Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ১৯ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

দেশে যখন লুটপাটের মচ্ছব চলছিল তখন মুজিবের প্রত্যক্ষ নির্দেশে গেরিলারা শাহবাগে মুসলিম লীগ অফিস দখল করে। মুসলিম লীগ অফিসের প্রতি শেখ মুজিবের এক সহজাত ঘৃণা ছিল। নিজে তিনি প্রথম জীবনে মুসলিম লীগের আদর্শে কিছুদিন আস্থাবান থাকলেও পরবর্তীকালে তাঁর রাজনীতির মূল সুর আমূল পাল্টে যায়।  তাই ক্ষমতায় গিয়ে তিনি তাঁর প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এগিয়ে এলেন। মুসলিম লীগ অফিসের একটা ইতিহাস আছে। ষাটের দশকের প্রথম দিকে মুসলিম লীগ কর্মীদের পক্ষ থেকে একটা দাবী উঠল তাদের একটা নিজস্ব অফিস থাকা চাই। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর তখন মোনেম খান। তাঁরই প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে মুসলিম লীগ অফিস নির্মাণ শুরু হয়। এ সময় আইয়ুব খান ঢাকায় এলে মোনেম খান ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে মুসলিম লীগ কর্মীদের এক সভা আহ্বান করেন। এই সভায় তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অনেক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিকে দাওয়াত দিয়েছিলেন। আইউব খান তাঁর বক্তৃতায় সবাইকে মুসলিম লীগ অফিসের জন্য উদার হস্তে চাঁদা দেয়ার আহ্বান জানান। এতে ব্যাপক সাড়া পড়েছিল। মুসলিম লীগের কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁদের অফিস তৈরীর জন্য ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে চাঁদা দেয়ার ঘোষণা দিতে লাগলেন। আমার মনে আছে চাটগাঁর হাফিজ জুট মিল ও কটন মিলের মালিক হাফিজ সাহেবও এ সভায় এসেছিলেন। তাঁর আদি নিবাস ছিল বোম্বাই। তিনি ছিলেন অন্ধ। কিন্তু তাঁর অনুভূতি এতটাই প্রখর ছিল যে, তাঁর কারখানায় উৎপাদিত সুতায় হাত দিয়ে তিনি বলে দিতে পারতেন এটা কোন কাউন্টের সুতা। তুলায় হাত দিয়ে তিনি বলে দিতে পারতেন এ থেকে উৎপাদিত সুতার গুণাগুণ কেমন হবে।
তিনি প্রথমে ডায়াসের সামনে এসে একলাখ টাকা দেয়ার ঘোষণার পর আইয়ুব খানের সাথে হাত মেলান। হাত মেলানোর পরই কেবল তাঁকে জানানো হয় প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের হাতে তিনি হাত রেখেছেন। একথা শুনে তিনি এত উৎফুল্ল হন যে দ্বিতীয়বার তিনি মাইকের সামনে এসে এক লাখ টাকা বৃদ্ধি করে দু’লাখ টাকার কথা ঘোষণা দেন।

হাফিজ সাহেবের মত গেন্ডারিয়ার মুসলিম লীগ কর্মী হাবিব ফকির প্রথমে ৫০ হাজার টাকা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও আইয়ুব খানের সাথে হাত মেলানোর পর তিনি এক লাখ টাকা দেয়ার ঘোষণা দেন। পরবর্তীকালে আইয়ুব খান হাবিব ফকিরকে তমঘায়ে পাকিস্তান খেতাবে ভূষিত করেছিলেন। হাবিব ফকির নিজের এলাকায় পর্যাপ্ত সমাজ কল্যাণমূলক কাজ করেছিলেন। গেন্ডারিয়ার ফজলুল হক মহিলা কলেজটি তাঁরই জায়গায় তৈরী।

কার্জন হলের সভায় প্রাদেশিক মন্ত্রী নওয়াবজাদা হাসান আসকারী মুসলিম লীগ বিল্ডিং এর জন্য জমি দান করার ঘোষণা দেন। জায়গাটি ছিল আজকের পিজি হাসপাতালের এ ব্লক যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানে। পিজি হাসপাতালের বি ব্লক ছিল পাকিস্তান আমলের শাহবাগ হোটেল। শাহবাগ ও পরীবাগের পুরো এলাকাই ছিল একসময় ঢাকার নওয়াবদের। শাহবাগ হোটেলের এলাকা সরকার হোটেলের প্রয়োজনে রিকুইজিশন করে। হাসান আসকারী ছিলেন নওয়াব সলিমুল্লাহর পৌত্র এবং নওয়াব হাবিবুল্লাহর ছেলে। হাসান আসকারী তাঁর পৈত্রিক সম্পত্তি মুসলিম লীগের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছিলেন। কার্জন হলের সভায় তিনি বলেছিলেন, আমার দাদা মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাঁর নাতি হিসেবে মুসলিম লীগ অফিসের জন্য জমি দেওয়ার হক আমারই সবচেয়ে বেশী। প্রয়োজনে আমি মুসলিম লীগের জন্য আমার আরও সম্পত্তি দান করে দেব।
কার্জন হলের সভায় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রাপ্ত চাঁদার টাকায় মুসলিম লীগ বিল্ডিং তৈরীর দায়িত্ব দেয়া হয় মানিকগঞ্জ থেকে নির্বাচিত মুসলিম লীগের এম এন এ আব্দুর রউফকে। আব্দুর রউফ নামকরা ঠিকাদারও ছিলেন। তিনি নিজের তত্ত্বাবধানে মুসলিম লীগের দোতলা অফিসের নির্মাণ কাজ করিয়ে দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ হওয়ার পর মুজিব মুসলিম লীগ অফিস ও শাহবাগ হোটেলকে একত্র করে পিজি হাসপাতাল হিসেবে চালু করেন। শাহবাগ হোটেল কোন হাসপাতালের পরিকল্পনায় তৈরী হয়নি। মুসলিম লীগ অফিস তো নয়ই। শুধুমাত্র প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য মুজিব হাসপাতাল বানিয়ে মুসলিম লীগ অফিস দখলকে হালাল করেছিলেন।

এর মধ্যে কোন ক্রমেই জনস্বার্থের বিবেচনা মুজিবের ছিল না। স্নাতকোত্তর চিকিৎসার উন্নয়নেও মুজিবের কোন অবদান নেই। কারণ পিজি হাসপাতালের গোড়া পত্তন করেছিলেন মোনেম খান। এদেশে চিকিৎসা শিক্ষার উন্নতিতে মোনেম খানের অবদান অতুলনীয়।

আওয়ামী লীগ সরকারে এসে সমাজতন্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করেছিল। আমার কাছে বিষয়টি অদ্ভুত মনে হত। কেননা, আওয়ামী লীগ চিরকালই ছিল একটা বুর্জোয়া প্রভাবিত দল। মার্কসীয় সমাজতন্ত্র বলতে যা বুঝায় আওয়ামী লীগের কোন নেতা তা বুঝতেন কিনা তাতে রয়েছে আমার প্রবল সন্দেহ। মার্কসীয় রাজনীতিতে সমাজতন্ত্রের পথ ধরে যে শ্রেণীহীন সমাজের কথা বলা হয়েছে তা আওয়ামী রাজনীতির গুণগত চরিত্র দিয়ে কোন কালেই প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। তা সত্ত্বেও আওয়ামী সরকার সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার তর্জন-গর্জন করে যাচ্ছিল। সরকারের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে দেশের তাবৎ কারখানা জাতীয়করণ করে ফেলা হল। এ কর্মকান্ডের স্বপক্ষে বলা হতে লাগল এর মাধ্যমে জনগণ তার পূর্ব অধিকার ফিরে পাবে। আসলে জাতীয় করণ প্রক্রিয়া ছিল এক ধরনের আত্মীয়করণ। জাতীয়করণের মাধ্যমে এসব কলকারখানার প্রশাসন স¤পূর্ণ আওয়ামী লীগের লোকজনের হাতে চলে গেল। কলকারখানায় এতকাল যে শৃঙ্খলা ছিল তা পুরোপুরি ভেঙ্গে পড়ল। জাতীয়করণের তাৎক্ষণিক ফল হল দিনের পর দিন কল কারখানার শ্রমিক কর্মচারীরা স্বাধীনতার দোহাই দিয়ে কাজ না করে কারখানা বন্ধ রেখে বেতন তুলতে লাগল। এরকম অবস্থায় কোন শিল্প কারখানাই লাভের মুখ দেখতে পারে না। বাংলাদেশের জাতীয়করণকৃত শিল্প খাতের দিকে তাকালেই এ ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে। বাংলাদেশ হওয়ার ঊষালগ্নেই শিল্প কলকারখানাগুলোতে যে নৈরাজ্য ও লুটের রাজত্ব শুরু হয়েছিল তার ধকল এখনও কাটিয়ে ওঠা যায়নি।

দেশের সর্ববৃহৎ আদমজী জুট মিলের জি এম হিসেবে মুজিব নিয়োগ দিয়েছিলেন মুজাহারুল কুদ্দুসকে। তিনি ছিলেন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে মুজিবের ক্লাসমেট। মুজাহারুল কুদ্দুস চাকরী করতেন পূর্ব পাকিস্তান কটেজ ইন্ডাস্ট্রিতে। বাংলাদেশ হওয়ার পর পুরনো বন্ধুত্বের কারণে মুজিব যখন তাঁকে নতুন পদে নিয়োগ দান করেন তখন তিনি আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন তুমি আমাকে এখানে কেন দিচ্ছ? আমি জুটের এক্সপার্ট নই, পাট সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না। এতবড় একটা মিল কি আমি চালাতে পারব? মুজিব তখন হাসতে হাসতে তাঁর বন্ধুকে বলেছিলেন আমি যদি বাংলাদেশ চালাতে পারি তাহলে তুই একটা জুট মিল চালাতে পারবি না, এটা কি কখনও হয়। আসলে বাংলাদেশের তখন সার্বিক অবস্থাটাই ছিল এরকম। মুজিব পাকিস্তান আমলে বাঙ্গালীদের স্বার্থে কথা বলে বেড়াতেন। অথচ বাংলাদেশ হওয়ার পর তিনি যখন কলকারখানা দেদারসে জাতীয়করণ করতে শুরু করলেন তখন বাঙ্গালীদের শিল্প কারখানাও তিনি রেহাই দেননি। এই জাতীয়করণের প্রহসন কতদূর পৌঁছেছিল তার এক প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা আমাকে দিয়েছিলেন সৈয়দ মোহসীন আলী। আমি জেল থেকে বের হয়ে তাঁর কাছ থেকে এ কাহিনী শুনেছিলাম।

সৈয়দ মোহসীন আলী ছিলেন পাকিস্তান ফেডারেল চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি। পাকিস্তান আমলেই তিনি জুট মিল, কটন মিল ও কোল্ড স্টোরেজের মালিক হয়েছিলেন। তাঁর আদি নিবাস ছিল হুগলী। দেশবিভাগের পর তিনি প্রায় কপর্দকশূণ্য অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানে আসেন এবং নিজের বুদ্ধি ও বিবেচনার জোরে শিল্পপতিতে পরিণত হন। একসময় তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের কোষাধ্যক্ষও হয়েছিলেন। সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে যে সমস্ত বাঙ্গালী শিল্পপতি হিসেবে উঠে এসেছিলেন তার মধ্যে সৈয়দ মোহসীন আলীর স্থান ছিল বেশ উঁচুতে। তিনি ছিলেন আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ’৭০ সালে যখন দেশের মানুষ আওয়ামী লীগের মিথ্যাচারে বিভ্রান্তির ধুম্রজালে ঘুরপাক খাচ্ছে তখন দেখি মোহসীন আলীর আচরণেও কেমন যেন পরিবর্তন এসেছে। ’৭০ সালের নির্বাচনে কোতয়ালী-সূত্রাপুর এলাকা থেকে মুজিব নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের প্রার্থী ছিলেন খাজা খয়েরুদ্দীন। তিনি আমাকে একদিন ডেকে বললেন, ইব্রাহিম তোমার মোহসীন তো এখন মুজিবের পক্ষে কাজ করছেন।

আমি বললাম, খাজা সাহেব, আপনি এ কি বলছেন! তিনি আমাদের মুসলিম লীগের লোক। মুসলিম লীগের লোকেরাই তাঁকে শিল্পপতি বানিয়েছেন। পাকিস্তান এসেইতো তার ভাগ্য খুলে গেছে। তিনি এরকম কাজ করবেন, বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়।

আমি সময় মত একদিন মোহসীন আলীকে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি নাকি আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করছেন? পাকিস্তানের জন্য আপনি সবকিছু পেয়েছেন। এখন সেই পাকিস্তান বিরোধীদের সাথে আপনি হাত মিলিয়েছেন? আপনি কি আদমজী হতে চান? যা আপনি চাচ্ছেন তা আপনি হতে পারবেন না। আপনি পা দিয়েছেন ষড়যন্ত্রের এক ফাঁদে। পরে শুনেছিলাম নির্বাচনের আগে আগে মোহসীন আলীসহ অন্যান্য বাঙ্গালী শিল্পপতিরা মুজিবকে বস্তা ভর্তি টাকা দিয়ে এসেছিলেন।

বাংলাদেশ হওয়ার পর যখন শিল্প কারখানাগুলো জাতীয়করণ করা হল তখন এই মোহসীন আলীসহ অন্যান্য বাঙ্গালী শিল্পপতিরা মুজিবের সাথে পুনরায় দেখা করেন। তাঁরা মুজিবকে গিয়ে বললেন, আমাদের কি অপরাধ! আপনি আদমজী-বাওয়ানীদের খেদিয়েছেন ভাল কথা। তাঁদের শিল্প কারখানাগুলো জাতীয়করণ করেছেন তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন করেনি। কিন্তু আমরা বাঙ্গালীরা কি অন্যায় করেছি? নির্বাচনের আগে আপনাকে বস্তা ভর্তি টাকা দিয়ে এসেছিলাম কি আমাদের সর্বনাশের জন্য? বাংলাদেশ হয়েছে কি বাঙ্গালীদের ভাতে মারবার জন্য? আমরা ধার দেনা করে স্ত্রীর অলংকার বিক্রী করে মিল-কল-কারখানা গড়ে তুলেছি। আমাদের রক্ত আর ঘামে গড়া শিল্প-কারখানাগুলো এমনিভাবে আপনি জাতীয়করণ করে নিলেন?

মুজিব তখনকার মত তাঁদের বুঝানোর জন্য বলেছিলেন আমি বাঙ্গালীদের মিল-কারখানাগুলো ফেরত দেয়ার কথা বিশেষভাবে ভাবছি। তোমরা চিন্তা করো না। আমার প্লানিং কমিশনের মিটিং আছে। তোমরা এসো। আমি ঐদিন তোমাদের একটা ডিসিশন জানিয়ে দেব।

নির্ধারিত দিনে প্লানিং কমিশনের বৈঠক শুরু হওয়ার আগে মোহসীন আলীসহ অন্যান্য বাঙ্গালী শিল্পপতিরা একত্রিত হন। এর মধ্যে মুজিব আসলেন। হাতে পাইপ। ঘরে ঢুকেই মুজিব শিল্পপতিদের উদ্দেশ্যে হঠাৎ গর্জে উঠলেন, ‘আবার ষড়যন্ত্র। সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। কোন ষড়যন্ত্র সহ্য করা হবে না।’ মুজিবের এই আচরণ দেখে তো সবাই হতবাক। তিনি নিজে শিল্পপতিদের আসতে বলে এখন তিনিই উল্টো সুরে গান গাওয়া শুরু করেছেন। এ অবস্থা দেখে সবার পক্ষ থেকে সাত্তার জুট মিলের মালিক আব্দুস সাত্তার দাঁড়িয়ে গেলেন। তিনি মুজিবকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘ধমকাবেন না। আপনি নিজেইতো আমাদের আসতে বলেছেন। আপনিইতো সেদিন বললেন, বাঙ্গালীদের মিলগুলো আপনি ফেরত দিয়ে দেবেন। আপনাকে বঙ্গবন্ধু বানিয়েছিলামতো আমরাই। বাঙ্গালীদের সুবিধা হবে সেজন্যই আমরা আপনাকে নির্বাচনে জিতিয়েছিলাম। নির্বাচনের আগে তো আপনি সমাজতন্ত্রের কথা বলেননি। ভারতের সম্মান রক্ষার জন্য আপনি নির্বাচনে ভোট চেয়েছিলেন, একথা তো আপনি আমাদের সেদিন একটি বারও ইঙ্গিত দেননি।

উত্তেজিত শিল্পপতিদের শান্ত করার জন্য মুজিব তখন চায়ের আমন্ত্রণ জানান। শিল্পপতিরা সেদিন মুজিবের চায়ের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে চলে আসেন। আসার সময় মুজিবের মুখের উপর বলে আসেন আপনার চা আমরা খাব না। আপনি আমাদের পথে বসিয়েছেন, আল্লাহ এর বিচার করবেন।

নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাতে মনে হয়েছিল মুজিব ক্ষমতায় এলে তাড়াতাড়ি দেশের অবস্থা পাল্টে যাবে, বাংলাদেশ অল্প সময়ের মধ্যেই পৌঁছে যাবে উন্নতির চরম শিখরে।

আমরা জেলে বসে উন্নতি-অগ্রগতির কোন লক্ষণ বুঝতে পারতাম না। বুঝতে পারতাম না দেশের মানুষের উন্নতি হচ্ছে না অবনতি হচ্ছে। মাঝে মাঝে পত্রিকায় মওলানা ভাসানীর বক্তব্য ও বিবৃতি পড়তাম। মওলানা আওয়ামী লীগের লুটপাটের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন। মওলানা আর একটা কাজ করেছিলেন। পাক আর্মির ১২ হাজার কোটি টাকার সমরাস্ত্র ইন্ডিয়া লুট করে নিয়ে গিয়েছিল মওলানাই প্রথম এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেন। আওয়ামী লীগের ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে মওলানা কথা বলতেন। মওলানার একটি পত্রিকা ছিল ‘হক কথা’। এ পত্রিকাটি চালাতেন মওলানার এক সাগরেদ ইরফানুল বারী। যেহেতু হক কথা আওয়ামী লীগের লুটপাট ও নৈরাজ্যের ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরত তাই আওয়ামী লীগ প্রশাসন ইরফানুল বারীকে ধরে জেলে পাঠিয়ে দেয়। আমরা জেলের ভিতরে বারীকে পেয়ে খুশীই হয়েছিলাম।
এ সময় বিরোধী দল বলতে কিছুই ছিল না। মুজিব ইসলামপন্থী দলগুলো নিষিদ্ধ করেছিলেন। মুজিবের সৃষ্ট নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে এ সময় মওলানা ভাসানী ছাড়া আর এক ব্যক্তি বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। ইনি হলেন আবুল মনসুর আহমদ। এ সময় তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা না থাকলেও তাঁর কলমের জোর অক্ষুন্ন ছিল। তিনি আমাদের মত পাকিস্তানপন্থীদের যাঁদের কোন যুক্তিগ্রাহ্য কারণ ছাড়া শুধুমাত্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আটক করে রাখা হয়েছিল, তাঁদের পক্ষেও অনেক লেখালেখি করেছিলেন।

একদিন জেলে একটা খবর ছড়িয়ে পড়ল। জেলের সবার মুখে মুখে খবরটা ভেসে বেড়াতে লাগল। খবরটা ছিল মুজিবের মন্ত্রী তাজুদ্দীনের নিকট ইন্ডিয়ার কাছ থেকে কারাবন্দীদের একটি লিস্ট এসেছে। ইন্ডিয়া তাজুদ্দীনকে বলেছিল যে উদ্দেশ্যে আমরা তোমাদের বাংলাদেশ স্বাধীন করে দিয়েছি তা যদি কার্যক্ষম রাখতে চাও তাহলে লিষ্টে উল্লেখিত কারাবন্দীদের চিরদিনের মত সরিয়ে দাও। লিষ্টে ১৭৮ জনের নাম ছিল। এর মধ্যে ইসলামপন্থী রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সিভিল সার্জেন্ট ও পুলিশ অফিসার অন্তর্ভূক্ত ছিলেন।

এ খবর গুজব ছিল কিনা বলতে পারব না। তবে তখনকার পরিস্থিতিতে এরকম ঘটনা অস্বাভাবিক ছিল না। কেননা, জেল থেকে ধরে নিয়ে পাকিস্তানপন্থীদের গুলি করে মেরে ফেলার উদাহরণ ইতোমধ্যে গেরিলারা সৃষ্টি করেছিল।

এর মধ্যে একদিন জেলে কিছু নতুন মুখ দেখা গেল। ফজলুল কাদের চৌধুরী আমাকে ডেকে বললেন, ইব্রাহিম তুমি ভাল করে খোঁজ খবর নাও। দুটি অপরিচিত যুবক দু’বার আমার ঘরে উঁকি মেরে গেল। পাশের ঘরগুলোতেও যুবকরা উঁকি মারল। ব্যাপারটা কি! আমি আমার সেল থেকে বের হয়ে এদিক-ওদিক তাকালাম, দেখি কয়েকজন যুবক সেলগুলো ঘুরে ঘুরে দেখছে। এদের দু’একজনের মুখ আমার চেনা চেনা লাগল। আমার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মালো এরা গেরিলা বাহিনীর সদস্য না হয়ে পারে না।

ফজলুল কাদের চৌধুরীকে সব খুলে বললাম। তিনি আমাকে বললেন নির্মল বাবুকে একটু ডেকে আনো। আমি নির্মল বাবুকে গিয়ে বললাম, চৌধুরী সাহেব জরুরীভাবে আপনাকে ডেকেছেন। একটু আসেন। নির্মল বাবু তৎক্ষণাৎ তার ফোর্সসহ ফজলুল কাদের চৌধুরীর সেলের সামনে আসেন। চৌধুরী সাহেব তখন তাঁকে বললেন, দেখুন মি. রায়, আপনি তো সব সময় আমাকে জেলকোড শেখান। জেলকোডের কোথায় আছে বাইরের অপরিচিত লোকজন এসে সেলের ভিতর উঁকি দিয়ে যাবে? এদের উদ্দেশ্য কি? কি মোটিভ নিয়ে এরা জেলের ভিতর ঢুকেছে?
চৌধুরী সাহেবের হাকডাকে নির্মল বাবু থতমত খেয়ে গেলেন। তিনি বললেন, স্যার, আমি সব কিছু দেখছি। শুনেছিলাম নতুন চেহারার লোকেরা হোমস থেকে অনুমতি নিয়ে ঢুকেছিল। কিভাবে ঢুকেছিল আমি আজও বুঝতে পারিনা।

নির্মল বাবু চলে যাবার পর চৌধুরী সাহেব আমাকে বললেন দেখলেন ইব্রাহিম জেলার জানেন না অথচ বাইরে থেকে জেলের ভিতর লোক ঢুকে পড়েছে। ষড়যন্ত্র চলছে। এ ঘটনার পর আমাদের জেলের ভিতর বেশ কয়েকদিন আতঙ্কের মধ্যে কাটে। কখন কি হয়! শাহ আজিজ তো বেশ ভেঙ্গে পড়েছিলেন।

পাবনার আব্দুল মতিন আমাদের সাহস যোগাতেন। তিনি হঠাৎ করে একদিন আমাদের বললেন চিন্তার কোন কারণ নেই, পাকিস্তান থেকে ত্রিদিব রায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চলে এসেছেন। অস্ত্র-শস্ত্রও এনেছেন। এবার লোকজন নিয়ে আমাদের জেলের দেয়াল ভেঙ্গে উদ্ধার করবেন।

বন্দী জীবনের এত কষ্টের মধ্যেও মতিনের এই সাহস দেবার কৌশল আমাদের মন স্পর্শ করত। একদিন সকালে শুনি মুজিব আমাদের দেখতে আসবেন। মুজিব আসবেন তাই সকালে নাস্তা দেবার পরপরই আমাদের সেলের ভিতর ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দেয়া হল। যেন আমরা চিড়িয়াখানার জন্তু-জানোয়ার।

আমরা সেলের মধ্যে বসে মুজিবের আগমন প্রতীক্ষা করতে লাগলাম। কি কারণে মুজিব সেদিন আসেননি, এলেন তাজুদ্দীন।
জেলের আর কোথায় গিয়েছিলেন সে বলতে পারব না। তবে একবার তিনি বিশ সেলের সামনে এলেন। গরাদের আড়ালে দাঁড়ানো আমাকে দেখেই তাজুদ্দীন দাঁড়িয়ে পড়লেন। তিনি আমাকে বললেন কি খবর ইব্রাহিম ভাই, কেমন আছেন?
আমি তাঁকে বললাম, তোমরা যেমন রেখেছো। তোমরাই তো এখন দেশের দন্ডমুন্ডের হর্তাকর্তা। এভাবে আর তোমরা আমাদের কতকাল কষ্ট দেবে? তাজুদ্দীন বললেন, বাইরের অবস্থা খুব খারাপ ইব্রাহিম ভাই। সময় হলে আমরা আপনাদের ছেড়ে দেব। একথা বলে তিনি যখন চলে যাওয়ার উপক্রম করছেন অমনি পাশের সেল থেকে ফজলুল কাদের চৌধুরীর কণ্ঠ শুনতে পেলাম। তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, তাজুদ্দীন, এদিকে শোন।

স্যার আমি আসছি বলে তাজুদ্দীন তাড়াতাড়ি চৌধুরী সাহেবের সেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। চৌধুরী সাহেব তাজুদ্দীনকে বললেন মুজিবের না আসার কথা ছিল? এ আমাদের কোথায় রেখেছ? দেখছ কি অবস্থা আমাদের। ২৬ সেলে আমাদের রাখা যেত না? তোমরাওতো এই এই জেলেই ছিলে। আমরা কি তোমাদের এই কষ্ট দিয়েছি?

তাজুদ্দীনের বললেন স্যার ২৬ সেলে নিয়াজীকে আনা হবে। ওখানেই ওর বিচার হবে। তাজুদ্দীনের কথা শেষ না হতেই চৌধুরী সাহেব বললেন, কি বাজে কথা বলতে শুরু করেছ। নিয়াজীকে ইন্ডিয়া নিয়ে গেছে। সেখান থেকে তিনি পাকিস্তান চলে যাবেন। তোমরা তাদের বিচার করতে পারবে না। পাক আর্মির ফেলে যাওয়া অস্ত্র-শস্ত্র ইন্ডিয়া লুট করেছে। তোমরা ঠেকাতে পারনি। তোমাদের সে সুযোগ হয়নি। তাজুদ্দীন, বিশৃঙ্খলার ভিতর যাদের জন্ম তারা কখনই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পারে না। বিশৃঙ্খলার ভিতর দিয়েই তারা শেষ হয়ে যায়। ইন্ডিয়া এ বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে তোমাদের ক্ষমতায় বসিয়েছে। তাজুদ্দীন শুনে রাখ, আল্লাহ সবকিছু স্থির করেন। দেশের মানুষের আমি কোন ক্ষতি করিনি। আমরা দেশটা গড়তে চেয়েছিলাম। তোমরা ইন্ডিয়ার সাথে চক্রান্ত করে আমাদের কয়েক যুগ পিছিয়ে দিলে। আমি বলছি একদিন এই জেলখানার ভিতর তোমাদেরও বিচার হবে।

তাজুদ্দীনের পিছনে সেক্রেটারী আইজি প্রিজনসহ জেলের সব উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁরা চৌধুরী সাহেবের কথায় নীরব হয়ে যান। আমি আজ এতদিন পর যখন ভাবি তখন মনে হয় চৌধুরী সাহেবের কথা। ইতিহাসের অমোঘ রায় এড়িয়ে কেউ পালিয়ে বাঁচতে পারে না। যে তাজুদ্দীন আমাদের করুণা করতে এসেছিলেন পরবর্তীকালে এই জেলেই তাঁকে অধিকতর খারাপ পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল।

জেলখানা এতদিন ছিল মূলত দাগী আসামীদের থাকার জায়গা। পাকিস্তান আমলে জেলখানায় রাজনৈতিক বন্দীরাও থাকতেন। কিন্তু তাঁদের সংখ্যা ছিল অল্প। ঢাকা জেলের ইতিহাসে মনে হয় এই প্রথম এত বেশী শিক্ষিত কয়েদী, রাজনৈতিক নেতা, সরকারী কর্মচারী, ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ডাক্তার ও ইসলামী চিন্তাবিদ কারারুদ্ধ হন।

জেলের কর্মচারীরাও জানতেন সামাজিকভাবে এঁদের অবস্থান তাঁদের চেয়ে অনেক উপরে। বাংলাদেশ হওয়ার পর প্রথম প্রথম যখন দেশের মানুষ এক ধরনের হুজুগে মেতে ছিল তখন জেলের কর্মচারীরা এসব জানা সত্ত্বেও আমাদের মত বন্দীদের উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখতেন। কিন্তু নতুন সরকার যখন তাদের প্রতিশ্রুতি মত চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছিল, দু’আনা চাল, তিন আনা ঘি দেয়ার মত লোভনীয় প্রতিশ্রুতি যখন ধুলায় গড়াগড়ি দিতে শুরু করল তখন জেলের পুলিশ ও ওয়ার্ডারদের মনোভাব আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠল। তখন দেশের আম জনতার মত এঁদেরকেও দেখলাম আওয়ামী লীগের উপর থেকে তাঁদের বিশ্বাস হারাতে শুরু করেছে।

একদিন তো এক মিয়া সাহেব ফজলুল কাদের চৌধুরীর কাছে এসে বলেই ফেলল স্যার আপনাদের কথা না শুনে যে কি ভুল করেছি। শেখ মুজিব আমাদের দাগা দিয়েছেন। বাজারে এখন আকাল। জিনিসপত্রের দাম যেভাবে হু হু করে বাড়ছে তাতে স্যার দুর্ভিক্ষ লেগে যাবে। চৌধুরী সাহেব তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বললেন, হ্যা, তোমরা পুলিশের লোকজনই তো বেশী করে লাফিয়েছিলে। এখন স্বাধীনতাকে তরকারি বানিয়ে খাও। আমি চৌধুরী সাহেবের পাশেই ছিলাম। তিনি আমাকে বললেন দেখেছ ইব্রাহিম অবস্থাটা। বাঙ্গালীদের মত দুর্বল বিশ্বাসের লোক আর কোথাও পাবে না। স্বাধীনতার জন্য এরাই একদিন সবচেয়ে বেশী লাফালাফি করেছিল এখন আবার উল্টো জারি গাওয়া শুরু করেছে।

জেলে আসার মাস তিনেক পর আমার দাঁতে খুব ব্যথা শুরু হল। আমার ডানদিকের মাড়ির একটা দাঁত আগে থেকেই একটু একটু নড়ত। ভীষণ ব্যথায় ছটফট করতাম। এসময় জেলে অনেকেরই দাঁতে ব্যথা শুরু হয়েছিল। জেলের পরিবেশ হয়ত এর জন্য অনেকখানি দায়ী। দাঁতে ব্যথা উঠলে আমি গুল মাখতাম। তাতে ব্যথার একটু উপশম হত। সবুর সাহেবেরও তখন দাঁতে ব্যথা শুরু হয়েছিল। একদিন তো তিনি আমাকে ডেকে বললেন ইব্রাহিম দাঁতের ব্যথায় তো আমি কাতর হয়ে পড়েছি। কি করব বুঝতে পারছিনা। আমি বললাম, সবুর ভাই, আপনার ডাক্তার দেখানো উচিত। আর আমি ব্যথা উঠলে গুল মাখি। আপনি একটু মেখে দেখতে পারেন। গুল আমাকে কে এনে দেবে! আমি বললাম সবুর ভাই গুল আমি ম্যানেজ করে দেব। চিন্তা করবেন না। পরে আমি এক কৌটা গুল বাইরে থেকে এনে সবুর সাহেবকে দেই।

একদিন ব্যথা উঠলে সবুর সাহেব দাঁতের গোড়ায় সেই গুল নিয়ে মাখতে থাকেন। আর যায় কোথায়! তার তো গুল মাখার কখনও অভ্যাস ছিল না। সেই গুল মেখে তিনি হঠাৎ চোখ মুখ উল্টে মুর্ছা গেলেন। আমি তাড়াতাড়ি তার সেলে গিয়ে দেখি তিনি খাটের উপর চোখ উল্টে পড়ে আছেন। বড় বড় শ্বাস নিচ্ছেন।

মাথায় পানি দেওয়ার পর যখন তিনি একটু একটু করে চোখ খুললেন তখন প্রথমেই তাঁর মুখ দিয়ে বের হল ইব্রাহিম তুমি আমাকে এ কি দিলে! আমি তো ব্যথা কমানোর জন্য দিয়েছিলাম। হুঁ তুমি আমাকে জানে মারতে চেয়েছিলে। তোমার গুল তুমি নিয়ে যাও।
বলাবাহুল্য এরপর সবুর সাহেব আর কখনও গুল মাখেননি। জেল থেকে বের হওয়ার পর এ কাহিনী বললে তিনি হাসতেন।
একদিন দাঁতের ব্যথা সহ্য করতে না পেরে আমি জেল হাসপাতালে গেলাম। ডাক্তার সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বললেন আপনার দাঁত তো নড়ে গেছে, ফেলে দিতে হবে। এজন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে কাল আমরা সব ব্যবস্থা করে দেব। হঠাৎ ডাক্তার আমাকে বললেন ফজলুল কাদের চৌধুরী সাহেব তো হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। দোতালায় আছেন।

দাঁতের ব্যথায় এত অস্থির হয়ে পড়েছিলাম যে চৌধুরী সাহেব কখন হাসপাতালে এসেছেন বুঝতে পারিনি। দোতলায় যেয়ে দেখি তিনি বেডে শুয়ে আছেন। লক্ষ্য করলাম তাঁর মুখের বাম দিকে এক মস্ত বড় ফোঁড়া উঠেছে। তখন আবার ভীষণ গরম, ব্যথায় তিনি অস্থির হয়ে পড়েছেন। আমি বললাম কাদের ভাই আপনার ফোঁড়া উঠেছে তাতো আমাকে বলেননি। তিনি বললেন কেন, সেদিন বললাম না। সব ভুলে গেছ। তিনি আবার হাসতে হাসতে বললেন, বেঁচে যে আছি এইতো অনেক। মুজিব তো আমাদের খুব আরামে রেখেছে।

হঠাৎ আমার চোখে পড়ল চৌধুরী সাহেবের কাছেই একটা বেডে পূর্বদেশ পত্রিকার সম্পাদক নোয়াখালীর মাহবুবুল হক শোয়া। আমি একটু অবাক হয়ে তাঁর কাছাকাছি গিয়ে বললাম, মাহবুব ভাই আপনি জেলে এসেছেন কবে? আপনি কি অন্যায় করেছেন? আমি আবার হাসতে হাসতে বললাম, এ্যাসেম্বলির মেম্বার আর স্পীকার এভাবে যুগলবন্দি হলেন কখন? চৌধুরী সাহেব যখন পাকিস্তান ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলির স্পীকার মাহবুব তখন বিরোধী দলের এমএনএ। মাহবুব মূলত ছিলেন রেলওয়ে শ্রমিকদের নেতা।

মাহবুব আমাকে বললেন সব ষড়যন্ত্র। শেখ মনি আমাকে জেলে ঢুকিয়েছে। দেখছো আমার শরীরে পানি এসেছে! আমার অবস্থা খুব খারাপ। আমার বাইরে চিকিৎসা দরকার। ডাক্তাররা লিখেছেন অথচ হোমস পারমিশন দিচ্ছে না। শেখ মনিই এসব করাচ্ছে। আমাকে তারা জেলের ভিতরে তিলে তিলে মারতে চায়।

আমি বললাম মাহবুব ভাই এ্যাসেম্বলিতে বিরোধী দলে থাকার সময় আপনি তো বাঙ্গালীদের অধিকার নিয়ে বহু কথাবার্তা বলেছেন। নানা রকম তথ্য পরিসংখ্যান দিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আপনি বাঙ্গালীদের অধীকার নিয়ে এ্যাসেম্বলির ফ্লোরে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন। সেগুলো আমরা পত্রিকায় দেখেছি। আপনি বাঙ্গালীদের জন্য যে রকম কথা বলেছেন এ্যাসেম্বলিতে আওয়ামী লীগ মেম্বাররাও তো সেরকম করে কখনও বলেননি। আমরা জেলে এসেছি কারণ রাজনীতিতে আমরা মুজিবের আদর্শের প্রতিপক্ষ। কিন্তু আপনি কেন জেলে এলেন?

চৌধুরী আমার কথা শুনে হাসতে হাসতে বললেন মাহবুব তো আমাদের বহু গাল দিয়েছে। একবার আমি এ্যাসেম্বলিতে ওকে ছয় ঘন্টার উপর সময় দিয়েছিলাম গালাগালি করার জন্য। কিন্তু লাভ কি হল? আমাদের সাথেই তো ওকে এখন জেলের ভাত খেতে হচ্ছে। মাহবুব তখন বেডে শুয়েই চৌধুরী সাহেবকে বললেন কাদের ভাই আমি বাঙ্গালীদের অধিকারের কথা বলেছি ঠিকই কিন্তু কখনও মুজিবের অপশাসন চাইনি।
আসবার সময় বললাম, মাহবুব ভাই, আপনার জন্য খাবার পাঠিয়ে দেব। কোন চিন্তা করবেন না। মাহবুব তখনও ডিভিশন পাননি।
আমি পরে শুনেছিলাম মাহবুব তাঁর পত্রিকায় মুজিবের অপশাসনের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়েই শেখ মনির রোষানলে পড়েন।

পরের দিন জেলের নিয়ম অনুযায়ী আমাকে সিপাই পরিবৃত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দন্ত বিভাগে নিয়ে যাওয়া হল। আমার আগে সিপাই পিছনে সিপাই, দেখে তো চারদিকে লোকজন জমে গেল। তারা ভেবেছিল কোন কেউ-কেটা বোধ হয় এসেছেন। কিন্তু তাদের ধারণা কিছুক্ষণের মধ্যেই শরতের মেঘের মত অপসৃত হল। তারা বুঝল আমি একজন ‘দালাল’। লোকজনের মধ্যে তখনও কম বেশী আওয়ামী লীগের হুজুগ চলছিল। ডাক্তার যখন আমাকে চেয়ারে বসিয়ে দাঁত তোলার প্রক্রিয়া শুরু করলেন তখন তারা কয়েকজন জোরে চিৎকার করতে লাগল, দে শালা দালালকে শেষ করে দে!

ডাক্তারও জানিনা আওয়ামী লীগ মনোভাবাপন্ন ছিলেন কি না! দাঁত তোলার সময় আমি যথেষ্ট ব্যথা পেয়েছিলাম। ডাক্তার আমাকে দাঁত তোলার আগেই দাঁতের গোড়ায় চেতনানাশক ওষুধ দিয়েছিলেন বললেন, কিন্তু কতদূর সত্য ছিল তাঁর কথা বলতে পারব না। আমি ব্যথায় মুখ চেপে ধরে চিৎকার করে উঠেছিলাম। আমার আর্ত চিৎকার এত ভয়ঙ্কর ছিল যে আমাকে প্রহরারত এক সিপাই সেই চিৎকার শুনে তার বন্দুকসহ মুর্ছা যায়। লোকজন তখন বলাবলি করতে শুরু করে দালালের চিৎকার শুনেই যদি পুলিশ অজ্ঞান হয়ে যায় তবে তাড়া করলে এদের কি অবস্থা হবে?
ডাক্তার আসার সময় কিছু ঔষুধপত্র দিয়ে দিয়েছিলেন। জেলে ফিরে এসেও ব্যথাটা আমার কয়েকদিন ছিল। কিন্তু নিজেদের তকদিরের কথা ভাবলে জেলে বসে এসব ব্যথার কথা অবশ্য মনে থাকত না।

জেলে বসে ফজলুল কাদের চৌধুরী যেমন সবকিছুরই প্রতিবাদ করতেন, সবুর সাহেবকে তেমন ভূমিকায় দেখা যেত না। অধিকাংশ ব্যাপারে তিনি নীরবই থাকতেন। সেলের ভিতর দেখলাম তিনি তাঁর আত্মচরিত বসে বসে লিখছেন। কি করে যেন পরে তাঁর আত্মচরিতের পান্ডুলিপিটা হারিয়ে যায়। আমার বিশ্বাস এটা প্রকাশিত হলে জাতির অনেক উপকার হত। জেলে বসেই সবুর সাহেব তার বিশাল সম্পত্তির একটা ট্রাস্ট তৈরী করে উইল করে দিয়েছিলেন। তাঁর বিশাল সম্পত্তি জাতির কল্যাণে ব্যবহৃত হওয়ার কথা উইলে লেখা হয়েছিল।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে ফজলুল কাদের চৌধুরীর মতই সবুর সাহেবের একটা বিরাট ভূমিকা ছিল। জাতীয় পরিষদে তিনি সরকারী দলের নেতা ছিলেন। এই বিরাট দায়িত্ব থেকে তিনি বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে বিরাট অবদান রেখেছিলেন। ফজলুল কাদের চৌধুরী যেমন চট্টগ্রাম শহরকে গড়েছিলেন তেমনি সবুর সাহেব খুলনা শহরকে নিজ হাতে সাজিয়েছিলেন। খুলনাকে শিল্প শহর হিসেবে গড়ে তোলার পিছনে তাঁর অবদান সমধিক। খুলনার নিউজপ্রিন্ট ফ্যাক্টরী, কেবল ফ্যাক্টরী, কয়েকটি জুট মিল, কটন মিল, নিউ মার্কেট, চালনা বন্দর, রেডিও সেন্টার তাঁরই উদ্যোগে গড়ে ওঠে।

সবুর সাহেব আজীবন নিঃসন্তান ছিলেন। বোধ হয় সে কারণে নিঃসঙ্গতা কাটাতে তিনি তাঁর বাড়ীতে নানা রকম জন্তু-জানোয়ার পুষতেন। হয়ত এটা তাঁর এক ধরনের সখও ছিল। তিনি যখন জাতীয় পরিষদের নেতা তখন তাঁর পিন্ডির বাসায় গিয়ে দেখি বাসাতো নয় যেন পুরোদস্তুর এক চিড়িয়াখানা। তাঁর এ চিড়িয়াখানায় বিদেশী কুকুর, বানর, হরিণ, শিম্পাঞ্জি এমনকি সুন্দরবনের হিংস্র বাঘও ছিল। চীন থেকে তিনি বিরল প্রজাতির টিয়া সংগ্রহ করেছিলেন। আর ছিল কাকাতুয়া। বাঘ কখনও পোষ মানে না শুনেছি। কিন্তু সবুর সাহেব যখন বাঘটার কাছে যেতেন তখন সে মাথা নীচু করে থাকত। বাঘের খাঁচায় খাবার-দাবার সবুর সাহেবই দিতেন। এ এক অবিশ্বাস্য ব্যাপার।

শিম্পাঞ্জিগুলো সবুর সাহেবের এত অনুগত ছিল যে তারা লাইটার দিয়ে তাঁর সিগারেট ধরিয়ে দিত। তাঁর এ্যাসট্রে এগিয়ে আনত। প্রয়োজনে তাঁর গা চুলকিয়ে দিত। শিম্পাঞ্জিগুলোকে সবুর সাহেবও খুব যত্নে করতেন। আঙুর, আপেল, আনার এনে তিনি এদের নিজ হাতে খাওয়াতেন। এ দেখে আমাদের হেকিম ইরতেজাউর রহমান বলতেন সবুর ভাই আপনি আপনার শিম্পাঞ্জিগুলোকে বিদায় করে দিয়ে আমাকে খাঁচায় রেখে দিন। শিম্পাঞ্জিগুলোকে যা খাওয়ান তার কিছু অংশ আমাকে দিলেই হবে। আমি আপনার সব কাজ করে দেব। হেকিম সাহেবের কথা আমরা বেশ উপভোগ করতাম। মন্ত্রীত্ব থেকে চলে আসার পর সবুর সাহেব পিন্ডি থেকে শিম্পাঞ্জিগুলোকে তাঁর ঢাকার বাসায় নিয়ে এসেছিলেন।

৭১-এর ২৫শে মার্চের একদিন আগে দেশের অবস্থার কথা ভেবে সবুর সাহেব শিম্পাঞ্জিগুলোকে ঢাকা চিড়িয়াখানায় দিয়ে আসেন। আমিও তাঁর সাথে গিয়েছিলাম। মানুষের সাথে অবোধ প্রাণীগুলোর কি যে এক মমত্বের বন্ধন প্রতিষ্ঠিত হতে পারে তা না দেখলে কখনও বিশ্বাস করতাম না। বিদায় নেবার সময় শিম্পাঞ্জিগুলো সবুর সাহেবের গলা ধরে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। তারা তো সবুর সাহেবকে ছাড়বেই না। সবুর সাহেব অনেক আপেল, আঙুর সাথে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারা ওসব কিছু স্পর্শও করল না। সবুর সাহেব যখন চলে আসতে থাকেন তখন তারা একদৃষ্টে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিল।

সেলের মধ্যে একদিন বসে আছি, এক ফালতু এসে আমাকে খবর দিল, সবুর সাহেব কাঁদছেন। আমি তাড়াতাড়ি করে তাঁর সেলে গিয়ে দেখি ফালতু যা বলেছে তা ঠিক।

আমি বললাম সবুর ভাই আপনি কাঁদছেন কেন? আপনাকে তো আমি কখনও কাঁদতে দেখিনি। তিনি বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন ইব্রাহিম তুমি তো জানো শিম্পাঞ্জি দুটোকে আমি চিড়িয়াখানায় রেখে এসেছিলাম। খবর পেয়েছি চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ ঠিকমত খেতে না দিয়ে আমার শিম্পাঞ্জি দুটোকে মেরে ফেলেছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে তার ডায়েরীতে রাখা শিম্পাঞ্জি দুটোর ছবিও আমাকে দেখালেন। আমিও এই নিঃসন্তান বৃদ্ধ রাজনীতিবিদকে কি সান্ত্বনা দেব তখনকার মতো তাঁর কন ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর সবুর সাহেব আমাকে দুঃখ করে বললেন ইব্রাহিম অবোধ পশুগুলোরও কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। আদর পেলে তারাও প্রতিদান দিতে চায়। কিন্তু মানুষের কি তা আছে? এই যে দেখ আমার বাসা থেকে আত্মীয়-স্বজন চাকর-বাকর আমার খাবার নিয়ে মাঝে মাঝে আসে। ওদের সাথে আমার কুকুর দুটোও আসে। জেল গেটে আমার শরীর ঘেঁষে দাঁড়ায়, লেজ নাড়ে, জিহ্বা বের করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। কিন্তু দেখ আমার পিন্ডির বাসায় বিরোধী দলের বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কোন্ সদস্য সন্ধ্যার পর আসেনি? আমার বাসায় খায়নি? মশিউর রহমান, মিজানুর রহমান চৌধুরী এঁরাতো আমার বাসায় পড়েই থাকতেন। আমার কুকুর দুটো দেখতে আসে, এঁরা আসে না।

পার্টিশনের আগে আমি যখন সোহরাওয়ার্দী গ্রুপে ছিলাম তখন মুজিব কত এসেছেন। আমার কাছ থেকে কতভাবে যে টাকা আদায় করেছেন, তা ইয়ত্তা আছে! এসব মানুষ পশুরও অধম।

সবুর সাহেবের পাশের সেলেই থাকতেন খাজা খয়েরুদ্দীন। খাজা সাহেব ছিলেন ঢাকার নওয়াব পরিবারের সদস্য। তাঁর আচার-ব্যবহার সৌজন্যবোধ ছিল দেখবার মত। ব্যবহারের মধ্যে যে মানুষের অনেকখানি পরিচয় দীপ্ত হয়ে ওঠে খাজা খয়েরুদ্দীনের সাথে আলাপ করলে তা পরিষ্কার হয়ে উঠত।

নওয়াব পরিবারের সদস্যভুক্ত হয়েও তিনি জনতার কাতারে নেমে এসেছিলেন। মানুষকে তিনি দ্রুত আপন করে নিতে পারতেন। যে কেউ দু'দন্ড তাঁর সাথে কথা বললে তাঁর গুণমুগ্ধ হয়ে যেতেন। খাজা সাহেবের একটাই অসুবিধা ছিল তিনি ভাল করে বাংলা বলতে পারতেন না। সেকালের শরীফ পরিবারগুলোতে উর্দুর ছিল ব্যাপক প্রভাব। তবু এই ভাঙ্গা বাংলা নিয়েই নিজের চরিত্র মাধুর্যের জন্য ঢাকাবাসীর কাছে তিনি জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তিনি আইয়ুবের কনভেনশন মুসলিম লীগে যোগ না দিয়ে যোগ দিয়েছিলেন নাজিমুদ্দীন সাহেবের সরকার বিরোধী কাউন্সিল মুসলিম লীগে। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায়ই তিনি ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান হন।

জেলে আসার পর একবার তিনি আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের উত্তরে বলেছিলেন, মুসলিম লীগ আমার পূর্ব পুরুষেরাই প্রতিষ্ঠা করেছেন। মুসলিম লীগ আমার আদর্শ। ১৯৭১ সালে আমি আমার আদর্শ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছি। তাতে আমার কোন অপরাধ হয়েছে বলে আমি মনে করি না।

শাহ আজিজুর রহমান থাকতেন নিউ আট সেলে। তাঁর সেলের মধ্যে একদিন গিয়ে দেখি সেলের দেয়াল জুড়ে কয়লা দিয়ে কোরান শরীফের আয়াত লিখে তিনি ভরে রেখেছেন।

শাহ সাহেব জেলের মধ্যে আমাকে প্রায়ই বলতেন, আমি ছিলাম পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগের বিরোধী দলীয় উপনেতা। আজ সেই আওয়ামী লীগই আমাকে জেলে ঢুকিয়েছে। দেখো তকদির আর কাকে বলে!

শাহ সাহেবের জীবন ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ। জীবনে তিনি দল পাল্টিয়েছেন বহুবার। প্রথম জীবনে পাকিস্তান আন্দোলনের তিনি ছিলেন শীর্ষ ছাত্র নেতা। শাহ আজিজ অনেক পরে যোগ দেন আওয়ামী লীগে। কিছুদিন তিনি সোহরাওয়ার্দীর সাথে পিডিএম-এর হয়ে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে কাজ করেন। আওয়ামী লীগের সাথে যখন মুজিবের মনোমালিন্য হয় তখন শাহ আজিজ সোহরাওয়ার্দীর ডান হাত হিসেবে কাজ করেন। কিছুদিন তিনি আতাউর রহমান খানের সাথে জাতীয় লীগও করেছেন। জেল থেকে বের হওয়ার পর নিছক ক্ষমতার জন্য মুসলিম লীগকে ভেঙ্গে জিয়াউর রহমানের সাথে যোগ দেন ও প্রধানমন্ত্রী হন।

জেলের মধ্যে মোনেম খানের ছেলের কথা না লিখলে এ কাহিনী অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এদের বয়স ছিল খুব কম। দুজনই কলেজে পড়ত। একজনের নাম ছিল খালেকুজ্জামান খান, অপরজনের সাইফুজ্জামান খান। এরা থাকত পুরানো ৮ সেলে, বিশ সেলের উল্টো দিকে। মাঝে মাঝে ছেলে দুটো খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিত। অত্যন্ত অন্যায়ভাবে তাদেরকে যে জেলে ঢুকানো হয়েছিল বোধ হয় এভাবেই অনশন করে তারা তার প্রতিবাদ জানাত। তাদের এ বিরতি দিয়ে দিয়ে অনশনের কারণে জেল কর্তৃপক্ষ অস্থির হয়ে উঠেছিল। জেলারসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা গলদঘর্ম হয়ে তাদের অনশন ভাঙ্গানোর চেষ্টা করতেন। তখন ছেলে দুটো চিৎকার করে তাঁদেরকে বলত, টিপু সুলতান দেশপ্রেমিক ছিলেন তাই ইংরেজরা তাদের এদেশীয় দালালদের সহযোগিতায় তাঁকে হত্যা করে। তাঁর ছেলে মঈনউদ্দীনকে কলকাতায় এনে আলীপুর জেলে বন্দী করে রাখে। আরও বলত, আমার আব্বা এদেশের উন্নতির জন্য কি না করেছেন? যে দিকে তাকান তাঁর উন্নতির ছোঁয়া চোখে পড়বেই। দেশকে ভালবেসেছিলেন বলেই ভারতীয় দালালরা তাঁকে হত্যা করেছে। আর আপনারা আমাদের বন্দী করে রেখেছেন। আমাদের কিসের অপরাধ? আমরা কি অন্যায় করেছি? আমার আব্বা দেশ প্রেমিক ছিলেন এটাই কি আমাদের অপরাধ?

ছেলে দুটোর কথা ভেবে খুব খারাপ লাগত। বিশেষ করে তাদের বয়সের কথা ভেবে। খালেকুজ্জামান পরবর্তীকালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য হয়েছিল।

রাজনীতিবিদদের মধ্যে আমাদের সাথে ছিলেন এমন আরও কয়েকজনের কথা মনে পড়ছে। ঢাকার ফয়েজ বক্স, সিলেটের সিরাজউদ্দীন, এএনএম ইউসুফ, জি এ খান, নাজিরউদ্দীন চৌধুরী, মোমেনশাহীর এম এ হান্নান, কুষ্টিয়ার এডভোকেট সাদ আহমদ, আফিলউদ্দিন, ফরিদপুরের এডভোকেট বাকাউল, কুমিল্লার এডভোকেট শফিকুর রহমান, রাজশাহীর আয়েন উদ্দিন, বরিশালের মওলানা নুরুজ্জামান, বাগেরহাটের এডভোকেট ফজলুর রহমান এঁদের মধ্যে অন্যতম। তাছাড়া মালেক মন্ত্রীসভার সব সদস্যও এসময়ে আমাদের সাথে জেলে ছিলেন।

৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সদস্য এমএন জামানও ছিলেন আমাদের সাথে। জামান আওয়ামী লীগ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে জেলে ঢুকানো হয়েছিল। কারণ তিনি মুজিবের পাকিস্তান বিরোধী ষড়যন্ত্র পছন্দ করেননি এবং অসংখ্য বক্তৃতা-বিবৃতি দিয়ে তিনি একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষ নিয়েছিলেন।

সাংবাদিকদের মধ্যে দৈনিক সংগ্রামের সম্পাদক আখতার ফারুকের কথা মনে পড়ছে। খুলনার ডিসি রশীদুল হাসান সিএস পিও ছিলেন আমাদের সাথে। তাঁর অপরাধ ছিল খুলনায় যখন ইন্ডিয়ান আর্মি দেদার লুটতরাজ করছিল তখন মেজর জলিলের সাথে তিনিও এর প্রতিবাদ করেছিলেন। গেরিলারা ডিসি সাহেবের এই দুঃসাহসের সমুচিত জবাব দেয়ার জন্য তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। মেরে ফেলাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল। ডিসি দেখতে খুব সুদর্শন ছিলেন। তাঁর সুন্দর চেহারা দেখেই হোক আর অন্য কোন কারণেই হোক গেরিলারা তাঁর প্রতি দয়া পরবশ হয়ে তাঁকে না মেরে জেলে ঢুকিয়ে দেয়। জেলে ইউনিভার্সিটির শিক্ষকদের মধ্যে ডঃ সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন, ডঃ হাসান জামান, ড. কাজী দীন মোহাম্মদ. ড. মোহর আলী ও ড. মুসতাফিজুর রহমান ছিলেন। এঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের নিজ নিজ বিষয়ে অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী। তাঁদের যোগ্যতা নিয়ে কোন সন্দেহ ছিলনা। শুধুমাত্র আদর্শের সাথে কোন আপোস না করতে পারার জন্য কারাবরণ করতে হয়েছিল।

ড. সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েন ছিলেন ইংরেজীর শিক্ষক। বাঙ্গালী মুসলমানদের মধ্যে ইংরেজীতে তিনিই প্রথম পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেছিলেন। ইংরেজী ছাড়াও জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। তাঁর সাথে কথা বলে আমার মনে হত তিনি একজন জ্ঞানতাপস। প্রফেসর সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, প্রফেসর হুমায়ুন কবির, প্রফেসর জাকির হোসেন (ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি), ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতই ছিল তাঁর মেধা ও মণীষার পরিধি।

১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর। পাকিস্তান আন্দোলনের ঐতিহাসিক যথার্থতা নিয়ে তাঁর মনে কোন সন্দেহ ছিল না। তিনি মনে করতেন মুসলমানদের কল্যাণের জন্যই পাকিস্তান সৃষ্টি। মুসলমানদের সমৃদ্ধির জন্যই পাকিস্তানের টিকে থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ হওয়ার পর ১৯শে ডিসেম্বর গেরিলারা এই পন্ডিত বুদ্ধিজীবীকে তাঁর নাজিমউদ্দিন রোডের বাসা থেকে নিয়ে যায়। গেরিলারা তাঁকে প্রথমে নিয়ে যায় তাঁরই সারা জীবনের কর্মস্থল ঢাকা ইউনিভার্সিটির আর্টস ফ্যাকাল্টির বিল্ডিং-এ। এ বিল্ডিং-এর কয়েকটি কক্ষে নিয়ে সারারাত গেরিলারা তাঁকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করে। বেয়নেটের খোঁচায় খোঁচায় তাঁর শরীর হয়ে ওঠে রক্তাক্ত। পরের দিন ভোরবেলায় গেরিলারা তাঁকে হাত পা চোখ বাঁধা অবস্থায় নিয়ে আসে গুলিস্তান এলাকায়। প্রকাশ্য রাজপথে মেরে তাঁর লাশ ফেলে রেখে যাওয়াই ছিল গেরিলাদের উদ্দেশ্য। বেয়নেট দিয়ে তাঁর শরীরের ছয়টা স্থানে আঘাত করা হয়। ৪টা পিঠে, ২টা বুকে।

অবশেষে তাঁরা রাইফেলের বাট দিয়ে তাঁর মাথায় ও শিরদাঁড়ার উপর প্রচন্ড জোরে আঘাত করে। তিনি জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তাঁর শরীরের নিম্নভাগ চলৎশক্তিহীন হয়ে পড়ে। গেরিলারা তাঁকে মৃত ভেবে রাজপথে ফেলে রেখে চলে যায়। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল অন্যরকম। এসব সত্ত্বেও তিনি বেঁচে যান। গুলিস্তানে রাস্তার উপর তাঁর চারপাশে ভিড় জমে গিয়েছিল। কিন্তু গেরিলারা তাঁকে মেরেছিল এজন্য ভয়ে কেউ তাঁকে সাহায্য করতে সাহস করেনি। পাছে গেরিলারা তাঁদের উপর আবার চড়াও হয়।

এ সময় মালেক নামে মুসলিম লীগের এক তরুণ কর্মী সাহস করে তাঁকে গুলিস্তান থেকে রিকশায় তুলে নিয়ে বাসায় পৌঁছে দেয়। মালেকের বাসা সাজ্জাদ সাহেবের বাসার কাছেই ছিল। সে গুলিস্তানে সাজ্জাদ সাহেবের মৃতপ্রায় অবস্থা দেখে বিবেকের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারেনি। সাজ্জাদ সাহেবের যে হাল হয়েছিল তাতে তাঁকে বাসায় রাখবার মত অবস্থা ছিল না। তাঁকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হয়েছিল।

ইন্ডিয়ান আর্মি তাঁকে হাসপাতালে প্রহরা দিয়ে রাখত। পরে হাসপাতাল থেকেই তাঁকে জেলে পাঠিয়ে দেয়া হয়। বহুদিন জেলে দেখেছি সাজ্জাদ সাহেব ঠিকমত হাঁটতে পারতেন না। সোজা হয়ে দাঁড়াতে তাঁর অসুবিধা হত। কিছুক্ষণ কারও সাথে কথা বললে অথবা কাজ করলে এত ক্লান্ত হয়ে পড়তেন যে তাঁকে আবার কিছুক্ষণ শুয়ে বিশ্রাম নিতে হত।

ড. হাসান জামান থাকতেন নিউ আট সেলে। সাজ্জাদ সাহেবকে যে জীপে করে গেরিলারা গুলিস্তান মারতে এনেছিল ঐ জীপেই হাসান জামান চোখ বাঁধা অবস্থায় ছিলেন। তাঁকেও তাঁর বাসা থেকে ধরে এনেছিল। গুলিস্তানে যেখানে সে সময় কামানটা ছিল তার একদিকে গেরিলারা মেরে ফেলে রাখে সাজ্জাদ সাহেবকে অন্যদিকে হাসান জামানকে। সাজ্জাদ সাহেবের আঘাতটা যেমন গুরুতর হয়েছিল হাসান জামানের সে রকম হয়নি। মালেক হাসান জামানেরও হাত পা ও চোখের বাঁধন খুলে দিয়েছিল। মালেক সাজ্জাদ সাহেবের বাসায় নিয়ে আসার পর হাসান জামান উঠে দাঁড়ান এবং হাঁটতে হাঁটতে বায়তুল মোকাররমের দিকে অগ্রসর হন। তিনি ভেবেছিলেন মসজিদের ভিতর একটু আশ্রয় নেবেন। কিন্তু তাঁর ভাগ্য ছিল অন্যরকম। কিছুদূর এগুতেই গেরিলাদের একটি জীপ তাঁর সামনে এসে পড়ে। গেরিলারা তাঁকে চিনতে পেরেই ধর ধর করে তাঁর উপর পুনরায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ তাঁর উপর চলে শারীরিক নির্যাতন। মৃতপ্রায় হয়ে পড়লে গেরিলারা তাঁকে জীপে উঠিয়ে নিয়ে মিরপুর ব্রীজের কাছে চলে যায় এবং ব্রীজের উপর থেকে নীচে ফেলে দেয়। হাসান জামান গভীর পানির মধ্যে না পড়ে কিনারার দিকে পড়েছিলেন। ওই অবস্থায় তিনি ভেসেছিলেন কিছুক্ষণ।

আশেপাশের গ্রামের লোকজন মাঠে কৃষিকাজ করতে এসে দেখে সাহেবের মত ফর্সা চেহারার একজন লোক পানিতে ভেসে আছেন। তারা এগিয়ে এসে দেখে তখনও তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। গ্রামের কৃষকরা তখনই তাদের বাড়ীতে তাঁকে নিয়ে যায়। সেবা-শুশ্রষা করে, গরম দুধ খাওয়ায়। হাসান জামান আস্তে আস্তে চোখ মেলেন। আশে পাশের লোককে তিনি জিজ্ঞাসা করেন আমি কোথায়? তারা জবাব দেয় আপনি তো মিরপুর ব্রীজের নীচে পড়ে গিয়েছিলেন। তখন একে একে তাঁর সব কথা মনে পড়ে যায়।

হাসান জামান তখন সবাইকে অনুরোধ করেন মিরপুর ব্রীজের কাছে গিয়ে শিখ আর্মি দেখলে তাদের ডেকে আনতে। শিখ আর্মি আসার পর হাসান জামান তাদের সব খুলে বলেন। শিখ আর্মি তাদের তত্ত্বাবধানে তাঁকে কয়েকদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাখে এবং পরে সেখান থেকে জেলে পাঠিয়ে দেয়।

জেলে এসে হাসান জামান অনেকটা নীরব হয়ে যান। সেলের ভিতর থেকে তিনি খুব একটা বের হতেন না। কারও সাথে তেমন কথাও বলতেন না। অথচ হাসান জামানের মত তরতাজা মানুষ খুবই কম দেখা যেত। ইউনিভার্সিটির তিনি ছিলেন মেধাবী শিক্ষক।

সাত সেলে সাজ্জাদ সাহেবের পাশেই থাকতেন ড. কাজী দীন মোহাম্মদ। কাজী সাহেব ছিলেন বাংলার অধ্যাপক। তাঁর সকাল বেলা ঘুমানোর অভ্যাস ছিল। জেলে একটা নিয়ম আছে সকাল বেলা মিয়া সাহেব রুমের তালা খুলে ভিতরে ঢুকে ভাল করে পরীক্ষা করে দেখেন সেলের বাসিন্দারা বেঁচে আছেন না মরে গেছেন। এতে কাজী সাহেব খুব বিরক্ত হতেন। আসলে যে কেউ এ রকম ব্যাপারে বিরক্ত হতে পারেন। আমরা এ ব্যাপারটা সহ্য করে নিয়েছিলাম। একবার কাজী সাহেব মিয়া সাহেবের এই অত্যাচারের প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন অদ্ভুতভাবে।

একদিন সকাল বেলা মিয়া সাহেব এসে তাঁর রুমের ভেতর ঢুকে পড়লে তিনি কোন সাড়া শব্দ না করে মরার মত পড়ে থাকেন। মিয়া সাহেব যতই ডাকাডাকি করে এমনকি ধাক্কানোতেও তিনি কোন সাড়া শব্দ করেন না। মিয়া সাহেবের মনে তখন সন্দেহ হয় কাজী সাহেব কি মারা গেছেন। মিয়া সাহেব খেয়াল করে দেখে কাজী সাহেব খাটের উপর মাথা কাত করে পড়ে আছেন। শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। তখন সে ভয় পেয়ে ডাক্তার ডাকতে যায়।

আমাকে এসে এক ফালতু খবর দেয় কাজী সাহেব মারা গেছেন। আমি হায় হায় করতে করতে সাত সেলের দিকে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি অনেকেই কাজী সাহেবের সেলে ভিড় জমিয়েছে। ডাক্তার এসে কাজী সাহেবকে পরীক্ষা করে দেখছেন। পরীক্ষার পর ডাক্তার কাজী সাহেবকে হাসপাতালে নেয়ার কথা বলেন। এই কথা শোনার পর দেখি কাজী সাহেব ধীরে ধীরে চোখ মেলছেন। ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন আমাকে হাসপাতালে নেয়ার দরকার নেই। আমি সুস্থ হয়ে গেছি। ডাক্তার ও অন্যান্য সবাই চলে যাওয়ার পর আমি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কি হয়েছিল?

তিনি হাসতে হাসতে বললেন প্রতিদিন সকালে মিয়া সাহেব এসে বিরক্ত করে। তাকে বলেছি সেলের ভিতরে না আসার জন্য। কথা শোনেনা। তাই আজকে মরার ভান করে পড়েছিলাম। দেখি এতে এদের হুঁশ হয় কিনা। বুঝলাম কাজী সাহেব শুধু ভাষা ও সাহিত্যের সমঝদার নন, রসিকও বটেন। পরে শুনেছিলাম মিয়া সাহেব কাজী সাহেবের সেলের সামনে এসে সাবধান হয়ে যেত।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh