Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ১০ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

এদিকে ১৯৫৮ সালের এপ্রিল মাসে মুসলিম লীগের দ্বিতীয় কাউন্সিল অধিবেশন হয়। এবারও অধিবেশন স্থল ছিল করাচীর সেই বিখ্যাত খালেকদীনা হল। যেখানে পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের অনেক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এবার আমরা করাচী গিয়েছিলাম উড়োজাহাজে। আমি উঠেছিলাম করাচীর তাজ হোটেলে।

এবারকার অধিবেশনে আমাদের সভাপতি নির্বাচিত হন সীমান্ত প্রদেশের আব্দুল কাইয়ুম খান। কাইয়ুম খান ছিলেন পাকিস্তানোত্তর কালে সীমান্ত প্রদেশের প্রথম মূখ্যমন্ত্রী। সীমান্ত প্রদেশে বরাবরই কংগ্রেসের একটা প্রভাব ছিল। এই প্রভাবের মূলে ছিলেন খান আব্দুল গফফার খান। দীর্ঘদিন সংগ্রামকরে তিনি সীমান্ত প্রদেশের মানুষকে গান্ধীর অহিংস রাজনীতিতে দীক্ষা দিয়েছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনকালে কাইয়ুম খানের গতিশীল নেতৃত্বের সামনে সীমান্ত প্রদেশে কংগ্রেসের এতকালের সাজানো ঘর ভেঙ্গে পড়ে এবং রেফারেন্ডামের মাধ্যমে সীমান্ত প্রদেশের মানুষ পাকিস্তানে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।

এই পাঠান নেতা যেদিন নতুন করে মুসলিম লীগের হাল ধরলেন সেদিন মনে আছে সারা করাচী শহরে সাড়া পড়ে গিয়েছিল। পাকিস্তান হওয়ার পর কায়েদে আযমের ইন্তেকাল ও লিয়াকত আলী খানের শাহাদাতের ফলে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে যে এক ধরণের নির্জীবতা এসেছিল আমার মনে হয় কাইয়ুম খানের সভাপতি হওয়ার পর তা কাটতে শুরু করে।

মুসলিম লীগের কর্মীদের মধ্যেও নতুন করে প্রাণ-চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। আমি এবার পাকিস্তান মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য নির্বাচিত হই। এসময় পূর্ব পাকিস্তান পরিষদে একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটে। কৃষক শ্রমিক পার্টি ও আওয়ামী লীগের সদস্যদের মধ্যে পরিষদের একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে রীতিমত মারামারি বেধে যায়। সেটা হাতাহাতি ও ঘুষোঘুষি পর্যন্ত পৌঁছায়। সে সময় পরিষদে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পীকার চাঁদপুরের শাহেদ আলী। তিনি কৃষক শ্রমিক পার্টির টিকিটে নির্বাচিত হয়েছিলেন। মারামারির এক পর্যায়ে শেখ মুজিব শাহেদ আলীকে লক্ষ্য করে পেপার ওয়েট ছুঁড়ে মারেন। শাহেদ আলী ছিলেন ডায়াবেটিসের রোগী। তিনি সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে যান। তাঁকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তিনি আঘাতজনিত কারণে ইন্তেকাল করেন। আমি পুরো কাহিনী পরে মোহন মিয়ার মুখ থেকে শুনেছি। পরিষদের মধ্যে আওয়ামী লীগের গুন্ডামী ছিল নজিরবিহীন ঘটনা। এভাবে একজন নির্বাচিত স্পীকারকে হত্যা করে আওয়ামী লীগ তার ফ্যাসিস্ট চরিত্রের ষোলকলা পূর্ণ করে। পরিষদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনেও ঘটে ভূমিকম্প। জেনারেল আইয়ুব রাজনীতিবিদদের এই নীতি বিবর্জিত কর্মকান্ডের ধুয়া তুলে পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করেন। এভাবে রাজনীতিবিদদের হাত থেকে পাকিস্তানের ক্ষমতা চলে গেল সামরিক বাহিনীর হাতে। সেই সাথে দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় আমেরিকা একটি নতুন বন্ধু পেল। যে রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল ইসলামী আদর্শের উপর ভিত্তি করে সে রাষ্ট্রটিই তখন নেতৃত্বের অযোগ্যতার কারণে ইসলামের দুশমন আমেরিকার স্বার্থ রক্ষার বাহক হয়ে দাঁড়ালো।

আইয়ুব খান ক্ষমতায় এসেই রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করলেন। সংবিধান স্থগিত করলেন। কাইয়ুম খান সোহরাওয়ার্দীর মত নেতাদের করলেন কারারুদ্ধ। সেই সাথে বলতে লাগলেন রাজনীতিবিদরাই পাকিস্তানের যত দুর্গতির জন্য দায়ী। তিনি ভুলে গিয়েছিলেন পাকিস্তানের সৃষ্টিই হয়েছিল রাজনীতিবিদদের সংগ্রামের ফলে। আইয়ুব খান সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য নিয়ে পাকিস্তানের ক্ষমতায় এসেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন ফৌজি পোশাক ছেড়ে পাকিস্তানের ক্ষমতায় দীর্ঘদিন টিকে থাকতে। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন মুসলিম লীগ দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠান। তার একটি গণভিত্তি আছে। সুতরাং এই প্রতিষ্ঠানটির পরিচয়কে ব্যবহার করা যেতে পারে। আইয়ুব গোপনে মুসলিম লীগ ভাঙ্গতে উদ্যোগী হলেন। তাঁর এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গী হলেন বগুড়ার মোহাম্মদ আলী। তখন আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র নামে একটা অদ্ভুত রাজনৈতিক পদ্ধতি চালু করলেন। এ ধরণের ব্যবস্থার সাথে এদেশের মানুষের কোন পরিচয় ছিল না। সমকালীন পৃথিবীতে এর কোন নজিরও ছিল না। আসলে পাকিস্তানের দুর্বল রাজনৈতিক কাঠামোকে এ নতুন পদ্ধতি দুর্বলতর করতে শুরু করল।

আইয়ুব মৌলিক গণতন্ত্রের ভিত্তিতে একটা সংবিধানও তৈরী করেছিলেন। সেই সংবিধানের সূত্র ধরে ১৯৬২ সালে দেশে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আইয়ুব তাঁর নিজের লোকদেরকে পাশ করিয়ে নেন।

আইয়ুব খান নির্বাচনের পর একটা দল গঠনেরও প্রয়োজন অনুভব করেন। মোহাম্মদ আলী নির্বাচনে জয়লাভের পর এই দল গঠনের উদ্যোগ নেন। তিনি তখন একটি সুর তোলেন Voice of the people is the voice of God. তাঁরই নেতৃত্বে করাচীতে মুসলিম লীগের একটা কনভেনশন ডাকা হয়। তিনি ঢাকায় এসে মুসলিম লীগ কর্মীদের খরিদ করতে শুরু করেন। এভাবেই মুসলিম লীগ দু’টুকরো হয়ে যায় এবং সরকারীপন্থী কনভেনশন মুসলিম লীগ তৈরী হয়। যাঁরা সেদিন সরকারের সাথে যোগ দিয়েছিলেন তাঁরা যে সবাই খারাপ মানুষ ছিলেন এমন নয়। কিন্তু আমি বলব তাঁদের এই কার্যকলাপে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে পড়ে, সেই সাথে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ ইতিহাসও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে উঠতে থাকে।

মুসলিম লীগের নির্বাচিত সভাপতি কাইয়ুম খান তখনও জেলে। এ বিপর্যয়ের দিনে নূরুল আমীন এই আত্মঘাতী কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকার জন্য মুসলিম লীগ কর্মীদের আহ্বান জানালেন। সেই আহ্বান বোধ হয় আপাত ক্ষমতার সিঁড়িতে উঠবার মত সুযোগপ্রাপ্ত অনেকের কাছেই ভাল লাগেনি। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আইযুবের আশীবার্দ প্রাপ্ত হয়ে মুসলিম লীগের পুনরুজ্জীবন আমরা চাইনি। আমরা চেয়েছিলাম কাইয়ুম খানের নেতৃত্বে মুসলিম লীগকে নিয়ে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে নামতে।

নূরুল আমীনের বাসভবনে প্রদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত মুসলিম লীগ নেতাদের নিয়ে একটা মিটিং হয়েছিল। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেনঃ সর্বজনাব শাহ আজিজুর রহমান, সৈয়দ শামসুর রহমান, হাশিম্দুদ্দীন আহমদ, বি এম ইলিয়াস, পনিরুদ্দীন, জনাব মাসুদ, রুহুল আমীন, আব্দুল করিম, সিরাজুদ্দীন, খাজা খয়েরুদ্দীন, সৈয়দ শহিদুল হক, আজিজুর রহমান, আব্দুল গফুর, শাহ ইকরামুর রহমান, আলাউদ্দীন আহমদ, শাহ আবদুল বারী, আবুল কালাম আজাদ, আব্দুস সালাম, আসাদুল্লা, আহমেদুর রহমান, আব্দুল হাকিম, সফিকুর রহমান ও আমি।
এ সময় মুসলিম লীগের জন্য আর একটা আঘাত অপেক্ষা করছিল। কাইয়ুম খানকে বাদ দিয়ে মুসলিম লীগের একটা অংশ খাজা নাজিমুদ্দীনকে সভাপতি করে কাউন্সিল মুসলিম লীগ তৈরী করে। কাউন্সিল মুসলিম লীগ কাইয়ুম বিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু এটা সত্য, সরকার বিরোধী মুসলীম লীগ অংশের উপর তারা পুরো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।

আমি সেদিন মুসলিম লীগের কোন পক্ষকেই সমর্থন জানাতে পারিনি। ব্যক্তিগতভাবে সারাজীবন মুসলিম লীগের খেদমত করলেও মুসলিম লীগের বিপর্যয়ের দিনে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিল না। দু’পক্ষের সবাই ছিল আমার পরিচিত। হয়ত কোন প্রয়োজনে কারও আমন্ত্রণে সাড়া দিলেও সেটা ছিল ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের কারণে। আদর্শের প্রয়োজনে নয়।

কনভেনশন মুসলিম লীগকে ব্যবহার করে বগুড়ার মোহাম্মদ আলী নতুন সংবিধানের আওতায় পরিষদের নেতা নির্বাচিত হন। আইয়ুব তাঁর ক্ষমতার ভিত্তিকে মজবুত করতে সচেষ্ট হন। পাশাপাশি দেশে এ সময় আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনও গড়ে ওঠে। তাঁর অগণতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদে রাজনৈতিক লোকজন একত্রিত হন এবং এভাবেই সম্মিলিত বিরোধী দল এন ডি এফ-এর জন্ম হয়। ঠিক হয়, এন ডি এফের নেতারা নিজস্ব দলের পুনরুজ্জীবন না ঘটিয়ে আইয়ুবের বিরোধিতায় সম্মিলিতভাবে আন্দোলন করবেন। কিন্তু গোল বাধান শেখ মুজিব। তিনি তাঁর নেতা সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশ উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবন করতে উদ্যত হন। এ নিয়ে সোহরাওয়ার্দীর সাথে তাঁর মনোমালিন্য হয়। সোহরাওয়ার্দী শেখ মুজিবকে যে কোন কারণেই হোক স্নেহ করতেন। কিন্তু শেষ বয়সে মুজিবের অসৌজন্যমূলক আচরণে সোহরাওয়ার্দী অত্যন্ত ব্যথিত হন। শোনা যায় এই বেদনা নিয়ে তিনি বৈরুত চলে যান। সেখানে তিনি ইন্তেকাল করেন। পরে শুনেছি শেখ মুজিবের এই আচরণে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন ‘এই লোকটিই এখন আমার দেশের ক্ষতি করবার চেষ্টা করছে’।

সোহরাওয়ার্দীকে উপেক্ষা করার মধ্য দিয়ে মুজিব তাঁর ভারতমুখী রাজনীতির ভেলায় উঠে বসেন। এতদিন সোহরাওয়ার্দীর বিশাল ব্যক্তিত্বের সামনে শেখ মুজিব যা ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারেননি। এবার তাঁর সামনে সে সুযোগ এসে যায়।

১৯৬৫ সালে আইয়ুব প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আয়োজন করেন। নির্বাচনকে সামনে রেখে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের নেতাদের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যের এক অপূর্ব নজির স্থাপিত হয়। সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ) কায়েদে আযমের বোন ফাতেমা জিন্নাহকে আইয়ুবের বিরুদ্ধে প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করায়। এটা সত্য, সত্যিকার অর্থে যদি কোন নির্বাচন হত তবে সেদিন ফাতেমা জিন্নাহই নির্বাচিত হতেন। কিন্তু নির্বাচনের রায় পূর্ব নির্ধারিত ছিল। তাই আইয়ুবই আবার প্রেসিডেন্ট হলেন।

১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধ হয়। যুদ্ধটা ছিল কাশ্মীরকে নিয়ে। ভারত চেয়েছিল এ যুদ্ধের মাধ্যমেই পাকিস্তানকে শেষ করে দিতে। কিন্তু পাকিস্তানের উপর কোন সামরিক বিজয় লাভ তো দূরে থাক এ যুদ্ধে দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় ভারত।

আইয়ুব খান এ যুদ্ধকে জিহাদ হিসেবে ঘোষণা করেন। এটা অস্বীকার করবার উপায় নেই আইয়ুবের সফল নেতৃত্বের কারণে পাকিস্তান ভারতের চক্রান্ত নস্যাতে সমর্থ হয়। আইয়ুবের রাজনৈতিক ব্যবস্থা আমরা সমর্থন করতে না পারলেও একথা স্বীকার করতে হবে পাকিস্তানের উন্নয়নে তাঁর গতিশীল ভূমিকার কথা। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের সত্যিকার উন্নতি যা হয়েছে তা তাঁর আমলেই।

আমার মনে আছে যুদ্ধকালীন গভর্ণর মোনেম খান তাঁর সরকারী দফতরে সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনার জন্য সবক’টি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দকে আহ্বান করেছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে শেখ মুজিব যা বলেছিলেন তা রীতিমত পিলে চমকানোর মত। তিনি গভর্ণরকে প্রস্তাব দেন পাকিস্তানের এই ক্রান্তিলগ্নে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করলে নাকি তিনি মোনায়েম খানকে সকল রকম সহযোগিতা দেবেন। শেখ মুজিবের এই উক্তি ছিল রীতিমত রাষ্ট্রদ্রোহিতামূলক। তখনকার পরিস্থিতিতে সরকার অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

১৯৬৬ সালে মুজিব তাঁর ৬ দফা পেশ করেন। এটাকে তিনি নাম দেন বাঁচার দাবী। ৬ দফার প্রত্যেকটি শর্ত পড়লে যে কোন বিবেকবান লোকই স্বীকার করবেন এ ব্যবস্থায় প্রকৃত অর্থে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের এক হয়ে চলা সম্ভব ছিল না। অথচ মুজিব সেই দাবীই করেছিলেন। আসলে ৬ দফার অন্তরালে তাঁর বিচ্ছিন্নতার গোপন ইচ্ছা লুকিয়ে রেখেছিলেন। ৬ দফায় ছিল বিচ্ছিন্নতার বীজ। ৬ দফা মুজিবের মস্তিষ্কপ্রসূত ছিল না। এটা তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট নেতা খোকা রায়।

৬ দফার সাথে সাথে মুজিব তাঁর পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী প্রচারণা আরও বৃদ্ধি করেন। বাঙ্গালী এমনিতেই আবেগপ্রবণ জাতি। নিজের কর্তব্য কর্মের চেয়ে পরচর্চা ও পরের উপর দোষ চাপানোতেই তারা আনন্দ পায়। তারা যখন দেখল শেখ মুজিব আপাতদৃষ্টিতে তাদের হয়েই কথা বলছেন, তখন তারা তাঁর কথায় বিশ্বাস করতে শুরু করে। শেখ মুজিব তাঁর পুরনো ধারায় প্রচার করতে থাকে যে, পশ্চিম পাকিস্তানীরাই পূর্ব পাকিস্তানকে লুটে নিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে থাকার কতকগুলো ঐতিহাসিক কারণ ছিল। যখন ভারত ভাগ হয় তখন পশ্চিম পাকিস্তানে তিনটি পূর্ণাঙ্গ প্রাদেশিক রাজধানী ছিলঃ করাচী, লাহোর ও পেশাওয়ার। পাঞ্জাবের যে সেচ ব্যবস্থা ছিল তা উপমহাদেশের কোথাও ছিল না। সিভিল সার্ভিস ও অন্যান্য সার্ভিসেও তাদের বহু যোগ্য অফিসার ছিল। এর মোকাবিলায় পূর্ব পাকিস্তানের উল্লেখ করবার মত তো কিছুই ছিল না। এ আপাত বৈষম্য কাটিয়ে উঠবার জন্য তো সময়ের প্রয়োজন। রাতারাতি তো কেউ সার্ভিসে উচ্চ পদ পেতে পারে না, হঠাৎ করেই একটা অঞ্চলের উন্নতি সম্ভব নয়। এটা স্বীকার করতেই হবে ষাটের দশকে এসে পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তান উন্নয়নের দিক থেকে খুব কাছাকাছি চলে আসতে শুরু করেছিল।

আমার মনে পড়ছে ষাদের দশকের শেষে এসে ইউনিভার্সিটিতে আমার সিনিয়র শফিউল আযম প্রদেশের চীফ সেক্রেটারী হয়েছিলেন। প্রায় প্রত্যেক জেলাতেই বাঙ্গালী অফিসাররা ডিসি হিসেবে নিয়োগ পেতে শুরু করলেন। সেনাবাহিনীতে বাঙ্গালীদের সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছিল ৩১%। যেখানে ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মিতে পূর্ব পাকিস্তানী বাঙ্গালী সৈন্য খুঁজে পাওয়া যেত না। কিন্তু শেখ মুজিবের কাছে এগুলোর কোন গুরুত্ব ছিল না। তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থে একটা পলিটিক্যাল এজিটেটর বা রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টিকারী। এ কথাটা পরে তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় ভারতীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান লে. জেনারেল অরোরা। মুজিব যখন পূর্ব পাকিস্তানের জনপ্রিয় নেতা হয়ে উঠতে শুরু করলেন তখন তাঁর সাথে এক অদ্ভুত সম্পর্ক গড়ে ওঠে অবাঙ্গালী কতিপয় শিল্পপতির। আমার মনে পড়ছে সিন্ধু মুসলিম লীগ নেতা ইউসুফ হারুন ছিলেন আলফা ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের মালিক। তাঁর পূর্বাঞ্চলীয় সদর দফতর ছিল ঢাকার গুলিস্তানে। ইউসুফ হারুন আলফা ইন্স্যুরেন্সের পূর্বাঞ্চলীয় জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে শেখ মুজিবকে পছন্দ করেন। তিনি তাঁকে নিয়মিত বেতন ভাতা দিতেন। শোনা যায় ইউসুফ হারুন তাঁর পার্টির খরচের জন্যও টাকা পয়সা দিতেন। বলতে গেলে মুজিব তাঁর পার্টির কাজ কর্ম করতেন আলফা ইন্স্যুরেন্সের অফিসেই বসে।

ইউসুফ হারুনের এই মুজিব প্রীতির একটা কারণ ছিল। ইউসুফ হারুন ছিলেন জমিদার এবং পারিবারিকভাবে তাঁরা ছিলেন ভূট্টো পরিবারের প্রতিদ্বন্দ্বী। ভূট্টো ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের জনপ্রিয় নেতা। হয়ত ইউসুফ হারুন মুজিবের জনপ্রিয়তাকে ভূট্টোর বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন।

মুজিবের সাথে আদমজীদেরও সম্পর্ক ছিল। আব্দুল আউয়াল বলে চাঁদপুরের এক ছাত্রলীগ নেতা ছিল আদমজী গ্রুপের কর্মচারী। তাকে সবাই আউয়াল আদমজী বলে ডাকত। এই আউয়ালের মাধ্যমে মুজিব আদমজীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করতেন। তখন পূর্ব পাকিস্তানে ভাবনা ফুড প্রসেসিং ইন্ডাষ্ট্রি ছিল বেশ নামকরা। এক পাঞ্জাবী শিল্পপতি ছিলেন এটার মালিক। এরা জ্যাম জেলী ইত্যাদি প্রস্তুত করত। একবার মোহন মিয়ার সাথে আমি ভাবনা ইন্ডাষ্ট্রির মালিকের এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়েছিলাম। তাঁর ড্রইং রুমে যেয়ে দেখি ঘরের দেয়ালে শেখ মুজিবের বিরাট এক ছবি। এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করায় তিনি উত্তর দিলেন মুজিব আমাদের নেতা। সেই বাসায় তখন মুজিবের এক বোনের জামাইকেও দেখলাম। তিনি ছিলেন এদের কর্মচারী। মুজিব এই পাঞ্জাবী ব্যবসায়ীর কাছ থেকেও অর্থ গ্রহণ করতেন। এ ধরনের দু’একটি ঘটনার উল্লেখ এ কারণে করলাম যে শেখ মুজিব গোপনে এসব অবাঙ্গালী শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করতেন অথচ তাদেরই বিরুদ্ধে শোষণের অভিযোগে রাজপথ মুখর করতেন। মুজিবের একটা সুবিধাও ছিল। অবাঙ্গালীদের শোষণের কথা বলে তিনি তাদের কাছে একটা প্রেসার এলিমেন্ট হিসাবে দাঁড়িয়ে গেলেন। একারণে অবাঙ্গালীরা অনেক সময় ভয়ে তাঁকে স্বেচ্ছায় টাকা পয়সা দিয়ে আসত। বলাবাহুল্য অস্তিত্ব রক্ষার ভীতিই কাজ করত তাদের এ ধরনের অর্থ প্রদানের পেছনে।

মুজিব যখন ১৯৬৯ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে আইয়ুবের গোল টেবিল বৈঠকে যোগ দেয়ার জন্য পশ্চিম পাকিস্তান যান তখন লাহোর থেকে গাড়ীসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করেছিল আদমজী। আমি তখন লাহোরে। সেখানে আউয়ালের সাথে দেখা। সে আমাকে বলল বড় ভাই সব ব্যবস্থা করতে এসেছি। ১৯৬৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার মত একটা গুরুতর ষড়যন্ত্র উদ্ঘাটিত হয়। এটিই আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নামে পরিচিত। ভারতের সহযোগিতায় পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার এই কাজে মুজিব ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

এই মামলায় শেখ মুজিব এতদ্সংক্রান্ত সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। শেখ মুজিব দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় স্বার্থরক্ষা করে চলেছিলেন। ভারতীয় স্বার্থ রক্ষা করার জন্যই তিনি পূর্ব পাকিস্তানে বাঙ্গালীর অধিকারের কথা বলতেন। আর ভারতও জানত বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের ভিত যত মজবুত হবে পাকিস্তানের বুনিয়াদ তত দুর্বল হবে। সেই পথ ধরেই পাকিস্তান দ্বিখন্ডিত হয়ে যাবে যা ছিল ভারতের আরাধ্য। বাংলাদেশ হওয়ার পর শেখ মুজিব যে এই সব ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ছিলেন তা নিজেই স্বীকার করেছেন। তাঁর দল এ জন্য গৌরব বোধ করে। তিনি যে ভারতীয় স্বার্থের রক্ষক হিসেবে এদেশে কাজ করতেন তা অনেকেরই জানা। ১৯৭২ সালে ৮ ও ৯ এপ্রিল আওয়ামী লীগের দলীয় কাউন্সিলে দেয়া এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা সত্যিকারের স্বাধীনতা ছিল না। আমি কোনদিনই এ স্বাধীনতার উপর বিশ্বাসী ছিলাম না। আমি বহুপূর্ব থেকেই এদেশের স্বাধীনতার জন্য কাজ করে আসছিলাম। শেখ মুজিব আরও বলেছিলেন সর্বপ্রকার সাহায্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তার জন্য ভারতের সঙ্গে পূর্বেই তাঁর চুক্তি হয়েছিল। সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ভারত সাহায্য ও আশ্রয় দেবে এসব চুক্তি তিনি আগে থেকেই সম্পন্ন করেছিলেন।

ষড়যন্ত্র মামলা যখন চলছিল তখন তাঁর পক্ষ নেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির কতিপয় বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী শিক্ষক। এসব শিক্ষকের সামাজিক অবস্থান অর্জিত হয়েছিল পাকিস্তান হবার ফলেই। কলকাতার জগতে এদের কোন স্থান ছিল না। অথচ এরাই মুজিবের সাথে মিলেমিশে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলেন।

এরকম কয়েকজন প্রফেসরের কথা আমার মনে পড়ছে। প্রফেসর রেহমান সোবহান, আব্দুর রাজ্জাক, আবু মুহম্মদ হাবীবুল্লাহ, খান সরওয়ার মোরশেদ প্রমুখ। রেহমান সোবহান ছিলেন টু ইকনমির প্রবক্তা। একটা দেশে দুটো ইকোনমি কি করে চলে তা বোঝা বেশ মুশকিল হত। আসলে তাঁরা টু ইকোনমি চাননি। টু কান্ট্রিই চেয়েছেন। এই রেহমান সোবহানদের সাথে আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগও ছিল মধুর। শোনা যায় ফোর্ড ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তাঁরা সে সময় বহু অর্থ বানিয়েছেন।

শেখ মুজিবের মামলায় আরও যাঁরা সমর্থন করেছিলেন তাঁদের মধ্যে দুজনের কথা বিশেষ করে মনে পড়ছে। একজন পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি এস এম মোরশেদ। আর একজন জুলফিকার আলী ভুট্টো। মোরশেদ সাহেবের বাড়ি ছিল মুর্শিদাবাদ। দেশ বিভাগের পর তিনি ঢাকায় আসেন। মোরশেদ ভাল লেখাপড়া জানতেন। কিন্তু পাকিস্তানের আদর্শে তাঁর কতটুকু বিশ্বাস ছিল সে কথা বলা মুশকিল। আমার মনে আছে ষাটের দশকে রবীন্দ্র জন্ম শতবার্ষিকী পালন উপলক্ষে সরকারী নির্দেশ উপেক্ষা করে তিনি বিচারপতির আসনে বসে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদীদের সাথে হাত মিলিয়েছিলেন।

রবীন্দ্র শতবার্ষিকী পালনে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। তখনকার পরিস্থিতিতে পাকিস্তান বিরোধী সংস্কৃতিসেবীরা রবীন্দ্রনাথকে ব্যবহার করে বিচ্ছিন্নতার ঢেউকে পল্লবিত করতে মাঠে নেমেছিল মাত্র। কবি রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একজন নিষ্ঠাবান হিন্দু ও শোষক জমিদার। তাঁর জমিদারী এলাকায় গরু কোরবানী নিষিদ্ধ ছিল। তিনি এতদূর সাম্প্রদায়িক ছিলেন যে তিনি ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠারও বিরোধীতা করেছিলেন।
পাকিস্তানের মৌল আদর্শের চেতনায় আঘাত করবার জন্য এই সব সংস্কৃতিসেবীরা মাঠে নেমেছিলেন। তাঁদের সেই অপকৌশলের সাথী হয়েছিলেন মোরশেদ।

আমি এসময় আরও একটা জিনিস অবাক হয়ে দেখেছি মোরশেদের মত পশ্চিমবঙ্গ থেকে আগত কিছু সংখ্যক বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত একদল মানুষ পাকিস্তানের বিরোধীতা করতে শুরু করেন। অথচ এদেশের আশ্রয় লাভের সুবাদেই তাঁরা উপরের সিঁড়িতে ওঠার সুযোগ পেয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গে থাকলে হয়ত এটা কোনক্রমেই সম্ভব হত না।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh