Home EBooks ৭১এর আত্মঘাতের ইতিহাস অধ্যায় ১৮: যে ইতিহাস আত্মবিনাশের

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১৮: যে ইতিহাস আত্মবিনাশের Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 19 October 2008 19:40
স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে যে অবিরাম বিবাদ সেটি বাংলাদেশের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আত্মঘাতি বিষয়ও। যখনই দেশে রাজনৈতিক সংঘাত তীব্রতর হয় তখনই প্রবলতর হয় এ বিবাদ। তবে এটিকে বিবাদ বললেও ভূল হবে। কারণ বিবাদে দুটি পক্ষ থাকে। অথচ এখানে চলছে এক পক্ষের তীব্র গলাবাজী। এনিয়ে যেমন নেই বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা, তেমনি নেই একাডেমিক লেখালেখি। আছে নিছক আবেগ, গালিগালাজ ও অস্বীকারের মিথ্যাচার। এটি অস্বীকারের উপায় নেই, তথাকথিত বুদ্ধিবৃত্তির পুরো ময়দানটি দখল করে আছে চিন্তা-চেতনায় স্যেকুলার, ধর্মে অঙ্গিকারহীন এবং রাজনীতিতে ভারতপন্থি একটি পরিচিত গোষ্ঠী। স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে যত লেখালেখি হয়েছে তা মূলতঃ তাদেরই পক্ষ থেকেই। তাদের অভিযোগ,বাংলাদেশের স্বাধীনতা এই ইসলামপন্থিদের কারণে বিপন্ন। এটি এক গুরুতর অভিযোগ। আরো দুশ্চিন্তার কারণ, ইসলামপন্থিদের মুখেও এনিয়ে উচ্চবাচ্য নেই, একাডেমিক আলোচনাও নেই। শাক দিয়ে মাছ ঢাকার ন্যায় তারাও বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছে। অনেকে তো স্যেকুলার প্রপাগান্ডার জোয়ারে ভেসেও গেছে। এমনকি একাত্তরে নিহত নিজেদের লোকদের কথাও তারা বেমালুম ভুলে গেছে। বরং নিজেদের পরাজয়ের দিনটিকে উৎসবের দিন রূপে উদযাপন করছে।

এভাবে গাদ্দারি করছে নিজেদের নিহত বহু হাজার নিরপরাধ মানুষের সাথে। আবার কিছু ইসলামপন্থির উদ্ভব ঘটেছে যারা ৭১-এ পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিও দাবী করছে। দেশের জন্য এটি এক বড় রকমের বু্‌দ্ধিবৃত্তিক দুর্গতি। যা ডেকে আনছে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংঘাত। এমন বিভক্ত জাতি কি সামনে এগুতে পারে? স্বাধীনতা ও সুস্থ্য রাজনীতির স্বার্থে এ নিয়ে বিশদ বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা হওয়া উচিত। আলোকিত করা উচিত নতুন প্রজন্মকে। সনাক্ত করা উচিত কারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি, কোথায় তাদের অবস্থান এবং কি তাদের কর্মকান্ড। এমন শক্তি যদি থেকেই থাকে তবে তাদের আশু বিচার ও শাস্তি হওয়া উচিত। তবে প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ অবধি স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বা সীমান্তে ইসলামপন্থিদের পক্ষ থেকে একটি বুলেটও কি নিক্ষিপ্ত হয়েছে? উচ্চারিত হয়েছে কি একটি শব্দ? লিখিত হয়েছে কি কোন প্রচারপত্র বা বই? অধিকারে নিয়েছে কি তারা দেশের এক ইঞ্চি ভূখন্ড? রাস্তার ভদ্রলোককে খুনি বললেই সে খুনি হয়না। খুনের লক্ষ্যে তার হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল এবং সে সাথে খুনের মটিভ ছিল আদালতে সে প্রমাণও হাজির করতে হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেছে দুই বার। তাদের হাতে তখন সামরিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা বাহিনীও ছিল। ছিল আদালত। যাদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ তাদেরকে তারা প্রমাণসহ আদালতে তুলতে পারতো। শাস্তিও দিতে পারতো। কিন্তু তা পারেনি। একজনের বিরুদ্ধেও আদালতে তারা অভিযোগ আনতে পারেনি। অথচ একই কথা বিগত ৩৫ বছর ধরে বলে ময়দান গরম করে চলেছে। দেশে সুষ্ঠ বিচার থাকলে বরং তাদের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের দাবী তুলে মানহানির মামলা হতে পারত। এর কারণ একটিই, দেশের ইসলামী শক্তিকে স্বাধীনতার শত্রু বলে তাদের নির্মূল করা। এরা রুখতে চায় ইসলামের উত্থান।


ইরাকের বিরুদ্ধে মানববিধ্বংসী অস্ত্রের এমনই এক মিথ্যা অভিযোগ এনে জর্জ বুশ সে দেশের নিরীহ নারী-পুরুষ-শিশু হত্যার বাহানা তৈরী করেছিল। এরাও তেমনি একটি মিথ্যা বানায়োট অভিযোগ এনে দেশে একটি ব্যাপক হত্যাকান্ড ঘটাতে চায়। এবং সে অভিলাষের কথা তারা বার বার ঘোষণাও দিয়েছে। নব্বইয়ের দশকে নির্মূল কমিটি গঠনের মূল কারণ তো এটিই। তখন মেঠো আদালত বসিয়ে মৃত্যূদন্ডে দন্ডিত করেছিল বহু মানুষকে। আইন-আদালত ও বিচারের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এদের মন যে কতটা ইতর এবং ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে যে কতটা বিষপূর্ণ এটি হলো তারই নমুনা। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বা সীমান্তে হামলা যে হয়নি তা নয়। সেটি হয়েছে তাদেরই সহযোগী বা সমচিন্তার লোকদের দ্বারা। সত্তরের দশকে হামলা করেছিল ভারতীয় অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও অর্থে প্রতিপালিত আওয়ামী-বাকশালী কাদের সিদ্দিকী ও তার সাঙ্গোপাংগের বাহিনী। আজও বাংলাদেশ দখলের ষড়যন্ত্র ও পাঁয়তারা হচ্ছে এককালীন আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি এবং ভারতীয় নাগরিক চিত্তরঞ্জন সুতোর ও তার নেতৃত্বাধীন স্বাধীন বঙ্গভূমী আন্দোলনের কর্মীদের দ্বারা। হামলা হয়েছে ভারতীয় সাহায্যপুষ্ট চাকমা বিদ্রোহীদের দ্বারাও। বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে এ হামলাগুলো সবর্জনবিদিত। এদের মটিভ বা উদ্দেশ্য যেমন গোপন ছিল না, তেমনি গোপন ছিল না কর্মকান্ডও। অথচ এ পক্ষটি তাদের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেনি। এমনকি শেখ মুজিব যখন বাংলাদেশের কয়েকটি ছিটমহল ভারতের হাতে তুলে দিল এবং ভারত দখল করে নিল বাংলাদেশে উপকূলে জেগে উঠা তালপট্টি দ্বীপ তখনও তারা প্রতিবাদ জানায়নি। প্রতিবাদ তখনও করেনি যখন ভারতীয় সেনাবাহিনী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার শুরুতেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুটে নিয়ে গেল এবং লুটে নিল বাংলাদেশী কলকারখানার বহু হাজার কোটি টাকার যন্ত্রাংশ। এরাই যখন স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে বিতন্ডা খাড়া করে তখন তাদের মতলব নিয়ে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। তাদের মতলব স্বাধীনতা না অন্যকিছু সেটিরও অনুসন্ধান হওয়া উচিত। কারণ পক্ষ-বিপক্ষের এ লড়াই উন্নয়নের পথে একটি প্রকান্ড বাধা। পরস্পর এমন সংঘাত ও ঘৃণা নিয়ে কোন দেশ কি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে?


এটি সত্য, ১৯৭১এ মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলামী, নুরুল আমীন সাহেবের পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ সবগুলো ইসলামী ও মুসলিম জাতিয়তাবাদী দলই অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিল। এ নিয়ে বিতর্ক নেই। বিতর্ক নেই যে মসজিদের ইমাম, মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষক একাত্তরে ভারতে যায়নি। মুক্তি বাহিনীতে যোগও দেয়নি। কোন আলেম দেয়নি পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষে ফতওয়া। অথচ বাংলাদেশে এদের সংখ্যা বহু লক্ষ। ব্যতিক্রম থাকলেও সে সংখ্যা অতি নগণ্য। তাদের সে ভূমিকার পিছনে রাজনৈতিক দর্শনটি কি ছিল সে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সামনে আসেনি। ফলে নতুন প্রজন্ম পায়নি সে বিষয়ে সঠিক ধারণা। এক পক্ষের বিবরণ শুনে এমন কি অতিশয় দক্ষ ও সুবিজ্ঞ বিচারকও সুবিচারে ব্যর্থ হয়। একাত্তরে যারা বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধী ছিল তাদের ভূমিকার যথার্থ মূল্যায়নে একই ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে সাধারণ জনগণ। আর বিবাদের যারা নায়ক তারা সেটিই চায়। কারণ হিন্দু পৌরাণিক উপখ্যানের মত কিছু কল্প কথাকে দিয়ে তারা ইতিহাস বানাতে চায়। ফলে একাত্তর প্রসঙ্গে আজ অবধি যা বলা হচ্ছে তা হলো এক পক্ষের ভাষণ যার মধ্যে রয়েছে সীমাহীন অসত্য। রয়েছে প্রচুর অতিরঞ্জন। এ কল্প কথার বিরুদ্ধে যাতে প্রতিবাদ না উঠে সে জন্য শুরু থেকেই তারা মিডিয়া ও প্রকাশনা জগতে বজায় রেখেছে চরম সন্ত্রাস। সরকারি সেন্সারের চেয়েও যা শক্তিশালী। সন্ত্রাসী পক্ষটির মনপুতঃ নয় এমন বই মেলায় উঠলে বইয়ের স্টলেই আগুন দেওয়া হয়। ফলে সাধারন মানুষ ব্যর্থ হচ্ছে একাত্তরের দুটি প্রতিদ্বন্ধী পক্ষের মাঝে সুবিচার করতে। অথচ দেশের স্বার্থে এমন অবস্থা দূর হওয়া উচিত ছিল বহু পূর্বেই। নইলে একাত্তরে যারা পাকিস্তানের পক্ষ নিল তাদের যুক্তিই শুধু অজানা থাকবে না, বরং অজানা থেকে যাবে ১৯৪৭এ যে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙ্গালী মুসলমান অবাঙ্গালী মুসলমানদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লড়াই লড়েছিলেন তাদের রাজনৈতিক দর্শনও। পাকিস্তান খন্ডিত হতে পারে, কিন্তু বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানের পক্ষে যে আন্দোলন করেছিলেন তাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা কি ভিত্তিহীন ছিল? সে বিষয়টিও সামনে আসা উচিত। নইলে চরম অসম্মান ও বেয়াদবি বাড়বে পূর্বপুরুষদের প্রতি। তবে এ জন্য দূর করতে হবে প্রকাশনা ও মিডিয়া জগতের সন্ত্রাস।


গায়ের জোরে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ শুধু একদলীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা বা মিডিয়া দমনই করেনি, জাতির ইতিহাসে প্রচুর মিথ্যা আবর্জনাও ঢুকিয়েছে। সে আবর্জনা সরাতে না পারলে জাতির জীবনে নেমে আসবে চরম বুদ্ধিবৃত্তিক অসুস্থ্যতা। মন ও মননের সে অসুস্থ্যতায় অসম্ভব হবে ইতিহাসের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন। জাতীয় জীবনে এমন বুদ্ধিবৃত্তিক অসুস্থ্যতা বিজয়ী হলে ইসলাম ও মুসলমানের কল্যাণ চিন্তায় যেসব দেশপ্রেমিক ছাত্র, যুবক ও সাধারণ মানুষ সাতচল্লিশে ও একাত্তরে নির্যাতিত হয়েছেন, প্রাণ দিয়েছেন বা গৃহহারা হয়েছেন এবং আজও নানা ক্যাম্পাসে ও গ্রাম-গঞ্জে রক্ত দিচ্ছেন,ইতিহাসে চিরকাল তারা ভিলেনরূপেই চিত্রিত হয়ে থাকবেন। আগামী প্রজন্ম ব্যর্থ হবে তাদের আত্মত্যাগ ও রাজনৈতিক দর্শনটি বুঝতে। অপরদিকে ধর্মে অঙ্গিকারহীন বিদেশী এজেন্ট এবং চরিত্রহীন দুর্বৃত্তরা প্রতিষ্ঠা পাবে মহান নেতারূপে। ফলে অন্ততঃ দেশ ও ইসলামের কল্যাণে ইসলামপন্থিদের সাহসের সাথে সত্য কথাগুলো বলা উচিত। তাছাড়া সত্যের পক্ষে এমন সাক্ষ্যদান তাদের ঈমানী দায়বদ্ধতা। সে দায়বদ্ধতা ইতিহাসের প্রতিও। নইলে সঠিক ইতিহাস লেখা হবে কি ভাবে? ইসলামী পরিভাষায় এটিই হলো ‘শাহাদতে হক’ -যা প্রতিটি মুসলমানের উপর ফরজ। এটি গোপন করা গোনাহ। তাদের বোঝা উচিত, ইতিহাসের কোন মহত কর্মই ভীরুতায় গড়ে উঠে না। ভীরুদের স্থান হয় চিরকালই ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। তাছাড়া ইসলামের বিরুদ্ধে আজ যারা স্যেকুলারিজমের ঝান্ডা নিয়ে ময়দানে নেমেছে তারা ফিরাউন নয়, নমরুদও নয়; বরং বিদেশনির্ভর কিছু মেরুদন্ডহীন জীব। অথচ মুসলমানদের ঐতিহ্য তো খোদ ফিরাউন ও নমরুদের বিরুদ্ধে সাহসের সাথে সত্য কথা বলা। এমন সাহসিকতায় আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্তি তখন অনিবার্য হয়। তবে দ্রুত বাজার হারাচ্ছে সেকুলারিজমও। তাদের জাতীয়তাবাদ ও তথাকথিত জাতীয় স্বার্থের রাজনীতি মাঠে মারা পড়েছে ভারতের প্রতি নতজানু নীতির কারণে।


মুসলিম বিশ্বের মানচিত্রে বিভক্তি গড়া ছাড়া জাতিয়তাবাদ মুসলমানদের আর কোন কল্যাণই দেয়নি। দিবে না আখেরাতেও। আল্লাহর দরবারে ভাষা বা বর্ণের নামে বিবাদ গড়ার প্রতিটি প্রয়াস চিত্রিত হবে কবীরা গুনাহ রূপে। সেখানে বরং হিসাব হবে, ভিন্ন ভাষা ও ভিন্ন দেশের মুসলমান ভাইয়ের সাথে একতা গড়ায় কে কতটা মেহনত করেছে সেটির। এমন ভাতৃত্ব ইসলামে ইবাদত। এটি হলো অভিন্ন উম্মাহর চেতনা। উম্মতে ওয়াহেদা গড়ার লক্ষ্যে এটি হলো সিমেন্ট লাগানোর কাজ। অথচ ভাষা,বর্ণ,গোত্র বা ভূগোলের অহংকার তথা জাতিয়তাবাদ মূলতঃ মুসলমানদের মধ্য থেকে সে সিমেন্টই খুলে নেয়। ইসলামে তাই এটি হারাম। আল্লাহর দরবারে এটি গণ্য হবে জঘন্য অপরাধ রূপে। পবিত্র কোরআনে একতা গড়ার তাগিদ এসেছে বার বার। সে বর্ণনা এসেছে এভাবেঃ

“ইন্নাল্লাহা ইউহিব্বুল্লাযীনা ইউকাতিলুনা ফি সাবিলিহি সাফ্ফান কা’আন্নাহুম বুনইয়ানুন মারসুস”।

অর্থঃ নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তাদেরকে ভালবাসেন যাঁরা তাঁর রাস্তায় যুদ্ধ করে, যেন তারা (একতায়)সীসাঢালা দেওয়াল।”-(সুরা সাফ, আয়াত ৪)।


ভাষা, বর্ণ, ভূগোল বা অন্য কোন পরিচয়ে এ দেওয়ালে কোন ফাটল সৃষ্টি করা যাবে না। সেটি হলে তা আল্লাহর আযাব ডেকে আনবে। তাই আফ্রিকার হযরত বেলাল (রাঃ), রোমের হযরত সোহেল(রাঃ), ইরানের হযরত সালমান ফারসী(রাঃ)র ন্যায় বহু অনারব সাহাবী আরবী-ভাষী সাহাবাদের সাথে আপন ভাইয়ের ন্যায় যেভাব একাত্ম হতে পেরেছিলেন সেটি তো আল্লাহর প্রিয় বান্দাহ হওয়ার তাগিদেই। ফলে গড়ে উঠেছিল সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় অখন্ড মুসলিম উম্মাহ। আল্লাহর কাছে তাঁরা যে অতি প্রিয় হতে পেরেছিলেন সে সার্টিফিকেটও এসেছে পবিত্র কোরআনে। বলা হয়েছেঃ...“রাযীআল্লাহু আনহুম ওয়া রাদু আনহু..।” অর্থঃ..“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের উপর রাযী আছেন, এবং তারাও রাযী আল্লাহর উপর”..(সুরা বাইয়েনাহ,আয়াত ৮)।

আজও মুসলমানদের সামনে তারাই অনুকরণীয় আদর্শ। ফলে সে আমলে নানা ভাষাভাষী ও নানা বর্ণের মানুষ নিয়ে মুসলিম রাষ্ট্রের ভূগোল বাড়লেও রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়েনি। যখন থেকে রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে, তখন থেকে বাড়তে থাকে দূর্বলতাও। কারণ, খন্ড খন্ড রাষ্ট্রতো মুসলিম দেওয়ালে ফাটলেরই লক্ষণ, এতে কি কোন শক্তি সৃষ্টি হয়? একমাত্র কোরআনের অনুসরণই মুসলমানদের আবার ফিরিয়ে আনতে পারে একতা পথে। একমাত্র সে একতার পথেই আবারও অর্জিত হতে পারে বিশ্বশক্তির মর্যাদা ও সম্মান। তাই যেখানেই প্রসার পাচ্ছে কোরআনী জ্ঞান, সেখানেই বেগবান হচ্ছে প্যানইসলামিক চেতনা। ফলে আরব, আফগান, চেচেন, পাকিস্তানী, বাংলাদেশী, তুর্কী মুসলমান বিশ্বের বহু মঞ্চেই এখন আবার একতাবদ্ধ হচ্ছে। এরই প্রমাণ মেলে লন্ডন, প্যারিস, রোম বা নিউয়র্কের রাজপথে। প্রমাণ মেলে বহুভাষী পাশ্চাত্য নগরগুলির ছাত্র সংগঠন, কম্যুনিটি প্রতিষ্ঠান ও মসজিদগুলোতে। এমনকি নানা দেশের জিহাদের ময়দানগুলোতেও। নানা বর্ণ, নানা ভাষা ও নানা গোত্রে মানব সৃষ্টির লক্ষ্য এ নয় যে, তারা এ ভিন্নতার ভিত্তিতে আলাদা আলাদা রাষ্ট্র গড়বে এবং পরস্পরে লড়াই করবে। যেমনটি একাত্তরে হয়েছে। বরং সেরূপ ভিন্নতা নিয়ে মানব সৃষ্টির মূল লক্ষ্য আল্লাহপাক বর্ণনা করেছেন এভাবে,

“ইয়া আইয়োহান্নাসু ইন্না খালাকনাকুম মিন যাকারিও ওয়া উনসা ওয়া যায়ালনাকুম শুয়ুবাও ওয়া কাবায়িলা লি তায়ারাফু ইন্না আকরামাকুম ইনদাল্লাহি আতকাকুম,ইন্নাল্লাহা আলীমুন খাবির।”

অর্থঃ “হে মানব,আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ এবং নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার। নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ এবং সবকিছুর খবর রাখেন”।-(সুরা হুযরাত আয়াত ১৩)

অর্থাৎ মহান আল্লাহতায়ালার কাছে ভাষা ও গোত্রের কোন গুরুত্বই নেই, গুরুত্ব পায় ব্যক্তির তাকওয়া বা আল্লাহভীতি। এর ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয় তার মর্যাদা। ফলে মহান আল্লাহর কাছে মানুষের যে পরিচিতির কোন মূল্যই নেই সেটি নিয়ে এত বিভক্তি, এত অহংকার, এত যুদ্ধবিগ্রহ ও এত রক্তপাত কেন? মুসলমান হিসাবে তার কাজ হবে মহান আল্লাহর কাছে যেটি গুরুত্ব রাখে সেটির অর্জনে আত্মনিয়োগ করা। নানা গোত্র, নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মুসলমানরা একই ভাবে একত্রে বসবাস করবে জান্নাতে, সেখানে ভাষাগত, বর্ণগত বা গোত্রগত পরিচয়ের কোন গুরুত্ব থাকবে না। একমাত্র পরিচয় হবে, তারা সবাই আল্লাহতায়ালাতে আত্মসমর্পিত মুসলমান। তাই জান্নাতের প্রবেশের পূর্বশর্ত হলো দুনিয়া থেকেই সে গুণটি অর্জন করা। সাহাবায়ে কেরাম সেটি অর্জন করেছিলেন। আজও যদি নানা ভাষা ও নানা বর্ণে বহু হাজার নবী নাযিল হতেন তবে তাদের মাঝেও বর্ণ ও ভাষা নিয়ে কোনরূপ বিভেদ হতো না, সংঘাতও হতো না। বিভেদ গড়া তো শয়তানের কাজ। অথচ বাংলাদেশের স্যেকুলার পক্ষটি শুধু বিভেদই গড়েনি, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধও বাধিয়েছে। এবং এখনও সেটির বার বার হুংকার দিচ্ছে।


বাংলাদেশের স্যেকুলার পক্ষের আরেক কৌশল, স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের বিবাদ বাড়িয়ে নিজেদের অতীত ব্যর্থতাকে আড়াল করা। সত্তরের দশকে ক্ষমতায় গিয়ে দূর্নীতি ও অযোগ্যতার তারা পাহাড় সমান ইতিহাস গড়েছিল। ডাস্টবিনে উচ্ছিষ্ট খুঁজতে গরীব মানুষকে কুকুরের পাশে পাঠিয়েছিল। মহিলাদের বাধ্য করেছিল মাছ ধরার জাল পরতে। রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছিল ফেনীর জয়নাল হাজারীর ন্যায় বিপুল সংখ্যক সন্ত্রাসী ও খুনিকে। তার মত দুর্বৃত্তকে নিজ দলের টিকেটে এমপিও করেছিল। এমন কদর্য ইতিহাস নিয়ে আবার ক্ষমতায় যাওয়া তাদের জন্য অসম্ভব। এখন কৌশল ধরেছে, মুছে ফেলবে মানুষের স্মৃতি থেকে কদর্যতার সে ইতিহাস। এখন চায়, বিবাদ বাধিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ ধরতে। কথা হলো, একাত্তরের স্বাধীনতার লড়াই নিয়ে তাদের যে এত অহংকার তাতেই বা তাদের অংশীদারিত্ব কতটুকু? তারা সমগ্র বাংলাদেশ স্বাধীন করা নিয়ে বড়াই করে। জাতির পিতা বানিয়েছে তাদের নেতাকে। অথচ একাত্তরের ৩রা ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনা বাহিনীর সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর পূর্বের নয় মাসে তারা বাংলাদেশের কোন একটি জেলাকেও কি স্বাধীন করতে পেরেছিল? অথচ অগ্রাসী রুশ ও তাদের আজ্ঞাবহ তাঁবেদার সরকারগুলির হাত থেকে কাবুল মুক্ত করার বহু বছর আগেই আফগান মোজাহিদরা শতকরা ৮০ ভাগের বেশী ভূ-ভাগ স্বাধীন করেছিল। যেমন আজ আফগানিস্তানে মার্কিন ও তার মিত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রন সীমিত হয়ে পড়েছে কাবুল ও প্রাদেশিক রাজধানী গুলোর কয়েক মাইলের মধ্যে। এমনকি পুরাপুরি নিরাপদ নয় কাবুল শহরও। একই ভাবে দেশের সিংহভাগ মুক্ত করেছিল আলজেরিয়া ও ভিয়েতনামের মুক্তি ফৌজ। এবং তাদের পক্ষে কোন বিদেশী শক্তি এসে লড়েনি। অথচ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে মূলতঃ পরাজিত করেছে ভারতীয় বাহিনী। এ যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনীর ১৪ হাজার সৈন্যও নিহত হয়েছে। যদি মুক্তিবাহিনীই পাকবাহনীকে পরাজিত করে থাকে তবে ভারতীয় বাহিনীকে কেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে হল? জয়-পরাজয়ের প্রকৃত লড়াই হয়েছে এ দুটি বাহিনীর মধ্যে। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্দানে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণ চুক্তিটি সাক্ষর হয়েছিল তাই এ দুই বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডারদের মাঝে। সেখানে কোন বাংলাদেশী সেনা কমান্ডারকে ডাকা হয়নি। ভারত সরকার যে একান্তই নিজ শক্তিবলে পূর্ব পাকিস্তান দখল করেছিল সেটি তারা এ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিল। দখলের পর গদীতে পুতুল রূপে বসিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকারকে। ফলে কোন আত্মসচেতন জাতি কি এমন পুতুলদের স্বাধীনতার স্থপতি ভাবে? বাংলাদেশের ১৫ কোটি মুসলমানদের জন্যও কি এটি কম অপমানের যে একটি কাফের শাসিত দেশ তাদের স্বাধীনতার জনক হবে? আওয়ামী-বাকশালী চক্র ইতিহাসের পাতা থেকে সে সত্যকে মুছে দিতে চায়। নিজেদের অবদানকে বড় করে দেখানোর জন্য ভারতীয় বাহিনীর পরিচালিত প্রকান্ড যুদ্ধকে ইতিহাস থেকেই মুচ্ছে দিচ্ছে। ইতিহাসের নামে এটি আরেক মিথ্যাচার।


বলা হচ্ছে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল অবধি বাংলাদেশ ছিল ঔপনিবেশিক পাকিস্তানের একটি কলোনী মাত্র। কিন্তু কিভাবে পাকিস্তানের কলোনী রূপে বাংলাদেশের সে পরাধীনতা শুরু হলো সে বিবরণ তারা দেয় না। ঔপনিবেশিক পরাধীনতার শুরুর জন্য একটি পলাশীও লাগে। ১৭৫৭ সালে বাংলাকে পরাস্ত করতে বহু হাজার ইংরেজ সৈন্য সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে পলাশীর রণাঙ্গণে এসেছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালে পূর্ববাংলা জয়ে এসেছিল কি কোন পাকিস্তানী সৈন্য? এসে থাকলে কোথায় হয়েছিল সে যুদ্ধটি? তখন কে ছিল সিরাজউদ্দৌলা, আর কে ছিল মীরজাফর? কিরূপে প্রতিষ্ঠা পেল সে ঔপনিবেশিক শাসন? পূর্বপাকিস্তানকে বলা হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনি বা উপনিবেশ। কথা হল, কলোনি বা উপনিবেশ বলতে কি বুঝায় তা কি তারা বুঝেন? ১৯০ বছর বাংলাদেশ ব্রিটিশের কলোনি ছিল। এ দীর্ঘ ১৯০ বছরে এ ব্রিটিশ কলোনি থেকে কোন বাঙ্গালী কি ব্রিটিশের প্রধানমন্ত্রী দূরে থাক কোন ক্ষুদ্র মন্ত্রীও হতে পেরেছে? অথচ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হয়েছেন সে আমলের পূর্ব পাকিস্তান থেকে। তখন রাষ্ট্রপ্রধানকে বলা হত গভর্নর জেনারেল। প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন কয়েকবার। তাছাড়া পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনি ছিল এটি নেহায়েতই ১৯৭১-পরবর্তী আবিস্কার। ১৯৭০ এর নির্বাচনের পূর্বে এমনকি শেখ মুজিবও এমন কথা একটি বারের জন্যও বলেননি। পাকিস্তানের ২৩ বছরের জীবনে রচিত হাজার হাজার নিবন্ধ, কবিতা বা গল্প ও উপন্যাসেও এমন কথা একটি বারের জন্যও লেখা হয়নি। অথচ সাহিত্য হল একটি দেশের চেতনার প্রতিচ্ছবি। সে সময়ের সাহিত্যে যে চেতনা ও উপলদ্ধিটি ফুটে উঠেছে তার কিছু উদাহরণ দেওয়া যাক তাদের লেখা থেকে যারা ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশে বাঙ্গালী জাতিয়তাবাদের প্রধানতম বুদ্ধিজীবী। পাকিস্তান নিয়ে বেগম সুফিয়া কামাল লিখেছেন-

“আজাদ পাকিস্তান, লাখো বক্ষের কামনার ধন,আল্লাহর অবদান। কত শহীদের জিগরের খুনে পাক হল এই মাটি, কত অশ্রুতে ধুইয়া জাতির দুর্দিন গেল কাটি। জাগে নিপীড়িত জনগণ সবে গাহি মুক্তির গান, টুটেছে শিকল আঘাতে আঘাতে ভাঙ্গিয়াছে জিন্দান।”

কায়েদে আজমকে নিয়ে বেগম সুফিয়া কামাল লিখেছেন-

“কায়েদে আযম,হে মহান নেতা সাড়া দাও দাও দাও সাড়া, তোমরে হেরেনি,শুনেছিল শুধু তোমান কন্ঠবাণী; জেনেছিল তারা,তুলেছে পতাকা তোমার বজ্রপানি। সিকান্দার আবু জাফর পাকিস্তান নিয়ে লিখেছেন- “নূতন মাটিতে নূতন প্রাণের অধিকার কিনে এনেছি, ওক্ত-আঁখির শাসন-বিহী বাধাহীন গতি প্রতি নিশিদিন কত যে মধুর জেনেছি।” ...(মাহে নও, আগষ্ট ১৯৫২)

ডঃ মাযহারুল ইসলাম লিখেছেন-

“সহসা আলোর পরশ লাগলো প্রাণে প্রাণে এক চেতনা জাগলো আঁধার দুয়ার খুলে গেল সম্মুখে কে তুমি নতুন হে নব-পথ-সন্ধানী আলোক দ্রষ্টা? কে তুমি নতুন মাটির স্রষ্টা।”

বরং সত্য হলো, বাংলার মুসলমানগণই ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্টে পাকিস্তানের পতাকা কাঁধে বিপুল আনন্দ করেছে। সে আনন্দ উৎসব হয়েছে গ্রামে গঞ্জে। সে স্বাধীনতার নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নামে দেশের মানুষ নিজেরা বহু প্রতিষ্ঠান গড়ছে। অসংখ্য মানুষ জিন্নাহর নামে সন্তানদের নাম রেখেছে। বাংলাদেশের কবিরা তার প্রশংসায় বহু কবিতা লিখেছে। কোন হানাদার বা দখলদারের নামে কি সেটি হয়? তারা বরং নিজেরাই পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন পাকিস্তানের অংশ মনে করে নিজ দায়িত্বে পাহারাদারির ব্যবস্থা করেছে। ১৯৬৫ সালে হানাদার ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে সীমান্তে গিয়ে যুদ্ধও করেছে। স্কুলের ছাত্ররা গ্রামে গঞ্জে গিয়ে সে যুদ্ধের তহবিলে চাঁদা তুলেছে। পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্যালয়গুলোতে ২৩ বছর যাবত ছাত্ররা পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত গেয়েছে। স্বাধীনতা দিবস রূপে মহাধুমধামে প্রতি বছর পালিত হয়েছে ১৪ই আগষ্ট। স্বাধীনতার গান ও কবিতা লিখেছেন দেশের কবি-সাহিত্যিকগণ। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পত্রিকাগুলো বের করেছে ক্রোড়পত্র। ঔপনিবেশিক শাসনে আটকে পড়া কোন পরাধীন জনগোষ্ঠী কি এরূপ স্বতঃস্ফুর্তভাবে স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করে?


আরো প্রশ্ন উঠে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ অবধি বাংলাদেশ পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক কলোনী রূপে গণ্য হলে শেখ মুজিব বা আওয়ামী লীগের দলীয় পুস্তকে সেটির উল্লেখ কই? সেটির উল্লেখ আছে কি বিশ্বের অন্য কোন ভাষার গ্রন্থে? শেখ মুজিব ১৯৭০এর নির্বাচন লড়েছিলেন পাকিস্তানের অখন্ডতা ও স্বাধীনতার প্রতি লিখিত অঙ্গিকার দিয়েই। এমনকি শেখ মুজিব নিজেও পূ্‌র্বপাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন। সেটি হয়েছেন পাকিস্তান যে স্বাধীন রাষ্ট্র সে বিশ্বাস নিয়েই। এবং সে স্বাধীনতার সুরক্ষার শপথ নিয়েছিলেন পবিত্র কোরআন ছুঁয়ে। শেখ মুজিব কোরআন ছুঁইয়ে পাকিস্তান রক্ষার সে কসমের সাথে নিজে গাদ্দারী করেছেন। কিন্তু বাংলার বহু মানুষ তা করেনি, তারা বিশ্বস্থ থেকেছেন। কিন্তু সে বিশ্বস্থ থাকাটিকে কি অপরাধ বলা যায়? অথচ শেখ মুজিব এটিকে অপরাধ গণ্য করে হাজার হাজার মানুষকে কারারুদ্ধ করেছেন। অনেককে হত্যাও করা হয়েছে। কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর পর তার স্থানে যিনি বসেন এবং পাকিস্তানের কর্ণধার হন তিনিও কোন পশ্চিম পাকিস্তানী ছিলেন না, ছিলেন ঢাকার নবাব খাজা নাযিম উদ্দিন। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বগুড়ার জনাব মোহাম্মদ আলী এবং বাংলারই আরেক জন জনাব শহিদ সোহরাওয়ার্দী। বাংলাদেশ যদি পাকিস্তানের পরাধীন উপনিবেশই হতো তবে কোন বাঙ্গালীর পক্ষে কি সে দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে বসা সম্ভব হতো? পাঞ্জাবীদের গোলাম হলে সে গোলাম কি সুযোগ পেত বাংলাদেশের ভুগোলের চেয়ে কয়েকগুন বৃহৎ পাকিস্তানী ভুগোলের উপর শাসনের অধিকার? বৃটিশের ১৯০ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনে কোন ভারতীয় নাগরিকের কি পেয়েছিল সে সুযোগ? ঔপনিবেশিক শাসনের ফল হলো এক নির্ভেজাল শোষণ, শোষণমূলক সে শাসনে দেশে কোন শিল্প গড়ে উঠে না। ১৯০ বছরের শাসনে বৃটিশ সরকার বাংলাদেশে একটি পাটকলও প্রতিষ্ঠা করেনি। পাটকল প্রতিষ্ঠা করেছে নিজ দেশের ডান্ডি বা অন্যান্য শহরে। স্থাপন করেনি কোন বস্ত্র, ঔষধ, সিরমিক ও অস্ত্র কারখানাও। প্রতিষ্ঠিত করেনি ইঞ্জিনিয়ারিং বা মেডিকেল কলেজ। অতি শেষ সময়ে এসে ঢাকাতে প্রতিষ্ঠা করেছিল ছোট মাপের একটি বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ পাকিস্তানে মাত্র ২৩ বছরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৭০টিরও বেশী পাটকল। একটি ছিল বিশ্বের সর্ব বৃহৎ পাটকল। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৬০টির বেশী বস্ত্র কারখানা। নির্মিত হয়েছিল ষ্টীল মিল, নিউজপ্রিন্ট কারখানা, ডকইয়ার্ড, অস্ত্রনির্মাণ কারখানা। ঢাকাতেই নির্মিত হয়েছিল পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ আজ যা বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ। প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বহু বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ।


সমস্যা হলো ঔপনিবেশিক শাসন কাকে বলে বস্তুতঃ সেটি বুঝতেই রয়েছে তাদের চরম ব্যর্থতা। বরং প্রকৃত সত্য হলো, পাকিস্তানের ন্যায় বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের উপর শাসন অধিকার পেয়ে বাংলাদেশী মুসলমানেরা সুযোগ পেয়েছিল মুসলিম উম্মাহর রাজনীতি এবং সে সাথে বিশ্বরাজনীতিতে প্রভাব ফেলার। বিশ্বের বহুদেশ থেকে বাংলাদেশের মানুষ হাত পেতে বহু কিছুই নিচ্ছে, কিন্তু আণবিক শক্তিধারি বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতায় অংশিদার থাকলে তাদেরকে কিছু দেওয়ারও সুযোগ পেত। নানা ভাষাভাষি হয়েও প্রাথমিক যুগের মুসলমানগণ যেমন উম্মতে ওয়াহেদার জন্ম দিতে পেরেছিলেন, ২৮ কোটি মুসলমানের পাকিস্তানও হতে পারতো তারই সাম্প্রতিক কালের মডেল। চীন ও ভারতের পর এটিই হতো বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র। তেমনি একটি দূরদৃষ্টি বা ভিশন নিয়ে উপমহাদেশের নানা ভাষাভাষি মুসলমানগণ কংগ্রেসের প্রচন্ড প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তান গড়েছিল। বিহার, মধ্যপ্রদেশ, উত্তর প্রদেশ এবং ভারতের অন্যান্য প্রদেশের মুসলমানগণ জানতো যে তাদের মাতৃভূমি কখনই পাকিস্তানভূক্ত হবে না। কিন্তু তারপরও তারা পেশ করেছেন কোরবানি। কারণ, এতে তারা বিশ্বের মুসলমানদের কল্যাণ দেখেছিলেন। একটি মুসলিম বিশ্বশক্তি গড়ার প্রচন্ড তাড়না নিয়ে নিজেদের বহু শত বছরের পুরনো পৈতৃক ভিটা ও ব্যবসাবাণিজ্য ছেড়ে পাকিস্তানে পাড়ি জমিয়েছিলেন। এমন একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের নেতৃত্বে শরিকদার থাকায় বাংলাদেশী মুসলমানদের কি ইজ্জতহানি হতো? স্বাধীন বাংলাদেশের ইজ্জত বেড়েছে কি বিশ্বে তলাহীন ভিক্ষার ঝুড়ি বা দূর্নীতিতে প্রথম হওয়াতে? অপর দিকে স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে পাকিস্তান আমলের ২৩ বছর বাদ দেওয়ায় বিশ্বের দরবারে স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলির তালিকায় বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে সবচেয়ে তলার একটি জুনিয়র রাষ্ট্রে। আগামী প্রজন্ম কি এ তথ্য পড়ে বিস্মিত হবে না যে তাদের পূর্বপুরুষ এতই মেরুদন্ডহীন, চেতনাহীন ও কাপুরুষ ছিল যে বার্মা, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ, উগান্ডা, ঘানা, কেনিয়ার মত একশতেরও অধিক দেশের পর স্বাধীনতা অর্জন করেছে। আওয়ামী গোষ্ঠীর ইতিহাস বিকৃত করার কারণে তারা জানতেই পারবে না যে বিশ্বের সর্ববৃহৎ স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্রের নির্মাণে তারাই মূল প্রস্তাবক ছিল। ছিল অন্যতম স্রষ্টা ও কর্ণধার। ভিন্নভাষা বা ভিন্ন বর্ণের মানুষের সাথে এক রাষ্ট্রে বসবাসের অর্থ গোলামী নয়, পরাধীনতাও নয়। নিজেদের আশা-আকাঙ্খাকে খাটো করাও নয়। বরং বহু ক্ষেত্রে সেটিই স্বাধীনতার রক্ষাকবচ।


ভারতীয় হিন্দুদের কাছে অখন্ড ভারতে একতাবদ্ধ থাকাটাই তাদের রাজনীতি। তাদের মজবুত অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষার এটিই মূল গ্যারান্টি। তাই বাঙ্গালী হিন্দুগণ অবাঙ্গালী হিন্দুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে অনিচ্ছুক। একই কারণে আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে সে ভূমিতে বসবাসকারি ইংরেজ, ফরাসী, আইরিশ, ডাচ বা স্পেনিশগণ। নইলে তাদের পক্ষে অসম্ভব হতো বিশ্বশক্তিরূপে প্রতিষ্ঠা পাওয়া। যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে আজ ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোও। নইলে প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে তাদের টিকে থাকাই কঠিন। আজকের বিশ্বে যারা শিল্পে ও সামরিক ক্ষেত্রে উন্নত এটি হলো তাদের অবস্থা। এর বিকল্প যেটি হলো সেটি হলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাতার, কুয়েত, বাহরাইন হয়ে শত্রুর পদতলে পিষ্ট হওয়া। সামরিক ঘাঁটি নির্মাণে এবং সীমাহীন লুন্ঠনে দরজা খুলে দেওয়া। সাতচল্লিশে এক গভীর প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি কাজ করেছিল সোহরাওয়ার্দী, নাজিমুদ্দিন, নুরুল আমিনের মত বাংলার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের রাজনীতিতে। ফলে তারা সেদিন তাড়িত হয়েছিলেন এক অখন্ড পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠায়। নইলে শুরু থেকেই ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতো বাংলাদেশ। এবং একাত্তরে সে অভিন্ন চেতনাতে উদ্বুদ্ধ হয়েই বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রাণপণে বিরোধীতা করেছিল তাবৎ ইসলামি দল ও ইসলামি ব্যক্তিত্ব। কিন্তু যে ব্যক্তির সর্বচ্চ যোগ্যতা হলো বাংলাদেশকে একটি তলাহীন ভিক্ষার ঝূড়িতে পরিণত করা, গণতন্ত্র হত্যা করে একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠা করা, রক্ষীবাহিনী লেলিয়ে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা এবং দেশীয় শিল্প ধ্বংস করে ভারতের হাতে দেশের বাজার তুলে দেয়া, শেখ মুজিবের ন্যায় তেমন এক ব্যক্তি থেকে কি সে প্রজ্ঞা ও দূরদৃষ্টি আশা করা যায়? দেশটির অস্তিত্ব অসম্ভব বলা হয়েছে এ কারণে যে, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মাঝে ১২ শত মাইলের ব্যবধান। অথচ দেশটি ভেঙ্গে গেল রাজনৈতিক কারণে, যোগাযোগ বা প্রশাসনিক সমস্যার কারণে নয়। ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব প্রান্তের দ্বীপটি থেকে পশ্চিম প্রান্তের দ্বীপের দূরত্ব এর চেয়ে অনেক বেশী। আরো সত্য হলো বাংলাদেশ বৃটিশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল ১৯০ বছর। অথচ দুটি দেশ ছিল দুটি ভিন্ন গোলার্ধে। মাঝের দূরত্ব ছিল বহু হাজার মাইল। কিন্তু এরপরও প্রশাসনে সমস্যা হয়নি। অথচ তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা আজকের মত এত উন্নত ছিল না। আসা-যাওয়ায় বহু সপ্তাহ কেটে যেত পথে।


আওয়ামী লীগের মূল সমস্য হলো এরা প্রচন্ড ক্ষমতালোভী। এবং সে সাথে প্রচন্ড অঙ্গিকারহীন ইসলামে। ইসলামে অঙ্গিকারহীন হওয়ার কারণে তারা ছিল পাকিস্তানের অখন্ডতায়ও অঙ্গিকারহীন। ইসলাম, মুসলিম এরূপ ধর্মের সাথে সম্পর্কযুক্ত শব্দগুলির সাথেই তাদের শত্রুতা। যারা তাদের মূল সংগঠন আওয়ামী মুসলিম লীগের মুসলিম শব্দটিকেই সহ্য করতে পারেনি তারা কি করে মুসলিম স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে পারে? যে কোন ভাবে ক্ষমতায় যাওয়াটাই তাদের রাজনীতির মূল লক্ষ্য। প্রয়োজন দেশের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে হলেও। তারা ক্ষমতায় যাওয়ার লোভে আন্দোলন জোরদার করতে সব সময় লাশ চেয়েছে। কিন্তু এত লাশ পড়ার মূল কারণও তারা। নইলে ঢাকা, কুমিল্লা, চিটাগাং, যশোর ইত্যাদী শহরে সাত চল্লিশ থেকেই বহু হাজার পাঞ্জাবী সৈন্যের অবস্থান ছিল। বাংলাকে বাঙ্গালী শূণ্য করার মতলব থাকলে, যে অভিযোগ তাদের বিরুদ্ধে আনা হয়, তারা সে সময় থেকেই বাঙ্গালী খুনে লাগতো। বাংলাদেশ সৃষ্টির পরও আওয়ামী লীগ সেই অভিন্ন ষড়যন্ত্রে মশগুল। বিএনপি শাসনামলে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বই লিখে তারা বিদেশে প্রচার করেছে। নির্বাচিত দলকে ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করার ইতিহাস নতুন নয়। পাকিস্তানে সেটি অনেক বার ঘটেছে। খাজা নাজিমুদ্দিনের মুসলিম লীগ সরকারও অগণতান্ত্রিক ভাবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে মোহাম্মদ আলী বগুড়া এবং সোহরাওয়ার্দীর সরকারও। বার্মার অং সান সুকি নির্বাচনে জিতেও ক্ষমতায় যেতে পারেননি। অগণতান্ত্রিক ভাবে ক্ষমতাচ্যুত হয়েছেন তুরস্কের নাজিমুদ্দিন আরবাকান সরকার। বিপুল ভোটে এগিয়ে থাকা আলজেরিয়ার ইসলামিক সালভেশন পার্টিকেও সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি। এ তালিকা অতি দীর্ঘ। ক্ষমতা বঞ্চিত হয়ে আওয়ামী লীগ যেভাবে বিদেশী শত্রু সৈন্যদের দেশে ডেকে আনলো এবং পাকিস্তানের ভূগোল খন্ডিত করলো তেমন আত্মবিনাশী কাজ কিন্তু অন্যরা করেনি। তারা ধৈর্য ধারণ করেছেন কিন্তু আওয়ামী লীগ তা পারেনি। অপরদিকে শেখ মুজিব দ্বৈত খেলা খেলেছেন। বলা হয়ে থাকে, ইয়াহিয়া খানকে শাসনতান্ত্রিক ভাবে প্রেসিডেন্ট করার প্রলোভন দিয়ে তৎকালীন সামরিক সরকার থেকে সব রকমের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়েছেন। এর প্রমাণ, অন্য দলগুলির নির্বাচনী প্রচারের উপর সন্ত্রাসী হামলায় তারা পেয়েছে সরকারের পরিপূর্ণ প্রশ্রয়। এ অভিযোগ জোরেশোরে এনেছিলেন মাওলানা ভাষানী। এ অবস্থায় নির্বাচন অহেতুক জেনে তিনি নির্বাচনে অংশই নেননি। সে নির্বাচনে আওয়ামী সন্ত্রাসের নমুনা অনেক। ১৯৭০ সালের ১৮ ই জানুয়ারির পল্টনে ছিল জামায়াতে ইসলামির জনসভা। আওয়ামী লীগের কর্মীরা সেদিন তিন জন জামায়াত কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করে। আহত করে মফস্বলের বহু জেলা থেকে আগত বহু শত নিরীহ নাগরিককে। অথচ এতবড় একটি ঘটনা ঘটেছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর এ্যাডমিরাল আহসানের বাসভবন থেকে সামান্য কয়েক শত গজ দূরে। কিন্তু পুলিশ কোন কার্যকর ব্যবস্থাই নেয়নি। কাউকে এ অপরাধে গ্রেফতার করা হয়নি এবং সাজাও দেওয়া হয়নি। পরের সপ্তাহে ২৫ জানুয়ারিতে একই স্থানে জনসভা ছিল পাকিস্তান মুসলিম লীগের। মূল বক্তা ছিলেন দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরি। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসী বাহিনী শুরুতেই সে মিটিং লন্ডভন্ড করে দেয়। গুন্ডাদের হামলা থেকে ফজলুল কাদের চৌধুরী সে যাত্রায় বেঁচে গিয়েছিলেন তার দলীয় কর্মীদের প্রবল প্রতিরোধের কারণে। কোন পুলিশ তার হেফাজতে এগিয়ে আসেনি। সরকার এ সন্ত্রাসীদের কাউকে গ্রেফতার করেনি বা শাস্তিও দেয়নি। এ ঘটনার পর সন্ত্রাসের প্রবল জোয়ার শুরু হয় সারা দেশব্যাপী। সরকার কোথাও সে নির্বাচনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে কোন দলের পক্ষেই সম্ভব হয়নি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সুষ্ঠ নির্বাচন প্রচার চালানো। ফলে নির্বাচনের বহু আগেই বিজয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ। আর সেটি সুনিশ্চিত করেছিল ইয়াহিয়ার সরকার। অপরদিকে শেখ মুজিব গোপনে ব্যবস্থা করেছেন ভারতের অর্থপ্রাপ্তি ও সামরিক সাহায্যপ্রাপ্তিকে। এভাবে দুপক্ষের সমর্থণ তিনি সুনিশ্চিত করেছিলেন। অবশ্য ভারতের সাহায্য পেতে তার কোন বেগ পেতে হয়নি। বরং ভারতই এমন এক ব্যাক্তির প্রতীক্ষায় ছিল। শেখ মুজিবের প্রলোভনে ইয়াহিয়া খান এতটাই মত্ত ছিল যে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দারা তাকে গোপনে সংগ্রহ করা শেখ মুজিবের ক্যাসেট শুনিয়েও মুজিবের আসল মতলব যে পাকিস্তান খন্ডিত করা সেটি বোঝাতে পারেনি। বরং জবাবে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, “ইফ হি ব্রেকস হিজ প্রমিজ আই শ্যাল ফিক্স হিম।”-(G.W.Chowdhury,1974)


প্রশ্ন হলো পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়াকে স্বাধীনতার শত্রু বলা হলে যারা পাকিস্তানের জন্ম দিয়েছিলেন তাদেরকে কি বলা যাবে? পাকিস্তানের সৃষ্টিতে জড়িত ছিলেন বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান এবং তাদের নেতা ফজলূল হক, খাজা নাজিম উদ্দিন, সোহরোওয়ার্দি এবং আরো অনেক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি। তবে তারা কি বাংলাদেশকে পাকিস্তানভূক্ত করে বাংলাদেশীদের পায়ে পরাধীনতার শেকল পরিয়েছিলেন? তারাও কি আত্মবিক্রীত গোলাম ছিলেন? অন্যদের কাছে ঐক্যের বিষয়টি নিছক রাজনীতি, কিন্তু মুসলমানদের কাছে সেটি ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। একতার হুকুম এসেছে মহান আল্লাহতায়ালা থেকে। তাই ইসলামে এটি ফরয। এর প্রতিফলন ঘটাতে হয় শুধু নামাযের জামাত বা হজ্বের সম্মেলনে নয়, বরং সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনাসহ সর্বক্ষেত্রে। এটি ফরয প্রতিটি মুসলমানের উপর। তাই ইসলামে অঙ্গিকারবদ্ধ মুসলমানগণ বিস্তর ভুগোল বাড়িয়েছেন, কিন্তু রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়াননি। মুসলিম ভূমিতে বার বার ইয়াজিদের ন্যায় বহু দুর্বৃত্তও শাসক হিসাবে জেঁকে বসেছেন, কিন্ত সে কারণে কেউ দেশ ভাঙ্গার কাজে হাত দেননি। যুদ্ধ-বিগ্রহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে অগণিত মানুষের মৃত্যু খুবই বেদনাদায়ক। শুধু বিগত ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের জলোচ্ছ্বাসেই বাংলাদেশের প্রায় ১০ লাখ মানুষ ভেসে গেছে। কিন্তু এত লোকের মৃত্যুতে শেখ মুজিবের ক্ষমতায় যাওয়ায় নেশায় সামান্যতম ফাটল ধরেনি। তিনি নির্বাচন এক দিনের জন্যও পিছিয়ে নিতে রাজী হননি। অথচ অনেকের পক্ষ থেকে দাবী উঠেছিল নির্বাচন থামিয়ে সে সময় রিলিফ ও পুনর্বাসনের কাজ জোরদার করতে। কিন্ত ক্ষমতা পাগল মানুষের কাছে কি মানুষের জীবনের মূল্য থাকে? তারা তো লাশকে ব্যবহার করে ক্ষমতায় যাওয়ার মাধ্যম রূপে। তবে আরো বেদনাদায়ক হল, যদি সে অসংখ্য প্রাণহানীর সাথে দেশেরও মৃত্যূ ঘটে। সাদ্দাম হোসেনের আমলে ইরাকের কুর্দিদের উপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের ন্যায় বীভৎস ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু তাই বলে কি কুর্দিদের পৃথক রাষ্ট্র গঠন বা ইরাককে কয়েক টুকরোয় বিভক্ত করায় কোন মুসলমান খুশি হতে পারে? তখন তো শুরু হয় রক্তক্ষয়ী ফেতনা তথা গোলযোগ। ইরাকে মার্কিন দখলদারির ফলে শিয়া-সূন্নী-কুর্দি পরিচয়ে যে ফেতনা বা গোলযোগ শুরু হয়েছে তাতে মারা গেছে দশ লাখের বেশী মানুষ। গৃহহারা হয়েছে প্রায় সিকিভাগ মানুষ। এখনও সে রক্তাক্ষরণ থামার নাম নিচ্ছে না। স্বৈরাচারি ও বর্বর সাদ্দামের চেয়েও বেশী ভয়ানক, বেশী বর্বর ও বেশী রক্তাক্ষয়ী প্রমাণিত হচ্ছে ফেতনার এ নায়েকরা। সাদ্দাম মুসলিম দুষমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং ইসরাইলের ন্যায় শত্রু পক্ষের এতটা আনন্দ বাড়ায়নি যা বাড়িয়েছে এসব ফেতনার নায়কেরা।


আওয়ামী লীগ তেমনি এক বাঙ্গালী-অবাঙ্গালীর রক্তাক্ষয়ী ফেতনা সৃষ্টি করেছিল পাকিস্তানে। উপমহাদেশের সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে ভাষা-ভিত্তিক এমন রক্তাক্ষয়ী ফিতনা বা সংঘাত আর কোন মুসলিম সংগঠন করেনি। ফলে তারাও প্রচন্ড আনন্দ বাড়িয়েছিল মুসলিম দুষমন আগ্রাসী ভারতীয়দের। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবের পূর্বে একমাত্র কাশ্মিরের শেখ আব্দুল্লাহ ছাড়া আর কোন মুসলিম নেতাই ভারতীয়দের এত আনন্দ বাড়ায়নি। ভারতীয়দের কাছে শেখ মুজিব এবং তার পরিবার ও দল এজন্যই তো এত প্রিয়। ভারতের মুসলমানেরাও চরম মনকষ্টে ভূগেছে পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ায়। পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়াতে বহির্বিশ্বে যারা খুশি হয়েছিল এবং বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে এগিয়ে এসেছিল তারা হলো ভারত, ভূটান ও রাশিয়া। কোন মুসলিম দেশ নয়। ঈমানের আলামত তো এটাই যে কোন মুসলিম দেশের এমন বিভক্তিতে মুসলমানের আত্মা বেদনায় কেঁদে উঠবে। পাত্রে ময়লা লাগায় সেটি ভেঙ্গে ফেলা শিশুসুলভ বুদ্ধিহীনতা। বু্‌দ্ধিমানের কাজ হলো, ময়লা ধুয়ে ফেলা। সেটি সত্য রাজনীতির ক্ষেত্রেও। ইসলামে তাই স্বৈরাচারি শাসকের বিরুদ্ধে জ্বিহাদের অনুমতি আছে, কিন্তু ভূগোল খন্ডিত করার অনুমতি নেই। ভূগোল খন্ডিত হলো শক্তিহীন হয় মুসলিম উম্মাহ। ইসলামে মুসলামানের ঘর ভাঙ্গা যেখানে হারাম, মুসলিম দেশকে খন্ডিত করা সেখানে হালাল হয় কি করে? এ কথা এখন আর অস্বীকারের উপায় নেই যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দূর্বলতা হলো তার ভূগোলে। বৃহৎ ভূগোলের বিকল্প নেই। বাংলাদেশে মানুষের মাথাপিছু আয় যদি ১০০ গুণ বেড়েও যায় তবু দেশটির পক্ষে বিশ্ব মাঝে শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে মাথা তুলে দাঁড়ানো অসম্ভব। সে সামরিক সামর্থ তার নেই। ভৌগলিক সামর্থও নেই। একই কারণে পারছে না কুয়েত। যদিও তাদের মাথাপিছু আয় মার্কিনীদের চেয়েও অধিক। বরং কুয়েতের মত ধনী আরব দেশগুলো বেঁচে আছে মার্কিনীদের পদপিষ্ঠ হয়ে। ভারতের মাথাপিছু আয় কুয়েতের সিকি ভাগও নয়, অথচ ভারত আজ বিশ্বশক্তি। শক্তিশালী রাষ্ট্র রূপে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য শুধু অর্থবল ও লোকবলই নয়, সে সাথে বৃহৎ ভূগোলের বলও চাই। অতীতের মুসলমানেরা রাজনীতির এ অতি মামূলী বিষয়টি ভাল ভাবে বুঝতেন। তাই উমাইয়া, আব্বাসীয়, উসমানিয়া আমলে শাসকদের হাতে বহু অন্যায় হয়েছে, কিন্তু সে কারণে কেউ ভূগোলে হাত দেননি। বরং তারা বহু অর্থ ও বহু রক্ত ব্যয়ে সে ভূগোল বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। তখন চেষ্টা হয়েছে সরকারের সংস্কারের। অথচ দায়িত্বশূণ্য এবং ইসলামি চেতনাশূণ্য স্বার্থপর মুসলমান নেতাদের কারণে যখন রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়তে লাগলো, তখন ইউরোপ, ভারত, মধ্য এশিয়া ও আফ্রিকা জুড়ে মুসলমানদের পরাজয়ও শুরু হল। সাম্রাজ্যবাদ কবলিত হলো মুসলিম ভূমি ও শত্রুদের হাতে আরো খন্ডিত হল তাদের ভূগোল। সে খন্ডিত ভূগোলের হেফাজতে প্রতি দেশে বসানো হল তাঁবেদার পুতুল শাসক। এভাবে মুসলিম ভূমির খন্ডিত মানচিত্রকে একটি স্থায়ী রূপ দেওয়া হল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী শক্তিবর্গ খলিফা হযরত ওমরের আমলের সিরিয়ার মত একটি মাত্র প্রদেশ ভেঙ্গে সৃষ্টি হলো সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন ও জর্দান নামের ৪টি পৃথক দেশ। সৃষ্টি করল ইসরাইল। এভাবে একটি প্রদেশের সমান এলাকায় উড়তে শুরু করলো ৪টি মুসলিম দেশের পতাকা। সে সাথে বাড়তি আরেকটি পতাকা ইসরাইলের। ইসরাইলের নিরাপত্তা এবং পবিত্র আল-আকসা মসজিদ ও মুসলিম ভূমির উপর ইসরাইলী জবর দখল স্থায়ী করার লক্ষ্যে মুসলিম ভূমির এরূপ বিভক্তিটি জরুরী ছিল। যেমন পাকিস্তানের বিভক্তি জরুরী ছিল ভারতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। কিন্তু প্রশ্ন হল, মুসলমানগণ সে বিভক্তির লক্ষে রক্ত দিবে? আমুসলমানরা এখন একতা ভূলে রাষ্ট্রীয় পূঁজির সিংহভাগ খরচ করছে সেসব পতাকা ও খন্ডিত ভূগোলের পাহারাদারিতে। এবং এটিকেই বলছে দেশপ্রেম। এভাবেই উপেক্ষিত হলো মুসলিম উম্মাহর একতা এবং নর্দমায় গিয়ে পড়লো তাদের ইজ্জত।


প্রশ্ন হলো, মুসলমানদের এরূপ এরূপ পারস্পারিক বিবাদে কাফেরদের সহায়তা নেওয়া কি জায়েজ? ঈমানদার মুসলমান কি তার ভাই-এর সাথে সৃষ্ট বিবাদ মেটাতে অমুসলিম বা কাফেরকে বাড়ীর আঙ্গিনায় ডেকে আনে? সর্বকাজে সে তো সমাজ গড়ে ঈমানদারদের সাথে। তেমনি মুসলমানের রাজনীতিও। তাই জায়েজ কি কোন কাফের শক্তিকে মুসলিম দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশের পথ করে দেওয়া? জায়েজ কি তাদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করা? মুসলমানদের মাঝে পারস্পরিক ঝগড়া-বিবাদ বা যুদ্ধ-বিগ্রহ নতুন নয়। এমন কি রক্তক্ষয়ী লড়াই-বিবাদ সাহাবায়ে কেরামের মাঝেও হয়েছে। এরপরও মহান আল্লাহতায়ালা তাদের ঈমান ও আমলে এতই সন্তুষ্ট যে সেটি জানিয়ে তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত নাযিল করেছেন। সর্বকালের মুসলমানদের মাঝে মূলতঃ তারাই শ্রেষ্ঠ মুসলমান। তাদের নামের সাথে পরবর্তীকালের মুসলমানগণ রাযীআল্লাহু আনহু পাঠ করে থাকে। সেটি যেমন হযরত আলী (রাঃ)র উপর, তেমনি হযরত মোয়াবিয়া (রাঃ)র উপর। বহু নেক আমলের পাশে তাদের অন্যতম মহৎ গুণ হলো নিজেদের বিবাদে কাফেরদের নাক গলানোর সুযোগ দেননি। অথচ প্রতিযুগের ন্যায় সে যুগের প্রতিবেশী কাফের রাষ্ট্রও এমন বিবাদে হস্তক্ষেপের জন্য উদগ্রীব ছিল। অথচ আওয়ামী লীগসহ দেশের স্যেকুলার পক্ষের বড় অপরাধ হল তারা ভারতের কাফের সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ডেকে এনেছে। তাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু এখনও তারাই। অথচ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলিম নিধন, মুসলমানদের সম্পদ লুন্ঠন এবং তাদের ঘরবাড়ী পুড়িয়ে দেওয়াই হলো সে দেশের রাজনীতি। মুসলমানদের সে দেশে জীবন্ত দগ্ধ করা হয়। মা-বোনেরা সে দেশে পুলিশের সামনে ধর্ষিত হয় এবং নিহত হয়। একবার দুইবার নয়, এমন ঘটনা ঘটেছে বহু হাজার বার। ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদকে সে দেশে দশ ঘন্টা ধরে প্রকাশ্য দীবালোকে ধ্বংস করা হলো। শত শত পুলিশ সেটি নীরবে দেখলো। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী কোন ব্যবস্থাই নিলেন না। এ অপরাধের জন্য কাউকে দেওয়া হল না শাস্তি। মুসলিম জনসংখ্যা ভারতের মোট জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ১৫ ভাগ, অথচ সরকারি দফতরে শতকরা দুই ভাগ চাকুরিও তাদের দেওয়া হয় না। এবং এসবই হল ভারতের সরকারি নীতি। এমন একটি মুসলিম বিরোধী দেশ মুসলমানের কল্যাণে একটি যুদ্ধ করবে এবং একটি তীর ছুঁড়বে সেটি কি বিশ্বাস করা যায়? তারা তো যুদ্ধ করে মুসলিম দেশ লুন্ঠনে বা মুসলিম দেশ ধ্বংসের লক্ষ্যে। একাত্তরে সেটি তারা প্রমাণও করেছে। একটি কাফের রাষ্ট্র থেকে আর কিইবা আশা করা যায়? আওয়ামী–বাকশালীদের বড় অপরাধ হল, তারা ভারতকে সে লুন্ঠনে এবং উপমহাদেশে মুসলিম শক্তির খর্ব করণে সর্বপ্রকার সহায়তা দিয়েছে এবং এখনও দিচ্ছে। সন্ত্রাসীদের পেশীবলে এখন তারা পার পেয়ে গেলেও ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাদের দাঁড়াতেই হবে।


এক সময় মীর জাফরকে কাঠগড়ায় তোলা সম্ভব হয়নি। তাকে নিরাপত্তা দিত লর্ড ক্লাইভের ব্রিটিশ বাহিনী। কিন্তু ইতিহাস তার রায় শুনিয়ে দিয়েছে। ইতিহাস রায় দিয়েছে কাশ্মিরের শেখ আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধেও। ফলে তার কবরকে এখন পুলিশ দিয়ে পাহারা দিতে হয়। এ ভয়ে না জানি তারা হাড্ডিগুলোকে কবর থেকে তুলে কেউ পিটানো শুরু না করে। কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব করা ইসলামে হারাম। আল্লাহতায়ালার সে সুস্পষ্ট ঘোষণাটি এসেছে এভাবে,

ইয়া আইয়োহাল্লাযীনা আমানু লা তাত্তাখিযুনাল কাফিরিনা আওলিয়া মিন দুনিল মু’মিনিন,আ’তুরিদুউনা আন তাজয়ালু লিল্লাহি আলাইকুম সুলতানাল মুবিনা।”-(সুরা নিসা ১৪৪)

অর্থঃ "হে ইমানদারগণ! তোমরা মুমিদেরকে ছেড়ে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না, তোমরা কি আল্লাহকে তোমাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রমাণ দিতে চাও।”

পবিত্র কোরআনের এ আয়াতে কাফিরদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করাটিকে শুধু হারাম বলা হয়নি, বরং হুশিয়ারিও শুনানো হয়েছে, এমনটি করা হলে সেটি হবে কঠোর শাস্তি প্রদানের জন্য আল্লাহতায়ালার হাতে অকাট্য দলীল তুলে দেওয়া। এ কঠোর হুশিয়ারি শোনার পর যার মনে আল্লাহর ভয় আছে এমন মুসলমান কি ইসলামি প্রজাতন্ত্র দেশ ছেড়ে ভারতের কাফেরদের গৃহে গিয়ে উঠতে পারে? নিতে পারে কি তাদের অর্থ, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ? এবং সেটিও মুসলিম হত্যার কাজে? এমন হারাম কাজটি যে ইহকালে ও পরকালে আযাব ডেকে আনবে সে ভয়েই বাংলাদেশের কোন বিজ্ঞ আলেম, মাদ্রাসার কোন শিক্ষক, মসজিদের কোন ইমাম বা ইসলামি সংগঠনের কোন নেতা একাত্তরে ভারতে যাননি। ভারতের অস্ত্র নিয়ে একটি মুসলিম দেশের বিনাশে যুদ্ধেও নামেননি। অথচ দেশের স্যেকুলার-বাকশালী পক্ষটি ভারতীয় কাফেরদের অস্ত্র নিয়ে সম্পূর্ণ উল্টোটি করেছে। ঈমানদারদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করার বদলে যুদ্ধ কালে নির্মম ভাবে হত্যা করেছে বহু হাজার আলেমকে। ক্ষমতা লাভের পর কারারুদ্ধ করেছিল বহু হাজারকে। সংকুচিত করেছে মাদ্রাসা শিক্ষা।


তবে এর অর্থ এ নয় যে পাকিস্তানের মানুষ ফেরেশতা ছিল। যেমনটি নয় বাংলাদেশের মানুষও। জালেম ফাসেক, জ্বিনাকারি ও খুনি যেমন বাংলাদেশে রয়েছে তেমনি পাকিস্তানেও আছে। বিশ্বের প্রতিদেশেই তা আছে। কিন্তু তাদের কারণে কি একটি রাষ্ট্রকে বিনাশ করা যায়? বরং দেশের নাগরিক হিসাবে মুসলমানের দায়িত্ব হল,নিজ দেশের পরিশুদ্ধির জন্য কাজ করা।দেশকে ধ্বংস করা নয়।ধ্বংসে তো আগ্রহ থাকবে বিদেশী শত্রুদের। তাছাড়া কাফেরদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করায় কি ইজ্জত বাড়ে? আওয়ামী লীগ দলীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কোলকাতায় মুখ্যমন্ত্রী রূপে অভিহিত করা হয়েছে। দেশ পরিণত হয়েছিল তলাহীন ঝুড়িতে। সত্তরের দশকে কুকুরের সাথে খাবার নিয়ে লড়াই করেছে মানুষ। কুকুরের সাথে মানুষের সে লড়াই সারা দুনিয়ার মানুষ টিভিতে দেখেছে এবং পত্রিকায় পড়েছে। বাংলাদেশের বহু হাজার বছরের ইতিহাসে এমন অপমান নেই। এটি কি কম আযাব? অথচ এটিই আওয়ামী-বাকশালীদের বড় অর্জন। কাফেরদেরকে বন্ধু হিসাববে গ্রহণ করলে এমন আযাব যে অনিবার্য সে ঘোষণা পবিত্র কোরআনে এসেছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেছেন,

“আল্লাযীনা ইয়াত্তাখিযুনাল কাফিরিনা আউলিয়া মিন দুনিল মুমিনিনা আ’ইয়াবতাগুনা ইন্দাহুম ইজ্জাতা ফা ইন্নাল ইজ্জাতা লিল্লাহি জামিয়া।”-(সুরা নিসা ১৩৯)

অর্থঃ “যারা মুমিনদেরকে পরিত্যাগ করে কাফিরদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করে তারা কি তাদের নিকট সম্মান অনুসন্ধান করে? কিন্তু যাবতীয় সম্মানই আল্লাহর।”

মহান আল্লাহতায়ালা আরো বলেছেন,

“ঈমানদারগণ যেন ঈমানদারদের বাদ দিয়ে কাফেরদের বন্ধু রূপে গ্রহণ না করে। যারা এরূপ করবে আল্লাহর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক থাকবে না।”-(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ২৮)

আলোচ্য আয়াতে এ বিষয়ে কোন অস্পষ্টতা নেই, বন্ধু গ্রহণের ক্ষেত্রে মুসলমানদের সামনে পথ একটিই। তা হল, ঈমানদেরকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করা। আল্লাহর সাথে মোমেনের সম্পর্ক একমাত্র এ পথেই স্থাপিত হয়। অপর দিকে সে সম্পর্ক ছিন্ন হয় কাফেরদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ায়। তখন আযাব নেমে আসে নানা ভাবে। এ বিশ্বে পক্ষ মাত্র দুটি: একটি আল্লাহর পক্ষ, অপরটি শয়তানের। মুসলমান হওয়ার অর্থই হল, প্রতি কর্মে আল্লাহর পক্ষ নেওয়া। সেটি রাজনীতি হোক, সমাজনীতি হোক বা জীবন ও জগতের অন্য কোন প্রসঙ্গ হোক। মুসলমানের ইজ্জত তো আসে একমাত্র আল্লাহ থেকে। কাফের ব্যক্তি বা আল্লাহর বিরুদ্ধ-শক্তিকে বন্ধু রূপে গ্রহণ করায় বাড়ে অপমান। শুধু দুনিয়ায় নয়, আখেরাতেও। এমন ব্যীক্তদের যাত্রা শুরু হয় অন্ধকারের পথে। মহান আল্লাহতায়ালার সে পবিত্র ঘোষণাটি এসেছে এ ভাবেঃ

“আল্লাহু ওয়ালীউল্লাযীনা আমানু ইউখরিযুহুম মিনাল যুলুমাত ইলাননূর। ওয়াল্লাযীনা কাফারু আওলিয়াহুমুত্তাগুত। ইউখরিযুনাহুম মিনান্নূরি ইলায যুলুমাত। উলায়িকা আসহাবুন্নারি হুম ফিহা খালিদূন।”

অর্থঃ “যারা ঈমান আনলো তাঁদের বন্ধু হল আল্লাহ। তিনি তাঁদেরকে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে যান। আর যারা (আল্লাহর দ্বীনকে)অস্বীকার করল(অর্থাৎ কুফুরি করল) তাদের বন্ধু হল শয়তান তারা তাদেরকে আলো থেকে অন্ধকারে নিয়ে যায়। তারার হল জাহান্নামের আগুনের বাসিন্দা যার মধ্যে তারা চিরকাল থাকবে।”(সুরা বাকারা, আয়াত ২৫৭)


কোন মুসলমান কি এ কোরআনী সত্যকে অস্বীকার করতে পারে? অতএব ভারতের আগ্রাসী ও মুসলিম দলনকারি হিন্দুদেরকে বা সমাজতন্ত্রী নাস্তিকদের যারা নিজেদের সাহায্যকারি বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করে তারা কি আলোর সন্ধান পায়? পায় কি আল্লাহর সাহায্য? পায় কি ইজ্জত? পায় নি। বাংলাদেশের ইতিহাসই তার সাক্ষী। ফলে মুজিব যেমন নিজের ও নিজ পরিবারের উপর ধ্বংস ডেকে এনেছে, তেমনি চরম বিপর্যয় ও তলাহীন ভিক্ষার ঝুলির অপবাদ ডেকে এনেছে বাংলাদেশের উপর।


তবে গণতন্ত্রে আযাব শুধু আল্লাহর অবাধ্য নেতার উপরই আসে না, আসে তাদের উপরও যারা তাদেরকে জেনেবুঝে নির্বাচিত করে। আযাব তখন ভাগাভাগি হয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের উপর এসেছে উপর্যুপরি বন্যা, প্লাবন, ঘূর্নিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। সেকুলারগণ আল্লাহর এরূপ আযাবকে বলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অথচ ইসলামের পরিভাষায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে কিছু নেই। সেটি হলে আদ, সামুদ, মাদায়েনে অধিবাসী, হযরত নুহ (আঃ) এবং হযরত লুত (আঃ)এর কউমের উপর যে মহাবিপদ নেমে এসেছিল পবিত্র কোরআনে সেগুলোকেও প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলা হত। অথচ কোরআন সে গুলিকে বলেছে আযাব। অথচ সেকুলারগণ সে কোরআনী পরিভাষাকে মানতে রাজি নয়। সেকুলারিজমের আভিধানিক অর্থ ইহজাগতিকতা; পরকালীন চেতনা তাদের কাছে কুসংস্কার। তাই সমাজকে কুসংস্কারমূক্ত করার নামে ইসলামের এ দুষমনেরা মানুষের মন ও মনন থেকে যেমন আল্লাহ-সচেতনতা ও পরকালের ভয়কে ভূলিয়ে দিতে চায়, তেমনি ভূলিয়ে দিতে চায় আল্লাহর আযাবের ধারণাকেও। এ লক্ষ্যে সেকুলারদের আবিস্কৃত বিকল্প পরিভাষাটি হল “প্রাকৃতিক দুর্যোগ”। মুসলিম সমাজে ইসলামী চেতনা বিনাশে সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের এ হল আরেক অপরাধ। অথচ প্রকৃতির সামর্থ নেই গাছের একটি মরা পাতা ফেলার, যদি না আল্লাহর পক্ষ থেকে সেটির অনুমোদন না আসে। ইসলামের এটি মৌলবিশ্বাস। তাই মুসলমান হওয়ার অর্থ এই নয়, সে শুধু আল্লাহর অস্তিত্ব, তাঁর নবী-রাসূল, কেতাব ও আখেরাতে বিশ্বাস করবে। বরং তাকে বিশ্বাস করতে হয় আল্লাহর সর্বব্যাপী ক্ষমতাকে। গাছের পাতা কখন গজাবে এবং কখন ঝড়ে পড়বে সেটিও সে মহান রাব্বুল আ’লামিন নির্ধারণ করেন। এ বিশ্বাসটুকু না থাকলে কেউ কি মুসলমান হতে পারে? একটি জনপদে আযাব পাঠিয়ে মহান আল্লাহপাক তাঁর বান্দাহর মনে ভয় সৃষ্টি করেন। এভাবে ফিরিয়ে নিতে চান তাঁর যিকর বা স্মরণের দিকে। প্রতিটি মোমেন তাই প্রতিটি দুর্যোগের মাঝে ঈমান ফিরে পায়। কিন্তু সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের কারণে বাংলাদেশ পুনঃ পুনঃ আযাবের দেশে পরিণত হলেও তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের সামর্থ সৃষ্টি হচ্ছে না অধিকাংশ মানুষের। তাদের মন থেকে আল্লাহতায়ালার সে আযাবকেই ভূলিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে দেশে বার বার আযাব আসলে কি হবে, বাড়ছে না আল্লাহর ভয়। বাড়ছে না আল্লাহর দ্বীনের প্রতি অঙ্গিকার। মানুষ ডুবছে পাপের গভীরে। দূর্নীতিতে বিশ্বে পাঁচ বার প্রথম হয়ে পাপাচারে সে বিপুল পারদর্শিতার কথা প্রমাণও করেছে। মানুষ তো নানবিধ দূর্নীতি করে ইহজাগতিক জীবনকে বেশী বেশী আনন্দময় করতে। একমাত্র পরকালের ভয়ই তাকে সে পাপাচার থেকে ফিরিয়ে রাখতে। আল্লাহর উপর ঈমান বান্দাহকে পরিণত করে সার্বক্ষণিক পুলিশে। সে তখন সমাজে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা করে এবং অন্যায়কে রুখে। পবিত্র কোরআনের ঈমানদারদের সে বর্ণনাটি এসেছে এভাবে,

“তোমাদের মধ্যে এমন দল মানুষকে অবশ্যই থাকতে হবে যারা মানুষকে ভাল কাজের দিকে ডাকবে এবং ন্যায় কাজের নির্দেশ দিবে এবং অন্যায় কাজকে রুখবে;এবং তারাই হল সফলকাম।”-(সুরা আল-ইমরান, আয়াত ১০৪)


তাই ঈমানদার হওয়ার অর্থ শুধু নামায পড়া নয়, নিছক রোযা রাখাও নয়। তাকে সমাজে ন্যায়র প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধে অবৈতনিক পুলিশের ভূমিকায়ও নামতে হয়। ঈমানদারদের সফলতা তো আসে এ পথেই। তাই ঈমানদারের সংখ্যা যে দেশে বেশী সে দেশ কি কখনও দূর্নীতিতে বিশ্বে রেকর্ড গড়তে পারে? সে দেশ তো রেকর্ড গড়ে সুনীতি ও সৎকর্মে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সে ইতিহাসই নির্মিত হয়েছিল। বাংলাদেশের নব্বই ভাগ মানুষ মুসলমান, কিন্তু ক’জনের মধ্যে সে ঈমান? ঈমান সৃষ্টি হলে তো আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত দায়িত্বপালনে প্রবল আগ্রহও সৃষ্টি হয়। দূর্নীতিতে বাংলাদেশের বিশ্ব-রেকর্ডই প্রমাণ করে এ দেশের মুসলমানেরা মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে অর্পিত সে পুলিশী দায়িত্ব পালন করেনি। অন্যায়কে না রুখে তারা বরং অন্যায়ের প্রসারে কাজ করেছে। কথা হল, দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ যখন দূর্বৃত্তির পথে বাড়ায় তখন মুষ্টিমেয় রাষ্ট্রীয় পুলিশ দিয়ে কি তা দমন করা যায়? দেশের জেলখানাগুলোতেই বা এত দুর্বৃত্তের স্থান হয় কি করে? বাংলাদেশীদের মূল সমস্যাঃ তাদের চেতনালোকে বেড়ে উঠেনি পরকালের ভয়। বাড়েনি ইসলামের প্রচার, প্রতিষ্ঠা ও বিজয়ের লক্ষ্যে অঙ্গিকার। ফলে ইসলামী বিধান ও মূল্যবোধ পরাজিত হলেও এমনকি নামাযীদের মধ্যেও তা নিয়ে কোন মাতম নেই। বাংলাদেশের সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের বিরাট সাফল্য মূলতঃ এ ক্ষেত্রটিতে। সাধারণ মানুষের চেতনালোককে তারা যে কতটা পরকালের ভয়শূণ্য করতে পেরেছে সেটি ইসলামের প্রচার, প্রতিষ্ঠা ও বিজয়ে তাদের অঙ্গিকারহীনতাই বলে দেয়। সেকুলারদের দ্বারা বাংলাদেশের মসজিদ-মাদ্রাসা ধ্বংস বা কোরআনে আগুণ লাগানো না হলে কি হবে, তারা বিধ্বস্ত করেছে সাধারণ মানুষের মনে পরকালের ভয়ের চেতনা। বিনাশ করেছে আল্লাহসচেতনা। এভাবে প্রচন্ড সফলতা পেয়েছে তাদের ডি-ইসলামাইজেশন প্রজেক্ট। ইসলাম রয়ে গেছে শুধু খোলস রূপে। এর ফল দাঁড়িয়েছে, নামায-রোযা পালন করেও মানুষ ঘুষ খায়, সূদ খায়, মিথ্যা কথা বলে এবং ইসলামের পরাজয় সুনিশ্চিত করতে চিহ্নিত দুর্বৃত্তদের ভোট দেয়।

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh

 

Most Read