Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ১৮ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

আমরা ডিভিশনের বন্দীরা জেলে পত্রিকা পেতাম। তাই বাইরের খবরাখবর পেতে আমাদের তেমন অসুবিধা হত না। তাছাড়া আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব কখনও আমাদের সাথে দেখা করতে এলে তারাও অনেক খবর দিয়ে যেত। ৭২ সালের প্রথম কয়েক মাস আমাদের কাটল আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে এক ধরনের উগ্র বাঙ্গালীত্বের প্রদর্শনী দেখে। তখন সবকিছুতেই বাঙ্গালীত্বের উৎস খোঁজা হত। পূর্ববঙ্গ ও পরে পূর্ব পাকিস্তান যে একটা মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল ছিল এবং এখানকার মানুষের জীবনাচারের মধ্যে মুসলিম সংস্কৃতির গভীর প্রতিফলন ছিল তা যেন ইচ্ছে করেই চাপা দেয়া হতে লাগল। মুসলমানদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য বর্জন করতে পারলেই এসময় সবচেয়ে প্রগতিশীল ও আধুনিক মানুষ হওয়া যেত। গেরিলারা যারা ভারত থেকে ফিরে এসেছিল তাদের মধ্যেই পূর্ব পুরুষের বিশেষ করে মুসলিম ঐতিহ্যের সাথে জড়িত যা কিছু তার প্রতি এক ধরনের বিতৃষ্ণা দেখা দিল। এদের কেউ কেউ সে সময় নিজেদেরকে সূর্যসেন ও ক্ষুদিরামের বংশধর বলেও দাবী করছিল।

এসব গেরিলারা ত্রিশের দশকে সূর্যসেন ও ক্ষুদিরামের সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের কাহিনী আদৌ জানত না। সূর্যসেন ও ক্ষুদিরাম যে রাজনীতির অনুশীলন করেছেন এবং যে পৌত্তলিক আদর্শ তাঁরা প্রচার করেছেন তা মেনে নিলে মুসলমান বলে পরিচয় দেয়ার সুযোগ থাকে? অথচ এসব সাম্প্রদায়িক চেতনায় আচ্ছন্ন ব্যক্তিদের তখন জাতীয় বীর সাজানোর এক প্রহসন চলছিল। জেলের ভিতর বসেই আমরা শুনতে পেলাম সরকার ঢাকা ইউনিভার্সিটির জিন্নাহ হল ও ইকবাল হলের নাম পরিবর্তন করেছে। এরা জিন্নাহ হলের নতুন নামকরণ করেছিল সূর্যসেন হল এবং ইকবাল হলের নামকরণ করেছিল জহুরুল হক হল। জহুরুল হক ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন সার্জেন্ট। ২৫শে মার্চের আগেই বিদ্রোহ করতে গিয়ে তিনি আর্মির গুলিতে মারা পড়েন। এর আগে তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্রের সাথেও জড়িত ছিলেন। আরও অবাক হয়েছিলাম আল্লামা ইকবালের মত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন কবি ও দার্শনিকের সাথেও নতুন সরকার শত্রুতা শুরু করে। ইকবাল যেহেতু উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমির কথা বলেছিলেন এবং যে কারণে তাঁকে পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা বলা হয়ে থাকে তাই তাঁর নাম মুজিব সরকার বরদাশ্ত করতে রাজী হয়নি। তাছাড়া ইসলাম ও মুসলমানদের সাথে সম্পর্কিত যা কিছু তাকেই ঝেঁটিয়ে বিদায় করবার জন্য মুজিব সরকার তখন আদাপানি খেয়ে লেগেছিল।

এরা যে কতদূর ইসলাম বিরোধী হয়ে উঠেছিল তার প্রমাণ হচ্ছে ঢাকা ও রাজশাহী ইউনিভার্সিটির মনোগ্রাম থেকে কোরআন শরীফের আয়াত তুলে দেয়া। ঢাকা ইউনিভার্সিটির সলিমুল্লাহ ও ফজলুল হক মুসলিম হল থেকে এরা মুসলিম শব্দটি উৎখাত করেছিল। জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম ইউনিভার্সিটি থেকে মুসলিম শব্দটি তুলে দেয়া হয়েছিল। এ সমস্ত কর্মকান্ডকেই তখন বলা হচ্ছিল অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার চূড়ান্ত নিদর্শন। অথচ দেশের বিভিন্ন স্থানে অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ছিল রামকৃষ্ণ মিশন, ভারতেশ্বরী হোমস, সেন্ট জোসেফ, সেন্ট গ্রেগরী স্কুলের মত প্রতিষ্ঠান যাদের ধর্মীয় পরিচয়টাই ছিল মূখ্য। এসব প্রতিষ্ঠানের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কোন প্রশ্ন তোলা হল না। এমনকি ঢাকা ইউনিভার্সিটির জগন্নাথ হলের হিন্দু স্ট্যাটাসও অপরিবর্তিত রইল। মুজিব সরকারের একমাত্র মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়াল ইসলাম ও মুসলমান। একদিন শুনতে পেলাম ধর্মনিরপেক্ষতা সঠিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য রেডিওতে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কয়েকদিন পর এ ঘটনার প্রতিবাদে রেডিওর কর্মচারীরা যখন ধর্মঘটের ডাক দেয় তখন তড়িঘড়ি করে সরকার কোরআন তেলাওয়াতের ব্যবস্থা করে। পাশাপাশি অবশ্য গীতা-বাইবেল-ত্রিপিটক থেকে পাঠের ব্যবস্থারও প্রচলন করা হয়। এভাবে মুজিব সরকার ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে একটা আপাত আপোস ফর্মুলা উদ্ভাবন করে।

জেলে বসে এসময় আমরা প্রায়ই আওয়ামী সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের তর্জনগর্জন শুনতাম। প্রায়ই এরা হুঙ্কার দিত ত্রিশ লাখ মানুষকে যারা শহীদ করেছে এবং যারা দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম লুটেছে পাক আর্মির সেই সব এদেশীয় দালালদের কাউকে ক্ষমা করা হবে না। তাদের কথায় মনে হত এদেশের যত দুঃখ ও দুর্গতি তার জন্য এইসব দালালরাই শুধু দায়ী।

জেলে বসেই আমি গেরিলাদের হাতে মৌলভী ফরিদ আহমদ, সিলেটের আজমল আলী চৌধুরী ও সিরাজগঞ্জের সৈয়দ আসাদুদ্দৌলা সিরাজীর নির্মম হত্যাকান্ডের খবর পাই। ১৯৭১ এর ১৭ই ডিসেম্বর ফরিদ আহমদকে গ্রেফতার করে লালবাগ থানায় নেয়া হয়। গেরিলারা ১৯শে ডিসেম্বর তাঁকে লালবাগ থানা থেকে ছিনিয়ে ইকবাল হলে নিয়ে যায়। সে সময় ইকবাল হলে ছিল গেরিলাদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। এখানে গেরিলারা পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসীদের ধরে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করে মেরে ফেলত।

আমি যখন জেল থেকে বের হই তখন মৌলভী ফরিদ আহমদের দুঃখজনক পরিণতির কথা জহিরুদ্দীনের মুখে আদ্যোপান্ত শুনেছিলাম। জহিরুদ্দিন ছিলেন এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। গেরিলারা তাঁকেও ধরে নিয়ে ইকবাল হলে রেখেছিল।

মৌলভী ফরিদ আহমদকে ইকবাল হলে ধরে নিয়ে যায় সমাজতন্ত্রের লেবেলধারী কতিপয় কপট ছাত্র নেতা ও তাদের সঙ্গী সাথীরা। তারা প্রথমেই ফরিদ আহমদকে মুক্তি দেয়ার কথা বলে তাঁর ব্যাংকে গচ্ছিত ১২ লাখ টাকা নিজেদের নামে তুলে নেয়। তারপর শুরু হয় তাঁর উপর অকথ্য নির্যাতন। প্রথমে তাঁর চোখ তুলে ফেলা হয়। কান কাটা হয়। হাত ভেঙ্গে দেয়া হয়। সর্বশেষে দীর্ঘ নিপীড়নের পর ২৪শে ডিসেম্বর রাতে হত্যা করা হয়। তার আগে তাঁর জিহ্বা কেটে ফেলা হয়েছিল এবং শরীর থেকে অবশিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছিল। নরপশুরা তাঁকে ঐ রাতেই সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের পিছনে একটা ডোবার মধ্যে ফেলে দেয়।

আজমল আলী চৌধুরী ছিলেন সিলেটে মুসলিম লীগের এক শক্ত খুঁটি। আইয়ুবের কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় তিনি শিল্প মন্ত্রী ছিলেন। সিলেটে মুসলিম লীগ বলতে একসময় তাঁকেই আমরা বুঝতাম। সিলেট রেফারেন্ডামের সময় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। রেফারেন্ডামের সময় যখন কায়েদে আযম সিলেটে আসেন তখন তিনি আজলম আলী চৌধুরীর আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। চৌধুরী সাহেব কায়েদে আযমের এত গুণমুগ্ধ ছিলেন যে কায়েদে আযম যে ঘরে রাত কাটিয়েছিলেন সেই ঘরের প্রত্যেকটি জিনিসপত্র মিউজিয়ামের মত করে সংরক্ষণ করেছিলেন। তাঁর বাসায় যে কেউ গেলে তিনি অত্যন্ত আগ্রহভরে কায়েদে আযমের ব্যবহৃত জিনিসপত্র ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাতেন। কায়েদে আযমের সাথে তাঁর বোন ফাতেমা জিন্নাহও এসেছিলেন। চৌধুরী সাহেব ফাতেমা জিন্নাহকে যে ঘরে রেখেছিলেন সেটিও যত্নে সহকারে রক্ষা করেছিলেন।

চৌধুরী সাহেব কখনও ভাবতে পারেননি, যত রাজনৈতিক বিরোধীতাই থাকুক না কেন সিলেটের মানুষ তাঁর গায়ে হাত তুলতে পারে। কিন্তু ইন্ডিয়ার রাজনৈতিক মন্ত্র গেরিলাদের বুদ্ধি ও বিবেচনাকে এতখানি অসুস্থ করে ফেলেছিল যে তাদের কোন কিছুই নৈতিকতা বিরোধী মনে হত না।

চৌধুরী সাহেবের বাসা ছিল সিলেটে শাহজালালের (রঃ) দরগার কাছাকাছি। তিনি প্রতিদিন দরগার মসজিদে ফজরের নামায আদায় করতেন। গেরিলার এটা জানত। বাংলাদেশ হওয়ার দু’দিন পর ১৯শে ডিসেম্বর তিনি যথারীতি নামায আদায় করে ফেরার পথে ওঁৎ পেতে থাকা গেরিলারা তাঁকে আক্রমণ করে। বুলেটের আঘাতে নিমেষে তাঁর শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায়।

আওয়ামী লীগের সেই উন্মাদনার যুগেও চৌধুরী সাহেবের শাহাদাতের খবর যখন ছড়িয়ে পড়ে হাজার হাজার মানুষ তাঁর বাড়ীর সামনে সমবেত হয়। বলা বাহুল্য তাঁর আততায়ীদের খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সিলেটে মুসলিম লীগের আর একজন নেতা ডা. এম. এ মজিদকেও গেরিলারা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল। তিনি সিলেট জেলা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর মজিদ সাহেব নিজের বাসা থেকে সরে গিয়ে তাঁরই এক আত্মীয় কমিউনিষ্ট নেতা পীর হাবিবুর রহমানের বাসায় আশ্রয় নেন। মজিদ সাহেব বিপদের দিনে যাকে আশ্রয়দাতা বিবেচনা করেছিলেন-শোনা যায় সেই পীর সাহেবের ইঙ্গিতেই গেরিলারা তার বাসায় বসেই মজিদ সাহেবকে গুলি করে হত্যা করে। মজিদ সাহেবের ছেলেকেও একই স্থানে মারা হয়েছিল। এ দুটি হত্যাকান্ডই সিলেটের মানুষকে অত্যন্ত মর্মাহক করেছিল। তখন অনেকেই ক্ষোভের সাথে বলতে থাকেন আমরা রেফারেন্ডামের মাধ্যমে পাকিস্তানে এসেছিলাম। যারা আমাদের পূর্ববঙ্গের সাথে অন্তর্ভূক্ত করিয়েছিলেন তাদেরই যদি মেরে ফেলা হয় তবে আমাদের পূর্ববঙ্গের সাথে থেকে লাভ কি। আমাদের আসামে ফিরে যাওয়াই ভাল।

সৈয়দ আসাদুল্লাহ সিরাজীকে গ্রেফতার করে সিরাজগঞ্জ জেলে রাখা হয়েছিল। গেরিলারা হত্যা ও রক্তের জন্য এতখানি মরিয়া হয়ে উঠেছিল যে, পুলিশের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে ছিনতাই করে নিয়ে যায়। তাঁকে তাঁর সাথে আরও ১৫/১৬ জন পাকিস্তানপন্থীকে গেরিলারা ধরে নিয়ে প্রথমে শারীরিক নির্যাতন করে পরে গুলি করে হত্যা করে। তাদের লাশও ফেরৎ দেয়নি। যমুনার বক্ষে এসব লাশ ছুঁড়ে ফেলে ছিল। পাকিস্তানপন্থীদের হত্যা করার এরকম প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। যে যত বেশী দালাল খুন করতে পারত সেই তত বড় বীর হিসেবে চিহ্নিত হত।

এ সময় গেরিলাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়াল বিহারীরা। বিহারী পুরুষদের হত্যা করা। তাদের স্ত্রী ও মেয়েদের লুটের মালের মত যথেচ্ছ ব্যবহার করা এসময় ডাল ভাত হয়ে গিয়েছিল। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গেরিলারা বন্দুকের নলের মুখে অসংখ্য অবাঙ্গালীর বাড়ীঘর, জমি-জিরাত নিজেদের নামে লিখিয়ে নিয়েছে। মীরপুর ও মোহাম্মদপুরে যেখানে বিহারীদের অসংখ্য সম্পত্তি ছিল তার অধিকাংশই বাংলাদেশ হওয়ার পর গেরিলারা ঠিক এ প্রক্রিয়ায় কব্জা করেছে। জেলে আটক বিহারীরা আমাদের তাদের অবর্ণনীয় দুর্দশার কথা বাঁধ ভাঙ্গ চোখের পানিতে বর্ণনা করেছে। আজ এই ভেবে কৌতুক অনুভব করি যখন আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতারা স্বাধীনতার চেতনার কথা বলে হুঙ্কার ছাড়ে তখন মনে হয় এ চেতনার বেলুন কত ঠুনকো। পরের সম্পত্তি লোপাট করে যে চেতনাই প্রতিষ্ঠা করতে যাওয়া হোক না কেন তার পরিণতি কখনই শুভ হয় না। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস কি তার বড় প্রমাণ নয়?

লুটপাটের এই প্রক্রিয়া মুজিবের ইঙ্গিতে অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে। মুজিব যখন দেশে ফিরে আসেন তখন তাঁর কর্মীদের তিনি বলতে শুরু করেছিলেন বাইশ বছর কিছু দিতে পারিনি। এখন তোদের সামনে সুযোগ এসেছে। তোরা যে যার মত কিছু বানিয়ে ফেল।
অথচ প্রকাশ্য ভাষণে জনগণকে মুজিব বলে বেড়াতেন তিন বছর আমি তোমাদের কিছুই দিতে পারব না।

লুটপাটের ব্যাপারে মুজিবের ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি সবচেয়ে বেশী হাত পাকিয়েছিল। ঢাকা শহরে বিহারীদের যে কত সম্পত্তি সে জবর দখল করেছে তার ইয়ত্তা নেই। মতিঝিলে এমনও ঘটনা ঘটেছে যে কোন গেরিলা দিনের বেলায় কিছু টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে বিহারীদের কাছ থেকে সম্পত্তি লিখিয়ে নিয়েছে। রাতে সেই টাকাই গেরিলারা আবার ছিনিয়ে নিয়ে এসেছে। অনেক ইন্ডিয়া ফেরৎ গেরিলা এভাবে রাতারাতি কোটিপতি হয়ে গেছে।

জেল থেকে বের হওয়ার পর ফজলুল হক মনির এক কাহিনী শুনেছিলাম আবু সালেহর কাছ থেকে। আবু সালেহ পাকিস্তান আন্দোলনের সময় সোহরাওয়ার্দী গ্রুপে কাজ করতেন। তিনি ছিলেন মুজিবের খুব ঘনিষ্ঠ। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথেও তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর আবু সালেহ মুজিব আর নুরুদ্দীন গ্রীন এন্ড হোয়াইট নামে এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। নিউ মার্কেটের সামনে বলাকা সিনেমা হল এঁরাই তৈরী করেছিলেন। পরে অবশ্য সিনেমা হলের মালিকানা তাঁরা অন্যের কাছে হস্তান্তর করেন।

মুজিবের ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে আবু সালেহর মুজিবের পরিবারেও আসা যাওয়া ছিল। মুজিব যখন ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে বন্দী তখন আবু সালেহ মুজিবের স্ত্রী ও ছেলে মেয়েদের অনেক সাহায্য করেছেন।

আবু সালেহর বলাকা সিনেমা হলের নীচে একটা বইয়ের দোকান ছিল। এখানে তিনি নিয়মিত বসতেন। জেল থেকে বের হওয়ার পর আমি একবার নিউমার্কেট গিয়েছিলাম। তখন তাঁর সাথে আমার দেখা। অনেক আক্ষেপের সাথে তিনি আমাকে বললেন, দোস্ত তোরাই ঠিক কথা বলেছিলি। মুজিব যে কি এ দেশ স্বাধীন করেছে! জনগণ শান্তি পেল না।

আমি বললাম কেন এখনতো তোদেরই দিন তোদের ভাল থাকবার কথা। তিনি বললেন ভাল থাকতে পারলাম কোথায়। মুজিব পাকিস্তান থেকে ফিরে আসার কয়েকদিন পর আমি তাঁর ধানমন্ডির বাড়ীতে গিয়েছিলাম। মুজিব তখন সবেমাত্র প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। যে বাড়ীতে আমার এত যাতায়াত, ইব্রাহিম, এবার গিয়ে আমার যেন একটু অন্যরকম লাগল। রিসিপশনে জিজ্ঞাসা করলাম মুজিব কোথায়?
তাঁরা উত্তর দিল উনি এখন একজন খুব সম্মানিত লোকের সাথে কথা বলছেন।
আমি তাঁদের বললাম, কথা শেষ হলে আমাকে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিতে।

মুজিবের বাড়ীর চাকরসহ অনেককেই আমি চিনতাম। তারা কেউ কেউ আমাকে বাইরে দাঁড়িয়ে আছি দেখে ভেতরে যাওয়ার অনুরোধও করল। তারাই আমাকে তখন বলল সম্মানিত ব্যক্তিটি মুজিবেরই দুই ছেলে কামাল ও জামালের জন্য দু’টো ঝকঝকে কার উপহার নিয়ে এসেছেন। মুজিবের মন্ত্রীরা আপ্যায়নের জন্য ছোটাছুটি করছেন। দুটি নতুন কার বাড়ীর সামনে দেখতে পেলাম। কিছুক্ষণ পরেই বুঝলাম সম্মানিত ব্যক্তিটি কে। মুজিব হাস্যোজ্জ্বল মুখে ধনাঢ্য জহুরুল ইসলামের ঘাড়ে হাত দিয়ে বেরিয়ে আসছেন। মুজিব তাঁকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে ফেরার পথে আমার সাথে তাঁর চোখাচোখি হল।

মুজিব বললেন তুই এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন, চল চল। চা খাবি। কখন এসেছিস? আমি বললাম বেশ কিছুক্ষণ হয় এসেছি। আমি চা খেতে আসিনি। তোর কাছে একটা বিচার চাইতে এসেছি। মুজিব বললেন, কিসের বিচার? আগে ভিতরে চল চা খাবি, তারপর সব শুনব।

আমি বললাম আমিতো আগে বিচার চাই। তুই বিচার করবি কি না বল। মুজিব আমাকে চাপের মুখে বললেন কি ঘটনা আমাকে খুলে বল। আমি বললাম তোর ভাগ্নে ফজলুল হক মনি আজ ৬ দিন ধরে ঢাকা শহরে লুটপাট চালাচ্ছে। সরকারী সম্পত্তি রেহাই পাচ্ছে না। ইস্কাটনের ওয়াপদা রেস্ট হাউস মনি শূণ্য করে ফেলেছে। এর দামী আসবাবপত্র এসি ফ্যান থেকে শুরু করে যা কিছু আছে দুদিনে তার দলবল সাবাড় করে ফেলেছে। বাংলাদেশ তো লুটপাট হওয়ার জন্য তৈরী হয়নি, তুই এর বিচার কর।

মুজিব বললেন, আমি সবকিছু দেখব। তুই চিন্তা করিস না। এর মধ্যে মুজিবের স্ত্রী আমাকে দেখে কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনিও বললেন হ্যাঁ মনির এসব কথা আমিও শুনেছি।
মুজিব তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আমাকে আবারও বললেন তুই একটু বসে যা।

আমি বললাম তুই যদি এসব লুটপাটের কোন প্রতিকার না করিস তবে আমি আর কখনও তোর কাছে আসব না। এই কথা বলে মুজিবের বাসা থেকে আমি আমার বাসায় ফিরে এলাম। আধা ঘন্টা হয়নি। এর মধ্যে দেখি একটা জীপ এসে দাঁড়াল, আমার বাসার সামনে। জীপ থেকে একদল তরুণ স্টেনগান হাতে নেমে এসে আমার বাসা ঘিরে ফেলল। আমি তো হতভম্ব। আমার সামনে ওরা চিৎকার করে বলে উঠল তোর এত সাহস। দেশ স্বাধীন করেছি আমরা, আর তুই মনি ভাই এর বিরুদ্ধে তোর পার্টনারের কাছে অভিযোগ করেছিস। বুঝলাম সবকিছু খবর পেয়ে মনি তার দলবল পাঠিয়ে দিয়েছে-আমাকে শিক্ষা দেবার জন্য। এর মধ্যে ওদের কেউ গলা ফাটিয়ে বলল শুয়োরের বাচ্চাকে বেঁধে ফেল।
আর যায় কোথায়। মনির লোকজন আমাকে পিঠ মোড়া দিয়ে বাঁধল। চোখও কাপড় দিয়ে বেঁধে দিল। আমার স্ত্রী ও বাচ্চারা তখন অসহারে মত দাঁড়িয়েছিল।

তারপর আমাকে হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে জীপের মধ্যে আছাড় দিয়ে ফেলল। জীপ চলতে শুরু করল। মনে মনে ভাবছিলাম আমার হয়ত দিন ফুরিয়ে এসেছে। জীপ প্রায় ২০/২৫ মিনিট চলার পর এক জায়গায় এসে থামল। এবারও সশস্ত্র তরুণরা আমাকে আর এক আছাড় দিয়ে জীপ থেকে নামাল। এভাবে প্রায় ২/৩ মিনিট চলে গেল। তরুণরা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালি-গালাজ করছিল। আমি তখন মৃত্যুর জন্য মানষিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছি। হঠাৎ দেখি একটা মেয়েলী কণ্ঠ চিৎকার করে বলছে সালেহ ভাই, সালেহ ভাই আমি এসেছি। আপনার আর কোন ভয় নেই। কিছুক্ষণ চিন্তা করে বুঝলাম এ হচ্ছে বেগম মুজিবের কণ্ঠ। তিনি কিভাবে যেন খবর পেয়ে ছুটে এসেছিলেন। তিনি আমার হাত খুলে দিলেন। চোখের কাপড় সরিয়ে ফেললেন। দেখলাম গুলশান লেকের কাছে আমাকে নিয়ে আসা হয়েছে। বেগম মুজিব না আসলে সেদিন হয়ত তরুণরা আমাকে ওখানে মেরে ফেলে রেখে যেত। যেমন করে ওখানে মনি ও তার লোকজন অসংখ্য রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী ও বিহারীদের নিয়ে জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিয়েছে।

লক্ষ্য করলাম বেগম মুজিব আসায় তরুণরা বেশ কিছুদূর সরে গেছে। বেগম মুজিব আমাকে বারবার অনুরোধ করলেন তাঁর বাসায় যাবার জন্য। আমি বললাম এর পরেও তোমরা আমাকে বাসায় যেতে বল? যাও মুজিবকে বল, স্বাধীন বাংলাদেশে আমার জন্য এত লাঞ্ছনা অপেক্ষা করছিল তা বুঝতে পারিনি। জানিনা আমার পরিবার পরিজন এখন কেমন আছে।

পরে অবশ্য বেগম মুজিবই সালেহকে তাঁর বাসায় পৌঁছে দিয়ে যান। সেদিন সালেহ আমাকে বলেছিলেন এরপর থেকে তিনি আর কখনও মুজিবের বাসায় যান নি। শেখ মনি তখন নতুন দেশের আয়রন ম্যান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। তার কথার প্রতিবাদ করার মত সাহস তখন কারও ছিল না।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh