Home EBooks ৭১এর আত্মঘাতের ইতিহাস অধ্যায় ১৬: পাকিস্তানপন্থিগণ কি স্বাধীনতার বিপক্ষ-শক্তি?

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১৬: পাকিস্তানপন্থিগণ কি স্বাধীনতার বিপক্ষ-শক্তি? Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 19 October 2008 19:27
যাদেরকে স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি রূপে চিত্রিত করা হচ্ছে তারা কি আদৌ বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষে ছিল? এ নিয়ে বিবাদ নেই, তারা অখন্ড স্বাধীন পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। তারা বিরোধীতা করেছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার। তখন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিক ছিল পূর্বপাকিস্তানীরা, তাই পাকিস্তান স্বাধীন হলে সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকগণ পরাধীন হয় কি করে? বরং সে দেশ ভাঙ্গার অর্থ বাংলাদেশের চেয়ে ছয়গুণ বৃহৎ দেশের উপর বৈধ শাসনের যে ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার তাদের ছিল সে অধিকার থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করা। এজন্যই কোন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠরা দেশবিভক্তির সর্বশক্তি দিয়ে বিরোধীতা করে। প্রয়োজনে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও লড়ে। অথচ পাকিস্তানে উল্টোটি ঘটেছে, দেশটি বাঁচাতে দেশের সংখ্যালঘিষ্ঠরা লড়েছে। আর ধ্বংসে নেমেছিল সেদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ। একেই বলা যায় একটি নিরেট আত্মঘাত। নিরোদ চৌধুরি কোলকাতা কেন্দ্রীক বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবীদের অনেক আগেই আত্মঘাতি বলেছেন, কিন্তু আত্মঘাতে বিশ্বকে তাক লাগিয়েছে তাদের ঢাকার শাগরেদরা। কোলকাতার আত্মঘাতি বুদ্ধিজীবীদের কারণেই ১৯৪৭ এ বাংলা বিভক্ত হয়েছিল। এবং পশ্চিম বাংলা পিছিয়ে গেল ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে; শুধু রাজনীতিতে নয়, জ্ঞানবিজ্ঞান, অর্থনীতি ও রাজনীতেতেও।

আত্মঘাতি ঢাকার বু্‌দ্ধিজীবীদের কারণেই বাংলার মানুষ তাদের নিজ দেশের চেয়ে ৬ গুণ বৃহৎ দেশ সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পরিচালনার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হল। এবং পিছিয়ে গেল সংখ্যালঘিষ্ঠ পশ্চিম পাকিস্তানীদের থেকে। তারা আণবিক শক্তিতে পরিণত হল, আর বাংলাদেশ অর্জন করলো তলাহীন ঝুড়ি রূপে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি। বিতন্ডা ও সংঘাত ছাড়া দেশের স্যেকুলার পক্ষটির থলিতে দেওয়ার মত কিছু নেই। যে সমাজতন্ত্র নিয়ে এক কালে তারা গর্ব করত সেটি আজ আবর্জনার স্তুপে। সত্তরের দশকে মুজিববাদ নিয়ে তারা প্রচন্ড প্রচার শুরু করেছিল, যেন সেটিকে বিশ্বজনীন করে ছাড়বে। মুজিববাদের উপর তখন বড় বড় বইও লেখা হয়েছিল। মুজিবভক্ত সেদিন প্রচার করত, মার্কসবাদ ও লেলিনবাদের চেয়েও নাকি সেটি কালোপযোগী। কিন্তু সেটি কবরস্থ হয়েছে মুজিবের মৃত্যুর আগেই। আর স্যেকুলারিজমের কথা? পবিত্র কোরআনের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সেটিও বাজার পাচ্ছে না বাংলাদেশের মত একটি মুসলিম দেশে। কোরআন চায় আল্লাহর বিধানের প্রতিষ্ঠা। সে বিধান প্রতিষ্ঠার কাজে ব্যক্তির অঙ্গিকার ও আত্মবিণিয়োগ দিয়ে যাচাই হয় তার ঈমান। অথচ স্যেকুলারিজম চায়, আল্লাহর বিধানকে রাজনীতির বাইরে রাখতে-যাতে সেটি প্রতিষ্ঠার কোন সুযোগই না পায়। মুজিবামলে সেটিই হয়েছিল। ইসলামের নামে রাজনীতি বা সংগঠিত হওয়ার কাজকে তিনি নিষিদ্ধ করেছিলেন। কোন দ্বীনদার মানুষ কি এমন জাহেলী মতবাদে বিশ্বাসী হতে পারে? পার্থিব বা ইহজাগতিক লাভ-লোকসানই হলো স্যেকুলার রাজনীতির মূল প্রসঙ্গ। সেখানে অনন্ত অসীম কালের পরকালীন সুখ-শান্তির ভাবনা হল সাম্প্রদায়ীকতা। সেকুলার রাজনীতিতে তাই এটি অপ্রাসঙ্গিকই শুধু নয় অপরাধমূলকও। তারা চায়, মুসলমান তার ইসলামে অঙ্গিকার জায়নামাযে রেখে প্রশাসন, বিচার বা রাজনীতিতে প্রবেশ করুক। অথচ হৃৎপিন্ডের ন্যায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার অঙ্গিকারটি তার অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। ইসলামী পরিভাষায় সেটিই ঈমান। ব্যক্তির কর্ম বা আচরণ থেকে এমন অঙ্গিকার বিচ্ছিন্ন হলে তার ঈমানই বাঁচে না। যেমন দেহ বাঁচে না হৃৎপিন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হলে। ফলে মুসলমানের রাজনীতি স্যেকুলার হয় কি করে? ইসলামে এটি হারাম। এজন্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের আশু মৃত্যূ অনিবার্য। তারা বেঁচে আছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের চেতনায় ইসলাম-বিষয়ে বিরাজমান অজ্ঞতার কারণে। যে সময়টিতে তাদের জয়জয়কার, বাংলা ভাষায় তখন ইসলামের উপর তেমন বই ছিল না।


বাংলাভাষায় ইসলামের উপর যত বই লেখা হয়েছে তার সম্ভবতঃ শতকরা ৯০ ভাগ লেখা হয়েছে একাত্তরের পর। ফলে যতই বাড়ছে ইসলাম চর্চা, কর্পূরের মতই ততই হাওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে ইসলামের বিপক্ষ শক্তির সর্বশেষ এ পুঁজি। তাই মরণের ভয় ঢুকেছে বাংলাদেশের স্যেকুলার মহলে। রাজনীতিতে নিছক বেঁচে থাকার স্বার্থে তারা নিজেদের একাত্তরের ভূমিকাকে ব্যবহার করতে চায়। তাদের দৃষ্টিতে এটিই হল তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। একাত্তরের যুদ্ধ ছিল দুটি দর্শনের, দুটি জীবন-চেতনার। একাত্তরের যুদ্ধ শেষ হলেও এদুটি চেতনার মৃত্যূ হয়নি। ফলে বেঁচে আছে সংঘাতের উপকরণ বা প্রেক্ষাপটও। আজও বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে উত্তাপ তা তো সে কারণেই। ভারতপন্থি বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদি শক্তি সেদিন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর পরাজয় ও পাকিস্তান ভাঙতে পারলেও প্যান-ইসলামি চেতনার পরাজয় ঘটাতে পারিনি। বরং বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদের চেয়েও প্রবল ভাবে বেঁচে আছে ইসলামি চেতনা। সে প্যান-ইসলামি চেতনা বাড়ছে এখন বিশ্বব্যাপী। মুসলিম মনে অঙ্গিকার বাড়ছে ইসলামের বিজয় ও মুসলমানের গৌরব বাড়াতে। এ লক্ষ্যে দেশে দেশে মুসলমানগণ একতাবদ্ধও হচ্ছে। ফলে লেবাননে ইসরাইলী বোমা পড়লে লাখো মানুষের ঢল নামে জাকার্তা, কায়রো বা ইস্তাম্বুলের রাজপথে। কাবুল বা বাগদাদে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে মিছিল হয় ঢাকা, করাচী ও কুয়ালালামপুরের ন্যায় নানা মুসলিম শহরে। বরং দিন দিন সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে সেটি তীব্রতর লড়াকু রূপ নিচ্ছে। ১৯৪৭ এ এমন এক চেতনার বলেই বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধু, উত্তর প্রদেশ তথা ভারতের নানা প্রদেশের মুসলমানরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশ, হিন্দু ও শিখদের প্রবল বিরোধীতার মুখে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছিল। এমন চেতনার প্রবলতায় উদ্বেগ বাড়ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ইসরাইলসহ সকল সাম্রাজ্যবাদী ও আগ্রাসী শক্তির। তারা ইসলামি চেতনার উত্থান রুখতে প্রতি মুসলিম দেশে বিশ্বস্ত পার্টনার খুঁজছে। এতে তাদের সফলতাও মিলছে।


বাংলাদেশে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ইসরাইল ও ভারতীয়দের অতি বিশ্বস্থ মিত্র হল এসব স্যেকুলার বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদীগণ। তাদের হাত দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি ও মিডিয়া জগতে শত শত মিলিয়ন ডলারের বিণিয়োগ ঘটছে। ফলে মাত্র কিছুদিন আগেও যাদের পক্ষে নিজ অর্থে একখানি দোকান খোলাও অসম্ভব ছিল তারা এখন রমরমা টিভি চ্যানেল বা বিশাল আকারের দৈনিক পত্রিকা বের করছে। তাদের অর্থে রাজনৈতিক দলের নেতা, এনজিও পরিচালক, পত্রিকার কলামিষ্ট ও বুদ্ধিজীবীর বেশে ময়দানে নেমেছে হাজার হাজার ব্যক্তি। বাংলার মাটিতে কোনকালেই মিরজাফরদের অভাব পড়েনি। বরং আজ তারা বিপুল সংখ্যায়। বিদেশী মদদে তারা জিদ ধরেছে, দেশের ইসলামপন্থিদের নির্মূল করতেই হবে। চায়, একাত্তরের ন্যায় আরেকটি ভয়ানক যু্‌দ্ধ। বাংলাদেশ সৃষ্টির বহুকাল পরেও আজ ইসলামাপন্থিদের বিরুদ্ধে অবিরাম প্রচারের মূল কারণ হল এটি। ১৯৪৭ সালে যে ভৌগলিক এলাকা নিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে এলাকায় বর্তমানে ৩০ কোটি মানুষের বাস। জনসংখ্যায় চীন, ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরই এর অবস্থান। বিশ্বরাজনীতিতে মুসলমানদের মূল এজেন্ডা মুসলিম রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়ানো নিয়ে নয়। বরং মাথা তুলে দাঁড়ানো নিয়ে। নইলে আজ থেকে চৌদ্দশত বছর আগেই মুসলমানদের দখলে যে ভৌগলিক এলাকা ছিল তা দিয়ে ১০০টিরও বেশী বাংলাদেশ সৃষ্টি করা যেত। প্রতি ভাষাভাষিদের জন্য একেকটি রাষ্ট্র সৃষ্টিকে ন্যায্যতা দিলে একমাত্র ইরানেই সৃষ্টি হত কমপক্ষে অর্ধ-ডজন বাংলাদেশের আয়তনের ন্যায় রাষ্ট্র। কারণ সেখানে ফারসী, তুর্কি, আরব, বেলুচ, কুর্দ, লোর, তুর্কমানীসহ এক ডজনের বেশী বিভিন্ন ভাষাভাষি মানুষের বাস। কিন্তু সেদিন তা হয়নি। নানা ভাষার মুসলমানেরা জন্ম দিয়েছে বিশাল এলাকার এক অখন্ড মুসলিম ভূগোলের। যা সেদিন ছিল বিশ্বের এক নম্বর বিশ্বশক্তি। সে সময়ের অপর বিশ্বশক্তি রোমান ও পারস্য সাম্রাজ্য পরাজিত হয়েছিল তাদের হাতেই। আজও মুসলমানদের সামনে ইজ্জত নিয়ে বাঁচার এটিই একমাত্র মডেল। পবিত্র কোরআন ও নবীজীর (সাঃ) আদর্শ মুসলিম মনে এমনই একটি প্যান-ইসলামী চেতনার জন্ম দেয়। এজন্যই যখন ইরাক, সূদান বা ইন্দোনেশিয়া ভেঙ্গে আরো কয়েক টুকরা মুসলিম রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা হয় তাতে কোন ঈমানদার মুসলমান বেদনাসিক্ত না হয়ে পারে না। পাকিস্তান ভাঙ্গাতেও তেমনি বেদনাসিক্ত হয়েছে সারা দুনিয়ার মুসলমান। এবং সেদিন আনন্দে আত্মহারা হয়েছিল তারা যারা মুসলমান নর-নারীদের জীবন্ত আগুণে ফেলা, তাদের ঘরবাড়ি লুট করা বা তাদের নারীদের ধর্ষণ করাকে বিজয় উৎসব মনে করে। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর কোন মুসলিম দেশই যে স্বীকৃতি দানে এগিয়ে আসেনি তার কারণ তো এটাই। শত বছর আগে তুরস্কের ওসমানিয়া খেলাফতকে খন্ডিত করার এমনই চেষ্টা হয়েছিল বলকান এলাকায়। শত্রু শক্তি সেদিন যুদ্ধ শুরু করেছিল তুরস্কের বিরুদ্ধে। তখন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম দেশের বিপদে তাদের সাথে একাত্ম হয় এমন কি বাংলার মুসলমানগণও। খলিফাকে সাহায্য করতে ঘরে ঘরে তারা মুষ্টির চালের হাঁড়ি বসিয়েছিল। কেউ কেউ সুদুর বলকানে ছুটে গিয়েছিলেন খলিফার বাহিনীকে সাহায্য করতে। একাত্তরে এমন একটি চেতনা কাজ করেছিল ইসলামের চেতনাধারিদের মাঝে। এমন কাজে মৃত্যুবরণ করলে তারা যে শহীদ হবে এ নিয়ে সে সময় কোন আলেমের মাঝেই সন্দেহ ছিল না। এমন একটি বলিষ্ঠ চেতনা এ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ করা হয়নি। বরং তাতে চাপানো হয়েছে মনগড়া মটিভের কথা। তাদের কাজ নাকি ছিল, পাঞ্জাবী মিলিটারিদের নারী সাপ্লাই দেওয়া! বাংলাদেশের সৃষ্টিতে যারা সর্বপ্রকার সামরিক ও রাজনৈতিক সাহায্য দিল তাদের সবগুলিই কেন অমুসলিম দেশ? বাংলাদেশের সৃষ্টিকে ত্বরান্বিত করতে কেনই বা ভারত নিজেদের অর্থ ও রক্ত ব্যয়ে প্রকান্ড একটা যুদ্ধ করল? কেনই বা যুদ্ধ শেষে ভারত বাংলাদেশে ব্যাপক লুণ্ঠন শুরু করল, বহু শত কোটি টাকার জালনোট ছেপে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক বিপর্যয় ডেকে আনল এবং দেশটিকে একটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের মুখে ঠেলে দিল? এ প্রশ্নগুলো বাংলাদেশের ইতিহাসে অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে এ নিয়ে পাঠ্য বইগুলোতে আলোচনা হয়নি।


১৯৪৭এ অখন্ড ভারতপন্থিদের যে পরাজয় হয়েছিল ১৯৭১এ এসে তারা সে পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছিল। যুদ্ধ কোন দেশেই মধুর বন্যা আনে না, আনে রক্তের। যুদ্ধে অপরাধ ঘটে যুদ্ধরত উভয় পক্ষ থেকে। কিন্তু যখন সকল হত্যার জন্য দোষ চাপানো হয় শুধু এক পক্ষকে তখন সেটি মানবতার সাথে মসকরায় পরিণত হয়। অথচ বাংলাদেশের স্যেকুলাররা সেটিই করছে। স্যেকুলারদের আলোচনায় একাত্তরে সংঘটিত সকল অপরাধের জন্য দোষী রূপে চিত্রিত করা হচ্ছে দেশের ইসলামের পক্ষশক্তিগুলিকে। কোন ঘটনার বিচার-বিশ্লেষণে রায় কি হবে সেটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে সেটি বিচারে কোন আদর্শ বা কোন দর্শনকে মাপকাঠি ব্যবহার করা হল তার উপর। একারণেই দুনিয়ার তাবত স্যেকুলারদের ন্যায় বাংলাদেশের স্যেকুলারদের কাছেও পতিতাবৃত্তির ন্যায় জ্বিনা আইনসম্মত পেশা। এটি তাদের কাছে এতটাই গ্রহণযোগ্য যে নিজেদের টাক্সের অর্থ দিয়ে সে পাপাচারের হেফাজতে পুলিশি প্রহরারও ব্যবস্থা করে। বাংলাদেশের স্যেকুলার আদালতে তাই জ্বিনা কোন শাস্তিযোগ্য অপরাধই নয়। তাদের সেকুলার বিবেচনায় সূদের ন্যায় হারাম বিষয়টিকেও তারা হালাল মনে করে। অতি সৌভাগ্যের বিষয় মনে করে দেশের সূদী ব্যংকগুলোতে নিজের বা নিজ সন্তানদের চাকুরি পাওয়াটাকে। অথচ ইসলামের বিচারে সূদ দেওয়াই শুধু নয় সূদের হিসাব লেখাও হারাম। হাদিস পাকে এটিকে নিজের মায়ের সাথে জ্বিনার তুলনা করা হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে মুসলিম নামধারি সূদখোরের সংখ্যা মুর্তিপুজারি কাফেরদের চেয়ে বহুগুন বেশী। বুদ্ধিবৃত্তিক দিক দিয়ে বাংলাদেশ এখনও ডুবে আছে স্যেকুলার চিন্তা-চেতনার প্রবল প্লাবনে। সে প্লাবনের পানি ঢুকেছে দেশের অধিকাংশ বুদ্ধিজীবি, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের মগজে। বুদ্ধিবৃত্তিক সুস্থ্যতা ক’জনের? ফলে একাত্তরে বাংলাদেশে সবগুলো ইসলামি দল কেন পাকিস্তানের পক্ষ নিল এবং তাদের বহু লক্ষ ধর্মভীরু কর্মী কেন রাজাকার বা আলবদরের সদস্য হয়ে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে লড়তে গিয়ে প্রাণ দিল বা নির্যাতিত হল -সেটির একটি ইসলাম সম্মত ব্যাখ্যা কি এমন স্যেকুলারদের থেকে আশা করা যায়?


কথা হল, ১৯৭১ এ বাংলাদেশের ইসলামের পক্ষ শক্তি যদি পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশের সৃষ্টিতে অংশ নিত তা হলে ইতিহাসে তারা কিভাবে চিহ্নিত হত? একটি দেশের ইতিহাসে একটি বছর বা একটি দশক বা একটি শতকই বড় কথা নয়। ইতিহাস বেঁচে থাকে হাজার হাজার বছর ধরে। আজকে দেশ স্যেকুলারজিমের প্লাবনে ভাসলেও পঞ্চাশ বা শত বছর পর তেমনটি নাও হতে পারে। ইসলামি আদর্শের পতাকাবাহিগণ তখন বিজয়ী হলে কি ভাববে? তারা কি এমন কর্মকে ইসলামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা ভাববে না? ইসলামে অঙ্গিকারহীন স্যেকুলারদের সাথে ইসলামপন্থিদের যে বিরোধ সেটি কি শুধু একাত্তর নিয়ে? মূল বিরোধ তো অন্যত্র। সেটি তো শরিয়তের প্রতিষ্ঠা ও ইসলামের পরিপূর্ণ বিজয় নিয়ে। এ কারণেই যেসব দেশে একাত্তর নেই রক্তাক্ত বিবাদ সেখানেও। একাত্তরে ইসলামপন্থিরা যদি পাকিস্তান ভাঙ্গা ও বাংলাদেশ সৃষ্টির পক্ষও নিত তারপরও কি তারা ভারতপন্থি স্যেকুলার মহলে গ্রহনযোগ্য হতে পারতো? মেজর আব্দুল জলীল তো প্রাণবাজী রেখে বাংলাদেশের পক্ষে যুদ্ধ করেও রাজাকার হওয়ার অভিযোগ থেকে বাঁচতে পারেনি। তাছাড়া মুসলমানের লক্ষ্য কি গণমুখী হওয়া না আল্লাহমুখী হওয়া? তাছাড়া মুসলমানগণ নিছক নিরাপদে বসবাস, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ, শিল্পসাহিত্য বা রাজনীতির জন্য রাষ্ট্র নির্মাণ করে না। তার জন্য যুদ্ধ-বিগ্রহ বা সংগ্রামও করে না। নিছক রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে এমন কাজ হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃষ্টান বা নাস্তিক ও স্যেকুলারগণও করে থাকে। কিন্তু মুসলমানের বাঁচার লক্ষ্য যেমন অন্যদের থেকে ভিন্ন, তেমনি ভিন্নতর হল তাদের রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যও। অন্যদের কাছে রাষ্ট্র নির্মাণের কাজ নিছক রাজনীতি, অর্থনীতি বা সাংস্কৃতিক লক্ষ্য রূপে গণ্য হলেও মুসলমানের কাছে সেটি সর্বোচ্চ জ্বিহাদ। এ লক্ষ্যে সে যেমন অর্থ-শ্রম-মেধা ও সময় দেয়, প্রয়োজনে প্রাণও দেয়। প্রাণ দানের বরকতে সে জীবন্ত শহীদে পরিণত হয়। সারা জীবন ব্যাপী রোযা-নামায বা অসংখ্য বার হজ্বের মাধ্যমেও এ মর্যাদা হাসিল হয় না। এজন্যই শক্তিশালী রাষ্ট্রের নির্মাণ ও তার প্রতিরক্ষা প্রতিটি মুসলমানের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্র বাঁচলেই মুসলমান ও মুসলিম সংস্কৃতি বাঁচে; তখন ইসলামী চেতনা ব্যপ্তি পায়, প্রসার পায়, এবং শক্তিশালী হয়। তাই ইতিহাসে যত মুসলমান শহীদ হয়েছেন তা তো নিরাপদ রাষ্ট্রের নির্মাণেই, ধর্মের তাবলীগ করতে নয়। মুসলমান দ্বীনের তাবলীগে অস্ত্র ধরে না। নবীজী (সাঃ) বলে গিয়েছিলেন, সম্ভব হলে তোমরা কনস্টান্টিনোপল দখল করবে। রাষ্ট্রের ভূগোল বৃদ্ধি যে কত জরুরি সেটি তিনি এভাবে বুঝিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি যে কত বড় মিলিটারি স্ট্রাটেজিস্ট ছিলেন, এটি হল তার প্রমাণ। তখন কনস্টান্টিনোপল ছিল রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানি এবং এশিয়া ও ইউরোপের সংযোগস্থল। শুধু নামাজ রোযায় মুসলিম উম্মাহর নিরাপত্তা বাড়ে না। এজন্য নিরাপদ রাষ্ট্রও নির্মাণ করতে হয়। মোমেনের জীবন ও মৃত্যু এ কাজের মধ্য দিয়েই তো মহান আল্লাহর কাছে প্রিয় হয়ে উঠে। ১৯৪৭এ মুসলমানগণ পেশোয়ার থেকে চিটাগাং অবধি ‘পাকিস্তানের মতলব কি? -লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ শ্লোগান তুলেছিলেন। (উর্দুতেঃ পাকিস্তান কা মতলব কিয়া? -লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এটি ছিল সে সময় মুসলিম লীগের শ্লোগান)। সেদিন একটি বৃহৎ ভূগোল নির্মাণের সে প্রচেষ্টার মাঝে তাদের সে ইসলামি চেতানারই প্রকাশ ঘটেছিল। এ রাজনীতি সেদিন জ্বিহাদে পরিণত হয়েছিল। শেখ মুজিব নিজেও তাতে জড়িত ছিলেন। কথা হল, ১৯৪৭-এ যদি পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা জ্বিহাদে পরিণত হয়, তবে ১৯৭১-এ সেটির সুরক্ষা কেন অপরাধে পরিণত হবে? বাংলাদেশে ইতিহাসের বইয়ে সে প্রশ্নেরও কোন উত্তর দেওয়া হয়নি। আওয়ামী লীগের জাতিয়তাবাদী রাজনীতির ইসলাম-বিরোধী বড় অপরাধ হল, বাংলার মুসলমানদেরকে জীবনের সে জ্বিহাদী মিশন থেকেই বিচ্যুৎ করে। এতে অসংখ্য অপচয় ঘটে জীবনের। স্যেকুলার আওয়ামীলীগের হাতে বাংলার মুসলমানদের, সে সাথে ভারতের মুসলমানদেরও সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয়েছে এক্ষেত্রে। এ বিষয়ে শুধু আগামী মুসিলম প্রজন্মের কাছেই নয়, মহান রাব্বুল আ’লামীনের দরবারেও তাদের জবাব দিতে হব। সে দরবারে ইন্দিরা গান্ধি, জ্যোতি বসু বা মানেক শ’দের দেওয়া সার্টিফিকেট কোন কাজে লাগবে না।

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh

 

Most Read