Home EBooks অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের ইতিহাস

eBooks

Latest Comments

বাংলাদেশঃ মারাত্মক অপপ্রচারণা, ষড়যন্ত্র ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকার - অধ্যায় ৩: ১৯৭১ সালের পর থেকে একাত্তরের হত্যাকান্ডের একপেশে কল্পকাহিনী ও মিথ্যাচার PDF Print E-mail
Written by এম, টি, হোসেন   
Friday, 15 November 1996 02:00
Article Index
বাংলাদেশঃ মারাত্মক অপপ্রচারণা, ষড়যন্ত্র ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকার
অধ্যায় ১: তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য সম্পর্কিত অলীক কাহিনী ও স্বায়ত্বশাসনের দাবী প্রসঙ্গ
অধ্যায় ২: ভারতীয় ষড়যন্ত্রের সহায়তায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্জন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশঃ পরবর্তীতে কী?
অধ্যায় ৩: ১৯৭১ সালের পর থেকে একাত্তরের হত্যাকান্ডের একপেশে কল্পকাহিনী ও মিথ্যাচার
অধ্যায় ৪: বাংলাদেশে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও স্বার্থ সংঘাতের গতি-প্রকৃতি
অধ্যায় ৫: একবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় আধিপত্যঃ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উভয় সংকট
All Pages

মিথ্যাচারের পুনরাবৃত্তি

এটা আজ কারো অজানা নয় যে সব মিথ্যাচারের ভিত্তিতে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার মধ্য দিয়ে একাত্তরে অভু্দ্যয় ঘটানো হয় স্বাধীন বাংলাদেশ-এর সে মিথ্যাচারেরই অব্যাহত পুনরাবৃত্তি করে আসা হচ্ছে গত কয়েক দশক ধরে। এমনিতর মিথ্যাচারের একটি অংশ হচ্ছে ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ‘৩০ লক্ষ’ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আরো কৌতুহলউদ্দীপক হচ্ছে পাক বাহিনী কর্তৃক উক্ত সময়ে দুই লক্ষ মহিলার শ্লীলতাহানীর কল্পকাহিনী।

প্রাসঙ্গিকভাবেই কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হয়। কারা ঐ দুইটি পরিসংখ্যান নির্ণয় করেছে ? কৌতুলহলউদ্দীপকভাবে এই প্রশ্ন যে কারুরই মনে উদয় হবার কথা যে কিভাবে ঐ দুইটি সংখ্যাতত্ত্ব একেবারে লক্ষের পূর্ণ সংখ্যায় তথা ৩০ লক্ষ ও দুই লক্ষে নির্ণীত হলো ? নয় মাসের মধ্যে কিভাবে ত্রিশ লক্ষ মানুষকে হত্যা ও দুই লক্ষ মহিলার শ্লীলতাহানী করা হলো ?

বিশ্বাসযোগ্য কোন সংখ্যা আজো নির্ণীত হয়নি

এ পর্যন্ত জানা মতে কেহই ঐ দুইটি সংখ্যাতথ্যে বিশ্বাসযোগ্যভাবে নির্ণয় করতে পারেনি। এমনকি ঐ দুইটি সংখ্যাতথ্যের অনুকূলে কোন সংস্থা আজ অবধি একটি নমুনা জরীপও সম্পন্ন করেনি। যেখানে কোন সরকারি সংস্থা কিংবা স্থানীয় বিদেশী কোন সংস্থা আজ অবধি এই সংখ্যাতথ্যের উপর প্রামাণ্য কোন জরীপ সম্পন্ন করতে পারেনি; সেখানে কিসের ভিত্তিতে ঐ দুইটি সংখ্যাতথ্য নিয়ে প্রচারণা চালিয়ে আসা হচ্ছে ?

কোন প্রামাণ্য বা নির্ভরযোগ্য সূত্র নেই

বর্ণিত সংখ্যাতথ্য দুটির ভিত্তি কি ? যদি কোন বিশ্বাসযোগ্য সূত্র থেকে থাকে সেগুলো কি কি ? যতদূর জানা যায়, যেহেতু উক্ত সংখ্যাতথ্য দুটো শেখ মুজিবর রহমান বলেছেন সে জন্যই তা অতি পবিত্র (!) ও অকাট্য বলে ধরে নেয়া হয়। এই সংখ্যাতথ্য দুটির সত্যাসত্য বিশ্লেষণ করাও যেন কান্ডজ্ঞান সম্পন্ন যে কারুরই জন্য নিষিদ্ধ, এমনকি বর্ণিত সংখ্যাতথ্য দুটির বৈধতা নিয়েও যেন কারো কোন প্রশ্ন উত্থাপন নিষিদ্ধ, এমনকি কখন কি ধরণের পরিবেশ ও প্রেক্ষাপটে শেখ মুজিব ঐ সংখ্যাতথ্য দুটি জাহির করেছেন তার কোন বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করাও যেন যে কারুরই জন্য নিষিদ্ধ! কেন মুজিব ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরার আগেই ঐ সংখ্যাতথ্য দুটি সাধারণ্যে জারী করলেন ?

এটা সবারই জানা যে ১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের নয় মাস পর্যন্ত মুজিব পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালী জেল এ অন্তরীন ছিলেন। অন্তরীন সময়কালে সংবাদ মাধ্যমের সাথে তার কোন যোগাযোগ ছিল না। ফলে সেই সময়ের মধ্যে কোথায় কি ঘটেছে তা তার জানা ছিল না। ২০ শে ডিসেম্বর ভুট্টো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর মুজিবকে ইসলামাবাদে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তাকে আরো ১০/১২ দিন অন্তরীন রাখা হয়। ঐ সময়ের মধ্যেও কোন সূত্র বা মহলের সাথে মুজিবের কোন যোগাযোগ হয়নি। বার কয়েক ভুট্টো সাহেবের সাথে কথাবার্তা হয়েছে কিভাবে বাংলাদেশ নামে ইতিমধ্যে বিচ্ছিন্ন পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ে পাকিস্তানকে পুনঃএকত্রীকরণ করা যায়; সেই সমঝোতা নিরূপণ ও প্রতিষ্ঠার জন্যে। [ষ্ট্যানলী ওলপার্ট, জুলফী ভূট্রো অব পাকিস্তানঃ হিজ লাইফ এন্ড টাইমস, অক্সফোর্ড ইউনির্ভাসিটি প্রেস, দিল্লী, ইটিসি ১৯৯৩]

সম্ভবত মুজিবের সাথে আলোচনায় সন্তুষ্টি লাভ করার পরই ভুট্টো পিআই-এর একটি বিশেষ বিমানে ১৯৭২ সনের ৮ই জানুয়ারি মুজিবকে লন্ডন প্রেরণ করেন। লন্ডনে ক্লারিজেস হোটেলে রাত কাটিয়ে পর দিন ৯ই জানুয়ারি তিনি দিল্লীতে পৌঁছে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে আলাপ আলোচনা করে ১০ই জানুয়ারি অপরাহ্নে ঢাকার তেজগাঁও বিমান বন্দরে আগমন করেন। লন্ডনের একটি সূত্রমতে মুজিব লন্ডন থেকে মস্কোর সাথে যোগাযোগ করেন। এটা হয়তো ঠিক যে মস্কো অথবা দিল্লী অথবা উভয়ে মুজিবের কানে ঐ দুটি সংখ্যাতথ্য ঢুকিয়ে থাকবে। কেননা ঐ দুটি দেশের স্বার্থ রক্ষার জন্য তেমন আজগুবি সংখ্যাতথ্য তারা মুজিবের কানে ঢুকিয়ে দেয়। একটি সূত্রের মতে এই সংখ্যাতথ্যের মিথ্যাচারটি মস্কোই প্রনয়ণ করেছে; অন্য একটি সূত্রের মতে ব্যাপারটা দিল্লীর তৈরী। উল্লেখ্য যে দিল্লী এবং মস্কো উভয়েই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে তাদের কথিত যথার্থ, যৌক্তিক ও নৈতিক আগ্রাসন চালায়।

৩০ লক্ষ সংখ্যাতথ্যের অসারতা সম্পর্কে জহুরী

সাংবাদিক জহুরী তার লিখিত ‘ত্রিশ লাখের তেলেসমাতি’ বইয়ে ৩০ লক্ষ নিহত হবার বিষয়টিকে তদানীন্তন ঢাকার বাংলা দৈনিক পূর্বদেশ এর সম্পাদক জনাব এহেতেশাম হায়দার চৌধুরীর একটি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন উদ্ভাবন আখ্যায়িত করে তার বইয়ে এতদসম্পর্কিত প্রমাণাদি সন্নিবেশিত করেন। জহুরী প্রদত্ত প্রমাণ মোতাবেক জনাব এহেতেশাম হায়দার চৌধুরী কাল্পনিক এই সংখ্যাতথ্যটি উদ্ভাবন করেন সেই সময় ঢাকায় কর্মরত মস্কো দূতাবাসের এক কনস্যুলারের যোগসাজশে। [জহুরী, ত্রিশ লাখের তেলেসমাত, আশা প্রকাশন, ঢাকা, ১৯৯৪ (দ্বিতীয় সংস্করণ)] জনাব জহুরী প্রসঙ্গক্রমে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকা পতনের ৬ দিন পর পূর্বদেশ-এ প্রকাশিত একটি সম্পাদকীয়-এর উদ্ধৃতি প্রদান করেন। [১৯৭১ সালের ২২শে ডিসেম্বর তারিখে দৈনিক পূর্বদেশ-এর সম্পাদকীয় থেকে প্রদত্ত উদ্ধৃতি]

উল্লেখ্য যে পূর্বদেশ ১৬ই ডিসেম্বরের পূর্বে সংঘাতের নয় মাসে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অতি উচ্ছ্বাসী সমর্থন ছিল; কেননা পত্রিকাটির মালিক ছিলেন নোয়াখালী জেলার অধিবাসী পূর্ব পাকিস্তানী বাঙালি জনাব হামিদুল হক চৌধুরী। বস্তুতঃ পত্রিকাটি উক্ত সম্পাদকীয়তে লক্ষ লক্ষ নিহত হবার গল্প প্রকাশ করে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় পত্রিকার নয় মাসব্যাপী ভূমিকাকে পাঠকদের মন থেকে বিস্মৃত করার চেষ্টা করেন। পূর্বদেশ এর উক্ত সম্পাদকীয়তে বর্ণিত সংখ্যাতথ্যটিকে প্রকৃত ও প্রধানতম উৎস অভিহিত করে মস্কোর কম্যুনিষ্ট সরকারের সংবাদ মাধ্যম সমূহ তা প্রচার করে এবং পরবর্তীতে ঢাকার ও ভারতের অন্যান্য সংবাদ মাধ্যমেও সেই সম্পাদকীয়তে বর্ণিত ৩০ লক্ষ নিহত হবার গাল গল্পের প্রচারণা ১৯৭২ সালের ৫ই জানুয়ারির পর থেকে অব্যাহতভাবে চালিয়ে আসছে। কোন কোন সূত্র মতে দিল্লী লন্ডন হয়ে ১০ই জানুয়ারি ঢাকা প্রত্যাবর্তনের সময় উক্ত কাল্পনিক সংখ্যাতথ্যটি মুজিবকে লন্ডনে কোন একটি মহল কর্তৃক সরবরাহ করা হয়।

জহুরী তার বইয়ে যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য তথ্য প্রমাণাদি সন্নিবেশন করার পরও কিছুটা সন্দেহ থেকে যায় যে প্রকৃতই মুজিবের সহকর্মীদের কারো মাধ্যমে উক্ত সংখ্যাতথ্যটি তাকে সরবরাহ করা হয়েছিল কিনা। এদিকে মুজিবের দল আওয়ামী লীগের সেই সময়কার সংসদ সদস্য জনাব আবদুল মোহাইমেন তার এক বইয়ে উল্লেখ করেছেন যে মুজিব ছিলেন ইংরেজীতে একজন অর্ধ-শিক্ষিত লোক যিনি নয় মাসের অন্তরীণ ও একেবারে বিচ্ছিন্ন পরিবেশ থেকে মুক্তির পর অত্যন্ত আবেগাপ্লুত হয়ে সংখ্যা ইংরেজীতে বলতে গিয়ে বিভ্রান্ত বা ভুলবশত ৩ লক্ষকে ইংরেজীতে থ্রি মিলিয়ন (যা বাংলায় ত্রিশ লক্ষ) বলে থাকবেন। ইয়াহিয়া খান ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতি তার তীব্র ঘৃণা ও আক্রোশের ফলে একটি অসৎ প্রচারণা চালানোর উদ্দেশেও তিনি জ্ঞাতসারেই ৩ লক্ষকে বাড়িয়ে ৩০ লক্ষ বলে থাকতে পারেন। [কুতুবুদ্দীন আজিজ, সাম এক্সসাইটিং ষ্টোরিজ টু রিমেম্বার, দি ইসলামিক মিডিয়া করপোরেশান, করাচী, ১৯৯৫]

যাই হোক, যে কারণেই হোক অনুমিত ৩ লক্ষ নিহত হবার ব্যাপারকে ৩০ লক্ষ বলা আর দুই লক্ষ মহিলার শ্লীলতাহানীর কথা মুজিব বলায় সেটাই তার রাজনৈতিক অনুসারীদের জন্য আপ্তবাক্য হিসেবে পরিগণিত হলো। ইতিমধ্যে কয়েক দশক অতিবাহিত হবার পরও উক্ত সংখ্যাটির সত্যাসতি যাচাই ও বিশ্লেষণ করার কোন উদ্যোগ আজও গৃহীত হয়নি।

নিহতদের রকমফের
১৯৭১ সালের সংঘাতের ঘটনা প্রবাহে পূর্ব পাকিস্তান/বাংলাদেশ-এ যারা নিহত হয়েছিল তারা বহু শ্রেণী ও অভিধায় বিভক্ত। নিহতদের রকমফের বিশ্লেষণ করতে হবে সময় ও জাতিগত/ভাষাগত প্রভেদ-এ। নিরপেক্ষ দৃষ্টিসম্পন্ন পর্যবেক্ষকমহলের যে কেউই এটা স্বীকার করবেন যে হত্যাকান্ড কেবল ১৯৭১ সালের ২৫মার্চ তারিখে পাকিস্তানের ফেডারেল সেনা অভিযানের দিন থেকেই শুরু হয়নি। প্রকৃত সত্য হচ্ছে সহায়-সম্পদে অগ্নিসংযোগ, দাঙ্গা, লুটতরাজ ও হত্যাকান্ডের শুরু হয় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ যখন জাতীয় পরিষদের বৈঠক মূলতবী ঘোষণা করেন তখন থেকেই। পাকিস্তানের সংসদীয় রাজধানী তথা দ্বিতীয় রাজধানী হিসেবে পরিচিত ঢাকার শেরে বাংলা নগরের সংসদ ভবনে ৩রা মার্চ থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন শুরু হবার কথা ছিল। ১ লা মার্চ এর পর থেকেই কোনরূপ উস্কানী বা প্রতিরোধ না থাকা সত্ত্বেও শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের অবাঙালি জনগোষ্ঠীর উপর হামলা, তাদের সহায় সম্পদ জালানো-পোড়ানো ও তাদের হত্যা করা।
অবাঙালীদেরকে ব্যাপকভাবে হত্যা করার এই অভিযান অব্যাহত থাকে সংশ্লিষ্ট এলাকা সমূহে পাকিস্তান ফেডারেল সেনাবাহিনী না পৌঁছা পর্যন্ত। এটা অনেকেরই জানার কথা যে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের অনেক দূরবর্তী এলাকায় পৌঁছতে পারেনি। অর্থাৎ এটা সহজেই অনুমেয় যে ঢাকায় ২৫শে মার্চের সেনা অভিযানের পর থেকে প্রায় ৬ সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবাঙালিদের হত্যা করা হয়। [পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলী সম্পর্কে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময় প্রকাশিত স্বেতপত্র থেকে এল,এফ রুশব্রুক উইলিয়মস কর্তৃক তার দি ইষ্ট পাকিস্তান ট্র্যাজেডী বইয়ে (টম ষ্টেচি, লন্ডন, ১৯৭২) প্রদত্ত উদ্ধৃতাংশ।]

ঐ হত্যাকান্ডে কয়েক হাজার অবাঙালি নিহত হয় যাদের প্রকৃত সংখ্যা কখনও কেউ নিরূপণ করেনি; ফলে দুনিয়াবাসী তা আজও জানেনা। এক সময়ের পূর্ব পাকিস্তানে একাত্তরের ঘটনা প্রবাহে নিহত অবাঙালিদের ব্যাপারটা আজও রহস্যাবৃত্তই রয়ে গেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্মৃতিসৌধ ও যাদুঘরে যুদ্ধ নিহতদের মাথার খুলি, হাড়-গোড়, ইত্যাদি যা নিহত বাঙালিদের বলে সংরক্ষিত রয়েছে সে সবের বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি নির্ণয় পূর্বক জাতিগত পরিচিত উদ্ভাবন করে এটা ঠিক করা উচিত যে ঐ সব মাথার খুলি ও হাড়-গোড় কি নিহত বাঙালিদের না তার মধ্যে অবাঙালিও ছিল অনেক। এটা নিশ্চিত হওয়া অপরিহার্য কেননা এর মাধ্যমে ১৯৭১ সালের সংঘাতে কত সংখ্যক অবাঙালি নিহত হয়েছিল এবং কত সংখ্যক বাঙালি নিহত হয়েছিল তার একটি প্রকৃত সংখ্যা ও হার নির্ধারণ করা সম্ভব।

অবাঙালী নিহত হবার কিছু দিক

অবাঙালি বিহারী এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত পাকিস্তানের ফেডারেল সেনাবাহিনীর কিছু ক্ষুদ্র গ্রুপ ও পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস এর কিছু ক্ষুদ্র গ্রুপ কিভাবে কচুকাটা হয়েছিল তা প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে পাকিস্তানের ফেডারেল সরকার জেনেছে এবং জেনেছে পাকিস্তানের খ্যাতিমান সাংবাদিক ও কুটনীতিক জনাব কুতুবউদ্দিন আজিজ। পাকিস্তান সরকার ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সেই সময়কার পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলী নিয়ে যে স্বেতপত্র প্রকাশ করে তাতে এবং জনাব আজিজের লেখা ব্লাড এন্ড টিয়ারস বইয়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের কারো কারো বর্ণনা সন্নিবেশিত হয়েছে। [১৯৯৪ সনের ডিসেম্বরে করাচীতে প্রকাশিত ‘জুয়ে খুন’ নিবন্ধে কতুবউদ্দিন আজিজ প্রণীত ব্লাড এন্ড টিয়ারস (১৯৭৪) বই থেকে প্রদত্ত উদ্ধৃতাংশ।] সে সব বর্ণনায় কিভাবে একাত্তরের মার্চ-এপ্রিল-মে মাসে পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় বর্বরোচিতভাবে অবাঙালিদের হত্যা করা হয় সে সবের কিছু কিছু লোমহর্ষক কাহিনীর উল্লেখ রয়েছে। ১৯৭৩ সালের শেষের দিকে যে সব আটকে পড়া পাকিস্তানীদের প্রত্যাবসনের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের স্বাক্ষ্য ও বর্ণনা মতে অবাঙালি বিহারীদের অবস্থানস্থল পূর্ব পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চল তথা শান্তাহার, সিরাজগঞ্জ, পাবর্তীপুর, নীলফামারী, দিনাজপুর, রংপুর, পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, যশোর প্রভৃতিস্থানে এবং পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চল চট্টগ্রাম, ফেনী, লাকসাম ও কুমিল্লায় কিভাবে অবাঙালিদের হত্যা করা হয় তার কিছু কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। অথচ একই সময়ে পশ্চিম পাকিস্তানে আটকা পড়া একজন পূর্ব পাকিস্তানী বাঙালিকেও পশ্চিম পাকিস্তানের লোকজন হত্যা কিংবা অত্যাচার বা হয়রানী করেনি। পক্ষান্তরে অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলেও সত্যি যে একাত্তরের মার্চ-এপ্রিল-মে মাসে অসংখ্য অবাঙালিদের নিধন করার পর পূনরায় একই নিধন গণহারে চালানো হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে পূর্ব পাকিস্তানের পতনের পর পর। খ্যাতিমান বৃটিশ ঐতিহাসিক এল,এফ রুশ ব্রুক উইলিয়ামস তার বিখ্যাত দি ইস্ট পাকিস্তান ট্রাজেডী বই-এ অবাঙালিদের নির্বিচার গণহত্যার কিছু কিছু লোমহর্ষক কাহিনীর উল্লেখ করেছেন যে সব গণহত্যা চালানো হয় একাত্তরের মার্চ-এপ্রিল-মে মাসে।

হত্যা এবং পাল্টা হত্যা

পাকিস্তানের ফেডারেল সেনাবাহিনী মে মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে সারা পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এবং ততদিনে বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীও সংগঠিত হয়। এর পরই শুরু হয় পাল্টা হত্যাকান্ড। সেনাবাহিনী গেরিলা যুদ্ধ ও সামনা সামনি লড়াই-এ হত্যা করে মুক্তিবাহিনীকে এবং কিছু ক্ষেত্রে অনেক বেসামারিক লোকও হত্যাকান্ডের শিকার হয়। এদের কেউ সেনাবাহিনী এবং মুক্তিবাহিনীর মধ্যকার চলমান সংঘাতের মাঝে পড়ে নিহত হয়; কেউ হয়তো নিহত হয় সন্দেহের বশে সেনাবাহিনীর হাতে পড়ে। এই ধরণের হত্যাকান্ড চলতে থাকে জুন এর শুরু থেকে ডিসেম্বরে তিন তারিখ পর্যন্ত।

কত লোক ২৫ শে মার্চ থেকে ৩রা ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে সংঘটিত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছিল তার একটি পরিসংখ্যান নির্ণয় করে নিউইয়র্ক ভিত্তিক একটি জরিপ সংস্থা-সিওডব্লিউ (কো-রিলেটস অব ওয়ার) যা ১৯৮২ সালে স্মল ও সিঙ্গার তাদের প্রকাশনায় উদ্ধৃত করেন; পরবর্তীতে ঢাকার বিআইআইএস এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল ১৯৯৩ সনে অক্টোবর সংখ্যায় পুনঃউদ্ধৃত করে ডঃ এ, রব, খান। সিওডব্লিউর নির্ণীত হিসাব মতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকাকালীন তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে নিহত হয় ৫০ হাজার লোক। [এ, রব, খান কনটেমপরারী ইন্টারন্যাশনাল কনফ্লিক্ট ইন সাউথ এশিয়া, এ কমপেনডিয়াম, বিআইআইসি ত্রৈমাসিক জার্নাল (ঢাকা), অক্টোবর, ১৯৯৩ইং সংখ্যায় প্রদত্ত সিওডব্লিউ, স্মল এন্ড সিংগার, ইউএসএ, ১৯৮২ (পৃ: ৪৪৩) এর নিহতের সংখ্যা সম্পর্কিত তথ্যের উদ্ধৃতাংশ।]

কারো কারো মতে নির্ণীত ঐ সংখ্যা প্রকৃত হিসাবের চাইতে কম; তবে ঐ সংখ্যা বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে নিহতদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার জন্যে আবেদনপত্র আহবান করার পর যত আবেদন জমা পড়ে সেই আবেদনপত্রের সংখ্যার কাছাকাছি। তবে দু’টো সূত্রের সংখ্যা নির্ণয়ের মধ্যেই যথেষ্ট ফাঁক থেকে গেছে। কেননা নির্ণীত সংখ্যায় জাতিগত হিসেব দেখানো হয়নি। অর্থাৎ বাঙালি ও অবাঙালি সংখ্যা তার মধ্যে কত তা পৃথকীকরণ করা হয়নি। বাংলাদেশ সরকার এটা পরিকল্পিতভাবেই করেছে যে নিহতদের বাঙালি-অবাঙালি শ্রেণীতে নির্ণয় করা যাবে না। তবে অ-বাঙালিদের সকল হত্যাকান্ডকে ইনডেমনিফাই বা ক্ষমা করে দেয়া হয়।

দুই সপ্তাহের যুদ্ধকালীন সময়ের হত্যাকান্ড

আর একটি পর্যায়ে হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। সেটি হচ্ছে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে ৩রা ডিসেম্বর থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত সংঘটিত দুই সপ্তাহের আনুষ্ঠানিক যুদ্ধকালীন সময়। ঐ সংঘাতে লিপ্ত তিন পক্ষের তথা ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের মুক্তি বাহিনীর লোক নিহত হয়। পূর্বে উল্লেখিত নিউইয়র্ক ভিত্তিক জরীপ সংস্থা সিওডব্লিউ কর্তৃক উক্ত হত্যাকান্ডের যে সংখ্যা নির্ণয় করা হয় তা হচ্ছে ১১,০০০ (এগার হাজার)। একইভাবে বিআইআইএস তাদের ১৯৯৩ সালের অক্টোবর মাস সংখ্যার জার্নাল-এ সিওডব্লিউ’র উক্ত জরীপ তথ্য সন্নিবেশিত করে। তবে দেশভিত্তিক নিহতের সংখ্যা কত কিংবা বাংলাদেশ মুক্তি বাহিনীর কত সদস্য নিহত হয়েছে তার কোন হিসাব পৃথকভাবে উক্ত জরীপে দেখানো হয়নি।

কিছু বুদ্ধিজীবির নিখোঁজ ও হত্যাকান্ড প্রসঙ্গ

যুদ্ধের শেষের দিকে তথা ১৩ ও ১৬ই ডিসেম্বরের মধ্যবর্তী সময়ে রহস্যজনকভাবে বিশেষত ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক সহ জনাকয়েক বুদ্ধিজীবি নিখোঁজ ও নিহত হয়। বিজয়ী মুক্তি বাহিনী ও ডিসেম্বর উত্তর বাংলাদেশ সরকার একাত্তরের অপরাপর হত্যাকান্ডের ন্যায় বুদ্ধিজীবি হত্যাকান্ডের সকল দায়-দায়িত্ব পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী আল বদর, আল শামস ও রাজাকারদের স্কন্ধে চাপিয়ে দেয়। কান্ডজ্ঞান সম্পন্ন যে কেহই এটা স্বীকার করবেন যে সেই সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী বাহিনীর কারো দ্বারা এই হত্যাকান্ড সংগঠিত হওয়া বাস্তব অবস্থায় সম্ভবপর ছিল না; কেননা তারা তখন ব্যস্ত ছিল নিরাপদ স্থানে আশ্রয়ের জন্য কিংবা দেশ থেকে পালানোর জন্যে। আর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ব্যস্ত ছিল বিভিন্ন জায়গা থেকে সবাইকে ঢাকায় এনে আত্মসমর্পনের জন্য জড় করানোর কাজে। সঙ্গতকারণেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী অন্যান্য বাহিনীর দ্বারা সেই হত্যাকান্ড ঘটানোর অভিযোগের কোন ভিত্তি নেই। ১৯৭১ সালের পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী পরিষদ সদস্য এ্যাডভোকেট মজিবর রহমান ও ব্যারিষ্টার আখতার উদ্দীন আহমেদ এমন বাস্তবতার কথাই প্রামাণ্যভাবে বলেছেন। এ্যাডভোকেট মজিবুর রহমান আমার সাথে বহুবার অনুষ্ঠিত ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তেমন বাস্তবতার কথা জোর আস্থার সাথে বলেছেন এবং ব্যারিষ্টার আখতার উদ্দীন আহমেদ তার অকাট্য দালিলিক বই ন্যাশানালিজম অব ইসলাম (১৯৮২) বইয়ে সেই বাস্তবতার কথাই বলেছেন। এটা খুবই দুঃখজনক যে আজ অবধি কোন সরকারই এই সব হত্যাকান্ডের রহস্য কিংবা কার্যকারণ উদঘাটন কিংবা প্রকৃত সত্য নির্ণয়ে কোনরূপ কর্মসূচী গ্রহণ করেনি। ঢাকার পতনের সামান্য আগে একজন অতি একনিষ্ঠ পাকিস্তান পন্থী প্রফেসার মুনির চৌধুরীর অন্তর্ধান কিংবা নিহত হওয়া এবং ১৬ই ডিসেম্বরের সপ্তাহ দুয়েক পর জহির রায়হানের অন্তর্ধান কিংবা নিহত হওয়ার ঘটনা কিছুতেই পাকিস্তান পন্থী সামরিক বা তাদের সহযোগী বাহিনীর দ্বারা ঘটতে পারেনা; এটা অবশ্যই বিশেষ ভারতীয় বাহিনী তথা যুদ্ধের সময় কিংবা ভারতীয় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জেনারেল ওভানের প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত মুজিব বাহিনী দ্বারা সংঘটিত হয়ে থাকবে। এর পক্ষে অকাট্য যুক্তি এবং তথ্য যতই থাকুকনা কেন বিষাক্ত প্রচারণার দাবানলে সবকিছুকে ভষ্ম করে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রচার মাধ্যম এটাই প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে যে, এই হত্যাকান্ডের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী বা তাদের সহযোগী বাহিনীই কেবল দায়ী। প্রসঙ্গত মনে এই প্রশ্নের উদ্রেক হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক যে উক্ত হত্যাকান্ডের একটা বিচার বিভাগীয় তদন্ত কেন আজ অবধি করা হলোনা ? ১৯৭১ উত্তর সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী মুজিব সরকার তাদের নিজের মত করেই তদন্তানুষ্ঠান সম্পন্ন করা সত্ত্বেও তার রিপোর্ট কেন সাধারণ্যে প্রকাশ না করে সে রিপোর্টকে ধ্বংস করে দেয়া হয়? কেন মুজিব সরকার জহির রায়হানের নিখোঁজ কিংবা হত্যাকান্ডের তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দেয়? কেন মুজিব জহির রায়হানের বোন নাসিমা কবীরকে এই মর্মে হুমকি দিয়েছিল যে জহির রায়হানের নিখোঁজ ও হত্যাকান্ড সম্পর্কিত তদন্ত রির্পোট সাধারণ্যে প্রকাশ করার জন্য বেশী চাপাচাপি করলে তাঁর (নাসিমা কবীর) পরিণতিও ভাই জহির রায়হানের ন্যায় হতে পারে। মুজিবের সেই হুমকির নির্গলিতার্থ কি ছিল ? সেই হুমকি থেকে এটা কি স্পষ্টতই অনুমেয় নয় যে, জহির রায়হানের নিখোঁজ ও হত্যাকান্ডের সাথে মুজিব বাহিনীর সদস্যরাই জড়িত ছিল ? [ওবায়দুল হক সরকার, বুদ্ধিজীবি হত্যাকারী কারা, মাসিক নতুন সফর, ঢাকা, ডিসেম্বর ১৯৯৫ সংখ্যা, পৃ: ৭-৮]

জঘন্য হত্যাকান্ড সংঘটিত হয় ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর

১৬ই ডিসেম্বরের পর পরই একাত্তরের সব চাইতে জঘন্যতম হত্যাকান্ডের সমূহ ঘটনা ঘটে। বিজয়ী হাজার হাজার মুক্তি বাহিনী দেশের সর্বত্র নির্বিচারে হত্যা করে অসংখ্য বেসামরিক ব্যক্তি, রাজাকার, পাকিস্তানপন্থী রাজনৈতিক কর্মী-সমর্থক, ইসলামিক পন্ডিত, আলেম-ওলামা এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদীদের। রাজধানী ঢাকায় বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে পাকিস্তান রক্ষায় সক্রিয় ব্যক্তিদের পাইকারী হারে মুক্তি বাহিনীর কমান্ডার ও সদস্যরা হত্যা করে। মুক্তি বাহিনীর কমান্ডার কাদের সিদ্দিকী নিজে ঢাকা ষ্টেডিয়ামে আয়োজিত প্রকাশ্য জনসমাবেশে হত্যা করে পাকিস্তানপন্থী বাঙালিদের। [আবদুল মালেক, ফ্রম ইষ্ট পাকিস্তান টু বাংলাদেশ, ইন্ডিপেন্ডেট কমিটি ফর হিউম্যান রাইটস, মানচেষ্টার, ১৯৭৩ পৃ: ৪ এবং ১১, ১৪ ও ১৭ পৃষ্টায় মুদ্রিত ৫টি ছবি-যে ছবিগুলোতে মুক্তিবাহিনী কর্তৃক পাকিস্তানপন্থীদের নির্যাতনের মধ্য দিয়ে হত্যা করার দৃশ্য বিদেশী সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ধারণ করা হয়।]

একইভাবে সারা দেশে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানপন্থীদের জনসমক্ষে হত্যা করে। বিশ্বস্ত সূত্রে থেকে আমার জানামতে সেই সময় উত্তরাঞ্চলীয় পাবনা জেলার সিরাজগঞ্জে পাকিস্তানপন্থী প্রচুর সংখ্যক অবাঙালি বিহারীদের ধরে এনে জেল ক্যাম্পাসে জড় করে তাদেরকে আগুনে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। [ঐ পৃ: ২৩: উক্ত পৃষ্টায় ১৯৭১-৭২ সনে অবাঙালীদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা সহ বিভিন্ন যায়গায় যেভাবে নির্বিচারে হত্যা করা হয় তার সংখ্যা ২০০,০০০ বলে উল্লেখ করা হয়।]

সিরাজগঞ্জে বধ্য ঘর বলে একটা বাড়ী ছিল; যেখানে প্রথমে অবাঙালিদের পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের ধরে এনে হত্যা করা হতো এবং এটা ১৯৭৫ সালের মুজিবের পতন হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। মুজিবের পতনের পর ঐ কসাই বা বধ্য ঘরের কর্ণধাররা ভারতে পালিয়ে যায়। আমি এই ঘটনা জানতে পারি ১৯৮৯ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের নিউ জেল ডিভিশন ওয়ান-এ থাকাকালে আমার সাথে দেখা সিরাজগঞ্জের এক তরুণ যুবকের নিকট থেকে। উল্লেখ্য যে, এরশাদ সাহেব কোনরূপ অপরাধমূলক তৎপরতা না থাকা সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে আমাকে প্রথমে ৫৪ ধারা ও পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে সেই সময় গ্রেফতার করে জেলে ঢুকান। যাক সিরাজগঞ্জের প্রত্যক্ষদর্শী ঐ তরুণ হত্যাকান্ডের বহু লোমহর্ষক বিবরণ দেন।

তার বর্ণনামতে এক হত্যাকারী, যে মানুষ (পুরুষ-নারী-শিশু নির্বিশেষে) খুন করতে খুব আনন্দ পেতো, সে খুন করতো বেয়নেট চার্জ করে। কাকেও গুলি বা জবাই না করে বেয়নেট খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সে হত্যা করতে মজা পেতো। এই কাজে যাবার সময় উক্ত হত্যাকারী সারা গায়ে বোরকা জাতীয় একটি প্লাষ্টিকের পোষাক পরিধান করতো যাতে বেয়নেটের অব্যাহত খোঁচায় ফিনকি দিয়ে বের হওয়া রক্ত তার গায়ে না লাগে। মুজিবের শাসনের সময়কালে সংঘটিত হত্যাকান্ডের বিষয়াদির সত্যাসত্যি আমি যাচাই করতে পারিনি। তবে মুজিবের ব্যক্তিগত বাহিনীর দ্বারা এমনিতর খুন-খারাবি ছিল নিত্য-নৈমিত্ত্যিক ব্যাপার। এটা ছিল তাদের নিকট অনেকটাই ক্রীড়ার মত। একইভাবে নির্বিচার হত্যাকান্ড চালিয়েছে মুজিবের কুখ্যত রক্ষী বাহিনী যারা মুজিবের সরাসরি নির্দেশে চলতো। রক্ষী বাহিনীর হাতে ৩৭০০০ (অন্য এক পরিসংখ্যান মতে ৩২ হাজার) বেসামরিক ব্যক্তি ১৯৭২-৭৫ সালের মধ্যে নিহত হয়। দুর্ভাগা এই দেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ডের এই সব হচ্ছে যতকিঞ্চিত প্রমাণ। মুজিবের পুত্র শেখ কামাল ও ভাগ্নে ফজলুল হক মনি ছিল মুজিবের তরুণ বয়সের মত একই গুন্ডা প্রকৃতির। অসাংবিধানিক রক্ষী বাহিনীর হত্যার শিকার হতো তারা যারা আওয়ামী লীগ ও ভারত বিরোধী ছিল এবং ছিল বাংলাভাষী মুসলমান।

একাত্তরের হত্যাকান্ডঃ ব্যক্তিগত অভিজ্ঞানের আলোকে

একাত্তরের হত্যাকান্ডের সত্যিকার ঘটনাবলী বিধৃত করতে আমি আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞান থেকে কিছু বলতে চাই। আমার দূর সম্পর্কের এক আত্মীয় পাকিস্তান আর্মিতে ছিল। এক পর্যায়ে সে পালিয়ে গিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে পাক সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সে মুক্তি বাহিনীর একজন সদস্য এবং একজন কোম্পানী কমান্ডার হিসেবে তার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমার নিকট ১৯৭২ সালে বর্ণনা করেন। তার প্রদত্ত বর্ণনা মতে যুদ্ধকালীণ সময় তার উপর অর্পিত দায়িত্ব ছিল সে তার কোম্পানী সহ ভারতের আশ্রয়স্থল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে নিজেদেরকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোক হিসেবে জনসমক্ষে পরিচয় দিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকাবাসীদের একত্রিত করে অনর্গল উর্দ্দুতে (আমার সে আত্মীয় ১৯৭১ সালের পূর্বে প্রায় ১০ বছর পশ্চিম পাকিস্তানে থাকায় অনর্গল উর্দ্দুতে কথা বলতে পারতো) পাকিস্তান রক্ষার (!) জন্য বক্তৃতা দিয়ে জনগণ থেকে পাকিস্তানের হেফাজতের জন্য অর্থ সাহায্য আদায় করে ভারতে তাদের আশ্রয়স্থলে ফিরে যাবার সময় জড় হওয়া বেসামরিক লোকদের উপর নির্বিচারে ব্রাস ফায়ার করে তাদের হত্যা করতো। ঐ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল জনগণের মনে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সম্পর্কে বিরূপ ও বিক্ষুদ্ধ ধারণা সৃষ্টি করা অর্থাৎ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বর্বর প্রকৃতির; যারা নির্বিচারে সাধারণ জনগণকে হত্যা করে থাকে। এই ধারণা পাকিস্তান বিরোধী ভারতের বিষাক্ত প্রচারণার জন্য ছিল অত্যন্ত সহায়ক। আমার আর এক বন্ধু ছিল মুক্তি বাহিনীতে। সেও আমাকে অনুরূপ ঘটনা সংগঠনের কথা বলেন এবং বলেন যে ঐ ধরণের হত্যাকান্ড পরিকল্পিতভাবে ঘটানো হতো, যাতে পাকিস্তানীদের বর্বরতা সম্পর্কিত প্রচারণা প্রামাণ্য ও শক্তিশালী রূপ পরিগ্রহ করে। এই ধরণের অপকর্মে তাদের যুক্তি ছিল যুদ্ধে এবং প্রেম-এ কিছুই ভুল নয়। এই সব ঘটনা প্রবাহ থেকে হত্যাকান্ডের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয় করা দুস্কর এবং আরো বেশী দুস্কর হচ্ছে কে কাকে হত্যা করেছে তা নিরুপণ করা। একই প্রেক্ষাপটে কত মহিলা ধর্ষিত হয়েছে তার সংখ্যা নির্ণয় এবং কে এবং কেন ধর্ষিত হয়েছে তাও নিরূপণ করা দুস্কর। এই সব কারণেই মুজিব সরকার কর্তৃক ১৯৭২ সালে হত্যাকান্ডের সংখ্যা ও কারণ নির্ণয় পূর্বক যখন নিহতদের ক্ষতিপূরণের একটা কার্যক্রম গ্রহণ করে, তখন প্রাপ্ত বাস্তব তথ্য ও অবস্থার আলোকে সে কার্যক্রম পরিত্যক্ত করা হয় কেননা নিহতদের ক্ষতিপূরণের যে পরিমাণ আবেদনপত্র জমা পড়ে তার আলোকে সংখ্যা নির্ধারণ করা হলে মুজিব ও তার সহযোগীরা হত্যাকান্ডের যে কাল্পনিক, মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বিশাল সংখ্যার উপর প্রচারণা চালায় তা মুখ থুবড়েই কেবল পড়তোনা; ঐ মিথ্যাচারের জন্য আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও পদদলিত হয়ে যেতো।

১৯৮০ সালের শুরুতে লন্ডনে আমার সাথে আর এক মুক্তি যোদ্ধার সাক্ষাত ঘটে। সে আমার নিকট হত্যাকান্ড সম্পর্কিত আরো কিছু ভয়ংকর ঘটনাবলী বর্ণনা করে। মুক্তি বাহিনীর সদস্য হিসেবে ভারতে প্রশিক্ষণের পর তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে সুনির্দ্দিষ্ট হত্যাকান্ড চালানোর জন্যে। তাকে এই সম্পর্কে একটি তালিকা ধরিয়ে দেয়া হয়। সে তালিকায় তারই ঘনিষ্ঠ আত্মীয় যারা মুসলিম লীগ কিংবা পাকিস্তান রক্ষায় ছিল সক্রিয়। মুক্তি বাহিনীর সে সদস্য আমাকে জানায় যে সে এমন ধরণের তালিকাভূক্ত তার অনেক ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে হত্যা করেছে। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর সে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের এক কর্মকর্তা হিসেবে কিছুদিন কাজ করে যখন একজন মুক্তি বাহিনী হিসেবে ১৯৭১ সালের ঐ সব হত্যাকান্ডে তার সম্পৃক্তিতে অনুতপ্ত হন; তখন লন্ডনে পালিয়ে যান। আমার সাথে আলাপচারিতার সময় তাকে স্পষ্টতই ঐসব হত্যাকান্ডের জন্যে অত্যন্ত অনুতপ্ত বলে মনে হয়েছে।

মুক্তিবাহিনীর আর একজন সদস্য মুজিব সম্পর্কে একটি ঘটনার কথা আমাকে জানান। পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর মুজিব ঢাকার সিদ্দিক বাজার কম্যুনিটি সেন্টারে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য গেলে মুজিবের ঘনিষ্ট সে মুক্তি বাহিনীর সদস্য তাকে এই মর্মে অনুরোধ করেন যেন তিনি (মুজিব) মুক্তি বাহিনীর সবাইকে অবিলম্বে তাদের অস্ত্র জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ জ্ঞাপন করেন; কেননা ১৬ই ডিসেম্বরের পর থেকে সারা দেশে নির্বিচারে হত্যাকান্ড চলছে। মুজিব তার উক্ত অনুরোধে অগ্নিশর্মা হয়ে বললেনঃ আমার ছেলেরা ১৯৫৪ সাল থেকে কিছু খেতে পায়নি, ওরা যখন কিছু খাচ্ছে -তাতে তোর এতো চোখ তাতাঁই কেন? প্রকাশ্যে অর্থাৎ একটা জনসমাগমে মুজিব এমন কথা বলার পর অবাঙালি ব্যবসায়ীদের একচেটিয়াভাবে হত্যা ও তাদের সহায় সম্পত্তি লুটতরাজ চলতে থাকে। এদের মধ্যে এমন বহু অবাঙালিও নিহত হয়; যারা ১৯৪৭ সালেরও বহু পূর্ব থেকে ঢাকায় ব্যবসা বাণিজ্য চালিয়ে আসছিল। মুক্তি বাহিনীর অনেকে অবাঙালি ব্যবসায়ীদের নিকট থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ আদায় করার পরও তাদের অনেককে হত্যা করে। সেই সব হত্যাকান্ডের কোন খতিয়ান আজও নির্ণয় করা হয়নি -যা একটি স্বাধীন দেশের জন্য নিতান্তই দুঃখজনক। এটা নির্ণয় হওয়া সত্যিই একটি দেশের ভবিষ্যদের কল্যাণের জন্য অতীব প্রয়োজন, যাতে সত্যের প্রকাশ ঘটবে এবং যার মাধ্যমে অর্ধ সত্য কিংবা মিথ্যাচার যা স্কুল পাঠ্য বই সমূহে এই পর্যন্ত সন্নিবেশিত হয়েছে তা থেকে জাতি নিস্কৃতি পাবে।

হত্যাকান্ডের পরস্পর বিরোধী সংখ্যা

পঞ্চাশ এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী মরহুম হামিদুল হক চৌধুরী লিখিত মেমোয়েরস বইয়ে একাত্তরের সংঘাতে ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ নিহত হবার কথা বলেছেন। [হামিদুল হক চৌধুরী, মেমোয়েরস, এসোসিয়েটেড প্রিন্টার্স লিঃ ঢাকা, ১৯৮৯ পৃ: ৩২৩] তার প্রদত্ত সংখ্যা বিশ্বাসযোগ্য নয়, কেননা তিনি উক্ত সংখ্যা গণনার কোন ভিত্তি প্রদান করেননি। এছাড়াও জনাব চৌধুরী ১৯৭১ সালের শেষের দিকে বিদেশে ছিলেন এবং সেখান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত অবস্থান করেন। তার বইয়ে তিনি প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয়ে নিহতদের কোন শ্রেণীবিন্যাসও করেনি। ইংরেজী দৈনিক দি মনিং সান (ঢাকা) এর সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলাম ববি তার পত্রিকায় এক সুদীর্ঘ নিবন্ধে মজিবের কথিত হত্যাকান্ডের সংখ্যা নিয়ে গুরুত্বর প্রশ্নের অবতারণা করেন। তিনি অংক কষে দেখিয়েছেন যে পাকিস্তানের ফেডারেল সেনাবাহিনীর হাতে ৩০ লক্ষ মানুষ নিহত হওয়ার অর্থ হচ্ছে ৯ মাসের তথা সাকুল্যে ২৬৭ দিনের প্রতিদিন ১১,২৩৬ মানুষকে হত্যা করা। এত ব্যাপক সংখ্যক লোককে হত্যা করা এবং লাশগুলো গুম বা সৎকার করা কারো পক্ষেই চাট্টিখানি কথা নয়। পূর্ব পাকিস্তানের সর্বত্র কর্মরত ৯০ হাজার সদস্যের পাকিস্তান বাহিনীর দ্বারা এমন অবিশ্বাস্য কাজ সম্ভব ছিল কিনা। এটা যে কোন কান্ডজ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিরই নিকট গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বলে বিবেচিত হবার কথা। বিএনপি সরকারের আমলে দু’দুবার মন্ত্রী হওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা লেঃ কর্ণেল আকবর হোসেন মজিবের কথিত সংখ্যাতথ্যটিকে আজগুবী বলে আখ্যায়িত করেন।

জনাব আকবর হোসেনের মতে নিহতের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩ লাখ হতে পারে। আকবর বর্ণিত সংখ্যার সাথে অপূর্ব মিল রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জরীপ সংস্থা হাভার্ড গ্রুপ এর রিচার্ড সিশন ও লিউ রোজ প্রণীত ওয়ার এন্ড সিসেশানঃ বাংলাদেশ ডক্যুমেন্ট-এ দেয়া সংখ্যার সাথে। অবশ্য কর্ণেল আকবর তার বর্ণিত সংখ্যার ভিত্তি হিসেবে নিজের অভিজ্ঞানকেই গণ্য করেছেন। তার মতে বাঙালি মুক্তিযোদ্ধারা এত কাপুরুষ ছিলনা যে ৯০ হাজার পাকিস্তানী নয় মাসে ৩০ লক্ষ লোককে হত্যা করে ফেলবে। তবে কর্ণেল আকবরের প্রদত্ত নিহতদের হিসেবেও জাতিগতভাবে সংখ্যা পৃথকীকরণ করা হয়নি; হয়তো তিনি নিজেই একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন বিধায়। এদিকে ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময়কার ভারতীয় সেনা প্রধান জেনারেল মানেকশ পর্যন্ত ভয়ানকভাবে বিব্রতবোধ করেন মুজিব কর্তৃক নিহতের সংখ্যা হিসেবে ৩০ লক্ষ ঘোষণা করায়; কেননা মুজিবের উক্ত ঘোষণার পূর্বে বিবিসিকে প্রদত্ত এক সাক্ষাতকারে জেনারেল মানেকশ সর্বোচ্চ ১০ লক্ষ লোক নিহত হতে পারে বলে অনুমান নির্ভর একটি তথ্য প্রদান করেছিলেন, যার সাথে মুজিব প্রদত্ত সংখ্যার গরমিল ছিল রীতিমত আকাশ-পাতাল তুল্য। [এ,কে, এম রহুল আমিন, বিতর্কিত মুজিব, চিন্তন প্রমিতো প্রকাশনী, ঢাকা, বিএস, ১৩৯৯ (১৯৯৩) পৃ: ১৫]

মুজিব সরকার শুরু করেও নিহতদের গণনা শেষ করেনি

নিহতদের ক্ষতিপূরণ দেবার জন্যে তাদের আত্মীয়দেরকে আবেদন করতে ১৯৭২ সালে মুজিব সরকার একটি প্রজ্ঞাপন জারী করে। একটি সূত্রমতে নিহতদের পক্ষ থেকে দাখিলকৃত আবেদনপত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ৯৫ হাজার। আবার এর মধ্যে একই নিহতের পক্ষে ২টি এমনকি ৩টি আবেদনপত্রও জমা পড়ে। যাচাই-বাছাইয়ের পর প্রকৃত আবেদনপত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র ৫৫ হাজার-এ। সম্ভবত এই সংখ্যাটিই স্মল ও সিঙ্গার (১৯৮২) তাদের জরীপ প্রকাশনায় সিওডব্লিউর সূত্রে উল্লেখ করেন। এই সংখ্যার কথা যখন ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি মুজিবকে তার সরকারী কর্মকর্তারা জানান তখন তিনি মারাত্মকভাবে বিব্রতবোধ করেন; কেননা এতদিনে তার কথিত ৩০ লক্ষ নিহত হবার কথা সাধারণ্যে তার জনপ্রিয়তার বদৌলতে অতি পবিত্র ও বিশ্বাস্য বলে গণ্য করা শুরু হয়। তার সরকারের কর্মকর্তাদের থেকে নিহতদের প্রকৃত সংখ্যার একটা ধারণা পেয়ে তিনি এতদসম্পর্কিত সকল নথিপত্র জ্বালিয়ে ফেলার জন্যে তাদের নির্দেশ জ্ঞাপন করেন। কেননা ঐ সব নথি-পত্র সংরক্ষিত হলে মুজিব একজন মিথ্যাবাদী বলে প্রমাণিত হবেন। ফলে এতদসংক্রান্ত সরকারী কোন নথি বা দলিল দস্তাবেজ কোথায়ও পাওয়া যায়না।

এতদসংক্রান্ত নথি, দলিল-দস্তাবেজ ধ্বংস করার প্রক্রিয়ার মধ্যেই মোট ৯ হাজার নিহতদের পরিবার-পরিজনদের ক্ষতিপূরুণের অর্থ প্রদান করা সম্পন্ন হয়। বস্তুতঃ ঐ নয় হাজারই একাত্তরের যুদ্ধে নিহত হয় বলে গণ্য করা যায়। ক্ষতিপূরুণের তালিকায় দুই লক্ষ নিখোঁজ কিংবা নিহত অবাঙালির কাকেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়নি। জনৈক আবদুল মালেক ১৯৭৩ সালে নিহত অবাঙালিদের সম্পর্কে একটা তথ্য প্রণয়ন করলেও তাদেরকে কোন ক্ষতিপূরুণ কখনও দেয়া হয়নি। একই কায়দায় মহিলা নির্যাতন ও ধর্ষনের মিথ্যা ও ভিত্তিহীন সংখ্যাতথ্য প্রনয়নের জন্যে ১৯৭২ সালের শুরুতে সারা দেশে প্রচুর বীরঙ্গনা রেজিষ্ট্রেশন কেন্দ্র খোলা হলেও তা অচিরেই বন্ধ হয়ে যায়; কারণ ঐ সব কেন্দ্রে নিবন্ধিত হওয়ার জন্যে নির্যাতিত- ধর্ষিত মহিলাদের পাওয়া যাচ্ছিলনা।

৩০ লক্ষের সংখ্যাতত্ত্ব নিতান্তই ভিত্তিহীন ও মারাত্মকভাবে ফুলানো-ফাঁপানো উপরোক্ত বিশ্লেষণ থেকে এটা স্পষ্ট যে ১৯৭১ সালের সংঘাতে ৩০ লক্ষ নিহত আর দুই লক্ষ মহিলা ধর্ষিত হবার কাহিনী কেবল ভিত্তিহীন ও আজগুবীই নয়; এই সংঘাত থেকে সত্যকে বহু দূরে হঠিয়ে দেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জরীপ সংস্থা হার্ভাড গ্রুপ (সিশন ও রোজ-১৯৯০) কর্তৃক ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান/বাংলাদেশ-এ যে তিন লক্ষ নিহত হবার কথা বলেছে তা বোধ হয় সত্যের কাছাকাছি। কেননা নিহত বাঙালিদের ক্ষতিপূরণের জন্য দাখিলকৃত আবেদনপত্রের সংখ্যা আর তার সাথে নিহত অবাঙালি দুই লক্ষ যোগ করলে হার্ভাড গ্রুপের জরীপকৃত সংখ্যার সত্যতা প্রমাণিত হবে। তবে বাংলাদেশ সরকার ৩০ লক্ষের যে জজবা টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট তার কোন ভিত্তি নেই; এটা নিশ্চিতভাবে অবিশ্বাস্য ও এক জঘন্য মিথ্যাচার বই আর কিছুই নয়। এটা বাংলাদেশ সম্পর্কিত অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার অংশ। তবে দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে ৩০ লক্ষ আর দুই লক্ষ সংখ্যাতথ্যের মিথ্যাচার আমাদের মিডিয়া সমূহকে অব্যাহতভাবে যোগান বা ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে যাতে করে সাধারণ মানুষ এই নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য না করে; আর এই মিথ্যাচারকে স্কুলে পাঠ্য বইয়ে সন্নিবেশিত করে আমাদের উঠতি তরুণ বংশধরদের মগজ ধোলাই করা হচ্ছে। আমরা কোন অবস্থাতেই আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের মিথ্যাচার গলাধিকরণ বা অসত্যের জাবর কাটায় সোর্পদ করতে পারিনা। আমাদের ভবিষ্যত বংশধরদের অবশ্যই মিথ্যা ইতিহাসের বেড়াজাল ছিন্ন করে প্রকৃত সত্যের উদঘাটন করতে হবে। যুদ্ধে নিহতদের প্রকৃত সংখ্যা নির্ণয়ে নতুন করে কোন নিরপেক্ষ জরীপ/গণনা এখনো শুরু করা যেতে পারে; কেননা এখনো তেমন বিলম্ব হয়নি। নিহতের সঠিক সংখ্যা নিরূপণ বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম কর্তব্য; কেননা এতদসম্পর্কিত রেকর্ড শুদ্ধ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে পাকিস্তানেরও কিছু নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। যদি বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এই বিষয়ে সহযোগিতাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ পূর্বক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করে তা হলে এর সুযোগ গ্রহণ করে ভারতীয়রা এতদসম্পর্কিত সকল মিথ্যাচারের ফুলঝুরি সৃষ্টি করে তাদের অসৎ প্রচারণাকে শান দিতে থাকবে; যা বাংলাদেশে গত সাড়ে তিন দশক ধরে চলছে।

এটা প্রত্যেকেরই স্মরণ থাকার কথা যে, ১৯৭১ সালের সংঘাতে নিহতদের এক চোখা ও বিকৃতভাবে সংখ্যা নির্ণয় এবং তা নিয়ে ১৯৭১ সাল থেকে পরিচালিত তারস্বরের অপ্রচারণা লক্ষ্য একটাই-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের আগ্রাসন চালানো।



 

Comments  

 
-2 # 2010-04-19 05:31

I've never seen such a ugly site that corrupts history and truth simutenously. Host of this site need to be punished as they are manipulating our history, which could be dangerous for the new generation. They've no right to manipulate our history. Don't try to show us white part of a black spot,we r nt colour blind

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+2 # 2012-08-11 01:08

I think I am part of that generation what you mentioned here. I am just requesting you very honestly --- "gather much more knowledge before you start commenting to save yourself from becoming a stupid and the new generation from the rubbish history and truth you mentioned above". Try to thing something for, try to thing something for 150 million Bangladeshi. Thanks.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
-3 # 2010-04-19 06:57
কেন এই মিথ্যাচার! কেন অবাঙ্গালীদের জন্য এত কান্না?
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+9 # 2010-04-24 17:14
Honest speaker কি এখনও বুঝেনা ভারতিয় আগ্রাসন। যদি এই ব্যাটা ভারতিয় হয় তাহলে জীবনেও বুঝবে না। আর বাংলাদেশি দেশপ্রেমিক হলে বুঝা উচিৎ। কারণ, ১)ফারাক্কা ২)তিন বিঘা করিডর ৩)বাংলাদেশ ঘিরে ফেনসিডিল কারখানা ৪)কাঁটা তারের বেড়া ৫)ভারত কর্তৃক শান্তি বাহীনি গঠন ৬)BSF দ্বারা বাংলাদেশি খুন ৭)বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার বাজার হিসেবে তৈরি করা ৮)বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ বিরোধি কর্মকান্ড করা ৯)মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো etc
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+1 # 2010-04-25 12:21
প্রথম আলোর পাঠককে ধন্যবাদ যার মাধ্যমে এই সাইটটির খোজ পেয়েছি। অত্র বইটির লেখককে মোবারকবাদ জানাই তার এই সত্য ও তথ্যনির্ভর লেখা উপহার দেবার জন্য।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+11 # 2010-04-28 05:02

I would request readers to think and anylise events, in light of history of last 39 years and make your decision.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
-10 # 2010-06-18 21:48

honest speaker go to hell and take your thoughts with you. You are a coward.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+9 # 2010-07-12 15:50


If someone writes the truth and it is against the belief of the reader, their voice is often negative. I suggest commentators should response from the point of very neutral views.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2010-08-27 12:16
ধন্যবাদ জনাব এম,টি,হোসেনকে। অনেক না বলা ইতিহাস আমাদের জন্য রেখে যাওয়ায়। একদিন সত্যকথা বের হবেই। ষড়যন্ত্রকারীরা চিরদিন বিজয়ী থাকতে পারেনা। আর অনেস্ট স্পীকারের মত সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদীদের জন্য ঘৃণা।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+2 # 2010-09-23 06:26
লেখক মহোদয়কে ধন্যবাদ। তার এই লেখনির মাধ্যমে জাতি অনেক উপকার পাবে।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2012-06-26 08:17
সাহস করে করে সত্য কথা বলাই মানুষের শেষ্ঠত্ব। প্রত্যোক স্থানে প্রচার করো উচিত।
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh