Home EBooks অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের ইতিহাস

eBooks

Latest Comments

বাংলাদেশঃ মারাত্মক অপপ্রচারণা, ষড়যন্ত্র ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকার - অধ্যায় ২: ভারতীয় ষড়যন্ত্রের সহায়তায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্জন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশঃ পরবর্তীতে কী? PDF Print E-mail
Written by এম, টি, হোসেন   
Friday, 15 November 1996 02:00
Article Index
বাংলাদেশঃ মারাত্মক অপপ্রচারণা, ষড়যন্ত্র ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকার
অধ্যায় ১: তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য সম্পর্কিত অলীক কাহিনী ও স্বায়ত্বশাসনের দাবী প্রসঙ্গ
অধ্যায় ২: ভারতীয় ষড়যন্ত্রের সহায়তায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্জন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশঃ পরবর্তীতে কী?
অধ্যায় ৩: ১৯৭১ সালের পর থেকে একাত্তরের হত্যাকান্ডের একপেশে কল্পকাহিনী ও মিথ্যাচার
অধ্যায় ৪: বাংলাদেশে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও স্বার্থ সংঘাতের গতি-প্রকৃতি
অধ্যায় ৫: একবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় আধিপত্যঃ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উভয় সংকট
All Pages

বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের উৎস

এটা সর্বজনবিদিত যে, বর্ণহিন্দু ও বৃটিশ উপনিবেশবাদীদের দহরম-মহরমের পক্ষপুটে সৃষ্ট ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এর তিক্ততম বিরোধীতার মধ্যে দিয়ে অভ্যুদয় ঘটে পাকিস্তান রাষ্ট্রের। এটাও সর্বজনবিদিত যে ভারতীয় কংগ্রেস তাদের নেতা নেহেরুর আপোষহীন মনোভাবের ফলশ্রুতিতে মুসলমানদের স্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে পাঞ্জাব ও বাংলাকে ভাগ করে ফেলে। নেহেরুর যুক্তি ছিল যে যেহেতু এই দুইটি এলাকার মুসলমানরা ভারত বিভাগ রোধ করেনি সেহেতু পাঞ্জাব ও বাংলার মুসলমান ও হিন্দুদের অধ্যুষিত জায়গা ভাগ হতে হবে -যা ছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের প্রতি নেহেরুর ঘৃণ্য আক্রোশ। উপরন্তু— ১৯২০ সাল থেকে ভারতের কম্যুনিষ্ট পার্টি (সিপিআই)ও ভূতপূর্ব সোভিয়েত ইউনিয়ন সৃষ্টির আদলে বহু মতাবলম্বীর জনগোষ্ঠীর দেশ ভারতকেও একদেশ হিসেবে রাখার জন্যে কংগ্রেস-এর দাবীর সমর্থনে পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধীতা করতে থাকে; যদিও কম্যুনিষ্ট পার্টির কোন গণসমর্থন ছিলনা। অবশ্য ১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয় যখন ঘটলো তখন ভারতীয় কম্যুনিষ্ট পার্টি তাদের রাজনৈতিক কৌশল পরিবর্তন করলো। কিন্তু তারা অবিভক্ত ভারত পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্য সামনে রেখেই আভ্যন্তরীন ও সীমান্ত বহির্ভূত কার্যকলাপের দ্বারা পাকিস্তান রাষ্ট্রকে নির্জীব তথা বিচ্ছিন্ন করা পূর্বক ভারতের সাথে লীন করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এটা অনেকেরই জানার কথা ১৯৪৭ সালেই শেখ মুজিবর রহমান পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে কলকাতায় জনাকয়েক কংগ্রেস ও কম্যুনিষ্ট নেতার সহযোগে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলাকে পুনএকত্রীকরণের এক উদ্যোগে গ্রহণ করে। এই ব্যাপারে আমি পরে বিশদ আলোকপাত করবো। বৃহত্তর স্বাধীন বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রয়াস ব্যার্থ হবার পর সেই সময়কার প্রথম কাতারের মুসলিম নেতা হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী দেশ বিভাগের পর কলকাতায় থেকে যান। শেখ মুজিব সেই সময় কিছু দিনের জন্য কলকাতায় অবস্থান করেন এবং সেই সাথে আরো ছিলেন আবুল হাশিম, সৈয়দ বদরুদ্দোজা সহ জনাকয়েক মুসলিম নেতা। মুজিব অবশ্য তাড়াতাড়িই ফিরে আসেন কেননা কলকাতায় তার মত তরুণ মুসলমানদের কোন কিছুই করার ছিলনা। কলকাতায় থাকতে হলে তাকে খাওয়া পরার জন্যে কারো বদান্যতার উপর নির্ভর করতে হতো।

পাকিস্তান শুরুর বছর কয়েক ছিল অত্যন্ত ঝুট-ঝামেলাপূর্ণ এবং প্রশাসন ছিল অত্যন্ত দূর্বল। প্রথমে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিতাড়িত লক্ষ লক্ষ মুসলমান উদ্ধাস্তুদের পুনর্বাসন করতে পাকিস্তানকে হিমসীম খেতে হয়। এমতাবস্থায় ভারত পাকিস্তানের অভ্যন্তরে নানাবিধ অন্তর্ঘাতমূলক পদক্ষেপ-এ উস্কানী ও মদদ দেয়; যার মধ্যে ছিল সেই সময়কার আলোকে কিছু ইস্যুর অবতারণা করা। পাকিস্তান জন্মের মাত্র ১৭ দিন পর ১৯৭১ সালের ১লা সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিদ্যার একজন শিক্ষকের নেতৃত্বে তমুদ্দিন মজলিস কর্তৃক বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী উত্থাপন ছিল তেমনি একটি ইস্যু। প্রাথমিক অবস্থায় নানাবিধ বিপর্যয় সত্ত্বেও পাকিস্তানী জনগণের অদম্য সাহস ও সেই সময়কার ত্যাগ-তীতিক্ষাপূর্ণ নেতৃত্বের কারণে সামগ্রিক বিপর্যয় সামাল দিয়ে পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যেই স্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়। ১৯৫৬ সালে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র প্রণীত হয় এবং পূর্ব বাংলা আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ব পাকিস্তান-এ নামাংকিত হয়, যা ছিল সংবিধান বর্ণিত ফ্রেমওয়ার্কের এক ইউনিট পদ্ধতির অংশ। অনেক ধরণের সংহতি অর্জন সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তান ভারতের দিক থেকে ভৌগলিক অবস্থান হেতু একটা বিপদাপন্ন অবস্থায় নিপতিত হয়। কারণ তিন দিক দিয়ে বিশাল ভারতীয় ভূভাগ দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিল পূর্ব পাকিস্তান আর দক্ষিণে ছিল বঙ্গোপসাগর। পূর্ব পাকিস্তান ভারতের পশ্চিম বাংলার চাইতে ছিল অনেক অনগ্রসর; কেননা প্রায় দুই শতাব্দী ধরে পূর্ব পাকিস্তান ছিল পশ্চিম বাংলার পশ্চাদভূমি। যার দারুণ জনগণ ছিল ব্যাপকভাবে নিরক্ষর এবং দরিদ্র আর এদের ব্যাপক অংশ ছিল ধর্ম বিশ্বাসে মুসলমান। এই অবস্থার তথা অর্থনৈতিক ও বিপদ সংকুল ভূ-প্রকৃতিগত অবস্থার সুযোগ নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু করার জন্য এক শ্রেণীর বামপন্থী নেতা কংগ্রেসীদের যোগসাজসে উঠে পড়ে লাগে। এই লক্ষ্য অর্জনে মধ্যে একটা যোগ-সাজশ ভারতীয় শাসক চক্র ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের কম্যুনিষ্টদের মধ্যে একটা যোগসাজস প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন বোধ করে।

কম্যুনিষ্ট রাজনীতির জন্যে পূর্ব পাকিস্তানকে উর্বর ভূমি হিসেবে গণ্য করা

পূর্ব পাকিস্তানী জনগণের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার অভিযোগ উঠিয়ে কম্যুনিষ্ট ও হতাশ কিছু তরুণ রাজনীতিবীদ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের গোড়াপত্তন করে। এই বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের পিছনে সাধারণ মানুষের প্রকৃত কল্যাণ সাধনের কোন লক্ষ্য ছিল না কি সে আন্দোলন ছিল বর্ণ হিন্দুদের অবিভক্ত তথা অখন্ড ভারত পুনঃ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য বাস্তবায়ন -তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নের দাবী রাখে। এই বইয়ের অন্যত্র আমি এটা বিশ্লেষণ করবো। তবে একটা সত্যি যে নিশ্চিত তাতে কোন সন্দেহ নেই। সেই সত্যটি হচ্ছে ১৯৭১ সালে বিচ্ছিন্ন হবার পর গত ৩৭ বছর প্রায় ৫০০ কোটি ডলার তথা [সিরাজুল আলম খান, বাংলাদেশে গণতন্ত্র (এন অল্টারনেটিভ মডেল অব ডেমোক্রাসি ফর বাংলাদেশ) এমএনও পাবলিকেশন্স (প্রাইভেট), ঢাকা, ডিসেম্বর, ১৯৯৫, পৃ: ৫] প্রায় চল্লিশ হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক সাহায্য বাংলাদেশ লাভ করার পরও সাধারণ মানুষের উন্নয়নে সেই সাহায্য তেমন কোন অবদানই রাখতে পারেনি। কেননা ১৯৯৫ সালের এক উপাত্ত মতে বাংলাদেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ [ঐ পৃ:-৬] মানুষ দারিদ্র্য সীমার নীচে অবস্থান করে। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে দারিদ্র্যের এই হার ক্রমেই বাড়ছে।

একটি অতি বাম গোষ্ঠী মনে করেছিল যে ইসলামিক পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বিচ্ছিন্ন হলে সহজে মার্কসবাদ প্রতিষ্ঠা করা যাবে। এই বাম গোষ্ঠী এটাও মনে করতো যে পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হলে সময়ে ভারতের পশ্চিম বাংলা মিলে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে।

বস্তুতঃ তেমন লক্ষ্য নিয়েই বামপন্থীরা মুজিবের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে ১৯৭৫ সালে একদলীয় বাকশালী শাসন কায়েম করেছিল। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য যে সে লক্ষ্য তারা অর্জন করতে পারেনি; বরং বাকশাল প্রতিষ্ঠার ছয় মাসের মধ্যে মজিব রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে উৎখাত হয় এবং এর পর বার কয়েক সশস্ত্র বিপ্লব হওয়া সত্ত্বেও কম্যুনিষ্টদের বিরুদ্ধে তথা ইসলামিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী মুসলিম জাতীয়তাবাদীদেরই বিজয় নিশ্চিত হয় এবং ক্ষণস্থায়ী বাঙালী জাতীয়তাবাদ প্রত্যাখাত হয়। এটা আজ যে কারুরই গবেষণা ও অনুসন্ধিৎসার ব্যাপার হতে পারে যে কেন পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা তাদের বাঙালি পরিচিতি ও সূদীর্ঘকাল করে লালিত তাদের বাঙালি মূল্যবোধ ১৯৪৭ সালের পর থেকে গত ষাট বছর ধরে বিসর্জন দিয়ে আসছে এবং মার্কসীয় মার্কার সমাজতন্ত্রের আবডালে গত প্রায় চার দশক ধরে নিজেদের কিসমৎ গড়ে চলেছে এমনকি তারা তাদের অঞ্চলকে বিশ্বের বাজার অর্থনীতির সাথেও আজ সম্পৃক্ত করতে চাচ্ছে।

পূর্ব পাকিস্তানের ভৌগলিক অসহায়ত্ব

এটা অনেকটাই অনস্বীকার্য সত্যি যে পূর্ব পাকিস্তানের চাইতে সাতগুণ বড় ভূখন্ডসম্পন্ন পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সহস্র মাইল দূরে অবস্থিত পাকিস্তানের এই অংশ পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে রীতিমত যৌক্তিক বলে রাজনীতিবীদদের কেউ কেউ মনে করতো। এদের মধ্যে কিছু প্রামাণ্য তথ্যমতে উল্লেখ্য হচ্ছেন শেখ মজিবুর রহমান; যিনি তার পিতার স্বীকারোক্তি মত ছিলেন একজন গুন্ডা। [বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ, বি, সরকার সম্প্রতি আমাকে বলেছেন যে, মরহুম শেখ লুৎফুর রহমান নিজকে হতভাগ্য আখ্যায়িত করে ফরিদপুরের প্রকাশ্য জনসভায় এই মর্মে উল্লেখ করেন যে তার দুই পুত্রের মধ্যে ছোটটা (শেখ নাসের) হচ্ছে খোঁড়া আর বড়টা (শেখ মুজিব) হচ্ছে গুন্ডা। উল্লেখ্য যে বিচারপতি সরকার ফরিদপুরে অতিরিক্ত জেলা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে মুজিবের পিতা শেখ লুৎফুর রহমান তার কোর্টে পেশকারের দায়িত্বে ছিলেন।]

মুজিব ১৯৪৭ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের একজন ছাত্র নেতা ছিলেন। সেই সময় বাংলার রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবীদ হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী, জনাব শেখ মুজিবকে পৃষ্টপোষকতা প্রদান করেন কোন মহৎ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়; তাঁর একজন সমর্থক ও তল্পীবাহী হিসেবে মুজিবকে দিয়ে কাজ করানোই ছিল সোহ্রাওয়ার্দী লক্ষ্য। যদিও সোহ্রাওয়ার্দী এবং মুজিব দুইজনই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেন। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তারা রাজনীতির মূলধারা ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক ক্ষমতার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভূক্ত হতে পারেনি। স্বভাবতই মুজিব তখনকার বিরোধী রাজনীতিতে তার একটা অবস্থান তৈরী করতে সচেষ্ট হয়। এই লক্ষ্য অর্জনে মুজিব ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার জ্যোতি সেন গুপ্তের সান্নিধ্যে আসেন- যিনি মনোরঞ্জনধর সহ কতিপয় কংগ্রেস নেতার সাথে মুজিবের পরিচয় করিয়ে দেন। [জ্যোতি সেন গুপ্ত, হিষ্ট্রী অব ফ্রীডম ম্যুভমেন্ট অব বাংলাদেশ, ১৯৪৭-৭৩: সাম ইনভলভমেন্ট, নয়া প্রকাশ, কলকাতা, ১৯৭৪, পৃ: ৮৩] মুজিব তাদের সাথে মিলে পূর্ব পাকিস্তানে কংগ্রেসের লক্ষ্য হাসিলে কাজ করার ব্যাপারে একমত হন। পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে মুজিব পাকিস্তানের পুরো সময় ধরে গোপনে কাজ করে আসলেও নির্যাতনের ভয়ে সে বরাবরই ষাট এর দশকের পুরো সময় এমনকি ৬-দফা আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়েও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে তার সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করতে থাকেন। অথচ ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহের পর এই মুজিবই বেশ দম্ভের সাথে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার সাথে তার সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। এমনকি সর্বশেষ ১৯৭১ সনের ২৫শে মার্চ সেনা অভিযানের পূর্বে পাকিস্তানের ন্যাপ নেতা ওয়ালী খান ও মুসলিম লীগের নেতা খান এ সবুর-এর সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মুজিব বিচ্ছিন্নতাবাদের সাথে তার সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেন। ওয়ালী খানের সাথে ১৯৭১ সালের ১৪ই মার্চ তারিখে অনুষ্ঠিত এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মুজিব এই মর্মে ওয়ালী খানকে আস্বস্ত করেছিলেন যে তিনি (মুজিব) যে কোন মূল্যে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি রক্ষা করবেন; কেননা তিনি (মুজিব) নিজকে পাকিস্তান আন্দোলনের একজন অন্যতম সংগঠক বলে দাবী করেন। মুজিব ন্যাপ নেতা ওয়ালী খানকে এই বলে আরো আস্বস্ত করেন যে ওয়ালী খানের পিতা গাফফার খান কংগ্রেসের হয়ে যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে কাজ করেছিলেন তখন তিনি (মুজিব) ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের অন্যতম নিবেদিত ও ত্যাগী কর্মী। মুসলিম লীগ নেতা সবুর খানকেও মুজিব অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনচিত্তে এই মর্মে আস্বস্ত করেছিলেন যে কোন মূল্যে তিনি (মুজিব) পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় সর্বাত্মক দায়িত্ব পালন করবেন। জনাব সবুর খান যখন মুজিবকে বলেন যে, আপনি যদি পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা সত্যি সত্যি প্রত্যাশাও করেন, তা হলেও তা করা উচিত পার্লামেন্টের মাধ্যমে- কেননা আপনার দল পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ। অন্য কোনভাবে করতে গেলে ভারত এখানে মজা লুটবে। কিন্তু মুজিব বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা সংক্রান্ত সকল অনুমান, আশংকা হেসে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কেন ?

নিজেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে শেখ মুজিবের স্বীকারোক্তি

১৯৭২ সালের ৭ই জুন অর্থাৎ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ছয় মাস পর ঢাকার রমনা রেসকোর্স (সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে) ময়দানে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় শেখ মুজিব শুরু থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার সাথে তার সম্পৃক্তির কথা দম্ভভরে প্রকাশ করেন এবং কিভাবে তিনি ভারত সরকারের সাথে অস্ত্র ও অন্যান্য সাহায্যের বিষয়াদি আগ থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন তার বর্ণনা দেন। [দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, জুন ৮, ১৯৭২] মুজিব কিন্তু তার সে বক্তব্য কখনও প্রত্যাহার করেনি; যদিও তার রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল একটা লোক-দেখানো বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন ভারত সরকারের সাথে পূর্ব থেকে শেখ মুজিবের যোগাযোগ সংক্রান্ত কথাবার্তা মুজিব সে জনসভায় বলেননি। কিন্তু ভারতের গোয়েন্দা জ্যোতি সেন গুপ্তের লেখা ১৯৪৭-৭৩ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস বই [পৃ: ১৯৮] অথবা মনোজ বসুর লেখার চীন দেখে এলাম ও একই লেখকের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যা ১৯৭২ সালের ১৬ই জানুয়ারি লন্ডনের বাংলার ডাক পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল; যা থেকে নঈম হাসানের লেখা বাংলাদেশ ট্রাজেডী বইতে [পৃ: ১০] উদ্ধৃত হয়েছে-তা যদি কেউ পড়েন তাহলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে শুরু থেকেই জ্যোতি বসুর যথাযোগ্য ভূমিকা সমেত মুজিবের সম্পৃক্তির পর্যাপ্ত প্রমাণ লাভ করবেন। মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা ওয়াজেদও বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে শুরু থেকেই তাঁর পিতার সম্পৃক্তির কথা স্বীকার করেছেন। সংসদের বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা এবং তার দলের সাংসদ আবদুর রাজ্জাক স্পষ্টতই স্বীকার করেন যে শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেন এবং ১৯৬২ সালে ভারতীয় সাহায্য লাভের জন্য গোপনে আগরতলা সফর করেন। [সাপ্তাহিক মেঘনা ও মাসিক নতুন সফরে প্রকাশিত আবদুর রাজ্জাকের সাক্ষাতকার সেপ্টেম্বর ১৯৫৫, পৃ : ১৫ ও ২২] কিন্তু ভারত থেকে প্রত্যাবর্তনের পর পরই মুজিবকে পাকিস্তান দেশরক্ষা আইনে গ্রেফতার করে কারাগারে অন্তরীণ করা হয়। এটা কারো কারো মনে থাকার কথা যে ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের সময় একমাত্র মুজিবই ভারতের বিরুদ্ধে কোন বিবৃতি প্রদান করার দাবী সরাসরি প্রত্যাখান করেন। অনেকেরই এটা বিস্মৃত হবার কথা নয় যে মুজিব বরং সে সময় পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন ঘোষণার জন্য গভর্ণর মোনায়েম খানের নিকট দাবী জানান।

আগরতলা ষড়যন্ত্র ছিল একটি সত্যি ঘটনা

কুখ্যাত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা- যাকে মুজিব ষাট এর দশকের ‘ইসলামাবাদ ষড়যন্ত্র’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর আগরতলা ষড়যন্ত্রের সাথে সেই মুজিব নিজের সম্পৃক্তির কথা সব স্বীকার করে সে মামলার প্রতিপাদ্যকে সত্যি বলে প্রতিভাত করেছিলেন। সে স্বীকারোক্তি ছিল মুজিবের ভন্ডামীপূর্ণ রাজনীতির পরিচায়ক। এ ছাড়াও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় মুজিবের প্রধান আইনজীবি জনাব আবদুল সালাম খান মামলা প্রত্যাহারের পর ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মন্ত্রী প্রফেসার জি. ডব্লিউ চৌধুরীর নিকট বলেছিলেন যে তার (সালাম খান) কোন সন্দেহ নেই যে মুজিব ভারতের যোগসাজশে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র অনেক আগ থেকেই করে আসছিলেন।

আওয়ামী লীগের এমপি আবদুর রাজ্জাকও স্বীকার করেছেন যে সে (রাজ্জাক) ও শেখ মুজিব তাদের দলের প্রাক্তন এমপি চিত্ত রঞ্জন সুতার সহ ১৯৬৯ সালে ভারতে গিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানকে ভারতের সাহায্যে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে। উল্লেখ্য উক্ত চিত্ত রঞ্জন সুতার ১৯৭৫ সালে মুজিব কর্তৃক একনায়কতান্ত্রিক একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পর ভারতে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যায়। চিত্ত রঞ্জন সুতার ১৯৭১ সালের ঘটনা প্রবাহের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশকে ভারতের সাথে একীভূত করতে ব্যার্থ হওয়ায় ভারতে বসে হিন্দুদের জন্য পৃথক বঙ্গভূমি প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী এই সুতার কেবল ১৯৬৯ সালে লন্ডনে বসে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে ভারতীয় মদদই সংগঠন করেনি; সে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর পরই দিল্লীতে তদানীন্তন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাত করে বাংলাদেশকে ভারতের একটি প্রদেশে পরিণত করার প্রয়োজনীয় সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণেরও আবদার জানান।

অবশ্য প্রাপ্ত তথ্য মতে, ইন্দিরা তার সে প্রস্তাবে রাজী হননি অন্তত সে সময়ের জন্যে; কেননা সে সময়ের জন্য আন্ত ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ভারতের অনুকূলে ছিলনা। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা যে ভিত্তিহীন ছিলনা এটা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা’র কর্মকর্তা জ্যোতি সেন গুপ্তের নিজ ভাষ্যতেই স্পষ্ট। তিনি বলেছেনঃ পূর্ব পাকিস্তানে একটা বিদ্রোহ সংগঠনের তৎপরতা দূর থেকে দেখার একজন স্বাক্ষী হিসেবে এটা আমি বলতে চাই যে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা উক্ত বিদ্রোহ সংগঠনের সে সূত্রগুলো বের করতে পারেনি যেগুলো মোটেই মিথ্যা ও জাল ছিলনা। [জ্যোতি সেন গুপ্তের পূর্বে উল্লেখিত বই, পৃ: ১৯৮]

১৯৬৯ সালে গোলটেবিল বৈঠক ব্যার্থ হবার পর সেই সময়কার পাক সেনা প্রধান জেনারেল ইয়াহিয়ার সাথে মুজিবের দহরম-মহরম জমে উঠে। ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে পাকিস্তানে পুনরায় সামরিক শাসন জারীর ফলে ১৯৫৬ সালের শাসনতন্ত্র পুনপ্রবর্তন রুদ্ধ হয়ে যায় (সরদার এম চৌধুরী রচিত দি আল্টিমেট ক্রাইম : উইটনেস টু পাওয়ার গেম লাহোর ১৯৯৭/১৯৯৯ পৃ: ৯৮ দ্রষ্টব্য)। ইয়াহিয়ার সাথে মুজিবের সুসম্পর্ক ছিল নিতান্তই তাৎপর্যময়; যার ফলে ১৯৭০ এর নির্বাচনের পর ইয়াহিয়া প্রকাশ্যে মুজিবকে পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন। বস্তুতঃ মুজিব ইয়াহিয়া দহরম-মহরম না থাকলে এবং প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের নেতৃত্ব ১৯৫৬ সালের সংবিধানের পুনঃপ্রবর্তন হলে আর ১৯৬৯ সনের সেনা শাসন জারী না হলে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার নোংরা রাজনীতির কোন সুযোগই কারও জন্য ঘটতো না।

ষড়যন্ত্রের সাথে আরো কিছু লোকের যোগসাজস

বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার সাথে আরো কিছু লোকের যোগসাজস ছিল এটা অনেকেই সুবিদিত। এর মধ্যে একজন ছিলেন পাকিস্তান নৌবাহিনীর লেঃ কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, যার স্ত্রী সম্প্রতি প্রকাশ্যে এক বিবৃতিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার সাথে তার স্বামীর পরিপূর্ণভাবে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।

বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকান্ডের সাথে কর্ণেল ওসমানীর জড়িত থাকার কথাও জানা যায়। কর্ণেল ওসমানী ছিলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি অত্যন্ত নাখোশ; কেননা তার অভিযোগ ছিল কর্ণেল এর উপরে তাকে আর কোন পদোন্নতি দেয়া হয়নি। কিন্তু এই সম্পর্কিত প্রকৃত কাহিনী হচ্ছে ভিন্নতর। এই ওসমানী পেশাগতভাবে ছিলেন অত্যন্ত অদক্ষ অফিসার। ১৯৪৮ সালে কাশ্মীর যুদ্ধের সময় এই ওসমানীই ছিলেন একমাত্র পাকিস্তানী অফিসার যিনি যুদ্ধের ময়দানে অদক্ষতার কারণে ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক বন্দী হন। শুধু তাই নয় বন্দী অবস্থায় তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত অমায়িক ব্যবহারে গলে যান এবং সেই থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার গোপন ভারতীয় কর্মকান্ডে সর্বাত্মক মদদ দান করেন। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস এই ওসমানীকেই ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর রেসকোর্সে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হওয়া সত্ত্বেও আত্মসমর্পণ দলিলের একজন স্বাক্ষরদাতা হিসেবে অন্তর্ভূক্তির জন্যে ডাকা হয়নি। শুধু তাই নয়; তার সাথে এমন ব্যবহার করা হয় যে আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণের জন্যে তাকে অনুমতিও প্রদান করা হয়নি। তাকে ২০০ মাইল দূরে এক নিভৃত স্থানে আটকিয়ে রাখা হয়। একটি সূত্র কর্ণেল ওসমানীর স্বীকারোক্তি উদ্ধৃত করে জানায় যে, ১৯৮৩ সালে লন্ডনে চিকিৎসার জন্যে যাত্রার প্রাক্কালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার তৎপরতার সাথে সক্রিয় থাকার বিষয়টিকে মারাত্মক ভুল ছিল বলে স্বীকার করেন। ততদিনে তার এবং বাংলাদেশের দুর্ভাগ্যক্লিষ্ট মানুষের পক্ষে সে ভুলের প্রায়শ্চিত্র করারও কোন সুযোগ অবশিষ্ট ছিলনা।

বাংলাদেশের জন্মের পর এক দশক ধরে তিনি ভারতকে ঘৃণা জানানোর রাজনৈতিক পদক্ষেপ এর সাথে তার সম্পৃক্তি প্রতিষ্ঠা করেন। এই ঘৃণার অংশ হিসেবে ওসমানী তার এক পোষা কুকুরের নাম ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নামে রেখেছিলেন। কেননা ইন্দিরা পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে তার ভারতীয় সেনাবাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছিলেন।

সিরাজুল আলম খান

বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার ইতিহাস অনেকাংশে অপূর্ণ থেকে যাবে যদি ষাট দশকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা সিরাজুল আলম খান ও তার সহকর্মীদের কার্যকলাপ নিয়ে কিছু আলোকপাত করা না হয়। এই অধ্যায়ের শুরুতে আমি তার সম্পর্কে একটু উল্লেখ করেছি। এই খান কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের কোন খান বংশীয় কেউ নন। তিনি একজন বাঙালি খান, যিনি নোয়াখালীর এক সাদামাটা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। এই খানই ছিলেন বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার প্রধান তাত্ত্বিক। পতিত স্বৈরাচার এরশাদের সময় সংসদের বিরোধী দলের নেতা আ.স.ম আবদুর রবও সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে, তিনি ১৯৬০ সালেই একজন স্কুলের ছাত্র হিসেবে জনাব খানের তত্ত্বমতে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। [মাসিক নতুন সফর, ঢাকা, আগষ্ট, ১৯৯৫ পৃ: ৮]

তারা গোপনে ছাত্র সমাজের মধ্যে একটি বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ সংগঠিত করে। পরবর্তীতে খানের পরামর্শ ও উপদেশে একাত্তরের বিচ্ছিন্নবাদী যুদ্ধের সময় তাদেরকে দিয়ে বাংলাদেশ লিবারেশান ফোর্স (বিএলএফ) নামে পৃথক একটি সশস্ত্র গ্রুপের সৃষ্টি করা হয়। আবদুর রাজ্জাক ছিল বিএলএফ-এর প্রধান। তবে জনাব সিরাজুল আলম খান লম্বা সময় ধরেই ভারতে ভারত সরকারের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের পৃষ্টপোষকতায় গোপন তৎপরতায় লিপ্তু থাকে। ১৯৭৫-৯৫ সনের মধ্যে আমার সাথে বার কয়েক সিরাজুল আলম খানের দেখা ও কথা হয়েছিল। একটি বৈঠকে সিরাজুল আলম খান আমাকে বলেন, ‘আমার জীবনের সবচাইতে বড় স্বপ্ন ছিল পাকিস্তান ভাঙা। আমার সে স্বপ্ন পুরণ হয়েছে এবং সে জন্য আমি অনেক খুশী।’ কিছুদিন আগে তার একটি নতুন বিবৃতি পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। এতে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব ভারতের পূর্বাঞ্চলসমূহে বাস্তবায়নের দাবী জানান। অর্থাৎ বাংলাদেশ ও ভারতের পূর্বাঞ্চলীর রাজ্যসমূহ মিলে একটা পৃথক স্বাধীন দেশের গোড়াপত্তন করা। বস্তুতঃ এই দাবী তার দেশদ্রোহী তৎপরতার নতুন আর এক অধ্যায়েরই নামান্তর। বেগম জিয়ার বিএনপি সরকার তাকে স্বল্প সময়ের জন্যে কারান্তরালে পাঠিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সে মুক্ত। তার বর্তমান কাজকর্মও অত্যন্ত রহস্যপূর্ণ।

বয়সে ষাট এর মাঝা-মাঝিতে উপনীত এই সিরাজুল আলম খান দেখতে অত্যন্ত রুগ্ন এবং আসনে-বসনে একজন হিন্দু সাধুর মত। দু’একজন তরুণকে সাথে নিয়ে একটা লাঠির উপর ভর করে তিনি এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়ান। আমি তাকে ‘৯৫ সনে ঢাকা শহরে কোন এক জায়গায় এইভাবে চলাচল করতে দেখি। প্রায়শই সে আমেরিকা, ইউরোপ ও ভারত সফর করে থাকে। জনাব খানের এক বন্ধু যিনি ৫০ এর দশকের মাঝামাঝি সময়কার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা ছিলেন এবং সত্তর দশক থেকে লন্ডনের স্থায়ী বাসিন্দা; তার থেকে শুনেছি যে একবার সিরাজুল আলম খান তার লন্ডনের বাসায় বেড়াতে গেলে তার সে বন্ধু বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকান্ডের প্রতি তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করে সিরাজুল আলম খানকে বাসা থেকে বের করে দেয়।

চিত্ত রঞ্জন সুতার সম্পর্কে আরো কিছু কথা

চিত্ত রঞ্জন সুতার সম্পর্কে কিছু কথা আগে বলেছি। আওয়ামী লীগের নেতা বাকশালের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাকের স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য যা প্রথমে ১৯৮৭ সালের সাপ্তাহিক মেঘনায় প্রকাশিত হয়; যা পরে ১৯৯৫ সালের মাসিক নতুন সফরে পুনঃপ্রকাশিত হয় তাতে বলা হয় যে, নিম্নবর্ণের হিন্দু চিত্ত রঞ্জন সুতার ছিল ভারতের সাথে সংযোগ প্রতিষ্ঠা ও রক্ষায় মুজিবের কন্টাক্টম্যান। সুতার বাবু ১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকেটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। একই সাথে তার আবাসস্থল ছিল পূর্ব পাকিস্তান ও কলকাতায়। এই সুতার বাবু কলকাতাতেই ১৯৭৫ সন থেকে স্থায়ীভাবে আছেন এবং বাংলাদেশ বিরোধী সর্বধরণের অপতৎপরতার সাথে জড়িত রয়েছেন। বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ এলাকা নিয়ে দাবীকৃত তথাকথিত ‘স্বাধীন বঙ্গভূমি’ আন্দোলন তারই মস্তিস্ক প্রসুত। [এম, টি, হোসেন ‘বঙ্গভূমি’ দি উইকলী ফ্রাইডে, লন্ডন, সেপ্টেম্বর ১, ১৯৮৯ইং] উল্লেখ্য যে শেখ মুজিবের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে ১৯৭৭ সালের ১৫ই আগস্ট কলকাতায় আয়োজিত এক সভায় এই বঙ্গভূমি আন্দোলনের সূচনা করা হয়। আরো উল্লেখ্য যে, সে সমাবেশে সেই সময় ভারতে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর প্রত্যক্ষ পক্ষপুটে অবস্থানকারী মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা ওয়াজেদও উপস্থিত ছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের প্রায় সকলেই এই সুতার বাবুর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন যেহেতু তিনি ছিলেন পাকিস্তান আমলে তাদের নেতা মুজিবের সাথে ভারতের সংযোগ রক্ষাকারী ব্যক্তি। বঙ্গভূমি আন্দোলনের সামরিক শাখা বঙ্গসেনার কার্যকলাপও কলকাতা কেন্দ্রিক যদিও এদের কিছু তৎপরতা গোপনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নিয়মিতভাবে চলছে। সুতার বাবু সময়ে কালিনাথ বৈদ্য সহ ইত্যকার অনেক ছদ্মনাম ধারণ করে থাকে। মাঝে মাঝেই তারা বিভিন্ন লিফলেট, পুস্তিকা প্রকাশ করে থাকে। তবে এটা স্পষ্ট নয় যে এদের সাথে পশ্চিম বাংলার সাথে বাংলাদেশকে মিলিয়ে অবিভক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠার চক্রান্তকারীদের সাথে কোন যোগাযোগ আছে কিনা। তবে সুতার বাবুর সাথে এদের যোগাযোগ থাকুক বা নাই থাকুক বৃহত্তর বাংলা গঠন ও বঙ্গভূমির দাবী একই মুদ্রার এই পিঠ ও ঐ পিঠ বই আর কিছুই নয়। ভারতীয় কংগ্রেস ও শাসক শ্রেণীর জন্য এই সব অপতৎপরতা তাদের দৃষ্টিতে ভারতপন্থীদের রাজনৈতিক অগ্রগতি বলে বিবেচ্য হতে পারে; কিন্তু দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীদের বিবেচনায় এই সব অপতৎপরতা ভূয়া বই আর কিছুই নয়। দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীরা যে কোন মূল্যে সাম্রাজ্যবাদী ও ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতের আগ্রাসন থেকে তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে। এটা নিশ্চিত দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীদের কারুরই এই সুতার বৈদ্যনাথ বাবুদের ভারতপন্থী বঙ্গভূমি আন্দোলন কিংবা বৃহত্তর অথবা যুক্তবাংলা গঠণের অপতৎপরতাকারীদের প্রতি বিন্দুমাত্র সমর্থনও নেই।

আ স ম রব
এটা অনেকেই জানেন যে জনাব সিরাজুল আলম খানের অন্যতম তল্পীবাহী আ স ম রব ছিলেন পাকিস্তানের সংহতি রক্ষায় মুজিব-ইয়াহিয়ার মধ্যকার সম্ভাব্য ন্যুনতম সমঝোতা প্রতিষ্ঠার প্রয়াসকে ব্যার্থ করার অন্যতম রূপকার; যে আওয়ামী লীগকে দিয়ে তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সর্বাত্মক কৌশল নির্ণয় ও তা বাস্তবায়ন করেন। বিশ্বস্ত সূত্রে মতে, ১৯৭১ সালের ২০ শে মার্চ পর্যন্ত মুজিব-ইয়াহিয়া সমঝোতা প্রায় নিশ্চিতই ছিল। কিন্তু এক পর্যায়ে তার ছাত্র ও যুব নেতারা মুজিবের প্রতি রুষ্ট হয়ে তার থেকে কিছুটা দূরে সরে গেলে মুজিব অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েন। কারণ এদের সমর্থন ছাড়া তার রাজনীতিতে টিকে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল বিধায় তিনি তাদের কথামত চলার নীতি অবলম্বন করে ইয়াহিয়ার সাথে সমঝোতার পথ থেকে দূরে সরে গেলেন। এক পর্যায়ে তিনি সমঝোতার ব্যাপারে অনেকটাই চুপচাপ হয়ে গেলেন। এমনিতর পর্যায়ে ২৩শে মার্চ তিনি বাংলাদেশের পতাকা (প্রস্তাবিত) তার গাড়ীতে লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট হাউসে গেলেন- যা ছিল পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতির প্রতি এক চপেটাঘাত। [হাসান জহীর, দি সেপারেশান অব ইষ্ট পাকিস্তান, অক্সফোর্ড ইউনিভাসিটি প্রেস, করাচী, ১৯৯৪, এবং ষ্ট্যানলী ওলপার্ট, জুলফী ভুট্রো অব পাকিস্তান; হিজ লাইফ এন্ড টাইমস, অক্সফোর্ড ইউনিভাসিটি প্রেস, দিল্লী, ১৯৯৩]

আর ২৩শে মার্চ ছিল পাকিস্তান দিবস। যাই হোক, মুজিবের ইতিমধ্যকার চুপচাপ অবস্থা ছিল সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এক বিশ্লেষণ মতে মুজিব কথাবার্তা একেবারেই বন্ধ করতে চেয়েছিলেন, না অন্য কোন মতলবে চুপচাপ ছিলেন তা বোধগম্য করা দুস্কর। তবে একটা বিশ্লেষণ মোটামোটি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করা হয়। সম্ভবত মুজিব ঐ সময়টার মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদ নাকি পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি- এই প্রশ্নে তার ভূমিকা নির্ধারণে দ্বিধাদ্বন্দ্বে নিমজ্জিত ছিলেন। এক বিশ্লেষণ মতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সামনে মুজিব ছিলেন অসহায় যার দরুণ ২৫-২৬ শে মার্চ রাতে তিনি স্বেচ্ছাপ্রণোদিতভাবেই পাকিস্তানের ফেডারেল আর্মির নিকট আত্ম সমর্পণ করেন; যাতে করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহ দমন করতে পারে। আর একটি বিশ্লেষণ মতে মুজিব চেয়েছিলেন উভয় রাস্তাই খোলা রাখতে এবং অবশেষে তাদের সাথেই থাকতে যারা সংঘাতে জয়ী হবে। তেমনি করে সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে পূর্ব পাকিস্তানের পতন হবার পর মুজিব পাকিস্তান থেকে মুক্ত হয়ে বিচ্চিন্নতাবাদীদের সাথেই হাত মিলান। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ইয়াহিয়ার সাথে আলাপ আলোচনা চালানোর পিছনে মুজিবের মনে যে উদ্দেশ্যই থাকুক, এক পর্যায়ে তথা ২০শে মার্চের পর তাঁর চুপচাপ অবস্থা দৃশ্যপটে আনয়ন করে জনাব তাজউদ্দিনকে। অথবা বলা যায় মুজিবের চুপচাপ বা সিদ্ধান্তহীন অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে জনাব তাজউদ্দিন। জনাব তাজউদ্দিন ছিলেন অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও ধূর্ত চরিত্রের মানুষ এবং ছিলেন মুজিবের চাইতে অনেক বেশী চালাক। সম্ভবত মুজিব সে বিবেচনাতেই পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার বাকী কাজগুলো সম্পন্ন করার দায়িত্ব তাকে প্রদান করেন। এটার প্রমাণ হচ্ছে মুজিব ২৫-২৬ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করলেও তাজউদ্দিন পালিয়ে যায় ভারতে এবং তার প্রধানমন্ত্রীত্বে সেখানে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে গঠিত হয় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। বস্তুতঃ স্বাধীনতা সরাসরি ঘোষণা করার ক্ষেত্রে মুজিব ও তাজউদ্দিনের দ্বিধা-সংশয় পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার চিন্তা থেকে ছিল না; বরং সে দ্বিধা ছিল নিজেদের জীবন রক্ষা করার চিন্তা থেকে। কেননা, স্বাধীনতা প্রকাশ্যে ঘোষণা করলে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা প্রতিহত করতে সেনা অভিযানে তাদের জীবনহানী ঘটতো। [মাসিক নতুন সফর, সেপ্টেম্বর ১৯৯৫- ১৯৮৭ সালে সাপ্তাহিক মেঘনায় প্রকাশিত আবদুর রাজ্জাকের সাক্ষাতকার থেকে উদ্ধৃত।]

জনগণ বিচ্ছিন্নতাবাদ চায়নি
পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ কোন অবস্থাতেই বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিলনা; তারা পাকিস্তানকে ভাঙ্গবার জন্যে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়নি। এটা তাজউদ্দিন এবং মুজিব জানতো বিধায় তারা কখনও রাজনৈতিক বাগাড়াম্বরীতা দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদের সাথে তাদের সংশ্লিষ্টতার কথা সাধারণ্যে প্রকাশ করেনি; কেননা তারা এটা ভালভাবেই অনুমান করেছিল যে জনগণ তাদের মূল লক্ষ্যের কথা জানতে পারলে তারা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতো। অথচ তারা ছিল মনেপ্রাণে বিচ্ছিন্নতাবাদী। আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি যে তাজউদ্দিনের একজন প্রতিনিধি ১৯৭১ সালে লন্ডনে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার একটি সম্ভাবনাময় সমঝোতার প্রয়াসকে ভন্ডুল করে দেয়। প্রসঙ্গত পাকিস্তানের সেই সময়কার নামজাদা সাংবাদিক ও এক সময়ের কুটনৈতিক কতুবুদ্দিন আজিজের একটি লেখা প্রণিধানযোগ্য। জনাব আজিজ ওয়াশিংটন কেন্দ্রিক একাত্তরের কুটনৈতিক তৎপরতার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন। নিক্সন প্রশাসন কর্তৃক সেই সময় গৃহীত একটি কুটনৈতিক তৎপরতা সম্পর্কে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞান বর্ণনা করতে গিয়ে জনাব আজিজ লিখেনঃ সেই সময় ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর আমেরিকা সফরের সময় প্রেসিডেন্ট নিক্সন তাকে (ইন্দিরা) বলেছিলেন যে পূর্ব পাকিস্তানের সংঘাত-এর একটি শান্তিপূর্ণ মীমাংসার জন্যে তার কিছুটা সময় দরকার এবং ইন্দিরাকে তিনি উপমহাদেশে নতুন করে যেন কোন যুদ্ধের সূত্রপাত না করা হয় তার জন্যে অনুরোধ করেন। জনাব আজিজের লেখায় আরো উল্লেখ করা হয় যে, নভেম্বরের ৫ তারিখে (১৯৭১ সাল) ওয়াশিংটন ন্যাশনাল প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক মধ্যহ্ন ভোজ সভায় প্রদত্ত ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী (আমি সেই সময় ইন্দিরা ও হেনরী কিসিঞ্জার উভয়ের সাথেই সাক্ষাত করি) অত্যন্ত অতি ধীর ও শান্ত কণ্ঠে তার শঠতাপূর্ণ বক্তব্যে জানান যে, ‘পাকিস্তানের কোন এলাকা অথবা পূর্ব বাংলার সাথে ভারতের কোনই বিরোধীতা বা ঝগড়া নেই’। প্রেসিডেন্ট নিক্সনের লেখা বই মেমোয়েরস থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে আজিজ লিখেছেনঃ প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে ইন্দিরা বস্তুতঃ বোকা বানিয়ে রেখেছিল এমন একটি ধারণা দিয়ে যে, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সে কোন সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবেনা। ইন্দিরা যখন নিজে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হচ্ছিলেন এবং সে কাজে তার জেনারেলরা দিল্লীতে বসে সোভিয়েত ইউনিয়নের চার জেনারেলের সহায়তায় সমরনীতি চূড়ান্ত করছিলেন; সে সময় নিক্সনকে তিনি (ইন্দিরা) এটা ঝুঝাতে সক্ষম হন যে, পাকিস্তানের ঐক্য ও অস্তিত্ব ধ্বংসে তাঁর (ইন্দিরা) কোন ইচ্ছাই নেই। [কুতুবুদ্দীন আজিজ, এক্সসাইটিং ষ্টোরিজ টু রিমেম্বার, দি ইসলামিক মিডিয়া কর্পোরেশন, করাচী ১৯৯৫]

আমি অত্যন্ত বিশ্বস্ত একটি সূত্রে জানি যে, ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে লন্ডনে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মেয়ে বেগম আখতার সোলায়মানের মধ্যস্থতায় পূর্ব পাকিস্তান সংকটে জড়িত বিদ্যমান পক্ষ সমূহের মধ্য একটা সমঝোতার প্রয়াস নেয়া হয়। সে সমঝোতা বৈঠকে অংশগ্রহণকারী একজন ছিলেন আমার এক বন্ধু। উক্ত বৈঠকের আলোচনার বিষয়াদি শুনে আমার এই বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে তাজ উদ্দিন ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের যৌথ সমর্থনে পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতা ঠেকাতে ইসলামাবাদের সাথে সকল ধরণের সমঝোতার কঠোর বিরোধী ছিলেন। তাজউদ্দিনের সাথে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং কলকাতায় তার সন্নিধ্যে থাকা আওয়ামী লীগের প্রাক্তন এমপি জনাব এম এ মোহাইমেন তার এক বইতে এই মর্মে তাঁরই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছেন যে, ‘ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানের কাঠামোয় কোন ধরণের সমঝোতা হবার প্রয়াস-এর মারাত্মক বিরোধী ছিল ভারত এবং এই জন্যে তারা প্রবাসী সরকারকে নানারূপ হুমকিও প্রদান করে’। [এম,এ, মোহাইমেন, ঢাকা-আগরতলা-মুজিবনগর, পাইওনিয়ার পাবলিকেশানস, ঢাকা, ১৯৮৯]

মুজিবের বিচ্ছিন্নতাবাদী ভূমিকা সম্পর্কে নতুন করে তথ্য প্রমাণের তেমন দরকার নেই। মুজিব বিচ্ছিন্নতাবাদী না হলে ১০ই ডিসেম্বর পর সে দেশে ফিরে এসে পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় দখলদারিত্বের বিরোধীতা করে তার বন্ধু এ কে ব্রোহীর নিকট তার বর্ণিত পাকিস্তান রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে পারতেন। কেননা মুজিব ব্রোহীকে বলেছেন যে, তিনি পাকিস্তান ভাঙ্গতে চাননি। ব্রোহী আরো জানান যে, ১৯৭১ সালের শেষে দিকে ভারত যখন পূর্ব পাকিস্তান আক্রমণ করে তখন নাকি মুজিব তাঁকে পাকিস্তান টেলিভিশনে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে ভারতীয় আগ্রাসন প্রতিরোধের আহবান জানানোর অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন। তার এই অভিপ্রায়ের কথা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসনিক জেনারেল ইয়াহিয়ার নিকট প্রেরণ করা হয়েছিল।

কিন্তু মুজিবের সে অভিপ্রায়কে কোন গুরুত্ব প্রদান করেনি পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ (ইমপেক্ট ইন্টারন্যাশনাল লন্ডন, ২৮ সেপ্টেম্বর-৮ অক্টোবর ১৯৮৭ সংখ্যা পৃষ্টা ১৯ দ্রষ্টব্য)। ১৯৭১ সনের পূর্বে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে মুজিব সব ধরণের অভিযোগ অস্বীকার করলেও বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার সাথে তার সম্পৃক্তির বহু প্রমান রয়েছে। জনাব মুজিবের সমসাময়িক রাজনীতিক জনাব অলি আহাদ-তার জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫-৭৫ বইতে লিখেছেন মুজিবের নিকট ক্ষমতা তথা নিরঙ্কুশ রাষ্ট্রক্ষমতা ছিল মুখ্য; এবং এই লক্ষ্য হাসিলে যত ধরণের ফন্দি-ফিকির করা যায়; যত মূল্যই তার জন্য যোগান দেয়া দরকার মুজিব তার সবকিছু করতেই অভ্যস্থ ছিল। ক্ষমতা করায়ত্ত করার জন্যে মুজিবের সর্বধরণের সুযোগ সন্ধানী পদক্ষেপের প্রেক্ষিতেই ভারত মুসলমানদের বিরুদ্ধে সহস্র বছরের প্রতিশোধ গ্রহণ করে; আর এই সুবাদে মুজিব যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদ দূরত্বে পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী কারগারে তার ব্যয়বহুল এরিনমোর তামাকের পাইপ মুখে দিয়ে রাজসিকভাবে জীবন যাপন করেন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধ জয়ের পর মুজিবকে বিচ্ছিন্ন পূর্ব পাকিস্তানের রাজমুকুট পরানো হলেও একটি স্বাধীন দেশের নেতা হিসেবে তিনি ভারতকে মোকাবেলা করার সৎসাহস বা নৈতিক শক্তি দেখাতে পারেনি ; বরং ভারতের একজন পুতুল হিসেবেই নিজকে প্রমাণ করেন। মুজিবের সে নৈতিক বল না থাকার কারণ হচ্ছে তার বিচ্ছিন্নতাবাদী ভূমিকা। আর তিনি জানতেন যে ভারতের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে পিছনে জনসমর্থনের যে শক্তি থাকতে হয় তা তার নেই। কেননা জনগণ তাকে ১৯৭০ এর নির্বাচনে ভোট দিয়েছিল আর যাই হোক অন্তত দেশকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নয়।

ভারতকে পুনঃএকত্রীকরণের লক্ষ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের পুতুল হিসেবে দায়িত্ব পালন

উপরেউল্লেখিত ঘটনা প্রবাহ থেকে এটা সহজেই অনুমেয় যে মুজিব ও তার সকল সাঙ্গাত পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ভারতের নোংরা কৌশলের খেলায় পুতুল হিসেবে কাজ করেছে। এই নোংরা কৌশলের চূড়ান্ত হিসাব-কিতাবে কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারতের কোন আগ্রহ নেই ; বরং তাদের অখন্ড ভারতের লালিত স্বপ্নের সন্নিবেশন রয়েছে, যা মুসলমানদের নিগ্রহের মাধ্যমেই অর্জন সম্ভব বলে তারা মনে করে। এ কারণেই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বাংলাদেশকে প্রথমে ২৫ বছর মেয়াদী এক দাসত্ব চুক্তিতে আবদ্ধ করা এবং পরবর্তীতে ফারাক্কা সহ বাংলাদেশের প্রায় সকল নদীর উজানে বিভিন্ন স্থানে বাঁধ-গ্রোয়েন নির্মাণ করে বাংলাদেশের জীবন ব্যবস্থাকে নানাবিধভাবে বিপদাপন্ন করে রাখা হয়। ভারতের পরবর্তী পদক্ষেপ হচ্ছে পুরো বাংলাদেশকে বৃহত্তর ভারতের অঙ্গীভূত করা। এটাই ছিল ৪৭ পূর্ব সময়ে ভারতীয় রাজনীতিবীদদের ইচ্ছা-যা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের আশা-আকাংখার বিরোধী। অবস্থা দৃষ্টে এটা সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, বস্তুত বাংলাদেশ হচ্ছে ভারতীয়করণের ট্রানজিট পর্যায়। ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা ও লেখক বলরাজ মাধক প্রদত্ত ভারতীয়করণের সংজ্ঞা সম্পর্কে অনেকে হয়তো অবহিত। বলরাজ বলেছেন, ভারতীয়করণ হচ্ছে ভারতের সকল ধর্ম, বর্ণ, অঞ্চল ও মতবাদ নির্বিশেষে যে কারুরই অখন্ড ভারত বিরোধীতা কিংবা ভারতের সীমান্ত বহির্ভূত যে কোন ধরণের আনুগত্যকে তথা দ্বিজাতিতত্ত্বের সকল সূত্রকে ধ্বংস করে দেয়া। [বলরাজ মোধক, ইন্ডিয়ানাইজেশান, এস, চান্দ এন্ড কোঃ (প্রাইভেট) লিমিটেড, দিল্লী, ১৯৭০, পৃ: ১০২]

এই সংজ্ঞাই সকল ভারতীয়ের জন্য সার্বজনীন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এমনিতর সংজ্ঞায় বিশ্বাসী ভারত কোন বিবেচনায় ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদকে সমর্থন করলো-যে বিচ্ছিন্নতাবাদের ভিত্তি ছিল আঞ্চলিকতাবাদ ও ভাষা ? কেননা তারা কি এটা ভাবেনি যে এই ভিত্তি কোন এক সময় ভারতের ঐক্যকেও বিনষ্ট করতে পারে ? এমন ধরণের বিশ্লেষণ এবং মূল্যায়ন ১৯৭১ সালে ইন্দিরা সরকার যে করেনি তা নয়; তারা তা করেও বিচ্ছিন্নতাবাদকে সমর্থন করেছে এই বিবেচনায় যে বাংলাদেশ দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সময়ে দূর্বলরূপ পরিগ্রহ করবে এবং তা থেকে বাঁচার জন্যে বাংলাদেশ এক সময় ভারতীয় ইউনিয়নে প্রত্যবর্তন করবে। ১৯৪৭ সালে এমন ভবিষ্যতবাণীই করেছিল প্যাটেল, নেহেরু, শ্যামা প্রসাদ সহ ভারতীয় নেতারা। ভারতের সর্বশেষ বৃটিশ বড়লাট মাউন্টবেটেনের ব্যক্তিগত সচিব হডসন লিখেছেন, দেশ বিভাগের মধ্য দিয়ে এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে যার দরুণ কয় বছরের মধ্যেই পূর্ব বাংলা ভারত এর সাথে মিশে যাবে। [এইচ, বি, হর্ডসন, দি গ্রেট ডিভাইডঃ বৃটেন-ইন্ডিয়া-পাকিস্তান, হাচসিনসন, লন্ডন, ১৯৬৯ পৃ: ২৭৬]

জাওয়াহারলাল নেহেরু ১৯৪৭ সালের ২৩ শে মে তার কংগ্রেসী সহকর্মী কুমিল্লার আশরাফ উদ্দিন চৌধুরীকে লেখা একটি পত্রে অনুরূপ আশাবাদই ব্যক্ত করেন। এ সময় ভারতের ষ্টেটসম্যান পত্রিকায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী বলেন ‘আমরা অনেকটা জবরদস্তিকমূলকভাবে বাংলা বিভাগ মেনে নিচ্ছি। কিন্তু এটা আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস যে এটা সাময়িক; আমরা অবশ্য অখন্ড ভারত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অভিভক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠা জন্য কাজ করে যাবো’। [মতিউর রহমান, বাংলাদেশ টুডে, এন ইনডিক্টমেন্ট এন্ড ও লেমেন্ট, নিউজ এন্ড মিডিয়া লিঃ লন্ডন, ১৯৭৮ পৃ: ১৫৩] অর্থাৎ বিচ্ছিন্নতাবাদীরা ভারতীয় ষড়যন্ত্রকারীদের হাতের পুতুলে পরিণত হয় যে ষড়যন্ত্রকারীরা ১৯৪৭-এর পর থেকেই পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চক্রান্ত লিপ্ত ছিল।

বিচ্ছিন্নতাবাদ ও শেখ মুজিবের ৬-দফা স্বায়ত্বশাসনের দাবী

শেখ মুজিবের স্বায়ত্বশাসনের ৬-দফা দাবীর স্থপতি কে-- আওয়ামী লীগে এ নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের কোটায় এক সময়ের পাকিস্তান বৈদেশিক সার্ভিস (পিএফএস) এর কর্মকর্তা জনাব রুহুল কুদ্দুস নিজেকে ৬-দফা দাবীর ব মূল প্রণেতা হিসেবে দাবী করেন। [মাসুদুল হক, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ‘র’ এবং সিআইএ’র ভূমিকা ওসমানী লাইব্রেরী, ঢাকা ১৯৯০, পৃ: ১৬৯]
তবে তিনি এই মর্মে দুঃখ প্রকাশ করেন যে মুজিব তাঁর জীবদ্দশায় কখনও তার (রুহুল কুদ্দুস) এতদসম্পর্কিত ভূমিকা স্বীকার করেনি; বরং ৬-দফার একচ্ছত্র পরিকল্পক ও রূপকার হিসেবে সে (মুজিব) নিজকেই কেবল জাহির করেছে। স্বায়ত্বশাসনের ৬-দফা কর্মসূচীর স্থপতি যেই হোক না কেন-এটা সত্যি যে ৬-দফা আন্দোলনই পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার বীজ রোপন করে। এটা করা হয় খুব ধূর্ততার সাথে; কেননা জনগণ উক্ত কর্মসূচীর নিগলিতার্থ বুঝতে পারলে কিছুতেই চূড়ান্ত অর্থে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের জালে তারা নিজেদের জড়াতোনা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও এটা কোন ইস্যু ছিলনা। উপরন্তু মজিব বরাবরই বলতেন যে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার কোন উদ্যোগ তিনি সমর্থন করেননা; বরং তিনি শক্তিশালী পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় বিশ্বাসী এবং এই লক্ষ্যেই তিনি কাজ করে যাবেন। পাকিস্তানকে শক্তিশালী করার এই ওয়াদা ছিল মুজিবের প্রকাশ্যে, একান্তে, তার সাথে সাক্ষাতকারী এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক নেতার নিকট। আমি জানি যে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতা খান, এ, সবুর ও পশ্চিম পাকিস্তানের ন্যাপ নেতা ওয়ালী খানকেও তাঁর (মুজিব) প্রদত্ত এই ওয়াদার কথা পূর্বে উল্লেখ করেছি। [১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় মুসলিম লীগ নেতা খান, এ, সবুর ও পশ্চিম পাকিস্তানের ন্যাপ নেতা ওয়ালী খানের সাথে অনুষ্ঠিত একান্ত আলাপচারীতায় শেখ মুজিব যে কোন মূল্যে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার ওয়াদা করেছিলেন। ১৯৭৩ সালে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তনকারী একজনকে এই মর্মে একনিষ্টভাবে বলেছিলেন যে তিনি যেন শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাত করে তার উক্ত ওয়াদার কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং মুজিবকে এটাও স্মরণ করিয়ে দিতে বলেন যে, চল্লিশের দশকে ওয়ালী খানের পিতা যখন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধীতা করেছিলেন তখন মুজিব তার পিতাকে অত্যন্ত নিন্দনীয় ভাষায় কঠোর সমালোচনা করে যার মধ্য দিয়ে এটা স্পষ্টতই প্রমাণিত হয় যে মুজিব ছিল একজন সাচ্চা দেশপ্রেমিক পাকিস্তানী।]

তবে এটা উল্লেখ না করা অসমীচিন হবে যে, বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতার ক্রীড়নকরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবী অসাবধানতার সাথে মোকাবেলা করার সুযোগকে পরিপূর্ণভাবে কাজে লাগিয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানে জন্ম নেয়া উর্দ্দুভাষী রাজনৈতিক নেতা খাজা নাজিম উদ্দীনের কিছু বেকুবী ও উস্কানীমূলক কথাবার্তা সে অনভিপ্রেত পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রদত্ত বক্তৃতার পর যেখানে প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল; তাকে নতুনভাবে উঠানোর সুযোগ পেল পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৫২ সালের শুরুতে ঢাকায় খাজা নাজিম উদ্দিন আহমেদ যখন উর্দ্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা পুনরায় উল্লেখ করেন। অথচ ততদিনে পূর্ব পাকিস্তানের সরকারী ভাষা হিসেবে বাংলার প্রচলন পূর্ণভাবে চলছিলো যদিও তখনকার ঢাকা ও কলকাতার মুখচেনা কয়টি পত্রিকা বাংলা ভাষার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবার কাল্পনিক ও উদ্দেশ্যেপ্রণোদিত মিথ্যাচার চালিয়ে যাচ্ছিল। বাংলা ভাষার ইস্যুটিকে ঠিকভাবে মোকাবেলা না করতে পারার ব্যার্থতা থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পুরোপুরি ফায়দা উঠায়। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারী সংগঠিত ঘটনা প্রবাহের মধ্যে যারা পুলিশের গুলিতে মারা যায়; প্রকৃত অর্থে ভাষা আন্দোলনের সাথে তাদের ব্যক্তিগত সম্পৃক্তি আদৌ ছিল কিনা এটা বলা দুষ্কর। কিন্তু নিহতদের ভাষা আন্দোলনের শহীদ হিসেবে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ক্রীড়নক ধূর্ত নেতারা জোর প্রচারনা চালায়। একই কায়দায় ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের অবিচক্ষণ সেনা অভিযানের পরও নানারূপ উস্কানীমূলক প্রচারণা চালিয়ে জাতিকে বিভান্ত ও ক্ষুদ্ধ করে তোলে।

সত্যি বটে যে, ২৫ মার্চের সেনা অভিযানের প্রেক্ষিতে অনেক দিকেই পরিস্থিতির অবণতি ঘটেছিল; কিন্তু যে প্রশ্নের আজও কোন সুরাহা হয়নি তা হচ্ছে সেই সেনা অভিযান কি খুব সুচিন্তিত ছিল, নাকি ছিল বিদ্রোহ প্রশমিত করার লক্ষ্যবোধে, নাকি সে সেনা অভিযান ঘটেছিল অনেকটা বাধ্যবাধকতামূলক পরিস্থিতিতে-যে পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে পাকিস্তানের ফেডারেল সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড তথা দেশ ও জনগণের অস্তিত্বের বিরুদ্ধে পরিচালিত আগ্রাসন থেকে। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেয়া হয় যে সেনা অভিযান ছিল বিরাট ভুল; তাহলেও এটা কি কিছুতেই গ্রহণযোগ্য যে জনগণ পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্যে কাকেও কোন ম্যান্ডেট দিয়েছিল ? কারণ এটা অনেকেরই জানার কথা যে, ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্যে এই প্রদেশের অধিবাসীরাই তুলনামূলকভাবে অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে অনেক বেশি নিরঙ্কুশ সমর্থন ও রায় প্রদান করেছিল। এমনকি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্যে উপমহাদেশের মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে একটি সমঝোতায় উপনীত হবার জন্যে ইজমা করা সহ যা কিছুই করেছে তা কারো নিকট তেমন কোন আবেদন সৃষ্টি না করলেও ১৯৭১ সালের বিয়োগান্তক ঘটনার মধ্য দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদ প্রতিষ্ঠার যে অর্জন তাকে আইনানুগ ভিত্তি দেবার জন্যে এই বিচ্ছিন্নতাবাদের উপর একটি গণভোট অনুষ্ঠান করা জরুরি বলে অনেকে মনে করেন। সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশ একটি ডিফ্যেক্টো সত্ত্বা; কিন্তু ১৯৪৬ সালের গণভোটের ফলাফলকে পুরো উল্টে ফেলার জন্য দেশটির আইনানুগ অবস্থান একটি উদ্বেগের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হচ্ছে যদিও পাকিস্তান ১৯৭৪ সালে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। [এই, বি, খায়ের বাংলাদেশঃ দি কোশেচন অব লেজিটেমেসী ইমপ্যাক্ট ইন্টারন্যাশনাল, লন্ডন, ভল্যুয়ম ১৮, জানুয়ারী ৮-২১, ১৯৮৮, পৃ: ১২ এবং এইচ, বি, খায়ের, বাংলাদেশ এ সোর কোশ্চেন, দি কনসেপ্ট, ইসলামবাদ ভলিয়্যুম ৮, নং ২, ফেয়ালী ১৯৮৮ পৃ: ২১-২২, উদ্ধৃত ২টা নিবন্ধেই লেখক গ্রহণযোগ্যভাবে এই মর্মে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন যে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হচ্ছে বস্তুতঃ মুসলিম জাতিত্বের ধারণার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা।] ভারতের শাসক গোষ্ঠীর আদর্শিক ও মানসিক অবস্থান সম্পর্কে যারা সুবিদিত তারা এটা নিশ্চয় জানেন যে, বাংলাদেশ-এর অভ্যুদয়ে কেবল ভারত তৃপ্ত থাকতে পারেনা। ভারতের প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে হজম করা পূর্বক লেন্দুপ দর্জি মার্কা কাকেও দিয়ে সিকিমের মত বাংলাদেশকে গ্রাস করতে। সময়ই বলতে পারে যে ভারত তার উদ্দেশ্য সাধনে লেন্দুপ দর্জি র্মাকা কাকেও শেষাবধি পাবে কিনা।



 

Comments  

 
-2 # 2010-04-19 05:31

I've never seen such a ugly site that corrupts history and truth simutenously. Host of this site need to be punished as they are manipulating our history, which could be dangerous for the new generation. They've no right to manipulate our history. Don't try to show us white part of a black spot,we r nt colour blind

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+2 # 2012-08-11 01:08

I think I am part of that generation what you mentioned here. I am just requesting you very honestly --- "gather much more knowledge before you start commenting to save yourself from becoming a stupid and the new generation from the rubbish history and truth you mentioned above". Try to thing something for, try to thing something for 150 million Bangladeshi. Thanks.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
-3 # 2010-04-19 06:57
কেন এই মিথ্যাচার! কেন অবাঙ্গালীদের জন্য এত কান্না?
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+9 # 2010-04-24 17:14
Honest speaker কি এখনও বুঝেনা ভারতিয় আগ্রাসন। যদি এই ব্যাটা ভারতিয় হয় তাহলে জীবনেও বুঝবে না। আর বাংলাদেশি দেশপ্রেমিক হলে বুঝা উচিৎ। কারণ, ১)ফারাক্কা ২)তিন বিঘা করিডর ৩)বাংলাদেশ ঘিরে ফেনসিডিল কারখানা ৪)কাঁটা তারের বেড়া ৫)ভারত কর্তৃক শান্তি বাহীনি গঠন ৬)BSF দ্বারা বাংলাদেশি খুন ৭)বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার বাজার হিসেবে তৈরি করা ৮)বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ বিরোধি কর্মকান্ড করা ৯)মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো etc
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+1 # 2010-04-25 12:21
প্রথম আলোর পাঠককে ধন্যবাদ যার মাধ্যমে এই সাইটটির খোজ পেয়েছি। অত্র বইটির লেখককে মোবারকবাদ জানাই তার এই সত্য ও তথ্যনির্ভর লেখা উপহার দেবার জন্য।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+11 # 2010-04-28 05:02

I would request readers to think and anylise events, in light of history of last 39 years and make your decision.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
-10 # 2010-06-18 21:48

honest speaker go to hell and take your thoughts with you. You are a coward.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+9 # 2010-07-12 15:50


If someone writes the truth and it is against the belief of the reader, their voice is often negative. I suggest commentators should response from the point of very neutral views.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2010-08-27 12:16
ধন্যবাদ জনাব এম,টি,হোসেনকে। অনেক না বলা ইতিহাস আমাদের জন্য রেখে যাওয়ায়। একদিন সত্যকথা বের হবেই। ষড়যন্ত্রকারীরা চিরদিন বিজয়ী থাকতে পারেনা। আর অনেস্ট স্পীকারের মত সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদীদের জন্য ঘৃণা।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+2 # 2010-09-23 06:26
লেখক মহোদয়কে ধন্যবাদ। তার এই লেখনির মাধ্যমে জাতি অনেক উপকার পাবে।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2012-06-26 08:17
সাহস করে করে সত্য কথা বলাই মানুষের শেষ্ঠত্ব। প্রত্যোক স্থানে প্রচার করো উচিত।
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh