Home EBooks ৭১এর আত্মঘাতের ইতিহাস অধ্যায় ১৯: যে ইতিহাস আত্মঘাতি বুদ্ধিবৃত্তির

eBooks

Latest Comments

অধ্যায় ১৯: যে ইতিহাস আত্মঘাতি বুদ্ধিবৃত্তির Print E-mail
Written by ফিরোজ মাহবুব কামাল   
Sunday, 19 October 2008 19:43
খুন, মদ্যপান বা ব্যাভিচারের চেয়েও জঘন্য হলো অনৈক্য বা বিভেদ। কারণ খুন, মদ্যপানে বা ব্যভিচারে ধ্বংস হয় কতিপয় ব্যক্তি। অনৈক্যে ধ্বংস হয় একটি দেশ। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সমগ্র উম্মাহ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, মুসলমানগণ পরস্পরের ভাই। আর সে ভ্রাতৃত্বের নমুনা কি এই,দুই ভায়ের মাঝে অনতিক্রম্য প্রাচীর গড়া হবে? সীমান্ত রেখা তো বিভেদেরই প্রাচীর। মহাসাগর অতিক্রমের ন্যায় বিভেদের এ প্রাচীর অতিক্রম করাও দূরুহ। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সে বিভক্তি হলো ভৌগলিক ও রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা। ইসলামে সেটি হারাম। রাষ্ট্রে বিরাজমান অন্যায়ের বিরুদ্ধে নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে, কিন্তু অধিকার নেই মুসলিম ভূগোলকে খন্ডিত করার বা উম্মাহর মাঝে বিভেদ গড়ার। তাই গাধা,ঘোড়া ও উট ছাড়া যখন অন্য কোন যানবাহনই ছিল না, তখনও বহু হাজার মাইলের ব্যবধানে নানা ভাষা ও নানা বর্ণে বিভক্ত মুসলমানরা একতাবদ্ধ থেকেছে। রাজধানি এবং রাষ্ট্রের খলিফা বহু হাজার মাইল দূরে থাকলেও সে কারণে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হয়নি। ফলে মুসলিম ভূমি খন্ডিত হয়নি। মরক্কো, মিশর, লিবিয়া বা আলজেরিয়ার মুসলমানগণ বহু হাজার মাইল দূরের ইস্তাম্বুলের সাথে অখন্ডতা বজায় রেখেছে।

সে দূরত্ব ইসলামাবাদ থেকে ঢাকার দূরত্বের বহুগুণ বেশী। তখন বিমান ছিলনা। যন্ত্রচালিত জাহাজও ছিল না। কিন্তু ছিল প্যান ইসলামিক চেতনা। ছিল ইসলামি উম্মাহর চেতনা। এ চেতনায় নানা ভাষা ও নানা বর্ণের মুসলমানেরা নিজেদের কল্যাণ-চিন্তায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একত্রে কাজ করে। এ চেতনার কারণেই মুসলিম ভূমিকে যখন খন্ডিত করার চেষ্টা হয়, তখন তার বিরোধীতাও হয়। মুসলমান পরাজিত হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রে ঐক্যের পতাকাবাহি ইসলামে অঙ্গিকারপূর্ণ মুসলমান যে বেঁচে আছে সেটি প্রমাণিত হয় ঐক্যবিনাশী কাজের বিরোধীতার মধ্য দিয়ে। ১৯৭১-এ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ইসলামী দলসমূহ বা আলেমগণ পাকিস্তান থেকে এ প্রদেশটির বিচ্ছিন্নতায় সমর্থণ না দেওয়ার কারণ ছিল এমনই কোরআন-নির্ভর চেতনা। ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধার নয়। তাদের সে প্যান-ইসলামিক রাজনীতির মূল্যায়ন আজ যে ভাবেই হোক এবং তাদের বিরুদ্ধে যতই নিক্ষিপ্ত হোক ইসলামি চেতনাশূণ্য ব্যক্তিদের গালিগালাজ, আজ থেকে অর্ধ শত বা শত বছর পর বাংলার মানুষগণ যখন প্যান-ইসলামি চেতনায় উজ্জিবীত হবে তখন সে নতুন প্রজন্মের বহু মানুষ বিস্ময়ে বলবে, জাতীয়তাবাদের প্লাবনে সবাই যখন শিকড়হীন আগাছার ন্যায় ভেসে যায়, আমাদের পূর্ব পুরুষদের অন্ততঃ কিছু লোক তখন মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থ নিয়ে চিন্তা করেছে। ভাষা ও আঞ্চলিকতার উর্দ্ধে উঠে তারা মুসলিম ঐক্যের কথা বলেছে এবং ত্যাগ স্বীকারও করেছে। কাফেরদের অস্ত্র কাঁধে নিয়ে যখন মুসলিম হত্যা ও তৎকালীন বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র ধ্বংসের উৎসব হচ্ছিল, অন্ততঃ কিছু লোক তার বিরোধীতা করেছিল।


মেজর আব্দুল জলিল একজন মুক্তিযুদ্ধা ছিলেন। যে কারণে ইসলামপন্থিগণ একাত্তরে পাকিস্তান ভাঙ্গার পক্ষ নেননি এবং বিরোধীতা করেছেন বাংলাদেশ সৃষ্টির, সেটি তিনি বুঝেছেন বহু বছর পর। দেখা যাক তাঁর সে পরবর্তী উপলব্ধিটা কি ছিল। তিনি লিখেছেন,

“স্বাধীনতার ১৭ বছর পরেও আমার মত একজন সাধারণ লড়াকু মুক্তিযোদ্ধার মনে এ প্রশ্নগুলো নিভৃতে উঁকি-ঝুঁকি মারে এ কারণে যে, ২৫ মার্চ সেই ভয়াল রাতের হিংস্র ছোবলের সাথে সাথেই পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী এবং পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যবর্গ কি করে পাকিস্তানের শত্রু হিসাবে পরিচিত ভারতের মাটিতে আশ্রয় গ্রহণের জন্য ছুটে যেতে পারল? তাহলে কি স্বাধীনতা-বিরোধী বলে পরিচিত ইসলামপন্থি দলগুলোর শঙ্কা এবং অনুমান সত্য ছিল। তাদের শঙ্কা এবং অনুমান সত্য হয়ে থাকলে দেশপ্রেমিক কারা? আমরা মুক্তিযোদ্ধারা না রাজাকার-আলবদর হিসাবে যারা পরিচিত তারা?”- (মেজর (অবঃ) আব্দুল জলিলঃ অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা, পৃষ্ঠা ৭-৮)


অনৈক্য, বিশৃঙ্খলা ও বিভেদ প্রতিদেশেই আযাব ডেকে আনে। পবিত্র কোরআনে আভ্যন্তরীণ গোলাযোগ, বিশৃঙ্খলা ও বিভেদকে বলা হয়েছে ফিতনা। ইসলামে এটি হত্যাকান্ডের চেয়েও জঘন্য অপরাধ। কারণ, হত্যাকান্ডে বেদনাদায়ক মৃত্যূ ঘটে কিছু ব্যক্তির। অনৈক্য বা ফিতনায় মৃত্যু ঘটে একটি দেশের বা মিল্লাতের। এতে প্রচন্ড দুর্বলতা ও বিঘ্নতা সৃষ্টি হয় শত্রুর হামলার মুখে মুসলিম উম্মাহর টিকে থাকা বা বেঁচে থাকার সামর্থে। তখন শত্রুর হাতে বিশাল বিপর্যয় নেমে আসে অগণিত মুসলমানের জীবনে এবং শত শত বছর পিছিয়ে যায় মুসলিম উম্মাহ। ইসলামি আইনে ফিতনা এজন্যই হত্যাযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। অতীতে আভ্যন্তরীণ ফিতনাই বিজয় তুলে দিয়েছিল বর্বর মোঙ্গলদের হাতে। মোঙ্গালদের সে বিজয়ে মৃত্যূ ডেকে এনেছিল লক্ষ লক্ষ মুসলিম নরনারীর। ধ্বংস হয়েছিল বাগদাদ ও দামেস্কসহ অসংখ্য মুসলিম জনপদ। রক্তলাল হয়েছিল দজলা-ফোরাতের পানি। এ ফিতনাই ভারতের বুকে উপর্যপরি বিজয় দিয়েছিল ঔপনিবেশিক ব্রিটিশদের। এবং একাত্তরে সে বিজয় দিয়েছিল ভারতীয়দের। অথচ পাকিস্তান এক সময় কোরিয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। কোরিয়া লাগাতর এগিয়ে গেছে, কিন্তু পাকিস্তান পারেনি। কারণ, আভ্যন্তরীন গোলযোগ তথা ফিতনা। ভাষা, বর্ণ, গোত্র ও মাজহাবের নামে সে ফিতনা আজও অতি প্রবল মুসলিম বিশ্ব জুড়ে। এ ফিতনার কারণে আজও আযাব আসছে নানা ভাবে। পরাজয়, অপমান, শোষণ, নির্যাতন, হত্যা এবং রাজনৈতিক গোলামী হলো তার আলামত। সংখ্যায় বিপুল এবং সম্পদশালী হয়েও মুসলমানেরা আজ শক্তিহীন ও ইজ্জতহীন। বিশ্ব রাজনীতিতে তারা প্রভাবহীন। বিশ কোটির বেশী আরব পরাজিত হচ্ছে অর্ধকোটি ইসরাইলীদের হাতে। কারণ, নানা দেশের নানা ভাষাভাষী ইসরাইলী একতাবদ্ধ হলেও একই ভাষা ও একই ভূখন্ডের আরবগণ তা পারেনি। সেখানেও কাজ করছে গোত্র, ভূগোল, মজহাব ও রাজনৈতিক আদর্শ-ভিত্তিক ফিতনা। বিশেরও বেশী টুকরায় বিভক্ত হলো তাদের ভূমি।


পাঁচ শত বছর পূর্বেও মুসলমানদের এত পতাকা ছিল না। কিন্তু যতই বাড়ছে পতাকা ততই বাড়ছে শক্তিহীনতা। জাতীয় ঝান্ডা পরিণত হয়েছে আল্লাহর বিরুদ্ধে অবাধ্যতার ঝান্ডা তথা অনৈক্যের প্রতীকরূপে। মুসলমান ফিরে গেছে ইসলাম পূর্ব আইয়ামে জাহিলিয়াতের তথা আদিম অজ্ঞতার দিকে। তখন নানা গোত্রে বিভক্ত হয়ে তারা একই যুদ্ধ শত বছর ধরে করতো। নানা বর্ণ ও নানা ভাষায় মানুষ সৃষ্টির মূল লক্ষ্য এ নয় যে, ভাষা বা বর্ণভিত্তিক পরিচয়ে আলাদা আলাদা রাষ্ট্র সৃষ্টি হবে। তা হলে একমাত্র ভারতেই শত রাষ্ট্রের জন্ম হতো। বিচিত্র ভাষা ও বর্ণে মানব সৃষ্টির যে কারণটি পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে তা হলো,একে অপরকে চিনতে সে ভিন্নতা সাহায্য করবে। রাষ্ট্র নির্মাণে অনুপ্রেরণা আসবে মুসলিম উম্মাহর স্বার্থ ও নিরাপত্তাকে সুনিশ্চিত করার লক্ষে। বর্ণ বা ভাষাভিত্তিক ক্ষুদ্রতা থেকে নয়। হিন্দু ধর্মে একতা প্রতিষ্ঠার প্রতি কোন ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই। নেই কোন উম্মাহর ধারণা। বরং আছে জাত-পাতের বিভেদ। অথচ ঐক্য প্রতিষ্ঠায় তারাও অনেক উর্দ্ধে। মুসলমানদের অবস্থান তাদের চেয়ে অনেক নীচে। ফলে মুসলমানদের চেয়ে জনশক্তিতে অর্ধেক হয়েও ভারত আজ বিশ্বশক্তি। অথচ সে সম্মান নেই প্রায় দেড় শত কোটি মুসলমানের। তারা নিহত ও ধর্ষিতা হচ্ছে দেশে দেশে। আবুগারিব ও গোয়ান্তানামোর মত অসংখ্য কারাগার পূর্ণ হচ্ছে তাদের দিয়ে। মুসলমানদের মাঝে ঐক্যের চেতনা যতদিন বেঁচেছিল ততদিন বেঁচে ছিল বৃহৎ ভূগোলও। ফলে শত শত বছর ধরে বেঁচেছিল খেলাফত। তখন ঔপনিবেশিক শক্তিবর্গ তাদের দূর্দান্ত দাপটের দিনগুলিতেও খেলাফতভূক্ত জনপদে হামলা করতে ভয় পেত। অনৈক্য সে শক্তিকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। মুসলিম ভূমিতে অনৈক্য সৃষ্টির সে ঘৃণ্য হারাম কাজটিই সমাধা করেছে স্যেকুলার জাতীয়তাবাদী শক্তিবর্গ। মুসলিম দেশের অভ্যন্তরে এরাই সর্বনাশা কীট। উঁই পোকার ন্যায় তারা ভিতর থেকে নিঃশেষ করেছে প্যান-ইসলামিক চেতনা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে আরব ভূমিতে এরাই বৃটিশবাহিনীকে ডেকে এনেছিল। যেমন বাংলাদেশে এরা ডেকে এনেছিল কাফের বাহিনীকে। এরাই দেশকে তলাহীন ভিক্ষার ঝুড়ি এবং দূর্নীতিতে প্রথম স্থানে পৌছে দিয়েছে। এমন বিশ্বজোড়া অপমান কি একটি দেশের জন্য কম আযাব। এত অপমান নেই যুদ্ধে হেরে যাওয়ায়। কারণ যুদ্ধে হেরে যাওয়ার পিছনে থাকে অর্থনৈতিক, সামরিক ও ভৌগলিক কারণসহ অনেক কারণ। কিন্তু তলাহীন ভিক্ষার ঝুড়ি এবং দূর্নীতি প্রথম স্থানে পৌছার বিষয়টি নিতান্তই নৈতিক। এটি মানুষের নিজস্ব অর্জন। দেশের মানুষগুলো নিজেরা যে কতটা খারাপ সে প্রমাণ মেলে এ থেকে। আগুনে বাড়ী পুড়লে বা ঝড়ে ঘর উড়ে গেলেও তাতে অসম্মান নেই। কিন্তু সমাজে দুর্বৃত্ত বা দূর্নীতিবাজ রূপে পরিচিতি পেলে তাতে চরম ইজ্জতহানী হয়। বাংলাদেশ সৃষ্টির মধ্য দিয়ে মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশীদের মর্যাদাই বা বেড়েছে কতটুকু? বিদেশীদের অস্ত্র নিয়ে যারা ইরাক, ইন্দোনেশিয়া, সূদান বা কোন মুসলিম ভূমিকে খন্ডিত করবে তাদের মর্যাদাই বা মুসলিম বিশ্বে কীরূপ হবে? তাদের সম্মান কি এতে বাড়বে? তখন বরং বেদনায় ক্রন্দন উঠবে বিশ্বের প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের সাথে বাংলাদেশের মুসলমানের আত্মায়ও। আর সে ক্রন্দনটুকুই তো ঈমানের লক্ষণ। যে কোন মুসলমানদের কাছে এমন কাজের নায়কগণ চিত্রিত হবে বিশ্বাসঘাতক বা গাদ্দার রূপে। মুজিব সে পরিচিতিটি পেয়েছে সমগ্র মুসলিম বিশ্ব জুড়ে।


যারা ভারতীয় মুসলমানদের খবর রাখে তারা জানে ১৯৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বরে সে দেশের ঘরে ঘরে কিরূপ মাতম উঠেছিল। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর পর তাই স্বীকৃতি দিয়েছিল ভারত, ভূটান, সোভিয়েত রাশিয়ার মত অমুসলিম দেশ, কোন মুসলিম দেশ নয়। এটি সত্য, পাকিস্তানে বৈষম্য ছিল। অবিচারও ছিল। তবে সে বৈষম্য ও অবিচারের সমাধানও ছিল। ভারতের আসাম বা বিহারের সাথে পাঞ্জাবের বৈষম্য কি কম? কিন্তু তা নিয়ে ঘরে চিহ্ণিত শত্রুকে ডেকে আনা কি কল্যাণকর প্রমাণিত হয়? তাছাড়া গণতন্ত্রের দোহাই? সেটিই বা কতদূর সত্য? পাকিস্তান আমলে যে নির্বাচন শেখ মুজিব নিজে উপভোগ করেছেন তা কি নিজেও জনগণকে দিতে পেরেছেন? তিনি বরং বহুদলীয় গণতন্ত্রকে কবরে পাঠিয়েছিলেন। রুদ্ধ করেছিলেন বাক স্বাধীনতা।তখন আওয়ামী রক্ষিবাহিনীর হাতে নিহত হয়েছিল বহু হাজার রাজনৈতিক কর্মী। ফলে এমন স্বৈরাচারি ও গণতন্ত্র হত্যাকারিকে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জনক বললে প্রকৃত গণতন্ত্রিকে কি বলা হবে? বাংলার মুসলমানদের এভাবে দ্রুত নীচে নামার ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের সৌভাগ্য যে, বৃটিশ শাসনের শেষপ্রান্তে মাওলানা মোহাম্মদ আলী জাওহারের ন্যায় প্যান-ইসলামী চেতনায় সমৃদ্ধ বিপুল সংখ্যক জ্ঞানীর আবির্ভাব ঘটেছিল। উপমহাদেশের মুসলমানদের এটিই রেনেঁসা যুগ। তারা গড়ে তুলেছিলেন শক্তিশালী মিডিয়া এবং ইসলামি সাহিত্য। ফলে তৎকালীন মুসলিম যুবসমাজকে তারা আলোকিত ও আন্দোলিত করতে পেরেছিলেন। তারাই উপমহাদেশে গড়ে তুলেছিলেন ভারতের ইতিহাসে সর্বপ্রথম বৃটিশ বিরোধী গণআন্দোলন। যা পরিচিত পেয়েছিল খেলাফত আন্দোলনরূপে। এবং সেটি করেছিলেন কোনরূপ সংগঠন ছাড়াই। মানুষের মাঝে সেদিন সৃষ্টি হয়েছিল প্রচন্ড প্যানইসলামিক চেতনা। ১৯১১ সাল অবধি ভারতীয় মুসলমানদের সে বুদ্ধিবৃত্তিক কমের্র মূলকেন্দ্র ছিল কোলকাতা। কারণ এ শহরটি তখন ছিল বৃটিশ ভারতের রাজধানী। এখান থেকেই বের হত ইংরেজী, উর্দু ও বাংলা ভাষায় ইসলামি চেতনা সমৃদ্ধ নানা পত্র-পত্রিকা যা পেশোয়ার থেকে চট্রগ্রাম পর্যন্ত প্রচারিত হতো। বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রিয়াকর্মের এ ব্যাপক জোয়ার তখন সবচেয়ে অধিক আন্দোলিত হয়েছিল বাংলার শিক্ষিত মুসলিম সম্প্রদায়। তারই ফল হলো, বাংলাতে প্রতিষ্ঠা পেল সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ। মুসলমানদের কল্যাণ চিন্তায় তখন বাংলার নানা শহরে অনুষ্ঠিত হতো প্রতিবছর শিক্ষা, সংস্কৃতি ও রাজনীতি বিষয়ক নানা সন্মেলন। বাংলার গ্রামেগঞ্জে এভাবে ব্যাপ্তি পেয়েছিল প্যানইসলামি চেতনা। ফলে বাংলার মুসলমানগণ ১৯৪৭য়ে স্বেচ্ছায় শুধু পাকিস্তানভূক্তই হয়নি বরং সে লক্ষে সমগ্র ভারতে নেতৃত্বও দিয়েছে। মুসলিম লীগের ঐতিহাসিক লাহোর সম্মেলনে পাকিস্তান প্রস্তাবের উপস্থাপনা করেছিলেন বাংলার ফজলূল হক। কিন্তু ১৯৪৭এর পর বন্ধ হয়ে যায় কোলকাতা কেন্দ্রীক সে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা শহরে সে কাজটি সে ভাবে শুরুই হয়নি।


কোন জাতি নিছক পানাহারে বাঁচে না। দেহের খোরাকের সাথে মনের খোরাকও অপরিহার্য। দেহের পুষ্টি জোগাতে যেমন লক্ষ লক্ষ টন খাদ্য শস্য লাগে তেমনি মনে স্বাস্থ্য বাঁচাতে লাগে লক্ষ লক্ষ বই, লাইব্রেরী, পত্র-পত্রিকা ও জ্ঞানবান ব্যক্তি। ইসলামে জ্ঞানার্জনকে এজন্যই নামায রোযার আগে ফরয করা হযেছে। কিন্তু তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে ছিল দুটিরই দারুন অভাব। নিছক ভাতে-মাছে ঈমান বাঁচে না, তেমনি পুষ্টি পায় না প্যান-ইসলামিক চেতনা। অথচ এটিই ছিল পাকিস্তানের লাইফ লাইন বা প্রাণ। ফলে অতি দ্রুত তা দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকে। পানাহারের ন্যায় মুসলমানের মানসিক পুষ্টির খোরাকও অমুসলিম থেকে ভিন্নতর। এজন্যই সেকুলার সাহিত্যে মুসলমানের ঈমান পুষ্টি পায় না। বাংলার মুসলিম মানস তাই পুষ্টি পায়নি বেদ, উপনিষদ, ভগবতগীতা ভিত্তিক রবীন্দ্র, বঙ্কিম ও অন্যান্য হিন্দু সাহিত্য থেকে। বরং এ হিন্দু সাহিত্য মুসলমানের ঈমানের ভীতই ধ্বসিয়ে দিয়েছে। তাই সহজেই মারা পড়েছে প্যান-ইসলামিজম। রাষ্ট্রভাষার কাজ শুধু এই নয় যে, চিঠিপত্র, কথাবার্তা, সাইনবোর্ড বা দলিল লেখার কাজে সেটি ব্যবহৃত হবে। বরং মানসিক পুষ্টি জোগানোর ন্যায় অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ কাজটিকেও সে ভাষায় রচিত সাহিত্যকে জোগাতে হয়। মোকসেদুল মোমেনিন, নেয়ামূল কোরআন, বেহশতি জেওর, বিষাদ সিন্ধূ বা কিছু পুঁথি সাহিত্য দিয়ে সে পুষ্টি মেলে না। আর ভাষার ঐশ্বর্য বাড়তে লাগে শত শত বছর। নিছক তরজমা দিয়ে সে কাজ চলে না। ২৩ বছরের পাকিস্তানী আমলে যে প্রচেষ্ঠা হয়েছে তা দিয়ে বাংলা ভাষার দৈন্যতা পূরণ সম্ভব হয়নি। ভাষার জীবনে এ সময়টি অতি ক্ষুদ্র সময়। কিন্তু মানুষ তো খাদ্যের অপেক্ষায় বসে থাকে না। সুখাদ্য না পেলে তখন সে অখাদ্য ও দুষিত খাদ্যের দিকে ঝুঁকে। গ্রামে গঞ্জে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠার ফলে বিপুলভাবে বাড়ছিল নতুন শিক্ষিত সম্প্রদায়। তখন পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষুধার্ত নতুন প্রজন্ম ছুটেছে হিন্দু, সেকুলার ও মার্কসীয় সাহিত্যের দিকে। তখন সীমান্ত দিয়ে বাধভাঙ্গা প্লাবনের পানির ন্যায় এগুলি ঢুকছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। ফলে চেতনায় বেড়ে উঠে ভয়ানক অসুস্থ্যতা। এতে মহামারি লাগে মুসলিম যুবকদের ঈমানী চেতনায়। সেকুলারিজম, জাতীয়তাবাদ ও সমাজতন্ত্রে দীক্ষা নেওয়া তখন যুবকদের জন্য ফ্যাশানে পরিণত হয়। আর ইসলামের পক্ষ নেওয়া পরিণত হয় কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়ীকতা রূপে। বাঙ্গালী মুসলমানদের জীবনে ভয়ংকর আত্মঘাতের শুরু মূলতঃ তখন থেকেই। যে কোন জাতির জন্য এ এক হৃদয়বিদারক অবস্থা। সমগ্র মুসলিম বিশ্বের আর কোন ভাষাভাষীর জীবনে নানা মতবাদের বানে ভাসা এমন দুরাবস্থা সৃষ্টি হয়নি। এমন একটা অবস্থা এড়াতে পাঞ্জাবী, সিন্ধি,বেলুচ ও পাঠানসহ উপমহাদেশের অন্য ভাষাভাষি মুসলমানেরা সমৃদ্ধ উর্দুভাষার সাহায্য নিয়েছে।‌ তাদের দুরদৃষ্টি এখানে প্রচন্ড কাজ দিয়েছে। কিন্তু বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবীদের ভিত্তিহীন অহংকার সে কাজেও প্রচন্ড বাধা দিয়েছে।


উর্দু ভাষার সৌভাগ্য হলো, সে ভাষায় বিস্তর ইসলামি সাহিত্য গড়ে উঠেছিল বিগত কয়েক শত বছর ধরে। আরব ও ইরানীদের দূর্দিনে এক সময় জ্ঞানচর্চা ভারতে উঠে এসেছিল। সে সময় সমৃদ্ধি এসেছিল উর্দু সাহিত্য। সে সমৃদ্ধি এসেছিল উপমহাদেশের নানা ভাষাভাষী মুসলমানদের সম্মিলিত উদ্যোগে। তাই সমৃদ্ধিতে এ ভাষাটি আরবী ও ফারসীর সমকক্ষ। এ ভাষাটি পেয়েছে বেশ কিছু উচ্চ শিক্ষিত বিশ্বমানের দার্শনিক কবি, লেখক ও সাহিত্যিক। আল্লামা ইকবাল, হালী, গালিব, শিবলী নোমানী তাদেরই কয়েকজন। বাংলা সাহিত্যে সে মাপের একজনও ছিল না। তারা শুধু লক্ষ লক্ষ মুসলমানের মনের ভুগোলই পাল্টে দেননি, পাল্টে দিয়েছেন ভারতের বিশাল রাজনৈতিক ভূগোলও। এসব প্রতিভাবান কবি সাহিত্যিকদের অনেকেই নিজেদের মাতৃভাষাকে বাদ দিয়ে সমৃদ্ধ করেছিলেন উর্দূকে। উর্দু এভাবেই পরিণত হয়েছিল উপমহাদেশের শিক্ষিত মুসলমানদের সাধারণ ভাষায়। এমন একটি শক্তিশালী উর্দূ সাহিত্যের কারণেই পাকিস্তান সুসংহত হয় পশ্চিম পাকিস্তানে। সে অঞ্চলের মুসলিম যুবকদের তাই মনের ক্ষুধা মেটাতে আবর্জনায় হাত দিতে হয়নি। কিন্ত ঢাকাকেন্দ্রীক বুদ্ধিবৃত্তির মূল খেলোয়াড় ছিল রাশিয়া, চীন ও ভারত থেকে দীক্ষাপ্রাপ্ত বামপন্থি ও সেকুলার বুদ্ধিজীবীগণ। তাদের অধিকাংশ ছিল হয় নাস্তিক সমাজতান্ত্রিক অথবা ধর্মে অঙ্গিঁকারশূণ্য নাম সর্বস্ব মুসলমান। অনেকেই ছিল হিন্দু। সে আমলে এরা ছিল মার্কসবাদ, লেলিনবাদ, মাওবাদসহ নানা আবর্জনার ফেরিওয়ালা। এদের দখলে চলে যায় দেশের মিডিয়া, শিক্ষা-সাহিত্য ও রাজনীতি। ফলে ভিতরে বসে এরা প্যান-ইসলামের শিকড় কাটতে থাকে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে শুরু হয় ভাষাভিত্তিক সেকুলার সাহিত্যের জোয়ার। সে জোয়ার বহুলাংশেই ভাসিয়ে নেয় ১৯৪৭-পূর্ববর্তী প্যান-ইসলামী চেতনা। ফলে দ্রুত দূষণ ঘটতে থাকে মুসলিম চেতনায়। ফলে যারা ১৯৪৬ ও ৪৭-এ “লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান” ধ্বণিতে কোলকাতাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরের রাজপথে যুদ্ধে নেমেছিল তাদেরই বিরাট অংশ পাকিস্তানের বিনাশে নামে। এমনকি ভারতের সাথে সূর মিলিয়ে পাকিস্তানের সৃষ্টিকে এক অনাসৃষ্টি এবং উপমহাদেশের জন্য অশান্তির মূল কারণ রূপে অভিহিত করতে থাকে। ভুলে যায় পাকিস্তানের সৃষ্টির ফলে তাদের নিজেদের এবং উপমহাদেশের মুসলমানদের যে অসাধারণ কল্যাণ হয়েছে সে সত্যটিও।


ভারতের মুসলিম জনসংখ্যার চেয়ে কম মুসলমানের বাস বাংলাদেশে। অথচ মুসলমানের যে সম্পদ একমাত্র ঢাকা শহরে জমা হয়েছে তা সমগ্র ভারতীয় মুসলমানদের নাই। যত জন মুসলমান ডাক্তার, প্রকৌশলী, অধ্যাপক বা ব্যবসায়ী ঢাকা শহরে বাস করে তা নেই তাদের। পশ্চিম পাকিস্তানে যা অর্জিত হয়েছে সে হিসাব তো বাদই রইলো। অথচ পাকিস্তান আজ আণবিক অস্ত্রধারী দেশ। পাকিস্তান সৃষ্টির এ সুফলগুলোকে কি অস্বীকার করা যায়? সমাজতন্ত্র আজ মৃত। স্থান নিয়েছে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে। কিন্তু মরণের পূর্বে এ মতবাদের অনুসারিরা সর্বনাশা প্রভাব ফেলে গেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি, বুদ্ধিবৃত্তি ও ভূগোলে। এদের কারণে সামরিক যুদ্ধে পরাজয়ের আগেই পাকিস্তান পরাজিত হয়েছিল সংস্কৃতি, রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তির ময়দানে। ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে আজও যে নির্মূলের হুংকার,সে প্রেক্ষাপট নির্মিত হয়েছিল সে আমলেই। আজও স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ নিয়ে যে বিবাদ তার স্র্‌ষ্টা ও পৃষ্ঠপোষক মূলতঃ তারাই। কোলকাতা কেন্দ্রীক যে বুদ্ধিজীবীদেরকে নীরদ চন্দ্র চৌধুরী বহুকাল আগেই আত্মঘাতি বলে আখ্যায়ীত করেছিলেন।- (সুত্রঃ তাঁর রচিত বই-আত্মঘাতি বাঙ্গালী)। নীরদ বাবুর অভিযোগ, উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাংলায় (হিন্দুদের) যে রেঁনেসাঁ শুরু হয়েছিল সেটি হত্যা করেছিল কোলকাতা কেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবীরা। অবশেষে তাদেরই অনুসারিদের দখলে চলে যায় ঢাকার বুদ্ধিবৃত্তির অঙ্গন। ফলে বাংলার মুসলমানদের যে জাগরণ শুরু হয়েছিল বিংশ শতাব্দীর শুরুতে,সেটিও আত্মহননের শিকার হয় এ আত্মঘাতি বুদ্ধিজীবীদের হাতে। ফলে ঢাকায় মুসলিম লীগ গঠন ও পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা দিয়ে তারা যে কাজের শুরু করেছিলের সেটি এ বুদ্ধিজীবীদের কারণে সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। মুসলিম লীগ পত্রিকা বের করেছে, কিন্তু সেগুলি পরিকল্পিত ভাবে দখলে নিয়েছে বামপন্থিরা। তারাই আজ আরেক আত্মহনের দিকে ধাবিত করতে চায় বাংলাদেশকে। একাত্তরের হাতিয়ারকে আবার গর্জে উঠার যে বার বার আহবান জানাচ্ছে সেটি তো এমনি এক আত্মঘাতি লক্ষ্যে। ৭১এ তারা বিনাশ করেছিল পাকিস্তানের, এবার বিনাশ করতে চায় বাংলাদেশকে। ইসলাম ও মুসলমানের বিরুদ্ধে সর্বশেষ লড়াইটি তারা এভাবেই শেষ করতে চায়। এবং সেটি হলে একটি গৃহযুদ্ধই অনিবার্য হয়ে উঠবে। তেমন একটি গৃহযুদ্ধ শুরু হলে সেটি যে একাত্তরের ন্যায় নয় মাসে শেষ হবে না সেটি সুনিশ্চিত। চলবে বহু কাল ব্যাপী। যেমনটি আলজেরিয়ায় ও আফগানিস্তানে চলছে।


কথা হলো, একটি গৃহযুদ্ধ যে কত ভয়াবহ সে খবর কি তাদের আছে? যুদ্ধবিগ্রহ যে কতটা ভয়ানব সে খবর নাই বলেই একাত্তরের যুদ্ধকে তারা অনিবার্য করে তুলেছিল। এখন আবার এক প্রকান্ড রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের দিকে দেশকে ধাবিত করতে চায়। অবিরাম গৃহযুদ্ধে আলজেরিয়ায় দেড় লাখেরও বেশী মানুষ নিহত হয়েছে। দেশছাড়া হয়েছে বহু লক্ষ। অথচ এখনও সেটি থামছে না। বাংলাদেশে কি তারা সেটিই চায়? তবে বাংলাদেশের বিপদের আশংকা শুধু এ বিভ্রান্ত সেকুলার বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে নয়। বিপদের আরো কারণ, ইসলামের লেবাসে যারা রাজনীতিতে নেমেছে তাদের নিয়ে। তার এখন আদর্শিক আত্মসমর্পনের পথে।বলছেন, তারা এবং তাদের কেউ বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধী ছিল না।অথচ সত্য হল,এদেরই অনেকে একাত্তরে অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষে লড়েছেন,তাদের পরিবার বা দলের বহু হাজার মানুষ মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহতও হয়েছেন। অথচ সে ভূমিকাকে তারা আজ অস্বীকার করছেন। তাদের উচিত ছিল,পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ার দার্শনিক বা তত্ত্বগত বিষয়টিকে মানুষের সামনে তুলে ধরা। পুরোন অতীত নিয়ে এমন একটি তত্ত্বগত বা একাডেমিক আলোচনা বাংলাদেশের আইন বা শাসতন্ত্রের বিরোধীও নয়। এতটুকু সাহস না থাকলে তারা রাজনীতি করবেন কোন সাহস নিয়ে? তাদের বোঝা উচিত,ভেড়া জন্মায় ও বেড়ে উঠে কসাইয়ের ছুরির নীচে যাওয়ার জন্য। তেমনি ভীরুও বেড়ে উঠে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হওয়ার জন্য। ইতিহাসে ভীরুদের জন্য কোন স্থান নেই। তাছাড়া তারা মুখ না খুললেই শত্রুপক্ষের বিরোধীতা দূর হবে, সেটিও ঠিক নয়। ইসলামবিরোধীদের সাথে ইসলামী পক্ষের শত্রুতা চিরকালের। আলজেরিয়ার মোজাহিদগণ সে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সেকুলারদের চেয়ে অধিক রক্ত দিয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতালাভের সাথে সাথে সেকুলাররা তাদের রাজনীতিকেই নিষিদ্ধ করেছে। একই অবস্থা ঘটেছে তুরস্ক, তিউনিসিয়া, মিশর, লিবিয়া, সিরিয়াসহ আরো অনেক দেশে। ফলে সেকুলারদের কাছে ইসলামি চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তির গ্রহনযোগ্য হওয়ার কোন পথ নেই। রাস্তা মাত্র দুইটি। হয় ঈমান-আক্বিদা দূরে ছূঁড়ে ফেলে পূর্ণ আত্মসমর্পণ, অথবা সাহসিকতার সাথে ঈমান যে আছে সে সাক্ষ্য দেওয়া। আল্লাহতায়ালা তো তার বান্দাহ থেকে সে সাহসিকতাপূর্ণ কোরবানিটুকুই দেখতে চান। যেমন হযরত ইব্রাহীম (আঃ) নমরুদের ন্যায় প্রবলতম শত্রুপক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে জোর গলায় বলেছিলেন,

“..আমরা তোমাদেরকে মানি না। সৃষ্টি হলো তোমাদের ও আমাদের মধ্যে চিরকালের শত্রুতা ও বিদ্বেষ।.. হে আমাদের প্রতিপালক! আমারা তো আপনার উপরই নির্ভর করছি।”-(সুরা মুমতাহিনা,আয়াত ৪)


সে আমলে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)এর কোনরূপ সামরিক বা রাজনৈতিক বল ছিল না। ছিল ঈমানের বল। তিনি নির্ভর করেছিলেন মহান আল্লাহর উপর। বিপক্ষের মন জুগিয়ে কথা বলেননি,বরং সত্য কথাগুলো বলেছেন অকুতোভয়ে। চিরকালের শত্রুতার কথা ঘোষণা করেছেন শত্রুপক্ষের মুখের সামনে। তাঁর সে সাহসী ভূমিকায় আল্লাহতায়ালা এতই খুশি হয়েছিলেন যে পবিত্র কোরআনে তার সে সংলাপকে চিরকালের জন্য সংকলিত করে রেখেছেন, যাতে ইতিহাসের এ মহান শিক্ষক থেকে মানব জাতি কিয়ামত অবধি শিক্ষা নিতে পারে। আল্লাহপাকের সাহায্য তো এভাবেই আসে। ইসলামের বিজয়ের এ ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। সত্য গোপন করে বা শত্রুকে ভয় করলে কখনই আল্লাহর সাহায্য আসে না,আসে আযাব। ভয় করতে হবে একমাত্র মহান আল্লাহকে। অথচ সত্য গোপন করাই বাংলাদেশে রাজনীতির হিকমতে পরিণত হয়েছে। ভীরুরা পরিচয় পাচ্ছে বুদ্ধিমান রূপে। এটিই একটি জাতির বড় চরিত্রহীনতা। এমন জাতি দূর্নীতিতে বিশ্বে প্রথম হবে সেটিই কি নয়? সত্যপন্থিদের পরাজয় দোষের নয়,অপমানেরও নয়। হযরত ইব্রাহীম (আঃ), হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর মত নবীগণও দেশান্তরিতও হয়েছেন। ওহুদের ময়দানে নবীজী (সাঃ) নিজে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিলেন।কিন্তু সবচেয়ে বিপদজনক হলো সত্য থেকে বিচ্যুতি। একাত্তরে যে বিষয়টিকে সত্য জেনে বাংলাদেশের সকল ইসলামপন্থি দল ও ব্যক্তিত্ব পাকিস্তানের পক্ষ নিলেন এবং অনেকে প্রাণও দিলেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর সেগুলো মিথ্যা হয় কি করে? সে মৃত ব্যক্তিদের আত্মাই বা তাদেরকে কি ভাববে? সে সত্যকে গোপন করা কি যথার্থ? বাহাদুরী তো দেশ গড়াতে বা দেশের ভূগোল বৃদ্ধিতে, ভাঙ্গাতে নয়। তাছাড়া ১২০০ মাইলের শত্রু ভূমি দ্বারা বিভক্ত পাকিস্তানের মত একটি দেশ ভাঙ্গা কি এতই কঠিন ছিল? তাছাড়া ঐতিহাসিক সত্য হল, কোন মুসলিম দেশ ভাঙ্গাতে মুসলমানের আদৌ মেহনতের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন নেই একটি তীর ছোঁড়ারও। মুসলিম রাষ্ট্র ভাঙ্গার সে কাজটি ইসলামের বিপক্ষ শক্তিবর্গ নিজ অর্থ, নিজ মেধা, নিজ শক্তি ও নিজ রক্ত ব্যয়ে করে। তারা রাজি মুসলিম দেশ ভাঙ্গার লক্ষ্যে প্রকান্ড যুদ্ধ লড়তেও। এরই প্রমাণ হল, অখন্ড আরব ভূখন্ড ভেঙ্গে বিশেরও বেশী রাষ্ট্রগড়ায় আরবদের রাজপথে সংগ্রাম করতে হয়নি। কোন যুদ্ধও লড়তে হয়নি। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ নিজ খরচে সেটি করে দিয়েছে। কায়রোর এক চায়ের টেবিলে কলমের খোঁচায় চার্চিল জর্দান নামক একটি রাষ্ট্রের জন্ম দেয়। (পিটার ম্যান্সফিল্ড, ১৯৮৫) তাদের ঘাড়ে দায়িত্ব দিয়েছে শুধু সে খন্ডিত মানচিত্রকে পাহারা দেওয়ার। যাতে আবার খন্ডিত টুকরোগুলো জোড়া লেগে বৃহৎ কোন মুসলিম রাষ্ট্রের জন্ম না হয়। সে পাহারাদারির কাজে কমতি হলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিবর্গ বার বার যুদ্ধ লড়তে রাজী। মধ্যপ্রাচ্যের নানা দেশে মার্কিন ও বৃটিশ বাহিনীর ঘাঁটি গেড়ে বসার মূল কারণতো এটি। কারণ এর মধ্যে রয়েছে ইসরাইলের নিরাপত্তা এবং সে সাথে তেল সম্পদের অবাধ লুন্ঠনের বিষয়। তাদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ ছিল আরবদের খন্ডিত মানচিত্রের সংরক্ষণ।


একই কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য শেখ মুজিবকে কোনরূপ আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে হয়নি। কোন দলীয় সম্মেলন ডেকে প্রস্তাবনাও পাশ করতে হয়নি। মাঠে ময়দানে সে জন্য জনমত সংগ্রহেও নামতে হয়নি। ভারত নিজ অর্থ ও রক্ত-খরচে সেটি করে দিয়েছে। ফলে সেটি নয় মাসেই সম্ভব হয়েছে। অথচ ১৯৭১এর ৩রা ডিসেম্বরে পাকিস্তানের ভূমিতে ভারতীয় বাহিনীর সর্বাত্মক আগ্রাসনের পূর্বে মুক্তিবাহিনী সমগ্র বাংলাদেশ দূরে থাক,একটি জেলা শহর বা কোন থানা শহরকেও মুক্ত করতে পেরেছিল? বরং সেটি করে দিয়েছে ভারতীয় বাহিনী। আওয়ামী লীগের নেতাগণ ভারতীয় আশ্রয় থেকে হেলিকপ্টার যোগে এসে মন্ত্রীত্বের আসনে বসেছেন। অথচ বহু বছর ধরে বহু সংগ্রাম করতে হয়েছে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার জন্য। অমুসলিম সরকার পাকিস্তাতনের প্রতিষ্ঠায় সমর্থণ দেয়নি, একটি তীরও ছুড়েনি। কোলকাতার মত বহু শহরে রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ একাকী যুদ্ধ লড়তে হয়েছে মুসলমানদের। মুসলিম লীগের বহু লক্ষ কর্মীকে গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে ঘুরে মানুষকে পাকিস্তানের অপরিহার্যতা বোঝাতে হয়েছে। বহু প্রচারপত্র ও বহু বই লিখতে হয়েছে। বিষয়টিকে নির্বাচনী ইস্যু বানিয়ে এ জন্য ভোটযুদ্ধে নামতে হয়েছে। এবং সে যুদ্ধে জিততেও হয়েছে। অথচ নয় মাস পূর্বে অনুষ্ঠিত ৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ শত শত মিটিং মিছিল করেছে, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের কথা মুখে আনেনি। এ ইস্যুতে কোন নির্বাচনী যুদ্ধ লড়েনি। পাকিস্তান আন্দোলনের ন্যায় তাদের কোন গণসংযোগ আন্দোলনও করতে হয়নি। এমনকি ২৫শে মার্চেও সে কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয়নি। অথচ পাকিস্তান থেকে ফিরে ১৯৭২‌ এর ১০ই জানুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্দ্যানের জনসভায় শেখ মুজিব জোর গলায় বললেন,

“স্বাধীনতা সংগ্রামের শুরু একাত্তর থেকে নয়, শুরু করেছিলাম সাতচল্লিশ থেকে।”

অর্থাৎ পাকিস্তান ভাঙ্গার আসল উদ্দেশ্যটি সযত্নে গোপন রেখে তিনি রাজনীতি করেছেন। অর্থাৎ রাজনীতি করেছেন মুখোশ পড়ে। মুখে এক কথা আর মনে ছিল আরেক কথা। মুখোশ পড়ে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন,কোরআনের কসম খেয়ে পাকিস্তান রক্ষার শপথ নিয়েছেন,পাকিস্তান জিন্দাবাদ ধ্বনি দিয়েছেন এবং পাকিস্তানের ঝান্ডা উড়িয়ে সরকারি গাড়িতেও চড়েছেন। এসবই ছিল সাধারণ মানুষকে ধোকা দেওয়ার জন্য। ১৯৬৮ সালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তার বিরুদ্ধে ভারতের সাথে পাকিস্তান ভাঙ্গার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু আদালতে তিনি সেটি অস্বীকার করেছিলেন। সে মামলাকে মিথ্যা বলে কারামুক্তির দাবীও তুলেছিলেন। পাকিস্তানের বিখ্যাত আইনবিদ এবং সাবেক আইন মন্ত্রী জনাব এ, কে, ব্রোহীকে উকিল হিসেবে লাগিয়েছিলেন আগরতলা মামলা যে মিথ্যা সেটি প্রমাণ করার জন্য। ফলে প্রশ্ন উঠে,একাত্তরের যুদ্ধের জন্য কে দায়ী? বিপুল প্রাণনাশ ও সম্পদহানীর জন্যই বা কে দায়ী? সর্বসাধারণকে তিনি তার মনের গোপন কথাটি কেন নির্বাচনকালে বললেন না? গণতান্ত্রিক রাজনীতির এটিই কি মূলনীতি নয়? সেটি বললে হয়তো তিনি নিজে জেলে যেতেন, কিন্তু দেশবাসী তো বাঁচতো ভয়ানক যুদ্ধ থেকে।


যুদ্ধ সবসময়ই আত্মঘাতি, যুদ্ধে নামলে নিজ পিতা বা ভাইকেও কেউ ছাড়ে না। ইতিহাসের বহু যুদ্ধে বহু পিতা ও বহু ভাই নিহত হয়েছেন আপন পুত্র ও আপন ভাইয়ের হাতে। সাহাবাদের হাতে সাহাবা নিহত হয়েছেন। ১৯৪৭ থেকে শেখ মুজিব কি সংগোপনে ভারতীয়দের সাথে নিয়ে এমন একটি ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন যা তিনি ১৯৭২এর জানুয়ারিতে এসে বললেন? তিনি কি জানতেন না,পাকিস্তান ভাঙ্গার এমন চেষ্টা হলে যুদ্ধ অনিবার্য। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লক্ষ্য হলে সে ইস্যুতে ১৯৭০এর নির্বাচন-জয় জরুরী ছিল। পাকিস্তানের জনগণ ও সেনাবাহিনী তখন সেটিকে গণরায় রূপে বুঝতে পারতো। জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে নির্বাচনে রায় দিলে তখন সবাই সেটি মেনে নিত। ফলে সৃষ্টি হতো না একাত্তর-পরবর্তী স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের বিবাদ। যেমনটি হয়নি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকালে। দেশ বেঁচে যেত ভয়াবহ রক্তক্ষয় থেকে। পাকিস্তান বাঁচানোর ওয়াদা দিয়ে নির্বাচন জিতে ভারতীয় অস্ত্র হাতে যুদ্ধ শুরু করলে অনেকেই যে সেটিকে গাদ্দারি বলবে তা নিয়ে কি কোন সন্দেহ ছিল? পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দেশভাঙ্গার এমন প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ করবে সেটি কি শেখ মুজিবের অজানা ছিল? তিনি কি জানতেন না যে পাকিস্তান ভাঙ্গার এমন মুহুর্তে সেদেশের সেনাবাহিনী নিশ্চয়ই ডুগডুগি বাজাবে না? যে কোন মুসলিম সৈনিক দেশের এমন ক্রান্তিলগ্নে যুদ্ধের জন্য কোরআন হাতে নিয়ে শপথ নেয়। নিজ দেশের ঐক্য ও অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার এমন মুহুর্তে যে কোন নীরবতা বা পিছুটান দেওয়াকে দেশপ্রেমিক সৈনিক মাত্রই গাদ্দারি ভাবে। শেখ মুজিব না হয় সে কসমের কথা বেমালুম ভূলে যেতে পারেন,কিন্তু সবাই কি তা পারেন? একটি দেশের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলে অবস্থা যে কতটা রক্তাক্ষয়ী হতে সে হুশ কি মুজিবের ছিল? এমন কি নিরোদ চন্দ্র চৌধুরির মত ভারতীয় বুদ্ধিজীবীও এমন উদ্দ্যোগ যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনে ভয়ানক বিপদ ডেকে আনবে সে হুশিয়ারি বার বার দিয়েছিলেন। কোলকাতা থেকে প্রকাশিত হিন্দুস্তান স্টান্ডার্ড পত্রিকায় তার সে নিবন্ধগুলো সে সময় ছাপাও হয়েছে। নিরোদ চৌধূরীর অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগের নেতাদের ইতিহাস জ্ঞান নেই। সামরিক অভিযান কাকে বলে এবং সেটি কত ভয়ানক সেটি উত্তর-ভারতীয়রা বার বার দেখেছে। কারণ সেপাহী বিদ্রোহসহ বৃটিশ বিরোধী নানা বিদ্রোহ সেখানে হয়েছে। বৃটিশ বাহিনীর পদভারে সেখানকার জনপদগুলি বার বার প্রকম্পিত হয়েছে। বহু হাজার মানুষকে বৃটিশ বাহিনী হত্যা করেছে। লাঠির মাথায় লাশ ঝুলিয়ে সেগুলিকে পঁচে পঁচে নিঃশেষ হতে দিয়েছে। অথচ সে যুদ্ধগুলো ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ন্যায্য স্বাধীনতা যুদ্ধ। অথচ বাংলাদেশে সে রূপ অভিযান পূর্বে হয়নি। গ্রামে-গঞ্জে কোন কালে মিলিটারি ঢুকেনি। ফলে এসব নেতারা কখনও দেখেনি সামরিক অভিযান বলতে কি বুঝায়। না জানার কারণেই তারা একাত্তরে একটি সেনাবাহিনীকে গ্রামে-গঞ্জে ডেকে আনে।


একাত্তরে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতেছিল। কিন্তু সেটি পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে গণরায় ছিল না। নির্বাচন হয়েছিল সংবিধানিক ইস্যু নিয়ে। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের উপর অর্পিত দায়িত্ব ছিল পাকিস্তানের জন্য একটি সংবিধান তৈরী করা, দেশ বিভাজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। শেখ মুজিব যে লেগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্কে দস্তখত করে ৭০-এর নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তার শর্ত্ব ছিল নির্বাচনের পর নির্বাচিত সদস্যদের প্রথম কাজ হবে দেশের জন্য নতুন শাসনতন্ত্র তৈরী করা। শাসনতন্ত্র রচিত হওয়ার পর তারা পাবে শাসনক্ষমতা। কিন্তু শেখ মুজিব বিশ্বাসঘাতকতা করেছে নিজের স্বাক্ষরিত দলিলের সাথে। তার দলের নির্বাচনকে ঘোষণা করে বাঙালীর স্বাধীনতার পক্ষে রায় রূপে। অথচ তার দলের নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে কোথাও স্বাধীনতার কথা তুলে ধরা হয় নি। জনগণকে সে বিষয়ে ওয়াদাও দেওয়া হয়নি। তাছাড়া কোন দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সংখ্যালঘুদের থেকে আলাদা হয় না। আলাদা হয় হওয়ার দাবী তোলে তারা যারা সংখ্যালঘু। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আলাদা হওয়াটি ছিল তাই ইতিহাসের রীতি বিরুদ্ধ। তাছাড়া নির্বাচনে বিজয়ই বড় কথা নয়। হিটলারের সৃষ্টি হয়েছিল নির্বাচনের মধ্য দিয়েই। নির্বাচনের উপর প্রভাব ফেলে বহু বিষয়। ফলে ফলাফল ভিন্নতর হয় প্রায় প্রতিবছর। আওয়ামী লীগ তাই ১৯৭০ জিতলেও এখন বার বার হারছে। তাই নির্বাচিতদের উপর দেশের ভূগোল পাল্টানোর দায়িত্ব দিলে তাতে সমূহ বিপদ আছে। এ বিষয়ে মুসলমানের কাছে অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হলো কোরআনের নির্দেশ। পার্লামেন্টের শতকরা ১০০ ভাগ সদস্যও ভোট দিয়ে মদ্যপান, পতিতাবৃত্তি ও সূদের ন্যায় পাপকে হালাল করতে পারে না। তেমনি হালালরূপে ঘোষণা দিতে পারে না একটি মুসলিম দেশের বিভক্তিকেও। একজন ভারতীয় হিন্দুর কাছে তার দেশের সংহতির সুরক্ষা যেখানে রাজনীতি, মুসলমানের কাছে সেটি ইবাদত। দেশের বিভক্তি ও বিচ্ছন্নতা সেখানে হারাম। ফলে নির্বাচিত পার্লামেন্ট সদস্য হয়েও সে পারে না দেশকে বিক্রয় করে দিতে। জনগণ কোন নির্বাচিত দলকে বা সে দলের সদস্যকে এ অধিকার দেয় না। আওয়ামী লীগকে দেয়নি একাত্তরেও। এমনকি আওয়ামী লীগ জনগণ থেকে সে লক্ষ্যে ভোটও চায়নি। মুসলমানের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য সংসদের সিদ্ধান্তকে তাই কোরআন-হাদিস ও ইসলামি মূল্যবোধ সম্মত হওয়াটিও পূর্বশর্ত। নইলে মুসলমান সেটি মানবে কেন? সে জন্য তাদের পিছনে যুদ্ধই বা লড়বে কেন? বরং এমন আত্মঘাতি পদক্ষেপের জন্য নির্বাচিত সরকারের সাথেও মুসলমানের লড়াই যে অনিবার্য তা নিয়ে সন্দেহ আছে কি? মুসলিম দেশে অসংখ্য সূদী ব্যংক,অগণিত পতিতাপল্লী ও মদের দোকানের অর্থ এই নয় যে সেগুলি হালাল বা বৈধ। তেমনি মুসলিম বিশ্বের বহুধা বিভক্ত খন্ডিত মানচিত্র দেখে কি বলা যায় এটিও কল্যাণকর ও ইসলাম-সম্মত? বস্তুতঃ বাংলাদেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে ভারতের আগ্রহটিই ছিল মূল। শেখ মুজিব ব্যবহৃত হয়েছেন দাবার গুটি হিসাবে। প্রকৃত নেতারা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জনগণকে সাথে নেয়, অথচ তিনি সাথে নিয়েছেন ভারতীয়দের। নিজের মনের কথাটি তাই তিনি জনগণকে না বলে বলেছিলেন দিল্লির নেতাদের। এবং সেটি সাতচল্লিশেই। বাংলাদেশীদের বলেছিলেন ১৯৭২এর ১০ই জানুয়ারিতে। তার লক্ষ্য ছিল ভারতীয়দের হাতে সোনার ফসল তুলে দেওয়া। এবং দিয়েছিলেনও। এতে ভারতের লাভ হয়েছে নানা ভাবে।

এক. পাকিস্তান ভাঙ্গায় তাদের প্রধান শত্রুর শক্তিহানী হয়েছে।

দুই. হাতের মুঠোয় পেয়েছে বাংলাদেশের ন্যায় বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম একটি দেশের বাজার।

তিন. অনুগত রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দ্বারা প্রভাবিত করতে পেরেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি।

চার. বিশ্বের সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র ধ্বংসের মধ্য দিয়ে দূর্বল করতে পেরেছে বিশ্বে ইসলামের পুনঃজাগরণ।

আর এগুলি কি ভারতের জন্য কম বিজয়? সিকিমের নেতারা একই খেলা খেলেছেন নিজ দেশের জনগণের সাথে। তারাও নিজেদের মনের গোপন কথাটি জনগণকে না বলে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদে বসে পুরা দেশকে তুলে দিয়েছেন ভারতের হাতে। আর সাথে ভারতীয় সেনাবাহিনী সিকিম রাজার প্রাসাদ ঘিরে ফেলে। সে কাজের জন্য তারা পূর্ব থেকেই যেন প্রস্তুত ছিল। ভারতীয় অর্থে যে লক্ষ্যে তারা প্রতিপালিত হয়েছিলেন সেটিই তারা সেদিন ষোল আনায় ভারতের ঘরে তুলে দিয়েছিলেন। আর এসবই হলো প্রতিবেশী দেশগুলিতে ভারতের বিশাল অংকের রাজনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগের ফল। এবং সেটি আজও চলছে বাংলাদেশে।


ইতিহাসের সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা নিতান্তই বুদ্ধিহীনতা। কারণ, সত্য ধামাচাপা দেওয়ার বিষয় নয়। বরং শক্তি বাড়ে এর প্রচারে। এবং এ পথেই বাড়ে সত্যপন্থিদের ইজ্জত। সত্য গোপন করলে বরং শত্রুপক্ষ সে বিষয়ে রঙ-চঙ চড়িয়ে নানারূপ মিথ্যা বলে। বাংলাদেশে সেটিই হয়েছে। ইসলামপন্থিরা তাদের একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে মুখ বন্ধ রেখেছে। আর ঘাদানী বুদ্ধিজীবী ও বাকশালী রাজনীতিবিদেরা তাদেরকে নারী ধর্ষণকারি এবং পাক-সেনাদের নারী সরবরাহকারিরূপে চিত্রিত করছে। এভাবে দুষিত ও বিষাক্ত করেছে নতুন প্রজন্মের চেতনা। অপর দিকে ইসলামপন্থি বহু নেতা-কর্মীর ধারণা, নির্বাচনে তাদের বার বার পরাজয়ের কারণ, একাত্তরে তাদের বাংলাদেশ বিরোধী ভূমিকা। ফলে তাদের বিশ্বাস, সে ভূমিকার কথা না বলাই ভাল। অথচ ধারণাটি অসত্য। বরং ভারত থেকে আগত বিপুল সংখ্যক মোহাজির অধ্যুষিত সীমান্তের জেলাগুলিতে ঘটছে এর উল্টোটি। তাছাড়া দেশের ইসলামে অঙ্গিকারপূর্ণ জনগণের কাছে এটি মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে পারতো। কারণ যে প্যান-ইসলামিক চেতনা সাতচল্লিশে বাংলাদেশে ব্যাপক রাজনৈতিক বিজয় এনেছিল সে চেতনা এত সহজে হাওয়া হয়ে যাওয়ার নয়। দেশে কোরআন চর্চা দিন দিন বেড়ে যাওয়ার কারণে বরং সে চেতনা আবার বেগবান হচ্ছে। কাশ্মীরে শেখ আব্দুল্লাহর পরিনতি থেকে তাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। শেখ আব্দুল্লাহ ছিলেন শেখ মুজিবের মতই সেকুলার, বিশ্বাস করতেন না দ্বিজাতি তত্ত্বে। ১৯৪৭য়ে পাকিস্তানে কাশ্মিরে যোগ দেওয়ার সুযোগও ছিল। কারণ কাশ্মিরের শতকরা ৮০ ভাগ অধিবাসি মুসলমান। কিন্তু শেখ আব্দুল্লাহর বন্ধুত্ব ছিল কংগ্রেস ও তার নেতা নেহেরুর সাথে। ১৯৪৭য়ে কাশ্মিরের হিন্দু রাজা কাশ্মিরের ভারতে যোগ দেওয়ার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেয়,শেখ আব্দুল্লাহ ও তার দল ন্যাশনাল কনফারেন্স সে সিদ্ধান্তকেই সমর্থণ করেন। বিণিময়ে তিনি কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী হন। সে সময় কাশ্মিরের জনপ্রিয় নেতা চৌধুরি গোলাম আব্বাসকে কারারুদ্ধ করা হয়। কারণ তিনি ও তাঁর দল মুসলিম কনফারেন্স কাশ্মিরের পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার পক্ষ নেয়। শেখ আব্দুল্লাহ সে সময় কাশ্মিরে জনপ্রিয় ছিলেন। তাকে শেরে কাশ্মিরও বলা হত। কিন্তু এখন তাঁর কবরকে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে পাহারা দিতে না। এ ভয়ে, না জানি কররের অসম্মান না হয়। এখন তাঁর জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন হয় কুশপুত্তিলিকা পুড়ানোর মধ্য দিয়ে।


বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলির নির্বাচনী পরাজয়ের কারণ, তাদের নানাবিধ পেশাগত, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক অযোগ্যতা। তারা যদি একাত্তরে আওয়ামী লীগের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গার কাজেও নামতো তবুও এ ধরণের অযোগ্যতা নিয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়া অসম্ভব ছিল। ইসলামপন্থিরা পাকিস্তানেও জিতছে না একই কারণে । লক্ষ্যণীয়, বাংলাদেশের ইসলামপন্থি দল ও বুদ্ধিজীবীগণ এখনও পরিস্কার করে বলেনি, কেন তারা ৭১-এ অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষ নিল। কোন কোন দল তো ৭১-য়ে তারা যে বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরুদ্ধে ছিল সেটিও অস্বীকার করতে চায়। শুধু তাই নয়, ইসলামপন্থি দলের কোন কোন নেতা ও কর্মী একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ার জন্য প্রকাশ্যে মাফ চাওয়ার পক্ষে। বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের এটি এক বড় রকমের আদর্শিক পরাজয়। আর এর কারণ, বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রে তাদের নিদারুন স্থবিরতা। অনেকের চেতনা রাজ্য প্লাবিত হয়েছে সেকুলার দর্শনে। ফলে তারা জায়েজ বলছে জাতীয়তাবাদকেও। প্যান-ইসলামিক চেতনার কথা শুনলে এদের অনেকে বরং বিস্মিত হয়। অথচ একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে সঠিক অবস্থানটি তুলে ধরলে তারা দেশজুড়ে অন্ততঃ একটা আদর্শিক পরিচয় পেত। তাছাড়া একাত্তরে পাকিস্তানে অখন্ডতায় সমর্থন দেওয়াটি বাংলাদেশের আইনে কোন অপরাধও নয়। কারণ সে সময় পাকিস্তানের নাগরিকরূপে সে দেশের অখন্ডতায় সমর্থন দেওয়া বা তার পক্ষে কাজ করা বিশ্বের কোন আইনেই দোষনীয় ছিল না। একই কারণে ১৯৪৭এর পূর্ব পর্যন্ত যে সব কংগ্রেসকর্মী অখন্ড ভারতের পক্ষে এবং পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কাজ করেছিল তাদের কোন নেতা বা কর্মীকে শাস্তি দেওয়া হয়নি। একদিনের জন্যও কাউকে কারারুদ্ধ করা হয়নি। কংগ্রেসকর্মীদের নির্মূলে নির্মূলকমিটিও গড়া হয়নি। বরং কংগ্রেসী নেতারা স্বাধীন পাকিস্তানে পূর্ণ স্বাধীনতার সাথে রাজনীতির অধিকার পেয়েছেন,সংসদের সদস্য হয়েছেন এবং অনেকে মন্ত্রীও হয়েছেন। অথচ আওয়ামী লীগের আজও অবিরাম আব্দার, পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ার কারণে ইসলামী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং নির্মূল করতে হবে তাদের নেতাদের। একাত্তরে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তাই সকল ইসলামী দলকে নিষিদ্ধ করেছিল। কারারুদ্ধ করেছিল তাদের নেতাদের। এমনকি অনেকের নাগরিকত্বও কেড়ে নিয়েছিল। জন্মগত নাগরিক অধিকার দিতেও তার রাজি ছিল না। তারা যে কতটা দানবীয় ও বর্বর, এ হল তার প্রমাণ।


অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটি হয়েছে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় যাওয়ায়। আওয়ামী লীগের ৪ বছর ক্ষমতায় থাকায় বাংলাদেশের যে ক্ষতি হয়েছিল তা ইতিহাসের অন্য সময়ে কয়েক যুগেও হয়নি। সীমান্ত খুলে দিয়ে তারাই দেশটিকে ভারতীয় বাজারে পরিণত করে। ধ্বসিয়ে দেয় দেশের শিল্প ও অর্থনীতিকে। কারেন্সী নোট ছাপতে দিয়ে ভারতকে সুযোগ করে দেয় কয়েক গুণ অধিক নোট ছেপে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ লুন্ঠনের। অথচ একাত্তরে পাকিস্তানের অখন্ডতার পক্ষ নিয়েছেন এমন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রি বা প্রেসিডেন্ট হওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতি,স্বার্বভৌমত্ব বা স্বাধীনতা বিপদে পড়েনি। এর প্রমাণ শাহ আজিজুর রহমান এবং আব্দুর রহমান বিশ্বাস। শাহ আজিজুর রহমান একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলতে জুলফিকার আলী ভূট্টোর সাথে জাতিসংঘে গিয়েছিলেন। পরবর্তীতে হয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। সংসদ নির্বাচনে তিনি নিজ জেলা কুষ্টিয়া থেকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়েছেন। পাকিস্তানের পক্ষে ভূমিকা নিয়েছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। সে অপরাধে শেখ মুজিব তাকে কারারুদ্ধও করেছিলেন। অথচ তিনি বার বার নির্বাচিত হয়েছেন বরিশাল থেকে। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্টও হয়েছেন। কিন্তু তাতে সামান্যতম ক্ষতি হয়েছে কি বাংলাদেশের? বৃহত্তর খুলনার তিন-তিনটি আসনে এক যোগে নির্বাচিত হয়েছেন মুসলিম লীগ নেতা আব্দুস সবুর খান। এভাবে নির্বাচিত হয়েছেন তাদের মত আরো অনেকে। স্বাধীনতার একমাত্র ইজারাদার ভাবেন এমন আওয়ামী প্রার্থীগণ শোচনীয় ভাবে পরাজিত হয়েছেন তাদের কাছে। আওয়ামী লীগ যতই স্বাধীনতার শত্রু বলে চিহ্নিত করুক না কেন জনগণ তাদেরকে মিত্র ভেবেছে। ফলে বিপুল ভোটে নির্বাচিতও করেছে। তারা বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন যেমন একাত্তর-পূর্বে, তেমনি একাত্তর-পরবর্তীতেও। ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুরক্ষায় প্রশাসনে অংশ নিতে তাদের কোন রূপ অসুবিধা হয়নি।


আত্মসমর্পণে আত্মসন্মান বাড়ে না। বাড়ে আত্মভ্রষ্টতা। বাড়ে অপমান। এবং সে আত্মসমর্পণ কাদের কাছে? সমাজের শিকড়হীন ভারতনির্ভর কিছু আত্মবিক্রীত ঘাদানী বুদ্ধিজীবী ও বাকশালী রাজনৈতিক নেতাদের কাছে? এরা নিজেরাই তো রাজনীতির পরাজিত শক্তি। ভীরুতায় ব্যক্তি ও দেশের কোন কল্যাণ নেই। যে সাহস নিয়ে দেশের ধর্মশূণ্য স্যেকুলার পক্ষ ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কথা বলে সেরূপ সাহস নিয়ে ইসলামের পক্ষশক্তি যদি ময়দানে নামতো তবে স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের এ বিতর্ক বহু আগেই বিলুপ্ত হত। এখন জাগরণের সময়। মুসলমানগণ জাগছে বিশ্বের সর্বত্র। সেকুলারিজমের প্রতিষ্ঠা যে মুসলিম দেশটিতে সর্ব প্রথম ঘটেছিল সে তুরস্কের মাটিতেই সেটি এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। বহু দেশের বহু লক্ষ মুসলমান এখন ইসলামের বিজয়ে অকাতরে অর্থ ও রক্ত দিচ্ছে। লড়াই করছে বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে। আমরা কি সাহসিকতার সাথে নিজেদের ইতিহাস নিয়ে সত্য কথাগুলোও বলবো না? অথচ সাহসিকতাই ইসলামের বড় শিক্ষা। হযরত মুসা (আঃ) ফিরাউনের রাজ প্রাসাদে সত্য কথাগুলো নির্ভয়ে বলেছিলেন। ইসলাম ভীরু ও কাপুরুষদের জন্য আসেনি। দেশের চলমান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্রোতে ভেসে যাওয়া গোলামদের জন্যও আসেনি। আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার বিষয়টিই মূল,বান্দাহর কাছে নয়। অথচ ভোটার বেজার হবে, এমপি বা মন্ত্রী হওয়া কঠিন হবে এ ভয়েই অনেক ইসলামি দলের নেতা সত্য কথা বলতে ভয় পায়। এটি কি ঈমানদারি? মন্ত্রীত্ব, সংসদ সদস্যপদ ও নানারূপ ইহজাগতিক কল্যাণ-চিন্তা যাদের রাজনীতির প্রধান বিষয় এ ভয় একমাত্র তাদের। এমন ইহজাগতিকতাই তো সেকুলারিজমের মূল কথা। অথচ অতিশয় পরিতাপের বিষয়, সেরূপ ইহজাগতিক লাভ লোকসানের চিন্তা ঢুকেছে বাংলাদেশের কোন কোন ইসলামি দলে। ফলে তারা কথা বলেন আখেরাত বা ইসলামের শ্বাস্বত শিক্ষার দিকে চেয়ে নয়, বরং নির্বাচনে ভোটপ্রাপ্তি ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠাকে হিসাবে রেখে। এভাবে সেকুলারিজম ঢুকছে ইসলামি দলে।


কথা হলো, এমন সেকুলারাইজড ইসলামি দলের ক্ষমতালাভে মুসলমানের কল্যাণ আছে কি? হিকমতের কথা বলে কি এমন ইহজাগতিক লাভ-লোকসানের রাজনীতিকে জায়েজ করা যায়? বাংলাদেশের মাটিতে সেকুলারিজমের হেলে পড়া দেয়ালে এখন শক্ত ধাক্কা দেওয়ার সময়। এতে গুড়িয়ে যাবে এর অস্তিত্ব। ইহজাগতিকতা বা সেকুলারিজমের মোহ থেকে মুক্তি দিতে না পারলে শুধু এ দুনিয়ায় নয়, পরকালের মুক্তিও অচিন্তনীয়। কারণ ইহজাগতিকতায় মৃত্যূ ঘটে আল্লাহ ও পরকালের ভয়। তখন ব্যক্তি, সমাজ ও জাতি ভাসে ব্যক্তিস্বার্থ, গোত্রীয় বা ভাষা ও বর্ণগত স্বার্থের ক্ষুদ্রতায়। তখন গুরুত্ব হারায় উম্মাহর কল্যাণ চিন্তা। নিজ স্বার্থে তখন অন্য ভাষা ও অন্য ভাষার মুসলমানদের হত্যা বা তাদের ঘরবাড়ি, দোকানপাট ব্যবসা বাণিজ্য দখলের ন্যায় জঘন্য পাপকর্মকেও উৎসবযোগ্য মনে হয়। ১৯৭১ এ বাংলাদেশে তেমন পাপকর্মই মহাধুমধামে হয়েছে। কয়েক লাখ অবাঙ্গালী পরিবারকে নর্দমার পাশে বস্তিতে পাঠিয়ে তাদের বাড়িগুলোকে দখল করা হয়েছে। সাতচল্লিশে কোন কংগ্রেসী পরিবারের বাড়ি এভাবে দখল করে তাদেরকে বস্তিতে পাঠানো হয়নি। আরো লক্ষণীয় হলো, বাংলাদেশের ইতিহাসে বর্বরতার যে নব্য ইতিহাস রচিত হলো তারও কোন প্রতিবাদ উঠলো না দেশের বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক মহল থেকে। দেশের বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদগণ যে কতটা মানবতাশূণ্য ও হিতাহিত জ্ঞানশূণ্য এটি হলো তারই জ্বলন্ত নজির। একাত্তর-পরবর্তী সরকারও যে কতটা দুর্বৃত্ত কবলিত ছিল সেটির প্রমাণ তারা রেখেছে সে জবর দখলকে বৈধতা দিয়ে। এভাবে ঘরে ঘরে পাপের বীজ বপন করা হয়েছিল পাপকে প্রশ্রয় দিয়ে। সেদিন যে বীজ বপন করা হয়েছিল বস্তুতঃ সেটিই পরবর্তীতে দূর্নীতির মহীরুহে পরিণত হয়। দেশটিকে পৌঁছে দেয় দুর্নীতে বিশ্বের প্রথম স্থানে। রাজনৈতিক দলের কর্মী ও নেতারা দলবেঁধে তখন দস্যুবৃত্তিতে নেমেছিল। কোন ব্যবসা-বাণিজ্য, চাষাবাদ বা চাকুরিবাকরি না করেও তারা বহু ঘরবাড়ির ও দোকানপাটের মালিক হয়েছেন। অবাঙ্গালী ও পাকিস্তানপন্থিদের লক্ষাধিক ঘরবাড়ি ও দোকানপাট তাদের দখলে গেছে। জবরদখলকারি প্রতিটি পরিবার পরিণত হয়েছে দূর্নীতির ইন্সটিটিউশনে। ফলে ঘরে ঘরে বসেছে পাপের পাঠশালা। অথচ সুনীতি ও সুশিক্ষার জন্য প্রথমে যেটি চাই সেটি হলো সুনীতিসম্পন্ন সুস্থ্য পরিবার। পরিবারই হলো শ্রেষ্ঠ শিক্ষালয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনের ন্যায় মানব জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে সেরা মানুষগুলো সৃষ্টি হয়েছিল কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নয় বরং সে আমলের মুসলিম পরিবারগুলি থেকে। তখন বিশ্ববিদ্যালয় দূরে থাক, স্কুলই বা ছিল কয়টি? তখন ঘরে ঘরে বসেছিল বিদ্যালয়। ফলে কয়েক দশকের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সভ্যতার। অথচ ভাল মানুষ গড়ার সেরূপ ইন্সটিটিউশন সন্ত্রাসী রাজনৈতিক নেতা, বাড়ী দখলকারি দুর্বৃত্ত ক্যাডার বা ঘুষখোর চাকুরিজীবির ঘরে গড়ে উঠে না। এমন ঘরে বেড়ে উঠে পাপাচারি দুর্বৃত্ত। এদের নামায-রোযা বা ইবাদত বন্দেগীর মূল্য আছে কি? ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য পূর্ব শর্ত্ব হল হালাল বাসস্থান ও হালাল রেযেক। জবর দখল করা বাড়ীতে জায়নামায বিছিয়ে সারা রাত নামায পড়লেই কি সে নামায কবুল হয়? ডাকাতির অর্থে যেমন দানখয়রাত হয় না, তেমনি নামাযও হয় না অন্যায়ভাবে দখল করা বাড়ীতে। কিন্তু সেকুলারিজম বা ইহজাগতিকতায় অতি অপ্রাসঙ্গিক হলো নীতি নৈতিকতার এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইসলামের এ সুনীতি তাদের কাছে সাম্প্রদায়িকতা। অপর দিকে সেকুলারিজম বা ইহজাগতিকতায় যেটি জন্ম নেয় সেটি হলো ভোগবাদী এক চরম উম্মাদনা। সে উম্মাদনায় ধর্মশূণ্য ব্যক্তি তখন অপরের পকেটে, সম্পদে বা ইজ্জতে হাত দেয়। নামে নারী অপহরণ ও ধর্ষণে। এমনকি প্রাণনাশও করে। এমন দূর্বৃত্তিতে সফল হওয়াকে সে জীবনের বড় অর্জন মনে করে। উৎসবযোগ্যও মনে করে। এরাই অফিস-আদালতে ভদ্রবেশী ডাকাত এবং রাস্তা বা মহল্লার সন্ত্রাসী ক্যাডার।


বাংলাদেশে আজ যারা সন্ত্রাস, নারি ধর্ষণ ও দূর্নীতিতে নেমেছে তারা কোন জংগলে বেড়ে উঠেনি, বরং পরিচর্যা ও প্রতিপালন পেয়েছে এরূপ পরিবারগুলিতে। কারণ যে পরিবার বেড়ে উঠেছে অন্যের ঘরবাড়ি, দোকানপাট, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য জবরদখল করার মধ্য দিয়ে সেখানে সুনীতি, সুসংস্কৃতি ও সুচরিত্র পরিচার্য পায় কি? বাংলাদেশের সেকুলার পক্ষটি তাই রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনছে। ফলে জন্ম নিয়েছে দেশবিনাশী এক চরম অপশক্তিতে। অথচ এরাই নিজেদেরকে স্বাধীনতার পক্ষ শক্তি রূপে তুলে ধরছে। ঘোষণা দিচ্ছে আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের যার মধ্য দিয়ে নির্মূল করতে চায় ইসলামি চেতনার লোকদের। এমন একটি যুদ্ধে তারা সুযোগ পাবে বিপক্ষ শক্তির গৃহ ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন ভাবে হত্যাকান্ড ও লুটপাটের। একপাল ক্ষুধার্ত দুর্বৃত্ত এজন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। তারা ভাবছে, এতে দেশের ভাগ্যে যাই হোক তাদের ভাগ্যে বিশাল পরিবর্তন ঘটবে। ফলে একাত্তরের পর যেভাবে অল্প সময়ে তারা দেশটিকে তলাহীন ঝুড়িতে পরিণত করেছিল সে অবস্থায় আবার ফিরিয়ে নিতে চায়। এভাবে জন্ম দিতে চায় সন্ত্রাসের আরেক সয়লাবের। সন্ত্রাস ও সীমাহীন দূর্নীতির কারণে আন্তর্জাতিক মহলেই কি কম অপমান জুটেছে? আগুনে বাড়ি পুড়লে সে দূর্ঘটনাতে সবাই সমবেদনা জানায়। কিন্তু দূর্বৃত্ত রূপে পরিচয় পেলে কি ইজ্জত থাকে? জলচ্ছ্বাসে ভেসে যাওয়াতে বা দুর্ভিক্ষে লক্ষ মানুষের মৃত্যুতে বাংলাদেশের মানুষের তেমন অসম্মান ছিল না। কিন্তু বিশ্বজুড়ে অসম্মান বেড়েছে দূর্নীতিতে বিশ্বে বার বার প্রথম হওয়ায়। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসে এসব ব্যর্থতার কোন বিবরণ নেই। যে ব্যক্তি আত্মহত্যার লক্ষ্যে বিষপানে উদ্দ্যত তার কাছে গুরুত্ব হারায় জীবনে ব্যর্থতার কারণ গুলো খুঁজে বের করার ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। গুরুত্ব হারায় সে ব্যর্থতা থেকে মু্ক্তির চিন্তাও। তার ব্যস্ততা তখন আত্মবিনাশে। তেমনি অবস্থা একটি আত্মবিনাশী জাতিরও। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ করে একাত্তরের ইতিহাসে এজন্যই নিজেদের অতীত আত্মঘাতি কর্মকান্ডের বিবরণ নেই।

Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Add comment


Security code
Refresh

 

Most Read