Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ১২ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

কাইয়ুম খানের সাথে এই আমার শেষ দেখা। বাংলাদেশ হওয়ার পরও তিনি বেশ কিছুদিন বেঁচে ছিলেন। কিন্তু আমার আর কখনও সুযোগ হয়নি তাঁর সাথে পুনরায় সাক্ষাৎ করার।

২৫শে মার্চ পাকিস্তান আর্মি ঢাকা শহরে বেরিয়ে আসে। আর্মি ক্র্যাক ডাউনের পরিকল্পনা কিভাবে করেছিল বলতে পারব না। এ ধরনের রাজনৈতিক জটিলতা কখনও সামরিকভাবে মোকাবেলা সম্ভব নয়। আর তাছাড়া তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আর্মির কোন ভূমিকা পালনের অনুকুলে ছিল না। আমার মনে হয় না আর্মি তাদের অপারেশনের আগে কোন রাজনৈতিক নেতার সাথে আলাপ করেছিল। পাকিস্তান পন্থী বহু রাজনীতিবিদ ছিলেন যাঁদের সাথে আর্মি আলাপ করলে এ ধরনের রাজনৈতিক জটিলতা মোকাবেলা অধিকতর সহজ কাজ হত। ২৫শে মার্চেই দেখলাম পুরো ঢাকায় একটা আতঙ্কের ভাব। অনেকেই ঢাকা থেকে নীরবে সরে পড়েন। শেখ মুজিব নিজেই পাকিস্তান আর্মির কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। (পরে শুনেছি শেখ মুজিব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকাস্থ প্রতিনিধির মধ্যস্থতায় আর্মির কাছে ধরা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এর দ্বিবিধ করণ হতে পারে। প্রথমতঃ নিজেকে নিরাপদ করা। দ্বিতীয়তঃ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়ার মত বড় ঝুঁকি থেকে দূরে সরে থাকা।) কিন্তু আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান।

আমি এ জিনিসটা সহজে বুঝতে পারি না আর্মি যখন ক্র্যাক ডাউন করার সিদ্ধান্ত নিল তখন কেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আর্মিও তখন এক ধরনের সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছিল। যদি বিদ্রোহ দমন করাই উদ্দেশ্য হয় তবে এ সব নেতাদের পালিয়ে যেতে দিয়ে ভারতের মাটিতে বসে ষড়যন্ত্রের সুযোগ দেয়া হল কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর হয়ত মহাকালই দিতে পারবে। আরও একটা জিনিস আমি উল্লেখ না করে পারছি না, বাংলাদেশ হওয়ার পর একটা প্রচারণা সব সময় আমি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, আর্মি নাকি নিরীহ বাঙ্গালীদের উপর হামলা চালিয়েছিল। যেখানে বাংলাদেশের জন্য নতুন পতাকা উড়ানো হচ্ছে, সশস্ত্র সামরিক কুচকাওয়াজ চলছে, সামরিক বাহিনীর সাথে বিভিন্নস্থানে যুদ্ধ চলছে সেখানে কি করে আর্মি নিরীহ মানুষের উপর হামলা চালাল তা আমি আজও বুঝতে পারি না।

মুজিবের ৭ই মার্চের ভাষণকে আওয়ামী লীগ দাবী করে স্বাধীনতার ভাষণ। তা যদি সত্য বলে ধরে নিতে হয় তাহলে একটা প্রতিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্রোহ ঘোষণার অনেক পরে আর্মি বিদ্রোহ দমন করতে নেমেছিল।

২৫শে মার্চ রাতে আমি আমার ওয়ারীর বাসায় অবস্থান করছিলাম। রাত বারটা/একটার দিকে হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়। বেশ গোলাগুলির আওয়াজ পাচ্ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল কোর্ট বিল্ডিং-এর দিক থেকে গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। কোর্ট বিল্ডিং-এর পিছনে পুরনো ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা। বাড়ীর দোতলার ছাদে উঠে বুঝতে পারলাম কি! দেখলাম মাঝে মাঝে আগুনের গোলার মত কি যেন ঢাকার আকাশ আলোকিত করে ফেলেছে। এগুলো ছিল কামানের গোলা। আমাদের মহল্লায় দেখলাম কিছু তরুণ কাঠের গুড়ি ফেলে রাস্তা বন্ধ করার চেষ্টা করছে। বুঝলাম এরা আওয়ামী লীগের কর্মী। সম্ভাব্য আর্মির আগমণের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিচ্ছে। পরদিন সকালে আমি কৌতুহলবশতঃ কোর্ট বিল্ডিং-এর দিকে বাসা থেকে হাঁটতে হাঁটতে রওনা হলাম। তখন কারফিউ ছিল না। গিয়ে দেখি ঐ এলাকার সবাই সরে পড়েছে। শুনলাম নদীর ওপার জিঞ্জিরার দিকে গেছে। শাখারী বাজার, তাঁতীবাজার এলাকার ভিতরে ঢুকে দেখি আর্মি এসব এলাকায় গুলি চালিয়েছে। কয়েকটা বাড়ী দেখলাম পোড়া। এ সব বাড়ীর মধ্যে কয়েকটা লাশ তখনও অল্প আগুনে পুড়ছিল।

তারপর গেলাম ইউনিভার্সিটির দিকে। এখানেও আর্মি হামলা করেছিল। আমি গিয়ে শুনতে পেলাম ফিলোসফি ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর জি সি দেব নিহত হয়েছেন। তাঁকে চিনতাম। তিনি অনেকটা ঋষির মত ছিলেন দেখতে। জি সি দেব ধুতি আর পাঞ্জাবী পরে চলাফেরা করতেন। তাঁর মৃত্যুতে আমি দুঃখিত হয়েছিলাম। জ্ঞানী ব্যক্তিদের মৃত্যুতে দেশেরই ক্ষতি হয়। কিন্তু এসব আমাদের জাতীয় জীবনে যে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা শুরু হয়েছিল তারই এক দুঃখজনক পরিণতি। যখন কোন গৃহযুদ্ধ শুরু হয় তখন এরকম অবস্থাই সৃষ্টি হয়। আরও শুনতে পেলাম আর্মি রাজারবাগের পুলিশ লাইন ও পিলখানার ইপিআরদের আস্তানায় হামলা চালিয়েছে।

পরের দিন ২৭শে মার্চ গেলাম নদীর ওপারে জিঞ্জিরাতে। আমি গিয়েছিলাম আমার ব্যবসায়িক পার্টনার ও বন্ধু বিভূতি ভূষণ সাহার সাথে দেখা করতে। বি বি সাহা হিসেবে তিনি সবার কাছে পরিচিত ছিলেন। তাঁর বাড়ী ছিল তাঁতীবাজারে। আর্মির হামলার পর তিনি বৌ ছেলে মেয়ে ও পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের নিয়ে ইন্ডিয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়ে প্রথমে জিঞ্জিরা যান। যাওয়ার আগে আমার কাছে একটা চেক ও চিরকুট পাঠিয়ে দেন। তাতে লেখা ছিল চেকটা ব্যাংক থেকে ক্যাশ করে ১০,০০০/- টাকা যেন তাঁর কাছে আমি পৌঁছে দেই। আমি সেই টাকা নিয়ে গিয়েছিলাম। জিঞ্জিরায় গিয়ে দেখি এলাহী কারবার। ঢাকা শহর থেকে যারা পালিয়ে এসেছিল তারা দেখি অনেকেই এখানে এসে সমবেত হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদেরও দেখলাম। তাদের অনেককে চিনতাম। আমি আশ্চর্য হলাম এখানে আওয়ামী লীগ নেতারা বসে দিক নির্দেশনা দিচ্ছে, কে কোথায় কোনদিকে ইন্ডিয়া যাবে সে সব বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমার কাছে মনে হল পুরো ব্যাপারটাই পরিকল্পিত। তারা আগেই আঁচ করেছিল আর্মি হামলা করবে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে তাই তাদের কি করতে হবে তারা সবকিছু ঠিক করে রেখেছিল। আর্মি এখানেও খবর পেয়ে হামলা করেছিল। তবে পরে ২৮শে মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর লে.জে.টিক্কা খান সবুর সাহেবকে ডাকলেন। ২৫শে মার্চের ঘটনার পরবর্তী অবস্থা মোকাবেলার জন্যই বোধ হয় আর্মি রাজনীতিবিদদের সাথে আলাপ-আলোচনার কথা ভেবেছিল। তাদের হয়ত এই বোধোদয় হয়েছিল রাজনীতিকদের সহযোগিতা ছাড়া এরকম পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যাবে না। তিনি মুসলিম লীগের তিন গ্রুপসহ অন্যান্য নেতাদের সাথে কথা বলেন। কাইয়ুম মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে সবুর সাহেবের সাথে আমি, মফিজুদ্দীন আহমেদ, হেকিম ইরতেজাউর রহমান এবং সিরাজগঞ্জের আফজাল হোসেন ছিলাম।

তিনি আমদের দেখেই প্রথমে বললেন আপনারাইতো পাকিস্তানের এই দুর্গতির জন্য দায়ী। মুসলিম লীগ পাকিস্তান বানিয়েছিল আর সেই মুসলিম লীগ এখন তিন ভাগে বিভক্ত। এখনও যদি নিজেদের মধ্যে দলাদলি আর মারামারি বন্ধ না করেন তাহলে পাকিস্তান টিকবে? আপনারা এক হন। তিনি দুঃখ করে বললেন পাকিস্তান পাঞ্জাবীরা বানায়নি। পাকিস্তান হয়েছিল ৭৮% বাঙ্গালীর ভোটে। আজ তারাই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে। টিক্কা খান আরও বললেন পাকিস্তান শেষ হয়ে গিয়েছে। একে বাঁচানো যাবে না। তবে আমি যতদিন আছি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যারা ষড়যন্ত্র করছে তাদের বিরুদ্ধে আর্মি শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে লড়াই করে যাবে। আপনারা আমাকে সাহায্য করবেন। আমি চলে যাওয়ার আগে দেখে যেতে চাই আপনারা সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধ হয়েছেন।

টিক্কা খান সম্বন্ধে পাকিস্তান বিদ্বেষীরা এমন অপপ্রচার চালিয়েছিল যে তাঁকে যে কারও কাছেই মনে হবে এক নিষ্ঠুর ঘাতক হিসেবে। তিনি এতই খারাপ ছিলেন যেন হিটলার-মুসোলিনী তাঁর কাছে কিছুই না। অথচ তিনি ছিলেন একজন দৃঢ় চিত্তের মানুষ, জেনারেল হবার মত অনেক যোগ্যতা তাঁর ছিল। তিনি ভাল লেখাপড়াও জানতেন।

২৫শে মার্চের ঘটনা ছিল একটা রাষ্ট্রীয় সিন্ধান্ত। সেই সিদ্ধান্তের সাথে তিনি ঘটনাক্রমে জড়িত হন। এটা যে কোন দেশে যে কোন জেনারেলের পক্ষে এরকম সমস্যা মোকাবেলা করা লাগতে পারে। টিক্কা খানের সাথে আলোচনার সময়ই আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করি মওলানা ভাসানী সম্বন্ধে আপনার ধারণা কি? তিনি এখন কোথায় আছেন? টিক্কা খান স্বতঃস্ফুর্তভাবে বললেন, He is very much with us. I have asked Sodri Isphahani to bring him to me. তাঁর কথায় আমি আশ্বস্ত হলাম। তাহলে মওলানা আমাদের সাথে আছেন। তিনি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যাবেন না। কিন্তু ইতিহাস তৈরী হচ্ছিল ভিন্ন পথে। পাকিস্তানের ভাগ্যও ছিল মন্দ। পরে শুনেছি আর্মির মধ্যেও ছিল দুটো গ্রুপ। একটা মার্কিনপন্থী অন্যটা চীনপন্থী। টিক্কা খান ছিলেন চীনপন্থী। তিনি বলেছিলেন ভাসানীকে পাকিস্তানের পক্ষে কাজে লাগাতে। অন্যদিকে মার্কিন গ্রুপের ভূমিকা ছিল রহস্যময়। তারা পাকিস্তানের সংহতির ব্যাপারে কতদূর আন্তরিক ছিল তা বলা মুশকিল। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পাকিস্তানের সংহতির পক্ষে মার্কিন ভূমিকা ছিল অস্পষ্ট। পাকিস্তানকে তারা অখন্ড দেখতে চেয়েছিল এটা সুস্পষ্টভাবে বলা যাবে না। ভূরাজনৈতিক স্বার্থের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের মত একটা শক্তিশালী মুসলিম দেশ কামনা করত না নিশ্চয়ই। পশ্চিমী সভ্যতার ইসলাম বিরোধী এ চেতনা থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখনও মুক্ত ছিল না। পূর্ব পাকিস্তানে আর্মির ভিতরে মার্কিন স্বার্থের প্রতিভূ ছিলেন রাও ফরমান আলী ও তাঁর অনুসারীরা। তাঁরা বোধ হয় ভাসানীর সাথে টিক্কা খানের যোগাযোগের খবর আগেই পেয়েছিলেন। সদরি ইস্পাহানীকে ফরমান আলীর নির্দেশে আর্মির লোকেরা আটক করে। সন্তোষে মওলানা ভাসানীর বাড়ীতে আগুন লাগিয়ে দেয়। মওলানা ঐ রাতেই সন্তোষ ত্যাগ করে সিরাজগঞ্জ হয়ে আসামের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আসামের ভিতর দিয়ে চীনে চলে যাওয়া। আসামে তিনি গিয়ে উঠেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রীসভার শিক্ষামন্ত্রী মঈনুল হকের বাসায়। আমরা যখন পাকিস্তান আন্দোলন করি এই মঈনুল হক ছিলেন নিখিল ভারত মুসলিম ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি, তখন থেকেই তাঁর সাথে ছিল প্রীতির সম্পর্ক। মওলানা তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন নেপাল হয়ে চীনে পাঠিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতে। কিন্তু মঈনুল হক তা না করে ইন্দিরা গান্ধীকে পুরো ঘটনা অবহিত করেন। ইন্দিরা তখন ভাসানীকে দিল্লীতে ডেকে নিয়ে গৃহবন্দী করে রাখেন। আমি এ ঘটনা পরবর্তীকালে মশিউর রহমান জাদু মিয়ার কাছ থেকে শুনেছি। ইন্দিরা মনে করেছিলেন পাকিস্তান ভাঙ্গার যে শ্রেষ্ঠতম সুযোগ তিনি পেয়েছেন ভাসানীকে দিয়ে তাঁর সেই উদ্দেশ্য সফল হবে না। তাই তিনি তাঁকে আটকিয়ে রেখেছিলেন।

মশিউর রহমান নিজেও ২৫শে মার্চের ঘটনাবলীর পর হিন্দুস্থান গিয়েছিলেন। তিনি মওলানাকে মুক্ত করার চেষ্টাও করেছিলেন কিন্তু সফল হননি। তাছাড়া হিন্দুস্থানের অবস্থাও তাঁর কাছে ভাল লাগেনি। সেখানে রুশ-ভারতের পাকিস্তান বিরোধী ষড়যন্ত্র ও কার্যকলাপ দেখে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরেও যখন ইন্দিরা ভাসানীকে আটকে রাখেন তখন মশিউর রহমান ঢাকায় মওলানাকে মুক্ত করার আন্দোলন শুরু করেন। পরিশেষে জনমতের চাপে ইন্দিরা তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন। আগেই বলেছি টিক্কা খান পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্রোহ দমনের ব্যাপারে আপোসহীন ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর কড়া স্ট্যান্ট নেয়ার ফলেই পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহ প্রাথমিকভাবে এক প্রচন্ড ধাক্কা খায়। আমি আজও ভাবি যে স্ট্যান্ট টিক্কা খান নিয়েছিলেন তা অনেক দেরীতে হয়েছিল। এটা যদি আগরতলা ষড়যন্ত্রের সময়ই নেওয়া যেত তাহলে হয়ত ’৭১ ট্রাজেডি নাও ঘটতে পারত।

এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে আর্মির ব্রিগেডিয়ার বশীর সূত্রাপুর থানার ওসিকে টেলিফোন করে আমাকে তাঁর অফিসে জরুরীভাবে নিয়ে আসার জন্য নির্দেশ দিলেন। বশীর ছিলেন ঢাকা শহরের যাবতীয় আর্মি অপারেশনের দায়িত্বে। ওসি আমাকে টেলিফোন করে জানালেন আমি যেন পরদিন ১০টার সময় তৈরী থাকি। তিনি এসে আমাকে নিয়ে যাবেন।

বশীর সাধারণতঃ আগে গোয়েন্দা মারফত খোঁজ-খবর নিতেন। তারপর পাকিস্তান বিরোধী কোন তথ্য বা ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত ব্যক্তিকে গিয়ে সোজাসুজি ধরে নিয়ে আসতেন। শুনেছি পাকিস্তান বিরোধী হিসেবে তিনি যাঁকে ধরতে পেরেছেন তিনি আর রেহাই পাননি।

সত্যি বলতে কি বশীর আমাকে খোঁজ করায় আমি একটু দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে পড়ি। আমি সব সময় পাকিস্তানের আদর্শে বিশ্বাসী ছিলাম। মনের মধ্যে তাই আমার কোন জড়তা ছিল না। তখন সময়টা ছিল সন্দেহ আর অবিশ্বাসপূর্ণ। কে কি কাজ করছে, কার বিরুদ্ধে কে ষড়যন্ত্র করছে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না।

আমি সোজাসুজি সবুর সাহেবের বাসায় চলে যাই। সেখানে গিয়ে তাঁকে বলি সবুর ভাই বশীর আমাকে ডেকেছেন। বশীর যাকে ডাকেন তিনি তো আর ফিরে আসেন না। আপনি একটু খোঁজ-খবর নেন। আমি যখন সবুর সাহেবের বাসায় যাই তখন দেখি তাঁর ড্রয়িং রুমে পাকিস্তান টেলিফোনের চীফ ইঞ্জিনিয়ার লোকমান হোসেনের স্ত্রী ও ছেলে মেয়েরা বসে আছে। তাদের দেখলাম সবাই কাঁদছে। আর্মি লোকমান হোসেনকে এর আগের রাতে ধরে নিয়ে গিয়েছিল।

সবুর সাহেব আমাকে বললেন ইব্রাহিম তুমি আমার সাথে চল। সবুর সাহেব যখন কেন্দ্রের যোগাযোগ মন্ত্রী তখন এই লোকমান হোসেনকে তিনি টেলিফোন বিভাগের প্রধান বানিয়েছিলেন। সবুর সাহেব তাকে খুব স্নেহ করতেন। রাও ফরমান আলী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন আগে থেকেই, সবুর সাহেব তাঁর সাথে টেলিফোনে সময় নিয়ে নিয়েছিলেন।

সবুর সাহেব রাও ফরমানের কাছে জানতে চাইলেন লোকমানকে কেন আটক করা হয়েছে। রাও ফরমান জবাবে বললেন আপনি লোকমানের জন্য এসেছেন? তিনি তো একটা ইন্ডিয়ান এজেন্ট। তিনি চীফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিজের ক্ষমতায় পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে সব টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করেছে। অন্যদিকে দিল্লীর সাথে আওয়ামী লীগ নেতাদের যোগাযোগ করে দিয়েছে, মুজিবের সাথেও দিল্লীর কানেকশন লাগিয়ে দিয়েছে কয়েকবার। পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে আমরা কয়েকদিন ঠিকমত যোগাযোগ রাখতে পারিনি। আপনি যদি টেপ শুনতে চান শুনতে পারেন। এসব টেপ আমাদের ইন্টেলিজেন্স পাঠিয়েছে। সবুর সাহেব এসব কাহিনী শুনে অবাক। তারপরও তিনি রাও ফরমানকে বললেন লোকমানকে আমি ভাল ছেলে হিসাবে জানি। তাকে আমিই টেলিফোন বিভাগের প্রধান বানিয়েছিলাম। যা হোক, আপনার কাছে বলছি আপনারা আর যাই করুন তাকে প্রাণে মারবেন না।

রাও ফরমান আলী সবুর সাহেবকে বললেন লোকমানকে আমি বাঁচাতে পারবো না। আমাকে এই অনুরোধ করবেন না। আপনি যদি ওর জন্য কিছু করতে চান, তাহলে ইন্টেলিজেন্সের মেজর জেনারেল আকবরের সাথে কথা বলুন।

সবুর সাহেব তখন আমার কথা জিজ্ঞাস করলেন। কেন বশীর তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন। ইব্রাহিম আমাদের লোক। রাও ফরমান আলী তখন বশীরকে টেলিফোনে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন আমাকে নাকি বশীর ডেকেছেন কিছু ইনফরমেশন নেওয়ার জন্য। সবুর সাহেবকে রাও ফরমান আলী আশ্বস্ত করে বললেন ভয়ের কোন কারণ নেই। পরে সবুর সাহেব আমাকে বললেন তুমি গিয়ে বশীরের সাথে দেখা কর। সাথে সাঈদুর রহমানকে নিয়ে যাও। কোন অসুবিধা হলে সাঈদুর রহমানকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিও। সাঈদুর রহমান রংপুর মুসলিম লীগের নেতা ছিলেন। তিনি তখন ঢাকায় অবসর জীবনযাপন করছিলেন। আমি তখনকার মত বাসায় চলে গেলাম। সবুর সাহেব লোকমানের জন্য জেনারেল আকবরের সাথেও দেখা করেছিলেন। আকবরকে বুঝিয়ে তাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিলেন। পরে লোকমানকে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশ হওয়ার পর যখন জেল উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় তখন অনেকের সাথে তিনিও বেরিয়ে আসেন। তখন জেলখানার সমস্ত বন্দীকে অরোরার নির্দেশে মুক্তি দেয়া হয়। ইন্ডিয়ান আর্মি ৩ মাস যাবত অরোরার নেতৃত্বে এ দেশ শাসন করেছিল। মুজিব ফিরে আসার পরও জেনারেল অরোরা ও মুজিবের যুক্ত নির্দেশে দেশ পরিচালিত হয়েছে। তবে বাংলাদেশের জনগণ অরোরাকে বাধ্য করেছে এদেশ ছেড়ে চলে যেতে।

আমি পরের দিন সাইদুর রহমানকে নিয়ে ব্রিগেডিয়ার বশীরের দফতরে দেখা করতে গেলাম। যাওয়ার আগে সুত্রাপুর থানা ওসিকে জানিয়ে গেলাম আমি বশীরের কাছে যাচ্ছি। তুমি এলে এস। বিগ্রেডিয়ার বশীর তখন বসতেন বর্তমান সংসদ ভবনের উত্তর দিকের একটা বিল্ডিং-এ। আমি যাওয়ার পর সেখানকার কর্তব্যরত মেজরের সাথে দেখা করে সব কথা বললাম। তিনি তখন আমাকে বশীরের ঘরে নিয়ে গেল। বশীরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সাথে সাথে তিনি প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলেন Where is your friend and Indian spy Mr. Ruhul Amin Nijami. আমার পিছনে সাঈদুর রহমানও ঢুকেছিলেন। তিনি তাঁকে বললেন, Go and seat outside. আমি বশীরের কান্ডকারখানায় থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম। তাঁকে বললাম নিযামী আমার বন্ধু ছিলেন। তিনি আমাদের সাথে পাকিস্তানে আন্দোলনে যথেষ্ট কাজ করেছিলেন। তারপর তিনি কি করেছেন আমি তেমন বলতে পারি না। বশীর রাগত কন্ঠে বললেন ওসব শুনতে চাই না। সে এখন কোথায় আছে? বললাম, তা কি করে বলব। বশীর বললেন তুমি জানো। আমাদের কাছে খবর আছে তুমি তাকে লুকিয়ে রেখেছ। তুমি তাকে বের করে আনো। বললাম, কেন আমাকে দোষারোপ করছেন। তিনি কিছুক্ষণ নীরব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন তুমি মিথ্যা বলছো, আমি জানি কিভাবে অবস্থার মোকাবেলা করতে হয়। I will kill that Indian agent. আমি বললাম মারতে চাইলে মারো। আমাকে এসব কথা বলে লাভ কি?
আর কথা না বাড়িয়ে বশীর আমাকে বিদায় করে দিলেন। এভাবে বন্ধুর জীবন বাঁচাবার জন্য মিথ্যা কথা বলে বাসায় ফিরে এলাম।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh