Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ৩ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

বরিশাল থেকে আমার আব্বা খুলনায় বদলি হয়ে এলে আমি খুলনা জেলা স্কুলে ভর্তি হই। কবি ফররুখ আহমদও এই স্কুলের কৃতী ছাত্র ছিলেন। খুব সুন্দর করে কবিতা আবৃত্তি করতেন আমাদের স্কুলে। তখন চাটগাঁ থেকে আব্দুর রহমান নামে একজন তেজস্বী মুসলিম হেডমাস্টার বদলী হয়ে আসেন। মুসলমান ছাত্ররা ধুতি পরে স্কুলে আসুক এটা তাঁর পছন্দ হয়নি। তিনি নিয়ম করলেন মুসলমান ছাত্ররা ধুতি পরতে পারবে না মাথায় টুপি দিতে হবে। নামাজ অবশ্যই পড়তে হবে। এটার ব্যতিক্রম হলে তিনি মুসলমান ছাত্রদের তিরস্কার করতেন; কখনও কখনও শাস্তিও দিতেন। মুসলমান হেড মাস্টারের এসব কান্ডকারখানায় হিন্দু ছাত্ররা সে সময় খুব রুষ্ট হয়েছিল।

আসলে এই শতকের চল্লিশের দশকটা ছিল বাঙ্গালী মুসলমানদের জন্য একটা রূপান্তরের সময়। বহু বছরের গ্লানি ও নির্জীবতা থেকে তারা তখন কেবল চোখ মেলতে শুরু করেছিল। খুলনার মুসলমান নেতাদের মধ্যে তখন আব্দুল হাকিম ছিলেন খুব বিখ্যাত লোক। সবুর খান তখনও রাজনীতির ময়দানে স্থায়ী জায়গা করতে পারেননি। তিনি তখন খুব ভাল ফুটবল খেলতেন।

পাকিস্তান আন্দোলনের বাণীকে বাংলার মুসলমানদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়ার জন্য দৈনিক আজাদ সে সময় এক তুলনাহীন ভূমিকা রেখেছিল। কংগ্রেস সমর্থিত পত্রিকা যুগান্তর, বসুমতী, আনন্দবাজার, অমৃতবাজার প্রভৃতির মিথ্যা অপপ্রচার খন্ডাতে মওলানা আকরাম খাঁর আজাদ ছিল একমাত্র এবং যথার্থ অবলম্বন।

দৈনিক আজাদের সম্পাদক ছিলেন স্বনামধন্য সাংবাদিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। দৈনিক আজাদ, মোহামেডান স্পোটিং ক্লাব, আব্বাস উদ্দীনের গান আর জনসেবায় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ছিল মুসলমানদের গর্বের বিষয়। সে সময় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব তারুণ্যের প্রতীক হিসেবে আমাদের সামনে স্থান করে নিয়েছিল। জুম্মা খাঁ, হাফেজ রশীদ শাফী, উসমান, রহীম, শাহজাহান প্রমুখ খেলোয়াড়ের ক্রীড়া নৈপুণ্যে উজ্জীবিত হয়ে উঠত সবাই। এক একবার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব শিরোপা লাভ করত। তখন মনে হত সারা বাংলার মুসলমানরাই যেন এক উৎসবে মেতে উঠেছে। কবি গোলাম মোস্তফা একবার মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের শিরোপা অর্জনের ওপর সুন্দর একটা কবিতা লিখেছিলেন। কবিতাটির শিরোনাম ছিল ‘লীগ বিজয় না দিগ বিজয়’। খেলার মাঠে হাফেজ রশীদ একবার আহত হন। মনে আছে তাঁর আরোগ্য কামনায় মসজিদে মসজিদে দোয়া হয়েছিল। তাঁর অবস্থা জানার জন্য কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাজার হাজার লোক ছুটে গিয়েছিল আর তাঁদের নিয়ে যাওয়া পথ্য সামগ্রীতে সেদিন মেডিকেল কলেজের ওয়ার্ড এক রকম উপচে পড়েছিল। সত্যি বলতে কি এ ঘটনা ছিল অভূতপূর্ব।
আব্বাস উদ্দীন ছিলেন সুকণ্ঠ শিল্পী। তাঁর গলায় যখন ইসলামী গান উঠে আসত তখন শ্রোতারা যেন হারানো সম্বিত ফিরে পেত। আব্বাস উদ্দীনের গানের মাধ্যমেই পল্লী বাংলার ও সেকালের মুসলিম চেতনা ও সংস্কৃতির একটি আবহ ফুটে উঠেছিল। মুসলিম লীগের বিরাট বিরাট জনসভায় গানের মাধ্যমে পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে তাঁর ভূমিকা ছিল অতুলনীয়।

আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম ছিল একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। মুসলিম সমাজের মধ্যে সামাজিক ও নৈতিক সচেতনতা সৃষ্টির জন্য এবং মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতি রেখে মানবিক সেবাকর্মের উদ্দেশ্যে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিভিন্ন সময় এ প্রতিষ্ঠানের সাথে বাংলার স্বনামধন্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ জড়িত ছিলেন। কলকাতার ডাইরেক্ট অ্যাকশন পরবর্তী সময় যখন মারমুখী হিন্দুরা নিরীহ মুসলমানদের আক্রমণ করে তখন হাজার হাজার মুসলমানের লাশ দাফনের ব্যবস্থা করেছিল এই প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে সালাউদ্দীন নামে একজন মহৎ ব্যক্তি দীর্ঘদিন যুক্ত ছিলেন। তাঁর অপরিসীম উৎসাহে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের সেবামূলক কর্মের পরিধি চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। আজকাল প্রায়ই প্রচার মাধ্যমের বদৌলতে জনসেবায় মাদার তেরেসার নাম শোনা যায়। কিন্তু এই নীরব সাধক সালাহউদ্দীন মাদার তেরেসার তুলনায় কোন অংশে কম ছিলেন না।

১৯৪৬ সালের নির্বাচন ছিল মুসলমানদের জন্য একটা টার্নিং পয়েন্ট। কায়েদে আযম আহ্বান জানিয়েছিলেন যদি মুসলিম লীগের প্রার্থী কলাগাছও হয় তবে তাকেই ভোট দিতে। বাংলার মুসলমানরা সেরকমই করেছিলেন। তাঁরা সেদিন একযোগে মুসলিম লীগকে ভোট দিয়ে জিতিয়ে দেন। আশ্চর্যের ব্যাপার হল সারা ভারতের আর কোথাও মুসলিম লীগ এমন সমর্থন পায়নি। এমনকি নির্বাচনোত্তর কালে পাঞ্জাব, সিন্ধু ও সীমান্ত প্রদেশেও মুসলিম লীগ মন্ত্রীসভা গঠিত হতে পারেনি। একমাত্র বাংলাতেই সেটা সম্ভব হয়েছিল। বাংলার মুসলমানদের নির্বাচনী জেহাদেই বলা যায় পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়েছিল।

নির্বাচনের পর প্রদেশে মুসলিম লীগ গঠিত হয়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হন প্রধানমন্ত্রী। নুরুল আমীন সাহেব স্পীকার আর কুমিল্লার মফিজুদ্দীন চীফ হুইপ নির্বাচিত হন।

সোহরাওয়ার্দ্দী ছিলেন অভিজাত পরিবারের সন্তান। তাঁর আব্বা জাহিদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি আর মা খুজিস্তা আখতার বানু ছিলেন একজন বিদুষী মহিলা। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনিই প্রথম ফার্সীতে এম এ পাশ করেন।

সোহরাওয়ার্দী ছিলেন স্বনামধন্য পন্ডিত। জামালুদ্দীন আফগানীর তিনি ছিলেন ভক্ত। আর হাসান সোহরাওয়ার্দী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। অভিজাত পরিবারের সন্তান বলে তাঁর মধ্যে কোন অহমিকা ছিল না। বিনা আয়াসে তিনি কুলি-মজুর, রেল-শ্রমিক, ঠেলা গাড়ির চালক আর রিকশাওয়ালাদের সাথে মিশে যেতে পারতেন। কলকাতার ডক শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজে তিনি একসময় অবিশ্রান্ত খেটেছেন। শ্রমিক আন্দোলনে তাঁর সাথে দুজন মুসলিম নেতা যুক্ত হয়েছিলেন। একজন পূর্ব পাকিস্তানের শেষ গভর্ণর ডা. এ এম মালেক আর অপরজন ফয়েজ আহমেদ।

মওলানা ভাসানী একবার আমাকে বলেছিলেন সি আর দাস দেশ বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর পোষাক-পরিচ্ছদ প্যারিস থেকে ধুয়ে আনা হত। কিন্তু শহীদও তাঁর চেয়ে কম ছিলেন না। শহীদ ছিলেন বিসিএল, উপরন্তু জন্মেছিলেন এক খান্দানী পরিবারে। কিন্তু তাঁর পছন্দ ছিল অনাড়ম্বর জীবন। ১৯৪৬-এর নির্বাচনের সময় দেখেছি, মুসলিম লীগের সাধারণ কর্মীদের সাথে তিনি কিভাবে মিশে যেতেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী রাত্রে কর্মীদের ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজে জেগে থাকতেন। দিনের পর দিন কর্মীদের ভরণ-পোষণের ব্যয় নিজে বহন করতেন। বাকেরগঞ্জের নির্বাচনী প্রচারের সময় লঞ্চ থেকে নেমে তিনি নিজে আমাদের ডাব কেটে পানি পান করিয়েছিলেন। এ ব্যাপারে তাঁর মধ্যে কখনও ক্লান্তি দেখিনি। বাংলার পার্লামেন্টারী রাজনীতিতে ফজলুল হক, নাজিমুদ্দীন ও সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তিনটি নক্ষত্র।

৪৬-এর নির্বাচনের ঠিক আগের একটি ঘটনা। তখনও মুসলিম লীগ প্রার্থীদের নাম পুরোপুরি ঠিক হয়নি। ঢাকার নওয়াবগঞ্জ-দোহার এলাকা থেকে আমরা মোহাম্মদ ওয়াসেককে ঠিক করেছিলাম প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করাব। ওয়াসেক ছিলেন বিপ্লবী ছাত্রনেতা। সেকালে বাংলায় মুসলিম ছাত্রদের সংগঠিত করতে ওয়াসেক দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত কাজ করেছিলেন। আমরা যখন মালদায় ছিলাম তখন তিনি একবার সেখানে যান। আমাদের স্কুলের মুসলমান ছাত্ররা সেদিন তাঁর অনলবর্ষী বক্তৃতায় এতটা উদ্দীপিত হয়েছিল যে তা ভুলবার নয়। তরুণ ওয়াসেক সে সময় কলকাতার হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণে নেতাজী সুভাষ বসুর সাথে যোগ দিয়ে এক অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।

ওয়াসেক বেঙ্গল সিভিল সার্ভিস পরীক্ষাও পাস করেন। কিন্তু রাজনীতি এত মজ্জাগত হয়ে গিয়েছিল যে, তিনি উচ্চ পদের চাকরীর প্রলোভন সহজেই ত্যাগ করেন। তিনি ছিলেন চিরকুমার। বিত্ত-বৈভবের প্রতিও তাঁর কোন আসক্তি ছিল না। একটি নিরাসক্ত মন ছিল তাঁর। নির্বাচনের আগে টাকার দরকার। সোহরাওয়ার্দী সাহেব তখন একবার ঢাকায় এলেন। তিনি উঠেছিলেন নওয়াবজাদা নসরুল্লাহর বাসায়। সোহরাওয়ার্দীও মনে-প্রাণে আশা করেছিলেন ওয়াসেক নির্বাচনে দাঁড়াক। মুসলিম লীগ নেতারা সৎ যোগ্য ও উদ্যমী প্রার্থীকে চিহ্নিত করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় যাচ্ছিলেন। ওয়াসেকের নিজের এলাকায়ও এরকমটি ঘটে। একদিন তিনি আমাকে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছে নিয়ে যান। ওয়াসেক সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে উদ্দেশ্য করে বললেন, কাল সুবা ছে বাজে ও আপকা ইহা চলে আয়েগা, আপ উনকো সাড়ে তিন হাজার রূপীয়া দে দিজিয়েগা আউর ও সুবা লঞ্চ মে সাইনপুকুর চলা জায়েগা। সাইনপুকুর ছিল মুসলিম লীগ নেতা ফজলুর রহমানের গ্রামের বাড়ি। এটি ছিল দোহার থানায়। এখানে তিনি জনমত জরিপের কাজ চালাচ্ছিলেন।

ওয়াসেক সাইনপুকুর চলে যাওয়ার পর আমি পরদিন যথাসময় সোহরাওয়ার্দী সাহেবের ওখানে যাই। তিনি তখন বাড়ীর সামনে পায়চারী করছিলেন। আমাকে দেখেই তিনি বলে উঠলেন You seems to be very naughty boy. Ibrahim, you have come so early. ব্যাংক নেহী খুলনেছে রূপীয়া হাম কাহাসে দে? তুম দশবাজে আকে পয়সা লে লেনা। আমি বললাম স্যার হামকো ছুবহ ছে বাজেকা লঞ্চ মে যানা হোগা। লঞ্চ ছে বাজে ছোড় কে চলা যায়েগা। বাদ মে আওর কই লঞ্চ নেহি হায়। হামকো রূপীয়া এন্তেজাম করকে দিজিয়ে।

তখন তিনি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহর কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা ধার নিয়ে আমাকে দিলেন। আমি সেই টাকা নিয়ে সরদঘাটের দিকে রওনা দেই। গিয়ে দেখি লঞ্চ চলে গেছে। তখন মুসলিম ন্যাশনাল গার্ডের সালারে সিটি সিরাজুদ্দীনের কাছ থেকে আমি একটা সাইকেল ধার করে নদী পার হয়ে আড়িয়াল বিলের ভিতর দিয়ে সাইনপুকুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। সেদিন সাইকেল চড়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। সাইকেল কাঁধে আর কচুরিপানা ভেঙ্গে ঘটনাস্থলে গিয়ে ওয়াসেকের কাছে টাকা পৌঁছাতে হয়েছিল। নির্বাচনকে সামনে রেখে তখন মুসলিম লীগের পক্ষ থেকে অনেক সাইকেল কেনা হয়েছিল।

সেদিন ওয়াসেকের জন্য এই যে এত খেটেছিলাম মনে হয় এর কোন কিছুই কাজে আসেনি। ফজলুর রহমান চাননি ওয়াসেক নির্বাচনে দাঁড়াক। তিনি নির্বাচনের প্রার্থী হিসেবে পছন্দ করেছিলেন অবসরপ্রাপ্ত স্কুল ইনস্পেক্টর খান বাহাদুর আব্দুল খালেককে। খালেক সাহেব আমার আত্মীয়। কিন্তু তাঁর নির্বাচনে দাঁড়ানোটা আমার কাছে গুরুত্বহীন মনে হয়েছিল। মুসলিম লীগের জন্য ওয়াসেকের যে বিপুল অবদান তাঁর সামনে খালেককে কোন স্থান দেয়া যেত কিনা সন্দেহ।
সে সময় মুসলিম লীগের মধ্যে সোহরাওয়ার্দী আর নাজিমুদ্দীনের দুটো ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ ছিল। নাজিমুদ্দীন গ্রুপে ছিলেন মওলানা আকরাম খাঁ, ফজলুর রহমান, হামিদুল হক চৌধুরী, ইউসুফ আলী চৌধুরী (মোহন মিয়া) আর তমিজুদ্দীন খাঁ।

সোহরাওয়ার্দীর সাথে ছিলেন আবুল হাশিম, বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, ডা. এ এম মালেক, টি আলী, আব্দুস সবুর খান, খয়রাত হোসেন, আব্দুল জব্বার খদ্দর, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ। দলের মধ্যে এই গ্রুপিং-এর কিছু প্রভাব নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী নির্বাচনের মধ্যেও পড়েছিল। ওয়াসেক ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর সাথে। ফজলুর রহমানের প্রভাব পার্লামেন্টারী বোর্ডের সামনে ওয়াসেকের মনোনয়ন তাই বাতিল হয়ে যায়। এটা ছিল একটা দুঃখজনক সিদ্ধান্ত।

ওয়াসেক আমাকে কলকাতা পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য নাজিমুদ্দীন গ্রুপকে তাঁর পক্ষে যেন আমি ভালভাবে বুঝাতে পারি। আমার নিজেরও দুর্বলতা ছিল নাজিমুদ্দীন গ্রুপের প্রতি। নাজিমুদ্দীন ও ফজলুর রহমান উভয়কে আমি ওয়াসেকের পক্ষে সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কথা বলেছিলাম। এতে ফজলুর রহমান আমার প্রতি বিরক্ত হয়ে বললেন, তুমি আমাদের পক্ষের হয়ে কেন ওয়াসেকের জন্য কাজ করছ। আমি বলেছিলাম, আমি মুসলিম লীগের জন্য কাজ করছি। ওয়াসেককে মনোনয়ন দিলে মুসলিম লীগের আদর্শ বাস্তবায়নে আমাদের সুবিধা হবে। কিন্তু আমার সেদিনের অনুরোধে তাঁরা কোন কর্ণপাত করেননি। ঠিক এরকম একটা ঘটনা ঘটেছিল চাটগাঁর ফজলুল কাদের চৌধুরীর মনোনয়ন নিয়ে। তিনি ছিলেন নাজিমুদ্দীন গ্রুপে। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের চাপে তিনি মনোনয়ন লাভে ব্যর্থ হন। আমরা মনে করেছিলাম ফজলুল কাদের চৌধুরী একজন উঁচু দরের সংগঠক ও লীগের উদ্যমী কর্মী, তাঁর মনোনয়ন লাভ মুসলিম লীগের ভিত্তিকেই মজবুত করবে। আমরা বেকার হোস্টেল থেকে মিছিল নিয়ে সোহরাওয়ার্দীর বাসায় গিয়েছিলাম। মিছিলে আমাদের সাথে সোহরাওয়ার্দীর পি এস নূরুল হুদাও ছিলেন। এই নূরুল হুদাই পরবর্তীকালে ঢাকায় বুলবুল একাডেমী প্রতিষ্ঠা করেন। মিছিলের ভিতর থেকে অনেকেই ফজলুল কাদের জিন্দাবাদ, সোহরাওয়ার্দী মুর্দাবাদ ধ্বনি দিয়েছিল। এসব শুনতে পেয়ে সোহরাওয়ার্দী বাড়ীর ভিতর থেকে বের হয়ে এসে বললেন, Your Zindabad and Murdabad carries the same music to me.

তারপর তিনি আমাদের শান্ত করার জন্য বললেন, তোমরা এখন চলে যাও। পার্লামেন্টারী বোর্ডেই আমরা সব সিদ্ধান্ত নেব। কিন্তু চূড়ান্ত মনোনয়নের ঘোষণা দেয়ার পর আমরা হতবাক হয়ে দেখলাম ফজলুল কাদের চৌধুরীর নাম নেই। ওয়াসেকের কাহিনী বলতে গিয়ে এই যে এত কথা বললাম এর কারণ সোহরাওয়ার্দীর পার্টি কর্মীদের প্রতি কি অসীম মমতা ছিল সেটা বুঝানোর জন্য।

সোহরাওয়ার্দী কখনোই ভাল বাংলা বলতে পারতেন না। সভাগুলোতে তিনি বাংলা ও উর্দু মিশিয়ে জগাখিচুড়ি ভাষায় যা বলার চেষ্টা করতেন তা আমরা বেশ উপভোগ করতাম। জনসভায় কায়েদে আযমের কাছ থেকে আমি এসেছি এটা বলতে তিনি বলতেন আমি কায়েদে আযমের কাছ থেকে টাটকা টাটকা আসিয়াছে। তারপরেই তিনি যোগ করতেন কায়েদে আযম তোমাদের কাছে জানাইতে বলিয়াছে মুসলিম লীগকে ভোট দিতে। কায়েদে আযম তোমাদের খুব ভালবাসে। তোমরাও তাঁকে খুব ভালবাস আমি জানি।

কলকাতার ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-তে সোহরাওয়ার্দী মুসলমানদের জান বাঁচানোর জন্য নিজের জান বাজি রেখেছিলেন। যেখানে তিনি শুনেছেন মুসলমানদের উপর আক্রমণ করা হয়েছে লোকজন আর পুলিশ ফোর্স নিয়ে তিনি নিজেই সেখানে ছুটে গিয়েছেন। সেদিন সোহরাওয়ার্দী না থাকলে কলকাতার সব মুসলমান খতম হয়ে যেত।

পাকিস্তান হওয়ার পর তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করেন। আমরা মুসলিম লীগেই থেকে যাই। সোহরাওয়ার্দীর এই মুসলিম লীগ ত্যাগ আমরা কর্মীরা কখনও প্রসন্ন মনে মেনে নিতে পারিনি। কিন্তু কলকাতায় মুসলিম লীগের ভিতরকার গ্রুপিং পাকিস্তান হওয়ার পর প্রকাশ্য আকার ধারণ করে। সোহরাওয়ার্দী আর নাজিমউদ্দীন উভয়েই দুই মেরুতে চলে যান। আমি মুসলিম লীগে থাকলেও তাঁর সাথে আমার প্রীতির সম্পর্ক কখনই চুকে যায়নি। একবার পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক সালাম সাহেবের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল প্রেস ক্লাবে। বর ছিলেন সাংবাদিক এ বি এম মূসা। ঐ অনুষ্ঠানে সোহরাওয়ার্দীসহ আবু হোসেন সরকার, হামিদুল হক চৌধুরী, ইউসুফ আলী চৌধুরীর মত নামী দামী ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত হয়েছিলেন। অনুষ্ঠানে আমিও ছিলাম। আব্দুল জব্বার খদ্দর আমাদের টেনে নিয়ে সোহরাওয়ার্দীকে বললেন ইব্রাহিম এখন অনেক টাকা বানিয়েছে। এর কাছ থেকে কিছু আদায় করুন। সোহরাওয়ার্দী তখন আমার পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন ওতো আমার জন্যই টাকা বানিয়েছে। ওর টাকাতো আমার টাকা। তিনি ছিলেন সুবিশাল চিত্তের অধিকারী।

পাকিস্তান আন্দোলনে আবুল হাশিমের অবদান ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে অনেকখানি সীমাবদ্ধ। তিনি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ নির্বাচিত হন। ১৯৪৫-৪৬ সালে পাকিস্তান আন্দোলন যখন তুঙ্গে তখন পাকিস্তানের দাবিকে জনপ্রিয় করবার জন্য তাঁর অবদান সোহরাওয়ার্দীর চেয়ে কোন অংশে কম ছিল না। রাজনীতিতে তিনি ছিলেন অনেকটা রেডিক্যাল চিন্তার অধিকারী। ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে সাম্যভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ার কথা তিনি বলতেন। মুসলিম ছাত্রলীগের তরুণদের নিয়ে তিনি কোরআনের ক্লাস করতেন। এ ক্লাসে তিনি কোরআন শরীফের আলোকে এক আদর্শ সমাজ ব্যবস্থার চিত্র তরুণদের সামনে তুলে ধরতেন। তিনি মনে করতেন পাকিস্তানও হবে এ ধরণের একটি আদর্শ রাষ্ট্র।

আবুল হাশিমের সবচেয়ে উৎসাহী ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন টাঙ্গাইলের শামসুল হক, মুন্সীগঞ্জের শামসুদ্দীন, নারায়ণগঞ্জের আওয়াল ও আলমাস। আলমাস পরে পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য হয়েছিলেন।

শামসুদ্দীন কিছুদিন মৌলভী তমিজুদ্দীন খানের প্রাইভেট সেক্রেটারী হিসেবে কাজ করেছিলেন। পরে তিনি পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডেপুটি ডাইরেক্টর হিসেবে যোগ দেন। শামসুল হক আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। মওলানা ভাসানী ছিলেন সভাপতি। খন্দকার মোশতাক ও শেখ মুজিব ছিলেন যুগ্ম সম্পাদক।

শামসুল হক খুব উদ্যমী মানুষ ছিলেন। আবুল হাশিমের মত তিনিও ইসলামের বিপ্লবী ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করতেন। টাঙ্গাইলের এক উপনির্বাচনে তিনি মুসলিম লীগের প্রার্থী খুররম খান পন্নীকে হারিয়ে দিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। এই নির্বাচন ছিল মুসলিম লীগের জন্য টেস্ট কেস। তখনই বুঝা গিয়েছিল মুসলিম লীগ ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে।

শামসুল হকের জীবনের শেষ অধ্যায় ছিল খুব দুঃখজনক। তিনি বিয়ে করেছিলেন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্রী নরসিংদীর সিকান্দার মাষ্টারের মেয়ে আফিয়াকে। ভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে শামসুল হক কারাবরণ করেন। শুনেছি সেখানে তিনি হয়ে যান ভারসাম্যহীন। জেল থেকে মুক্তি পাবার পর শামসুল হক হয়ে যান সম্পূর্ণ অপ্রকৃতিস্থ। শামসুল হক জেলে যাবার পর তাঁর সাথে আফিয়ার আর কোন সম্পর্ক ছিল না।

জেল থেকে বের হয়ে তিনি বহুদিন ভারসাম্যহীন অবস্থায় ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করেছেন। প্রাদেশিক পরিষদের একজন সদস্যকে দেখবার মত তখন কেউ ছিল না। আমার বাসায় তিনি এভাবে কয়েকবার এসেছেন। পুরানো ঢাকার সেকালের এক রেস্টুরেন্টের আবাসিক কামরায় তিনি মাঝে মাঝে থাকতেন। কিন্তু পয়সার অভাবে হোটেল কর্তৃপক্ষ তাঁকে বহুবার গলাধাক্কা দিয়েছে। একদিন শুনতে পেলাম তাঁর লাশ বুড়ীগঙ্গায় এক নৌকার ভিতর পাওয়া গেছে। তারপর তাঁর আর কোন খবর পাইনি। অথচ তিনি তখনও আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক।

শামসুল হকের অন্তর্ধানের রহস্য, তাঁর স্ত্রীর চলে যাওয়া এবং তাঁর অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যাওয়া সবই আমার কাছে এখনও রহস্য হয়ে আছে। আওয়ামী লীগের কেউ সেদিন তাঁর সামান্য কাজেও আসেনি। মানবিক সহানুভুতিও তিনি পাননি।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh