Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ৭ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

১৯৫১ সালে করাচীতে মুসলিম লীগের কাউন্সিল মিটিং হয়। পাকিস্তান হওয়ার পর মুসলিম লীগের এই ছিল প্রথম কাউন্সিল মিটিং। পূর্ব পাকিস্তান থেকে অনেকের মধ্যে আমিও কাউন্সিলার মনোনীত হই। এর মধ্যে আবার আমরা শ্রীলঙ্কা যাওয়ার আমন্ত্রণও পাই। শ্রীলঙ্কা তখন সিংহল নামে পরিচিত ছিল। শ্রীলঙ্কায় মুসলিম লীগের একটি শক্তিশালী শাখা ছিল। টি বি জয়া ছিলেন সেখানকার মুসলিম লীগ নেতা। তিনি শ্রীলঙ্কার শিল্প মন্ত্রী হয়েছিলেন। পরে তিনি পাকিস্তানে শ্রীলঙ্কার হাইকমিশনার নিযুক্ত হন। এই টি বি জয়াই শ্রীলঙ্কার একটি মুসলিম যুব সম্মেলন অনুষ্ঠানের উদ্যোগ নেন। করাচীর কাউন্সিলর মিটিং-এ যাওয়ার পথে এই যুব সম্মেলনে আমর যোগদান করি। আমরা সমুদ্র পথে শ্রীলংকা যাই এবং সেখান থেকে পরে করাচী পৌঁছি। তখন চাটগাঁ থেকে নৌ-বাহিনীর একটি জাহাজে করে আমরা রওয়ানা হই। মুসলিম লীগ সরকারই আমাদের নৌ-বাহিনীর জাহাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।

আমার সাথে যেসব কাউন্সিলর জাহাজযোগে সহযাত্রী হয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ঢাকার নূরুল ইসলাম, হেকিম ইরতেজাউর রহমান, শামসুল হুদা, ফিরোজ আহম্দ ডগলাস, আলিমুল্লাহ, আলাউদ্দীন, মোহাম্মদ ইয়াসিন, আখতার আহাদ, আসলাম রেঙ্গুনওয়ালা, চাটগাঁর আবু সালেক, রফিকুল্লাহ চৌধুরী, চৌধুরী হারুনুর রশীদ, মোহাম্মদ রুস্তম, কাজী নাজমুল হক, আলিমুল্লাহ চৌধুরী, রাজশাহীর মোহাম্মদ ফারুক, বগুড়ার ফজলুল বারী ও আব্দুল হামিদ, কুমিল্লার এটি সাদী, শফিকুর রহমান, নূরউদ্দিন আবাদ, মফিজুর রহমান, রংপুরের সাঈদুর রহমান, ফেনীর সাইফুদ্দিন চৌধুরী এবং রাজশাহীর এমরান আলী সরকারের কথা মনে পড়ছে।

আমাদের সাথে ঢাকা ইউনিভার্সিটির তিনজন ছাত্রীও সফর করেন। তাঁরাও মুসলিম লীগের কর্মী ছিলেন। এঁরা হলেন রোখসানা রেজা, তৌহিদা ও জাকিয়া।

রোখসানা পরে পাইলট হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন প্রথম মুসলিম মহিলা পাইলট। রোখসানার আব্বা আলী রেজা ছিলেন ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট।
তৌহিদা ছিলেন ডা. আব্দুল ওয়াহেদের মেয়ে। ডা. আব্দুল ওয়াহেদ বাঙ্গালী মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এমআরসিপি ডিগ্রী পেয়েছিলেন। তিনি পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষও হন। এই সব মুসলিম লীগ কাউন্সিলরদের মধ্যে চাটগাঁর চৌধুরী হারুনুর রশীদ পরে মুসলিম লীগ ত্যাগ করে ন্যাপে যোগ দেন। চিন্তাভাবনায় তিনি হয়ে যান বামপন্থী। জাহাজযোগে এই ছিল আমার প্রথম সমুদ্র ভ্রমণ। সমুদ্রের মধ্যে আমাদের জাহাজটা ছিল ভাসমান দ্বীপের মত। বিশাল বিশাল ঢেউ এগিয়ে আসছে। দেখলে রীতিমত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তে হয়। পরক্ষণেই তা আবার শুভ্র ফেনার মিছিল হয়ে চতুর্দিকে ভেঙ্গে পড়ছে। সে এক অপূর্ব দৃশ্য।

সমুদ্রে উড়ন্ত মাছের ঝাঁক দেখা যেত ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আবার পরক্ষণেই তা সমুদ্রেও বুকে মিশে যেত। আমার কাছে সবচেয়ে ভাল লাগত সমুদ্রে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য। সারা পৃথিবীকে রাঙ্গিয়ে একবার সূর্য সমুদ্রের বুক ফেড়ে উপরে উঠে আসছে আবার সন্ধ্যা বেলায় রক্তের আভা ছড়িয়ে সমুদ্রের বুকেই হারিয়ে যাচ্ছে। জেলেরা দেখতাম উপকূল থেকে বহুদুর এসে মাছ ধরছে। তাদের দেখলে তাদের জীবনের প্রতি কোন মায়া আছে কিনা বুঝা যেত না। সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথেই বোধহয় তারা জীবনবাজি রেখেছিল। মাঝে মাঝে দেখতাম ঢেউয়ের তালে তালে তাদের নৌকা কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে। আবার কিছুক্ষণ পর দেখতাম ঢেউয়ের ফেনার ভিতর থেকে তারা বেরিয়ে আসছে।

আমাদের জাহাজ বঙ্গোপসাগর ছেড়ে ভারত মহাসাগরে এসে পড়ামাত্রই ভীষণভাবে দুলতে থাকে। জাহাজ কর্তৃপক্ষ আমাদের শুয়ে থাকার নির্দেশ দেয়, কেননা উঠে দাঁড়ালেই তখন পড়ে যাবার আশংকা ছিল। তারা আমাদের লাইফ জ্যাকেট পরে ফেলবারও নির্দেশ দেয়। বঙ্গোপসাগর যেখানে ভারত মহাসাগরের সাথে একাকার হয়ে গেছে এবং করাচী যাওয়ার পথে আরব সাগর যেখানে ভারত মহাসাগরের সাথে মিশেছে সেখানে দুই সমুদ্রের মিলন স্থলটা স্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছিলাম। পরিষ্কার ভিন্ন দু’টি পানির ধারা বয়ে চলেছে।

আমার তখন কোরান শরীফের কথা মনে হয়েছিল। সেখানে আছে দুই সমুদ্রের মধ্যে আল্লাহ তা’আলা এমন একটা অভেদ্য পর্দা দিয়ে রেখেছেন যা ভেদ করে কখনও দুই সাগরের পানি পরস্পরের সাথে মিশে যায় না। আমরা চতুর্থ দিন কলম্বো বন্দরে পৌঁছি। কলম্বো বন্দরটা দেখলাম আমাদের চাটগাঁ বন্দরের মত নয়। মূল বন্দর থেকে বেশ দূরে জাহাজ নোঙ্গর করে। সেখান থেকে ছোট ছোট বোটে করে তীরে পৌঁছাতে হয়। কলম্বো বন্দরে টিবি জয়ার নেতৃত্বে মুসলিম লীগ কর্মীরা মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ, সিংহল জিন্দাবাদ বলে আমাদের স্বাগত জানায়।

কলম্বোয় আমরা জাহাজেই থাকতাম। সকাল বেলায় বেরিয়ে যেতাম আবার সন্ধ্যায় জাহাজে ফিরে আসতাম।
কলম্বো শহরটা দেখতে ছবির মত। মনে হল যেন নিসর্গের মধ্যে শহরটা গড়ে উঠেছে। তখনই দেখেছিলাম সিংহলীরা সবাই শিক্ষিত। রাস্তার ঝাড়ুদারও দেখেছি পথের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সংবাদপত্র পাঠ করছে। সেই সাথে পেয়েছি সিংহলীদের মধ্যে রুচিবোধের পরিচয়।
আমরা প্রথম দিন বিকেলের দিকে পৌঁছেছিলাম। ওখানকার মুসলিম লীগের উদ্যোগেই আমাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হয়েছিল। দেখলাম সিংহলীরা তরকারীতে খুব নারকেল খায়। ঝালের কথা না বলাই ভাল। দ্বিতীয় দিন সমুদ্রের ধারেই গফুর ম্যানশনে সম্মেলন হয়েছিল। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার প্রতিনিধিরা বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল দুই দেশের মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধনকে উজ্জীবিত করা। পাকিস্তানীদের পক্ষ থেকে আমি, আখতার আহাদ ও রোখসানা বক্তৃতা করেছিলেম। শ্রীলঙ্কার পক্ষ থেকে টিবি জয়া ও প্রফেসর মাহমুদ কিছু কথা বলেছিলেন। শ্রীলঙ্কায় পাকিস্তানের হাইকমিশনার সেলিম খানও সম্মেলনে বক্তৃতা করেছিলেন।

সম্মেলন শেষে আমরা পুরো কলম্বো শহর ঘুরে দেখেছি। শ্রীলঙ্কায় সে সময় মুসলমানের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় আট ভাগ। এরা সবাই ছিল সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। তারা সবাই নানা ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে জড়িত। পাকিস্তান হওয়ার পর, আমার মনে পড়ছে, সিংহলের এক মুসলিম ব্যবসায়ী প্রথম ঢাকায় এসে নওয়াবপুরে কাসিম জুয়েলার্স নামে এক সোনার দোকান দিয়েছিলেন। তখন কোন মুসলমান সোনার ব্যবসায়ী ছিল না। সিংহলের আরব বংশোদ্ভুত মুসলমানদের চেহারা দেখতে টকটকে ফর্সা। স্থানীয় মুসলমানদের গায়ের রং গৌরবর্ণ। সিংহলে অনেকগুলো সুন্দর মসজিদ দেখেছি।

একদিন সিংহলের মুসলিম লীগ কর্মীরা আমাদেরকে আদমের পাহাড়ে (Adam’s Peak) নিয়ে যান। বেহেশত থেকে পৃথিবীতে এসে এ পাহাড়ের উপরই হযরত আদম (আঃ)-এর আগমণ ঘটেছিল বলে সবার বিশ্বাস। হযরত আদম (আঃ) থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে বিবি হাওয়া পড়েছিলেন বর্তমান সৌদি আরবের জেদ্দায়। পাহাড়টা প্রায় ৩৫০০ ফুট উঁচু হবে। মুসলমান ছাড়াও দেখলাম খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধরাও এ পাহাড়টাকে খুব সম্মান দেখান। এরপর আমরা গিয়েছিলাম কলম্বোর জাতীয় মিউজিয়ামে। গৌতম বুদ্ধের নানা ভঙ্গির মূর্তিতে মিউজিয়াম ছিল ভর্তি। সেখানে তার চুল, পায়ের ছাপ সব কিছুই খুব সযত্নে রাখা হয়েছে।

বৌদ্ধ গাইডকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমরা রামায়ণের কাহিনী পড়েছি। রাম-রাবণের কথা শুনছি। তাঁদের কোন স্মৃতি-চিহ্ন এ দেশে আছে কিনা?
সে হেসে উড়িয়ে দিল। বলল পুরো কাহিনীটাই আজগুবি। এটা কবির কল্পনাপ্রসূত। রাবণ বলে কেউ ইতিহাসে ছিলেন না। আর তিনি সিংহলেও কোনদিন আসেননি। উল্টো সে আমাকে বলল শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধ এত বেশী হওয়ার কারণ কি জান? ভারতে হিন্দুদের নির্মম অত্যাচারের মুখে বৌদ্ধরা এখানে পালিয়ে এসে প্রাণ বাঁচিয়েছিল।

সিংহলে যে কয়েকদিন ছিলাম তার মধ্যে একদিন আমরা যাইদিয়া মুসলিম ইউনিভার্সিটি দেখতে যাই। এটা সিংহলের মুসলামনরা নিজেদের চেষ্টায় গড়ে তুলেছিল। কলম্বো শহরে মুক্তার ব্যবসা খুব জমজমাট মনে হল। এখানকার মুক্তা খুবই বিখ্যাত। সিংহলে হাতির দাঁতের জিনিসপত্রও খুব সস্তা। সিংহলের আনারসের আকার দেখে অবাক হয়েছিলাম, এক একটা প্রায় ৫ কেজি। সিংহল টিও দেখলাম খুব নামকরা। আমরা যখন চলে আসি তখন আমাদের প্রত্যেককে হাতির দাঁত ও মুক্তার কাজ করার খুব সুন্দর সিংহলের মানচিত্র উপহার দেয়া হয়েছিল।
জাহাজে করে এবার আমরা করাচী চললাম। আসার পথে শুনেছিলাম সমুদ্রের অনেক ভৌতিক কাহিনী। সমুদ্রের ভিতরে নাকি তাদের অদ্ভুত হাত দিয়ে জাহাজ যাত্রীদের ডাকে। অদ্ভুত গলার স্বর করে মানুষকে ভয় দেখায়। কিন্তু এসব কিছুই আমাদের নজরে পড়ল না। নির্বিঘ্নে করাচী পৌঁছেছিলাম। করাচী বন্দরে আমাদের অভিনন্দন জানাতে এসেছিলেন সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রী ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন। ন্যাশনাল গার্ডের কর্মীরাও ছিল। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল করাচীর একটা কলেজ বিল্ডিংয়ে। করাচীর বাইরের প্রতিনিধিরাও আমাদের সাথে জায়গা নিয়েছিলেন।
আমাদের কাউন্সিল মিটিং হয়েছিল করাচীর বিখ্যাত খালেকদীনা হলে। এতদিন মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন চৌধুরী খালিকুজ্জামান। কাউন্সিল মিটিং-এ নতুন সভাপতি নির্বাচিত হন সর্দার আবদুর রব নিশতার। এ মিটিং-এ পূর্ব পাকিস্তান থেকে মূখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীন হাজির হয়েছিলেন। সিন্ধুর মূখ্যমন্ত্রী ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন, পাঞ্জাবের মূখ্যমন্ত্রী মিয়া মমতাজ দৌলতানা, সীমান্ত প্রদেশের মূখ্যমন্ত্রী খান আবদুল কাইয়ুম খান এবং বেলুচিস্তানের মুসলিম লীগ নেতা কাজী মোহাম্মদ ঈসা উপস্থিত ছিলেন।

করাচী শহর দেখলাম তখন কেবল গড়ে উঠছে। একটি প্রাদেশিক রাজধানী থেকে হঠাৎ করে একটি দেশের রাজধানীতে পরিণত হয় করাচী। রাজধানীর অতিরিক্ত বোঝা তখন বহন করা করাচীর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ছিল। তার উপর ভারত থেকে আগত হাজার হাজার মুহাজির করাচী শহর ছেয়ে ফেলেছে। করাচীতে আর একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম ঢাকার মতই প্রচুর টিনশেডের আশ্রয় তৈরী করে অফিসের কাজকর্ম চলছে।

সর্দার আব্দুর রব নিশতার ছিলেন পাঠান। দেখতে অত্যন্ত সুপুরুষ। যেমন উঁচু, তেমনি গায়ের রং কমলা লেবুর মত পরিষ্কার। তাঁর পাকানো মোচটা ছিল খুব আকর্ষনীয়। মুসলিম লীগের এই ত্যাগী পুরুষ পাকিস্তান আন্দোলনে কায়েদে আযমের অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহচর ছিলেন। ১৯৪৬ সালে ভারতে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তিনি ছিলেন তার অন্যতম সদস্য। কাউন্সিল মিটিং-এ একটা সুন্দর ঘটনার কথা মনে পড়ছে। নিশতার সাহেব তখন নতুন কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্যদের সবার পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেলেন। মোমেনশাহীর গিয়াসউদ্দীন পাঠান মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। তিনি ছিলেন ছোটখাটো আকৃতির। আমাদের পাশে বসেছিলেন সীমান্ত প্রদেশের উঁচু লম্বা পাঠান কাউন্সিলার ভাইয়েরা। তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেবার সময় পাঠান ভাইরা হাসতে হাসতে বলছিলেন, ইয়ে বহুত ছোটা পাঠান হ্যায়। দপ্তর সম্পাদক যিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি ছিলেন প্রবীণ মুসলিম লীগার, খুব বয়স্ক ব্যক্তি ছিলেন তিনি। কায়েদে আযমের সময় থেকেই তিনি দফতর সম্পাদকের কাজ করে আসছিলেন। তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেবার সময় নিশতার সাহেব যে কথাটা বলেছিলেন তা এখনও আমার কানে বাজছে। তিনি বলেছিলেন, ইয়ে আদমী যব গুজারতা হ্যায় তব রোগ বোলতে হ্যায় মুসলিম লীগ যা রাহা হ্যায়। হাম চাহতে হ্যায় আপলোগ ভি যাঁহা যায়ে তো আদমী কহেকে মুসলিম লীগ যা রাহা হ্যায় হাম চাহতে হায় আপলোক হামারে ইয়ে সেক্রেটারীকে তরা চলতা ফিরতা মুসলিম লীগ বন যায়ে।

নিশতার সাহেব তাঁর বক্তৃতায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছিলেন। পাকিস্তানের দুই অংশের কোথাও যদি মুসলিম লীগ দুর্বল হয়ে যায় পাকিস্তানের উভয় অংশের ঐক্য বজায় রাখা যাবে না।
কাউন্সিল মিটিংয়ের পর আমরা সবাই মিলে কায়েদে আযমের মাজার জিয়ারত করতে গিয়েছিলাম। একদিন নাজিমুদ্দীন গভর্ণর জেনারেল হাউসে মুসলিম লীগ কাউন্সিলরদের নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কায়েদে আযম ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত এ বাড়ীতেই থাকতেন। পরে নাজিমুদ্দীন এখানে ওঠেন।

করাচী থাকতে একদিন আমরা পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিরা ফাতেমা জিন্নার সাথে দেখা করতে যাই। কায়েদে আযমের বোন হিসেবে তাঁর প্রতি আমাদের বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল। তিনি মুসলিম লীগকে গড়ে তোলবার জন্য আমাদের অনুপ্রাণিত করেন। বিশেষ করে তরুণ কর্মীদের তিনি উপদেশ দেন: Build up your career, earn money then join Politics.

আমাদের মধ্যে শাহ আজিজকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, তোমার কথা আমি শুনেছি, তুমি ভাল করে ওকালতি পড়ো। আশা করি মুসলিম লীগের জন্য তুমি অনেক কিছু করতে পারবে। শাহ আজিজ তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আইন অধ্যয়ন করছিলেন।

করাচীতে আমরা সপ্তাহ খানেক ছিলাম। নৌ-বাহিনীর আর একটি জাহাজে করে সিংহল হয়ে আমরা চাটগাঁয় ফিরে আসি। ১৯৫১ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানের জন্য একটি দুঃখজনক অধ্যায় অপেক্ষা করছিল। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৬ই অক্টোবর রাওয়ালপিন্ডির এক জনসভায় বক্তৃতারত অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে শহীদ হন। লিয়াকত আলী খানের মৃত্যু পাকিস্তানকে দুর্বল করেছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। কায়েদে আযমের ইন্তেকালের পর দুর্বল পাকিস্তানের হাল তিনি শক্ত করে না ধরলে কি হত বলা মুশকিল।

পাকিস্তান আন্দোলনে লিয়াকত আলী খান কায়েদে আযমের পাশে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যেভাবে এসে দাঁড়িয়েছিলেন তার তুলনা নেই।



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh