Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ৪ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

আবুল হাশিম মুসলিম লীগের নওয়াবদের অপছন্দ করতেন। হয়ত হতে পারে এটা তাঁর সাম্যবাদী চিন্তাভাবনার ফসল। মওলানা আকরাম খাঁর কাছে যখনই গিয়েছি, তিনি আবুল হাশিমের চিন্তা ভাবনার নিন্দা করেছেন। আকরাম খাঁ ছিলেন দেশ বিখ্যাত আলেম। তিনি বলতেন আবুল হাশিম ইসলামের অপব্যাখ্যা করছে। আবুল হাশিমের গুরু ছিলেন মওলানা আজাদ সুবহানী। গুরুর চিন্তাভাবনকে বিন্যস্ত করে তিনি লিখেছিলেন তাঁর যুগান্তকারী দার্শনিক গ্রন্থ Creed of Islam. পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান তাঁকে ইসলামিক একাডেমীর ডাইরেক্টর বানান। আইয়ুব খান তাঁর পান্ডিত্যের প্রশংসা করতেন।

আবুল হাশিম আমাদের মহল্লা ওয়ারীতেই থাকতেন। আমি প্রায়ই তাঁর কাছে যেতাম। তিনি কথা বলতেন, আমি শুনতাম। মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে আমি তাঁর সাথে দেখা করতে যাই। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সেভ না করতে পারায় তাঁর দাড়ি বড় হয়ে গিয়েছিল। আমি বললাম, ভাই, দাড়িতে আপনাকে খুব মানিয়েছে। সফেদ চুল ও দাড়িতে আপনাকে দরবেশের মত লাগছে।
তিনি হাসি মুখে বললেন আর কিছু বলার থাকলে বল।
আমি ইতস্তত করে বললাম ইসলামে আছে দাড়ি রাখা সুন্নাত।
তিনি একটু গলার স্বর উঁচু করে বললেন ইসলামে দাড়ি রাখার বিধান সম্বন্ধে তুমি কি জানো? কোরআন শরীফের কোথাও এমন কোন কথা নেই যে দাড়ি রাখতেই হবে।

আমি বললাম রাসূল (সাঃ) দাড়ি রাখতেন। আবুল হাশিম বললেন সেটা পরিবেশের কারণে। তারপর তিনি হাসতে হাসতে বললেন আমাকে সুন্দর লাগে কি না লাগে তুমি বলার কে! আমার স্ত্রী বা ঐ বিধবা বোনটি যদি বলে দাড়ি রাখলে আমাকে সুন্দর লাগে তখনই কেবল আমি দাড়ি রাখব। আবুল হাশিমের ইসলামী সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব কথার উত্তরে সবুর সাহেব বলতেন, হাসু ভাই, সোনার পিতলের কলস হয় না। পিতল পিতলই, সোনা সোনাই, ইসলাম ইসলামই, সমাজতন্ত্র সমাজতন্ত্রই। আবুল হাশিমের ব্যাখ্যা শুনতে লীগ কর্মীদের সবুর খান বহুদিন নিষেধ করেছেন।

আমরা মনে করেছিলাম পাকিস্তান হবে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে, বাংলা ও আসামকে নিয়ে গঠিত হবে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল। আমরা কখনও চিন্তা করতে পারিনি কলকাতাসহ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো আমাদেরকে দেয়া হবে না। আসলে দেশভাগ নিয়ে তখন চলছিল ইঙ্গ-হিন্দু যৌথ চক্রান্ত। ভারতবর্ষের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন ছিলেন দারুন হিন্দু প্রেমী। জওহরলাল নেহেরুর সাথে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব। রাজনীতির দাবাখেলায় কায়েদে আযম ও তাঁর মুসলিম লীগের সামনে কংগ্রেসের ঝানু ঝানু হিন্দু নেতারা যখন কাত হয়ে পড়েছিলেন তখন তাঁরা গ্রহণ করেন ষড়যন্ত্রের পথ। র‌্যডক্লিফ রোয়েদাদ মুসলমানদের প্রতি যে বেইনসাফী করেছিল সেটা সম্ভব হয়েছিল মুসলমান বিদ্বেষী ভাইসরয় মাউন্টব্যাটেনের ইশারায়। এই মাউন্টব্যাটেন রোয়েদাদের ফর্মূলা প্রস্তুত করেছিলেন নেহেরুর সাথে গোপন আলোচনার মাধ্যমে। যার ফলে ভাগ বাটোয়ারার সময় যে পাকিস্তান পাওয়া গেল তা ছিল কায়েদে আযমের ভাষায় গড়ঃ Moth eaten Pakistan -পোকায় কাটা পাকিস্তান।

কায়েদে আযম চাননি বাংলা ও পাঞ্জাব দুই টুকরো হয়ে যাক। বাংলাকে অবিভক্ত রাখতে তিনি শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলেন। অন্তত তিনি এতটুকু আশা করেছিলেন মুসলমানরা কলকাতা পাবে। কলকাতা শহর গড়ে ওঠার পিছনে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের ছিল অনেক অবদান। পূর্ববঙ্গের চাষী মুসলমানদের কৃষি পণ্যের বিশেষ করে পাটের টাকায়ই স্ফীত হয়েছিল কলকাতা শহর। হিন্দু জমিদার মহাজন, বেনিয়ারা পূর্ববঙ্গ শোষণ করে কলকাতার নাগরিক কালচারের জন্ম দিয়েছিল। কলকাতাকে বাদ দিয়ে তাই একদিন বাংলাদেশের কথা চিন্তাই করা যেত না। সেই কলকাতা যখন বাংলার মুসলমানদের হাত ছাড়া হয়ে গেল তখন কায়েদে আযম আক্ষেপ করে বলেছিলেন- Like asking man to like without his heart. বাংলাদেশ আন্দোলনের সময় অনেককেই বলতে শুনেছি কায়েদে আযম নাকি ষড়যন্ত্র করে পশ্চিম পাকিস্তানীদের বেশী দেওয়ার জন্য পূর্ব বঙ্গের মানুষদের সাথে প্রতারণা করে এই ভাগাভাগি মেনে নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ আন্দোলনের সারথিদের মুখে যখনই এইসব কথা শুনতাম তখনই ভাবতাম যে মানুষটি ইচ্ছা করলে গান্ধীর প্রস্তাবিত যুক্তভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন শুধু এই শর্তে যে, ভারত ভাগ করা চলবেনা। তিনি কি কারণে বাংলার মাসুলমানদের এত বড় সর্বনাশ করতে যাবেন।

বাংলাকে অবিভক্ত রাখার জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম কংগ্রেসের শরৎচন্দ্র বসু, কিরণশংকর রায় প্রমুখের সাথে একটি ঐকমত্যে পৌঁছেছিলেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন স্বাধীন ভারত ও স্বাধীন পাকিস্তানের বাইরে একটি স্বাধীন বাংলা নামের রাষ্ট্র গঠনের। শহীদ সোহরাওয়ার্দীর এ প্রস্তাবে কায়েদে আযম সমর্থন দিয়েছিলেন। শরৎ বসু যখন এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা করার জন্য কংগ্রেস হাই কমান্ডের কাছে গেলেন তখন গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেলের তীব্র বিরোধীতার মুখে সেদিন স্বাধীন অখন্ড বাংলার স্বপ্ন নস্যাৎ হয়ে যায়। বাংলায় নেহেরু প্যাটেলের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন উগ্র সাম্প্রদায়িক নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। ইতিহাসের এসব সত্য অস্বীকার করে যাঁরা বাংলাদেশ আন্দোলনের সময় কায়েদে আযমের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছিল আমার মনে হয় তাঁরা না বুঝে এটা করেনি। তৃতীয় একটি শক্তির ইন্ধনে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে একাজটি করেছিল। পাকিস্তান হওয়ার দিন মুর্শিদাবাদ ও মালদহে পাকিস্তানের পতাকা উড়েছিল। খুলনায় উড়েছিল কংগ্রেসের পতাকা। এ তিনটি জেলাই ছিল মুসলমান অধ্যুষিত। সবাই ভেবেছিল এ তিনটি অঞ্চল পাকিস্তানের ভিতর চলে আসবে। কিন্তু মুসলমানদের বিরুদ্ধে চক্রান্ত তখন পর্বত প্রমাণ হয়ে উঠেছে। সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় মুসলমান নেতৃত্ব যতটুকু সম্ভব যুদ্ধ করে নিজেদের অধিকার আদায় করতে পেরেছিল মাত্র। একমাত্র খুলনাই পরবর্তীকালে পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়। খান আব্দুস সবুরের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে খুলনার মানুষ পাকিস্তানে যোগদানের জন্য সেদিন ঐক্যবদ্ধ হয়। খান এ সবুর ছাড়া খুলনা পাকিস্তান অন্তর্ভূক্ত করণ সম্ভব হত না। বাউন্ডারী কমিশনের কাছ থেকে মালদহের শুধুমাত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ থানাটি পেয়েছিল পাকিস্তান। এর পিছনে ভূমিকা রেখেছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের অন্তর্গত মনাকষার জমিদার মুর্তজা রেজা চৌধুরী। পরবর্তীকালে মুর্তজা রেজা চৌধুরী পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হয়েছিলেন। বাউন্ডারী কমিশনের সামনে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দাবি তুলে ধরেন হামিদুল হক চৌধুরী।

বাংলার এককালের রাজধানী মুর্শিদাবাদ কিন্তু পাকিস্তানে আসেনি। আমার মনে হয় সেখানকার মুসলমান নেতৃত্ব সেরকম কোন আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। এর একটা কারণও ছিল। ১৭৫৭ সালে সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর ইংরেজদের যত রকমের জুলুমবাজী এখানেই প্রথম আঘাত হানে। সে অত্যাচারের মুখে দাঁড়িয়ে মুসলমানরা প্রকৃত অর্থেই অসহায় হয়ে পড়ে। সাতচল্লিশ সালে এসেও তাদের অবস্থার তেমন কোন পরিবর্তন ঘটেনি। এ সময় সিদ্ধান্ত হয় পুরো আসামকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র সিলেটকে পাকিস্তানের সাথে অন্তর্ভূক্ত হওয়ার সুযোগ দেয়া হবে। তাও আবার রেফঅরেন্ডামের মাধ্যমে। এরকম আরকটি রেফারেন্ডামের ব্যবস্থা করা হয়েছিল উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে। আমরা তখন রেফারেন্ডামের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। মুসলিম ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় সংগঠনের বিভিন্ন শাখার কর্মীরা সিলেটে পাকিস্তানের জন্য একযোগে কাজ করবে। আমরা ঢাকা থেকে কয়েকটি গ্রুপ সিলেট পৌঁছাই। আমার সাথে হেকিম ইরতিজাউর রহমান, আলাউদ্দিন আহমেদ, শামসুল হুদা, সৈয়দ সাহেব আলম, কাজী আশরাফ উদ্দীন আহমদ, নুরুল ইসলাম, আব্দুর রহীম চৌধুরী, আলিমুল্লাহ, আবু সালেক, সুলতান হোসেন খান, খোরশেদ আলম চৌধুরী, কাজী আওলাদ হোসেন ছিলেন। ন্যাশনাল গার্ড স্কোর সালারে সিটির মোঃ সিরাজউদ্দিনের নেতৃত্বে একদল গার্ড কর্মী সিলেটে যান। নুরুল ইসলামও আমাদের সাথে ছিলেন। তিনি খুব ভাল গান গাইতেন। এ সময়ে একটি গানের দলই তৈরী করে ফেলেন এবং রেফারেন্ডামকে সামনে রেখে তিনি একটি গান রচনা করেছিলেন। সুরও তাঁর দেয়া। আমার মনে আছে সে গানের জোয়ারে পুরো সিলেটের মানুষ ভেসে গিয়েছিল। আমরা রাজনৈতিক শ্লোগান দিয়ে এবং মিটিং করেও যতখানি সফল হইনি এই গানের আবেদন হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশী। গানের দু একটি কলি এখনও আমার মনে পড়েঃ
সিলেটবাসী মুসলমান
সবাই মিলে পাকিস্তান
পাকিস্তানে ভোট কর দান
তুমি কি ভুলিয়া গেছ
গৌড় গোবিন্দের হীন অত্যাচার
দুধের শিশু হত্যা করল
হাত কাটিল তার
বোরহানুনদ্দীনের রুহু কাঁদে
কাঁটিয়া সাফমাত্র
সোনার সিলেট যাব পাকিস্তান
তুমি কি ভুলিয়া গেছ
গৌড় গোবিন্দের হীন অত্যাচার
সিলেটবাসী মুসলমান
সবাই মিলে পাকিস্তান
পাকিস্তানে ভোট কর দান
শাহ জালালের পূণ্যভূমি
আজাদ কর মুসলিম তুমি
কুড়ালের বাক্সে ভোট দিয়ে ভাই
কোরানের ফরমান
সিলেটবাসী মুসলমান...

উল্লেখ্য কুড়াল ছিল পাকিস্তানের পক্ষের প্রতীক। নুরুল ইসলাম ১৯৫৩ সালে করাচীতে বিশ্ব মুসলিম যুব কংগ্রেসে কবি তালিম হোসেনের লেখা একটি গান গায়। সেটিও দারুণ হিট করেছিল। পাকিস্তানের পক্ষে জনমত সংগঠিত করবার জন্য চাটগাঁ থেকে ফজলুল কাদের চৌধুরী তাঁর এক বিরাট কর্মী বাহিনী নিয়ে সিলেট পৌঁছান। কলকাতা থেকে ন্যাশনাল গার্ডের সালার শেখ মুজিবও এক বিরাট দল নিয়ে রেফারেন্ডামের পক্ষে কাজ করতে আসেন।

মুসলিম লীগ ও মুসলিম ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে সে সময় এক বিরাট সাড়া পড়েছিল। সিলেটকে যেভাবেই হোক পাকিস্তানে রাখতে হবে। এই রকম পণ করে তাঁরা সেদিন কাজ করেছিলেন।

আর যাঁরা এসেছিলেন তাঁর মধ্যে কুমিল্লার খান বাহাদুর আবিদুর রেজা চৌধুরী, মুফিজুদ্দীন আহমদ, টি আলী, ছাত্রনেতা শফিকুল ইসলাম, নুরুদ্দীন মোঃ আবাদ, নোয়াখালীর আব্দুল জব্বার খদ্দর, আজিজ আহমদ, রাজশাহীর মিরান আলী সরকার, বগুড়ার আব্দুল হামিদ খান, ফজলুল বারী, বি এম ইলিয়াস, রংপুরের মশিউর রহমান যাদু মিয়া, সাঈদুর রহমান, খুলনার আব্দুস সবুর খান, এ এম মজিদ, আদিল উদ্দিন আহমদ, বরিশালের আজিজুদ্দিন আহম্মদ, শমসের আলী, মহিউদ্দিন আহমদ, ম কাজী বাহাউদ্দিন আহমদ, আব্দুর রহমান চৌধুরী, পাবনার আব্দুল্লাহিল মাহমুদ, ফরিদপুরের ইউসুফ আলী চৌধুরী প্রমুখের কথা মনে পড়ছে।
সিলেটের মুসলিম নেতাদের মধ্যে যারা রেফারেন্ডামের জন্য কাজ করেছিলেন তাদের মধ্যে আব্দুল মতিন চৌধুরী, দেওয়ান আব্দুল বাছিত, মঈনুদ্দীন চৌধুরী, আজমল আলী, চৌধুরী মাহমুদ আলী, মোঃ আব্দুল্লাহ, শাহেদ আলী ও আব্দুল আজিজ অন্যতম। আব্দুল মতিন চৌধুরী ছিলেন আসাম মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। মওলানা ভাষানী ছিলেন সভাপতি। আব্দুল মতিন চৌধুরী স্যার সাদুল্লাহ মন্ত্রীসভার অন্যতম সদস্যও হয়েছিলেন। আসামের মুসলিম লীগ সংগঠনেও তিনি রেখেছিলেন অসামান্য ভূমিকা। কায়েদে আযম তাঁকে খুব স্নেহ করতেন। শোনা যায়, জিন্নাহ সাহেব যখন ভারতীয় রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে লন্ডনে চলে যান তখন লিয়াকত আলী খানের সাথে তিনিও লন্ডনে গিয়ে দেশের প্রয়োজনে তাঁকে ভারতে ফিরে আসার অনুরোধ করেছিলেন। তাঁদের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়েই পরবর্তীকালে কায়েদে আযম ফিরে আসেন। পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি মঞ্জুরী কমিশনের চেয়ারম্যান হয়েছিলেন।

সিলেটের ছাত্র নেতাদের মধ্যে জি এ খান, এ এন এম ইউসুফ, এটিএম মাসুদ আমাদের সাথে কাজ করছিল। মেয়েদের মধ্যে জরিনা রশীদ, হাজেরা খাতুন, সৈয়দা রোকেয়া প্রমুখ পাকিস্তানের দাবীকে এগিয়ে নিয়ে আসে। জরিনা রশীদ ছিল খাসিয়া। সে পরে মুসলমান হয় এবং পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের এককালীন সচিব আব্দুর রশীদের সাথে তার বিয়ে হয়। সিলেটে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের ব্যাপক প্রভাব ছিল। কংগ্রেসের পক্ষে মওলানা হোসেন আহমদ মাদানী নিজে এসে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তখন একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল। যে সব জায়গায় জমিয়তের শক্ত ঘাঁটি ছিল সে সব স্থানে আমরা শাহ আজিজকে আরবী পোষাকে সজ্জিত করে নিয়ে যেতাম। তিনি এমনিতেই খুব ভাল আরবী জানতেন। আমরা জনসভায় তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিতাম ইবনে সউদের দূত হিসেবে তিনি এসেছেন। সৌদী বাদশাহর বাণী আপনাদেরকে তিনি শোনাতে চান।

শাহ আজিজ আরবীতে অনলবর্ষি বক্তৃতা দিয়ে যেতেন। আমাদের কেউ হয়ত দোভাষীর কাজ করত। এতে সাধারণ লোক ভাবত হেরেম শরীফের হেফাজতের দায়িত্ব পালনরত বাদশাহ সউদের প্রতিনিধি যদি পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিতে বলেন তাহলে সে কথা একেবারে ফেলে দেয়া যায় না।

নিম্ন বর্ণের হিন্দু এলাকাগুলোতে আমরা রসরাজ মন্ডলকে সাথে নিয়ে যেতাম। এদের নেতা ছিল যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল। যোগেন্দ্রনাথ পরে কায়েদে আযমের ইচ্ছায় অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্য হয়েছিলেন ও পরবর্তীকালে পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী হিসেবে সুদীর্ঘ সময় কাজ করেছেন। পাকিস্তানের নির্বাচনী প্রচারের সময় যোগেন্দ্রনাথ কি কারণে আসতে পারেননি তা জানা নেই। তখন আমরা রসরাজ মন্ডলকে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল বলে পরিচয় করিয়ে বহু জনসভা করেছি। রসরাজ মন্ডল পরে পূর্ব পাকিস্তানের মন্ত্রী হয়েছিলেন।

আমরা একবার রেফারেন্ডামের পক্ষে কাজ করার জন্য করিমগঞ্জ গিয়েছিলাম। করিমগঞ্জে ছিল জমিয়তের শক্ত ঘাঁটি। বাসে করে যাওয়ার সময় কুমিল্লার আজিজুর রহমান আহত হন। তিনি পরে পাকিস্তানের গণপরিষদ সদস্য হয়েছিলেন। মনে আছে তিনি হাত বের করে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন হঠাৎ করে উল্টো দিক থেকে একটা বাস এসে তার হাতটা উড়িয়ে নিয়ে যায়। ব্যথায় তিনি ছটফট করছিলেন। তিনি চিৎকার করে বলছিলেন আমার স্ত্রীকে এনে দাও। করিমগঞ্জে এসে তাড়াতাড়ি করে আমরা আজিজুর রহমানকে হাসপাতালে ভর্তি করি। অন্যদিকে তার স্ত্রীকেও খবর পাঠানো হয়। হাসপাতালে আজিজুর রহমানকে রেখে আমরা বেড়িয়ে পড়ি জনসভার উদ্দেশ্যে। সেখান থেকে ফেরার পথে নদীর ঘাটে জমিয়তের কর্মীদের সাথে আমাদের দেখা হয়ে যায়। ওরা উল্টো দিক থেকে আসছিল। কথায় কথায় শুরু হয়ে যায় সংঘর্ষ। নদীর ঘাটে ছিল পাথর। সেদিন সে পাথরের ব্যবহার হয়েছিল পর্যাপ্ত। হতাহতের সংখ্যাও মন্দ ছিল না। জমিয়তের তিনজন কর্মী নিহত হন। আমাদের গাড়ির ড্রাইভারের মাথায় এসে পড়ে এক বড় পাথর। মাথা ফেটে প্রচুর রক্তরক্ষণ হয়ে ড্রাইভার মারা যান। পরদিন কংগ্রেস সমর্থক পত্রিকাগুলো লেখে মুসলিম লীগ গুন্ডাদের হাতে তিনজন মওলানা নিহত।

গাড়ীর ড্রাইভারের মৃত্যুতে আমরা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। আমাদের এক বন্ধু কাজী আশরাফ উদ্দীন আহমদ ড্রাইভিং জানতেন। তিনি এই বিপদে হাল ধরেন। ড্রাইভারের লাশসহ বাসে করে আমরা সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। তখন সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। এমনিতে তখন বর্ষাকাল। রাস্তার দুধারে অথৈ পানি। হঠাৎ দেখি আমাদের পিছনে দুটি জীপ ছুটে আসছে। আমরা মনে মনে ভীত হয়ে পড়েছিলাম। কেননা, মারামারির ঘটনাটি নিশ্চয় এতক্ষণে  প্রশাসনের কানে পৌঁছে গেছে। ভেবেছিলাম আমাদের ধরার জন্য হয়ত কোন ফোর্স আমাদেরকে অনুসরণ করছে। আমরা তখন তাড়াতাড়ি করে লাশ রাস্তার এক পাশে রেখে পানিতে ঝাঁপ দিলাম। চারপাশের কিছুই জানি না। পানির গভীরতা কত তাও বুঝতে পারছিলাম না। শুধু ভেসে থেকে সবকিছু বোঝার চেষ্টা করেছিলাম। দেখি জীপ দুটো বাসের পাশ দিয়ে দ্রুত চলে গেলো। তখন নিশ্চিত হলাম আমরা বিপদমুক্ত। একে একে পানি থেকে উঠে এসে ভেজা কাপড় নিয়েই বাসে চড়ে বসলাম। ঐ অবস্থায় বাস চলল। সেদিন আমরা সিলেট পৌঁছেছিলাম রাত তিনটায়। সিলেটে এসেই আমরা হবিবুল্লাহ বাহারকে পুরো ঘটনা খুলে বলি। বাহার ঐ রাতেই লাশ দাফন করে ফেলার কথা বললেন। আমরা তাঁর কথা মত কাজ করলাম। বাহার ভেবেছিলেন লাশ দীর্ঘক্ষণ রেখে দেওয়ার অর্থ শুধু শুধু আইনগত ঝামেলায় আটকে যাওয়া। তাছাড়া আমাদের একটা রাজনৈতিক ইমেজেরও ব্যাপার ছিল।

সিলেটে বাহার আমাদের সার্বক্ষণিক দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। হবিবুল্লাহ বাহার ছিলেন একাধারে রাজনীতিবিদ, খেলোয়াড় এবং সুসাহিত্যিক।
কলকাতা থেকে তিনি তাঁর বোন শামসুন্নাহার মাহমুদের সাথে যৌথভাবে বের করেছিলেন বিখ্যাত মাসিক পত্রিকা ‘বুলবুল’। ‘বুলবুল’ পত্রিকা হিসেবে সেকালে খুব নাম করেছিল। এ দুই ভাইবোনের উদ্দেশ্যেই কবি নজরুল ইসলাম উৎসর্গ করেছিলেন তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ চক্রবাক।

পাকিস্তান হওয়ার পর বাহার পূর্ব পাকিস্তানের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হন। মন্ত্রী হিসেবে তাঁর এক বিরাট সাফল্য ছিল তিনি ঢাকা থেকে মশা নির্মূল করেছিলেন। আমার মনে হয় এ কাজে তাঁর আগে ও পরে কেউই এরকম কৃতিত্ব দেখাতে পারেনি।

বাহারের মন্ত্রীত্ব থেকে বিদায়ের পর ঢাকায় আবার মশার প্রাদুর্ভাব হয়। এ নিয়ে তখন পত্র-পত্রিকায় খুব লেখালেখি হয়েছিল। কিন্তু মশা নির্মূলে কেউ কোন ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসেনি। তখন একটি পত্রিকায় বিখ্যাত চিত্রনায়িকা বৈজয়ন্তীমালার গানের একটি কলি তুলে দিয়ে ঢাকার মশা যাচ্ছে না কেন তার উত্তরে প্যারডি করে লিখেছিল ‘হামছে না পুছ, পুছ বাহারছে’।

অনেকেই জানেন না ঢাকা বারডেম হাসপাতাল গড়ার পিছনে ডা. ইব্রাহিমকে বাহারই অনুপ্রেরণার পাশাপাশি সহযোগিতা যুগিয়েছিলেন। ডা. ইব্রাহিম তখন এম আর সি পি করে সদ্য বৃটেন থেকে ফিরেছেন। বারডেম হাসপাতাল সে সময় শুরু হয়েছিল সেগুন বাগিচায়।

পাকিস্তান হওয়ার পর হিন্দুস্থান থেকে নুরজাহান থিয়েটারস নামে একটি নাট্যদল ঢাকায় আসে। আজকের ন্যাশনাশ হাসপাতাল যেখানে সেকালে এখানে ছিল একটা খোলা ময়দান। নাট্যদল সেখানেই অভিনয়ের সিন্ধান্ত নেয়। অভিনয়ের কথা শুনে পুরোনো ঢাকার লোকজন ভীষণ খেপে যায়। তারা এসব অভিনয়কে অনৈসলামী কার্যকলাপ বলে নাট্যস্থলের সবকিছু ভেঙ্গে চুরে দেয়। তখন নাট্যকর্মীরা আমার কাছে এলে আমি ঘটনা বাহারকে খুলে বলি। আগে থেকেই জানতাম তিনি সংস্কৃতিমনা। সবকিছু শুনে তিনি বললেন নাট্যদলকে বলো সবকিছু পুনরায় আয়োজন করতে। আমি উদ্বোধন করব।

পুরানো ঢাকার লোকজনের উপর বাহারের একটা প্রভাব ছিল। আর তাই বাহার উদ্বোধন করার সময় আর কোন গন্ডগোল হয়নি। পরবর্তীকালে বাহার বুলবুল একাডেমী প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার খবরটা কেমন করে যেন কবি জসীম উদ্দীনের কানে পৌঁছে। তিনি আমার সাথে দেখা করে তাঁর ‘বেদের মেয়ে’ নাটকটা মঞ্চস্থ করার অনুরোধ করেন। আমরা তাঁর অনুরোধের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পেরেছিলাম।

বাহার যখন দেখলেন করিমগঞ্জে এরকম ঘটনা ঘটিয়ে আমরা ফিরে এসেছি তখন তিনি আমাদের দুটো বাস ভর্তি করে শিলং এর দিকে পাঠিয়ে দিলেন। যাতে আর কোন রকম অসুবিধা না হয়। আমরা শুনেছিলাম শিলং প্রবাসী সিলেটের বহু মুসলমান ভোটারদের আটকিয়ে রাখা হয়েছে- যাতে তারা নির্বাচনে তাদের মতামত না দিতে পারে। রেফারেন্ডাম কমিটি আমাদের পাঠিয়েছিলেন তাদের সিলেটে আনার বন্দোবস্ত করতে। শিলং শহরটা পাহাড়ের উপর অবস্থিত। অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্য আর মনোরম আবহাওয়া এর চারিদিকে বিরাজ করছে। পাহাড়ের উপর দিয়ে রাস্তা। এত সরু যে দুটো বাস পাশাপাশি আসা যাওয়া করতে পারে না। আমরা সেই রাস্তা ধরে শিলং এর দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। রাস্তার মাঝামাঝি পেনিনসুলা নামের একটা জায়গা আছে। একটা বাজার। এখানেই বাসগুলো একে অপরকে ক্রস করে। পেনিনসুলা এলাকাটা হচ্ছে চেরাপুঞ্জী অঞ্চলের ভিতরে। যেখানে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। পেনিনসুলার দেখলাম খাসিয়াদের বাস। এদের গায়ের রং খুব সুন্দর। খাসিয়ারা মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে। বাড়ির বাইরে মেয়েরাই সব কাজকর্ম করে। দেখলাম তারা দোকানদারীও করছে। পরে শিলং এ যেয়েও দেখি তাদের একই অবস্থা। খাসিয়া পুরুষরা ঘরের ভেতরে থাকে।

শিলং-এ দৈনিক আজাদের রিপোর্টার জিলানীর সাথে আমরা দেখা করি। জিলানীর বাড়ি ছিল মালদায়। সেই আমাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল। আসামে তখন বরদলাই সরকার ক্ষমতায়। কংগ্রেসের মাসলম্যানরাই মুসলমানদের সিলেটে যেতে বাধা দিচ্ছিল। বাস সার্ভিস বন্ধ করে দিয়েছিল যাতে মুসলমানরা সিলেটে না যেতে পারে।

জিলানী আমাদের নিয়ে যায় মুসলিম লীগ নেতা আসামের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী স্যার সাদুল্লাহর কাছে। আমরা রেফারেন্ডাম কমিটির পক্ষ থেকে এসেছি শুনে তিনি ইংরেজীতে বললেন, I will give you all co-operation. শিলং-এর মুসলমানদের সিলেট যেতে যেন কোন অসুবিধা না হয়, তিনি প্রশাসনের সাথে আলাপ করে তার ব্যবস্থা করেন। এ সময় আবুল হাসানাত বজলুর রশীদ বলে শিলং-এর একজন মুসলমান ব্যবসায়ী আমাদের অনেক সহযোগিতা করেছিলেন।
রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সিলেটের মুসলমানরা পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে রায় দেয়। র‌্যাডক্লিফ রোয়েদাদ কিন্তু এই গণদাবীকেও উপেক্ষা করেছিল। করিমগঞ্জ মহুকুমাকে কেটে সেদিন বাকী আসামের সাথে জুড়ে দেয়া হয়েছিল।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh