Home EBooks অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের ইতিহাস

eBooks

Latest Comments

বাংলাদেশঃ মারাত্মক অপপ্রচারণা, ষড়যন্ত্র ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকার - অধ্যায় ৫: একবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় আধিপত্যঃ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উভয় সংকট PDF Print E-mail
Written by এম, টি, হোসেন   
Friday, 15 November 1996 02:00
Article Index
বাংলাদেশঃ মারাত্মক অপপ্রচারণা, ষড়যন্ত্র ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকার
অধ্যায় ১: তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য সম্পর্কিত অলীক কাহিনী ও স্বায়ত্বশাসনের দাবী প্রসঙ্গ
অধ্যায় ২: ভারতীয় ষড়যন্ত্রের সহায়তায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্জন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশঃ পরবর্তীতে কী?
অধ্যায় ৩: ১৯৭১ সালের পর থেকে একাত্তরের হত্যাকান্ডের একপেশে কল্পকাহিনী ও মিথ্যাচার
অধ্যায় ৪: বাংলাদেশে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও স্বার্থ সংঘাতের গতি-প্রকৃতি
অধ্যায় ৫: একবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় আধিপত্যঃ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উভয় সংকট
All Pages

উপমহাদেশের পশ্চিম প্রান্তের দেশ পাকিস্তান এবং পূর্বাঞ্চলীয় দেশ বাংলাদেশ এক হাজার মাইলের দূরত্বে হলেও দুই দেশই তাদের নিজেদের অভিন্ন ও সুস্পষ্ট স্বতন্ত্র সত্ত্বা উচ্ছকিত রাখার জন্যে উভয়েই অভিন্ন ঐতিহাসিক পরিস্থিতির মধ্যে কষ্টকর এক সংগ্রামে পাড়ি দিয়ে চলেছে।

তবে কিছু সন্দেহবাদী রয়েছে যারা উভয় দেশের বহু ক্ষেত্রের অবস্থা যে এক ও অভিন্ন তা মানতে চায়না। এই সন্দেহবাদীরা ভাষাগত প্রভেদ এবং ভৌগলিক অবস্থানের কথা গুরুত্বের সাথে বলে তারা জনগণকে এটা বোঝাতেই সব সময় তৎপর থাকে যে, জাতি, ভাষা ও ভৌগলিক অবস্থার চাইতে কোন কিছু মোটেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু ভাষাগত প্রভেদ বা ভৌগলিক বাস্তবতাকে কি বুঝ-জ্ঞানসম্পন্ন কেহই অগ্রাহ্য করতে পারে?

আসলে সন্দেহভাজন কিছু লোক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই জাতিগত প্রভেদ বা বিভিন্নতার কথা বলে কোন কোন জনসমষ্টির এক ধরণের পৃথক সামাজিক বৈশিষ্ট্য দাঁড় করায়। কিন্তু মানুষের সমাজে সে যেখানকারই হোক ঐসবই কেবলমাত্র বিবেচ্য বা ঐসবই শেষ বিষয়াদি নয়। জাতি এবং জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নে জাতিগত, ভাষাগত এবং ভৌগলিক পরিচিতিকে গণ্য করার একটি ব্যাপার সম্প্রতি ইউরোপে লক্ষ্যনীয় হয়ে উঠেছে। এটা এক অর্থে বাস্তব; কিন্তু উক্ত ধারণার ভিত্তিতে জাতিরাষ্ট্র হিসেবে অভ্যুদয়প্রাপ্ত দেশ সমুহের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সে ধারণা ভাল হবার চাইতে খারাপ বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।

বস্তুতঃ দুইটি বিশ্বযুদ্ধে পৃথিবীতে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞের উৎসে রয়েছে জাতী ও জাতিরাষ্ট্র সম্পর্কিত উক্ত ধারণাসমূহ। শিল্পজাত পণ্যের বাজার দখল করার যে উতুঙ্গ প্রতিযোগিতা দেখা দেয় তা থেকেই উদ্ভূত উপরেউল্লেখিত নিন্দনীয় ধারণা -যা ছিল আমার দেশ-সঠিক কিংবা বেঠিক যাই হোক না কেন দৃষ্টিভঙ্গী; যার মধ্যে মানবিক কল্যাণ কিংবা মানবিক মর্যাদাকে পদদলিত করে শুধু টিকিয়ে থাকার উৎকট প্রবৃত্তি নিহিত আর এর ভয়াবহ কাফ্ফরা গুণতে হয় কম ভাগ্যবান সাধারণ জনগোষ্টীকে।

গত শতকের শুরুতে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও স্নায়ুযুদ্ধের পরিসমাপ্তির পর সাম্প্রতিক সময়ে খোলাবাজার অর্থনীতি নিয়ে যে দৌড়-ঝাপ-- তার ঘোষিত লক্ষ্য যদিও হচ্ছে ধনী ও গরীবদের মধ্যে দূরত্ব হ্রাস করা; কিন্তু বাস্তব ফলশ্রুতি হচ্ছে গরীব দেশসমূহের গরীবরা যেন গরীবও না থাকতে পারে, তারা যেন সর্বস্বহারা নিঃস্ব-এ পর্যবসিত হয়। এমনিতর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটকে সামগ্রিকভাবে নিজেদের অনুকূলে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে শোষণ এবং এখানে তাদের নব্য উপনিবেশ প্রতিষ্ঠায় ভারত তার সর্বশক্তি নিয়োগ করবে: যদি সে এই দেশ ও ভূখন্ডকে জুনাগড়, হায়দ্রারাবাদ, কাশ্মীর ও সিকিমের মত গ্রাস না করে। এমনিতর আশংকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ও পাকিস্তান যদি ভাষা বিষয়ক উন্মাদনাকে জিইয়ে রাখে তাহলে রাজনীতি, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভারতের আধিপত্যবাদী তৎপরতা বাড়তে থাকবে, কমবে না।

ইতিহাসে এটা স্পষ্ট যে মুসলমানরা কখনও কোন নিদ্দিষ্ট ভাষা ও ভৌগলিক পরিমন্ডলে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি। জাত প্রথা, -যা কাকেও সম্ভান্ত ও আবার কাকেও অচ্ছ্যুৎ হীনমন্য বলে চিহ্নিত করে, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর উপর উচ্চবর্ণ বলে দাবীদারদের শোষণ ও খবরদারী ইসলামী দর্শন ও বিশ্বাস মতে নিতান্তই ঘৃণ্য ব্যাপার। বৈদিক ভারতীয়দের মত মুসলমানরা কখনও নিজেদের বিশেষ কোন এলাকা কিংবা কেবল একটি এলাকায় সীমাবদ্ধ রাখেনি। কেবল অর্থনৈতিক কারণে কোন এলাকায় নিবাস গড়ে কিংবা স্থায়ীভাবে বসবাস না করে জাত, ধর্ম, বর্ণ ও ভূখন্ড নির্বিশেষে সর্বত্র মানুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠার বাণী নিয়ে চষে বেড়ানোর ব্যাপারটাই কোরানে উৎসাহিত করা হয়েছে। এই কারণেই ইতিহাসে দেখা যায় যে, মুসলমানরা সুদূর আরব ভূমি থেকে দলে দলে বের হয়ে আফ্রিকা, ইউরোপ, এশিয়া এবং দূরপ্রাচ্য চষে বেড়িয়েছে। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে যা বর্তমানে পাকিস্তান সেখানে মুসলমানদের পদচারণা অষ্টম শতাব্দীর প্রথম দিকেই শুরু হয় এবং প্রায় একই সময়ে পূর্ব ভারত তথা বর্তমান বাংলাদেশেও মুসলমানদের আগমণ ঘটে। পশ্চিমাঞ্চলে মুসলমানদের আবির্ভাব ঘটে বিজয়ী শক্তি হিসেবে আর পূর্বাঞ্চলে মুসলমানরা প্রথমে আসে ধর্ম প্রচারক হিসেবে এবং পরবর্তীতে আবির্ভূত হয় যুদ্ধে বিজয়ী শক্তি হিসেবে।

শুরুতে মুসলমানদেরকে বৈরী অবস্থা মোকাবেলা করতে হয়েছে কেবল অজানা অঞ্চলে বসত গড়ে তোলার ক্ষেত্রেই নয়, এই বৈরীতা মোকাবেলা করতে হয়েছে আরবীয় আদর্শের আলোকে ইসলামিক সামাজিক জীবন অনুসরণে এবং মুসলিম স্বাতন্ত্র্যবজায় রেখে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনায়। কেননা মুসলমানদের অনুসৃত তৌহিদ (আল্লাহর প্রতি একনিষ্ট বিশ্বাস) এবং রিসালাত (মুহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনাচার-এর তত্ত্ব ও দর্শন) বিশাল ভারতীয় বিধর্মী জনগোষ্ঠীর নিকট ছিল সম্পূর্ণ অজানা। তবে সৌভাগ্যক্রমে বসতিস্থাপনকারী মুসলমানদের জন্য একটি অনুকূল অবস্থা ছিল এই যে তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে নির্যাতিত ও নিগৃহীত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর একাংশের মধ্যে ইসলামী ব্যবস্থার প্রতি ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত বৈদিক ধর্ম ছিল কার্যত তথাকথিত নিম্নবংশে জন্মগ্রহণকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণকে হিন্দু পুরোহিত ও ব্রাহ্মণদের হাতে নির্মমভাবে শোষিত ও নির্যাতিত হবার একটা হাতিয়ার বিশেষ। নতুন ইসলামী বিশ্বাস ও সামাজিক প্রথা সম্পর্কিত জ্ঞান তারা লাভ করার পর গরীব ও নির্যাতিত জনগোষ্ঠী ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়, কেননা মুসলমানদের দৃষ্টিভঙ্গী ও আচরণে ছিল সর্বক্ষেত্রে সকল মানুষের সমানাধিকার নিশ্চিত করা, তবে অষ্টম শতাব্দী থেকে প্রায় সহস্র বছর ধরে উপমহাদেশে মুসলমানদের পদচারণা চললেও সামগ্রিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে সাধারণ জনগোষ্ঠী এবং শাসক পর্যায়ে তারা সংখ্যালঘিষ্টই থেকে যায়। অবশ্য ভারতের পশ্চিমাঞ্চল এবং পূর্বাঞ্চলীয় বাংলা ও আসামে মুসলমানরা পরে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ উপনিবেশিক শাসক হিসেবে বৃটিশদের অবস্থান এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয় যে তারা তাদের উপনিবেশিক স্বার্থ রক্ষার তাগিদে শিক্ষা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উচ্চবর্ণের অবিমিশ্র হিন্দুদের সাথে একটি দুষ্টজোট গড়ে তোলা শুরু করে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে হিন্দুদের আনুকূল্য প্রদানের পাশাপাশি ইংরেজ শাসকরা মুসলমানদের দূরে ঠেলতে শুরু করে। যার পিছনে বিদ্যমান ছিল অনেক স্পষ্ট কারণ। যে সব সম্পর্কে ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার তার বিখ্যাত বই দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস (১৮৭১)-এ বিশদভাবে আলোকপাত করেন।

পক্ষান্তরে মুসলমানরাও নেটিভদের জন্য বৃটিশদের প্রবর্তিত ইংরেজী শিক্ষা বর্জন করে। এই পর্যায়ে অতি উৎসাহ ও আগ্রহের সাথে বাঙালি হিন্দুরা অপরাপর বৃটিশ ইন্ডিয়ান নাগরিক গ্রুপ সমূহের চাইতে অনেক বেশী ইংরেজী শিক্ষার দিকে ঝুঁেক পড়ে। ফলে উচ্চবর্ণের বাঙালি হিন্দুরা কেবল ইংরেজী শিক্ষা লাভই নয়, তারা ইংরেজ শাসক শ্রেণী এবং ভারতে কর্মরত বৃটিশ কর্মকর্তাদের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে এবং তাদের তল্পীবাহীর ভূমিকা গ্রহণ করে তাদের আর্থিক ভাগ্যও সুপ্রসন্ন করে তোলে। হিন্দুদের নিকট সেটা ছিল অনেকটা প্রভু বদলের ব্যাপার। শত শত বছর ধরে উপমহাদেশে চলা মুসলিম শাসনামলে যাদের প্রভূ ছিল মুসলমানরা। মুসলিম শাসনামলে হিন্দুরা ফার্সী ভাষা শিখতো সরকারী চাকুরী লাভের জন্য -যা তারা রাতারাতি বদলিয়ে ইংরেজী ভাষা শিক্ষায় ঝাঁপিয়ে পড়লো বৃটিশদের শাসনাধীন আকর্ষণীয় বেতন-ভাতায় সরকারী পদ লাভের জন্যে।

ফলে বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনামলের অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সারা ভারতে ব্যাপকভাবে এলিট হিন্দু শ্রেণীর উদ্ভব ঘটে। এর মধ্যে এলিট বাঙালি হিন্দুদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটে অনেক; কেননা বৃটিশরা ১৯১১ সনে কলকাতা থেকে রাজধানী উত্তর ভারতের দিল্লীতে স্থানান্তরের পূর্ব পর্যন্ত ১৫০ বছর ধরে তাদের শাসন কার্যাদি পরিচালিত হয় কলকাতা কেন্দ্রিক। শাসন কার্যাদির কেন্দ্র দিল্লীতে স্থানান্তরের আরো কারণ ছিল। দিল্লী ছিল মোগলদের কয়েকশ বছরের শাসনামলের মূলকেন্দ্র। ১৮৫৮ সালে সিপাহী বিদ্রোহ তথা বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ সৈনিকদের বিপ্লবের পর বৃটিশরা পূরো ভারত সাম্রাজ্য নিজেদের কর্তৃত্বে নিয়ে যায়। আরো উল্লেখ্য যে বেশ কিছু উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে এলিট বাঙালি হিন্দুরা রাজধানী দিল্লীতে স্থানান্তরের কাজে বৃটিশদের সহায়তা করেছিল। এর মধ্যে প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি মুসলমানদের প্রশাসনের স্বাদ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা। কেননা বাঙালি মুসলমানরা ১৯০৬ থেকে ১৯১১ সন পর্যন্ত মুসলমান সংখ্যাধিক্যের নতুন পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ রক্ষার ব্যর্থ সংগ্রাম চালায়, যে প্রদেশের রাজধানী ছিল ঢাকা। বাংলা-বিহার-উড়িষা নিয়ে স্বাধীন সুবে বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলাকে পরাভূত করা পূর্বক বহু শতাব্দী ধরে মুসলমানদের রাজধানী হিসেবে পরিচিত ঢাকা বৃটিশরা দখল করে নেয়।

প্রখ্যাত বাঙালি কবি ও সেই সময়ের কলকাতা কেন্দ্রিক এক সামন্ত প্রভূ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নবগঠিত পূর্ব বাংলা প্রদেশকে বিলুপ্ত করা পূর্বক পশ্চিম বাংলার সাথে একীভূত করে রাজধানী ঢাকা থেকে কলকাতায় স্থানান্তর আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’ শীর্ষক এক উদ্দীপনামূলক বন্দনাগীত রচনা করেন এবং নিজের কণ্ঠেই তার যুক্তবাংলার অনুসারীদের নিয়ে ১৯০৫ সালের ৭ই আগস্ট কলকাতা টাউন হলে গানটি গান -যে সম্পর্কে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ কি দুঃখ ও বেদনার বিষয় যে, সে গানকেই ৬৬ বছর পর ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বরণ করে নেয়া হয়। এ থেকে এমন ধারণা করা কারো পক্ষেই অসম্ভব নয় যে, গোপন কোন অসৎ উদ্দেশ্য থেকেই বিগত শতাব্দীর প্রথম দিকে দুই বাংলাকে পুনঃএকত্রীকরণের উদ্দীপনামূলক বন্দনা সঙ্গীতটিকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদায় অভিষিক্ত করানো হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে রক্ষা ও উচ্ছকিত রাখতে সুদৃঢ়ভাবে বদ্ধপরিকর কারো পক্ষে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে উক্ত বন্দনাগীত গৃহীত হওয়ার ব্যাপারটাকে সন্দেহজনক বলে গণ্য করা কি অযাচিত হবে ?

শিক্ষা-দীক্ষাসহ সর্বক্ষেত্রে অগ্রগামী হবার পাশাপাশি ১৮৮৫ সালে হিন্দু এলিটদের নেতৃত্বে গঠিত কংগ্রেস পার্টির মাধ্যমে হিন্দুরা সুসংগঠিত হয়ে পড়ায় সৃষ্ট পরিস্থিতিতে বৃটিশরা তাদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা কংগ্রেসের নিকট ছেড়ে দিলে এক বিপদাপন্ন অবস্থার আশংকা করলো মুসলমানরা। বিভিন্নভাবে শোষিত-নিযার্তিত জনগোষ্ঠী সহ সংখ্যালঘুদের মধ্যে স্বকীয় স্বাতন্ত্র্যে বৈশিষ্ঠ্য বৃহত্তর জনগোষ্ঠী মুসলমানরা স্পষ্টতই সূদৃঢ়প্রসারী দৃষ্টিতে তাদের এবং অপরাপর অচ্ছ্যুৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য বিপদ দেখতে পেলো। এমনিতর বিপদের হুমকিতে তারা তাদের নিজস্ব সংগঠন গড়ে তোলার জন্যে সচেষ্ট হলো। ফলে প্রতিষ্ঠা লাভ করলো নিখিল ভারত মুসলিম লীগ যা ছিল মুসলমান নেতৃবৃন্দ, বুদ্ধিজীবি, যথার্থ চিন্তায় উদ্ধুধ ইসলামী পন্ডিত ও উলামাদের আশা আকাংখা বাস্তবায়নের যৌক্তিক পরিণতি। এর মধ্যে অবশ্য অগ্রগামী ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমেদ খান, নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী যদিও নেতৃত্ব দেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। ১৯০৬ সালের ডিসেম্বর ঢাকায় ইন্ডিয়ান মোহামেডান সোসাইটির বার্ষিক শিক্ষা সম্মেলন অনুষ্ঠানের সুবাদে মুসলীম লীগ দল প্রতিষ্ঠার সুযোগ ঘটে; যদিও ততদিনে আগে উল্লিখিত তিন মুসলিম নেতারই ইন্তেকাল ঘটে, কিন্তু উপমহাদেশে মুসলমানদের স্বতন্ত্র সত্ত্বা, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি রক্ষার উদ্দীপনা সৃষ্টিতে ও সংগ্রামে যারা ছিল স্থপতি।

বৃটিশ তল্পীবাহী হিসেবে কি মুসলিম লীগের যাত্রা শুরু হয়েছিল ?

বৃটিশ রাজের উপনিবেশিক স্বার্থ জিইয়ে রাখার কাজে ভূমিকা রাখার জন্য মুসলিম লীগকে কেউ কেউ অভিযুক্ত করেন। সমালোচকরা এই অভিযোগের পক্ষে মুসলিম লীগের সংবিধানের মুখবন্ধে উল্লিখিত বৃটিশ রাজের প্রতি আনুগত্যের কথা কেউ কেউ বলেন। এহেন অভিযোগ রীতিমত প্রতারণামূলক। রাজ কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য দেখানো সম্পর্কিত তরীকা সম্পর্কে যারা অবহিত তারা জানেন যে সেই সময়কার বৃটিশ সাম্রাজ্যের প্রতিটি কায়-কারবারে, রাজনীতিতে প্রকাশ্যে এবং দালিলীকভাবে বৃটিশ রাজের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা ছিল একটা আবিশ্যক শর্ত। সেই সময়তো ছিলই: এমনকি আজও বৃটিশ রাজের প্রতি সর্বক্ষেত্রে আনুগত্য ঘোষণা একটা স্বীকৃতি প্রথা হিসেবে গ্রেট বৃটেনে অনুসৃত হয়ে থাকে। যেমন বৃটিশ পার্লামেন্ট-এর প্রতি বিরোধী দলকেও বলতে হয় যে তারা হচ্ছে বৃটিশ রাজের-এর প্রতি আনুগত্যশীল বিরোধী দল। অতএব বৃটিশ ভারতে মুসলমানদের আনুষ্ঠানিকভাবে বৃটিশ রাজ এর প্রতি আনুগত্যের ওয়াদা করার রেওয়াজ ছিল সেই সময়ের একটা বাধ্যতামূলক প্রথা; কারণ মুসলমানরা তাদের প্রতি আনুগত্যশীল নয় বলেই বৃটিশরা মনে করতো। কিন্তু হিন্দু সহ অপরাপর সম্প্রদায়সমূহকে বৃটিশরা কখনও বৃটিশ রাজ-এর প্রতি আনুগত্যশীল নয় বলে বিবেচনা করতোনা। যেমন মুসলিম লীগ বিরোধী কংগ্রেসকে কখনও বৃটিশ শাসন বিরোধী বলে বিবেচনা করার কোন অবকাশ বৃটিশদের ছিলনা; কারণ কংগ্রেস প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে ছিলেন এলান অক্টোভিয়ান হিউম সহ বহু বৃটিশ ও তাদের এতদ্দেশীয় তল্পীবাহীরা। মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা নবাব স্যার সলিমুল্লাহ কোন বিবেচনাতেই বৃটিশদের তল্পীবাহী ছিলেননা; বরং বৃটিশদের প্রতি তার ঘৃণা ছিল সর্বজনবিদিত। তিনি কোন বৃটিশ কর্মকর্তার সাথে করমর্দন করার পর হাত ধুয়ে ফেলতেন এবং তার সোহব্বত থেকে সব সময় নিজকে দূরে রাখতেন।

বৃটিশদের প্রতি মুসলমানদের ঘৃণা বিনা কারণে সৃষ্টি হয়নি। মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রায় দুই শতাব্দীব্যাপী পরিচালিত ক্রুসেডের পরবর্তীতে মুসলমানদের শিক্ষা, জ্ঞান ও দক্ষতা অনুকরণ করে পরবর্তীতে যে ইউরোপীয় সভ্যতার অভ্যূদয় ঘটে তার প্রতিটি আক্রমণের লক্ষ্য ছিল মুসলমানরা। বৃটিশ নেতৃত্বে বৃটিশ মিত্র শক্তির জয়ের অব্যবহিত পরে ১৯২০ এর দশকে মুসলিম খেলাফতকে বিলুপ্ত করার বিষয় কেবলমাত্র সারা বিশ্বের সাধারণ মুসলমানরাই এটাকে তাদের উপর চাপিয়ে দেয়া এক মহা বিপর্যয় হিসেবেই গণ্য করেনি, উপমহাদেশের মুসলমানরাও সেই বিপর্যয়কে মেনে নিতে পারেনি এবং ইতিহাসের সেই পর্যায়ে বিশ্বের অপরাপর অঞ্চলের চাইতে উপমহাদেশের মুসলমানরা ছিল অনেক বেশী সংগঠিত। তুরস্কের স্পষ্টতই ধর্মানিরপেক্ষতাবাদী নেতা কামাল পাশা বৃটিশদের পৃষ্টপোষকতা পেলেও সাধারণ মানুষ তার প্রতি সমর্থন জানানোকে তেমন বেশী ফলদায়ক মনে করেনি। তুরস্কের খেলাফত অবসানের অনতিকালের মধ্যেই খেলাফত ধ্বংসের বিরুদ্ধে ভেতরে ও বাইরে বিভিন্ন প্রতিরোধ আন্দোলন দানা বেঁধে উঠে।

তুরস্কের লেখক হালীদী এদিব তার ইনসাইড ইন্ডিয়া বইয়ে ১৯২০ এর দশকের পরে ভারতের মুসলমান ও হিন্দুদের মধ্যকার অবস্থা সম্পর্কে লিখেন: ভৌগলিক বিভাজন, সংস্কৃতি এবং জাতিগত স্বাতন্ত্র্য পৃথক হলেও মানব হৃদয় ও আত্মার হিমালয় অনুগ্রহ করে না ভুলাই সমীচিন। আমাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যবাহী সাহিত্য, অর্থনৈতিক পদ্ধতি, উত্তরাধিকার আইন, উত্তরাধিকার এবং বিবাহ পদ্ধতি মৌলিকভাবে পৃথক--- আমরা এক সাথে খাই না; পারস্পরিকভাবে বিবাহ করিনা। আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য ও প্রথা ও দিন এমনকি পোষাক-পরিচ্ছেদ পর্যন্ত পৃথক। [ওহিদ-উজ-জামান, টুওয়ারডস পাকিস্তান, পাবলিশার্স ইউনাইটেড লিঃ, লাহোর, ১৯৬৪, পৃ: ১৫১, হালিদী এদিব প্রণীত ইনসাইড ইন্ডিয়া থেকে উদ্ধৃত পৃ: ৩৬২]

যদিও ১৯৩০-এর দশকে বৃটেনের ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী, প্রকৃতই যিনি পাকিস্তান প্রস্তাবের উদগাতা, ভারতের পশ্চিম বাংলা এবং আসাম নিয়ে পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলের হায়দ্রারাবাদ নিয়ে একটি ভৌগলিক সীমারেখা নির্ণয় পূর্বক ১৯৪০ সালের ২৩-২৪ শে মার্চ লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হবার দুই সপ্তাহ আগে ১৯৪০ সালের ৮ই মার্চ লন্ডনে মুসলমানদের জন্য প্রস্তাবিত পৃথক রাষ্ট্রের সংজ্ঞা ব্যক্ত করেছিলেন। একইভাবে তেমন সীমারেখা ও প্রস্তাব প্রণয়ন করেছিলেন আল্লামা ড: মোহাম্মদ ইকবাল। কিন্তু বাস্তবে জিন্নার গতিশীল নেতৃত্বে মুসলিম লীগই বৃটিশ ও তাদের তল্লীবাহী এবং কংগ্রেসের এলিট হিন্দুদের তীব্র বিরোধীতার মধ্যেই রাজপথের আন্দোলন সংগঠিত করে ১৯৪৭সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তার ফসল হাসিল করে।

ভারতের বিভিন্নমূখী চাপ ও ষড়যন্ত্রের মধ্যেও পাকিস্তানের টিকে থাকা

টিকে থাকার প্রশ্নে মারাত্মক বৈরীতার অনেক চ্যালেঞ্জ স্কন্ধে নিয়ে পাকিস্তানের জন্মলাভ ঘটে। নব জন্মগ্রহণকারী পাকিস্তান রাষ্ট্রের নানাবিধ দূর্বলতা ও অর্থনৈতিকভাবে বিপদাপন্ন অবস্থা সত্ত্বেও বিশ্বের খৃষ্টান, হিন্দু ও ইহুদী শক্তি পাকিস্তানকে অনেক উচ্চ মাত্রার প্রকাশ্য শত্রু হিসেবে গণ্য করে। ভারতের তুলনায় পাকিস্তান কেবল অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর ছিলনা; উপরন্ত শিক্ষা-দীক্ষায় এবং রাজনীতিতেও অনেক অনগ্রসর ছিল। ভারতের তুলনায় পাকিস্তানে এমন কোন প্রতিষ্ঠান ছিলনা -যার সহায়তায় দেশে কার্যকর একটি প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা যেতো।

প্রফেসর রালফ ব্রেইবন্ত তাঁর বইয়ে বিপদসংকুলভাবে শুরু হওয়া পাকিস্তানের পাশাপাশি ভারত যে কত বেশী শক্তিশালী ছিল তার কিছুটা বর্ণনা দিয়েছেনঃ “ভারত উত্তরাধিকার সূত্রে একটি অত্যন্ত মনলোভা সরকারী যন্ত্র, অত্যন্ত অভিজ্ঞ আমলাদের ক্যাডার এবং গভীর মনস্তাত্বিক সুবিধা ছিল প্রাচীন ভারতের উত্তরাধিকারী একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্তনিহিত বাস্তবতা।” পক্ষান্তরে পাকিস্তানকে তার নামের প্রতি সুবিচারকারী একটি জাতি সৃষ্টি করতে হয়েছে। আর সরকারী যন্ত্র তৈরী করতে হয়েছে। একটি নতুন ইমেজ নিয়ে স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠা করার অসুবিধাজনক প্রেক্ষাপট ছিল পাকিস্তান বিরোধী পারিপার্শ্বিকর্তার জিগির সৃষ্টিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে। এই অবস্থা অধিকাংশ পশ্চিমাদের মতে ভারতের জন্য ছিল অত্যন্ত সহায়ক। ‘প্রাচীন ভারত থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত নতুন রাষ্ট্র ভারত পশ্চিমাদের সহানুভূতি কুড়ায়। পক্ষান্তরে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি পশ্চিমাদের নিকট ছিল এক ধরণের রাজনৈতিক পলায়ন যা ভৌগলিক সিমেট্রি ও ভারতীয় সভ্যতার পরিচিতিতে ধ্বংস সাধন করেছে--সে জন্য পাকিস্তানকে শুরু থেকেই পশ্চিমাদের মজ্জাগত ইসলাম বিদ্বেষী দৃষ্টিকোন থেকেই গণ্য করে আসা হচ্ছে।’ [রাল্ফ ব্রেইবান্তী, সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানঃ এ থিয়োরেটিক্যাল এনালাইসেস নিবন্ধটি আটলান্টিক কোয়াটারলীতে প্রকাশিত হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের ডিউক ইউনির্ভাসিটি কর্তৃক ১৯৫৯ সনে পুনঃ মুদ্রিত, পৃ: ২৯২]

পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল মুক্তবুদ্ধি সম্পন্ন প্রত্যেকেরই এটা জানার কথা যে পাকিস্তান শুরু হয়েছিল সম্পূর্ণ শুন্য অবস্থা থেকে। বৃটিশ ভারতে অর্জিত রাজস্ব আয়ের মধ্যে পাকিস্তানের নির্ধারিত প্রাপ্য ৬০ কোটি রূপী যা দিল্লীর সেন্ট্রাল রিজার্ভ ব্যাংকে গচ্ছিত ছিল, তা পাকিস্তানকে প্রদান করতে ভারত রাজী হয়নি। ফলে নব্যরাষ্ট্র পাকিস্তান শুরুতে সরকারি কর্মচারীদের বেতন পর্যন্ত দিতে পারেনি। তবে হায়দারাবাদের নিজামের বদান্যতায় অবশ্য পাকিস্তান তার কর্মচারীদের বেতন শেষমেষ প্রদান করতে সক্ষম হয়। রাজধানী করাচীতে কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের কোন ভবনও ছিলনা। রাজস্ব নিয়ন্ত্রণ ও টাকা লেনদেন-এর জন্যে কোন ষ্টেট ব্যাংক ছিলনা। এমনকি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে কোন প্রশাসনও ছিলনা -যা দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অর্থাৎ পাকিস্তানকে সবকিছুই শুন্য থেকেই শুরু করতে হয়েছে এবং আস্তে আস্তে সকল ক্ষেত্রে ন্যুনতম অবস্থা তৈরী করতে হয়েছে। পক্ষান্তরে পাকিস্তানের শোচনীয় অবস্থার পাশাপাশি রাজধানী দিল্লী কেন্দ্রিক অবস্থা ভারত বৃটিশ ভারতের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের সকল সুবিধা ব্যবস্থাদিই উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করে রাজকীয় হালতে তাদের দেশ পরিচালনা শুরু করে।

অবশ্য পাকিস্তান ও ভারতের উভয়ের জন্য উদ্বাস্তু সমস্যা ছিল প্রায় একই রকম। তবে ভারত বড় দেশ হিসেবে বড় সম্পদের অধিকারী হওয়ায় উদ্বাস্ত পুনর্বাসন সেখানে কম ঝক্কিতেই নিস্পন্ন করা সম্ভব হলেও সম্পদের দুষপ্রাপ্যতা এবং ভারতের তুলনায় পাকিস্তানের উদ্বাস্ত সমস্যার ব্যাপ্তি অনেক প্রকট ও বহুমুখী হওয়ায় পাকিস্তানকে এনিয়ে হিমশীম খেতে হয়েছে মারাত্মকভাবে। যে কেহই এটা অনুধাবন করবেন যে ১৯৪৭ সালের অল্প আগে ১৯৪৩-৪৪ এর ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বিধ্বস্ত পূর্ব বাংলা/পূর্ব পাকিস্তানে যখনও সে দুর্ভিক্ষের রেশ চলতে ছিল সেই সময় উদ্ধাস্তুদের পূর্নবাসন যে কত বেশী ব্যাপক ও মারাত্মক ছিল। তা সহজে আনদাজ করার বিষয় বটে।

অন্য আর একটি বিষয়ও সঠিকভাবে মনে রাখতে হবে যে, মাউন্টবেটেন তার বৃটিশ সাঙ্গাত রেডক্লিফ-এর সাথে মিলে এমনভাবে সীমানা চিহ্নিত করে যা পাকিস্তানকে আরো এক ধরণের সংকটে নিপতিত করে। গুরুদাসপুর পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা হওয়া সত্ত্বেও রেডক্লিফ রোঁয়েদাদ তাকে ভারতের সাথে অঙ্গীভূত করে দেয়, যার ফলে জম্মু ও কাশ্মীরে ভারতের অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়; একইভাবে পূর্বাঞ্চলের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আসামের করিমগঞ্জ জেলা দিয়ে দেয়া হয় ভারতকে, যার ফলে পূর্ব বাংলা/পূর্ব পাকিস্তানকে আর এক ধাপ দুর্বল অবস্থায় নিপতিত করে ভারতকে শক্তিশালী করা হয়। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে একটি করিডোর সংযোগ দেয়ার অতি প্রয়োজনীয় দাবীকে নিদারুণভাবে প্রত্যাখান করা হয়।

অযোচিতভাবে এমনিতর ভঙ্গুর পাকিস্তানী সীমান্ত ব্যবস্থা মেনে নেয়ার জন্য বৃটিশ ভাইস রয় মাউন্টব্যাটন কংগ্রেস নেতাদের ষড়যন্ত্রের সাথে মিলে জিন্নাহর উপর এই মর্মে চাপ প্রয়োগ করে যে উক্ত সীমান্ত ব্যবস্থা হয় তাকে মানতে হবে অথবা পাকিস্তানের দাবী চিরতরে পরিত্যাগ করতে হবে। জিন্নাহর সামনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য সৃষ্ট সমস্যা সংকুল পরিস্থিতিতে কাট-ছাট করা ও পোকায় খাওয়া পাকিস্তানকে গ্রহণ করা ছাড়া কোন বিকল্প ছিলনা; কেননা জিন্নাহ এটা যথার্থই অনুধাবন করেছিলেন যে অল্প-স্বল্প যা কিছুই পাওয়া যায়- অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে সেটা গ্রহণ করাই উত্তম। নব্য রাষ্ট্র পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নানাধরণের অপমানজনক পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরও উৎকট স্বাদেশিকতায় উদ্ধুধ ভারতের ঝাল মেটেনি; পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্র ও বিপদাপন্ন দেশ এবং অঞ্চলসমূহ গিলে খাবার জন্য তারা উঠে পড়ে লাগে। ভারতের সেই মারাত্মক আগ্রাসী চরিত্রের কিঞ্চিত নতীজা, আচরণ ও আলামত পরিস্ফুট হয় সেই সময়কার এক হিন্দু নেতা শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীর বক্তব্যে। শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলার এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ফজলুল হক মন্ত্রীসভার শিক্ষামন্ত্রী আশুতোষ মুখার্জীর ছেলে। শ্যামা প্রসাদ এই মর্মে মন্তব্য করেছিলেন যে ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসের পর ৬ মাসের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তান নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এটাও সর্বজনবিদিত যে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওয়াহেরুল নেহেরু তিন তিনবার পূর্ব পাকিস্তানে পুলিশী এাকশান শুরু করা পূর্বক তা দখল করে নেয়ার পরিকল্পনা এটেছিলেন; কিন্তু তিনবাবই তিনি তা করা থেকে শেষ-মেষ নিবৃত্ত থাকেন। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা সমূহ পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের মধ্যে গভীর ভারত বিরোধী বিক্ষুদ্ধতা লক্ষ্য করেই নেহেরুকে তার সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ছাড়পত্র দেয়নি। ভারতের নানাবিধ আগ্রাসনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ কত গভীরভাবে বিক্ষুদ্ধ ছিল তার কিছু প্রকাশ ঘটে ১৯৬৫ সালের পাক ভারত যুদ্ধের সময় -যা থেকে এটা স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে নেহেরু তার পরিকল্পিত পুলিশী এ্যাকশানের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান দখল করার চেষ্টা করলে তাঁর ও ভারতের জন্য তা হতো এক মর্মান্তিক ব্যার্থ অভিযান -যা নিজ বুদ্ধি-জ্ঞান দিয়ে নেহেরু উপলব্ধি করেই শেষ পর্যন্ত নিজকে সংযত করেন। ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ ছিল ভিন্নতর। তবে ১৯৭১ উত্তর সময় থেকে বাংলাদেশে জনগণের মধ্যে বিদ্যমান ভারত বিরোধী মনোভাব এটা স্পষ্টই প্রমাণ করে যে পতাকার পরিবর্তন হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনগণ কোন অবস্থাতেই তাদের মুসলিম পরিচিতি মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিকে বিসর্জনতো দূরের কথা, বরং যে কোন মূল্যে যে তা রক্ষা ও উচ্ছকিত রাখতে ওয়াদাবদ্ধ থাকবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

ভারতীয় আধিপত্যবাদের কারুকাজ/চক্রান্ত বুঝতে হবে

এতে কোন সন্দেহ নেই যে ১৯৭২ সালের পর থেকে বাংলাদেশের মন ও মানসকে ভারতীয়করণের জন্য প্রচুর বস্তুগত আর্থিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সাহায্য ও সমর্থন ভারত যুগিয়ে আসছে। বাংলাদেশের প্রচার মাধ্যমসমূহের এক বিরাট অংশ ভারতীয় মার্কা অপপ্রচার-এর প্রতিপাদ্য দিয়ে পরিচালিত। তথাকথিত আধুনিক স্কুল সমূহের শিক্ষা কারিক্যুলাম বিশেষত সমাজ বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিষয়াদি সম্পূর্ণভাবে ইসলামিক মূল্যবোধ ও গুণাবলী বিরোধী বৈদিক দর্শনের অনুকরণে প্রণীত। আমলাতন্ত্র, প্রশাসন শিক্ষক সমাজ এবং কায়েমী স্বার্থবাজদের নতুন গোষ্ঠীর এক উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতীয় সংস্কৃতির আজ্ঞাবহের ভূমিকায় অবতীর্ণ রয়েছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে যাদের কোন অবস্থানই নেই। সম্ভাব্য সকল ধরণের মস্তিস্ক ধোলাইয়ের অপচেষ্টা চালানো সত্ত্বেও আজ অবধি তারা সফলকাম হতে পারেনি; জনগণ আজও ভারত বিরোধী এই জন্যে যে ভারত বাংলাদেশের সাধারণ জনগোষ্ঠীর জীবনাচারের মৌলিক ভিত্তিকে ধ্বংস করতে চায়। দেশের অর্থনীতি ও উৎপাদনশীলতার যে কাঠামো সাধারণ গরীব ও নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের জীবন ধারণের ভিত্তি তা ভারতের প্রভূসূলভ আচরণে হুমকিগ্রস্ত। ভারতের নির্মিত ফারাক্কা বাধ-এর বিষময় ফলে বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ এলাকা মরুভূমিতে পর্যবসিত হয়ে বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ জনগণের জীবন ও জীবিকাকে হুমকিগ্রস্ত করে ফেলেছে।

বাংলাদেশে ভারতীয় আধিপত্যের এসব হচ্ছে যৎকিঞ্চিত নমুনা। উল্লেখ্য যে, দুই দেশের ৫৪ টি অভিন্ন নদীর মধ্যে বাংলাদেশের উজানের ভারতে প্রবাহিত ৫৩টি -যার প্রায় প্রত্যেকটিতে বাঁধ, গোয়েন, স্পার নির্মাণ করে উজানের পানি নিয়ন্ত্রণ পূর্বক শ্বাসরোধ করে বাংলাদেশের ভাটিতে বিপর্যস্তকর অবস্থায় ফেলে তার অর্থনীতির অস্বাভাবিক তথা অপমৃত্যূর ঘটনার চেষ্টায় লিপ্ত ভারত। অর্থাৎ বহুল পরিচিত ভিত্তিক বাংলাদেশে আজ এক মৌসুমে খরা আর বর্ষা মৌসুমে বন্যার ছোবলে ক্রমবর্ধমানহারে বিপর্যস্ত হচ্ছে। [বেন ক্রো, ইটি এএল, শেয়ারিং দি গ্যাঞ্জেস, ইউনির্ভাসিটি প্রেস লিঃ, ঢাকা, ১৯৯৫, এম, রফিকুল ইসলাম গ্যাঞ্জেস ওয়াটার ডিসপ্যুটঃ ইটস ইন্টারন্যাশনাল লিগ্যাল এসপেক্টস, দি ইউনির্ভাসিটি প্রেস লিঃ, ঢাকা, ১৯৮৭, বি,এম, আব্বাস এটি, দি গ্যাঞ্জেস ওয়াটার ডিসপ্যুট, দি ইউনির্ভাসিটি প্রেস লিঃ, ঢাকা, ১৯৮২ ইত্যাদি]

এছাড়াও ভারতের শিল্পজাত পণ্যের অবাধ প্রবাহ বাংলাদেশের শিল্প উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে রেখেছে। আনুষ্ঠানিক চ্যানেল এই পণ্য প্রবাহের যে অবস্থা তার চাইতে অনেক অনেক বেশী এই পণ্য প্রবাহ চলছে দু’ দেশের ১৭০০ মাইল সীমান্ত পথের চোরাচালান রুটে।

বাংলাদেশের এই যাবতকালের সকল শাসক শ্রেণীই তারা যে মত ও পথের হোক না কেন; ভারতের পদাঙ্কই অনুসরণ করে আসছে। এটা বাস্তব অবস্থার আলোকে কেবল অযৌক্তিকও নয়; কেননা দিল্লীর গুডবুক-এ থাকা ও ভারতে কৃপা লাভের চাইতে অন্য কিছু চিন্তা করার অবকাশই শাসকশ্রেণীর নেই। ১৬ই ডিসেম্বরের কয়মাসের মধ্যে থেকেই ভারতের অনুকম্পা শেখ মুজিব (কলকাতার জনৈক অরুণ চক্রবর্তীর ছেলে যার নাম প্রথমে ছিল দেবদাস চক্রবর্তী, যাকে তিন বছর বয়সে ১৯২৩ সালে শেখ লুৎফুর রহমান পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করে নাম রাখেন মজিবুর রহমান -ডঃ এম,আই চৌধুরী, জীবনস্মৃতি, ঢাকা ২০০৬ পৃষ্টা, ৬৪২-৪৩) কর্তৃক ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে ভারতের সাথে ২৫-সালা মেয়াদী এক চুক্তি স্বাক্ষর করার ফলে ভারতের অনুকম্পায় থাকা বাংলাদেশের শাসকশ্রেণীর জন্য ফরজ হয়ে দাঁড়ায়। উক্ত চুক্তির অষ্টম, নবম এবং দশ নম্বর ধারার শর্ত সমূহই হচ্ছে ঢাকার ক্ষমতায় আরোহনকারী সবারই ঘাড়ের উপর তলোয়ার স্বরূপ; যাদেরকে পরিচালনার জন্য দিল্লীর সরাসরি খবরদারীর তেমন প্রয়োজন পড়েনা। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূত ১৯৪৭ সাল থেকে সক্রিয় ভারতীয় লবীর ঘনিষ্ঠ সহযোগে বাংলাদেশের বড় বড় কর্তাব্যক্তিদের অব্যাহতভাবে হুমকি প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীন বিষয়াদিতে বহুমাত্রিক ভারতীয় হস্তক্ষেপ ও আধিপত্যবাদী তৎপরতা বাস্তব সত্যি -যা সর্বজনবিদিত। ভারতের এই ধরণের হস্তক্ষেপ এর সাথে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ক্লাইভ ও ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর হস্তক্ষেপ এর সাথে তুলনীয়। পলাশীর যুদ্ধেরর অনতিকাল পূর্বে মীর জাফরের সাথে কোম্পানী কর্মকর্তা ক্লাইভ যে চুক্তি (পরিশিষ্ট-২) করিয়ে নেয়, তার দুই নং ধারায় বলা হয়ঃ ‘ইংরেজদের শত্রু, তা সে ইউরোপীয় হোক কিংবা হোক ভারতীয়, তারা আমারও শত্রু।’

গত কয়েক দশক ধরে বিপদাপন্ন অবস্থায় দিনাতিপাত করতে গিয়ে বাংলাদেশের যে অভিজ্ঞান ও আক্কেল হয়েছে, তা থেকে যথেষ্ট শিক্ষা নেয়ার আছে। এই শিক্ষা প্রথমে হতে পারে ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে; যা নিতে হলে ১৯৭১ সালের পরিস্থিতিকে সম্পূর্ণ নতুন ও নিরাবেগপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে। এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গীর সূত্র হতে হবে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় অর্জিত বিজয় বাংলাদেশের জন্য তেমন কোন বিজয় ছিলনা, যতটা না ছিল ভারতের জন্যে।

দ্বিতীয় অত্যাবশ্যকীয় শিক্ষা নিতে হবে এই বাস্তবতা থেকে যে স্বাধীনতার যৎসামান্য স্বাদ বাংলাদেশীরা লাভ করতে না করতেই তা সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় শাসকরা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশ বাস্তবে ভারতের দখলকৃত একটি ভূখন্ডেই পর্যবসিত হয়েছে, ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওসমানীর রহস্যজনক অনুপিস্থিতিতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিকট পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের আত্মসমর্পনের দলিলই ভারত কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তান দখল করার স্পষ্ট ও বৈধ প্রমাণ। শেখ মুজিব ফিরে এসে ২৫ বছর মেয়াদী যে চুক্তিতে দেশকে আবদ্ধ করেন তা ছিল বস্তুতঃ ১৯৭১ সালের তাজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন প্রবাসী সরকার স্বাক্ষরিত গোপন চুক্তির ৭টি ধারার পরিবদ্ধিত সংস্করণ৫ এবং ২৫ বছরের সে চুক্তির দ্বারা প্রকারান্তরে আত্মসমর্পনের উক্ত দলিলের উপর বৈধতার সীল মেরে দেয়া হয়। যা ছিল আর এক অর্থে ভারতের গোলামীর নিশ্চয়তা এবং এতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আধিপত্য চালনার আইনানুগ কর্তৃত্ব লাভ করে ভারত। ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে দিয়ে নিজেদের স্বার্থে যে সব ক্ষমতা ও অধিকার ভারত লাভ করে তা যে কোন মূল্যে চিরস্থায়ী করতে তারা বদ্ধপরিকর। ঐ কুখ্যাত চুক্তির নবায়ণ কিংবা অন্য নামে একই মাত্রায় আর একটি চুক্তিতে বাংলাদেশকে আবদ্ধ করার পরিকল্পনাও রয়েছে ভারতের।

বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়কার দেখা দেয়া রাজনৈতিক অচলাবস্থার অধিকাংশ কারণ হচ্ছে দিল্লীর ঐ লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাব্য কোন ক্ষেত্র। গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশকে নামেমাত্র স্বাধীন রাখার ভারতীয় কৌশলের এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশকে নিয়ে তার লক্ষ্য অর্জনে তাদের আরো কিছু অত্যাবশাকীয় কাজ রয়েছে। এই কাজগুলো হচ্ছে বাংলাদেশকে সর্বব্যাপ্ত ও অনতিক্রান্ত চাপের মধ্যে ফেলা। এই লক্ষ্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সক্রিয় ভারতীয় তল্পীবাহীদের দিয়ে নেতিবাচক রাজনীতি করানো, ভারতের শিল্পজাত পণ্যের বাজার প্রতিষ্ঠার জন্যে শুরু থেকেই বিপদাপন্ন অর্থনীতিতে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালিয়ে আরো ক্ষতিগ্রস্ত করা, পরিকল্পিতভাবে ভারতীয়করণের জন্যে স্থানীয় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা, বাংলাদেশের সাথে পানি বণ্টনে সমঝোতা আসার আহবান প্রত্যাখান করা পূর্বক সকল আন্তর্জাতিক আইন নিয়মনীতি পদদলিত করে৬ অভিন্ন ৫৩টি নদীর উজানে পানি প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে ভাটির দেশ বাংলাদেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করা। পাকিস্তানের করাচীর ন্যায় ভারতীয় সন্ত্রাসী কার্যকলাপ পরিচালনা করা, চাকমা ইস্যু নিষ্পন্নে অনাগ্রহ তথা সৎ প্রতিবেশীমূলক আচরণে অনীহা, তথাকথিত বঙ্গভূমি আন্দোলনের দ্বারা বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ ভূখন্ডকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে মদদ ও পৃষ্টপোষকতা প্রদান এবং সর্বোপরী দক্ষিণ তালপট্টি দ্বীপকে দখলে করে রেখে ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে রক্তচক্ষু ও বিষদাঁত দেখাচ্ছে বিগত তিন দশকব্যাপী। এ ছাড়াও ট্রানজিট সুবিধাসহ পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহে সেনা অভিযান চালানোর সুযোগ প্রদানের জন্যে ভারত বাংলাদেশের উপর অব্যাহত চাপ প্রয়োগ করে চলেছে এবং বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্র বন্দর চট্টগ্রাম বন্দরকে আনসেন্সরড ব্যবহারের জন্য ভারত চাপ প্রয়োগ করে চলেছে।

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের আধিপত্যের রকমফের অন্তহীন। সময়ে তাদের আধিপত্যের বিভিন্ন প্রকরণ জনপ্রিয় অবয়বও ধারণ করে, যা কেবল বাংলাদেশে তাদের তল্পীবাহী রাজনৈতিক দলসমূহের সৃষ্ট বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; নানাবিধ শ্রমিক আন্দোলনেও তা পরিস্ফুট হয়। আর এই সব আন্দোলন ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা’র কর্তৃক পরিকল্পিত, সংগঠিত ও অর্থায়ন হয়ে থাকে। জামাতে ইসলামের নেতা গোলাম আযমের বিরুদ্ধে ১৯৯০ সালে ঘাদানিক আন্দোলন তেমন একটি। প্রায় ২০টি কিংবা তার কাছাকাছি বা তার বেশী সামরিক অভ্যুত্থান বা পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থান, যার দরুণ প্রকারান্তরে প্রেসিডেন্ট জিয়া নিহত হোন, তা ছিল তাদের অন্যতম মিশন। এটা কেবল ‘র’ এর কর্মকর্তাদের স্বীকারোক্তিতেই নয়; ভারতের বহু বিশ্বস্ত সূত্র ও মিডিয়া তা নিশ্চিত করে। [অশোক রায়না, স্পেশাল অপারেশানঃ বাংলাদেশ, ইনসাইড‘র’, বিকাশ পাবলিশিং হাউস (প্রাইভেট) লিঃ, দিল্লী, ১৯৮১, পৃ: ৫০-৬৩] প্রাক্তন পূর্ব পাকিস্তানে ‘র’ এর অনুপ্রবেশ ছিল অনেকভাবে, অনেক স্তর ও পর্যায়ে -যা বাংলাদেশ আমলে এত ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি ঘটে যে ‘র’ এবং দিল্লী কারো পক্ষেই এই সব তথ্য গোপন রাখা সম্ভব হয়নি।

পূর্ব পাকিস্তান জন্মের প্রায় শুরু থেকে ভারতের ষ্টেটসম্যান পত্রিকার ঢাকা অফিসে দায়িত্বপালনকারী ভারতীয় সাংবাদিক জ্যোতি সেন গুপ্ত স্বীকার করেছেন যে, শেখ মুজিবর রহমান সহ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বহু মহলের সাথে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সেই গোয়েন্দা সংস্থাই এক বিভ্রান্তিকর রিসার্চ এন্ড এনালাইসিস উইং (RAW) নামে ষাট এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে কাজ শুরু করে।

‘র’ এর কর্মকর্তারা বাংলাদেশকে এই মর্মে সর্বদাই নছিয়ত দিতে থাকেন যে বাংলাদেশ সামাজিক পর্যায়ে অবশ্যই তাদের শিকড়ের সন্ধানে ব্যপৃত হওয়ায় উচিত; যে শিকড় ‘র’ এর মতে হচ্ছে নিখাদ সনাতন ধর্ম। আর এই দৃষ্টিকোন থেকে ইসলাম হচ্ছে বিদেশী ধর্ম যার উৎস আরবের মাটি থেকে উৎসারিত। এ থেকে কি এমন প্রশ্নের উদ্রেক হয়না যে তাহলে কি বাংলাদেশীদেরকে হিন্দু দেবতা শিব, কালী, দুর্গার পূজা করতে হবে? নবজাত শিশু হত্যা শুরু করতে হবে? মৃত স্বামীর সাথে স্ত্রীকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা পুনঃরায় শুরু করতে হবে? মুসলমানদেরকে মানবিক সমতার আদর্শ পরিত্যাগ করে মানুষের মধ্যে সকল ক্ষেত্রে বনেদি ও অচ্ছ্যুৎ শ্রেণী প্রভেদ সৃষ্টির কাজ শুরু করতে হবে ?

বদ্ধপরিকর হওয়া দরকার

স্পষ্টতই এই প্রশ্নের উদ্রেক হয় যে, বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক শক্তি যারা জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশ তারা সমেত ১৫ কোটি মানুষ কি বাংলাদেশকে অব্যাহতভাবে ভারতীয় কবজায় রাখার ব্যাপারটা অনুমোদন করে ? তারা কি শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবেনা ?

কোন অবস্থাতেই পাকিস্তানের পরিতৃপ্ত হয়ে থাকা যাবে না

১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ক্ষুদ্র বাংলাদেশ এক বিপদাপন্ন অবস্থার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। পূর্ব পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান তেমন বিপদাপন্ন অবস্থায় পতিত হয়নি কিংবা ভারতের চাইতে দুর্বল হয়নি; তবে পাকিস্তান ততটুকু শক্তিশালী নয় যতটুকু হতো দুই অংশ ঐক্যবদ্ধ থাকলে। পাকিস্তান হয়তো কতগুলো ক্ষেত্রে তার অর্জিত অগ্রগতিতে পরিতৃপ্ত হতে পারে, যার মধ্যে উল্লেখ্য হচ্ছে অপমান এবং ধ্বংসস্তুপ থেকে সর্বক্ষেত্রের অবস্থার উন্নয়ন; কেননা অর্থনৈতিক সুচকের প্রণীত তথ্যাদি অনুযায়ী কেবল বাংলাদেশ থেকেই নয়, ভারতের চাইতেও পাকিস্তানের জীবন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটেছে; যা পাকিস্তানের উন্নয়ন, সমৃদ্ধ জীবন ব্যবস্থা, দরিদ্রতা হ্রাস এবং গণতন্ত্র ও প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মোটামোটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের মধ্যেই নিহিত। ১৯৭১ সালের ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে যে আত্মবিশ্বাস পাকিস্তান হারিয়ে ফেলেছিল তা পাকিস্তান পুনরুদ্বার করে বর্তমানে অনেক বেশী আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। আফগানিস্তানে সোভিয়েট আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব মোকাবেলায় প্রায় এক দশকের যুদ্ধে পাকিস্তানের সাফল্য তাকে যে কোন বৃহৎ ও শক্তিশালী শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজকে রক্ষা করতে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যুগিয়েছে। কাশ্মীর সমস্যার কোন সমাধান আজ পর্যন্ত না হওয়া সত্ত্বেও কাশ্মীরিদের প্রতি কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের আর্দশিক ও নৈতিক সমর্থন ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের যে কোন আলোচ্যসূচীর অগ্রে স্থান দিয়েছে। ভারত কাশ্মীর ইস্যুতে বরাবরই কলংকজনকভাবে পরাভূত হয়ে আসছে। মোট কথা এটা নিঃসন্দেহ যে পাকিস্তান তার শক্তিই কেবল পুনরুদ্ধার করেনি; স্বীয় ঐক্য ও সংহতি এবং সুস্পষ্ট স্বাতন্ত্র্যতা চিরতরে রক্ষা করতে যথেষ্ট আস্থাবান। ভারত হয়তো মাঝে মধ্যে আক্রমণ ও তার সক্রিয় দালালদের দিয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালাতে পারে; কিন্তু পাকিস্তান দখল করার মত স্পর্ধা তার নেই যদি সে তার নিজকে ধ্বংস করতে না চায়। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থান সে রকম নয়। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ বরাবরই একটি অসহায় সত্ত্বা হিসেবে বিরাজ করছে। ভারতের প্ররোচনা ও পৃষ্টপোষকতায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নানা ধরণের ধ্বংসাত্মক অপতৎপরতা চরমে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের জনগণ অব্যাহতভাবেই ভারতের সামরিক আগ্রাসনের হুমকি অনুভব করে। যেভাবে সিকিম ভারত তার বশংবদ সংসদের মাধ্যমে গ্রাস ও হজম করেছিল সে ষ্টাইলে বাংলাদেশে ভারত তার তল্পীবাহী বা পঞ্চম বাহিনী দ্বারা আগ্রাসন চালাতে পারার একটা আশংকা সব সময়ে বাংলাদেশকে তাড়া করে। তথাকথিত চরম পন্থী বাঙালী জাতীয়তাবাদীরাই আসলে ৫ম বাহিনী হিসেবে সর্বজন বিদিত। সহস্র বছর ধরে বাংলাদেশের ১৫ কোটি মানুষের ৯০ শতাংশ মুসলমান যে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও স্বাতন্ত্র্যতা অনুসরণ, রক্ষা ও চর্চা করে আসছে এই বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা হচ্ছে তার সবচাইতে বড় শত্রু। অতএব ভারতীয় আধিপত্য কার্যকরভাবে প্রতিহতকরণে বাংলাদেশকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে উপমহাদেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতা থেকে। আর এই লক্ষ্যবোধ থেকে যথাযথ দিক-নির্দেশ-এ উদ্ধুধ হতে হলে বাংলাদেশ অবশ্যই পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠ হতে হবে।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ভারতের বিরোধীতা

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সৌভাতৃত্বমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাকে ভারত বরাবরই ঘৃণার চোখে দেখে আসছে। ভবিষ্যতেও এমন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগকে তারা ঘৃণা করবে। কেননা বাংলাদেশ প্রকৃতই একটি স্বাধীন স্বার্বভৌম শক্তিশালী দেশ হিসেবে টিকতে পারলে ১৯৪০ সালের লাহোরে গৃহীত পাকিস্তান প্রস্তাবের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা লাভ এবং আরো স্পষ্টভাবে বলতে গেলে দ্বি-জাতিতত্ত্ব যাকে ইতিহাস বর্ণিত মতে কংগ্রেসী ও বাজপেয়ী, বসন্ত চ্যাটির্জী সহ হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয়রা তীব্রভাবে অবজ্ঞা করে- সেই দ্বি-জাতিতত্ত্বের যৌক্তিকতাই প্রমাণ হবে। [বসন্ত চ্যাটার্জী, ইনসাইড বাংলাদেশ টুডে, এস, চান্দ এন্ড কোঃ (প্রাইভেট) লিমিটেড, দিল্লী, ১৯৭৩]

যদিও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অভিন্ন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দুইটি দেশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অভ্যুদয় ঘটে; কিন্তু ১৯৭১ সালের বিয়োগাত্মক নাটক মঞ্চায়ন এবং তার ধারাবাহিকতা ও জের অব্যাহত রাখার উৎকট প্রয়াসের লক্ষ্য একটাই -দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী ঝগড়া জিইয়ে রাখা। একসময়ের তথাকথিত বৈষম্য ইস্যুকে আজও জিইয়ে রেখে তাকে সুযোগ পেলেই শান দেয়ার লক্ষ্যই হচ্ছে দুটি দেশের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষ সৃষ্টি করে রাখা। অথচ সেই তথাকথিত বৈষম্যতত্ত্ব ছিল নিতান্তই ভিত্তিহীন যা বিশ্বের সর্ববৃহৎ ও শক্তিশালী একটি মুসলিম দেশকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জনমত সৃষ্টির কাজে ভারত ব্যবহার করে। ভারতীয় প্রচার মাধ্যমসমূহের অসত্য ও অর্ধসত্য প্রচারণাগুলোই শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে অব্যাহতভাবে পরিচালিত অপ্রচারসমূহ বস্তুত সেই প্রচারণারই পরিবর্ধিত রূপ। তথাকথিত ৩০ লক্ষ মানুষের নিহত হবার মিথ্যা সংখ্যাতথ্য বাংলাদেশ ও ভারতের প্রচারমাধ্যম সমূহে অব্যাহতভাবে প্রচার করা হয়, যার লক্ষ্যই হচ্ছে নানাবিধ প্রেক্ষাপটের দুই বন্ধুপ্রতীম দেশের সাধারণ মানুষের মনে পারস্পরিকভাবে বিদ্বেষভাব জিইয়ে রাখা। বস্তুতঃ পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটানোই হচ্ছে এই ভয়াবহ অপপ্রচারের মূল সূত্র। [জুলফিকার আলী ভূট্টো, মাই ডিয়ারেষ্ট ডটার, ক্লাসিক, লাহোর, ১৯৯৫, পৃ: ৫১] বলা বাহুল্য যে, ঐ বিলুপ্তকরণের অপপ্রয়াস থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়।

বাংলাদেশের চাইতে অনেক শক্তিশালী দেশ পাকিস্তান যদি বিলুপ্ত হবার ভারতীয় হুমকিতে নিমজ্জিত থাকতে পারে, সেখানে মুসলিম সত্ত্বা নিয়ে ভারতীয় আক্রমণের মুখে বাংলাদেশের টিকে থাকা সত্যিই দুস্কর। পাকিস্তান অথবা বাংলাদেশের ভূখন্ডগত তথা ভৌগলিক অবস্থান ভারতের নিকট কোন গুরুতর উদ্বেগের বিষয় নয়; তাদের উদ্বেগ হচ্ছে দুই দেশের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মূল্যবোধ ও সংস্কৃতিতে মুসলিম জাতিসত্ত্বা ও ইসলামিক স্বাতন্ত্র্যের প্রাবল্য। তাদের নিকট ইসলাম ও বিদেশী মুসলমানরা হচ্ছে তাদের বড় শত্রু -যা ১৯৪৭ সালে মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের অভ্যুদয় ঘটায় পাকিস্তানকে এক নম্বর শত্রু হিসেবে তারা চিহ্নিত করে। কেননা পাকিস্তান সৃষ্টির পিছনে ছিল বৃটিশ ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলমানদের রাজনৈতিক আন্দোলনের ফসল যার ভিত্তি ছিল দ্বি-জাতিতত্ত্ব আর তার অর্থই ছিল মুসলমান ও হিন্দুদের সত্ত্বা ও স্বাতন্ত্র্যের স্পষ্ট ভিন্নতা। ফলে বৃটিশরা ভারত ছেড়ে দেয়ার আগে দুইটি সার্বভৌম পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি করা পূর্বক উপমহাদেশকে স্বাধীনতা দেয়া ছাড়া বৃটিশ ও কংগ্রেস-এর সামনে আর কোন পথ খোলা ছিলনা। তবে তারা ১৯৪৭ সালে তাদের ভারত মাতার অঙ্গচ্ছেদন কোন শর্ত বা উদ্দেশ্য ছাড়া মেনে নেয়নি। আর পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে একটি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ টিকে থাক -এমন উদারতার বশে ভারত বাংলাদেশকে একাত্তরে সমর্থন দেয়নি। তাদের প্রকৃত স্বার্থের প্রথম ধাপ হচ্ছে বাংলাদেশকে ভারতীয়করণ এবং পরবর্তীতে সুযোগ মত বাংলাদেশকে সিকিমকরণের জন্য ঘুম পাড়ানীর টেবলেট খাইয়ে দেয়া। ভারতীয় প্রচার মাধ্যম ও তাদের বাংলাদেশী তল্পীবাহী মহলের অসত্য ও ভিত্তিহীন প্রচারনাসমূহ নিয়ে বার বার মাতম করার পিছনে রয়েছে ভারতের বাংলাদেশ বিরোধী চক্রান্তের কিছু নোংরা দিক। এই নোংরা দিকগুলো ভারতীয় হিন্দুদের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী থেকে উদ্ভূত। তাদের হিন্দু ধর্মমতে অখন্ড ভারত অথবা রামরাজ্য তথা দেবরাজ্য খন্ডন করা যাবে না; কোন কারণে খন্ডিত হলেও তাকে পুনরায় একত্রীকরণ করা ধর্মীয় মতে বাধ্যবাধকতাপূর্ণ; কিন্তু বাস্তবের পরিস্থিতি যে ভিন্ন এটা তারা এখনো অনুভব করতে পারেনি। তাদের দুই লক্ষ্য সাধনে তারা ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিশ্চিত করার জন্যে নিরুঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের লেলিয়ে দিয়ে রেখেছে। তারা চায় এই লক্ষ্য বাস্তবায়নেই উনিশ’ চল্লিশের দশকের ভারতীয় নেতা গান্ধী, নেহেরু, শ্যামাপ্রাসাদ মুখার্জী প্রমুখ পাকিস্তানের দুই অংশকে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদান করতে বহুভাবে উদ্ধুদ্ধ করেছিল।

বাংলাদেশ সৃষ্টি ভারতের ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’

ভারতীয় সাংবাদিক প্রাণ চোপড়া ১৯৭১ সালের ঘটনাপ্রবাহের অব্যবহিত পরেই বলেছিলেন যে, বাংলাদেশের সৃষ্টি হচ্ছে ভারতের জন্য ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জন’। [প্রাণ চোপড়া, ইন্ডিয়াজ সেকেন্ড লিবারেশান, বিকাশ পাবলিশিং হাউস (প্রাইভেট) লিমিটেড, দিল্লী, ১৯৭৩]

প্রথমটি তারা হাসিল করেছিল ১৯৪৭ সালে যখন বৃটিশরা ভারত ছেড়ে চলে যায়। এই ধরণের ধারণা কেবল চোপড়ার একার নয়; এই ধারণা সমগ্র হ্নিদু জাতীয়তাবাদীদের যারা মুজিবকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাদের এক সহস্র বছরের বিজয়ের নায়ক বলে মনে করে। আর দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীদের নিকট মুজিবের পরিচয় হচ্ছে বিংশ শতাব্দীর মীর জাফর যে সম্পর্কে বহু দেশপ্রেমিক বাংলাদেশীদের মত জনাব কে এ হক যথাযথভাবে তার ২০০৭ সালে প্রকাশিত একটি বইয়ের নামকরণ করেছে দুই পলাশী দুই মীর জাফর। ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন যে কোন বিজ্ঞ পাঠক এমন উপসংহারই টানবেন যে বাংলাদেশকে ভারত মাতার দখলে নিতে পারলে তাকে তারা তাদের তৃতীয় স্বাধীনতা হিসেবে আখ্যায়িত করবে আর চতুর্থ স্বাধীনতা হবে বোধ হয় তখন, যখন তারা পাকিস্তানের সমগ্র এলাকা দখল করে ফেলতে পারবে। এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্যি যে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয়েই ভারতমাতার অঙ্গচ্ছেদ থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল, যা গত ছয় দশকেও হিন্দুরা মনের দিক থেকে মেনে নিতে পারেনি। হিন্দুরা চায় উপমহাদেশের সমগ্র মুসলমানরা যেন হিন্দুয়ানী জীবনাচার -এ অভ্যস্থ হয়ে উঠতে অথবা যেন ভারতীয়করণে গা ভাসিয়ে দেয়, আর পক্ষান্তরে মুসলমানরা গৌরবের সাথে মুসলমান হিসেবে টিকে থাকতে বদ্ধপরিকর। এটা কেবল মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসেরই অংশ নয়; এটা নিজস্ব স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসারও পরিচায়ক। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের মহাসমুদ্রে সংখ্যালঘিষ্ঠ হিসেবে মুসলমানদের হজম হয়ে যাওয়া কোন অবস্থাতেই মুসলমানদের পক্ষে গ্রহণযোগ্য হতে পারেনা। অতএব দুই মূল্যবোধ ও জীবনাচারের প্রকাশ্য সংঘাত অব্যাহত রয়েছে এবং দু’য়েরই স্বাতন্ত্রতা রাজনৈতিক পর্যায়েও লক্ষ্যনীয়। পাকিস্তানের সাথে বৈরীতার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হলেও মুসলিম জাতি হিসেবে সম্মানের সাথে বেঁচে ও টিকে থাকা ছাড়া বাংলাদেশের সামনে অন্য কোন বিকল্প নেই। সে কারণেই কলিনস ও ল্যাপায়ার (১৯৭৫) যথাযথভাবেই বলেছেন যে, বাংলাদেশ হচ্ছে জিন্নাহের দ্বি-জাতি তত্ত্বের বাই প্রোডাক্ট। অতএব এটা নিশ্চিতভাবেই যে কেহ বলবে যে পাকিস্তান ও মুসলিম দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ স্থাপনের মধ্যে বাংলাদেশের উত্তম ভবিষ্যত নিহিত।

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ঘনিষ্ঠতার অপরিহার্যতা

বর্ণিত অবস্থার প্রেক্ষাপটে সম্মানের সাথে বাস করার জন্যে উভয় দেশকেই বৃহত্তর ঐক্যের জন্য আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। এই প্রয়োজনের গুরুত্ব আমাদের পূর্ব পুরুষরা উপলদ্ধি করেছিল মুসলিম লীগ সংগঠনের মাধ্যমে- যে মুসলিম লীগের জন্ম হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ঢাকার মহৎ মানব হিতৈষী নবাব স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে। ঐ প্রয়োজন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শেষ হয়ে যায়নি; কিংবা যায়নি ১৯৭১ সালের বিচ্ছিন্ন হবার কারণেও -যা খ্যাতিমান ঐতিহাসিক মরহুম ড: মতিয়ার রহমান (নবীনগর ব্রাহ্মণবাড়ীয়া), মরহুম ব্যারিষ্টার আলী আব্বাস (চান্দাইকোনা, পাবনা), মরহুম মাহমুদ আলী (সুনামগঞ্জ) আমৃত্য বলে গেছেন। মরহুম মাহমুদ আলীর সর্বশেষ লেখা ‘এক জাতি দুই রাষ্ট্র’ বইয়ে এই সম্পর্কে তার অকাট্য যুক্তি উল্লেখ করে গেছেন। একই ধরণের রীতিমত ভবিষ্যতবাণী করেছেন মহান অধ্যাপক খ্যাতিমান শিক্ষাবীদ-সাহিত্যিক এবং ঐতিহাসিক মরহুম ড: সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেইন তার এক বিবৃতিতে। ১৯৯৪ সালের অক্টোবরে প্রদত্ত উক্ত বিবৃতি পরবর্তীতে তার সর্বশেষ বইয়ে সন্নিবেশিত হয়, যা ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে মুদ্রণখানায় গেলেও বইটি প্রকাশিত হয় তার ইন্তেকালের (১২ জানুয়ারি, ১৯৯৫ইং) এক মাস পর। উক্ত বিবৃতিতে তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীনভাবে মন্তব্য করেছিলেন যে, এমনকি নামমাত্র স্বাধীন একটি দুর্বল বাংলাদেশও ভারতের নিকট একটি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালাতন বা উৎপীড়ণের হেতু রূপেই গণ্য যা তার নিকট সহনীয় হতে পারেনা। উত্তেজনা প্রশমিত হবার পর ভারত তার প্রধান শত্রু পাকিস্তানের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে বুঝাপড়া করা পূর্বক কিছু সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় অনেক বেশী স্বাধীনভাবে উদ্যোগী হবে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কে খাপ খাইলে, যদি তা পুরনো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নাও হয়, তাহলেও সেটা বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য বড় গ্যারেন্টি হয়ে থাকবে আর পাকিস্তানের টিকে থাকার পক্ষে হবে বড় ধরণের উৎস। যারা এই সত্য হৃদয়ঙ্গম করবেনা, তাদেরকে ক্ষীনদৃষ্টিসম্পন্ন স্বপ্নবীদ অথবা ৫ম কলামভূক্ত মারাত্মক দেশদ্রোহী বলেই অভিহিত করা যায়। [সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেইন, দি ওয়েষ্টস অব টাইমঃ রিফ্লেকশানস অন দি ডিক্লাইন এন্ড ফল অব ইষ্ট পাকিস্তান, নতুন সফর প্রকাশনী, ঢাকা, ১৯৯৫, পৃ: ২৮৪]

তিন অনুচ্ছেদের উপরোক্ত মন্তব্যগুলো তিনি তার ঐতিহাসিক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন। এই মহান ব্যক্তি উনিশ ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেন; অথচ একাত্তরের ঘটনা প্রবাহের সময় পঞ্চম বাহিনী ও ভারতের পোষ্য গুন্ডাদের হাতে নৃশংসভাবে নির্যাতিত হোন। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের পতনের পর তাকে নির্মমভাবে দৈহিক নির্যাতন করা হয় এবং দুই বছরের বেশী সময় কারা নির্যাতন এর একটি হচ্ছে একাত্তরে স্মৃতি এবং অন্যাটি হচ্ছে দি ওয়াষ্ট অব টাইমঃ রিফ্লেকশনস অন দি ডিক্লাইন এন্ড ফল অব ইষ্ট পাকিস্তান। তাঁর উপরোক্ত মন্তব্য সম্পর্কে কোন পর্যবেক্ষণ আমার করার দুঃসাহস নেই; তবে ঐ মন্তব্যের সর্বাংশকে এই জাতির জন্য নিখুঁত ভবিষ্যতবাণী বলে আমি মনে করি।

সৎ বুদ্ধিজীবি ও উল্লেখযোগ্য রাজনীতিবীদদের সবাই বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে একমত; যদিও তারা তা কৌশলগত কারণে প্রকাশ্যে বলবেননা। তবে তারা এটা স্পষ্টই অনুধাবন করেন যে উভয়ই ইসলামের সুমহান আদর্শে অভিন্নভাবে আত্মসঞ্জীবিত। অবশ্য অঞ্চল ভেদে এবং জনগণের মধ্যে ভাষা ও জীবনাচারে হয়তো বিভিন্নতা থাকতে পারে; কিন্তু ইসলামী মূল্যবোধ হচ্ছে উভয়ের অভিন্ন জীবনাচারের লাইফ ব্লাড। এই জীবনাচার থেকেই তারা তাদের জীবন ও জীবিকার মৌলিক প্রেরণা লাভ করে। এটা না থাকলে তারা তাদের ইসলামী মূল্যবোধ হারিয়ে বিশাল ভারতীয় সমাজে লীন হয়ে যেতো। এটা সৎ বুদ্ধিজীবি ও সঠিক চিন্তা-চেতনায় উদ্দীপ্ত সবাই স্বীকার করবেন, কিন্তু ভারতের ভয়ে বা অন্য কোন অজ্ঞাত কারণে তারা এই সত্যের কথা প্রকাশ্যে বলবেননা। এ থেকে অনুমান করা দুস্কর নয় যে ভারতীয় অধিপত্যের অষ্টোপাশ কত নির্মমভাবে বাংলাদেশকে আকঁড়ে ধরে রেখেছে। আর এখানেই নিহিত রয়েছে ভারতের অব্যাহত অধিপত্যবাদী অপতৎপরতা প্রতিহতকরণে অপরিহার্য ঐক্য প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উভয় সংকট। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান উভয়কে ভারত ভীতির কলংচক্র ভাঙ্গতে হবে; কেননা এর মাধ্যমেই তারা ভবিষ্যত বংশধরদের ভবিষ্যতকে সম্মানীয় করে তুলতে পারে। ভারতের সকল আধিপত্যবাদী অপতৎপরতাকে প্রতিহত করার চ্যালেঞ্জ স্কন্ধে নিয়েই আমরা একবিংশ শতাব্দীতে পদাপর্ন করেছি।

(বইটির pdf version download করুন এখানে)



Add this page to your favorite Social Bookmarking websites

 

Comments  

 
-2 # 2010-04-19 05:31

I've never seen such a ugly site that corrupts history and truth simutenously. Host of this site need to be punished as they are manipulating our history, which could be dangerous for the new generation. They've no right to manipulate our history. Don't try to show us white part of a black spot,we r nt colour blind

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+2 # 2012-08-11 01:08

I think I am part of that generation what you mentioned here. I am just requesting you very honestly --- "gather much more knowledge before you start commenting to save yourself from becoming a stupid and the new generation from the rubbish history and truth you mentioned above". Try to thing something for, try to thing something for 150 million Bangladeshi. Thanks.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
-3 # 2010-04-19 06:57
কেন এই মিথ্যাচার! কেন অবাঙ্গালীদের জন্য এত কান্না?
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+9 # 2010-04-24 17:14
Honest speaker কি এখনও বুঝেনা ভারতিয় আগ্রাসন। যদি এই ব্যাটা ভারতিয় হয় তাহলে জীবনেও বুঝবে না। আর বাংলাদেশি দেশপ্রেমিক হলে বুঝা উচিৎ। কারণ, ১)ফারাক্কা ২)তিন বিঘা করিডর ৩)বাংলাদেশ ঘিরে ফেনসিডিল কারখানা ৪)কাঁটা তারের বেড়া ৫)ভারত কর্তৃক শান্তি বাহীনি গঠন ৬)BSF দ্বারা বাংলাদেশি খুন ৭)বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার বাজার হিসেবে তৈরি করা ৮)বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ বিরোধি কর্মকান্ড করা ৯)মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো etc
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+1 # 2010-04-25 12:21
প্রথম আলোর পাঠককে ধন্যবাদ যার মাধ্যমে এই সাইটটির খোজ পেয়েছি। অত্র বইটির লেখককে মোবারকবাদ জানাই তার এই সত্য ও তথ্যনির্ভর লেখা উপহার দেবার জন্য।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+11 # 2010-04-28 05:02

I would request readers to think and anylise events, in light of history of last 39 years and make your decision.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
-10 # 2010-06-18 21:48

honest speaker go to hell and take your thoughts with you. You are a coward.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+9 # 2010-07-12 15:50


If someone writes the truth and it is against the belief of the reader, their voice is often negative. I suggest commentators should response from the point of very neutral views.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2010-08-27 12:16
ধন্যবাদ জনাব এম,টি,হোসেনকে। অনেক না বলা ইতিহাস আমাদের জন্য রেখে যাওয়ায়। একদিন সত্যকথা বের হবেই। ষড়যন্ত্রকারীরা চিরদিন বিজয়ী থাকতে পারেনা। আর অনেস্ট স্পীকারের মত সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদীদের জন্য ঘৃণা।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+2 # 2010-09-23 06:26
লেখক মহোদয়কে ধন্যবাদ। তার এই লেখনির মাধ্যমে জাতি অনেক উপকার পাবে।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2012-06-26 08:17
সাহস করে করে সত্য কথা বলাই মানুষের শেষ্ঠত্ব। প্রত্যোক স্থানে প্রচার করো উচিত।
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh