Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ২০ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

জেলে আসার প্রায় আটমাস পর একদিন খবর পেলাম আদমজী মিলের কমার্শিয়াল চীফ ম্যানেজার লুৎফর রহমান ইঞ্জিনিয়ারসহ কয়েকজন কর্মকর্তাকে জেলে ঢুকানো হয়েছে। লুৎফর রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে আমি চিনতাম। তিনি আমাকে বললেন, আব্দুল আওয়ালও এসেছেন। এই আওয়ালের কথা একবার লিখেছি যে মুজিব ও আদমজীর মধ্যে বন্ধনের কাজ করতেন তিনি। আওয়াল জায়গা পেয়েছিলেন পুরনো আট সেলের পাগলা গারদের খুব কাছাকাছি। একদিন আওয়ালের সাথে দেখা করতে গেলাম। আওয়াল তো আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরলেন। কিন্তু আমার কাছে তাঁকে এবার একটু অন্যরকম মনে হল। তিনি কথা বলছিলেন অনেকটা অসংলগ্নভাবে। হঠাৎ করে বললেন, ইব্রাহিম ভাই আপনাকে একটা কথা বলি শোনেন। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে যদি কিছু লোকের ভিড় দেখেন এবং আপনি ভিড়ের মধ্যে যেয়ে দেখেন মুজিবের লাশ পড়ে আছে, কেমন হবে?

আমি বললাম আওয়াল তুমি এসব কথা কেন বলছ? মুজিব এখন দেশের হর্তাকর্তা। তুমি আছ জেলে। এখন এসব কথা বলা ঠিক নয়।
আওয়াল বললেন মুজিবের এরকমই শাস্তি হওয়া উচিত। দেখছেন না আমাকে রেখেছে পাগলা গারদের কাছে। ওরা আমাকে পাগল বানাতে চায়। আমি তো কোন অন্যায় করিনি অথচ আমাকে জেলে ঢুকিয়েছে। মুজিবের জন্য আমি কি না করেছি? আপনি তো জানেন সব কাহিনী। ইব্রাহিম ভাই আপনার কাছে সিগারেট আছে? আমি বললাম ওসব কিছু নেই। তিনি তখন বললেন ইব্রাহিম ভাই আপনি নাকি ম্যানেজার? আপনি আমাকে খাওয়াবেন তো? আমি বললাম তোমাকে খাওয়াব না তো কাকে খাওয়াব? তখনকার মত আওয়ালের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলেও আমি মাঝে মাঝে তাঁর খবর নিতাম। বিশেষ করে আমার একটা কৌতুহল ছিল কেন মুজিব তাঁকে জেলে পাঠালেন। প্রথমদিকে আওয়ালের মধ্যে যে অপ্রকৃতিস্থ ভাব ছিল তা ধীরে ধীরে কমে আসতে শুরু করেছিল। আমার মনে হয় প্রথম প্রথম জেলে আসার ধকলটা তিনি সহজে নিতে পারেননি।

আওয়ামী লীগ ও তাঁর সহযোগীদের জেলে আসার কারণ খুঁজতে গিয়ে এক দীর্ঘ কাহিনীর সন্ধান পেলাম। লুৎফর রহমান নিজেই আমাকে এ ব্যাপারে কিছুটা আভাস দিয়েছিলেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর আওয়ামী লীগের বড় নেতা থেকে পাতি নেতা পর্যন্ত সবাই অবাঙ্গালীদের সম্পত্তি ও টাকা-পয়সা হাতানোর এক অরুচিকর প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিল। আদমজীরা ছিল তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিল্পপতি। স্বভাবতই আদমজীদের বিরাট সম্পত্তির দিকে আওয়ামী নেতাদের ঝোঁকটা পড়ে থাকবে। এ ব্যাপারে মুজিব পরিবারও পিছিয়ে ছিল না।

আদমজী গ্রুপের প্রধান অফিস ছিল মতিঝিলের আদমজী কোর্টে। এখানেই আদমজী পরিবারের হানিফ আদমজী বসতেন। পূর্ব পাকিস্তানে আদমজী গ্রুপের সমস্ত প্রতিষ্ঠান তিনিই দেখাশোনা করতেন। বাংলাদেশ হওয়ার পর আদমজীর বিশাল সম্পত্তি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। তাদের অনেকেই দিশেহারা হয়ে দেশ ত্যাগ করেন। ফলে এসব সম্পত্তি পুরোপুরি আওয়ামী লীগের নেতা ও কর্মীদের নিয়ন্ত্রণের চলে যায়। পরে অবশ্য মুজিব সরকার আদমজী গ্রুপের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান আদমজী জুট মিল জাতীয়করণ করে। তখনকার মত এসব প্রতিষ্ঠান সমাজতন্ত্রের নামে দেদারসে জাতীয়করণ করে মুজিব দলীয় নেতা ও কর্মীদের লুটপাটের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সুবিধা দিয়ে দেন।

এই হরি লুটের যুগে মতিঝিলের আদমজী কোর্ট চলে যায় আব্দুল আওয়ালের নিয়ন্ত্রণে। আমদজী কোর্টের ভিতরে ছিল আদমজীদের স্ট্রংরুম। আওয়াল জানতেন। কি করে মুজিব পরিবারের কাছেও সে খবর পৌঁছেছিল। মুজিব পরিবার ভেবেছিল আওয়াল যদি আদমজীদের স্ট্রংরুম ভাঙ্গে তাহলে তার ভিতর গচ্ছিত টাকা-পয়সার একটা অংশ অবশ্যই তাদের দেয়া হবে। মুজিব পরিবার আওয়ালের গতিবিধি সন্দেহের চোখে দেখত। আওয়ালকে নজরে রাখার জন্য লুৎফর রহমানকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।

কিন্তু আওয়াল ছিল অত্যন্ত ধূর্ত। তিনি লুৎফর রহমান ও আদমজী কোর্টের কয়েকজনকে বুঝিয়ে নিজের দলে ভাগিয়ে নেন এবং আদমজীদের স্ট্রংরুম ভেঙ্গে সবকিছু হাতিয়ে নিতে উদ্যত হন।

এই স্ট্রংরুমের মধ্যে ছিল আদমজীদের তাল তাল সোনা। মুজিব পরিবার তার লোকজনের মারফত আওয়ালের এই সোনা লুটের খবর পেয়ে যায়। তারা আওয়ালের উপর অগ্নিশর্মা হয়ে ওঠে এবং পরবর্তীতে আওয়ালকে জেলে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। আওয়ালের হঠাৎ আওয়ামী বিরোধীতার এটাই ছিল কারণ। পরে জেলে বসেই আওয়াল জাসদ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং জেলে বসেই তিনি ৭৩ সালে আরও একবার খবরের শিরোনামে চলে এসেছিলেন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসে অন্ধকারাচ্ছন্ন দিনগুলোতে কর্ণেল তাহের তাঁকে জেল থেকে বের করে এনে খন্দকার মোশতাকের পরিবর্তে তাঁকে রাষ্ট্রপতি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সে ইচ্ছায় সেদিন বাধ সাধেন জিয়াউর রহমান।

এসময় জেলে আরও দু’জন নতুন রাজবন্দী আসেন। একজন টিপু বিশ্বাস অন্যজন আব্দুল ওয়াহেদ। চিন্তা ভাবনায় এঁরা দুজনই ছিলেন পাকা কমিউনিস্ট। মুজিবের দুঃশাসন ও অপকীর্তির প্রতিবাদ করাই ছিল এঁদের একমাত্র অপরাধ। রাজশাহীর আত্রাই থেকে ধরে এনে প্রথমে পুলিশী হেফাজতে নির্মমভাবে অত্যাচার করা হয় এঁদের ওপর। তারপর অসুস্থ্য অবস্থায় এঁদের দুজনকে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তাঁদের শরীর জুড়ে নির্যাতনের চিহ্ন ছড়িয়ে ছিল। বহুদিন দুজনকে অসুস্থ অবস্থায় জেলের ভিতর দেখেছি, ঠিকমত হাঁটতেও পারতেন না। সবুর সাহেব নিজের পয়সা খরচ করে এঁদের জন্য কয়েকবার ওষুধ ও পথ্য আনিয়ে দিয়েছিলেন। জেল কর্তৃপক্ষ এঁদের চিকিৎসার জন্য কোন আগ্রহ দেখায়নি। বোধ হয় উপরের নির্দেশ ছিল।

টিপু বিশ্বাস ও আব্দুল ওয়াহেদকে রাখা হয়েছিল আট সেলে। যদিও তাঁদেরকে কোন ডিভিশন দেয়া হয়নি। সেলে রাখার কারণ কর্তৃপক্ষ তাঁদেরকে পৃথকভাবে রাখতে চেয়েছিলেন। আমি ম্যানেজার হিসেবে তাঁদেরকে মাঝে মাঝে ডিভিশনের খাবার পাঠাতাম। এ নিয়ে জেলার একদিন আমাকে অনুযোগ করে বললেন ইব্রাহিম সাহেব এঁরাতো ডিভিশন প্রিজনার না। তখন আমি বললাম সেটা ঠিক তাঁরা ডিভিশন প্রিজনার না কিন্তু তাঁরা দেশপ্রেমিক। তাঁরাওতো মুক্তিযুদ্ধ করেছেন। তাহলে অসুবিধা কি? জেলার সাহেব আর কথা বাড়াননি।

একদিন জেলের মধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা ও আমার পাড়ার ছেলে মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার সাথে দেখা। আমি তো তাকে দেখে হতবাক। আওয়ামী লীগের যুগে মায়া জেলে আসবে ভাবতেও পারিনি। আমি তাকে বললাম, কি মায়া, তুমি আমাদের দেখতে এসেছ নাকি? সে বলল না দুলাভাই তোফায়েল আমাকে ষড়যন্ত্র করে জেলে ঢুকিয়েছে। আপনার খবর সব আমি রাখি। জেলে বসে আপনি ম্যানেজারী করছেন শুনেছি। এখন আপনি আমাকে দেখে শুনে রাখবেন।

মায়া আমার শ্যালক সাধনের বন্ধু। সেই সূত্রে সে আমাকে আগে থেকে দুলাভাই ডাকত। এখন মায়াকে জেলে দেখে বুঝলাম নতুন দেশ আওয়ামী লীগ নেতাদের সোনার বাংলা গড়ার প্রতিযোগিতা কি রকম চলছে। এতদিন তারা পশ্চিম পাকিস্তানীদের গালি দিয়েছে আর এখন নিজেরা নিজেদের মধ্যে মারামারি শুরু করেছে।

১৯৭৩ সালের শুরুতে এসে কর্তৃপক্ষ আমাকে ফেনী জেলে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিল। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ, ১৯৭১ সালের উপনির্বাচনে অংশ নিয়েছি। আমার নির্বাচনী এলাকা ছিল ফেনী। তাই কর্তৃপক্ষ পণ করেছিল আমার বিচার ফেনীতে হওয়াই সঙ্গত।

একদিন খুব সকালে জেলারের সাথে আর একজন সাদা পোষাকধারী পুলিশ এসে হঠাৎ আমাকে বলল, আপনি রেডি হয়ে নিন, আপনাকে ফেনী যেতে হবে। আপনার বিচার ওখানেই হবে। এভাবে হঠাৎ করে পূর্বাপর কিছু ইঙ্গিত না দিয়ে ফেনী যাত্রার নির্দেশে ইতস্তত বোধ করলাম। কিন্তু বন্দী হিসেবে এ নির্দেশ অবহেলা করার ক্ষমতা আমার ছিল না।

এদিকে আমার এ অবস্থা দেখে ফজলুল কাদের চৌধুরী, খাজা খয়েরুদ্দীন ও সবুর সাহেব বের হয়ে এলেন। আমি তাঁদের সব কথা বললাম। ফজলুল কাদের চৌধুরী তো হাহুতাশ শুরু করে দিলেন। ইব্রাহিম তুমি চলে গেলে কি হবে। আমাদের এত যত্নে করে কে খাওয়াবে? এতদিন সুখে-দুঃখে এক সাথেই ছিলাম।

জেলের ভিতরে এতসব বন্ধু-বান্ধবের সাহচর্যে এসে সব দুঃখ কষ্ট ভুলতে পেরেছিলাম। অন্ততঃ এইটুকু উপলব্ধি করতাম যে এঁরা সবাই আমার আদর্শিক ভাই। একটা আদর্শের স্বপক্ষে লড়াই করতে গিয়ে আমরা এই কষ্টকে হাসিমুখে গ্রহণ করেছি। তাই হঠাৎ করে এইসব প্রিয় মুখকে বিদায় দিতে খুব কষ্ট হচ্ছিল।

জেলের ভিতর আমার যে সামান্য জিনিসপত্র ছিল তাই নিয়ে আমি বের হয়ে আসলাম। বাইরে আমার জন্য পুলিশের জীপ দাঁড়িয়ে ছিল। চারজন পুলিশসহ আমি সেই জীপে উঠে বসলাম। তখন আনুমানিক সকাল ১০টা। ফজলুল কাদের চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বললাম কাদের ভাই দোয়া করবেন। আর কবে দেখা হবে কিছুই বুঝতে পারছি না।

ফজলুল কাদের চৌধুরীর সাথে এই আমার শেষ দেখা। নোয়াখালী জেলে বসেই শুনেছিলাম তাঁর নির্মম ও ষড়যন্ত্রমূলক হত্যার কাহিনী। জীপে উপবিষ্ট পুলিশ ইন্সপেক্টরকে বললাম ভাই আপনারাতো আমাকে হঠাৎ করেই নিয়ে চলেছেন। আমাকে একটু অল্প সময়ের জন্য বাসায় নিয়ে চলুন। না হলে ওরা খুব চিন্তিত হয়ে পড়বে। ওদের একটু বলে যেতে চাই। ইন্সপেক্টর বললেন এটাতো ইলিগ্যাল (illegal), আর তাছাড়া জানাজানি হলে আমাদের অনেক অসুবিধা হতে পারে। আমি তাঁকে অনেক কাকুতি-মিনতি করে অনুরোধ করলাম। বললাম আইজি আব্দুর রহীম আমার আত্মীয়। তাছাড়া তখন তিনি ক্যাবিনেট ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন। আমি তাঁকে বললাম আপনার কোন অসুবিধা হলে আইজি সাহেবকে বলব। আপনি আমাকে নিয়ে চলুন। আমার কথায় পুলিশ ইন্সপেক্টর প্রভাবিত হলেন বুঝতে পারলাম।

ইন্সপেক্টরের নির্দেশে গাড়ী ঘুরানো হল। আমি আমার বাসায় এলাম আমাকে দেখে আশে পাশের অনেকে ছুটে এল। বাচ্চারা আব্বা আব্বা বলে জড়িয়ে ধরল। নিজের বাড়ীতে নিজের বহু পরিচিত পরিবেশে ক্ষণিকের জন্য হলেও সমস্ত দুর্ভোগের কথা ভুলে গেলাম।

মিনিট বিশেকের জন্য আমাকে বাসায় রাখা হয়েছিল। এত অল্প সময়ের মধ্যেও আমার স্ত্রী আমার জন্য প্রচুর খাবার তৈরী করেছিল। সেগুলোর ভাগ পুলিশরাও পেল। তাছাড়া আসবার সময় কিছু টাকাও সে আমার হাতে দিয়ে দেয় পথ খরচের জন্য।

আমার আকস্মিক উপস্থিতিতে বাচ্চারা যেভাবে আনন্দে মশগুল হয়ে উঠেছিল আমার বিদায়ে তারা ততধিক শোক বিহ্বল হয়ে উঠল। তাদের বুক ফাটা কান্নায় চারদিকের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। সেই ভারী বাতাসের ভিতর দিয়ে আমি পুনরায় পুলিশের জীপে উঠে বসলাম।

ইন্সপেক্টর আমাকে বললেন আপনাকে এখন রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্পে রাখা হবে। রাতে আমার জন্য ট্রেনের প্রথম শ্রেণী রিজার্ভ করা হয়েছে। সন্ধ্যার পর আমরা ফেনী রওনা হব। বাসায় আমার স্ত্রীকে সেইভাবে বলে এসেছিলাম বিকেলে যেন সবাই মিলে আমার সাথে যেয়ে দেখা করে।
রাজারবাগ পুলিশ ক্যাম্পে সারাদিন কাটল। দুপুরে পুলিশের লোকেরাই খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। পুলিশ ক্যাম্পে বসে বসে ভাবছিলাম, মানুষের ভাগ্য কখন কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় কেউ বলতে পারে না।

বিকেলে ছেলেমেয়েদের সাথে নিয়ে আমার স্ত্রী দেখা করতে এল। কারাবন্দীদের সাথে যখন তাদের স্ত্রীরা দেখা করতে আসে তখন একটা অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা ঘটে। জেলগেটে এরকম দৃশ্য অহরহ মেলে। বন্দী যেমন অনেক দিন ধরে অনেক কথা সঞ্চয় করে রাখে তাদের স্ত্রীরাও জমা করে রাখে অনেক অনুক্ত কথা। কিন্তু বন্দীদের সাথে স্ত্রীদের দেখা হওয়ার পর অনেক না বলা কথার প্রকাশ ঘটে নিঃশব্দ চোখের পানিতে।

স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা চলে যাওয়ার পর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলাম। সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে আসার সাথে সাথে আমি প্রস্তুত হতে শুরু করলাম। ইন্সপেক্টর তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে আমাকে সাথে করে কমলাপুর রেল স্টেশনে পৌঁছালেন। শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ট্রেনের কমপার্টমেন্টে উঠে বসলাম।

ট্রেন চলতে শুরু করল। বন্দীর চোখে এমনিতেই ঘুম থাকে না। তারপর ট্রেন যাত্রার ঝাক্কি। ভৈরবে এসে গাড়ী থেমে গেল। যুদ্ধের সময় মেঘনা ব্রীজ উড়িয়ে দিয়েছিল গেরিলারা। ভৈরব থেকে নেমে যাত্রীরা নৌকায় পার হয়ে অপর পার থেকে ট্রেন ধরত। সেই রাতে পুলিশ আমাকে নিয়ে নৌকায় উঠল। ঢেউয়ের প্রমত্ততার মুখে আমাদের ছোট নৌকাটি প্রচন্ড দুলতে লাগল। মনে শঙ্কা জেগে উঠল। নদী পার হওয়া সম্ভব হবে কিনা। এক অজানা আশঙ্কায় পুলিশের লোকেরাও ভয় পেয়ে গিয়েছিল বন্দীকে আজ পার করে যথাস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে কিনা।
প্রমত্ত মেঘনা পাড়ি দিয়ে অবশেষে যখন আমরা তীরে পৌঁছলাম তখন সবাই আমরা ক্লান্ত। ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দিলাম ট্রেনের কমপার্টমেন্টে। ঘুম থেকে উঠতে দেরী হয়েছিল। পুলিশের ডাকাডাকিতে বুঝলাম ট্রেন ফেনীতে পৌঁছেছে। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম এই ভেবে মেঘনার উপর রীতিমত আজরাইলের সাথে কোলাকুলি করে এসেছি। ফেনী রেল স্টেশনের ওয়েটিং রুমে বসে নাশতা শেষ করে পুলিশকে বললাম চলুন এবার যাওয়া যাক। জেলখানায় পৌঁছানোর পর আমাদের প্রথম দেখা করতে হল জেলারের সাথে। মহকুমার জেলখানা হিসেবে এটার আয়তন ছিল খুবই ছোট। জেলার আমাকে বললেন আপনি তো ডিভিশন প্রিজনার। আমাদের এখানে তো ডিভিশনের ব্যবস্থা নেই। আপনাকে যেতে হবে নোয়াখালীতে। পুলিশ উপায়ান্তর না দেখে আমাকে নিয়ে গেল মহকুমা পুলিশ অফিসারের বাংলোয়। ভদ্রলোক আমার সাথে খুবই সৌজন্যমূলক আচরণ করলেন। উপরন্তু তিনি বললেন ফেনী থেকে আপনি নির্বাচিত হয়েছেন। আপনি তো অবশ্যই সম্মানিত লোক। তিনি আমাকে পেট পুরে ভাত খাওয়ালেন। তারপর নিজের গাড়ী দিয়ে পুলিশদের বললেন আমাকে নোয়াখালী নিয়ে যেতে। নোয়াখালী জেলে পৌঁছেছিলাম ওই দিন বিকেল তিনটার দিকে। জেলা শহরের জেলখানা ঢাকা জেলের মত হওয়ার কথা নয়। আয়তনে ছোট। ধারণক্ষমতা পাঁচশর মত। কিন্তু এখানেও নতুন সরকার দেড় হাজারের মত অতিরিক্ত কয়েদী ঢুকিয়ে দিয়েছে। এরা অবশ্য পাকিস্তানপন্থী।

আমার ডিভিশনের ব্যবস্থা হয়েছিল একটা টিনশেড বিল্ডি-এ। নোয়াখালী জেলে তখন এরকম লম্বা লম্বা কয়েকটি টিনশেড বিল্ডিংয়ে বন্দীরা থাকত। জেলের ভিতর ঢুকে দেখি ডিভিশনে নোয়াখালীর মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর কয়েকজন নেতা রয়েছেন। এঁদের অনেকেই আমার পূর্ব পরিচিত। আমার আসবার খবর তাঁরা আগেই কিভাবে পেয়ে গিয়েছিলেন। তাই তাঁরা আমাকে পেয়ে তাদেরই একজন হিসেবে কাছে টেনে নিতে মোটেই দেরী করেননি।

নোয়াখালী জেলে একটা জিনিস বিশেষ ভাবে নজরে এল। জেলে অধিকাংশ বন্দীকেই দেখলাম শশ্রুমন্ডিত, মাথায় টুপি। এঁরা সবাই আলেম, ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে এঁদের জোরালো দখল রয়েছে। রাজনীতির সাথে এঁদের সংশ্লিষ্টতা খুব একটা ছিল না। শুধুমাত্র ইসলামপন্থী হওয়ার অপরাধে এঁদেরকে জেলে আসতে হয়েছিল।

রাতে নোয়াখালী জেলের চেহারা সম্পূর্ণ পাল্টে যেত। প্রত্যেকটি রুম থেকে জিকিরের শব্দ আসত। মনে হত পুরো নোয়াখালী জেল দরবেশের হুজরাখানায় পরিণত হয়েছে। ডিভিশনে আমার পাশের সিটেই থাকতেন মওলানা রুহুল আমীন আতিকী। আতিকী সাহেব ছিলেন দীর্ঘদেহধারী। ৬ফুটের চেয়েও লম্বা। ইসলামের যে কোন বিষয়ের উপর দীর্ঘ সময় ধরে অনলবর্ষী বক্তৃতা দিতে পারতেন তিনি।

নোয়াখালী জেলে এসময় আটক হয়ে এসেছিলেন মওলানা মুহাম্মদ মুসা। সবাই তাঁকে পীর হিসেবে শ্রদ্ধা করতেন। তখন তাঁর বয়স ৯০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চোখের জ্যোতি ছিল অত্যন্ত প্রখর। খালি চোখেই তিনি কোরআন শরীফ পড়তেন আর সারারাত কাটাতেন ইবাদত-বন্দেগীতে। তাঁকে নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির কথাও লোকে বলাবলি করত।

মওলানা মুসাকে প্রথম আটক করে নেয়া হয়েছিল ফেনী জেলে। এখানে এক পুলিশ তাঁর সাথে বেয়াদবী করেছিল। যার প্রতিক্রিয়া হয়েছিল অদ্ভুত রকম। কিছুই দৃশ্যমান হত না অথচ কেউ যেন পুলিশটিকে থাপ্পড় মারছে। কাঁদার মধ্যে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে। তাদের জিনিসপত্র উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে এরকম ঘটনা ঘটতে লাগল, সেই পুলিশের তখন কাজ করাই এক বড় রকম সমস্যা হয়ে দাঁড়াল।

লোকের মধ্যে গুঞ্জন শোনা গেল মওলানা মুসার পোষা জ্বীনগুলোই রেগে গিয়ে এরকম ঘটনা ঘটাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ তখন অসহায় হয়ে এবং জেলের নিরাপত্তার কথা ভেবে মওলানা মুসাকে নোয়াখালী জেলে স্থানান্তর করে।

জেলের মধ্যে মুসলিম লীগ কর্মী খোকা মিয়া সব সময় আমাদের হাসি-খুশীতে রাখার চেষ্টা করতেন। তাঁর ভাই নুরুল হক ছিলেন তখন আওয়ামী লীগ এমপি। খোকা মিয়া সুন্দর গান জানতেন। সুরেলা গলায় গান গেয়ে গেয়ে তিনি পুরো জেল মাতিয়ে রাখতেন। মুজিবের নামে তিনি কতগুলো প্যারোডি তৈরী করেছিলেন। খোকা মিয়ার প্যারোডি জেলের সেই দুর্ভাগ্যের দিনগুলোতে আমাদেরকে দারুণ উৎসাহ জোগাত।
নোয়াখালী জেলে আর যাঁদের কথা মনে পড়ছে তাঁদের মধ্যে হাকিম মোঃ ইলিয়াস, আব্দুল্লাহ রফিক আবু সুফিয়ান, এডভোকেট শামসুল হক, এডভোকেট সিদ্দিকুল্লাহ, এডভোকেট আব্দুল ওহাব ছিলেন অন্যতম। অন্য সবার মত এদেরও অপরাধ, এঁরা ছিলেন পাকিস্তানপন্থী।

আমি নোয়াখালী আসার মাস দুয়েক পর কমরেড নাসিম নামে কমিউনিস্ট পার্টির একজন তরুণ কর্মী গুলিবিদ্ধ অবস্থায় জেলে আসেন। তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির গোপন সংগঠনের একজন সক্রিয় কর্মী। আমি এতদিন পর যতটুকু মনে করতে পারছি রাজনৈতিকভাবে তিনি তোয়াহার চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ছিলেন। নাসিম ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স করেছিলেন। তাঁর স্ত্রীও ছিলেন ইউনিভার্সিটির মাস্টার্স। কমিউনিস্ট পার্টির এই ধারার লোকজনরা কখনই বাংলাদেশ আন্দোলনকে সমর্থন করতেন না। তাঁরা মনে করতেন এটা হচ্ছে ভারতীয় চক্রান্তের একটা রূপ এবং এটা যথাযথভাবে রোখা প্রয়োজন। তাঁরা রাজনীতি করতেন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির ব্যানারে।

নাসিম নোয়াখালীর বিভিন্ন গ্রামে এসময় পাকিস্তানের পতাকা ওড়ান। বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ অফিসেও তিনি একই কাজ করেন। তিনি তাঁর ক্যাডার বাহিনী নিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন আমরা এই স্বাধীনতা মানি না। আরও অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন ভারতীয় আধিপত্যবাদ থেকে এদেশকে রক্ষা করতে হবে। মুজিবের শাসনামলে এটা ছিল একটা দুঃসাহসিক কাজ। একবার এক ইউনিয়ন পরিষদ অফিসে তিনি পাকিস্তানী পতাকা ওড়ানোর সময় ধরা পড়েন এবং উরুতে গুলিবিদ্ধ হন। তাঁকে ধরিয়ে দিয়েছিলেন ঐ ইউনিয়ন পরিষদের আওয়ামী লীগ সমর্থক চেয়ারম্যান।

নোয়াখালী জেলে যখন নাসিমকে আনা হয় তখন তাঁর উঁরুতে পচন ধরেছিল। জেলে আগে থেকেই নাসিমের সহযোদ্ধা মাস্টার মজিদ ছিলেন। তিনিই আমাদের ধরে নাসিমকে দেখাতে নিয়ে যান। গিয়ে দেখি দুর্গন্ধে নাসিমের কাছে যাওয়া যাচ্ছে না। জেল কর্তৃপক্ষ নাসিমের কোন চিকিৎসার ব্যবস্থাই করেনি। এমনকি বাইরে থেকে পাঠানো ওষুধপত্রও জেল কর্তৃপক্ষ ভিতরে নেয়ার অনুমতি দেয়নি।

এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে বিনা চিকিৎসায় জেলের মধ্যে নাসিম মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাঁর সহযোদ্ধারা বিশেষ করে মাস্টার মজিদ এতে খুব উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। জেলের মধ্যেই লাশের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে তিনি বলতে থাকেন দেখবেন এর প্রতিশোধ আমি নেবই। আগামী তিনদিনের মধ্যেই আমি প্রতিশোধ নেব।

তখনকার মত মাস্টার মজিদের কথার গুরুত্ব আমি অতখানি গভীরভাবে বুঝতে পারিনি। ওইদিন রাতে দুটোর সময় হঠাৎ শুনি জেলের মধ্যে পাগলা ঘন্টা। চারিদিকে হৈ চৈ। পুলিশের চিৎকার। নিরপরাধ কয়েদীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ। এর মধ্যে শুনতে পেলাম মাস্টার মজিদ টয়লেটের ভিতর দিয়ে কিভাবে যেন বের হয়ে গিয়ে জেলের দেয়াল টপকে পালিয়ে গিয়েছেন।

আমার জন্য আরও বিস্ময়ের বাকী ছিল। মাস্টার মজিদ পালিয়ে গিয়ে বসে থাকেননি। তিনি কমরেড নাসিমকে যে চেয়ারম্যান ধরিয়ে দিয়েছিল নিজের দলবল নিয়ে তাকে হত্যা করে কথা রেখেছিলেন। মাস্টার মজিদ তারপর সেই ইউপি চেয়ারম্যানের বুক চিরে হৃদপিন্ড বের করে সেটাকে সুন্দর করে প্যাকেট করে জেলখানায় পাঠিয়ে দেন। মজিদের কোন এক লোক কোন এক কয়েদীর নামে খাবার পাঠানোর ওসিলায় জেলের ভিতর সেই হৃদপিন্ডের প্যাকেট ঢুকিয়ে দেয়। প্যাকেট খুলে পরে দেখা গেল ইউপি চেয়ারম্যানের হৃদপিন্ড, পাশে মজিদের হাতের লেখা একটা চিরকুট, আমি প্রতিশোধ নিয়েছি।

নোয়াখালী জেলে আমি প্রায় নয় মাস ছিলাম। নিস্তরঙ্গ জেল জীবনে দিন চলে যেত সবার সাথে গল্প-গুজব করে আর নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। বাংলাদেশ হওয়ার পর সারাদেশ জুড়ে যে নারকীয় বর্বরতা শুরু হয়েছিল তা থেকে নোয়াখালীও বাদ পড়েনি। আমি এখানে এসেও সেই বর্বরতার কিছু আভাস পেয়েছিলাম।

ছাগলনাইয়া থানায় ইউপি চেয়ারম্যান ও মুসলিম লীগ নেতাকে ধরে নিয়ে শুধু নির্যাতনই করেনি, পানুয়া মাঠের মধ্যেই তাঁকে দিয়ে নিজ হাতে নিজের কবর খুঁড়িয়ে তার মধ্যে তাঁকে জোর করে নামিয়ে মাটি চাপা দিয়ে জ্যান্ত কবর দেয় আওয়ামী লীগাররা।

নজরুল ইসলাম নামে একজন মুসলিম লীগ কর্মীকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রথমে ধরে নিয়ে সারা শরীরে খেজুরের কাঁটা ফুটিয়ে জয় বাংলা উচ্চারণ করতে বলে। নজরুল ইসলাম ছিলেন সুসাহিত্যিক এবং মনে-প্রাণে পাকিস্তানী আদর্শে বিশ্বাসী। তিনি জয় বাংলা বলতে অস্বীকার করায় তাঁকেও নিজের কবর খুঁড়তে বাধ্য করা হয় এবং খেজুরের ডাল দিয়ে পিটতে পিটতে জ্যান্ত কবর দেয়া হয়। ফেনী কলেজে ইলিয়াস নামে ইসলামী ছাত্র সংঘের একজন শক্তিশালী ছাত্র নেতাকে একইভাবে দাগন ভূইয়া কামাল আতাতুর্ক স্কুলের সামনে জনসম্মুখে গুলি করে হত্যা করে নিজেদের পৈশাচিক ক্ষুধা পূর্ণ করে আওয়ামী লীগাররা।

ইলিয়াসকে জয় বাংলা বলতে নির্দেশ দিলেও সে তা উচ্চারণ করতে অস্বীকার করে। একইভাবে গেরিলারা চৌমুহনী কলেজের বাংলার অধ্যাপককে কলেজ প্রাঙ্গণেই গুলি করে হত্যা করে।

বাংলাদেশ হওয়ার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন নাগের নেতৃত্বে নোয়াখালীতে বহু আলেম ও মুহাদ্দিসকে ধরে নিয়ে লাইন বেধে গুলি করে হত্যা করা হয়। আমি প্রত্যক্ষদর্শীর মুখ থেকে শুনেছি বহুদিন ধরে একটি খাল আলেম ওলামাদের লাশে পূর্ণ ছিল।

নোয়াখালী আসার কয়েকদিন পর জেলে ডিসি সাহেব আসলেন। এটা ছিল তাঁর রুটিন ভিজিটের অংশ। ঢাকা থেকে একজন বড় দালাল এসেছে শুনে তিনি বেশ কৌতুহলী হয়ে আমার সাথে দেখা করতে এলেন। তাঁর সাথে ছিলেন একজন হিন্দু এডভোকেট। আমাকে জিজ্ঞাসা করার আমি বললাম ফেনী থেকে আমি উপনির্বাচনে নির্বাচিত হয়েছিলাম। সেই অপরাধে এখন জেল খাটছি। তিনি বেশ গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর যথাসম্ভব নিজেকে সহজ করে বললেন, দেশের অবস্থা কেমন মনে হচ্ছে?

আমি বললাম, আমরা দালাল হিসেবে বন্দী হয়েছি। আমাদের কথার কতটুকুই বা মূল্য আছে এখন। তবে মুসলমান হিসেবে এইটুকু বলতে পারি কোন কিছুই দুনিয়ায় স্থায়ী নয়। কোরআন শরীফে আছে, আল্লাহ ক্ষমতা দেয়ার মালিক, ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ারও মালিক। শেখ মুজিবও একসময় জেলে ছিলেন। আমরা ক্ষমতায় ছিলাম। এখন অবস্থাটা পাল্টে গেছে। নতুন কোন বিপ্লব আবার সবকিছু মিছমার করে দেবে না একথা কেউ কি নিশ্চয়তা দিয়ে বলতে পারেন? ডিসি বললেন জেলে বসে আপনি এসব কি বলছেন! আমি বললাম, এগুলো আমার কথা নয় ডিসি সাহেব, কোরআনের কথা।

হিন্দু এডভোকেট তখন বললেন, হ্যা, এসবতো তাঁর কথা নয়, নিজে কিছু বানিয়ে বলেননি, আপনাদের ধর্মগ্রন্থের কথাই বলেছেন। আসলে তো তাই, কেউ বলতে পারে না ভবিষ্যতে কি হবে। আমি বললাম, ডিসি সাহেব আল্লাহ নিজেই অঙ্গীকার করেছেন তাঁর মনোনীত ধর্ম ইসলামের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করবে তিনি তাদের নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। ডিসি বোধ হয় আমার খোলামেলা কথা শুনে আর আলাপ জমাতে উৎসাহ পেলেন না। তিনি আমাকে হাসি মুখে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলেন।

নোয়াখালী জেলে বসেই আমি একদিন ফজলুল কাদের চৌধুরীর হত্যার কথা কাগজে পড়ি। আমার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছে জাতির এই একনিষ্ঠ সেবককে আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রকারীরা বিষপ্রয়োগে জেলের ভিতরেই মেরে ফেলতে পারে। তাঁর সাথে আমার বহু স্মৃতি ও এক সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল। সেগুলো আমার মনের পর্দায় উজ্জ্বল হয়ে ভেসে উঠতে শুরু করল।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh