতায় সে জোরের সাথে বলেছিল আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। এ আন্দোলনের আড়ালে পাকিস্তানের শত্রুরা মূলতঃ শক্তি সঞ্চয়ে ব্যস্ত। যাতে সময় মত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মরণ আঘাত হানা যায়।

ফায়েকুজ্জামানকে দেখে আমার এতদিনের পুরানো সব কথা মনে পড়ে গেল।
নুরুজ্জামানের হত্যাকারী জালালুদ্দীনকে পরে শেখ মুজিব মন্ত্রীত্ব দিয়ে পুরস্কৃত করেন। ফায়েকুজ্জামান জেল থেকে বের হয়ে নুরুজ্জামানের মৃত্যুর কথা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। পরে তিনি শেখ মুজিবের কাছে ছেলের জন্য কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গিয়েছিলেন। তাঁর বিশ্বাস হয়েছিল মুজিব বোধ হয় নুরুজ্জামানকে ভারতে লুকিয়ে রেখেছে। মুজিব ফায়েকুজ্জামানকে দুলাভাই বলে ডাকত। তিনি তো সবকিছু জানতেন। তবু তিনি ফায়েকুজ্জামানকে বুঝানোর জন্য বলেছিলেন, দুলাভাই আপনি বাসায় যান। আপনার ছেলেকে আমি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।

জেলের সেই প্রথম রাত আমার কাটল ফায়েকুজ্জামানের সাথে নানা আলাপ, চিন্তা আর উদ্বেগ আশঙ্কার মধ্যে। ভোরে উঠে আমি পরিচিত হলাম জেলের নতুন নতুন অনেক কিছুর সাথে। জেলের খাত বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। এর মানে হল প্রতিদিন সকালে নতুন কয়েদী হিসেবে যারা আসে তাদের উচ্চস্বরে ডাকা হয় এবং তাদের নতুন থাকার জায়গা বলে দেয়া হয়। জেলের কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানে সিপাই ও সুবেদাররা এসব কাজ সাধারণত করে থাকে।

খাতায় আমার নাম ডাকার পর আমার থাকার জন্য ‘পুরানো হাজতকে’ বরাদ্দ করা হল। পুরানো হাজত হল একটা বিরাট হল ঘর। এ হলঘরের মধ্যেই কয়েদীরা থাকত। ‘পুরানো হাজত’ নামকরণের কারণ হল জেলের মধ্যে এটাই ছিল সবচেয়ে পুরানো বিল্ডিং। জেলের সিপাইকে বলা হয় মিয়া সাহেব। এরকম একজন মিয়া সাহেব আমাকে ফাঁসির সেল থেকে পুরানো হাজতে নিয়ে এল।

পুরানো হাজতে এসে দেখি এলাহী কারবার। সব পাকিস্তানপন্থীরা এখানে আলো করে বসে আছেন। আমাকে দেখে তাঁদের আনন্দ আর ধরে না। আরও দেখলাম মোনেম খানের কলেজ পড়ুয়া দুটো ছেলেকেও এখানে এনে রাখা হয়েছে। এরা রাজনীতির কি বুঝত আমি জানি না। মোনেম খান তাদের পিতা-বোধ হয় এটাই ছিল তাদের অপরাধ। পুরানো হাজতে বিখ্যাত আলেম মাওলানা মাসুমকেও দেখলাম। তিনি কোন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন বলে কখনও শুনিনি। কিন্তু ১৬ই ডিসেম্বরের পর ইসলামপন্থী হওয়াটাই ছিল একটা অপরাধ। সে কারণে তাঁকে জেলে ঢুকানো হয়েছিল। মাওলানা মাসুম জেলখানায় আমাদের নামাজে কয়েকদিন ইমামতি করেছিলেন। তিনি জেলে ঢুকেই বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের লোকেরা আমাকে ৯দিনের বেশী আটক করে রাখতে পারবে না। সত্যি তিনি ৯দিনের আগেই জেল থেকে মুক্তি পান। এর ফলে আমাদের বিশ্বাস দৃঢ়মূল হয় তিনি প্রকৃতই বড় বুজর্গ ছিলেন। তিনি আমাদের বলতেন, পাকিস্তান সারা ভারতের মুসলমানরা বানিয়েছিল। আল্লাহর কাছে মুসলমানরা অনেক কান্নাকাটি করেছিল-একদিন এই পাকিস্তান বানাবার জন্য। সেই পাকিস্তানের যারা ক্ষতি করেছে আল্লাহ তাদের উচিত শিক্ষা দেবেন। আল্লাহর আদালতে একদিন এদের বিচার হবেই। নামাজ শেষে মাসুম সাহেব আমাদের ধৈর্যধারণ করার উপদেশ দিতেন। তিনি আমাদের বলতেন, আল্লাহর রাহে যারা সংগ্রাম করে তাদের উপর এরকম বালা-মুসিবত আসে। এগুলো ঈমানদারদের উপর আল্লাহর পরীক্ষা, এ পরীক্ষায় ঈমানদারদের বিজয়ী হতে হবে।

প্রতি ওয়াক্ত নামাজের পর আমরা জিকির করতাম। মাসুম সাহেব জিকিরের মাহফিল পরিচালনা করতেন। তখন আমার কাছে পুরো জেলখানাকে মনে হত দরবেশের হুজরা খানা। মাসুম সাহেব জোরের সাথে বলতেন আমাদের কাউকে ওরা আটকে রাখতে পারবে না। পুরানো হাজতে আমি বেশীদিন থাকতে পারিনি। দুদিন থাকার পর জেল কর্তৃপক্ষ আমাকে ডিভিশন বরাদ্দ করে। তখনকার স্বরাষ্ট সচিব শামসুদ্দীন আহমদ ছিলেন আমার আত্মীয়। মূলত তাঁর প্রভাবের কারণেই আমি ডিভিশন পাই। জেলের এক সুবেদার আমাকে ‘পুরানো হাজত’ থেকে নিয়ে বিশ সেলে ডিভিশন বন্দীদের ভিতর পৌঁছে দেয়। বিশ সেল বলা হত এজন্য যে একতলা এ বিল্ডিংটিতে বিশটি কামরা ছিল। আসলে এটা ছিল নামেই ডিভিশন। পাকিস্তান আমলে এখানে রাখা হত দাগী আসামীদের। নতুন সরকার এসে এটিকে ডিভিশন প্রাপ্তদের আশ্রয়স্থল বানিয়েছিল। পাকিস্তান আমলে ২৬ সেল নির্মাণ করা হয়েছিল রাজনৈতিক বন্দীদের জন্য। রাজনৈতিক বন্দীদের মর্যাদা অনুযায়ী সুযোগ সুবিধা দেয়া হত। শেখ মুজিব এখানে বহুদিন কাটিয়েছেন। নতুন সরকার ২৬ সেল কোন রাজনৈতিক বন্দীদের জন্য বরাদ্দ করেনি। এটা তারা স্বতন্ত্রভাবে সংরক্ষণ করেছিল এই আশায় এখানে নাকি জে. নিয়াজী ও তাঁর সহযোগীদের বিচার করা হবে। ২০ সেলে প্রত্যেক চার রুমের পর দেয়াল তুলে পৃথক করে দেয়া হয়েছিল। আমাকে যখন বিশ সেলে নেয়া হয় তখন দেখি ফজলুল কাদের চৌধুরীকেও সেখানে রাখা হয়েছে। ফজলুল কাদের চৌধুরী দেখামাত্রই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ইব্রাহিম তোমাকেও এরা নিয়ে এসেছে। আমি বললাম, আমি দিন তিনেক হল জেলে এসেছি। আপনি কবে? ফজলুল কাদের চৌধুরী তাঁর জেলে আসার যে বর্ণনা দিলেন তা শুনে আমার মনে হল এটা রোমাঞ্চকর উপন্যাসকেও হার মানায়।

তাঁর কাছ থেকে শোনা সেই অবিশ্বাস্য অথচ সত্য ঘটনাটি ছিল এরকম: ১৪ই ডিসেম্বর সবকিছু আঁচ করে তিনি পাকিস্তান নেভীর একটা শিপে করে পরিবার পরিজনসহ চাটগাঁ থেকে বার্মার উদ্দেশ্যে পালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ নেভাল শিপটি ভাটার সময় চড়ায় আটকে যায়। তখন আশেপাশের গ্রাম থেকে নৌকায় করে লোকজন এসে জাহাজটি ঘিরে ফেলে। এরমধ্যে গেরিলাও ছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার হল ফজলুল কাদের চৌধুরী যখন জাহাজ থেকে বেরিয়ে আসলেন তখন পরিবেশ সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। চারদিকের লোকজন তাঁকে নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে স্বাগত জানায়। তারা তাঁকে তাঁর পরিবার পরিজনসহ তাঁদের গ্রামে নিয়ে যায় এবং গরু জবাই করে এ উপলক্ষে ভোজের আয়োজন করে। ফজলুল কাদের চৌধুরীর জাহাজ আটকে যাওয়া এবং তাঁকে গ্রামে নিয়ে গিয়ে জনসাধারণের উল্লাস করার ঘটনা ইন্ডিয়ান আর্মির কানে যায়। তারা গেরিলাদের সহযোগিতায় দ্রুত গ্রামটি ঘিরে ফেলে। এ রকম অবস্থায় তারাও যে কি করবে বুঝে উঠতে পারছিল না। ইন্ডিয়ান আর্মি তখন দিল্লীতে তাদের সদর দফতরের সাথে যোগাযোগ করে। দিল্লী থেকে ইন্ডিয়ান আর্মিকে নির্দেশ দেয়া হয় তারা যেন কোনভাবেই ফজলুল কাদের চৌধুরীর সাথে দুর্ব্যবহার না করে এবং অতি সত্ত্বর তাঁকে ঢাকায় জেলে পৌঁছে দেয়। ইন্ডিয়ান আর্মির প্রহরায় ফজলুল কাদের চৌধুরী চাটগাঁ থেকে ঢাকা জেলে পৌঁছেন। তাঁর পরিবার পরিজনকে ঐ গ্রামবাসীরা আঁচড় পর্যন্ত লাগাতে দেয়নি।

ফজলুল কাদের চৌধুরী যে জনপ্রিয় নেতা ছিলেন এবং তাঁর চমৎকার ব্যক্তিত্বের প্রতি দেশের মানুষ যে বিশেষ আকর্ষণ অনুভব করত এ ঘটনা তার প্রমাণ। আমার মনে আছে, ৫৪ সালের নির্বাচনে যখন যুক্তফ্রন্টের সামনে মুসলিম লীগের করুণ অবস্থা তখনও তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে জিতে এসেছিলেন। নির্বাচনে জিতে অবশ্য তিনি মুসলিম লীগেই যোগ দেন। আগে মুসলিম লীগ পার্লামেন্টারী বোর্ড তাঁকে নমিনেশন দেয়নি। চাটগাঁর ভাষায় বক্তৃতা দিয়ে তিনি লোকজনকে দারুণভাবে মাতিয়ে ফেলতে পারতেন। চাটগাঁর উন্নতির জন্য ফজলুল কাদের চৌধুরী অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। ইউনিভার্সিটি, ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজ, রিফাইনারী এগুলো তাঁর একক প্রচেষ্টার ফল। স্পীকার এবং কিছুদিনের জন্য পাকিস্তানের অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিজের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান তিনি গড়ে তুলেছিলেন। ডিভিশনে আসার দুদিন পর আমার একটা নতুন কাজ জুটে যায়। জেল জীবনে হঠাৎ হঠাৎ এসব বৈচিত্র্য মন্দ লাগে না। আমরা ডিভিশন পেয়েছিলাম প্রায় পঞ্চাশ জন। এঁদের মধ্যে একজন ম্যানেজার থাকতেন। জেল কর্তৃপক্ষের অনুমোদনেই এটা হত। ম্যানেজারের কাজ ছিল প্রতিদিন সকালে ডিভিশন বন্দীদের খাবার সামগ্রী অর্থাৎ প্রতিদিনের চাল, ডাল, তেল, গোশত, মাছ বুঝে নেয়া এবং রান্নার যাবতীয় ব্যবস্থা করা। জেলখানায় রান্নাঘরকে বলে চোখা। চোখায় বাবুর্চিদেরও তত্ত্বাবধান করেন ম্যানেজার। আমি আসার পর ডিভিশনের বন্দীরা আমাকে ম্যানেজার বানানোর জন্য জেলার নির্মল বাবুকে অনুরোধ করেন। ডিভিশনের বন্ধুরা কেন আমাকে ম্যানেজার হিসেবে পেতে চেয়েছিলেন তা ভাবলে আজও আমি অবাক হয়ে যাই। রাজনৈতিক জীবনে তাঁরা যেমন আমার উপর আস্থা রাখতে পারতেন বোধ হয় জেল জীবনে এসেও তাঁদের সেই আস্থার অভাব হয়নি।

নির্মল বাবু যখন আমাকে ম্যানেজারের দায়িত্ব নেয়ার কথা বললেন তখন আমি সানন্দে রাজী হয়ে যাই। আমার আগে ম্যানেজার ছিলেন মেজর আফসারউদ্দীন। তিনি ছিলেন ইসলামিক ডেমোক্রেটিক পার্টির সভাপতি। তাঁর সেক্রেটারী ছিলেন মাওলানা মান্নান। প্রতিদিন সকালে আমি জেল গেট থেকে আমাদের মাথাপিছু বরাদ্দের সামগ্রী বুঝে নিতাম। আমাকে সাহায্য করত বাবুর্চিরা। আমি ম্যানেজার হবার পর চোখার বাবুর্চি পাল্টে দেই। তখন জেলে কিছু অবাঙ্গালী বাবুর্চি ধরে আনা হয়েছিল। এসব বাবুর্চির অপরাধ ছিল এরা অবাঙ্গালী ও পাকিস্তানী আদর্শে বিশ্বাসী। বাবুর্চিদের অধিকাংশই ছিল আমার পরিচিত। ঢাকার সেরা বাবুর্চি হিসেবে এদের নাম ডাক ছিল। এদের অনেককে আমি চোখার দায়িত্ব দেই। অবাঙ্গালী বাবুর্চিদের রান্নার গুণে আমাদের খাবার বেশ উপাদেয় হয়ে উঠল।

ম্যানেজার হিসেবে আরও একটা দায়িত্ব ছিল আমার। ডিভিশনে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে তাড়াতাড়ি জেলের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হত। আমার একটা সুবিধা ছিল তখন ঢাকার সিভিল সার্জন ছিলেন সিরাজ উদ্দিন।  মালদা জেলা স্কুলে তিনি আমার ক্লাসমেট ছিলেন। সিরাজ উদ্দিন জেলের ডাক্তারদের ভাল করে বলে রেখেছিলেন যেন তাঁরা আমার দেখাশুনা করেন। ডাক্তাররা বোধ হয় সে কারণেই আমাকে খুব সমীহ করতেন। কোন রোগী নিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি দেখে দিতেন। বিশেষ করে আমার অনুরোধে অনেক সময় ডাক্তাররা মেডিকেল ডায়েট বরাদ্দ দেয়ার জন্য লিখে দিতেন। মেডিকেল ডায়েটের ব্যাপারটা ছিল জেলের খাবার খেতে খেতে অনেকেরই অনীহা ধরে যেত। তাছাড়া জেলের বন্দীদশার কারণেও অনেকের খাবারের প্রতি অরুচি হত। ডাক্তাররা ইচ্ছে করলে তখন কয়েদীর মনের মত একটা ডায়েট লিখে দিতে পারতেন। এর মধ্যে হয়ত বিশেষ ধরনের মাছ যেমন কৈ, মাগুর কিংবা বিশেষ ধরনের সব্জির উল্লেখ থাকত।

অনেক সময় ডাক্তাররা অসুখের কারণে সামনের লনে ঘোরার অনুমতি দেয়ার জন্য জেল কর্তৃপক্ষকে লিখতেন। আমার অনুরোধে একবার তাঁরা ফজলুল কাদের চৌধুরী ও খাজা খয়েরুদ্দীনকে জেলের লনে ঘোরার অনুমতি দেয়ার কথা লিখেছিলেন।

ম্যানেজার হওয়ার সুবাদে আমার একটা সুবিধা ছিল আমি ডিভিশনের প্রত্যেক বন্দীসেলে ইচ্ছেমত যেতে পারতাম। তাদের সুখ দুঃখের আলাপের ভাগী হতে পারতাম। কখন কার কি প্রয়োজন সেটা তাৎক্ষণিকভাবে শুনে সমাধানেরও চেষ্টা করতাম। একবার একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। বাংলাদেশে উদযাপিত প্রথম বিজয় দিবসে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দীদের জন্য উন্নতমানের খাবার সরবরাহ করে। আমি মুরগীসহ অন্যান্য খাদ্য সামগ্রী চোখার এক কোণায় ফেলে রাখি এবং বাবুর্চিদের বলি প্রতিদিনের মত সাধারণ খাবার রান্না করতে। জেলার নির্মল বাবু কি করে যেন ব্যাপারটা টের পেয়ে যান। তিনি এসে আমাকে প্রায় কৈফিয়তের সুরে বলতে থাকেন, ইবাহিম সাহেব এসব কি হচ্ছে? মুরগী রান্না করেন নি, বিরিয়ানি পাকাননি, আজকে দেশের এতবড় একটা উৎসব আর আপনারা নিরামিষভোজী হয়ে আছেন। আমি হাসতে হাসতে বললাম, জেলার সাহেব, আপনি আমাদের খোঁজ-খবর নিতে এসেছেন, ধন্যবাদ। কিন্তু এ বিজয় তো আমাদের বিজয় নয়। আমরা আজকে বিরিয়ানি খাব না। আমরা উপোস করব। যেদিন এদেশের মানুষের সত্যিকারের বিজয় আসবে সেদিন আমরা ভরপেট বিরিয়ানি খাব, আজকে নয়।
নির্মল বাবু আমার কথা শুনে তো অবাক। তিনিও হাসতে হাসতে বললেন, খুব রাজনীতি করে বেড়াচ্ছেন ইব্রাহিম সাহেব।

আমি তাঁকে বললাম, রাজনীতি নয় এটা আমাদের আদর্শ, জেলার সাহেব।
নির্মল বাবু তখনকার মত কিছু না বলে চলে গেলেন। তবে আমি যে ১৬ই ডিসেম্বর বিরিয়ানী পাকানোর ব্যবস্থা করিনি এজন্য আমার ডিভিশনের বন্ধুদের মুখে কোন অভিযোগ শুনিনি। বোধ হয় তাঁরা মনে মনে খুশী হয়েছিলেন।

একদিন জেলার অবাঙ্গালীদের এক সুবেদার এসে আমাকে খবর দিলেন গুদামে অনেক পাক বাসমতি চাল আছে। এই চাল আর কখনও পাকিস্তান থেকে আসবে না। আপনি যদি জেলারকে বলে কয়েক বস্তা চাল জোগাড় করতে পারেন তাহলে সবাইকে বিরিয়ানি খাওয়াতে পারবেন।

সুবেদারের আইডিয়াটা আমার কাছে বেশ আকর্ষণীয় মনে হল। আমি নির্মল বাবুকে বললে তিনি রাজী হয়ে গেলেন। গুদামে প্রায় সাত আট বস্তা বাসমতি চাল ছিল, তিনি সবটাই আমাদের দিয়ে দেন।

এত অনায়াসে বাসমতি চাল পেয়ে যাব তা আমি ভাবিনি। নির্মল বাবু আমাদের মনে মনে পছন্দ করতেন না ঠিকই কিন্তু এটা তিনি বুঝতেন আজ যারা এখানে বন্দী আছেন তাঁরা একসময় দেশের দণ্ডমুন্ডের কর্তা ছিলেন। ভবিষ্যতেও যে চাকা উল্টে যাবে না, এঁরাই আবার যে মসনদে বসবেন না তারই বা নিশ্চয়তা কি? বোধ হয় এসব চিন্তা করেই নির্মল বাবু আমাকে চাল দিতে দ্বিরুক্তি করেননি।

জেলের মধ্যে একটা নিয়ম হল প্রত্যেক কয়েদীর জন্য মাথাপিছু বরাদ্দ দেয়া। ডিভিশন বন্দীদের খাবার-দাবারের সুবিধাটা আরও বেশী। কিন্তু এসব খাবার কখনও কয়েদীরা ঠিকমত পায় না। দুর্নীতিবাজ পুলিশ ও জেলের কর্মচারীরা এসবের মধ্যে অবৈধ ভাগ বসায়। যার ফলে কয়েদীদের ভাগ্যে জোটে খুব সামান্যই।

আমরা যারা ডিভিশন পেয়েছিলাম তাঁদের খাবার ব্যবস্থা মোটামুটি ভালই ছিল। কিন্তু অসংখ্য ইসলামপন্থী ও পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসী কয়েদী যারা ডিভিশন পাননি তাঁদের খাওয়ার দুঃখজনক অবস্থা দেখলে চোখে পানি এসে যেত। এসব কয়েদীদের প্রত্যেকেরই একটা সামাজিক সম্মান ও মর্যাদা ছিল। আজ তকদীরের ফেরে সামান্য পুলিশ ও ওয়ার্ডারদের চোখ রাঙ্গানীও দেখতে হচ্ছে তাঁদের বেদনাটা সেখানেই।

জেলের মধ্যে এতদিন কয়েদীদের নিয়ে জামাতে জুমার নামাজ পড়ার একটা রীতি চলে আসছিল। বাংলাদেশ হওয়ার পর নির্মল বাবুর নির্দেশে জুমার নামাজ পড়া বন্ধ হয়ে যায়। আমার মনে হয় আওয়ামী লীগ সরকারের কোন হোমড়া-চোমড়ার নির্দেশেই এটা করা হয়েছিল। তা না হলে নির্মল বাবুর অন্তত জামাতে নামাজ পড়া বন্ধ করার দুঃসাহস হত না।

আমাদের ব্লকে আমার সাথে ফজলুল কাদের চৌধুরী ছাড়াও পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক ডেপুটি স্পীকার সাভারের এডভোকেট আজগর হোসেন ও মালেক মন্ত্রীসভার সদস্য কুমিল্লার এডভোকেট মুজিবর রহমান ছিলেন।

মুজিবর রহমান ছিলেন খুব ধীরস্থির। তাঁর সাথে কথা বললেই বোঝা যেত ইসলামের উপর তাঁর ব্যাপক পড়াশুনা রয়েছে। বিশ সেলে আমাদের পরের ব্লকেই থাকতেন সবুর সাহেব, খাজা খয়েরুদ্দীন, পাবনার এম এ মতিন, পাকিস্তান ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলির সাবেক ডেপুটি স্পীকার এ টি এম আব্দুল মতিন প্রমুখ।

সেল বলতে আমাদের ডিভিশনের বন্দীদের যা বরাদ্দ করা হয়েছিল তা ছিল একট ছোট্ট জানালাবিহীন ঘর। সেই ঘরে কোনক্রমে একটা খাট পাতা হয়েছিল। একটা টেবিলও দেয়া হয়েছিল। আমার কাছে এটা জেল কর্তৃপক্ষের একটা মষ্করা বলে মনে হত।

রাতে দুই ঘরের মাঝামাঝি দেয়ালের উপর একটা ফাঁকা জায়গায় বাল্ব জ্বলত। এটা দু’ঘরকেই আলোকিত করার চেষ্টা করত। রাতে ঘরের মধ্যে একটা পাত্র দিয়ে রাখা হত। ঐ পাত্রেই আমাদের যাবতীয় প্রাকৃতিক কর্ম সারতে হত। জেলের মধ্যে আমার সবচেয়ে খারাপ লাগত ল্যাট্রিনের অবস্থা দেখে।

ডিভিশনের বন্দীদের জন্য এক একজন ফালতু দেয়া হত। এরা ছিল নিম্ন শ্রেণীর গরীব কয়েদী। এরা ডিভিশনের বন্দীদের ফায়ফরমাশ খেটে দিত, চোখা থেকে খাবার নিয়ে আসত। গোসলের জন্য পানি আনাও ফালতুর কাজ ছিল।

আমাদের ব্লকের গোসলখানায় একটা পানির চৌবাচ্চা ছিল। ফালতু পানি এনে চৌবাচ্চা ভরে দিয়ে গেলে আমরা গোসল করতাম। সমস্যা হল ফজলুল কাদের চৌধুরীকে নিয়ে, তাঁর তো ছিল বিরাট বপু। এতটুকু পানিতে তাঁর গোসল হত না।

তিনি আমাকে বলতেন, ইব্রাহিম যেদিন আমি গোসল করব তোমরা দয়া করে সেদিন গোসল করো না। আমরা ফজলুল কাদের চৌধুরীর জন্য অনেকদিন গোসল না করে কাটিয়েছি।

ফজলুল কাদের চৌধুরীর ছিল সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস। অনেকদিন রাতে তিনি চিৎকার করে বলতেন ইব্রাহিম একটা সিগারেট দাও। খুব খারাপ লাগছে, ঘুমাতে পারছি না। আমার পাশের সেলটাই ছিল তাঁর। আমি তখন দেয়ালের উপর ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে সিগারেট ছুঁড়ে দিতাম। সেই সিগারেট টেনে তিনি ঘুমাতেন। অনেক সময় রাতে আমার ঘুম ভেঙ্গে যেত। ঘুম থেকে চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে শুনি চৌধুরী সাহেব তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করছেন। আমি স্পষ্ট শুনতাম তিনি মুনাজাত করতে করতে বলতেন, খোদা আমরা কি অপরাধ করেছি.... এই জালেমদের কবল থেকে দেশের অসহায় মানুষকে তুমি রক্ষা করো। তুমি আমাদের সবর করার তৌফিক দাও। হে আল্লাহ, আমরা যেন ঈমানের সাথে দুনিয়া থেকে বিদায় নিতে পারি ইত্যাদি। ফজলুল কাদের চৌধুরী তো গম গম করে কথা বলতেন। মনে হত লাউড স্পীকারে কেউ কথা বলছেন। দোয়ার সময় তাই সব শোনা যেত।

ফজলুল কাদের চৌধুরী একবার জেলের মধ্যে এক মিয়া সাহেবকে ধরে আচ্ছা করে কিলঘুষি মেরেছিলেন। জেলের মধ্যে মানুষের মানষিক অবস্থা যে কতখানি বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়ে তা না দেখলে বোঝা যায় না। একদিন হল কি ফজরের সময় চৌধুরী সাহেবের প্রাকৃতিক কাজ করার খুব প্রয়োজন পড়ল। তিনি এত উঁচু লম্বা ছিলেন যে ঘরের মধ্যে রাখা পাত্রের উপর বসে প্রাকৃতিক কাজ সারতে পারতেন না। আবার এদিকে সেলের দরজাও তালা মারা, সকাল ৭টার আগে খুলবে না। তিনি আমাকে বললেন, ইব্রাহিম তুমি মিয়া সাহেবকে বল দরজাটা খুলে দিতে। আমি বললাম কাদের ভাই ৭টার আগে তো দরজা খোলার নিয়ম নেই। ও কি খুলবে! তিনি আমাকে পীড়াপীড়ি করতে থাকায় আমি চেঁচামেচি করে মিয়া সাহেবকে অনেক বুঝিয়ে দরজা খুলতে রাজী করালাম।

চৌধুরী সাহেব তাড়াতাড়ি করে ল্যাট্রিনে গেলেন। সেখান থেকে ফিরে আসার পর মিয়া সাহেব হয়ত একটু জোরের সাথেই তাঁকে বলেছিল তাড়াতাড়ি করে সেলের মধ্যে ঢোকার জন্য। তালা লাগাতে হবে নইলে কর্তৃপক্ষ তাকে কৈফিয়ত তলব করবে। আর যায় কোথায় চৌধুরী সাহেব তাঁর বিরাট বপু নিয়ে মিয়া সাহেবের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ইচ্ছামত কিল ঘুষি মেরে সেই শ্মশ্রুমন্ডিত মাঝারী বয়সী মিয়া সাহেবকে নাজেহাল করে ফেললেন। মার খেয়ে সে অনেকক্ষণ মেঝের উপর পড়েছিল। আমি সেলের ভিতর বসে সব শুনছি। মিয়া সাহেব কিছুক্ষণ মেঝেতে পড়ে থাকার পর জেল অফিসের দিকে চলে গেল। ততক্ষণে সেলের তালা খুলে দেয়া হয়েছে। আমি, চৌধুরী সাহেব, আজগর হোসেন ও মুজিবর রহমান একসাথে বসে আছি।

হঠাৎ দেখি নির্মল বাবু তাঁর দলবলসহ আমাদের ব্লকের দিকে এগিয়ে আসছেন। নির্মল বাবু প্রায় চিৎকার করে বললেন জেলের তো একটা কোড আছে। চৌধুরী সাহেব আপনি এসব কিছুই মানতে চান না। আগেও আপনি এক সিপাইকে মেরেছেন।

দেখলাম চৌধুরী সাহেব যে চেয়ারে বসেছিলেন সেটা নিয়েই তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি চিৎকার করে নির্মল বাবুকে বলতে লাগলেন গুলি করতে হলে গুলি চালাও। ফাঁসি দিতে হলে ফাঁসি দাও। এরকম করে খালি খালি আমাদের কষ্ট দিচ্ছ কেন? বলতে বলতে চৌধুরী সাহেব অচেতন হয়ে পড়লেন। আমি চিৎকার দিয়ে উঠলাম। নির্মল বাবু এসব দেখে হতচকিত হয়ে তাড়াতাড়ি সরে পড়লেন। পাশের ব্লক থেকে সবুর সাহেব, খাজা খয়েরউদ্দীন ছুটে এলেন। আমরা চৌধুরী সাহেবকে ধরাধরি করে খাটের উপর শুইয়ে দিলাম। আমি গামছা ভিজিয়ে তাঁর কপালে ঠান্ডা পানির ছিটা দিলাম। কিছুক্ষণ পর তিনি চোখ মেললেন।
অনেকক্ষণ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে তিনি আমাকে বললেন, ইব্রাহিম আমার কি হয়েছিল?
আমি বললাম কিছুই মনে নেই আপনার? এত কান্ড হয়ে গেল আপনাকে নিয়ে। আপনি মিয়া সাহেবকে ধরে উত্তম মধ্যম দিলেন। জেলারকে গালাগালি করলেন।
চৌধুরী সাহেব তখন বললেন, দেখ ইব্রাহিম আমার আজকাল কি হচ্ছে! মাথা ঠিক রাখতে পারছি না। তুমি মিয়া সাহেবকে ডাকো। ওকি এখানে আছে?
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ও কি এখন আসবে নাকি? তিনি বললেন তুমি বলেই দেখ না।
আমি মিয়া সাহেবকে অনেক বুঝিয়ে বললাম, দেখো এত বড়লোক, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ছিলেন, তিনি আজ জেলে, কতক্ষণ মাথা ঠিক থাকে বল? উনি তোমাকে ডাকছেন, না করো না।

মিয়া সাহেব আমার কথায় রাজী হয়ে চৌধুরী সাহেবের ঘরে দেখা করতে এল। চৌধুরী সাহেব তখন তাঁকে বুকে নিয়ে বললেন দেখ আমার ভুল হয়ে গেছে। তুমি আমাকে মাফ করে দাও। তিনি মিয়া সাহেবের কাছে আবেগ তাড়িত কণ্ঠে বলতে থাকলেন, আমাকে সত্যি মাফ করেছ তো?
চৌধুরী সাহেবের এই শিশুর মত আচরণ দেখে আমি নিজেও হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। মিয়া সাহেবের মুখে কোন কথাই ছিল না। সে পাকিস্তানের এক সময় সর্বোচ্চ পদাধিকারীর এই আচরণে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল। চৌধুরী সাহেব আমাকে বললেন, দেখ ইব্রাহিম আমার ঝুড়িতে কিছু ফ্রুটস আছে। এগুলো মিয়া সাহেবকে দিয়ে দাও।

আমি যখন ফলগুলো নিয়ে মিয়া সাহেবকে দিচ্ছিলাম তখন তার চোখ দিয়ে দর দর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন নরম দিলের মানুষ। অনেকদিন দেখেছি বাসা থেকে তাঁর জন্য ভাল ভাল খাবার এলে তিনি শুধু আমাদের ডেকে নিয়ে খেতেন না অনেকটাই ফালতুদের মধ্যে বিতরণ করে দিতেন। একদিন তিনি আমাকে বললেন, ইব্রাহিম টাকা পয়সা দিয়ে কি হবে। ফালতুদের অবস্থাতো দেখছ ওদের গেঞ্জি ও লুঙ্গির ব্যবস্থা করে দেয়া উচিত।

তখন তিনি আমাকে তাঁর বোনের জামাই ডিআইজি পুলিশ আব্দুল হকের কাছে একটা চিঠি লিখতে বললেন, কিছু গেঞ্জি ও লুঙ্গি জেলে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য। চৌধুরী সাহেবের যাবতীয় চিঠিপত্র আমি জেলে বসে লিখে দিতাম। পরদিন দেখি আব্দুল হক এক গাট্টি লুঙ্গি ও গেঞ্জি পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেগুলো আমি আর চৌধুরী সাহেব মিলে ফালতুদের মধ্যে বিতরণ করেছিলাম।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh