Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ৯ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

এ সময় পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঘটল আরেকটি বিপর্যয়। ১৯৫৩ সালে নাজিমুদ্দীনকে পদচ্যুত করলেন গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ। গোলাম মোহাম্মদ ছিলেন একজন আমলা। আমার মতে এই আমলার হাতেই পাকিস্তানে গণতন্ত্রেও ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে গেল। তারপর থেকে যতদিন পাকিস্তানের দুই অংশ একত্রিত ছিল ততদিন পর্যন্ত প্রকৃত অর্থে পাকিস্তানের রাজনীতিতে কোন স্থিরতা আসেনি। নাজিমুদ্দীনকে পদচ্যুত করা হয়েছিল সম্পূর্ণ অগণতান্ত্রিক পন্থায়। তাঁর বদলে আমেরিকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত বগুড়ার মোহাম্মদ আলীকে বানানো হল প্রধানমন্ত্রী। স্পীকার মৌলভী তমিজুদ্দীন খান এই অগণতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদে হাইকোর্টে গিয়েছিলেন। হাইকোর্ট তাঁর পক্ষে রায় দিলেও পরে সুপ্রীমকোর্ট তার বিপক্ষে রায় দেয়।

আমার মনে হয়েছিল এটা একটা পাতানো খেলা। এর পিছনে ছিল জেনারেল আইয়ুবের হাত। জেনারেল আইয়ুব তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান। আইয়ুব খান চলতেন আমেরিকার ইশারায়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে তখন চলত আমেরিকা আর রাশিয়ার খবরদারী। পাকিস্তান ছিল খবরদারীর শিকার। একটা দেশে যখন সামরিকতন্ত্রের ভূত চাপে তখন সে দেশ কোনভাবেই এগিয়ে যেতে পারে না। আমেরিকা ও রাশিয়া তখন সামরিকতন্ত্রকে ভর করেই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাত।

মোহাম্মদ আলীকে নূরুল আমীন মোটেই পছন্দ করতেন না। ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তাঁর ক্ষমতারোহণ তিনি মেনে নিতে পারেননি কখনও।
মোহাম্মদ আলীরই কেবিনেটে আইয়ুব খান যোগ দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে। দেশের সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে চাকুরীরত অবস্থায় তিনি কি করে কেবিনেটে জায়গা করে নিলেন তাও ছিল আমাদের কাছে এক পরম বিস্ময়ের ব্যাপার।

মোহাম্মদ আলীর কেবিনেটে সোহরাওয়ার্দী যোগ দেন আইনমন্ত্রী হিসেবে। সোহরাওয়ার্দী যখন যুক্তবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তখন মোহাম্মদ আলী তাঁর উল্টো। রাজনীতির এই চক্রটা বড়ই অদ্ভুত। নাজিমুদ্দীন আমেরিকা প্রভাবিত সিয়াটো চুক্তিতে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকার করেছিলেন। আমেরিকা তার বদলা নিয়েছিল আইয়ুবের মাধ্যমে। দুঃখজনক হলেও সত্য নাজিমুদ্দীনের এ পদচ্যুতিকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন সোহরাওয়ার্দী।
এ রকম একটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন ঘনিয়ে এল। ঠিক নির্বাচনের আগে মুসলিম লীগের নড়বড়ে অবস্থাটা একটু তরতাজা করার জন্য মোহন মিয়া নূরুল আমীনের কাছে নতুন প্রস্তাব নিয়ে গেলেন। মোহন মিয়াকে বলা হত কিংমেকার-পর্দার অন্তরালে থেকে ক্ষমতার রাজনীতির পাল্লা ঘুরিয়ে দিতে তাঁর জুড়ি ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সোহরাওয়ার্দীর বিরুদ্ধে নামিজুদ্দীনের বিজয়ে তাঁরই ভূমিকা ছিল সবচেয়ে বেশী। সিলেটের পরিষদ সদস্যদের বুঝিয়ে তিনি নাজিমুদ্দীনের পক্ষে এনেছিলেন।

মোহন মিয়া এবার আমাদের নিয়ে নূরুল আমীনের কাছে গিয়ে বললেন, ফজলুল হক মুসলিম লীগে আসতে রাজী হয়েছেন। আপনি তাঁকে সভাপতির পদটা ছেড়ে দিন। তাহলে প্রদেশে আমাদের অনেক শক্তি বৃৃদ্ধি পাবে। নির্বাচনেও জোর লড়াই চালানো যাবে। এটা সত্য ফজলুল হক দীর্ঘদিন কোন একটা আদর্শে স্থায়ী থাকতে পারতেন না। তারপরও বলতে হবে এদেশের মানুষের উপর ফজলুল হকের ছিল অসামান্য প্রভাব। ব্রিটিশ ভারতে বাংলার চাষা মুসলমানদের আত্মপ্রত্যয় সৃষ্টিতে তাঁর অবদান অতিক্রম করার মত কেউ ছিলেন না। ঋণসালিশী বোর্ড স্থাপন করে যুক্তবঙ্গে তিনিই জমিদারের শোষণ আর অত্যাচার থেকে বাংলার মুসলমানদের বাঁচিয়েছিলেন। লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৯০৬ সালে ঢাকার বুকে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠাকালে ফজলুল হক উপস্থিত হয়েছিলেন। তারপর ১৯১৬ সালে লাহোর চুক্তিকালে তিনি কায়েদে আজমের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান ছিল অনন্য। ১৯৩৭ সালে তিনি যখন মুসলিম লীগের সহযোগিতায় যুক্তবাংলার প্রধানমন্ত্রী হন তখন কংগ্রেস শাসিত প্রদেশগুলোতে চলছিল নির্বিচারে মুসলিম নিধন। এর প্রতিবাদে তিনি হুংকার দিয়ে বলেছিলেন: কংগ্রেস শাসিত প্রদেশগুলোতে একটা মুসলমান মারা হলে আমি বাংলায় তার বদলা হিসেবে দুজন হিন্দুকে খতম করে দেব। তাঁর এই সাহসিকতা দেখে লক্ষ্ণৌর মুসলমানরা তাঁকে শের-ই-বাংলা উপাধি দেন।

ফজলুল হককে নূরুল আমীন সভাপতির পদ ছেড়ে দিতে রাজি হলেন না। নির্বাচনের প্রাক্কালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন হয় কার্জন হলে। সে অধিবেশনেও কর্মীদের পক্ষ থেকে ফজলুল হককে সভাপতি করার দাবী উঠেছিল। এই দাবী নিয়ে কার্জন হলে রীতিমত হাতাহাতি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নূরুল আমীনের একগুঁয়েমির মুখে ফজলুল হককে মুসলিম লীগে আনা যায়নি। সেদিন যদি ফজলুল হককে লীগে আনা যেত তাহলে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী জোয়ার এতটা প্রবল হতে পারত না। হয়ত যুক্তফ্রন্টই গড়ে উঠত না। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে মোহন মিয়া মুসলিম লীগ ত্যাগ করলেন। তাঁর সাথে হাত মিলালেন হামিদুল হক চৌধুরী ও দেওয়ান আবদুল বাসিতসহ মুসলিম লীগের একনিষ্ঠ বহু নেতা ও কর্মী। তাঁদের এই দলত্যাগ মুসলিম লীগের শিরদাঁড়া ভেঙ্গে দিয়েছিল।

মোহন মিয়া খুবই জেদী ছিলেন। নূরুল আমীনকে হারানোর জন্য নিজের জমিদারীর কিছু অংশ বিক্রি করে প্রায় দু’লাখ টাকা তিনি ফজলুল হকের হাতে তুলে দেন। আমাকে তখন তিনি মুসলিম লীগ ছেড়ে তাঁদের সাথে যোগ দিতে বলেন। তাঁর সাথে আমার গভীর হৃদ্যতা ছিল। তিনি আমাকে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে মনোনয়ন দিতে চেয়েছিলেন। বললেন, নূরুল আমীনের অবস্থাটা তো দেখছ। কি হবে মুসলিম লীগ করে!
আমি বললাম মোহন ভাই নূরুল আমীনের সিদ্ধান্ত মানতে আমি পারিনি ঠিকই। কিন্তু তা বলে আমি মুসলিম লীগ ত্যাগ করব না। আমি দলত্যাগীদের দলভুক্ত হতে চাই না। আপনার সাথে আমার সম্পর্ক সব সময়ই থাকবে।

যুক্তফ্রন্টের কাছে মুসলিম লীগের পরাজয়ের আর একটা কারণ আমার কাছে খুব উল্লেখযোগ্য বলে মনে হয়েছে। নূরুল আমীন কখনও ছাত্র রাজনীতিকে উৎসাহিত করতেন না। ছাত্ররা রাজনীতি করুক এটা তার পছন্দ ছিল না। তাঁর অসহযোগীতার কারণে ছাত্র আন্দোলনকে আমরা সংগঠিত করতে পারিনি, নতুন রিক্রুট তেমন একটা হয়নি, এই শূণ্যতার সুযোগ নিয়েছিল আমাদের বিরোধীরা। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে ছাত্র রাজনীতি সব সময়ই একটা ফ্যাক্টর। এ জিনিসটা তিনি বুঝতে পারেননি। তিনি ছাত্রদেরকে উল্টো বুঝাতেন go back to studies. নির্বাচনে মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসন পেয়েছিল। ফজলুল কাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি পরে মুসলিম লীগে যোগ দিলে আসন সংখ্যা ১০-এ এসে দাঁড়ায়। নূরুল আমীন হেরেছিলেন সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের এক তরুণ কর্মী খালেক নওয়াজের কাছে। নূরুল আমীন একটু এদিক-ওদিক করলেই নিজের কেন মুসলিম লীগের জন্যও অনেক আসন ছিনিয়ে নিতে পারতেন। কিন্তু মুসলিম লীগের বিরোধীরা ক্ষমতার জন্য সেদিন যে সব ন্যাক্কারজনক কাজ করেছিলেন তিনি সে সব নীরবে মেনে নিয়েছিলেন। বলতে দ্বিধা নেই ৫৪-এর নির্বাচনের মত নিরপেক্ষ নির্বাচন এদেশে আর একটিও হয়নি। সেটা সম্ভব হয়েছিল নূরুল আমীনের গণতান্ত্রিক চেতনা ও মন-মানসিকতার জন্য। নির্বাচনের আগে যুক্তফ্রন্ট ২১ দফা পেশ করেছিল। এটাকে তাঁরা বলত গণদাবী। তাঁরা আরও বলতেন ক্ষমতার জন্য নয় গণদাবী আদায়ের জন্য তাঁরা নির্বাচন করছেন।
নির্বাচনের পর অবশ্য গণদাবী আদায়ের নেতৃত্বদানকারীদের চেহারা ফুটতে শুরু করল। পরিষদের নেতা নির্বাচিত হলেন ফজলুল হক। কিন্তু গোল বাঁধল মন্ত্রীসভায় কারা যোগ দেবেন সেটা নিয়ে। ফজলুল হককে যুক্তফ্রন্টের কর্মীরা বাঁধা দিতে উদ্যত হলেন। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন গুলিস্তানের গভর্ণমেন্ট হাউস ঘেরাও করে মন্ত্রী পরিষদের শপথ গ্রহণকে যে করেই হোক ভন্ডুল করবেন। ঘটনার দিন রাতে মোহন মিয়া আমার বাসায় হাজির। তিনি বললেন ইব্রাহিম তোমার লোকজন দিয়ে হেলপ করো। মুবিজকে বাঁধা দিতে হবে। আমি সেই রাতে কর্মীদের বাসায় ঘুরে ঘুরে সবাইকে সংগঠিত করি এবং পরদিন সকালে গভর্ণমেন্ট হাউজের দিকে রওয়ানা দেই। সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের হয়ে শেখ মুজিব তাঁর লোকজন নিয়ে বাঁধা দিতে অগ্রসর হলেন। কিন্তু তিনি যখন শুনলেন আমাদের দল অনেক বেশী শক্তিশালী ও সংগঠিত তখন পিছিয়ে গেলেন এবং একটা মারামারির হাত থেকে আমরা সবাই রেহাই পেলাম। ফজলুল হক তখনকার মত নির্বিঘ্নে তাঁর মন্ত্রীদের শপথ করালেন।

আমার মনে আছে যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার পর নবনির্বাচিত পরিষদ সদস্যদের প্রথম সংবর্ধনা অনুষ্ঠান হয়েছিল শাহবাগ হোটেলে। এতদিন তাঁরাই ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় এটিকে বলতেন শাদ্দাদের বেহেশ্ত। তাঁরা এটা নিয়ে অহেতুক নূরুল আমীনের কুৎসা রটিয়ে বেড়াতেন।
মোহন মিয়াকে সহযোগিতার জন্য তোফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া) তাঁর ইত্তেফাক পত্রিকায় ‘মুসাফির’ নামে আমাকে আক্রমণ করেন এবং কয়েকদিন ধরে লেখালেখি করেন। তিনি খামোখাই আমার বিরুদ্ধে চটেছিলেন। তিনি বুঝতে পারেননি যুক্তফ্রন্টেও ছিল বহু দলত্যাগী নেতা কর্মীদের ভিড়। আপাত সুবিধা প্রাপ্তি ছিল তাঁর লক্ষ্য। আমি বলব এটা মানিক মিয়ার অপসাংবাদিকতা। মন্ত্রীসভা গঠনের সময় শেখ মুজিব শেরে বাংলার মুখের উপর বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চটাং চটাং কথা বলেছিলেন। আর তার উত্তরে শেরে বাংলা দুঃখ করে বলেছিলেন, যে ছেলে আশি বছরের বুড়োকে বেইজ্জত করতে দ্বিধা করেনা, সে এদেশের সম্ভ্রমকে-লুটিয়ে দিতে দ্বিধা করবে না-এটা তোমরা দেখে নিও।

এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় নেতার কথা পরবর্তীকালে অক্ষরে অক্ষরে ফলেছিল। পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্টের ইতিহাস হল এক অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়। ২১ দফার রফাদফা করে নেতারা রীতিমত মাঠে নেমে গেলেন। যুক্তফ্রন্টের শরীকদের মধ্যে কোন মিল ছিল না। একজন ডাইনে গেলে আর একজন যেতেন বাঁয়ে। সোহরাওয়ার্দীর লোকজন সোহরাওয়ার্দীর অনুগত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলীর সাথে মিলে ষড়যন্ত্র করতে লাগলেন কিভাবে ফজলুল হককে সরিয়ে দেয়া যায়।

একবার ফজলুল হকের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের শরীক আওয়ামী লীগ একটা ষড়যন্ত্র করে। বুড়িগঙ্গার ওপার থেকে কিছু গরীব লোককে খাদ্য দেবার প্রলোভন দিয়ে ঢাকায় এনে ভুখা মিছিল বের করে। আওয়ামী লীগের উদ্দেশ্য ছিল গভর্ণমেন্ট হাউস ঘেরাও করে ফজলুল হককে বেকায়দায় ফেলা। মিছিল যখন ঢাকা কোর্টের সামনে আসে তখন পুলিশ বাঁধা দেয়, পরে লাঠিচার্জ করে এবং গুলি ছোঁড়ে। গুলিতে দুজন গরীব মানুষ মারা যায়। এদের ভাগ্যে অবশ্য রাতারাতি শহীদ হওয়ার গৌরব প্রাপ্তি ঘটেনি। আওয়ামী লীগের এই মিছিল সংগঠিত করেছিলেন জিঞ্জিরার হামিদুর রহমান। তিনি আওয়ামী লীগ থেকে ’৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হয়েছিলেন।

এসময় আওয়ামী লীগ আরও একটা ন্যাক্কারজনক কাজ করেছিল। আদমজী জুট মিল তখন নির্মাণাধীন। এখানে কিছু অবাঙ্গালী শ্রমিক কাজ করত। আওয়ামী লীগ প্রচার করতে লাগল লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি টাকা অবাঙ্গালীরা এদেশ থেকে নিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের ঘৃণা ও বিদ্বেষের রাজনীতি এখান থেকেই শুরু। তাদের রাজনৈতিক পুঁজিই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী আর অবাঙ্গালীদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ। অবাঙ্গালীরা এদেশের যাবতীয় দুঃখ কষ্টের জন্য দায়ী, তাদের রুখতে হবে। অথচ দেশ বিভাগের আগে এদেশে একটাও পাটকল ছিল না। এদেশের পাটকে নির্ভর করে যেসব জুট মিল গড়ে উঠেছিল তা ছিল কলকাতায়। তখন কিন্তু হিন্দুদের এই শোষণের বিরুদ্ধে এরকম প্রতিবাদ ওঠেনি বা পরবর্তীকালেও কেউ কিছু বলেনি। অবাঙ্গালীরা ছিল মুসলমান। পাকিস্তানের জন্য তাঁরা সর্বস্ব ত্যাগ করেছিল। নিজেদের সহায় সম্পত্তি ফেলে এদেশে ছুটে এসেছিল। বাঙ্গালীদের মধ্যে তখনও কোন শিল্পপতি শ্রেণী গড়ে ওঠেনি। অথচ অবাঙ্গালীরা যখন কেউ কেউ দেশের শিল্পায়নে এগিয়ে এল তখন তারাই হল আওয়ামী লীগের প্রথম টার্গেট।

নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা শামসুজ্জোহার নেতৃত্বে একদল সশস্ত্র আওয়ামী লীগ কর্মী আদমজী জুট মিলে হামলা চালায় ও অবাঙ্গালী মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই বিহারী বাঙ্গালী দাঙ্গায় বহুলোক হতাহত হয়েছিল। ফজলুল হকের বিরুদ্ধে এটা ছিল আর একটা আওয়ামী চক্রান্ত। এ ঘটনার ফলেই সোহরাওয়ার্দীর অনুগত মোহাম্মদ আলীর পরামর্শে গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ ফজলুল হকের মন্ত্রীসভা ভেঙ্গে দেন এবং প্রদেশে কেন্দ্রের শাসন জারী করেন।

এসময় রাষ্ট্রীয় কাজে একবার গোলাম মোহাম্মদ ঢাকায় আসেন। তখন রাজনৈতিক মহলে শলা-পরামর্শ চলছিল কেন্দ্রের শাসন তুলে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে পুনরায় গণতান্ত্রিক সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার। বিমানবন্দরে গোলাম মোহাম্মদকে সংবর্ধনা জানাতে যুক্তফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছিল। গোলাম মোহাম্মদ এসেছিলেন দেরী করে। সেদিন মালা নিয়ে ফজলুল হক ও আতাউর রহমান খান ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়েছিলেন গভর্ণর জেনারেল সাহেবের নেক নজর কাড়ার জন্য। দু’দলেরই উদ্দেশ্য ছিল কেন্দ্রের সুদৃষ্টি অর্জন করে মন্ত্রীসভা গঠন করা। আমার কাছে সেদিন বিশেষ করে খারাপ লেগেছিল ফজলুল হকের মত একজন মানুষ কি করে একজন আমলার পিছনে ছুটতে পারেন। ক্ষমতার লোভ মানুষকে কোথায় নামিয়ে নিয়ে যায়!

বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন চৌধুরী মোহাম্মদ আলী। তিনিও ছিলেন একজন আমলা। লিয়াকত আলী খান ১৯৪৬ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের যে বাজেট পেশ করে হুলুস্থুল করে ফেলেছিলেন তা প্রণয়ন করতে চৌধুরী মোহাম্মদ আলী সহযোগীতা করেন বিস্তর। তিনি তখন কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পদস্থ কর্মচারী। কেন্দ্রে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে পরিষদে সমর্থন করত ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি আর নেজামে ইসলাম পার্টি। নেজামে ইসলাম পার্টি থেকেই মন্ত্রী হয়েছিলেন মৌলভী ফরিদ আহমেদ ও মাহফুজুল হক। ফজলুল হক চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রীসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন। কৃষক শ্রমিক পার্টির আর এক প্রভাবশালী সদস্য হামিদুল হক চৌধুরী হন পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তখন প্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হন কৃষক শ্রমিক লীগের আবু হোসেন সরকার।

তখন পাকিস্তানের রাজনীতিতে ষড়যন্ত্র ও কুটিলতা এত ছায়া ফেলেছিল যে কোন মন্ত্রীসভাই দীর্ঘস্থায়ী হত না। আসলে হতে দেয়া হত না। পাকিস্তানের রাজনীতিতে আমেরিকা এত বেশী প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করল যে এখানে দীর্ঘস্থায়ী স্থিতিশীলতা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল। ক্ষমতার মঞ্চে এবার এলেন সোহরাওয়ার্দী। তিনি হলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এই প্রথম আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হল। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বরাবরের মত সোহরাওয়ার্দী মার্কিন ঘেঁষা নীতি অনুসরণ করলেন। আওয়ামী লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী অবশ্য সোহরাওয়ার্দীর এই মার্কিন ঘেঁষা নীতি পছন্দ করতেন না। এ কারণেই তাঁর সাথে সোহরাওয়ার্দীর বিরোধ শুরু হয় এবং তিনি তাঁর দলবল নিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে বের হয়ে আসেন এবং নতুন দল ন্যাপ তৈরী করেন। সন্তোষের কাগমারীতে এক সম্মেলন ডেকে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের বিভাজন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেন। পরে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ন্যাপের কাউন্সিল অধিবেশন হয়। এই অধিবেশন স্থলে হামলা চালায় আওয়ামী লীগ। পরের দিন পল্টন ময়দানে আহূত ন্যাপের জনসভায়ও হামলা করে আওয়ামী লীগ এবং সেখানে প্রচুর হতাহত হয়।

সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হয়ে পাকিস্তানের জন্য এক বিরাট ক্ষতির কাজ করেছিলেন। ক্ষমতায় এসে তিনি পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা তুলে দেন। পরিষদ অধিবেশন ডেকে তিনি সংবিধানে রীতিমত সংশোধন এনেছিলেন। পাকিস্তান হয়েছিল পৃথক নির্বাচনের ভিত্তিতে। এটা ছিল একসময় মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রতিরক্ষা ব্যূহ। এর জন্য ব্রিটিশ ভারতে মুসলমান নেতাদের অনেক সংগ্রাম  করতে হয়েছিল। এমনকি সোহরাওয়ার্দীও কলকাতার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন এই পৃথক নির্বাচনকে ভিত্তি করে। তিনি কি বুঝে এটা করেছিলেন জানি না তবে নির্বাচনে হিন্দু ভোট পাওয়ার তাৎক্ষণিক সুবিধার কথা তিনি ভেবে থাকতে পারেন।

আওয়ামী লীগ যে পাকিস্তানকে দুর্বল করার জন্য এক এক করে অতি সন্তর্পণে এগুচ্ছিল ভাষা আন্দোলনের পর পৃথক নির্বাচন তুলে দেওয়ার আয়োজন তারই প্রমাণ। তবে সোহরাওয়ার্দী কখনই পাকিস্তান ভাঙ্গায় জড়িত ছিলেন না। কিন্তু মোসাহেব ও পাকিস্তান বিরোধীদের কথায় তাঁর কান ভারী হয়েছিল সন্দেহ নেই।

এতদিন আওয়ামী লীগ বিরোধীদলে থাকাকালে পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তান শোষণের কল্পিত জিকির করত। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী যখন ক্ষমতায় গেলেন তখন তিনি বললেন, পূর্ব পাকিস্তান শতকরা ৯৮ ভাগ স্বায়ত্বশাসন ভোগ করছে। সুতরাং নতুন করে পূর্ব পাকিস্তানের আর স্বায়ত্বশাসন দরকার নেই।

আসলে ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ কখনও শোষণের কথা বলত না। ক্ষমতা হারালেই শোষণ তারা খুঁজে বেড়াত। এই ছিল আওয়ামী লীগের রাজনীতি।

অথচ এই রাজনীতি পাকিস্তানকে দুর্বল করে দিচ্ছিল। দু’অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ঐক্যের বদলে বিভেদের বীজ পল্লবিত হচ্ছিল। পাকিস্তানের ক্ষমতার রাজনীতিতে সোহরাওয়ার্দী বেশী দিন টিকে থাকতে পারেননি। মাত্র ১৩ মাস প্রধানমন্ত্রীত্বের পর তাঁকে বিদায় নিতে হয়। সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় আওয়ামী কর্মীদের দাপটে সারাদেশ অস্থির হয়ে উঠেছিল। করাচীর সচিবলায় আওয়ামী কর্মীদের গুঞ্জনে মুখরিত থাকত। আমার মনে আছে মাত্র ১৩ মাসের মধ্যেই অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে সর্বপ্রকার লাইসেন্স, পারমিট, পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যে আমদানী-রফতানীর ব্যবসা, জাহাজের মাল চলাচলের স্থান ও রেলওয়ে ওয়াগন মঞ্জুরী সব কিছু হাতিয়ে নেয় তারা। করাচীর তাজ হোটেল ছিল বিখ্যাত হোটেল। এমন সব আওয়ামী লীগ কর্মী যাদের কোন সামাজিক অবস্থান ছিল না করাচীতে, সে সময় দেখেছি, তাজ হোটেল তাদের দখলে। একবার ব্যবসায়িক কারণে করাচীতে গিয়ে দেখি তাজ হোটেল আওয়ামী কর্মীতে গিজ গিজ করছে। সবাই তদবির প্রার্থী, লাইসেন্স-পারমিট আকাঙ্খী। এদের অনেককেই চিনতাম। তাদের ঘরে ঢুকে দেখি মদ ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের ছড়াছড়ি।

এরপর প্রধানমন্ত্রী হন মুসলিম লীগের আই আই চুন্দ্রীগড়। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তিনি পৃথক নির্বাচন পদ্ধতি বহাল রাখতে সচেষ্ট হন। দুর্ভোগ্যবশত তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের মেয়াদ ৩ মাস স্থায়ী হয়েছিল। পৃথক নির্বাচনী বিল পুনরায় উত্থাপনে মুসলিম লীগ চেষ্টা করে। তবে সে চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।

আই আই চুন্দ্রীগড় সবুর সাহেব এবং আমাকে করাচীতে ডেকে পাঠান। আমরা হাজির হলে তিনি বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানে পৃথক নির্বাচনের গুরুত্বের কথা বলেন এবং পৃথক নির্বাচনের পক্ষে প্রদেশে জনমত সৃষ্টির উপর জোর তাগিদ দেন।

করাচী থেকে ফিরে আমরা পৃথক নির্বাচনের পক্ষে কাজ শুরু করি। সারা প্রদেশে আওয়ামী লীগের এই পৃথক নির্বাচন বানচালের আত্মঘাতী উদ্যোগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারণা চালাতে থাকি। তখন পৃথক নির্বাচনের পক্ষে একটি জনমত তৈরী হতে শুরু করেছিল। তা দেখে ভীত হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার ধরপাকড় শুরু করে এবং অন্যান্যের মধ্যে মুসলিম লীগের ফজলুল হক কাদের চৌধুরী ও সাইদুর রহমানকে গ্রেফতার করে। তখন ফজলুল কাদের চৌধুরী চাটগাঁ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। এসময় সিডিউল কাস্ট নেতা রসরাজ মন্ডল আমাদের উদ্যোগকে সমর্থন দেন। আমরা সারা প্রদেশে পৃথক নির্বাচন দিবস পালন করেছিলাম। পৃথক নির্বাচনের পক্ষে ঢাকার এক জনসভায় আমি বলেছিলাম, মুসলমানরা পৃথক জাতি এই নীতির ভিত্তিতেই পাকিস্তানের সৃষ্টি। যে শক্তি পাকিস্তানের হাসিলে বাঁধা সৃষ্টি করেছিল এবং যারা আজ পর্যন্ত ইসলামী আদর্শের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে চলেছে তারা এই ইসলামী আদর্শের বিলোপ সাধন ও যুক্ত নির্বাচন পদ্ধতি প্রবর্তনের জন্য অশুভ আঁতাত করেছে। এই পদ্ধতি প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই হিন্দু ও মুসলমানকে এক জাতি বলে ধরে নেয়া হবে। এবং শেষ পর্যন্ত এমন এক সময় আসবে যখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধবাদী দল পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ও পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদেরকেও একজাতি বলে দাবী উত্থাপন করবে। আওয়ামী লীগ এসময় প্রদেশের সরকারে থাকা অবস্থায় মুক্ত নির্বাচনের পক্ষে হরতাল ডেকেছিল কিন্তু সে হরতাল সফল হয়নি।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh