Home EBooks অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের ইতিহাস

eBooks

Latest Comments

বাংলাদেশঃ মারাত্মক অপপ্রচারণা, ষড়যন্ত্র ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকার - অধ্যায় ৪: বাংলাদেশে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও স্বার্থ সংঘাতের গতি-প্রকৃতি PDF Print E-mail
Written by এম, টি, হোসেন   
Friday, 15 November 1996 02:00
Article Index
বাংলাদেশঃ মারাত্মক অপপ্রচারণা, ষড়যন্ত্র ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকার
অধ্যায় ১: তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য সম্পর্কিত অলীক কাহিনী ও স্বায়ত্বশাসনের দাবী প্রসঙ্গ
অধ্যায় ২: ভারতীয় ষড়যন্ত্রের সহায়তায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্জন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশঃ পরবর্তীতে কী?
অধ্যায় ৩: ১৯৭১ সালের পর থেকে একাত্তরের হত্যাকান্ডের একপেশে কল্পকাহিনী ও মিথ্যাচার
অধ্যায় ৪: বাংলাদেশে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও স্বার্থ সংঘাতের গতি-প্রকৃতি
অধ্যায় ৫: একবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় আধিপত্যঃ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উভয় সংকট
All Pages

মূল্যবোধের সংঘাতঃ একাত্তরের ডিসেম্বরে সৃষ্ট পরিণতি পরবর্তী প্রেক্ষাপট

মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও স্বার্থের এক কঠিন সংঘাত থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ-এর অভ্যুদয় ঘটে। সেই সংঘাত এর একটি পর্যায়ের পরিণতি ঘটে ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে। ভারতীয় কংগ্রেসপন্থী আওয়ামী লীগের দাবীমত দৃশ্যতঃ এটা প্রতিভাত হয় যে, ঐ পর্যায়ে পাকিস্তানী মূল্যবোধকে বিপর্যস্ত করে জয়ী হয় বাঙালি সংস্কৃতি। তাদের জয়ী হবার দাবীর কারণ ১৯৭১ সনের যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হয়। বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা একশ্রেণীর বাঙালি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সেই পরাজয়কে পূর্ব বাংলা/পূর্ব পাকিস্তান/বাংলাদেশের মাটিতে মুসলিম মূল্যবোধের পরাজয় হিসেবে আখ্যায়িত করে। তারা এও বলে যে, সীমান্তের বাইরে থেকে মুসলমানদের দ্বারা আনীত মূল্যবোধ ছিল বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নেয়া মূল্যবোধের পরিপন্থী। এরই ফলে শেখ মজিবের নেতৃত্বে নতুন বাঙালি শাসকরা পূর্ব থেকে বিদ্যমান মুসলিম পরিচয় জ্ঞাপক সকল প্রতীক, নাম ও পদচিহ্ন পরিবর্তন করে ফেলে। এমনকি কোরানের অনেক বাণী যেমন ‘রাব্বী যিদনি ইলমা’ ‘ইক্রা বিস্মি রাব্বিকা আল লাজী খালাক’ যা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মনোগ্রাম-এ অংকিত ছিল, তা পরিবর্তন করে সেখানে এমন কিছু বাংলা বাক্য বা শব্দ প্রতিস্থাপন করা হয় যেগুলোর মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধে উজ্জীবনের কোন দিক-নির্দেশনা বা অনুপ্রেরণা নেই। এমনকি নতুন বাঙালি শাসকরা মুসলমান পরিচয় জ্ঞাপক সকল কিছুকে বর্হিদেশীয় এবং সংশোধনযোগ্য বলে চিহ্নিত করে এবং সকল সরকারী প্রচার মাধ্যমে ইসলামী প্রতীক ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়। অনৈসলামিকীকরণের এই সব কর্মসূচী মূল্যায়ন করলে বোধশক্তি সম্পন্ন যে কারোরই নিকট এটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে ওটার লক্ষ্য ছিল সংশ্লিষ্টদের বিবেচনায় বাঙালি প্রথা ও মূল্যবোধকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার ক্ষেত্র সৃষ্টি করা। এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, বৈদিক ও হিন্দু পুরান এর ঢামাঢোলে তাদের সকল মূল্যবোধ নিমজ্জিত করার অপপ্রয়াসে হয়তো বাঙালি মুসলমানরা বিস্মৃত হতোনা; কিন্তু যে সব মূল্যবোধের কোন ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, তা তাদের নিকট কোন অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য ছিল না। বস্তুতঃ পৌরনিক পূর্বযুগের অন্ধ সাধু দীর্ঘতমার- এর জারজ সন্তান ‘বঙ্গ’র ব্যক্তিত্ব ও আচারাদির মধ্যেই তারা জাতির উৎসের সন্ধানে ব্যপৃত হয়। [রমেশ চন্দ্র মজুমদার, হিস্ট্রী অব এনসিয়েন্ট বেঙ্গল, সি ভাদোরওয়াল এন্ড কোঃ, কলকাতা, ১৯৭১, পৃ: ২৮ এবং বি,সি,সেন, হিষ্টোরিক্যাল এসপেক্টস অব বেঙ্গলী ইনসক্রিপশানস, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৪২, পৃ: ৮]

এটা বলার অপেক্ষা রাখেনা যে বাংলাদেশের এমনকি স্বল্প সচেতন মুসলমান ও বোধবুদ্ধি সম্পন্ন যে কেহরই ঘৃণাভরে এমনিতর অনৈতিহাসিক ইস্যু সমূহ নিশ্চিতভাবেই প্রত্যাখান করার কথা।

ধর্ম নিরপেক্ষতা নাকি অনৈসলামিকীকরণ ?

পরিচয়ে মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ১৯৭১ উত্তর বাংলাদেশের শাসকরা দেশের জন্য এমন এক জাতীয় সঙ্গীত প্রবর্তন করে যাতে ছিল বহু-ঈশ্বরবাদী হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস-সঞ্জাত এবং ছিল একেশ্বরবাদী মুসলমানদের মূল্যবোধ ও বিশ্বাসের পরিপন্থী। কেবল তাই নয়, উক্ত সঙ্গীতের প্রথম লাইন ‘আমার সোনার বাংলা.....’ এর ঐতিহাসিক কার্যকারণ হচ্ছে এই যে এটা বঙ্গভঙ্গ রদ আন্দোলনের সময় রচিত হয় এক ও অবিভক্ত বাংলার বন্দনায়; আজকের বাংলাদেশ হচ্ছে সেই মূল বাংলা প্রদেশ এর অর্ধেক। এটা অনেকেরই জানা যে এই বন্দনা সঙ্গীত ১৯০৫ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচনা করেন যার একই সময় রচিত আর একটি বন্দনাগীত অর্থাৎ ‘জনগণ মন.......’ ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে ১৯৫০ সালে ভারত রিপাবলিক ঘোষিত হবার পর গৃহীত হয়। ইতিহাসে এটা স্পষ্টভাবে সন্নিবেশিত আছে যে প্রথম বন্দনা গীত ( যা বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সঙ্গীত) রচনা করা হয় বৃটিশ সরকার কর্তৃক বাংলাকে বিভক্ত করে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠণের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠন করতে বাঙালি হিন্দু কর্মীদের উজ্জীবিত করার জন্য। ইতিহাস স্বাক্ষী যে বাংলাকে অবিভক্ত রাখার হিন্দুদের সে আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল পশ্চিম বাংলা ও কলকাতার পশ্চাৎভূমি হিসেবে পূর্ব বাংলাকে শোষণ করার ক্ষেত্র অক্ষুন্ন রাখা এবং একই সাথে ১৯০৫ সনের বঙ্গভঙ্গের পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে সৃষ্ট ঢাকা কেন্দ্রিক পূর্ব বাংলার সামগ্রিক উন্নয়নের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করা। ঠাকুর এই বন্দনা গীত ১৯০৫ সনের ৭ই আগস্ট দুই বাংলা পুনঃএকত্রীকরণের দাবীতে কলকাতা টাউন হলে আয়োজিত গণ সমাবেশে প্রথম গেয়েছিলেন। [এম,এ, আজিজ, ক্যান দেয়ার বি ডিউরেবল পীস ইন দি সাব-কন্টিনেন্ট, ডাহুক পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ১৯৭৮ পৃ: ১৩]

বাঙালি জাতীয়তাবাদের নামে বঙ্গভঙ্গ রদ তথা অবিভক্ত বাংলার সে আন্দোলনের আর একটি লক্ষ্য ছিল হিন্দুত্ববাদীতার পুনরুজ্জীবন যার মধ্যে জাতীয় স্বাধীনতার কোন ব্যাপার ছিলনা। এই সম্পর্কে বাঙালি লেখক ও ঐতিহাসিক নিরোধ চন্দ্র চৌধুরী খুব চমৎকারভাবে কিছু কথা বলেছেন। নিরোধ বাবু লিখেছেন যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জাতীয়তাবোধ ছিল হিন্দুত্ববাদ থেকে উৎসারিত। [নিরোদ সি, চৌধুরী, আত্মঘাতী রবীন্দ্রনাথঃ আত্মঘাতী বাঙালী, দ্বিতীয় খন্ড, মিত্র এন্ড ঘোষ পাবলিশার্স (প্রাইভেট) লিঃ, কলকাতা, ১৯৯২, পৃ : ১০১]

বাঙালি হিন্দুদের জাতীয় অনুভূতির লক্ষ্যই ছিল মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার সৃষ্টি করা। তাঁর নিজ ভাষ্যঃ ‘হিন্দুতে যতটা না শ্রদ্ধা তার (রবীন্দ্রনাথ) ছিল তার চাইতে অনেক বেশী ছিল মুসলিম বিদ্বেষ অর্থাৎ হিন্দুরা যতটা না তাদের নিজ ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তার চাইতে বেশী তাদের ঘৃণাবোধ রয়েছে মুসলমানদের প্রতি।’ অত্যন্ত স্পষ্টবাদী নিরোধ বাবু সত্যের উন্মোচন করতে গিয়ে তার নিজ ভাষ্যে আরো বলেনঃ ‘বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের মধ্যে বাঙালির নবহিন্দুত্বের সর্বাত্মক প্রকাশ ঘটেছিল।’

জাতীয় কবির সাথে জাতীয় সঙ্গীতের বিরোধ

এটা অত্যন্ত কৌতুহলজনক যে বহু সংগ্রামী, ত্যাগ-তীতিক্ষাময় ও দিক-নির্দেশক সঙ্গীতের জনক কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত করে তাঁর রচিত দেশাত্ববোধক যে কোন একটি সঙ্গীতকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত করা যেতো; কিন্তু বাংলাদেশ তা করেনি। যে কেউ এর কারণ খতিয়ে দেখতে পারেন। অতি সঙ্গতভাবেই যে কাররই মনে এমন প্রশ্নের উদ্রেক হতে পারে যে, স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে কি রবীন্দ্রনাথের সে বিতর্কিত বন্দনা গীতটিকে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা ছাড়া আর কোন গত্যন্তর ছিল না ?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বৃটিশ যুগের সৃষ্ট জমিদারী প্রথার এক বড় ক্রীড়নক, যার জমিদারীতে মুসলমানরা নানাবিধভাবে শোষিত ও নির্যাতিত হয়েছিল। আর কাজী নজরুল ইসলাম, যার কাজী নামটি থেকেই এটা স্পষ্ট যে তিনি ছিলেন একটি বনেদী মুসলমান পরিবারের সদস্য; কিন্তু ছোটকাল থেকেই দারিদ্র্যপীড়িত পারিবারিক অবস্থার মধ্য দিয়ে তিনি বেড়ে উঠেন। সন্দেহ নেই যে, ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের একজন বড় কবি ছিলেন। কিন্তু তার জীবনাচারের ভিত্তি ছিল হিন্দুত্ববাদ এবং তার কবিত্বের মূল উৎস ছিল হিন্দুদের প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র উপনিষদ।

অনেকে বলে থাকেন যে, ঠাকুর ব্রাহ্ম ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন; কিন্তু এটা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয় যে ঠাকুরের ব্যক্তিগত ধর্মীয় বিশ্বাস কী ছিল। তবে ১৯০৫ সালে রচিত তার বন্দনা গীতটি ছিল অবিভক্ত বাংলা পুনঃ প্রতিষ্ঠায় উজ্জীবনমূলক এবং যে বন্দনাগীত এর প্রতিপাদ্য ছিল ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় উভয় দৃষ্টিকোন থেকে তদানীন্তন পূর্ব বাংলা প্রদেশ তথা আজকের বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের স্বাধীন ও সার্বভৌম সত্ত্বা, পরিচয়, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। যে কেহ সেই সময়কার ঐতিহাসিক কার্যকারণ ও বিষয়াদীর নিরাবেগ বিশ্লেষণ করলে এটা সহজেই অনুধাবণ করতে পারবেন যে শত বর্ষ পূর্বে দুই বাংলাকে এক ও অবিভক্ত রাখার লক্ষ্যে রচিত ঠাকুরের সে বন্দনা গীত এর মর্মবাণী ঠাকুরের নেতারা তথা ভারতীয় কংগ্রেস পার্টি ও হিন্দু মহাসভার নেতারাই পদাঘাত করেন; কেননা ১৯৪৭ সালে (অবশ্য তার কয় বছর আগে ঠাকুর মশাইয়ের মহাপ্রয়ান ঘটে) তারা পাকিস্তান রাষ্ট্র কাঠামোর বাইরে রেখে দুই বাংলার সমন্বয়ে স্বাধীন বৃহত্তর বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব প্রত্যাখান করে- যা বাংলার মুসলমানরা চেয়েছিল। অথচ ১৯৭১ সালে প্রবর্তিত ঠাকুরের সে বন্দনা গীতকে জাতীয় সঙ্গীতে অভিষিক্ত করা হয় যে গীত এর মর্মকথা হচ্ছে এক ও অবিভক্ত বাংলা। কি মর্মান্তিক বৈসাদৃশ্য!

ইসলাম ও মুসলিম বিরোধী দর্শন নির্ভর এই জাতীয় সঙ্গীত আওয়ামী লীগের অনেক সিনিয়ার নেতাও পছন্দ করেনি। কিন্তু তাদের কিছুই করার ছিলনা; যেহেতু তারা ভারতীয় প্রভূদের পা চাটা হিসেবে ছিল অসহায়। মুজিব কর্তৃক দেশের নাম হিসেবে প্রদত্ত বাংলাদেশ এর প্রতিও জনগণের কোন সমর্থন বা অনুমোদন ছিলনা। গুরুতর এই বিষয়ে জনগণের কোন সম্মতিও নেয়া হয়নি।

বাংলাদেশ নামটি নেয়া হয়েছে প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র পুরান ও মহাভারতে বর্ণিত ‘বঙ্গ’ থেকে-যা হিন্দুদের নিকট অতি প্রিয়; কিন্তু সচেতন মুসলমানদের নিকট কিছুতেই নয়; যেহেতু তারা ‘বঙ্গ’-এর নামের পটভূমি জানে। সেজন্য মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বাংলাদেশ এর স্থলে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান হিসেবে দেশটির নাম রাখার জন্য জোর দাবী জানিয়েছিলেন। জাতীয় পতাকার মধ্যে লাল সূর্য বহু দেবত্ববাদী হিন্দুদের কথিত সূর্য দেবতাকেই প্রতিভাত করে, যা আল্লাহর একেশ্বরবাদীতায় বিশ্বাসী মুসলমানদের নিকট কিছুতেই সুখকর হতে পারেনা। অন্যান্য জাতীয় প্রতীক, মনোগ্রাম, তঘমাতে মুসলমানদের ইতিহাস-ঐতিহ্য-বিশ্বাস-মূল্যবোধের কোন পরিস্ফুটন নেই; আছে বহুদেবত্ববাদী হিন্দুত্বের পরিস্ফুটন। এসব থেকে যে কোন সচেতন মানুষের পক্ষেই এটা স্পষ্টতই বোঝা সম্ভব যে, ১৯৭২ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত মুজিবের শাসনামলে গৃহীত তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিমালার আবডালে পরিকল্পিতভাবে ভারতীয়করণ ও হিন্দুত্বকরণের খেলাই চলেছে। যদিও ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের সফল অভ্যূত্থানের মাধ্যমে ভারতীয় ও হিন্দুত্বকরণের খেলা বন্ধ হলেও পরবর্তী সরকার সমূহের আমলে সে খেলার নানারূপে পুনরাভির্বাব ঘটে এবং তা অনেকটা পৌঁছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত ১৯৯৬-২০০১ সালের পাঁচ বছর সরকারের সময়কালে।

ক্ষমতা থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের পতনের যৌক্তিকতা

বাঙালি সংস্কৃতির ধারকবাহকরা ক্ষমতা বেশী দিন ধরে রাখতে পারেনি। কারণ তারা জনগণের অনুভূতি, আশা-আকাংখা ও গভীরভাবে আকড়ে রাখা আদর্শাবলীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলনা। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও জনগণ তাদের মৌলিক বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও জীবনাচারের অনেক কিছুই পরিত্যাগ করেনি। মুজিবের পতনের পিছনে তেমন কোন বিদেশী শক্তির প্রত্যক্ষ হাত বা কারসাজী নেই, আভ্যন্তরীন ব্যর্থতা তথা মুজিব নিজেই তার পতনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করেন; কারণ তিনি যাদের ভোটে ক্ষমতায় আরোহন করেন সে সাধারণ জনগণের আশা-আকাঙ্খা ও মূল্যবোধের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা বা সমীহ জানাতে তিনি ব্যর্থ হন। যার দরুণ তার নিজের লোকজন ও মুক্তিযোদ্ধারাই তাকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামায়। পতনের পর অভ্যুত্থানকারীরা যথার্থই বলেছিলঃ জনগণের বিশ্বাসের অমর্যাদা ও তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করার ম্যান্ডেট মুজিবকে কেউ দেয়নি এবং দেশ থেকে কোরানের বাণী, জাতীয় প্রতিষ্ঠান সমূহের মনোগ্রাম-তঘমা থেকে মুসলমানী প্রতীক ও চিহ্ন সমূহ অপসারণের জন্যে কোন মুসলমান মুজিবকে ভোট দেয়নি। মুজিব প্রবর্তিত ধর্মনিরপেক্ষতা ছিল সরাসরি মুসলিম আদর্শ, মূল্যবোধ এবং রীতিনীতির বিরুদ্ধে; অথচ তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতার কোন বিরোধীতা ছিলনা খৃষ্টীন, বৌদ্ধ ও হিন্দুদের বিশ্বাস ও জীবনাচারের সাথে। উদাহরণ স্বরূপ এটা উল্লেখ্য যে, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে মুসলিম নামাংকিত অথবা মুসলিম নামানুসারের মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর ছুরি চালিয়ে জাহাঙ্গীরনগর মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়, ফজলুল হক মুসলিম হল এবং ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ সলিমুল্লাহ মুসলিম হল সমূহের নাম থেকে মুসলিম শব্দ সমূহ ঝেটিয়ে বিদায় করা হলো; অথচ রামকৃষ্ণ হিন্দু মিশন অথবা ভোলানাথ হিন্দু একাডেমীর নাম-এ কোন পরিবর্তন করা হলো না; হলো না হলিক্রস কলেজ, নটরডেম কলেজ, সেন্ট গ্রেগরী স্কুল সহ বিভিন্ন খৃষ্টীয় ও হিন্দু প্রতিষ্ঠানের, যেগুলো বৃটিশ ও পাকিস্তান আমলের ন্যায়ই অপরিবর্তিত থাকে। প্রসঙ্গত এটা উল্লেখের দাবী রাখে যে, ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ভারতে কিন্তু এইভাবে কোন ধর্মীয় নাম বা প্রতীকে ছুরি চালানো হয়নি। হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় সেখানে জাতীয় কোন প্রতীক ও কোন প্রতিষ্ঠানে হিন্দুত্ববাদী প্রতীক চিহ্ন ব্যবহারে কোন বাধাই নেই। এমনকি উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে শুরু হওয়ায় সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলমানদের নামের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় আজও সে নামেই চলছে। অথচ বাংলাদেশ মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্ত্বেও এখানে জাতীয় প্রতীক, মনোগ্রাম, তঘমা কিংবা কোন প্রতিষ্ঠানে মুসলিম প্রতীক ও নিশানা ব্যবহার করা যায়না। ভারতপন্থীরা বরাবরই এই ক্ষেত্রে স্বাধীনচেতা হয়ে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেনি, কেননা তারা দিল্লীর হাতের পুতুল বা ক্রীড়নকের ভূমিকাই সব সময় গ্রহণ করে। জনগণ অবশ্য তথাকথিত ধর্ম নিরপেক্ষতা তথা অনৈসলামিকীকরণের লক্ষ্যে গৃহীত কোন পরিবর্তনকেই পছন্দ করেনি এবং করবে না। ফলে মুসলিম মূল্যবোধ, পরিচয় ও রীতিনীতির বিরুদ্ধে কোন আঘাতই অতীতে বিরোধীতা ছাড়া যায়নি এবং সে আঘাতকে প্রত্যাঘাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে। ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদীদের নানাবিধ অপকর্ম তাদেরকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং তাদের ক্ষমতার ভিত্তিকে নড়বড়ে করে দেয়। মুজিবের বিশাল জনপ্রিয়তার পটভূমিতে মাত্র অতি স্বল্প সময়ে তথা মাত্র সাড়ে তিন বছরে মুজিবের শাসন তথা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারক-বাহকরা পরাস্ত হয় তাদেরই হাতে, যারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের বিশ্বাস ও মূল্যবোধকে যে কোন মূল্যে উচ্ছৃকিত রাখতে বদ্ধপরিকর।

সীমান্তের বাইরে থেকে তাদের প্রভূদের মদদ ও পৃষ্টপোষকতায় বাংলাদেশের জনগণের অব্যাহত মুসলিম মূল্যবোধ পরাস্ত করার জন্য বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসীরা ১৯৭৫ সালের পর থেকে নানাবিধ অপচেষ্টা চালানো সত্ত্বেও টিকে থাকার মত কোন সাফল্য তারা লাভ করতে পারেনি। সীমান্তের বাইরে থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারকরা সর্বধরণের সহায়তা, পৃষ্টপোষকতা এবং বস্তুগতঃ সমর্থন লাভের পরও মুসলিম মূল্যবোধ, নীতি আদর্শ ও সংস্কৃতিকে তারা সাধারণ মানুষের পর্যায়ে পরাস্ত করতে পারেনি। তবে একদিকে মুসলিম মূল্যবোধের অব্যাহত অগ্রযাত্রা এবং অন্যদিকে দুইটি মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির চলমান দ্বন্দ্ব ও সংঘাত এর পরিণতি কে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন ?

বাংলাদেশে ইসলামী মূল্যবোধের শিকড় সহস্র বছর ধরে প্রোথিত

দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নতুন হলেও জনগণের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি বহু পুরনো। প্রায় সহস্র বছর ধরেই তারা স্থানীয় বাঙালি মূল্যবোধের উপর জয়ী হয়ে এসেছে। এটা নিতান্তই সহজাত যে কোন শক্তিশালী ও প্রগাঢ় মূল্যবোধ ঐতিহাসিক পরিক্রমনের মধ্য দিয়ে অপেক্ষাকৃত দূর্বল মূল্যবোধকে পরাস্ত করে যা প্রতিটি মানব সমাজেরই বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের মাটিতেও একই বাস্তবতার পুনরাবির্ভাব ঘটেছে। বাংলাদেশ অঞ্চলে মুসলমানদের আগমনের পূর্বে স্থানীয় মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি কেবল অতি প্রাচীনই ছিলনা; তা ছিল মানুষের সকল রিপুর দ্বারা সংক্রমিত। সামন্ত প্রভূদের শোষণ ছিল সে সব কথিত মূল্যবোধের ভিত্তি। সাধারণ মানুষের কোন অর্থনৈতিক বুনিয়াদ ছিলনা; এমনকি মানুষ হিসেবে তাদের অধিকারের কোন মানদন্ড ছিলনা। তবে এতদঞ্চলে মুসলমানদের আগমনের পর- যা হয়তো পীর-আওলিয়া-সুফিরা শুরু করেছিল অষ্টম শতকের শুরুতে কিংবা তের শতাব্দীতে বিজয়ী বীর ইখতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীর আমল শুরুর পর থেকে যে মূল্যবোধ, পদ্ধতি, মানবিক গুণাবলী চালু হয়, তার মধ্যেই মানবিকতার সঠিক দিক-নির্দেশ প্রতিফলিত হয়।

তবে মূল্যবোধের সে মানবিক রূপ পরিগ্রহ করা কুসুমাস্তীর্ণ ছিলনা। মূল্যবোধকে মানবিক রূপ পরিগ্রহ করতে হয়েছিল স্থানীয় মূল্যবোধের কায়েমী স্বার্থের পক্ষ থেকে সংগঠিত নানাবিধ প্রতিরোধ ও বহু সংগ্রামকে মোকাবেলা করার মধ্য দিয়ে; যে কায়েমী স্বার্থের উৎস ছিল হিন্দুত্ববাদ -যা ছিল মানুষের সমানাধিকার জীবন ধারণের স্বাধীনতা ও সম্পদ এর উপর সমান অধিকার এবং সকল নাগরিকের সমান স্বাধীনতার পরিপন্থী। স্থানীয় বাঙালি মূল্যবোধ ছিল হীনমন্যতা-উচ্চমন্যতাবোধ ও খাটি-দূষণে দোলায়িত; যার ফলে পুরুষ ও মহিলার মধ্যে উচ্চ ও নিম্নবর্ণের শ্রেণীভেদ প্রথা চালু করা হয়। হিন্দু বিশ্বাস মতের বর্ণভেদ প্রথা মানুষের সকল ধরণের মর্যাদা বিরোধী, যদিও বর্ণভেদী সেই সমাজ একই এলাকায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রতিবেশী হিসেবে বসবাস করে আসছে।

বাংলাদেশের মাটিতে ইসলামের আগমন ও প্রতিষ্ঠা বাইরে থেকে আসা হলেও সামাজিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি সম্পূর্ণ ভিন্নতরভাবে রূপ পরিগ্রহ করে। এটা সত্যি যে সবকিছু দ্রুত বা একরাতের ব্যবধানে পরিবর্তিত হয়নি। তবে ইসলামী বিশ্বাসের সাথে সম্পর্কিত মূল্যবোধের শক্তি এমনি যে এটা অনেক কিছুরই পরিবর্তন অতি দ্রুত তথা রাতারাতি কিংবা বলা যায় এক রাতের ব্যবধানেই ঘটিয়ে ফেলে। স্থানীয় অমুসলিম শাসকরা নতুন মূল্যবোধকে প্রতিরোধ করার সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বেও ইসলামিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির ঢেউ তাদের সব প্রতিরোধকে গুড়িয়ে দেয়। যার দরুণ ষোল শতাব্দীতে মোগল রাজত্বের মাঝামাঝি সময়তেই সারা ভারতীয় উপমহাদেশ মুসলিম মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির সর্বোচ্চ প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয়ে পড়ে। স্থানীয় পর্যায়ের কিছু কিছু সংস্কৃতির অস্তিত্ব থাকলেও তা প্রভাব সৃষ্টি করার সকল ক্ষমতা হারিয়ে ইসলামী মূল্যবোধের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের আওতায় আসে। এই সংস্কৃতি খাদ্যাভাস ও পোষাক-পরিচ্ছদ থেকে স্বাস্থ্যসম্মত বাসগৃহ নির্মাণ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

বর্ণ হিন্দুদের সহায়ক সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য বৃটিশদের উদ্যোগ

শাসক হিসেবে ভারতীয় উপমহাদেশে বৃটিশদের অভ্যুদয় ঘটার পর সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের অনুকূল এবং সে স্বার্থের সেবক হিসেবে নতুন এক মূল্যবোধ ব্যবস্থার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করার কোশেশ শুরু হয়। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এই কোশেশ শুরু হয় বাংলাদেশের মাটিতে নবনির্মিত শহর কলকাতাকে এর রাজধানী বানানোর মধ্য দিয়ে। তাদের প্রথম আক্রমণ ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার উপর। বৃটিশরা ৭০০ বছরের পুরনো এবং ভালভাবে সংগঠিত মুসলিম শিক্ষা ব্যবস্থা ১৮৩৩ সালে রাতারাতি বদলিয়ে ফেলে। তদস্থলে তারা ম্যাকলে মাইনিউটস বাস্তবায়নের দ্বারা প্রবর্তন করে এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার-- যার লক্ষ্য ছিল এইরূপঃ ‘রক্তে এবং রং-এ ভারতীয়, রুচিতে-মতাদর্শে-নৈতিকতায় এবং বুদ্ধিবৃত্তিতে ইংরেজ’ (জেপি নায়েক ও এস নুরল্লাহ ১৯৯৬ পৃ: ১০১) হিসেবে গড়ে তোলা। ১৮৩৭ সালে সরকারী ভাষা হিসেবে ফার্সী ভাষার বিলুপ্তির পর পরই ইংরেজীকে সরকারি ভাষার মর্যাদায় অভিষিক্ত করা হয়। ফলে এক রাতের ব্যবধানে ফার্সী শিক্ষিত মুসলমানরা অশিক্ষিত নিম্নশ্রেণীতে পর্যবসিত হয়। নব্য ইংরেজী শিক্ষিত স্থানীয় হিন্দুদের দ্বারা ফার্সী শিক্ষিত মুসলমানদের চাকরীচ্যুত করা হয়। আর এই সুযোগে ভাগ্যগড়ার পেশা এবং ইজ্জত সম্মান অর্জনের পথে ইংরেজী শিক্ষিত হিন্দুরা একচ্ছত্রভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

এটা অনেকেরই মনে থাকার কথা যে শিক্ষা ক্ষেত্রে পরিবর্তন, ১৭৯৩ সালে ভূমির ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা’ এবং মারাত্মকভাবে প্রবর্তিত ১৮৪১ সালের ‘সূর্যাস্ত আইন’-এর বদৌলতে মুসলিম ভূস্বামীরা এক রাতের ব্যবধানে নিঃস্ব ও ভূমিহীন-এ পরিণত হয়। মুসলমানরা অশিক্ষিত ও দরিদ্র হয়ে পড়ে। নেটিভ বা স্থানীয় বাঙালি ভদ্রলোক হিসেবে উচ্চ বর্ণ হিন্দুরা নতুন ভূস্বামী শ্রেণীই কেবল নয়; তদানীন্তন বৃটিশ ভারতের রাজধানী কলকাতা কেন্দ্রীক বিভিন্ন ইংরেজী শিক্ষিত পেশার লোকের অভ্যূদয় ঘটে। বৃটিশ শিক্ষা, পেশা বা বাণিজ্য নীতির সে লক্ষ্যই ছিল ‘বাঙালি ভদ্রলোক’ সৃষ্টি করা। এই লক্ষ্য অর্জনে বৃটিশরা ব্যাপকভাবে সাফল্য মন্ডিত হয়।

এই পর্যায়ের বাঙালি ভদ্রলোক হিসেবে বৃটিশদের পৃষ্টপোষকতায় অভ্যুদয় ঘটে উচ্চ বর্ণের হিন্দু ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, বঙ্কিম চন্দ্র চ্যাটার্জী, শরৎচন্দ্র চ্যাটার্জী, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, দ্বারকানাথ ঠাকুর প্রমুখ; যাদের পাশাপাশি সমসামায়িক কোন বাঙালি মুসলমান ভদ্রলোক ছিলেন না।

সহসাই সমগ্র ভারতের বিশেষত বাংলার মুসলমানরা বৃটিশ ভারতীয় উপমহাদেশের অপরাপর অনগ্রসর গরীব জনগোষ্ঠীর ন্যায় ভাগ্যবিড়ম্বনায় পর্যবসিত হয়ে বর্ণ হিন্দু ও শিক্ষিত স্বচ্ছল হিন্দুদের চাইতে অনেক পিছিয়ে পড়লো। বৃটিশ ঐতিহাসিক উইলিয়াম উইলসন হান্টার পর্যন্ত এটা স্পষ্টতই উপলব্ধি করলো যে এতে মুসলমানদের আহত করা হয় চরমভাবে। ১৮৭১ সালে সে ভারতে একশত বছরের বৃটিশ শাসনে কি দুর্ভোগ-দুর্দশা ও বদনসীব মুসলমানদের জন্য সৃষ্টি করা হয় তার প্রামাণ্য কিছু তথ্যাবলী সন্নিবেশিত করে হান্টার একটি অনবদ্য ইতিহাস রচনা করেন। পূর্ব বাংলা ছিল বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠী অথচ তাদের দারিদ্র্যের সাথে তুলনীয়ভাবে বর্ণ হিন্দুদের স্বচ্ছলতা ছিল অত্যন্ত লক্ষ্যনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ। ঐতিহাসিক হান্টার-এর নিজ ভাষ্য মতে। ‘১৭০ বছর আগে বাংলায় জন্ম নেয়া ভাল বংশজাত একজন মুসলমানের পক্ষে গরীব হয়ে যাওয়া অসম্ভব ব্যাপার ছিল; আর এখন কোন মুসলমানের পক্ষে তার স্বচ্ছলতা টিকিয়ে রাখাই অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ [ডব্লিউ, ডব্লিউ, হান্টার, দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস, প্রথম বাংলা সংস্করণ, বর্ণলিপি মুদ্রায়ণ, ঢাকা পুনঃমুদ্রিত ৫ম সংস্করণ (মূল পান্ডুলিপি প্রকাশ ১৮৭১), পৃ: ১৪১]

বাংলার সেই সময়কার সমগ্র অবস্থা সম্পর্কে হান্টার-এর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞান ছিল অনেক। কেননা তিনি ছিলেন সেই সময়ের বৃটিশ সরকারের একজন সিনিয়ার আমলা যার বাংলার সমসাময়িক পরিস্থিতির বিভিন্ন দিকের প্রকৃত তথ্য এবং জ্ঞান সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভের ছিল অবারিত সুযোগ। আর সেই সুবাদেই তার বইতে সন্নিবেশিত হয় সংশ্লিষ্ট ঘটনাপ্রবাহের মাঠ পর্যায়ের প্রামাণ্য তথ্যাবলী। কিন্তু তা সত্ত্বেও এমন কিছু সমালোচকের আবির্ভাব ঘটে যাদের মতে হান্টারের ঐ মন্তব্য নাকি ছিল ‘ভুল’! প্রসঙ্গত হান্টার তার মন্তব্যের অনুকূলে যে সব প্রামাণ্য উপাত্ত সন্নিবেশন করেন তা থেকে কিছু অংশ এখানে উল্লেখ করতে চাই। ১৮৭১ সালে বাংলার ২১১১ জন নিয়োগপ্রাপ্ত অধঃস্তন সরকারি কর্মচারীর মধ্যে ১৩৩৮ জন ছিলেন ইউরোপীয়, হিন্দু ছিল ৬৮১ জন আর মুসলমান ছিল মাত্র ৯২ জন।

ঐতিহাসিকরা এটা ভাল করেই জানে যে, ঐ সময়ের কোন কর্তৃপক্ষই হান্টার প্রদত্ত তথ্য ও উপাত্তবলী চ্যালেঞ্জ করতে পারবেনা। মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার পিছনে মুসলমানরা যে মোটেই দায়ী নয়, আমি এটা বলবোনা; আমি শুধু এটাই উল্লেখ করতে চাই যে, মুসলমানরা বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী এবং অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়কাল পর্যন্ত সকল দিক থেকে উন্নত সম্প্রদায় হিসেবে অবস্থান করার পর কিভাবে এত স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তাদের পতন ঘটলো এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বহু পিছনে পড়ে গেল ? এই সম্পর্কেও হান্টার বলেছেনঃ “ভারত ভূখন্ডের প্রাক্তন বিজেতারা দৃশ্যপট থেকে ছিটকে পড়ার পর ধন্যবাদের সাথে হিন্দুরা রুটি হালুয়ার ভাগ নিতে থাকলো আর ততদিনে ইংরেজরা দৃশ্যপটে কেবল কিছু গোমস্তা আর পুরোহিত নিয়ে আবির্ভূত হলো।”

যে সব মন্তব্য তথ্য এবং বর্ণনাদি এখানে উল্লেখ করা হলো তা থেকে এটা স্পষ্ট যে মুসলমানরা কেবল অর্থনৈতিকভাবেই নয়; পেশাগতভাবেও পিছনে পড়ে গেল ইংরেজী শিক্ষা থেকে নিজেদের দূরে রাখার কারণে, যার ফলে মুসলমানদেরকে প্রশাসনিক পদ আর ক্ষমতা থেকে সম্পূর্ণ হটিয়ে দেয়া হয়। উপমহাদেশে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদী শাসন-শোষণের সব চাইতে বেশী শিকার ছিল উপমহাদেশের মুসলমানরা কেননা তারা একই সাথে শোষিত ও নির্যাতিত হয় বৃটিশ ও তাদের দুষ্ট সাঙ্গাত বর্ণ হিন্দুদের নব্য বনিয়াদী শ্রেণীর কায়েমী স্বার্থবাজদের দ্বারা।

অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের যেভাবে পশ্চাৎপদতায় নিমজ্জিত শুরু হয় ১৯৪৭ সালে পূর্ব বাংলায় স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র অভ্যুদয়ের মাধ্যমে তার রাতারাতি অবসান ঘটেনি। অতীতের অনগ্রসরতা এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৃষ্ট জনগণের সামগ্রিকহীনমন্যতাবোধ এর মাঝে দোলায়িত হচ্ছিল দেশটি। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের (সিএসপি) একজন খ্যাতিমান কর্মকর্তা এবং বহু বইয়ের লেখক জনাব পিএ নজির তার স্মৃতিচারণে নথিবদ্ধ করেছেন মুসলমানদের হীনমন্যতার একাধিক নজীর। পঞ্চাশ ও ষাট এর দশকে পূর্ব পাকিস্তান প্রশাসনের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে জনাব পিএ নজীর সাধারণ মানুষের সন্নিধ্যে এসে অনেক কিছু অবলোকন ও বাস্তবে বুঝার সুযোগ লাভ করেন। তিনি দেখেছেন যে মুসলমানদের কেহ কেহ হীনমন্যতা থেকে বাঁচার জন্য তথা ভদ্রলোক তথা হিন্দু ভদ্রলোক সাজার জন্য ধূতি পরিধান করতো; যেই ধূতি ছিল বর্ণ হিন্দুদের পরিধান (পিএ নজীর স্মৃতির পাতা থেকে, ১৯৯৩, পৃ: ১০) মুসলমানদের এমন হীনমনতাবোধ অস্বাভাবিক ছিলনা। তথা ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত দুই শতাব্দীরও বেশী সময় ধরে বৃটিশ ও তাদের ভূত্য বরকান্দাজদের শাসন শোষণ থেকে সৃষ্ট ব্যাপক দারিদ্র্য, অনগ্রসরতা, ক্ষমতা হারানো এবং নিম্নশ্রেণীতে পর্যবসিত হওয়া থেকে এমন বোধের সঞ্চার হওয়া বরং স্বাভাবিক।

মুসলমানদের জাগরণঃ আলীগড় আন্দোলন

স্যার সৈয়দ আহমেদ খান প্রবর্তিত আলীগড় শিক্ষা আন্দোলন এবং পরবর্তীতে স্যার সৈয়দ আমীর আলী ও নবাব আবদুল লতীফ কর্তৃক সংগঠিত প্রায় একই ধরণের আন্দোলন ইংরেজী শিক্ষায় মুসলমানদের অগ্রগামী হওয়ার সুযোগ ও ক্ষেত্র সৃষ্টি করে। সে অগ্রগতিতে ছিল খুবই শ্লথগতি আর সারা ভারতে ইতিমধ্যে ইংরেজীতে শিক্ষা লাভকারী বর্ণ হিন্দু শ্রেণীর তুলনায় মুসলমানদের সে অগ্রগতি ছিল নিতান্তই নগণ্য।

উল্লেখ্য যে বাঙালি হিন্দুরা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তাদের জ্ঞাতিভাইদের তুলনায় ছিল অনেক অগ্রসর। এরই মধ্যে নতুন ধরণের এক বাংলা ভাষাকে বৃটিশরা পৃষ্টপোষকতা দিলে বাঙালি হিন্দুদের অগ্রগতিতে আর এক মাত্রার সৃষ্টি হয়।

বাংলাভাষার প্রতি বৃটিশদের এই পৃষ্টপোষকতার ফলে তাদের দেশে গড়ে তোলা ইংরেজ ভদ্রলোক শ্রেণীর ন্যায় এখানে বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে অভ্যুদয় ঘটে বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণী যা স্থানীয়ভাবে বাঙালি বাবু বলে বেশী পরিচিত। এই অবস্থা নতুন ধরণের বাংলাভাষা ভিত্তিক এক বাঙালি মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি। দৃশ্যতঃ ধর্ম নিরপেক্ষতার লেবেল-এ উক্ত যে ভাষার কারিক্যুলাম ছিল হিন্দু বিশ্বাস পদ্ধতির অবয়ব থেকেই উৎসারিত। এমনকি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় মডেল অনুকরণে স্থাপিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা সনদ ও কার্যক্রম-এ ধর্মনিরপেক্ষ নীতি আদর্শের কথা থাকলেও কারিক্যুলাম ছিল তার চাইতে অনেক দূরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মান্ধতা হিন্দু শিক্ষকরা পরিকল্পিতভাবে তাদের ধর্মশাস্ত্র থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সিলেবাস প্রণয়ন করতো। [মাসিক নতুন সফর, ডিসেম্বর, ১৯৯৬, পৃ: ৩১-৪৩-মাসিক মোহাম্মদী, কলকাতা, জৈষ্ঠ্য, ১৩৪৩ বি,এস, মে-জুন ১৯৩৭ সংখ্যা থেকে প্রদত্ত উদ্ধৃতি]

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের স্কুল কারিক্যুলামের অবস্থা ভিন্নতর কিছু ছিলনা, বরং প্রতিপাদ্য ইসলামের কাছাকাছিতো নয়ই; ছিল অনেক বেশী হিন্দুত্ববাদী। প্রায় সকল শিক্ষক হিন্দু হওয়ার কারণেই এমন কারিক্যুলাম ও সিলেবাস প্রণীত হয়। হিন্দুরা কিছু কিছু ইংরেজকে সাথে নিয়ে প্রশাসনের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন পদসমূহ করায়ত্ত্ব করে ফেলে। এই অবস্থা মুসলিম মানসে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সঞ্চার করে। ফলে নিজেদের মূল্যবোধ ও রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল মুসলমানরা আধুনিক ইংরেজী শিক্ষার প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে। এর ফলে মুসলমানরা আর এক ধাপ পিছনে পড়ে যায়।

পূর্ব বাংলার মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার আর একটি বড় কারণ হচ্ছে তারাই উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনে সব চাইতে দীর্ঘ সময় তথা ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল অর্থাৎ ১৯০ বছর ধরে উপনিবেশিক শাসন-শোষণে জর্জরিত জাতি। শোষণ উপনিবেশিক নির্যাতনে মুসলমানরা দারিদ্র্যে পর্যবসিত হওয়ার পাশাপাশি অজ্ঞানতায় নিমজ্জিত এবং মানসিক শক্তি হারিয়ে ফেলায় ভাগ্যবান বর্ণ হিন্দু ও কায়েমী স্বার্থবাজদের দ্বারা সর্বক্ষেত্রে পরাভূত হয়ে পড়ে। আর এই প্রক্রিয়ায় তারা তাদের পরিচয়, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি প্রায় হারিয়ে ফেলে। গত শতাব্দীর শুরুতে রাজনৈতিক দল হিসেবে মুসলিম লীগের অভ্যুদয় বিশেষত বাংলার মুসলমানদেরকে তাদের মুসলিম পরিচিতির পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে।

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ফল

মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতির মধ্যে সৃষ্ট দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের যৌক্তিক পরিণতিই সামাজিক সংঘাতের কার্যকারণ সৃষ্টি করে; যার পরিব্যপ্তি রাজনৈতিক অঙ্গনে অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে। ১৮৮৫ সালে সিনিয়ার কর্মকর্তা এলান অক্টাভিয়ান হিউমসহ বৃটিশ আমলাদের প্রবর্তনায় বর্ণ হিন্দুদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস যার মধ্য দিয়ে প্রকৃত অর্থে দুই এলিট চক্রের একটি আনুষ্ঠানিক সংঘের যাত্রা শুরু হয়। কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক লক্ষ্য যাকে পর্দার অন্তরালে রাখা হয়, তা ছিল উপমহাদেশে বৃটিশ উপনিবেশবাদী স্বার্থকে চিরস্থায়ী করা আর অন্য উদ্দেশ্য ছিল সংখ্যালঘু মুসলমানদেরকে অনগ্রসরতায় নিমজ্জিত রাখা। কংগ্রেস এর উদ্দেশ্য মুসলমানরা সঠিকভাবেই অনুধাবন করে বুঝলো যে মুসলমানদের কংগ্রেস-এ যোগ দেয়া হবে অর্থহীন। কিন্তু তা সত্ত্বেও পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত জনাব মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, এ, কে ফজলুল হক সহ কিছু মুসলমান নেতা কংগ্রেস-এ যোগ দেন। তবে বেশীর ভাগ মুসলমান নেতারাই নিজেদেরকে কংগ্রেস থেকে দূরে রাখে। আলীগড় শিক্ষা আন্দোলনের খ্যাতিমান নেতা স্যার সৈয়দ আহমেদ খান মুসলমানদের নিজেদেরকে কংগ্রেস থেকে দূরে থাকার জন্যেই হুঁশিয়ার করে দিলেন না; তিনি আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হবার পূর্বে মুসলমানদের কোন রাজনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত হতেও বারণ করে দিলেন। অনেকেই তার আহবান সাড়া দেন। সারা উপমহাদেশ থেকে মুসলমান ছাত্র আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ও একই সাথে ভাল মুসলমান হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে আলীগড় এঙ্গলো- মোহামেডান কলেজ-এ আসতে শুরু করে। স্যার সৈয়দ আহমেদ তার প্রণীত কারিক্যুলামে এমন পরিকল্পনা ও প্রত্যাশাই ব্যক্ত করেছিলেন। উক্ত কলেজ থেকে আধুনিক শিক্ষা লাভ করে প্রশিক্ষিত মুসলিম গ্র্যাজুয়েটরা বের হতে থাকে এবং কলেজেরও সমৃদ্ধি ঘটে এবং পরবর্তীতে যে কলেজ পরিণত হয় আজকের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে।

১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাঃ উদ্দীপনা ও দিক-নির্দেশ

কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার ২০ বছর পর মুসলমানরা তাদের নিজেদের রাজনৈতিক মঞ্চ প্রতিষ্ঠার জন্য জোটবদ্ধ হয়। সে মঞ্চ হচ্ছে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ, যার জন্ম লাভ ঘটে তখনকার সময়ের ইসলামিক ভাবধারা ও গুরুত্বের অন্যতম পীঠস্থান ঐতিহাসিক ঢাকা নগরীতে ১৯০৬ সালে। সেই সময়টি ছিল বিশেষ তাৎপর্যময়। কেননা ঢাকা তখন কয়েক শতাব্দী পর প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়। শুধু তাই নয়, নব গঠিত পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হিসেবে ঢাকায় তথা ঢাকা কেন্দ্রীক শিক্ষাগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক উন্নয়নের যে কার্যক্রম শুরু হয় তার মধ্যদিয়ে পূর্ব বাংলা ও আসামের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনে সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়; যার শুভ ফল মুসলমানরা নিকট ভবিষ্যতেই লাভ করে।

অনেক বেশী সংগঠিত ও শক্তিশালী কংগ্রেস এর পাশাপাশি নব গঠিত মুসলিম লীগ শুরুতে মুসলমানদের সম্প্রদায়গত স্বার্থ ও মূল্যবোধ রক্ষায় বৃটিশ শাসকদের সাথে দেন-দরবারের মধ্যেই নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখে। সেই সময়ে ঐ কৌশলই মুসলিম লীগের জন্য দিল যথার্থ; কেননা মুসলমানরা অর্থনৈতিক, শিক্ষা ও সামাজিকভাবে কেবল অনগ্রসরই ছিলনা, তারা ছিল সমগ্র উপমহাদেশে একটি ক্ষুদ্র সংখ্যালঘু সম্প্রদায়।

এম, কে, গান্ধীর যোগদানঃ কংগ্রেস সম্পূর্ণভাবে হিন্দুদের রাজনৈতিক ফোরামে পরিণত

এম, কে, গান্ধী বাস করতেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। প্রথমে তিনি সেখানকার একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন। পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশ সেনাবাহিনীতে স্থানীয় অর্থাৎ দক্ষিণ আফ্রিকানদের নিয়োগ দেয়ার কাজের এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং সর্বশেষ তিনি দক্ষিণ আফ্রিকান শ্রমিকদের একজন নেতা বনে যান। ইতিমধ্যে কংগ্রেস- এর রাজনীতি তীব্রতর রূপ পরিগ্রহ করে। বুদ্ধিমান পর্যবেক্ষকরা এটা উদঘাটন করেছেন যে কেমন কৌতুলউদ্দীপকভাবে লন্ডন এর গ্রেজ ইন-এ প্রশিক্ষিত ব্যারিষ্টার গান্ধী একজন নিবেদিতপ্রাণ হিন্দু সাধুতে নিজকে পর্যবসিত করেন। তিনি তার পরিচ্ছদ রাতারাতি বদলিয়ে ফেলে উইনষ্টন চার্চিলের যথার্থ বর্ণনা মত একজন নেংটা ফকিরের বেশ ধারণ করেন। একজন দরিদ্র মানুষের ন্যায় খেতে অভ্যস্থ হবার জন্য খাদ্যাভাস পরিবর্তন করেন। কিন্তু তার এই ব্যক্তিগত আচারাদি তেমন ঘৃণ্য খারাপ কাজ ছিলনা; কিন্তু ঘৃণ্য কাজ ছিল এই গান্ধী কংগ্রেস-এ যোগদান করে দৃশ্যত ধর্মনিরপেক্ষতার লেবাসধারী হলেও কংগ্রেসকে কার্যত একটা হিন্দু সংগঠনের পরিণত করে। গান্ধীর ঐরূপ উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার নিজের বক্তব্যের কিয়দাংশের উদ্ধৃতি প্রসঙ্গক্রমে দেয়া যায়।

১৯২০ সালের শুরুতে ভারতীয় খেলাফত আন্দোলনের পক্ষে কংগ্রেস এর সমর্থন জ্ঞাপনের পিছনে গান্ধীর উদ্দেশ্য ও স্বার্থ কি ছিল তাতে এর কিছু উল্লেখ আছে। ১৯২১ সালের ২১শে অক্টোবর ইয়ং ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত গান্ধীর নিজ স্বাক্ষরযুক্ত বিবৃতিতে গান্ধী স্পষ্টভাবে বলেন, ‘আমি দাবী করি যে উভয় খেলাফতের একটি সমধর্মী লক্ষ্য রয়েছে। মাওলানা মোহাম্মদ আলীর রয়েছে তার ধর্মীয় লক্ষ্যবোধ আর খেলাফতের পক্ষে আমার জীবন উৎসর্গ করার লক্ষ্য হচ্ছে মুসলমানের ছুরি থেকে গরুকে নিরাপদ করা যা- আমার ধর্ম।’ [এইচ,এম, সীরভাই, পার্টিশান অব ইন্ডিয়া, লিজেন্ড এন্ড রিয়ালিটি, ইম্মেনেম পাবলিকেশানস, বোম্বে, ১৯৮৯, পৃ: ১৩] এটা এখানে অবশ্যই উল্লেখের দাবী রাখে যে, জিন্নাহ মুসলিম নেতা হওয়া সত্ত্বেও গান্ধীকে খিলাফত আন্দোলনের জন্য সমর্থন করেননি; কেননা জিন্নাহ তখনও ভারতীয় রাজনীতির সাথে ধর্মকে মিশানোর ব্যাপারটা এড়িয়ে যেতে সচেষ্ট ছিলেন। অথচ গান্ধী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী কংগ্রেস এর ঘাড়ে সওয়ার হয়ে হিন্দু আবেগকে সমসাময়িক রাজনীতিতে অতি ধৃর্ততার সাথে ব্যবহার করেন।

বস্তুতঃ কংগ্রেস-এর রাজনীতিতে গান্ধীর হস্তক্ষেপ দলটিকে বেশী মাত্রায় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনে পরিণত করে। কংগ্রেস রাজনীতিতে গান্ধীর প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার অশুভ পরিণতিতে ভারতীয় রাজনীতিতে অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়। কারণ গান্ধী ১৯০৯ সালে লর্ড মেন্টো ও ১৯১৯ সালে মন্টেগু- চেমস ফোর্ড প্রণীত আইন মোতাবেক ভারতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসা পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিরোধীতা করা শুরু করেন। গান্ধীর সক্রিয় সাহায্যেই ১৯২৮ সালে মতিলাল নেহেরু রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যে রিপোর্ট ২০ বছর ধরে চালু থাকা সংখ্যালঘিষ্ঠদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থার অবমাননা করা পূর্বক পৃথক নির্বাচনের বদলে রিপোর্টে যৌথ নির্বাচন ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়; যার অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য ছিল বর্ণহিন্দুদের রাজনৈতিক অবস্থান ও মর্যাদা রক্ষা করা। অন্যদিকে মুসলমানদের নূন্যতম অধিকারের অবস্থান ধ্বংস করা।

হরিজন সম্প্রদায় তথা নিম্নবর্ণের অচ্ছ্যুত হিন্দুদের জন্য গান্ধীর তথাকথিত সহানুভূতি বা দরদ ছিল স্রেফ একধরণের ধাপ্পাবাজি। নেহেরু রিপোর্ট ভারতীয় জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতাদের কংগ্রেস থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং প্রকারান্তরে কংগ্রেস এর সাথে তাদের বিচ্ছেদ ঘটায়। নেহেরু রিপোর্ট প্রণয়নের পর পরই জিন্নাহ নিতান্তই দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বলেছিলেনঃ ‘এটা বিভাজনের রাস্তা তৈরী করে দিলো।’

জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগের পিছনে মুসলমানদের সংঘবদ্ধতা

উক্ত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে উপমহাদেশের মুসলমানদের জন্য তাদের অঙ্গীকার নবায়নের লক্ষ্যে মুসলিম লীগের ব্যানারে সংঘবদ্ধ হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে বিংশ শতাব্দীর ভারতের হিন্দু মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বহুল পরিচিত জিন্নাহ কংগ্রেস দল থেকে নিজকে সম্পূর্ণ গুটিয়ে নেন; এমনকি ভারতীয় রাজনীতি থেকেও দূরে সরে গিয়ে লন্ডনে অস্থায়ীভাবে বাস করতে শুরু করেন। অবশ্য পরে তিনি ভারতে প্রতাবর্তন করে ভারতীয় মুসলমানদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তিনি মুসলমানদের সুস্পষ্ট মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি রক্ষায় সুদৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করেন এবং কোন অবস্থাতেই হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমুদ্রে মুসলমানদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হিসেবে বিলীন হতে দিতে এতটুকুও চাননি। যদিও বৈদিক সংস্কৃতির উত্তরাধিকারের দাবীদার স্থায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুরা ততদিনে সকল অ-ব্রাহ্মণ সংস্কৃতি গিলে খেয়ে তাদের উদরপূর্তি করে ফেলেছিলো। কেবলমাত্র মুসলমান ও মুসলমানদের সংস্কৃতিই ছিল তার মধ্যে ব্যতিক্রম। উন্নততর মূল্যবোধ, রীতিনীতি ও সংস্কৃতির অধিকারী মুসলমানরা উপমহাদেশে সুস্পষ্টভাবে ভিন্নতর ও গর্বিত জনগোষ্ঠী হিসেবেই কেবল নিজেদের টিকিয়ে রাখেনি; তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উন্নত খাদ্য তৈরী, উন্নত পোশাক তৈরীর প্রযুক্তিজ্ঞান, উন্নত পোশাক পরিধানের অভ্যাস, নতুন ধরণের গৃহ ও স্থাপনা নিমার্ণ, সেনিটেশান, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সহ বহু কিছু শিখিয়েছে; যা পরবর্তীতে পশ্চিম ভারতের বহু উচ্চবর্ণের হিন্দুরাও গ্রহণ, অনুসরণ করে ও ব্যবহার করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, নেহেরু পরিবার অত্যন্ত গর্বের সাথে কেবল মুসলমানদের খাদ্যাভাসই নয়; বেশ-ভূষাও গ্রহণ এবং ব্যবহার করে -এই অজুহাতে যে নেহেরুরা ছিল মোগল শাসক ফাররুখ শিয়রের সময়কার একটি আধুনিক মুসলিম জায়গীরদারের বংশধর।

জিন্নাহ তার দক্ষতা দিয়ে ভারতীয় রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের পাশাপাশি পৃথক জাতি হিসেবে মুসলমানদেরও সুদৃঢ় অবস্থান প্রমাণ ও প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলমানরা যথার্থভাবেই জিন্নাহর আহবানে সাড়া দিয়ে তার পিছনে সবাই কাতারবদ্ধ হন। এই প্রক্রিয়ায় জিন্নাহর যথাযথ শ্রমের ফলে মাত্র দু’ বছরের ব্যবধানে ১৯৩৭ সনের নির্বাচনে মুসলমানদের প্রথম বিজয় অর্জিত হয়। মুসলমানদের এই অবস্থা আরো সুসংহত হয় যখন সাতটি প্রদেশে কংগ্রেস মন্ত্রী পরিষদ গঠন করার পর কংগ্রেস এর মুসলমান বিরোধী তিক্ত প্রচারণা তুঙ্গে পৌঁছে। উপমহাদেশের মুসলমানরা কংগ্রেস শাসন এর তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করে।

মুসলমান ছেলে-মেয়েদের স্কুল কলেজে বাংলার এক দুষ্ট সাম্প্রদায়িক কবি বঙ্কিমের রচিত বহু দেবত্ববাদী বন্দে মাতরম সঙ্গীত কণ্ঠস্থ করতে হতো যা তাদের ধর্ম ও বিশ্বাসের পরিপন্থী। অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস যে আজকের বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতও বন্দে মাতরম-এর আর একটি সংস্করণ যার প্রতিপাদ্য হচ্ছে জগতের শ্রষ্টার বদলে কেবল মাতৃভূমির বন্দনা করা। কংগ্রেস সরকার সমূহ এতেও ক্ষান্ত হয়নি। তারা হিন্দুদের সাথে স্কুলের মুসলমান ছাত্রদেরকেও গান্ধীর প্রতিকৃতিতে প্রণাম করতে নির্দেশ দেয় যা গান্ধীকে পুজারই নামান্তর, -যা করতে মুসলমান ছেলে-মেয়েরা অস্বীকৃতি জানায় যেহেতু তা ছিল তাদের ধর্ম বিশ্বাসের বিরোধী। সর্বোপরী যে যে প্রদেশে কংগ্রেস সরকার গঠন করে সে সব প্রদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারী ভবনে কংগ্রেস এর দলীয় পতাকা উড্ডয়ন করা হয়। [কে, কে, আজিজ, মুসলিমস আন্ডার দি কংগ্রেস রুল, ১৯৩৭-১৯৩৯: এ ডক্যুমেন্টারী রেকর্ডস, ভল্যুয়েম-২, ফ্রেন্ডস বুক হাউস, করাচী, ১৯৭৯, পৃ: ৪৩]

ঐতিহাসিক আর, কুপল্যান্ড তার ভারতীয় রাজনীতিঃ ১৯৩৬-৪২ শীর্ষক বইয়ে সাতটি প্রদেশে কংগ্রেস সরকার প্রতিষ্ঠিত হবার পর মুসলমানদের শাসরুদ্ধকর নিদারণ দুরাবস্থার কিছু সংক্ষিপ্ত বর্ণনা সন্নিবেশন করেন। তিনি তার বইয়ে লিখেছেনঃ ‘গ্রামাঞ্চলে গো জবাই নিষিদ্ধ করা হয়, -যা ছিল সেখানকার চিরদিনকার প্রথা। মুসলমান কসাইদের হিন্দুরা যততত্র মারধর করতো। মসজিদ সমূহে শুকর ছেড়ে দেয়া হতো। মুসলমানদের নামাজে আহবানসূচক আযান দেয়া বন্ধ করে দেয়া হয় কিংবা বাধাগ্রস্ত করা হয়, মুসলমানদের দোকান পাট থেকে হিন্দুরা কেনাকাটা বন্ধ করে দেয়। গ্রামের পানির কুপ থেকে পানি ব্যবহারে মুসলমানদের বাধাগ্রস্ত করা হয়। বয়স এবং লিঙ্গ নির্বিশেষে মুসলমানদের উপর যততত্র হামলা চালানো শুরু হয়। [জামিল ওয়াস্তী, মাই রেমিনিসেন্সেস অব চৌধুরী রহমত আলী, এশিয়া প্রিন্টার্স এন্ড পাবলিশার্স, করাচী, ১৯৮২ (প্রথম সংস্করণ) পৃ: ১০৫]

এই ছিল কংগ্রেস শাসিত সাতটি প্রদেশে হিন্দুদের দ্বারা মুসলমানদের নির্যাতনের সামান্য চালচিত্র। এই অবস্থা বিশ্লেষণ করলে যে কারুরই এটা অনুধাবন করার কথা যে বৃটিশরা যদি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের হাতে ভারতের কর্তৃত্ব ছেড়ে দিয়ে যেতো তাহলে সমগ্র ভারতে মুসলমানদের অবস্থা কি দাঁড়াতো! সৌভাগ্যবশতঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট ভীতি ও হতাশার প্রেক্ষাপটে কংগ্রেস মন্ত্রীসভার পতন ঘটে। মুসলিম লীগ কংগ্রেস মন্ত্রীসভা সমুহের পতনে আনন্দিত হয় এবং ১৯৩৯ সালের ২২ ডিসেম্বর দিকে কংগ্রেস মন্ত্রীসভার পতনের দিনকে নাজাত দিবস হিসেবে ঘোষণা ও পালন করে।
কংগ্রেস মন্ত্রীসভার ব্যার্থতা মুসলমানদের ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করে এবং তারা তাদের পৃথক রাজনৈতিক অস্তিত্ব উচ্ছকিত করা পূর্বক নিজস্ব মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি রক্ষায় পৃথক রাজনৈতিক কর্মসূচী বাস্তবায়ন করতে থাকে।

লাহোর প্রস্তাবঃ মূল্যবোধ ও রাজনৈতিক স্বার্থ সংঘাতের পরিণতি

১৯৪০ সালের ২৩ ও ২৪ শে মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে গৃহীত হয় ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাব যা পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

পৃথক সমাজ বিনির্মাণের মাধ্যমে নিজস্ব স্বকীয়তা ও মুসলিম মূল্যবোধ রক্ষার প্রত্যয়ে ভারতের মুসলমানরা ১৯৪৭ সালে নিজেদের পৃথক আবাসভূমি হিসেবে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে একটি বিষয় গুরুত্বের সাথে উল্লেখের দাবী রাখে যে, তদানীন্তন ভারতের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশসমূহের চাইতে বাংলার মুসলমানরা পাকিস্তান আন্দোলনে ছিল বেশী অগ্রগামী, যার দরুণ ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বাংলার ৯৭ শতাংশ মুসলমান ভোটার পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পক্ষে রায় প্রদান করে। মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশের মুসলমানরা একইভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় তাদের সুদৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রতি মুসলমানদের এই সমর্থন অহেতুক ছিলনা। ঐসব অঞ্চলে মুসলমানরা তাদের প্রতিবেশী বর্ণ হিন্দুদের হাতে নির্মমভাবে নির্যাতিত হতো। উল্লেখ্য যে বৃটিশ শাসনের সুবাদেই তাদের এলাকার বর্ণ হিন্দুদের ভাগ্যের চাকা খুলে গিয়েছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে কর্তৃক বৃটিশ কেবিনেট মিশন পরিকল্পনা ও আবুল হাশিম, শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী ও শরৎ বোস উদ্ভাবিত স্বাধীন যুক্ত বাংলা প্রতিষ্ঠার প্রতি শুরুতে জিন্নাহর আপোষমূলক দৃষ্টিভঙ্গী ছিল বটে; কিন্তু তার মধ্যে এটা ধারণা করার কোনই অবকাশ নেই যে জিন্নাহ মুসলমানদের স্বতন্ত্র মূল্যবোধ প্রথা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় পরিত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। ক্যাবিনেট মিশন প্লান মোতাবেক ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম জোন ছিল স্পষ্টতই মুসলিম প্রধান এলাকা আর মধ্যাঞ্চল ছিল হিন্দু প্রধান এলাকা। আর মিশন প্লান বাস্তবায়িত হলে মুসলিম প্রধান এলাকাসমূহের স্বশাসন এবং স্বায়ত্বশাসনে স্পষ্টতই মুসলিম সাংস্কৃতিক স্বাধীকারই পরিস্ফুটিত হয়ে উঠতো। সমভাবে বৃহৎ বাংলার ধারণাও বিকশিত হতো; যেহেতু সেই ব্যবস্থাতেও মুসলিম মূল্যবোধ ও রাজনীতি পরিস্ফুট হবার সম্ভাবনা ছিল। এটা রেকর্ড-এ আছে যে এক পর্যায়ে জিন্নাহ এই মর্মে মন্তব্য করেছিলেন যে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বাধীন দেশ বৃহৎ বাংলা ভবিষ্যতে পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশ পাকিস্তানের সাথে অবশ্যই সুসম্পর্ক গড়ে তুলবে। জিন্নাহ’র এতদসংক্রান্ত প্রকৃত বাক্যটি ঐতিহাসিক হডসন তার বইতে উল্লেখ করেছেন। ‘তারা (পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা) অবিভক্ত ও স্বাধীন থাকাই উত্তম। আমি নিশ্চিত যে তারা পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলবে।’ [এইচ, ভি, হর্ডসন, দি গ্রেট ডিভাইডঃ বৃটেন-ইন্ডিয়া-পাকিস্তান, হাটচিনসন, লন্ডন, ১৯৬৯ পৃ: ২৪৬]

কিন্তু নেহেরুর নেতৃত্বে কংগ্রেস বাংলাকে যেকোনভাবে হোক বিভক্ত করার জন্যে গোঁ ধরলো। বস্তুতঃ নেহেরু উদ্দেশ্য অন্য কিছু ছিলনা; সে বাংলাকে বিভক্ত করতে উঠে পড়ে লাগলো এই কারণে যে ভারত বিভাগের পর পূর্ব বাংলা ভারতের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলবে। কেননা তার বিশ্বাস ছিল দেশ বিভাগের ফলে সৃষ্ট নানাবিধ পরিস্থিতিতে বছর কয়েকের মধ্যেই পূর্ব বাংলা ভারতের সাথে মিশে যাবার ক্ষেত্র সৃষ্টি করবে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাঃ মূল্যবোধ ও স্বার্থ সংঘাতের আর এক পরিণতি

১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত ভারতীয় রাজনীতিতে চল্লিশের দশকের ঘটনাপ্রবাহ কত দ্রুতগতিতে পরিবর্তিত হয়েছে তা যে কেউই সম্ভবত অনুমান করতে পারবে। বস্তুতঃ পুরোপুরিভাবে লাহোর প্রস্তাব কিংবা বৃহত্তর বাংলার ধারণা কিংবা কেবিনেট মিশন প্ল্যান কোনটাই গৃহীত হয়নি; তবে চূড়ান্ত ফল ছিল একক ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে পাকিস্তানের অভ্যুদয়।

১৯৪০ সালে লাহোরে পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করে সেই সময়কার বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক আর ১৯৪৬ সালের ৯ই এপ্রিল দিল্লীতে অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের সাংসদদের সম্মেলনে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব উত্থাপন করেন সেই সময়কার বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী আর দুই অধিবেশনেই সভাপতিত্ব করেন মুসলিম লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। উভয় প্রস্তাবই ছিল এক ও অভিন্ন পাকিস্তানের প্রস্তাব, যার মধ্যে কোন অস্পষ্টতা ছিলনা (বেগম শায়েস্তা এস, ইকরামউল্ল্যাহ ১৯৯১ পৃ: ১৩০-৩১)। মাঝে এক হাজার মাইলের দুস্তর ব্যবধান নিয়ে অবশেষে বৃটিশ ভারতের পশ্চিম ও পূর্ব প্রান্তের দুই ভূখন্ড নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকিস্তান। মাঝখানে থেকে যায় শত্রুভাবাপন্ন ভারত। এক ব্যতিক্রমধর্মী ভৌগলিক অবয়ব নিয়ে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানকে থেকে শুরু থেকেই ভারতের সব ধরণের শত্রুতাকে সামলাতে হয় এবং নিয়মিত বিরতিতে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের মোকাবেলা করতে হয়। এতদসত্ত্বেও ভারতের সাথে তুলনামূলকভাবে অনেক ছোট দেশ এবং দুই খন্ডে অদ্ভূত এক ভৌগলিক অবয়বে জন্ম নেয়া পাকিস্তান প্রায় সিকি শতাব্দী ব্যাপী এক ও একটি সুসংহত রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকে। শুধু তাই নয়; এই সময়ের মধ্যে স্বাধীন ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের দুই অংশের উন্নয়ন ছিল দর্শনীয়। যেখানে পাকিস্তানের শুরুতে বলতে গেলে কিছুই ছিল না; সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের জীবনের মান উন্নয়ন ছিল চল্লিশের দশকের দুঃখভারাক্রান্ত অবস্থার চাইতে অনেক উন্নত; যে চল্লিশের দশকের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে (১৯৪৩-৪৪) বাংলায় ৫০ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল।

তবে পাকিস্তানের উভয় অংশের মধ্যকার দ্রুত উন্নয়নকে ঘিরে পূর্ব পাকিস্তানের এক শ্রেণীর মানুষ ভুল বুঝতে শুরু করে। তারা পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নের সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের কোন কোন অঞ্চলের উন্নয়নের তুলনা করতে থাকে। এই ভুল বুঝার কারণ ছিল অংশত জ্ঞানের স্বল্পতা কিংবা শুন্যতা আর অংশত ছিল পাকিস্তানের কোন কোন এলাকায় উন্নয়নের গতি বেশী মাত্রায় লক্ষ্যনীয় হয়ে উঠায়।
এই প্রসঙ্গে মরহুম প্রফেসর ডঃ সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন মুখে শুনা একটি ঘটনার কথা আমার মনে পড়ে। মরহুম প্রফেসার সাজ্জাদ হোসেন ১৯৪০ এর দশকে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের শিক্ষক থাকাকালে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব তার ছাত্র ছিলেন। ১৯৫০ সনের মাঝামাঝি সময়ে তখনকার পাকিস্তানের রাজধানী করাচীর শহর কেন্দ্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ইংরেজীর শিক্ষক ডঃ সাজ্জাদ হোসেনের সাথে শেখ মজিবের সাক্ষাত হলে তিনি সাজ্জাদ সাহেবকে এটা বোঝানোর চেষ্টা করেন যে করাচীর সুন্দর সুন্দর সড়ক ও ভবনসমূহ পূর্ব পাকিস্তানের পাট বিদেশে রপ্তানী করে অর্জিত আয় থেকে নির্মিত হয়েছে। ইতিহাস সম্পর্কে ন্যুনতম জ্ঞান বা ধারণা যাদের আছে তারা জানেন যে করাচীর উন্নয়ন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরে নয়; বহু আগ থেকেই এমনকি উপমহাদেশে বৃটিশ শাসন শুরু হবারও আগ থেকে এতদঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন বন্দর নগরী হিসেবে করাচীর উন্নয়ন ঘটে।

পূর্ব পাকিস্তানের বিচ্ছিন্নতাঃ মূল্যবোধ ও স্বার্থ সংঘাতের আর একটি পরিণতি

পূব পাকিস্তানের মধ্যবিত্ত শ্রেণী যারা ১৯৪৭ সালের অনতিকাল পরেই সীমান্তের ওপারের পশ্চিম বাংলা, ত্রিপুরা ও ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের চাইতে অনেক বেশী স্বচ্ছলতা লাভ করেন তাদের মধ্যে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশ না থাকার বেদনার অভিযোগ থেকে এক ধরণের ক্ষোভের উদ্ভব ঘটে। এই ক্ষোভকে রাজনৈতিক আন্দোলনে বিকশিত করা হয় যার ফল ঘটে ১৯৭০ এর নির্বাচনের ফলাফলে এবং যা প্রকারান্তরে ১৯৭১ সালের গৃহযুদ্ধে পর্যবসিত হয়। সেই গৃহযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, গণতান্ত্রিক পন্থায় রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন, উন্নততর অর্থনৈতিক অবস্থা কায়েমের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতায় অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠা অথবা কারো মতে অর্থনৈতিক ন্যায়ানুগতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের দুর্ভাগ্যক্লিষ্ট সাধারণ মানুষের ভাগ্যন্নোয়ন প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার কারণে অথবা দিল্লীর নিকট পূর্ব পাকিস্তানের আত্মসমর্পনের পর থেকে আজ অবধি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত ভাগ্যন্নোয়ন ঘটেনি। আসলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নিবুর্দ্ধিতা, বিভিন্ন ইস্যুকে উঠিয়ে স্বল্প সংখ্যক বিচ্ছিন্নতাবাদীর মজা লুটা এবং সর্বোপরী ১৯৪৭ সালের পর থেকে ভারতের মারাত্মক অনিষ্টকর অভিপ্রায় -যা হিন্দু ও ইহুদীদের আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের দ্বারা লালিত ছিল; এই সব কিছুর সম্মিলিত অপপ্রয়াস ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের পতন ডেকে আনে। ১৬ ডিসেম্বরের পরপরই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ বেদনাত্মক বিস্ময়ে মুষড়ে পড়ে। পূব পাকিস্তানে ভারতের অধিপত্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জনগণ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল এ,কে, নিয়াজীর আত্মসমর্পনের পর থেকেই প্রতিরোধ শুরু করে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী ১৯৭১ সালের সংঘাতকালীন সময়ের বিভিন্ন পর্যায়ে অপদস্থ হয়ে বিজয় ও পরাজয়ের পূর্ব পরিকল্পিত নাটকের অংশ হিসেবে তথাকথিত আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া প্রত্যাখান করায় ভারতীয় জেনারেল আরোরা বিজয়ী বাহিনীর অধিনায়ক হিসেবে অভিষিক্ত হোন। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ২০০ মাইল দূরে সিলেটের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে ওসমানীর অবস্থানের কারণ ছিল ওটাই। তার অনুপস্থিতি সঙ্গত কারণেই একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, যার অর্থ ছিল জবরদখল হওয়া পূর্ব পাকিস্তান ভূখন্ড আইনানুগভাবে বিজয়ী ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিকটই আত্মসমর্পন করে। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ভাগ্য সেই মুহুর্ত থেকেই দিল্লীর নিকট বন্ধক হয়ে যায়। পরবর্তীতে অবশ্য আন্তর্জাতিক জনমতের চাপে ভারতীয় বাহিনী প্রত্যাহৃত হলেও গর্বিত বিজয়ী বেসামরিক জেনারেল ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে ঢাকা সফরে এসে এমন এক চুক্তিপত্র শেখ মজিবুর রহমানকে দিয়ে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়; যার সুবাদে বাংলাদেশের উপর ভারতের পূর্ণ কর্তৃত্ব এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সর্বধরণের আগ্রাসন এস্তেমাল করার অধিকার লাভ করে ভারত। ফলে কেবল শ্রুতিমধুর স্বাধীন বাংলাদেশ বাস্তবে ভারতের একটি করদ রাজ্যে পর্যবসিত হয়। ভারতের অসৎ অভিপ্রায়-এর বিকাশ সাধন ও অসহায়ের মত তা তোষণ করতে দিল্লীর পুতুল ও শো বয় এর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় শেখ মুজিব যে সম্পর্কে শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী বহু পূর্বেই ভবিষ্যতবানী করেছিলেন। ১৯৬২ সালে কারারদ্ধ থাকাকালীন সময়ে করাচীর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে লেখা এক চিঠিতে শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী বলেছিলেন আমার নিকট পাকিস্তান এক ও অবিভাজ্য---পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হলে সামান্য পুলিশী এ্যাকশনেই পরাভূত ও ধ্বংস হয়ে যাবার ভয়াবহ বিপদে নিপতিত হবে (বিএসএস ইকরাম উল্লাহ’র বই পৃ : ১৭৩)। দিল্লীর পুতুল মজিব ও তার ভুঁইফেড় ধনী রাজনৈতিক সাঙ্গাত, যারা নিঃস্ব ও দরিদ্র অবস্থা থেকে জাতীয় সম্পদ লুট, দেশপ্রেমিকদের দল ও তাদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস লেলিয়ে দিয়ে এবং পাকিস্তান জাতীয়তাবাদী মানুষের সহায়-সম্পত্তি লুটপাট করে রাতারাতি নিজেদের ভাগ্য গড়ে তোলে। দেশপ্রেমিক ব্যক্তি ও দল সমূহের অপরাধ ছিল তারা বৈদিক পুরনো ভারতীয় মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির নিকট তাদের নিজেদের মহৎ মুসলমানী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিতে চায়নি।

ভারতীয়করণের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীদের প্রতিরোধ

দেশপ্রেমিকদের ভোগান্তি অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও সন্দেহ নেই যে তারা তাদের সাধ্যানুযায়ী অব্যর্থভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। এই অব্যাহত প্রতিরোধ কেবল আভ্যন্তরীনভাবেই নয়; দেশের বাইরেও এমনকি ১৯৭১ সালের প্রথম দিকেই লন্ডনে গড়ে উঠে। দেশের ভিতরে ভারতীয় প্রভূত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ১৬ই ডিসেম্বর চূড়ান্ত পরিণতি তথা ঢাকা পতনের পর পরই শুরু হয়। সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পন দিন কয়েকের মধ্যেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়া মেজর জলিল তার বন্দুক ভারতের দিকে তাক করে। এটা এমনিতেই ঘটেনি। বিজয়ী ভারতীয় সেনাবাহিনী যখন বাংলাদেশে নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্র থেকে শুরু করে অস্ত্র সস্ত্র, মেশিন পত্রাদি, গাড়ী, যন্ত্রপাতি ইত্যাদি ব্যাপকভাবে লুটতরাজ শুরু করে তখনই মেজর জলিল তা প্রতিরোধ করতে এগিয়ে যায়।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর লুটপাট প্রতিরোধ করার অপরাধে মেজর জলিলকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কমান্ড থেকে সরিয়ে তাকে গ্রেফতার ও অন্তরীন করা হয় এবং জেল থেকে তার ছাড়া পাবার পরও বহুবার তাকে গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ করা হয়। অন্যান্য কিছু দেশপ্রেমিক শক্তি গোপন তৎপরতায় লিপ্তু হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। ১৯৭২ সালের ১৬ই ডিসেম্বর অর্থাৎ পাকিস্তান পতনের প্রথম বার্ষিকীতেই সিরাজ শিকদারের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি ১৬ ডিসেম্বরকে কালো দিবস অভিহিত করে ঢাকা সহ দেশের সর্বত্র সাফল্যের সাথে অর্ধ দিবস হরতাল পালন করে। অন্যান্য দেশপ্রেমিক শক্তিও বিশেষত আবদুল মতিনের নেতৃত্বে এক গ্রুপ, আবদুল হকের নেতৃত্বে আর এক গ্রুপ আবার তোহার নেতৃত্বেও একটি গ্রুপ ভারতীয় অধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এরা সবাই বাম দেশপ্রেমিক শক্তি বলে পরিচিত হলেও এই অবস্থান তারা স্পষ্টতই গ্রহণ করে এই কারণে যে বাংলাদেশ কেবল ভারতীয় প্রভূত্বেরই শিকার নয়, বাংলাদেশী জনগণের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি ভারতের অমানবিক ব্রাহ্মণ্যবাদের হুমকিরও শিকার বটে।

ভারতীয়করণের বিরুদ্ধে লন্ডনে দেশপ্রেমিকদের তৎপরতা

ভারতের আধিপত্য থেকে বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য লন্ডনেও বেশ কয়েকটি দেশপ্রেমিক গ্রুপ তৎপর হয়। লন্ডনে প্রবাসী পাবনার চান্দাইকোনার ব্যারিষ্টার আলী মোহাম্মদ আব্বাসের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ প্রবাসী সরকার গঠণ করে। [এম, ওয়াই, আখতার, আলী মোহাম্মদ আব্বাসঃ এ গ্রেট সন অব পাকিস্তান, পাকিস্তান হাউস, ৩৩, টেভিসটক স্কয়ার, লন্ডন, ১৯৭৯ ; মাসিক আল-হিলাল, লন্ডন, ১৯৮৬ ও ১৯৮৭ সংখ্যা সমূহ]

আর একটি গ্রুপ কুমিল্লার নবীনগরের মরহুম ডঃ মতিউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত হয়। তার সাথে তার বন্ধু নঈম হাসান সহ অনেকেই ছিলেন এবং তারা বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পূর্বক তাদের অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে লিফলেট, সাময়িকী ইত্যাদি প্রকাশনার মাধ্যমে তুলে ধরে। তাদের ‘দি স্ক্যানার’ নামে একটি পাক্ষিক, সাপ্তাহিক আওয়াজ, সাপ্তাহিক নিশা, মাসিক মনিটর ইত্যাদি প্রকাশনা ছিল। এছাড়াও অন্যান্য কিছু কিছু গ্রুপও ছিল যারা অন্যান্য ফোরামে কাজ করতো।

পূর্ব বাংলার আজাদী আন্দোলন বলে দেশপ্রেমিকদের একটি সংগঠন গড়ে তোলেন জনাব চৌধূরী মঈন উদ্দিন। তিনি ‘বাংলার কথা’ বলে একটি সাময়িকীও প্রকাশ করতেন। শেখ মজিব সরকারের একছত্র, অত্যাচারী ও নৃশংস ফ্যাসিষ্ট শাসন সত্ত্বেও দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে ভারতীয় অধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতিরোধ আন্দোলন চলতে থাকে।

দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতিরোধ রাজনৈতিক শক্তি অর্জনের পাশাপাশি মুসলিম মূল্যবোধ, প্রথা-পদ্ধতি ও স্বাতন্ত্র্য ভিত্তিক সংস্কৃতি রক্ষায় সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করে; যা মুজিব তার ভারতীয় প্রভূদের পৃষ্টপোষকতা ও সমর্থনে দেশ থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করতে চেয়েছিলো। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে পতন হওয়ার আগ পর্যন্ত জনগণ প্রত্যক্ষ করলো মুজিবের সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসনে দেশকে অনৈসলামিকীকরণের অপচেষ্টা আর তাদের ঐতিহ্যবাহী মুসলিম সমাজকে পদদলিতকরণ। ইসলামের বিভিন্ন দিক-এর প্রতি মুজিবের খড়গহস্ত কামাল আতার্তুককেও হার মানায়। সব সরকারী, শিক্ষা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ইসলামী ভাবধারাপ্রসুত প্রতীক ও মনোগ্রাম বদলিয়ে তদস্থলে হিন্দু ধর্মীয় ভাবধারার প্রতীক ও মনোগ্রাম প্রতিস্থাপন করা হয়। সরকারী মিডিয়া এবং অনুষ্ঠানসমূহে কোরান তেলাওয়াতের রেওয়াজ বিলুপ্ত করা হয়। শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের প্রতীক-মনোগ্রাম থেকে কোরানের আয়াত মুছে ফেলে সেখানে এমন সব বাক্য ও মূলমন্ত্র লাগানো হয় যার সাথে কোরানের আয়াতের কোন তুলনাই হয়না। আমি দৃষ্টান্ত সহকারে পূর্বে উল্লেখ করেছি যে, কিভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার বজ্র আটুনিতে মুজিব ভারতের প্রচারণায় ইসলামের বিরুদ্ধে নানাবিধভাবে খড়গহস্ত হয়েছিলো। প্রতিরোধ এবং আভ্যন্তরীন জনমতের চাপে এক পর্যায়ে বাংলাদেশ রেডিও ও টেলিভিশনে কোরান তেলওয়াত শুরু করা হলেও ধর্মনিরপেক্ষতার আর এক সংস্করণ মোতাবেক কোরান পাঠের সাথে সাথে হিন্দু সহ অন্যান্য ধর্মান্ধবলম্বীদের ধর্মশাস্ত্র পাঠ করাও চালু করা হয়। ১৯৭১-উত্তর সরকার বাংলাদেশে মুসলমানদের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা ব্যবস্থা তথা মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধ করতে উদ্যোগী হয়; কিন্তু তীব্র জনমতের চাপে তারা তা করতে সমর্থ হয়নি। ভারতকে পুনরায় একত্রীকরণ তখা অখন্ড ভারত প্রতিষ্ঠার জন্যে ভারতের অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে দেশপ্রেমিক জনগণের ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ার পর অতি অল্প সময়ের মধ্যে ভারত তার কৌশল বদলিয়ে ফেলে এবং বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে বিশেষত শিক্ষা কারিক্যুলাম, মিডিয়া, সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও প্রশাসনে নাক গলানো ও হস্তুক্ষেপ করে। এই হস্তক্ষেপ-এর ধরণ ও প্রকৃতি এত ব্যাপক যে আমার পক্ষে তার পূর্ণ বিবরণ দেয়া সম্ভব নয়। তবে এত এইটুকু জোরের সাথেই বলা যায় যে, পরিকল্পিতভাবে ভারতীয়করণের জন্য যে অপপ্রয়াস অব্যাহতভাবে চলছে এই যাবতকালের সকল সরকারই তা অনুসরণ করে আসছে। প্রশাসনের সর্বোচ্চ ব্যক্তিরা এই প্রক্রিয়ার ভবিষ্যত পরিণতি সম্পর্কে কিছু আঁচ করতে পারেন কিনা এটা অবশ্য ভিন্ন কথা। আর এই পরিকল্পিত ভারতীয়করণের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণের স্বাধীনতা ও এখতিয়ার তাদের রয়েছে কিনা এটাও বলা দুস্কর।

ভারতীয়করণের গতি-প্রকৃতি

এটা সর্বজনবিদিত যে বাংলাদেশের সংবিধান কেবল দিল্লীর ছাড়পত্রই নয়, দিল্লীর অনুমোদন নিয়েই প্রণীত হয়। একই ব্যবস্থাধীনে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল ও কমপদ্ধতি প্রণীত হয় ভারতীয় অর্থনীতির পরিপূরুক হিসেবে -যাতে করে উন্নয়ন কর্মসূচীর অর্থ পেতে দিল্লীর করুনা লাত করা যায়। ১৯৭১ সনের পর পরই সেই সময়কার বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব ডঃ এ, আর, মল্লিক (একজন শিক্ষাবীদ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ভিসি) শিক্ষানীতি, তার লক্ষ্য, কারিক্যুলাম, প্রশাসনিক রূপরেখা, ইতিহাস, বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, সামাজিক বিজ্ঞান ইত্যাদির ধরণ কি হবে তার দিক-নির্দেশ ভারতীয় প্রভূদের নিকট থেকে নেয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে কলকাতা ও দিল্লীতে পাড়ি জমান। (এম,আই, চৌধুরী, জীবন স্মৃতি, ঢাকা, ২০০৬ পৃ: ৬২৫ দ্রষ্টব্য)। উল্লিখিত নীতির লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে তার অর্থনীতি ও শিক্ষা ক্ষেত্রে ভারতের নব্য উপনিবেশ হিসেবে তৈরী করা এবং তরুণদের মন-মানসে তা সঠিকভাবে গ্রথিত করা। তথাকথিত চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র সম্পূর্ণভাবে দিল্লীর নির্দেশেই গৃহীত হয়েছিল; যার প্রতি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন মোটেও ছিলনা। কেননা এই ব্যাপারে জাতীয় পর্যায়ে কোন সমঝোতায় পৌঁছার চেষ্টা করা হয়নি কিংবা অন্ততঃ কোন গণভোট হয়নি। আওয়ামী লীগ পূর্বে তথা ১৯৭০ সনের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে প্রদত্ত তাদের সকল ওয়াদার বরখেলাপ করে ১৯৭২ সালের জানুয়ারি থেকে রাষ্ট্রের প্রশাসন চালানো শুরু করে।

জনগণকে নিত্যব্যবহার্য দ্রব্য কমমূল্যে সরবরাহের ওয়াদা করা হয়েছিল; কিন্তু ১৯৭১ সনের আগের পর মারাত্মকভাবে নিত্যব্যবহার্য জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। যে জনগণকে অনেক বেশী স্বাধীনতা ভোগ করার ওয়াদা দেয়া হয়েছিল; বাস্তবে তারা দেখলো আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি ও নিরাপত্তাহীনতার শিকার-এ তারা পরিণত হয়। মুজিবের বাংলাদেশে জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা অকল্পনীয় বলে প্রতীয়মান হয়।

মুজিব নিজেই তার আত্মীয়-স্বজন ও পান্ডাদের দিয়ে অরাজকতার সৃষ্টি ও তাতে পৃষ্টপোষকতা দান করেন। তার আপন ছেলে শেখ কামাল, ভাগিনা শেখ ফজলুল হক মনি, তার বশংবদ ঢাকার এস,পি মাহবুবের নাম ঢাকা শহরে সন্ত্রাসীদের সমার্থক হয়ে দাঁড়ায়। ভারতীয় জেনারেল ওভানের তত্ত্বাবধানে ১৯৭২ সালের মাঝামাঝি সময়ে গড়ে তোলা শুরু হওয়া অসাংবিধানিক প্যারা মিলিটারী ফোর্স রক্ষীবাহিনী ছিল মুজিবের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে। এই রক্ষীবাহিনী বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক শান্তিকামী মানুষের জন্যে এক আতংক হয়ে উঠে। মুজিবের পুত্র কামাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন পেশাজীবি ছাত্রনেতা ছিলেন এবং ছিলেন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এক মূর্তিমানআতংক। তার এক ঘনিষ্ঠজন ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলার ড: আবদুল মতিন চৌধুরী। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে কামালকে কেউ কিছু বলার সাহস ছিলনা। কামাল ক্যাম্পাসে তার ভোগের জন্য তার পছন্দের সুন্দরী মেয়েদের ক্লাস রুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে যেতো। আমার কলেজ জীবনের এক সাথী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু, যিনি এখনো জীবিত আছেন, তার এক সুন্দরী বোন সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। তার উপর কামালের চোখ পড়ায় ইজ্জত বাঁচানোর জন্যে দ্রুত সে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা বন্ধ করে এবং তাড়াতাড়ি এক তরুণের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বাঁচার জন্য বিদেশে পাড়ি জমায়। এটা ছিল ১৯৭৩ সালের প্রথম দিককার ঘটনা। আমি অন্যত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরীতে সংঘটিত এই ধরণের উচ্ছংখল ঘটনা সম্পর্কে আলোকপাত করেছি, যার প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীর সেই সময়কার ইনচার্জ ড: এম,এ, আজিজ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েন। কামাল ও তার সাঙ্গাতরা মুসলমানদের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি বিরোধী বহু নেককারজনক কাজের সাথে জড়িত ছিল, যেগুলো সাধারণ মানুষ ভয়ানকভাবে ঘৃণা করতো।

উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের পাশাপাশি স্কুল সমূহের সমাজ বিজ্ঞান কারিক্যুলাম এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয় যার লক্ষ্য ছিল তরুণ ছেলে-মেয়েদের ব্রেন ওয়াশ করা যাতে করে তারা তাদের ধর্মের একেশ্বরবাদী মূল্যবোধ ভুলে গিয়ে বহু দেবত্ববাদী ভারতীয় মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিতে অভ্যস্থ হয়ে উঠে।

১৯৭২ সালের প্রথম দিকে ভারতীয় আমলা ও পরিকল্পনাবীদ দূর্গা প্রসাদ ধর বাংলাদেশ সরকারকে এই মর্মে নসিহত করে যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যেন ভারতীয় অর্থনীতির পরিপূরক হিসেবে বিন্যস্ত করা হয়। প্রশাসনের অল্প সংখ্যক দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা যাদের মুখে তালা লাগিয়ে মুজিব সরকার দিল্লীর সকল দিক-নির্দেশ পালনের জন্য কর্তৃত্বপ্রাপ্ত ডিপি ধরের নির্দেশেই সব কিছু করতেন। অথচ বাংলাদেশের যে কোন সৎ ও দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবীদ জানতো যে বাংলাদেশের অর্থনীতি ভারতের পরিপূরক নয়; বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে অর্থনীতি হতে হবে ভারতের সাথে প্রতিযোগিতামূলক -যদি বাংলাদেশ প্রকৃতই আত্ম-সম্মান নিয়ে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে বাঁচতে চায়।

অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষঃ ১৯৭৪ সালের বাংলাদেশ

প্রশাসন এবং সামগ্রিকভাবে দেশ থেকে ইসলামী মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে ঝেটিয়ে বিদায় করার অপচেষ্টা থেকে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি মারাত্মকরূপ পরিগ্রহ করে। বিদেশী-সংবাদদাতারা মুজিবকে যথার্থভাবে দুর্নীতির বরপুত্র বলে আখ্যায়িত করে। ১৯৭০ সালের তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যের একটি দেশ সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসনে ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে নিপতিত হয় এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে, যার দরুণ ঐ বছরের আগস্ট থেকে নভেম্বর; এই চার মাসে বেসরকারী হিসাব মতে কয়েক লক্ষ লোকের মৃত্যু ঘটে। অবস্থা এমন চরমে পৌঁছে যে দুর্ভিক্ষে মৃত ব্যক্তিদের লাশের দাফন বা সৎকারের জন্যে কোন খোজ-খবরও আত্মীয়-স্বজন পর্যন্ত নিতনা।

কিছু কিছু স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান রাস্তা-ঘাট সহ যত্রতত্র পড়ে থাকা লাশ দাফন করতো। দুর্ভিক্ষে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় শহর রংপুরে সব চাইতে বেশী মানুষের মৃত্যু ঘটে। লঙ্গরখানা সমূহে ছিল লক্ষ লক্ষ ক্ষুধার্থ মানুষদের উপছে পড়া ভীড়। যৎসামান্য যে খাবারের আয়োজন লঙ্গরখানা সমূহে করা হতো তা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অতি সামান্য। যখন দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ না খেয়ে মরছিলো তখন আওয়ামী লীগারা ছিল তাদের ভাগ্যগড়ার তুঙ্গে। হাজার হাজার ফেডারেল পাকিস্তানের সমর্থক বাংলাভাষী ও অবাঙালি বিহারীদের হয় হত্যা না হয় জেলে পুরে তাদের সকল সহায় সম্পদ লুট করার পাশাপাশি নানাবিধ রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও রিলিফের মালামাল লুট করে তারা ছিল মহা সুখ ও আনন্দে। আর অন্তত সেই সময়ের জন্যে মুসলিম সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে পরাস্ত করে বাঙালি মূল্যবোধের ডংকা বাজছিলো সর্বত্র। ভারতের কংগ্রেসীয় নেতৃত্ব সেটাই বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দিয়েছিল যা তাদের পূর্বসূরী হিন্দু নেতারা ১৯৪৭ সালের পূর্বে সমগ্র উপমহাদেশে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলো।

ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপনই ছিল সেই সময়কার দুঃশাসন এস্তেমাল করার অন্যতম তরীকা এসন অবস্থার প্রেক্ষাপটেই মুজিব গণতন্ত্রকে হত্যা করে তার নিরঙ্কুশ একনায়কোতান্ত্রিক নেতৃত্বে সোভিয়েট মডেল-এ কায়েম করে এক দলীয় বাকশালী শাসন। স্বৈরশাসক মুজিবের জন্য পার্লামেন্টকে একটি রাবার ষ্ট্যাম্প বানানো হয়। মুজিবের দুঃশাসনের যারা বিরোধীতা করে তাদেরকে কুখ্যাত রক্ষীবাহিনী ধরে নিয়ে অবর্ণনীয়ভাবে নির্যাতন করতো এবং বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড চালানো হয় দেদারছে। মাত্র কয়েক মাসে এভাবে প্রায় ২৭০০০ দেশপ্রেমিক তরুণকে হত্যা করা হয়। [নঈম হাসান, বাংলাদেশ ট্রাজেডীঃ বিদেশী সাংবাদিকের দৃষ্টিতে মুজিবের বাংলাদেশ, লন্ডন, ১৯৭৭] অবস্থা এত ভয়ংকর পর্যায়ে উপনীত হয় যে বাঙালি মূল্যবোধের ধারক-বাহকদের অত্যাচার, নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোন প্রতিবাদ জ্ঞাপন করা অসম্ভব হয়ে উঠে। এই অবস্থার অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতিতে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট প্রতিরোধের বিস্ফোরণ ঘটলো। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের বীরোচিত অভ্যুত্থান মুজিবের একনায়কতান্ত্রিক শাসনকেই কেবল উৎখাত করেনি, বরং দেশ ও জাতির প্রকৃত পরিচয় ও মুসলিম জাতিসত্ত্বার দৃঢ়তর পুনরুজ্জীবনও ঘটালো। মুজিবের ঘৃণ্য একনায়কতান্ত্রিক শাসনের যবনিকাপাতে জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। উপরন্ত জনগণ ভারতীয় প্রভাব ও আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়ে নিজেদের স্বকীয়তা প্রতিষ্ঠার অবারিত সুযোগ লাভ করলো। অভ্যুত্থানের সংগঠকরা খন্দকার মোশতাককে দেশের প্রেসিডেন্ট পদে অভিষিক্ত করলো। খন্দকার মোশতাক দেশে বিভিন্ন ক্ষেত্র ও পর্যায়ে চালু হওয়া বৈদিক ও ভারতীয় প্রতীক ও তঘমার বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করলেন এবং জয়বাংলা শ্লোগান বদলিয়ে মুসলিম প্রথা অনুসৃত বিস্মিল্লাহ, খোদা হাফেজ, আস্সালামু আলাইকুম, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ প্রভৃতি চালু করেন। ৮৩ দিনের মাথায় এক পাল্টা অভ্যুত্থানে মোশতাক অপসারিত হলেও তার প্রবর্তিত প্রতীক ও শ্লোগান পরবর্তীতে ক্ষমতাসীন হওয়া কোন সরকারের পক্ষেই পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি। কারণ অত্যন্ত স্পষ্ট। মুসলিম মূল্যবোধের পরিপন্থী কোন পরিবর্তনই জনগণ মেনে নেবেনা; বরং তারা যে কোন মূল্যে মুসলিম মূল্যবোধ, পরিচয়সূচক স্বাতন্ত্র্যতাকে টিকিয়ে রাখতে বদ্ধ পরিকর। পরবর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট জিয়া ও এরশাদ ইসলামী পরিচয় জ্ঞাপক কিছু কিছু প্রতিপাদ্য সংশোধনপূর্বক সংবিধানে সন্নিবেশিত করেন। সংবিধানের ঐসব পরিবর্তন তাদের জনপ্রিয়তায় অতিরিক্ত মাত্রার সংযোজন করে, যেহেতু জনগণ তা পছন্দ করে। অবশ্য ঐসব পদক্ষেপ স্রেফ তাদের কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সাধনের জন্যই নেয়া হয়েছিল; নাকি জনগণের অনুভূতির প্রতি তাদের সততা-শ্রদ্ধাবোধ থেকেই তারা সেটা করেছে -এটা তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। তবে পরবর্তী সরকার সমূহের কেউ ঐ সব পরিবর্তন থেকে সরে আসার সাহস করেনি এই কারণে যে তেমন অবস্থায় জনমত তাদের বিরুদ্ধে চলে যাবে। তবে মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব ও সংঘাত এখনো চলছে। এটা ভবিষ্যতেও চলবে কেননা ভারত ও তাদের এতদ্দেশীয় বশংবদরা দুই মূল্যবোধের মধ্যকার দ্বন্দ্বকে শানিত রাখতে দেশাভ্যন্তরে ও বাইরে থেকে ভারতের অধিপত্যবাদী কারসাজীতে অব্যাহভাবে তৎপর রয়েছে। বাংলাদেশের সমাজে অস্থিতিশীলতা এবং অর্থনীতিতে বিপদাপন্ন অবস্থা জিইয়ে রাখতে ভারত অব্যাহতভাবে তৎপর থাকবে বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের বাজার ভারতের দখলে রাখার জন্যে। আওয়ামী লীগের বাঙালি মূল্যবোধের কচকচানি ভারতীয় মূল্যবোধ ও প্রথার জন্য উপযোগী; কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ বা নব্বই শতাংশ মানুষ মূল্যবোধের সাথে তা সামঞ্জ্যস্যপূর্ণ নয়। সে কারণেই সত্তুর দশকের দিকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যথার্থভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখান করে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করেন, যার ভিত্তি কেবল বাংলাদেশের ভৌগলিক সীমারেখাই নয়; এই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণা বস্তুতঃ নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান জনগোষ্ঠীর মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি থেকে উৎসারিত, যা সহস্র বছর ধরে এই মাটিতে লালিত ও বিকশিত হয়েছে।

বাংলাদেশকে ইসলামিক বলে মানতে ভারত ও তার অনুচরদের অস্বীকৃতি

ভারতীয় শাসকরা বরাবরই এটা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে যে, মৌলিকভাবে ‘এক ও অবিভাজ্য’ ই হচ্ছে উপমহাদেশের সংস্কৃতি -যা প্যাটেল চল্লিশের দশকে বলেছিলেন। [এম,এ, আজিজ (পূর্বে উদ্ধৃত) পৃ: ৫] সত্তর দশকের বহুল পরিচিত ভারতীয় রাজনীতিবীদ ও লেখক বলরাজ মাধক জোরের সাথে বলেছিলেন যে ভারতের একক এবং প্রধান সংস্কৃতি বৈদিক সূত্র থেকে উৎসারিত যা চার হাজার বছর ধরে অনুসূত হয়ে আসছে। অন্য যে সব সংস্কৃতির আবির্ভাব দেখা যায় তা নানা ধরণের বিভাজনেরই প্রতিফলন যার সাথে সামগ্রিক ভারতীয় সংস্কৃতির কোন সম্পর্ক বা তালুকাত নেই।

বলরাজ মাধকের দাবী আংশিক সত্য; কিন্তু সম্পূর্ণ সত্য নয়। উপমহাদেশে মুসলমানদের পূর্বে বৈদিক বিশ্বাস ভিত্তিক সংস্কৃতির আগ্রাসন ও আক্রমণে ব্রাহ্মণ্যবাদ ছাড়া অন্য কোন বিদেশী সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ টিকতে পারেনি। একমাত্র ইসলামী মূল্যবোধই সেই বৈদিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির সাথে সুদৃঢ় ও সমান্তরালভাবে অবস্থান করে। অন্য কথায় মুসলমানরা তাদের মূল্যবোধ রক্ষায় সুদৃঢ় থাকার জন্যে ভারতের মাটি তাদের সম্পূর্ণভাবে হজম করতে পারেনি। তারা কেবলমাত্র অপরাপর মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের পাশাপাশি নিজেদের স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্যতা নিয়ে টিকেই থাকেনি, মুসলমানরা ইসলামী বিশ্বাসের প্রতি এতদঞ্চলের অপরাপর মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের ইসলামিক বিশ্বাস, মূল্যবোধ, প্রথা ও সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন। এই কারণেই বারো শত বছর ধরে মুসলমানরা এক বিশাল জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়; -যা হিন্দুদের চক্ষুশুলে পরিণত হয়। এই সম্পর্কে খ্যাতিমান ইংরেজ ঐতিহাসিক ও চল্লিশের দশকে ইন্ডিয়ান ষ্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদক ইয়ান স্মীথ চমৎকারভাবে বলেছেন : ‘উপমহাদেশে তাদের বিশাল সংখ্যক অনুসারী থাকা সত্ত্বেও হিন্দুরা অবশ্যই এটা সম্পূর্ণভাবে জানে যে কেন তারা ইসলামকে ভয় করে। ইসলামে বিশ্বাসীরা এখানে প্রথমে আসে সমুদ্র পথে, পরে আসে ভূভাগ দিয়ে এবং বারো থেকে আঠারো শতাব্দী ব্যাপী ৫৫০ বছর ধরে পর্যায়ক্রমিকভাবে বেশ কিছু শক্তির পরাজয় ঘটিয়ে, মুসলিম বিজেতারা দিল্লী থেকে বিনাবাধায় একচ্ছত্র প্রভাবে সমগ্র ভারত শাসন করে, ভারত মাতার বিশাল অংশ তাদের দখলে নেয়; যে জায়গাগুলো ছিল হিন্দু ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অবয়ব। [ঐ, আয়ান স্টিকেন এর পাকিস্তান বই থেকে উদ্ধৃত পৃ: ২৮-২৯] মুসলমানদের এই বিজয়াভিযান হিন্দুদের মনে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি করে।’

বস্তুতঃ মুসলমানদের সম্পর্কে হিন্দুদের দৃষ্টিভঙ্গী ও মানসিক অবস্থানের এটাই হচ্ছে সংক্ষিপ্ত পটভূমি। উপমহাদেশে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ফলে ইসলামিক মূল্যবোধ ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে; তবে ব্যাপকভাবে নয়। এটা ঘটে নির্দিষ্ট পরিমন্ডলে। সহস্র বছরের বেশী সময় ধরে মুসলমানদের শাসন চলার পরও তাদের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হয়ে থাকার এটা একটা বড় কারণ। অথচ মধ্যপ্রাচ্য মুসলিম শাসনের ফলে বিভিন্ন বিশ্বাস থেকে গড়ে উঠা সেখানকার প্রায় সম্পূর্ণ জনগোষ্ঠীই মুসলমান হয়ে যায়।

উপমহাদেশে মুসলমানরা বাইরে থেকে এলেও তারা এই মাটিতে স্থায়ী নিবাস গড়ে তোলে এবং স্থায়ী হবার পর তারা কখনও তাদের পূর্ব জায়গায় ফিরে যায়নি। অথচ হিন্দুরা বরাবরই মুসলমানদেরকে বিদেশী ও অনুপ্রবেশকারী বলে গালি দেয়। এই গালিই শেষ নয়; তারা মুসলমানদেরকে ভারত ত্যাগ করা পূর্বক তাদের আদি নিবাস-এ ফিরে যাবার জন্য সর্বদাই হুমকি দিয়ে থাকে। পাশাপাশি হিন্দুদের আর একটি কথা হচ্ছে মুসলমানরা যদি ভারতে থাকতে চায় তাহলে তাদেরকে অবশ্যই বৈদিক হিন্দু মূল্যবোধ সম্পূর্ণভাবে মানতে হবে এবং পৌরনিক হিন্দুত্ব সংস্কৃতি ভিত্তিক বহুশ্বেরবাদ ও বহুদেবত্ববাদী মূল্যবোধ অনুসরণ করতে হবে।

হিন্দুদের বিশেষত ব্রাহ্মণদের এই অহমবোধ থেকেই তারা মানবতাবাদী বৌদ্ধদের তাদের নিজ ভূমি থেকে শত শত বছর ধরে অমানবিকভাবে নির্মূল করে ভারত থেকে বৌদ্ধধর্ম প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলে এবং একইভাবে তারা মুসলমানদেরকেও নির্মূল করতে চায় (ড: এ, মুমিন চৌধুরী, দি রাইজ এন্ড ফল অব বুদ্ধিইজম ইন সাউথ এশিয়া, লীসা, লন্ডন, ২০০৮)। তবে এই কাজটি হিন্দুরা হয়তো শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নয়; তারা এটা করতে চায় অনৈসলামিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে- যা বাংলাদেশ ১৯৭১ সনের সংঘাতের সময় থেকেই ভোগ করে আসছে। কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে মুসলমানরা যে সমাজ বা দেশেরই হোক না কেন; তাদের একেশ্বরবাদী ধর্মীয় বিশ্বাস এতই প্রগাঢ় যে সর্বেশ্বরবাদ বা বহুদেবত্ববাদী কোন কিছুর অনুসরণের কোন প্রশ্নই তাদের জীবনে নেই। এটা তাদের ধর্মবিশ্বাসের মূলমন্ত্র; এমনকি অনেক সময় নিরঙ্কুশভাবে একনায়কতান্ত্রিক ও শাসরুদ্ধকর শাসন ব্যবস্থা সত্ত্বেও এমন কোন পথ বা পন্থার সাথে তারা নিজেদের সম্পৃক্ত করেনা, যা একেশ্বরবাদী ইসলামিক মূল্যবোধ বিরোধী। মুসলমানদের আভ্যন্তরীণ শক্তির মূলসূত্র এটাই- যা তাদেরকে গত দেড় হাজার বছর ধরে তাদের স্বাতন্ত্র্য মূল্যবোধ নিয়ে টিকিয়ে রেখেছে এবং পৃথিবীর ৫টি মহাদেশে তাদের বিস্তৃত করে আজ পৃথিবীর গোটা জনগোষ্ঠীর প্রায় এক চতুর্থাংশে পরিণত করেছে। তবে এটা সত্যি নয় যে মুসলমানরা স্থানীয় পর্যায়ের সবকিছুই ত্যাগ করেছে অথবা এড়িয়ে গেছে। তবে তারা তাদের ধর্মের একেশ্বরবাদী মূল্যবোধের পরিপন্থী কোন মূল্যবোধ কখনই গ্রহণ করেনি।

অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে মূল্যবোধের সংঘাত প্রবিষ্ট

রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে মূল্যবোধের সংঘাতের রূপরেখা বৃটিশ শাসনামলে অনেক শানিত রূপ ধারণ করে; কেননা বৃটিশরা ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত করে ভাল বেতনে সরকারী চাকুরী ও অন্যান্য পেশায় নিয়োগ প্রদান পূর্বক আর্থিক আনুকল্য দিয়ে হিন্দুদেরকে জাতে উঠায়- যেই সব পদ ও পেশায় মুসলমানরা ছিল হিন্দুদের অনেক পিছনে। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শুরুতে মুসলমানরা ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ শুরু করায় তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় নামে অগ্রবর্তী তথা জাতে উঠানো হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে প্রতিযোগিতায় নামে; বিশেষত বাংলায়-যেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় সত্ত্বেও সরকারি চাকুরী ও বিভিন্ন শিক্ষিত পেশায় হিন্দুদের চাইতে অনেক পিছনে ছিল। হিন্দুরা সেই প্রতিযোগিতাকে নিদারুণভাবে ঘৃণা করতে থাকে। ফলে বিভিন্ন স্তরে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। চল্লিশের দশকের প্রথমে লিখিত বিভিন্ন লেখায় নিরোদ চৌধুরী এই সম্পর্কে বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন যা তার প্রকাশিত অনেকগুলো বইয়ের মধ্যে দাই হেন্ড, গ্রেট এনার্কঃ ইন্ডিয়া, ১৯২১-১৯৫২ শীর্ষক একটি বইতে সন্নিবেশিত হয়েছে। কলকাতা করপোরেশানের একটি সভায় বাংলার মুসলমানদের শ্রদ্ধেয় নেতা খান বাহাদুর আবদুল মমিন কলকাতায় বসবাসকারী মুসলমানদের জন্য হিন্দুদের অনুরূপ সুযোগ-সুবিধার দাবী জানালে তাকে অত্যন্ত অপমান করে থামিয়ে দেয়া হয়। তিনি সভায় উপস্থিত হিন্দু তরুণ কাউন্সিলারদের তীব্র ব্যঙ্গ-বিদ্রপাত্মক কোরাসের মধ্য দিয়ে সভাস্থল ত্যাগ করেন।

নিরোদ চৌধূরী আরো লিখেনঃ ‘আমি এক নিবন্ধে মুসলমানদের প্রতি সাধারণ বাঙালি হিন্দুদের দৃষ্টিভঙ্গীতে আমার মর্মাহত হবার কথা উল্লেখ করেছি -যা শুধু কলকাতাতেই সীমাবদ্ধ ছিলনা; এটা ছিল সমগ্র ভারতে মুসলমানদের প্রতি হিন্দুদের দৃষ্টিভঙ্গী -যারা, হিন্দু সমাজের পাশাপাশি নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতো এবং এই স্বাতন্ত্র্যকে হিন্দুরা বৈধ বলেই স্বীকার করতোনা।’ তিনি তার বইয়ে আরো লিখেছেনঃ ‘মুসলমানদের আত্মপরিচয়মূলক সবকিছুই হিন্দুরা আপোষহীনভাবে প্রত্যাখান করতো। এমনকি হিন্দুরা আত্মপরিচয়মূলক, মুসলমানদের জীবনাচারকে জাতি-বিরোধী বলেও ঘোষণা করে।’ [নিরোদ চন্দ্র চৌধুরী, দাই হ্যান্ড, গ্রেট এনার্কঃ ইন্ডিয়া, ১৯২৩-১৯৫২, চাট্টো এন্ড উইডাস, লন্ডন, ১৯৮৭, পৃ: ৪৬৬-৬৮]

উক্ত মূল্যবোধ ও স্বার্থ সংঘাতেরই পরিণতি হচ্ছে ভারতীয় মুসলমানদের নিজেদের আবাসভূমি হিসেবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবী উত্থাপন। হিন্দুরা এই দাবীর প্রতি কেবল বিরক্তিই প্রকাশ করেনি, তারা পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপনকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধপ্রবন হয়ে উঠে এবং বিভাজন প্রতিষ্ঠাকে অকার্যকর করার কাজ ১৯৪৭ সাল থেকেই শুরু করে। এই সম্পর্কে বৃটিশ ফিল্ড মার্শাল স্যার ক্লড আউচিনলেক ১৯৪৭ সালেই প্রণীত তার এক রিপোর্টে উল্লেখ করেন যে, "এটা নিশ্চিতভাবে বলতে আমার কোন দ্বিধা নেই যে জওয়াহেরুল লাল নেহেরুর নেতৃত্বাধীন বর্তমান ভারতীয় মন্ত্রী পরিষদ পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সকল পথে বাধা সৃষ্টির জন্য তাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করতে বদ্ধপরিকর” [ল্যারি কলিনস এন্ড ডোমিনিক ল্যাপায়ার, ফ্রীডম এট মিডনাইট, পান্থার বুকস, গ্রানাডা পাবলিশিং লিঃ, ইউ, কে, ১৯৮৪ (পুনঃমুদ্রণ) পৃঃ ৩৪০]

আউচিনলেক এই রিপোর্ট প্রদান করেন যখন তিনি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম বণ্টনের দায়িত্ব পালনে তার কাজে কংগ্রেস নেতাদের অব্যাহত বাধা প্রদানে অত্যন্ত হতাশ ও মর্মাহত হন। আউচিনলেক তার সর্বোচ্ছ শক্তি দিয়ে পাকিস্তানের জন্য মাত্র ৬০০০ টন সামরিক সরঞ্জাম দিল্লীর নেহেরু সরকারের কবজা থেকে উদ্ধার করতে সমর্থ হোন। অথচ পাকিস্তানের অংশ নির্ধারিত হয়েছিল এক লক্ষ সত্তর হাজার টন।

তিনি তদানীন্তন এটলীর নেতৃত্বাধীন বৃটিশ সরকারের নিকট উক্ত রিপোর্ট পেশ করেন। আমি এই বইয়ের অন্যত্র পাকিস্তান সৃষ্টির প্রতি ভারতের ঘৃণ্য দৃষ্টিভঙ্গী এবং ১৯৪৭ সালের বিভাজন মুছে পাকিস্তানকে বিলুপ্ত করার ভারতীয় পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করেছি। অতএব ১৯৭১ সালের বিচ্ছিন্নতাই শেষ নয়; এটা ছিল তাদের মূল লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি উপায় মাত্র। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান সংক্রান্ত ভারতের প্রতিটি কার্যক্রমের পিছনে মূলতঃ রয়েছে তাদের সেই মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গী।

এটা তাদের জন্য দুর্ভাগ্য যে, ১৯৪৭ সালের বিভক্তিকে অকার্যকর করার পরিকল্পনা ভারত আজও বাস্তবায়িত করতে পারেনি। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয় আজ যে অবস্থানে রয়েছে তা ৪৭’ এর বিভক্তিরই ফল। এই দুই দেশের কেহই ৪৭’ এর বিভক্তিকে অকার্যকর করতে চাইবেনা। ভারতের তীব্র চাপ ও মারাত্মক আধিপত্যবাদী কর্মকান্ড এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহজাত দুর্বলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মুসলমানরা কোন অবস্থাতেই ৪৭’ এর বিভক্তিকে অকার্যকর করতে চাইবে না। আমি নিশ্চিত যে মুসলমানরা তাদের স্বাধীন সত্ত্বা যে কোন মূল্যে টিকিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর এবং কোন অবস্থাতেই তারা নিগৃহীত ভারতীয় বাঙালিত্বে কখনই লীন হয়ে যাবেনা। এই বাস্তবতা সম্পর্কে ১৯৭১ সালের গৃহযুদ্ধ শুরুর পূর্বে সত্তুর দশকের অনেকের মধ্যে স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান শ্লোগানের উদগাতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই হৃদয়ঙ্গম করেছিলেন। ১৯৭১ সালের পর পরই সৃষ্ট সম্ভাব্য বিপদাপন্ন অবস্থা আঁচ করতে পেরেই তিনি পৃথক জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। আজাদ/মুসলিম বাংলা আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন। পরবর্তীতে জনাব অলি আহাদও বাংলাদেশে আজাদ বাংলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ডাক দিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের অভ্যুত্থানের পর প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমেদ কর্তৃক রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সকল কর্মকান্ডের শুরুতে বিস্মিল্লাহর অন্তর্ভূক্তি, পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কর্তৃক ১৯৭৯ সালে সংবিধানের শুরুতে বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহিম এর সংযোজন এবং এরপর জেনারেল এরশাদ কর্তৃক সংবিধান সংশোধনপূর্বক রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামের অন্তর্ভূক্তি দ্বারা বাংলাদেশ এটাই বার বার বুঝাতে এবং পুনঃ নিশ্চয়তা বিধান করতে চেয়েছে যে, বাংলাদেশ কেবল ১৯৪৭ সালের বিভক্তি জোরের সাথেই রক্ষা করবেনা; উপরুন্ত তার মুসলিম পরিচয়ও যে কোন মূল্যে বজায় রাখবে।

এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক যে ১৯৪৭ সালের পর ভারতীয় মুসলমানদের ভারতীয়করণ তথা বাস্তবে হিন্দুয়ানীকরণ প্রক্রিয়া ও চাপ ইতিহাসের অন্য সময়ের তুলনায় জোরে শোরেই চালানো হচ্ছে; কেননা ভারতীয় মুসলমানদের অপরাধ হলো তারাও পাকিস্তান আন্দোলনকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন করেছিল। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের সংবিধানে সকল ধর্মের স্বাধীনতার গ্যারেন্টি সন্নিবেশিত থাকা সত্ত্বেও তারা নির্যাতিত হচ্ছে অহরহ। বাংলাদেশ সংবিধানেও সকল ধর্মচর্চার গ্যারেন্টি আছে; কিন্তু বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা কি নির্যাতিত হচ্ছে ? ১৯৪৭ সালের পর শত সহস্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ভারতে মুসলমানদের কচুকাটা করা হয়েছে। সেখানে মুসলিম বিদ্বেষী ভাব ও উদ্বেগ থেকে প্রতিদিনই ভারতের কোথায়ও না কোথায়ও সাম্প্রদায়িক ঘটনাবলী ঘটছে এবং এটা ক্রমশই বৃদ্ধিলাভ করছে। ১৯৪৭ সালের পর গত ৫১ বছর ধরে কাশ্মীরের মুসলমানদের অত্যাচার-নির্যাতন, নির্মূল হত্যা, গণহত্যা আজ প্রামাণ্য ইতিহাসের অংশ। ১৯৯২ সালে অযোধ্যায় ৫০০ বছরের পুরনো বাবরী মসজিদ ধ্বংস করা ইত্যাদিই হচ্ছে মৌলবাদী হিন্দুদের মারাত্মক মুসলিম বিদ্বেষের নজীর। অথচ সৌভাগ্যক্রমে ভারতের অন্তহীন উস্কানী সত্ত্বেও বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে ভারতীয় মডেল এর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ তথা হিন্দু বিদ্বেষী কোন দাঙ্গা সংঘটিত হয়নি। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ছত্রছায়ায় বাংলাদেশকে ভারতীয়করণের জন্য ভারতীয় চর ও ৫ম বাহিনী ভেতর ও বাইরে থেকে অব্যাহতভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যে দেশে ৯০ শতাংশ জনগণ হচ্ছে মুসলমান তারা কখনও এই চক্রান্তকে সফল হতে দেবেনা। তারা বরং মুসলিম মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে অব্যাহতভাবে চিরদিনের জন্য উচ্ছৃকিত রাখবে। অর্থনৈতিক দিক-দর্শন, সংস্কৃতি ও জীবনাচারের মধ্যেই টিকে ও সম্পৃক্ত হয়ে উঠতে বদ্ধপরিকর থাকবে। এই প্রক্রিয়ায় অবশ্য গত সহস্রাব্দে চালু থাকা সংঘাত লক্ষ্যনীয়ভাবে হয়তো অব্যাহত থাকবে; যা পৃথিবীর সর্বত্রই প্রায় জারী রয়েছে। তবে মুসলমানরা তথাকথিত অখন্ড ভারতীয় রামরাজ্য প্রতিষ্ঠার যে কোন চক্রান্তের সামনে মাথা নত না করে ইজ্জত ও সম্মানের সাথে টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাবে। আমি নিশ্চিত যে ভারতের শাসক শ্রেণীর অখণ্ড ভারত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন চিরদিনের জন্যই অপূর্ণ থেকে যাবে।



 

Comments  

 
-2 # 2010-04-19 05:31

I've never seen such a ugly site that corrupts history and truth simutenously. Host of this site need to be punished as they are manipulating our history, which could be dangerous for the new generation. They've no right to manipulate our history. Don't try to show us white part of a black spot,we r nt colour blind

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+2 # 2012-08-11 01:08

I think I am part of that generation what you mentioned here. I am just requesting you very honestly --- "gather much more knowledge before you start commenting to save yourself from becoming a stupid and the new generation from the rubbish history and truth you mentioned above". Try to thing something for, try to thing something for 150 million Bangladeshi. Thanks.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
-3 # 2010-04-19 06:57
কেন এই মিথ্যাচার! কেন অবাঙ্গালীদের জন্য এত কান্না?
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+9 # 2010-04-24 17:14
Honest speaker কি এখনও বুঝেনা ভারতিয় আগ্রাসন। যদি এই ব্যাটা ভারতিয় হয় তাহলে জীবনেও বুঝবে না। আর বাংলাদেশি দেশপ্রেমিক হলে বুঝা উচিৎ। কারণ, ১)ফারাক্কা ২)তিন বিঘা করিডর ৩)বাংলাদেশ ঘিরে ফেনসিডিল কারখানা ৪)কাঁটা তারের বেড়া ৫)ভারত কর্তৃক শান্তি বাহীনি গঠন ৬)BSF দ্বারা বাংলাদেশি খুন ৭)বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার বাজার হিসেবে তৈরি করা ৮)বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ বিরোধি কর্মকান্ড করা ৯)মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো etc
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+1 # 2010-04-25 12:21
প্রথম আলোর পাঠককে ধন্যবাদ যার মাধ্যমে এই সাইটটির খোজ পেয়েছি। অত্র বইটির লেখককে মোবারকবাদ জানাই তার এই সত্য ও তথ্যনির্ভর লেখা উপহার দেবার জন্য।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+11 # 2010-04-28 05:02

I would request readers to think and anylise events, in light of history of last 39 years and make your decision.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
-10 # 2010-06-18 21:48

honest speaker go to hell and take your thoughts with you. You are a coward.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+9 # 2010-07-12 15:50


If someone writes the truth and it is against the belief of the reader, their voice is often negative. I suggest commentators should response from the point of very neutral views.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2010-08-27 12:16
ধন্যবাদ জনাব এম,টি,হোসেনকে। অনেক না বলা ইতিহাস আমাদের জন্য রেখে যাওয়ায়। একদিন সত্যকথা বের হবেই। ষড়যন্ত্রকারীরা চিরদিন বিজয়ী থাকতে পারেনা। আর অনেস্ট স্পীকারের মত সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদীদের জন্য ঘৃণা।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+2 # 2010-09-23 06:26
লেখক মহোদয়কে ধন্যবাদ। তার এই লেখনির মাধ্যমে জাতি অনেক উপকার পাবে।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2012-06-26 08:17
সাহস করে করে সত্য কথা বলাই মানুষের শেষ্ঠত্ব। প্রত্যোক স্থানে প্রচার করো উচিত।
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh