Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যয় ৫ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

১৪ই আগষ্ট, ১৯৪৭। অনেক ত্যাগ অনেক রক্ত আর অনেক সংগ্রামের পথ ধরে বিশ্ব মানচিত্রে স্থান করে নিল পাকিস্তান। সেদিন আমার মনে হয়েছিল কত পথ অতিক্রম করে, কত আঁধার রাতের সীমানা পেরিয়ে, কত তিতুমীরের শাহাদাত, কত ফকীর মজনু ও শমশের গাজীর সংগ্রাম... ১৮৫৭ সালের আজাদী আন্দোলন, জাস্টিস আমীর আলী ও নওয়াব আব্দুল লতীফের বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনা; খেলাফত আন্দোলনের পথ ধরে অবশেষে মুসলিম হোমল্যান্ডের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হল। আমরা পেলাম আজাদ ওয়াতান, স্বাধীন পাকিস্তান। ১৪ই আগস্টের ক’দিন পূর্বেই আমি আর সালাউদ্দিন র‌্যাংঙ্কিন ষ্ট্রীটের মাড়োয়ারী ব্যবসায়ীর বিসি নান নামের দোকান থেকে কাপড় কিনে পাকিস্তানের পতাকা বানানো শুরু করি এবং বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করি যাতে ১৪ই আগষ্ট সকালের মধ্যে পুরো ঢাকা পাকিস্তানের পতাকায় পতাকায় সুশোভিত হয়।

মনে আছে লালবাগ কেল্লার ভিতর খাজা নাজিমুদ্দীন পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। তিনি ফজরের নামাজের পর পরই কেল্লার চত্বরে লোকজন পরিবেষ্টিত হয়ে চলে আসেন। কিন্তু তখন তাঁকে গার্ড অব অনার দেয়া, ব্যান্ড বাজানো ইত্যাদি নিয়ে বেশ সমস্যা দেখা দিয়েছিল-এসব কাজ করত পুলিশ বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর সদস্যরা। এদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু। তারা সবাই হিন্দুস্তান চলে যায়। এ পরিস্থিতিতে মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের তরুণ সদস্যরা এগিয়ে আসে। ন্যাশনাল গার্ডের ঢাকার সালারে সিটি সিরাজদ্দীন এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তখনও পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা নির্দিষ্ট হয়নি। ১৪ই আগষ্ট সকালে মুসলিম লীগের পতাকাকেই জাতীয় পতাকার সম্মান দেয়া হয়। ঢাকায় তখন একটি প্রদেশের রাজধানী হওয়ার মত কোন সুযোগ সুবিধা ছিল না। পুরো পূর্ব পাকিস্তানে উল্লেখ করার মত ছিল না তেমন কোন শহর। ঢাকার লোক সংখ্যা ছিল সর্বসাকুল্যে এক লক্ষ্যের কাছাকাছি। থানা ছিল মাত্র তিনটি। ওয়ার্ড ছিল ৭টি। পূর্ব পাকিস্তান হওয়ার পর ঢাকার ডিসি হন এস রহমতুল্লাহ, আইসিএস।

নতুন রাজধানীর সচিবালয়, প্রশাসন যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দু ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলবার মত কোন বিল্ডিং পাওয়া যায়নি। টিনশেডের অস্থায়ী আশ্রয়ে দিনের পর দিন প্রশাসনের কাজ চালাতে হয়েছে।
বহুদিন ধরে পূর্ব পাকিস্তানের সংসদ ভবন হিসেবে ঢাকা ইউনিভার্সিটির জগন্নাথ হলের একাংশ ব্যবহার করা হত। মুখ্যমন্ত্রী থাকতেন বর্তমান হাউজে বর্তমানে যা বাংলা একাডেমীর অংশ।

পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন যন্ত্র গড়ে তুলবার মত কোন সুদক্ষ অফিসারও বহুদিন পাওয়া যায়নি। হিন্দু অফিসাররা চলে যাওয়ার ফলে যে শূণ্যতা সৃষ্টি হয়েছিল রাতারাতি ইন্টারভিউয়ের মাধ্যমে মুসলমান তরুণদের চাকুরী দিয়ে তা পূরণ করতে হয়েছিল।

বাঙ্গালী মুসলমানদের মধ্যে কোন পাস করা আইসিএস অফিসার ছিল না। অন্যান্য সার্ভিসেও ছিল মুসলমানদের একই অবস্থা। এ অবস্থায় একটা দেশ পরিচালনা করা সহজ কথা ছিল না। শুধুমাত্র নৈতিক শক্তির উপর নির্ভর করে মুসলিম লীগ নেতারা পাকিস্তানের নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। আমার মনে আছে তখন কিছু অবাঙ্গালী মুসলিম অফিসার এসে পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসন যন্ত্র গড়ে তোলেন। পুলিশ সার্ভিস ও রেলওয়ে সার্ভিস গড়ে তোলার পিছনেও তাদের অবদান ছিল সমধিক। বাঙ্গালী মুসলমানদের মধ্যে সে সময় তেমন কোন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি শ্রেণী গড়ে ওঠেনি। আদমজী, ইস্পাহানী, বাওয়ানীরাই তখন এদেশে এসে প্রথম শিল্পায়নের অবকাঠামো গড়ে তোলে।

নতুন প্রদেশে আরও একটি সমস্যা দেখা দিল। পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারে তখন চলছিল ইতিহাসের বীভৎসতম মুসলিম নিধন। সাম্প্রদায়িক হিন্দুদের হাতে যে কত মুসলমান নর-নারীর জীবন প্রদীপ নিভে গিয়েছিল তার কোন সীমা সংখ্যা নেই। হিন্দুদের ভয়ে তখন হাজার হাজার অসহায় নিঃস্ব মুহাজির ভারত থেকে এসে ঢাকা শহর ছেয়ে ফেলেছিল। এভাবে মুসলমানদের ভিটেমাটি ছাড়া করে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দিয়ে হিন্দু ভারত আরও একটি উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চেয়েছিল। যাতে নতুন প্রদেশের দুর্বল ও নড়বড়ে প্রশাসন মুহাজির সমস্যা মোকাবেলা করতে গিয়ে অচল হয়ে পড়ে।
ফুলবাড়ীয়া রেলস্টেশন তখন মুহাজির আর মুহাজিরে পূর্ণ হয়ে থাকত। আমরা মুসলিম লীগ কর্মীরা এই সব অসহায় বনি আদমকে আশ্রয় দেয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগলাম। ঢাকার প্রায় প্রত্যেকটা স্কুল তখন রিকুইজিশন করা হল এদের আশ্রয় দেবার জন্য। বিভিন্ন পরিত্যক্ত হিন্দু বাড়িতেও তাদের জন্য জায়গা করা হল। আমরা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে এদের জন্য চাঁদা তুলতাম। খাবারের ব্যবস্থা করতাম। আমার উপর নাজিমুদ্দীন সাহেবের নির্দেশ ছিল রিফিউজী ক্যাম্পগুলো তত্ত্বাবধান করার।

আসলে এসব মুহাজিররা পাকিস্তানের জন্য সবকিছু হারিয়েছিল। বলতে দ্বিধা নেই, সেদিন পাকিস্তানকে ভালবেসেই তারা এখানে তাদের নতুন আশ্রয় নির্মাণ করতে চেয়েছিল। এসব মুহাজিরের একটা বিরাট অংশই ছিল উর্দূভাষী। কিন্তু ভাষাটা তখন আমাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দেয়নি। কেননা পাকিস্তান হয়েছিল মুসলিম জাতিসত্ত্বার উপর ভিত্তি করে। তাই তাদের আমরা আপন করে নিতে পেরেছিলাম।

তখন পুরাতন হাইকোর্ট বিল্ডিংয়ে পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের কাজ শুরু হয়। বিল্ডিং এর শীর্ষে যে বিরাট পাকিস্তানী পতাকা উড়ত-আমি দেখেছি এইসব মুহাজির প্রত্যেকদিন সকালে গিয়ে ঐ পতাকাকে সালাম করত অনেকক্ষণ ধরে। পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দীন। অত্যন্ত সৎ ও ধার্মিক হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। খাজা নাজিমুদ্দীন ছিলেন ঢাকার নওয়াব পরিবারের সন্তান। আত্মীয়তা সূত্রে নওয়াব সলিমুল্লাহর ভাগ্নে। উচ্চ শিক্ষা পেয়েছিলেন বৃটেনে।

এত বড় ভূস্বামী ঘরের সন্তান হয়েও তিনি জনসাধারণের কাতারে নেমে এসেছিলেন এবং তাদের কল্যাণের জন্য আজীবন রাজনীতি করে গেছেন। তাঁরই উদ্যোগে বাংলার কৃষককে বাঁচানোর জন্য যুক্তবঙ্গে ঋণ শালিসী বিল পাস হয়েছিল। বাংলার মুসলমান জাগরণে ঢাকার নওয়াব পরিবারের মধ্যে নওয়াব সলিমুল্লাহর পর তাঁরই অবদান সমধিক। খাজা নাজিমুদ্দীন শেরে বাংলার পর যুক্তবঙ্গের মুসলিম লীগ মন্ত্রীসভার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রী হন। কর্মীদের প্রতি নাজিমুদ্দীন সাহেবের নজর ছিল খুব তীক্ষ্ণ। তাদের ভালমন্দের সব কিছুই তিনি খবর রাখার চেষ্টা করতেন। পাকিস্তান হবার পর আমার আব্বাকে একবার ঢাকা থেকে বদলী করে খুলনার এডিএম হিসেবে পাঠান হয়। এর পিছনে একটা কারণ ছিল। কাদের সর্দার নামে পুরনো ঢাকার একজন শক্তিশালী পঞ্চায়েত নেতাকে ঢাকার নওয়াবরা পুরনো শত্রুতার জের ধরে মামলা দিয়ে জেলে পাঠায়। এই কাদের সর্দার ছিলেন ফজলুল হকের গুণমুগ্ধ। তাঁর জামিনের জন্য স্বয়ং ফজলুল হক এসে আমার আব্বাকে অনুরোধ করেন। তাছাড়া কেসটা জামিনযোগ্যও ছিল। তিনি সেই হিসেবে কাদের সর্দারকে জামিন দিয়ে দেন। কিন্তু নওয়াবরা আমার আব্বার উপর ভীষণ চটে যান। তাঁরা খাজা নাজিমুদ্দীনকে প্রভাবিত করে আমার আব্বার বদলীর আয়োজন করেন। নাজিমুদ্দীন সাহেবের নিরেট সরলতার জন্য এটা সম্ভব হয়েছিল।

আমি বাসায় এসে রাত্রিতে এ ঘটনা শুনি। পরদিন সকালে আবু সালেককে সাথে করে সরাসরি বিমানবন্দরে চলে যাই। নাজিমুদ্দীন সাহেব তখন রাষ্ট্রীয় কাজে করাচী যাচ্ছিলেন।
আমি সোজা তাঁর কাছে গিয়ে সালাম দিয়ে বিনীত কন্ঠে বললাম, ‘স্যার, মাইনে সুনা হ্যায় কে মেরে ওয়ালিদ সাহাবকো ট্রান্সফার কর দিয়া গিয়া, কিয়া ইয়ে সাচ হ্যায়’?
তিনি অকপট সরলতার সাথে জবাব দিলেন, ‘দেখো ইব্রাহিম, সৈয়দ সেলিম, সৈয়দ সাহেবে আলম আউর হাবিবুর রহমান হেকিম সাহেব মেরে পাস আয়েথে তুমহারা ওয়ালিদ সাহাবকা খেলাফ শেকায়েত লেকর কে, উনুহনে কাদের সর্দার জিনকো এরেস্ট কিয়া গিয়া থা উনকো জামানত দে দি।’ আমি কিছুমাত্র দমে না গিয়ে বললাম, ‘স্যার, হাকিকত ইয়ে হ্যায় কে শের-ই-বাঙ্গাল খুদ হামারা ঘর তশরিফ লায়ে আউর ইস সিলসিলামে মেরে ওয়ালিদ সাহেব ছে বাত কি। কিউ কে ইয়ে বেলয়্যাবল (Bel-able) কেস থা ইস লিয়ে কাদের সর্দারকো জামানত মিলি’।

মনে হল নাজিমুদ্দীন সাহেব ব্যাপারটা বুঝে ফেললেন। একটা সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে একজন সরকারী অফিসারকে বদলি করা যে ঠিক নয়, তা তাঁর পরবর্তী একশন থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।
তখন হোম সেক্রেটারী ছিলেন এস এন বাকের। নাজিমুদ্দীন সাহেবের পিছনে তখন তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। তাড়াতাড়ি করে তিনি তাঁকে বললেন- Baker, Please withheld transfer of Mr. Hussain, till I come back from Karachi. তখনকার মত আব্বার সমস্যা কেটে যায়। পরবর্তীতে আব্বা আরও তিন বছর ঢাকায় কাটান। নুরুল আমীন যখন প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী তখন তিনি কুমিল্লার ডিএম হিসেবে বদলি হন। কুমিল্লার ডিএম দেহলভী ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হওয়ায় ঐ পদটি শূণ্য হয়। নাজিমুদ্দীন সাহেবের সততা ও নির্লোভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট ছিল প্রায় প্রবাদতুল্য। একটা ঘটনা মনে পড়ছে। প্রদেশের প্রশাসন তখন আমদানী-রফতানীর জন্য কিছু লাইসেন্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আমার মনে আছে অনেক শিক্ষিত বাঙ্গালী মুসলমানও তখন আমদানী-রফতানী লাইসেন্স ব্যাপারটা কি তা বুঝে উঠতেন না। আসলে আমদানী-রপ্তানীর জন্য যে ব্যবসায়ী শ্রেণী গড়ে ওঠা প্রয়োজন তা তখনও পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না বললেই চলে। বৃটিশের বৈরী শাসন ও জুলুমের ফলে মুসলমানদের মধ্যে অবশ্য সেরকম কোন ব্যবসায়ী শ্রেণী গড়ে ওঠা সম্ভব ছিল না। আমদানী-রফতানী ব্যবসাটা ছিল পুরো হিন্দুদের কব্জায়। পাকিস্তান হবার পর এ অবস্থা বদলাতে শুরু করে। প্রথম দিকে অনেক বাঙ্গালী মুসলমান ব্যবসা না বুঝে ওঠার কারণে লাইসেন্সগুলো পূর্ব পাকিস্তানে আগত অবাঙ্গালী মুসলমান ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দিতেন। লাইসেন্স কেনাবেচা করে অনেকে তখন বিস্তার অর্থ উপার্জন করেছেন।

মোহন মিয়া তখন প্রদেশ মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক। আমরা কয়েকজন মিলে তাঁর কাছে একদিন গেলাম কিছু ব্যবসায়িক সুবিধা পাওয়ার আশায়। তিনি আমাদের নিয়ে নাজিমুদ্দীন সাহেবের কাছে গেলেন। মোহন মিয়া খোলাখুলিভাবে তাঁকে বললেন, এসব ছেলেরা পাকিস্তান আন্দোলন করেছে। আন্দোলনের জন্য তাদের কেরিয়ারও অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এখন সময় এসেছে এদের জন্য আমাদের কিছু করার। আমরা যদি এদের লাইসেন্স ইস্যু করি তবে এরা তা বেঁচে কিছু উপার্জন করতে পারবে।

নাজিমুদ্দীন সাহেব সব শুনে বেশ কঠোর কন্ঠেই বললেন, ‘হাম ইয়ে লোগোকো কাভি লাইসেন্স নেহি দেয়েঙ্গে। জো সহিমানোমে বিজনেস করতে হ্যায় স্রেফ উনহি লোগোকো লাইসেন্স মিলেগা। পলেটিক্যাল ওয়ার্ককারসকো লাইসেন্স দেনেকা মতবল হোগা কে উনহে চোর ও বদমাশ বানায়া যায়ে। হাম ইনহে বরবাদ করনা নেহি চাহতে হ্যায়। আগার ইয়ে সরকারী নকরী করনা চাহতে হ্যায় হাম নকরীকা বন্দোবস্ত কর দেয়েঙ্গে। হাম জানতে হ্যায় কে ইয়ে লোগ পাকিস্তানকো লিয়ে বহুত কাম কিয়া, মুসলিম লীগকে কহনে পর কোরবানী দি। হাম ইনকো ইজ্জাত করতে হ্যায়। ইয়ে হামারা কউমকা সরমায়া হ্যায়’।

তারপর তিনি মোহন মিয়াকে বললেন কর্মীদের একটি লিস্ট দিতে। এ লিস্টে আমার সাথে শফিকুল ইসলাম, শফিকুর রহমান, মুজিবর রহমান, আবু সালেক, সুলতান হোসেন খান, আলাউদ্দিন আহমদ, আফজাল হোসেন, আতাউল হক খান, কাজী আওলাদ হোসেনের নাম ছিল। হামিদুল হক চৌধুরী তখন অর্থমন্ত্রী। নাজিমুদ্দীন তাঁকে ডেকে আমাদের কয়েকজনের চাকুরির ব্যবস্থা করে দিতে বলেন। আমাদের চাকুরী হয়ে যায়। পরদিন দৈনিক আজাদে বড় হেডিংয়ে লেখা হয় “কওমের খেদমতের এনাম স্বরূপ উচ্চ বেতনের গেজেটেড চাকরী”।

আমাকে ও আলাউদ্দিন আহমদকে দেয়া হয় কৃষি দফতরে। শফিকুর রহমান ও মুজিবর রহমানকে দেয়া হয় ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে। আবু সালেক, সুলতান হোসেন খান, আফজাল হোসেন, কাজী আওলাদ হোসেন চাকরী পান তথ্য মন্ত্রণালয়ে এবং শফিকুল ইসলাম ও আতাউল হক খান যান খাদ্য বিভাগে। আমরা কেউই দীর্ঘদিন চাকরিতে টিকে থাকতে পারিনি। এক দেড় বছরের মধ্যেই সবাই চাকরী ছেড়ে দেন। শুধুমাত্র আফজাল হোসেনই চাকরীতে থেকে যান।

নাজিমুদ্দীন সাহেবের আচার ব্যবহার ছিল আদর্শ স্থানীয়। তাঁম মত শরীফ মানুষ আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। যখনই তাঁর বাসায় গিয়েছি তখনই তিনি আমাদের নিজ হাতে আপ্যায়ন করেছেন। সব সময় তিনি মুসলিম লীগ কর্মীদের ইসলামী জিন্দেগী অনুসরণ করতে বলতেন। বিশেষ করে আমাদের তিনি বলতেন নিয়মিত নামাজ পড়তে। নামাজের ওয়াক্ত হলে তিনি এর কাজ বাদ দিয়ে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। তিনি তাহাজ্জুদ গোজারও ছিলেন।

১৯৪৮ সালে কায়েদে আযম ঢাকায় আসেন। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসেবে এটিই ছিল তার প্রথম ঢাকা সফর। এটা তাঁর শেষ সফরও ছিল। কারণ করাচী ফিরে গিয়ে তিনি আর বেশীদিন হায়াত পাননি। আমি তখন ঢাকা মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি। জিন্নাহ সাহেব ঢাকা আসবেন শুনে আমাদের সবার মন আনন্দে নেচে ওঠে। যে নেতার কথায় পাকিস্তান আন্দোলন করেছি, যাঁর অসাধারণ নেতৃত্বের সামনে কংগ্রেসের জাঁদরেল নেতারা ও বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ পর্যন্ত পাকিস্তান দাবী কবুল করতে বাধ্য হয়েছিল, যাঁর অসাধারণ বলিষ্ঠতার মুখে উপমহাদেশের কোটি কোটি মুসলমান পেয়েছিল তাঁদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি, তিনি এলে আমাদের মনের অনুভূতি যে এমনিতেই উল্লাসমুখর হয়ে উঠবে তাতো স্বাভাবিক। আমার মনে আছে বিভিন্ন সুযোগে আমি তাঁর সাথে ৭ বার হাত মিলিয়েছিলাম। আমরা মনে করতাম তাঁর মত মানুষের সাথে হাত মিলাতে পারাটা রীতিমত একটা গৌরবের ব্যাপার। ইতিহাসের এই অধ্যায়টি পুরোপুরি না জানলে আমাদের এই মানসিক অবস্থাটা কেউ ধরতে পারবে না।

কায়েদে আযমের ঢাকা সফর পুরোপুরি সফল করবার জন্য আমরা সর্বাত্মক সাংগঠনিক তৎপরতা শুরি করি। ঢাকার নওয়াব হাবিবুল্লাহকে সভাপতি করে একটি অভ্যর্থনা কমিটি গঠিত হয়। নওয়াব সাহেব তখন মুসলিম লীগে পুনরায় ফিরে এসেছেন। আমি অভ্যর্থনা কমিটির প্রচার সম্পাদক। আমার মনে আছে সমগ্র প্রদেশে তখন কয়েক লক্ষ পোষ্টার ও লিফলেট বিলি করা হয়েছিল আমার নামেই। এয়ারফোর্সের দুটো ছোট বিমানে করে আমি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রচারপত্র ছড়িয়েছিলাম।

কিছু প্রচারপত্র ঢাকা কোর্ট বিল্ডিং-এর উপরে এসে পড়ে। তখন আদালতের অধঃস্তন কেরানীরা সেগুলো কুড়িয়ে নিয়ে আমার আব্বার কাছে পৌঁছে দেয়ার সময় বলেছিল আপনার ছেলের নামেই এতসব কান্ডকারখানা চলছে। আব্বা বোধ হয় খুশিই হয়েছিলেন। কায়েদে আযম যেদিন আসেন সেদিন ঢাকা লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল। তেজগাঁও থেকে ঢাকার রাস্তায় দু’ধারে অসংখ্য লোক দাঁড়িয়েছিল কায়েদে আযমকে দেখার জন্য। তিনি ঢাকায় এসে মিন্টু রোডের একটা বাড়ীতে ওঠেন। পরবর্তীকালে আইয়ুব খান এটির বহু সংস্কার করে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন বানিয়েছিলেন।

আমরা বিমান বন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে গিয়েছিলাম। ‘মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ’ ‘কায়েদে আযম জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে পুরো ঢাকা সেদিন প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। রেসকোর্স ময়দানে কায়েদে আযম প্রথম জনসভা করেন। অভ্যর্থনা কমিটির পক্ষ থেকে বিরাট প্যান্ডেল সাজানো হয়েছিল। সুদৃশ্য ডায়াস তৈরী করা হয়েছিল। কায়েদে আযম বক্তৃতা দেন বিকালের দিকে। সকাল থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে সর্বস্তরের হাজার হাজার লোক জনসভা স্থলে জমায়েত হতে থাকে। আমার কাছে মনে হল বিরাট এক জনসমুদ্র। আসলে কায়েদে আযম তখন মুসলমানদের জন্য একটি গৌরবের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের সব জেলা থেকে প্রবীণ ও নবীন সব মুসলিম লীগ নেতাই কায়েদে আযমের জনসভায় হাজির হয়েছিলেন। সংবর্ধনা কমিটির পক্ষ থেকে আব্বাস উদ্দিন ও কবি গোলাম মোস্তফা কায়েদে আযমকে অভিনন্দন জানিয়ে গান গেয়েছিলেন।

তখন ছিল গরম কাল। মুসলিম লীগ কর্মীরা হাজার হাজার মাটির কলস ভর্তি পানি তৃষ্ণার্ত শ্রোতাদের পান করিয়েছিলেন। ঢাকায় অবস্থানকালে কায়েদে আযম পল্টন ময়দানে মুসলিম লীগ কর্মী সমাবেশে ভাষণ দিয়েছিলেন। এছাড়া কার্জন হলে ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এবং ঢাকা ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দেন। রেসকোর্স ময়দানে এবং সমাবর্তন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের রাষ্ট্রাভাষার উপর সুস্পষ্ট বক্তব্য দেন। তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করবার পক্ষেও যুক্তি প্রদর্শন করেন।

প্রকৃতপক্ষে উর্দু পাকিস্তানের কোন প্রাদেশিক ভাষা ছিল না। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কোন প্রদেশেই উর্দুর ব্যবহার হত না। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রদেশগুলোতে নিজস্ব ভাষা প্রচলিত ছিল। জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ থাকবার প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব দিয়ে কোন নির্দিষ্ট প্রাদেশিক ভাষার স্থলে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করবার কথা কায়েদে আযম ভেবেছিলেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাথে জড়িত অনেকেই পরবর্তীকালে দাবি করেছেন কায়েদে আযমের ভাষণের একটি কথিত উক্তি Urdu and Urdu shall be the state language of Pakistan. উচ্চারণ করার সময় তারা নাকি No No বলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এটা একটা স্রেফ মিথ্যাচার এবং গালগল্প মাত্র। তাঁরা মনে করেছিলেন মিথ্যা বলে তাঁরা গৌরবের অধিকারী হবেন। এটাকেই বলা যায় ইতিহাসের চুরি। এই গৌরব দাবীকারীদের মধ্যে নাইমুদ্দীন, তোয়াহা, আজিজ আহমেদ প্রমুখের কথা শুনেছি।

রেসকোর্স ময়দানের বিশাল জনসভায় কায়েদে আযমের ভাষণের প্রতিবাদ করতে যাওয়া ছিল রীতিমত কল্পনাতীত ব্যাপার। তখন কায়েদে আযমের যে বিপুল জনপ্রিয়তা এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের যে বিশালতা তার সামনে দাঁড়িয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে গেলে জনতার রুদ্ররোষেই সে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। কনভোকেশন বক্তৃতা সম্বন্ধেও একই কথা চলে আসে। ওখানেও নাকি তাঁরা ‘নো’ ‘নো’ বলে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। অথচ এই প্রতিবাদের কথা উপস্থিত কেউ শোনেনি। তখনকার পত্র পত্রিকায় এ ধরণের কথা প্রকাশ পায়নি। পেছনের দিক থেকে কেউ বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ করে থাকলেও জিন্নাহ সাহেব নিজে শোনেননি, যারা সামনের দিকে বসা ছিলেন তাঁদের কানেও পৌঁছেনি।

এটা সত্য যে, মুসলিম লীগ তখন দুটো গ্রুপে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল। মুসলিম লীগের মধ্যে দুটো উপদল ছিল নাজিমুদ্দীন ও সোহরাওয়ার্দী গ্রুপ এরা ছিল তাঁদের অনুসারী। ছাত্র নেতাদের অনেকেই পরবর্তীকালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু করেন। কায়েদে আযমের ঢাকা অবস্থানকালে নাইমুদ্দীন, তোয়াহা প্রমুখ ভাষার দাবী নিয়ে তাঁর সাথে দেখা করেছিলেন। বদরুদ্দীন উমর তাঁর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিষয়ক বইয়ে লিখেছেন এরা নাকি কায়েদে আযমের সাথে ভাষার প্রশ্নে তর্কাতর্কিতে জড়িয়ে পড়েন। এটা একটা কল্প কাহিনী বৈ অন্য কিছু নয়। তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলা খুব একটা সহজ ব্যাপার ছিল না। সোহরাওয়ার্দীর মত জননেতাকেও আযমের সাথে দেখা করতে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হত।

যাঁরা রাষ্ট্রভাষার দাবী নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন তাঁদের অধিকাংশই আমাদের সাথে পাকিস্তান আন্দোলনে জড়িয়ে ছিলেন। এদের মধ্যে এ সময় একটা রূপান্তর আসতে শুরু করল। পশ্চিম পাকিস্তানীরা তাঁদের ভাষা আমাদের উপর চাপিয়ে দিতে চায়-আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চায়- ইত্যাকার কথা তাঁদের মুখে শোনা যেতে লাগল।

এ সমস্ত শ্লোগান দিয়ে সরল অথচ আবেগপ্রবণ বাঙ্গালী মুসলমানের অনুভূতিকে তারা বিষিয়ে দিতে শুরু করল। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানে যেমন উর্দুর কোন প্রচলন ছিল না তেমনি কায়েদে আযমের মাতৃভাষাও ছিল না উর্দু। তাঁর মাতৃভাষা ছিল গুজরাটী। উর্দুর সাথে তিনি তেমন ঘনিষ্ঠও ছিলেন না। কায়েদে আযম নিজেও বলেছিলেন এই প্রদেশের ভাষা কি হবে তা এখানকার জনগণই নির্ধারণ করবে। তাঁর জীবদ্দশায় বাংলাকে প্রাদেশিক ভাষা হিসেবেই মেনে নিয়ে একটি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল। একারণে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন পর্যন্ত ভাষা নিয়ে কাউকে মাততে দেখা যায়নি।

আন্দোলনকারীরা ভাষা সমস্যা নিয়ে মিছিল মিটিং পিকেটিং শুরু করল। পরিষদ ভবন, মূখ্যমন্ত্রীর বাসভবন এগুলো আন্দোলনকারীদের ঘেরাওয়ের শিকার হতে লাগল প্রায় প্রতিদিন। এরা মুখে বাংলা ভাষার প্রতি দরদ দেখাত অথচ মিছিল মিটিং-এর নামে সরকারী সম্পত্তি নষ্ট, কর্মচারীদের তাদের নিজ নিজ দফতরে যেতে বাধা প্রদান নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। অথচ তাদের এ সমস্ত অন্যায় কার্যকলাপের প্রতিরোধ করতে যখন পুলিশ নামান হতো তখনই প্রচার করা হত মুখ্যমন্ত্রী নাজিমুদ্দীনের অত্যাচারে নাকি দেশ জর্জরিত হয়ে যাচ্ছে।

আমার মনে আছে আন্দোলনকারীরা এতদূর জঙ্গি হয়ে উঠেছিল যে একবার তারা সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিং-এর দেয়াল টপকিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং সেখানে উপস্থিত প্রাদেশিক মন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আফজালকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। আফজাল ছিলেন ফজলুল হকের ভাগ্নে। তিনি নিজেও বাংলা ভাষার সমর্থক ছিলেন। আমার তখনই মনে হয়েছিল এটা শুধু নিছক রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন হতে পারে না। এর পিছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য লুকিয়ে আছে। ভাষা আন্দোলনকারীরা এ সমস্ত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে প্রদেশে নতুন প্রশাসনকে বেকায়দায় ফেলতে চেয়েছিল। ভাষার মত একটি আবেগপ্রবণ ব্যাপারকে পুঁজি করে তারা নাজিমুদ্দীন সাহেবকে অনেকখানি হেনস্থা করতে পেরেছিল। মিছিল মিটিং-এ তারা নাজিমুদ্দীন সাহেবকে অশ্লীল ভাষায় গালি দিত।

নতুন প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন তা নিয়ে কলকাতার পরিষদ ভবনে ভোটাভুটি হয়েছিল। ঐ নির্বাচনে সোহরাওয়ার্দী নাজিমুদ্দীনের কাছে হেরে যান। প্রদেশে যখন নাজিমুদ্দীন মন্ত্রীসভা গঠন করেন তখন তাঁর মন্ত্রীসভায় সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের কেউই স্থান পায়নি। স্বাভাবিকভাবে তাদের একটা ক্ষোভ ছিল। পরিষদে এরাও নাজিমুদ্দীনের বিরোধীতা করা শুরু করে এবং ভাষা আন্দোলনকারীদের পিছন থেকে উৎসাহ যোগাতে থাকে। এঁদের মধ্যে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, কুমিল্লার টি আলী এবং কুষ্টিয়ার ডাঃ এ এম খালেক ছিলেন। ভাষার ব্যাপারটা নিয়ে এঁরা যে খুব গভীরভাবে ভাবতেন এমন নয় কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতির জন্য তাঁরা এসব করেছিলেন বলেই মনে হয়। কিন্তু এর ফল যা হয়েছিল তার জন্য আমাদের পরবর্তীকালে চড়া মূল্য দিতে হয়।

ভাষা আন্দোলনকারীদের সাথে কমিউনিষ্ট পার্টি ও কংগ্রেসের একটা যোগাযোগ ছিল। কিন্তু সেটা কখনও প্রকাশ্য ব্যাপার হতে পারেনি। আমি নিজে লক্ষ্য করছি ভাষা আন্দোলনকারীদের মিছিল-মিটিং চলাকালে কমিউনিষ্ট পার্টির অফিস ও লাইব্রেরীগুলো বিশেষ তৎপর হয়ে উঠত। কংগ্রেসী নেতাদের মনে হত খুব কর্মচঞ্চল। ভাষা আন্দোলনকারীদের লিফলেট-ইশতেহার ও অন্যান্য প্রচারপত্র তাঁরা নিজেরা অনেক সময় স্বেচ্ছায় বিলি-বাটোয়ারা করে দিত। ভাষা আন্দোলনের নেতা তোয়াহা, মতিন এঁরাতো কমিউনিষ্ট পার্টির সাথেই সংশ্লিষ্ট ছিলেন। কমিউনিষ্ট পার্টির অনিল রায়, লীলা রায় এবং কংগ্রেসের শিরিশ চট্টোপাধ্যায় ও ভবেষ নন্দীরা ভাষা আন্দোলকারীদের সব রকমের সহযোগীতা করতেন। এঁরা নিশ্চয়ই সেদিন কোন সদুদ্দেশ্য নিয়ে ভাষা আন্দোলনকারীদের পাশে এসে দাঁড়াননি।

কায়েদে আযম ঢাকায় এসে আন্দোলনরত ছাত্রদের সাথে আমরা যারা নাজিমুদ্দীন গ্রুপের বলে পরিচিত ছিলাম তাদের মধ্যে একটা ঐক্য তৈরী করে দেবার চেষ্টা করেছিলেন। সে চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ আন্দোলনকারীরা তখন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবী নিয়ে এতদূর এগিয়ে গিয়েছিল যে তাদের সাথে আমাদের চিন্তার দূরত্ব অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কায়েদে আযম বলেছিলেন ‘বিভিন্ন গ্রুপের ঐক্য ছাড়া পাকিস্তান টিকবেনা’। সে কথা অবশ্য পরে নির্মমভাবে সত্য হয়েছিল।

তখনকার মত কায়েদে আযম সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের কয়েকজন নেতাকে খুশী করবার চেষ্টা করেছিলেন বলে মনে হয়। ডা. এ এম মালেক লিয়াকত আলী খানের মন্ত্রীসভায় যোগ দেন এবং মোহাম্মদ আলী ও টি আলী বিদেশে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। কায়েদে আযম শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। শুনেছি তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন।

ভাষা আন্দোলনকারীদের খবর ফলাও করে প্রচার করত কলকাতার কংগ্রেসী পত্রিকাগুলো। এসব পত্রিকা পড়লে মনে হত পত্রিকাগুলো ভাষা আন্দোলনের দাবীকেই সমর্থন করছে। আমার কাছে এ জিনিসটা চিরদিনই অদ্ভুত ঠেকেছে যে কলকাতার বাঙ্গালী হিন্দুরা এদেশের বাংলাভাষার আন্দোলনকে সমর্থন করছে অথচ নিজেরা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে হিন্দিকে গ্রহণ করেছে-এক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের দোহাই পেড়ে। সেখানে তাদের বাংলা প্রেমের মোটেও ঘাটতি হয়নি। অথচ পাকিস্তানে উর্দু রাষ্ট্রভাষার দাবীর কথা শুনে তারাই আবার হৈ চৈ করে উঠেছে এবং এদেশের কিছু আত্মবিক্রিত নেতা ও বুদ্ধিজীবীর ভাষার দাবী নিয়ে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে তাঁরাই সমর্থন দিয়েছে। পাকিস্তান হয়েছিল ১৪ই আগষ্ট। অথচ ১লা সেপ্টেম্বরেই ঢাকা ইউনিভার্সিটির দুজন লেকচারার, আবুল কাশেম ও নূরুল হক ভূঁইয়া তমুদ্দুন মজলিসের জন্ম দেন। এই সংগঠনটিই ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের মধ্যে ভাষার ব্যাপারে কাজ করতে শুরু করে। যার পথ ধরে পরবর্তীকালে গড়ে উঠে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময়ই মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দের মনে সন্দেহ ছিল পাকিস্তান টিকবে কিনা। ভৌগলিকভাবে বিচ্ছিন্ন দুটি অঞ্চলকে একত্রিত করে রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল। শুধুমাত্র মুসলিম জাতীয়তার আদর্শের ভিত্তিতে গঠিত রাষ্ট্রটির কোষাগারে তখন কোন টাকা ছিল না। বাউন্ডারী কমিশনের কাছে পাকিস্তানের পাওনা ৫৫ কোটি টাকা ভারত আটকে দিয়েছিল। লাখ লাখ মুহাজির হিন্দুদের হাতে নির্যাতিত হয়ে পাকিস্তানে ছুটে এসেছিল। এ সমস্যা মোকাবিলা করতে তখন পাকিস্তান সরকারের অচল হয়ে পড়ার মত অবস্থা। তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তানের অবস্থা ছিল আরও খারাপ। হিন্দুরা চলে যাওয়ায় প্রশাসন অর্ধমৃত হয়ে পড়েছিল। পুলিশ ও আর্মি তখনও ঠিকমত গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। সরকারের প্রত্যেকটা বিভাগই ছিল অপূর্ণ। এরকম একটা নাজুক অবস্থায় ভাষার দাবী নিয়ে যারা নতুন দেশে ঐক্যের পরিবর্তে ঘৃণা ছড়ানো শুরু করল, তাদের উদ্দেশ্যে সততা কতদূর ছিল তা বলা মুশকিল।

এক হতে পারে রাজনৈতিক স্বার্থে সেদিন মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে ভাষাকে ব্যবহার করা হয়েছিল। দ্বিতীয়তঃ পাকিস্তানের বুনিয়াদকে দুর্বল করে দেয়ার জন্য ভাষার প্রশ্নটাকে সামনে নিয়ে আসা হয়েছিল। এটা সত্য পূর্ব বাংলার মুসলমানরা বাংলাভাষী। কিন্তু বৃটিশের দুশো বছরের রাজত্বে বাংলাভাষা ও সাহিত্য এবং রাজনীতিতে ডমিনেট করেছে হিন্দুরা। বাংলার মুসলমানদের তারা কখনও বাঙ্গালী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। বাঙ্গালী বলতে বাংলাভাষা কিংবা বঙ্গের অধিবাসী না বুঝিয়ে সেকালে হিন্দুদের বুঝানো হত। এ প্রসঙ্গে শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত উপন্যাসের বহু বিখ্যাত ‘স্কুলের মাঠে বাঙ্গালী ও মুসলমানের মধ্যে ফুটবল খেলা চলিতেছে’- উক্তিটি মনে করবার মত। এ অবস্থা থেকে মুসলমানদের বাঁচার জন্যই পাকিস্তান আন্দোলনে নামতে হয়েছিল। অথচ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকারীরা এমন একটা প্রসঙ্গ নিয়ে রাজনীতির মাঠ গরম করলেন যা মুসলিম জাতীয়তার বুনিয়াদকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে অগ্রসর হল।

তারা যে এ জিনিসটা বুঝতেন না তা নয়। কিন্তু বাংলা ভাষার পরিচয়টা যখন মুসলমান পরিচয়ের চেয়ে তারা বেশী করে দিতে লাগলেন তখনই পাকিস্তানের আকাশে কালো মেঘ জমতে শুরু করেছিল। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর অনেক নেতাকে বলতে শুনেছি ভাষা আন্দোলন থেকেই আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু। তখন আমার কাছে এটা পরিষ্কার হয় যে আসলে ভাষা আন্দোলন ছিল পাকিস্তানকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ারই একটি আন্দোলন।

সেই উনিশ’শ আটচল্লিশেই মুসলিম লীগ কর্মীদের সাথে ভাষা আন্দোলনকারীদের প্রায়শঃই মারামারি হত। এবার শুনতে পেলাম কোর্ট হাউস স্ট্রিটে কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে বসে ভাষা আন্দোলনকারীরা মিটিং করছে। ফিরোজ আহমদ ডগলাস বলে আমাদের এক তরুণ কর্মী ছিল। আমাদের একটা সুবিধা ছিল ফিরোজ আবার কমিউনিস্টদের সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করত। সে আমাদের কাছে কমিউনিস্টদের গোপন খবর পাচার করত। সেই এসে জানাল মিটিং-এ সিদ্ধান্ত হয়েছে ভাষা আন্দোলনকারীরা মর্নিং নিউজ, সংবাদ এবং আজাদ পত্রিকা অফিসে আগুন লাগিয়ে দেবে। এসব পত্রিকা তখন মুসলিম লীগকে সমর্থন করত। তখন ঢাকা নগর মুসলিম লীগের অফিস ছিল ৩৩, জনসন রোডে বর্তমানে যা লিয়াকত এভিনিউ। আমি তাড়াতাড়ি করে সেখানে চলে যাই। আমরা সিদ্ধান্ত নেই আগুন দেয়ার আগেই আমরা তাদের প্রতিহত করব। কিন্তু তারা ততক্ষণে মর্নিং নিউজ অফিস জ্বালিয়ে দেয়। রায় সাহেব বাজারে এসে আমরা মুখোমখি দাঁড়িয়ে যাই। মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। দু’পক্ষই মারামারি করার জন্য এক রকম প্রস্তুত হয়ে ছিল।

আমার মনে আছে প্রতিপক্ষ সেদিন মিছিল করে আমাদের দিকে আসছিল আর শ্লোগান দিচ্ছিল ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘পাকিস্তান মুর্দাবাদ’ ইত্যাদি। দু’পক্ষেই সেদিন হতাহত হয়েছিল। এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ে এবং গুলিও চালায়। গুলিতে আমাদের একজন ভীষণভাবে আহত হয়। তাকে হাসপাতালে নেয়ার সময় সে মারা যায়।

ভাষা আন্দোলনকারীরা চেয়েছিল এ ঘটনার সূত্র ধরে তার পরের দিন ঢাকায় হরতাল ডাকতে। প্রতিরোধের মুখে তাদের সে চেষ্টা বানচাল হয়ে যায়। আমি মুসলিম লীগের তরুণ কর্মীদের নিয়ে জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজ আর ইউনিভার্সিটিতে যাই। গিয়ে দেখি পিকেটাররা জটলা করছে। এর মধ্যে মুসলিম লীগ কর্মীরা কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয়।

‘পাকিস্তান মুর্দাবাদ’ শ্লোগান দেয়ায় তাদের উপর আমাদের ক্ষোভ ছিল প্রচন্ড। তাছাড়া সরকারের বিরুদ্ধে এরা আন্দোলন উস্কে দিচ্ছিল।
কোর্ট হাউস ছাড়া কমিউনিস্ট পার্টির অফিস ছিল কাপ্তান বাজার এবং ফুলবাড়ী রেল স্টেশনের বিপরীত দিকে। তিনটি অফিসই বিক্ষুব্ধ জনগণ জ্বালিয়ে দেয়। এদের দুটো পার্টি লাইব্রেরী ছিল। একটি ঢাকা কোর্টের বিপরীতে নাসিরুদ্দীন সরদার লেনের মাথায় অন্যটি নওয়াবপুরে। এ দুটো লাইব্রেরী ছিল সেকালে পাকিস্তান বিরোধী প্রকাশনা ও প্রচারণার তীর্থস্থান। কমিউনিস্টদের এ দুটো আখড়াও জ্বালিয়ে দেয়া হয়।

কমিউনিস্ট রাজনীতি ছিল আমার কাছে এক রীতিমত রহস্যময় ব্যাপার। অনেকেই জানেনা এরা পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করত। কমরেড বঙ্কিম মুখার্জী, রণেশ দাশের মত প্রথিতযশা কমিউনিস্ট নেতারা সেকালে পাকিস্তান আন্দোলনকে রীতিমত নিপীড়িত মানুষের আন্দোলন বলে বক্তৃতা-বিবৃতি পর্যন্ত দিয়েছেন। অথচ পাকিস্তান হবার পর এঁরাই আবার বলতে শুরু করলেন এটা নাকি একটা ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক দেশ। পাকিস্তান হচ্ছে সর্ব প্রকার প্রগতিবিরোধী মধ্যযুগীয় চিন্তাভাবনার কারখানা। আমার মনে আছে কোর্ট হাউসের পিছনে যে অফিসটা সেদিন পুড়িয়ে দেয়া হয় সেটা কয়েকদিন পরেই হোটেল হিসেবে চালু করেছিল ভাষা আন্দোলনের এক নেতা কামরুদ্দীন আহমদের ছোট ভাই বদরুদ্দীন আহমদ রুকু। কামরুদ্দীন ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর ভক্ত। প্রথম জীবনে তিনি ছিলেন আরমানীটোলা হাই স্কুলের মাস্টার। পরবর্তীকালে সোহরাওয়ার্দী যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন তখন তাঁকে তিনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন।

কমিউনিস্ট পার্টি অফিস পুড়িয়ে দেবার পর কলকাতায় কমিউনিস্টদের মুখপত্র ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় মুসলিম লীগ কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক লেখালেখি হয়েছিল। এ সময়ে আর একটা ঘটনার কথা মনে পড়ছে। ফজলুল হক হলে মুসলিম ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে একটা সভা আহ্বান করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রভাষার ব্যাপারে মুসলিম লীগের অবস্থান ব্যাখ্যা করা। তখন ভাষা আন্দোলনকারীরা মুসলিম লীগ নেতা আবু সালেক, সুলতান হোসেন খান, কাজী আউলাদ হোসেন, এটি সাদী প্রমুখকে ঘেরাও করে ফেলে। আমাদের কাছে খবর আসে তাঁদেরকে মেরে ফেলার জন্য তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। খবরটা এনেছিল ইউনিভার্সিটির ছাত্র আমাদের কর্মী আখতার আহাদ ও আসলাম। আমি মুসলিম লীগের শ’খানেক কর্মী নিয়ে ফজলুল হক হলে পৌঁছে যাই। আমাদের সবার মধ্যে তখন যুদ্ধ প্রস্তুতি চলছে। এসময় ইউনিভার্সিটির ভিসি মাহমুদ হাসান ছুটে আসেন। তাঁরই মধ্যস্থতায় ভাষা আন্দোলনকারীরা মুসিলম ছাত্রলীগের নেতাদেরকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়। মাহমুদ হাসান না আসলে হয়ত সেদিন রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটত!

ঢাকা থেকে ফিরে গিয়ে কায়েদে আযম মাত্র ছ’মাস বেঁচেছিলেন। তখন পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল হিসেবে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন খাজা নামিজমুদ্দীন। সেই সাথে পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন নূরুল আমীন।

নূরুল আমীন ছিলেন অত্যন্ত সৎ রাজনীতিবিদ, তাঁর প্রশাসনও ছিল পুরোপুরি দুর্নীতিমুক্ত। কিন্তু রাজনৈতিক দক্ষতা তাঁর কতটুকু ছিল সেটা বলা মুশকিল। অত্যন্ত গণতন্ত্রমনা হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক বুদ্ধির তীক্ষ্ণতার অভাবে আমার মনে হয় তিনি দ্রুত অপ্রিয় হয়ে ওঠেছিলেন।
পূর্ববঙ্গের উন্নয়ন প্রকৃত পক্ষে তাঁর আমলেই শুরু হয়। তখন ঢাকা শহরে কোন আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ছিল না। একটি প্রাদেশিক রাজধানীতে বিদেশী অভ্যাগতরা কোথায় উঠবেন, কোথায় রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদি হবে তার কোন বন্দোবস্ত ছিল না। এই শূণ্যতা পূরণ করার জন্য তিনি সরকারী অনুকূল্যে প্রথম হোটেল শাহবাগ নির্মাণ করান। যা বর্তমানে পিজি হাসপাতাল। তাঁর হাতেই গড়ে ওঠে ঢাকার নিউমার্কেট এবং আজিমপুরের সরকারী কলোনী। ধানমন্ডির আবাসিক এলাকা তাঁর সময়ে তৈরী। আমার মনে আছে মতিঝিল এলাকায় যখন তাঁর সময় বাণিজ্যিক প্লট দেয়া শুরু হয় তখন কেনার জন্য বাণিজ্য বিমুখ বাঙ্গালীরা খুব একটা এগিয়ে আসেনি। এর সুযোগ নিয়েছিল ভারত থেকে আগত ধনাঢ্য মুহাজীররা- যারা আগে থেকেই ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিল।


নূরুল আমীনের এই উন্নয়ন কর্মকান্ডের সমালোচনা শুরু করল বিরোধীরা। শাহবাগ হোটেলকে তারা বলত ‘শাদ্দাদের বেহেশত’। আন্তর্জাতিক একটি হোটেলের সুযোগ-সুবিধার কথা বিকৃতভাবে জনগণের কাছে প্রচার করে তারা রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের চেষ্টা করতে লাগল। তারা বলতে লাগল দেশের মানুষকে দরিদ্র রেখে নূরুল আমীন বিলাস-ব্যসনে গা ঢেলে দিয়েছেন।

অথচ আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি তিনি অত্যন্ত সাধাসিধা জীবনযাপন করতেন। ধৈর্য্য ধরে তিনি জনগণের দুঃখ-কষ্টের কথাও শুনতেন।
ইস্কাটনে তাঁর একটা ছোট্ট একতালা বাড়ী ছিল। অথচ বিরোধীরা সাধারণ জনগণের কাছে প্রচার করত তিনি নাকি শ্বেত পাথরের বিরাট প্রাসাদ বানিয়েছেন যেখানে তার স্ত্রী সোনার খাটে শুয়ে থাকেন। নূরুল আমীন কোনদিন এ ধরণের মিথ্যা অপপ্রচারের বিরুদ্ধে টু’শব্দটি করেননি। তিনি অত্যন্ত ধৈর্য্যরে সাথে সমস্ত পরিস্থিতি মোকাবেলা করে গেছেন।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh