Home EBooks আমি আলবদর বলছি

eBooks

Latest Comments

আমি আল বদর বলছি Print E-mail
Written by কে এম আমিনুল হক   
Friday, 15 August 2008 00:00
Article Index
আমি আল বদর বলছি
অধ্যায় এক
অধ্যায় দুই
অধ্যায় তিন
অধ্যায় চার
অধ্যায় পাঁচ
অধ্যায় ছয়
অধ্যায় সাত
অধ্যায় আট
অধ্যায় নয়
All Pages

ভূমিকা: আমি আল বদর ছিলাম

আমি আল বদর ছিলাম। একাত্তরের সিদ্ধান্ত আমার নিজস্ব। আমার বিবেকের সাথে পরামর্শ করে এ সিদ্ধান্ত আমি নিয়েছিলাম। কোন দল কোন গোষ্ঠী অথবা কোন ব্যক্তি এ সিদ্ধান্ত আমার ওপর চাপিয়ে দেয়নি। আবেগ দ্বারা তাড়িত হয়ে অথবা কোন কিছুতে প্রলুব্ধ হয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম একথা সত্য নয়। বন্দুকের নলের মুখে এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি তাও নয়।

২শ’ বছরের গোলামীর ইতিহাস, সমসাময়িক হিন্দু চক্রান্ত, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের অতীত কার্যকলাপ, তথাকথিত সমাজতন্ত্রীদের দুরভিসন্ধি সব মিলে ২৫শে মার্চের পর আমার বিবেকে একটা ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে। আমার তারুণ্যকে পরিস্থিতির সুলভ শিকারে পরিণত হতে মন সায় দেয়নি। বার বার মনকে প্রশ্ন করেছি: এদেশে ইট কাঠ দালানগুলো ও অন্যান্য জড় পদার্থের মত আমি নীরব দর্শক হয়ে বোবার মত দাঁড়িয়ে থাকব? এই আত্মঘাতী ষড়যন্ত্রের শেষ কোথায়? যে হিন্দুস্তান তার নিজের দেশে হাজার হাজার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সৃষ্টি করে মুসলমানদের নিধন করছে, সেই ভারত কী স্বার্থে পূর্ব-পাকিস্তানের আট কোটি মুসলমানদের জন্য দরদে উচ্ছসিত হয়ে উঠল?

আওয়ামী লীগের তৎকালীন ধ্বংসাত্মক তৎপরতা ৫৪ হাজার বর্গমাইল একটি ভূখণ্ডকে সেই দেশের মানুষকে দিয়ে পদানত করার ভারতীয় প্রয়াস বলে আমার ধারণা হল। মনে হল এদেশের ৮ কোটি মুসলমানকে দিল্লীর আজ্ঞাবহ সেবাদাসে পরিণত করতে চায় আওয়ামী লীগ। ইসলামী জজবাতের ঘুমন্ত সত্তা আমার মধ্যে জেগে উঠল। আমি সবকিছু জেনে শুনে সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার পিতা অথবা পিতামহদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ছেচল্লিশের গণরায়ের সপক্ষে হাতিয়ার তুলে নিলাম। সক্রিয় অংশ নিলাম প্রতিরোধ লড়াই-এ। তারপর রুশ-ভারত অক্ষশক্তির সব ষড়যন্ত্রের শেষ পরিণতি হল ১৬ই ডিসেম্বর। চূড়ান্ত বিপর্যয় হল। বিচ্ছিন্ন হল দেশ। এক ভয়ঙ্কর বিভ্রান্তির গণজোয়ারকে বালির বাঁধ দিয়ে ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছি, পারিনি। দেশের প্রত্যেকটি জনপদ রাজপথ গ্রাম আর গঞ্জে দেশপ্রেমিক মানুষগুলো লাঞ্ছিত রক্তাক্ত হল। মীরমদনরা নিক্ষিপ্ত হল মীরজাফরের কারাগারে। আমিও কারা প্রকোষ্ঠে অন্তরীণ হলাম। আমার ৪০ বছর কারাদণ্ড হল। আমি দেখেছি বিচারক নিজেই ছিলেন আমার চেয়ে অসহায়।

এরপর পদ্মা মেঘনা যমুনায় অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। মুজিবের প্রতিশ্রুত ৩ বছরও পেরিয়ে গেল। ভয়ঙ্কর হতাশা, নৈরাজ্য, অর্থনৈতিক সংকট ঘিরে বসল গোটা জাতিকে। গলাবাজি আর সন্ত্রাস দিয়ে বিবেকবান প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা অব্যাহত থাকল। কিন্তু তবু মুজিব ধুমায়িত গণ-অসন্তোষকে ঢাকতে ব্যর্থ হল। পনের আগস্ট সূর্য ওঠার আগেই সুপ্তোত্থিত মোহমুক্ত দেশপ্রেমিক সৈনিকদের গুলীতে মুজিবের বুক বিদীর্ণ হল। তার খুন আর লাশের ওপর পা দিয়েই সম্ভবত সেদিন এদেশে সূর্যোদয় হয়েছিল। বুক ভরা নিঃশ্বাস নিয়েছিল এদেশের কোটি কোটি মানুষ। সেদিন তার ঠ্যাঙারে বাহিনী লাল নীল বিচিত্র বাহিনী তার সমর্থক জালেম লুটেরার দল ভীরু শৃগালের মত লুকিয়ে ছিল অন্ধকার গহ্বরে। সেদিন বাঙালীর চোখে অশ্রু নয় উল্লাসের হাসি দেখেছিল পৃথিবী।

আমরা কারাগার থেকে জাতীয় জীবনের এই নাটকগুলো নীরব দর্শকের মত দেখলাম। বোবা শ্রোতার মত শুনে গেলাম অনেক কিছু। আমাদের কি করণীয় আছে? একাত্তরে আমাদের বিবেক আমাদের সত্তা সব শেষ হয়ে গেছে। আমাদের হাত আছে হাতিয়ার নেই তূন আছে, তীর নেই।

কারাগার ছিল একটি নাট্যমঞ্চ। দৃশ্যপট বদলের সাথে সাথে এই মঞ্চে আসতে শুরু করল নতুন নতুন মুখ। প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, দলনেতা, কর্মী ও অনেকেই। যারা এইমাত্র ক্ষমতাসীন ছিলেন তাদেরও ঠিকানা হল এই কারাগার। কালের সাক্ষী হয়ে আমরা সবকিছু দেখেছি। এই কারাগারে ডান, বাম, মধ্য সবপন্থী নেতা ও উপনেতাদের পেয়েছি তাদের অনেকের সাথে অন্তরঙ্গ আলাপ হয়েছে। স্মৃতি থেকে যতটুকু পেরেছি, আমার এই সাজান স্বরলিপিতে টেনে আনার চেষ্টা করেছি। এর বাইরেও রয়েছে অনেক কিছু। পরবর্তীতে তুলে ধরার আশা রাখি।

অনেক দেরী হয়ে গেছে। কারাগার থেকে বেরিয়ে আমার সামনে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ছাড়া অবশিষ্ট কিছু ছিল না। জীবন ও জীবিকার সন্ধানে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে। স্মৃতি রোমন্থনের সময় কোথায়? কারাগারের শেষ দিনগুলোতে মোহাম্মদ ফারুক, আব্দুল মালেক ও এ কে. এম শফিউল্লাহ ভাই ডায়েরী সরবরাহ করে স্মৃতিগুলো লিখে রাখার জন্য। নৈরাশ্য অথবা আলস্য, যে কারণেই হোক না কেন সেগুলো ঠিকমত লিখে রাখা হয়নি। তবে স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল হয়ে আছে এখনও অনেক কিছু। এর কিছুটা এই বইটিতে সন্নিবেশিত হয়েছে।

অনেক দেরী হলেও বইটা প্রকাশ করতে পেরে আনন্দিত। অবিশ্য এর জন্য বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশও অপরিহার্য ছিল। বইটিতে আমার মানসিকতার প্রতিফলন ঘটেছে। আমি লুকোচুরি রাখঢাক অথবা ডিপ্লোম্যাসির আশ্রয় নিইনি। কাউকে ক্ষুণ্ণ করাও আমার উদ্দেশ্য নয়। কেবল আমার বিশ্বাসকে তুলে ধরেছি। আমার বিশ্বাস অহিপ্রাপ্ত অথবা সমালোচনার উর্ধে এমনটি নয়। নিয়মতান্ত্রিক সমালোচনাকে আমি স্বাগত জানাব।

আমার অতীত জেনে শুনে যে মহিলা আমাকে বিয়ে করেছেন সেই আনোয়ারা খন্দকার বেবীর প্রেরণায় বইটা প্রকাশে উদ্বুদ্ধ হয়েছি। পত্র-পত্রিকার পাতায় পাতায় যেভাবে আল বদরকে বর্বরতার প্রতীক হিসেবে দাঁড় করান হয়েছে, এতে ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্ব্বোচ্চ ডিগ্রী নেয়া একজন মহিলার আমার প্রতি বিরূপ ছাড়া অনুরক্ত হওয়ার কোন সঙ্গত কারণ নেই। এমন কোন প্রাচুর্যের জৌলুসও আমার ছিল না। আমাদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের একতরফা বিশ্রী প্রচারণায় প্লাবিত সমাজের একজন হয়েও বেবী আমাকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে স্বেচ্ছায় গ্রহণ করেছে। শুরু থেকে চাপ দিয়ে আসছে আমার অভিজ্ঞতায় নিরপেক্ষ কিছু লেখার জন্য।

তার ভাষায়- "‘ইতিহাস তার নিজস্ব গতিধারায় এগিয়ে চলে। একদিন নিরপেক্ষ নির্ভেজাল ইতিহাস লেখা হবে। সেই আগামী দিনের ঐতিহাসিকদের জন্য কিছু তথ্য রেখে যেতে পার।" বেবীর সাধ কতটুকু পূরণ করতে পেরেছি জানি না। তবে আমার বিক্ষিপ্ত কলমের আঁচড় আলোর মুখ দেখতে পেয়েছে তারই প্রেরণায়- একথা বলতে দ্বিধা নেই।

বিভিন্ন জনের সাথে আমার বিভিন্ন সংলাপ আমি সঠিকভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। আমার এই লেখা কতখানি সুখপাঠ্য ও সমাদিত হবে সেটা আমার জানার কথা নয়। বিজ্ঞ পাঠকদের ওপর আমার বইটির সঠিক মূল্যায়নের ভার দিচ্ছি। বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের নিকট থেকে অনেক তাগিদ পেয়েছি। যারা আমাকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত ও বিরল সহযোগিতা করেছেন তাদের মধ্যে অধ্যাপক মাহাতাব উদ্দিন কিশোরগঞ্জ, মীর কাসেম আলী মিন্টু ভাই, বিশিষ্ট ব্যাংকার সুসাহিত্যিক কলামিষ্ট গবেষক আব্দুল মান্নান ভাই, মাসিক নতুন সফর সম্পাদক সাবেক ছাত্র নেতা মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন ভাই কারাগারে থাকা অবস্থায় আমাকে কিছু লেখার জন্য বলতেন তাদের সেই প্রেরণাও বইটি লেখার ব্যাপারে শক্তি যুগিয়েছে। বিশেষজ্ঞ ডাঃ আফসার সিদ্দিকী, সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ হাবিবুর রহমান, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ বিশেষজ্ঞ ডাঃ মুস্তাক আহম্মদ, মোঃ কামরুল ইসলাম, মোঃ গিয়াস উদ্দিন তালুকদার, মুহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, ডক্টর মুহাম্মদ আব্দুল লতিফ, মোঃ আব্দুল কাহ্হার, এস ডাব্লিউ ভি ফরিদা ইয়াসমীন, সাবেক ছাত্র নেতা ইমতিয়াজ আহম্মদ খান, সাবেক কেন্দ্রিয় ছাত্র নেতা জাকির হোসেন (মুকুল), আক্তার উজ্জামান, মোঃ এনামুল হক, মুহাম্মদ সামসুদ্দিন, এস এম দুররুল হুদা, ইঞ্জিনিয়ার সাইফুল ইসলাম, প্রিন্সিপাল আব্দুস সামাদ সাহেব প্রমুখের নিকট আমি চির কৃতজ্ঞ।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুদ্রণ জনিত কিছু ভুল-ত্রুটি রয়ে গেল। আশা করি পাঠকগণ সেটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। তবু সবরকম ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

- কে এম আমিনুল হক

(বইটির pdf version download করুন এখানে)
একাত্তরের ১৭ ডিসেম্বর। কিশোরগঞ্জে মুক্তিবাহিনী ও হিন্দুস্তানী সেনার সম্মিলিত আক্রমণের মুখে প্রচণ্ড প্রতিরোধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রাজাকার, আলবদর, মুজাহিদ ও পুলিশের মৃত্যুকামী সদস্যরা। ১৬ ডিসেম্বরে হিন্দুস্তানের হাতে পাকিস্তানী বাহিনী অস্ত্র সমর্পনের পর যে বিজয় সূচিত হয়েছে, কিশোরগঞ্জের প্রতিরোধ যেন তার কলঙ্কের তিলক। অসংখ্য শেল প্রতিনিয়ত এসে পড়ছে শহরের বিভিন্ন অবস্থানে। দালানগুলোর ইট খসে খসে পড়ছে। হতাহতের খবরও আসছে বিভিন্ন দিক থেকে। গুলী, অজস্র গুলী, বৃষ্টির মত গুলী, তবু কারো দুঃসাহসে চিড় ধরেছে বলে মনে হয় না। প্রতিরোধের প্রচণ্ড নেশায় উন্মত্ত সকলে। কিশোরগঞ্জের এই প্রতিরোধকে বিশাল সমুদ্রের ছোট একটি ঢেউ অথবা বুদ বুদ কোনটি বলব সেটা আমার জানা নেই। ঝঞ্ঝা অথবা ঝড়ো হাওয়ার উন্মত্ততা শেষ হয়েছে নিয়াজীর আত্মসমর্পণের পরেই, অর্থাৎ আগের দিন। কিন্তু কিশোরগঞ্জের ঝড় তখনও। তখনও প্রচণ্ড লড়াই। আমি জানি এর শেষ কোথায়। রসদের পরিমাণও আমার জানা। সরবরাহের সম্ভাবনা আর কোন দিনই আমাদের সামনে আসবে না। আমার জানবাজ সহকর্মীদের সামনে পশ্চাৎ অপসারণ অথবা আত্মসমর্পণের কথা বলবার দুঃসাহস আমার নেই। ভয়ঙ্কর দুশ্চিন্তা। এতগুলো জীবনের ঝুঁকি! অন্তহীন অনিশ্চয়তার মধ্যে আমার আপোষহীন সিপাহীরা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করছে। আমি উল্কার মত ছুটে বেড়াচ্ছি এক বাংকার থেকে আর এক বাংকারে, এক ট্রেঞ্চ থেকে আর এক ট্রেঞ্চে, এক অবস্থান থেকে আর এক অবস্থানে। সবার একই ভাষা, সেই ১৪শ’ বছর আগের কারবালার ভাষা, যে ভাষায় হযরত হোসেন (রাঃ) প্রতি তাঁর সহগামীরা আনুগত্য ব্যক্ত করেছিলেন। উৎকণ্ঠা কারো নেই। সবার চোখে আর চাওনিতে অব্যাহত লড়াইয়ের দৃপ্ত শপথ ঠিকরে বেরুচ্ছে। আমার মন থেকে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ধীরে ধীরে অপসারিত হচ্ছে। আমার সহকর্মীদের মৃত্যুকে হাসি মুখে বরণ করার ইচ্ছার মধ্যে আমি হারিয়ে যাচ্ছি। ১৪শ’ বছর পর কারবালার নুতন দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য আমার মনকে আমি তৈরি করে ফেলেছি।

বেলা গড়িয়ে এলো। সূর্যটা অস্তাচলে। গোধূলির রঙ আমি দেখছি। এ রঙে পৃথিবী এমন করে কোনদিন দেখেছি বলে মনে হয় না। আকাশটা লালে লাল। সূর্যটার বুক বিদীর্ণ হয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। আহত সূর্যের গোঙ্গানি যেন রণাঙ্গনে বিমূর্ত। মনে হয় রক্তাক্ত পথ দিয়েই সূর্যোদয় ঘটে। রক্ত-পিছল পথ দিয়ে সূর্যটা অস্তাচলে ঢলে পড়ে। দুনিয়ার মানচিত্রে পাকিস্তানের অভূদ্যয়, কত অজস্র জীবনের বিনিময়ে। কত খুন আর আগুনের পথ অতিক্রম করে মুসলমানরা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ২শ’ বছরের গোলামীর জিঞ্জির ছিঁড়েছে। মানচিত্রের একটা দিক থেকে পাকিস্তানের চিহ্ন মুছে ফেলতে তেমনি রক্ত ঝরবে এটাই স্বাভাবিক।

মসজিদ থেকে আযান ভেসে আসল। “আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার, আশহাদু আল্লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহ।” আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন মাবুদ নাই। আমার মন-মানসিকতা আবার যেন শানিত হয়ে উঠল। না, কোন শক্তির কাছে নয় আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করাই আমাদের মঙ্গল। পানি নিয়ে ওযু করতে বসলাম। অন্তহীন ভাবনা। এ জাতির অনাগত অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা কল্পনা করে আমার দু’চোখ ফেটে পানি গড়িয়ে এলো। অশ্রু আর ওযুর পানিতে একাকার হয়ে গেল আমার মুখমণ্ডল। আল্লাহ দরবারে হাত তুললাম, ‘ইয়া আল্লাহ্, ইয়া মাবুদ, ইয়া যাজা ও সাজার মালিক, সমস্ত জাতিকে কতিপয় উচ্চাভিলাষী রাজনীতিক অন্ধ করে রেখেছে। আমার এ বেগুনাহ কাওমকে রাজনীতিকদের গুনাগারীর সাজা দিও না। তোমার ঐশী আযাব থেকে এদের আশ্রয় দাও।

প্রাণ ভরে নামাজ পড়লাম। তখন প্রত্যেকটি নামাজই মনে হত আমার জন্য শেষ নামাজ। মাগরিবের নামাজের বেশ কিছুক্ষণ পর নেজামে ইসলাম পার্টির প্রধান সর্বজন শ্রদ্ধেয় মওলানা আতাহার আলী সাহেবের টেলিফোন পেলাম। তিনি তার আল জামেয়াতুল এমদাদিয়া থেকে আমাকে তলব করেছেন। আমি মোটেও বিলম্ব না করে তার কাছে ছুটে গেলাম। পৌঁছে দেখলাম মহকুমা অফিসার জনাব আবদুর রহিম, মহকুমা পুলিশ অফিসার ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বসে রয়েছেন। আওয়ামী লীগের মহকুমা সেক্রেটারী অধ্যাপক জিয়াউদ্দিনকে দেখেই আমি ভয়ঙ্কর মানসিক বিপর্যয় অনুভব করলাম। মওলানা আতাহার আলী সাহেব এই অঞ্চলের আধ্যাত্মিক নেতা, তিনি আমাদের অনেকের আপোষহীন প্রেরণার উৎস। তাঁর শত শত অনুগামী এই প্রতিরোধ যুদ্ধে সক্রিয় অংশীদার। যাই হোক, আমি সালাম দিয়ে তার কোন নির্দেশ, বক্তব্য অথবা পরামর্শের প্রত্যাশা করছিলাম। আমার যেন মনে হচ্ছিল, তিনি কোন এক আপোষ ফর্মূলায় উপস্থিত হয়েছেন। আমি দৃষ্টি অবনত করে বসে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ। মাথা উঁচু করে মাঝে মাঝে দেখছিলাম, মওলানা অপলকে তাকিয়ে রয়েছেন আমার দিকে। তাঁর অশ্রুসজল সকরুণ চাওনি আমাকে বিব্রত করছিল ভয়ঙ্করভাবে। নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন, “আমিন, কুদরতের ফায়সালা আমাদের সপক্ষে নেই। ৫৪ হাজার বর্গমাইলের পাঁচ-দশ বর্গমাইল প্রতিরোধের প্রাচীর দিয়ে বিভ্রান্তির জোয়ার আটকাতে পারবে না। আওয়ামী লীগ নেতারা আত্ম-সমর্পণের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন, আমি মনে করি রক্তক্ষরণের চাইতে অস্ত্রসংবরণই উত্তম। হক-বাতিলের ফায়সালা আগামী দিনগুলোর জন্য রেখে দাও।” তাঁর এই বক্তব্যে অনেক বেদনা, অনেক অন্তর্জ্বালা আমি চোখ বন্ধ করে দেখতে পেলাম। মওলানা আতাহার আলী সাহেবের নির্দেশকে উপেক্ষা করার দুঃসাহস আমার নেই। কেননা শুরু থেকে আজ পর্যন্ত তিনি আমাকে ছায়া বিস্তার করে রেখেছেন। তার সহযোগিতায় এবং সৎ পরামর্শে সমস্ত অন্যায় অপকর্মের ভাগাড়গুলোকে আমি নির্মূল করতে পেরেছি। আমার এও বিশ্বাস ছিল যে তিনি কোন অন্যায় অযৌক্তিক পরামর্শ দিতে পারেন না। এ ছাড়াও আমাদের এই বয়সটা আবেগ দ্বারা তাড়িত, আর তিনি এর বাইরে থেকে পরিস্থিতিকে সঠিকভাবে দেখছেন। আমি তার নির্দেশ মেনে নিলাম সহজভাবে। আমি মোটেও দেরী না করে মওলানা আতাহার আলী সাহেবকে তাঁর নির্দেশ পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিদায় নিলাম। দেখলাম অধ্যাপক জিয়াউদ্দিন প্রচণ্ড আক্রোশে আমার দিকে চেয়ে আছে। ফিরে এলাম আমার ডেরায়।

স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিভিন্ন অবস্থান থেকে সমস্ত গ্রুপের কমান্ডারকে ডেকে পাঠালাম। পরামর্শে বসলাম। অনেকেই শেষ অবধি যুদ্ধ চালিযে যাওয়ার কথা ব্যক্ত করল। কিন্তু এর শেষ কোথায়? আমি বোঝানোর চেষ্টা করলাম, রক্তাক্ত পরিণতি ছাড়া এর আশাব্যঞ্জক কোন দিকই অবশিষ্ট নেই। আরও বললাম, মওলানা আতাহার আলী সাহেব যুদ্ধ-বিরতির সপক্ষে সুপারিশ করাতে তাঁর অনুসারী মুজাহিদরা রণেভঙ্গ দিবে। এছাড়াও গুলীর মওজুদ নিঃশেষের পথে। এ নিয়ে হয়তো বা কয়েক ঘন্টা অথবা কয়েকদিন লড়তে সক্ষম হব। কিন্তু তারপর? তারপরও যদি সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করে কোন বাহিনীর এগিয়ে আসার সম্ভাবনা থাকতো, তাহলে যে কোন ঝুঁকি নেয়া সঙ্গত মনে করতাম। বিভিন্ন আলোচনা পর্যালোচনা করে আমরা সিদ্ধান্তে পৌঁছলাম, সময় ও সুযোগমত যে যখন পারে আমার জানবাজ যোদ্ধারা রণাঙ্গন পরিত্যাগ করবে। আমাদের একটা সুবিধা ছিল যা পশ্চিম পাকিস্তানীদের ছিল না। তা হল, গণ-আবরণে গা ঢাকা দেওয়ার সুবিধা। যেহেতু আমাদের ভাষা, বর্ণ, পোশাক-আশাক এবং চলাফেরার ব্যাপারে প্রতিপক্ষদের সাথে কোন ব্যবধানই ছিল না। সবাই মোটামুটি যুদ্ধকে এড়িয়ে নিজ নিজ দায়িত্বে রণাঙ্গন পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত উপনীত হওয়া সত্ত্বেও রাত ১০টা নাগাদ মওলানা আবদুর জব্বার সাহেবের ছেলে ইমদাদুল হক এবং শহীদুল্লাহ আমাকে না জানিয়ে মুজাহিদ, রাজাকার, আলবদর ও শহরের অতি উৎসাহী মানুষদের নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সপক্ষে রাস্তায় রাস্তায় মিছিল বের করে। দেখলাম, ইসলামের সৈনিকদের আত্মোৎসর্গ করার উদ্দীপনা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। আমার সহকর্মী অসংখ্য তরুণ-প্রাণের করুণ পরিণতির কথা ভেবে আমার বুক চাপড়াতে ইচ্ছে করছিল। ক্রমশ আমরা অসহায়ত্বের দোর গোড়ায় এগিয়ে চললাম। আমাদের দুর্জয় বন্দুকের নল ধীরে ধীরে বোবা হয়ে গেল। ১৮ তারিখ সকালে ইমদাদুল হক এবং শহীদুল্লাহকে মুক্তিফৌজরা নির্মমভাবে হত্যা করল। অন্যদিকে রাত্রেই আর এক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম, রাজাকার প্রধান মওলানা মহিউদ্দিন আযমী সম্ভবত মুক্তিবাহিনীর সহানুভূতি পাওয়ার প্রত্যাশায় এক অতি উৎসাহী ভূমিকা নিলেন।

আল জামেয়াতুল এমদাদিয়া থেকে মাইক নিয়ে মওলানা আযমী সর্বত্র ঘোষণা দিলেন যে, আগামী কাল মুক্তিফৌজ অমুক অমুক সড়ক দিয়ে প্রবেশ করবে। আমাদের ভাইয়েরা তাদের প্রবেশ পথে কোন বাধার সৃষ্টি না করে অভিনন্দন জানাবে। এবং শহীদি মসজিদের সম্মুখভাগে আমাদের বাহিনী অস্ত্র সমর্পণ করবে। চুক্তিমত কাউকে গ্রেফতার করা হবে না। এমন কি কোন প্রতিশোধ নেয়া হবে না। মওলানা আযমীর এই ঘোষণাও ছিল আমার নির্দেশের বাইরে। মওলানা আযমী হয়তো পরিস্থিতির চাপে বিদিশা হয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের প্রতিশ্রুতিকে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) মক্কা বিজয়ের প্রতিশ্রুতির মত ভেবে বসেছিলেন। কিন্তু এরও পরিণতি শুভ হল না। শহরে ঢুকে মুক্তিফৌজদের প্রথম গুলী যার বুক বিদীর্ণ করল, তিনিই হলেন সেই মহিউদ্দিন আযমী। এ ছাড়াও মওলানা হেদায়েত উল্লাহসহ আরো পাঁচ-ছয় জনের শাহাদতের খবর আমার কাছে এসে পৌঁছল।

ওদিকে রাত্রে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের প্রতিশ্রুতির প্রেক্ষিতে একটি খসড়া চুক্তিপত্র প্রণয়ন করা হয়। এতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মহকুমা আওয়ামী লীগ নেতা ডাঃ মাযহারুল ইসলাম এবং আমাদের পক্ষ থেকে আমি স্বাক্ষর দান করি। আমাদের প্রতি ডাক্তার সাহেবের ছিল অন্তহীন সহানুভূতি।

আত্মীয় পরিজন, জামায়াত নেতৃবৃন্দ ও আরো অনেকেই আমার সাথে সাক্ষাৎ করে নিশ্চিত মৃত্যুর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিলেন। তারা বলেন নিরাপদ আশ্রয়ে আমাকে সরে যাওয়ার জন্য। জাতীয় বৃহৎ স্বার্থ ও ভবিষ্যৎ ইসলামী আন্দোলনের জন্য আমার জীবন রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা বার বার উল্লেখ করলেন। এ সত্ত্বেও আমার মন সাড়া দিল না মোটেও। কেননা আমার শত শত জানবাজ সহকর্মীদের অনিশ্চিতের মধ্যে ফেলে যেতে বিবেক সায় দিল না। আমি আমার নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও রয়ে গেলাম।

সকালে এলাকার ৩০জন নেতৃবৃন্দসহ ডাক্তার মাযহার সাহেবের বাসায় সমবেত হলাম। তার চোখে মুখে চিন্তা আর উদ্বেগের ছায়া। কিন্তু ম্লান হেসে বারবার তিনি আশ্বাস দিচ্ছেন। তার চাওনিতে দুঃচিন্তার স্পষ্টতা দেখে মনে হল সম্ভবত তিনি মুক্তিফৌজদের ওপর ভরসা করতে পারছেন না। কেননা তিনি শহর ঘুরে দেখে এসেছেন, মুক্তিফৌজরা শত শত মানুষকে শহরে ঢুকে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করেছে। মনে হল তিনি ভাবছেন, তাকে উপেক্ষা করে তার আশ্রিত ব্যক্তিদের উপর হয়তো বা মুক্তিফৌজ চড়াও হতে পারে। আমি বললাম, “ডাক্তার সাহেব, আমাদের চাইতে সম্ভবত আপনি নিজেই অসহায়ত্ব অনুভব করছেন বেশী। আপনার অনেক সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি রাখতে পারবেন না। এর চেয়ে মুক্তিফৌজ চড়াও হবার আগে আপনি আমাদেরকে হিন্দুস্তানী বাহিনীর কাছে সমর্পণ করে দিন।” কিংকর্তব্যবিমূঢ় ডাক্তার সাহেব আমার কথা থেকে যেন সম্বিত ফিরে পেলেন। আমার কথাগুলো তার পছন্দ হল। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি ভারতীয় কর্ম-কর্তাদের নিকট টেলিফোন করলে সেনাবাহিনী এসে আমাদেরকে তাদের হেফাজতে নিলো। তখন সম্ভবত বেলা ২টা হবে। হিন্দুস্তানী সৈনিকরা আমাদেরকে নিরাপত্তা বেষ্টনী দিয়ে তাদের হেফাজতখানার দিকে নিয়ে চললেন। পথে মুক্তিবাহিনীর একটি দলের সাথে দেখা হল। তারা সম্মানিত নেতা মওলানা আতাহার আলীর পায়ে ধরে সালাম করলো, এদের অন্যতম ছিলেন ক্যাপটেন মতিউর রহমান। বর্তমানে তিনি অবসরপ্রাপ্ত মেজর। যাই হোক, ইতোমধ্যে আমরা সরকারী হাইস্কুলে এসে পৌঁছলাম। এখানকার কমনরুমে সেনাবাহিনীর হেফাজতে আমাদের রাখা হল।

আছরের সময় ন্যাপের একটা দলকে আমাদের অবস্থানের দিকে আসতে দেখলাম। এরা প্রত্যেকেই চাদর গায়ে দেয়া। কাছাকাছি এসে জিজ্ঞেস করল, “আলবদর কমাণ্ডার কোথায়?” আমি বেরিয়ে এলাম। আমার বাহিনীর গ্র“প কমাণ্ডার জাকির ভাইকে ডেকে বাইরে আনা হল। প্রত্যেকের চাদরের মধ্য থেকে লোহার রড বেরিয়ে এলো। শুরু হল লোহার রড দিয়ে নির্মম নির্যাতন। জাকির ভাইয়ের মাথা ফেটে দর দর করে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। রক্তস্নাত হয়ে উঠলেন জাকির ভাই। আমার উপর চলতে লাগল একই নির্যাতন। একজন আঘাতের পর আঘাত করে ক্লান্ত হলে আর একজন শুরু করে। এভাবে ক্রমাগত নির্যাতন আমার শরীর নেতিয়ে পড়ল। ডান হাতে পেলাম প্রচণ্ড আঘাত। জাকির ভাইয়ের মত আমার মাথা হয়তো ক্ষত-বিক্ষত হবে এমন আশঙ্কা করে আমি বাম হাতে লোহার রড চেপে ধরলাম। তিন চার জনে টানা-হেঁচড়া করেও ওরা আমার হাত থেকে রড ছাড়িয়ে নিতে সক্ষম হল না। ইতোমধ্যে হিন্দুস্তানী সেন্ট্রী এসে পড়ায় আমি নিষ্কৃতি পেলাম। ওদিকে আর এক দল হলের ভেতর প্রবেশ করে মওলানা আতাহার আলী সাহেবের মাথা ফাটিয়ে দিল। তিনিও নিমিষে রক্তস্নাত হয়ে উঠলেন। আর একজন নির্যাতন চালিয়ে এডভোকেট বদরুজ্জামানের হাত ভেঙ্গে দিল। মুসলিম লীগ নেতা এমপি ও পৌরসভার চেয়ারম্যান জনাব আবদুল আওয়াল সাহেবের উপর ভয়ঙ্কর অত্যাচার চালানো হল। এতে তার ডান হাত ভেঙ্গে যায়। তার সুস্থ হতে অনেক দিন সময় নেয়। বর্তমানে তিনি কিশোরগঞ্জ পৌরসভার চেয়্যারম্যান এবং জনপ্রিয় এমপি। সোলাইকার চেয়ারম্যান তারামিয়া ও তার বড় ভাই বাদশাহ মিয়ার ওপর নির্যাতন যেমন নিষ্ঠুর তেমনি ভয়াবহ ও মর্মান্তিক। উভয়েরই পুরুষাঙ্গ দড়ি দিয়ে বেঁধে সিলিং ফ্যানের সাথে সংযোগ করে সেটা পূর্ণ গতিতে চালিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে তাঁদের আর্তচিৎকার ও আহাজারিতে কারবালার ভয়াবহতা প্রকট হয়ে ওঠে। তাঁদের প্রস্রাবের সাথে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। মোটের উপর আমরা সবাই সেইসব জাহেল বুজদীল ও কাপুরুষের খেলার সামগ্রীতে পরিণত হই।

রাত এগারটা। ন্যাপের নেতৃবৃন্দকে আমাদের অবস্থানের চারিদিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা গেল। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা হান্নান মোল্লা আসগর ভাইয়ের কাছে এসে বলল, “যা করেছেন তার প্রায়শ্চিত্য আপনাদের পেতে হবে।” সম্ভবত হান্নান মোল্লা আসগর ভাইয়ের ক্লাসমেট বলে সে তার উপর নির্লজ্জ আক্রমণ চালাতে পারেনি।

অন্যদিকে মোমেনশাহী জেলা ন্যাপের সহ-সভাপতি কাজী আবদুল বারী ও তার সহকর্মীরা বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করে চিৎকার করে বলতে থাকে, “অষ্টগ্রামের আমিন ও দৌলত মওলানা কোথায়?” হান্নান মোল্লা আমাদের কক্ষ থেকে জবাব দিল ‘না’ এখানে নেই, এখানকার সকলেই শহরের।’ সম্ভবত সে আমাদের চিনতো না। দৌলত মওলানা আমার কানে কানে বললেন- ‘আমিন বলে ফেলি যে আমরা এখানে আছি। কাপুরুষের মত লুকিয়ে থাকতে মন চাচ্ছে না।’ আমি তাঁকে নিষেধ করলাম। সবাই যেন নির্যাতন দেখে দেখে এবং মার খেয়ে খেয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে। কাজী বারীরা চলে গেল। পরে জানতে পারি, অষ্টগ্রামে জনসভা করে তারা জনগণকে আমাদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করেছে। কাল্পনিক স্বর্গরাজ্যের প্রত্যাশায় মাতাল মানুষগুলোর কাছ থেকে আমাদেরকে প্রকাশ্য ফাঁসী দেয়ার সপক্ষে সম্মতি আদায় করেছে।

রাত ১১টার দিকে মওলানা আবদুল হালিম পাকুন্দিয়া ও ক্যাপটেন মতিউর রহমান এলেন। তাঁরা উভয়েই মওলানা আতহার আলী সাহেবকে সহানুভূতি জানালেন। মওলানা আবদুল হালিম সাহেব তাঁর গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করলেন। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, সম্ভবত মওলানাদের মধ্যে পাকুন্দিয়া সাহেবই ভারতীয় বাহিনীর সহযোগী হয়েছিলেন। কিন্তু কেন, তা আমার জানা নেই। তবে তাঁর প্রতি কারো অশ্রদ্ধাও দেখিনি।

ক্যাপটেন মতিউর রহমান আমার পরিচয় পেয়ে অত্যন্ত দুঃখের সাথে বললেন- “দেশের সমস্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা সোচ্চার, সে জামায়াত কি করে ইয়াহিয়ার নিপীড়নের সহযোগী হতে পারল!’ তাঁর ঐ বক্তব্য থেকে আমার মনে হল জামায়াতের অতীত কর্মকাণ্ডের ওপর ক্যাপটেন মতিউর রহমানের ধারণা স্বচ্ছ। অন্তত একটা ব্যক্তিকে আমি পেলাম, সীমাহীন রাজনৈতিক ধূম্রজালের মধ্যেও যার অন্তরে রয়েছে সচেতন বিবেকের এই ক্ষীণ স্পন্দন। আমি জানি, আজ নয়, সময়ের আবর্তে একদিন বিবেকের এই ক্ষীণ স্পন্দনই বেগবান হয়ে উঠবে। আমি কোন জবাব না দিয়ে তাঁর দিকে চেয়ে থাকলাম। এরপর এলেন SDO খসরুজ্জামান। তার সম্বন্ধে কিছু বলা প্রয়োজন। ১৯৭০ সালে আমি যখন ভৈরব কলেজের ছাত্র এবং ভৈরব ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি, তখন SDO খসরুজ্জামান ভৈরব প্রেসক্লাবের উদ্বোধনকালে প্রধান অথিতির ভাষণ দিতে গিয়ে আলেম সমাজের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে বলেন, পাকিস্তান আন্দোলন অথবা বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে আলেম সমাজের কোন ভূমিকা ছিল না। শুধু তাই নয়, তিনি আলেম সমাজকে পরগাছা হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চালান। আমি প্রেসক্লাবের সদস্য হিসেবে এর প্রতিবাদ জানাই। যাই হোক, তথাকথিত স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হলে জনাব খসরুজ্জামান কিশোরগঞ্জের ব্যাংকসমূহ লুট করে ভারত পলায়ন করেন।

তিনি আমার বন্দী কক্ষে প্রবেশ করে উত্তেজিতভাবে চিৎকার করে বলেন- ‘আমিন কোথায়?’ আমি দাঁড়ালে তিনি বলেন, “দু’পয়সার ইসলামের জন্য জিহাদ করেছিলেন। এখন আমার হাতে পিস্তল থাকলে গুলী করতাম।” মওলানা আতহার আলী সাহেবের উদ্দেশ্যে বলেন- “শিয়ালের কান্না গেল কোথায়? শিয়ালের কান্নায় পাকিস্তান রক্ষা হল না? ঘৃণা হয়, এদের মুখ দেখতে।” এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, জনাব খসরুজ্জামান ছাত্র সংগঠন এনএসএফ-এর সাথে জড়িত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি মোজাফ্ফর ন্যাপের সাথে জড়িত হন।

সেই একই রাত্রে মুক্তিফৌজ আমার ৫শ’ টাকা জুতা মাফলার আর হাতঘড়িটা নিয়ে গেল। এছাড়াও যার কাছে যা ছিল সবই তারা জোর করে ছিনিয়ে নিল। সকালবেলা আমরা হিন্দুস্তানী ফৌজদের জানালে তারা সেই সব মুক্তিফৌজদের কাছ থেকে অপহৃত টাকা পয়সা ও জিনিসপত্র ফিরিয়ে দেয়ার আশ্বাস দেয়। কিন্তু সেসব কোন দিনই আর ফিরে আসেনি। আমরা জানতাম কোন দিন ওসব আর ফিরে আসবে না। তথাকথিত আন্দোলনের শুরু থেকে দিনে দিনে আওয়ামী লীগ কর্মীদের মধ্যে যে লুট করার মানসিকতার সৃষ্টি করা হয়েছে, এমন কোন যাদুর কাঠি নেই যা দিয়ে এ মানসিকতার আমূল পরিবর্তন সম্ভব। অবাঙালীদের সম্পদ লুট করার মধ্য দিয়ে কর্মীদের বিবেককে কেড়ে নেয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তারা গ্রাম-গঞ্জের নিরীহ মানুষের সম্পদ লুট করে। লুট করে অগণিত কুমারী মেয়ের ইজ্জত। পক্ষান্তরে আমরা বিশেষ করে আলবদরদের কথা বলছি, সাধারণ কর্মীদেরকে কড়া দৃষ্টির মধ্যে রাখতাম। কোন দুর্বলতা কোন অভিযোগ কোনভাবে এসে পড়লে তড়িঘড়ি এ ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হত। এমনকি আমাদের চোখের সামনে কারো দ্বারা কোন অঘটন ঘটলে তার প্রতিকার করেছি আমরা নিজেরাই।

যাই হোক, একদিন ছাত্রলীগের ভিপি আফজাল জানিয়ে গেল, তার ভাষায় 'বঙ্গবন্ধু' ফিরে আসলে বিচার করা হবে। কাউকে আর মারা হবে না। তবে লড়াই করলেও আপনাদের ব্যাপারে কোন নোংরামীর দৃষ্টান্ত জানা নেই। অষ্ট্রগ্রামের ফিরোজ সাহেবও অনুরূপ অভিমত ব্যক্ত করলেন।

আহতদের আর্তনাদ, দুঃসহ যন্ত্রণা এবং সার্বক্ষণিক মানসিক চাপের মধ্যে একে একে ৩টা দিন পেরিয়ে গেল। আমার মনে হত যেন আমরা ১৬ ডিসেম্বরে মরে গেছি। এখনকার নির্যাতনকে কবরের আযাব বলে আমার মনে হতে লাগল। দলের পর দল এসে আমাদের উত্যক্ত করতে লাগল। জয়বাংলা বলার জন্য চাপ দিতে লাগল। আমাদের কেউ চাপের মুখে সেই ঘৃণিত শ্লোগান উচ্চারণ করেছিল কি না আমার তা জানা নেই। তবে এ সংক্রান্ত একটি মর্মান্তিক ঘটনা আমাকে আজও পীড়া দেয়।

বন্দীদশার তৃতীয় রাত্রে, সম্ভবত ২১ ডিসেম্বরের রাত সেটি। মুক্তিফৌজের একটি দল এসে উপস্থিত হল। আমাদের বন্দী জীবনের সাথী একজন এ্যাডজুটেন্টকে ধরে নিয়ে গেল আমাদের কাছ থেকে। যাবার সময় কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বিদায় নিলেন তিনি। তার সেই বিদায়ই যে শেষ বিদায় এমনটি ধারণা করেনি কেউ। পরে জানলাম জয় বাংলা বলার জন্য তাকে চাপ দেয়া হয়। বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাকে ক্ষত বিক্ষত করা সত্ত্বেও জয় বাংলা উচ্চারণ করাতে ব্যর্থ হয় নির্মম মুক্তিফৌজেরা। পক্ষান্তরে প্রতিটি বেয়নেট চার্জের সাথে সাথে নারায়ে তাকবীর আল্লাহু আকবর ধ্বনি উচ্চারণ করছিলেন এবং লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মোহাম্মাদু রাসূল্লাহ (সাঃ) বলতে বলতে তিনি শাহাদাতের ঐশী নেশায় বুঁদ হয়ে গেলেন চিরদিনের জন্য।

আরও বেশ ক’টা দিন চলে গেল অন্তহীন আযাবের মধ্যে। এরপর দু’জন মুক্তিযোদ্ধা আমার কাছে আসল, একজন সুমুজ আলী আর অন্যজন গিয়াসউদ্দিন। এই গিয়াসউদ্দিন যুদ্ধ শুরু হবার আগে ইসলামী ছাত্র সংঘের কর্মী ছিল। তার উপস্থিতি সেই আত্মিক সম্পর্কের টানে কিনা জানিনা; তবে সে আমার জন্য অত্যন্ত ভয়াবহ ও মর্মান্তিক সংবাদ নিয়ে এসেছিল, যেটা আমার না শুনলেই বোধ হয় ভাল ছিল। তার কাছ থেকে জানলাম, আমার ফুফা মধুমুন্সী যিনি ২৫ বছর ধরে কখনো ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান কখনো সদস্য হয়ে দেশ সেবা করছেন তাকে হত্যা করা হয়েছে। ভগ্নিপতি আলাউদ্দিন মোল্লাকে এবং তার চাচাত ভাই মুর্তজা আলী মোল্লাকে গুলী করা হয়েছে। মামা আমান মেম্বার নিহত। ফুফাত ভাই বাদশাহ মিয়াকেও বাঁচিয়ে রাখেনি। অন্য আর এক আত্মীয় জজ মিয়াও আর নেই। এছাড়া আরও অনেক প্রতিবেশীকে নির্মমভাবে হত্যার ইতিবৃত্ত বর্ণনা করে গেল গিয়াসউদ্দিন আমি নির্বাক হয়ে শুনে গেলাম। যেন আমার কানে গলিত লোহা ঢেলে দিল। অসহ্য যন্ত্রণায় আমার দু’চোখ বেয়ে ব্যথার অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আমার মনে হল সম্ভবত ঘাতকরা আমার সামনে দাঁড়িয়ে। আমার ধারণা এ হত্যার পেছনে সন্ত্রাসী বদর এবং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মুর্তুজ আলী ও সমুজের সক্রিয় হাত ছিল।

প্রাসঙ্গিকভাবে আমাকে একটা কথা বলতে হয়। গিয়াউদ্দিনের সহযোগী সুমুজ আলী ও বদরের অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে ক্রুদ্ধ জনতা তাদেরকে হত্যা করে এবং পরে টুকরো টুকরো করে। পরে আমি লৌহ যবনিকার অন্তরাল থেকে এ খবর শুনতে পাই। নিউটনের তৃতীয় সূত্র যেন বস্তুর সীমা পেরিয়ে নৈতিকতায় এসে পড়েছে। এই সূত্রে বলা হয়, প্রত্যেক ক্রিয়ার সমমুখী ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে। আল-কোরআনের সূত্রে বলা হয়, 'আমি যদি জালেমকে দিয়ে জালেমকে শায়েস্তা না করতাম তাহলে পৃথিবীটা জুলুমে পরিপূর্ণ হয়ে যেত।'

আমাদের সেনাবাহিনীর হেফাজতে নেয়ার কয়েক মাসের মধ্যে সরকারী স্কুল থেকে পিটিআই-এ স্থানান্তরিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়। মুক্তিফৌজ ও যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্টদের মন-মানসিকতায় এমন একটা কমপ্লেক্সের সৃষ্টি হয় যাতে আমাদেরকে শারিরীক মানসিক নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে তারা মানসিক সুখ অনুভব করতে থাকে। তাদের বিবেক আর অনুভূতি এমনই পাথরে পরিণত হয় যে, সাধারণ সৌজন্য ও মহানুভবতা এবং উত্তম চিন্তা-চেতনার একটুও অবশিষ্ট ছিল না। যাই হোক, পিটিআই-এ আমাদের নিয়ে যাবার সময় বন্দীদের দুটো সারিতে দাঁড় করানো হল। একটি সারির সম্মুখে দাঁড়াতে হল আমাকে। অন্যটির সামনে দাঁড় করানো হল শ্রদ্ধেয় মওলানা আতাহর আলী সাহেবকে। আমাদেরকে সরকারী স্কুল থেকে পিটিআই-এর দিকে হাঁটতে বলা হল। মুক্তিফৌজদের ধারণা ছিল, রাস্তার দু’পাশ থেকে বিক্ষুদ্ধ জনতা ক্ষোভ, ঘৃণা, ও তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের উক্তি দিয়ে আমাদের লাঞ্ছিত করবে। কিন্তু সেটা আর হল না। প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম এর উল্টো। রাস্তার দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকদের চোখ দেখলাম অশ্রুসজল। কারো মুখে কোন কথা নেই। এমন কি শিশুরাও বোবার মত দাঁড়িয়ে আছে। এরা ছিল আমারই প্রতিষ্ঠিত শিশু প্রতিষ্ঠান শাহীন ফৌজের সদস্য। আমার মনে হতে লাগল, ১৭৫৭ সালে সিরাজের স্বপক্ষে যারা সত্যিকারভাবে লড়াই করেছিলেন তাঁদেরকেও ইংরেজ ও তার দালালেরা এমনি করে জনতার সামনে দিয়ে নিয়ে গেছে। ১৮৫৭ সালের আযাদী আন্দোলনের সিপাহীদের করুণ পরিণতি দেখতে হয়েছে এদেশের নিরুপায় মানুষকে।

জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহ। দিনটা ঠিক আমার মনে নেই। কোন এক সকালে দেখলাম কয়েকজন সাবেক ইপিআর অর্থাৎ বর্তমান বিডিআর এর সদস্য আমার কক্ষে এসে আমাকে বলল, আপনাকে ব্যারাকে তলব করা হয়েছে। আমি তৎক্ষণাৎ তৈরি হয়ে গেলাম। তাদের অনুসরণ করে এগিয়ে চলেছি। যদিও তারা কেউ আমার গায়ে হাত তুলেনি কিন্তু বিভিন্ন কটাক্ষপাতের অবতারণা করে সারাটি পথ মানসিক যন্ত্রণা অব্যাহত রেখেছিল। অবশেষে স্টেডিয়ামের সন্নিকটে এসে পথচলা ক্ষান্ত হল। আমাকে নিয়ে আসা হল সামরিক বাহিনীর অস্থায়ী ব্যারাকে। একটি কক্ষে লেফটেন্যান্ট কামালের সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমি দেখলাম কামাল সাহেবের চোখে মুখে ভয়ংকর আক্রোশ আর ক্ষোভের চিহ্ন। মনে হল, কোন বিশেষ মহল থেকে আমার বিরুদ্ধে তার কানে বিষ ঢালা হয়েছে। আমাদের নিয়ে কামাল সাহেবদের মানসিক ভীতিও কম ছিল না। এতক্ষণ পিস্তলটা তার বালিশের কাছে ছিল। আমাকে দেখে তিনি তড়িঘড়ি হাতে নিয়ে পেছন দিকে সরিয়ে দিলেন। পরে আমাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, ‘তোমাদের কাউকে হত্যা করা হবে না। স্বাধীনতা যুদ্ধে যেসব ব্রীজ কালভার্ট নষ্ট হয়েছে, আমরা চাই তোমাদের হাতেই সেসব মেরামত অথবা নির্মাণ হোক।’ আমি নীরব থাকলাম। এ প্রসঙ্গে আমার অনুচ্চারিত অভিব্যক্তি প্রকাশ না করলেও মনে মনে বলেছিলাম, 'তোমাদের সমস্ত গুনাহর কাফফারা মৃত্যুর দোর-গোড়ায় এসেও আমাদের দিতে হবে, সে আমরা জানি। তোমরা ধ্বংস করবে আমরা গড়ব। তোমরা বিদেশীদের দালালি করবে আর দালাল হিসেবে চিহ্নিত হব আমরা। যুগে যুগে ইসলামের সৈনিকরা সমগ্র জাতির ভুলের মাশুল দিয়েছে তাদের জীবন দিয়ে।'

লেঃ কামাল বললেন, 'তুমি অনেক হত্যাযজ্ঞের নায়ক।’ আমি নীরব থাকলাম। কেননা তাদের আবেগের কাছে আমার সমস্ত প্রতিবাদ ও বক্তব্য অরণ্যেরোদন মাত্র। জিজ্ঞাসা করলেন,’তুমি কোথায় লেখাপড়া করতে?’ বললাম, 'ভৈরবের হাজী আছমত কলেজে।’ জিজ্ঞেস করা হল, ‘প্রিন্সিপাল তোমাকে জানেন?’ বললাম জানেন। তিনি তৎক্ষণাৎ টেলিফোন করলেন। সম্ভবত ভাইস প্রিন্সিপাল হানিফ সাহেব টেলিফোন রিসিভ করেছিলেন। তার সাথে আমার প্রসঙ্গে বেশ কিছুক্ষণ ধরে আলাপ আলোচনা হয়। তিনি কি বলেছিলেন আমি জানিনা। তবে লেঃ কামালের চেহারায় পরিবর্তন হতে আমি দেখেছি। রিসিভার রেখে দিয়ে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি মালেককে চেনেন?” বললাম, জ্বি হ্যাঁ, শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রনায়ক তিনি। ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে তাকে শহীদ করা হয়।’ আমি লক্ষ্য করলাম তার মধ্যে আমূল পরিবর্তন। আমাকে সম্বোধন এতক্ষণে ‘তুমি’ থেকে ‘আপনিতে পরিবর্তন হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের প্রথম দিকে আমাকে টুলে বসতে দেয়া হয়। আমি বসিনি, দাঁড়িয়ে ছিলাম এতক্ষণ। কামাল সাহেব চেয়ার এগিয়ে দিলেন। আমি বসলাম। তিনি বলে চলেছেন, ‘ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ার সময় আমি মালেককে জানতাম। খুব ভাল ছাত্র, তার মৃত্যুতে আমরাও আহত হই, যদিও আমি ছাত্র ইউনিয়নে ছিলাম। আমি বুঝতে পারি না, কি অন্ধ মোহে আপনারা এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নেমেছিলেন। ৮ কোটি মানুষের গণস্রোত ও প্রচণ্ড গতির সামনে কি করে আপনারা শূন্য হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই গতি পাল্টে দেওয়ার জন্য, ভাবলে বিস্ময়ে হতবাক হই। অথচ আপনারা লুট করেছিলেন এমনটিও নয়। বৈষয়িক সুবিধাভোগীও আপনাদের বলা যাবে না। আপনারা আলবদরে যারা রয়েছেন তারা চিন্তা-চেতনার ও যোগ্যতার নিরিখে বিচার করলে পেছনের সারি নন। অথচ ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, আপনারা আজ অন্ধ প্রকোষ্ঠে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন!’ আমি নীরব শ্রোতার মত শুনে গেলাম। এরপর আমার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে আসলেন তিনি। আমার পারিবারিক সমস্ত কিছু জানতে চাইলেন। আমার জবাবে পরিবারের যে ছয় জন নিহত হয়েছেন সে প্রসঙ্গ অনুক্ত রইল না। এরপর কামাল সাহেব বললেন, ‘গণবিরোধী ভূমিকা নেয়ার জন্য আপনার সমস্ত পরিবারকে বিরাট মূল্য দিতে হয়েছে। হয়তো বা আপনাকেও আপনার জীবন দিয়ে তার মূল্য দিতে হবে। আপনার কি মনে হয় না যে আপনি একটা বিরাট ভুল করেছেন?’

আমি বললাম, ‘আবেগ-তাড়িত হয়ে আমি কিছু করেছি বলে মনে হয় না। আমি যা করেছি অনেক চিন্তা ভাবনার মধ্য দিয়েই। আমাদের সিদ্ধান্ত সঠিক কি বেঠিক এটা নিরূপনের সময় এখনও আসেনি, আগামী দিনের ইতিহাস আমাদের ভূমিকা কিভাবে নিবে সেটাই বড় কথা। তবে এটা ঠিক, মুসলমান হিসেবে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার সামনে দ্বিতীয় কোন পথ খোলা ছিল না। নীরব দর্শকের ভূমিকা নেয়ার পথও ছিল বন্ধ। একটা পথ খোলা ছিল, ভারতে পাড়ি জমানো। হ্যাঁ সেখানে গিয়েও আমরা বিরাট দায়িত্ব পালন করতে পারতাম। কিন্তু সেটা আমার পক্ষে কোনদিন সম্ভব হতো না। কেননা হিন্দুস্তানী সাহায্যকে আমি ঘৃণা করি। মুসলমানদের সাথে তাদের হাজার বছরের বৈরী মানসিকতার আকস্মিক পরিবর্তন মোটেও শুভ মনে করতে পারি না। ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের দুর্বল করাই তাদের লক্ষ্য। মীরজাফর ইংরেজদের সহযোগিতায় সিরাজের পতন ঘটিয়ে নিশ্চয় মুসলমানদের জন্য, এমনকি তার জন্যও কোন কল্যাণ ডেকে আনেনি। ইতিহাসের একই ভুলের আবর্তে আমি পা রাখতে চাইনি।’

‘যখন পরিস্থিতি আমি অবলোকন করছি কোন পক্ষ অবলম্বন না করে, আমি যখন আমার অঞ্চলের মানুষগুলোকে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী এবং মুক্তি বাহিনীর নির্যাতন থেকে বাঁচাবার চিন্তা-ভাবনায় নিরত, ঠিক সে সময় কয়েকবার মুক্তি বাহিনী আমার বাড়ীতে হানা দিয়ে আমাকে হত্যার চেষ্টা চালায়। এর ফলে সাম্প্রতিক ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে তৃতীয় কোন অবস্থান নেয়ার পথ আমার জন্য রুদ্ধ হয়ে যায়। কাপুরুষোচিত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার মন-মানসিকতা কোনকালেই আমার ছিল না। আমি সঠিক বিচারে মন্দের ভাল হিসেবে সঠিক সিদ্ধান্ত ও সঠিক পথ মনে করে একাত্তরের ভূমিকায় অবতীর্ণ হই। এখন আমরা একতরফা প্রচারণার শিকার।’

দীর্ঘ আলোচনার মধ্যে লেঃ কামাল আমার খাওয়া-দাওয়া প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন। বললাম, ‘এ কয়দিন আমি ভাত খাইনি। অসুস্থতার অস্বস্তিতে আমি বিব্রত ছিলাম। আমার সহযোগী ভাইয়েরা কোথায় কিভাবে বাইরে থেকে খাবার ম্যানেজ করতেন, সেটা আমার জানা নেই। এসব খেয়েই রয়েছি এ কয়দিন।’ কামাল সাহেব বললেন, ‘আপনার খাওয়ার ব্যবস্থা করি, কি বলেন?; আমি দ্বিমত পোষণ করলাম না। আমাকে বাবুর্চিখানায় পাঠিয়ে দিলেন। আমি খেতে বসলাম। মনে হল আমি কতকাল খাইনি। আর সত্য বলতে কি এ কয়দিন গোস্ত খাওয়াতো দূরের কথা চোখেও সেসব দেখিনি। আমি পরম তৃপ্তিতে খেলাম। ভাতের চেয়ে গোস্ত খেলাম বেশী। এরপর ফিরে এলাম আবারও কামাল সাহেবের চেম্বারে। এসে দেখলাম এখানে কেউ নেই। আমি বসে থাকলাম। কামাল সাহেব ফিরে এসে কিছুটা আমার সাথে সহানুভূতিসুলভ হাল্কা আলাপ শুরু করলেন। ইতোমধ্যে হিন্দুস্তানী বাহিনীর ২ জন অফিসার এলেন। কামাল সাহেব তাদের অভিনন্দন জানিয়ে আমাকে নিয়ে তাদের সাথে হাসি-মশকারায় অবতীর্ণ হলেন। এক পর্যায়ে আমার সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমার পরিচয় দিতে গিয়ে ‘অনেক হত্যাযজ্ঞের নায়ক আমি’- এ কথা বলতে ভুললেন না। আমার মনে হল ভারতীয় অফিসাররা রাজপুত। তাঁরা কখনো হিন্দীতে কখনো ইংরেজীতে কথা বলছিলেন। তারা আমাকে বললেন, ‘বাংলাদেশের হাজার হাজার প্রগতিশীল ছাত্র ভারতে ট্রেনিং নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, তা সত্ত্বেও আপনি কেন দেশে রয়ে গেলেন?’ বললাম, ‘আমি ভারতকে কখনও হিতাকাঙ্খী মনে করিনি।’

তারা বললেন, ‘আপনার ধারণা ছিল পাকিস্তান টিকে যাবে এবং পাকিস্তানের কাছ থেকে বৈষয়িক সুযোগ সুবিধা নেয়ার ব্যাপারে সংঘাতকালীন ভূমিকা আপনার জন্য হবে একটি বিরাট সার্টিফিকেট।’ বললাম, ‘বৈষয়িক লোভ লালসার বাইরে থেকে আমরা আমাদের ভূমিকা রেখেছি। শুধুমাত্র ঈমানের দাবী আমার কাছে যা ছিল তাই করেছি। এর বাইরে চিন্তা করার কোন অবকাশই আমাদের ছিল না এবং এখনও নেই।’
- আপনি কী করতেন?
- ছাত্র ছিলাম। ছাত্র হিসেবে ছাত্র সংগঠন ‘ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্য ছিলাম।’
- আপনি কতজন লোক হত্যা করেছেন?
- ‘রণাঙ্গনে কতজন মরেছে সেটা আমার জানা নেই, আমি প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে ছিলাম না। সার্বিক পরিচালনা করেছি। নিজে গুলী চালানোর অবকাশ আমার ছিল না। তবে যুদ্ধ চলাকালীন কেউ নিহত হয়ে থাকলে তার দায়-দায়িত্ব আমারই, কেননা আমার নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে। কতজন মারা গেছে সেটা আমাদের চাইতে আমাদের প্রতিপক্ষরাই সঠিক বলতে পারবে। লড়াইয়ের ময়দানে হতাহতের ব্যাপারটা কোন বিশেষ ঘটনা নয়।’

তারা বললেন, ‘আপনাদের গ্রামে-গঞ্জে এবং মহকুমা শহরে যে প্রাচুর্য আমরা দেখেছি, আমাদের জেলা শহরগুলোতেও তেমন নেই, তা সত্ত্বেও এখানকার তরুণরা বিদ্রোহী হয়ে সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হল কেন এটা এখনও আমরা বুঝে উঠতে পারছি না।’ আমি এ প্রসঙ্গে নীরব থাকলাম। কামাল সাহেবকে দেখলাম তার দৃষ্টি নিচের দিকে। মনে হল, তাদের জন্য এটা একটা চপেটাঘাত। এরপর কামাল সাহেবের চেম্বার থেকে বিদায়ের পালা। সবাই একত্রে বেরুলাম। লেঃ কামাল আমাকে তার গাড়ীতে উঠতে বললেন। আমাকে আমার সেই অবস্থানে পৌঁছে দিয়ে তারা চলে গেলেন। আমি আমার সেই হল কক্ষে ঢুকে দেখতে পেলাম অনেকের অশ্রুসজল চোখ। মওলানা আতাহার আলী সাহেবসহ আমার সব সহযোগী অধীর আগ্রহে আমার সংবাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমাকে পেয়ে যেন তারা আকাশের চাঁদ হাতে পেলেন। তাদের ধারণা ছিল আমাকে আর তারা পাবে না। পাবে সেই এ্যাডজুটেন্টের মত আমার শাহাদতের সংবাদ। এতক্ষণ তারা দোয়া ‘ইউনুস’ পড়ে আমাকে জীবন্ত ফিরে পাওয়ার জন্য খোদার কাছে কান্নাকাটি করছিল। হয়তো আমার সেই সহযোগী আল্লাহর নির্যাতিত বান্দাদের দোয়ার বরকতে ফিরে আসতে পেরেছি। মজলুমের দোয়া নাকি আল্লাহ্ সাথে সাথে কবুল করেন। অনেকে এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমি তাদেরকে সমস্ত বিবরণ খুলে বললাম।

আর একদিন এক কালের আমার সহকর্মী বর্তমান মুক্তিবাহিনীর কমাণ্ডার গিয়াসউদ্দিন এসে উপস্থিত হয়ে আমার কুশল সংবাদ জিজ্ঞেস করল এবং বাড়ীর খবরাখবর দিল। গিয়াসউদ্দিন এও জানালো যে, আমার মা আমার জন্য কিছু খাবার তাকে দিয়েছিলেন আর দিয়েছিলেন আমার পরনের কাপড়। সেসব আমার অবস্থান পর্যন্ত এসে পৌঁছেনি। সে বলল যে, তার সহযোগীরা সব জামা কাপড় নিয়ে গেছে এবং খাবারগুলো খেয়ে ফেলেছে। এজন্য তাকে দুঃখ প্রকাশ করতেও দেখলাম। তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। এজন্য তাকে অন্যান্যদের কাছ থেকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে বলতে গেলে কানে কানে বলেছিলাম, ‘তুমি বরং আমার খালু মীর আশরাফ উদ্দিন আহমদ চেয়ারম্যান সাহেবের বাসায় যাও। ওখানে আমার জামা-কাপড় রয়েছে। সে সবের কয়েকটা আমাকে এনে দিলে আমার দারুণ উপকার হবে। তুমি আমার এ কাজটা করেই বরং বাড়ী যেও। এক জামা-কাপড়ে দারুণ বিব্রতবোধ করছি। নামাজ কালামেও তৃপ্তি পাচ্ছি না।’ গিয়াসউদ্দিন সেসব আমাকে এনে দিতে সম্মত হল। কিন্তু সে জামা-কাপড়ের একটিও আজ পর্যন্ত আমার হাতে এসে পৌঁছেনি। আমার স্যূটকূট জামা-কাপড়, জুতা, সেন্ডেল আর গেঞ্জী পরে তারা সদলবলে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। কিন্তু গিয়াউদ্দিনের পরনে সেসব কাপড় আমি দেখেনি। তার ভাষায়, ‘আমি আর সকলকে এড়িয়ে আপনার জিনিস পৌঁছাতে পারিনি।’ আমি অসহায়ের মতো নীরবে তাকিয়ে থাকলাম। সবচেয়ে করুণ ও দুঃসহ নির্মমতার প্রকাশ ঘটাতেও তারা ছাড়েনি। আমার পাশের গ্রামের এক তরুণীর সাথে আমার বিয়ের কথা আমাদের গার্জেন পর্যায়ে মোটামুটি ঠিক হয়েছিল। সেই তরুণীকে একজন মুক্তিযোদ্ধা বন্দুকের নলের মুখে বিয়ে করে এবং সেই বিয়েতে খালুর বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া সুটকেসটি উপহার দেয়া হয়। এসব ঘটনাসমূহের অবতারণা করা হয় আমাকে এবং আমার মা ও আত্মীয় পরিজনদের মানসিক যন্ত্রণা দেয়ার জন্য।

কিছুদিন পর আমাকে কিশোরগঞ্জ জেলে প্রেরণ করার ব্যবস্থা করা হয়। সোজা পথ দিয়ে অথবা গাড়ীতে জনমানুষের প্রদর্শনী ছাড়াও আমাকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু সেটা না করে আমাকে কলেজের পাশ দিয়ে বিভিন্ন পথ ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হল। এর একমাত্র কারণ, যেন আমি বিভিন্নভাবে জনতার হাতে লাঞ্ছিত হই। আমি যেন এখন এক খেলার সামগ্রী। আমাকে ঘিরে জনমানুষের ভিড় সৃষ্টি করাই হল পুলিশদের উদ্দেশ্য। কলেজের ছাত্ররা আমার প্রতি বিদ্রুপাত্মক উক্তি করুক এমনটি চেয়েছিল পুলিশেরা। কিন্তু সেটা হল না। পথিমধ্যে শুধুমাত্র কতিপয় কলেজ ছাত্রীর মন্তব্য আমার কানে এসেছিল। তা হল, ‘আলবদরের পান্ডাকে দেখ, নিয়ে যাচ্ছে।’ এরা আমাকে জানতো। কলেজের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের স্বপক্ষে ভাষণ দিতে দেখেছে। কারাগারের সম্মুখে দেখলাম অনেক মানুষের ভিড়। সকলে আমাকে দেখার জন্য সমবেত হয়েছে। আলবদরকে দেখার এমন আগ্রহ দেখে মনে হল, আমি যেন কোন এক ভিন গ্রহ থেকে এসেছি। এ দেশ এ মাটির সাথে আমার যেন কোন সম্পর্ক নেই অথবা কোনদিন ছিল না। সম্ভবত পত্র-পত্রিকার উদ্ভট প্রচারণা থেকে মানুষের আগ্রহ এমন তীব্র হয়েছে।

অনেক মানুষের ভিড়ের মধ্য দিয়ে আমাকে জেলের ভেতরে পা রাখতে হল। ভেতরে ঢুকিয়েই অফিসিয়াল কাজ সম্পন্ন হওয়ার সাথে সাথেই আমাকে একটা সংকীর্ণ প্রকোষ্ঠের ভিতরে ঢুকিয়ে দেয়া হল। আমার মনে হল গোটা দেশটা একটা কারাগার। সেই করাগার থেকে ছোট, ছোট থেকে অতি ছোট কারাগারে প্রবেশ করলাম, আওয়ামী লীগের ঔদ্ধত্বের কাছে অসহায় কারা কর্তৃপক্ষের মেহেরবানীতে। এখানে আমাকে নিয়ে দাঁড়াল ৭ জন। অথচ খুব বেশী হলে স্থান সংকুলান হয় ৩ জনের। এখানে যারা ছিল, যদিও এরা মানুষ কিন্তু তাদের চাল-চলন, আলাপ আলোচনা ও তাদের সমস্ত অভিব্যক্তি থেকে মনে হত এরা নর্দমার কীট। গনোরিয়া সিফিলিসের রুগী এরা। সারাক্ষণ তাদের আলাপ আলোচনায় সারা জীবনের অপকর্মের ফিরিস্তি একে অপরের কাছে অকপটে প্রকাশ করছে। এদের সাথে আলাপ আলোচনা অথবা কোন রকম কথা বলার আগ্রহ কোন সময়েই আমার জাগেনি। আমি ৬টি লোক সাথে পেয়েও একান্ত একা। নির্লিপ্ত হয়ে সারাক্ষণ বসে অথবা শুয়ে কাটাতম, আমার জীবন মৃত্যু যার হাতে, সেই মালিকের রহমত কামনা করে। পরে জেনেছিলাম, এই অন্ধ প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করানোর মূলে ছিলেন আমারই মত ২জন বন্দীর বিভ্রান্তিকর প্রচারণা। তারা হচ্ছে শান্তি কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সাবেক মহকুমা অফিসার ও মুসলিম লীগ নেতা বাদশাহ মিয়া। তারা কারা কর্তৃপক্ষ ও আওয়ামী লীগের করুণা ও রহমতের প্রত্যাশায় আমাকে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তারা ধারণা দিয়েছিল, সমস্ত অপকর্মের নায়ক আমি। অথচ তাদের প্রকোষ্ঠে আর একজন থাকতেন এডভোকেট সাইদুর রহমান আরো অনেকে। তারা আমাকে নিয়ে কোন খারাপ ধারণা ব্যক্ত করেননি। বরং আমার প্রতি ছিল তাদের গভীর মমতা।

ছয় জন কারাসঙ্গী থাকা সত্ত্বেও আমি একা। আমার একাকীত্ব আমাকে নিমগ্ন করেছে পুরোপুরি। আমার ফেলে আসা বিক্ষিপ্ত স্মৃতিগুলো কুড়িয়ে কুড়িয়ে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করছি। আর আত্মবিশ্লেষণ করে চলেছি সারাক্ষণ। মনের পর্দায় ভেসে উঠছে...।

সত্তরের নির্বাচন শেষ। রাজনৈতিক দিক দিয়ে দেশটা যেন দুটো ভাগ হয়ে গেল। একদিকে উগ্র আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ অন্যদিকে ইসলামী সমাজতন্ত্রের ইউটোপিয়া। দুটোরই অবাস্তব কাল্পনিক স্বাচ্ছন্দের প্রতিশ্রুতি আর চোখ ঝলসানো প্রাচারণার তোড়ে সমগ্র জাতিটা দুটো শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে। জাতির অনাগত ভবিষ্যতের ভাবনা যাদের তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছিল নির্বাচনের রায় ঘোষণার পর তারা নির্বাক হয়ে পড়ল। অতি আশায় উচ্ছল কোটি কোটি মানুষ হল প্রত্যাখ্যাত। এই প্রত্যাখ্যান পর্যায় স্বাভাবিক পথ ধরে হয়েছে এমনটি বলা যায় না। আমরা দেখেছি আওয়ামী লীগের পোষা গুণ্ডাদের দ্বারা আমাদের সহকর্মী বহু পোলিং এজেন্টকে পোলিং বুথ থেকে লাঞ্ছিত হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে। পশ্চিম পাকিস্তানের দৃশ্য এর চেয়ে ভিন্ন কিছু ছিল বলে আমার জানা নেই। এমনটি হবে এটা অনেকেই আঁচ করেছিল অনেক আগে থেকে। ঢালাও পয়সার বিনিময়ে এবং পোষা গুণ্ডাদের উগ্র মানসিকতার প্রকাশ ঘটিয়ে জাতির বিবেককে কেনার সামর্থ্য আওয়ামী লীগ অর্জন করেছিল। বেশ কিছু আগে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিব ভাষণ দেয়ার সময় টাকা সংগ্রহের জন্য শত শত ড্রাম বসান হয়েছিল। এ থেকে কত টাকা সংগ্রহ হয়েছিল। সেটা বলা হয়নি। তবে এর অছিলায় কোটি কোটি টাকার হিন্দুস্তানী মদদ জাতীয়তাবাদী নেতা শেখ মুজিবের হাতের মুঠোর মধ্যে এসেছিল পাকিস্তান ভাঙ্গার জন্য। এটা অনেকেই টের পেয়েছিলেন। কিন্তু এর বিরুদ্ধে কিছু বলবার হিম্মত ছিল না অনেকের।

এ প্রক্রিয়া কোন তাৎক্ষণিক প্রক্রিয়া নয়। এর শুরু অনেক আগে থেকে। বলতে গেলে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রথম দিন থেকে এর মূল উদগাতা আওয়ামী লীগ অথবা শেখ মুজিব কেউই নয়। এর নেপথ্যে যাদের কালো হাত সবচেয়ে সক্রিয় ছিল সেটা হল কমিউনিস্ট পার্টি ও সমাজতান্ত্রিক সংগঠনগুলো। আর এ ব্যাপারে সর্বাত্মকভাবে সুযোগ সৃষ্টি করেছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ।

পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে পাকিস্তানের প্রতিশ্রুত আগামী দিনগুলোকে নিয়ে শুরু হয় প্রসাদ ষড়যন্ত্র। যে দ্বিজাতি তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে উপমহাদেশের মানচিত্র ভেঙে খণ্ড-বিখণ্ড হয়, পাকিস্তান সৃষ্টির পর সেই দ্বিজাতীয় তত্ত্বকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় অস্বীকৃতি জানানোর প্রয়াস অব্যাহত থাকে। পাকিস্তান সৃষ্টির সূচনা লগ্নে কোটি কোটি ইসলামী জনতার উদ্দেশ্যে যে বাণী সম্প্রচারিত করা হয়েছিল সেটা হল কায়দে আযমের ভাষায়, ‘আমাদের নতুন শাসনতন্ত্রের প্রয়োজন নেই। ১৪শ’ বছর আগে এটি রচিত হয়েছে। আমরা তার প্রতিফলন ঘটাব মাত্র।’ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সেটাকে পাশ কাটিয়ে যাবার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো হয়, এরও কারণ রয়েছে। জনগণের আবেগ ও মন-মানসিকতা ইসলামিক হওয়া সত্ত্বেও নেতৃত্ব যাদের হাতে এসে পড়ে, তারা হচ্ছেন নবাব, জমিদার ও গোলামী মনোবৃত্তি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে বৃটিশ প্রণীত শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষিত তথাকথিত এলিট গোষ্ঠী। তাদের মন-মানসিকতায় ইসলামী চেতনার ক্ষীণতম আলো বিরাজ করলেও ইসলামী জীবন-বোধ সম্বন্ধে তাদের অন্তঃকরণে সটিক ধারণা অনুপস্থিত ছিল। এর ফলে যা হবার তাই হয়েছে। ইসলামী জনতার দাবী হয়েছে উপেক্ষিত। তাদের আন্দোলন ও বক্তব্যকে চিহ্নিত করা হয়েছে ধর্মীয় উন্মাদানা বলে এমনকি তাদেরকে পাকিস্তান বিরোধী হিসেবে চিহ্নিত করে বিষোদগার করা হয়েছে বার বার।

আলেমদের মধ্যে অখণ্ড ভারতের প্রবক্তা মওলানা আবুল কালাম আযাদ ও মওলানা মাদানীর কাতারে টেনে এনে ইসলামের অগ্রনায়কদের ভাবমূর্তিকে খাটো করার জন্য তাদেরকে পাকিস্তানের শত্র“ ও ভারতের দালাল হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়েছে। এমনকি ক্ষেত্র বিশেষে এদের বিরুদ্ধে গুণ্ডাও লেলিয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে প্রকৃত পাকিস্তান বিরোধীরা এক পা এক পা করে নেপথ্য যবনিকা থেকে রাজনৈতিক মঞ্চে এগিয়ে আসতে শুরু করে।

জামায়াত যখন আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের দাবীতে গণআন্দোলন শুরু করার আয়োজন-উদ্যোগ নেয় তখনই ছাত্রদের মাধ্যমে ৬ দফা রাজনৈতিক ময়দানে আনাগোনা শুরু করে। পঁয়ষট্টির যুদ্ধে পাকিস্তানের কাছে মার খেয়ে হিন্দুস্তান পিছন দিক থেকে এ জাতিকে ছুরিঘাত করার চেষ্টা নেয়। ৬ দফা আওয়ামী লীগ প্রণয়ন করে থাকলেও প্রকৃত পক্ষে এটা আসে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র‌্যাডের টেবিল থেকে সময় মত আগরতলা ষড়যন্ত্রের রহস্য ও উদঘাতি হয়। আওয়ামী লীগ তখন ময়দান থেকে বিচ্ছিন্ন। শুধু মিজানুর রহমান চৌধুরী ও আমেনা বেগম আওয়ামী লীগের নিভু নিভু বাতি জ্বেলে রেখেছিলেন কোন মতে।

ছাত্রদের মধ্যে র‌্যাডের এজেন্টরা ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করে। তখন রাজনৈতিক দিক দিয়ে তাদের সহায়ক শক্তি ছিল ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি। ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে এরা সিদ্ধহস্ত। গণআন্দোলন যখন তুঙ্গে, যখন আইয়ুব খানের সাথে বোঝাপড়া হবে, এ সময় ১১ দফাকে আকস্মিকভাবে গণআন্দোলনের জোয়ারে ছেড়ে দেয়া হয়। বামপন্থী সাংবাদিকতার সুবাদে ১১ দফা ব্যানার হেডিং-এ সবক’টি দৈনিকে প্রকাশ পেতে থাকে। এতে ছিল আওয়ামী লীগের ৬ দফা আর বাকীটা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির প্রোগ্রাম। রুশ-ভারত ষড়যন্ত্র হাত ধরে পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে। এই মোর্চা থেকে আগরতলা ষড়যন্ত্রের মূল নায়ক শেখ মুজিবের মুক্তির দাবী উঠল। এ দাবীও গণজোয়ারে ছেড়ে দেয়া হল। ফলে ধিকৃত ষড়যন্ত্রের নায়কের মুক্তির দাবীটা জনগণের আওয়াজে পরিণত হতে দেরী হল না। জামায়াতে ইসলামী ও অন্যান্য ইসলামী দল এটাকে এড়িয়ে যেতে পারল না। পরবর্তীতে ষড়যন্ত্রকারী ভারতের দালাল পরিণত হল জাতীয় হিরোতে।
আল্লাহ আসন্ন বিপদের লাল সংকেত দিয়েছে সময় মত এবং বার বার। তা না হলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে মালেক ভাইয়ের মত চরিত্রবান ও সেরা ছাত্রের শাহাদাত সে সময় হল কেন? অথচ এই আসন্ন ঝড়ের সংকেত বুঝল না ইসলামপন্থীরা। তারা সংঘবন্ধভাবে বাতিলের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে ব্যর্থ হল।

সত্তরের ১৮ জানুয়ারী পল্টন ময়দানে ইসলামী জনতার রক্ত ঝরার পরও ইসলামপন্থীরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারল না। ওটাও ছিল আসন্ন ঝড়ের সংকেত। আমি পল্টনে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে দেখেছি কি ভয়াবহ দৃশ্য! একটা কারবালা যেন। শত শত মানুষকে রক্তাক্ত হতে দেখেছি। শহীদও হয়েছে কয়েক জন। অথচ ষড়যন্ত্রকারীরা রাত্রে মাইক যোগে প্রচার করেছে, ‘নিরস্ত্র জনতার ওপর জামায়াতে ইসলামী গুণ্ডাদের নির্লজ্জ হামলা।’ কি বিচিত্র এদেশ সেলুকাস!

এইভাবে আওয়ামী লীগ তাদের সুপরিকল্পিত প্রচারণা দিয়ে জনতার বিবেককে ধীরে ধীরে অন্ধতার দিকে টেনে নিয়ে চললো। সরকার নিরপেক্ষতার আবরণ দিয়ে তার চোখ দুটোকে বেঁধে রাখলো। আওয়ামী লীগের কালোহাত প্রশাসনকে পর্যন্ত স্পর্শ করলো। সরকারের নীরবতার সুযোগে হিন্দুস্তান আওয়ামী লীগের মাধ্যমে পাকিস্তানে যা কিছু করতে চেয়েছিল তার সবটাই নির্বিগ্নে করতে পেরেছে। এতে মদদ দিয়েছে- সরকার, মদদ দিয়েছে ভুট্টো, মদদ দিয়েছ অন্যান্য সব ক’টি দল। বলতে গেলে পরোক্ষভাবে জামায়াতে ইসলামীও।

নির্বাচন অনুষ্ঠিত হল ফ্যাসীবাদী কায়দায়। দুই দিকে দুই জাহেলিয়াতী শক্তি মাথা তুলে দাঁড়ালো। মুজিব-ভুট্টো স্পস্ট বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে জনগণকে নিয়ে চললো এক ভয়ঙ্কর সংকটের দিকে। ইয়াহিয়া মুজিবের ষড়যন্ত্র অনুধাবন করল। কিন্তু ভূট্টোকে আন্দাজ করতে ব্যর্থ হল। রাজনীতিতে শুরু হল অরাজকতা। মুজিব-ভূট্টো যা চেয়েছিল দেশ সে অবস্থায় এসে উপনীত হল।
অপরাধ করতে করতে আওয়ামী লীগের দুঃসাহসিকতা সীমা ছাড়িয়ে গেল। যখন হত্যাযজ্ঞ শুরু হল অবাঙালীদের ওপর, যখন জাতীয়তাবাদের হাতিয়ার গর্জে উঠল পশ্চিম পাকিস্তানী সৈনিকদের লক্ষ্য করে, তখন সরকারের টনক নড়ল। তখন যমুনার পানি অনেক দূর গড়িয়ে গেছে। গোটা দেশে তখন কারবালা সংঘটিত হয়ে গেছে। প্রায় প্রতিটি অবাঙালী বসতি উজাড় হয়ে গেছে। এটাও ছিল হিন্দুস্তানী পরিকল্পনা। অবাঙালী ও ইসলামপন্থীদের হত্যাযজ্ঞের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান বাহিনীর নির্বিচার নিপীড়ন শুরু হলে স্বাভাবিকভাবে বাঙালীরা হিন্দুস্তানে পলায়ন করবে। তারপর সেখান থেকে পাকিস্তানকে পাকিস্তানী দিয়েই ভেঙে টুকরো করা যাবে।

একই সূত্র থেকে একই পরিকল্পনার পথ ধরে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি এগুতে লাগলো। ভূট্টোর দোসর টিক্কা খানের সামরিক অপারেশন ভয়াবহতা সৃষ্টি করলো। দুষ্কৃতিকারী আর প্রকৃত অপরাধীরা ততক্ষণে সীমান্তের ওপারে। নিরীহ সাধারণ মানুষেরা সহানুভূতির বদলে পেল সামরিক অপারেশনের ভয়বাহতা।

এক ভয়ঙ্কর দুশ্চিন্তা নিয়ে তখন আমি গ্রামের বাড়ীতে। এখান থেকে প্রকৃত পরিস্থিতি আঁচ করতে পারছি না। সম্পূর্ণ অন্ধকারে আমি বিদিশা। দেশের ভবিষ্যত নিয়ে দারুন উদ্বিগ্ন। এক নীল নক্সার শিকার হয়ে আমরা দেশের ৮কোটি মানুষ কী সাধ করে হিন্দুস্তানের পায়ের তলে আশ্রয় নিতে যাচ্ছি!

হিন্দুস্তানের মদদ কি পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানদের জন্য কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারবে? এ প্রশ্ন আমি আমাকে জিজ্ঞাসা করেছি বার বার। এখন আমরা কি করতে পারি? অশান্ত উদ্বেল দেশটাতে কিভাবে শান্তি ফিরিয়ে আনা যাবে? এমন শত শত প্রশ্ন, শত শত সমস্যার পাঁকে যেন আমি হারিয়ে যাচ্ছি।

আমার এ উদাস উদভ্রান্ত অবস্থা দেখে মা দারুণ বিব্রত বোধ করেছিলেন। মা এক সময় আমাকে বললেন- ‘তুমি এভাবে বাড়ীতে বসে থাকলে পাগল হয়ে যাবে। যাও বাজারের দিক থেকে ঘুরে আসতো।’ মার কথায় আমি দ্বিমত পোষণ করলাম না। আমি বাজারের দিকে পা বাড়ালাম। আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে চলছি আঁকা বাঁকা মেঠো পথ ধরে। সবকিছু শূন্য মনে হচ্ছে। খাঁ খাঁ করছে সবকিছু। দু’পাশে কড়োই গাছ ঝিম ধরে আছে। ঝিম ধরে আছে বিশ্বপ্রকৃতি। এত পরিচিত এই পথঘাট, এই এত আপন আমার এ গ্রামটা। এই মাটি, এই ভূখণ্ড যেখানে আমি লালিত হয়েছি, যেখানকার সৌন্দর্য সুষমা পান করে আমি বেড়ে উঠেছি। মাটির সোঁদা গন্ধ আর মউলের সুরভী শুঁকে শুঁকে আমি জীবনটাকে উপলব্ধি করেছি। এই গ্রামবাংলার সাথে আমার কি নিবিড় সম্পর্ক অথচ আমি ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। ষড়যন্ত্রের রাজনীতির কাছে সুস্থ রাজনীতি বিপন্ন। জগতশেঠ আর মীরজাফরের রাজনীতির কাছে মীরমদনের রাজনীতি ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে।

হাঁটতে হাঁটতে এসে পড়লাম অষ্টগ্রাম বাজারে। এসে ঢুকলাম ভূঁইয়াবাড়ীর চা স্টলে। এখানে লোকজন কম মনে হল না। জমজমাট চা বেচাকেনা চলছে। কিন্তু চেনা মুখ চোখে পড়ছে না আমার সবই যে অপরিচিত মুখ। আমি ভাবছি আমার মানসিক অবস্থা কি সব মানুষকে অপরিচিত করে দিয়েছে? নাকি এরা সব নবাগত! আমি এমন একটা ভাবনার মধ্যে রয়েছি এমন সময় দেখলাম , আমার এক পরিচিত মুখ কাজী বারী। মোমেনশাহী জেলা ন্যাপের সহ-সভাপতি। কোন এক সময় তার কর্মী ছিলাম আমি। অন্ধতার ঘোর কাটলে আমি অবস্থান নিই তার বিপরীত বলয়ে। আমাকে দেখেই কাজী বারী সদম্ভে বললেন- ‘কি আমিন, তোমার সিনা তো বেশ চওড়া হয়ে গেছে।’ তার কথাটা শুনেই আমার চেতনা ফিরে আসলো। আমি এখন স্পষ্ট বুঝলাম, এ অপরিচিত মুখগুলো এখানে কেন? বুঝলাম আমি আমার অজান্তে শত্র“র বেষ্টনীর মধ্যে এসে পড়েছি। ঘটনার আকস্মিকতায় একটা তাৎক্ষণিক বিহবলতা আমার মধ্যে এলেও আমি নিজেকে সামলে নিয়ে একটুখানি চাতুরির আশ্রয় নিলাম। বললাম, ‘বারী ভাই যে’। চায়ের দোকানীর উদ্দেশ্যে বললাম-‘বারী ভাই আর আমার জন্য লাগান ২ কাপ চা। বিস্কুটও দেন, আমি এক্ষুণি আসছি।’ কাজী বারী আমার মধ্যে কোন কৃত্রিমতা আঁচ করতে পারল না। আমি কেটে পড়লাম। কিন্তু সমস্ত বাজারটা আমার কাছে মনে হতে লাগলো আমার শত্র“। মনে হচ্ছিল সবাই যেন আমার পিছে ধাওয়া করছে। আমি ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে চলছি। চলার পথে দেখলাম হাফেজ আবদুল হাইও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। চাপা কণ্ঠে বললেন- ‘এখানে কেন। তাড়াতাড়ি সরে যান। ইপিআর, আওয়ামী লীগ আর কমিউনিস্টরা বাজারে ক্যাম্প করেছে। মওলানা আব্দুল গণি খান সাহেবের বাড়ীর সকলকে হত্যা করেছে। এদের টার্গেটে আপনিও আছেন। বাড়ীতেও থাকবেন না।’ বাজার একটু আড়াল হলে আমি দৌড় দিলাম আমার সমস্ত শক্তি দিয়ে।

বাড়ী এসেই বাবা-মাকে নিয়ে বসলাম। পরিস্থিতির সমস্তটাই বিশ্লেষণ করে বললাম-‘আমি নীরব দর্শকের ভূমিকা নিলেও এরা আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে না। এ অবস্থায় আমি কী করতে পারি?
বাবা বললেন-‘ কোন বুজদীলের মৃত্যু মুসলমানের নয়। তোমাকে আল্লাহর রাস্তায় ছেড়ে দিয়েছি। যে কোন মূল্যে আল্লাহর পথে থাকাই উত্তম।’ মা বললেন-‘এই পরিস্থিতিতে তোমার যা ভাল মনে হয় তাই করো। তোমার পথ আগলে রাখতে চাই না।’

আমার সে রাত্রে ঘুম নাই। আমি সারা রাত ঘুরে ঘুরে আমার বন্ধু বান্ধব ও নিজস্ব লোকদের সাথে যোগাযোগ করলাম। দেখলাম সবাই আমার মতই চিন্তা করছে। ভারতীয় প্রচারণার ধূম্রজালে এরা কেউ আটকেনি। নিজস্ব চিন্তার পরিসর দিয়ে সবাই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছে।

রাত ভোর হয়ে এল। ফজরের নামাজ শেষ করে বাবার কাছে বিদায় নিলাম। আমাকে অনিশ্চিতের মধ্যে ছাড়তে বাবার অন্তর কাঁদছিল। আমি তার মুখে দেখেছি হাসি কিন্তু সে হাসির আড়ালে কি দারুণ বেদনা লুকিয়ে আছে, একমাত্র পুত্র হয়ে সেটা অবশ্যই আমি উপলব্ধি করি। মা’র চোখ দেখলাম অশ্রুসজল। সূর্য উঠার আগেই আমি গ্রাম ছাড়লাম। কখনো হেঁটে, কখনো নৌকায়, আমি এসে পৌঁছলাম ভৈরব।

২৫ মার্চের পর এই প্রথম পা রাখলাম ভৈরবে। এখানে আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। কেমন যেন স্থবির মনে হল। প্রাণের প্রাচুর্যে ভরা এই ভৈরব যেন ঝিমিয়ে পড়েছে। একটা প্রচণ্ড ঝড় যেন বয়ে গেছে এই ভৈরবে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস না করে আমি এগিয়ে চলছি। চকবাজারে এসে থমকে দাঁড়ালাম। হাজী সবদের আলী সাহেবের দোকানের ভেতরে ঢুকতেই হাজী সাহেব আমাকে দেখে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। বললেন, “ওদের বাঁচাতে পারলাম না। মনসুরের বাবা-মা ভাই-বোনকে বাঁচাতে পারলাম না। ওরা সব শেষ।”

আমি তার কথা বুঝলাম না। অনেক জিজ্ঞাসা নিয়ে হতবাক হয়ে তার দিকে চেয়ে আছি। তিনি বলে চলছেন, ‘এখানকার সব অবাঙালীকে হত্যা করা হয়েছে। মনসুরের বাবা, মা, ভাই বোন সহ ৫শ’ বিহারীকে ব্রাক্ষ্মবাড়িয়া নিয়ে হত্যা করেছে। মনসুরকে আমার দোতালায় লুকিয়ে রেখে বাঁচিয়েছি।’ আমার চোখ ফেটে অশ্রু গড়িয়ে এলো। মনুসর আমার ঘনিষ্ঠতম বন্ধু, ডিগ্রীর ছাত্র। আজ সে এতিম সর্বহারা। আমার ভেতরের মানবিক সত্তা জেগে উঠল। আমার অন্তরের ঘুমন্ত সিংহ গর্জে উঠল যেন। এইসব জুলুম অত্যাচার আর অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শপথ নিলাম। বিভিন্ন সূত্রে আমি জানলাম, এসব অমানবিক হত্যাযজ্ঞের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা জিল্লুর রহমান, মোজাফফার ন্যাপের লেঃ রউফ (আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ১৭ নং আসামী), অধ্যাপক মতীন ও আওয়ামী লীগ নেতা সিদ্দিক মিয়া। এদের ব্যাপারে আমি চিন্তা করলাম হিন্দুস্তানের প্ররোচনায় এরা কি করে পারলো মুসলমানদের খুনে তাদের হাত রঙীন করতে। কি করে পারলো অবোধ শিশুদের বেয়নট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত করতে। তাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ঘৃণা আর ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হল আমার মনে।

খাঁটি সরিষার তেল আর ঘি বিক্রি করতেন আমাদের সফি ভাই। আমাকে দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন তিনি। বললেন, ‘আমিন ভাইয়া আমার বেঁচে থেকে আর লাভ নেই। আমার আত্মীয় পরিজন সকলকে শেষ করে দিয়েছে ওরা।’ আমি স্থির থাকতে পারছিলাম না। আমার শপথ আরও প্রচন্ড হয়ে উঠলো।

ভৈরবে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে আমি সংক্ষিপ্ত একটা ট্রেনিং নিলাম। ইতোমধ্যে সুযোগ-সন্ধানীরা সেনাবাহিনীর আশেপাশে ভিড় জমিয়েছেন। এরাও দেখলাম মোজাফফর ন্যাপের লোকজন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের শয়তানী প্ররোচনায় বিভ্রান্ত হতে শুরু করেছে। এ ব্যাপারে আমি প্রতিবাদী হয়ে উঠি। আমার ব্যাপারে সুযোগ সন্ধানী তোষামোদকারীরা সেনাবাহিনীকে ভ্রান্ত ধারণা দেয়ার চেষ্টা করে। এরপর ভৈরবকে আমার জন্য নিরাপদ মনে করলাম না।

আমি ব্রাক্ষ্মণবাড়ীয়া চলে এলাম। এখানে সংগঠনের অন্যতম নেতা মুহাম্মদ ফারুকুল ইসলাম ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ হলে তিনি সেনাবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করে আমার উন্নত ট্রেংনি এর ব্যবস্থা করে দিলেন। ট্রেনিং শেষ করে এখানে বেশ কিছু দিন অবস্থান করি। ইতোমধ্যে আমি বাড়ীর টান অনুভব করতে থাকি। বাবা-মা’র সান্নিধ্য পাবার জন্য প্রাণ চঞ্চল হয়ে ওঠে। একদিন কুমিল্লার গোয়ালনগর ইউনিয়ন কাউন্সিলের কলিমউদ্দিন চেয়ারম্যানের সাথে গ্রামের বাড়িতে রওয়ানা হলাম।

আমার ধারণা ছিল এর মধ্যে হয়তো অষ্টগ্রামে পাকিস্তানী বাহিনী অবস্থান নিয়ে ফেলেছে। কিন্তু এসে শুনলাম এখানকার অবস্থা আগের মতই। সশস্ত্র ইপিআর, আওয়ামী লীগ আর বামপন্থীদের চারণভূমি এই অষ্টগ্রাম। গ্রামে আমার আসার সংবাদ ইতোমধ্যে বিদ্রোহীদের ক্যাম্পে পৌঁছে গেছে। এ খবর জানলাম দেলোয়ার মাষ্টার অর্থাৎ দিলু ভাই এর চিরকুটে। আমার হিতাকাক্সক্ষী এবং আমার বিরোধী আওয়ামী লীগের লোকেরা সবাই এসে আমার বাড়ীতে ভিড় জমিয়েছে। সবার কৌতূহলী চোখ আমার দিকে। আমার আসন্ন পরিণতি দেখার জন্য সবাই যেন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। আমি আমার দুর্বল অবস্থান আর ভয়াবহ অবস্থা আঁচ করলাম। কিন্তু তাৎক্ষণিক কী করতে পারি! এর মধ্যে হয়তো সশস্ত্র পতিপক্ষরা আমার উদ্দেশে রওয়ান হয়ে গেছে। এত চোখ ফাঁকি দিয়ে কোথাও লুকানো সম্ভব নয়। হিতাকাক্সক্ষীদের অনেকে জিজ্ঞাসা করছে আমি কেন এলাম। আমার দুর্বলতার প্রকাশ না ঘটিয়ে সকলকে শুনিয়ে জোরে জোরে বললাম- ‘আমি আমার প্রস্তুতি না নিয়ে এমনি এসেছি, আমি কি এমনই গাধা। দাওনা ওদরে আসতে।’ আমার চোখে মুখে ভীতি নেই, নির্বিকার অভিব্যক্তি। আমার এ কথায় সম্ভবত কাজ হয়েছিল। প্রতিপক্ষরা তাৎক্ষণিক আমাকে আঘাত হানার সাহস করেনি। ওরা থমকে ছিল। আমার দিক থেকে কোন আঘাতের প্রতীক্ষা করছিল হয়তো বা। তাতে আমি বেশ সময় পেয়ে গেলাম।

আমি তড়িঘড়ি আমার নিকটতম আত্মীয়দের সহযোগিতায় গোপনে নৌকাযোগে অন্যত্র সরে যাই। আমাদের নৌকা যখন মাত্র মাইল খানেক পথ অতিক্রম করেছে ঠিক সে সময় আমার সশস্ত্র প্রতিপক্ষরা আমাদের বাড়ী ঘেরাও করে।

পরবর্তীতে, যারা আমাকে স্থানান্তরে সহযোগিতা করেছিলেন তাদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করা হয়েছিল, যদিও তাদের প্রাণে মারা হয়নি। নিপীড়নের শিকারে পরিণত হয় মওলান আবদুল মোমেন ভাই, ভাগ্নে জামালউদ্দিন ও আর একজন প্রতিবেশী।

এরপরে আমার সব ধরণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সশস্ত্র প্রতিরোধের জন্য পুরোপুরি নিজেকে প্রস্তুত করে ফেলি। অষ্টগ্রামের সাবিয়ানগর থেকে কুলিয়ার চর হয়ে কিশোরগঞ্জে এসে সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করলাম। তারপর আমাদের সমমনা বিশেষ করে ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে আমি আলবদর বাহিনী গঠন করলাম। ইতোমধ্যে রাজাকারদের দ্বারা বিভিন্ন স্থানে জুলুম হয়েছে এমন অভিযোগও আসছিল। আলবদর গঠন করে বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে সবরকমের অরাজক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এলাম জনগণের মধ্যে ভীতি ও সন্ত্রাসের ব্যাপ্তি ঘটেছিল, সেটাও অল্প কয়দিনেই কেটে গেল। জনগণের আস্থা ফিরে এলে আমরা গণ সমর্থন পেতে থাকলাম। কিন্তু এসব হল অনেক পরে এসে। শুরু থেকে এ সুযোগ না আসাটা জাতির জন্য ছিল চরম দুর্ভাগ্য।
কিশোরগঞ্জ জেলের ধারণ ক্ষমতা ২শ’ জনের বেশী নয় অথচ ৭শ’ লোককে সেখানে রাখা হয়েছে। এখানকার অস্বাস্থ্যকর ও অস্বস্তিকর পরিবেশে সকলেই হাঁপিয়ে উঠেছিল। এখান থেকে নিষ্কৃতির পথ খুঁজছিল সকলে। কিন্তু নিরুপায়। কারা প্রকোষ্ঠে মাথা কুটে মরা ছাড়া কোন পথ আছে কি? তবু সবখানে ফিসফিস, কানে কানে কথা, নীরব গুঞ্জরণ। উপায় বের করার প্রচেষ্টা চলছে যেন। একদিন তারা মিয়া ও কতিপয় তরুণ আমাকে জানালেন কারাগার ভাঙবার সিদ্ধান্ত। তারা যে পথ ও পদ্ধতির কথা বলল তাতে সেটা অসম্ভব বলে মনে হল না। কিন্তু আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বেরিয়ে কোথায় যাবেন?’ জবাব পেলাম, ‘বাইরের মুক্ত আলো বাতাসে।’ বললাম- ‘সেটাতো বড় কারাগার বরং এখানে ভাল আছেন, নিরাপদে আছেন। বাইরে অরাজক রাজ্য, ভয়ংকর সন্ত্রাস আর ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। কারাগারের বাইরে বাংলাদেশে আমরা নিরাপদ নই মোটেও। অতএব আল্লাহর উপর নির্ভর করে এখানেই থাকার চেষ্টা করুন। এখানকার অখাদ্য খেয়ে হলেও, মানবেতর পরিবেশে থাকতে মন না চাইলেও এটাই আপাতত আমাদের নিরাপদ আশ্রয়।’ এরপর সম্ভবত জেল ভাঙার পরিকল্পনা তারা বাতিল করে দেয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও কথাটা গোপন থাকেনি। মুখে মুখে শেষ পর্যন্ত কারা কর্তৃপক্ষের কান পর্যন্ত পৌঁছে। তাদের এই ধারণা জন্মে যে, এসব পরিকল্পনার মূলে রয়েছি আমি, অতএব এখান থেকে আমাকে সরানো জরুরী। একদিন আমাকে একজন কনস্টেবল এসে তাৎক্ষণিক প্রস্তুতি নিতে বলে এবং আমাকে জানায় এ কারাগার থেকে স্থানান্তরিত করার জন্য উপর থেকে হুকুম এসেছে। আমি তৈরি হলাম। আরও ৩ জন আমার সহগামী হলেন এমপি লোকমান হেকিম, সাবেক গভর্নর শহীদ আবদুল মোনয়েম খানের নাতি আলী আনোয়ার খান এবং এনএসএফ নেতা আবুল কাশেম ভাই।

বিকেল ৪টা নাগাদ কিশোরগঞ্জ জেল থেকে বের করা হল। হাঁটিয়ে নেয়া হল স্টেশন পর্যন্ত। এখানে পুলিশরা আমাদের ৩য় শ্রেণীর ওয়েটিং রুমে নিতে চাইল কিন্তু আমরা যেতে চাইলাম না। শেষ পর্যন্ত ১ম শ্রেণীর ওয়েটিং রুমে নিয়ে আসা হল দেখা গেল এখানে অনেক চেনা মুখ। আমাদের জন্য সাধারণ সৌজন্যবোধে সিট ছেড়ে দিলেও তাদের কথাবার্তা আলাপ আলোচনায় আমাদের প্রতি নিন্দাসূচক অভিব্যক্তির প্রকাশ ঘটেছিল। আমরা নীরব দর্শক হয়ে বোবার মত বসে থাকলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে ট্রেন আসলো। আমরা ট্রেনে উঠলাম। পুলিশেরা আমাদের মার্জিত ব্যবহার ও আচার আচরণের কারণে ট্রেনের মধ্যে আমাদের হাতের বেড়ী খুলে দিল। ট্রেন ছাড়লো। আমরা কিশোরগঞ্জ ছেড়ে চলেছি। ভাল লাগছিল না মোটেও। এই মাটি এই আকাশের নিচে সর্বোত্তম কোরবানীর স্পৃহা নিয়ে প্রচণ্ড গোলাগুলীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হেসেছি। কত আত্মোৎসর্গকারী সহযোগীদের তাজা রক্ত এ মাটিতে গড়িয়ে পড়েছে। এই মাটি এই পবিত্র মাটি ছেড়ে আমাকে যেতে হচ্ছে সাধ করে নয়। নিজের প্রতিতো এখন আমার নিয়ন্ত্রণ নেই। আমার ইচ্ছা অননিচ্ছার কবর হয়েছে ১৮ ডিসেম্বর। তবু বললাম, মনে মনে বললাম, ‘খোশ রহো আহলে চামান মাইতো চামান ছোড়কে চালে।’-হে বাগানবাসী তোমরা আনন্দে থাক। আমিতো এই সাজানো বাগিচা ছেড়ে চলেছি।

তখন সুবেহ সাদিক। শম্ভুগঞ্জ স্টেশনে ট্রেন এসে পৌঁছল। ময়মনসিংহ থেকে মাত্র ৩ মাইল দূর ট্রেন আর এগুবে না। কেননা সামনের সেতু ভাঙা। যুদ্ধকালীন সময়ে সেটা ভেঙে দেয়া হয়। এবার পায়ে হাঁটা পথ। এক পা এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছি। সামনে নদী পার হলাম। সমস্ত আকাশটায় সূর্যোদয়ের পূর্বাভাস। রাত্রির অন্ধকার পালানোর পথ খুঁজছে। আমি ভাবছি আমাদের জাতির ভাগ্যে পালাবদলের এমন মুহূর্ত কি কোনদিন আসবে না! ইসলামের সূর্যটা কারবালার রক্তাক্ত পথ ধরে, সেই যে বিদায় হয়েছে, তারপর অন্ধকার। কখনো নিবিড়, কখনো আধো আলো। কখনো জোনাকীর আলো জ্বেলে অথবা দীপশিখা দিয়ে যুগের অন্ধকার বিদূরিত করার প্রয়াস প্রচেষ্টা চলেছে। কিন্তু আজও মুসলিম বিশ্বে ইসলামের সূর্যোদয় হয়নি। ওযু করলাম কালের সাক্ষী প্রবহমান নদীর নির্মল পানিতে। তারপর উন্মুক্ত আকাশের নিচে শিশির ভেজা দূর্বাঘাসের সবুজ গালিচায় নামাজ পড়লাম। দোয়া করলাম প্রাণ ভরে।

পূর্বাচলে সূর্যটা ধীরে ধীরে উঁকি মারছে। অনেকদিন পর অবারিত আকাশের নিচে প্রশান্ত নির্বিরোধ পরিবেশে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় প্রত্যক্ষ করলাম। তখন পৃথিবীটা পাখির কাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে। মনে হল, এটা প্রকৃতির পক্ষ থেকে সূর্যটাকে অভিনন্দন জানানোর প্রয়াস। আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। কোথাও কোন মানুষের সাড়া নেই। এমন কি মসজিদ ফেরা কোনও মুসল্লিও চোখে পড়ল না। আর তেমন চোখে পড়ার কথাও নয়। মসজিদে যাতায়াতকারী মুসলমানদের অধিকাংশ তো কারাগারে। আর যারা বাইরে রয়েছে তারা পলাতক। এ কারণে মুসল্লিদের সংখ্যা নগণ্য হওয়া স্বাভাবিক। আর ওদিকে মুক্তবাংলার তথাকথিত ফৌজরা নিশাচর হয়ে উঠেছে। এদের অধিকাংশের তো এখন ঘুমানোর সময়। অতএব পথঘাট জনশূন্য। আমরা মনে করলাম এও আল্লাহর মেহেরবাণী।

ইতোমধ্যে আমরা শহরের মধ্যে এসে গেছি। তখন ইতস্তত দোকান পাঠ খুলছে। কিন্তু সবারই চোখ আমাদের দিকে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। হয়তো ভাবছে, এমন প্রত্যূষে এরা কারা? আমার সাথীরা দেখতে শরীফ, সভ্য এবং নম্রতার প্রতীক। এদের ব্যাপারে পুলিশি তৎপরতা তো শেষ হয়েছে অনেক আগে। তাদের বিস্ময়ে হতবাক হওয়া স্বাভাবিক। এই সাত সকালে পুলিশের বেষ্টনীতে যারা এসে থাকে তারা তো আমাদের মত নয়। তেমন মস্তানি সুরত আমাদের কারো ছিল না।

আমরা পুলিশদের বললাম, ‘আমাদের হাতের বেড়ী পড়িয়ে দিন। তা না হলে আপনাদেরকে কৈফিয়তের সম্মুখীন হতে হবে।’ তারা ইতস্ততঃ করলেও শেষ পর্যন্ত আমাদের কথা মত কাজ করল। হাঁটতে আছি। কিছু কিছু মাসুম বাচ্চা বই নিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বুঝলাম মক্তবে কোরআন পাঠ করতে যাচ্ছে। আমার মনে হ’ল এসব ছোট্ট শিশুদের বুকে টেনে নিয়ে বলি- ‘আমরা আমাদের বর্তমানকে উৎসর্গ করে তোমাদের জন্য এক নিরাপদ ভবিষ্যত রচনা করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি। তোমরা তোমাদের সামর্থ্য দিয়ে জাতির ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে এনো।’

জেল গেটে এসে পড়লাম, দাঁড়িয়ে থাকতে হল বাইরে। কেননা তখন অফিসার নেই। এখন আমাদের মনে হচ্ছে, আমরা না ঘরকা না ঘাটকা। অনেক্ষণ পরে অফিসাররা আসার পর আমাদের ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়া হল। ঢুকেই দেখলাম পিডিপি’র ভাইস প্রেসিডেন্ট মওলানা মুসলেহ উদ্দিন। তিনিও আমাদের মত একজন কারাবন্দী। তিনি পিডিপির ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। যুদ্ধকালীন সময়ে আমাদের মত দেশপ্রেমের পরীক্ষা দিতে গিয়ে তাঁকেও আজকের এই দুর্ভাগ্যকে বরণ করতে হয়েছে। তাকে দেখেই আমি সালাম দিলাম। তিনিও আমাকে পেয়ে দারুণ খুশী হলেন।

বাইরে থেকে নতুন যারা আমদানী হয় তাদের তদারকীর দায়িত্বে ছিলেন কিশোরগঞ্জ মহকুমা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারী জনাব মোশাররফ হোসেন সাহেব। আপাতত আমি তার হেফাজতে। আমি ভাবলাম মোটামুটি সময় আমার ভালই কাটবে। এখন আমি আমদানী খাতায় রয়েছি। নবাগতদের স্কুলে রাখা হত। স্কুল কেন বলা হত আমার জানা নেই। সেসব জানবার আগ্রহও আমার ছিল না। দুই রাত্রি আমাদেরকে সেখানে থাকতে হয়। মোশাররফ সাহেবের ওপর সবাই বিরূপ। বিরূপ হওয়া স্বাভাবিক। যা দেখলাম তাতে আমিও সন্তুষ্ট হতে পারিনি। কারাগারে যে খাদ্য সরবরাহ করা হত সেটা একে তো নিম্নমানের এবং পরিমাণে কম। তা সত্ত্বেও সেই স্বল্প পরিমাণ খাদ্যে কর্তা অর্থাৎ মোশাররফ সাহেব নিজের অতিরিক্ত ভাগ বসাতেন। এছাড়া স্বল্প পরিসর একটি কক্ষ। সেখানে প্রায় ২শ’ লোক। পালা করে শোয়ার জায়গাও মেলে না। এতদসত্ত্বেও তাকে আমি দেখেছি, একটা বিরাট স্থান দখল করে তিনি রয়েছেন তার একার জন্য। আমি অবাক হলাম। জামায়াতে ইসলামীর মত আদর্শবাদী সংগঠনের নেতৃপর্যায়ের হয়েও তিনি কিভাবে এমন নির্মম, এমন নিষ্ঠুর হতে পারলেন? আমার সেদিনই মনে হল খোদার তরফ থেকে আমাদের জন্য এমন জিল্লতি নির্ধারিত হওয়ার এ সবই কারণ। কতিপয় স্বার্থাশ্বেষী মানুষের তৎপরতা খোদার নিশ্চয়ই পছন্দ হয়নি। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ ইসলামের আবেগ-তাড়িত হয়ে, জীবনের সমস্ত কিছু কোরবানী দিয়েও দেশটাকে টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এখানে অনেক অমানুষ এসেও মানুষের সাথে মানবিক আচরণ করতে থাকে। তার কারণ, সবার ভাগ্য এখানে এক সূত্রে গাঁথা। এমন এক স্থানে এসে মোশাররফ সাহেব যে আচরণের প্রদর্শনী করেছেন তাতে তার মত লোকেরা ক্ষমতাসীন হলে জাতির ভাগ্যে দুর্বিপাক ছাড়া কিছুই মিলবে না। তার সাথে এ ব্যাপারে কোন কথা বলতে আমার মন চাইল না। জেল থেকে বেরিয়ে এসে তার ব্যাপারে আমি জামায়াত কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তা সত্ত্বেও তিনি এখন কিশোরগঞ্জ জামায়াতে ইসলামীর নেতা। এ দেখে মনে হল, আমীর মোয়াবিয়া যেন আমীরুল মোমিনীনের সন্তুষ্টি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।

যাই হোক, ২দিন পর আমাকে জেল সুপার মোফাখ্খারুল ইসলাম সাহেবের দপ্তরে তলব করা হল। আমি তার সম্মুখে উপস্থিত হতেই আমার দিকে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর যে আচরণ করলেন তা হল, তিনি যেন বিচারকের আসনে সমাসীন আর আমি এক অসহায় খুনের আসামী। গুরুগম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “কয়টা মানুষ হত্যা করেছো?” তার প্রশ্নের ধরনে ভীষণ বিরক্তি অনুভব করলাম। জবাবও দিলাম একটু বাঁকা করে। বললাম-‘জবাবটা আমি আদালতে যথাসময়ে দেব। কারা কর্তৃপক্ষের কাছে নয়।’ জবাব শুনে তিনি গর্জে উঠলেন। বললেন, ‘তেজ তো এখনো কমেনি। জানো আমি কী করতে পারি?’ জমাদারকে ডাক দিলেন। ডাক শুনে জমাদার এসে উপস্থিত হলে বললেন-‘এর পায়ে জুতো কেন?’ জমাদার কাশেম আমাকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে নিয়ে গেল। তারপর জুতা খুলিয়ে আবার আমাকে আনা হল তার সামনে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমি কী করতাম? বললাম-‘কলেজে পড়তাম।’ তিনি বললেন- ‘চেহারা সুরত তো ভদ্র ঘরের বলে মনে হয়। কিন্তু খুন-খারাবীর ফিরিস্তিও তো কম নেই।’ বলে গেলেন নিজের মনে, তারপর কাগজে কি লিখলেন সেটা আমার জানার কথা নয়। আমাকে স্কুল থেকে আনা হল হাজতী ওয়ার্ডে।

ওদিকে আদালতে আমার বিরুদ্ধে দায়েকৃত মামলার শুনানী শুরু হয়েছে। একই মামলায় আমাকে এবং মওলানা কুতুবউদ্দিন সাহেবকে আদালতে হাজির হতে হচ্ছে প্রত্যেক দিনই। আমার স্বপক্ষে মামলা পরিচালনা করেছেন এডভোকেট সাত্তার ও তাহেরউদ্দিন সাহেব। বাদী পক্ষে রয়েছে সরকারী পিপি, আওয়ামী লীগের এমপি এডভোকেট আবদুল হক। তিনি আলবদরের বিরুদ্ধে ভীষণ ক্ষিপ্ত। তার দাপট তখন আদালতের স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে অশালীন ঔদ্ধত্যের পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। আমার স্বপক্ষের এডভোকেটকে স্বাভাবিকভাবে মামলার জেরা করতে দেয়া হয়। কিন্তু তিনি খানিকটা ভীত। কেননা আমার স্বপক্ষে তার বক্তব্য না জাতি তাকেও আসামীর পর্যায়ে টেনে আনে।

বিচারক তাঁর আসনে নির্বাক। ভীত-বিহ্বল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। এমপি আবদুল হকের গর্জনে তার আসনটা কেঁপে উঠেছিল কিনা জানিনা, তবে রায়টা আমার বিপক্ষে দিতে সম্মানিত বিচারক বাধ্য হয়েছেন। তার কারণ ২০ বছর কারাদণ্ডের রায় শোনার পর যখন আমি ‘আলহামদুলিল্লাহ’ উচ্চারণ করি তখন তিনি অসহায়ের মত সকরুণ চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তারপর যখন হাতে কোমরে বেড়ী দিয়ে পুলিশেরা আমাকে কাঠগড়া থেকে নিয়ে যেতে প্রস্তুত, তখন আমার উদ্দেশ্যে তিনি বললেন- ‘আপনি হাইকোর্ট করলে খালাস পাবেন।’ তখন অবশ্য পিপি এডভোকেট আবদুল হক আদালতে ছিলেন না। এই একই মামলায় মওলানা কুতুবউদ্দিন সাহেবের ৩ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়। এখন তিনি সিলেটে দরগা মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
আমাকে কারাগারে ফিরিয়ে আনা হল। এসে দেখলাম সকলে আমার জন্য উৎকর্ণ হয়ে আছে। ইতোমধ্যে প্রহসনমূলক বিচারের রায় তাদের কাছে পৌঁছে গেছে। আমাকে পেয়েই তারা অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়ে। আমি তাদের উদ্দেশ্যে কোরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি তুলে ধরি ‘ফাইন্নামায়াল উসরে ইউসরা, ইন্নামায়াল উসরে ইউসরা’ -কষ্টের পরেই স্বস্তি আছে, অবশ্যই কষ্টের পরে আছে স্বস্তি। আরও বললাম, ‘মেঘ দেখে কেউ করিসনে ভয় আড়ালে তার সূর্য হাসে।’ এই মেঘ এই আবর্ত একদিন কাটবেই, এখন প্রয়োজন ধৈর্যের। আল্লাহ এ পরীক্ষাই নিতে চান আমাদের কাছে।

এবার আমাকে অলংকার পরানোর পালা এল। বিচার প্রহসনে প্রমাণিত হয়েছে আমি খুনী। আমি এক দুর্ধর্ষ আসামী। আমাকে তো শিকল পরাবেই। কারাগারের ভাষায় ডাণ্ডাবেড়ী। সাড়ে সাত সের ওজনের সবচেয়ে ভারীটাই পরান হল আমাকে। এরপর আমাকে আনা হল জাহান্নাম থেকে হাবিয়ায়। অর্থাৎ সাধারণ ওয়ার্ড থেকে ফাঁসীর সেলে। সবচেয়ে মারাত্মক আসামীর জন্য এটি তৈরী। কারাগারের ভেতরে একটা ছোট্ট অন্ধকার প্রকোষ্ঠ, আমার স্থান হল এখানে। এখানে আমি একা, একান্ত একাকী। প্রকোষ্ঠের দরজা তালাবদ্ধ। এর পরেও একটি দরজা, সেখানেও তালা। তদুপরি সশস্ত্র সেন্ট্রী। আমাকে ঘিরে পুলিশী তৎপরতা দেখে আমার মনে হল, জেমস বন্ডের ডিটেকটিভ উপন্যাসের নায়ক আমি।

অন্ধ প্রকোষ্ঠে নির্লিপ্ত একাকী আমি। ভাল লাগছে, বড্ড ভাল লাগছে আমার। এখানে আমি যেন একান্তভাবে খোদার অস্তিত্বকে অনুভব করছি। অন্তর দিয়ে আমি ডাকছি তাঁকে। আমি যেন হৃদয়ের অনুভূতি ঢেলে তাঁকে স্পর্শ করছি। মনে হল আমার মালিকের নিবিড় সান্নিধ্য পেলে অনন্তকাল ধরে এই অন্ধ কুঠরীতে মোটেও কষ্ট হবে না আমার। আমার মওলার ইচ্ছার সাথে আমার ইচ্ছা একাকার হয়ে গেছে। আহ, কি সুখ আমার! এখন আমার মনে হচ্ছে জ্বলন্ত লেলিহান অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হয়ে ইব্রাহিম (আঃ) হয়তো এর চেয়ে বেশী সুখে পেয়েছিলেন। লালনের ভাষায়- এ মরণ যে সুখের মরণ।

আবার আদালত আওয়ামী লীগের আদালত, মুজিব প্রশাসনের আদালত। সেই একই স্টাইল। সেই একই বিচার প্রহসন। আবার ২০ বছর। আওয়ামী লীগের এমপি এডভোকেট আবদুল হক বিচারকের ওপর ভর করেছেন। জ্বীনের আছরপ্রাপ্ত রুগীর মত মাননীয় জজ সাহেব এমপি আবদুল হক সাহেবের রায়টাকে প্রকাশ করলেন মাত্র। আমার মন মস্তিষ্কে এই রায়ের কোন প্রতিক্রিয়া হয়েছিল বলে মনে হয় না। হিন্দুস্তানী কূটচক্রের আবেষ্টনীতে যে প্রশাসন বাঁধা, সে প্রশাসন নিজেই তো অসহায়। প্রভুর মনোরঞ্জের জন্য ইসলামী চেতনার মানুষগুলোকে তারা বিপন্ন করবে এমন প্রত্যাশার বাইরে আমি কখনও কিছু ভাবিনি। আমার ফাঁসী হলেও অস্বাভাবিক মনে হত না। ৪০ বছর কারাদণ্ড বলতে গেলে খোদার এটা এক মেহেরবানী। ২শ’ বছর আগে এমনি প্রহসন হয়েছিল মুর্শিদাবাদের আদালতে।

কারাগারের ভেতরে কারাগার। তার ভেতরে একটা ছোট্ট অন্ধকার প্রকোষ্ঠে রেখেও আমাকে সাড়ে সাত সের ওজনের ডাণ্ডাবেড়ী থেকে মুক্ত করা হল না। নিদারুন অস্বস্তির মধ্যে আমাকে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। প্রতিনিয়ত ঘর্ষনের ফলে আমার পায়ে ক্ষতের সৃষ্টি হল। ডাণ্ডাবেড়ী থেকে মুক্ত হবার আবেদন করলাম। তাও নাকচ হল। অন্ধ কুঠুরীর নিচ্ছিদ্র অন্ধকার থেকে আলোর মুখ দেখার অন্তহীন পিপাসা আমার অন্তরে জেগে উঠল। সে আলো মুক্ত পৃথিবীর সূর্যরশ্মি নয়। অক্ষমতার জন্য যে দীপশিখার ভার বহন করতে আকাশ, পৃথিবী, চন্দ্র, সূর্য, পাহাড়, পর্বত অস্বীকৃতি জানায় সেই কালামে পাক আল কোরআনের কিছু আলো চাই। আমার এই আবেদন কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করলেন। তফসীরের জন্য নিয়োগ করা হল মুফতি মওলানা আবদুল হান্নান সাহেব (সিলেট)কে। মুফতী আল্লামা মুহাম্মদ নূরুল ইসলাম সাহেব (ময়মনসিংহ), মওলানা ইলিয়াস খাঁন (কিশোরগঞ্জ ইটনা) যথারীতি ১৯ নং ওয়ার্ডে সকাল-বিকাল দরসে কোরআন, দরসে হাদিসের বয়ান কারাবাসের শুরু থেকে করে আসছিলেন। পরবর্তীতে তাফসীর ক্লাসে যোগ দিলেন আমার সাথে অধ্যাপক গোলাম রব্বানী, অধ্যক্ষ খলিলুর রহমান, বিগচান খান (শহীদ আবদুল মোনয়েম খান-এর ভাইস্তা), সেলিম দারোগাসহ আরও ৩ জন কারাবাসী পুলিশ অফিসার। এরা দালাল আইনের আসামী।

অন্ধ প্রকোষ্ঠে কারাবাসের দুটো বছর পেরিয়ে গেছে। অনেক দিন পর আমার আহত মানসিকতায় আনন্দের ছোঁয়া সকাল থেকে অনুভব করছি। কিন্তু কেন? আমি তখনও বুঝে উঠিনি। মনে হচ্ছে কি যেন আমি পেতে চলেছি। অনেক তপস্যা অনেক সাধ্য সাধনার পর হেরার গুহায় মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁর অন্তঃকরণে কিছু পাওয়ার পূর্ভাবাস পেয়েছিলেন। যা তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে বিহ্বল করেছিল। আমার আবেগে তেমন আনন্দের আতিশয্য অনুভব করছি।

বেলা ১১টা। একজন সেন্ট্রী তালা খুলে জানাল- ‘ভিজিটিং রুমে আপনার সাথে সাক্ষাতের জন্য লোক এসেছে। আপনি আমার সাথে আসুন।’ আমি বিশাল বিস্তৃত অন্তহীন মরুতে একনাগাড়ে পথচলা পরিশ্রান্ত তৃষ্ণাবিধূর মুসাফির। সামনে অদূরে নিশ্চল দাঁড়িয়ে আছে মরুদ্যান-ওয়েসিস, আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমি কাঁপছি, বালির সমুদ্রে পা আটকে যাচ্ছে বার বার। আমাকে আনা হল ভিজিটিং রুমে। আমার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশী কিছু পেলাম। অনেক পাওয়ার আনন্দে আমি উদ্বেল, বিস্ময়ে বিমূঢ়, মুখের ভাষা মূক হয়ে গেছে। আমি দেখছি আমার পরম পাওয়াকে। আর হৃদয় দিয়ে গেলাসে গেলাসে পান করছি স্বর্গীয় সুখ। মা, আমার মা, আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আড়াই বছরের তৃষ্ণা আর চব্বিশ বছরের জমাট বাঁধা গভীর মমতা নিয়ে অশ্রুসজল চোখে ডাণ্ডাবেড়ী পরানো তাঁর সন্তানকে গভীর আগ্রহে তিনি দেখছেন। কারো মুখে কোন কথা নেই। সবাই নির্বাক। ফেলে আসা দুঃসহ দিনগুলোর সমস্ত ক্লেদাক্ত ব্যথা মা-সন্তান উভয়েই ভুলে গেছি। নীরবতা ভঙ্গ করে আমি ডাকলাম ‘মা! মাগো।’ এবার মায়ের চোখে অশ্রুর ঢল নামল, ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুর অক্ষর সাজিয়ে মা যেন আমার অনাগত ভবিষ্যতের জন্য আশীর্বাদের ফিরিস্তি লিখে চলেছেন। কাঁদছে মায়ের সাথে আসা আমার বিধবা বোন কাঞ্চন। তার কত আদর মমতা আর আশীর্বাদের স্পর্শ আমার গায়ে লেগে আছে তার হিসেব নেই।

আমি আবার ডাকলাম, মা। জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমি কি ভুল করেছি মা?’ মায়ের স্পষ্ট জবাব- ‘না।’ বলতে থাকলেন- ‘আর এটাই আমার বড় সান্ত্বনা। অন্তহীন ব্যথার দুঃসহ বোঝা নিয়ে আমি বেঁচে আছি এই ভেবে যে, আমার সন্তান কোনদিন অন্যায় অপকর্মে জড়ায়নি। হক আর বাতিলের সংঘাতে আমার কলিজার টুকরা আমার সন্তান হকের স্বপক্ষে জানবাজি রেখেছে। মানুষ এখন সব বুঝে। আমি দোয়া করি হকের স্বপক্ষে তুমি যেন চিরদিন মজবুত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পার। আল্লাহ যেন তোমাকে সার্বক্ষণিক ধৈর্যের তাওফীক দেয়। বাতিলের ধ্বংসস্তূপের ওপর হক আর ইনসাফের ঝাণ্ডা একদিন উড়বেই।’

মা আমার কাছে আরো কাছে এসে আমাকে স্পর্শ করে বললেন, ‘বাবা আমার বুকটা শূন্য হয়ে আছে। শূন্য হয়ে আছে আমার বাড়ী-ঘর। তোমার ঘরের চারপাশে এখন জঙ্গল হয়ে গেছে। তোমার কুকুরটাকেও ওরা হত্যা করেছে। তোমার বন্ধুরা এখন আর আসে না। অন্তহীন একাকীত্ব নিয়ে আমি একা তোমার মুক্তির প্রতীক্ষায় দিন গুনছি। আর তোমার জন্য সবকিছু আগলে আছি।’ মাকে বললাম- ‘মওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদীর তাফহীমুল কোরআন আর হাকীকত সিরিজের যে বইগুলো আছে, কেউ এলে তার হাতে পাঠিয়ে দিও।’ মা এগুলো অনেক যত্ন করে মুক্তিফৌজের দৃষ্টির বাইরে মূল্যবান সম্পদ হিসেবে মাটির নীচে পুঁতে রেখেছিলেন। মার সাথে সাক্ষাতের কিছুদিন পর আমার চাচাত ভাই খন্দকার বজলুর রহমানের হাতে বইগুলো পাঠিয়ে দেন। এই বইকটিকে পুঁজি করে আমরা কারাগারে সাংগঠনিক কাজ শুরু করি।

একদিন মামা জনাব হাজী আঃ হাসিম সাহেব মোমেনশাহী কারাগারে এলেন আমার সাথে দেখা করার জন্য। তিনি সদ্য মক্কা থেকে ফিরেছেন। হজ্জে যাওয়ার আগে তিনি চিঠিতে আমার প্রতি গভীর মমতার কথা উল্লেখ করে লিখেছিলেন যে, আল্লাহর ঘর খানা-এ-কাবায় তিনি আমার জন্য দোয়া করবেন। আমার প্রতি তার প্রাণের গভীরে যে তীব্র অনুভূতি রয়েছে সেটা আমি জানতাম। এই মামা এবং তার স্ত্রী, আমার মামীর স্নেহমমতার ছায়া পরিবেষ্টিত ছিল আমার শৈশব। কৈশোর- যৌবনেও আমি তাদের স্নেহ-বঞ্চিত হইনি। রাজনৈতিক শঠতার শিকার হয়ে অন্ধ জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা আমি ধিকৃত হলেও আমার জন্য মামা-মামীর ছিল অপরিসীম দোয়া। আমার কারণে মামাকে লাঞ্ছিত হতে হয়, এমন কি তাকে হত্যা করার জন্য বধ্যভূমিতে নেয়া হয়। তার উদ্দেশ্যে গুলী নিক্ষিপ্ত হয়। কিন্তু খোদার মেহেরবানীতে সবকটি গুলী কুদ্রতিভাবে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তিনি প্রাণে বেঁচে যান। পরবর্তীতে তার গুণগ্রাহী প্রতিবেশী, মুক্তিফৌজ ও অন্যান্য মানুষের চাপে তাকে তার হত্যাকামীরা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।

কারাগারে আমার সাথে দেখা হতেই তিনি বললেন- ‘এখনও তুমি ফাসীর প্রকোষ্ঠেও তোমার পায়ে ডাণ্ডাবেড়ী। এটা থাকার কথা নয়। আমি তো খাস করে তোমার জন্য দোয়া করেছি। আমি ভেবেছিলাম। এসেই অন্তত তোমাকে ডাণ্ডাবেড়ী মুক্ত দেখব।’ তখন তিনি আমাকে ডাণ্ডাবেড়ী মুক্ত না দেখলেও সময়ের স্বল্প ব্যবধানে আমি এ থেকে মুক্ত হই এবং অন্যান্য অসুবিধাগুলোও আমার দূর হয়। মামার পরহেজগারীর তুলনা হয় না। তিনি জামায়াতকে রাজনৈতিক সমর্থন দিতেন। জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি ছিল তার অবিচল আস্থা।

একদিন শুনলাম ঢাকা থেকে কারাগারসমূহের ডিআইজি জনাব কাজী আবদুল আওয়াল সাহেব আসবেন। চারিদিকে মোটামুটি সাজ সাজ আয়োজন। এসেও পড়লেন একদিন। কারা পরিদর্শন করতে করতে অবশেষে আমার সেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। সাথে আছেন জেলার এবং সব কয়জন ডেপুটি জেলার ও অন্যান্য অফিসার।

আমি সালাম দিলে তিনি প্রত্যুত্তর দিলেন। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য জমাদার কাশেম মুখ খুললেন। বললেন, ‘স্যার এই যে আমিন। এই জেলের সবচেয়ে বড় টেরর। খুনের আসামী স্যার, বহু মানুষ খুন করেছে। ২টা কেসে ৪০ বছর জেল হয়েছে স্যার। এখানে এই সেলে আমরা খুব কড়া নজরে রেখেছি স্যার।” ডিআইজি সাহেব শুনে গেলেন কেবল। খুব খুশী হলেন এমনটি মনে হল না। তিনি আমাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেন- ‘কি করতেন।’ বললাম- ‘ভৈরব কলেজে পড়তাম।’ গভীর মমত্ববোধ নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাইকোর্ট করেছেন?’ বললাম- ‘না’। আবার প্রশ্ন- কেন? বললাম- ‘যারা করতে পারতেন তাদের অনেকে শহীদ হয়েছেন। বাকী যারা রয়েছেন তারা পলাতক। তবে কেউ কেউ আশ্বাস দিলেও তারা তেমন কিছু আমার জন্য করেনি।’ তিনি বললেন- ‘আপনি তো ভেতর থেকেই করতে পারতেন।’ বললাম- ‘তা হয়তো পারতাম। কিন্তু বাইরের আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে সময় পেরিয়ে গেছে।’ ডিআইজি দুঃখ প্রকাশ করলেন আর জিজ্ঞেস করলেন- ‘আপনার কোন রকম অসুবিধা হচ্ছে কি? বললাম অসুবিধাতো সবটাই। তবে সবচাইতে বড় অসুবিধা হচ্ছে এই ডাণ্ডাবেড়ী। এ নিয়ে নামাজ কালামও স্বস্তির সাথে পড়তে পারছি না।’ ডিআইজি জেলারদের উদ্দেশ্যে বললেন- ‘জেলার সাহেব! বেড়ীটা খুলে দিবেন।’ জেলার আমিনুর রহমান সাহেব প্রত্যুত্তরে বললেন- ‘স্যার অসুবিধা আছে।’ ডিআইজি এ ব্যাপারে কোন পুনরুক্তি না করে শুধু বললেন, ‘ঢাকা পাঠিয়ে দিন।’ ডিআইজি সাহেব চলে গেলেন। সপ্তাহ গড়িয়ে গেছে। একদিন জানলাম আমাকে, মোঃ ইউছুফ আলী ভাইকে ঢাকা জেলে স্থানান্তর করা হবে।  মোঃ ইউসুফ আলীও আলবদরের সদস্য ছিল। তারও ২০ বছর কারাদণ্ড হয়। তারিখটা ’৭৪-এর ১৭ জানুয়ারী। বেলা ১০টায় আমাদেরকে কারাগার থেকে বের করা হল। বেরিয়ে দেখলাম সংগঠনের কে এম মঞ্জুর এলাহী ভাই সহ নবীন কর্মীরা আমাদেরকে দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। সিপাহীরা আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে বললেন, ‘কাছে কোন আত্মীয়-স্বজন থাকলে তাদের বাসা বেড়িয়ে যেতে পারেন। তখন সংগঠনের ভাইয়েরা আমাদের মুত্যুঞ্জয় রোডে জামায়াতে ইসলামীর একজন রুকন নোয়াখালীর রব সাহেবের বাসায় নিয়ে এলেন। সেখানে খাওয়া দাওয়া করলাম, খোলামেলা অনেক আলাপ আলোচনা হল। জানলাম মুজিবের বেসামাল অবস্থা। গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। সন্ত্রাসের মাধ্যমে ভীতি সঞ্চার করে যতদিন ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে। একাত্তরে যে হাতগুলো মুজিবকে জীবন্ত ফিরে পাওয়ার জন্য দোয়া করেছিল সেই হাতগুলো খোদার কাছে ফরিয়াদ জানাচ্ছে, অভিসম্পাত দিচ্ছে খুনী মুজিবকে।

বিকেলে স্টেশনের দিকে রওয়ানা হলাম। ট্রেন আসতে তখনও দেরী। অনেক পরিচিত মানুষ অনেক চেনামুখ চোখে পড়ছে। ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছিলাম। পুলিশরা আমার পাশেই বসা। দেখলাম একটা তরুণ ছেলে আমার দিকে এগিয়ে এল। এসে জিজ্ঞেস করল ‘আমিন দা, আমাকে চিনছেন?’ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকলাম। আমার অতীত স্মৃতি রোমন্থন করলাম কিছুক্ষণ। কিন্তু না আমার পরিচিত কোন আদলের সাথে এ চেহারার মিল নেই। বললাম- ‘নাতো ভাই, আপনাকে তো চিনছিনা।’ তরুণটি আহত হল যেন। একটু কাঁদ কাঁদ স্বরে বলল- ‘আমি কোমল রায়।’ বললাম- ‘বেশ জোয়ান হয়ে গেছতো! আর বলোনা ভাই এ কয়টা বছর যে ধকল গেছে আমিতো আমাকেই ভুলে গেছি। কিছু মনে করো না।’ কোমল আমাকে ভাল ফুটবল প্লেয়ার হিসেবে জানে। ও আমার দারুণ ভক্ত ছিল এককালে। সে নিজেও ভাল খেলোয়াড় হওয়ার জন্য কসরত চালাত। জিজ্ঞেস করলাম- ‘খেলাধুলা চলছে তো তোমার?’ বলল- ‘চলছে, কিন্তু সেই আগের মত কি আছে দাদা। এখন সবাই যার যার তার তার। মানুষ যেন সব কেমন হয়ে গেছে।’

বলতে ইচ্ছে হল, এখনি কী হয়েছে! কেবল তো শুরু। অথচ আমাদের রক্ত লোলুপ ধর্মোন্মাদ ও মৌলবাদী যুদ্ধাপরাধী বলে চিহ্নিত করার জন্য প্রতিপক্ষরা কতইনা প্রচার চালাচ্ছে। আমরা জাতীয় আদর্শ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য অনুশীল করার চেষ্টা করি, এটাই আমাদের অপরাধ। কোন হিন্দু অথবা অন্য কোন সংখ্যালঘু এমনকি কেউ আছে যে হলপ করে বলতে পারে, আমরা তাদের সাথে অসামাজিক অথবা অন্য কোন খারাপ আচরণ করেছি? এটা প্রচারণা। শুধুমাত্র মিথ্যা প্রচারণা। ভারতের তথাকথিত প্রগতিশীল বাবু ও তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট এদেশের অভিজাত হিন্দুরা তাদের গোয়েবলসীয় প্রচারণার দ্বারা এদেশের হিন্দু সমাজকে অশান্ত উদ্বেল করে তুলেছে। এদের বিরূপ করে তুলেছে মুসলমানদের ওপর। এদেশের মাটিতে বসবাস করেও গণমানুষের সাথে একাকার হতে পারছে না এরা। আর এদেরকে উত্তেজিত করে এবং এদের মনমানসিকতায় কাল্পনিক ভীতির সঞ্চার করে হিন্দুস্তানের মদদপুষ্ট কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক চক্র তাৎক্ষণিক ফায়দা নেবার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। এরাই কৃত্রিম দরদ, মমত্ববোধ আর পৃষ্ঠপোষকতার আবরণে সামগ্রিভাবে হিন্দুদের জন্য কাঁটার শয্যা রচনা করছে।

ট্রেন এসে গেল। আমরা দ্বিতীয় শ্রেণীর একটি কামরায় উঠলাম। দেখলাম সেখানে আরও কিছু পুলিশ অফিসার আগে থেকেই বসেছিলেন। তারা আমার পরিচিত, এক সময় খুব কাছাকাছি ছিলাম আমরা। যখন কিশোরগঞ্জের পুরো দায়িত্বটা ছিল আমার উপর, তখন তাদের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তারা আমাকে জানে। জানে আমার ভেতর-বাহির। আমাকে দেখেই হাসিমুখে অভিবাদন জানালো। খুনের আসামী আমি, আমার কোন এক সময়ের পুরনো সহযোগীদের কাছে পেয়ে বেশ ভাল লাগল। মনে পড়ল আমার সংগ্রামী দিনগুলোর বিক্ষিপ্ত স্মৃতি। এরাও তো হিন্দুস্তান যেতে পারত। কিন্তু না, ভুল করেও ওদিকে পা বাড়ায়নি। জাতীয় ইতিহাসের অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিণতির কথা ভেবেই সম্ভবত তারা এমনটি করেনি। উৎকোচ সংক্রান্ত পুলিশদের স্বাভাবিক অসংযমী আচরণের বহিঃপ্রকাশ যুদ্ধকালীন ৯ মাস তাদের মধ্যে দেখিনি। তারা যা কিছু করেছেন নেহায়েত দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে। তারা আমার সাথী পুলিশদের বলে দিলেন যাতে আমার কোন অসুবিধা না হয়। বললেন- ‘তোমরা যদি আমিন সাহেবকে সত্যি খুনের আসামী মনে করে থাক তাহলে ভুল করবে। উনি রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের এক নিষ্ঠুর শিকার আমরা তাকে দেখেছি অত্যন্ত কাছে থেকে, আমরা তাকে জানি। তোমরা ছেড়ে দিলেও উনি পালাবেন না।’ পুলিশরা জবাব দিল, “স্যার, মানুষ নিয়েই তো আমাদের কারবার, প্রকৃত ক্রিমিন্যাল চিনতে কি আমাদের ভুল হয় স্যার। উনাকে জিজ্ঞেস করুন, তার সাথে কোন বেয়াদবী করেছি কিনা?’

রাত তখন ১১টা এসে পৌঁছলাম কমলাপুর স্টেশনে। কালের সাক্ষী এই কমলাপুর স্টেশন। স্টেশনের সেই আগের জৌলুস নেই। জেল্লা ফিকে হয়ে গেছে। লাবণ্যের কোথায় যেন ঘাটতি মনে হচ্ছে। আরও দেখলাম, শত শত ছিন্নমূল মানুষ। কঙ্কালসার মানুষগুলো ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে-বসে আছে। জীবন যুদ্ধে পরাজিত মানুষের ভিড় এখানে। শেখ মুজিবের প্রতিশ্রুত গণমানুষের কল্পিত সোনার বাংলা’র বিবর্ণ চেহারা দেখে আমি আহত হলাম দারুণভাবে। এই স্টেশন, এশিয়ার বৃহত্তম স্টেশন। শেখ মুজিব গংরা যাকে বড় দালাল হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা চালিয়ে এসেছেন, যুদ্ধকালীন সময়ে যিনি কোন ভূমিকা না রাখা সত্ত্বেও রুশ-ভারত চক্রের হাতে নির্মম ভাবে শহীদ হয়েছিলেন, সেই সাবেক গভর্নর শহীদ আবদুল মোনয়েম খানের অবদান এই স্টেশনটি। কালের  আবর্তে এই স্টেশনই মুজিবের তথাকথিত সোনার বাংলার ছিন্নমুল মানুষগুলোর শেষ আশ্রয়স্থল।

স্টেশন থেকে রিক্সাযোগে মতিঝিলের দিকে এগুলাম। মতিঝিল এজিবি কলোনীতে রয়েছেন আমার ভগ্নীপতি সার্ভে অফিসার জনাব জসিমউদ্দিন আহমেদ। বাইরে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হল। কড়া নেড়ে কোন সাড়া পাচ্ছি না। পরে আমার নাম বলাতে এবং ভেতর থেকে গোপন সতর্ক পর্যবেক্ষণের পর দরজা খুললেন। পরে জানলাম রাজধানী ঢাকা সন্ত্রাস, ডাকাতি আর রাহাজানীর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এসব অপকর্মের নেটওয়ার্ক জাতির পিতার উত্তরসূরী জাতীয় রত্ন শেখ কামালকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। আল-কোরআনের একটি আয়াত মনে পড়ল- ‘প্রত্যেক জিনিসই তার উৎসের দিকে ফিরে যায়।’ শেখ মুজিবের সোনার বাংলা চোরের খনিতে পরিণত হয়েছে; তার ভাষায়- ‘আমি ডানে তাকালে চোর, বামে তাকালে চোর, যেদিকে তাকাই সেদিকেই চোর।’ আয়নার সামনে দাঁড়ালে কি দেখেন তা অবশ্যি তিনি বলেননি। যাইহোক, মানুষ সন্ত্রাস ও ভয়ঙ্কর ভীতির মুখোমুখি। রাত হলে মানুষ ঘর থেকে বেরুতে চায় না আর একটু বেশী রাত হলে দরজা খোলার তো প্রশ্নই উঠে না।

দীর্ঘ চার বছর পর দুলাভাইয়ের সাথে আমার দেখা ইতোমধ্যে বুড়িগঙ্গায় কত পানি গড়িয়ে গেছে। বিবর্তনের গতিধারায় কত মানুষ কতভাবে পাল্টে গেছে। কিন্তু আমার ফুফাত বোনটা যেন আগের মতই সেই মমতার মূর্ত প্রতীক। বিবর্তনের ছোঁয়া লাগেনি তাঁর মধ্যে। বড় ভাল লাগল। মাত্র দুটি বছর অথচ দুটো যুগ পর যেন আমরা এমন কাছাকাছি এসেছি। তাও একটি মুহূর্তের জন্য। আবেগের আতিশয্যে বোন-দুলাভাই দু’জনে একইভাবে উদ্বেল। মাত্র একটি মুহূর্ত, এর মধ্যে কত কথা, কত আদর-আপ্যায়ন, কত আলাপ আলোচনা। বড় ভাল লাগল। রাত ১২টা বিদায় নিলাম।

রওয়ানা হলাম টিকাটুলীর দিকে। উদ্দেশ্য চাচা-মামার বাসা। চাচা খন্দকার মোহাম্মদ ইসমাইল ফুডের ডেপুটি ডাইরেক্টর। ডেকে তুললাম। চাচা আমাকে পেয়ে কি দারুণ খুশী চাচার স্নেহ মিশ্রিত সংলাপে বাবার স্নেহসুলভ আচরণের কথা মনে পড়লো। আবেগে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলাম। পিতার সহোদরকে মনে হল যেন আমার সেই হারানো পিতা, আমার সম্মুখে বসে আছেন। প্রাণ খুলে আলাপ করলাম। মনে হল কতকাল মহাকাল পেরিয়ে এসে এমন প্রাণের স্পর্শ পেলাম আমি। পাশে মামার বাসা। মামা সফিউদ্দিন আহম্মদ সাহেব অবসরপ্রাপ্ত সিও (ডেভ)। তিনিও এলেন। আত্মীয় পরিজনদের উচ্ছ্বসিত স্নেহের বারিধারায় আমার আত্মা সিক্ত হয়ে উঠল।

রাত গভীর। সময়ের পরিসর স্বল্প অথচ এরই মধ্যে রান্না হয়ে গেছে। আমার সাথী পুলিশদের সাথে নিয়ে খেতে বসলাম । কি যে ভাল লাগছে। মাতৃত্বের গন্ধ মিশে আছে এ রান্নায়। চাচী নিজ হাতে রান্না করেছেন। মা চাচীতে পার্থক্য আর কতটুকু! বাড়ীর রান্না, দারুণ খেলাম। তৃপ্তিতে মন প্রাণ ভরে গেল। চাচা চাচী দু’জনের সাথে কথা বললাম। এত সময় ধরে এমন করে কোনদিন তাদের সাথে মুখোমুখি আলাপ করিনি। ফজরের আযান তখনও হয়নি। তবে বাকীও তেমন নেই। এবার বিদায় নেয়ার পালা। চাচাও আমাদের সাথে বাইরে এলেন। চাচার চোখ দুটো অশ্র“সজল হয়েছিল কিনা জানিনা। তবে কণ্ঠ জড়িয়ে এসেছিল, বাষ্পরুদ্ধ ছিল তার শেষ কথাগুলো।

পথে বেরিয়ে পড়লাম। বেশ কিছু পথ হাঁটতে হল। তারপর রিক্সা পেয়ে গেলাম। এসে পৌঁছলাম কেন্দ্রীয় কারাগারে। পথেই ফজরের আযান শুনেছি। নামাজের সময় আসন্ন। অজু করলাম। নামাজ পড়লাম পুলিশ ব্যারাক মসজিদে। আত্মীয় পরিজনদের সান্নিধ্য পাওয়ার আনন্দের রেশ রয়ে গেছে বলে সফরে ক্লান্তি কাহিল করতে পারছে না। ভোরের নির্মল হাওয়া উল্লসিত হয়ে দালানে দালানে ঠোকর খেয়ে ফিরছে। আর মাঝেমাঝে কারো সাজানো ফুলের বাগান থেকে সুরভী ছিনতাই করে দস্যু বাহরামের মতো ছড়িয়ে দিচ্ছে সবার মধ্যে। হাসনাহেনার আতরদানি নিঃশেষ হয়নি তখনও। খু-উব ভাল লাগছে আমার। মনে হচ্ছে এই চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে আমি গান ধরি। ‘ঐ দূর দিগন্তে ডাক এল, ডাক এল, ডাক এল। স্বর্ণ ঈগল পাখা মেল, পাখা মেল, পাখা মেলরে।’ স্বর্ণ ঈগলের ডানায় অফুরন্ত শক্তি থাকলেও পা তো শেকলে বাঁধা।

আমি বাহির থেকে কারাগার দেখছি, যেমন করে গোরস্থান দেখে মানুষ। জীবনে চল্লিশটি বছর এখানেই কাটবে আমার। অবশিষ্ট আর কতটুকু থাকবে আমার জন্য। হয়তো একদিনও নয়। কারাগারকে গোরস্থান মনে করা আমার জন্য অযৌক্তিক নয়। একটু পরেই আমি কেন্দ্রীয় কারাগরের বাসিন্দা হব। অতএব বাইরের চলমান পৃথিবীটাকে একটু ভাল করে দেখে নিই। হেঁটে হেঁটে ঘুরে ঘুরে দেখতে চাইলাম। সাথী পুলিশদের কোন আপত্তি ছিল না। ওতে ওরাও আমার সাথে সাথে হাঁটছে। হেঁটে হেঁটে ঘুরলাম নাজিমউদ্দিন রোড, চকবাজার, বখশিবাজার, উর্দু রোড। দেখলাম এত ঝড়ের মধ্যেও উর্দু রোড তার অস্তিত্ব ঠিকই বজায় রেখেছে। জিন্নাহ এভিন্যু বঙ্গবন্ধু এভিন্যু হয়েছে। ইকবাল হল জহুরুল হক হল হয়েছে। পাকমোটর বাংলামোটর হয়েছে। কেবল মাত্র উর্দু রোড বাংলা রোড হয়নি, হয়তো বা এটা আওয়ামী লীগের হিসেবের বাইরে রয়ে গেছে।

দেখলাম জেলখানার আশেপাশে অনেক মানুষের ভিড়। এরা সব ঢাকার কুট্টি। আমাদেরকে এই সাত সকালে শেকল বাঁধা অবস্থায় ঘোরা-ফেরা করতে দেখে অনেকে এগিয়ে এল। আগ্রহ সহকারে জানতে চাইল। বললাম সবকিছু। জনতা উত্তেজিত, সবার মধ্যে পুঞ্জীভুত ক্ষোভ। বলল- ‘আমাদের খাজা খায়রুদ্দিন সাহেবকেও শালা হিন্দুস্তানের দালালরা আটকে রেখেছে ভাইজান, চিন্তা করবেন না কিছু। শালারা বেশি দিন আটকে রাখতে পারবে না। আপনাদের আমরা জেলের দরজা ভেঙে বের করে নিয়ে আসব।’পুলিশরা একটু ভয় পেয়ে গেল। এ অবস্থায় আর এদের কাছাকাছি আমরা দু’জনকে রাখা সমীচীন মনে করল না। আমরা দু’জনকে সাথে নিয়ে উত্তেজিত জনতার কাছ থেকে সরে গেল। বুঝলাম, হাওয়া বদলাতে শুরু করেছে। আবারও ঘুরলাম। ঘুরে ঘুরে দেখলাম সবকিছু। এক ফাঁকে নাস্তাও করলাম।

শেষ বারের মত এক কাপ করে চা খেয়ে কারাগারের প্রধান ফটকের সামনে এসে দাঁড়ালাম। কারা কর্তৃপক্ষের নিকট সমর্পণ করা হল বেলা সাড়ে আটটা নাগাদ। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ভিতরে পা রাখলাম। আমাদের সাথী পুলিশরা তাদের কাগজপত্রের কাজ সেরে বিদায় নিল। যাবার আগে শেষবারের মত আমাদের সালামত কামনা করে আমাদের শুভেচ্ছা জানিয়ে গেল। এবার আমাদেরকে নিয়ে আসা হল কেস টেবিলে। এখানে আমাদের কাগজপত্র পরীক্ষা করে দেখা হল। কেস টেবিলের কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে কেস টেবিলের চীফ রাইটার কামরুজ্জামান ভাই এসে আমাদের সাথে কুলাকুলি করলেন। এক মহান ভ্রাতৃত্বের আবেগ অনুভূতি লক্ষ্য করলাম। আমরা একই আন্দোলনের শরিকদার। এরপর এলেন তাহের ভাই, সৈয়দ মোহাম্মদ নূরুল হক ভাই ও আজহারুল ইসলাম ভাই। সবারই একই অনুভূতি। এই অনুভূতি দেখে আমার মওলানা আবুল কালাম আযাদের একটি লেখার কথা মনে পড়ল। ইসলামী ভ্রাতৃত্ব প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন- ‘সুদূর মিশরেও যদি কোন মুসলমানকে ফাঁসী দেয়া হয় আর তার দাগ যদি হিন্দুস্তানের মুসলমানদের গলায় না দেখা যায়, তাহলে বুঝতে হবে ইসলামী অনুভূতি বেঁচে নেই।’ এত বড় একটা ঝড়, এত বড় একটা পট-পরিবর্তনের পরেও আমাদের ইসলামী উখুওয়াতে চিড় ধরেছে বলে মনে হল না। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, কামরুজ্জামান ভাই বর্তমান জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ-এর কেন্দ্রীয় নেতা।

কেস টেবিলে কাগজপত্র পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ডাণ্ডাবেড়ী খুলে দেয়া হল। পা দুটো দারুণ হাল্কা অনুভূত হল। পা মাটিতে রাখতেই পৃথিবীটার মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কিছু অভাব মনে হল। আসলে সাড়ে সাত সের ওজনের বোঝা কমে যাওয়ার জন্যই এমন মনে হচ্ছিল। সদ্য হাঁটতে শেখা বাচ্চাদের মত বিক্ষিপ্ত হাঁটলাম কিছুক্ষণ। এরপর কামরুজ্জামান ভাই আমাকে ১০ সেল ডিভিশনে পৌঁছে দিলেন। এখানে এসে দেখলাম শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন ভূঁইয়া, জাসদের আকরাম ও মেসবাহ, বর্তমান মন্ত্রী পরিষেদের সদস্য (এরশাদ মন্ত্রীসভা) সিরাজুল হোসেন খান; নারায়গণগঞ্জ মুসলিম লীগ নেতা হাজী রফিক, কালীগঞ্জের শাহজাহান চেয়ারম্যান এবং সাবেক ওসি ইউসুফ চৌধুরী আগে থেকে এখানে অবস্থান করছেন। আমি নিজেই তাদের সাথে পরিচয় করে নিলাম। বিভিন্নমুখী স্রোত এক মোহনায় এসে আমরা একাকার। ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শী মানুষ আমরা এক পরিবারের মত এখানে অবস্থান করছি। সেলের ২০ জনের এক চুলায় রান্না, একই রকম খাওয়া দাওয়া, কোন রকম বিরোধ-অন্তর্বিরোধের চিহ্ন এখানে নেই। অথচ এই মানুষগুলো বাইরের মুক্ত আলো বাতাসে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। একে অপরের উপর মারমুখো। কিন্তু কেন? এই কেন-র জবাব আমি খুঁজে পাই না। তবে মনে হয় বাইরের পৃথিবীতে এসে মানুষের স্বতন্ত্র সত্তার বিলোপ ঘটে। বিভিন্ন জন বিভিন্ন নেপথ্য সূত্রে বাঁধা পড়ে। ফলে দৃশ্যপটের আড়াল থেকে বাইরের শক্তিসমূহ সূতোর টান দিয়ে নাচাতে থাকে সকলকে। সুস্থ স্বাভাবিক মানসিকতা জলাঞ্জলি দিয়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে লিপ্ত হয়। আল্লাহর পথে ফিরে আসা ছাড়া এই সংঘাত, এই রক্তপাতের অবসান কোন দিনই হবে না।

বর্তমান সরকারের মন্ত্রী সিরাজুল হোসেন খান আমাদের সাথে ৬ মাস কাটিয়েছেন। তিনি ডারউইনের বিবর্তনবাদে বিশ্বাসী। তার মাথায় তখন গিজ গিজ করছিল সমাজতন্ত্রের তত্ব। সমাজতন্ত্রের ব্যাপারে তার বিবেক অন্ধ ছিল। শয়নে-স্বপনে, বিশ্রামে-জাগরণে সব সময় সমাজতন্ত্র। সমামজন্ত্রের ভূত যেন তার ওপর ভর করেছে। আমাদের মধ্যে যারা অগ্রজ, যারা লেখাপড়া আর পাণ্ডিত্যের দিক দিয়ে তার চেয়ে খাটো নয়, তারা কারাবাসের অফুরন্ত অবসরে তার মাথার সেই ভুত ছাড়ানোর তদবীর করত। কিন্তু সেই তদবীরের ফলে সমাজতন্ত্রী ভূত তার মাথায় আরও পাকাপোক্ত হয়েছে কিনা জানিনা তবে চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে তাকে একই অবস্থানে দেখেছি। বিবর্তনবাদ তার মাথায় এসে স্থির হয়ে গেছে। আর কোন ক্রমবিকাশ ঘটছে না। মেজাজের ভারসাম্য তার ছিল না। এটা সম্ভবত তার স্বাস্থ্যগত কারণে। তবে আমার সাথে তার সম্পর্কটা সখ্যতার পর্যায়ে ছিল। আদর্শের দিক দিয়ে আমাদের সাথে তার মিল না থাকলেও আওয়ামী লীগ ও ভারত বিরোধী মনোভাবের দিক দিয়ে ছিলেন আমাদেরই মত একই অবস্থানে। বর্তমানে তার রাজনৈতিক অবস্থান যাই হোক না কেন অতীতে তার ত্যাগ ও তিতীক্ষার ইতিহাস আছে।

একদিন দেখলাম, আল্লামা দেলওয়ার হোসেন সাঈদী কারাগারে এলেন। তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ। খুলনার কোন এক জলসায় তার মুনাজাতকে কেন্দ্র করে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। পাবনার মনসুর আলী তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর প্রতি ক্যাপটেন মনসুর আলীর আক্রোশ অনেক আগের। পাবনা সবসময় ছিল আওয়ামী লীগের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি। অনেক দেশপ্রেমিক মুসলমানের রক্তে পাবনা আওয়ামী লীগ কর্মীদের হাত রাঙা। সেই সন্ত্রাসী পাবনায় আওয়ামী লীগের আধিপত্যের ভিতকে নাড়াতে সক্ষম হন দেলওয়ার হোসেন সাঈদী। এজন্য তাঁকে তাঁর জীবনের মারাত্মক ঝুঁকি নিতে হয়। তাঁর সুললিত কণ্ঠের বিপ্লবী তফসীরের মাধ্যমে তিনি আওয়ামী লীগের দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে আওয়ামী লীগ বিরোধী চেতনার লাভা ঢালতে সক্ষম হন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার পর ক্যাপটেন মনসুর সেই সুযোগটা নিতে ভুল করেননি।

আমি এবং সাবেক এনএসএফ প্রধান সৈয়দ নেসার নোমানী সবরকম চেষ্টা চালিয়ে দেলোয়াল হোসেন সাঈদীকে ১০ সেল ডিভিশনে আমার সেলে থাকার ব্যবস্থা করলাম। তার মত চিন্তাশীল এবং প্রভাবশালী মানুষকে তৃতীয় শ্রেণীর কয়েদীদের সাথে রাখা মোটেও সঙ্গত হয়নি। কিন্তু না রাখলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুরের ক্ষোভ আর জিঘাংসা নিরসন হয় কী করে? সাঈদী সাহেব আমাদের সেলে আসাতে আমাদের যথেষ্ট উপকার হল। তার সাহচর্যে থেকে কোরআন হাদিসকে আরও বিস্তৃত জানার সুযোগ হল। সকাল বেলা ফযরের নামাজের পর ১০ সেল ডিভিশনের সকলেই তার সাহচর্য নেবার চেষ্টা করতেন। তফসীর ছাড়াও তিনি ইসলামের বৈপ্লবিক দিক নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনার অবতারণা করতেন।

দেলওয়ার হোসেন সাঈদী সাহেবের নিকট-সাহচর্যে তাঁর সাথে আমার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সেই সুবাদে একদিন প্রস্তাব করলাম- সাঈদী ভাই, আমরা তো বাতিলের সাথে সংঘাতের মুখোমুখি। এ সময় মস্তিষ্ককে সংবেদনশীল রাখলেই শুধু চলবে না শরীরটাকেও সবল আর ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন করা দরকার।’ উনি বললেন- ‘তাতো ঠিকই। আমি মজলিসি মানুষ হয়ে বিপদ হয়েছে। তাছাড়া সফরে সফরেই আমার সময় কাটে। শরীর দেখব কখন।’ আমি বললাম- ‘এর মধ্যেই সময় করতে হবে। তা না হলে বাতিল শক্তির কাছে আপনি সহজলভ্য বস্তুতে পরিণত হবেন।’ তিনি একমত হলেন। আমি ব্যায়ামের প্রস্তাব দিলে তিনি রাজীও হলেন। সময় ঠিক হল, বাদ মাগরিব। এই সময় বেছে নেয়ার কারণ, সেলগুলো তালাবদ্ধ হলে নিরিবিলি পরিবেশ পাওয়া যায়। ব্যায়াম অনুশীলন শুরু হল। আমি তো যথারীতি করেই থাকি। সাঈদী ভাই আমাকে অনুসরণ করলেন। পরপর একই নিয়মে চললো কয়দিন। কিন্তু তারপর! তারপর তিনি শয্যাগত। ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া। ভীষণভাবে, দারুণ শরীর টাটানি, হাত পা ফুলে একাকার। নাড়াচড়া তার জন্য কষ্টদায়ক হয়ে উঠল। পরদিন সকালে আমার সেলে তার ভক্তদের ভিড়। সবার জিজ্ঞাসা, হুজুরের হলোটা কি? সাঈদী ভাই লা-জবাব। সিপাহসালারের এমন দুরবস্থা সত্যি পীড়াদায়ক। সাঈদী ভাই লজ্জায় কাউকে কিছু বললেন না। শেষে কেউ যদি বলে বসে, বুড়ো বয়সে ভীমরতি! ব্যায়াম-ট্যায়াম তো উঠতি বয়সের ছেলে-ছোকরাদের জন্য! যদিও সেটা সত্যি নয়। সাঈদী ভাইয়ের কষ্ট দেখে আমি নিজেকে অপরাধী মনে করলাম। তার শারীরিক অবস্থা ঠিক হতে সময় লাগল বেশ কয়দিন। এরপর ব্যায়ামের ধারে কাছে যেতে সাঈদী ভাই সাহস করলেন না।

এর আগে মালেক ক্যাবিনেটের মন্ত্রীরা কেন্দ্রীয় কারাগারে অন্তরীণ অবস্থায় ১০ সেলের সামনে একটি পরিত্যক্ত ঘর জেল কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে নামাজের জায়গা হিসেবে চালু করেন। একই সাথে তফসীর ক্লাসের ব্যবস্থা হয়। শুরুতে পালাক্রমে মওলানা মোহাম্মদ ইসহাক, মওলান মোহাম্মদ মাসুম, মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ তফসীর করতে থাকেন। সেখানেই আমরা প্রত্যেক দিন বিকালে সাঈদী ভাইয়ের তফসীর শোনার আয়োজন করি। ব্যায়াম ঘটিত অসুস্থতার কারণে কয়েকদিন বন্ধ থাকলেও আবার যথারীতি চালু করা হয়। একদিন তফসীর প্রদানকালীন সময়ে অফিস রাইটার এসে মওলানার হাতে তার ছাড়পত্র দিলেন। মওলানা আনন্দের আতিশয্যে আর তফসীর করতে পারলেন না। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে তৈরী হয়ে গেলেন। মুক্ত আলো বাতাসে নিঃশ্বাস নেয়ার জন্য তার এত তাড়া। চলে গেলেও তিনি আমাকে ভুলেননি। পরে এক সময় আমার সাথে সাক্ষাত করতে আসেন। কারাগারে সাঈদী ভাইকে ঠাট্টাচ্ছলে বলতাম, ‘সাঈদী ভাই, কারাবাসের পর তো আপনি আলেমদের মধ্যে শীর্ষে এসে যাচ্ছেন। তখন তো এই অধম কারাসঙ্গীদের কথা আপনার মনে থাকবে না।’ কোন জবাব দিতেন না। শুধু হাসতেন, লাজ বিনম্র হাসি।

পাকিস্তান আমলে আমরা তাকে কেউ জানতাম না। বাহাত্তরের জাহেলিয়াতের অন্ধ তমসায় গোটা দেশ ছেয়ে গেলে দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ইসলামের মশাল হাতে নিয়ে দেশের এক প্রান্ত হতে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত উল্কার মত ছুটে বেড়িয়েছেন। বন্দুকের নলের মুখে ইসলামের আওয়াজ বুলন্দ করেছেন। ঝঞ্ঝা বিক্ষুদ্ধ মহাসমুদ্রে ভাসছিল কেবল মাত্র সাঈদীর ছোট্ট একটি ডিঙ্গা,  বৈঠা হাতে তিনি উত্তাল তরঙ্গ ভেদ করে ইসলামের ছোট্ট কিস্তী নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন। মিনারে মিনারে আযান দিয়ে সম্মোহিত জাতির চেতনা ফিরিয়ে এনেছেন। কিন্তু যখন তন্দ্রার ঘোর থেকে গোটা জাতি জেগে উঠল তখন আর সেই নকীব সাঈদী ময়দানে নেই। কি এক অন্ধ মোহে বিপ্লবের পথ পরিহার করেছেন। আয়েশী জীবন যাপনের মধ্যে দিয়েই তিনি আল্লাহর কাছে নাজাত প্রাপ্তির সহজ পথ সন্ধান করছেন।

জেল থেকে বেরুবার বেশ কিছু পর অষ্ট্রগ্রাম ও বাজিতপুরে ইসলামী সম্মেলনের জন্য দেলোয়ার হোসেন সাঈদীকে আমন্ত্রণ জানানোর উদ্দেশে আমি ও সাবেক গভর্নর শহীদ মোনয়েম খানের ছেলে কামরুজ্জামান খান ভাই টেলিফোনে যোগাযোগ করে তাঁর বাসায় উপস্থিত হই। ভেতরে ঢোকার সময় দেখলাম সুন্দর একটা কোরআনের আয়াতের স্টিকার লাগানো। যেসব ইরানের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থেকে বিলি করা হয়। আমন্ত্রণ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কথাবার্তা শেষ হলে আমি সাগ্রহে ইরানের বিপ্লব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করি। জবাবে তিনি বলেছিলেন ইরান বিপ্লব নির্ভেজাল ইসলামী বিপ্লব। আমি ইরান সফরের সময় ঘুরে ঘুরে দেখেছি। বলতে গেলে ইরানের বিপ্লবকে বাজিয়ে দেখার সুযোগ পেয়েছি। যে কোন স্থানে বেড়ানোর সুযোগ ইরান আমাকে দিয়েছিল। আমি সর্বস্তরের জনগণের সাথে মিশেছি, তাদের সাথে কথা বলেছি, তাতে মনে হয়েছে, জনগণের অন্তর থেকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পর্যন্ত ইসলাম একটা বিপ্লব সাধন করেছে। অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি যে কোন দিক নিয়ে বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে বিপ্লবের ছোঁয়া একইভাবে লেগেছে।’ সেদিন তাঁর এই উপলব্ধিটা দারুণভাবে ভাল লেগেছিল। ইরান থেকে নিয়ে আসা শতাব্দীর সফল ইসলামী বিপ্লবের অভিজ্ঞতা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাঈদী সাহেব ছড়িয়ে দিতে পারতেন। নির্যাতিত মানুষের সিনায় সিনায় ছড়িয়ে দিতে পারতেন নতুন বিপ্লবের ফয়েজ। কোটি কোটি তন্দ্রাচ্ছন্ন আত্মার অনুভূতিকে উদ্দীপ্ত করার ক্ষমতা দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর যথেষ্ট ছিল। দেশের নিগৃহীত নিষ্পেষিত জন-মানুষের ঢল রাজপথে নামাতে পারতেন এই দেলওয়ার হোসেন সাঈদী। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই জাতির; কোন এক নেপথ্য হাওয়ার স্পর্শে বিপ্লবীকণ্ঠ সাঈদীর চোখেই এখন তন্দ্রার ঘোর।

একদিন দেখলাম মেজর (অবঃ) জয়নাল আবেদীন কারাগারে এলেন। আওয়ামী লীগের বিরোধী ভূমিকা নেয়ার জন্য তার এ কারাবাস। তিনি আমাদের কাছাকাছি ২৬ সেল ডিভিশনে থাকতেন। মুক্তিযুদ্ধে তার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। তিনি শেখ মুজিবর রহমান, আওয়ামী লীগ ও হিন্দুস্তানের কট্টর সমালোচক। প্রাসঙ্গিকভাবে সর্বশেষ মুগল সম্রাট বাহাদুরশাহের গজলের একটি কলি মনে পড়লো- ‘সবকুছ লুটাকে হুঁশমে আয়ে তো কিয়া কিয়া- সবকিছু হারিয়ে চেতনা এলে আর কী হবে’? মীরজাফরের সহযোগী মীর কাসিম তার জীবন দিয়েও বাংলার সৌভাগ্য ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবু আহত বিবেক তাদের তাড়িয়ে নিয়ে ফিরছে। মেজর (অবঃ) জয়নাল আবেদীনের মত তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের সহযোগীদের তূনের তীর বুমেরাং হয়ে তাদের বুকেই এসে বিঁধছে। সেই যন্ত্রণায় অস্থির তারা। কিন্তু তাদের সেই দুঃসাহসিক হাত এখন শূন্য। তাদের দুর্জয় হাতিয়ার এখন কুচক্রীদের অস্ত্রাগারে। মুক্তিযোদ্ধা হয়েও মেজর (অবঃ) জয়নাল আবেদীন কারাগারে সেল প্রকোষ্ঠে। মওলানা মতিন ও জয়নাল আবেদীন সাহেবের পাশাপাশি ২৬ সেল ডিভিশনে অবস্থান করেন। তাদের অপরাধ একই। মীরজাফরের বিরুদ্ধে মীর কাসিমের ভূমিকা নিয়েছেন তারা।

মওলানা মতীন আওয়ামী পঞ্চম বাহিনীর কৃত্রিম দেশপ্রেম আর গণসমর্থনের বহর দেখে এক সময় অন্ধমোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। তার আশৈশব লালিত চেতনা বিসর্জন দিয়ে তথাকথিত মুক্তির জন্য নিবেদিত হয়ে ওঠেন। হতে পারে তিনি এটাকে তার আত্মপ্রতিষ্ঠার সহজ পথ বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের হত্যাযজ্ঞের রাজনীতি, ব্যাপক দুর্নীতি ও দিল্লী নির্ভর আদিম স্বৈরাচার দেখে তার মোহভঙ্গ হয়। তিনি আবার ফিরে আসেন তার উৎস-মূলে। মেজর জয়নাল আবেদীনের সাথে সীরাত কমিটি গঠন করে নির্বাসিত ইসলামী চেতনাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। বিভিন্ন কার্যকারণে মোহগ্রস্ত হয়ে অথবা চাপের মুখে কৌশলগত কারণে অথবা হাল্কা চেতনায় বিভিন্ন বলয়ে আবর্তিত হলেও তাকে ঘিরে রয়েছে ইসলামী মূল্যবোধ।

দেলওয়ার হোসেন সাঈদীর বিদায়ের পর আমি কর্তৃপক্ষের অনুমিত নিয়ে জামায়াতে ইসলামী নেতা ও শহীদুল্লাহ কায়সার সংক্রান্ত হত্যা মামলার আসামী জনাব আবদুল খালেক মুজমদার ভাইকে আমার সেলে নিয়ে এলাম। পারস্পরিক আলাপ আলোচনার মাধ্যমে একঘেঁয়ে অলস মুহূর্তগুলোকে প্রাণবন্তু করে তোলার ব্যর্থ প্রয়াস হয়তোবা। আবদুল খালেক মজুমদার একাত্তরের যুদ্ধকালীন সময়ে ঢাকা সিটি জামায়াতে ইসলামীর একজন দায়িত্বশীল নেতা ছিলেন। একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তিত্ব হিসেবে কারাগারে তার আচার আচরণ, তার সন্ত্রস্ত অনুভূতি, তার প্রলুব্ধ চেতনা, তার স্বজনপ্রীতির বহিঃপ্রকাশ আমাদের যথেষ্ট আহত করেছে। অন্য কোন সংগঠনের নেতা তেমন কোন ঘটনার অবতারণা করলে আমার মনে তেমন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতো না এবং সেটা স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করতাম। কিন্তু একটা মৌলবাদী সংগঠনে দীর্ঘ দিন ধরে বিশেষ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ও ভারসাম্যমূলক জীবনবোধ বিকাশ ঘটানোর অব্যাহত প্রচেষ্টা চালু থাকা অবস্থায় তার নেতার অধঃপতিত মানসিকতা দেখে আমার পীড়িত হওয়া স্বাভাবিক। এটা তাকে খাটো করার জন্য নয়, এই বাস্তবতার নিরিখে তিনি স্বয়ং এবং আরও শত শত নেতা ও কর্মী দিক-নির্দেশনা পাবে। তা না হলে এসব দুর্বলতাকে লুকিয়ে রাখার অর্থ হবে আমি জেনে শুনে একটা বিষবৃক্ষের বীজ রোপণ করলাম।

১০ সেল ডিভিশনে আমার সেলে আমার সাথে তিনি থাকতে শুরু করলেন। তফসীর ক্লাস পুনরায় চালু হল। আমার খুব ভাল লাগছিল একজন আলেমকে আমার সাথে পেয়ে। তিনি আমার সাথে ১০ সেল ডিভিশনে থাকলেও তার অফিসিয়াল যোগসূত্র তৃতীয় শ্রেণীর সাথে রয়ে যায়। কয়েদী অবস্থায় তিনি বড় চৌকার ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিলেন। শিক্ষিত মানুষ বলে জেল কর্তৃপক্ষ তাকে এই দায়িত্ব অর্পণ করেন। একদিন দেখলাম ১০ সেল ডিভিশনে ২০ জনের জন্য রান্না করা ২০টা মাছের মাথা নিয়ে একজন মেট হাজির। জিজ্ঞেস করলাম- ‘কে পাঠিয়েছে?’ জবাব পেলাম- ‘ম্যানেজার সাহেব।’ এতে আমার ডিভিশনে দারুণ প্রতিক্রিয়া হল। আমার মোটেও ভাল লাগেনি। তৃতীয় শ্রেণীতে এমনিতেই খাদ্য সংকট, তরিতরকারী মাছ-মাংসের দারুণ অভাব। তাদের বঞ্চিত রেখে খালেক ভাই কোন মানবিক তাগাদায় ২০টি মাছের মাথা আমাদের সেল ডিভিশনে পাঠালেন বুঝলাম না। তাও যদি এখানে তেমন খাদ্য সংকট থাকত তাহলে সেটা মেনে নেয়া যেত। অনেকে আবার টিপ্পনি কাটলেন, ‘এরা আবার ইনসাফ কায়েম করবে?’ এরা মানে তো আমরা। আমিও তো জামায়াতে ইসলামীর সাথে সংশ্লিষ্ট। কথাটা আমার অসহ্য মনে হল। লজ্জিত হলাম। ইকবালের সেই বাণী মনে হল- ‘যদি মজদুরের হস্তগত হয় কর্মের কর্তৃত্ব তাহলে পাথর কাটার মধ্যে প্রকাশ পাবে আদিম স্বৈরাচার।’ তাকে আমি সাধারণ শ্রেণীর মনে করতাম না বলে দুঃখ পেলাম বেশী। শুধু সস্তা বাহবা নেয়ার জন্য তিনি তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে সাধারণ কয়েদীদের বঞ্চিত করেছেন।

রাত্রে ঘুমাতে এলেন। তার উপস্থিতি আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। চুপ করে অন্য দিকে তাকিয়ে ছিলাম আমরা যে সাধারণ কয়েদীদের বঞ্চিত করা উপহার সহজভাবে গ্রহণ করতে পারিনি এটা তিনি টের পেয়েছেন। প্রসঙ্গ আমি তুললাম। বললাম- ‘আপনার বিবেক বলে তো একটা কিছু থাকা উচিত। থাকা উচিত আপনার দূরদর্শিতা এখানে প্রত্যেকটা মানুষ সংবেদনশীল। আপনার প্রতি এখানকার সকলের কি গভীর শ্রদ্ধা ছিল। এক নিমিষে সেটা ধ্বংস করে দিলেন। আপনার এ হাল্কা চেতনাবোধ আন্দোলনের ওপর কত বড় আঘাত করে, আপনার এটা বোঝা উচিত ছিল। অথচ সংগঠনের সব মানুষই এমন নয়। কত হাজার হাজার মানুষ দৃষ্টির আড়ালে কত বড় বড় কোরবানী দিচ্ছে। তাদের কৃতিত্ব আর কোরবানীগুলো হয়তো ভেসে উঠবে না। কিন্তু আপনাদের এই ত্র“টিগুলো দুর্গন্ধ হয়ে ভেসে বেড়াবে।’ আর বললাম, ‘যা কিছু করবেন একটু ভেবে চিন্তে করবেন। আপনাদের উপদেশ দেয়া তো সাজে না।’

পাবনা আটঘরিয়ার মওলানা বেলাল আমাদের সংগঠনেরই একজন। তিনি একাত্তরে তথাকথিত চেতনার শিকার। প্রথম শ্রেণীর কয়েদী ছিলেন তিনিও। ১০ সেল ডিভিশনের এক কোণে আমার সাক্ষাতে আবদুল খালেক মুজমদারের উদ্দেশে রাগতভাবে বললেন, ‘আপনি সংগঠনের একজন নেতৃস্থানীয় লোক হয়ে কন্ট্রাকটরের কাছ থেকে কি করে টাকা নিলেন? ঐ টাকা কি আপনাকে তারা বকশিশ দিয়েছে? এতে কি সাধারণ কয়েদীদেরকে তাদের হক থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে না? আপনি বলুন হলপ করে বলুন যে কন্ট্রাক্টরের কাছ থেকে আপনি টাকা নেননি? আবদুল খালেক মুজমদারকে নীরব থাকতে দেখেছি। দেখেছি রাগে দুঃখে ক্ষোভে লজ্জায় বিমূঢ় হতে। আবারও আমি খালেক ভাইকে সংগঠনের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সংযত হতে বললাম। প্রতিবাদী কণ্ঠে বেলাল ভাইকে বললাম, এ নিয়ে আর এগুবেন না।’

আমি জানিনা তার পরিবারে অর্থনৈতিক সংকট তাকে এত নীচু হতে বাধ্য করেছিল কিনা। যে একটা ঝড়, যে একটি অর্থনৈতিক-সামাজিক সংকটের মোকাবিলা করতে হয়েছিল দেশের প্রত্যেকটি মানুষকে তাতে এর চেয়ে নীচু স্তরেও যদি কোন মানুষ নেমে থাকে তাহলে কতটুকু সে দায়ী হবে? তবে এসব কর্মকাণ্ড যে সংগঠনের ওপর দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে এটুকু বলার অপেক্ষা রাখে না।
সবচাইতে বেশী আমি ঘৃণা করতাম তার কাপুরুচিত অভিব্যক্তি। আমি মনে করি একজন মুসলমান জীবনের সংকটে অথবা কোন দুর্বল মুহূর্তে অনেক কিছু করতে পারে কিন্তু বুজদীল হতে পারে না। যখন কেউ মনে করবে পুরস্কার ও শাস্তি দানের মালিক আল্লাহ এবং কিসমত যখন নির্ধারিত হয় উপরে, জিন্দেগীর ফায়সালা যখন আসে লওহে মাহফুজ থেকে তখন একজন ঈমানদার মুনাফেক ও কাফেরদের পদচারণায় ভীতসন্ত্রস্ত হবে কেন? অথচ তাকে দেখেছি কারাগারের নিভৃত কোণেও তটস্থ থাকতে। হতে পারে আগে যে অমানুষিক জুলুম আর অত্যাচার তার ওপর হয়েছে তা থেকেই তার মধ্যে জন্ম নিয়েছে এই ভীতি।

কারাগারে আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীরা সম্মিলিতভাবে আমাকে বিপর্যস্ত করার চেষ্টা করছে। তাদের সাথে আমার বিরোধ শুধুমাত্র আদর্শগত। আমি জেলখানায় দাওয়াতী ও তরবিয়াতী প্রোগ্রাম বলতে গেলে ভালমত চালু করেছি। খালেক ভাইয়ের উচিত ছিল আমার পাশে বলিষ্ঠভাবে দাঁড়ানো। অথচ আমি তাকে তেমনভাবে পাইনি। বরং আমার আবেগ আর অনুভূতিকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছেন। বলেছেন- কারাগারে আমার অবস্থান থেকে একটু পিছু হটে আসতে। একটা ঘটনা থেকে বোঝাযাবে কারাগারে কিভাবে তিনি সন্ত্রস্ত থাকতেন। একদিন আমি তিন রাস্তার এক মোড়ে দাঁড়িয়ে তার সাথে কথা বলছি। বলছিলাম- আওয়ামী লীগ আমাকে টার্গেট করে তাদের ষড়যন্ত্র -জাল বিস্তার করেছে। ডিআইজি পর্যন্ত আমাকে নিয়ে বহু অভিযোগ উত্থাপন করেছে। এতে শান্তি বিঘ্নিত হবার আশংকায় ডিআইজি হয়তো এখান থেকে আমাকে অন্য কোন জেলে পাঠিয়ে দিবেন। যেটা আওয়ামী লীগ চায়। এমনটি হলে তারা সফল হবে। আমরা হব ব্যর্থ। আমাদের মিশনও হবে ব্যর্থ। আমাদের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। ‘আপনি তো আমাদের নেতৃস্থানীয়। বাইরের সাথে যোগাযোগ করে ব্যাপারটা ম্যানেজ করা যায় কিনা?’ তিনি কি বলতেন জানিনা। দূর থেকে জাসদের শ্রমিক নেতা রুহুল আমিন ভূঁইয়াকে দেখে আড়ালে সরে গেলেন। বুঝলাম ভীতি তাকে পেয়ে বসেছে। আমাদের সাথে তার কোন যোগাযোগ রয়েছে অথবা আমাদের জন্য কোন অনুভূতি রয়েছে এমনটি প্রতিপক্ষের কাছে ধরা পড়ুক তিনি তা চাইতেন না।

রুহল আমিন ভূঁইয়া চলে যাওয়ার পর তিনি আবার এলেন। আমি তাকে বললাম- ‘প্রাচীরের আড়াল হয়ে কি পরিচয় লুকাতে পারবেন? আমাদের বিরুদ্ধবাদী হয়ে তাদের সহানভূতি পাবেন? সহানুভূতি পাবার কোন সম্ভাবনা থাকলে মিথ্যা মামলায় আপনাকে ওরা জড়াতো না। নেতার এমন আচরণের প্রকাশ ঘটলে কর্মীরা তো দুর্বল হয়ে পড়বে। অন্তত আপনার কাছে আমি এমনটা আশা করি না। কাপুরুষতা আর বুজদিলীর নাম হিকমত নয়।’ তিনি লা-জবাব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন।

ওদিকে মেজর (অবঃ) জয়নাল আবেদীন সাহেব একটি বই লেখায় হাত দিয়েছেন। তিনি মনে করলেন আবদুল খালেক মুজমদার তার সহযোগী হলে তার কাজে সুবিধা হবে। তিনি কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আমার কাছ থেকে খালেক সাহেবকে তার নিজের সান্নিধ্যে টেনেনিলেন। আলবদরের ডেরা থেকে তথাকথিত স্বাধীনতা সংগ্রামীর পক্ষপূটে নিরাপদ আশ্রয় পেয়ে খালেক ভাই যেন হাফছেড়ে বাঁচলেন।

আবুবকর সিদ্দিকের জন্য আমার দুঃখ হত সবচেয়ে বেশী। পনের ষোল বছর বয়সের উঠতি তরুণ। কৈশোর পেরিয়ে কেবলি যৌবনে পদার্পণ করেছে। জীবন নিয়ে সূক্ষ্ম স্বপ্ন দেখারও সময় মেলেনি তার। সিদ্দিক ছিল বাগিচার এক প্রান্তে ফোটা যেন একটা ফুল। দল মেলার সাথে সাথে উত্তপ্ত বাতাস এসে পাঁপড়িগুলো ঝলসে দিল। সে তার আত্ম-প্রতিষ্ঠার জন্য হাতিয়ার তুলে নিয়েছিল এমন নয়। নেতৃত্বের ভিতকে মজবুত করার জন্যও তার সংগ্রাম ছিল না। ঐশ্বর্যের প্রয়োজনে অথবা ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দের জন্য রক্ত-পিছল পথে পা বাড়িয়েছিল- এ কথাও বলা যাবে না। তার সংগ্রামী ও সংঘাতময় জীবনের পশ্চাতে রয়েছে মহান জাতীয় প্রেরণা। পাকিস্তানের অস্তিত্বের ওপরই নির্ভর করছে উপমহাদেশের মুলসমানদের ইজ্জত ও আযাদী, এই ছিল তার বিশ্বাস। সিদ্দিক কিছুতেই হিন্দু মস্তিষ্ক থেকে উৎসারিত সমকালীন চেতনার প্রবাহমান ধারায় অবগাহন করতে চায়নি হাজার বছরের বৈরিতা যাদের সাথে, মুসলমানদের রক্তে যাদের হাত রাঙা তাদের আশ্রয় শিবিরে যেতে চায়নি সিদ্দিক। বরং হিন্দুস্তানী আগ্রাসন প্রতিহত করার জন্য হাতিয়ার তুলে নিয়েছিল হাতে। নেহায়েত দেশ-প্রেম ও জাতীয় অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য হারাতে হল তার মা ও বোনকে। বাংলাদেশ হওয়ার পর মুক্তিফৌজ তার ঘরে হানা দেয়। তাকে না পেয়ে তার মা ও বোনকে গুলী করে হত্যা করে। পরবর্তীতে কতিপয় মুক্তিফৌজের হাতে ধরা পড়ে সে। ছোট অল্প বয়সী সিদ্দিকের ওপর ভয়াবাহ নির্যাতন চালিয়ে তারপর কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়।

কারাগারে থাকাকালীন সবাই সিদ্দিককে আদর করতো। সবারই ছোট ভাই যেন ও। তার আব্বা প্রথম দিকে কারাগারে তার সাথে দেখা করার জন্য নিয়মিত এলেও নতুন করে বিয়ে করার পর আর তেমন আসত না। সিদ্দিকের সকরুণ চাহনি আমাকে দারুণভাবে বিব্রত করত। তার হাসির আড়ালে অন্তহীন বেদনা রয়েছে বোঝা যেত স্পষ্টই। দুঃসহ মানসিক যন্ত্রণায় সিদ্দিকের স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে। এই স্বল্প বয়সী তরুণ, স্বাভাবিকভাবেও যার এমন কারাভোগের কথা নয়, তাকে ৭টি বছর কারাপ্রকোষ্ঠে দুঃসহ জীবন যাপন করতে হয়। আটাত্তর সালে সিদ্দিক মুক্তি লাভ করে। এমনিভাবে কত শত দেশপ্রেমিক সিদ্দিক গুলীতে নিহত হয়েছে অথবা কারাপ্রকোষ্ঠে মৃত্যূর সাথে লড়াই করেছে তার হিসেব এখনো বের হয়নি।

ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে খুন খারাবী সংঘটিত হয়েছে। একই সময়ে ৭টি খুন। সেই হত্যা মামলার আসামী হয়ে আসলেন জনাব, শফিউল আলম প্রধান। তিনি মুসলিম লীগ নেতা ডেপুটি স্পিকার দবির উদ্দিন প্রধানের ছেলে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭টি খুন সংক্রান্ত বিষয়ে আলাপ তার সাথে হয়েছে। তা থেকে যতটুকু মনে হয়েছে, কোন এক নেপথ্য ইঙ্গিতে ছাত্রলীগে ভাঙনের ছোঁয়া লাগে। ক্রমে একের ভেতর দুই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটিতে প্রকাশ্য শেখ মণির মদদ। অন্যটির গাইডেন্স আসে অন্যতম আওয়ামী নেতা তোফায়েলের টেবিল থেকে। শেখ মণির মদদপুষ্টরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই শুধু নয়, সমস্ত শহরে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তাদের হিংস্র নখর থেকে কোন ছাত্র এমন কি মেয়েরাও নিজেদের নিরাপদ ভাবতে পারে না। কিন্তু তবু তাদের কর্মকাণ্ড নির্বিরোধ হতে পারছে না। কারণ অন্য গ্রুপটির নেতৃত্বে রয়েছেন শফিউল আলম প্রধান। তার অবস্থান একেবারে হাওয়ার ওপর, তাও নয়। প্রভাব প্রতিপত্তি দিয়ে তিনি তার গ্রুপ নিয়ে প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। এ ব্যাপারে শেখ মুজিব পর্যন্ত অভিযোগ পৌঁছে। কিন্তু শেখ মণির প্রভাব তখন এত তীব্র যে তা থেকে মুক্ত হয়ে শেখ মুজিব ও তার প্রশাসন সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে মণি-সমর্থক ছাত্রলীগের মস্তানদের দুঃসাহস, ঔদ্ধত্য আরও ভয়ঙ্কর ও সীমাহীন হয়ে ওঠে। তারা প্রতিপক্ষ প্রধান গ্রুপের উপর মরণ-ছোবল দেবার নীলনক্সা তৈরী করে। কিন্তু কুদরতের ফায়সালা ভিন্ন রকম। মণি গ্রুপের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে ৭টা লাশ বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে লুটিয়ে পড়ে।

কারাগারে আমার সাথে প্রধান ভাইয়ের সম্পর্ক অল্প কয়দিনের মধ্যে অন্তরঙ্গ হয়ে ওঠে। তার ভারত বিরোধী চেতনা আমাদের মতই মজবুত। মনের প্রসারতা ছিল ব্যাপক। পাঠ্য বিষয়ের বাইরেও ছিল তার পদচারণা। তিনি ইসলামের উপর লেখাপড়া করেছেন। মওলানা আবুল কালাম আজাদের লেখার দারুণ ভক্ত। কারাগারে তার অফুরন্ত অবসরে মওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর সাহিত্যের সাথে ব্যাপকভাবে পরিচিত হন। প্রায় এক ডজন সহযোগী তারই মত মন-মানসিকতা সম্পন্ন। যদিও তখন পর্যন্ত তাদের মাথা থেকে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের প্রতিমা পুরোপুরি অপসারিত হয়নি। তবু বলব, এরা ভাগ্যাহত জাতির সম্পদ।

জনাব, অলি আহাদ হিন্দুস্তান বিরোধী একটি বলিষ্ঠ বিবেক, একটি সংগ্রামী চেতনা, একটি সোচ্চার কণ্ঠ। এক পর্যায়ে তাকেও পেলাম আমরা। সিনেমার পর্দার মত যেন একে একে অনেক নায়ক মহানায়ক আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হচ্ছেন। আমি যেন কালের সাক্ষী হয়ে সবকিছু অবলোকন করছি। দিল্লী হনুজ দূরাস্ত। চল্লিশ বছর অনেক দূর। এক বির্তনশীল ইতিহাসের দ্রষ্টা হিসেবে কারাগারে অন্ধ প্রকোষ্ঠেও আমার ভাল লাগছে।

এনএসএফ নেতা সৈয়দ নেসার নোমানীর সাথে অলি আহাদ ভাইয়ের আগে থেকেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। নোমানী আমাকে নিয়ে গেলেন অলি আহাদ ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য। আমার অতীত ইতিবৃত্ত টেনে আনার প্রসঙ্গে আহাদ ভাইকে অনেক কিছু বললেন। আরও বললেন, ‘রুশ-ভারত বিরোধী আন্দোলন যদি সত্যি আপনারা করেন, যদি ভারতীয় আগ্রাসন রুখতে চান, তাহলে আমিন ভাইয়ের মত হাজার হাজার নির্ভীক ও বলিষ্ঠ কর্মীর প্রয়োজন হবে। আর এরা হচ্ছে যাঁচাই করা নির্ভেজাল। ইতিহাসের গতিধারায় পরীক্ষিত। হিন্দুস্তানের নুন খাওয়া মানুষদের নিয়ে আন্দোলন করতে পারবেন ঠিকই, কিন্তু হিন্দুস্তানী আগ্রাসন প্রতিরোধ করার মত শক্তিশালী ব্যুহ রচনা করতে পারবেন না। নোমানী অলি আহাদ ভাইকে গভীর সখ্যতার দাবি নিয়ে আরও বললেন- ‘কারাগার থেকে বেরিয়ে যেসব শক্তি কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে মাথা কুটছে তাদেরকে বের করার দুঃসাহসিক কাজে হাত দিতে হবে আপনাকে।’ অলি আহাদ ভাই মুখ খুললেন, তার ছোট্ট একটা জবাব- ‘ভেতর বাইরের পার্থক্য খুব একটা বেশী নেই নোমানী। তবু তোমার কথা মনে থাকবে।’ অলি আহাদ ভাই এক পর্যায়ে আমাকে ন্যাপ নেতা জনাব মশিউর রহমান যাদু মিয়ার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনিও ২৬ সেল ডিভিশনে অবস্থান করেছেন। শেখ মুজিব এবং হিন্দুস্তান বিরোধী ভূমিকা নেয়ার জন্য তাঁর ঐ একই কারাবাস।

তখন যাদু মিয়া রৌদ্রকরোজ্জ্বল বারান্দায় বসে ছিলেন। পাশে এক বাটি চা, মাঝে মাঝে চুমুক দিচ্ছেন! হাতে জ্বলন্ত সিগারেট। তিনি আমাকে সিগারেট দিয়ে আপ্যায়ন করতে চাইলেন। আমি ক্ষমা চেয়ে নিলাম। কেননা আমি তাতে অভ্যস্ত নই। মনে মনে ভাবলাম জাতীয় নেতারা তাদের অবচেতনে এমনি করে নিজেরা বিষ খান এবং গোটা জাতিকে বিষ গিলিয়ে থাকেন।
মশিউর রহমান তার স্বভাবসুলভ আচরণে আমার প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বললেন- ‘তোমাদের ঘাবড়ানোর কোন কারণ নেই। বাতাস উল্টো বইছে। জেল থেকে বেরিয়ে আমরা ব্যাপক গণ-আন্দোলনে নামব। ঐ জালেম মুজিবের তখতে তাউস ভেঙে আমরা খান খান করে দেব। এদেশের মাটিতে হিন্দুস্তানের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হবে, তোমরা দেখে নিও। কারাগার থেকে বেরিয়ে যে অরাজক রাজ্যে যাবে, সেটা কারাগার থেকেও ভয়ঙ্কর। নির্বিচার হত্যা, জুলুম, রাহাজানি দিয়ে দেশপ্রেমিক যুবশক্তিকে ধ্বংস করে দিল বদমায়েশটা। সংগ্রাম থেমে থাকবে না, জুলুমের মধ্যেই প্রতিরোধ গড়ে উঠবে। তোমরা বেরিয়ে আগ্রাসনমুক্ত এদেশের আলো বাতাসে মুুক্তির নিঃশ্বাস নিতে পারবে। মুজিব তার নাটকের শেষ দৃশ্যে এসে গেছে। তার আশা এবং আশ্বাসে জাতীয় জীবনের নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে যেন একটু খানি আলো রশ্মি দেখলাম। মনে মনে দোয়া করলাম- ‘আল্লাহ, তাঁর উক্তিগুলো সত্যে পরিণত হোক।’

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাসদের আ.স.ম রব ও মেজর জলিলকে দূর থেকে দেখতাম, কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীর বাসভবন অবরোধের ঘটনায় তারা জেলে আসেন।
জাসদের ব্যাপারে আমি ছিলাম একেবারে নিষ্পৃহ। যদিও সাংগঠনিকভাবে মুজিব বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যাপক প্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছিল তাদের কার্যকলাপে। কিন্তু তবু যেন সংগঠনটিকে রুশ-ভারত অক্ষশক্তির সেকেন্ড লাইন বলে আমার মনে হত। অনেক বুদ্ধিজীবিই জাসদ সম্বন্ধে এমন ধারণা পোষণ করতেন। অনেকেই মনে করতেন ভারত বিরোধী এবং মজিব বিরোধী সংগ্রামী যুবশক্তিকে চিহ্নিত করার জন্য জাসদের আন্দোলন ছিল ভারতের নেপথ্য প্রয়াস। এই ভারতীয় নীলনক্সার সুপরিকল্পিত ফাঁদে পা দিলেন মেজর জলিল সম্ভবত তার অজান্তে। একই ছিদ্রে দুই বার হাত রাখলেন তিনি। তার দেশপ্রেম ও সদিচ্ছার প্রতি আমার সন্দেহ নেই। ভারতীয় শোষণ ও বাংলাদেশী সম্পদের নির্বিচার লুণ্ঠনের ব্যাপারে তিনি ছিলেন সবচেয়ে প্রতিবাদী কণ্ঠ সক্রিয় প্রতিরোধকারী। এর জন্য আমার শ্রদ্ধাও তার প্রতি যথেষ্ট ছিল।

জাসদের কর্মধারায় একীভূত হওয়ার কারণে তার সদিচ্ছা এবং সংগ্রামী চেতনা অপশক্তির শিকারে পরিণত হয়। তাকে অনুসরণ করে দেশের অগণিত যুবকের শক্তি ও সামর্থ্য ‘কনশাস ক্রিমিনাল’ সিরাজুল আলম খানের উদ্ভট বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের বেদীতে অসহায়ের মত বলি হয়েছে। জাতীয় স্বার্থ  এবং আদর্শ বিরোধী অভীষ্ট অর্জনের জন্য জাসদের নেপথ্য নায়কেরা এবং আসম আব্দুর রব স্বয়ং দেশপ্রেমিক মেজর জলিলের ভারত বিরোধী ইমেজ চাতুরীর সাথে ব্যবহার করেছেন। এই সরলতা এবং দুর্বলতার জন্য মেজর জলিলের প্রতি সেদিনও আমার ছিল অনেক বেদনা মিশ্রিত চাপা ক্ষোভ। এ কারণে তার সাথে আলাপের ইচ্ছে হতো না।

সময়ের আবর্তে ঘুরপাক খেয়ে মেজর জলিল আজ একটি নতুন পথ পেয়েছেন। ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সাফল্য তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। মেজর জলিলের আজকের এই নতুন পরিক্রমা সঠিক সন্দেহ নেই। কিন্তু বেলা অনেক গড়িয়ে গেছে। প্রবহমান সময়ের গতিধারায় তার সেই শক্তি, সেই হিম্মত আজো কি তার মধ্যে রয়েছে? হয়তো বা নাই, তবু দুঃসাহসিক সিন্দাবাদ মেজর জলিলকে আমি কবি ফররুখের ভাষায় বলব-
‘আজকে তোমার পাল ওঠাতেই হবে
ছেড়া পালে আজ জুড়তেই হবে তালি
ভাঙা মাস্তুল দেখে দিক করতালি
তবুও জাহাজ আজ ছোটাতেই হবে।’

আ স ম আবদুর রবের সদম্ভ অভিব্যক্তিকে আমি ঘৃণা করতাম একাত্তরের আগে থেকে। মালেক হত্যার নেপথ্যেও তিনি ছিলেন। আদিম স্বৈর মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ তার প্রতিটি বক্তব্যে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন তিনি বলেন, ‘আমি মুজিবকে জাতির পিতা ঘোষণা দিয়েছিলাম, আমিই আবার প্রত্যাহার করে নিলাম।’ এ যেন ছেলের হাতের মোয়া।

এদেশের সচেতন যুব-শক্তি আগামী দিনের জাতির জন্য কল্যাণ আনতে পারত। কিন্তু এই আসম আব্দুর রব তাদেরকে বিপথগামী করে অপঘাতে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের ঘাড়ে পা রেখে নিরাপদ আখের গুছিয়ে নেয়। কর্মীরা পরিণত হয় হত্যাকারী আর লুটেরাতে। একই আন্দোলনের নেতা হয়ে মেজর জলিল অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিপন্ন, আর আ স ম আবদুর রব একজন পুঁজিপতি। এ কারণেই তেলে-জলে মিশ খায়নি।

রবের ওপর আমার সবচেয়ে বেশী দুঃখ আর ক্ষোভ পুঞ্জীভুত হয়েছিল সেদিন, যেদিন কারাগারে শিক্ষক মতিউর রহমান একটা ছোট্ট ঘটনা বলতে কেঁদে ফেলেন। কারাগারে আসম আবদুর রব আইন বিষয়ে পরীক্ষা দেন। টেবিলে প্রকাশ্যে বই রেখে পরীক্ষার খাতায় লিখছিলেন। মতিউর রহমান সাহেব ছিলেন ইনভিজিলেটর। তিনি বললেন, ‘রব সাহেব একটু রয়ে-সয়ে আমাদের বাঁচিয়ে যা হয় করুন।’ শিক্ষক মতিউর রহমান সাহেবের এই আবেদনটুকু রব সাহেব বরদাস্ত করতে পারেনি। বই ছুড়ে মতিউর রহমান সাহেবকে মেরেছিলেন এবং যা তা বলে ঘাড় ধরে রুম থেকে বের করে দেন। এই ঘটনার পর তার ওপর আমার কোন ভাল ধারণা আর অবশিষ্ট রইল না। তাছাড়া কারাগারেই সৈয়দ নেসার নোমানীর কাছে শুনেছিলাম এই রবেরাই উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ পার্লামেন্টারিয়ান এবং ইসলামের অন্যতম দিশারী মৌলবী ফরিদ আহমদকে নিশংস এবং পৈশাচিকভাবে হত্যা করে।

১০ সেল ডিভিশনে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালাক্রমে ডিভিশন প্রিজনারদের পরিচালনা করতে হতো। এবারের পালা আমার। একদিন সুবেদার এসে সংবাদ দিলেন, চার জন নেতা এসেছেন। জানলাম খাজা খায়ের উদ্দিন, সবুর খান, এডভোকেট শফীকুর রহমান, এডভোকেট ইউসুফ চৌধুরী, মুজিবী দুঃশাসনে এদের দ্বিতীয় দফা কারাবাস। দেখলাম সুবাদার দারুণ খুশী। আনন্দের আতিশর্য্যে বলে চলেছে- ‘বঙ্গবুন্ধ দালালদের রেহাই দিলেও তারা কিন্তু চুপচাপ ছিল না। ষড়যন্ত্র করছিল। ষড়যন্ত্র করবি, কর এবার। বোঝ, মজাটা। বঙ্গবন্ধুর চোখ কঠিন চোখ। ফাঁকি দেয়া এত সহজ? শালা, সময় মত হাতেনাতে ধরা পড়ে গেছে।’ আমি একটু রেগেই বললাম- ‘আর কিছু বলার আছে?’ প্রসঙ্গ এড়িয়ে তিনি বললেন- ‘আমিন সাহেব, জেলার সাহেব বলে দিলেন- এখান থেকেই আপনার নেতাদের খাবার দিতে হবে।’ বললাম- ‘ঠিক আছে হবে।’ রাজী হলাম আমি। খাবার তৈরী ছিল। একজন ফালতুকে ডেকে চার জনের প্রয়োজনীয় খাবার পাঠিয়ে দিলাম। একটু পরে আমিও হাজির হলাম। নেতাদের মুখ দেখে যদি বাতাসের ভাব বোঝা যায়, এই আশা নিয়ে তাদের সবার সাথে আলাপ হল। আমাকে আন্তরিকভাবে সানন্দে গ্রহণ করলেন তারা। একান্ত আপন জন মনে হল। সবুর খান তার প্রকোষ্ঠে প্রবেশ করে একটা বড়সড় কলা এনে দিলেন। প্রত্যেকেই মুরুব্বীর মত অনেক উপদেশ, অনেক সান্ত্বনা দিয়ে আমার মন-মানসতাজা রাখার চেষ্টা করলেন। তাদের অন্তরঙ্গ সাহচর্যে আমার দারুণ ভাল লাগল। পিতা ও সন্তানের যেমন একটা আত্মার যোগ তেমনই অনুভব করলাম এদের পেয়ে। হাল্কা বালসুলভ কোন কথা নেই, অবকাশ নেই বাচালতার। কথা হচ্ছে, আলাপ আলোচনা ঠিকই হচ্ছে। কিন্তু গুরুত্বহীন কোনটিই নয়। তারা বললেন,“তথাকথিত দালাল আইনের আওতামুক্ত হয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে ভাগ্যহত এই জাতিকে দুর্বিপাক থেকে টেনে তোলার জন্য আমরা চিন্তা ভাবনা করতে থাকি। একাত্তরের পটভূমিতে দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্র আর প্রচারণার তোড়ে অবলুপ্ত জাতির বিবেক ঘাটে ঘাটে ঠোক্কর খেয়ে স্বাভাবিক চেতনায় ফিরে এসেছে। এ সময় শুধু প্রয়োজন নির্ভীক বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আর সময়োচিত সঠিক পরিকল্পনা। আমরা এই ব্যাপারে উদ্যোগ নিচ্ছিলাম কিন্তু তার আগেই আসতে হলো কারাগারে।’

খাজা খায়েরউদ্দিন বললেন- ‘আমি এই দেশ, এই বাংলার মাটিতে আর নয়। আমাকে শূন্য হাতে যেতে হলেও কারামুক্তির পর এদেশ থেকে হিজরত করব। এদেশ আর সেই দেশ নেই। মুর্শিদাবাদ হয়ে গেছে। মুর্শিদাবাদের দেশপ্রেমিক সম্মানী ব্যক্তিত্বগুলো যেমন মুনাফেক গাদ্দারের হাতে লাঞ্ছিত হয়েছিল, তেমনি দুশো বছর পর আজ আবার এদেশের হাওয়ায় মুর্শিবাদের গন্ধ।’ বললাম, ‘আপনারা আমাদের নেতা। গোটা জাতিকে হিংস্র হায়েনার মুখে রেখে আপনি দেশ ছাড়বেন কি করে?’ খাজা সাহেব বললেন, ‘রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নিম্নতম মর্যাদাকেও যেখানে স্বীকার করা হয় না, সেখানে কোন বিবেকবান মানুষ থাকতে পারেন না, আমিন। এই দেখনা, রক্ষীবাহিনী আমার বাড়ীতে চড়াও হলে আমি বেরিয়ে এলাম। গায়ে আমার গেঞ্জী। আমাকে একটা কথাও বলতে দেয়া হল না। বেগম সাহেবা আমার জামা আনলেন, সেটি পর্যন্ত গায়ে দিতে দিল না। এছাড়াও ওদের অশ্রাব্য অশালীন আচরণ আমাকে দারুণভাবে আহত করেছে।’ তিনি আরও বললেন- ‘এজাতির সৌভাগ্য ফিরে আসবে কিনা জানিনা তবে এদেশের মানুষকে যুগ যুগ ধরে তাদের ভুলের কাফ্ফারা আদায় করতে হবে।’ তিনি অবশ্যি আমাকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে, ‘আমাকে এক সময় তোমার কেস নাম্বারটা দিয়ে দিও। আমি জেল থেকে বেরিয়ে তোমার এবং আমাদের আর যারা আছেন তাদের জন্য চেষ্টা করব।’

এক সময় এডভোকেট শফিকুর রহমান বললেন, ‘আমার কি মনে হচ্ছে জান? শেখ মুজিব আমাদের চেয়ে বেশী অসহায়। তার ইচ্ছা সদিচ্ছা যাই থাকনা কেন, তার করার কিছু নেই। হিন্দুস্তানী চক্রের কাছে তার হাত-পা বাঁধা। তার চারপাশে রুশ-ভারতচক্র এমন ব্যুহ রচনা করে রেখেছে যে তার থেকে তিনি বেরিয়ে আসার চেষ্টা করলে তার মৃত্যু অনিবার্য হয়ে উঠবে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সন্ত্রাস আর দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে কোন শাসক না চায়? কিন্তু চাইলেই সেটা করা সম্ভব নয়। এটা করলে মুজিব যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে সেটা ধসে পড়বে। আর সেও নিক্ষিপ্ত হবে ধ্বংসের অতল গহ্বরে। সেনাবাহিনী ময়দানে নামিয়ে সে চেষ্টাও তো করেছিল। কিন্তু বাধ্য হয়ে তাকে সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হয়। এর চেয়ে বড় কথা হিন্দুস্তান বাংলাদেশকে এক অরাজক পরিস্থিতির দিকে টেনে আনতে চাচ্ছে এবং সেটা সুপরিকল্পিতভাবে। হিন্দুস্তানের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাও বাংলাদেশকে দৈন্য, দুরদশা ও অরাজকতার দিকে নিয়ে যেতে চায়। রুশ-ভারত চক্র থেকে দেশটাকে মুক্ত করা মুজিবের পক্ষে সম্ভব নয়। মুজিব আস্ফালন, তর্জন গর্জন এবং গালভরা বক্তব্য যা কিছুই করুক না কেন ইন্দিরার চোখের দিকে চোখ রেখেই সেটা করতে হয়। বলতে গেলে মুজিব একটা রোবট, এর রিমোট কন্ট্রোল ইন্দিরার হাতে।’

সুদীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পরিক্রম করা এই চারজন নেতার সাথে আলাপ আলোচনার সময় আর একজন জনপ্রিয় নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর কথা মনে পড়েছিল বার বার। জাতির এমন ক্লান্তিলগ্নে তার প্রয়োজন ছিল সবচেয়ে বেশী। দুর্ভাগ্য আমার যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে এমন সময় স্থান্তরিত হলাম যখন তিনি পরপারে। তাকে দেখার এবং তার সাথে আলাপ আলোচনার সাধ অপূর্ণই রয়ে গেল।

চট্টগ্রামের শার্দুল ফজলুল কাদের চৌধুরীকে ক্ষুদ্র সেল প্রকোষ্ঠে রেখেও হিন্দুস্তানের শিখণ্ডী মুজিব তার আসনকে নিরাপদ ভাবতে পারেনি। সম্মোহিত বাংলার মুসলমানদের চেতনা ফিরে আসাতে এবং হিন্দুস্তান বিরোধী মনোভাব দানা বাঁধতে শুরু করলে হিন্দুস্তান তার এক নীলনক্সা বাস্তাবয়নের ওপর গুরুত্ব দেয়। এটি ছিল ভারত বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বসমূহকে দুনিয়ার আলো বাতাস থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেয়া। আমার ধারণায় এ ষড়যন্ত্রের প্রথম শিকার হলেন ফজলুল কাদের চৌধুরী। তার অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যা হিন্দুস্তানী নেতাদের স্মৃতিতে আঁকা ছিল। এ ছাড়াও গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর নথিপত্রের সমকালীন রিপোর্ট অনুযায়ী হিন্দুস্তান বিরোধী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সমূহের মধ্যে ছিলেন তিনি শীর্ষে।

তিনি নিখিল ভারত মুসলিম ফেডারেশনের প্রথম সেক্রেটারী জেনারেল ছিলেন। বৃটিশ এবং হিন্দুদের ষড়যন্ত্র বানচাল করে বৃটিশ ভারতের মুসলিম তরুণদের সুসংগঠিত করতে সক্ষম হন। সে সময় সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশে চট্টগ্রামে সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে মুসলমানদের একক একটি প্লাটফরমে টেনে আনতে সক্ষম হন। ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে চট্টগ্রামে মুসলমানদের নিরঙ্কুশ বিজয় তার সাংগনিক দক্ষতারই ফসল।

১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের স্পীকার এবং অস্থায়ী  প্রেসিডেন্টের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ’৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি আদমজী জুট মিল শ্রমিক ও জাহাজ শ্রমিকদের নেতৃত্ব দেন। পূর্ব পশ্চিম বৈষম্যের বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন সোচ্চার। কিন্তু এর জন্য হিন্দুস্তানের পক্ষপুটে আশ্রয় নিতে হবে এমন ধারণার বিরুদ্ধেও ছিলেন বলিষ্ঠ কণ্ঠ। আমি কারাগারে এসে যতটুকু জেনেছি- ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সেল প্রকোষ্ঠের শ্বাস-রুদ্ধকর পরিবেশে থেকেও তিনি এদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ব্যাপারে ছিলেন দারুণ আশাবাদী। তাজউদ্দিন গংরা কারা পরিদর্শনে এলেই তিনি নাকি তাকে বলেছিলেন, ‘সেলগুলোকে বড়সর কর তাজুদ্দিন। আমাদেরকে তোমরা ধরে রাখতে পারবে না। আমাদের বেরুনোর সময় এসে গেছে। কারাগারের ভেতরে আসতে তোমাদেরও বেশী দেরী নেই। এখন থেকে কারাগারগুলো সংস্কার করে ফেল।’ চৌধুরী সাহেব আরো নাকি ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন- ‘তোমাদের মুজিব তো এদেশকে সোনার বাংলা বানিয়ে ফেলেছে। মুজিবকে বলো, আমার জন্য অন্তত সাড়ে ৩ হাত মাটি যেন মাটিই রাখে।’

প্রত্যেক দিন সকল বেলা চৌধুরী সাহেব দরাজ গলায় কোরআন তেলাওয়াত করতেন। বিভিন্নভাবে জ্বালাময়ী বক্তব্য রেখে তিনি ভারত বিরোধী কারাবাসী মজলুমদের বিপন্ন মানসিকতাকে চাঙা রাখতেন। এই শার্দুল নেতার কণ্ঠরোধ করার জন্য সম্ভবত হিন্দুস্তানের কালো হাত কারা প্রাচীর আর লোহার গরাদ ভেদ করে ক্ষুদ্র সেল প্রকোষ্ঠ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছে। কারাগারের বিভিন্ন সূত্র থেকে আমি যতটুকু জেনেছি- এক কম্পাউন্ডার দ্বারা জনাব চৌধুরীর দেহে সিরিঞ্জ দিয়ে বিষ প্রয়োগ করা হয়। এই বিষক্রিয়ার ফলে ফজলুল কাদের চৌধুরী, মুসলিম বাংলার এক বিশাল ব্যক্তিত্ব শাহাদাতবরণ করেন। তার সমস্ত শরীর নাকি নীল হয়ে গিয়েছিল। মুজিব প্রশাসন পরবর্তীতে সেই কম্পাউন্ডারকে সরকারী খরচে তার সচেতন গুনাহ মাফের জন্য হজ্জে প্রেরণ করে।

ফজলুল কাদের চৌধুরীকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল এমন ধারণা বহুল প্রচারিত। মুজিব-পরবর্তী সরকারসমূহের উচিত ছিল, এর একটি নিরপেক্ষ তদন্ত করা। কিন্তু ‘বরবাদে গুলিস্তাঁ করণে কো একই উল্লোক কাফি হ্যাই হার শাখপর উল্লোক বায়টা হ্যায় আনজা সে গুঁলিস্তা কেয়া হোগা।’ সংবেদনশীল সচেতন বিবেক কি এখন একটিও অবশিষ্ট আছে? নেই। আছে কেবলমাত্র অন্ধ উন্মাদনা। কি শিক্ষিত, কি অশিক্ষিত, সবার যেন একই অবস্থা। এ কারণেই কোনদিন এসব রহস্যের জট খুলবে না।

কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে কখনো কখনো নৈরাজ্য আমাদের ঘিরে ধরতো। বাইরের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কত বিচিত্র খবর আমাদের কাছে এসে পৌঁছত। মুজিবের ব্যাপারে রুশ-ভারতের যৌথ উদ্যোগে এবং হিন্দুস্তান বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে আমরা সমগ্র জাতির সামনে নিচ্ছিদ্র অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখতে পাই না। ভয়ঙ্কর হতাশা ও অন্তহীন নৈরাজ্য যখন পেয়ে বসে, তখন কারাগারের একটি মাত্র মানুষ আমাদের কানে কানে ভোরের পাখীর মত যে গান শোনাতেন সেটা সূর্য উঠার গান, অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের আশ্বাস। তার পিতা বাঙ্গালী নন। কিন্তু তিনি এদেশে জন্মেছেন। বাংলার অস্থি-মজ্জার সাথে মিশে তিনি একাকার। এদেশের জলবায়ু আকাশ আর মাটিকে তার আত্মার সাথে একিভূত করে ফেলেছেন। তিনি ইশ্বরদীর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী জনাব আবদুল মজিদ খান। এ দেশের জন্য তার গভীর ভালবাসা, অন্তহীন মমত্ববোধ। ইচ্ছে করলেই তিনি পাকিস্তান যেতে পারতেন। কিন্তু সে চেষ্টা তিনি আদৌ করেননি। তাঁর ভাষায়, ‘আমি এদেশ, এ মাটি ছেড়ে কোথাও যেতে নারাজ। এদেশের কোটি কোটি মানুষের তকদীরে যা লেখা আছে আমার নসীবে তাই ঘটবে, এখান থেকে পালিয়ে আমি বাঁচতে চাই না।’

মার্চ-এপ্রিল নাগাদ ইশ্বরদীর পাকসীতে আওয়ামী লীগ যে ভয়াবহ অবাঙালী হত্যাযজ্ঞের উৎসব করেছে এবং হাজার হাজার মানুষকে বর্বরোচিতভাবে হত্যা করেছে, এর প্রেক্ষিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এবং অবাঙালীদের প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে এককভাবে এই মজিদ খান রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি অগণিত মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু তবু তিনি এই অন্ধ কারাপ্রকাষ্ঠে। হিন্দুদের হীন মানসিকতার শিকার হয়ে তাদেরকে ইউপি থেকে বাংলায় আসতে হয় ইমানকে নিরাপদ রাখার জন্য। অথচ এখানেও তাদের অর্জিত সম্পদ গ্রাস করার জন্য আওয়ামী পঞ্চমবাহিনী চক্রান্তে এখন তার ঠিকানা কারাগার। তিনি আমাদের বলতেন একটা পরিবর্তন আসন্ন। নৈরাশ্যের কিছু নেই। বসন্ত আসার আগে যেমন মৌমাছিদের মধ্যে দেখা যায় উল্লাস। পারিপার্শ্বিক আবহাওয়া থেকে তারা যেন আসন্ন বসন্তের গন্ধ পায়; শুনতে পায় দখিনা হাওয়ার পদধ্বনি; মজিদ ভাই তার অবচেতন মনে ঠিক তেমনি পালাবদলের সংকেত পেয়েছিলেন। তা না হলে তাঁকে কারাগারে এমন নিরুদ্বিগ্ন দেখতাম না। দুশ্চিন্তা ছিল না মোটেও। যদিও অর্থনেতিক দিক দিয়ে বিপর্যস্ত ছিলেন, রাজনৈতিক কার্যকারণে সামাজিক অবস্থানও ছিল তার পর্যুদস্ত।

খোদার ইচ্ছার সাথে কোন বিপন্ন আত্মার যোগ হলেই সম্ভবত মানুষ এমন নিরুদ্বিগ্ন হতে পারে। এত উল্লাস এত আনন্দ কারাগারে আমি আর কারো মধ্যে দেখিনি। বসন্তের পাখীর মত তিনি এ ডাল থেকে ও ডালে উড়ে গেছেন আর শুনিয়েছেন নতুন দিনের গান। অর্থাৎ কারাগারের সবখানে রাজনীতির প্রেক্ষিতে পর্যুদস্ত মানুষগুলোকে আশা আর আশ্বাসের প্রাণবন্ত করেছেন তিনি। সময়ের স্বল্প ব্যবধানে তার ভবিষ্যতবাণী আক্ষরিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট। জেল থেকে বেরিয়ে এসেও আমি তার নিবিড় সান্নিধ্য পেয়েছি। সুখ দুঃখের পসরা নিয়ে তিনি আমাতে একাকার হয়ে আছেন। সব রকম সহযোগিতা দেয়ার জন্য তার অন্তর আত্মা আমার দিকে সম্প্রসারিত করে রেখেছেন। ক্ষেত্রবিশেষে তিনি আমার রাহবার বললেও অতিরঞ্জিত হবে না।


 

পনেরই আগস্ট। কারাগারে রোজকার নিয়মের ব্যতিক্রম। প্রত্যেক দিন ভোর ৫টার সময় সূর্যোদয়ের পূর্বেই যথারীতি আমাদের সেলের ফট্ক খুলে যায়। অথচ আজ নিয়মের ব্যতিক্রম সেলের মধ্যে অস্থিরতা ও আশঙ্কাজনিত আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি। হলোটা কি! ৬টার ঘন্টা বাজল তবু কারো সাড়া নেই। বাজল ৭টা এখনও আমরা অন্ধ প্রকোষ্ঠে সূর্য ওদিকে তাতিয়ে উঠছে। উত্তাপ বিকিরিত হচ্ছে। উত্তপ্ত হচ্ছে পৃথিবী। আমাদের ভাবনাও একই রকম উত্তপ্ত। বাইরের সংবাদ থেকে আমরা বিছিন্ন। অতএব আল্লাহ ভরসা।

৮টার ঘন্টা পড়ল। পদশব্দ শুনলাম। সেন্ট্রী সম্ভবত এগিয়ে আসছে। কারা প্রাচীরের ফটক খুলে দেয়া হল। আমরা এখনও যে যার সেলে আবদ্ধ। অবশেষে একে একে সবক’টা সেলের দরজা উন্মুক্ত হল। আমরা সবাই বেরিয়ে এলাম। বেরিয়ে এসে বাইরের দিকে তাকালাম। কারাগারের অদূরে দালানগুলোর ছাদে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অগণিত জনতার ভিড়। এমনটি দেখিনি আর কোন দিন। হাত নাড়িয়ে আমাদের ওরা কি যেন বলতে চাচ্ছে। অনেকের হাতে রেডিও ট্রানজিস্টার অথবা টু-ইন-ওয়ান। আমাদের দিকে উঁচু করে ধরে আছে। ওরা আমাদের যেন কি বলতে চায়। ওদের অঙ্গভঙ্গির সাংকেতিক ভাষা কিছুই বুঝতে পারছি না। তবে মনে হল বাইরে অস্বাভাবিক একটা কিছু ঘটেছে। দূরে থেকে নজরুলের একটা গানের কলি ভেসে আসছে- মোহম্মদ মোস্তাফা সাল্লেআলা, তুমি বাদশাহর বাদশাহ কমলিওয়ালা।

স্রোত কি তাহলে উজানে বইতে শুরু করল! উল্টো হাওয়া দেখে কি ভাবতে পারি শ্রাবণ মেঘে ফাগুনের পূর্বাভাস। সূর্য পশ্চিম দিকে উদয়ের মত অস্বাভাবিক মনে হল সবকিছু। জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলায় একি অশনি সংকেত। শাহজালালের পদধ্বনি কেন?

গানটা শোনার পর কারাবাসীদের সকলের আগ্রহ আরও তীব্র হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে সকলেই এগুতে লাগল দালানগুলোর কাছাকাছি পাঁচিলের দিকে। কিন্তু পুলিশ এসে বাধা দেয়াতে সকলেই ফিরে এলেন। তবে অল্প সময়ের মধ্যে পুলিশদের মাধ্যমে জানতে পারলাম- শেখ মুজিব নিহত। সেনাবাহিনী মুজিবকে হত্যা করেছে। আমার তক্ষুণি সিজদায় লুটিয়ে পড়তে ইচ্ছে করল। মহান খোদার উদ্দেশ্যে বললাম, ‘ইয়া মাবুদ! তুমি ছিলে, তুমি এখনও আছ। তুমি কোন ব্যাপারে গাফেল নও। এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে! তুমি আধুনিক দুনিয়ার নব্য নমরুদ-শাদ্দাদের পতন ঘটিয়ে প্রমাণ করলে তুমি সর্বশ্রেষ্ঠ। তুমিই সমস্ত সার্বভৌমত্বের মালিক।’


কারাগারের ডাক্তার মঈনুদ্দিন সাহেব আমার প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে আমি বললাম- ‘একটা জগদ্দল পাথর যেন জাতির বুক থেকে সরে গেল। দুর্নীতির ভাগাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পাহাড় যেন ধসে পড়ল।’ ধোঁকাবাজী, মিথ্যাচার আর সন্ত্রাসের ওপর গড়ে ওঠা রাজপ্রাসাদ তাসের ঘরের মত ভেঙে খান খান। আমার মনে হল- হিন্দুস্তান ও তার উচ্চাভিলাষী কতিপয় দালালদের হাতে বন্দী ১০ কোটি মানুষ আজ মুক্ত। সোনার বাংলার ভগ্নস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে কঙ্কালসার মানুষগুলো আজ প্রাণ ভরে মুক্তির নিঃশ্বাস নিবে।

কারাগারে শিক্ষক মতিউর রহমান সাহেব স্কুলে আজ যথানিয়মে না এসে একটু দেরীতে এলেন। তার সাথে আমার ঘনিষ্ঠতার কারণে আজ মুক্তির এই আনন্দ-ঘন দিনে তার প্রাণের আবেগ নিয়ে অনেক কিছু বললেন- ‘আমি আসার পথে দেখলাম মোড়ে মোড়ে ট্যাঙ্ক দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাতে অস্ত্র নিয়ে সেনাবাহিনীর জোয়ানরা টহল দিচ্ছে গোটা শহরে। তারা আনন্দে উৎফুল্ল হয়ে উল্লসিত জনতার উদ্দেশ্যে বলছে- ‘আপনারা ধৈর্য ধরুন আল্লাহর সাহায্যের জন্য দোয়া করুন, সময় ভাল নয়। আপনারা জটলা অথবা ভিড় করবেন না।’ তার ভাষায়- ‘সেনাবাহিনীর বিনম্র আচরণ আমাকে মুগ্ধ করেছে। মনে হয় তাদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ মহান উদ্দেশ্যে এবং জাতির কল্যাণের জন্য।’

জাতির এই ঘোর অমানিশায় এই ভয়ঙ্কর দুর্দিনে জানবাজী রেখে যারা এই বিপ্লব ঘটিয়েছে আমি তাদের জন্য দোয়া করলাম। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম এই বলে- ‘ইয়া মওলা! এই বীর সৈনিকদের হাতগুলো মজবুত করে দাও। হিম্মত দাও এদের বাহুতে।’ আবার বলতে হয় নিউটনের তৃতীয় সূত্র- ‘প্রত্যেক ক্রিয়ার সমমূখী ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া রয়েছে।’ তার প্রমাণ এতদিন যারা দালালীর অভিযোগ এনে দেশপ্রেমিক মানুষগুলোকে অন্ধকারার বদ্ধ প্রকোষ্ঠে আটকে রেখেছিলেন আজ তারাই বিদেশী এবং বিজাতীয় দালালীর তিলক পড়ে আসতে শুরু করল। আর আমাদের শুরু হল একে একে বিদায়। রবীন্দ্রনাথের সেই গানের কলির মত- ‘তোমার হল শুরু আমার হল সারা।’

লাল বাহিনী প্রধান শ্রমিক নেতা আব্দুল মান্নান, যে একদিন কেন্দ্রীয় কারাগার ঘেরাও করেছিল, সাথে তার শত শত লাল বাহিনীর বরকন্দাজ। উদ্দেশ্য রাজাকার আল-বদর আল-শামস আর শান্তি কমিটির লোকজনদের হত্যা করবে। সেদিন পারেনি। কিন্তু আজ নিয়তির কি নির্মম পরিহাস- তাকে আসতে হল কারাগারে আলবদর আর রাজাকারদের মধ্যে। এদের করুণা নিয়ে তাকে বাঁচতে হয়। এদের দয়ায় তার পিঠ বাঁচে। তবু কি শেষ পর্যন্ত বাঁচতে পেরেছে? তার যন্ত্রণায় উত্যক্ত পুলিশেরাই তার সেলে পিঞ্জরায় আবদ্ধ জানোয়ারের উপর অত্যাচারের মত করে তার ওপর নিপীড়ন চালায়। তারই রক্তে লালে লাল হয়ে ওঠে সেল প্রকোষ্ঠের মেঝে।

একে একে আসে তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল, মনসুর আলী, কামরুজ্জামান, জিল্লুর রহমান, তোফায়েল আহমদ, শামসুল হুদা, কোরবান আলী, এম এ রেজা, আবদুল কুদ্দুস মাখন, নূরে আলম সিদ্দিকী আরো অনেকে।

কয়েকদিন পর আসে কাজী আঃ বারী। যে আমাকে হত্যা করার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজেছে, তাদের তথাকথিত বিজয়ের দিন গুলোতে। এর পরে এলেন আগরতলা ষড়যন্ত্রের অন্যতম হোতারা এদের মধ্যে ছিলেন সাবেক ডি সি আহমদ ফজলুর রহমান (ফরিদপুর), আলী রেজা (কুষ্টিয়া), কামাল সাহেব (নোয়াখালী), মাহবুবুল আলম চৌধুরী (হবিগঞ্জ)। এই ষড়যন্ত্রকারীদের পেলাম আমি অত্যন্ত কাছাকাছি। আমার ১০ সেল ডিভিশনে ছিল তাদের অবস্থান। সার্বক্ষণিক দেখা-সাক্ষাত ও কেরাম খেলার মধ্য দিয়ে তাদের সঙ্গে সম্পর্কটা নিবিড়ের পর্যায়ে এসে পড়ে। মোমেনশাহী ইসলামী ছাত্র সংঘের নেতৃস্থানীয় কর্মী, সুমসাম ভাই, কামাল সাহেবের শ্যালক হওয়ার কারণে কামাল সাহেবের সাথে আমার সম্পর্কটা আরও নিবিড় আরও ঘনীভূত হয়ে ওঠে। সুমসামের অনুপস্থিতিতে তার সাথে আমার সম্পর্ক সুমসামের অনুরূপ হয়ে দাঁড়ায়। নিকটতম আত্মীয় সুমসামের চরিত্র ও চিন্তা চেতনার সাথে তার পরিচয় ছিল। আমার প্রতিও তার কোন রকম বিরূপ ধারণা জন্মেনি। আহমদ ফজলুর রহমান ছিলেন স্বল্পভাষী কিন্তু একরোখা মানুষ। তার সাথে আমার আলোচনা প্রায়ই উত্তপ্তের পর্যায়ে এসে যেত। তার দাবী আজকের বাংলাদেশের স্থপতি তারাই। তারাই এই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অগ্রনায়ক। তার ভাষায়- ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমরাই আগরতলায় একটি তথাকথিত স্বাধীন রাষ্ট্রের খসড়া পরিকল্পনা প্রণয়ন করি। পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হলে ভারতের সাথে যোগসাজশ ছাড়া ভিন্ন কোন পথ ছিল না।’ বললাম, ‘এ ব্যাপারে আপনার সাথে একমত। সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করার জন্য ইংরেজদের সাহায্য নেয়া ছাড়া মীরজাফরের কোন বিকল্প ছিল না। মীরজাফরের অসদুদ্দেশ্য ছিল এমনটি বলা যায় না। ইতিহাস যাই বলুক, সিরাজের বালসুলভ স্বৈরাচার ও রাজনৈতিক অব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছিলেন মীরজাফর।’ যদিও সিরাজ স্বৈরাচারী ছিলেন এ কথা সত্য নয়।

‘আপনি আমাদের মীরজাফরের সাথে তুলনা করতে চান?’ একটু উত্তেজিত হয়ে বললেন রহমান সাহেব।

বললাম- ‘ভুল বুঝবেন না। মীরজাফরের উদ্দেশ্য আপনাদের মতই হয়তো বা মহত ছিল। কিন্তু আপনাদের মত তিনিও পরিণতির গভীরে যেতে পারেননি। এর ফলে যা হাবার তাই হয়েছে। স্বাধীন বাংলার সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে তিনি ক্লাইভের সাথে যে ঔদ্ধত্য নিয়ে আগে কথা বলেছেন, বাংলার নবাব হয়ে তার সেই ঔদ্ধত্য আর আত্মবিশ্বাস গুঁড়িয়ে গেছে। নবাবীর মসনদে বসেও মীরজাফর ক্লাইভের চোখে চোখ রেখে কথা বলার সাহস করেননি। যেমন শেখ মুজিব দিল্লীর অনুমোদন ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার সাহস রাখতেন না। অথচ একদিন এই মুজিবের হুঙ্কারে প্রেসিডেন্ট ইহাহিয়া পর্যন্ত তার ধানমন্ডির বাসভবনে ছুটে এসেছেন। ইতিহাসের করুণ পরিণতি তো এটাই। আমাদের দুঃখ তো ওখানেই।’

ফজলুর রহমান সাহেব আমার কথায় আরও একটু উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। চড়া গলায় বললেন- ‘আপনি কি বলতে চান? এত হত্যা এত জ্বালাও পোড়াও, এত অত্যাচারের পরও কি বলতে চান স্বাধীনতা আন্দোলন ঠিক হয়নি? অথবা ভারতের সাহায্য নেয়া অন্যায় হয়েছে?

বললাম- ‘মাফ করবেন। আপনাকে আহত করার কোন ইচ্ছেই আমার মধ্যে নেই। ২৩ বছরের ইতিহাসের শেষ অধ্যায় একাত্তরে এই যে নজীরবিহীন জুলুম নেমে  এসেছে, এটা কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে। সুপরিকল্পিতভাবে এটা আনা হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের আগে এই হত্যার সূচনা করল কারা? সান্তাহারের গণহত্যা কার ইঙ্গিতে? পাকসী হার্ডিঞ্জ সেতুর নিচে হাজার হাজার অবাঙালী বৃদ্ধ বৃদ্ধা নারী-পুরুষ শিশু হত্যা করল কারা? খুলনা, রাজশাহী, দিনাজপুর, নড়াইল, খালিশপুর, সাতক্ষিরা, কুষ্টিয়া, নওগাওঁ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নীলফামারী, সৈয়দপুর, বগুড়া, কোর্ট চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, ভৈরব, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, রংপুর, সিরাজগঞ্জ, যশোর, ঝিনাইদহ, খালিশপুর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কসবা এদেশের প্রত্যেকটি জায়গায় প্রত্যেকটি অঞ্চলে বর্বেরোচিত হত্যাকাণ্ডের উদ্বোধন আওয়ামী পঞ্চমবাহিনী করেনি কি? গণ-উত্তেজনা সৃষ্টি করে শত শত ইপিআর, সেনাবাহিনীর সদস্য ও তাদের পরিবারবর্গকে গরু ছাগলের মত হত্যা করা হয়েছে। এমনকি সদ্য ভূমিষ্ট শিশুকেও রেহাই দেয়া হয়নি। এর পরও বলতে চান সশস্ত্র বাহিনী তাদের হত্যাকারীকে চমু খাবে? এমনটি হবে না জেনেই আওয়ামী পঞ্চমবাহিনী ইচ্ছা করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। তারা চেয়েছিল- সেনাবাহিনী জনগণকে অত্যাচার  করুক। তাহলে তারা হিন্দুস্তানে যেতে বাধ্য হবে। এই দুর্বলতার সুযোগে তাদের হাতে তুলে দেয়া হবে অস্ত্র। এটা কিন্তু আমার বক্তব্য নয়; কোলকাতায় সাপ্তাহিক ‘দেশ’ এর রূপদর্শীর প্রতিবেদন থেকে বলছি। এই পত্রিকায় মুজিব ভুট্টো উভয়কেই হিন্দুস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা RAD (পরবর্তীতে RAW) -এজেন্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই উভয় নেতার বিবৃতি, পাল্টা বিবৃতি, ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ধ্বংসের পরিণতির দিকে এগিয়ে যায়। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাবে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যর্থ হন।’

ফজলুর রহমান সাহেব মনোযোগ ও ধৈর্যের সাথে আমার কথা শুনলেন। যদিও তার মধ্যে অস্বস্তিকর উত্তেজনা আমি লক্ষ্য করেছি। আগরতলা ষড়যন্ত্রের অন্য আর একজন কামাল সাহেব মুখ খুললেন। বললেন- ‘আপনি কি বলতে চান বৈষম্য ছিল না? বলতে চান বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করা অন্যায় হয়েছে?

বললাম- ‘বৈষম্য ছিল না এমনটি আমি বলিনি। বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে অন্যায় অথবা অযৌক্তিকইবা বলব কেন? গণ আন্দোলন ও শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বৈষম্য দূর করা যেত এটাও আমি বিশ্বাস করি। কিন্তু এর জন্য আমাদের জাতীয় দুশমন হিন্দুস্তানের সাহায্য নিয়ে হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মুসলমানকে রক্তাক্ত পরিণতির দিকে ঠেলে দিতে হবে, সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ এটাকে মেনে নিবে কি করে?'

আমি আবার বললাম- ‘ধরুন বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চল শিল্প কারখানা ও সমৃদ্ধির দিকে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, উত্তরাঞ্চলের অবস্থা তেমনই অপরিবর্তিত ও করুণ। এর সমাধান শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় না হয়ে যদি কেহ বিদেশী সাহায্য নিয়ে উত্তরবঙ্গকে পূর্বাঞ্চল থেকে বিছিন্ন করার উদ্যোগ নেয় এবং সশস্ত্র সংগ্রামে অবতীর্ণ হয় তাহলে এটাকে একটি সার্বভৌম সরকার কিভাবে নিবে? অথবা আপনি এটাকে কিভাবে নিতে পারেন? আপনি কি চাইবেন বাংলাদেশ দুটো ভাগ হয়ে যাক?’

কামাল সাহেব কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন- ‘সামরিক চক্র শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু হতে কোন দিনই দিতো না।’ বললাম- তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিকচক্র একটা বিরাজমান সমস্যা এটাকে স্বীকার করি। কিন্তু এ সমস্যা শুধু পূর্ব পাকিস্তানের এমনটি নয়। পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য সমস্যা ছিল ঐ একই। যেমন উনসত্তরের গণআন্দোলন। যার মাধ্যমে মুজিব কারাগার থেকে বেরিয়ে এলেন, এটাতো সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল। যদিও এই গণআন্দোলন সৃষ্টির মূলে আওয়ামী লীগের কোন হাত ছিল না। এমনি করে সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়ে তো আমরা সার্বিক সমস্যার সমাধান করতে পারতাম।’ রহমান সাহেব বললেন- ‘আপনি পশ্চিমাদের মন মানসিকতা জানেন না। শুরু থেকে তারা আমাদের ওপর তাদের মন-মানসিকতা চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছে। তা না হলে জিন্নাহ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দেয়ার অর্থ কি?’

আমি বললাম- কায়েদ আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর সিদ্ধান্ত ভুল হতে পারে কিন্তু অসদুদ্দেস্য-প্রণীত নয়। কেননা পশ্চিম পাকিস্তানের গণমানুষের মুখের ভাষা উর্দু নয়। উর্দুকে তিনি পূর্ব পশ্চিম উভয় পাকিস্তানের সেতুবন্ধন তথা কমন ভাষা হিসেবে চিন্তা করেছিলেন। এ সিদ্ধান্ত হয়তো তার ভুল। এ ভুল সিদ্ধান্ত গণ-আন্দোলন অথবা শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পাল্টানো সম্ভব ছিল। পরবর্তীতে সেটা হয়েছেও। যে ভাষা আন্দোলনকে পুঁজি করে তথাকথিত জাতীয়তাবাদকে সশস্ত্র বিপ্লবের দিকে আপনারা নিয়ে এসেছেন সেই ভাষা আন্দোলনের উদ্যেক্তরা কিন্তু আপনাদের তথাকথিত জাতীয়তাবাদী অপকর্মের শরিকদার নয়। তাদের অধিকাংশ আপনাদের পরিভাষায় দালাল ও প্রতিক্রিয়াশীল- যেমন অধ্যাপক গোলাম আযম, অধ্যক্ষ আবুল কাশেম এবং আরও অনেকে। আপনি কি বলতে চান তাদের দেশপ্রেমের অভাব রয়েছে?

প্রাসঙ্গিকভাবে আমি আরও বললাম- ‘পাকিস্তান ছিল জনগণের রায়। এটা চাপানো কোন বস্তু ছিল না আপনারা এই রায়কে পাল্টে দেয়ার যড়যন্ত্র করেছেন। আপনাদের অপরাধ নৈতিকতার মাপকাঠিতে কি পর্যায়ের ভেবে দেখেছেন কি? অথচ যারা সেই রায়কে টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করেছে তারাই দেশের শত্রু, আপনাদের পরিভাষায় দালাল। আচ্ছা বলতে পারেন, হিন্দুস্তানের ছত্রছায়ায় বন্দুকের নলের মুখে তথাকথিত বাংলাদেশ হওয়ার পর আজও কি এ ব্যাপারে কোন রেফারেণ্ডাম হয়েছে? হয়নি। অথচ যে কোন সচেতন ব্যক্তি এ কথাই বলবে রেফারেন্ডামকে একমাত্র রেফারেন্ডামের মাধ্যমে পাল্টান সম্ভব। এমনকি হিন্দুস্তানের ব্রাক্ষ্মণ্যচক্রের উর্বর মস্তিস্ক থেকে উৎসারিত মুজিব প্রণীত ৪টি মূলনীতির ব্যাপারেও জনগণের রায় নেয়া হয়নি। সবকিছু চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কেননা, তারা জানে জনগণ এসব প্রত্যাখ্যান করবে। মুজিববাদ ও তথাকথিত প্রগতিশীলদের গণতন্ত্র একটি ভণিতা, একটি মুখোশ এবং রুশ-ভারত চক্রের নীলনক্সা বাস্তবায়নের হাতিয়ার।’

১৫ আগস্টের প্রতিক্রিয়া প্রসঙ্গে জনাব রহমান বলেন- ‘রেডিও খুলে আমি হতবাক। ঢাকা বেতারের অনুষ্ঠান বলে বিশ্বাসই হচ্ছে না। গানগুলো পাকিস্তানী মার্কা ইসলামী গান। একের পর এক সম্প্রচারিত হচ্ছে। ভাবলাম এ আবার কি? ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে এ কোন অশনি সংকেত! রেডিওর নব ঘুরাচ্ছি। বার বার নেড়ে চেড়ে দেখছি ঢাকা কিনা। ঘোষণা শুনলাম- খুনী মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। পৃথিবীটা যেন কেঁপে উঠল আমার সামনে। থরথর করে কাঁপছে আমার দুটো পা । পা বাড়াতে পারছি না। বসে পড়লাম। মনে হল পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে আসছে। মুজিব ভাই, বঙ্গবন্ধু নিহত! না, এ হতে পারে না। অবিশ্বাস্য মনে হল আমার কাছে। সাহসে ভর করে উঠলাম। বন্ধুমহলে টেলিফোন করলাম। সবখানে একই বিস্ময়! কোন কোন টেলিফোনে রিং হচ্ছে কিন্তু কেউ রিসিভ করছে না। সময় অস্বস্তি আর অস্থিরতার মধ্যে এগিয়ে চলছে। খন্দকার মোশতাক আহম্মদ ভাষন দিলেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন। ধীরে ধীরে কুয়াশা কেটে পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠল। এর একটা ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। অঙ্কের হিসেবে কেমন যেন ভুল হয়ে যাচ্ছে। এক বিরাট রক্ষীবাহিনী, যাদেরকে মুজিবের কট্টর সমর্থক হিসেবে তৈরী করা হয়েছে। মুজিব সমর্থকদের হাতেও তখন প্রচুর হাতিয়ার। সেনাবাহিনীর কিছু অংশ বিরূপ থাকলেও বিরাট অংশ রয়েছে সমর্থনে। তা সত্ত্বেও প্রতিক্রিয়াহীন ভাবেই সারাটা দিন কাটল। রাত পেরুল, আবার সকাল হল, দেশের কোথাও কোন প্রতিক্রিয়া হয়েছে বলে শুনলাম না। এমনকি ভারতও এল না কোন সাহায্য নিয়ে। মনে হল গোটা জাতি মরে গেছে।’

জবাবে আমি বলেছিলাম- ‘সম্মোহিত গোটা জাতির চেতনা তখন ফিরে এসেছিল বলে কোন পক্ষ থেকে কোন প্রতিরোধ আসেনি। গোটা জাতি মুজিব হত্যকারীদের অভিনন্দন জানিয়েছে। একাত্তরে যে সম্মোহিত জাতি পাকিস্তানের কারাগারে থাকার কারণে মুজিবের জন্য কেঁদেছিল পঁচাত্তরে এসে সেই জাগ্রহ জাতি তার মৃত্যুর জন্য উল্লাস করেছে। এ থেকে আপনাদের বুঝা উচিত আপনারা জাতীয়তাবাদের যে উন্মাদানা ছড়িয়েছিলেন সেটা ছিল কৃত্রিম ও সুপরিকল্পিত। আপনারা নিজেদের ভাবেন সুচতুর ষড়যন্ত্রকারী, কিন্তু আল্লাহ বলছেন, ‘আমিই সবচাইতে বড় কৌশলী।’ আর এও জানা উচিত- কিছু মানুষকে কিছু দিনের জন্য সম্মোহিত করে রাখা সম্ভব হলেও চিরকাল সম্ভব হয় না। ইতিহাস তার নিজস্ব গতিধারায় এগিয়ে চলে।’

আমার কথাগুলো তারা কিভাবে গ্রহণ করলেন জানিনা। তবে তিনি বললেন- ‘সবচাইতে অবাক হলাম যখন আমাকে গ্রেফতার করা হল এবং ভারতের সাথে আমাদের যোগসাজসের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হল। আমাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালান হল। পশুসুলভ আচরণ করা হয়েছে আমাদের ওপর। উল্টো করে টাঙ্গিয়ে চাবকালো তারা ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত। সবচাইতে বড় কথা তারা যে ভাষায় আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে সেটা বাংলা নয় উর্দুতে। মনে হল আমি পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হাতে বন্দী। ভাবলাম ইতিহাসের গতি কি তাহলে উল্টো দিকে?’

কামাল ভাই বললেন- ‘আমার উপর নির্যাতনের কথা কোন দিনও ভুলব না। আজও সে নির্যাতনের কথা মনে হলে শিউরে উঠি। এ নির্মমতা পাকিস্তানীদেরকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের উপর তাদের যেন এক আদিম আক্রোশ জমে ছিল পাকিস্তানী মন-মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ আজও সেনাবাহিনী দখল করে আছে। তিনি আরও বললেন, আমাদের ত্যাগের বিনিময়ে এই বাংলাদেশে পাকিস্তানী মানসিকতাকে লালিত হতে দেব না। আমরা বাইরে বেরিয়ে আবার প্রতিরোধ গড়ে তুলব।’

অনুরূপ নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছিলেন আগরতলা ষড়যন্ত্রের অন্যতম আলী রেজা। তার ভাষায়- ‘বাংলাদেশের মাটিতে বাংলাদেশী সৈনিক দ্বারা আগরতলা ষড়যন্ত্রকারী বলে নির্যাতিত হব এমনটি ভাবতে পারিনি কোন দিনও।’

পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পরে আব্দুল কুদ্দুস মাখন কারাগারে অন্তরীণ হলে তিনি আমাদের পাশের সেলে থাকতে লাগলেন। তার সাথে ছিলেন তার চাচা ও তার ভাই হুমায়ুন। বাংলাদেশ আন্দোলনে চার যুব-নেতার তিনি অন্যতম হলেও আমার ইতিবৃত্ত জানার পর আমার প্রতি তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করিনি বরং তার সাথে আমার সম্পর্ক সদ্ব্যবহার থেকে সখ্যতায় পরিণত হয়। তার সাথে আমি প্রায় প্রতিদিন ব্যাডমিন্টন খেলতাম খেলার মাঠে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ডঃ মযহারুল ইসলামের সাথে প্রায় দেখা হত। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল তসরুফের আসামী হিসেবে কারাগারে ছিলেন। তার রবীন্দ্রপ্রীতির আতিশয্য এত অধিক ছিল যে শেষ পর্যন্ত সেটা পরিবর্তিত হয়ে হিন্দুপ্রীতিতে পরিণত হয়। তার ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য-বোধ, জাতীয় স্বাতন্ত্র্য-বোধ লোপ পেয়েছিল পুরোপুরি। হিন্দু সংস্কৃতির মধ্যে অবগাহন করার ব্যাপারে এতটুকু সংশয় ছিল না। কোন জাতির মগজে পঁচন ধরলে সে জাতি অধঃপাত ঠেকিয়ে রাখা যায় না। মযহারের প্রত্যক্ষ সাহচর্য না পেলে সম্ভবত সেই পঁচনের অস্তিত্ব অনুভব করতে পারতাম না। বাংলাদেশের স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে তিনি কটাক্ষ করতেন। তিনি অখণ্ড ভারতে বিশ্বাসী ছিলেন হিন্দুস্তানের সাথে বাংলাদেশ বিলীন হওয়ার মধ্যেই নাকী  বাংলাদেশের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এ নিয়ে তার সাথে বহুবার বহুভাবে আলাপ হয়েছে। তার সাথে উত্তপ্ত বিতর্কে লিপ্ত হতেন পাবনার সার্কেল অফিসার জনাব আবদুল কাদের খান। জনাব খান এক মিথ্যা মামলায় আটক ছিলেন। সার্বিক পরিস্থিতির ওপর তার যথেষ্ট পাণ্ডিত্য ছিল।

আমাদের আলোচনা পর্যালোচনা বাইরের যুদ্ধংদেহী রাজনৈতিক প্লাটফর্মের মত ছিল না। প্রত্যেকে তার সপক্ষে যথেষ্ট যুক্তির অবতারণা করতেন এবং ধৈর্য সহকারে শুনতেন। আওয়ামী লীগের অন্যান্যদের চাপ থাকা সত্ত্বেও মাখন ভাই আমাকে যথেষ্ট সম্মান করতেন। তার অন্তরে অনুশোচনার ঝড় বইছে এমনটি বাহির থেকে বেশ দেখা যেত। ঐদ্ধত্যপূর্ণ অশালীন মন্তব্য করতে আমি কোন সময়ই তাকে দেখেনি। তিনি ছিলেন প্রশান্ত-চিত্ত ও সদালাপী একই রকম অনুভূতি আমি লক্ষ্য করেছি জিল্লুর রহমান সাহেবের মধ্যেও।

ডক্টর মযহার ও জাসদের এম এ আওয়ালের মত দুর্নীতির পাঁক থেকে যারা উঠে এসেছেন ঔদ্ধত্যের বহিঃপ্রকাশ তাদের মধ্যেই বেশী ছিল। তাদের বক্তব্য ছিল। ‘বাহাত্তরে ভুল করেছি আলবদর রাজাকারদের ক্ষমা করে আগামীতে সুযোগ এলে আর ক্ষমা করব না।’

আমি বলেছিলাম, ‘আলবদর রাজাকার আর তাদের ভাষায় পাকিস্তানের দালালেরা আকাশ থেকে নাযিল হয়নি, এই মাটি এই আবহাওয়ায় তারা জন্ম নিয়েছে। এখানের এই পরিবেশে তারা লালিত। এ কারণে শিকড়ও এ মাটির গভীরে বিস্তৃত। এক সময় এ জাতিকে সম্মোহিত করে হিন্দুস্তানী তলোয়ারের ছায়াতলে যা ইচ্ছে তাই করেছেন। যাকে হত্যা করা সম্ভব করেছেন তার বেশী আর অগ্রসর হলে পঁচাত্তরের অনেক আগেই উৎখাত হতে হত। ভবিষ্যতের কথা বলছেন, সে সুযোগ আর এ দেশের মানুষ আপনাদের দিবে না। কোটি কোটি মানুষের কাছে আজ আপনাদের হিন্দুস্তানের দালালীর চেহারা স্পষ্ট। সাড়ে তিন বছরে জাতিকে আপনারা কি দিয়েছেন? খুন খারাবী লুটপাট ধোকা ছাড়া কিছু দিতে পারেননি।’

তারা বলেন- ‘এই আলবদর রাজাকারদের জন্য আমরা কিছু করতে পারিনি।’ বললাম, ‘ঠিক বলেছেন। এদের জন্য নাটকের শেষ পরিণতি টানতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভারতের হাতে এ দেশটাকে তুলে দেবার শেষপর্ব আর আনতে পারলেন না। পরিণতির আগেই স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হল। আপনাদের দুঃশাসনের দিনগুলোতে কোথায় কোন আলবদর রাজাকার আল শামস আপনাদের অগ্রগতি রোধ করেছিল? তারা হয়তো ছিল কারাগারে অথবা ছিল পালাতক। এমন নির্বিঘ্ন সময় আর কি আপনারা পাবেন? শেখ মুজিব যে বিষ পান করেছিলেন তার প্রতিক্রিয়ায় সোনার বাংলা উজাড় হয়ে গেছে সাড়ে তিন বছরে। মুজিব ৮ কোটি মুসলমানের ইজ্জত ও আযাদীকে বিক্রি করার ব্যাপারে যে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন সবংশে নিপাত হয়ে তাকে তার কাফফারা আদায় করতে হয়েছে। মুজিবের এই জিল্লতিপূর্ণ মৃত্যুর জন্য দায়ী মূলত আপনারাই। আপনারাই মুজিবের হাত পা বেঁধে রেখেছিলেন। চাটুকারিতার চক্রান্ত বিস্তার করে মুজিবকে পরিস্থিতি আঁচ করতে দেননি। তাকে বাস্তব গণচেতনা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলেন। মুজিবের সত্যিকার ভক্ত ও অনুরক্ত যদি এদেশে থেকে থাকে তাহলে তাদের উচিত হবে আপনাদের চিহ্নিত করা। আর মুজিব ভক্তরা যদি আপনাদের ক্ষমা করে তাহলে ইসলামী জনতার আদালতে আপনাদের একদিন দাঁড়াতেই হবে। সেদিন পালানোর আর সুযোগ হবে না। তথাকথিত জাতীয়তাবাদীর অধীশ্বর যেমন সে সুযোগ পায়নি।’

কথার প্রেক্ষিতে অনেক কথা এসে গেছে। ডক্টর মযহারকে অবমানা করা আমার উদ্দেশ্য ছিল না। সেদিন ডক্টর মযহার তেমন জোরালো প্রতিবাদ করেননি। তাকে নীরব আক্রোশে ফুঁসতে দেখেছি। তবে আমাকে ঘায়েল করার জন্য সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় থাকতেন। আমার সাথে মতবিরোধের প্রেক্ষিতে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছিল যে আওয়ামী লীগের কেউ যেন আমার সাহচর্যে না আসে, আওয়ামী লীগ নেতারা সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। এটা হয়েছিল ডক্টর মাযহার সাহেবের ইঙ্গিতে।

একদিন খেলার মাঠে আমি, মাখন ভাই ব্যাডমিন্টন খেলছিলাম। হাজী রফিক মওলানা বেলাল, মিস্টার গোমেজ আরও অন্যান্য লোক দাঁড়িয়ে ছিল। এক পর্যায়ে আমাকে অপ্রস্তুত করার জন্য ডক্টর মযহার একটু মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন, ‘আমিন যে স্বেচ্ছায় আলবদরে যোগ দিয়েছিল এটা আমরা মনে করি না। প্রেসারে যেতে বাধ্য হয়েছিল।’

প্রত্যুত্তরে আমি শুধু একথাই বলেছিলাম- ‘আমি জেনে শুনে ঈমানের দাবীতে একাজ করেছি। আমি এ জন্য অনুতপ্তও নই ক্ষমাপ্রার্থীও নই।’

আওয়ামী লীগ ও জাসদের সাথে আমাদের একটা স্নায়ু-যুদ্ধ কারাগারের অভ্যন্তরে চলতে থাকে। যদিও কিছুদিন আগে পর্যন্ত সৌহার্দ পূর্ণ সহ-অবস্থানের মনোভাব বিরাজ করছিল। ডক্টর মযহার, কাদের সিদ্দিকীর ভাই লতিফ সিদ্দিকী, পাবনার রফিকুল ইসলাম বকুল, এমপি এম, এ আউয়াল প্রমুখ উগ্রবাদীদের প্ররোচনায় কারাবাসীদের মধ্যে পোলারাইজেশন শুরু হয়। স্পষ্টত দুটো শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে কারাবাসীরা।

ডিআইজি অব প্রিজনস কাজী আব্দুল আউয়াল সাহেবের পদোন্নতি হলে তিনি সেক্রেটারিয়েট চলে যান। তার এ শূন্যস্থানে মোমেনশাহীর জেল সুপার ডিআইজি হয়ে ঢাকায় এলেন। আমাদেরকে নতুন এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হল। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থক ও উগ্রপন্থী তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা। ডক্টর মযহার, আবদুল কুদ্দুস মাখন, রফিকুল ইসলাম বকুল ও শেখ মুজিবের তথাকথিত গভর্নর নূরূল হকের প্ররোচানায় জেল সুপার আমাদের সকলকে দেশের বিভিন্ন কারাগারে স্থানান্তরের আদেশ দিয়ে বিক্ষিপ্ত করে দেন। ১০ সেল ডিভিশন থেকে সরিয়ে ২০ সেল ডিভিশনের সেই কুঠুরীটি আমার জন্য বরাদ্দ করা হয়, যে কুঠরীতে কিছুদিন আগে জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরীকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল।

ডিআইজি, জেল সুপার ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের নিষ্ঠুর পদক্ষেপের ফলে কারাগারে যেসব বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক দৃশ্যের সৃষ্টি হয় তার একটি তুলে ধরছি- নারায়ণগঞ্জের মুসলিম লীগ নেতা হাজী রফিক ও তার অন্ধ পিতা দালাল আইনে দীর্ঘ দিন ধরে আটক ছিলেন কেন্দ্রীয় করাগারে। এখানে একই সেলে পিতার অন্ধের যষ্টি হয়েই ছিলেন হাজী রফিক। কারা কতৃপক্ষের নতুন নির্দেশের ফলে অন্ধ পিতাকে একাকী কারাগারে বদ্ধ প্রকোষ্ঠে রেখে তাকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে যেতে হল। যাবার মুহূর্তে আমরা দেখেছি তার অন্ধ পিতার বুক চাপড়ানো কান্না আর আহাজারি। তাকে দেখা শোনা এবং সেবা শুশ্রুষার জন্য কোন লোক আর তার পাশে রইলো না। হাজী রফিকের পিতার দুরবস্থা দেখে কারাগারের প্রায় প্রতিটি মানুষই চোখের পানি ফেলেছে। কিন্তু ডক্টর মযহার ও আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের চোখে মুখে আমরা দেখেছি বর্বরোচিত উল্লাস।

অধিকাংশ জাসদ নেতা ও কর্মী আটক ছিলেন ২০ সেল ডিভিশনে। এখানে এসে প্রথমত যে ক’জনের সাথে আমার পরিচয় হয় তারা হল আমাদের বন্ধু সৈয়দ নেসার নোমানীর ভাই বাহাউল হক সবুজ, কর্নেল তাহেরের ভাই বেলাল, অধ্যাপক আনোয়ার ও ইউসুফ ভাই। এদের সাথে সম্পর্ক দু’-একদিনের মধ্যে আন্তরিকতার পর্যায়ে পৌঁছে। এদের সূত্র ধরে জাসদের সব ক’টি দুঃসাহসিক তরুণের সাথে আমি পরিচিত হই। পরে সম্পর্ক নিবিড় হয়ে উঠে। এদের নিয়ে প্রত্যেক দিন এক সাথে ব্যায়াম করতাম। রাজনৈতিক মত বিনিময় হত প্রায় সবসময়। আমাকে আমার পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে জেল সুপার যে মানসিক নির্যাতন চালাতে চেয়েছিলেন সেটা আর হল না বরং আমার চারিদিকে একটি নতুন পরিমণ্ডল সৃষ্টি করতে সক্ষম হলাম। জাসদের তরুণরা আমার ওপর দারুণভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

অল্প কিছু দিনের মধ্যে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে বেশ কয়েকটা দিন আমাকে কারাগারের হাসপাতালে অবস্থান করতে হয়। সুস্থ হয়ে উঠলে ২০ সেল ডিভিশন আর ফেরা হল না। আমার জন্য ২৭ সেল ডিভিশনের একটি কক্ষ বরাদ্দ করা হল। এটাও আমার নতুন পরিবেশ। আমাকে সার্বক্ষণিক বিব্রত রাখার জন্য জেল কর্তৃপক্ষের ষড়যন্ত্র এসব। এখানে আসার পর প্রথমত একাকী মনে হলেও পরবর্তীতে অনেকের সাথে ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হই। আমার পাশের সেলে থাকতেন আইনাল শাহ। তিনি একজন সাধক ছিলেন। খুনের আসামী হয়ে তিনি কারাগারে প্রবেশ করেন। সেই থেকে আজ অবধি তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। ১৯৭১ সালে কারাগারের ফটক খুলে দেয়া হলে সমস্ত কয়েদী পালিয়ে গেলেও আইনাল শাহই একমাত্র ব্যক্তি যিনি তার অবস্থান থেকে এ পর্যন্ত নড়েননি। তাকে সব সময় দেখতাম তসবিহ তহলীল নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। নামাজ পড়তে দেখিনি কখনও। কারাগারে থাকা অবস্থায় তার কাছে সাবেক রেডক্রস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা গাজী গোলাম মোস্তফা তার সহচর্য লাভের জন্য তার কাছে প্রায়ই আসতেন। গাজী গোলাম মোস্তাফার প্রতি আমার অত্যন্ত বিরূপ ধারণা ছিল বলে দু’একটি বাক্যালাপ ছাড়া সহজ ও স্বাভাবিক আলাপ হয়নি। আমার মনে হত কারাগারে গাজী গোলাম মোস্তফা তার অতীত কৃতকর্মের জন্য নিজেকে অত্যন্ত ভয়ঙ্কর অপরাধী ভাবতেন। আইনাল শাহের প্রতি গোলাম মোস্তফার এই দুর্বলতাকে তার পুঞ্জীভূত পাপ থেকে নিস্কৃতি পাবার প্রয়াস বলে আমার মনে হয়েছে।

এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী কোরবান আলী সাহেবের সাথে আমার সম্পর্ক নিবিড় হয়ে ওঠে। তাকে অনুতাপে দগ্ধ হতে দেখি। আমার জীবনের ঘাত-প্রতিঘাত এবং ৫ বছরের কারাবাসের পরও আমার অনমনীয় মনোভাব দেখে তিনি আমার প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি আমার কাছ থেকে মওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর সাহিত্য চেয়ে নিতেন এবং মনোযোগ সহকারে পড়তেন। তিনি বলেন- ‘ইসলাম সম্বন্ধে যে ধ্যান ধারণা, যে আলো আমি পাচ্ছি, এটা আমাদের সামনে এতকাল ছিল না।’

তার কথা শুনে নিজেদের অপরাধী বলে মনে হল। গোটা জাতির সামনে আমাদের চিন্তাধারা ও ইসলামকে সঠিকভাবে উপস্থাপন না করতে পারার জন্য আজকে গোটা দেশ, গোটা জাতি অন্ধকারের আবর্তে খাবিখাচ্ছে। যদি সঠিক সময়ে ইসলামকে ভারসাম্যমূলক জীবন ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারতাম তাহলে হয়তো আমাদের ভাগ্যাহত জাতি ভাবাবেগে তাড়িত হতো না। ইতিহাসের চেহারা হত উল্টোটা।

প্রাসঙ্গিকভাবে তিনি বলেন- ‘আপনাদের নেতাদের বলুন- ‘আমার কারামুক্তির ব্যাপারে চেষ্টা তদবীর করতে, আমি বেরিয়ে জামায়াতে ইসলামী করব।’ একই কথার প্রতিধ্বনি শুনি নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন এমপি এবং শেখ মুজিবের ঘনিষ্ঠ সহচর জনাব শামসুজ্জোহার কণ্ঠেও। তার সাথে একই সেলে অনেক দিন অবস্থান করেছি। ইসলামী সাহিত্য ও মওলানা মওদূদীর রচনাবলীর সাথে তার আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে আমার সাহচর্যে থেকে। ওদিকে হাসপাতালে অবস্থানকালে মোমেনশাহী জেলা ন্যাপের সহ সভাপতি জনাব কাজী আঃ বারী আমার সাথে দেখা করেন। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘আমিন মাফ করো। অতীতের সমস্ত কিছুকে ভুলে যাও।’ তার মধ্যে সৌভ্রাতৃত্বের মমত্ববোধ লক্ষ্য করেছি। দেখেছি তার অনুতপ্ত মানসিকতা। আমি এক বিস্ময় আর বিহ্বলতা নিয়ে নীরব থেকেছি। খোদাকে বলেছি- ‘তুমি সবই পার মাবুদ।’ এই সেই কাজী আঃ বারী, আমাকে হত্যা করার জন্য কি এক অন্ধ আবেগে শানিত কৃপাণ নিয়ে হন্যে হয়ে পাগলের মত আমাকে খুঁজেছে। এই কাজী বারীর হাত আমার ভাইদের রক্তে রাঙা। তার নেপথ্য ইঙ্গিতে তার সাগরেদরা অষ্টগ্রাম থানা জামায়াত নেতা মওলান আব্দুল গণি খানের পিতা, ভাই, ভাগ্নেসহ একই পরিবারের কয়েকজনকে হত্যা করে এবং শান্তি কমিটির কনভেনার জনাব মাহববুল হক কুতুব মিয়াকে জবাই করে হত্যা করা হয়। তার মাথাবিহীন লাশ নদীতে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়। সেদিন তার সন্তান ও স্বজনদের গগণবিদারী কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। এছাড়া আরো প্রায় ৩শ’ নিরীহ রাজাকারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদের লাশ মালা-ঘাঁথার মত দড়ি দিয়ে বেঁধে শাহপুরের নিকট নদীতে ভাসিয়ে দেয়। নদীর স্বচ্ছ পানি নিরপরাধ মানুষের রক্তে লালে লাল হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে বলে রাখা দরকার যে ঐসব রাজাকার তখনও অস্ত্র হাতে নেয়নি। কেবলমাত্র সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং নিয়ে নৌকাযোগে বাজিতপুর হয়ে কিশোরগঞ্জ যাওয়ার পথে এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। পাকিস্তান আমলে খুন আর ডাকাতী মামলার ফেরারী আসামী বর্সা, বেতের ও খুনী বদরসহ অধ্যাপক ইয়াকুব আলী এই হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষ অংশীদার ছিল। ইয়াকুব আলী বাজিতপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান।

এই নৃশংতা আমার সামনে ভেসে উঠল। অথচ আমার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে এই বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞের মূল নায়ক। তার খুন রাঙা হাত রয়েছে আমার হাতে। কাজী বারী আবেগে অনেক কিছু বলছে কিন্তু আমি যেন শুনতে পাচ্ছি সেই শাহাদাতপ্রাপ্ত রাজাকারদের দুঃস্থ পরিবার সমূহের পিতামাতা ভাই বোন স্ত্রী পুত্রদের আর্তনাদ, বুক চাপড়ানো আহাজারি আর বেদনার্ত বিলাপ। আজও সেই কান্না, সেই আহাজারি মর্ম বিদারী মর্সিয়া হয়ে আমার প্রাণে বাজে।

আমি সেই দুঃস্থ রাজাকারদের ঘরে ঘরে গিয়ে তাদের শোকে মুহ্যমান আত্মীয় পরিজনদেরকে আমার চোখের পানি ছাড়া সান্ত্বনা দেবার মত কোন কিছু দিয়ে আসতে পারিনি। কাজী বারী আমার কাছে এসেছে অনুতাপ বিদগ্ধ হৃদয় নিয়ে। আমি ভাবছি তাকে আমি কোন ভাষায় কথা বলি।

বললাম- ‘বারী ভাই, আমাদের জীবন, আমাদের মৃত্যু যাঁর হাতে সেই পরাক্রমশালী আল্লাহই একমাত্র ক্ষমাকারী।’ আমি রাসূল করীম (সাঃ)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বললাম- ‘আল্লাহ বলেছেন, আমার বান্দারা অপরাধ করবে আর আমার কাছে ফিরে আসবে; এ না হলে আমি দুনিয়া সৃষ্টি করতাম না।’ দেখলাম বারী ভাইয়ের মুখমন্ডল প্রদীপ্ত হয়ে উঠল। তিনি বললেন- ‘তুমি যেখানে আছ কর্তৃপক্ষকে বলে সেখানে আমাকে টেনে নাও। কারাগারে যে কয়টা দিন আছি আমি তোমার সাহচর্যে থাকতে চাই।’

বারী ভাইয়ের অনুরোধে আমি কারা কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে তাকে ২৭ সেল ডিভিশনে নিয়ে এলাম। এখানে কাজী বারী আমার কুঠুরীতে অধিকাংশ সময় কাটাতেন। আমার কাছ থেকে বই নিতেন, পড়তেন, আলোচনা পর্যলোচনায় অবতীর্ণ হতেন। তিনি আমার সামনে এলে অতীতকে রোমন্থন করে দুঃখ পেতাম। আবার তার চিন্তা-চেতনার পরিবর্তন দেখে আমি খুশীও হতাম। আমি দোয়া করতাম এদের সবার জন্য। আহ! এ জীবনগুলো পাল্টে গেলে এ দেশটায় একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসত। ইসলামী বিপ্লব তো একটা ব্যক্তির নাম নয়। এ বিপ্লব একটা গোষ্ঠী কিংবা সম্প্রদায়ের নাম নয়। ইসলামী বিপ্লব আপামর জনসাধারণের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে এক বিরাট জনগোষ্ঠীর আমূল পরিবর্তন আর এ পরিবর্তন আনতে হলে তাতে দেশের কোটি কোটি আবাল-বৃদ্ধ-বনিতার অংশীদারীত্ব থাকতে হবে। বিপ্লবের প্রতিটি স্তরে থাকতে হবে গণ মানুষের প্রতিনিধিত্ব। সংকীর্ণতার ভ্রান্তি বিস্তার করে যদি অনুতপ্ত কাজী বারীদের আমরা পাপী অশুচি বলে দূরে সরিয়ে রাখি তাহলে বিপ্লবের বিস্ফোরণ হবে না কোন দিন- কোন কালে। মানুষের অন্তরে অন্তরে বিপ্লব শুধুমাত্র গুমরেই মরবে।

ইসলামী সাহিত্যসমূহের সংস্পর্শে এসে কাজী বারীর চিন্তা-চেতনায় পরিবর্তন হতে শুরু করে। তার পরিবর্তন দেখে আমি অবাক হলাম। তিনি বললেন- ‘দ্বীন থেকে রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করার অবকাশ অন্তত ইসলামে নেই।’ ঠিক যেন আল্লামা ইকবালের সেই বাণীর প্রতিধ্বনি- ‘জুদা হো দ্বীন সেয়াসত সে তো রাহ যাতে হ্যায় চেঙ্গিজী।’ দ্বীন থেকে রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করলে সেখানে বিরাজ করে চেঙ্গিজের বর্বরতা। কাজী বারী আরও বললেন- ‘ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা সম্পর্কে কোন ধারণাই আমার ছিল না। ইসলামী রাজনীতিকে মনে করতাম ১৪শ’ বছর আগের পরিবেশেরই উপযোগী কিন্তু এখন আমি এর মধ্যে দেখছি এক শাশ্বত চিরন্তন আবেদন। আনন্তকালের উপযোগিতা এর মধ্যে বিদ্যমান। ইসলামের স্থিতিস্থাপকতা এত বিস্তৃত, এত ব্যাপক যে এটা পৃথিবীর যে কোন আবহাওয়া, যে কোন মাটিতে শিকড় গাড়তে সক্ষম।’ তিনি তার উদ্দাম যৌবন ইসলাম বিরোধিতা এবং জাহেলিয়াতের সপক্ষে ব্যয় করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করতেন। কারামুক্তির সময় কাজী বারী আমার হাত ধরে বলেছিলেন- ‘আমি তো মুক্ত হতে চলেছি। বাইরে গিয়ে তোমার মুক্তির জন্য কিছু করতে পারি কিনা দেখব। তোমার সাথে আমার যোগাযোগ থাকবে। এখান থেকে আমি যে চিন্তা-চেতনা নিয়ে গেলাম এটাকে কিভাবে কাজে লাগানো যায় সেটাও চিন্তা করছি।’ কারাগার থেকে বিদায় নেয়ার বেশ কিছুদিন পর কাজী বারী আবার এসেছিলেন আমার সাথে দেখা করতে।

খন্দকার মোশতাক আহম্মদ ক্ষমতাসীন থাকাকালে কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে আবার ১০ সেল ডিভিশন স্থানান্তর করলেন। এখানে থাকা অবস্থায় একদিন জানতে পারলাম আমাকে মোমেনশাহী যেতে হবে। আর এক মামলার শুনানী। ৪০ বছর কারাদণ্ড দেয়ার পরও প্রতিপক্ষের জিঘাংসা শেষ হল না। তারা আরও কিছু চায়; চায় আরও আমার শাস্তি হোক। চায় আমার জীবনের প্রদীপ কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠেই ধীরে ধীরে নির্বাপিত হোক। আমি যেন কোন দিনও বাইরের আলো বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে না পারি। পঁচাত্তরের পট-পরিবর্তনের পরও জিঘাংসার শেষ হল না। মুজিবের তথাকথিত সাধারণ ক্ষমা, দালাল আইনকে কালাকানুন হিসেবে মোশতাকের ঘোষণার পরও হিন্দুস্তানী দালালদের তূনের তীর ছুটে আসছে আমার দিকে। মুজিব চক্রের কর্মকর্তাদের সাথে কারাগারে সহ-অবস্থানের মধ্যে স্বাভাবিকতার পর্যায়ে উপনীত হলেও তাদের চর অনুচরদের দ্বারা দাবার ঘুঁটি ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে।

পঁচাত্তরের শেষার্ধে সম্ভবত সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে আমার পায়ে আবার ডাণ্ডাবেরী পড়ানো হল। দীর্ঘ মেয়াদী দণ্ডপ্রাপ্তদের সফরের সময়ের অলঙ্কার ওটি। ট্রেনপথে মাত্র চার জন পুলিশ প্রহরায় বিকেল ৪টা নাগাদ আমি এসে পৌঁছলাম মোমেনশাহী স্টেশনে। তারপর রিক্সাযোগে কারাগারে। কারা কর্তৃপক্ষ আমাকে বুঝে নিলে, আমার সফরসঙ্গী ৪ জন পুলিশ বিদায় নিয়ে চলে গেল। কারাগারে প্রবেশের পর যথানিয়মে আমাকে আনা হল কেস টেবিলে। কেস টেবিলে আসার পর জেল সুপার নির্মল রায় এলেন। জমাদার আবদুল আলিম তাকে জিজ্ঞেস করলেন- ‘ডাণ্ডাবেরী কি খুলে দেব স্যার?' জেল সুপার বললেন- ‘ কি করে হয়! তুমি জাননা তাকে? যার ৪০ বছর কারাদণ্ড, যার আরও বেশ কিছু মামলা ঝুলছে, এমন টেরর আলবদরের ডাণ্ডাবেড়ী খুলে দেয়ার কথা ভাবছো কি করে?’

দূরে থাকার জন্য আমি সে কথা শুনিনি। জমাদার এসে বললেন। আমি বললাম- জেল সুপারকে জানিয়ে দিন আমার বেড়ী খুলতেই হবে কারাগারের ভিতরে ডাণ্ডাবেরী পরিয়ে রাখার তো কোন অধিকার নেই। যদি তিনি আমার বেড়ী খোলার আদেশ না দেন তাহলে আমি তার ব্যবস্থা নেব।’ জমাদার সাহেব জেল সুপারকে জানালে তিনি না খোলার সিদ্ধান্ত অটল থাকলেন। জমাদার সাহেব এসে আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বললেন- ‘বাবা মাত্র কয়েকদিনের জন্য তো এসেছেন, আবার তো ঢাকায় ফিরে যাবেন। এর মধ্যে সাহেবদের সাথে গোলমাল করে কি লাভ? বাবুরা নাখোশ হলে অসুবিধা হবে।’ আমি বললাম- ‘অসুবিধার বাকী আর কি আছে? আমি এর প্রতিবাদ করবই আপনাদের বাবুকে জানিয়ে দিন আমি তৃতীয় শ্রেণীর বন্দী নই। আমার সাথে তৃতীয় শ্রেণীর মত আচরণ করার কোন অধিকার রাখেনা আপনার কর্তা। আমি অনশন করবই। আমরণ অনশন।’

জমাদার সাহেব সুপারের কাছে গেলেন। আর ফিরলেন না। এদিকে আমার সিদ্ধান্তে আমি অটল থাকলাম। ওদিকে পীরে কামেল হযরত মওলানা আতাহার আলী সাহেবের দ্বিতীয় ছেলে মুজাহিদ কমান্ডার আখতার ভাই আমার সিদ্ধান্তের কথা  শুনে আর সব কারাবাসীদের নিয়ে অনশনের সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে কারাকর্তৃপক্ষ ভীত হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে আমার ডাণ্ডাবেড়ী খুলে দেয়। আমি অনশন ভঙ্গ করি।

আমি বিভিন্ন সূত্রে যতটুকু জেনেছি মোমেনশাহীর জেল সুপার নির্মল রায় একাত্তরের সংকটে ভারতে পাড়ি না জমিয়ে হিন্দুস্তানের সপক্ষে গোয়েন্দাবৃত্তির জন্য দুঃসাহসে ভর করে ঢাকায় থেকে যান। ঢাকার জেলার হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। নিজেকে সন্দেহের উর্ধ্বে রাখার জন্য তিনি কৌশলগত অবস্থান নেন এবং ধর্মান্তরিত হওয়ার কথা বলে পাকিস্তানী কর্তৃপক্ষ ও বাঙালী মুসলমানদের সহানুভূতি লাভ করতে সক্ষম হন। সবার ধারণা হয় তিনি সত্যিই মুসলমান হয়েছেন। নিয়মিত নামাজ কালামও পড়তেন, কোরআন পাঠ করতেন। তৎকলীন প্রশাসনকে ধোঁকা দিয়ে বোকা বানিয়ে রাখার মত অভিনয়-নৈপুণ্য তার জানা ছিল। বাংলাদেশ হওয়ার পর তার স্বরূপ স্পষ্ট হয় ওঠে। ঢাকা হিন্দুস্তানী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এলে শত শত বিহারী ও অবাঙালী মুসলমানদের জেল হাজতে নিয়ে আসা হয়। তাদের সমস্ত টাকা পয়সা ও গয়নাপত্র নির্মল বাবু হাতিয়ে নেন। জেল রেজিস্ট্রারে সবকিছু অনুল্লেখ থেকে যায়। পরবর্তীতে তিনি এর সবটাই আত্মসাৎ করেন। শুধু তাই নয়, হিন্দুস্তানের গোয়েন্দাবৃত্তিতে নিয়োজিত এই ব্যক্তিটি ভারত বিরোধী চিন্তা চেতনা-সম্পন্ন মানুষদের পদে পদে বিড়ম্বনার সৃষ্টি করেন। এই নির্মল রায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার থাকা অবস্থায়ই জনপ্রিয় নেতা জনাব ফজলুল কাদের চৌধুরীকে তার সেলে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। ১৯৭৩ সালে তার সময়েই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গুলী চলে। এতে বহু কয়েদী হতাহত হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ইসলামী ছাত্র সংঘের তরুণ কর্মী, শহীদ আনিস ভাই। সুপরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে দণ্ডপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে সংঘর্ষ বাধিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় ইসলামপন্থীদের গুলী করা হয়। তিনি ভারতের গোয়েন্দাবৃত্তিতে নিয়োজিত ছিলেন তার প্রমাণ হল তার ধর্মান্তরিত হওয়া এবং যুদ্ধের ৯ মাস পাকিস্তানীদের সহযোগিতা করা সত্ত্বেও কোন একটি ফুলের আঁচড়ও তার ওপর পড়েনি। সম্ভবত হিন্দুস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা RAW এর নির্দেশে তিনি এসব করেছেন।

মোমেনশাহী কারাগারে আমাকে ১৪ নাম্বার ওয়ার্ড ডিভিশনের দোতলায় স্থান দেয়া হল। সেখানে মুজাহিদ কমান্ডার আখতার ও ডাঃ মান্নানসহ দালাল আইনের লোকজন অবস্থান করতেন। এখানে আসার কয়েক দিন পর আর এক গোল বাধল। শুনলাম আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমদ ও অধ্যাপক আবিদুর রহমানকে মোমেনশাহী কারাগারে আনা হয়েছে। জেল কর্তৃপক্ষ জানালেন যে তারা আমাদের ১৪ নাম্বার ওয়ার্ড ডিভিশনে অবস্থান করবেন। তোফায়েল আহমদের কথা শুনে প্রথম শ্রেণীর বন্দিরা বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। তারা কিছুতেই তোফায়েল আহমদকে বরদাস্ত করতে নারাজ। জেল কর্তৃপক্ষ বিশেষ করে নির্মল রায় তাদেরকে যেভাবে হোক সেখানেই রাখবে। তারা আমাদের শেষ পর্যন্ত আরও জানালেন যে প্রয়োজন হলে দালালদের সরিয়ে দিয়ে সেখানে তোফায়েল আহমদদের রাখা হবে। আমাদের অনমনীয় মনোভাব এবং একাত্মতা দেখে অবশেষে নির্মল বাবু হার মানলেন। তা না হলে তার ঝুলির বিড়াল বেড়িয়ে যেতে পারে এমন এক আশঙ্কা করেছিলেন হয়তোবা। যাই হোক, আওয়ামী লীগের দু’জনকে পুরাতন সেলে রাখা হল। ঘটনার কয়েকদিন পর তোফায়েল সাহেব আমাদের কাছে একটা চিঠি পাঠালেন। সেটা ছিল বিনম্রতার সাথে বিশেষ অনুরোধ। তিনি চান আমাদের ডিভিশনে আমাদের সাথে সহ-অবস্থান করতে। এবার আমরা বিবেচনা করলাম এই কারণে যে এটা চাপিয়ে দেয়া কোন সিদ্ধান্ত নয়। তোফায়েল ভাই, অধ্যাপক আবিদুর রহমান অবশেষে আমাদের ডিভিশনে এলেন। এখানকার বাসিন্দাদের সকলেই তাদেরকে বাঁকা চোখে দেখতেন। কিন্তু শুরু থেকেই তাদের সাথে আমার বেশ কথাবার্তা চলতে থাকে। এখানে তোফায়েল ভাইকে দেখতাম তিনি পুরোপুরি নামাজী। তসবীহ তাহলীল ও দোয়া কালাম নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন সব সময়। তার এই পরিবর্তীত মানসিকতার জন্য আমাদের ওয়ার্ডের বিরূপ কয়েদীরা তার প্রতি সহানুভূতিশীল হলে ওঠে। রুমে তোফায়েল ভাইদের সাথে সবারই সম্পর্কের উন্নতি হয়।

তাদের সাথে আমার প্রায়ই রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা হত। আলোচনায় এক পর্যায়ে তোফায়েল ভাই বলেন- ‘আমিন, আমরা কি একাত্তরে ভুল করেছিলাম?’
বলেছিলাম- ‘এখনও সেটা ভাবছেন, এত কিছুর পরও উপসংহারে পৌঁছাতে পারেননি? একটা বৃহত্তর দলের রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে আপনার মেধার ওপর আমার আস্থা ছিল।’ এ প্রসঙ্গে একটা হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বললাম- ‘যে আঞ্চলিকতার দিকে আহ্বান করে, যে আঞ্চলিকতার জন্য সংগ্রাম করে এবং আঞ্চলিকতার জন্য মৃত্যুবরণ করে সে আমার নয়।’ এর পর আপনার কী বলার থাকতে পারে? আগামী দিনের বংশধরদের জন্য আপনার কী বলার আছে? যে জাতির সাথে আমাদের হাজার বছরের বিরোধ, যারা আজও মুসলমানদের আপন করে নিতে পারেনি, তাদের ইঙ্গিতে তাদের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এদেশের বেগুনাহ হাজার হাজার উর্দুভাষী মুসলমান শিশু, নারী, পুরুষ খুন করেছেন। পাক বাহিনীর নৃশংসতার জন্যও দায়ী আপনারা। সবচেয়ে বড় কথা আপনাদের এবং আমাদের সংঘাতে যারা নিহত হয়েছে তারা কারা? সবাই মুসলমান। আপনার ভাই, আমার ভাই, মুক্তিফৌজ, সেও মুসলমান, বিহারী মুসলমান, পাকিস্তানী সেনা সেও মুসলমান। আলবদর, রাজাকার, বাঙালী সৈনিক, ইপিআর যারাই নিহত হয়েছে সবাই মুসলমান। আমরা পরস্পরের রক্ত ঝরিয়েছি আর হিন্দুস্তানের বাবুদের ঘরে ঘরে চলেছে উল্লাস। এর পরেও কি বলতে চান ভুল করেননি?’ তোফায়েল ভাই নীরব থাকলেন।

প্রসঙ্গ এড়িয়ে তিনি বললেন- ‘বঙ্গবন্ধুর বিরাট একটা সদিচ্ছা ছিল। সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ বঙ্গবন্ধুকে কাজ করতে দেয়নি। অতৃপ্ত আকাংখা নিয়েই এক মহান ব্যক্তিত্বের মৃত্যু হল।’ কথাগুলো আবেগ জড়িত কণ্ঠে বলার সময় দেখলাম তার চোখ ছল ছল করে উঠেছে। মুজিবের প্রসঙ্গ এলেই তিনি কেঁদে ফেলতেন। আমি বললাম- ‘নজীরবিহীন সমর্থন যার পেছনে ছিল, তার কিছু করণীয় থাকলে তার প্রতিফলন দেখতে পেতাম। বাংলাদেশকে অখণ্ড ভারতে বিলীন করা যদি হয়ে থাকে তার স্বপ্ন, তাহলে সেটা দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়ে ভালই হয়েছে। একটা জীবনের বিনিময়ে গোটা জাতি আসন্ন বিপর্যয় থেকে নাজাত পেয়েছে। যদি ভেবে থাকেন মুজিব বেঁচে থাকলে দেশকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্যে পরিপূর্ণ করে দিতেন তাহলে ভুল করেছেন। মুজিব বলেছিলেন, ‘তিন বছর কিছু দিতে পারুম না।’ আল্লাহ তাকে তার পরেও সাড়ে তিন বছর বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। কোনকালেই তিনি কিছু দিতে পারতেন না। খুনরাঙা হাত দিয়ে কোন কল্যাণ আসতে পারে না। বিদেশী ও বিজাতীয় গোলামদের দিয়ে ভাল পরিকল্পনা সম্ভব নয়।’ আমার কথাগুলো তোফায়েল ভাই নীরবে শুনে যেতেন তেতো ঔষুধের বড়ি গেলার মত করে, তবে অধ্যাপক আবিদুর রহমান আমার সাথে প্রায়ই একমত হতেন। আওয়ামী লীগের অতীত কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে তোফায়েল ভাইয়ের মানসিক প্রতিক্রিয়া হয়তো বা কিছু হয়েছিল, তার নামাজ কালাম ও তসবীহ তাহলীলের প্রতি আসক্তি দেখে সেটা স্পষ্ট বুঝা যেত। কিন্তু কখনও মুখ দিয়ে আবিদুর রহমানের মত সহজ স্বীকৃতি প্রকাশ করতে দেখিনি তাকে।

ছাত্র সংঘের বিভিন্ন নেতা প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত ভাল ধারণা ব্যক্ত করতেন। কোন একদিন ছাত্রনেতা শহীদ আবদুল মালেক ভাই প্রসঙ্গ এলে আমি তোফায়েল ভাইকে বলেছিলাম, ‘শহীদ মালেকের প্রত্যক্ষ হত্যাকারীদের মধ্যে ছিলেন আপনি নিজেও।’ প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন তিনি।

একদিন তোফায়েল ভাইয়ের স্ত্রী ও মা এলেন তার সাথে সাক্ষাৎ করতে। তাদের মুখ থেকে তিনি জানতে পারলেন, প্রতিদ্বন্দ্বীরা তার ভাইকে তার এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে বাজারে হত্যা করেছে। কথাটা শুনেই তিনি কেঁদে ফেললেন। সারাক্ষণ কাঁদতেন তিনি। তার চোখে আমি দেখেছি বাঁধভাঙা অশ্রু। আওয়ামী বর্বরতার মধ্যমণি হয়েও তার হৃদয়ের গভীরে ছিল একটি কোমল মানবিক সত্তা। তার আচার-আচরণ ও ব্যবহার ছিল আকর্ষণীয়। বিজাতীয় প্রলোভনের দুর্বিপাকে হারানো তার মুসলিম সত্তা তিনি কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজেছেন। খানিক হলেও পেয়েছেন বলে আমার ধারণা। তার এই প্রাপ্ত উপলদ্ধি আর অনুভূতি বাইরের দুর্বৃত্তরা আবারও লুট করবে কিনা আমি তা জানিনা।

ঢাকা থেকে মোমেনশাহী জেলে যে কারণে আমাকে আনা হয়েছে এবার সে প্রসঙ্গে আসা যাক। আমার বিরুদ্ধে আর একটি হত্যা মামলা। অষ্টগ্রামের দেওঘর ইউনিয়নের তৎকলীন চেয়ারম্যান আহমদ আলী আমার বাদী। অভিযোগ- তার পিতাকে আমি হত্যা করেছি। আদালতে আমাকে হাজির করা হয়। আদালতের এলাকার মধ্যে পুলিশের তত্ত্বাবধানে আমি রয়েছি। ভাগ্যচক্রে আহমদ আলীকে আমার চোখে পড়ল। ডাকলাম, আমার দিকে এগিয়ে এল। জিজ্ঞেস করলাম ‘আপনি নিজে আমার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। কিন্তু আপনি কি জানেন না, আপনার পিতার হত্যাকারী কে?’ ‘জানি’ জবাব দিল আহমদ আলী। জিজ্ঞাসা করলাম- ‘জেনে শুনে কি করে আমার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করলেন?’ আহমদ আলী বললেন- ‘আমি চাপের মুখে মামলা দায়ের করতে বাধ্য হয়েছিলাম। তবে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

বললাম, ‘কে বা কারা আপনার পিতাকে হত্যা করেছিল আপনাদের সবার জানা। তাছাড়া আপনার পিতার অপরাধ কি যে আমার তাঁকে হত্যা করতে হবে? তার কাছে আমি আপনার চেয়ে কম প্রিয় ছিলাম না। তিনি ছিলেন আমার শ্রদ্ধেয়।’

ইতোমধ্যে মামলার সাক্ষীদের পেয়ে গেলাম। তারা কাজী বারীর সহযোগী মোজাফফর ন্যাপের কর্মী। তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলাম- ‘আপনারা সাক্ষী হতে এসেছেন? সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে হলপ করে আপনারা কি বলতে পারবেন, আহমদ আলীর পিতাকে আমি হত্যা করেছি? ৪ বছর পরও মিথ্যার বেসাতী শেষ হল না! এ হত্যার নায়ক আপনারা, আপনাদের দলীয় কর্মীরা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগিতা করে আপনারা এদেশের ভাল মানুষগুলোকে হত্যা করেছেন। মুক্তিফৌজ সেজে এসেও আপনারা ভাল মানুষগুলোকে হত্যা করেছিলেন। ভৈরব কালিকা প্রাসাদের মোমতাজ পাগলার ছেলে হাদী, গোলাম গউস ও তার ভাইয়েরা কি জামায়াতে ইসলামীর কর্মী অথবা ইসলামী ছাত্র সংঘের কর্মী ছিল? সেনাবাহিনীকে তারা অপকর্মের ইন্ধন জুগিয়েছে। তারা হত্যা করেছে। এসব করেছে তারা পাকিস্তানের প্রতি মানুষকে বীতশ্রদ্ধ করে তোলার জন্য। মুক্তিফৌজরা গ্রামবাংলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে হত্যা করেছে জাতীয় বিবেকগুলোকে ধ্বংস করার জন্য। আবার মিথ্যে মামলায় জড়িয়ে অবশিষ্ট বিবেকগুলোকে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে পঁচন ধরিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র আজও চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ফলে আপনাদের অপকর্মের বাধা দেয়ার কেউ থাকবে না। এ জাতিটাকে ৪ বছর লুট করেও আপনাদের আশা মিটেনি। পঁচাত্তরের প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতেও কি আপনাদের বিবেকবোধের সঞ্চার হবে না।’

আমার কথাগুলোয় দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হল। নমনীয়তা প্রকাশ করে তারা আমার সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এই আদালত প্রাঙ্গণে আমার এলাকার চেনামুখ আরও অনেক পেলাম। এখানেই প্রথম জানলাম, অষ্টগ্রাম উপজেলার আবদুল্লাপুরের শ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবি তোতা মিয়া মাস্টারকে অন্ধ জাহেলরা অপদস্থ করেছে দুঃখ হল তিনি ছিলেন একজন আদর্শবান শিক্ষক ও এ অঞ্চলের নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী। রাজনৈতিক দিক দিয়ে তিনি ছিলেন মুসলিম লীগের সাথে জড়িত। জানলাম তথাকথিত মুজিববাদী সন্ত্রাসী খুনী মফিজ ও তার জাহেল অনুচরবর্গ তোতা মাস্টার ও সাবেক এমএনএ মুসলিম লীগ নেতা সরফুদ্দিন সাহেব, ওসমান গণি (টুক্কু চেয়ারম্যান, বড় বাড়ী) তাদের ওপর মানসিক ও শারিরীক নির্যাতনের কোন কিছু বাকী রাখেননি এবং অষ্টগ্রামের ফতু মেম্বারকে জাহেল আওয়ামী সন্ত্রাসীরা হত্যার পর তার লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়। তোতা মাস্টারকে মাথা মুড়িয়ে চুনকালি দিয়ে আবদুল্লাপুরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরান হয়। এইভাবে আল্লাহর হক-পরস্ত বান্দারা প্রকাশ্যে অথবা গোপনে জাহেল-জালেমদের হাতে কত যে অপদস্থ হয়েছে, কত যে নির্যাতিত হয়েছে- এর প্রকৃত তথ্য হয়তো কোন দিনই জনসমক্ষে আসবে না। এদেশের ইতিহাস একটি অপূর্ণ একপেশে ইতিহাস হিসেবে রয়ে যাবে শেষ অবধি।

আদালতের অঙ্গন থেকে শুনানীর সম্মুখীন না হয়েই আমাকে ফিরে আসতে হল কারাগারে। মরার ওপর খাড়ার ঘা যেমন প্রতিক্রিয়াহীন, ৪০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামীর কাছেও নতুন মামলার কোন প্রতিক্রিয়া নেই। এসব তেমনি বোঝার ওপর শাকের আঁটি বলে মনে হত। কয়েকদিন পর মোমেনশাহী জেল থেকে বিদায় নিতে হল।

আবার কেন্দ্রীয় কারাগার। আবার সেই ১০ সেল ডিভিশন। এর মধ্যে ডিআইজি মোফাখখারুল ইসলাম সাহেবের বদলীর আদেশ এল। নতুন এআইজি এলেন। ডিআইজির দায়িত্ব তিনিই পালন করছেন। জেলারও বদলী হয়েছে ইতোমধ্যে। নতুন জেলার রিয়াজুদ্দিন ভূঁইয়া (টাঙ্গাইল) এখন দায়িত্বে। প্রথম দর্শনে তার চেহারা সুরত ও চালচলন দেখে নেহায়েত আল্লাহওয়ালা বলে মনে হবে। কিন্তু ফুলের পাঁপড়ির নীচে বিষাক্ত বৃশ্চিকের মত একটা কিছু তার বাহ্যিক চেহারার আড়ালে লুকিয়ে ছিল। তিনি ছিলেন উৎকোচ গ্রহণে সিদ্ধহস্ত। তাকে ঘিরেই দুর্নীতি আবর্তিত হত। সবচেয়ে বড় কথা হল, তিনি ছিলেন তোষামোদপ্রিয় একটি মানুষ। কারাগারে এ সুযোগটা নিয়েছিল কারাবাসী আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা। এর ফলে কারাগারে সবরকমের সুযোগ-সুবিধা, আরাম-আয়েশের দুয়ার আওয়ামী লীগের জন্য উন্মুক্ত হয় এবং আমাদের প্রাপ্য কারাগারের সুযোগ সুবিধার ক্ষেত্র সংকোচিত হতে থাকে। একদিন জেলার সাহেব আমাকে বললেন- ‘১০ সেল ডিভিশন আপনাকে ছাড়তে হবে।’ বললাম- ‘কেন? আমার জানার প্রয়োজন আছে। ৪০ বছর কারাদণ্ড একজন কয়েদীর জন্য মানসিক যন্ত্রণা। তারপরও এক সেল থেকে আর এক সেলে, এক পরিবেশ থেকে আর এক পরিবেশে চালান করে কষ্ট দেয়া কি সঙ্গত হচ্ছে?’ আমি অনুরোধের সুরে বললাম- ‘ব্যাপারটা একটু বিবেচনা করবেন।’

পাথরের বুক থেকে প্রস্রবণের প্রবাহ বেরিয়ে আসে। নিরেট লোহা একটি নির্দিষ্ট উত্তাপে বিগলিত হয়। কিন্তু জেলার সাহেব এমন একটা মানুষ যার বিবেকের সাথে আত্মা ও অনুভূতির যোগ নেই। আমার আবেদন, আমার আকুলতা তাকে বিগলিত করা তো দূরে কথা, তার হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছতে ব্যর্থ হয়।

একদিন সার্জেন্ট এসে হাজির। আমাকে অন্যত্র অর্থাৎ অন্য সেলে যেতে হবে। আমি বললাম- ‘রাউন্ড পর্যন্ত আমাকে থাকতে দিন।’ তিনি চলে গেলেন। আমাকে সরানোর ব্যাপারে আর তিনি আসেননি। ডেপুটি জেলার ইকবাল সাহেবের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভাল ছিল। তাকে ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করলাম। তিনি আমার অনুভূতির সাথে একমত হয়ে বললেন ‘একটা বিশেষ গ্রুপের ইন্ধনে জেলার সাহেব এসব অন্যায় অবিচার করছেন।’ সেই বিশেষ গ্রুপটি কারা, আমার জানতে বাকী রইল না। সে কারণে এ ব্যাপারে প্রশ্ন না করে জেলার সাহেবকে বলে কয়ে কিছুদিন আমাকে ১০ সেলে থাকার ব্যবস্থা করার জন্য তাকে অনুরোধ করলাম।

মোফাখখারুল ইসলামের পর নতুন ডিআইজি আজিজুল হক ভূঁইয়ার আগমন আমার জন্য আশীর্বাদের মত মনে হল। কারা অফিসারদের মধ্যে আমার জানামত যে দু’জন সৎ ও বিবেকবান অফিসার রয়েছেন তারা হলেন সাবেক ডিআইজি কাজী আব্দুল আউয়াল সাহেব, যাকে ঢাকা কারাবাসের প্রথম দিনগুলোতে পেয়েছিলাম। অন্যজন হলেন নবাগত ডিআইজি জনাব আজিজুল হক ভূঁইয়া। এক সময় আমি তাঁকে কাছে পেয়ে বললাম- ‘জেলার সাহেব আমাকে অন্যত্র সরিয়ে দিতে চাচ্ছেন। আমার মন-মানসিকতা এ ডিভিশনে এডজাষ্ট হয়েছে। অন্যত্র সরালে আমার বেশ কষ্ট হবে।’ তিনি বললেন- ‘কোথাও কাউকে সরানো হবে না, যে যেখানে আছেন সেখানে থাকবেন।’ জেলার সাহেবের পৃষ্ঠপোষকতায় কারাবাসী আওয়ামী লীগ নেতা ও কর্মীদের মধ্যে তাদের সেই পুরোনো ফ্যাসীবাদী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে লাগল। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের ক্ষমতা অপব্যবহারকারী রাজনৈতিক সামাজিক অপরাধ, জুলুম ও হত্যার সাথে সংশ্লিষ্ট আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও কর্মীরা কারাগারে দারুণভাবে মানসিক বিপর্যস্ত ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ডিআইজি মোফাখখারুল ইসলামের নেপথ্য সহযোগিতায় এই হতাশাগ্রস্ত আওয়ামী লীগাররা দারুণভাবে চাঙা হয়ে ওঠে। জেলের ভেতরেই তারা সংগঠিত হয়। এছাড়াও জেল কর্মচারীদের সাথে একটা বিশেষ যোগসূত্র স্থাপন করে। কারাগারের নিয়ম শৃঙ্খলা পদদলিত করে স্বৈরাচারী কায়কারবার চালাতে থাকে। তথাকথিত দালাল আইনে কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ইসলামপন্থীদের ওপর চড়াও হবার চেষ্টা করে।

ডিআইজি মোফাখখারুল ইসলাম সাহেবের একপেশে প্রশাসনিক শিথিলতায় আওয়ামী লীগাররা যেসব বাড়াবাড়ির পথ ধরে এগুতে থাকে, সেটাকে বাগে আনতে ডিআইজি অব প্রিজন্স আজিজুল হক ভূঁইয়াকে যথেষ্ট হিমশিম খেতে হয়। তার সময়েই বাজিতপুর হত্যা মামলার রায়কে কেন্দ্র করে কারাগারে আওয়ামী লীগাররা অবস্থান ধর্মঘট করে। কয়েদীদের যথারীতি সন্ধ্যার পূর্বেই সেলে অথবা ওয়ার্ডে তালাবদ্ধ করে দেয়ার নিয়ম। সেদিন যথানিয়মে আমাদেরকে তালাবদ্ধ করা হলেও কোন আওয়ামী লীগারকে তালাবদ্ধ করা হয়নি। তারা একযোগে কারাগারের মুক্ত অঙ্গনে অবস্থান নিয়ে বাজিতপুর হত্যা মামলার আসামীদের ফাঁসী মওকুফের দাবীতে শ্লোগান দিতে থাকে। কারা কর্তৃপক্ষ দারুণ সংকটে পড়ে। ঘন্টার পর ঘণ্টা অতিবাহিত হচ্ছে। অথচ অবস্থান পরিবর্তন হচ্ছে না। এভাবে রাত্রি ১টা বাজে। ডিআইজি সাহেব তার কৌশল, ধী-শক্তি, ও প্রজ্ঞার প্রয়োগ ঘটিয়ে ঘটনাকে আয়ত্তে আনেন। আওয়ামী লীগের একতরফা বাড়াবাড়ি সত্ত্বেও তিনি যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে বাইরের সাহায্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতা নিয়ে একটি উত্তপ্ত ও মারমুখী পরিস্থিতির উপসংহার টানতে সক্ষম হন। আওয়ামী লীগাররা তাদের সেলে যেতে বাধ্য হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার সেদিন একটি রক্তাক্ত পরিণতি থেকে রক্ষা পায়। কারাবাসী আওয়ামী লীগারদের সাথে আমাদের সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। জনৈক ডেপুটি জেলার ছাত্রবস্থায় ছাত্রলীগের সাথে জড়িত ছিলেন বলে স্বভাবতই বন্দী আওয়ামী লীগারদের সাথে ছিল তার নাড়ীর যোগ। তার মাধ্যমে ওরা কারাগারের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট আমাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলে যে, আমরা তফসীরের মাধ্যমে রাজনীতি করছি, তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করছি, সাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশ ঘটাচ্ছি। তফসীর বন্ধ করা না হলে জাতীয় স্বার্থে তারা সম্মিলিতভাবে শক্তি প্রয়োগ করবে। এর ফলে কারাগারে অশান্ত পরিস্থিতির উদ্ভব হলে আওয়ামী লীগের কেউ দায়ী হবে না।

আওয়ামী লীগের ফ্যাসীবাদী উদ্ধত আচরণের আর একটি কারণ হল, পঁচাত্তরে আওয়ামী বাকশালী প্রশাসনের পতনের পর থেকে ক্রমশ কারামুক্তির ফলে আমাদের সংখ্যা কমতে থাকে। পক্ষান্তরে রাজনীতি ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে গ্রেফতার হয়ে আওয়ামী সমর্থকদের সংখ্যা বেড়ে যায়।

আমাদের স্নায়ুযুদ্ধ ও কারাগার পরিস্থিতির উত্তাপ নিরসনের জন্য ডিআইজি সাহেব আমাদের প্রতিনিধিত্বকারী কিছু লোককে ডেকে পাঠান। আমাদের পক্ষ থেকে আমি ও এডভোকেট এবিএম আনোয়ার হোসনে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রাখাল ভট্টাচার্য, হোসেন সাহেব ও মিস্টার গোমেজ উপস্থিত হলাম। ওরা অভিযোগ করে যে, আমরা পুরোনো কায়দায় ইসলাম ও কোরআনকে টেনে এনে তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করছি।

আমরা বললাম- ‘কারাগারের অফুরন্ত অবসরে আমরা অন্যায় অপকর্মে অর্থহীনভাবে সময়ের অপচয় না করে কোরআন চর্চা করছি। আর কোরআন চর্চা যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করা হয় তাহলে কারাগারের মধ্যে এ ধ্বংসযজ্ঞ চলবে। কারাগার থেকে বেরিয়েও তাই করতে থাকব।’

ডিআইজি সাহেব আওয়ামী লীগারদের উদ্দেশ্যে বললেন- ‘কোরআন চর্চা তো অপরাধ নয়, আপনারা নিজ নিজ ধর্ম চর্চা করেন, কেউ বাধা দিবে না। কেউ রাজনীতি করলে সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদের, আপনাদের নয়। আপনাদের সবাইকে বলছি কেউ বাড়াবাড়ি করার চেষ্টা করলে এখান থেকে অন্যত্র পাঠাতে বাধ্য হব। এরপরে এ ধরনের কোন অভিযোগ শুনতে আমি নারাজ।’

রাখাল ভট্টাচার্য, যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে কারাগারে কোরআন চর্চা বন্ধ করার প্রধান উদ্যোক্তা এবং মুসলমান কয়েদীদের মগজে ঘুন ধরানোর ব্যাপারে সক্রিয়, সেই রাখাল বাবু একটি মন্ত্রণালয়ের সেকশন অফিসার ছিলেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করার জন্য পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের সাথে সাথে তাকে গ্রেফতার করা হয়। একাত্তরের যুদ্ধকালীন সময়ে তার মত কোন হিন্দুর বাংলাদেশে থাকার কথা নয়। অথচ তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুসলমানদের ছদ্মাবরণে বাংলাদেশে অবস্থান করছিলেন। কালামে পাকের অনেক সূরা অর্থসহ তার জানা। নামাজের নিয়ম-পদ্ধতি ছিল তার নখদর্পণে। একাত্তরে তিনি বিভিন্ন মসজিদে নামাজ পড়িয়েছেন। এমনকি কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট মসজিদে তিনি ইমামতি করেছেন বলেও তিনি আমাকে জানান। পাকিস্তান ভেঙে যাওয়ার অনেক আগে থেকে তিনি হিন্দুস্তানের স্বপক্ষে গোয়ন্দাবৃত্তিতে নিয়োজিত থেকে ‘লরেন্স অব এরাবিয়ার’ মত বাংলাদেশের মুসলমানদের মগজে পচঁন ধরিয়েছেন। ভাল মানুষগুলোকে পাকিস্তানের শত্রু চিহ্নিত করে হত্যা করিয়েছেন। এ দেশের তথ্য হিন্দুস্তানে পাচার করেছেন। তার মুসলিম-বিদ্বেষী জঘন্য মনোবৃত্তির প্রকাশ আমরা দেখেছি কারাগারের অভ্যন্তরেও। এখানে মুসলমান অবুঝ তরুণদেরকে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।

আমি একদিন আমার সেলে বিশ্রাম নিচ্ছি। একটা উত্তেজিত কন্ঠ আমার কানে এল। বলতে শুনলাম ‘আমরা একাত্তরের আলবদর, রাজাকার আল-শামস মুজাহিদ আর শান্তি কমিটির লোকদের ছেড়ে দিয়ে ভুল করেছি। সামনের দিনগুলোতে আমরা আর সে ভুলের পুনরাবৃত্তি করব না। বঙ্গবন্ধু এদের জেলে পাঠিয়ে রক্ষা করেছেন। ওরা জেলখানাকে ট্রেনিং সেন্ট্রারে পরিণত করেছে। তারা আমাদের বিরুদ্ধে কথা বলে, কি দুঃসাহস। একাত্তরের চেতনাকে ধ্বংস করার জন্য ওরা জেলখানায় বীজবপন করছে। ওদের ক্ষমা করা আর ঠিক হবে না।’

আমি সেল প্রকোষ্ঠ থেকে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম, আমাকে দেখে রাখাল বাবু বিব্রত। বললাম- ‘রাখাল বাবু, কি বললেন আবার বলুন। আপনাদের ধ্বংসের বীজ বপন করেছিলেন আপনারাই। আপনাদের ধ্বংসের জন্য দায়ী আপনাদের সংকীর্ণ হিন্দুবাদ। যা মুসলমানদের মানসিক দুর্বলতার সুযোগে তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। গোটা জাতি আপনাদের সেই চক্রান্তের চেতনা ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছে। আপনাদের পাশে এখন খুনী লুটেরা আর ক্রিমিনাল ছাড়া কেউ নেই। তারা চায় আপনাদের তথাকথিত চেতনাকে তাদের কৃত-কর্ম আর অপরাধগুলোর ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে। মুসলমানদের কানে কানে বিষ ঢালার পুরোনো প্রবণতা এখনও আপনার মধ্যে রয়ে গেছে। অভ্যাস পরিবর্তন করুন। আমার কানে দ্বিতীয়বার যেন এ কথা না আসে। শুধু এটুকু জানিয়ে দিতে চাই, এটা একাত্তর নয় ছিয়াত্তর। একাত্তরের অন্ধ তরুণ, যাদের দিয়ে জঘন্যতম কাজ করিয়েছেন তাদের বিরাট অংশ এখন আমার পাশে।’ কাছে দাঁড়িয়েছিল জমাদার ও সিপাই। বললাম- ‘এই ক্রিমিনলটাকে আমার চোখের সামনে থেকে সরে যেতে বলুন। এই জঘন্য মনোবৃত্তির লোকটাকে আমি সহ্য করতে পারছি না।’ ডিউটি জমাদার কিছু বলার আগে রাখাল বাবু মাথা নীচু করে সরে গেলেন।

একদিন দেখলাম ঢাকা বেতার নিঃশব্দ। আশঙ্কা হল, একটা কিছু ঘটেছে। মনে হল পঁচাত্তরের ঐতিহাসিক বিপ্লব শুরু হয়ে গেছে। দোয়া করতে থাকলাম। আমাদের অন্যান্য ভাইদের দোয়া করতে বললাম। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তন জাতীয় জীবনে একটা উষালগ্ন বলে মনে হয়েছিল। এই বিপ্লব একটা সূর্যোদয় ঘটাতে না পারলেও অমানিশয়ার অন্ধকার বিদূরিত করে সুবহে সাদিকের আবছা আলোর আভা আনতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু আবার সেই জাহেলিয়াত। আবার সেই নিশ্চিদ্র অন্ধকার। আবার সেই হিন্দুবাদের প্রাধান্য। খবর পেলাম খালেদ মোশাররফের মা, ভাই, মতিয়া চৌধুরী এবং আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে একটি মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করেছে। এতে আরও নিশ্চিত হলাম যে প্রতি-বিপ্লব শক্তভাবেই এগুচ্ছে। পঁচাত্তরের পরিবর্তীত চেতনাকে রুশ-ভারত অক্ষশক্তি বেশী দূর এগুতে দিবে না। আমার এ ধারণা ছিল অনেক আগে থেকে। মীর কাশিমের অনুতপ্ত অনুভূতির প্রতি যেমন ক্লাইভের সতর্ক দৃষ্টি ছিল, হিন্দুস্তানের ক্ষুধার্ত আগ্রাসী জঠরে অবস্থান করে তা থেকে নিশ্কৃতি পাবার আকুলতাকে দিল্লী যে কোন মূল্যের বিনিময়ে প্রতিহত করবে এটাই তো স্বাভাবিক। স্বাধীনচেতা মীর কাশিমকে ক্লাইভ বাংলার মসনদে বসে কাজ করার সুযোগ দিবে না। এই নির্মম বাস্তবতা ও ইতিহাসের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত সামনে থাকা সত্ত্বেও, প্রতি বিপ্লবের পদধ্বনি শুনে ভাগ্যহত জাতির জন্য দারুণ ব্যথা অনুভব করি। রাত্রে ঘুমানোর চেষ্টা করি। কিন্তু ঘুম নেই। এক ভয়ঙ্কর মানসিক যন্ত্রণা ও অনাহুত অস্থিরতা অনুভব করি। শেষরাত্রে বেশ কিছু গুলীর শব্দ কানে এলো, লক্ষ্য করলাম সেন্ট্রিদের অস্থির পদচারণা। ভাবলাম বাইরে কেন্দ্রীয় কারাগারের কাছাকাছি প্রতিবিপ্লবের ঢেউ এসে আছাড় খেল। কোন মুসলমান কোনদিন কোন অবস্থায় আল্লাহর সাহায্য থেকে নিরাশ হতে পারে না। এমন একটা হাদীসের কথা মনে হতেই দোয়া করলাম। প্রাণ ভরে দোয়া করলাম আল্লাহর কাছে। অসহায় এই জাতির জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করলাম। আমার চিন্তা-চেতনা দুলছে। পেণ্ডুলামের মত দুলছে আশা নৈরাশ্যের মাঝখানে। আমি এই ভেবে আশ্বস্ত যে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রক আমরা নই। পরিস্থিতির ওপর প্রভাব বিস্তারের শক্তি ও সামর্থ্য আমাদের নেই। যখন ছিল তখন আমাদের সামর্থ্যরে সবটুকু কাজে লাগিয়েছিলাম। এখন আমরা দৃশ্যপটের বাইরে। আমরা বাইরের পর্যবেক্ষক মাত্র। তাছাড়া আমাদের সংগ্রাম, আমাদের কোরবানী যদি আল্লাহর ওয়াস্তে হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ নিশ্চয় আমাদের সাহায্য করবেন। আল্লাহ নিজ হাতে নিয়ন্ত্রণ করবেন সবকিছু।

সকাল হল, সেলের দরজা বন্ধ তখনও। সকাল ৮টা নাগাদ প্রতিদিন সেল প্রকোষ্ঠে নাস্তা পৌঁছে যায় যথানিয়মে। আজ ব্যতিক্রম। ঘন্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে গেল। ১১টা নাগাদ দরজা খোলা হল। ক্ষুধা, ভয়ঙ্কর ক্ষুধায় অস্থির আমরা সকলে। সেল থেকে বেরুলাম। বেরিয়ে শুনলাম বাইরে থেকে সেনাবাহিনীর লোকজন এসে আওয়ামী লীগের ৪ জন নেতাকে হত্যা করেছে। বুঝলাম গতরাতে গুলীর শব্দ বাইরে নয় ভেতরের। ঐ গুলীগুলাতেই কারা প্রকোষ্ঠে চারজন আওয়ামী লীগ নেতার বুক বিদীর্ণ হয়েছে। দুঃখ পেলাম এই ভেবে যে কারাগারের অসহায় মানুষদের বিনা বিচারে হত্যার প্রবণতা কোনদিনই শুভ হয় না। এটা অমানবিক বর্বরতা। এটা মানুষের মৌলিক অধিকারের চূড়ান্ত অবমাননা। কিন্তু ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতিকে আমরা ঠেকাব কি দিয়ে একটা বিচ্ছিন্ন তরঙ্গ বালির বাঁধকে ভেঙ্গে দিতে পারে। আশ্চর্য হলাম দুশ’ বছর পর একই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখে। মোহাম্মদী বেগরা অপঘাতে মরবে এটাইতো স্বাভাবিক।

দুপুরের খাবার পেলাম। সকালে খাবার থেকে সবাই মাহরুম হয়েছে। কারাগারে সন্ত্রাসের ছায়া নেমে এসেছিল। খাবার আয়োজন হয়নি, খাবারের কথাও ভুলে গিয়েছিলাম সকলে। সবার চোখে মুখে আতঙ্ক। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের বন্দীরা তাদের চার নেতার মৃত্যুতে মুষড়ে পড়েছে। তাছাড়া বিপ্লবের গতি-প্রকৃতি বুঝতে পারছেনা কেউ। কারো মুখে কোন কথা নেই। নির্বাক চাওনি সবার। সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে পরিস্থিতির গভীরতাকে নিরূপণের চেষ্টা করছে। বিকেল নাগাদ দেখলাম আওয়ামী লীগারদের চোখ-চাওনিতে আগের মত আর আতঙ্কের ছাপ নেই। মুখমণ্ডলের বিমর্ষতা দূর হয়ে অনেকখানি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। ওরা আমাদের জন্য পরিস্থিতির ব্যারোমিটার। ঠিক তেমনি ওদের জন্যও ছিলাম আমরা। তবে আমাদের চাইতে ওদের বাইরের জগতের সাথে সম্পর্ক ছিল বেশী। বুঝলাম সময়ের স্রোত তাদের সপক্ষে প্রবাহিত হচ্ছে। আমরা আমাদের মধ্যে ফিস ফিস করে আলাপ করছি। সামগ্রিক বিচারে পরিস্থিতিকে কুয়াশাচ্ছন্ন বলে মনে হচ্ছিল। দেখলাম প্রতিপক্ষের উল্লাস ক্রমশঃ বাড়তে আছে। বিক্ষিপ্ত আর কেউ নেই, দলে দলে পদচারণ আর বৈঠক, এদিক সেদিক ইতস্ততভাবে চলছে। আমার মন মানসিকতায় এই নিুচাপ যেন একটা ঝড়ের পূর্বাভাস বলে মনে হল। ইচ্ছে হল পঁচাত্তরের পরিবর্তিত অবস্থা ধরে রাখার জন্য আমি সচেতন সৈনিকদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রতিবিপ্লবকে প্রতিহত করি। কিন্তু আমার স্বতঃস্ফূর্ত আকাংখা লোহার গরাদে ঠোক্কর খেয়ে ফিরে এল। বুঝলাম আমি নিরুপায়। আমি একজন বন্দী।

এ রাতও অস্থিরতার মধ্যে কাটল। সকালে সেলের দরজা খোলার পর জানান হল, আমাকে এ সেল ডিভিশন ছাড়তে হবে। ওদের ভাষার মধ্যে শালীনতা ও সাবলীলতা নেই। সার্জেন্ট নিজে একজন তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। আওয়ামী লীগের ভেতর-বাহির সব চ্যানেলের সাথে তার ছিল অন্তরঙ্গতা। দিনের শুরুটা ভাল লাগল না মোটেও। এই ঘটনা অশুভ সংকেত বলে মনে হল। বাদ প্রতিবাদ না করে আমি তৈরী হলাম। এবার আমি ফাঁসীর সেলে। ফাঁসী হোক আর নাই হোক সার্জেন্টের এই কাজ, আমাদের প্রতি তার ভয়ঙ্কর জিঘাংসার বহিঃপ্রকাশ। ফাঁসীর সেলে আটক রেখে আমার মানসিক বিপর্যয় ঘটিয়ে এক বর্বরোচিত আনন্দ চোখে চোখে উপভোগ করতে চান তিনি। তার ভাবখানা যেন এই এবার তোমাকে ফাঁসীর সেল থেকে বাঁচাবে কে? তার মুখেই জানতে পারি- খালেদ মোশাররফ এখন ক্ষমতায়। মুজিব হত্যাকারীরা পলাতক। ভাবলাম ভাগ্যহত জাতিটা আবার অসহায় হয়ে পড়ল। ফাঁসীর সেলে অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু বিচলিত হইনি মোটেও। কেননা আমি জানি জীবন মৃত্যুর মালিক আল্লাহ। এমনি ফাঁসীর সেলে বসেই বিপ্লবী নেতা মোরশেদ সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী ফাঁসীর রায় শুনেও ছিলেন নির্বিকার। দ্বিধাহীন চিত্তে বই লিখে গেছেন সেল প্রকোষ্ঠের ক্ষুদ্র পরিসরে। ক্ষমা চাননি কারো কাছে। বলেছেন- ‘উপরের ফায়সালা না হলে কেউ আমাকে ফাঁসী দিতে সক্ষম হবে না।’

একদিন কাটল ফাঁসীর সেলে। আমি একা। মানসিক ভীতি অথবা অজানা আশঙ্কায় মনে কোন দুর্বলতার সঞ্চার হয়নি তবে একাকীত্ব আমার দারুণ খারাপ লাগছিল। আমাদের ভাইদের থেকে দূরে অবস্থান করে অস্বস্তি অনুভব করছিলাম। একটা দিন কোন মতে কাটল। পরদিনও একইভাবে পার হল। নামাজ কালাম তসবীহ তাহলীল করে অধিকাংশ সময় আমার কাটছে। রাত্রে ঘুম, নিবিড় ঘুমে আচ্ছন্ন। দুটো দিন অস্থিরতার মধ্যে কাটিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আবার আকস্মিক গুলীর শব্দ। গুলী চলছে। অবিরাম গুলীর শব্দ। ‘মিয়া সাহেব মিয়া সাহেব’ বলে ডাকলাম সেন্ট্রীকে। জেলের পরিভাষায় সেন্ট্রীদের মিয়া সাহেব বলা হয়ে থাকে। তিনি আসলেন। দেখলাম- বেশী বয়সী একজন বিহারী পুলিশ। তার সাথে আমার কথাবার্তা আগে থেকে হত। জিজ্ঞেস করলাম- ‘কি হয়েছে?’ তিনি বললেন- ‘দোয়া করেন সাহেব। বাইরে গণ্ডগোল চলছে।’ তবে এর বেশী তিনি কিছু বলতে পারলেন না।

রাত্রি ভোর হল। সকাল হল স্বাভাবিক নিয়মে। সেন্ট্রীদের মাধ্যমে বিকেল নাগাদ খবর পেলাম- খালেদ মোশররফের পতন হয়েছে। সিপাহী জনতা জেনারেল জিয়াকে আটকাবস্থা থেকে বের করে এনেছে। মোশতাক এখন আর প্রেসিডেন্ট নন, তিনি বিবৃতি দিয়ে সরে গেছেন। নতুন প্রেসিডেন্ট বিচারপতি সায়েম প্রেসিডেন্টের শপথ গ্রহণ করেছেন। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের ঝুঁকি গ্রহণকারী তরুণ সেনানায়করা দেশের মাটিতে আর নেই। দারুণভাবে দুঃখ পেলাম। মনে হল সেই জানবাজদের কাছে জাতির অনেক পাবার ছিল। দেশের প্রতি, জাতির প্রতি ঐকান্তিক দরদ ছিল বলেই তারা চূড়ান্ত কোরবানীর প্রস্তুতি নিয়ে মুজিবকে হত্যা করতে কুণ্ঠিত হয়নি। তাদের তত্ত্বাবধানে তিন মাসের বাংলাদেশ অন্ধকার থেকে আলোয় উত্তরণের বাংলাদেশ। তাদের সদিচ্ছা তাদের প্রাণের স্পর্শের সাথে কারো তুলনা করা যাবে না। জিয়ার ক্ষমতারোহণ, এতে খুশী হওয়ার কিছু নেই। কেননা দেশের পট পরিবর্তনে তার কোন ভূমিকা নেই। কিন্তু পরিস্থিতির সুফলটা তার হাতের মুঠোয় এসে গেছে। আমার মনে হয়েছিল পঁচাত্তরের চেতনা তার মধ্যে নেই বলে ক্ষমতায় আট ঘাট হয়ে বসবার চিন্তা-চেতনা দ্বারাই তিনি চালিত হবেন। অর্থাৎ আদর্শ নয়, ঐতিহ্য নয়, জাতি নয়, দেশ নয় তার কর্মের কেন্দ্রবিন্দু মসনদ। ফাঁসীর সেলে বসে জিয়া সম্বন্ধে আমার যে ধারণার উন্মেষ হয় জিয়া তার শাসনকালের প্রতিটি কর্মে অনুরূপ স্বাক্ষর রেখেছেন। প্রথমতঃ পঁচাত্তরের নায়কদের বাংলাদেশে আসতে দেননি। আসলেও তাদেরকে জুলুম নিপীড়নের সম্মুখীন হতে হয়েছে। দ্বিতীয়তঃ বিচারপতি সায়েমকে সরিয়ে তিনি নিজেই মসনদে সমাসীন হয়েছেন। তৃতীয়তঃ বিমান বাহিনী প্রধান এমজি তোয়াবকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছেন। কেননা এ দেশটাকে ইসলামী দেশে পরিণত করার আকাংখা তার মধ্যে বিদ্যমান ছিল।

তার সাথে সক্রিয় সহযোগিতা করা সত্ত্বেও কর্ণেল তাহেরকে ফাঁসীতে ঝুলিয়েছেন। ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ইসলামী চেতনাসম্পন্ন বিমান বাহিনী অফিসারদের হত্যা করিয়েছেন। শত শত তরুণ সামরিক অফিসার ও জোয়ানদের কারাগারে নিক্ষেপ করেছেন। শত শত সৈনিককে ফাঁসীতে ঝুলিয়েছেন। রাজনীতিকদেরকে তেজারতের মালে পরিণত করেছেন। তার শাসনামলে রাজনীতিকদের কেনা-বেচা শুরু হয়। তিনিই সেনাবাহিনীকে রাজনীতির মোহে আবিষ্ট করেছেন। তার ডিভাইড এন্ড রুল পলিসি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ না করে ভাঙনের দিকে নিয়ে যায়। বিসমিল্লাহর ছত্রছায়ায় তিনি ইসলামী চেতনাকে নস্যাৎ করার সুযোগ করে দেন। কর্ণেল নাসেরের মত একচ্ছত্র অধিপতি হওয়ার লক্ষ্যে তার সমস্ত কাজ আবর্তিত হতে থাকে। সরকারী ব্যয়ে তরুণদেরকে তার রাজনীতির মুখাপেক্ষী করে তোলেন। সবচেয়ে বড় কথা এ দেশটার স্বকীয় সত্তার বিকাশ না ঘটিয়ে আমেরিকা ও রুশ-ভারত অক্ষশক্তির চারণভূমিতে পরিণত করেন।

দুঃসাহসিক নওজোয়ানেরা যুগের মীরজাফরকে হত্যা করে মীর কাশিমকে মসনদে বসায়। অর্থাৎ মুজিবের পর প্রেসিডেন্ট হন খন্দকার মোশতাক। মীরজাফরের সহযোগী হিসেবে তার অতীত গুনাহের কাফফারা আদায়ের জন্য তার উচিত ছিল গণভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা  দেয়া। তা না করে তিনি কেবল পুরোনো পাঁকে পুরোনো চক্রের আবর্তে খাবি খেয়েছেন। গোটা জাতিকে একটা ইস্যূর ওপর ঐক্যবদ্ধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। ব্যর্থই বা বলি কেন? জাতিকে তার সত্তার মূল স্রোতধরায় প্রবাহিত করার চেষ্টা করেননি। হালকা কিছু সংস্কারের প্রলেপ দিতে চেয়েছিলেন মাত্র। কিন্তু এতে গোটা জাতির রোগ নিরাময় হল না। একাত্তর থেকে পঁচাত্তর পর্যন্ত রোগভোগের পর জাতির জীবনীশক্তি ফিরিয়ে আনার কোন ব্যবস্থা না হওয়াতে রোগ জীবাণুগুলো সক্রিয় হয়ে উঠল। এর ফল মাত্র তিন মাসের মধ্যেই মোশতাক সরকারের পতন।

বিপ্লবোত্তর প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক রাজনীতিকদের দ্বিতীয় ঠিকানা ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সেল প্রকোষ্ঠে ঠাঁই পেলেন। এই কারাগার তখন আওয়ামী বাকশালী ও বামপন্থীতে পরিপূর্ণ। ইসলামপন্থীদের সংখ্যা ক্রমশ কমতির দিকে। আওয়ামী বাকশালী ও বামপন্থীদের অস্থিমজ্জায় মিশে থাকা সন্ত্রাসী প্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ মাঝে মাঝে ঘটতে থাকে। এর প্রেক্ষিতে আমি, শফিউল আলম প্রধান এবং আরও অনেকে মিলে আওয়ামী বাকশাল বিরোধী একটি মোর্চা গঠন করি। এই অবস্থার মধ্যে খন্দকার মোশতাক সাহেব কারাগারে প্রবেশ করলেন।

২৬ সেল ডিভিশনে তার প্রবেশকে বলা যায়- রোষ্ট হবার জন্য একটা মোরগ যেন রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে চলেছে। মাত্র তিন মাস আগে এই আওয়ামী বাকশালীদের উৎখাত করে এদের নেতাদের লাশের ওপর খন্দকার মোশতাক সাধের সোনার বাংলার মসনদে আসীন হন। তাছাড়া মাত্র কয়দিন আগে তাদের ৪ নেতাকে হত্যা করা হয়। এর জন্যও তারা মনে করে মোশতাক স্বয়ং এটা করিয়েছেন। আজকে সেই মোশতাক তাদের হাতের মুঠোয়। দুশ্চিন্তার দুঃসহ গুরুভার নিয়ে আসন্ন মৃত্যুর প্রতীক্ষায় প্রহর গুণতে থাকলেন। তাছাড়া বাকশালীদের ভয়ঙ্কর উক্তি ও প্রতিশোধস্পৃহা তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলল। আমরা মোশতাক সাহেবের অবস্থা আঁচ করতে পারলাম। ওদিকে মোশতাক সাহেবের ভাগ্নে কাজী বারী তার সাথে যোগাযোগ করে আমাদের জানালেন যে, তিনি হতাশায় ভেঙে পড়েছেন। আমরা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে কি করা যায় আপাতত ভাবতে লাগলাম। শফিউল আলম প্রধান তার গ্রুপ থেকে শক্তিশালী দু’জনকে সার্বক্ষণিক পাহারা দেয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। আমরা ঘোষণা দিলাম মোশতাক সাহেবের ওপর কেউ আঘাত হানার চেষ্টা করলে কারাগার কারবালায় পরিণত হবে।

মোশতাক সাহেব প্রায়ই কাজী বারীর সেলে তার সাথে দেখা করতে আসতেন। একদিন কাজী বারী আমার সেলে থাকায় তিনি আমার সেলে এসে উপস্থিত হলেন। আমার সাথে বারী ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন। বললেন- ‘আমিনকে ছোট থেকেই জানি। প্রথম দিকে আমাদের সাথে কাজ করলেও ‘৬৯ সাল নাগাদ ইসলামী ছাত্রসংঘে যোগ দেন। তারপর একাত্তরে আমরা ছিলাম দুই বিপরীত মেরুতে। এখন আবার বাস করছি এক জায়গায়।’
আমি বললাম- ‘মুজিবের আইনের ফাঁদে আটকে আমাকে ৪০ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়।’
মোশতাক সাহেব বললেন- ‘আমি কালাকানুন ঘোষণা দিয়ে ওই সবগুলো বাতিল করে দিয়েছি।’
বললাম- ‘কিন্তু আমাদের কারাদণ্ড বাতিল হয়নি। আপনি কালাকানুন ঘোষণা দিয়েই খালাস। কিন্তু আওয়ামী চক্র তো প্রশাসনের রন্ধে রন্ধে প্রবিষ্ট হয়ে আছে। তারা আমাদের দণ্ডাদেশ বাতিল করবে কেন?’

খন্দকার মোশতাক স্বল্পভাষী, নিজের ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে সচেতন। মাত্র কয়টা দিন আগে জাতির সর্বোচ্চ আসনে থেকে কত অজস্র সম্মান কুড়িয়েছেন। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! আজকে কয়েদীদের সাথে কারাবাস করছেন। তার ইঙ্গিতে কত অজস্র মানুষ কারাগারে নিক্ষিপ্ত। আজকে তিনি সেই কারাগারে সবচেয়ে অসহায় প্রাণী। তাকালাম তার দিকে। তার চোখ আর চাওনিতে নৈরাজ্যের অন্ধকার। মনে পড়ল নজরুলের সেই মরমী সঙ্গীত-

নদীর এ কূল ভাঙে ও কূল গড়ে
এই তো নদীর খেলা
সকাল বেলা আমীর রে ভাই
ফকীর সন্ধ্যা বেলা।

অবশ্য তাকে আশ্বাস দিয়ে বললাম- ‘আমরা রয়েছি আপনার পাশে। আমাদের লাশের ওপর দিয়ে ওরা আপনার ওপর চড়াও হতে পারবে তার আগে নয়। আমরা আপনার ব্যাপারে সতর্ক। শাদ্দাদের স্বপ্ন আপনি ভেঙে চূরমার করেছেন। জাতিকে এর চেয়ে বড় উপহার দেয়ার কি ছিল? কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে আমরা দোয়া করেছি আপনার জন্য, যারা আপনার পাশে ছিল তাদের জন্য। আল্লাহ নিশ্চয় তার রাস্তায় চলা মজলুমের দোয়া ফিরিয়ে দেন না।’

ঈদ সমাগত। আত্মীয় পরিজন দূরে রেখে কারাগারে ঈদের আবেদন খুব একটা আমাদের কাছে নেই। এই ঈদ আমাদের কাছে যত মলিন বিবর্ণ হোক, যত মহররমের মত বেদনা বিধৃত হোক, তবু ঈদ তো। বছরের এই একটি দিন, বছরান্তে এই দিন জীবনে আর ঘুরে নাও আসতে পারে। কবি রবীন্দ্রের ভাষায়- ‘আজি যে রজনী যায় ফিরাইব তায় কেমনে?’ যে দিন যায় তাকে ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই এই কারা প্রকোষ্ঠে ঈদ উদযাপনের আয়োজন চলল। আয়োজন চলল আওয়ামী বাকশালী শিবিরে, সে আয়োজন ঈদ উদযাপনের নয়, খন্দকার মোশতাককে ঈদের জামায়াতে হত্যার আয়োজন। খবর আমাদের কানেও এল। কারা কর্তৃপক্ষের কানেও গেল। খন্দকার মোশতাকের জানতে বাকী রইল না। আমি মনে করলাম, সে সময় খন্দকার মোশতাককে সাহস যোগান দরকার। আমি একাই তার সাথে দেখা করতে চললাম। সামনে দিয়ে গেলে বিভিন্ন বিধি-নিষেধের বেড়া ডিঙাতে হবে। আমি সেসব এড়িয়ে, পেছন দিক দিয়ে তার জানালার সমনে দাঁড়াতেই তিনি জানালার কাছে এগিয়ে এলেন। আমাকে দেখে কেঁদে ফেললেন। সে কান্না শিশুদের কান্নার মত। বুঝলাম, ঘাবড়ে গেছেন তিনি। আমাকে বললেন- ওরা আমাকে হত্যা করতে চায়।’ বললাম- ‘অসম্ভব। হকের দীপশিখাকে বাতিলেরা সম্মিলিতভাবে এক ফুৎকারে নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু আল্লাহ এ দীপশিখাকে আরও প্রজ্জলিত আরও উদ্দীপ্ত করে তোলেন। আপনি নির্ভয়ে থাকুন ওরা আপনার কিছু করতে পারবে না। এছাড়া আপনার ব্যাপারে আমরা সতর্ক। আমরা প্রত্যেকেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।’

কারা কর্তৃপক্ষ পর দিন ঈদের জামায়াতে শামিল হতে তাকে নিষেধ করেন সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে। কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্ত সঠিকই বলতে হয়। যদি মোশতাক সাহেব জামায়াতে যেতেন, আর তার উপর যদি হামলা পরিচালিত হত, তাহলে সম্ভবতঃ ঈদের মাঠ রণাঙ্গনে পরিণত হত। কারাগারে প্রাণহানি ও রক্তপাতের খবর ব্যানার হেডিং হয়ে পৃথিবীর পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ হত। আল্লাহ সে অবস্থা থেকে কারাগারকে সেদিন বাঁচিয়েছেন। যাই হোক, যতদিন খন্দকার মোশতাক সাহেব কারাগারে ছিলেন আমরা তার নিরাপত্তার জন্য চোখে চোখে রেখেছি।

খবর পেলাম কয়েকজন ভদ্রলোক আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য এসেছেন। আমি তড়িঘড়ি ভিজিটিং রুমে এলাম। এসে দেখলাম কেউ নেই। গেটের কাছে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম প্যান্ট-শার্ট পড়া নাদুসনুদুস ভদ্রলোক তার পরিষদবর্গ নিয়ে লোহার গেট দিয়ে ভিতর ঢুকছেন। সালাম দিলাম। জবাবও পেলাম। তার সাথে অতিরিক্ত পেলাম মিষ্টি হাসির তোহফা। অর্ধযুগ পর অতি পরিচিত, অতি চেনা অতি পুরানো স্নেহ আর মমতা মিশ্রিত এ হাসি আমার অন্তরের গভীরে নাড়া দিল। আমার রাহবার, আমার পথপ্রদর্শক, আমার নেতা যেন দিগ্বীজয় করে ফিরে এসেছেন। উনসত্তরের প্রথমার্ধে ভৈরব রেলওয়ে কলোনীতে ইসলামী ছাত্রসংঘের একটি ঘরোয়া বৈঠকে আমি আমন্ত্রিত। যদিও আমি তখন ছাত্র ইউনিয়ন করি। সেখানে আশরাফ ভাই বক্তৃতা করলেন। অনেক জিজ্ঞাসার জবাব দিলেন। নতুনত্বের সন্ধান পেলাম আমি। গড্ডালিকা প্রবাহে আর নয়, স্রোতের বিপরীতে চলবার শপথ নিলাম। আমার তারুণ্য তওহীদের পথে এগিয়ে চলার আগ্রহে তীব্র হয়ে উঠল।

কৈশোরের তারুণ্য আর অবুঝ অন্ধতায় ছিলাম ছাত্রলীগে, দুর্নিবার আঠারোতে ছাত্র ইউনিয়নে। তারপর নতুন উপলব্ধি, নতুন চেতনা নিয়ে ইসলামী ছাত্রসংঘের সাথে একাকার হলাম। আশরাফ ভায়ের সাথে মাঝে মাঝে দেখা হত। দ্রুত সাংগঠনিক পথ পরিক্রমায় আমি এগিয়ে চলছি। নিত্য নতুন দায়িত্ব এসে পড়ছে। অবশেষে একাত্তরে আলবদর। তখন আশরাফ ভাইয়ের সাথে দেখা হতো না কিন্তু তিনি গাইড করতেন টেলিফোনে। তার পর বিপর্যয়। ঝড়ের পাখির মত বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত সকলে। পল থেকে প্রহর, প্রহর থেকে দিন, দিন থেকে মাস, মাস থেকে বছর, বছর থেকে যুগের অর্ধেক পেরিয়ে আজ আশরাফ ভাই আবার আমার সম্মুখে।

আশরাফ ভাই কথা পাড়লেন। একাত্তরের পতনের পর কিভাবে কোলকাতায় গেলেন ও ভারতের মুসলমানদের তখন কি দুঃসহ মানসিক অবস্থা তিনি একে একে বলতে থাকলেন। তিনি বললেন- আমাদেরকে যখন বাংলাদেশে বিশ্বাসঘাতক আর দালাল হিসেবে চিহ্নিত করে ঘরে ঘরে তল্লাসী করে খুঁজছে, যখন এদেশে আমাদের ভাইয়ের হাতে আমাদের বুক বিদীর্ণ হচ্ছে, তখন হিন্দুস্তানের হিন্দুদের গৃহে চলছে দেয়ালী আর মুসলমানদের ঘরে ঘরে চলছে মাতম আর মর্সিয়া। আমি নিজের দেশ নিজের ভূখণ্ড ছেড়ে যখন কোলকাতায় উপস্থিত হলাম, মুসলমানরা তখন আমাকে সাগ্রহে আগলে রাখল। দেখলাম কি অপরিসীম তাদের দরদ। পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে হিন্দুস্তানী সৈনিকদের পদচারণায় তারা কি নিদারুণ আহত। শেষ পর্যন্ত কোলকাতায় আমার দ্বীনি ভাইয়েরা অনেক ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও রাখতে পারলেন না। গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন পিছু লেগেছে। ওখানে প্রত্যেকটি মুসলমানের পেছনে গোয়েন্দা। যেন রুশ-ভারতের নীলনক্সা মত আওয়ামী লীগ ও বামপন্থীদের দ্বারা নির্যাতিত মজলুম মুসলমানদেরকে আশ্রয় না দিতে পারে। কোলকাতার মুসলিম ভাইয়েরা আমাদেরকে তাদের আশ্রয়ে রাখতে পারলেন না। আমার নিরাপত্তার জন্য আমাকে দিল্লী যেতে হল। সেসব আয়োজন উদ্যোগ কোলকাতার মুসলমান ভাইয়েরা করলেন। দিল্লীর মুসলমান ভাইয়েরাও আমাকে সাদরে আগলে রাখলেন। এখানেও একই রকম গোয়েন্দা তৎপরতা। এবার বোম্বে এলাম। দিল্লীর ভাইয়েরা বোম্বে পর্যন্ত আসার এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলেন। এখানেও থাকলাম অনেক দিন। গোয়েন্দারা তৎপর এখানেও। তারপর চোরা পথে দুবাই গেলাম, সেখান থেকে পাকিস্তান। সেখানে আলবদর দেখার জন্য শত শত মানুষের ভিড় জমে গেল। প্রত্যেকদিন আমি মওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর বৈকালিক অধিবেশনে তার সাহচর্য থেকে কিছু সংগ্রহ করার জন্য বসতাম। আমাকে পেয়ে মওলানা দারুণ খুশী। বিস্তারিত- ভাবে বাংলাদেশের সর্বশেষ অবস্থা আমার কাছ থেকে শুনলেন আর দোয়া করলেন আমাদের অগণিত নির্যাতিত মানুষদের জন্য।’

আশরাফ ভাই বলে চলেছেন- ‘নিজের দেশ, নিজের মাটি, আমাদের জন্য বেগানা হলেও দুনিয়ার মুসলমানরা আমাদের এই ত্যাগ এই কোরবানীকে সম্মানের সাথে গ্রহণ করেছেন। গ্রহণ করেছেন ইসলামের সাম্প্রতিক ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে। দুশ্চিন্তা করবেন না। আমাদের ত্যাগ বিফলে যাবে না কোনদিন। আমি আপনাদের সবার খবর রাখার চেষ্টা করেছি। আপনি কারাগারের নিভৃত সেলে থেকেও ইসলামী আন্দোলনের জন্য কী করেছেন তা আমার অজানা ছিল না। এদেশে আসার আগে আমি নিয়ত করেছিলাম দেশের মাটিতে পা দিয়েই আমি আপনার সাথে দেখা করব। আমি কোথাও না গিয়ে সরাসরি আপনার সাথে দেখা করার জন্য এখানে এসেছি।’

তার কথা শুনে মনে হল যদিও আমি কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে নিসঙ্গ, কিন্তু একা নই। পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আমার আপনজন। যাদের কল্যাণ কামনা, যাদের আশীর্বাদ আমাকে বেষ্টন করে রয়েছে। তাদের দোয়ায় সম্ভবতঃ আমি বেঁচে আছি।

আমি বেশী কথা বললাম না। আমি যা বলব সবই আশরাফ ভাইয়ের জানা। আমি স্রেফ একজন ধৈর্যশীল শ্রোতা হিসেবে তার কথাগুলো শুনতে লাগলাম। সংগঠনের জন্য তার ত্যাগ-তিতিক্ষা অপরিসীম। বৃহত্তর মোমেনশাহীতে বিপ্লবের মশাল নিয়ে গ্রাম-গঞ্জ, শহর-শহরতলীতে ছুটে বেড়িয়েছেন। তার সাহায্য না পেলে হয়তো আজও অন্ধকারের আবর্তে খাবি খেতাম। তিনিই আমাকে টেনে এনেছেন জাহেলিয়াত থেকে ইসলামের দিকে। তাকে ভুলব না। ভোলা উচিতও না।

প্রাণের আবেগ দিয়ে আশরাফ ভাই অনেক কিছু বললেন। বললেন সিন্দাবাদের মত তার দুঃসাহসিক সফরের ইতিবৃত্ত। তারপর বিদায় নিলেন। মন চাইল না ছেড়ে দিতে। কিন্তু আমি কারাগারের একজন বন্দী বই তো কিছু নই। আমার সম্মানিত মেহমানকে রাখার স্থান তো কারাগার নয়। তিনি চলে গেলেন। বিবর্ণ হাসি দিয়ে তাকে বিদায় দিলাম।

তারপর একদিন শুনলাম আশরাফ ভাই আবার এসেছেন। আমি তার জন্য ভিজিটিং রুমের দিকে এগুতেই একজন আমাকে বললেন- ‘আরে না ওদিকে নয়। ৪নং ওয়ার্ডের দিকে যান।’ বুঝলাম আশরাফ ভাই কারাবাসে। ৪নং ওয়ার্ডে গিয়ে দেখলাম আশরাফ ভাই বসে আছেন দুশ্চিন্তার দুঃসহ গুরুভার নিয়ে। আমাকে দেখেই একটু ম্লান হাসি দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন। আমি হেসে বললাম, ‘আশরাফ ভাই, আমার প্রতি আপনার প্রাণের টান হয়তো বা আমার কাছে আপনাকে টেনে এনেছে। সবই আল্লাহর মেহেরবানী। আল্লাহর কোন ফায়সালার ওপর নারাজ হওয়া উচিত নয়।’ জিজ্ঞাসা করলাম- ‘আপনি এখানে এলেন কিভাবে?’ তার মুখ থেকে জানলাম কোন এক রেস্টুরেন্টে চা খাওয়ার সময় একাত্তরে তার এলাকার কর্মরত একজন পুলিশ অফিসার তার প্রতি এই মেহেরবানী করেছে। তারই সৌজন্যে তিনি এখন কারাগারে। সাতাত্তরে এসেও একাত্তরের রেশ শেষ হয়নি। আশরাফ ভাই যাতে ভেঙে না পড়েন এ জন্য তার সঙ্গ দিতে থাকলাম। তাছাড়া কারাগারে আশরাফ ভাই থেকে আমি সিনিয়র এ জন্য দায়িত্ব অনুভূত হল বেশী করে। তৃতীয় শ্রেণীর ক্লেদাক্ত পরিবেশ থেকে সরিয়ে তাকে হাসপাতালে থাকার ব্যবস্থা করলাম। সেখানেও তিনি বিব্রত বোধ করলেন। শেষ পর্যন্ত কারা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে নিয়ে এলাম আমার সেলে। এখানে তার জন্য আমার বিছানা ছেড়ে দিয়ে আমি নিচে থাকতাম। আমার নেতাকে সাথে পেয়ে আমার নিঃসঙ্গ সময়গুলো প্রাণবন্তু হয়ে উঠল। জেল থেকেই তিনি দুবাইয়ে ব্যারিষ্টার কোরবান আলী সাহেব ও তার স্ত্রীকে চিঠি লেখেন। তার মুখেই শুনেছি, অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের প্রতিক্রিয়াশীল মহনুভবতায় পাকিস্তানে তার এবং কোরবান সাহেব-এর সংকটের কথা। তারপর দুবাইয়ে পাড়ি জমান। সেখানে কিভাবে সংকট উত্তরণের প্রয়াস নিয়েছেন, একে একে সবকিছু তিনি খুলে বললেন।

তারপর একদিন তিনি মুক্তি পেলেন। খাঁচা থেকে বেরিয়ে মুক্তির দিগন্তে ডানা মেললেন। আমি রয়ে গেলাম সেই অন্ধ তমসায়। সেই নিবিড় তিমিরে। দিল্লী হনুজ দূরাস্ত। চল্লিশ বছর অনেক দূর।
দিনের বেলাটা কারাবাসী দ্বীনি ভাই ও অন্যান্য সংগঠন বহির্ভূত ভাইদের সাথে আলাপ আলোচনা তালিম তরবিয়ত ও খেলাধুলার মধ্যে সময় অতিবাহিত হলেও রাত্রির একান্ত একাকীত্ব মাঝেমাঝে আমাকে বিচলিত করে তোলে। অন্তহীন হাহাকারে ঘিরে ধরে আমাকে। একটা কোমল অনুভূতি পাওয়ার আকুতি আমাকে কাতর করে তোলে। অন্তহীন প্রত্যাশা নিয়ে অধীর আগ্রহে যে মহিয়সী অপেক্ষা করছেন তার জন্য আমি পাগল হয়ে উঠি। মনে হয় কারাগারের গরাদ ভেঙে আমি ছুটে যাই। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর কেটে গেল। দেখতে দেখতে ৮টি বছর আমার জীবন থেকে খসে পড়ল। ৪০ বছরের দণ্ড প্রাপ্ত তাও চুরি ডাকাতি অন্যায় অপকর্মে নয়, ভাগ্যহত জাতির ইজ্জত ও আজাদী কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র প্রতিহত করার জন্য আমাদেরই এই বুজদীল জাতির কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ধুঁকে মরছি। কাছে থেকেও আমার প্রিয়জন, একান্ত প্রিয়জন থেকে আমি কোটি যোজন দূরে। কতরাত আমি বিনিদ্র তার জন্য। মোমেনশাহী কারাগারে তাকে আমি দেখেছি, দেখেছি তার অশ্রুসজল চোখ। সেই ছবি সাজিয়ে রেখেছি হৃদয়ের একান্ত গভীরে। আমার অনুভূতি দিয়ে তাকে দেখি। রোজ দেখি। দেখি তার অশ্রুভেজা চোখ। তার স্নিগ্ধ মমতার চাওনি। তার কোমল হাতের স্পর্শ, তার আবেগ-জড়িত বাণী, আমাকে আজও বিহ্বল করে রেখেছে। তবু ইচ্ছে হয় আর একবার দেখি। আবার দেখি তাকে। মমতার মূর্ত প্রতীক সেই মহিয়সী কি আসবেনা এখানে এই কারাগারে, আমার একান্ত কাছাকাছি।

উনআশির প্রথম দিক, দিন তারিখ মনে নেই। খবর পেলাম ভিজিটিং রুমে আমার সাথে সাক্ষাতের জন্য কিছু লোক অপেক্ষা করছে। আমার ধারণা হল আমার সংগঠনের কেউ হবে হয়তো। জমাদারের কাছে নিয়ম মত একটা স্লিপ জমা দিয়ে ভিজিটিং রুমের দিকে রওয়ানা হলাম। ঢুকেই আমি চমকে উঠলাম। এক বিশীর্ণ মহিলা কাতর চোখ মেলে অধীর আগ্রহে চাতকের মত অপেক্ষা করছেন।
এই সেই মহিলা যার জন্য আমার উৎকর্ণ প্রতীক্ষা। এই মহিয়ষী মহিলাই আমার মা। মায়ের কাছে এগিয়ে গেলাম। সালাম দিয়ে জড়িয়ে ধরলাম। মা তার বিশীর্ণ হাত দিয়ে আমাকে নেড়ে চেড়ে দেখছে। মায়ের আগের সেই লাবণ্য নেই, রোগে শোকে চামড়াগুলো কুঁচকে গেছে। চোখ দুটো কোঠরাগত। মা বললেন, ‘বাবা এই বোধ হয় শেষ দেখা। আর দেখা হবে না।’

মার শরীর উত্তপ্ত। কথা বলতে পারছেন না, কাঁপছেন। মাকে বললাম- ‘মাগো, তুমি আমার জন্য দোয়া করো। একমাত্র তোমার দোয়া আমাকে জুলুম-মুক্ত করতে পারবে। মা, দুনিয়ার যে যাই বলুক তোমাকে আবার জানাচ্ছি, আমি অন্যায় করিনি। কোন অপকর্মে জড়িত ছিলাম না, তুমি অন্তত বিশ্বাস করো। দোয়া করো ভবিষ্যতেও যেন আল্লাহর পথে থাকতে পারি।’ মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। মাকে আমি বিরক্ত করতে চাইলাম না। যত দেরী হবে কষ্ট  বাড়বে তার। আমার দেখার বড় সাধ ছিল। প্রাণ ভরে দেখে নিলাম। মার সাথে ছিল আমার খালাত ভাই আবদুল লতিফ, খন্দকার বজলুর রহমান, মামাত ভাই আবদুর রহমান দুটো বোন, ও ভাগ্নেরা। সবার সাথে সংক্ষিপ্ত আলাপ করে মার চিকিৎসা ভালভাবে করার জন্য উপদেশ দিলাম আর বললাম একটা ছবি তুলে নেয়ার জন্য। আমার মনে হল এ দেখাই শেষ দেখা। মাকে আর আমি পাব না।

মাকে পেয়ে যেমন আমি আনন্দিত হয়েছি। তার জীর্ণ শীর্ণ শারীরিক অবস্থা দেখে ততোধিক পেয়েছি কষ্ট। তবে কুদরতের ফায়সলা যা হবার তাই হবে; সেখানে আমাদের কোন হাত নেই, করণীয়ও কিছু নেই। ভাবনা দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করলাম।

তারপর তিন মাস পেরিয়ে গেছে। উনআশির ২৬ সেপ্টেম্বর শুক্রবার শেষ রাত্রে আমি দেখলাম দুঃস্বপ্ন। মা যেন মারা যাচ্ছেন। শ্বাসকষ্ট আর মৃত্যু যন্ত্রণায় অস্থির, কোন কথা বলতে পারছেন না। আমি দেখছি ভয়ঙ্কর কষ্ট আমারও। কান্নায় ভেঙে পড়ছি নিঃশ্বাস আমার বন্ধ হয়ে আসছে। হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেল। কিন্তু অস্থিরতা কমল না। উঠে পায়চারী করলাম। অযু করে নামাজ পড়লাম আর দোয়া করলাম মায়ের জন্য।

এরপর কয়েক দিন পর চাচা খন্দকার ইসমাঈল এলেন আমার সাথে দেখা করার জন্য। অনেক কিছু আলাপ করলেন। চাচা তার আলাপ আলোচনায় ভিন্ন কিছু হয়তো বা বলতে চেয়েছেন, কিন্তু আমি বুঝিনি অথবা বুঝার চেষ্টা করিনি। আরও কয়েকদিন পর সংগঠনের কয়েকজন এলেন। এর মধ্যে ছিলেন জামায়াতের আব্দুল খালেক মজুমদার ভাই, কামরুজ্জামান ভাই, আজহারুল ইসলাম ভাই শিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবু তাহের ভাই, ছাত্র নেতা এনামুল হক ভাই, মোঃ ফারুক ও মালেক ভাইসহ ১০ জনের মত। এতজন এক সাথে তারা কোন দিনেও সাক্ষাতের জন্য আসেননি। সকলকে এক সাথে দেখে সালাম বিনিময়ের পর আমি বললাম- ‘আপনারা কেন এসেছেন আমি জানি। আমার মা মারা গেছেন তাই না? দিনটা ছিল শুক্রবার, যেদিন শেষ রাতে স্বপ্ন দেখি।’ তারা অবাক হলেন, আমাকে অনেক সান্ত্বনা দিলেন।

মায়ের সাথে সাক্ষাতের পরই বুঝেছিলাম মা আর বাঁচবেন না। সেদিন থেকে মাকে হারানোর মত বিরাট একটা আঘাত সহ্য করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। মা নেই। এ বিরাট পৃথিবীতে আমার শেষ আশ্রয়টুকুও ব্যথার প্লাবনে ভেসে গেল। এখন আমি একা। নিতান্ত একা আমি। এই বেশ হল। পিছুটান আর রইল না। বিপ্লবীদের পিছুটান না থাকা ভাল।

প্রত্যেক দিন ফজরের নামাজের পর নিয়মিত ব্যায়াম করার সময় দেখতাম লুঙ্গী আর পাঞ্জাবী পড়া একটা লোক মন্থর গতিতে একাকী ইতস্তত হাঁটছেন। সকালের হাওয়া গায় লাগানো হয়তো তার অভ্যাস। পরিচয় জেনেছিলাম- তিনি কমিউনিস্ট পার্টির জাঁদরেল নেতা কমরেড ফরহাদ। তার সাথে আলাপ আলোচনার ইচ্ছে আমার কম ছিল এমনটি নয়। তবে চিন্তা-চেতনা ও কর্ম পদ্ধতির ক্ষেত্রে যেহেতু আমরা বিপরীত বলয়ে অবস্থান করছি সে কারণে কিভাবে তার সাথে আলাপ আলোনার সূত্রপাত করব এ নিয়ে কয়েকদিন ধরে ভাবছিলাম!

সেদিন যখন ব্যায়াম সেরে শরীরটা ম্যাসেজ করছি তখন পাঞ্জাবী ও একটা দামী লুঙ্গীপড়া সেই ভদ্রলোক আমার কাছে এসে নিজেই প্রথমে কথা পাড়লেন। বললেন- ‘আমাকে এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পারবেন।’ আমি তক্ষুণি ফালতুকে বললাম এক গ্লাস পানি দিতে। পানি খাওয়ার পর জিজ্ঞেস করলেন- ‘আপনি কি বাইরেও ব্যায়াম করতেন?’ বললাম- ‘জ্বি করতাম। তাছাড়া আমি স্পোর্টসের সাথে জড়িত ছিলাম। এখানে একটু বেশী করার কারণ, অন্য কোন কাজও নেই। অতিরিক্ত ব্যায়াম করে শরীরের চাহিদা পুষিয়ে নিচ্ছি। তা না হলে ৪০ বছরের কারাবাসে এমনিতেই শরীর নেতিয়ে পড়বে।’ এরপর থেকে তার সাথে আমার সখ্যতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সবচেয়ে বড় কথা-দুটো বিপরীতমুখী অবস্থানে থেকেও কারাগারের নিঃসঙ্গতায় আমাকে তিনি কথাবার্তা বলার ও আলাপ আলোচনার সাথী হিসেবে পাবার ফলে তিনি আমার সাথে কথা বলতে ভালোবাসতেন। অথবা এও হতে পারে তার চিন্তা-চেতনা আমাকে প্রবাহিত করার জন্য আমাকে টার্গেট করেছেন।

তার সাথে আমার সব রকম আলাপ আলোচনার দ্বার খুলে গেল। প্রত্যেক দিন তার সাথে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে আলাপ হত। তার সাথে মতান্তর, মত-বিরোধ হয়েছে। কিন্তু সম্পর্কের অবনতি ঘটেনি কখনও। আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি দুঃখ করে বলেন- ‘আমরা এ জাতিটার কাছে কুয়াশাচ্ছন্ন রয়ে গেলাম। আমরা ইসলাম বিরোধী, আমরা ধর্মদ্রোহী এমন একটা ধারণা মানুষের মধ্যে বদ্ধমূল রয়েছে। সে বিভ্রান্তি উপড়ে ফেলা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। অথচ আমরা শোষণ বঞ্চনার অবসানের জন্য সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক প্রোগ্রামের কথা বলে থাকি, যা ইসলামেরও লক্ষ্য।’

আমি বললাম- ‘আপনাদের অর্থনৈতিক প্রসঙ্গটাকে বাদ দিয়ে যদি শুরু থেকে আজ পর্যন্ত আপনাদের কার্যক্রম নিয়ে বিতর্ক না করে নিজেরাই বিশ্লেষণ করেন তাহলে এটা কি সুস্পষ্ট হয়ে উঠবেনা যে, আপনারা আপনাদের কর্মীদের ভেতরে ইসলামী চিন্তা-চেতনার বিলোপ ঘটাতে চেয়েছেন? যাদের চিন্তাধারা আপনাদের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ভিত্তি সেই মার্ক্স, সেই লেনিন, যারা ধর্মকে আফিম বলেছেন, খোদার অস্তিত্ব মুছে ফেলার কথা বলেছেন। এ ছাড়াও যে সমাজতন্ত্রী রাষ্ট্রের মদদ নিয়ে ময়দানে নেমেছেন, তাদের হাত কোটি কোটি মুসলমানদের রক্তাক্ত করেছে। তাদের আগ্রাসী ভূমিকা মধ্য এশিয়ার ৬টি মুসলিম রাষ্ট্রকে শুধুমাত্র দখলে রেখেছে এমন নয়, তাদের ইতিহাস ঐতিহ্য সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে নির্মূল করে দিয়েছে। এর ফলে যাদের মধ্যে একটুখানি ইসলামী চেতনা রয়েছে তারা কি করে আপনাদের সেই পুরানো ফাঁদে পা রাখবে?

তিনি একটু চুপ থেকে বললেন- ‘এদেশের ইসলামপন্থীরা যেভাবে সমাজতন্ত্রকে আক্রমণ করে, যেভাবে সমাজতন্ত্রী দেশসমূহের সমালোচনা করে, সেভাবে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ও পুঁজিবাদের সমালোচনায় মুখর নয়। এ থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে না কি, ইসলামপন্থীরা শোষণের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে?’

বললাম- ‘মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের সমালোচনা করেনা এমনটি নয়। তবে হ্যাঁ, দাঁড়ি-পাল্লায় ওজন করলে আপনাদের দিকটা বেশী হবে। পুঁজিবাদ যে দেউলিয়া এটা অনেক আগে প্রমাণ হয়ে গেছে। অর্বাচীনের মত একটা মৃত লাশকে টানা-হেঁচড়া করে সময়ের অপচয় হয়তো তারা করতে চান না। তাছাড়া ধরুন, আপনার বাড়ীতে আগুন লেগে বেড়ার আগুনে মশারীও জ্বলছে, আপনি দেখছেন স্পষ্ট। আগুন আপনার কি ক্ষতি করতে পারে এটুকু বলার কি প্রয়োজন আছে? পুঁজিবাদের আঁচ প্রত্যেকের গায়ে লেগেছে আমরা সবাই জ্বলছি। কিন্তু আগুন নেভাতে সমাজতন্ত্র যে ভয়াবহ তুষারপাত ঘটাতে চাচ্ছে, সেখানেই বেঁধেছে গোল। পুঁজিবাদের আগুনে জ্বলে পুরে চিৎকার আহাজারি করার সুযোগ থাকলেও সমাজতন্ত্রের তুষারপাতে গোটা জাতি হিম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বেশী। অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, পুঁজিবাদের আলোচনা সমালোচনা করা এমনকি পুঁজিবাদকে উৎখাত করার পথ খোলা আছে। কিন্তু সমাজতন্ত্রের অক্টোপাশে কোন জাতি আবদ্ধ হলে তা থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার কোন পথ নেই। সমাজতন্ত্রের সস্তা শ্লোগানে সাধারণ মানুষের বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী রয়েছে বলে সমাজতন্ত্রের ভয়ঙ্কর দিকগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরাকে ইসলামপন্থীরা তাদের দ্বীনি দায়িত্ব বলে মনে করেন।’

ফরহাদ সাহেব তখন বলেন- ‘আমাদের কর্মীরা যেভাবে শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সোচ্চার, যেভাবে জনগণের দুঃখ-দুর্দশার সাথে একাকার হয়ে কাজ করছে, আপনি বলুন ইসলামপন্থীদের কাউকে কি আপনি তেমনভাবে দেখছেন?’

আমি বললাম- ‘সব দলের কার্যক্রম ও স্ট্রাটেজী এক রকম হয় না। ইসলামপন্থীরা নৈতিক দিকটার প্রতি যেমন গুরুত্ব দেয় আপনাদের তেমন প্রয়োজন হয় না। ইসলামপন্থীরা মনে করে কোন বৃহত্তর পরিবর্তন আনতে হলে, নৈতিক চরিত্রের আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। তারা তাদের বিশাল কর্মী বাহিনীকে নৈতিক দিক দিয়ে বলিষ্ঠভাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। তারা যখন গণমুখী পরিকল্পনা নিয়ে ময়দানে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখনই তাদের ওপর এসেছে প্রচণ্ড আঘাত। রুশ-ভারত এমনকি আমেরিকা এদেরকে সম্মিলিতভাবে উৎখাত করার চেষ্টা করেছে। তা ছাড়া ১৪শ বছরের বংশ পরস্পরায় পেয়ে আসা পুঞ্জীভূত ধ্যান-ধারণা আর বস্তুবাদের সৃষ্ট সন্দেহবাদ ব্যক্তি-চেতনা থেকে নির্মূল করা চাট্টিখানি কথা নয়। এটা করতে ইসলামপন্থীদের দিনের পর দিন নিরলস পরিশ্রম করতে হয়েছে। ষাটের দশক থেকে আমরা দেখে আসছি মত ও পথের বৈপরীত্য থাকা সত্ত্বেও যে একটি ব্যাপারে আপনারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছেন তা হল- ইসলামপন্থীদের উৎখাত করতে হবে।’

ফরহাদ সাহেব বললেন- ‘আপনি তো এ ব্যাপারে একমত যে, প্রচলিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থা এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় কার্যক্রম জনকল্যাণের চাইতে গণ-বিরোধী অবদান রেখেছে বেশী।’

বললাম- ‘জ্বি হাঁ, সম্পূর্ণ একমত। আমাকে ভুল বুঝবেন না। আপনার বিরোধিতা আমি করছি না। এই ভাগ্যহত বিপর্যস্ত জাতির জন্য আপনাদের যে অনুভূতি ও বেদনাবোধ রয়েছে আমাদেরও একই অনুভূতি বিদ্যমান। পার্থক্য আমরা সমস্যার গভীরে আঘাত হানতে চাই, আর আপনারা সেখানে মলমের প্রলেপ দিতে চান।’

ফরহাদ ভাই হেসে ফেললেন। বললেন- ‘আপনি ধরেছেন ঠিক কিন্তু বললেন উল্টোটা। আসলে আমাদেরটা রেভ্যুলিউশন আপনাদেরটা এভ্যুলিউশন।’

বললাম- ‘না মোটেও উল্টো বলিনি। ধরুন একটা রিক্সাওয়ালা আপনাদের ভাষায় বঞ্চিত শ্রেণী অর্থাৎ প্রলেতারিয়েত শ্রেণী। তার ব্যক্তিমানসে বুর্জোয়া চিন্তা- চেতনা কি নেই? আছে। আর আছে বলেই ৫ টাকার ভাড়া বাগে পেলে ১০ টাকা আদায় করে। কর্মের কর্তৃত্ব যদি তার হাতে আসে তাহলে শোষণ থেকে সমাজকে কি বাঁচাতে পারবেন? স্বার্থপরতা সহজাত, জন্ম থেকে মানুষ সেটা অর্জন করেছে। এই ব্যক্তির সংকীর্ণ স্বার্থকে নির্মূল করতে হলে তার জন্য আর এক স্বার্থের জোগান দিতে হবে। শুধু পরার্থপরতা ও জাতীয় স্বার্থের দোহাই দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থের মূলে আঘাত হানা সম্ভব নয় কিছুতেই। একটা ব্যক্তি আবেগতাড়িত হয়ে দেশ, জাতি অথবা সামগ্রিক স্বার্থে জীবন দিতে পারে। কিন্তু সে লোক সামগ্রিক স্বার্থে লোক চক্ষুর আড়ালে কৃচ্ছ-সাধনায় নিমগ্ন হতে পারবে না। এ ব্যাপারে ইসলাম একটি বৈপ্ললিক ভূমিকা রাখতে পেরেছে। ধরুন, একটি লোক নিজের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। তবু দুনিয়ার মানুষ তাকে দেখেছে অবজ্ঞার চোখে। স্বার্থবাদী জৌলুসের সামনে তার ত্যাগ-তিতিক্ষা ম্লান হয়ে যাচ্ছে। আল্লাহ বলছেন- ‘আমি নিজ হাতে তার পুরস্কার দেব।’ এই আশ্বাসই তার প্রেরণাকে উজ্জীবিত করে রাখতে পারে। ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখুন। বিরাট হস্তীবাহিনী এবং লাখ লাখ সৈন্য নিয়ে আবরাহা বাহিনীর সৈনিকদের যুদ্ধ করতে বাধ্য করার জন্য পরস্পরকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়েছিল, যাতে কেউ পালাতে না পারে। অপর পক্ষে ৩০ হাজার পদাতিক সৈন্য, যারা নিয়মিত সৈনিক নয়, যাদের রণ-সম্ভার, খাদ্য সম্ভারের প্রাচুর্যও ছিল না, তাদের শিবিরে কে আগে শহীদ হবে তার প্রতিযোগিতা চলছে। এটা সম্ভব হয়েছিল ব্যক্তি মানসে বৈপ্লবিক চিন্তার সমাবেশ ঘটিয়ে। আর ও বিপ্লব এসেছিল তওহীদবাদ থেকে।

আমি আরও বললাম- ‘আপনার প্রজ্ঞা ও ধীশক্তির মোকাবিলায় আমি অতি তুচ্ছ। থিউরি আর থিসিসের পাঁকে ফেলে আমাকে পরাজিত করার যথেষ্ট যোগ্যতা আপনার আছে। আমার শ্রদ্ধেয় ভাই হিসেবে আপনার প্রতি অনুরোধ মানুষের কাছে ধার করার আগে আপনার বাক্স হাতিয়ে দেখুন যে কি পরিমাণ সম্পদ আপনার রয়েছে।’

ফরহাদ ভাইয়ের সাথে আমার আলোচনা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে হতো। তিনি কান পেতে আমার কথাগুলো শুনতেন। আমি আলবদরের দায়িত্বশীল ছিলাম জেনেও, তথাকথিত স্বাধীনতা বিরোধী এবং ৪০ বছর কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামী জেনেও আমার প্রতি তার স্নেহ-মমতার কোন ঘাটতি দেখিনি। তার সাহচর্য আমার যেমন ভাল লাগত আমার সাহচর্য তিনিও তেমনি কামনা করতেন। তাকে আমি মওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর তাফসীর দিয়েছি। তিনি পড়েছেন। দিয়েছি আরও অন্যান্য ইসলামী বই। তিনি ফিরিয়ে দেননি, পড়েছেন। তার মন-মানসিকতায় একটা ঝড় বইছে সেটা স্পষ্ট বুঝা যেত।

একদিন ফরহাদ ভাই দুপুর বেলায় আমার প্রিজন কেবিনে এলেন। হঠাৎ তার আগমনে বিস্মিত হলাম। তিনি নিজেই বললেন- ‘আপনাকে একটা সুখবর দিতে এসেছি। খবরটা একটু আগে পেলাম। আপনার ভাবী জানিয়ে গেলেন আমার মুক্তির আয়োজন হয়ে গেছে, আজকেই সম্ভবতঃ কাগজ এসে পৌঁছে যাবে। এখন পর্যন্ত কাউকে এমনকি আমার সংগঠনেরও কাউকে আমি জানাইনি, খবরটা আপনাকেই প্রথম দিলাম।’ বিকেলে আমাকে চা খাওয়ার দাওয়াত দিয়ে চলে গেলেন। তার প্রিজনস কেবিনে।

আমার কারাগারের সঙ্গী ও সহযোগী সাবেক এনএসএস নেতা সৈয়দ নেসার নোমানী বাইরের মুক্ত আলো বাতাসের স্পর্শ পেয়েও আমার কথা ভুলেননি। আমার মুক্তির জন্য এই একটি মাত্র ব্যক্তি যার চোখে ঘুম ছিল না। এমপি থেকে মন্ত্রী পর্যন্ত সবার দুয়ারে দুয়ারে ঘুরে আমার জন্য আবেদন রেখেছেন। নোমানী ভাই প্রায়ই কারাগারে এসে আমার সাথে দেখা করতেন। আমার ব্যাপারে কতটুকু এগিয়েছেন জানিয়ে যেতেন। অগ্রগতি তেমন করতে না পারলেও তিনি আশাবাদী। তার প্রবল আত্মবিশ্বাস ছিল। তিনি প্রায় বলতেন- ‘আমি আপনাকে মুক্ত করবই।’
সেদিন নোমানী ভাইকে আমি বললাম- ‘মন্ত্রীদের সাথে আপনার বেশ যোগাযোগ রয়েছে। আপনাকে একটা কাজ করতে হবে।’
নোমানী ভাই বললেন-‘যে কোন কাজ, তা যদি আপনার হয়, সাধ্যে কুলোলে আমি অবশ্যই সেটা করব।’

বললাম- ‘ডিআইজি, অব প্রিজন্স ভূইয়া সাহেবকে তো আপনি জানেন। আমাদের জন্য কিনা করেছেন। সম্ভব হলে তার জন্য আমাদের কিছু করা উচিত। বেচারা ভারী সংকটে আছেন। আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনসমূহের কর্মীরা কারাগারে তার বিরুদ্ধে একটা আন্দোলন গড়ে তুলতে চাইছে। কারাগারে এখন বস্ত্রের দারুণ সংকট। ডিআইজি সাহেব অনেক চেষ্টা করেও ম্যানেজ করতে পারছেন না। আপনি বস্ত্রমন্ত্রী আলীম সাহেবের সাথে যোগাযোগ করে এ ব্যাপারে একটা ব্যবস্থা করতে পারেন।’

নোমানী ভাই আমাকে বললেন- ‘আমি তো সরাসরি এ ব্যাপারে কিছু বলতে পারব না। তবে ডিআইজি সাহেবের সাথে মন্ত্রীর সরাসরি সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেব।’

নোমানী ভাই তার কথা রেখেছিলেন। ডিআইজি সাহেবের সাথে আলীম সাহেবের সাক্ষাৎ হয় এবং সমস্যার আংশিক সমাধানও হয়েছিল। সাক্ষাতের পর ডিআইজি সাহেব আমাকে এসে বলেছিলেন- ‘আলীম সাহেব আপনার কথা বলেছিলেন। কোন রকম নিরাশ হতে নিষেধ করেছেন।’ আলীম সাহেবের উক্তিগুলো পুনরাবৃত্তি করে বলেন- ‘আমরা আমিনদের ভুলিনি। তাদের বের করে আনা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। মন্ত্রীত্ব আমরা পেয়েছি ঠিকই কিন্তু ক্ষমতা এখনও নাগালের বাইরে। এখনও অনেক কিছু আমরা করতে পারছি না। যাই হোক, একদিন আমরা আমিনদের কারাগার থেকে বের করে আনবই।’

পঁচাত্তরের আগস্ট বিপ্লবের পর প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক একাত্তরের দালাল আইন ও তৎসংশ্লিষ্ট আইনসমূহকে কালাকানুন বলে ঘোষণা দিলেও একটা বছর পেরিয়ে গেল অথচ তখনও সেসব আইনের আওতায় কারাগারে রয়েছে হাজার হাজার মানুষ। বাইরেও এ নিয়ে কোন আন্দোলন গড়ে উঠছে না। এ ব্যাপারটা সংগঠনকে জানিয়েছি বহুবার। ছবরের নসিহত ছাড়া অন্য কোন জবাব তাদের কাছ থেকে পাইনি। কারাগারে আমিসহ হাজার হাজার মানুষের দুঃসহ দুর্দশা বাইরের মুক্ত আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে আঁচ করতে পারবে না। আমাদের নাভিশ্বাস উঠেছে। আমরা মরিয়া হয়ে উঠছি। নাড়া দিতে চেয়েছি মানবতাবাদী সংবেদনশীল মানুষগুলোর অন্তর। অনশন ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। কারা কর্তৃপক্ষকে পনের দিন আগে জানিয়ে দিয়েছি আমাদের দাবী, আমাদের সিদ্ধান্ত। আমাদের এ সিদ্ধান্তের কথা সংগঠনকেও জানিয়ে দেয়া হয়েছে। সংগঠন এ ব্যাপারে তাদের কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল না।

নির্দিষ্ট দিন সমাগত। কর্তৃপক্ষ আমাদের দাবীর জবাব না দিয়ে অনশন থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করলেন যথেষ্ট। কিন্তু আমরা আমাদের সিদ্ধান্তে অনড়। নির্দিষ্ট দিনে আমাদের পরিকল্পনা মত কালাকানুনের আওতাভুক্ত শত শত মানুষ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অনশন শুরু করল।

আগের দিন রাত্রে লোক মারফত জামায়াতে ইসলামীর সদর দফতরে এবং মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দকে এ কথা জানিয়ে দেয়া হয়েছিল। অনশন শুরু হলেও তাদের কোন প্রতিক্রিয়া অথবা অন্য কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। একটি দিন গেল, দু’দিন গেল, তা সত্ত্বেও পত্র-পত্রিকায় কোন খবর প্রকাশিত হলো না। সমমনা রাজনৈতিক সংগঠন অথবা মানবাধিকার সংস্থাকে উচ্চকিত হতে দেখলাম না। বুঝলাম, আমাদের সংগঠন একটা কমপ্লেক্সে ভুগছে। তারা কারো সাথে যোগাযোগ রক্ষা করেনি এমনকি পত্র-পত্রিকা ও প্রচার মাধ্যমসমূহের সাথে যোগাযোগের ব্যাপারে কোন গুরুত্ব দেয়নি। দুঃখ হল তাদের সংবেদনশীলতা ও সমমর্মিতার অভাব দেখে, তাদের অমানবিক দৃষ্টিভঙ্গী ক্ষমার অযোগ্য মনে হলো। রাজনীতিকদের তথাকথিত অণশনের ভনিতা নয়, দুদিনের সত্যিকার অনশনে আমাদের সবাই নেতিয়ে পড়ল। নেতিয়ে পড়লাম আমি নিজেও। অনশন তবু চলছে। একে একে আমিসহ নেতিয়ে পড়া ধর্মঘটীদের নেয়া হলো হাসপাতালে। সেখানে স্যালাইন দিয়ে তাজা করার জন্য ডাক্তার তার প্রয়াস অব্যাহত রাখলেন। কারা কর্তৃপক্ষ আমার সাথে যোগাযোগ করে অনশন থেকে বিরত হওয়ার কথা বললেন। এবং ওয়াদা করলেন এ ব্যাপারে সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের মাধ্যমে সমস্যার সুরাহা করার উদ্যোগ নিবেন। আরও একদিন পেরিয়ে গেল। বারবার কারা কর্তৃপক্ষের সমবেদনামূলক আবেদন ও ওয়াদার প্রেক্ষিতে তাদেরকে একমাস আরও সময় দিয়ে অনশন ভঙ্গ করলাম।

এরপর সংগঠনের প্রতি আমার বিরূপ ধারণা জন্মে। আমার ভয়ঙ্কর মানসিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সংগঠনের প্রধান অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবকে চিঠি লিখি। তাকে আমি এতকাল মনে করতাম- আত্মার আত্মীয়। আমাদের এই সংকটে তার এবং সংগঠনের স্থবির দৃষ্টিভঙ্গী আমাকে মর্মাহত করে। আমার চিঠির প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে তিনি তার জবাব ও তার সাথে একটি ফতোয়া কারাগারে আমার কাছে পাঠিয়ে দেন। নিচে তার অনুলিপি উদ্ধৃত হলো।

২৭ সফর, ১৪০০ হিঃ
১৭ জানুয়ারী, ১৯৮০

স্নেহের আমিন,
ওয়ালাইকুম সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। কারাগার থেকে তোমার ১৯ মোহররম তারিখে লেখা চিঠি যথাসময়ে পেয়েছি।
দীর্ঘদিন বদ্ধ আবহাওয়ায় জীবন কাটানোর যন্ত্রণা যে কত বেশী তা সহজে অনুমেয়। যুগে যুগে হকপন্থীরা বাতিলের হাতে এমনি করে নির্যাতিত হয়েছেন। বাতিল তার সকল শক্তি দিয়ে হককে স্তব্ধ করে দেয়ার অপচেষ্টা চালিয়েছে। পরিশেষে বাতিল পরাভূত হয়েছে, হক বিজয়ী হয়েছে। তোমরা যে মহান দ্বীনের খাতিরে দীর্ঘদিন যাবৎ কারা ভোগ করছো তা বৃথা যাবে না ইনশাআল্লাহ।
তোমরা অনশন পালনের ব্যাপারে যে পরামর্শ চেয়েছ সে সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করে দেখেছি- যেহেতু ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাই এ বিষয়ে শরীয়তী ফায়সালা জানার প্রয়োজন বোধ করে আমাদের দ্বীনি সাথীদের কতিপয় হক্কানী আলেমের সাথে পরামর্শ করেছি। তাদের মতামত এই চিঠির সাথে সংযুক্ত হলো। আশা করি এটিকে দ্বীনি ফায়সালা মনে করে তোমরা সিদ্ধান্ত নেবে।
আইনগত পথে চেষ্টা এখনও যেহেতু শেষ হয়নি- তাই এখনি কোন চরমপন্থার কথা চিন্তা করা ঠিক হবে না। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করে ছবর অবলম্বন করো। দেখা যাক আইনগত পন্থায় চেষ্টা করে কিছু করা যায় কিনা। আমি আশা করছি আল্লাহ অবশ্যই একটা ভাল ফায়সালা করবেন। আমার ব্যাপারে সরকারি মনোভাব পূর্ববৎ রয়েছে বলে তোমাদের জন্য জোড়ালো কোন বক্তব্য রাখা বা চেষ্টা করার পথে অসুবিধা যথেষ্ট। বিভিন্নভাবে যে চেষ্টা চলছে আশা করি তা ফলপ্রসূ হবে এবং আল্লাহ মুক্তভাবে তার দ্বীনের খেদমত করার সুযোগ তোমাদের দেবেন।
তোমার সাথীদের নিকট আমার সালাম।
তোমাদের হিতাকাঙ্খী

গোলাম আযম

আল জওয়াব

“যে কোন বিপদ আপদ বা সংকটে পড়ে মৃত্যু কামনা করা কিংবা এমন কোন পথ ও পন্থা অবলম্বন করা, যার ফলে মৃত্যুবরণ করতে হতে পারে তেমন কাজ করা শরীয়তে হারাম। তাই দালাল আইনে সাজা প্রাপ্তির প্রতিবাদে ঊর্ধ্বতন আদালতে আপীল করার সুযোগ গ্রহণ করা উচিত। এখন যদি আপীলের সুযোগ না থাকে তবে দালাল আইন বাতিল করার প্রেক্ষিতে উক্ত আইনে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদীদের বিনাশর্তে মুক্তি দানের জন্য এবং উক্ত আইনের ভিত্তিতে দায়েরকৃত যাবতীয় মামলা বাতিল করার দাবীতে গণআন্দোলন করাই উত্তম পন্থা। এজন্য আমরণ অনশন শুরু করা জায়েয হবে না।”


কিন্তু প্রশ্ন হলো, অনশন শুরু করার পনের দিন আগে জানানো সত্ত্বেও সংগঠনের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা অনশন শুরু হবার আগে কেন আমার কাছে পৌঁছল না? কোথায় কিভাবে এটা ফাইলবন্দি হয়ে থাকল? ক্ষমতাসীন হলে জাতীয় সমস্যাগুলো কি এমনিভাবে ফাইলবন্দি হয়ে বিলাপ করবে? জামায়াতের আনুষ্ঠানিকতা জামায়াতকে প্রগতির পথ থেকে সরিয়ে স্থবিরতার আবর্তে নিক্ষেপ করছে। একাত্তরের বিপর্যয়ের পরেও সংগঠনের এমন জড়তা বৈপ্লবিক চেতনাসম্পন্ন মানুষকে বিব্রত করছে। সংগঠনের হাত পা কোথায় যেন শিকল দিয়ে বাঁধা।

কোন ব্যাপারে সতর্ক পদক্ষেপ নেয়া ভাল। কিন্তু এর অর্থ এ নয় যে একটা বাড়ীতে আগুন লেগেছে সেটা নেভানোর ব্যবস্থা না করে মজলিশে শূরার অপেক্ষা করতে হবে। কোনদিক থেকে কিভাবে আগুন এল? কারা আগুন লাগাল? এর অর্ন্তনিহিত তাৎপর্য কি? এ আগুন নেভানোর ফজিলত কি? এসব নিয়ে গবেষণা করে সময়ের অপচয় করা একটা গতিশীল সংগঠনের জন্য কতখানি সঙ্গত আমার জানা নেই। অথচ জামায়াত বিধিবদ্ধ নিয়মে এমনটি করে থাকে। ওদিকে আগুনে জ্বলে পুড়ে সব শেষ।

আমার মধ্যে ছোট বেলা থেকেই বিরাজ করছিল অনুসন্ধিৎসা। আর এ কারণেই স্বাভাবিক নিয়মে আমার মধ্যে উত্তম পাঠাভ্যাস গড়ে ওঠে। আমি মনে করতাম স্কুল কলেজে ছকবাঁধা নিয়মের পাঠ থেকে মানুষ ডিগ্রীধারী হতে পারে ঠিকই কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানী হতে পারে না। নিয়মনীতির বাইরে থেকে বিশেষ পাঠাভ্যাসের দ্বারা জ্ঞানের বিচিত্র ভাণ্ডার থেকে এবং জ্ঞানী মহাজ্ঞানীদের অভিজ্ঞতার সমাহার বই পুস্তক থেকে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। এ বিশ্বাসের প্রাধান্য আমার মধ্যে অত্যন্ত বেশী থাকার জন্য ডিগ্রী নেয়ার ব্যাপারে আমার তেমন আগ্রহ ছিল না। তবে বই পড়তাম প্রচুর। বই পড়ার ব্যাপারে আমার তেমন বাছ বিচার ছিল না। ইসলামের বিভিন্ন দিকের ওপর ভাল লেখকের কোন বই পেলে অবশ্যই সেটা পড়তাম। কারাগারের লাইব্রেরিতে সময় কাটাতে আমার ভাল লাগত।

কারাগার থেকে পরীক্ষা দেয়ার জন্য আমার তেমন ইচ্ছে ছিল না। জীবনের প্রয়োজনে ডিগ্রীর গুরুত্ব থাকলেও কোনদিন সেটা আমার কোন কাজে লাগবে বলে মনে করতাম না। চল্লিশ বছর কারাগারে কাটিয়ে মুক্তাঙ্গনে এসে ডিগ্রী আমার কোন প্রয়োজনে আসবে না সেটা আমি ভাল করেই জানতাম। এর চেয়ে ভাল নিত্য নতুন বই পুঁথির পাতায় পাতায় চোখ বুলিয়ে জ্ঞানের অদম্য পিপাসা নিবারণ করা।

ডিগ্রী পরীক্ষার ৬ মাস বাকী। পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য আমার চাচা খন্দকার এম ইসমাঈল, ভাই ডাক্তার এবি সিদ্দিক (পূর্ব রায়পুরা) এবং আমার  শুভাকাক্সক্ষীরা দারুণভাবে চাপ দিলেন। আমি এ ব্যাপারে উৎসাহী না হলেও তাদের চাপের মুখে রাজী হলাম। এ ব্যাপারে কারাসঙ্গীদের মধ্যে সবচাইতে বেশী সহযোগিতা দিয়েছেন হাফিজ ভাই (চাঁদপুর), শামসুল আলম, আনিসুজ্জামান (হাটু ভাঙ্গা)। বাইরে থেকে সবচাইতে বেশী সহযোগীতা দিয়েছেন আজিমপুরের মুহম্মদ ফারুক এবং মালেক ভাই। এই দু’জনই আমার অন্তহীন অন্ধকারে আলোর দুটো বিন্দু। এই দুটো বিন্দুর প্রত্যাশায় প্রতিটি মুহূর্ত তৃষ্ণার্ত হয়ে কাটাতাম। এরাই ছিলেন বাইরের জগত এবং সংগঠনের সাথে আমার সার্বক্ষণিক যোগাযোগের সূত্র। এরা বয়সে আমার ছোট হলেও আমার ওপর সদিচ্ছাই চাপিয়ে দিয়েছেন অনেক ঋণের বোঝা যা কোনদিন কোনভাবে আমি পরিশোধ করতে পারব না। আমার এবং আমার মত অনেকের ভাবনা মাথায় নিয়ে তারা দু’জন ডিগ্রী নিতে পারেননি। লেখাপড়ায় তাদের সফল অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়েছে। সুকান্তর ভাষায়, তারা যেন সেই বাতিওয়ালা, প্রতিদিন পথে পথে যে দীপ জ্বেলে ফেরে। অথচ তার ঘরে জমাট বেঁধে থাকে দুঃসহ অন্ধকার।

যথাসময় পরীক্ষা দিলাম। আমার অনীহার কারণে প্রস্তুতি তেমন হয়নি। শুধু কিছু মানুষের কথা রাখার জন্য পরীক্ষা দিলাম। কারাগার থেকে আমরা প্রায় ৭০/৮০ জন পরীক্ষা দিলাম। যথানিয়মে পরীক্ষার রেজাল্টও বেরুল। পরীক্ষার্থীদের মধ্যে সর্বমোট পাশ করল ৫ জন। সৌভাগ্যক্রমে এই পাঁচজনের একজন আমিও। যা চাইনি, সেটা সীমাহীন অবহেলার মধ্যেও আমার হাতের মুঠোয় এসে গেল। অথচ যেজন্য আমার সাধনা, আমার অব্যাহত সংগ্রাম, আমার অন্তহীন কোরবানী, সেটা আজও রয়ে গেল আমার নাগালের বাইরে। এসব দেখে নজরুলের সেই গানের কলি বার বার মনে পড়ে : ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।’ সবই যেন তার ইচ্ছা। সংগ্রামে সাফল্য আর ব্যর্থতার মালিক আল্লাহ। আমাদের কাজ শুধুমাত্র তার নির্দেশের আনুগত্য করা।

একান্ত আপনজন আমার মা-এর ইন্তেকাল আমাকে দারুণভাবে আহত করে। যদিও জানি সবই আল্লাহর ইচ্ছা তবু অসহায়ত্বের অন্ধকার আমাকে গ্রাস করছিল। এতদিন মনে হত আমার সব আছে। আমার জন্য মা ভিটে-মাটি সহায়-সম্বল সবকিছু আগলে অপেক্ষা করছেন। আমার একাকীত্বের চাপ শরীরের ওপরও পড়তে থাকে। এ ছাড়াও একে একে কারাগারের সাথীরা বিদায়ের ফলে সবকিছু ভুলে থাকার বিকল্প পথগুলো রুদ্ধ হতে থাকে। ওদিকে কারাগারে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগীরা সংঘবদ্ধ হয়ে আমার ওপর ও আমার কিছু সহযোগীর ওপর তাদের পুরানো মারমুখো ফ্যাসিস্ট কায়দার মহড়া আমাকে ভয়ঙ্কর বিব্রত করে তোলে। সব মিলিয়ে আমার ধৈর্যে ফাটল ধরে, দুঃসাহস শিথিল হয়ে আসে; কারণ আমিও মানুষ। মানবিক দুর্বলতার ঊর্ধ্বে তো নই। একটা মানুষ একের পর এক কত ঝড় ঝঞ্ঝা সহ্য করতে পারে? আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। প্রথমত কারাগারের ডাক্তার আমার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় আমাকে মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান হয়। এখানে মেডিসিনের অধ্যাপক ওয়ালিউল্লাহর দায়িত্বে আমার চিকিৎসা শুরু হয়। হাসপাতালে ১২নং কেবিনে আমাকে রাখা হয়। ১২ জন পুলিশ আমার জন্য নিয়োজিত হয়। পালাক্রমে ৪ জন পুলিশের সার্বক্ষণিক প্রহরায় আমাকে কেবিনে অবস্থান করতে হতো। প্রথম দিকে পুলিশের আচরণকে ঘিরে সমালোচনার মত কিছু ঘটেনি। তারা সম্ভবত আমার কাছে থেকে উৎকোচের চলতি পরিভাষা বকশিস প্রত্যাশা করছিল। কয়েকদিন তারা নির্ভেজাল ব্যবহার দেখিয়ে যখন আমার কাছ থেকে সাড়া পায়নি। তখন তারা বিভিন্ন কলাকৌশলে আমার ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগ করার চেষ্টা করে। আমার হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো হয়। আমার সাথে কেউ সাক্ষাৎ করতে এলে পুলিশেরা বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এ নিয়ে তাদের সাথে উত্তপ্ত বচসা হয়। আমি বললাম- ‘আপনারা জানেন আমি ক্লাসিফাইড প্রিজনার। আমার হাতে বেড়ী কোন মতে পরাতে পারেন না। এটা পরিয়ে রাখার সঙ্গত কোন কারণ নেই। অনর্থক মাঝখানে অসুবিধায় পড়বেন। তাছাড়া আপনাদের অফিসার আমাকে ভালভাবেই জানেন। উপর থেকে কোন নির্দেশ থাকলে তাও বলেন। আর যদি আপনাদের নিজেদের সিদ্ধান্ত হয় তাহলে অফিসারদের পরামর্শ নিন।’ আমার কথাগুলো তাদের মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করল বলে মনে হলো না। পুলিশদের একজন ছিল নামটা ঠিক মনে নেই, সে লোকই তার অন্যান্য সহযোগী পুলিশদের প্ররোচিত করেছে। এখানে তার মধ্যে যে জিনিস কাজ করেছে তা হলো, তাদের সেই একাত্তরের উন্মাদনা। সেই আদিম আক্রোশ তাদের মধ্যে জমে থাকার কারণে আমার বক্তব্যগুলো তার মনে আছর করেনি।

সংগঠনের পক্ষ থেকে প্রথম দিকে কে এম মঞ্জুর এলাহী এবং এ কে এম সফিউল্লাহ ভাই- পরে কারাগারে যারা লিয়াজোঁ রাখতেন সেই মোঃ ফারুক ও আব্দুল মালেক ভাই কেবিনে আমার অবস্থা দেখে যাবার পর বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ শুরু করেন। তখন মাস্টার শফিকুল্লাহ এমপি লক্ষ্মীপুর, মওলানা আবুদর রহীম সাহেব এমপি। তিনি মন্ত্রীপর্যায়ে বিশেষ করে আলীম সাহেব, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান ও উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক সালাম সাহেবের সাথে যোগাযোগ করেন। মোন’য়েম খানের জামাতা, বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদেল এমপি, নাজমুল হুদা এমপি (মোমেনশাহী) তৎপর হয়ে উঠেন তাৎক্ষণিকভাবে। তারা থানায় টেলিফোন করে জরুরীভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেন। তারা টেলিফোন করেন ডিআইজি সাহেবের কাছেও।

ইতোমধ্যে বস্ত্রমন্ত্রী আলীম সাহেব এবং উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক সালাম সাহেবের টেলিফোন এসে পড়ায় ডিআইজি সাহেব দারুণভাবে তৎপর হয়ে ওঠেন। তাৎক্ষণিকভাবে ডেপুটি জেলার ও সার্জেন্টকে প্রেরণ করলেন ব্যাপারটা সুরাহা করার জন্য। তারা পুলিশদের আমার হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দেয়ার কথা বলেন। কিন্তু পুলিশেরা বেঁকে বসে। তারা বলে- ‘আমরা আপনাদের নির্দেশে খুলে দিতে পারি। কিন্তু আসামী পলাতক হলে সে ব্যাপারে দায়দায়িত্ব আমাদের থাকবে না। এবং একথা লিখিতভাবে দিতে হবে।’ ডেপুটি জেলার জহির সাহেব ফিরে গেলেন। ওদিকে মেডিকেল কলেজের ছাত্র, ডাক্তার, নার্সরা দলে দলে এসে পুলিশদের সামনে তাদের বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকে। পুরো হাসপাতালটার পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

ডিআইজি সাহেব আর এক সার্জেন্টকে পাঠিয়ে উল্লেখিত পুলিশের রিলিজ অর্ডার তার হাতে দিয়ে অপর আর একজনকে তার কর্মস্থলে নিয়োগ করেন। সাথে উক্ত পুলিশকে ডিআইজির সামনে হাজির করা হয়। ডিআইজি এ ব্যাপারে বিরক্ত হয়ে তাকে চাকুরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু জেলার, সাব জেলারদের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে তাকে ফরিদপুর বদলী করা হয়।

ইতিমধ্যে আমার হাতের বেড়ী খুলে দেয়া হয়। কিছুক্ষণ পর কোতোয়ালী থানার কর্মকর্তা এলেন, এই অনাহুত পরিস্থিতির জন্য ক্ষমা চাইলেন। বললেন, ‘ব্যাপারটা নিয়ে যদি আপনি আর বেশী নাড়াচাড়া করেন তাহলে ঐ পুলিশ বেচারাদের চাকুরি রক্ষা করা সম্ভব হবে না। আমি কি আশা করতে পারি না যে, আপনি তাদেরকে ঐ বেয়াদবীর জন্য ক্ষমা করে দিবেন?’

হেসে বললাম- ‘আমি যা চেয়েছিলাম তাতো পেয়ে গেছি। এরপর কারো ওপর আমার কোন ক্ষোভ থাকার কথা নয়।’

পরবর্তীতে আদেল সাহেব স্বয়ং আমার কাছে এলেন। কুশলাদি বিনিময়ের পর আমার আর কোন সমস্যা আছে কিনা জিজ্ঞাসা করলেন। বললেন- ‘কখনো কোন অসুবিধা হলে খবর দিবেন। আপনার তদবির চলছে, নিরাশ হবার কিছু নেই। হাসপাতাল কেবিনে থাকার সময় লক্ষ্মীপুরের এমপি মাস্টার শফিকুল্লাহ, হযরত মওলানা নূর মোহাম্মদ সিদ্দিকী, মওলানা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী, ইসলামী ব্যাংকের ডাইরেক্টর জনাব মুহাম্মদ ইউনুস ভাই, কামরুজ্জামান ভাই, ছাত্র নেতা ডাক্তার আবিদুর রহমান, ডাক্তার আলমগীর, ডাক্তার দীলবাহান, সাইমুমের পরিচালক মতিউর রহমান মল্লিক এবং ছাত্রনেতা ডাঃ ফাত্তাহ ভাইসহ অগণিত শুভাকাংখী ও বন্ধু-বান্ধব এসেছিলেন।

মুসলিম লীগ নেতা কামরুজ্জামান খান (খসরু ভাই) এসে আমার সাথে বেশ কিছুক্ষণ কাটান এবং এ পর্যন্ত আমার জন্য যা কিছু করেছেন তার বিস্তারিত বিবরণ দেন। তিনি আমাকে আশ্বাস দিয়ে বলেন- ‘আপনার মুক্তির জন্য যেভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে তৎপরতা চালানো হচ্ছে তাতে আশা করি আপনাকে খুব শীঘ্র মুক্ত করতে পারব। এতটা দিন যে ধৈর্য নিয়ে, যে হিম্মত নিয়ে কারাগারে অবস্থান করেছেন আমি আশা করব শেষ পর্যায়ে এসে আপনি হিম্মতহারা হবেন না।’ হুমাইপুরের চেয়ারম্যান ফজলুল করিম খান ও তাঁর জামাতা এলেন আমার সাথে দেখা করে মুক্তির ব্যাপারে আশ্বস্ত করার জন্য।

আমার কাছে সবচাইতে আনন্দের বিষয় হলো- ইসলাম বিরোধী মোর্চার লক্ষ্যবস্তু আমার প্রিয় নেতা অধ্যাপক গোলাম আযম এসেছিলেন আমার সাথে দেখা করার জন্য। আমার দীর্ঘ কারাবাস ও নির্যাতনের ইতিবৃত্ত তার জানা। তবু তিনি আমার মুখ থেকে অনেক কিছু জেনে নিলেন। ইতিহাস থেকে অনেক দৃষ্টান্ত টেনে তিনি আমাকে সান্ত্বনা দেবার এবং আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলেন। আল কোরআনের বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি আমার হিম্মতকে আরও চাঙ্গা আরও উদ্দীপ্ত করার চেষ্টা করলেন। দীর্ঘ কারাবাস আর নির্যাতনে পরিশ্রান্ত এই মনটা আমার তাজা হয়ে উঠল। মনে হলো আমি আর একা নই। আমার পেছনে রয়েছে এক শক্তিমান মহাপুরুষ। আমি আমার নেতাকে আমার ইমামকে জানালাম- আমি কোন সময় আন্দোলনের প্রাণশক্তি থেকে দূরে থাকিনি। কোন অবস্থাতে কোন নৈরাশ্য আমাকে গ্রাস করতে পারেনি। এতকাল কারাগারগুলো ছিল বামপন্থীদের আখড়া এবং কমিউনিস্ট তৈরির কারখানা। হাজার হাজার কমিউনিস্ট তৈরি হয়েছে এই কারাগারে। আমার উদ্যোগে ইনশাআল্লাহ সে অবস্থা আর নেই। আমরা নিষ্ঠার সাথে কারাগারে সেই তৎপরতা চালিয়েছি। এর ফল হয়েছে আমাদের অনুকূলে। মুসলমানী জজবাত সম্পন্ন বহু বন্দী এখন ইসলামী আন্দোলনের সৈনিকে পরিণত হয়েছে। একাত্তরের বহু মুক্তিযোদ্ধা এখানে আমাদের সাথে, ইসলামী আন্দোলনের সাথে কাজ করার ব্যাপারে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়। আমাদের বহু নেতার কারাগারে পদচারণা বহুদিন থেকে অথচ কর্মের এত বড় ক্ষেত্রকে অবহেলা করেছেন অথবা এ ব্যাপারে কোন কিছু ভাবেননি। আমি আইজি অব প্রিজনস এবং ডিআইজি অব প্রিজনস সাহেবদের অনুমোদন সাপেক্ষে সমাজ কল্যাণ সংস্থার দায়িত্বশীল মুহাম্মদ ইউনুস ভাই-এর সহযোগিতায় কারাগারের লাইব্রেরিতে প্রচুর ইসলামী বই ও তাফহীমুল কুরআন এবং হাদীসের সমাবেশ ঘটাতে সক্ষম হই।

আলাপ আলোচনার মধ্যে মাগরিবের নামাজের সময় হলো। আমার কেবিনে অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের ইমামতিতে নামাজ আদায় করলাম। গোলাম আযম সাহেব দোয়া করলেন আমাদের ইসলামী আন্দোলনের সিপাহীদের জন্য। চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রের আবর্ত থেকে, জিল্লতি আর অবমাননার গ্রাস থেকে গোটা  জাতির মুক্তির জন্য সর্বশক্তিমানের দরবারে রাখলেন বিনীত নিবেদন। কতিপয় স্বার্থান্বেষী মহলের অন্যায় অনাচারজনিত কারণে সমগ্র জাতির উপর সম্ভাব্য কুদরতি আযাব থেকে তিনি পানাহ চান। তার প্রাণের গভীর থেকে উৎসারিত দোয়ার আবেদন থেকে আমার মনে হলো- তিনি যেন গোটা জাতির নেতৃত্বে সমাসীন। সমগ্র জাতির ভাল-মন্দ কল্যাণ-অকল্যাণের সাথে তিনি একাকার। প্রায় ২ ঘণ্টা হক, ইনসাফ আর শরাফতীর মূর্ত প্রতীক অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেব আমাকে সাহচর্য দিলেন। তিনি জানালেন বাংলাদেশে ইসলামী বিপ্লব আসন্ন। মনে হলো ইরান থেকে উদ্ভুত ইসলামের বিশাল তরঙ্গ ভারত মহাসাগরের ওপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরের কিনারে এসে আছড়ে পড়বে। আর এই তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ মহাকল্যাণের জোয়ারে আমরা ভাসব। এই নতুন জীবন প্রবাহ আর মুক্তির কালোচ্ছ্বাসে একাকার হবে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়ার ১০ কোটি মানুষ। আহ, সেই দিনটি কবে, কখন আমার ঠিকানা কারার কপাটে আঘাত করবে। বিদায় নিলেন মহাপুরুষ আর রেখে গেলেন রোমাঞ্চকর অনুভূতি।

একদিন আমাদের আর এক নেতা ও তৎকালীন এমপি মওলানা আবদুর রহীম সাহেবকে হাসপাতাল থেকে টেলিফোন করলাম। কথা শুরু হতে না হতেই আমাকে এলার্ম দিলেন, বললেন- “কথা শর্ট কর। আমার অনেক কাজ।” এতে আমার আবেগ আহত হল। বললাম- ‘এ কারণেই আমি টেলিফোন করলাম, আমার জন্য আপনারা যে তদবির করেছেন তাতে আমার কাছ থেকে কোন কিছু জানার প্রয়োজন আছে কি না?’ জবাবে তিনি কি বললেন, ‘তা আমার মনে নেই।’ তবে দুপুরে তার বাড়ীতে খাবার দাওয়াত দিলেন।

সেদিনের আহত অনুভূতির মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলাম- ইসলামী নেতৃত্ব জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ কোথায়? আমাকে কেন্দ্র করে এমপি থেকে মন্ত্রী, সাংবাদিক থেকে সম্পাদক, ছাত্র থেকে জনতার এই যে তৎপরতা, তা আমার প্রাণের গভীরে আনন্দের স্পন্দন জাগালেও এর ফল শুভ হয়নি। আমার সাময়িক বিজয় হয়েছে হয়তোবা কিন্তু যে চিকিৎসার জন্য আমি এই হাসপাতাল কেবিনে সেটা আর হল না। আমার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিকট বার বার টেলিফোনকে তারা বাড়তি ঝামেলা আর উলকো নিপীড়ন ভাবলেন। আশঙ্কা করলেন, তারা আবার কোন সংকটের বেড়াজালে আটকে পড়েন। অতএব রুগীকে বিদায় দেয়া উত্তম। আমাকে দশ বার দিনের মধ্যে রিলিজ করে দেয়া হলো। আমি আবার কারাগারে ফিরে এলাম। শারীরিক অবস্থার ক্রমাবনতি হতে লাগল। আবার কারাগারের ডাক্তারদের শরণাপন্ন হলাম। ডাক্তাররা কারাগারে আমার সুচিকিৎসার ব্যাপারে অপারগতা ব্যক্ত করলেন। তারা আমাকে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী হাসপাতাল কেবিনে থাকার যাবতীয় খরচ বহন করতে হয় রুগীকে। আমার যাবতীয় খরচ আমাদের সংগঠন বহন করতে থাকল। মেডিসিনের হেড, অধ্যাপক ডাঃ ইউসুফ আলী সাহেবের তত্ত্বাবধানে আমার চিকিৎসা শুরু হলো। এখানে যথানিয়মে পালাক্রমে ২ জন করে মোট ৬ জন পুলিশ আমাকে পাহারা দিয়ে রাখত। আগের মত এখানে আর পুলিশী নির্যাতন নেই কিন্তু ভিন্নধর্মী নির্যাতনের আয়োজন উদ্যোগ চলতে লাগল।

নির্যাতনের তেলেসমাতি যা একাত্তরে শুরু হয়েছে তার যেন শেষ নেই। একাত্তরে আমাদের রাজনৈতিক দর্শনের পটভূমিতে ভুল শুদ্ধ যা কিছু করে থাকি না কেন সেই ফেলে আসা দিনগুলোকে ওরা আমাদের কিছুতেই ভুলতে দিবে না। ১০ বছরের ব্যবধানেও নতুন প্রত্যাশা নতুন চেতনার আলোকে নতুন মঞ্জিলের দিকে এগিয়ে চলার উদ্যোগ নিলেও বিশেষ বিশেষ মহল একাত্তরের খুঁটিতে আমাদের পা-গুলো বেঁধে রাখতে চায়। ‘লেকিন কম্বল নেহি ছোড়তা’ আমরা যেন এমনএক অবস্থায় রয়েছি। বামপন্থী নেতা ও আওয়ামী লীগ নেতার টেলিফোন আসতে লাগল ডাঃ ইউসুফ আলীর কাছে। তাদের সবার একই প্রশ্ন- আলবদরের কমাণ্ডারকে হাসপাতালে পোষা হচ্ছে কেন? কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে যার ঠিকানা তাকে মেডিকেল কলেজের কেবিনে কেন এমন যত্ন-আত্তির মধ্যে রাখা হয়েছে, এটাই তাদের প্রশ্ন। বার বার বলা হচ্ছে- তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দিন। প্রফেসর ইউসুফ সাহেব শুধুমাত্র বলেছেন- ‘আমি ডাক্তার, আমিন সাহেব আমার রুগী। কে আলবদর, কে রাজাকার, কে মুক্তিফৌজ, কে সন্ত্রাসবাদী সেটা আমার দেখার বিষয় নয়। সেটা দেখবে আদালত অথবা প্রশাসন। আমি দেখব রুগী। কোন হুমকি অথবা কোন প্রভাব আমার দায়িত্ব থেকে আমাকে বিরত রাখতে পারবে না।’

আমার পাশের কেবিনগুলোতে ছিলেন কাদের সিদ্দিকীর বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী, ফণীভূষণ মজুমদার, শ্রমিক লীগের বজলুর রহমান (পাবনা), কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড ফরহাদ এবং মুসলিম লীগের এমপি ইব্রাহীম খলিল। এদের মধ্যে লতিফ সিদ্দিকী ও ফণীভূষণ মজুমদার বাইরের ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। আমার যেন হাসপাতালে ঠিকমত চিকিৎসা না হয় সেজন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ, হুমকি প্রদানের ব্যাপারে ঐ দু’জনের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। কিন্তু ফরহাদ ভাই ও শ্রমিক নেতা বজলুর রহমানের ভূমিকা ছিল নির্লিপ্ত। ডাঃ গোফরান, ডাঃ একে এম খোরশেদ আলম, ডাঃ শওকত, ডাঃ নজরুল, ডাঃ সরকার মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম ও ডাঃ নূরুল ইসলাম সর্দার ডাঃ এনাম, ডাঃ দীল বাহার সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। কোন মানসিক ভীতি আমাকে গ্রাস করতে পারেনি। কেননা হাসপাতালের সমস্ত ডাক্তার, নার্স, এমনকি মেডিকেল কলেজের ছাত্রনেতা ইদ্রিস আলী, ছাত্র নেতা ডাঃ এম আই ফারুকী, ডাঃ হাফিজ ভাই ও অন্যান্য ছাত্ররা বিশেষ সহানুভূতি নিয়ে চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন। এ কারণে বাইরের কোন হামলার ভয় আমি অতটা করতাম না।

তবে যেদিন জিয়াউর রহমানের মৃত্যু হয় সে দিনটা উদ্বেগের মধ্যে কেটেছে। দু’জন মাত্র প্রহরী। প্রশাসনে শিথিল অবস্থা বিরাজ করছিল সর্বত্র। এ ছাড়া সংগঠনের তরফ থেকেও কেউ সেদিন যোগাযোগ রক্ষা করেনি। এতে একটু বিচলিত হয়ে উঠি। প্রতিপক্ষের কোন গ্রুপ আমাকে আঘাত হানতে চাইলে সেদিনটি ছিল তাদের জন্য উত্তম সময়।

যা হোক, যুব মুসলিম লীগ নেতা ইব্রাহিম খলিল (এমপি) ক্যান্সার রোগের চিকিৎসার্থে জুন ’৮১-র প্রথমদিকে কোন একদিন হাসপাতাল কেবিনে ভর্তি হন। আমার প্রিজন কেবিন থেকে একটু দূরে লতিফ সিদ্দিকীর  কেবিনের দক্ষিণ পাশে ছিল তার কেবিন। তার সাথে পরিচিত হতে এবং তার অসুস্থতার খোজ খবর নিতে তার কাছে ছুটে গিয়েছি। তাছাড়া সমমনা হওয়ায় এবং অন্তরের টানে সাক্ষাৎ জরুরী মনে করেছিলাম। আমার পরিচয় বললে তিনি অতি আন্তরিকতার সাথে আমার সম্পর্কে জানার আগ্রহ দেখান। তার অসুস্থতা এবং রোগজনিত কষ্টের কথা চিন্তা করে আমার ইতিবিত্ত সংক্ষেপে তাকে জানালাম। সেই থেকে নিয়মিত তার কেবিনে যাওয়া আসা, কথা-বার্তা চলতে থাকে। এ সময় তার পরিবরের সদস্যবর্গ এবং ইব্রাহিম ভাইয়ের সহধর্মীনী মহিয়ষী ভাবীসহ মুসলিম লীগ নেতাদের সাথে দেখা হতো এবং তাদের সাথে আলাপ পরিচয় ঘটতো।  ইতোমধ্যে ইব্রাহীম খলিল ভাইয়ের স্বাস্থ্যের অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকার লন্ডনে প্রেরণ করে। যাওয়ার সময় আমার প্রিজন কেবিনে সেই মহিয়ষী ভাবী বিদায় ও দোয়া নিতে এসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সেদিনের সে কান্নার দৃশ্য আজও আমার অন্তরে দেদীপ্যমান। একদিন পত্রিকায় দেখলাম ইব্রাহীম খলিল সাহেব আর বেঁচে নেই। লন্ডনের হাসপাতালে তিনি ২৫/২৬ জুন ’৮১ তারিখ সম্ভাবত তিনি মারা যান। অঙ্কুরেই এক সম্ভাবনাময় নেতার  জীবনাবসানে আমি দারুণভাবে মর্মাহত হয়েছিলাম।

তখনও আমি প্রিজন কেবিনেই রয়েছি। তবে কিছুদিনের মধ্যেই মুক্তি পাবো- এরকম একটি প্রত্যাশায় প্রহর গুণছি। অতঃপর সেই কাংখিত মুক্তির পর সময় করে ইব্রাহিম ভাইয়ের পরিবারের সদস্যবর্গের সাথে দেখা করি। ভাবী ও সন্তানদের সালামত কামনা করে চলে আসি।

একে একে ৭টা মাস আমি হাসপাতালে কাটালাম। এ ক’টা মাস ডাঃ ইউসুফের স্নেহ আর মমত্ববোধের বেড়া যেন আমার চারিদিকে নিরাপত্তার বেষ্টনী সৃষ্টি করে রেখেছিল। মনে হয়েছিল এই হাসপাতালটা আমার জন্য সবচাইতে নিরাপদ আশ্রয়। অধ্যাপক ইউসুফ আলী সাহেব আমাকে বলতেন- ‘তোমাদের সংগঠনকে তৎপর হতে বলো। তাড়াতাড়ি তোমার মুক্তির ব্যবস্থা করুক।’ তিনি চাইতেন না আমি আবার কারাগারে অন্ধ প্রকোষ্ঠে ফিরে যাই। তিনি অন্যান্য সহযোগী ডাক্তারদের বলতেন- ‘আমিনকে আমার এ জন্য ভাল লাগে যে তার মধ্যে রাখ ঢাকের কোন প্রয়াস নেই।’

অধ্যাপক ইউসুফ হিন্দুস্তান থেকে হিজরত করে এসেছেন। হিন্দু মানসিকতা সম্বন্ধে আমাদের চেয়েও অনেক বেশী তিনি সচেতন। একাত্তরে আমাদের প্রতি হিন্দুস্তানের উচ্ছ্বসিত দরদের অন্তরালে কী গভীর ষড়যন্ত্র ছিল সেটা তার মত বিজ্ঞ লোকের অজ্ঞাত থাকার কথা নয়।

একাত্তরে আমাদের ভূমিকায় কি গভীর দেশপ্রেম, কি নিবিড় জাতীয় অনভূতি লুকিয়ে ছিল সেটা কিছুসংখ্যক ষড়যন্ত্রকারী পরিস্থিতির দুর্বল পর্যবেক্ষকদের মনে দাগ কাটতে সক্ষম না হলেও সচেতন মানুষগুলো ঠিকই অনুভব করতো। ডাক্তার ইউসুফ তেমনি সতর্ক মানুষ ছিলেন। এ কারণে আমার প্রতি তার দরদ ছিল অপরিসীম।

আমি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে থাকা অবস্থায় জানতে পারলাম আমার মুক্তির দিন আসন্ন। কেননা প্রেসিডেন্ট সাত্তার ঈদ উপলক্ষে ৬ জন রাজবন্দীর মুক্তি ঘোষণা দেন তার মধ্যে রয়েছি আমিও। আমার সাথে আর যারা ছিলেন তারা সবাই মুক্ত হলেও আমি মুক্ত হতে পারলাম না। কেননা তখনও আমার আরো কিছু মামলা রয়ে গেছে ঝুলন্ত অবস্থায়।

শেষ দিকে এসে আমার দলীয় নেতৃবৃন্দের বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করলাম। এতদিন কেবিনে থাকার ব্যাপারে সংগঠন উদারভাবে সাহায্য সহযোগিতা করে এসেছে। মুক্তির কিছুদিন আগে দলের সমাজকল্যাণ বিভাগের দায়িত্বশীল, ইসলামী ব্যাংকের ডাইরেক্টর মুহাম্মদ ইউনুস ভাই আমাকে খবর পাঠালেন যে অতি সত্বর মুক্তির ব্যাপারে আমি কোন ব্যবস্থা করতে না পারলে সংগঠনের বিশেষ কিছু করার থাকবে না অর্থাৎ আমাকে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে ফিরে যেতে হবে। দুঃখ পেলাম এই ভেবে যে, সংগঠন এখনও সংকীর্ণতার আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

এতদিনে আমার ভুলটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল। ইরানের বিপ্লবের ব্যাপারে আমার যে উপলব্ধি সেটা আমার সাথে সাক্ষাত করতে আসা দলীয় কর্মী ও নেতৃবৃন্দের কাছে অকপটে বলতাম। ইরানের বিপ্লবের সপক্ষে আমার বক্তব্যগুলো বুমেরাং হয়ে ফিরে আসল আমার দিকে। সংগঠনের সহানুভূতি ও মদদ দুটোই আমি হারাতে বসলাম। এতে আমি মর্মাহত হইনি মোটেও কেননা ৪০ বছর কারাবাসের মানসিক প্রস্তুতি আমার এর আগেই নেয়া ছিল। তাদের এই সংকীর্ণতা আর হীনমন্যতা দেখে মহান আল্লাহ সম্ভবতঃ আড়াল থেকে হেসেছিলেন। তা না হলে প্রেসিডেন্ট সাত্তারকে দিয়ে আমার মালিক আমার মুক্তির জন্য শেষ ঘুঁটি চালালেন কেন? যাই হোক, আমার ঝুলন্ত মামলাগুলোর ব্যাপারে হাসপাতালের কেবিন থেকে আমি নিজেই তদবির করলাম। অবশেষে একাশির ২৬ সেপ্টেম্বর মুক্তি পেলাম।

মুক্তি পাবার দিন হাসপাতালের ডাঃ গোফরান, ডাঃ একে এম খোরশেদ আলম, ডাঃ এনাম, ডাঃ শওকত, ডাঃ নজরুল ইসলামসহ কয়েকজন মহিলা ডাক্তার আরও অন্যান্য ডাক্তাররা আমার একটা বিদায় সম্বর্ধনার আয়োজন করেন। সেই সভায় জামায়াত নেতা কামরুজ্জামান সাহেব, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবু তাহের ভাই উপস্থিত ছিলেন। ছাত্রনেতা ডাঃ মোঃ ইদ্রিস আলী, মেডিকেল কলেজের জিএস জনাব সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, ডাঃ হাফিজুর রহমান, ডাঃ দীল বাহার ও অন্যান্য ছাত্ররা মিলে আমাকে একটা পারকার কলম উপহার দেন।

এখন আমার বিদায়ের পালা। মুক্ত পৃথিবীর অবারিত আলোর মধ্যেও আমি অন্ধকার দেখছি। কোথায় যাবো? আমার লক্ষ্য স্থির করতে পারছিলাম না। অধীর আগ্রহে সংগঠনের নেতৃবৃন্দের প্রত্যাশা করছিলাম। পরবর্তীতে মনে হলো, এ প্রত্যাশা ভুল। কেননা আমি কোন বামপন্থী আন্দোলনের কর্মী নই যে আমার নেতা মানসিকভাবে চাঙা করার জন্য তার কর্মীর নিকট ছুটে আসবে। আমাদের সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মধ্যে আব্বাসীয় আভিজাত্যের প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। তবে কিছুক্ষণের মধ্যে একটা গাড়ী এলো, কিন্তু সেটা সংগঠনের নয়। উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক আবদুস সালাম পাঠিয়েছেন। দুঃখ-সুখের মিশ্র অনুভূতি আমাকে গ্রাস করলো। দুঃখ যে সংগঠনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য আমার উদ্দাম যৌবনের সোনালী দিনগুলোতে নিরলস পরিশ্রম করেছি, যাদের নির্দেশে বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়েছি, যাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য ১০ বছর কাটালাম কারাগারে, আমার মুক্তির দিনটিতে তাদের প্রত্যাশা করেও পাইনি। আর সুখ- যাদের ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ নেই, যার সাথে কারাগারে ক্ষণিকের আলাপ-পরিচয়, সেই তৎকালীন উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক সালাম সাহেব আমার জন্য গাড়ী পাঠিয়েছেন। কি বিচিত্র মনে হয়েছিল সেদিন। ভাই মুহাম্মদ ফারুক সহ সালাম সাহেবের বাসায় গেলাম। তার নিজস্ব লোকজন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক সভায় ব্যস্ত ছিলেন তিনি। তবু উঠে এলেন, এসে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। কি আনন্দ লেগেছিল সেদিন। তার অভ্যর্থনা আর আপ্যায়ন আমাকে লজ্জা দিয়েছিল। হয়তো পরিবেশগত সংকীর্ণ মানসিকতা নিয়ে আমি তার জন্য অতটুকু করতে পারতাম না। হিতাকাংখী হিসেবে তিনি আমাকে গাইড লাইন দিলেন। গ্রামের বাড়ীতে না যাওয়ার, কিছুদিন রাজনীতি থেকে বিরত থাকার এবং ঢাকায় অবস্থান করার উপদেশ দিলেন। তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলাম আমি আজিমপুরে শিবির নেতা মুহাম্মদ এনামুল হক ভাই-এর মেসে। আমার সাথে ছিলেন ফারুক ও মালেক ভাই। এখানে আমি মাস খানেক অবস্থান করলাম। এনাম ভাই সেখান থেকে চলে যাওয়াতে একটুখানি সমস্যার মুখোমুখি হতে হলো। কিন্তু আমার মালিক আমার জন্য আরো সুন্দর ব্যবস্থা করে দিলেন।

প্রফেসর ডাক্তার ইউসুফের সহযোগী ডাক্তার এ কে এম খোরশেদ আলম ভাই বর্তমানে তিনি পিজির সনামধন্য প্রফেসর হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। তার কোয়ার্টার ফ্রি করেদিলেন আমার জন্য। এখানে থাকা অবস্থায় অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের অনুগ্রহে বিআইসিতে আমাকে একটা চাকুরী দেয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক নাজির আহম্মদ সাহেব। এখানে খুব বেশী দিন এ্যাডজাস্ট করে থাকতে পারলাম না। জেলে থাকা অবস্থায় বিভিন্ন মত ও পথের বিভিন্ন নেতার সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। তাদের অনেকেই আমার কাছে টেলিফোন করতেন। যা কর্তৃপক্ষ পছন্দ করতেন না। আমার অবর্তমানে টেলিফোনকারীরা সাধারণ সদ্ব্যবহারটুকুও পেতেন না। প্রায় সবাই আমাকে এ ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন। কর্তৃপক্ষের আচার আচরণ থেকে আমি বুঝতে পারলাম যে এখানে আমি একজন চাকুরীজীবী ছাড়া কিছুই নই। এখানে আমার সাংগঠনিক দাবীও কিছু নেই। এ অবস্থায় বেশি দিন থাকা সংগত মনে করলাম না। আল্লাহর পৃথিবী অনেক বড়। আমি স্বাধীনভাবে রুটি রুজীর অন্বেষণ করা অধিকতর উত্তম মনে করলাম। সামান্য পয়সার বিনিময়ে কতিপয় দাম্ভিক মানুষের কাছে আমার স্বাধীন সত্তা ও সংযত বিবেক বন্ধক রাখা কিছুতেই মেনে নিতে পারলাম না। আমি আর এক কারাগার থেকে উন্মুক্ত দিগন্তে ডানা মেললাম। এতে আমার কষ্ট হয়েছে, তাতেও সুখ। পিঞ্জিরায় আবদ্ধ তোতা পাখীর মত ছক-বাঁধা মুখস্থ বুলি আবৃত্তি করে কাটানোর সুখকে আমি ঘৃণা করি। আমি চাই উদ্দাম ঝড়ো হাওয়ায় দুরন্ত ডানা মেলতে। অন্তরের আবেগ উজার করে মুক্তির গান গাইতে।

আল্লাহর বিরাট পৃথিবীর আমি একজন। আর এ সমগ্র পৃথিবীটা যেন আমার। হক আর ইনসাফের দীপশিখা নিয়ে এগিয়ে চলার দুঃসাহস যার বুকে পুঞ্জীভূত সেতো বিধি-নিষেধ আর জ্যাঠামীর বেড়াজালে নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। আমিও পারিনি।

কারামুক্তির পর বাইরের উন্মুক্ত আলো-বাতাসে এসে জীবন ও জীবিকার দিকটা যখন চিন্তা করতাম তখন আমার সামনে একরাশ নৈরাশ্য ছাড়া কিছুই দেখতাম না। জীবন থেকে আমার দশ বছর খসে গেছে। প্রগতি থেকে আমি দশ বছর পিছিয়ে গেছি। বিবর্তিত রাজনীতি ও সামাজিক অবস্থানেও আমি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। যেন আমি ভিন্ন গ্রহ থেকে এসে পা রেখেছি এই গতিশীল পৃথিবীতে।  জীবনের আঁকাবাঁকা পথগুলো আমার সব অচেনা। এমন সংকটের দিনগুলোতে যে লোকটি আমার হাত ধরে এই অচেনা পথে একপা একপা করে এগিয়ে নিয়ে গেছেন তিনি হলেন- সাবেক গভর্নর আবদুল মোনেয়েম খান সাহেবের পুত্র খসরু ভাই। বরাবরই তিনি আমাকে স্বাধীন জীবন ও জীবিকার কথা বলতেন। খসরু ভাই তার দরাজ দীল নিয়ে আমার পাশে আসেন। তিনি বলেন- ‘আপনি তো আমার ভাই। আমি আপনার পাশে রয়েছি।’

সংকট উত্তরণে আমার একক প্রচেষ্টার পাশাপাশি অন্যান্যদের সাথে তিনি নিজে চেষ্টা তদবীর সহযোগিতা দিয়ে স্বাধীন অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ার ব্যাপারে বলতেন আরোও বলতেন- ‘আপনার যে কোন প্রয়োজনে আমি রয়েছি।’ এমন কি তার পরিবারের সদস্য হয়ে তার গৃহে অবস্থান করার জন্যও আমাকে বলেন।

আমি কারাগারে অন্তরীণ থাকাকালে খসরু ভাই, এডভোকেট হুমায়ুন ভাই এমপি (সাবেক) তার পরিবারের সকলের নেপথ্য আন্তরিকতা আমাকে বেষ্টন করেছিল। কত যুগ আগে তার পরিবারের সাথে আমাদের আত্মিক যুগ হয়েছিল তা বলা মুশকিল তবে সেই সূত্র ধরে ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে থেকেও খসরু ভাই আত্মীয় না হলেও আমার মন-মানসিকতায় অনন্য ব্যক্তিত্ব হয়ে আছেন।
আমার স্বাধীন জীবন যাপনের জন্য সাহায্য ও সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করেছেন ইশ্বরদীর মজিদ ভাই, যার কথা আমি আগেই উল্লেখ করেছি। এছাড়া নাসের ভাইয়ের সহযোগিতা কম পেয়েছি এমনটি বলা যাবে না। ইকবাল খান, ইঞ্জিনিয়ার জমশেদ (বর্তমানে রাওয়ালপিণ্ডিতে অবস্থানরত), ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার দিদারুল ইসলাম, সোলাইমান, আনোয়ার, কামাল, এডভোকেট আমিনুল ইসলাম, এডভোকেট তারিকুল ইসলাম (মোহন), বিশেষজ্ঞ ডাঃ আফসার সিদ্দিকী, বিশেষজ্ঞ ডাঃ আব্দুল্লাহ ভাইয়ের সহযোগিতাও আমাকে যথেষ্ট প্রেরণা দিয়েছে। এদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ, আমি ঋণী। জীবনভর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে আমি তাদের সেই ঋণ পরিশোধ করতে থাকবো।

আটাত্তরের শুরু থেকে ইরানে কিছু কিছু আলোর ঝিলিক পরিলক্ষিত হচ্ছিল। প্রেসিডেন্ট কার্টারের তেহরান সফরের পর শাহের ইঙ্গিতে ইরানের পত্র-পত্রিকায় ইমাম খোমেনীর ব্যক্তিগত চরিত্রের ওপর কলঙ্ক আরোপ করে প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। এটা করা হয় খোমেনীর ওপর জনগণকে বীতশ্রদ্ধ করে তোলার জন্য। কিন্তু এটাই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে ইরানের শাহের দরবারে। ঝড় উঠে, সে ঝড় কোম থেকে তেহরান, তেহরান থেকে মাশাদ, মাশাদ থেকে শিরাজ এভাবে ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্র। একটা বিরাট ঝাঁকুনির প্রয়োজন ছিল ইরানে। ভাবলাম সে সময় সম্ভবত সমাগত।

ষাটের দশকে পাকিস্তানের সরকারি প্রচার মাধ্যমগুলোর সূত্রে ইরানের যেসব প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শিত হয়েছিল, তাতে আমরা দেখেছিলাম ইরানী শাহানশাহীর দু’হাজার বছরের ইতিবৃত্ত। এতে জাহেলী যুগকেও ইরানের গৌরবোজ্জ্বল দিন বলে চি‎হ্নিত করা হয়েছিল। সেইসব চিত্র দেখেই আমরা বুঝেছিলাম ইরানের রাজতন্ত্রের পতনের দিন আসন্ন। শাহের খোশ খেয়াল ও জাহেলী চিন্তা চেতনা সূক্ষ্মভাবে জনজীবনে প্রবিষ্ট করানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল। আমেরিকার নীলনক্সা অনুযায়ী তথাকথিত শ্বেত বিপ্লবের মাধ্যমে গণচেতনার বিভ্রান্তির ধুম্রজাল বিস্তার করা হচ্ছিল ব্যাপকভাবে। ওদিকে ইরানের গণমনে যে তুষের আগুনের মত এক বিপ্লবী চিন্তা-চেতনা ধিকিধিকি জ্বলছে তেমন কিছু আমরা জানতাম না। কেননা বিশ্বের সমস্ত প্রচার মাধ্যমগুলো এ সম্বন্ধে কোন তথ্য প্রকাশ করতো না।

আটাত্তরের শুরু থেকে বিশ্বের প্রচার মাধ্যমগুলোতে এবং আমাদের দেশের পত্র-পত্রিকাগুলোতে ইরানের বিপ্লব সংক্রান্ত খবর স্থান পেতে থাকে। অক্টোবর থেকে আন্দোলন আরও ব্যাপক আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভ আর বিক্ষোভ, মিছিলের পর মিছিল, ধর্মঘটের পর ধর্মঘট অব্যাহত রয়েছে তখন। সারা ইরানে এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। শাহের চোখে ঘুম নেই। তবুও শাহ নৈরাশ্যে ভেঙে পড়ছেন না। কেননা তাকে মদদ দেয়ার জন্য রয়েছে ২ লক্ষ দুর্ধর্ষ সৈনিক, তার নিজস্ব তৈরি সাভাক বাহিনী, সিআইএ’র উর্বর মস্তিষ্ক আর রয়েছে আমেরিকা, ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন দোসররা। এরপরেও স্ট্রাটেজিক্যালি রাশিয়ার সহানুভূতিও তার পাওয়ার কথা। কেননা রাশিয়ার আওতাধীন এশিয়ার ৬টি মুসলিম রাষ্ট্রের পাশে ইসলামী চিন্তা-চেতনা সম্পন্ন মৌলবাদী শক্তির বিকাশ হলে রাশিয়ার মুসলমানদের ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না, সোভিয়েত ইউনিয়ন এটা জানে ভাল করেই। এ কারণে রাশিয়া তার নিজস্ব যন্ত্রণায় ইরানের শাহকে ইরানী জনগণের ওপর বিজয়ী দেখতে চাইবে। বলতে গেলে ইরানী জনগণ শুধুমাত্র শাহের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে তা নয়। দুনিয়ার সমস্ত সাম্রাজ্যবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে ছিল ইরানী জনতার লড়াই। কোনক্রমেই পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় সামরিক আইন জারি করা হলো। তবু বিক্ষোভ ও ধর্মঘট অবিরাম চলছে। প্যারিস থেকে আয়াতুল্লাহ খোমেনী সামরিক সরকারকে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানালেন। জনতা আরও মরিয়া হয়ে উঠল। শিরাজে সেনাবাহিনীর সাথে জনগণের সংঘর্ষ হলো। শত শত লাশ নিয়ে মিছিল এগিয়ে চলল। মহররম সমাগত। সামরিক আইন মহররমকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। শাহ জনগণকে শান্ত করার জন্য প্রশাসনের কিছু রদবদল করলেন। কিছু দায়িত্বশীল অফিসারকে গ্রেফতার করলেন। এতেও কোন প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না জনতার মিছিলে। তেলক্ষেত্র অকেজো হয়ে পড়ল। দুই লক্ষ ব্যবসায়ী তাদের দোকান-পাট বন্ধ করে দিল। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে গেল। বন্ধ হল অফিস আদালত। সামরিক প্রধানমন্ত্রী গোলাম রেজা পদত্যাগ করলেন। শাপুর বকতিয়ার প্রধানমন্ত্রী হলেন। খোমেনী ঘোষণা দিলেন, কোনসরকারই গ্রহণযোগ্য হবে না। জনগণের লক্ষ্য শাহ। যুগ যুগ ধরে ইরানের জনগণের ওপর যে অত্যাচারের স্টীমরোলার চালান হয়েছে তার জবাবদিহি করতে হবে জনগণের আদালতে। শাহ দেশত্যাগ করলেন। শাপুর বখতিয়ার সর্বশক্তি নিয়োগ করেও জনতার ঢল রুখতে পারলেন না। সেনাবাহিনীর সদস্যরা জনতার কাতারে নেমে এল। অবশেষে গুলীগোলা ও আধুনিক মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে শহীদের রক্ত বিজয়ী হলো।

আমি জেল থেকে ইরানের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিরীক্ষণ করতাম। আর অনুভব করতাম অপূর্ব শিহরণ। মনে হতো আমি ইরানের পথে পথে বিপ্লবী জনতার কাতারে দাঁড়িয়ে ইসলামের সবচাইতে বড় কলঙ্ক রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করছি।

ইরান আধুনিক বিশ্বে নতুন করে প্রমাণ করল, ইসলামের অর্থ আপোষহীন সংগ্রাম। প্রমাণ করল, ইসলাম একক অভিযাত্রায় দুর্লঙ্ঘ্য লক্ষ্যে পৌঁছানোর এক দুর্নিবার শপথ। এ ব্যাপারে আয়াতুল্লাহ খোমেনীর একটা প্রসঙ্গ টানা যায়। তখন ইরানের শাহের গুলীতে প্রত্যেক দিন শত শত লোক শহীদ হচ্ছেন। ঐ সময় কিছ্ ুইরানী নেতৃবৃন্দ ইমাম খোমেনীকে প্রশ্ন করেন- ‘আপনি কি মনে করেন না জাতির এত যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, যে কোরবানী দিচ্ছে জনগণ, এর একটা ভয়াবহ ঝুঁকি আছে? এর ফলে লোকেরা হতাশ হয়ে পড়বে? পর্যায়ক্রমে তারা ক্লান্ত হয়ে পড়লে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে যাবে? এর চেয়ে বরং এই উত্তপ্ত অবস্থায় আন্দোলনকে থামিয়ে বর্তমান শাসক গোষ্ঠীকে রেখে একটা অস্থায়ী ব্যবস্থাপনায় কিছু সংস্কার করে নেয়া ভাল?’ তারা বুঝিয়েছিলেন ক্রমান্বয়ে ধাপে ধাপে আন্দোলনকে চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াই উত্তম।

আয়াতুল্লাহ খোমেনী স্পষ্ট জবাব দিয়েছিলেন- ‘আল্লাহ আমাদের যা করতে বলেছেন আমরা সে অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করে যাব। এর বিনিময়ে তিনি আমাদের সাফল্য আমাদের জীবদ্দশায় দিবেন, কি পরবর্তীতে কোন ভবিষ্যতে দিবেন, তা তাঁর ইচ্ছাধীন।’ ইমাম খোমেনী কোন শক্তির ওপর নয়, এমন কি জনগণের শক্তির ওপরও নির্ভর করেননি। তিনি নিষ্ঠার সাথে খোদা নির্দেশিত পথে জাতির জন্য কাজ করেছেন আর নির্ভর করেছেন আল্লাহর ওপর।

১৪শ’ বছর ধরে রাজতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ ও স্বৈরতন্ত্র যেভাবে ইসলামের প্রগতিশীল শক্তির ওপর আঘাত হেনেছে, যেভাবে মুসলমানদের মন-মগজ স্থবির করে দিয়েছে, যেভাবে সংস্কৃতি ও সভ্যতার মর্চে ধরানো হয়েছে; তাতে সংস্কারের মধ্যদিয়ে ইসলামের নিজস্ব জেল্লা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। ইসলামের বাসগৃহের অবস্থা হয়েছে এমন যা চৌদ্দ’শ বছর ধরে বিভিন্ন দিকে ফাটল ধরেছে, দেয়ালে ফাটল ধরেছে, ইট কাঠ খসে গেছে, ভিত হয়েছে দুর্বল। এর সংস্কার করে একে দুর্গ বানানো তো দূরের কথা এখানে নিরাপদে কোন মতে বাস করাও সম্ভব নয়। অতএব একে ভেঙে চূর্ণ করতে হবে। এর ভিত্তি উপড়ে ফেলতে হবে। আর এটা সংস্কার আন্দোলনের দ্বারা কোন মতে সম্ভব হবে না। এর জন্য প্রয়োজন বিপ্লব, চূড়ান্ত বিপ্লব। সংস্কার আন্দোলন করে মিশরে ইখওয়ানুল মুসলিমিন মার খেয়েছে। শক্তিশালী সংগঠন হয়েও জামায়াতে ইসলামী এগুতে পারছে না। জামাতের বিপ্লবী কর্মীরা এখন আয়েশের সন্ধানে ব্যস্ত।

জেল থেকে ইরানী বিপ্লবকে জানার বোঝার চেষ্টা করি। ক্রমশঃ আমি তাদের আপোষহীন প্রক্রিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ি। ইরানের সেই মহান বিপ্লবী নেতা ১৪শ’ বছর পর মুসলমানদের যিনি চূড়ান্ত লক্ষ্যে নিয়ে গেছেন তার চেহারা মোবারক দেখার ইচ্ছা তীব্রতর হয়ে ওঠে। ইরানের সংগ্রামী জনতা ও তাদের বিপ্লবোত্তর কার্যক্রম সরেজমিনে দেখার জন্য আমি ব্যাকুল হয়ে উঠি।

আশির মাঝামাঝিতে নব্বই শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সপক্ষে আওয়াজ তোলার জন্য কাজী আজিজুল হক ভাই কারাগারে অন্তরীণ হলেন। এতে আর যাই হোক আমার যেন মনে হয়েছে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের প্রকৃত তথ্য আমাকে জানানোর জন্য সম্ভবত তিনি খোদার তরফ থেকে উপস্থিত হয়েছেন।

তার মাধ্যমে সুস্পষ্টভাবে জানতে পারলাম, ইসলামী বিপ্লব ইরানে কিভাবে সংঘটিত হলো? ইরান বর্তমানে কোন অবস্থায় রয়েছে, পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার দোসরকে কিভাবে ইরান থেকে উৎখাত করা হয়েছে? আমেরিকা ও আরবের শিখণ্ডী সরকারসমূহ ইরাকের ঘাড়ে সওয়ার হয়ে ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধে কিভাবে যুদ্ধ পরিচালিনা করছে? কিভাবে একের পর এক শহরগুলোকে ধ্বংস করা হচ্ছে? ইরান এককভাবে সম্মিলিত শক্তির মোকাবেলা করছে কিভাবে? একে একে আজিজ ভাই আমার সামনে সবকিছু তুলে ধরেন। আমেরিকা ও আরবের প্ররোচনায় ইসলামের প্রগতিশীল কর্মকাণ্ড দুনিয়ার তাবৎ মুসলিম রাষ্ট্রসমূহে নিগৃহীত হচ্ছে। ইসলামী ইরানের সপক্ষে ভ্রাতৃত্ববোধ সঞ্জাত জনগণের আওয়াজ আমাদের সরকারও যেন সহ্য করতে পারছে না। আর পারছে না বলেই আজিজ ভাই কারা অন্তরালে। তার কারামুক্তির পরও তিনি আমার সাথে সাক্ষাত করেছেন। ইরানের যাবতীয় বই আমাকে সরবরাহ করেছেন। তার সাথে খন্দকার রাশেদুল হক, মাহফুজ ভাইসহ কয়েকজন সরকারী অফিসারও আসতেন, যারা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রগতিশীল প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ।

আমি কারাগার থেকে বেরিয়ে এলে আজিজ ভাই এক মহান ভ্রাতৃত্ববোধের তাগাদায় আমার কাছে প্রায় আসতেন। আমিও তার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতাম। আমার অধিকাংশ সময় কাটত জামায়াতের কর্মী ও নেতৃবৃন্দের সাহচর্যে। সেই পুরান ছকবাঁধা নিয়মে সাংগঠনিক কাজ। সেই গতানুগতিক কর্মপন্থা, যা আমার প্রগতিশীল চিন্তা চেতনাকে আহত করতো। আমি এখান থেকে মুক্তির পথ খুঁজতাম।

কিছুসংখ্যক বিবেক বর্জিত অসৎ আনাড়ীদের হাতে রাজনৈতিকভাবে পর্যুদস্ত সৎ ও বিবেকবান লোকদের যে হেনস্তা এটি আমাকে বরাবর বিড়ম্বিত করেছে। অথচ একাত্তরের রাজনৈতিক পরাজয়ের তিলক পরে আমাদের সংগঠন আজও পুরান পাঁকে আবর্তিত হচ্ছে। সেই গতানুগতিক গণতান্ত্রিক শ্লোগান। কিন্তু দেশের কোটি কোটি মানুষ নতুন বোতল, পুরানো মদ সবকিছু ভেঙে চূরমার করতে চায়। কোন পথ না পেয়ে সবার সাথে আমিও সংগঠনের পুরানো পথ ধরে এগুতে থাকি। কিন্তু আমার মন পড়ে থাকে তেহরানের রাজপথে, দেজফুল, কাসরে সিরিন আর খুররম শহর রণাঙ্গনে। ইরানের বিপ্লবী কর্মসূচী ও আপোষহীন সংগ্রামের সাথে পদ্মা-মেঘনা বিধৌত বাংলার শ্যামল প্রান্তরের জিন্দাহদীল অগণিত মানুষের মত আমিও কখন আমার অজান্তে একাত্ম হয়ে গেছি।

একদিন মাগরিবের নামাজ সবেমাত্র শেষ করেছি এমন সময় আত্মপ্রত্যয়ে সমুন্নত দুটো মানুষ আমার ডেরায় এসে ঢুকলেন। একজন আমার অতি পরিচিত। অন্যজনের সাথে আমার এখনও পরিচয় হয়নি। অপরিচিত আগন্তুকের সাথে আজিজ ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি একজন ইরানী ছাত্রনেতা, দিল্লীতে লেখাপড়া করতেন। বিপ্লবের প্রতি তাঁর অবিচল নিষ্ঠা ও অপরিসীম মমত্ববোধ আমার ভালো লাগলো। তিনি বলেন- ‘যে রঙীন স্বপ্ন বুকে নিয়ে আপনার তারুণ্যকে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলেন, যে লক্ষ্য অর্জনের জন্য রক্তাক্ত পথ ধরে হেঁটেছেন, ১০ বছর কারাবাসে কাটিয়েছেন, আমরা অজস্র খুন আর আগুনের তুফানের মধ্যদিয়ে সেই মঞ্জিলে পৌঁছেছি। এই মঞ্জিল আপনার আমার এবং দুনিয়ার সমস্ত বিপ্লবীদের। ইসলামী ইরানের পক্ষ থেকে আমি দাওয়াত নিয়ে এসেছি।’
ইরানের এই দাওয়াত যেন পরম পাওয়া বলে মনে হলো। আমি সাথে সাথে দাওয়াত গ্রহণ করলাম। মনে হল, ‘এ মেরে খাব কি তাবির এ মেরে জানী গজল।’ ইরান যেন আমার স্বপ্নের মঞ্জিল আমার হৃদয়ের সংগীত।
তার সাথে প্রোগ্রাম হল- প্রথমত আমাদের যেতে হবে বোম্বে। বোম্বের ইরানী কালচারাল সেন্টারে একদিন অবস্থান করতে হবে। তার পর ইরানী এয়ার লাইন্সের বিমান আমাদের নিয়ে যাবে তেহরান।
নির্দিষ্ট দিন সমাগত। বিরাশির ৬ আগস্ট তারিখে আমি, পিজি হাসপাতালের ডাক্তার আলমগীর সাহেব ও রাশিয়ায় উচ্চ শিক্ষারত ছাত্রশিবির নেতা আজাদ সাহেব তেহরানের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। বাংলাদেশ বিমান আমাদের বোম্বে পর্যন্ত পৌঁছে দিল। এখানে ইরানের কালচারাল সেন্টারে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য বিপ্লবী তরুণরা ইতোমধ্যে এসে গেছেন। আমরা পরস্পরের সাথে পরিচিত হলাম। এখানে আমার সাথে অনেকে বক্তব্য রাখলেন। পরদিন সকালে আমরা তেহরানের উদ্দেশ্যে ইরানী বিমান ‘হুমা’য় চাপলাম। ইরানে পৌঁছালে আমাদেরকে নিয়ে আসা হল তেহরানের সুসজ্জিত হোটেল পার্কে। এখানে এই হোটেলকে কেন্দ্র করে আমরা সমগ্র ইরানে আবর্তিত হয়েছি।

একদিন দুপুরে পবিত্র কোমের উদ্দেশে রওয়ানা হলাম। এই কোম নগরী তেহরান থেকে ১৪০ কিলোমিটার দূরে শিরাজ ও খুজিস্তানগামী একটি মহাসড়কের পাশে অবস্থিত। এখানে ইমাম মুসা কাজেমের কন্যা ও ইমাম রেজার বোন হযরত মাসুমার মাজার রয়েছে। এখানে শহীদ আয়াতুল্লাহ মাদানী, শহীদ আয়াতুল্লাহ মোতাহারী ও হুজ্জাতুল ইসলাম মোন্তাজারিরও কবর রয়েছে। এ শহরটি ইরানবাসীদের জন্য দ্বিতীয় পবিত্র নগরী। ১৮শ’ বছরের পুরান এই শহরটি ইসলামী তালিম-তরবিয়তের প্রাণকেন্দ্র। ইরানে ইসলামী আন্দোলনের বড় বড় ঢেউ এখান থেকে উত্থিত হয়েছে। দুনিয়ার ইসলামী আন্দোলনের মহান সৈনিকদের দৃষ্টি এই কোম শহরে নিবদ্ধ। এই কোম শহরে আয়াতুল্লাহদের বাণীএক একটি ঝড়ের রূপ পরিগ্রহ করে এশিয়ার লৌহমানব ইরানের শাহ পাহলবীর রাজ প্রাসাদে আঘাত হেনেছে। এই কোমের চেতনা উৎসারিত আলেমদের আবেদন প্রচণ্ড ক্ষেপণাস্ত্রের শক্তি নিয়ে জালেমশাহীর একটার পর একটা দুর্গ ধসিয়ে দিয়েছে। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে দেখলাম এই শহরটি। দেখলাম এই নগরীর মানুষগুলোকে। নতুন ইতিহাসের স্রষ্টা এরা। ইতিহাসের গতিধারাকে পাল্টে দেয়ার মহান হাতিয়ার যেন এই কোমের প্রত্যেকটি মানুষ। এদের চোখ, মুখ, চেহারা, চাহনিতে এক অমিত তেজ বিপ্লবের আগুন যেন ঠিকরে বেরুচ্ছে। যেন ‘ওরা জানেনা হার মানা, ওদের গতিতে প্রখর ডানা।’

বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ফায়জিয়া মাদরাসায় এলাম এই সেই মাদরাসা যেখানে প্রত্যেকটা তালেবে ইলমের কলবে ঢেলে দেয়া হয় বিপ্লবের ফয়েজ। প্রত্যেকটি রুহ এই মাদ্রাসায় এসে শাহাদাতের জন্য নেশাগ্রস্ত, উন্মাদ হয়ে উঠে। শূন্য হাতে বুক খুলে এরা গর্জে ওঠা কামানের সামনে দাঁড়াতে পারে। কামানের গর্জনকে স্তব্ধ করে দিতে পারে। শাহ যখন বিশ্ব জনমতকে ধোঁকা দেয়ার জন্য শ্বেত বিপ্লবের নামে তার সমস্ত অপকর্মগুলো বৈধ করার উদ্দেশ্যে গণভোট করে এবং সরকারী ঘোষণা দেয় যে বিপুল গণসমর্থন রয়েছে শাহের সপক্ষে, সে বছরই ঈদ উপলক্ষে ইমাম বক্তব্য রাখেন- ‘শাসক গোষ্ঠীর বেআইনী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। চরম পরীক্ষার ভয়ে ভীত হবেন না। সরকার যদি শক্তির আশ্রয় গ্রহণ করে, নতি স্বীকার করবেন না। আমরা ইসলামের জন্য সংগ্রাম করি। কোন শক্তিই তা সে যত বড়ই হোক না কেন আমাদের স্তব্ধ করে দিতে পারবে না।’

একই বছর ২২ মার্চ কোম থেকে উত্থিত ইসলামের আওয়াজকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য মেশিনগান সজ্জিত একদল সশস্ত্র সৈন্য কোমে প্রবেশ করে। ইমামের গৃহের চতুর্দিকে জনতার ভিড়, সেনাবাহিনীর অবস্থান থেকে ইসলাম বিরোধী শ্লোগান উত্থিত হল। সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় শাহের পালিত গুন্ডারা মাদ্রাসার ভেতরে প্রবেশ করল। বিক্ষিপ্ত ছাত্রদের মারধোর গালিগালাজ ও অত্যাচার শুরু করল। কোমের জনতা মাদ্রাসার চারিদিক বেষ্টন করে অবস্থান নিতে থাকলো। সেনাবাহিনী ও গুন্ডারা গুলীর ঝড় তুলে ছাত্রদেরকে মাদ্রাসা ছেড়ে যেতে বাধ্য করে। ইমাম ঘটনাস্থলে এসে রক্তাক্ত প্রান্তরে দাঁড়িয়ে বললেন- ‘আপনারা শান্ত থাকুন। আপনারা এমন সব দ্বীনি নেতার অনুসারী যারা এর চাইতে আরো বেশী নির্যাতন ভোগ করেছেন। যারা এ ধরনের দৌরাত্ম ও নির্যাতন চালায় শেষ পর্যন্ত এসব তাদের কাছেই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। ইসলাম ও মুসলমানদের ইজ্জত ও আযাদী রক্ষার জন্য আপনাদের অনেক দ্বীনি নেতা শাহাদাত বরণ করেছেন। সুতরাং তাদের পবিত্র উত্তরাধিকার হিফাযত করার দায়িত্ব আপনাদেরই।’

এই কোম থেকে ইমাম খোমেনী দেশের সমস্ত দ্বীনি মোবাল্লিগদের কাছে আরজ রাখলেন- ‘ইসলামী জনতার ওপর শাহ যে জুলুম ও নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল ও তার দালাল গোষ্ঠী ইসলামের প্রতি যে সত্যিকার হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, আপনারা সে সম্পর্কে আপনাদের খোতবায় আলোচনা করুন।’ তার বক্তব্যগুলো দেশের সর্বত্র চিঠি ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। উত্তেজনা বেড়েই চলেছে ক্রমশ। এক পর্যায়ে সাভাক বাহিনী হুমকি দিল, ফায়জিয়া মাদ্রাসায় বক্তৃতা দেয়া চলবে না। সেই দিনই আশুরার পড়ন্ত বিকেলে ইমাম ভাষণ দিলেন- ‘আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছি যে শাসক গোষ্ঠী ইসলাম ও ইসলামী নেতৃত্বের বিরোধী। ইসরাইল শাহ-এর সহযোগিতায় আমাদের ঐশী কেতাব কোরআনের অবমাননা করতে চায়। ইসলামী নেতৃত্বকে নির্মূল করতে চায়। ইহুদীরা আমাদের ব্যবসা, বাণিজ্য, অর্থনীতি ও কৃষ্টিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়’

৫ জুন কোম অবরুদ্ধ হয়। সেনাবাহিনী ইমামের বাড়ী ঘেরাও করে। তাকে দ্রুত সামরিক গাড়ীতে তুলে নিয়ে তেহরানের কারাগারে আবদ্ধ রাখে। বিদ্যুতের মত এ খবর তেহরানের সর্বত্র ছড়িয়ে পরে। জনতার ঢল নেমে আসে রাজপথে। কোম শহর রক্তাক্ত হয়ে উঠে। নিহত হয় ৪ শত। তেহরানের রাজপথের অবস্থাও একই রকম। লালে লাল হয়ে ওঠে অজস্ত্র শহীদের রক্তে। শাহেরমেশিনগানের গুলীতে লুটিয়ে পড়ে ১৫ হাজার জিন্দা-দীল মানুষ। তারপর ইমামকে দেশ থেকে নির্বাসন দেয়া হয়। বিপ্লবের আগুন রাজপথ থেকে সরে আসে। বছরের পর বছর ধরে রেজা শাহের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র আর চক্রান্তের স্তুপে চাপা পড়ে যায়। কিন্তু সে আগুন বাসা বেঁধে থাকে আলেমদের অন্তরে। সমগ্র কোম নগরী ১৫ বছর ধরে সে বিপ্লবের আগুন একইভাবে বহন করতে থাকে। শাহী আগ্রাসনের শেষ চিহ্ন মুছে দেয়া পর্যন্ত কোমের জাগ্রত জনতা তাদের তলোয়ার কোষবদ্ধ করেননি। মানুষের অন্তরকে জিন্দাদীলে পরিণত করার জন্য কোম আজও প্রচণ্ড শক্তির উৎস।

ফায়জিয়া মাদ্রাসায় আমরা আমন্ত্রিত। দুপুরের খানাদানায় আরও অনেকের সাথে আমরা অংশ নিলাম। বিকেল নাগাদ শুরু হয় অনুষ্ঠানের। এখানে একজন আলেম ভাষণ দিলেন ইমাম হোসেন (রাঃ)-এর শাহাদতের তাৎপর্য বিষয়ে। তিনি ভাষণ দিচ্ছেন, বলিষ্ট তার বক্তব্য। ইমাম হোসেনকে ঘিরে কুচক্রীদের বিস্তৃত ষড়যন্ত্রের রহস্য একে একে উদঘাটন করছেন। তার বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে সমবেত মর্সিয়ার বেদনা-বিধৃত সুরের মূর্ছনা। এতে অনুষ্ঠান আবেগ বিমণ্ডিত হয়ে উঠছে। শ্রোতাদের সবার চোখ দিয়ে একইভাবে গড়িয়ে আসছে অশ্রুর ধারা। অনুষ্ঠান হৃদয়গ্রাহী বলে মনে হল। আমার দারুণ ভাল লেগেছিল। ১৪শ’ বছর ধরে বিপ্লবের বহ্নিশিখা, সেই কারবালার বহ্নিশিখা এভাবেই তারা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। এ কারণেই আজকে প্রতিটি অন্তরের ছোট ছোট আগুন সম্মিলিতভাবে সূর্য-শিখায় পরিণত হতে পেরেছে। এ কারণেই ইরানী জনতার অভিব্যক্তি আপোষহীন। তারা নিঃশঙ্কচিত্তে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাসতে পারে। আর এই ১৪শ’ বছর ধরে আমরা রাজতন্ত্রীদের সাথে আপোষ করে এসেছি। রাজা, বাদশাহ, আমীর আর সুলতানদের ষড়যন্ত্র আমাদের চেতনাকে গ্রাস করে আমাদের ইসলামী স্পৃহাকে হত্যা করেছে। আমরা ইসলামের মূল প্রেরণা থেকে সরে গিয়ে এর ক্ষয়ে যাওয়া খোলসটা আঁকড়ে ধরে বেহেশতের প্রতীক্ষা করছি।

ভাবছি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) পর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবের প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে আজও আমাদের ঘুম ভাঙছেনা কেন? কারণ ওমর (রাঃ) ঝুপড়িতে ইসলামের অনুসন্ধান না করে আমরা তাজমহলের মর্মর পাথরে ইসলামের শান শওকত খুঁজতে ব্যস্ত। আমরা বেহেশতী জেহরা ঈদগাহে ইসলামকে না খুঁজে ফাহাদের দৌলতখানায় ইসলাম খোঁজার চেষ্টা করছি। ইরানের রেজাশাহ পাহলবী ৩৭ বছর জনগণের সম্পদ লুট করে যে সুরম্য ৪টি প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন সেগুলো দেখার আগ্রহ আমাদের কম ছিল না। বিপ্লবের উত্তাল তরঙ্গ প্রসাদের মালিককে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও প্রাসাদগুলো অক্ষত ছিল। নিরস্ত্র জনতার কাছে আমেরিকার মদদপুষ্ট তথাকথিত লৌহমানবের নির্লজ্জ পরাজয়ের কলঙ্ক-চিহ্ন হিসেবে ইরান সরকার প্রসাদগুলোকে সম্পূর্ণ আগের অবস্থায় রেখে দিয়েছেন।। এর ফলে বিপ্লবের সুদৃঢ় ভিত্তিমূল আরও মজবুত হয়েছে। জনগণের কাছে যা এতদিন ছিল অবিশ্বাস্য এবং আরব্য উপন্যাসের কল্পকাহিনী, স্বচক্ষে এবং সুস্পষ্টভাবে এসব অবলোকন করে জনতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, তারা কিভাবে গুটিকতক লোক দ্বারা শোষিত ও বঞ্চিত হয়েছে। চারটে রাজপ্রাসাদের জন্য এক বিরাট মূল্যবান এলাকা অনুৎপাদনশীল খাতে স্রেফ কতিপয় লোকের ভোগ বিলাসের জন্য বিনিয়োগ করা হয়েছিল। প্রাসাদের বর্ণনা দেয়া সম্ভব নয়। আধুনিক সাজ সরঞ্জাম আর আসবাবপত্রের বিপুল সমাহার। এ ছাড়াও পৃথিবী মন্থন করে যা কিছু পাওয়া গেছে যা কিছু শাহের পছন্দ হয়েছে সবগুলোর সমাবেশ ঘটানো হয়েছে এখানে। বিজ্ঞানের সর্বোন্নত ও সর্বশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে প্রাসাদগুলোতে। প্রমোদ কানন, সুইমিংপুল, হেলিপ্যাড, নাচঘর সব রকম আরাম আয়েশ এবং লালসা চরিতার্থ করার সব আয়োজন এখানে বিদ্যমান ছিল। এ ছাড়াও প্রাসাদগুলোকে সুরক্ষিত রাখার জন্য বৈচিত্রময় নিরাপত্তা বেষ্টনী, সর্বাধুনিক আয়োজন ও সমকালীন শ্রেষ্ঠতম অস্ত্র ও উপকরণের ব্যবহারের আধুনিকতম ব্যবস্থা ছিল। এখনও সৌন্দর্য ও সুষমামণ্ডিত সুগন্ধে সুবাসিত হাম্মামখানার কাছাকাছি গেলে মন মাতাল হয়ে ওঠে। সবকিছু দেখে মনে হল, শাদ্দাদের বেহেশত শাহের প্রাসাদের কাছে মাথা নত করবে। প্রাসাদের খাস কক্ষগুলোতে ঢোকার অনুমতি নেই। এ কারণে তালাবন্ধ। জানালা দিয়ে সবকিছু দেখলাম। দেখে আধুনিক শাদ্দাদের জন্য দুঃখ হল। জনগণের সম্পদ লুট করার তার এত আয়োজন-উদ্যোগ। তার আভিজাত্য-স্বাচ্ছন্দের জন্য এত রক্তপাত এত প্রাণহানি। তার পরিণতিটা কি হল? খুনের আসামী হয়ে নিরাশ্রয় ছিন্নমূল তৃণের মত ভেসে বেড়াতে হল পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত। এক ভয়ঙ্কর মৃত্যুভয় তাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে সব সময়। তার অপকর্মের প্রধান সহযোগী সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকাও তাকে ঠাঁই দেয়নি। তার ভাষায়-মৃত ইঁদুরের মত আমেরিকা আমাকে দূরে নিক্ষেপ করেছে। তার ঐশ্বর্য আর বিত্ত-বৈভবের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে শেষ অবধি।

ইরান সফরকালীন সময়ে একদিন তাবরিজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। তাবরিজ ইরানের উত্তর পশ্চিমে সবচেয়ে জনবহুল ও বৃহত্তম প্রদেশ আজারবাইজানের রাজধানী, রাশিয়া ও তুরস্কের সীমান্ত বরাবর অবস্থিত। প্রাকৃতিকভাবে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা প্রতিবাদী ও সংগ্রামী। ষাটের দশকে কোমে আয়াতুল্লাহ খোমেনী আত্মপ্রকাশের পর সরকার বিরোধী যে আন্দোলন উত্তাল হয়ে ওঠে তার ঢেউ তাবরিজে এসে আছড়ে পড়ে। এতে শাহের নির্বিচার গুলীতে ২শ’ লোক প্রাণ হারায়।

১৯৭৮ সালের শুরুতে আবার শাহ-বিরোধী বিপ্লবের গুমোট নিম্নচাপ তেহরানে ঘনীভূত হয়। তাবরিজের সংগ্রামী মানুষগুলো একটা ঝড়ের প্রতীক্ষা করতে থাকে। তারপর প্রচণ্ড ঝড় শুরু হলে এখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের ঢল রাজপথে নেমে আসে। শাহ তার শেষ দিন পর্যন্ত তাদের ফেরাতে সক্ষম হননি। বিক্ষোভ, মিছিল, শোকসভা ও পথসভায় রাজপথ মুখরহয়ে ওঠে। মসজিদগুলো পরিণত হয় বিপ্লবের কেন্দ্র-বিন্দুতে। সাভাক তার নির্মমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে ব্যর্থ হয়। স্থানীয় গ্যারিসনের সৈনিকদের ডাক পড়ে। কিন্তু তাবরিজের মানুষগুলোর মরিয়া মনোভাব লক্ষ্য করে গ্যারিসনের সেনাবাহিনী রাজপথে অবস্থান নিতে অনীহা প্রকাশ করে। এক বিরাট হত্যাযজ্ঞ এড়ানোর উদ্দেশে হয়তো সেনাবাহিনী বর্বরোচিত পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকে। অতঃপর শাহের নির্দেশে হেলিকপ্টার গানশিপ থেকে নিরস্ত্র জনতার ওপর নির্বিচার গুলী চলে। এতে ৫শ’ প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায় চিরদিনের জন্য। এর ফলে আন্দোলনের গতি ব্যাহত হয়েছে এমনটি নয় বরং এতে বিপ্লবের প্রকৃতি আরও ভয়ঙ্কর আরও প্রচন্ড হয়ে উঠে।

এই সেই তাবরিজ যেখানে মসজিদে অনুষ্ঠিত শোকসভার ওপর বাইরের গ্যারিসনগুলো থেকে নিয়ে আসা বর্বর সৈনিকরা গুলীবর্ষণ করে। নিহত মানুষদের গোঙানী, আহতদের আর্তনাদ, প্রতিবাদী জনতার তকবীর, সাইরেন ও গুলীর শব্দে পরিস্থিতি প্রচণ্ড হয়ে ওঠে। অজস্ত্র গুলী বুকে নিয়ে জনতা ধাওয়া করে সৈনিকদের। সেনাবাহিনী পালাতে বাধ্য হয়। নিরস্ত্র জনতার এই কোরবানী, নির্বিচার গণহত্যার বাস্তব চিত্র, আর বিপ্লবের নতুন স্ফুলিঙ্গ ক্যাসেটে বাণীবদ্ধ করে গোটা দেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়। তাবরিজের ঘটনা প্রবাহ, তাবরিজে ঝরানো বিপ্লবী জনতার রক্ত ইরানের ভাগ্য পরিবর্তনের বিরাট প্রেরণা হয়েছিল শেষ অবধি।

মেহমান হিসেবে তাবরিজে অবস্থানকালে তাদের সেই প্রতিবাদী প্রচণ্ড রূপের উল্টো দিকটা দেখে বিস্মিত হয়েছি। তারা যেমন আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠার জন্য জাতীয় প্রয়োজনে উজাড় করে রক্ত ঢালতে পারে; তেমনি মেহমানের পান-পেয়ালায় সরবত ঢেলে হাসিমুখে নিবিড়-সান্নিধ্য দিয়ে সৌজন্য উজার করতে পারে অকাতরে। তাদের মুখেই শুনেছি তারা কিভাবে নির্বিকারে অজস্র জীবন দিয়ে মহান ইসলামী বিপ্লবকে তার অন্তিম লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে গেছে। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আজও তারা রণক্লান্ত হয়ে পড়েনি। শাহাদাতের মঞ্জিলে পৌঁছে তবেই যেন তারা বিশ্রাম নেবে।

ঐতিহাসিক শহর শিরাজ সমুদ্রতল থেকে ১৬শ’ মিটার উচ্চে অবস্থিত। নাতিশীতোষ্ণ এই শহরটিতে আমাদের নিয়ে আসা হল। গুলিস্তাঁ-বুস্তাঁর এই শহরটির বিমোহিত করা মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মানুষকে আবেগময় করে তোলার জন্য যথেষ্ট। সম্ভবতঃ এই কারণে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের চারণভূমি হয়েছে। এটা প্রেয়সীর কপোলের একটা তিলের জন্য সমরখন্দ বোখারাকে বিক্রি করতে উদ্যত ছিলেন যে সৌন্দর্যপ্রিয় কবি সেই হাফিজ এখানে ঘুমিয়ে আছেন। ঘুমিয়ে আছেন মানব সত্তার রহস্য উন্মোচনকারী কবি শেখ সাদী। বিশ্ব সাহিত্যে যেমন তাদের কর্ম মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, অনুরূপভাবে তাদের মাজারগুলোতে সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুরম্য সৌধ। পুষ্পে শোভিত সৌন্দর্য আর সুরভিতে মৌ মৌ করছে মাজার বেষ্টিত ফুলের বাগান। স্মৃতি সৌধগুলোর পুষ্পময় চত্বরগুলো দেখে মনে হল-হুসন্ আর ইশ্ক সৌন্দর্য আর প্রেমের দুটো ধারা এখানে এসে একাকার। এমন মনোরম মোহনায় এই কবিরা এলেও থমকে দাঁড়াতেন। আর তাদের হংসপাখা কথা বলত, গানে গানে মুখর হয়ে উঠত। কিন্তু গানের সেই বুলবুলিরা ‘ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হয়ে।’

পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত কবিদের ভক্ত অনুরক্ত দেখে মনে হল আমি গান গেয়ে উঠি ‘লায়লী তোমার এসেছে ফিরিয়া মজনুগো আঁখি খোল।’ কিন্তু ফুলের জলসায় শায়িত মজনুরা কোনদিন আর আঁখি খুলবে না। তাদের সে ঘুম ভাঙার ঘুম নয়। আমি দোয়া করলাম তাদের জন্য আর বললাম- ‘খোশ রহো আহলে চামান- হে বাগানবাসী তোমরা সুখে থাক’।

দেখলাম, মুসলিম স্থাপত্য আর ঐতিহ্যের জীবন্ত নিদর্শন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুপ্রাচীন জুমা মসজিদ, নয়া মসজিদ। দেখলাম নরেন জেস্তান বাগান ও পারস্য যাদুঘর। শিরাজের সৌন্দর্য সুষমা দেখে যদি কেউ একে বেহেস্তের বাগান বলে তাহলে মনে হয় ভুল হবে না। জুন্দ রাজবংশের আমলে শিরাজকে রাজধানী করার রহস্যও সম্ভবতঃ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। ৪৯ বছর শিরাজ ইরানের রাজধানী ছিল। এখানকার রোমান্টিক কবি একটা নারীর তিলের জন্য সমরখন্দ বোখারা দিতে চাইলেও বিশ শতকের শিরাজ মহান ইসলামী বিপ্লবের শক্তিশালী দুর্গ। বুলবুলি আর গুলবাগের সুর আর সুরভির সমাহারে থেকেও শিরাজের আবাল-বৃদ্ধবনিতা আজানের বিপ্লবী আহবান ভুলেনি। শাহের নিপীড়নের বিরুদ্ধে পাহাড়ের মত প্রতিরোধ মূর্তিমান হয়ে ওঠে এখানে। শিরাজের দুঃসাহসিক জনতার ব্যুহকে ভেঙে ফেলার জন্য শাহী সৈন্যরা তাবরিজের মত এখানকার মসজিদেও নির্বিচারে মেশিনগানের গুলীবর্ষণ করে। বন্দুকের গর্জন, মানুষের আর্তনাদ, কাতর কণ্ঠের আহাজারি, প্রতিরোধকামীদের সোচ্চার তকবীর ক্যাসেটে আজও বাণীবদ্ধ হয়ে আছে। শত শত মানুষ আত্মাহুতি দেয় কিন্তু তবু মৃত্যু-পাগল মানুষগুলোর মুষ্টিবদ্ধ হাত রাজ তখতের ভিত্তিমূলে আঘাত করতে সক্ষম হয়।

আমরা আয়াতুল্লাহ শিরাজীর বাসভবনের দিকে পা বাড়ালাম। বহু মানুষ এখানে। আমাদেরকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হল। আয়াতুল্লাহ শিরাজী বিপ্লবের সুদৃঢ় স্তম্ভ। তার চোখ, চাওনি আর সমস্ত আদল থেকে বিপ্লব বিচ্ছুরিত। বক্তব্য রাখলেন ইংরেজীতে। কোন জড়তা নেই। সুস্পষ্ট বক্তব্য সুদৃঢ় বাচনভঙ্গী তার বাণীগুলো বিসুভিয়াসের অগ্লুৎপাতের মত মনে হল। আমাদের অন্তরে অন্তরে যেন মুহূর্তেই ছড়িয়ে দিলেন এক ভয়ঙ্কর অগ্নিগিরির লাভা। অনেক দিন হয়ে গেছে অথচ তার সেদিনের বক্তব্য আজও আমাকে উদ্বেল করে তোলে।

গাড়ী চলছে। দুর্নিবার গতিতে আমাদের গাড়ী চলছে। কখনও সুদৃশ্য শ্যামল প্রান্তর, কখনও পাহাড়ী পথ অতিক্রম করে আমরা এগিয়ে চলছি। ভাবছি এদেশের মানুষের অপূর্ব ত্যাগ আর কোরবানীর কথা। কতইনা রক্ত দিয়েছে এদেশের মানুষ। আজও দিচ্ছে। কোন ক্লান্তি কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া নেই। বিশ্রামের সময় নেই। সবাই ছুটছে, মোহগ্রস্তের মত ছুটছে এক অন্তিম লক্ষ্য অর্জনের জন্য। ইরানে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করেও এদের নেশা কাটেনি। আল্লাহর দ্বীনকে এরা দুনিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠেছে। এদের অকুতোভয় কর্মপ্রয়াসী জাতীয় উদ্দীপনা দেখে মনে হল এরা যেন বিশ্ব বিপ্লবের জন্যই জন্মেছে। বঞ্চিত মানুষদের নিয়ে সাম্রাজ্যবাদী লুটেরাদের বিরুদ্ধে এদের সংগ্রাম সফল লক্ষ্যে পৌঁছতে দেরী হবে না। তাদের সবারই যেন এই কথা, একই অভিব্যক্তি- ‘হামদার্দ কি আফসানা দুনিয়াকো শুনা দেঙ্গে, হো যায়েগী ফির দুনিয়া আবাদ এতীমো কা'-শুনিয়ে দে এই পৃথিবীকে প্রেম আর ভালবাসার বার্তা, এ পৃথিবীটা আবার হয়ে উঠবে দুঃস্থ, আর এতিমদের আবাসভূমি।

দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছলাম বেহেস্তী জেহরার দোর গোড়ায়। শত শত মানুষের ভিড়। আবাল-বৃদ্ধবনিতার সমাবেশ। অনেক মহিলা মাতম করছে তার ভাই, তার স্বামী, অথবা তার আত্মীয় পরিজনদের জন্য। এই আবেগ বিহবল বেদনার্ত অনুভূতি আমাদের আপ্লুত করে তোলে। আমাদের অজান্তেচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু। দূর দূরান্তের মুসাফির আমরা কখন যে একাকার হয়ে গেছি এদের সাথে। বিরাট কবরগাহ। কবরগুলো সুবিন্যস্ত সাজানো। হাজার হাজার জীবন্ত মানুষ ঘুমিয়ে আছে এখানে। আল-কোরআনে এদেরই বলা হয়েছে জীবন্ত। বলা হয়েছে- ‘এবং তাদের মৃত বলো না যারা আল্লাহর পথে শহীদ।’ এই কবরগুলোর জীবন্ত মানুষরা গোটা জাতির জীবনীশক্তি। ওদের হাতিয়ার গর্জে উঠবেনা কোন দিনও। কিন্তু ওদের জীবন্ত কবরগুলো কিয়ামত পর্যন্ত জাতীয় প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। ওদের খুন আর খাকের দ্রবণ জাতীয় সত্তাকে সঞ্জীবিত করতে থাকবে। প্রত্যেক কবরে শহীদের ছবি টাঙানো আছে, ঘুরে ঘুরে দেখলাম। দুঃসাহসিক সিপাহীদের অধিকাংশ তরুণ। শহীদদের বাবা-মা ও অন্যান্য আত্মীয় স্বজনদের সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছে। স্বজনহারানো বেদনাবোধ স্বাভাবিকভাবে আমরা দেখেছি তাদের মধ্যে। তারা সন্তানদের শাহাদাতের জন্য গৌরবান্বিত। বাকী সন্তানদেরকেও তারা শাহাদাতের রাস্তায় যাওয়ার জন্য প্রেরণা যোগাবে বলে আমাদের জানিয়েছেন।

এই বেহেস্তী জেহরা, এই বিরাট কবরগাহ দেখে মনে হয়েছে, যে জাতি মৃত্যুর জন্য এমন উন্মাদ হয়ে ওঠে তাকে দুনিয়ার কোন শক্তি মারতে পারে না। আমার মনে হল, কোন শক্তিধর পরাশক্তি ইরানের অনিবার্য বিজয় ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। বাংলাদেশের কুটির থেকে ইসলামের বিজয়ের স্বপ্ন দেখা কবির গজলের দুটো কলি এই কবরের তোরণে লেখা থাকলে বোধ হয় মানানসই ও সঠিক হত-

‘শহীদী ঈদগাহে দেখ আজ জামায়েত ভারী
হবে দুনিয়াতে ফের ইসলামী ফরমান জারী।’

ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যকে নিয়ে চিন্তা করতাম। এতদিন যেমন ছিল আশা তেমন ছিল আশঙ্কা। আওয়ামী পঞ্চমবাহিনীর চূড়ান্ত বিজয়ের পর বাংলাদেশে যেমন নেমেছে রাজনৈতিক অবক্ষয়ের ধস, সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে যেমন হয়েছে দেউলিয়া, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যেমন হয়েছে বিপন্ন; তেমন একটা পরিণতির দিকে ইরান এগিয়ে যায় কিনা- এমন একটা উদ্বেগ ছিল দুনিয়ার ইসলামী আন্দোলনের শরীক মানুষগুলোর। কিন্তু ইমাম খোমেনীর আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব বস্তুবাদী কুচক্রড়ী মুজিবের মত ভুল করেনি। আত্মোৎসর্গকারী তরুণদের ময়দান থেকে ঘরে পাঠিয়ে তাদের উদ্দীপ্ত চেতনাগুলোকে মরচে ধরিয়ে বিবর্ণ করেনি। কর্মক্ষেত্র থেকে বিতাড়িত করে কর্মবিমুখ অলস জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করেনি। বেগবান তারুণ্যকে শয়তানের ইন্ধনে পরিণত হতে দেয়নি। ইমাম খোমেনী তাদের সামনে তুলে ধরেছেন জাতীয় পুনর্গঠনের কর্মসূচী।

দক্ষ অদক্ষ তরুণ কর্মী ও ছাত্ররা গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে জিহাদ শাজিন্দেগীর (পুনর্গঠন জিহাদের) কর্মসূচী নিয়ে গেছে। রাস্তাঘাট নির্মাণ, বিধ্বস্ত বাড়ীঘর নির্মাণ, পানি সেচের ব্যবস্থা, গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন, এসব করছে শিক্ষিত অশিক্ষিত তরুণ কর্মীরা। আমরা দেখেছি বিধ্বস্ত ইরানকে তারুণ্যের স্পর্শে তাজা হতে।

দু’বছর স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে ইমাম খোমেনী দেশটাকে পিছিয়ে দিয়েছেন এমন নয়। বরং সমস্ত সিলেবাস, সমস্ত কারিকুলাম পরিবর্তন এবং নতুন পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও প্রকাশের ব্যবস্থা করার জন্য এটুকু সময়ের প্রয়োজন ছিল। আগের মতো শিক্ষা ক্ষেত্রে গোলাম তৈরির সিলেবাস চালু রাখলে হাজার হাজার দেশপ্রেমিকের রক্তদান বিফলে যেতে বাধ্য হত। এ ছাড়াও দুটো বছরের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তথাকথিত বামপন্থীদের সস্তা রাজনীতির আখড়াসমূহ স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছে। এসব দেখে মনে হল, তাপস আধ্যাত্মিক নেতা কত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ও প্রজ্ঞার অধিকারী।

ইরানে জিহাদে শাজিন্দেগী অর্থাৎ পুনর্গঠন জেহাদ সংস্থাটি অল্প কিছু দিনের মধ্যে জনমনে দাগ কাটতে সক্ষম হয় এবং দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। এককালের বিভ্রান্ত তরুনরা নতুন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদের তারুণ্যকে নিয়োগ করেছে জাতীয় পুনর্গঠনে।

সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সবরকমের কুট-কৌশল নিঃশেষ হওয়ায়, দুনিয়ার মুসলমানদের দৃষ্টি ইরানের বিপ্লব থেকে ফিরিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যে ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে শিয়া বিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত করার জন্য আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র চলছে। শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ বিপ্লবের মহানায়ককে কাফের হিসেবে মুসলিম বিশ্বে উপস্থাপন করা হচ্ছে। পরস্পরকে সংঘাতের মধ্যে নিয়ে এসে কায়েমী স্বার্থবাদী লুটেরা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মুসলমানদেরকে নিরংকুশভাবে শোষণ করার পথ পরিষ্কার করছে। প্রচারণার তোড়ে বিভ্রান্ত মুসলমানদের তবু অনেক জিজ্ঞাসা। এসবের সঠিক উত্তরের জন্য ইরানের সুন্নী আলেম খোঁজ করলাম। ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য একজন সুন্নী আলেমকে পেয়ে তার সাথে আলাপ করতে চাইলে তিনি সাগ্রহে রাজী হলেন। তার ভাষায়- ‘ইরানের ইসলামী বিপ্লবের ব্যাপারে সুন্নীরা নীরব ছিল অথবা শাহকে সমর্থন দিয়েছে এমন একটি ঘটনাও আমার জানা নেই। তুর্কমেন, কুর্দ, বেলুচ সব সুন্নীরা শিয়া ভাইদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তার দোসর ইরানের শাহকে উৎখাত করার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম করেছে। বিপ্লবের পরে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের সপক্ষে যে গণভোট অনুষ্ঠিত হয় সেখানেও সুন্নীরা ভোট দিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি তাদের সমর্থন ব্যক্ত করে।

কুর্দীস্তানের উত্তেজনা প্রসঙ্গে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন- ‘ওখানে যারা উত্তেজনা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে তারা শিয়া সুন্নী কোনটাই নয়। সস্তা শ্লোগানের মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদের নীলনক্সা বাস্তবায়নের জন্য কিছু কুচক্রী কাজ করে যাচ্ছে। আমরা শিয়া সুন্নী উভয়ে মিলে তাদের প্রতিহত করছি, ইসলামের পতাকা সমুন্নত রাখার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এখন আগের মত আর সেই অশান্ত অবস্থা নেই। ইমামকে আমাদের নেতা হিসেবে মনে করি। ইমামই আমাদের নেতা, আমাদের পথ প্রদর্শক।’

তিনি আরও বললেন- ‘ইমাম মদ নিষিদ্ধ করেছেন,সুদ উৎখাত করেছেন, রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়েছেন, হেজাব চালু করেছেন, হক আর ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত করেছেণ। আমরা সুন্নীরা কি এ কথাই বলব- মদ খেতে চাই, পর্দার প্রয়োজন নেই, রাজতন্ত্র ফিরিয়ে দাও, সামাজিক সুবিচার অনৈসলামিক? যদি এসব না চাই তাহলে আপনারা বলুন, ইমামের পথ আর আমাদের পথের পার্থক্য কোথায়? ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে যে এক-আধটু পার্থক্য রয়েছে এই পার্থক্যটুকু সাফী, হানাপী, মালেকী, হাম্বলী বিভিন্ন মতাবলম্বীদের মধ্যেও রয়েছে। এ পার্থক্য মৌলিক নয়। অতএব আমাদের বিভেদও নেই। ইরানের সমস্ত শিয়া সুন্নী কায়েমী স্বার্থবাদী, শোষক ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ শক্তি। কায়েমী স্বার্থবাদী ও শোষক শ্রেণী, তা সে শিয়া হোক অথবা সুন্নী হোক, আমরা শিয়া সুন্নী সম্মিলিতভাবে তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরব।’

‘রাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ শত শত বছর ধরে আমাদের শক্তি, সামর্থ্য ও সম্পদ লুট করছে। বিভেদের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে মুসলিম উম্মাহকে শতধাবিভক্ত করছে। ছোট্ট একটা অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের হাতে আমরা মার খাচ্ছি। লাঞ্ছিত হচ্ছি দেশে দেশে, দুনিয়ার সবখানে। সাম্প্রদায়িকতার ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে কোথাও যেন মুসলমানদের ঐক্যে ফাটল ধরাতে না পারে সেজন্য আপনারা যে যেখানে আছেন সেখান থেকে সাম্রাজ্যবাদীদের কুট-কৌশলগুলো দুনিয়ার সামনে তুলে ধরুন।’

ইরানের সুন্নী নেতা বলে চলেছেন- ‘লেবাননের সুন্নী নেতারাও ইমামকে তাদের নেতা হিসেবে মেনে নিয়ে শোষক ও সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে সংগ্রাম করার জন্য দুনিয়ার সকল মুসলমানদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন।’ এ ব্যাপারে ইমাম খোমেনী বলেন- ‘তারা আমাদের মধ্যে মতবিরোধ বাধাতে চায়। আমাদের অবশ্যই হুঁশিয়ার থাকতে হবে। কারণ আমরা সবাই মুসলমান, আল কোরআনের অনুসারী। পবিত্র কোরআন ও তওহীদের জন্য আমাদের অবশ্যই কাজ করে যেতে হবে এবং সর্বশক্তি নিয়োগ করতে হবে।’

জুমআর নামাজের প্রকৃত তাৎপর্য ও গুরুত্ব আমরা ইরানে না এলে বুঝতাম না। নিছক একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বলে আমরা আজও বিশ্বাস করতাম। অথচ এই জুমআর নামাজই এখানে শাসক ও শাসিতের দূরত্ব দূর করে পারস্পরিক নিবিড় সম্পর্কের সীমানায় নিয়ে এসেছে। সরকার ও জনগণের মধ্যে তথ্যের ব্যবধান অর্থাৎ ইনফরমেশন গ্যাপ দূর করার এই যে ধর্মীয় অনুভূতিসিক্ত সর্বাধুনিক ব্যবস্থা এমনটি পৃথিবীর আর কোন রাজনৈতিক মতবাদ দিতে পেরেছে বলে আমার জানা নেই।

বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অজস্ত্র সামিয়ানার নিচে লক্ষ লক্ষ মানুষ সমবেত হয় নামাজের জন্য। স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ইমামের দায়িত্ব পালন করেন। খোতবায়ে দাঁড়ালে হাতে থাকে অটোমেটিক মেশিনগান। এ যেন রাসূলুল্লাহর (সাঃ) হাতের লাঠি, ১৪শ’ বছর পর অটোম্যাটিক মেশিনগানে পরিণত হয়ে গেছে। মনে হয় সময়ের এই যে ব্যবধান সেটা এখানে এসে দূর হয়ে গেছে। এ যেন সার্ভাইভাল অব দি ফিটেস্ট-এর অনিবার্য পরিণতি। পৃথিবীটা যোগ্যতমের আবাস। কালের ব্যবধানে যোগ্যতার বিবর্তনও আনতে হবে স্বাভাবিকভাবে। সময়ের গতির সাথে জীবনকেও গতিশীল করে তুলতে হবে। ইরানের সামগ্রিক নেতৃত্বে এ দিকটায় কোন ফাঁক চোখে পড়ল না। ইমামের খোতবার জন্য তিন চার স্তর বিশিষ্ট কোন মেহরাব নয়, ভূমি থেকে ১৫ ফুট উঁচু একটা ডায়াস, এর থেকে বেশ কিছু দূরে একটা স্টেজ। এমন না হলে লক্ষ লক্ষ মুসল্লীদের মধ্যে খোতবা দেয়া সম্ভব নয়। সমবেত জনতার সংখ্যা অনুমান করার চেষ্টা করলে ভুল হবে, কেননা সাড়িবদ্ধ জনতার শেষ প্রান্তটি চোখে পড়ে না।
খোতবা আমাদের দেশের মতই দুটো পর্যায়ে বিভক্ত। এ ব্যাপারে আমরা ১৪শ’ বছর আগে রয়ে গেছি। অর্থাৎ সেই পুরানো দিনগুলোতে যে খোতবা পরিবেশন করা হত হুবহু সেটিকে পাঠ করা হয় মাত্র। তাও সেটা পাঠ করা হয় আরবীতে। যা অনেকেই শুধুমাত্র পুণ্যের আশায় চোখ বন্ধ করে অন্ধের মত শুনে যায়। কিন্তু গণমনে এর বিশেষ প্রতিক্রিয়া হয় বলে আমার মনে হয় না।
অথচ এখানে প্রথম পর্যায়ে খোতবা দেয়া হয় চলতি ঘটনা প্রবাহ সামনে রেখে। এতে রয়েছে জাতীয় মূলনীতির আলোকে গৃহীত কর্মসূচীর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ। দ্বিতীয় পর্যায়ে আলোচিত হয় ইসলামের হুকুম আহকাম ও তাত্বিক দিক নিয়ে। এখানে সমস্ত পর্যায়ের সরকারী কর্মকর্তা ও জাতীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকেন।

এই কেন্দ্রীয় জামায়াত ছাড়াও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে একইভাবে জুম্মার জামায়াত অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় জামায়াত পরবর্তীতে টেলিভিশনে প্রদর্শিত হয়।

ইসলামী বিপ্লব যে শুধুমাত্র রাজতন্ত্রের ভিতকে উপড়ে ফেলেছে, ইমামের ভাষায় ‘বড় শয়তান’ আমেরিকাকে ইরানের মাটি থেকে উৎখাত করেছে তা নয়; পুঁজিবাদ ও পাশ্চাত্য জীবন দর্শনসৃষ্ট ইরানের জাতীয় সত্তার গভীরে প্রোথিত অপসংস্কৃতিকে সমূলে উৎপাটিত করতে সক্ষম হয়েছে।

তথাকথিত নারী স্বাধীনতার নামে মেয়েদেরকে মাতৃত্বের মর্যাদার আসন থেকে সরিয়ে পুরুষদের ভোগ বিলাস ও লালসার একমাত্র সামগ্রীতে পরিণত করা হয় বিপ্লব-পূর্ব ইরানে। বারাঙ্গনা ও প্রমোদবালায় পরিণত হয় ইরানের অগণিত নারী। সমগ্র জাতীয় সত্তার অর্ধেক এই নারী সমাজকে অনিবার্য ধ্বংসের কিনার থেকে মুক্তির নব দিগন্তে টেনে আনে ইরানের ইসলামী বিপ্লব। তাই বলে ইরানে নারী সমাজকে অবরুদ্ধ করা হয়নি। নিশ্চিদ্র অবগুণ্ঠনে আবৃত করেও রাখেনি। হিজাব অর্থাৎ শালীন পোশাক পরিহিত অবস্থায় ইরানের মেয়েদের অবাধ বিচরণে কোন বাধা নেই। ইরানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত কোন মেয়ে যদি একাকী হেঁটে যায় তাহলে তাকে স্পর্শ করা তো দূরের কথা তার দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে কেউ তাকিয়েও দেখেতে পারবে না।

আজকের ইরানে একটিও বারবনিতা নেই। এ সবের ভাগারগুলো নির্মূল করা হয়েছে। পুনর্বাসন করা হয়েছে এদের। ইসলামী বিপ্লব এদেরকে বারবনিতা থেকে গৃহবধূতে পরিণত করেছে। পথে ঘাটে সবখানে আমরা দেখেছি মেয়েদের অবারিত পদচারণা কিন্তু শালীন পোষাকে আবৃত। তথাকথিত উদারনীতির নামে লালসা সৃষ্টি করার মত কোন পথই খোলা রাখা হয়নি। এখানকার মহিলারা বুঝেছে হিজাব তাদের নিরাপদ আশ্রয় ও মর্যাদার প্রতীক। বুঝেছে ইসলামী বিপ্লব মেয়েদের অধিকার সংরক্ষণের উত্তম গ্যারান্টি। আজকের ইরান সিনেমা, সাহিত্য, শিল্পকলার মাধ্যমে মেয়েদের হিজাবে উদ্বুদ্ধ করছে সূক্ষাতিসূক্ষ্ম কৌশল প্রয়োগ করে। ইমামের বাণীসমূহ ইরানের সমগ্র নারী সমাজকে হিজাবে উদ্বুদ্ধ করেছে সবচাইতে বেশী। ইমামের ভাষায় : ‘শত্র“রা আমাদের শহীদের রক্তকে ততটা ভয় করে না যতটা ভয় করে আমাদের বোন ও মেয়েদের হিজাবকে। হিজাব শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র।’

বিপ্লবের পর হিজাব প্রচলনে তথাকথিত পাশ্চাত্য সভ্যতার ধ্বজাধারীরা এর বিরুদ্ধে মহিলাদের উত্তেজিত করার চেষ্টা করে। অত্যন্ত মুখরোচক একটি শ্লোগান সামনে নিয়ে ময়দানে নামে। তাদের দাবী- ‘স্বাধীনতার বসন্তে স্বাধীনতা চাই।’ বামপন্থী ও পাশ্চাত্যপন্থীদের প্ররোচনায় হাজারখানেক মহিলা পাশ্চাত্য পোষাকে সুসজ্জিত হয়ে রাজপথে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এর কয়েক দিন পরে দু’লক্ষ মহিলা হিজাব পরিহিত অবস্থায় হিজাবের সপক্ষে মিছিল বের করে ইসলামের বিরুদ্ধে দক্ষিণপন্থী ও বামপন্থীদের এই ষড়যন্ত্রকে গুঁড়িয়ে দেয়। আসলে ইরানে ইসলামী বিপ্লবকে তার চুড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য পুরুষের পাশাপাশি মেয়েরাও সমান তালে এগিয়ে চলেছে। ১৯৭৮ সালে ৮ সেপ্টেম্বর ব্লাক ফ্রাইডে অর্থাৎ কালো শুক্রবারে তেহরানের রাজপথে গুলী চালিয়ে যে চার হাজার নিরস্ত্র জনতাকে হত্যা করা হয়, তার মধ্যে ৬শ’ জনই ছিলেন মহিলা। এত বড় কোরবানী দুনিয়ার কোন বিপ্লবে মহিলারা দিয়েছে কিনা আমার জানা নেই।

মেয়েদের হিজাবে উদ্বুদ্ধ করে ইরান সরকার তাদের দায়িত্ব শেষ করে দিয়েছে এমন নয়। মেয়েদের শিক্ষা বিস্তার এবং আর্থিক ও সামাজিক অধিকার সংরক্ষণের আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছে। মেয়েদের স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। এমনকি সামরিক ট্রেনিংও দেয়া হচ্ছে হাজার হাজার মেয়েকে। সেদিনের অবলা মেয়ে, তথাকথিত পাশ্চাত্য সভ্যতার ধারকদের ক্রীড়নক অসহায় মেয়েরা কাঁধে বন্ধুক নিয়ে ইসলামী বিপ্লব ও জাতীয় ইজ্জত আযাদীর অতন্দ্র প্রহরীতে পরিণত হয়েছে। তেহরানের মেয়েদের শালীন অথচ দৃপ্ত পদচারণা আমি অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করেছি আর ভেবেছি, কি এক যাদুর স্পর্শে সমগ্র ইরানের ঘরে বাইরে একইভাবে এমন একটা বিপ্লব সংঘটিত হল।

ইরানের শিল্পকলা ও সাহিত্য থেকে অপসংস্কৃতিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় দেয়া হয়েছে। ইসলামী ভাবধারায় অবগাহন করে সঙ্গীত এখন ব্যষ্টি থেকে সমষ্টিতে ব্যপ্ত হয়েছে। ‘তুমি’র ক্ষুদ্র পরিসর থেকে বেরিয়ে জাতীয় সত্তায় বিলীন হয়েছে। ভোগ বিলাসের দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে আধ্যাত্মিক শক্তিতে সমৃদ্ধ হয়েছে। ইরানের চলচ্চিত্র নতুন জগতে প্রবেশ করেছে। ইসলামের স্পর্শে চলচ্চিত্র আজ একটি জাতীয় শক্তি। ‘আর্ট ফর আর্টস সেক’ এমন ভোগ-বিলাসী ধারণার অবকাশ ইরানে নেই। আর্টের উদ্দেশ্য-মানুষ গড়ে তোলা। ইকবালের ভাষায়, ‘আর্টের লক্ষ্য যদি হয় মানুষ গড়ে তোলা তাহলে এ আর্টই হতে পারে পয়গম্বরীর উত্তরাধিকার।’ পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা দার্শনিক কবি ইকবালের বাণীই যেন ইরানে বিমূর্ত। ইকবাল আরও বলেছেন- ‘শামশিরই সনন আওয়ার তুসই রুবাব আখের।’ অর্থাৎ ‘তরবারী আর শৌর্যবীর্য একটা জাতির উত্থান এনে দেয় আর সেই জাতির পতনকে ত্বরান্বিত করে উদ্দেশ্যহীন গান বাজনা। ’ সম্রাট বাহাদুর শাহের জলসাঘরে যখন গজল আর ঠুংরীর রেওয়াজ হচ্ছে, এস্রাজ আর তানপুরার তারে তরঙ্গ তোলা ভৈরবীর আলাপে হায়দরাবাদের নিযামের দরবার যখন তন্ময়, নবাবরা যখন শরাবে বুঁদ হয়ে মদালস ঢুলু ঢুলু বিরস চোখে সুন্দরী সাকীর দিকে চেয়ে চেয়ে রুবাইয়াতে পাঠ নিচ্ছে, ঠিক সে সময়ই ইংরেজরা সমবেত বুটের আওয়াজ তুলে রাজপথ জনপদ গিরি-কান্তার পেড়িয়ে লাল কেল্লায় করেছে পদাঘাত। তারপর ২শ’বছর জিল্লতির শিকল পরিয়ে রেখেছে উপমহাদেশের মুসরমানদের। আজও তাদের দেয়া অপ-সংস্কৃতি প্রতিনিয়ত জাতীয় সত্তাকে ধ্বংস করছে। পৃথিবীর একটি মাত্র দেশ ইরান ১৪শ’ বছর পর সমস্ত প্রভাব আর চক্রান্তের ব্যুহ ভেদ করে আপন মহিমায় ভাস্বর।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও ইরান এক অভাবনীয় পরিবর্তন আনতে সক্ষম হয়েছে। শিক্ষার দ্বার উন্মুক্ত করা হয়েছে আপামর জনসাধারণের জন্য। পাশ্চাত্যের সেবাদাস সৃষ্টি  করার উদ্দেশ্যে শুধুমাত্র উচ্চ শ্রেণীদের জন্য উন্মুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে একই শিক্ষাপদ্ধতির আওতায় আনা হয়েছে সব প্রতিষ্ঠানকে। যেকোন শ্রেণীর মানুষের জন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অবারিত।

শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে পুঁজিপতিদের আধিপত্য ও আমলাদের আধিপত্য বিলোপ করা হয়েছে শ্রমিক শ্রেণীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। শ্রমিক সাধারণের জীবনের মান পাল্টে গেছে পুরোপুরি। বামপন্থীদের একমাত্র হাতিয়ার শ্রমিক শ্রেণী ইসলামী বিপ্লবের স্পর্শে পেয়েছে নতুন জীবনের সন্ধান। শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের বেতনের ব্যবধান কমিয়ে ১:৩ এ সীমাবদ্ধ হয়েছে। এমনকি ৮ ঘন্টা কর্ম সময়ের এক ঘন্টা বরাদ্দ করা হয়েছে শ্রমিকদের জীবনবোধ বিকাশের উদ্দেশ্যে, নৈতিক ট্রেনিং দানের জন্য।

ইরানের কারাগারগুলো এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিণত হয়েছে। বিপথগামীদেরকে এখানে বিভিন্নভাবে পাঠ অনুশীলনের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরিয়ে আনার অব্যাহত প্রয়াস আমরা কারাগারগুলোতে ঘুরে ঘুরে দেখেছি। দেখেছি মুজাহেদীনে খালকের সদস্যদের ও তুদেহ পার্টির তরুণ কর্মীদের ওপর বল প্রয়োগ করে নয় বরং সদাচারের মাধ্যমে এদের মন-মগজে ইসলামী চিন্তা-চেতনা প্রবিষ্ট করানো হচ্ছে। আবেগ আর প্ররোচনার পথ পরিহার করে ক্রমশঃ তারা ইসলামী জীবনবোধের দিকে ফিরে আসছে। বেশ কিছু কারাবাসীদের সাথে আমাদের কথা হয়েছিল, তাদের সবার বক্তব্য ছিল প্রায় একই। তা হল- ‘আমরা নতুন পথের সন্ধান পেয়েছি, পুরান মদের বোতল ভাংতে আমাদের একটুও সংকোচ নেই। বিদেশী আর বিজাতীয় গোলামী আর নয়, বিভ্রান্তির দিন আমাদের শেষ হয়ে গেছে। ইমামের নির্দেশে আমরা জাতীয় স্বার্থে কাজ করে যাব।’

সবচেয়ে বড় কথা, কারাবাসীদের পরিবারবর্গদের অর্থনৈতিক প্রয়োজন ও সামাজিক মার্যাদার দিকে লক্ষ্য রাখা হয়। অপরাধী পুত্র অথবা স্বামীর কারাদণ্ড হলে সরকারই সেই পরিবারের অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করে থাকে অথবা কোন বিকল্প ব্যবস্থা নেয়। একটা অপরাধীকে শায়েস্তা করার জন্য পাঁচটা অপরাধীর জন্ম দিতে চায় না ইরান।

ইসলাম ও তাওহীবাদের প্রকৃতিটা সম্ভবত আল্লাহ এমনই করে দিয়েছেন। যখন পৃথিবীর কোন জনগোষ্ঠী তাদের জিন্দেগী এবং তাদের সমাজে একে বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে তখনই সে জনগোষ্ঠীকে দুনিয়ার কায়েমী স্বার্থবাদীরা জোটবদ্ধ হয়ে সর্বাত্মকভাবে উৎখাতের উদ্যোগ নেবে। এমনটি না হলে বুঝতে হবে সেই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইসলামের সত্যিকার প্রাণশক্তি নেই। মৃত লাশকে কেউ আঘাত করে না। রাসূলে পাক (সাঃ) সেই সমাজেরই শ্রেষ্ঠতম মানুষ হয়ে যখন ইসলামের দাওয়াত দিলেন, হকের এই দাওয়াত কায়েমী স্বার্থবাদীরা কবুল তো করেইনি বরং সম্মিলিতভাবে ইসলামকে অঙ্কুরে বিনাশ করার চেষ্টা করেছে। জন্মভূমি ত্যাগ করে ২৬০ মাইল দূরে মদিনায় হিজরত করেও ষড়যন্ত্র থেকে রেহাই পাননি তিনি।

স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক নিয়মে ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে একই সংকটের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। বিজয় ছিনিয়ে আনতে ৭০ হাজার মানুষকে দিতে হল আত্মাহুতি, লক্ষাধিক মানুষ হল ক্ষত বিক্ষত। এরপরও শতাব্দীর এই শ্রেষ্ঠতম বিপ্লব সংকট থেকে নিষ্কৃতি পেল না। দুনিয়ার সবকটি পরাশক্তি ও কায়েমী স্বার্থবাদীরা সুপরিকল্পিতভাবে ইরানের সম্মুখে সংকটের আবর্ত সৃষ্টি করল।
আমেরিকা ও তার দোসররা দুইভাবে তাদের স্বার্থে কাজ করতে শুরু করল। প্রথমত পাশ্চাত্য প্রভাবিত ব্যক্তিত্ব সমূহের ভাবমূর্তি বড় করে তুলে ধরার চেষ্টা করা হল- যেমন ক্ষমতার চাবিকাঠি তাদের অনুচরদের হাতে এসে পড়ে। আর্ন্তজাতিক প্রচার মাধ্যমগুলোকে ব্যবহার করা হল একই উদ্দেশ্যে।

দ্বিতীয়তঃ ইসলামী নেতৃবর্গ, যারা অনমনীয় ও আপোষহীন, যাদের বিবেককে কেনা সম্ভব হবে না, তাদের জীবননাশের পরিকল্পনা নেয়া হল। বিপ্লবের মাত্র দু’মাসের মধ্যেই ইসলামী ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম চীফ অব স্টাফ জেনারেল কায়ানীকে খুনীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়। ইসলামী চিন্তাবিদ আয়াতুল্লাহ মোতাহারীকে খুন করা হয়। শহীদ হলেন মোফাত্তেহ, কাজী তাবাতাই, ডক্টর বেহশ্তী, রেজাই ও বাহানোর-এর মত প্রথম শ্রেণীর ব্যক্তিত্ব। রাতের অন্ধকারে খুন হল বহু বিপ্লবী রক্ষী, তেহরান পরিণত হল সন্ত্রাসবাদের আখড়ায়।

বনীসদর ক্ষমতাসীন হয়ে আমেরিকান নীলনক্সা মত কাজ শুরু করল। সুপরিকল্পিত ভাবে ইমামের ভাবমূর্তি নষ্ট করার উদ্যোগ নিল। বিপ্লবের ইসলামী চরিত্র হনন করে এতে জাতীয়তাবাদী চরিত্র আরোপের চেষ্টা করা হল। জনগণকে লক্ষ্যচ্যুত করাই ছিল এর মুখ্য উদ্দেশ্য।

সিআইএর সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম চক্রান্ত উপলব্ধি করতে ইরানের বিপ্লবী জনতার বাকি রইলো না। বিপ্লবী ছাত্ররা গোয়েন্দাবৃত্তির আড্ডাখানা তেহরানস্থ আমেরিকান দূতাবাস দখল করল। আমেরিকার জন্য ছিল এটা প্রচণ্ড আঘাত। যুগ যুগ ধরে গোয়েন্দা তৎপরতার দ্বারা বিস্তৃত প্রচারণা চারিয়ে আমেরিকা বিশ্ববাসীর সামনে আরব্য উপন্যাসের দানব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। সেই ভাবমূর্তি ভেঙে পড়ল। যেন হিন্দুশাস্ত্রের বিশ্বসংহারী কালী মূর্তির বিসজর্ন হল দূতাবাস দখলের মাধ্যমে। আমেরিকা ইরানের সম্পদ আটক করল। এতেও বরফ গললো না। জিম্মি উদ্ধার ও ইরানের কৌশলগত অবস্থানগুলোতে ধ্বংসাত্মক অভিযান চালানোর উদ্দেশ্যে পরিচালিত ষড়যন্ত্র খোদার মেহেরবানীতে তাবাসের মরু বালুকায় সমাধিস্থ হল।

এরপর আমেরিকা মরিয়া হয়ে উঠল। ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার অবস্থান আর দৃশ্যের বাইরে রইল না। একদিকে উপর্যুপরি অন্তর্ঘাতের মাধ্যমে এবং বনিসদরের কর্মকাণ্ড দিয়ে ধাপে ধাপে গোটা দেশকে অরাজকতার দিকে এবং অভ্যুত্থানের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলল, অন্যদিকে ইরাককে দিয়ে প্রচণ্ড আঘাত হেনে ইরানকে শায়েস্তা করতে চাইল। ঘরে বাইরে সবখানে সবদিক দিয়ে ইরানকে বিপর্যস্ত করে তুলল আমেরিকা।
আশির সেপ্টেম্বরে ভয়ঙ্কর আক্রমণের মধ্য দিয়ে এক দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের সূচনা করল ইরাক। বোমা আর গোলার আঘাতে বড় বড় শহরগুলো বিধ্বস্ত হল। কাসরে শিরিন, আবাদান, খুররম শহর, ইলম সালামচে, দেজফুল এবং নাফত শহরের ২০ লাখ মানুষ হল বাস্তুহারা। বিরাট বিরাট দালান গুঁড়িয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হল। বোমা ও গোলার আঘাতে ধ্বংসের অবশিষ্টটুকুও বুলডোজার দিয়ে ধুলিস্যাত করা হল। চেঙ্গিস আর হালাকুর প্রেতাত্মা যেন সাদ্দামের ওপর ভর করল। তাতারী আক্রমণের মুখে যেমন বাগদাদ জনমানবহীন বিধ্বস্ত নগরীতে পরিণত হয়, সীমান্তের সমৃদ্ধ শহরগুলোতে ইরাক তেমনই নৃশংসতার স্বাক্ষর রাখল। এইসব ধ্বংসস্তূপ আমি ব্যাপকভাবে ঘুরে ঘুরে প্রত্যক্ষ করেছি।

পাশ্চাত্যের সব কটি পরাশক্তির বিপরীত বলয়ে অবস্থান করেও প্রাচ্যের সোভিয়েত ইউনিয়ন ইরাককে সর্বাধুনিক সমরাস্ত্র সরবরাহ করল। মুসলমান হয়েও আমেরিকার ইঙ্গিতে ফাহাদ, হাসান, হোসেন, সাদাত, প্রমুখরা প্রত্যক্ষভাবে এবং পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করল ইরাককে।

একাশীর ২৮ জুন আমেরিকার চরেরা বোমা মেরে ডঃ বেহেশতীসহ ৭২ জন পার্লামেন্ট সদস্যকে একইদিনে একই জায়গায় শহীদ করলো। জুমআর নামাজের ইমাম আয়াতুল্লাহ মাদানী, আয়াতুল্লাহ যাদুকী, আয়াতুল্লাহ দস্তগীর, আয়াতুল্লাহ ইস্পাহানী সহ অগণিত দেশপ্রেমিক দ্বীনি আলেম ও গণনেতাদের হত্যা করা হল। শহিদী রক্তে সঞ্জীবিত হয়ে গর্জে উঠল সমগ্র জাতি। আমেরিকার দালাল বনিসদরকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হল। যুদ্ধের গতি পাল্টে গেল। প্রতিঘাতের সম্মুখীন হল ইরাকের আগ্রাসী বাহিনী। ইসলামের সৈনিকরা তাদের তাড়িয়ে নিয়ে গেল ইরাকের মাটিতে। কুচক্রীরা তখন শান্তির সপক্ষে যুদ্ধবিরতির জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। পাশ্চাত্যের প্রতিক্রিয়াশীল প্রচার মাধ্যমসমূহ, যারা এতদিন আগ্রাসনের সপক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তোলার দায়িত্ব নিয়েছিল। তাদের কণ্ঠে শোনা গেল নতুন গান। আশির ১৩ জানুয়ারী দি টাইমসের সম্পাদকীয়তে লেখা হল- Never invade a revolution. বিপ্লবকে আঘাত করো না। একই সম্পাদকীয়তে বলা হল- Unexpected resistance offered by the Iranian in the face of Iraqi armoured advances. ইরাকী গোলন্দাজের আক্রমণের মুখে ইরানের প্রতিরোধ অপ্রত্যাশিত।

ইরানে আমরা সপ্তাদুয়েক অবস্থান করেছি। এ সময়গুলোতে মনে হয়েছে আমি আত্মীয় পরিবেষ্টিত হয়ে অবস্থান করেছি আমার আপন গৃহে। ইরানের মানুষগুলোকে মনে হয়েছে আমার আত্মার আত্মীয়। মুহূর্তের জন্যও মনে হয়নি ২ হাজার মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত এই দেশটিতে আমি একজন অতিথি। এখানে সম্পন্দিত হতে দেখেছি আমার আত্মার প্রতিধ্বনি, দেখেছি আমার দীর্ঘ দিনের লালিত স্বপ্নের বিমূর্ত প্রকাশ। কত সৌভাগ্যবান এদেশের মানুষ। এদের জীবন, এদের মুত্যু, এদের সংগ্রাম, এদের সাধনা এক মহান লক্ষ্যে আবর্তিত হচ্ছে। এখানে এই মাটিতে মরণেও সুখ, বেঁচে থাকায় নিবিড় প্রশান্তি, সংগ্রামে অপূর্ব শিহরণ। আমার মনে হয়েছে- আমৃত্যু এখানে যদি থাকতে পারতাম। কিন্তু আজকেই ইরানে আমার অবস্থানের শেষ দিন আগামীকাল ২২ আগস্ট ১৯৮২ স্বদেশের উদ্দেশ্যে বিমানে চাপতে হবে।

আবার ভাল করে দেখার ইচ্ছা জাগলো। শেষ বারের মত দেখার ইচ্ছা হল এদেশের স্বাধীন মানুষগুলোর দৃপ্ত পদচারণা। পথে নামলাম। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে হাঁটছি। শোহাদা স্কোয়ারের দিকে এগিয়ে চলেছি। দেয়ালে দেয়ালে টাঙানো ইমামের প্রতিচ্ছবি। কত বিচিত্র শৈল্পিক আখরে পুরিপূর্ণ হয়ে আছে দেয়ালগুলো। ইংরেজী ফারসীতে লেখা অজস্র শ্লোগান। আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাহু ছাড়াও অজস্র কোরআনের উদ্ধৃতি, যেদিকে তাকাই সেদিকে চোখ পড়ে। ইংরেজীতে লেখা Neither East nor West, Islam is the best. এ শুধু দেয়ালের লিখন নয়। দুই পরাশক্তিকে ইরানীরা দুই কনুইয়ের গুতোয় দুই প্রান্তে সরিয়ে রেখেছে। ঐশী নির্দেশকেই তারা মনে করে তাদের একমাত্র পথ। ইতিহাসের গতিধারায় মার্ক্সের দ্বান্দ্বিক পথ পরিক্রম করে ইসলাম আজকের ইরানে যেন সেনথিসিসের অনিবার্য পরিণতি হয়ে এসেছে। দান্দ্বিক পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে তো এটা এমনিতেই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। পুঁজিবাদ থিসিস, সমাজতন্ত্র এন্টিথিসিস, ইসলাম সেনথিসিস। যে কোন বিছার বিশ্লেষণে ইসলাম একটি তৃতীয় স্রোত, আল কোরআনের ভাষায় মধ্যপথ।

একটা দেয়ালের লিখন চোখে পড়ল। ইরানের বিপ্লবী জনতার এই লিখন সমাজতন্ত্রের আবেগে তাড়িত দুনিয়ার নিগৃহীত মানুষের চোখ খোলার জন্য যথেষ্ট। জুলুম নিপীড়ন শোষণ বঞ্চনা অবসানের সমাজতন্ত্রের একচেটিয়া ইজারাদারীর বিরুদ্ধে এটাকে একটা চ্যালেঞ্জ বলতে হয়। দেয়ালে লেখা ছিল- Mr. Marks, Is riligion opium of the society? Arise and see, the religion has created a revolution, not economic forces. মিঃ মার্কস, ধর্ম কি সত্যি আফিম! ওঠো, উঠে দেখ, অর্থনৈতিক শক্তি নয়, ধর্মই সৃষ্টি করেছে একটি বিপ্লব।

আমি পড়লাম। বার বার পড়লাম। মনে হল আমার দেশের বিপ্লবী তরুণদের জন্য অনেক কিছু পেয়ে গেছি। এক নিবিড় প্রশান্তি নিয়ে ফিরে এলাম হোটেলে। আগামী কাল ঢাকায় ফিরে যাব।

‘দূর আরবের স্বপন দেখি বাংলাদেশের কুটির হতে।’ এ শুধু জাতীয় কবি কাজী নজরুলের স্বপ্ন নয়। এ স্বপ্ন বাংলাদেশের প্রতিটি মুসলমানের প্রাণের অভিব্যক্তি। বাংলাদেশের প্রতিটি মুসলমানের আবেগ বিদ্ধৃত হয়েছে কাজী কবির সেই মরমী গানের প্রথম কলিতে কিন্তু কয়জনের ভাগ্যে জোটে। আজন্ম লালিল এ স্বপ্ন ছিল আমার, মার ইচ্ছে ছিল, আমি জেল থেকে বেরুলে আমাকে নিয়ে হজ্জে যাবে। রাসূলের দেশে। রাসূলে পাকের (সাঃ) পদচারণায় পবিত্র মাটির সাহচর্যে হাবীবে খোদার নিঃশ্বাস প্রশ্বাস সঞ্জাত নির্মল হাওয়ার সংস্পর্শে সেই আরাফাত, সেই খানা-এ-কাবা, সেই রওজা মোবারক, সেই মসজিদে নববীতে আমাকে নিয়ে মায়ের ঘুরার কত যে সাধ ছিল সে আমি জানি। সেই অপূর্ণ সাধ বুকে নিয়ে মা আমার চির নিদ্রার কোলে ঘুমিয়ে গেছেন। মা ইন্তেকাল করেছেন কিন্তু মায়ের সেই স্বপ্ন, সেই সাধ আমার মধ্যে প্রবাহিত রেখেছেন। বাইরে এসে মুক্ত আলো বাতাসেও মায়ের সেই অতৃপ্ত আকাক্সক্ষা, অপূর্ণ সাধকে ঘুমাতে দিইনি। সময় ও সুযোগের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছিলাম।

ইতোমধ্যে ইরান সফর শেষ হয়েছে। রক্ত আর আগুনের তুফান বছরের পর বছর বয়ে চলেছে যে মাটিতে। সেই শহীদী খুন আর খাকের ছোঁয়া নিয়ে আমার সংগ্রামী চেতনাকে শানিত করে এসেছি। এখন রাসূলের দেশের উত্তপ্ত বালুকায় দাঁড়িয়ে লু হাওয়ার আগুনে জ্বলে পুরে খাঁটি হতে চাই, নিখাদ করতে চাই আমার প্রত্যয়কে। এর জন্য দিন রাত আল্লাহর সাহায্য কামনা করেছি। আল্লাহর রাস্তায় চলা মুসাফিরের নিজের ইচ্ছা বলে তো কিছু থাকতে নেই। ৪০ বছরের দণ্ডপ্রাপ্ত একজন কয়েদীর ১০ বছরের মধ্যেই খালাস হলাম, সেওতো আল্লাহর ইচ্ছা। কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে আমার মালিকের সাথে আমি একাকার হয়ে গেছি। তাঁর ইচ্ছার কাছে সমর্পিত করেছি নিজেকে। আমার মায়ের অন্তিম ইচ্ছা এই হজ্জ পালনের সুযোগ তিনিই আমাকে করে দিয়েছেন। নিয়মনীতির বেড়া ডিঙিয়ে হজ্জ্বের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে। এক পা এক পা করে সেই দিনটিও এসে উপস্থিত।

বিরাশি ১৪ অক্টোবর। তখন রাত। নির্দিষ্ট সময়ের বেশ আগে জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে উপস্থিত হলাম। আমি ও কাজী আজিজুল হক ভাই, বিশেষজ্ঞ ডাঃ মঞ্জুর মোর্শেদ ভাইয়ের সহযোগিতায়। আলোয় ঝলমল চারিদিক। একটা জীর্ণ শীর্ণ কঙ্কালসার রমণীর মেকআপ করা মুখ যেন এই ঢাকা জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। মনে হল, দারিদ্র-স্পর্শতায় বিবর্ণ, বিবস্ত্র রমণীর মুখাবয়বে বেনারসীর ঘোমটা। গোটা দেশে অন্ধকারের অমানিশা আর এখানে আলোর বন্যা। মনে হল জীর্ণ দেহটার সমস্ত রক্ত সিরিঞ্জ দিয়ে টেনে এনে সমস্ত মুখমণ্ডলে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কি বিচিত্র এদেশ সেলুকাস! ‘নিরানব্বাই’-এর ঘাড়ে পা রেখে ‘এক’ এমনি করে জিজ্ঞাসা চিহ্নের মত আর কতদিন দাঁড়িয়ে থাকবে?

মঞ্জুর ভাই যিনি এই শীতের রাতে কষ্ট স্বীকার করে বিমান বন্দরে আমাদের নিয়ে এলেন এবং আমাদের বিমান আকাশে পাখা মেলার পরেও আজকের রাতটা বিমান বন্দরেই তাকে কাটাতে হবে। এই মঞ্জুর মুরশেদ ভাই তার প্রাইভেট কারে বসে কথা বলতে গিয়ে একসময় আমাকে জানিয়েছিলেন তার জীবনের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা। মঞ্জুর ভাই পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সদস্য হিসেবে ঢাকা কলেজে কাজী আজিজুল হক ভাইয়ের নেতৃত্বে কাজ করতেন। মেধাবী ত্যাগী সদালাপি প্রশান্ত-চিত্ত মিষ্টিভাষী সাহসী কর্মী হিসেবে ৬০’র দশকে তার সুখ্যাতি ছিল। হামিদুর রহমান তথাকথিত শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে আজিজ ভাইয়ের সাথে তিনিও কারাবরণ করেন। ’৭১ সালে জাতীয় যুগসন্ধিক্ষণে ব্লাক ১৬ ডিসেম্বরের পর তার প্রতিবেশী তাকে মুক্তিফৌজের হাতে ধরিয়ে দেন। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাকে অত্যন্ত অশালীনভাবে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হচ্ছিল। এই দুর্যোগপূর্ণ সংকটময় মুহূর্তে তিনি দৃঢ়তার সাথে তার ভূমিকা যে সঠিক ছিল সে কথা ব্যক্ত করতে ভুলেননি। তিনি এও বলেন যে, ‘ঈমানী দায়িত্ব মনে করেই আমরা দেশ ও জাতির আদর্শ অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে এই কাজ করেছি। আমাদের ভূমিকা ছিল নিখাদ দেশপ্রেম থেকেই উৎসারিত। আপনাদের সাথে আমাদের পার্থক্য শুধু রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির।’ এভাবে মঞ্জুর ভাই মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কোন রকম জড়তাও রাখঢাক না রেখে যথার্থ জবাব দিয়েছিলেন। তাকে আলবদর কমান্ডার হিসেবে পৃথকভাবে রাখা হয় কিন্তু আল্লাহর কুদরতি রহমতে তিনি সেখান থেকে অলৌকিকভাবে সাধারণ বন্দীদের সাথে মিশে গিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পান। বর্তমানে তিনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হিসেবে দেশে-বিদেশে সুখ্যাতির সাথে জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন।

রাত ১০টায় বাংলাদেশ বিমানের এক বোয়িং এ আমরা পা রাখলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে বাতাসে ভর দিয়ে বিমান প্রচণ্ড বেগে উড়ে চলল। ভোর হয় হয়। সূর্যটা তখনও উঠেনি। ঘোষণা-শুনলাম-‘কিছুক্ষণের মধ্যে বিমান জেদ্দার মাটি স্পর্শ করবে। যে যার সিটের বেল্ট বেঁধে নিল। আমি ইচ্ছে করেই বাঁধলাম না।’ কিছুক্ষণের মধ্যে একটা ঝাঁকুনি অনুভব করলাম। বুঝলাম বোয়িংটি মাটি স্পর্শ করেছে। আজিজ ভাই বললেন- এসে গেছি। পা পা করে দরজার কাছে এগিয়ে চললাম। নেমেই বিমান বন্দরের গাড়ীতে উঠলাম। গাড়ীটি নিয়ে এল আমাদের গন্তব্যের দোর গোড়ায়। কাস্টমস ও অন্যান্য অফিসার আমাদের মালামাল চেক করলেন। চেক করলেন কাগজপত্র। অনেক বৃদ্ধ আর প্রৌঢ়দের মধ্যে সউদী অফিসাররা সন্দিগ্ধ চোখে আমাদের অনেক কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। তাদের ব্যবহারে শালীনতা ও সভ্যতার অভাব দেখলাম। হতে পারে, আমরা তাদের দৃষ্টিতে মিসকিন দেশের মানুষ বলে আমাদের প্রতি তাদের আচরণ এমনটি। তাছাড়া এরা দেখেছে আমাদের নেতৃবৃন্দকে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে তাদের শাহী দরবারে ধর্ণা দিতে। এরপরে আমাদের প্রতি অবজ্ঞা ও অসৌজন্যমূলক আচরণ যদি করে থাকে তাতে ওদের দোষ খুব একটা দেয়া যায় না।

বিমান বন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে আমরা মক্কার উদ্দেশ্যে একটা গাড়ীতে উঠলাম। প্রশস্ত আর মৃসণ পথ। প্রচণ্ড গতিতে গাড়ী এগিয়ে চলছে। কিন্তু ঝাঁকুনির লেশমাত্র নেই। দু’পাশে সবুজের সমারোহ। আমাদের দেশের মত অকৃত্রিম প্রকৃতির অবিন্যস্ত সৌন্দর্য নেই। ধনকুবেরী শাহী খেযালে পরিকল্পিতিভাবে সুনির্দিষ্ট ব্যবধানে গাছগুলো লাগান হয়েছে। গাড়ী এগিয়ে চলছে। সিনেমার পর্দার মত পারিপার্শিক দৃশ্যগুলো অত্যন্ত দ্রুত পিছু হটছে। কিছুক্ষণের মধ্যে মরুভূমির শূন্যতা আর মাঝে মাঝে বিক্ষিপ্ত মরুদ্যান চোখে পড়ল। ঘরির দিকে তাকালাম ঘন্টা পেড়িয়ে গেছে সামনে ছোট ছোট পাহাড়, পাহাড়গুলো যেন দ্রুত এগিয়ে আসছে। এক সময় আমাদের গাড়ী পাহাড়ের মধ্যবর্তী পথে এসে পড়ল। এবার দু’পাশে পাহাড়। পাহাড়গুলোতে ঘড় বাড়ী। প্রাচীনত্বের কোন ছাপ নেই, নতুন নতুন ডিজাইনে এগুলো তৈরী। মক্কা শহরে এসে পড়লাম। মনটা অনাবিল পবিত্রতায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।

গাড়ী খানা-এ-কাবার কাছাকাছি এসে থামল। আমরা সকলে খানা-এ-খাবার চত্বরে প্রবেশ করলাম। তওয়াফ শেষে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর মিম্বর সামনে রেখে দু’রাকাত নামাজ পড়লাম। এই মিম্বারে দাঁড়িয়ে তিনি খানা-এ-কাবার নির্মাণ কাজে তদারকী করতেন।

কোন পরিচিত মুখ চোখে পড়ে কিনা এমন উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা খানা-এ-কাবার আশেপাশে ঘুরাফিরা করছিলাম। বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মালেক ভাইকে আমার চোখে পড়ল। কোন এক সময় তিনি ছাত্রশিবিরের কর্মী ছিলেন, এখন জামায়াতে ইসলামীর সদস্য। কারাগারে থাকা অবস্থায় মাঝে মাঝে তিনি আমার সাথে দেখা করতেন। মালেক ভাই আমাকে নিয়ে শহীদ ভাইয়ের বাসায় গেলেন। শহীদ ভাই মক্কা মোয়াজ্জেমায় অধ্যাপক গোলাম আযম সাহেবের বিশেষ প্রতিনিধি। সউদী আরবে কর্মরত জামায়াত সমর্থকদের নিকট থেকে চাঁদা সংগ্রহ করা তার কাজ। শহীদ ভাই আলবদর ছিলেন। ঢাকা কারাগারে তার সাথে আমার সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়ে ওঠে। তিনি আমাকে দেখে বিস্মিত হলেন। আমার উপস্থিতি অবিশ্বাস্য ঠেকছিল তার কাছে। কেননা ১০ বছরের মধ্যেই আমি ছাড়া পাব এমন ধারণা তার ছিল না। আমাকে পেয়েই তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর জানতে চাইলেন আমার মুক্তির ইতিবৃত্ত। খুলে বললাম। সংগঠনের সাথে সম্পর্কের কথা জানতে চাইলেন। তাও বললাম। কিন্তু আমার উত্তর শুনে আমাকে মুরতাদ ভাবলেন কিনা জানিনা তবে খুশী যে হতে পারলেন না, বুঝা গেল স্পষ্ট। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বললেন- আমরা আপনার কাছে এমন কিছু আশা করিনি, সংগঠনের অগ্রগামী ভূমিকায় আপনাকে দেখতে চেয়েছিলাম।

বললাম- আমিও এমন প্রত্যাশা নিয়ে জেলখানায় মুক্তির প্রহর গুনেছি। কারা প্রকোষ্ঠে থেকেও আমি জামায়াতের দাওয়াত দিয়েছি। তরবিয়তী প্রোগ্রাম চালু রেখেছি।  বাইরে এসে অনেক চেষ্টা করেও এ্যাডজাস্ট করতে পারলাম না। দীর্ঘ দিন ধরে যে বিপ্লবী চিন্তা-চেতনা অনেক ঝড়-ঝাঁপটার মধ্যে বাঁচিয়ে রেখেছি, সেটাকে বিপ্লবী বিমুখ কোন সংগঠনে জড়িয়ে নষ্ট করতে চাইনি। এটা যদি আমার ভুল হয়ে থাকে তাহলে হয়তো হয়েছে খোদার কাছেই এর জবাবদিহি করব।

শহীদ ভাইরের সাথে কোন উত্তপ্ত আলোচনায় জড়াতে চাইনি। তিনিও প্রসঙ্গটা বেশী দূর গড়াতে চাইলেন না। তিনি আমাদের জন্য মেহেরবানী করে থাকা খাওয়ার আয়োজন করে দিলেন। যদিও ব্যয়টা আমাদেরই বহন করতে হয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর সাথে সংশ্লিষ্ট সৌদী আরবে অবস্থানরত বাঙালীরা আমাদের কাছে আসতে লাগলেন। দেশে ইসলামী আন্দোলনের অবস্থা, জামায়াতে ইসলামীর অগ্রগতি, বিভিন্ন প্রসঙ্গ আমাদের সাথে আলাপ আলোচনা চলতে থাকে। আমরা জামায়াত বিরোধী কোন মিশন নিয়ে সৌদী আরবে এসেছি এমনটি নয়। অথচ প্রসঙ্গ আসাতে আমাদের অনেক কিছু বলতে হয়েছে। বলতে হয়েছে, ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে প্রকারান্তরে খাটো করার জন্য জামায়াতের সাংগঠনিক তৎপরতার লক্ষ্য কি? সৌদি আরবের মদদকে অব্যাহত রাখার জন্য তথাকথিত ডেজার্ট ডেমোক্র্যাসী নিয়ে মাতামাতি কেন? তরুণদের ক্ষুরধার চেতনাসমূহে মরচে ধরানোর আত্মঘাতী ষড়যন্ত্র কোন লক্ষ্যে? ইসলামের সামগ্রিক আবেদন বাদ দিয়ে পুরান কায়দায় পাশ্চাত্য গণতন্ত্র নিয়ে রাজনৈতিক চর্চার উদ্দেশ্য কি? আয়েশী জীবন যাপনের জন্য জেহাদের ময়দান ছেড়ে জামায়াতের সংগ্রাম বিমূখ বাণিজ্যিক কর্মসূচীর প্রবণতা কোন দিকে? আমাদের আলাপ আলোচনা বিপ্লবী চেতনাসম্পন্ন জামায়ত সমর্থক ও কর্মীদের মধ্যে দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।

শহীদ ভাই অনুভব করলেন যে আমরা এখানে থাকলে জামায়াতে ইসলামী কর্মীরা তার হাতছাড়া হয়ে যাবে। হয়তো আগামীতে চাঁদা দেওয়াও বন্ধ হতে পারে। এমন সম্ভাবনা আঁচ করে আমাদেরকে এখান থেকে বিতাড়িত করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠলেন। অবস্থা দেখে আমার মনে হল যে তিনি আরও গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে পারেন। পুলিশকে সংবাদ দেয়াও বিচিত্র নয়। শাহী পুলিশেরা বিপ্লবী মানসিকতার বহু লোককে নির্বিচারে খুন করেছে এমন ইতিহাসও আছে। আমি ও আজিজ ভাই পরামর্শ করে সেখান থেকে কেটে পড়লাম।

ইতোমধ্যে ইরানীদের সাথে আমাদের যোগাযোগ হয়ে গেছে। ইসলামের মূল প্রাণশক্তির দিকে বিশ্বের মুসলমানদের ফিরিয়ে আনার জন্য ইরানীরা লিফলেট ও পোস্টারের মাধ্যমে হাজীদের আহ্বান জানাতেন। এ ছাড়াও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ ও তাদের সেবাদাস প্রতিক্রিয়াশীল শাসক চক্রের বিরুদ্ধে বিশ্ব-জনমত সৃষ্টির জন্য ইরানীরা সক্রিয় ছিল। আমরা স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে দ্বীনি দায়িত্ব মনে করে তাদের এই মহৎ কাজে শরীক হলাম।

একদিন আমি কিছু লিফলেট নিয়ে বাংলাদেশী হাজীদের মধ্যে বিলি করছি। এমন সময় দেখলাম, কিছু পুলিশ আমার গতিবিধি লক্ষ্য করছে। আরও দেখলাম তারা নড়ে চরে উঠল। চারিদিক থেকে পুলিশ আমাকে লক্ষ্য করে এগিয়ে আসছে। তাদের গতিবিধির ওপর রয়েছে আমার সতর্ক দৃষ্টি। বেকায়দা অবস্থা আঁচ করে জনতার ভিড়ের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে হারিয়ে গেলাম। তারপর সুযোগ বুঝে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে সরে গেলাম অনেক দূরে।

কয়েকদিন পেরিয়ে গেল। আমাদের কি মনে হল, শহীদ ভাইয়ের বাসায় ইচ্ছে করে এলাম। হতে পারে এটা অবচেতন মনের প্রতিক্রিয়া, প্রানের টানও বলা যায়। কেননা এক সময় আমরা পরস্পরের সহযোগী হয়ে একই আন্দোলন এবং অনুভূতির একই স্তরে দাঁড়িয়েছিলাম।

দেখলাম জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মওলানা মোহাম্মদ আলী ও অধ্যাপক ইউসুফ আলী ভাই আসছেন। দেখে খুশিই হলাম। তারাও আকস্মিকভাবে আমাকে খোদ মক্কায় দেখে হতবাক। অবশ্য বিমূঢ় বলা যাবে না। কেননা এখানে আমাদের আসাটা তেমন আহামরি কোন ঘটনা নয়। মোহাম্মদ আলী ভাই বললেন- ‘উপরে আসেন।’ আমার ওপর তার আদর্শিক দাবী নিয়ে তিনি হয়তো উপরে আসতে বললেন কিন্তু আমি বড় ভাইয়ের আদেশ মনে করে তাকে অনুসরণ করলাম। সাথে আজিজ ভাইও রয়েছেন।

মোহাম্মদ আলী ভাই আন্তরিকতার সাথে কথা পাড়লেন। বললেন- ‘আমরা তো রাবেতায়ে আলমে ইসলামীর দাওয়াতে এসেছি। পাকিস্তান থেকে জামায়াতে ইসলামীর আমীর মিয়া তোফায়েল আহমদ সাহেবও এসেছেন। কিন্তু আপনারা?’ প্রশ্ন রাখলেন তিনি।
বললাম-‘অন্যান্যরা যেমন এসেছেন আমরাও ঠিক তেমনি এসেছি। তবে এই পাঁকে জেহাদের ফরজ এক আধটু আদায় করার চেষ্টা করছি।’
জিজ্ঞেস করলেন- ‘তার মানে?’
বললাম- ‘ইরান পবিত্র মক্কাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিপ্লবের সপক্ষে যে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে চাইছে আমরা তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অংশীদার।’ মোহাম্মদ আলী ভাই চমকে উঠলেন। উত্তেজিত হয়ে বললেন- ‘কি বলতে চাচ্ছেন?’

আমরা সুস্পষ্টভাবে কোন রকম রাখঢাক না করে বললাম, রুশ-মার্কিন-ইসরাইল ও অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শয়তানী শক্তির বিরুদ্ধে আমরা কাজ করছি। প্রতিক্রিয়াশীল তাবেদার আরব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও আমরা সোচ্চার। ইসলামের পবিত্র এলাকাসমূহ বিশেষ করে খানা-ই-কাবাকে তাবেদারীর মসিলিপ্ত রাজতন্ত্রের হাত থেকে মুক্ত করতে চাই।’ আমাদের প্রতিটি শব্দ যেন মোহাম্মদ আলী ভাইয়ের কলিজায় তীরের মত বিদ্ধ হল। উত্তেজনা তুঙ্গে উঠল। তার মস্তিষ্কে যেন প্রচন্ড ঝড় বয়ে চলেছে। উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন-‘আপনারা জানেন ইরানীরা শিয়া?’ বেশ কিছু দুর্বল হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে তার কথার যথার্থতা প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন। শয়তান কোথায় বাসা বেঁধেছে তার উক্তি থেকে আমরা সুস্পষ্ট বুঝে ফেললাম। কোরআনে বলা হয়েছে-‘শয়তান ডান দিক থেকে, বাম দিক থেকে, সম্মুখ থেকে, পেছন থেকে আক্রমণ করে মানুষকে বিভ্রান্ত করে থাকে।’ বিপ্লব-বিমুখ অলস মস্তিষ্কে শয়তান ডেরা বাঁধবে এটাই তো স্বাভাবিক। এক ভয়াবহ কারবালার পথ অতিক্রম করে, শত শত বছরের অন্ধকার যুগের অবসান ঘটানো ইরানের নতুন সূর্যোদয় যাদের চোখে পড়ে না, বুঝতে হবে তারা এখনও কোন শরাবের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে। অথচ সুদীর্ঘ ৪০ বছর ধরে এরাই এক নতুন সূর্যোদয়ের স্বপ্ন দেখে আসছে।

আজিজ ভাই বললেন-‘ইরানীরা শিয়া এটা নতুন কিছু নয়। দুনিয়ার সবাই জানে। ইমাম খোমেনী সুন্নীর দাবী করেছেন এমন ঘটনা আমাদের জানা নেই। তবে আপনাদের এবং প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রশ্ন একটাই, যা খুলেমেলে আপনারা বলছেন না। তা হল- শিয়ারা কোন অধিকারে ১৪শ’ বছর পর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করল? সুন্নী রাষ্ট্রসমূহে মদ, জুয়া মেয়েদের বেলেল্লপনা, পুঁজিবাদী শোষণ, সমাজতান্ত্রিক নিপিড়ন কায়েমীভাবে বহাল থাকা সত্ত্বেও আয়াতুল্লাহ খোমেনী এসব উৎখাত করলেন কেন? কে অধিকার দিল তাকে? খাদেমুল হারামাইন সৌদি শাসকগোষ্ঠী সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার পদলেহন করা সত্ত্বেও মার্কিনীদের ঘাঁটি সমূহ উৎখাত করা হল কেন? এ প্রশ্নগুলোর জবাব সত্যিই কঠিন। কাজগুলো কাফের ছাড়া আর করবে কে?’

আমাদের কথা শুনে মোহাম্মদ আলী ভাই একটু নরম সুরে বললেন- ‘ইরানের ইসলামী বিপ্লব নির্ভেজাল ইসলামী বিপ্লব কিনা সেটা সিদ্ধান্ত নেয়ার এখনও সময় আসেনি, আরও আমাদের পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন।’

বললাম-‘সাম্রাজ্যবাদীর কালো হাত ইরানের কণ্ঠনালী চেপে ধরেছে। আপনারা চাচ্ছেন ইরান বিধ্বস্ত হলে তার ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যুগের পর যুগ গবেষণা করে সিদ্ধান্ত নিবেন ইরানী বিপ্লব ইসলামী ছিল কিনা, এইতো! বিপ্লবের ৩ বছর পরও যারা বিপ্লব সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না তারা নিজস্ব আন্দোলনকে কোনদিনও তার মঞ্জিলে নিয়ে যেতে পারবে না। তাছাড়া জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠাতা ও মূল ব্যক্তিত্ব মওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী যখন ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে তার ‘হৃদয়ের স্পন্দন’ বলে বর্ণনা করেছেন। সে ক্ষেত্রে সেই বিপ্লব সম্বন্ধে আপনাদের অনিহা থেকে কি আঁচ করব আমরা।’

মোহাম্মদ আলী ভাই এবার বলেন-‘শিয়া সম্বন্ধে আমাদের সতর্ক দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে বিবেচনা করতে হবে। তাছাড়া ইসলামের নামে কোন কিছু ঘটলে এ নিয়ে আমাদের মাতামাতি করতে হবে এমন কোন কথা নেই। আপনারা যেখানে সহজ উপলব্ধি নিয়ে চিন্তা করবেন, আমাদের সেখানে গভীরভাবে তলিয়ে দেখতে হবে।’

আমরা বললাম- ‘আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর সতর্কভাবে মন্তব্য করতে হবে এ সত্যটুকু মেনে নিলেও এটা বলতে হয়, ইখওয়ানুল মুসলেমীনের ওপর নির্যাতনের ব্যাপারে আপনারা যেমন মাতামাতি করেছেন, সেই একই দাবী নিয়ে ইরানীরা আপনাদের নৈতিক সমর্থন আশা করে। কেননা ইসলামের জন্য তাঁদের কোরবানী সবচাইতে বেশী। নির্ভেজালের প্রশ্ন তুলতে পারেন। রাসূলুল্লাহর প্রত্যক্ষ আন্দোলন ছাড়া নির্ভেজালের দাবী আর কেউ করতে পারে না। এমন কি জামায়াতে ইসলামীও প্রশ্নাতীত নয়। আমরা মনে করি, ইসলামের আওয়াজ পৃথিবীর যে প্রান্ত আর যার দ্বারা উত্থিত হোক না কেন, তার মৌলিক দৃষ্টিভঙ্গি নিরীক্ষণ করে তাৎক্ষণিকভাবে সমর্থন দেয়া প্রত্যেকটি মুসলমানের দায়িত্ব। আর এ দায়িত্বনুভূতি যাদের ভেতরে নেই, তাদের সম্বন্ধে এটাই ভাবতে হবে যে, হয় তারা পরিস্থিতি সম্বন্ধে গাফেল নয়তো কোথাও তাদের বিবেক বন্ধক হয়ে আছে। আপনাদের সম্বন্ধে আমরা কোন মন্তব্য রাখতে চাই না। শুধু এটুকু বলতে চাই আমাদের সচেতন বিবেকের উপলব্ধিকে আহত করার চেষ্টা করবেন না। এমন একদিন ছিল, আপনাদের কথায় অন্ধের মত চলেছি। এত ঝড় ঝঞ্চা, এত ঘাত-প্রতিঘাত, এত চড়াই উৎড়াইয়ের মধ্যে এগিয়ে আসার পর আজও আপনারা চান আমরা আপনাদেরকে অন্ধের মত অনুসরণ করি। কিন্তু সেটা সম্ভব হবে না। আপনাদেরকেও আমরা বাজিয়ে দেখব আপনারা কতখানি নিখুঁত, কতখানি নির্ভেজাল।

আলোচনা আর বেশী দীর্ঘায়িত করতে চাইলাম না। এতে তিক্ততা বাড়বে বৈ কমবে না। আমরা শেষ করতে চাইলাম। তারাও এমন চাচ্ছিলেন। কোন রকম আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া সমাপ্তি ঘটল। আলোচনার শুরুতে যে আন্তরিকতা ছিল দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য সুস্পষ্ট হওয়াতে শেষটায় আর তেমন থাকল না। আমরা ফিরে এলাম আমাদের অবস্থানে।

মক্কায় থাকা অবস্থায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ইসলামী আন্দোলনের স্বার্থে আমাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে হতো। কেননা সাম্রাজ্যবাদী চক্র এখানেও তৎপর। তাবেদার সউদী বাদশাহ তার গোয়েন্দা বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে ইসলামী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীদের খুঁজে বের করার জন্য। পুলিশ ও গোয়েন্দাদের সন্ধানী চোখ থেকে নিজেদের গা বাঁচিয়ে আমরা বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যে কাজ করে চলেছি। বাংলাদেশ হাজী সমিতির সভাপতি জনাব কাজী আজিজুল হক ভাই ও সাধারণ সম্পাদক আমি হাজীদের বিভিন্ন শিবির ঘুরে ঘুরে হজ্জ্বের সত্যিকার স্পিরিট এবং এর আন্তর্জাতিক মূল্য বিশ্লেষণ করেছি। বুঝিয়েছি হজ্জ কেবলমাত্র আনুষ্ঠানিকতা নয়। একে মুলমানদের আন্তর্জাতিক সম্মেলন হিসেবে তুলে ধরেছি। পৃথিবীর মুসলমানদের সমস্যা এখানে উপস্থাপিত হতে হবে। মক্কা মোয়াজ্জমা মুসলমানদের নিরাপদ আশ্রয়। সাম্রাজ্যবাদীদের চাপে কোথাও কোন মুসলমান তার স্বাধীন বক্তব্য রাখতে না পারলেও হজ্জ্বে এসে নির্বিঘ্নে দুনিয়ার মুসলমানরা তাদের সমস্যা উপস্থাপন করবে, দুনিয়ার মুসলমানদের সাহায্য কামনা করবে, সমস্ত মুসলমানদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। কিন্তু হোয়াইট হাউসের ইঙ্গিতে স্বাঘোষিত খাদেমুল হারামাইনের প্রতিক্রিয়াশীল তাবেদার সউদী শাসকগোষ্ঠী সেটা হতে দিতে চায় না। তার ঝুলির বিড়াল বেরিয়ে আসতে পারে অথবা প্রগতিশীল ইসলামী শক্তিসমূহকে পেছন দিক থেকে আঘাত হানার জন্য জুব্বার ভেতরে লুকান কৃপাণের সন্ধান দুনিয়ার মুসলমানরা পেয়ে যেতে পারে। এমন এক আশঙ্কায় সউদী শাসকেরা শঙ্কিত। এই আশঙ্কা ছিল আবু লাহাব, আবু জেহেলের। ইসলামের বিজয় সূচিত হলে তাদের কায়েমী স্বার্থ ও কর্তৃত্বের ভিত উপড়ে যাবে।

যাইহোক, আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর করার উদ্দেশ্যে ইরানীদের সাথে যৌথ কর্মসূচী নেয়ার জন্য তাদের সাথে বিভিন্ন গোপন বৈঠক মিলিত হচ্ছি। একদিন সিদ্ধান্ত নেয়া হল আগামীকাল একটা মিছিল বের করা হবে। কথা হল- যেখানে প্রায় ১০টা রাস্তা এসে মিশেছে সেখান থেকে নির্দিষ্ট সময়ে একটি মিছিল পুলিশের বেষ্টনী ভেদ করে মক্কা মোয়াজ্জমার প্রধান সড়ক পরিক্রম করবে এবং হেরেম শরীফে নামাজ আদায় করবে। কিন্তু হাজার হাজার পুলিশের সন্ধানী চোখ এড়িয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের মিছিল কি করে সম্ভব হবে? কিন্তু সেটাও সম্ভব হল। নির্দেশ ছিল- আশে পাশে বিভিন্ন কাজের অছিলায় সবাইকে অবস্থান করতে হবে। মিছিল শুরু হওয়ার ৫ মিনিট আগে বিদ্যুৎগতিতে সমবেত হতে হবে ঐ মোড়ে এবং তাৎক্ষণিকভাবে মিছিল এগিয়ে যাবে। যেই কথা কাজও ঠিক তেমনি হল। মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ মানুষ জমে গেল। মিছিল এগিয়ে চলছে। পুলিশ কিছু বুঝবার আগেই মিছিল গতি পেয়ে গেছে। লক্ষ জনতার ঢল। এ ঢল ‘রুখবি কি দিয়া বালির বাঁধ।’

গতি রুখা সম্ভব হল না। মিছিল এগিয়ে চলছে। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রতিক্রিয়াশীল বাহিনীর বিভিন্ন প্রস্তুতি ছিল। ছাদের উপর ইট পাটকেল নিয়ে সাদা পোষাকে পুলিশ বাহিনী তৈরী ছিল। তৈরী ছিল গরম পানির গাড়ী। রাবার বুলেট নিক্ষেপ করার জন্য পুলিশেরাও ছিল প্রস্তুত। মিছিল এগিয়ে চলছে, একযোগে হামলা শুরু হল। রক্তাক্ত ক্ষত-বিক্ষত হল শত শত মানুষ। ইরানী স্বেচ্ছাসেবীদের একটি দল শুধুমাত্র আহতদের হাসপাতলে পৌঁছানোর জন্য নিয়োজিত ছিল। তারা বিদ্যুৎবেগে তাদের কাজ করে চলেছে। পুলিশের বিরাট বিরাট দল মাঝে মাঝে আকস্মিক বেষ্টন দিয়ে গ্রেফতার করেছে মিছিলকারীদের কিছু কিছু লোককে। কিন্তু তবু মিছিলের গতি অনিরুদ্ধ। মিছিল এগিয়ে চলছে। আমাকে পুলিশ বেষ্টন করল। তাদের এক কথা হিন্দ হিন্দ’ অর্থাৎ আমি হিন্দুস্তানী। আমার পোষাক আশাক থেকে তারা এমন আন্দাজ করেছিল। আমার পরনে ছিল আলীগড়ি পায়জামা আর পাঞ্জাবী। আমরা পুরোপুরি পুলিশের বেষ্টনীর মধ্যে, পালানোর কোন পথ নেই।

হঠাৎ দেখলাম, মিছিলের হাজার হাজার মানুষ পুলিশদের ঘেরাও করে ফেলেছে। টানা-হেঁচড়া আর হাতাহাতি চলছে। এক ফাঁকে আমি কেটে পড়লাম। ইরানীরা পুলিশের হাত থেকে আমাকে বাঁচানোর জন্য এমনটি করেছে বলে আমার মনে হল। মক্কা নগরী শ্লোগানে মুখর হয়ে উঠল। মিছিল এগিয়ে চলছে। এ যেন রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সেই মক্কা বিজয়ের দিন। সুনির্দিষ্ট প্রোগ্রাম অনুযায়ী মিছিল হেরম শরীফে এসে শেষ হল।

আমরা সবাই আরাফাতে রওয়ান হলাম। হেঁটেই চলেছি। পায়ে হেঁটে ১ ঘণ্টায় পৌঁছান যায়। পাহাড়ের পথ কেটে কেটে রাস্তা তৈরী হয়েছে। দুনিয়ার মুসলিম এক জামায়াতে নামাজ আদায় করলাম। দুনিয়ার সাদা-কালো, আমীর-গরীব, বাদশাহ ফকীর আরাফাতের উন্মুক্ত অঙ্গনে এসে একাকার ইসলামের সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্বের সুমহান আবেদন এখানে মুর্তিমান হয়ে উঠেছে। উন্মুক্ত আকাশের নিচে উত্তপ্ত রোদের প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও যোহর আছরের নামাজ আদায় করলাম। আমরা মুজদালেফায় মাগরিব এশা এক সাথে আদায়ের পর সেখানে কি এক অনাবিল আনন্দ অনুভব করলাম। সেটা প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই।

মিনায় এসে নজরুলের একটি কবিতার প্রথম চরণ মনে পড়ল- ‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন।’ কোরবানীর এত বিপুল আয়োজন কেন? কেন লক্ষ লক্ষ পশুকে মিনার ময়দানে জবেহ করা হয়? শুধুমাত্র হযরত ইব্রাহীম (আঃ)এর সুন্নতকে সমুন্নত রাখার জন্য? না, তা নয়। খোদার সন্তুষ্টির জন্য কোরবানী দেয়ার এক মানসিক প্রস্তুতি। এখানকার পশু কোরবানী একটা প্রতীক মাত্র। এ কোরবানীর অর্থ খোদার দরবারে পুনরায় অঙ্গীকার করা যে, মওলা আমরা প্রস্তুত, তোমার সন্তুষ্টির জন্য আমরা প্রস্তুত।

‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ।’ উন্মুক্ত আকাশের নিচে সারারাতবর নৈশ্য এবাদত যেন আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড়গুলো ঘুমিয়ে আছে। পাহাড়ের পর পাহাড়। ছোট বড় পাহাড়ের বিচিত্র সমাবেশ এখানে। মানুষ স্বাধীনভাবে যে যেখানে ইচ্ছা অবস্থান নিয়ে নৈশ্য এবাদতে মশগুল হয়ে গেছে। আকাশে লক্ষ লক্ষ তারকা যেন পর্যবেক্ষকের মত পাহারা দিচ্ছে। রাতের প্রত্যেকটি মানুষের এবাদত বন্দেগীর এক একটি সাক্ষী যেন ওরা এত বিরাট গণসমাবেশ অথচ নিঃশব্দ চারিদিক। নৈসর্গিক পরিবেশে সারারাত এবাদত করলাম। প্রাণভরে ডাকলাম আমার প্রভু, আমার মওলা, আমার মালিককে।

মুজদালেফা থেকে মিনা। মিনা থেকে মক্কায়, তারপর মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। দু’পাশে বালি আর বালির সমুদ্র। পাড়ি দিচ্ছি আমরা। আজ থেকে ৫০ বছর আগে এ দুর্গম মরু পার হত মানুষ উটের পিঠে। তখন কী দুঃসহ ছিল এই পথ-পরিক্রমা। আল্লাহর কাছে আমাদের শুকরিয়া যে তিনি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রেখে মানুষের কষ্টকে কত লাঘব করে দিয়েছেন।
ফজরের নামাজ শেষ হলে মিনায় এসে হাজিরা প্রায় প্রত্যেকে কোরবানী দেয়। লক্ষ লক্ষ পশু জবেহ হল এখানে। আজিজ ভাই আর আমি রোজা রেখে কোরবানীর দায়িত্ব এড়িয়ে গেলাম। এখানে হাজার হাজার টন গোশত্ আর লক্ষ লক্ষ পশুর চামড়ার অপচয় দেখে আমাদের খারাপ লেগেছে। মওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদীর পরামর্শে সউদী সরকার গোশত্ সংরক্ষণের যে ব্যবস্থা নিয়েছে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ ব্যাপারে দুনিয়ার মুসলমানদের চিন্তা-ভাবনা করে সম্মিলিত উদ্যোগ নেয়া উচিত। অবশ্যি পবিত্র মক্কা মদীনার খাদেম কোন এক বিশেষ রাষ্ট্র হলে দুনিয়ার অন্যান্য মুসলিম রাষ্ট্রের দায়-দায়িত্ব তেমন থাকে না।

যাইহোক আমরা মদীনায় এসে পড়লাম। এসেই গভীর আগ্রহে মসজিদে নববীর দিকে এগুলাম। এই সেই মসজিদ, নবী করীম (সাঃ) এখান থেকেই তাঁর রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এখান থেকেই সৈন্য পরিচালনা করে সমকালীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর ভিত্তি উপড়ে ফেলেছেন। প্রশাসনিক আদেশ-নির্দেশ এখান থেকে দেয়া হত। এখানে বসেই বিদেশী রাষ্ট্রদূতদের সাক্ষাৎকার দিতেন। এখানেই ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ দেয়া হত। এ মসজিদ থেকেই পৃথিবীর ইতিহাস পাল্টেছেন তিনি।

কিন্তু যেদিন মসজিদ থেকে প্রশাসনকে বিচ্ছিন্ন করা হল সেদিন থেকেই অধঃপতিত হল ইনসাফ। একপা একপা করে অধঃপতরেন দিকে এগিয়ে চলল ইসলাম ও মুসলমান! আল্লাহর অনুশাসন বদলে এল ব্যক্তিগত মর্জি আর খোশ-খেয়াল। এক কথায় স্বৈরাচার। ইকবালের ভাষায়-‘জুদা হো দ্বীন সিয়াসাত সে তো রাহযাতী হ্যায় চেঙ্গিজী- দ্বীন থেকে রাজনীতি বিচ্ছিন্ন করলে সেখানে বিরাজ করে চেঙ্গিসের বর্বরতা। আজকের অধঃপতিত মুসলমানরা চেঙ্গিজের সেই বর্বরোচিত দুঃশাসনে আবর্তিত হচ্ছে। রাজপ্রাসাদ আর রাজকীয় ঐশ্বর্যের ওপর দাঁড়িয়েও আরবের শাসকরা আজ পরাশক্তির কাছে নতজানু।

ধীরে ধীরে মসজিদের দিকে এগিয়ে চলছি। রাসূলেখোদার (সাঃ) পদধুলি নিয়ে যে মসজিদ আর গৌরবের শীর্ষে সেখানে নামাজ পড়ে দোয়া করে মহান আল্লাহর অনুগ্রহ পাবার গভীর প্রত্যাশায় মনটা উদ্বেল হয়ে আছে। মসজিদে পা রাখছি এমন সময় কানে বাজল অনেক মানুষের করুণ কান্না। গণ-গুঞ্জনের মত কান্না মসজিদের ভেতর থেকে ভেসে আসছে। বিস্ময় আর বিহ্বলতা নিয়ে এগিয়ে চললাম। দেখলাম অনেক মানুষ যাদের অনেকের পা নেই, হাত নেই। অথচ তাদের আদল থেকে ঐশ্বরিক জ্যোতি ঠিক্রে বেরুচ্ছে। ওরা কাঁদছে, ডুকরে ডুকরে কাঁদছে।

দুটো হাত উপরে তুলে প্রার্থনা করছে ওরা। অন্তরে জমাট বাঁধন ব্যথার অশ্র“ যেন ইশকের উত্তাপে গলে গলে ঝরছে। ওরা কাঁদছে- ওদের সকরুণ কান্নার উচ্ছ্বাস, ওদের ব্যথা নির্গলিত আবেদন, ওদের অশ্র“ নিসিক্ত মিনতি, ওদের বেদনার্থ আহাজারিতে মনে হল একটা ঝড় উঠছে, প্রলয়ঙ্করী ইশকের তুফান। এই তুফানে আশেক আর মাশুক একাকার হয়ে গেছে। মনে হল, আল্লাহর আরশের সাথে এসব নির্যাতিত মানুষের ব্যবধান এক মিলিমিটারও নেই। আমরা অনেক মানুষ, দেশে বিদেশের অনেক মানুষ অবাক বিস্ময়ে দেখছিলাম। অভিভূত হয়ে দেছিলাম। এই অনিন্দ সুন্দর ঐশ্বরিক দৃশ্যটি। হৃদয় বিগলিত উচ্ছ্বাসে আমরাও যেন থরথর করে কাঁপছি। ইশকের মাতম যেন আমাদের ছুঁয়ে গেছে। সবার চোখে বাঁধভাঙা অশ্র“।

এইসব ইরানী যুবক, এক দিকে এদের ত্যাগ আর কোরবানী, অন্যদিকে খোদার প্রতি গভীর আস্থা আর নিবিড় আসক্তি দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছি। প্রত্যেকটি মানুষের নীরব জিজ্ঞাসা- কি অপরাধ ছিল এসব তুরুণদের? অপরাধ তো একটিই। বাতিল মতবাদকে উৎখাত করে এরা আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদীদের পদলেহী দুঃশাসনের অবসান ঘটিয়ে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল এরা। আরবের আইয়ামে জাহেলিয়াতের ধারক রাজা বাদশাহ আর আমীর ওমরাহ, ইসলামের দুশমন আমেরিকার ইঙ্গিত সাদ্দামের ওপর ভর করেছে। আরব জাতীয়তার নামে তথাকথিত কাদেশিয়ার নামে ইসলামী ইরানকে আঘাত হেনেছে। ইরানের আবালবৃদ্ধবনিতা আল্লাহর নামে জানবাজি রেখে প্রচণ্ড প্রতিঘাত করেছে। সেইসব রণাঙ্গণে আহত তরুণ এরা। এদের কোরবানী এদের রক্তাক্ত ইতিহাসও একদিন আরবের তরুণদের তৌহীদবাদে উদ্বুদ্ধ করবে। তরুণ প্রাণের তাজা রক্ত পান করেই একদিন জাহেলিয়াত মুক্ত হবে আরব। আমাদের দোয়া, বিশ্ব মুসলমানদের দোয়া, এইসব নির্যাতিত তরুণদের দোয়া থেকে একদিন নিম্নচাপ সৃষ্টি হবে আরব সাগরে। তারপর প্রলয়ঙ্করী প্রচণ্ড ঝড় উঠবে। এরপর মেঘ কেটে যাবে। আকাশ পরিষ্কার হবে। নতুন করে আবারও ইসলামের বিকাশ ঘটবে।

রাসূল (সাঃ) বলেছেন- ‘আমার মেহরাব ও রওজার মর্ধ্যবর্তী স্থানটি বেহেশতের টুকরা বিশেষ।’ এই স্থানটিতে নামাজ পড়ার বিশেষ ফজিলত মনে করে বহু হাজী এখানে ভিড় জমায়। আমি ও আজিজ ভাই এখানে সকালে এসে দুপুর পর্যন্ত অবস্থান করি। এখানে নামাজ কালাম ও তসবিহ-তাহলিলের মধ্যে আমাদের সময় অতিবাহিত হয়। খোদার বিশেষ রহমতে আমরা এখানে এতখানি সময় পেয়েছিলাম, যা কোনভাবে পাওয়া সম্ভব নয়।

মসজিদে নববীর সামন্য দক্ষিণে রওজা শরীফ। এখানে রাসূলে পাক (সাঃ) শায়িত রয়েছেন। তাঁর কবরের পাশে ইসলামের মহান খলিফা হযরত আবু বকর (রাঃ), হজরত ওমর (রাঃ) শায়িত রয়েছে। সমস্ত রওজা শরীফ লৌহপ্রাচীর বেষ্টিত। আমরা অনেক মানুষের ভিড়ে রওজা শরীফের নিকটবর্তী স্থানে দাঁড়িয়ে সালাম দিয়ে দরূদ শরীফ পাঠ করলাম।

এখানে এসে মানুষ আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। আমরা আমাদের হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম রাসূলে খোদা (সাঃ)ও নিকটতম সাহাবাদের উদ্দেশ্যে। মসজিদে নববী থেকে জান্নাতুল বাকীর দূরত্ব মাত্র পোয়া মাইল। ইসলামের আত্মোৎসর্গকারী মহান সৈনিকদের অনেকেই ঘুমিয়ে আছেন এখানে। এখানে রয়েছে হযরত আব্বাস (রাঃ), হযরত ওসমান (রাঃ), হযরত ফাতিমা (রাঃ), ইমাম হাসান (রাঃ), জয়নাল আবেদীন (রাঃ), ইমাম মালেক (রাঃ) প্রমুখ মহান ব্যক্তিত্ব। এখানে শায়িত মহামানবদের উদ্দেশ্যে অন্তরের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা নিবেদিত হল। আমরা দু’হাত তুলে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করলাম।

মদীনা থেকে রওয়ানা হলাম জেদ্দা। আমরা যে গাড়ীতে উঠেছি সে গাড়ীতে আর যারা ছিল এদের সবাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোক। বাহরাইনে কর্মরত রয়েছেন। জেদ্দা পর্যন্ত আমরা একই পথযাত্রী। মনে মনে বললাম, ভালই হল এক সাথে কিছুক্ষণ আলাপ হবে। আজিজ ভাই তাদের কাছে আমার পরিচয় দিলেন আমার ইতিবৃত্ত টেনে। আমার ১০ বছর কারাবাসের ভোগান্তির কথাও বাদ রাখলেন না। এর ফলে তাদের সাথে আমার সম্পর্ক আন্তরিক হয়ে উঠলো। তাদের সদ্ব্যবহার, তাদের অন্তরঙ্গ সংলাপ, তাদের অকৃত্রিম ভ্রাতৃত্ববোধ আমার দারুণ ভাল লাগল। তারা বললেন- তিন কুচক্রীর ষড়যন্ত্রে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়েছি। আমার হিসেবও এই তিনজনের নাম রয়েছে। শীর্ষে মুজিব-ভুট্টো-ইন্দিরা। এই তিন জনের যৌথ কূট-চক্রান্ত পূর্বাঞ্চলের ৮ কোটি মানুষকে টেনে এনেছিল এক ভয়াবহ সংকটের দোড় গোড়ায়। দেখলাম তাদেরও একই অনুভূতি!

মুসলমান রক্তাক্ত হল। দেশ ছিন্নভিন্ন হল, ফায়দা নিল হিন্দুস্তান। ওরা বললেন- ‘ফির মিলেঙ্গে হাম দোনো’ আমি ভাবলাম- ‘সবকুছ লুটাকে হুঁসনে আয়াতো কেয়া কেয়া।’ মুখে বললাম, ‘আপনাদের অনুভূতি আর আমাদের জনগণের অনুভূতি তো একই ছিল ভাই। কিন্তু আমাদের শাসকগোষ্ঠীরা আমাদের বিভ্রান্ত করেছে, বিভ্রান্ত করেছে আমাদের নেতারা। চটকদার শ্লোগানে আমরা ভূলেছি, ভুল পথে চালিত হয়েছি।’

আরও বললাম- ‘আপনারা ভ্রাতৃত্ব বোধ নিয়ে যে একত্রীকরণের চিন্তাভাবনা করছেন সেটা কোন দিনও আর সম্ভব হবে না।’ তারা বললেন- ‘আগের মত না হলেও অন্তত কনফেডারেশন তো হতে পারে।’
বললাম- ‘কনফেডারেশনের স্বপক্ষে হয়তো কোন দিন রায় পাওয়া যেতে পারে। একত্রীকরণের চিন্তাভাবনা একেবারে ভুল। বরং এটাই ভাল আমরা দূর থেকে এক ভাই আর এক ভাইকে সমবেদনা জানাব। প্রয়োজনে সাহায্য করব। কেউ আগ্রাসনের মুখোমুখি হলে আমরা পরস্পরের পাশে দাঁড়াব।

জেদ্দা থেকে ফিরে চললাম আবার মক্কায়। এখন আমাদের ঘরে ফেরার তাগাদা। কাফেলার পর কাফেলা ফিরে যাচ্ছে। জীবনের নতুন দিক-নির্দেশনা নিয়ে ফিরে চলছে তারা আপন গৃহে। হাজীদের উপলব্ধির নতুন ফসলকে কতটুকু কুড়াতে পেরেছে জানিনা। পাশ্চাত্যের অপসংস্কৃতি ও বিষাক্ত চিন্তাধারার প্লাবনে ভেসে যাওয়া পৃথিবীর বিরান ময়দানে হাজীরা তাদের কুড়ানো ফসলের কে কতটুকু ছড়াতে পারবে তাও আন্দাজ করা মুশকিল। কেননা রুশ-আমেরিকা প্রভাবান্বিত প্রতিক্রিয়াশীল শাসকগোষ্ঠীরা চোখ বন্ধ করে বসে থাকবে এমন তো হতে পারে না। তারা গাফেল হলেও সিআইএ কেজিবি গাফেল থাকবে এমতো নয়। হাজীদের নতুন চেতনা নতুন উপলব্ধি প্রতিক্রিয়াশীল চক্ররা কেড়ে নিতে কতক্ষণ! তবু দোয়া করবো আল্লাহর কাছে- ‘সবাইকে তোমার দ্বীনের জন্য কাজ করার তওফিক দিও, মালিক।

(বইটির pdf version download করুন এখানে)


Add this page to your favorite Social Bookmarking websites
 

Comments  

 
+14 # 2009-09-17 08:07
কে এম আমিনুল হকের লেখা "আমি আলবদর বলছি" বইটি পড়লাম। ইতিপূর্বে ডা. ফিরোজ মাহবুব কামালের "একাত্তরের আত্মঘাতের ইতিহাস" সহ প্রফেসর সাজ্জাদ হোসাইনের "একাত্তরের স্মৃতি" এবং প্রফেসর মুমিন চৌধুরির "Behind The Myth of 3 Million" বইগুলিও পড়েছি। সবগুলি বই খাটি তথ্য নির্ভর এবং অসাধারণ যুক্তি সমৃদ্ধ। যতই পড়ছি ততই হতবাক হয়ে যাচ্ছি বর্তমান সময়ের মিথ্যার জয়জয়কার দেখে।

আমি স্বাধীনতাপন্থিদ ের লেখা ইতিহাসও পড়েছি। কিন্তু তাদের লেখায় পাকিস্তান এবং পাকিস্তান পন্থীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রপাগান্ডা ও বিষদগার ছাড়া তেমন কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। ঐতিহাসিক মান ও সমসাময়িক যুক্তির নিরিখেও সেগুলো আলচ্য বইগুলোর আশে-পাশে আসার যোগ্য নয়। কিন্তূ তারপরেও সত্যের এই পরাজয় কেন? আমার কাছে মনে হয়েছে যারা মিথ্যা প্রপাগান্ডার শিকার তাদের সীমাহীন অযোগ্যতা ও একাগ্রতাহীনতাই আজকের এই অবস্থার জন্য দায়ী। অবাক হই বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর স্বাধীনতাত্তোর ভুমিকা দেখে। তাদের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে প্রপাগান্ডা চলেছে এবং চলছে। তারা এত আন্দোলন-সংগ্রাম করে, অথচ এই সত্য কথাগুলো আমরা নতুন প্রজন্মদের সামনে কখোনও তুলে ধরার চেস্টাই করেনি। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে এই তথ্যগুলো যদি আমাদের কাছে না আসত তাহলে এই সত্য কখনোও জানতামই না। (মুলতঃ ডা ফিরোজ কামালের লেখা "একাত্তরের আত্মঘাতের ইতিহাস" বইটি পড়ে এই জাতির ইতিহাস জানার প্রচন্ড আগ্রহ সৃষ্টি হয়।) এই আমি কিছুদিন আগ পর্যন্তও জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের কাছে অহরহ দাবী করতাম একাত্তরে তাদের ভুমিকার জন্য জাতির কাছে মাফ চাইতে। অথচ এখন আমার মনের অবস্থা এই যে, ভবিষ্যতে যদি আবার কখোনও এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হয় তবে পরিণতির কথা না ভেবেই ঐ একই ভুমিকা নেওয়া উচিত যা তারা একাত্তরে নিয়েছিল।
যাইহোক আমার বিশ্বাস এই অবস্থা একদিন থাকবে না। তার প্রমাণ আজকের এই বইগুলো। আমি মনে প্রাণেই বিশ্বাস করি তথাকথিত জাতির পিতাকে ইতিহাস একদিন মিরজাফরের কাতারে দাঁড় করাবেই। তার চিহ্ন ইতিমধ্যে ফুটে উঠা শুরু হয়েছে। আমি বাংলাদেশকে এখনও কিছুটা স্বাধীন মনে করি। তবে সে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টে, তথাকথিত ষোলই ডিসেম্বর নয়।

এখন আসি কিছু গুরুত্বপুর্ণ কথায়। "Behind The Myth of 3 Million" এবং "The Wastes of Time" বইগুলি যারা উচ্চ শিক্ষিত এবং ইংরেজিতে সাহিত্য পড়ার অহরহ অভ্যাস আছে তাদের জন্য। কিন্তু বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষিতরা এখনও সেই মানে পৌছায়নি। তাই ঐ বইগুলি বাংলা অনুবাদ বের করা যায় কিনা তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।
আমার হৃদয় নিংরানো সালাম ও শ্রদ্ধা জানাই প্রিয় ভাই কে. এম. আমিনুল হককে। তিনি যদি তার বাকি বইগুলো শিঘ্রই এই ওয়েব সাইটে সরবরাহ করতেন তবে আমরা যার পর নাই উপকৃত হতাম।
পরিশেষে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে এই বলে প্রার্থনা করি, এই উদ্দগে সংশ্লিষ্টরা যেন আরও অধিক দিন বেঁচে থেকে মুসলিম জাতির এই মহান খেদমতে আন্জাম দিতে পারেন। আমিন। শামীম (কোরিয়া থেকে)
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+8 # 2010-08-17 08:42
আমি শামীম ভাইয়ের সাথে সম্পূর্ন একমত। আমরা অনেক কিছুই জানিনা, আমরা সত্য ইতিহাস জানতে চাই। এই সাইটের বইগুলো পড়ে আমি স্তম্ভিত হয়ে পড়েছি, অনেক অজানা তথ্য জানা গেল। আরো বই আপলোড করার অনুরোধ জানাচ্ছি।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2009-11-02 17:38

Having read some pages of the book, I felt that I should write a few lines on the literary merits of it. Many a book goes beyond their discursive setting to please the readers of other disciplines, such as Edward Gibbon’s THE HISTORY OF THE SARACEN and THE HISTORY OF THE DECLINE AND FALL OF THE ROMAN EMPIRE; they are read for their literary merits more than their original objective as being historical work. This piece of writing of the author is almost similar. Once you start reading it, the narrative quality doesn’t seem to let you go of it. I would recommend readers of any persuasions, including political, to read it; no one needs to be persuaded to believe or accept what he had written, but simply to appreciate the ‘authorial energy’ that he had induced into narrative; you cannot escape it.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2010-07-07 15:16

My only and eager request to you and all people like you to write in details, ins and outs of that war, all facts in the form of text and online version. Plz spread these information to Bangladeshi people and to the whole world. I really get many untold and hidden facts which must be disclosed to the whole nation. By the will of Almighty, truth will prevail, today or tomorrow. "Man is unjust but God is just, finally justice triumphs."

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+2 # 2012-09-23 01:31

InshAllah! Truth has to come out a day - This is Allah's promise. He knows well about His secrets when to disclose.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
-5 # 2011-08-19 13:32

I am always interested in perspectives and views from all sides of an issue. As a result I have spent considerable time reading through this site and Dr. Kamal's writing, etc. What I have failed to understand is the deep love and importance of Pakistan to proponents of these views. After 40 years why does Pakistan matter at all? What is the relationship between Islam and Pakistan? Have you kept up with Pakistan? Do you see what a terrible, repressive mess that country has become? Are you not glad that we are not a part of that misery any more? Have you considered the view-point that Pakistan was created as a buffer state for the Western powers and served it's role faithfully till date while not serving it's own people at all.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2011-08-19 22:41
Thanks for your comment. The questions you raised are some of the most common we often get asked. The main reason behind the launching of this website is to provide an online archive of books and publications that reveal the different prospectives. It's almost impossible for anyone in Bangladesh to find proper historical facts regarding the creation of BD. From the inception of BD till to date the history books were and still being written by corrupt so-called historians. None of their books contain fact based analysis. Rather they are based on fantasy stories and character assassinations. The situation of BD is the classic example of the saying "When good men do nothing, evil triumphs." Even though there are some writers who tried to propagate the truth, the sheer numbers of filth and the state sponsorship to promote those filths had made those quality publications almost impossible to locate. Therefore, we have taken the initiative to make those books widely available. It's as simple as that! Nothing else. Our aim is not to propagate any political or ideological movement; neither do we seek to return BD as East Pakistan. (Although currently, both Pakistan and Bangladesh are almost in similar situation- morally, culturally, economically, socially bankrupt.) It's just an Online Archive!

It's not about whether Pakistan matters or not. It's about the historical lessons. It's about uncovering the lies, deceits and criminal activities which culminated in the illegitimate birth of BD. It's about fighting the propaganda which still swamps BD history, where criminals are being portrayed as national hero. Learning from history is very important as history has an uncanny knack of repeating itself. Therefore, someone who claims to be "always interested in perspectives and views from all sides of an issue" shouldn't get agitated when presented with arguments from "other side."

As for your argument about Pakistan now being a failed state- it's totally irrelevant in this context. What if in 5 years time Bangladesh becomes a failed state? (at the moment it's not really far from it!) Would that be a reason enough to change your mind (Assuming you are a proponent of Mujib's idea)? If that's the case, then the reasoning's behind such idea is shamefully fickle. The important thing that should matter is the honesty, sincerity and conviction of people behind a movement. A movement which lends itself to lies, racism, cowardice, treachery is not something to be proud of. As a Muslim a good intention behind an act is all that should matter. What will happen in the future is beyond our control. You cannot judge something with the benefit of hind-sight. So, whether Pakistan is now a failed state or not has no significance when analysing the thought process of the people who fought for the idea. Similarly, if Bangladesh becomes a very successful country, it shouldn't justify the fact that it was created by the masses of shameless collaborators of India.

Also it would be better not to amuse yourself by looking at the current plight of Pakistan. Who knows what calamity will befall us 5 years from now? It's not as if Bangladesh is Singapore. It's still a semi failed country almost a proxy state of India. Can't you see how India is depriving us of water, killing our citizens at borders- and all we can do is absolute zilch? So its a bit rich for us to claim to be in better condition. Anyway, as mentioned before, that's not the point. It is often the case with typical pro India/ BAL supporters who fail to understand this simple analogy.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+2 # 2012-09-23 02:04

Your comment raises another question. What would you say about the generation that actively struggled for freedom and Pakistan movement (In Fact, Muslim League was born in Dacca by a Bengali Nawab)? If Pakistan was created as buffer state for West, BD remained part of that. If your comment is considered correct, don't you think that the same Western Powers changed the game plan and they created Bangladesh?

If not for any other reasons, still for one reason, We all demanded a separate country in the name of Islam and so is the relationship between Islam and Pakistan. You can't claim this because BD's creation based on "Our hands were tied". Ask the souls of your forefathers about the relationship b/w Islam and Pakistan too. If you think creation of Pakistan was a sin, they are equally responsible for this "Sin".

Misery, repressive mess or the similar words about Pakistan are really disgraceful and displeasing. What media is portraying is not the real face of Pakistan. Whether its Heaven or a Living Hell, it is our country and no one has the right to use such remarks about it. We respect your views, your freedom and we feel more pleased than anyone else in the World whenever BD makes one step forward towards prosperity. Irrespective of the past, we consider BD a younger brother whether you consider us or not.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
-3 # 2011-08-20 17:35

Thank you for your response. I would like to respond to some of your comments.

I am not agitated at all and am glad you are providing perspective from the "other side". I am also sure there may be some lies, conceit, misinformation and propaganda involved in the creation myth of Bangladesh. It was so in the case of the birth of India and Pakistan. That is true for the birth of most nation states, civilizations, political entities and even religions. If truth is ultimately what you seek, you should consider the propaganda of your side carefully and not self-righteously assume your perspective to be the 'whole, unalloyed truth'. All that is written or said about the creation of Bangladesh is not myth and all historians are not corrupt or in the pocket of any one ideology. Some historians will try to unearth the truth and the truth has a neat way of emerging over time (Ibn Khaldun) whereas ideologists will constantly try to impose their view of the 'truth' on others.

Also, your claim that the birth of Bangladesh is illegitimate raises questions. Who decides if it is illegitimate? What gives legitimacy to such an outcome? Was the division achieved by Nehru-Jinnah-Radcliffe-Mountbatten legitimate? Was Nehru or Jinnah any less vain or power-hungry than Sheikh Mujib? Are the borders of the nation-states anywhere in the world today legitimate? One may like a border and another may not, in the same way that one man's freedom-fighter is another's terrorist. The question is not one of legitimacy of the arguments and propaganda of the two sides, but whether the majority of the peoples aspirations are reflected in the outcome. I think there is little doubt that the majority of East Pakistanis wanted to secede and are at peace with the separation. Perhaps, it's high time you accept this reality as well.

I would also like to clarify that I did not call Pakistan a 'failed state' nor am I amused by its current plight. There is no reason to relish in anyone's misery. However, it remains true that we don't have to deal with the particular problems that Pakistan is facing in addition to the many issues that plague us. We are struggling along our own path towards a better Bangladesh. We may not succeed, but at least our hands are not tied by West Pakistan or by the issues and limitations of West Pakistan. You did not address my earlier statement about how Pakistan has utterly failed to serve it's own people (of the west or east) over it's history. However, till date it has continued serving it's western masters needs of a buffer state at that location.

Also, the sides in this argument or discussion are not divided neatly into Pakistani collaborators and Indian collaborators. I cringe when I hear AL sympathizers call anyone who opposes them to be 'Pakistan Collaborators'. Likewise, I cannot appreciate your comment about the opponents to your ideology and those involved in the independence struggle of Bangladesh being 'Indian Collaborators'. The whole independence movement of Bangladesh was not simply a struggle between those two sides. Are you completely ignoring the history of agitations in East Pakistan and oppression of the East by the West? In the history of 25 years together the Eastern side never achieved proportional representation. Are you forgetting that while 30 million Bangladeshis most definitely did not die in 1971, several million did? The number is surely several orders of magnitude higher than those that died or suffered on your side (not to minimize deprivation, suffering or injustice suffered by anyone).

To finish , let me go back to my point that Pakistan itself is absolutely irrelevant to us now that 40 years have passed since the civil war and the two have indeed parted ways. The only reason it remains in the current narrative is because people of your ilk are holding on to it. Hence, my questions earlier. However, India remains relevant for many reasons including our shared borders and water resources. I agree that we should remain vigilant in defending these borders and maintaining our autonomy. While this may be difficult and India will constantly try to violate our independence, our history tells us that it is achievable (200 + years of independent Muslim Sultanate in Bengal after the Tughlaq dynasty). Let's worry about this challenge and let the issue of Pakistan pass. The issue is anachronistic and has passed just as water under a bridge.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+8 # 2011-08-21 11:56
I agree with you that it’s not uncommon to find lies and misinformation in historical documents of most nations, states, civilizations etc. But I’ve yet to know of any which have such rampant falsification as it is the case with Bangladesh’s creation. We do indeed consider each publications and the quality of analysis they provide very carefully. So far we haven’t come across any books supporting the secessionist movement offering similar quality of analysis. If you know any then feel free to share. We do not hoist any book which relies on character assassination or vengeance. Can you give evidence supporting your claim that any of the books in this website is such? Nowhere in this website it’s claimed that the perspective these books are providing are ‘whole, unalloyed’. No human being should claim that. As mentioned before we are simply providing a different viewpoint than those prevalent in BD now a day. The current generation has almost no exposure to these. It’s up to the readers if they think whether it’s superior to those. If your complain is about imposing a view then, I’m afraid you are directing it to the wrong people.

Ofcourse, I also wish someone would try to unearth the truth and hope the truth do emerges over time. But do you honestly believe that pro-separatist are keen to provide such conducive environment? Given the morally corrupt ideology of such people, it’s no wonder why they try to forcefully repress anyone trying to publish the other side. Each year during the February book fair how many publishers comes up with such books? Rest assured none will be more pleased if Ibn Khaldun’s quote you mentioned comes in to fruition.

I still stand by the essence of the comment I made earlier about the birth of Bangladesh. Perhaps ‘illegitimate’ wasn’t the appropriate word. I should’ve rather put “disgraceful”. Comparing someone like Mujib to Nehru-Jinnah is to compare cheese to chalk. Mujib is in different class due to his utter criminal intent. He proved it during his absolute rule by massacring thousands of his own people. Where did you see Jinnah doing so? Sheikh Mujib solely relied on whipping up mobs into frenzy by his rhetoric. He never believed in something constructive. His whole political career bears testament to that. Pre 1971, no where did Mujib publically mention the secession of East Pakistan. Rather he indulged in covert, deceitful collaboration with India. I know it’s a common trait for all pro-Mujib to hate Jinnah. But no where they can find evidence that Jinnah sleep walked Bengalis in to joining Pakistan.

How can you say peoples aspirations were reflected in the outcome? Was that part of Awami League’s constitution prior to the election? You might say the successful birth of Bangladesh in itself proves your point. But without India’s active support that would have never achieved. India chose to support the secessionists from the sideline, but when it realised there’s no hope for them to succeed then it chose to join in- realising such opportunity may never come again.

You cannot call a sudden agitation a reflection of people’s long term aspiration. You see people voting for Mujib then supporting his assassination few years after, how fickle! Even couple of years earlier we saw masses supporting BD Army taking over the country from the corrupt politicians and yet within a year protesting to re-install those same corrupt politicians! Do you call this reflection of aspiration? Do you think it was people’s long aspiration that Sikkim was annexed by India? Deciding to break one’s own country is not a game. Following something just because mob or masses are following is not something to be proud of. Therefore, I reject your idea of following such process. I have no problem even if it’s only one person expressing such view as this website.

This whole excuse of “our hands were tied” is nothing but a way of denying our own ineptitude. Decades will pass away and so will water under a bridge- but we will always find that quote handy. This is a big topic and I do not want to elaborate on this. I would suggest you to go through the books on this very topic. You can delve in to much details of this “hands were tied” saga. I often wonder what a glorified (?) tale we have for our future generations- We will tell the tale of “our hands being tied down” even though we were the majority. Instead of working for the solutions to mend our country’s problem what did we come up with? Destruction. Even for that we the majority had to rely on a hostile neighbours opportunistic support. There’s also a valuable (?) lesson if our country ever falls in to crisis- the best way is to invite foreign vested interests and allow it to divide it further. Destruction not construction is the way forward (!).

As for Pakistan utterly failing it’s own people- I wrote earlier that in this context it has no significance whatsoever. We are not discussing about what a utopia Pakistan has become. Since you are at it, what point you are trying to convey? I can’t see that serving your argument. Do you think Bangladesh serving it’s own people right? What’s your solution for that? Following the lead of 1971, isn’t breaking Bangladesh in to even smaller parts the best solution? No need to worry about Pakistan being a buffer state, worry about Bangladesh serving as a proxy of India. I think as a nation we should stop throwing stone when we are living in a glass house.

I refuse even to accept the term “Pakistan collaborator” same way as one cannot call a citizen of BD offering his life for his country as a “Bangladesh collaborator”. The creation of such derogatory term “Pakistan collaborator” in itself goes to show the corrupt filthy ideology of the Mujib supporters. Do you think 25 years is enough time for a country to achieve everything? Please research in to pre 1947 era East Bengal. I know that as a nation we love to promote fantasy stories like “Sonar Bangla”. But pre 1947 East Bengal was a hinterland. You cannot demand proportional representation without attaining the capabilities. A quota system without merit is not an ideal solution for an already struggling country trying to rebuild itself. Just look at the consequences of wanton quota (so called freedom fighters quota) system of Sheikh Hasina’s government. This is also a disgraceful historical fact of our nation. We do not want to take any responsibilitie s, but think it’s our birth right to demand anything. Don’t you find this hypocritical to conspire against a country since it’s birth and yet to complain about not getting enough from it.

As for you mentioning the number of dead people- I don’t want to engage in to number game but whatever number you are coming up with has no factual basis. The situation of Bangladesh is such that as long as it is greater then 3 million, anyone can conjure up anything- with plenty of eager masses to blindly support those. Don’t get me wrong, any death is deplorable. Questioning about 3million or 3 lacs or whatever is not to lessen anything but to show the extent to which these people are prepared to go to falsify history and justify their disgraceful act. Majority of Bangladeshi history books doesn’t even mention the massacres committed by the pro-India thugs called “Mukti Bahini”.

Whether you like it or not, Pakistan is relevant whenever you are discussing the birth of Bangladesh. What do you mean by “….people of your ilk are holding on to it.” Holding on to what? The problem is you are still failing to understand just because “people of our ilk” are analysing the birth of Bangladesh with the different perspective, doesn’t necessarily mean we are holding on to Pakistan. In a way your quote is not dissimilar to those you claim to give you cringe! Let me just give you a small example about the relevance of analysing the 40 year old factor. If Santu Larma ever asks for separation based on the same ideology you are purporting then on which moral high ground you will choose to stand? That issue is not anachronistic. There is so much to learn from our past history of letting criminals to lead and allowing them to whip up a frenzy of nationalistic fervour based on narrow ethnic creed, giving heed to false propaganda sponsored by a vested foreign interest. I cannot comprehend why it’s so difficult for some to accept that we cannot progress by simply ignoring our wretched past.

Unless of course if you had meant Pakistan’s irrelevance to current Bangladeshi Politics; then I would have totally agreed. But say that to Awami Leaguers. Not a day passes without them keep dragging Pakistan and blaming them for everything from political violence, BDR massacre to corruption! To give credence to that proverbial excuse of “our hands were tied”- Pakistan will always be needed by them. That putrid ideology of Mujib is such that to remain in existence it will always require the fantasy presence of Pakistan.

Just for your information, 200 + years of independent Muslim Sultan’s you were talking about were not Bengalis; so in a way to feel proud of their achievements is a sacrilege to the very ideology of Mujib you are supporting! You complain about analysing something which happened 40 years ago where Bengalis had atleast some influence, yet you want to feel proud about something that happened 500 years ago and for which Bengalis had no part whatsoever.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+1 # 2015-09-03 16:28
What an absolutely brilliant reply!
I'm new to this website myself.
I was completely enthralled by the writing of Syed Sajjad Hussain, please do try to publish his other works.
I will do my best to publicize this website. It is an excellent endeavour.
As a Bangladeshi, my sincere thanks to the creators and contributors of this website.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+9 # 2013-03-22 15:38
লেখাটা পড়ে অনেক কেঁদেছি
অনেক কিছুই জানিনা, আমরা সত্য ইতিহাস জানতে চাই।
"তোমাদের সমস্ত গুনাহর কাফফারা মৃত্যুর দোর-গোড়ায় এসেও আমাদের দিতে হবে, সে আমরা জানি। তোমরা ধ্বংস করবে আমরা গড়ব। তোমরা বিদেশীদের দালালি করবে আর দালাল হিসেবে চিহ্নিত হব আমরা। যুগে যুগে ইসলামের সৈনিকরা সমগ্র জাতির ভুলের মাশুল দিয়েছে তাদের জীবন দিয়ে।'
যাযাকাল্লাহ খায়র
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2013-10-14 10:29
আমি একটা জিনিস খেয়াল করেছি যে কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা ৭১ এ ইসলামের পক্ষে দাড়িয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক যে অনেককে দেখি কওমী মাদ্রাসার ছাত্রদের মুক্তিযোদ্ধা প্রমানের চেষ্ঠা করে। আলেম মুক্তিযোদ্ধার খোজে বই লেখে।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2015-04-13 08:17
আজই ১ম এই story of Bangladesh নামক সাইটি হঠাৎ পেলাম এবং “বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর অপরাধ” লিখাটি পড়লাম এরপর আরো কিছু লিখার ভুমিকা পড়লাম (সময়ের অভাবে এগুতে পারিনি) নিজেকে মনে হল ইতিহাসের মহাসমূদ্রে ভাসমান ছোট্ট একটি কচুরীপানার সদ্য অংকুরিত পাতা। নতুন প্রজন্মকে অনেক কিছুই জানা উচিৎ এখান থেকে। কিন্তু ভয় হয় বর্তমান আওয়ামী+নাস্তিক সরকারের কবলে পড়ে যে কোন মুহুর্তে এই সাইট আমাদের নিকট থেকে হারিয়ে যেতে পারে যেমনিভাবে “সোনার বাংলা” ব্লগটিকে তারা হত্যা করেছে! যা-ই হোক আমার এ মন্তব্যের উদ্দেশ্য একটাই। আর তা হলো, যারা এ ব্লগটির লেখক ও পাঠক আপনারা যেন প্রতিটি লিখার ১টি কপি ডাউনলোড করে নিজের সংগ্রহে রেখে দেন। তাহলে নতুন প্রজন্মের নিকট এগুলো পৌঁছে দিতে সহজ হবে।- আমি সত্যবাদীদের সহযোদ্ধা। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন যেন আমাদেরকে সত্য প্রকাশে দৃঢ় রাখেন। আমিন।
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh