Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ২ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

১৯৭১ সালে আমরা যখন ঢাকায় এলাম তখন এটি ছিল একটি ছোট্ট জেলা শহর। সেদিনের ঢাকার সাথে আজকের ঢাকার কোন তুলনাই চলে না। আজকের কমলাপুর রেল ষ্টেশন ছিল ফুলবাড়ীয়ায়। রেল লাইনের ওপারে ছিল মাঠ। শুধুমাত্র পুরানো পল্টন এলাকায় কয়েক ঘর হিন্দু বাস করত। মতিঝিল ও দিলকুশা এলাকা ছিল নওয়াবদের বাগানবাড়ী। নওয়াব সলিমুল্লাহর দ্বিতীয় পুত্র নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ এখানে বাস করতেন। তাঁর বৃহদায়তন প্রাসাদটি ছিল বর্তমানের ডিআইটি বিল্ডিং-এর ঠিক পিছনেই। সরকার পরবর্তীকালে এসব এলাকা রিকুইজিশন করে নেয়।

ঢাকার মুসলমানদের সামাজিক সম্মান ও প্রতিপত্তি তেমন একটা ছিল না বললেই চলে। ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরী-বাকরী প্রায় সব কিছুতেই ছিল হিন্দুদের একাধিপত্য। শুধুমাত্র বই-এর ব্যবসাটা দু’জন নেতৃস্থানীয় মুসলমান ব্যবসায়ীর হাতে ছিল দেখেছি। এঁদের একজন কাজী আব্দুর রশীদ। পরবর্তীকালে এঁর এক ছেলে কাজী বশীর ওরফে হুমায়ুন ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান হন। আর একজন আব্দুস সোবহান। ধানমন্ডির সোবহানবাগ এলাকা এক সময় তিনি কিনে নিয়েছিলেন। সোবহানবাগ নামটি তাঁরই স্মৃতি বহন করছে। সেকালের গরীব মুসলমানরা বংশাল, নাজিরাবাজার, বেগমবাজার, নওয়াবগঞ্জ, রায় সাহেব বাজার, রোকনপুর, কলতাবাজার প্রভৃতি এলাকায় বসবাস করত। এরা মূলত ওস্তাগরি করত, ঘোড়ার গাড়ি চালাত। সে আমলে ওয়ারী ছিল অভিজাত এলাকা। উচ্চবিত্ত হিন্দু পরিবার এ এলাকায় বাস করত। বলধার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরীর বাস ছিল ওয়ারীতে। তাঁর ছিল বিরল প্রজাতির গাছ সংরক্ষণ করার সখ। বলধা গার্ডেন তাঁর নিজের তত্ত্বাবধানেই করা। রবীন্দ্রনাথ একবার নরেন্দ্র নারায়ণের বাড়িতে এসে উঠেছিলেন। তাঁর ক্যামেলিয়া কবিতাটি এখানে বসেই লেখা। এ এলাকায় মুসলমানদের কোন প্রবেশাধিকার ছিল না। যদি কেউ ভুলক্রমে ঢুকেও পড়ত তবে সে এলাকা বুড়িগঙ্গার জলে ধুয়ে ফেলা হত। তখনকার দিনে মুসলমানদের প্রতি হিন্দুদের এই ছিল সাধারণ আচরণ। এ এলাকার পাশ দিয়ে তখন ঢাকা নারায়ণগঞ্জ রেল লাইন ছিল। একবার রেলগাড়ি থামিয়ে হিন্দুরা ১৯ জন নিরীহ মুসলমানকে জবাই করে ফেলে। তখনকার দিনে নওয়াব পরিবারের সদস্য ছাড়া ঢাকায় কয়েকজন প্রভাবশালী মুসলমানের কথা মনে পড়ছে। এঁদের মধ্যে সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুর, শেফাউল মুলক হাকিম হাবিবুর রহমান, আখুনজাদা, আবুল হাসানাৎ, সৈয়দ রেজাউল করিম, বাদামতলীর সৈয়দ মোহাম্মদ আলী বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

সৈয়দ মোহাম্মদ তৈফুর ও হাকিম হাবিবুর রহমান ঢাকার ইতিহাস লিখে বিখ্যাত হয়েছেন। এছাড়া হাবিবুর রহমান হেকিম হিসেবে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। শুনেছি রোগীর গলার আওয়াজ শুনে তিনি রোগ ধরে ফেলতে পারতেন। দিল্লীর হাকিম আজমল খাঁনের মতই তাঁর হাতযশ ছিল। নওয়াব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে যখন মুসলীম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয় তখন হাকিম সাহেব বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

১৯৪৪ সালে আইএ পাশ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হই। অনার্সে আমার সাবজেক্ট ছিল হিস্ট্রি। ইউনিভার্সিটিতে তখন আজকের মত রাজনীতি এত শিকড় গাড়েনি। ছাত্ররা রাজনীতির চেয়ে লেখাপড়াকেই বেশী অগ্রাধিকার দিত। কোন কোন বড় ইস্যুতে কেবলমাত্র ছাত্রদের অংশগ্রহনণটা ব্যাপক হয়ে উঠত। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কও আজকের মত ছিল না। শিক্ষকদের মধ্যে ছিল না দলবাজি। তখনকার দিনে ঢাকা ইউনিভার্সিটির অধিকাংশ শিক্ষকই ছিলেন হিন্দু। মুসলমান শিক্ষকদের মধ্যে ড. শহীদুল্লাহ, ড. মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরী, ফজলুর রহমানের নাম মনে পড়ছে। তখন আমাদের ভিসি ছিলেন ড. মাহমুদ হাসান। তাঁর মত এমন অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আজকের দিনের শিক্ষকদের মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না।

আমার ক্লাসমেটদের মধ্যে আবু সালেক, সুলতান হোসেন খান, খোরশেদ আলম চৌধুরী, আফতাব উদ্দীন আহমদ, কাজী আউলাদ হোসেন, এটি সাদী, শামসুজ্জোহার নাম মনে পড়ছে। ইউনিভার্সিটিতে মৌলভী ফরিদ আহমদ, শাহ আজিজুর রহমান, মোহাম্মদ তোয়াহা, শফিউল আযম আমার সিনিয়র ছিলেন।
তখন পাকিস্তান আন্দোলন কেবল দানা বাঁধতে শুরু করেছে। আমরা ইউনিভার্সিটির তরুণ মুসলিম ছাত্ররা মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি অর্জনের জন্য উন্মুখ হয়েছিলাম। কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আহ্বান আমাদের প্রাণে নবজীবনের তরঙ্গ এনে দিয়েছিল।

তখন মুসলিম ছাত্র লীগের কেন্দ্রীয় অফিস ছিল কলকাতার ১৪/২ চাঁদনী চকে। বশিরহাটের আনোয়ার হোসেন ছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি। তিনি ছিলেন খুবই উঁচু মানের সংগঠক। বাংলার তরুণ মুসলমানদের মধ্যে পাকিস্তানের বাণী ছড়িয়ে দেবার জন্য তিনি দিবারাত্রি পরিশ্রম করতেন এবং রাত কাটাতেন পার্টি অফিসেই। আনোয়ার হোসেনের সাথে বরিশালের মহিউদ্দীন আহমেদ, আব্দুর রহমান চৌধুরী, নুরুদ্দীন আহমদ, আব্দুর রশীদ, বাহাউদ্দীন আহমদ, বীরভূমের মোশাররফ হোসেন, চাঁটগাঁর কাজী নাজমুল হক, রুহুল আমিন নিজামী, মুজাহারুল কুদ্দুস, ফরিদপুরের লুৎফর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমান, খুলনার আফিলুদ্দীন, একরামুলক হক, মাকসুমুল হাকীম, রাজশাহীর এমরান আলী সরকার, এমএ ফারুক, আব্বাস তৈয়ব, আব্দুস সবুর, রংপুরের মশিউর রহমান, সাইদুর রহমান, আতাউর রহমান, মোমেন শাহীর আবু সাঈদ চৌধুরী, ঢাকার আব্দুল আউয়াল, আলমাস হোসেন, শামসুল হক, শামসুদ্দীন, আলাউদ্দীন আহমেদ, কুমিল্লার মুজিবুর রহমান, শফিকুর রহমান, শফিকুল ইসলাম, বগুড়ার আব্দুল হামিদ খান, ফজলুল বারী, বিএম ইলিয়াস প্রমুখ পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য অমানুষিক পরিশ্রম করতেন। এর মধ্যে বরিশালের মহিউদ্দীন আহমদ ছিলেন আমার খুবই ঘনিষ্ঠ। কলকাতার বৈঠকখানা রোডের জিন্নাহ হলে আমরা দু’জন একসাথে বহুদিন কাটিয়েছি। তিনি খুব উঁচুদরের সংগঠক ছিলেন এবং পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য দিবারাত্র পরিশ্রম করতেন। তিনি এক সময় এত ভারত বিরোধী ছিলেন যে, রেডিওতে ভারতীয় সংবাদ শুনতেন না এবং কাউকে শুনতে দেখলে সে রেডিও পর্যন্ত ছুঁড়ে মারতেন। মহিউদ্দীন ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ফজলুল হকের বিরুদ্ধে পুরো বরিশালের জনগণকে সংগঠিত করবার জন্য অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এ সময় বরিশালের নদীপথে লঞ্চে করে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে মহিউদ্দীন, আব্দুর রহমান চৌধুরী ও আমি রাতদিন পাকিস্তানের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছি।

পাকিস্তান হওয়ার পর একবার পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হলে বরিশালে তার প্রতিক্রিয়া হয়। বরিশালের দাঙ্গার পিছনে মহিউদ্দীনের হাত ছিল বলে অনেকে সে সময় অভিযোগ করেছিল। বরিশালের ডিসি ফারুকী তাঁকে দীর্ঘদিন জেলে রাখেন। জেলে গিয়েই তাঁর চিন্তাভাবনা পাল্টে যায়। সেখানে কিছু কমিউনিস্ট নেতার সংস্পর্শে এসে তিনি বামপন্থী বনে যান। এভাবেই একজন পাকিস্তানপন্থী নিবেদিত প্রাণ রাজনীতিবিদ পাকিস্তান বিরোধী শিবিরে যোগ দেন। আমরা মহিউদ্দীনকে জেল থেকে মুক্ত করার জন্য শাহ আজিজুর রহমানসহ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা লিয়াকত আলী খানকে অনুরোধ করি। কিন্তু ডিসি ফারুকীর অনমনীয়তার মুখে সেটি আর সম্ভব হয়নি।

উজিরে আযম লিয়াকত আলী খান মহিউদ্দীনকে ছেড়ে দেয়ার কথা বললে ডিসি উত্তর দিয়েছিলেন Sir, Please do not request me. So long I am the D.M of Barisal, I will not allow him to go out of jail. সেকালের আইসিএসডিএম-দের ব্যক্তিত্বের সামনে ঝানু রাজনীতিবিদরাও নাকানি-চুবানি খেতেন।
১৯৪৫ সালে আমরা মুসলিম ছাত্রলীগের কুষ্টিয়া সম্মেলনে যোগ দেই। এই সম্মেলনে ছাত্রলীগের একটি সাংগঠনিক কমিটি খাড়া করা হয়। শামসুল হুদা চৌধুরী সভাপতি ও শাহ আজিজুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আমি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হই। এই সম্মেলনে আমরা বাংলার সর্বত্র ছাত্রলীগকে সংগঠিত করার সিন্ধান্ত নেই এবং সম্মেলন শেষে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ি। আমরা দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া প্রভৃতি অঞ্চলে দলকে সংগঠিত করবার জন্য চেষ্টা চালাই। শাহ আজিজ ছিলেন আমাদের দলে। তিনি ছিলেন খুবই শক্তিশালী বক্তা। আরবী, উর্দূ, ইংরেজী, বাংলা যখন যেটির প্রয়োজন বোধ করতেন তিনি তাই ব্যবহার করতেন। ইসলামের উপর ছিল তাঁর অগাধ পড়াশোনা। ইসলামের নানা প্রসঙ্গ অবতারণা করে তিনি যে কোন সময় জনতাকে মাতিয়ে দিতে পারতেন। সে সময় কয়েকজনের এক একটি দল করে আমরা এমনিভাবে বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা বুঝানোর জন্য ছড়িয়ে পড়েছিলাম।
এ সময় লেডী ব্রাবোর্ন কলেজের কিছু ছাত্রী মুসলিম ছাত্রলীগের মহিলা শাখা গড়ে তোলেন। এঁদের মধ্যে হাজেরা খাতুন, মেহেরুন্নেসা, সৈয়দা রোকেয়া মুসলমান মহিলাদের মধ্যে পাকিস্তানের বাণী ছড়িয়ে দেয়ার জন্য খুবই পরিশ্রম করেছেন।

পরবর্তীকালে মেহেরুন্নেসা ওকালতি পাস করেন। মুসলমান মেয়েদের মধ্যে তিনিই প্রথম উকিল হিসেবে আদালতে হাজিরা দেন। তিনি ছিলেন নোয়াখালীর প্রখ্যাত মুসলিম লীগ নেতা ও যুক্তবঙ্গের শেষ মন্ত্রীসভার সদস্য খান বাহাদুর আব্দুল গোফরানের মেয়ে। মেহেরুন্নেসা মোমেনশাহী থেকে পূর্ব পাকিস্তান পরিষদ সদস্য হয়েছিলেন। হাজেরা খাতুনের বিয়ে হয় সিলেটের মাহমুদ আলীর সাথে। মাহমুদ আলী সিলেট রেফারেন্ডামের সময় আমাদের সাথে কাজ করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী হন। আসামের মুসলমানদের আন্দোলন নিয়ে তিনি Insurgent Assam নামে একটি তথ্যপূর্ণ বই লিখেছিলেন। রোকেয়ার বিয়ে হয় আমাদের এক সময়ের মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের সাথে। তিনিও পরবর্তীকালে পাকিস্তান গণপরিষদের সদস্য হন। র‌্যাংকিন ষ্ট্রিটের সিলভার ডেল হাইস্কুল তাঁরই প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে। ১৯৪৬-এর নির্বাচনের আগে কায়েদে আযম কলকাতায় আসেন। কলকাতায় এলে তিনি ৫, হ্যারিংটন ষ্ট্রিটে ইসপাহানীর বাড়িতে উঠতেন। আমরা সেদিন অনেকে হ্যারিংটন ষ্ট্রিটে কায়েদে আযমকে দেখতে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি সমগ্র এলাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে আছে। বাড়ির সামনে বারান্দায় তখন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, খাজা নাজিমুদ্দীন, মওলানা আকরাম খাঁ, হবিবুল্লাহ বাহার, ফজলুর রহমান, হামিদুল হক চৌধুরী, খাজা শাহাবুদ্দীন প্রমুখ ঘোরাফিরা করছিলেন। কায়েদে আযমের ব্যক্তিত্বের প্রখরতা এত বেশী ছিল যে, তাঁর সামনে বাংলার মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ প্রায় সবাই নিস্প্রভ হয়ে যেতেন। মানুষকে পর্যবেক্ষণ করে ত্বড়িৎ বুঝে ফেলার এত অদ্ভুত যাদুমন্ত্র তাঁর হাতে ছিল। বাংলার কোন মুসলিম লীগ নেতা জাতির জন্য রাজনীতি করেছেন, কে উপরে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন, কে সম্পদ বানানোর অভিপ্রায়ে রাজনীতিতে এসেছেন তা তিনি কিছুক্ষণ কথা বলেই বুঝে ফেলতেন।

গিয়ে দেখি শেখ মুজিবের নেতৃত্বে জহিরুদ্দীন, নুরুল হুদা, আবু সালেহ, নুরুদ্দীন, আজমিরী প্রমূখ ঐ ভীড়ের মধ্য থেকেই কায়েদে আযম জিন্দাবাদ, মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ বলে শ্লোগান দিচ্ছেন। এঁরা কয়েকজন মুসলিম ছাত্রলীগের জন্য কাজ করতেন কিন্তু আমাদের থেকে পৃথকভাবে। তাঁরা কোন কমিটির সদস্য ছিলেন না। এঁরা সোহরাওয়ার্দী সাহেবের গ্রুপ বলে পরিচিত ছিলেন। এঁরা তখন কলকাতায় মুসলিম ছাত্রলীগের উদ্যোগে একটি সম্মেলনের চেষ্টা চালান। কলকাতা নগর মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি সিলেটের মোয়াজ্জেম হোসেন ছিলেন এঁদের সাথে। কিন্তু কায়েদে আযম তাঁদের উদ্যোগকে সমর্থন দেননি।

আমরা নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে কায়েদে আযমের সাথে দেখা করতে যাই। খাজা নাজিমুদ্দীন ও মওলানা আকরাম খাঁ আমাদের সাথে তাঁর সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। আমরা তাকে আমাদের কাজকর্ম সম্বন্ধে অবহিত করি। তিনি আমাদের সম্মেলনে বক্তৃতা করতে রাজী হন।

ইসপাহানীর বাড়ীর সামনে দাঁড়ানো অজস্র মানুষের সামনে তিনি মাত্র একবার দেখা দিয়েছিলেন। তাঁর চলন, বলন ও ভঙ্গির মধ্যে ছিল বিশেষ ধরণের আভিজাত্য, যা অন্য দশজনের মত ছিল না। আমার এখনও চোখে ভাসে তিনি শান্ত, ধীর পায়ে বেরিয়ে এসে জনতার সামনে হাত উঁচু করে ধরতেই সবাই যেন নিশ্চুপ বনে গেল। তিনি তাঁর বিশেষ স্টাইলে মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, My young friends, from morning till now I am very much busy; Please let me have some rest. এই কথা বলে তিনি ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ করেছেন এমন সময় কে যেন জনতার মধ্য থেকে চিৎকার করে বলল, Sir how long you are remaining in Calcutta. তিনি তাঁর বিশেষ ভঙ্গিমায়ই উত্তর দিয়েছিলেন, As long as I feel necessary.

আমাদের সম্মেলন হয়েছিল কলকাতার বিখ্যাত গড়ের মাঠে। সেদিনও কায়েদে আযম লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে এক অসাধারণ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সারা বাংলাদেশ থেকে আমাদের প্রতিনিধিরা এখানে হাজির হয়েছিল। তাছাড়া কলকাতার মুসলমানরা সেদিন গড়ের মাঠে ভেঙ্গে পড়েছিল। কায়েদে আযম ইসপাহানীকে নিয়ে যখন গাড়ীতে করে সম্মেলন স্থলে পৌঁছলেন তখন এক অভূতপূর্ব অবস্থার সৃষ্টি হয়। চারদিক নারায়ে তকবীর আল্লাহু আকবর, কায়েদে আজম জিন্দাবাদ, মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। আমার মনে হচ্ছিল পুরো কলকাতা শহর বুঝি থরথর করে কাঁপছে।

আমরা তাঁকে অভ্যর্থনা করে স্টেজে নিয়ে বসাই। ছাত্রলীগ মহিলা শাখার নেত্রী রোকেয়া হাতের কাজ করা পুরো ভারতবর্ষের ম্যাপ যার মধ্যে চিহ্নিত হয়েছিল সম্ভাব্য পাকিস্তান এলাকা এবং নীচে ইংরেজীতে লেখা হয়েছিল Two Nation Theory  কায়েদে আযমকে উপহার দেন। রোকেয়া খুব ভাল সূঁচের কাজ জানতেন।

কায়েদে আযম বক্তৃতায় যা বলেছিলেন আমি তার প্রায় পুরোটাই মুখস্ত করে ফেলেছিলাম। এখনও তার দু’একটি মূল্যবান লাইন মনে আছেঃ We maintain and hold that Hindus and Muslims are two Major Nations by any definition. We are a nation of ten crores by our distinctive culture and civilization, language and literature, art and architecture, legal laws and moral codes, Customs and calendars, history and traditions, aptitude and ambitions. In short, we have our distinctive outlook on life and of life; by all canons of international law we Muslims are a nation. You see, after victory in the last Great War, Mr. Churchill showed two fingers as sign of victory. But my victory is this (Quid-e-Azam showed one finger.) If you Muslims are united, there is no power on earth, which can stop you from achieving Pakistan.

শাহ আজিজ এই বক্তৃতার বাংলা ও উর্দু অনুবাদ করে শুনিয়েছিলেন। তিনি এই সম্মেলনে সভাপতিত্বও করেছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি একবার আমাদের বলেছিলেন কায়েদে আযমের উপস্থিতিতে ঐ সভায় সভাপতিত্ব করাই ছিল তাঁর জীবনের সেরা ঘটনা।

কলকাতার মুসলমান ছাত্রদের বেশী আনাগোনা ছিল ইসলামীয়া কলেজ, আলীয়া মাদ্রাসা আর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কারমাইকেল ও বেকার হোস্টেলে এবং মীর্জাপুরের জিন্নাহ হলে। কলকাতায় গেলে আমি জিন্নাহ হলেই আস্তানা গাড়তাম। আত্মীয়-স্বজনের বাসায় না উঠে এখানে থাকার আমার কিছু সুবিধা ছিল। অবাধ রাজনীতি চর্চা ও আন্দোলনে আমার কেউ বাধা হয়ে উঠত না। জিন্নাহ হলের খাটগুলোতে এত ছারপোকার প্রকোপ ছিল যে আমাদের পিঠ তখন কারোরই অক্ষত ছিল না।

একবার কলকাতায় থাকতে রশীদ আলী দিবস পালিত হয়। রশীদ আলী ছিলেন সুভাষ বসুর বিপ্লবী বাহিনী INA-এর সদস্য। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপানের পরাজয়ের পর INA নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতার করে দিল্লীর লালকেল্লার অভ্যন্তরে ইংরেজরা বিচার করতে শুরু করে। রশীদ আলীর বিচারের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ প্রতিবাদ জানিয়েছিল। কলকাতার রাস্তায় মুসলিম ছাত্রলীগের ছেলেরা মিছিল করে, গণজমায়েত করে ইংরেজদের অপকর্মের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টির প্রয়াস চালায়। তখন পুলিশ লাঠিচার্জ করে, টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ে। একপর্যায়ে গুলিও চালায়। এতে আমাদের বহু কর্মী আহত হয়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়। বেশ কিছু কর্মীকে গ্রেফতার করে সরকার আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে ঢুকিয়ে দেয়।

আমরা আহতদের চিকিৎসা ও পথ্যের জন্য রাস্তায় রাস্তায় চাঁদা তুলেছিলাম। আমাদের মুখে তখন একটাই ভাষা ছিল ‘শহীদ ও জখমীকো মদদ করনে কে লিয়ে কুচ দিজিয়ে।’ কলকাতার সাধারণ মানুষ আমাদের পথযাত্রায় দারুণ সাড়া দিয়েছিল। আমরা বিপুল তথ্য, ফল-ফলাদি নিয়ে মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ভর্তি করে ফেলেছিলাম। মনে আছে কলকাতার খ্রিষ্টানরা আমাদের বিছিলে বাধা দেবার চেষ্টা করেছিল। এঁরা কলকাতার তালতলা এলাকায় থাকতেন। আসলে সেকালে ভারতীয় খ্রিষ্টানরা কখনোই চাইত না আমরা আজাদীর আন্দোলন গড়ে তুলি।

এসময় সারা ভারতবর্ষ জুড়েই বিরাজ করছিল এক আস্থাহীন পরিবেশ। কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি সবকিছু বিষয়ে তুলেছিল। এর প্রত্যুত্তরে সেকালের মুসলিম রাজনীতিও মারদাঙ্গা হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ, হিন্দু মহাসভা, শিবসেনা প্রভৃতির সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপে মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। তাঁরা তখন সিদ্ধান্ত নেন মুসলিম ন্যাশনাল গার্ড প্রতিষ্ঠার। বাংলায় ন্যাশনাল গার্ড গড়ে তোলার পিছনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিশাল ভূমিকা রেখেছিলেন। আসলে বাংলায় পাকিস্তান আন্দোলন জনপ্রিয় করার পিছনে তাঁরই ভূমিকাটা ছিল অনন্য।

মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের সালারে সুবা নির্বাচিত হয়েছিলেন আইএইচ মুহাজীর। নায়বে সালারে সুবা হন জহিরুদ্দীন। জহিরুদ্দীন পরে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন এবং কেন্দ্রের মন্ত্রীও হয়েছিলেন। তিনি সোহরাওয়ার্দীর গুণমুগ্ধ ছিলেন।

১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের টিকেটে জহিরুদ্দীন এমএনএ হন কিন্তু পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগের বাংলাদেশ আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারেননি। ১৯৭১ সালে বিশৃঙ্খলার মধ্যে তিনি শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কন্যা বেগম আখতার সোলায়মানের সাথে পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেন। এজন্য তাঁকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর তাঁকে মুক্তিযোদ্ধারা মেরে ফেলার জন্য ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহর রহমতে তাঁর প্রাণটা কোনক্রমে রক্ষা পায় তবে মুক্তিদের হাতে তাঁর লাঞ্ছনার শেষ ছিল না। পরবর্তীকালে তাঁকে পাকিস্তানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

দেখতে দেখতে ১৯৪৬ সালের নির্বাচন ঘনিয়ে আসে। এ নির্বাচনকে কায়েদে আযম পাকিস্তান ইস্যুর নির্বাচন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন। নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলার মুসলমানদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি হয়। এতকাল মুসলমানরা শুধু ইংরেজ ও হিন্দুদের যৌথ শোষণ ও নির্যাতনে জর্জরিত ও পীড়িত হয়ে আসছিল। ১৭৫৭ সালে বাংলায় মুসলিম শাসন অবসানের পর মুসলমানরা হান্টার সাহেবের ভাষায় ‘ভিস্তিওয়ালা ও কাঠুরিয়া’ জাতিতে পরিণত হয়েছিল। দু’শ বছরের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের শেষে এই প্রথমবারের মত তাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সুযোগ এল। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচার তখন চরমে পৌঁছেছিল।

সে আমলে হিন্দু জমিদার ও মহাজনদের বাড়ির সামনে দিয়ে কোন মুসলমান ছাতা মাথায় দিয়ে যেতে পারত না। জুতা পায় এমন কি হাঁটুর নীচে কাপড় পরে তাদের বাড়ির সামনে দিয়ে গেলে রীতিমত শাস্তি পেতে হত। বরিশালে আমার আব্বা এ ডি এম ছিলেন। তখন সেখানেও দেখেছি বাজারে কোন গরুর গোশত পাওয়া যেত না। গরু জবাই দূরে থাক, সকালে ফজলুল হকের মত শক্তিশালী মুসলিম নেতা পরিশালের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও অবস্থার তেমন একটা পরিবর্তন হয়নি। মিষ্টির দোকানে মুসলমানদের ভিতরে গিয়ে বসে মিষ্টি খঅওয়ার কথা চিন্তাই করা যেত না। মিষ্টি খাওয়ার পর উপর থেকে পানি ঢেলে দেয়া হত আর তাই আজলা ভরে খেতে হত। স্কুলে মুসলমান ছেলেরা বসতো পিছনের সারিতে। মুখে পেঁয়াজের গন্ধোর অভিযোগ তুলে তাদের দূর দূর করে সরিয়ে দিত হিন্দু সতীর্থরা।
মুসলমান ছাত্রদের বাধ্য করা হতো সরস্বতী পূজায় ভোগ দেয়ার জন্য। নিজের চোখেই দেখেছি দোলযাত্রায় মুসলমানরা অংশ গ্রহণ করত। এগুলো সম্ভব হয়েছিল এ কারণে, সাংস্কৃতিকভাবে মুসলমানদের প্রায় পর্যুদস্ত করে দেয়া হয়েছিল।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh