Home EBooks ফেলে আসা দিনগুলো

eBooks

Latest Comments

ফেলে আসা দিনগুলো - অধ্যায় ৮ PDF Print E-mail
Written by ইব্রাহিম হোসেন   
Sunday, 02 November 2003 20:38
Article Index
ফেলে আসা দিনগুলো
অধ্যায় ১
অধ্যায় ২
অধ্যায় ৩
অধ্যায় ৪
অধ্যয় ৫
অধ্যায় ৬
অধ্যায় ৭
অধ্যায় ৮
অধ্যায় ৯
অধ্যায় ১০
অধ্যায় ১১
অধ্যায় ১২
অধ্যায় ১৩
অধ্যায় ১৪
অধ্যায় ১৫
অধ্যায় ১৬
অধ্যায় ১৭
অধ্যায় ১৮
অধ্যায় ১৯
অধ্যায় ২০
অধ্যায় ২১
All Pages

১৯৪৬ সালে ভারতের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে লিয়াকত আলী খান ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। কংগ্রেসের হিন্দু নেতাদের ধারণা ছিল মুসলমানদের পক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয় চালানো সম্ভব হবে না। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে যখন লিয়াকত আলী খান পরিষদে বাজেট পেশ করেছিলেন তখন কংগ্রেস  নেতারা থ’ মেরে যান। লিয়াকত আলী খান এ বাজেটকে নাম দিয়েছিলেন ‘গরীবের বাজেট’। হিন্দু ব্যবসায়ীদের ওপর তিনি ট্যাক্স ধার্য করে কংগ্রেসকে যথেষ্ট নাকানি-চুবানি খাইয়েছিলেন। এ সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল নাকি বলেছিলেন ‘এভাবে আর চলা যায় না। এর চেয়ে ভাগ হয়ে যাওয়াই ভাল’।

লিয়াকত আলী খানের পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন খাজা নাজিমুদ্দীন। ১৯৫২ সালের জানুয়ারী মাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি ঢাকায় আসেন। ২৭ তারিখ পল্টন ময়দানে তিনি ভাষণ দেন। ভাষণ দেয়ার আগ পর্যন্ত আমরা বুঝতে পারিনি তিনি বক্তৃতায় রাষ্ট্রভাষার কথা বলবেন। কায়েদে আযমের অনুকরণ করে তিনিও বলেছিলেন উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। আমার মনে হয়েছে তিনি একথাটা তখনকার পরিস্থিতিতে না বললেও পারতেন।

আর মুসলিম লীগ বিরোধীরা যেন এ রকম একটা কথা শোনার জন্যই অপেক্ষা করছিল। এতদিন নূরুল আমীনের বিরুদ্ধে ক্ষমতা বঞ্চিত মুসলিম লীগের নেতা ও কর্মীরা-যারা আওয়ামী লীগ গঠন করে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি-এখন তারাই রাষ্ট্রভাষার দাবীতে মাঠে নেমে পড়ল।
১৯৪৮ সালে কায়েদে আযম চলে যাবার পর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ঝিমিয়ে পড়ে। এর কিছু কারণ ছিল। তাৎক্ষণিকভাবে তিনি প্রাদেশিক পরিষদে রাষ্ট্রভাষার সমর্থনকারী কয়েকজনকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিলেন, এ কথা আগেই বলেছি। তাছাড়া জনগণ যখন দেখল তাদের নেতা কায়েদে আযমই ভাষার ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করেছেন তখন ইউনিভার্সিটির কিছু তরুণ ছাত্রের ভাষার দাবী-দাওয়া নিয়ে তারা এত মাথা ঘামায়নি। ভাষা আন্দোলনকারীরাও তেমন কোন জনসমর্থন পায়নি।

নাজিমুদ্দীনের ঘোষণার প্রেক্ষিতে নতুন করে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। তারা ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী হরতাল আহ্বান করে। ঐদিন পরিষদে বাজেট পেশ হওয়ার কথা ছিল। খুব ভেবে-চিন্তে ভাষা আন্দোলনকারীরা এই দিনটি বেছে নেয়। সরকার গন্ডগোল হতে পারে আশংকায় ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারী করেছিল। ভাষা আন্দোলনকারীরা ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা চেয়েছিল তখনকার জগন্নাথ হলের পরিষদ ভবনে হামলা চালিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে। ইউনিভার্সিটির দিক থেকে তারা ১৪৪ ধারা ভাঙতে পারেনি। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দিক থেকে তারা ১৪৪ ধারা ভাঙতে এগিয়ে আসে। পুলিশকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মত তারা ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে চলছিল। আমি বলব পুলিশ সেদিন অতর্কিতে হামলা চালায়নি। পুলিশের সাথে সেদিন রীতিমত ভাষা আন্দোলনকারীদের ছোটখাট যুদ্ধ হয়ে যায়। পুলিশ প্রথমে টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ে-তাতে কোন কাজ হয়নি। ভাষা আন্দোলনকারীদের হামলায় বারবার পুলিশ আত্মরক্ষার জন্য পিছিয়েও গিয়েছিল। এক পর্যায়ে পুলিশ উপায়ান্তর না দেখে গুলি চালায়। গুলির আদেশ দিয়েছিলেন ঢাকার এসপি মাসুদ। গুলিতে কয়েকটি ছেলে মারা যায়। এরাই পরবর্তীকালে ভাষা আন্দোলনের শহীদ সালাম, জব্বার, বরকত, শফিক নামে পরিচিত।

এরা কেউ ভাষা আন্দোলনের সাথে মোটেই জড়িত ছিল না। সালাম ছিল একটা অফিসের পিয়ন। নোয়াখালীর ছেলে সালাম ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছিল। জব্বার ছিল দর্জি। তাঁর বাড়ি ছিল গফরগাঁয়ে। রফিক এসেছিল ঢাকায় বেড়াতে। সে দেবেন্দ্র কলেজের আইকম ক্লাসে পড়ত।
বরকত ও শফিকের আদি নিবাস ছিল ভারতের মুর্শিদাবাদে। পাকিস্তান হওয়ার পর তারা ঢাকায় চলে আসে। বরকত ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ত। শফিউর ছিল খুবই গরিব ঘরের ছেলে। ২১ তারিখের ঘটনার সূত্র ধরে ২২ তারিখেও বেশ গন্ডগোল হয়। ঢাকার নওয়াবপুর রোডে গোলাগুলির সময় শফিউর মারা যায়। ঢাকার নওয়াব পুরে আরও যারা নিহত হয়েছিল তারা হল হাবিবুল্লাহ নামে এক রাজমিস্ত্রীর ছেলে, অলিউল্লাহ রহীম নামে এক রিক্সাওয়ালা।

আমি তখন ঢাকা রিক্সা ইউনিয়নের সভাপতি। আমি তাকে চিনতাম। তার পেটে গুলি লেগেছিল। রিক্সা চালিয়ে আসার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। আমি তাকে নিজে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু পথেই সে মারা যায়। ভাষা আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছিল তাদের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থান ছিল অস্বচ্ছল। কোন আন্দোলন করার যোগ্যতাও তাদের ছিল না। ভাষা আন্দোলন যে কি জিনিস তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা থেকেও ধারণা করা স্বাভাবিক, এটা তাদের বুঝার কথা নয়। আসলে পূর্ব পাকিস্তানে তখন যে লাশের রাজনীতি শুরু হল তার স্রোতে এরা হিরো বনে গেলো। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার ঢাকা হাইকোর্টের ইংরেজ বিচারপতি এলিসকে চেয়ারম্যান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ইংরেজ বিচারপতি তাঁর রায়ে বলেছিলেন-পুলিশকে গুলি করতে বাধ্য করা হয়েছিল।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে যেখানে গোলাগুলি হয়েছিল সেখানে ভাষা আন্দোলনকারীরা একটা স্মৃতি স্তম্ভ বানায়। এটাই হল শহীদ মিনার। এই স্তম্ভকে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে এক অদ্ভুত কালচার আমদানী হল। যা এ দেশের মানুষ ইতোপূর্বে কখনও দেখেনি। এটাকেই আস্তে আস্তে বলা হতে লাগল বাঙ্গালীর সংস্কৃতি। প্রতিবছর ২১শে ফেব্রুয়ারী দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিট থেকেই প্রভাত ফেরির প্রচলন শুরু হল। ছেলেমেয়ে একত্রে মিলে নগ্ন পায়ে স্মৃতি স্তম্ভে ফুল দেয়া শুরু করল। তারা এর পাদদেশে আল্পনা আঁকতে থাকল। পাদদেশকে এখন বলা হয় বেদি। যা হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজারই অনুকরণ। আগে আল্পনা আঁকত মন্দিরে। মন্দিরের দেয়ালে বিগ্রহ যেখানে বসানো হয় সেই বেদিতে যে আঁকাজোখা করা হত তাকেই বলা হত আলপনা। সেই আলপনা এখন মুসলমান সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে ভাষা আন্দোলনকে ভয় করে। ভাষা আন্দোলনের এই এত ঘটনার মধ্যেও কিন্তু শেখ মুজিব নিজেকে বিস্ময়করভাবে দূরে রেখেছিলেন। এর কারণ মুজিবের নেতা সোহরাওয়ার্দীর বাংলা ভাষার ব্যাপারে আদৌ উৎসাহ ছিল না। আগেই বলেছি তিনি ছিলেন উর্দূভাষী। ফজলুল হকেরও বাংলা ভাষার ব্যাপারে আগ্রহটা কম ছিল। তিনি বাংলাভাষী ছিলেন ঠিক কিন্তু সারাজীবন তিনি যে সব বৃত্তে ঘোরাফেরা করেছেন সেখানে উর্দু ও ইংরেজীর প্রচলনটাই ছিল বেশী।

১৯৩৮ সালের ১লা অক্টোবর All Indian Muslim Educational Conference-এর সভাপতির ভাষণে ফজলুল হক উর্দুকে সারা ভারতের যোগাযোগের ভাষা (Lingua-Franca) হিসেবে গ্রহণ করবার দাবী করেছিলেন। আসলে ব্রিটিশ ভারতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করবার কথা কেউ ভাবতে পারেনি। বাঙ্গালী কবি রবীন্দ্রনাথও হিন্দিকে ভারতের রাষ্ট্রভাষা করার জোর ওকালতি করেছিলেন।

২১শে ফেব্রুয়ারীর ঘটনার পর মোহন মিয়া ফরিদপুর থেকে ঢাকায় আসেন। আমরা তাঁর সাথে গিয়ে নূরুল আমীনের সাথে দেখা করি।
আমাদের হয়ে মোহন মিয়াই তাঁকে বললেন দেশের কি সর্বনাশ হচ্ছে। আন্দোলনের গতি প্রবাহতো ভারতের হাতেই চলে যাচ্ছে।
নূরুল আমীন তখন আক্ষেপ করে বললেন: মোহন মিয়া, দেশের মানুষ যদি সর্বনাশ চায় তবে তুমি আমি আর ইব্রাহিম কি কিছু করতে পারব? দেশের মানুষ যদি দেশকে রক্ষা না করে তাহলে আমরা কতটুকু কি করতে পারি। দেশ তো শুধু তোমার আমার না-দেশ তাদেরও। দেশের মানুষ হিন্দুদের অত্যাচরের কথা যদি এত তাড়াতাড়ি ভুলে যায়, দু’শ বছরের লাঞ্ছনার কথা যদি মনে না রাখে তবে আমরা কিছুই করতে পারব না। দেশের মানুষ যদি আত্মহত্যা করতে চায় আমরা কি তা ঠেকাতে পারব?



 

Comments  

 
+1 # 2014-02-28 13:32
Its true history....I salute this
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-03-09 11:59
Thanks to Allah.I'm really proud to be a Muslim. I've lost word & don't know how to admire the almighty Allah. May almighty Allah keep my father in peace and harmony.
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
0 # 2014-09-24 05:03
আসসালামু আলাইকুম শ্রদ্ধেয় লেখক,
আপনার বইটি পড়ে ইতিহাসের যে বিষয় নিয়ে Confusion তৈরী হয়েছে তা পুরোপরি দূর হয়ে গেছে। তবে যে সত্য উপলদ্ধি করেছি, তা নতুন প্রজমকে জানানোর একটা তাগিদ অনুভব করছি। কিন্তু কিভাবে করব তা বুঝে উঠতে পারছিনা। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি যে গোয়েবসলীয় তত্বের উপর প্রতিষ্টিত তা পানির মত পরিষ্কার। সেই তত্ত্বের মত করেই একটি সামাজিক আন্দোলন হওয়া দরকার। আপনি কেমন আছেন, কোথায় আছেন আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করে,সরাসরি পা ছুয়ে সালাম দিতে ইচ্ছে। আল্লাগ আপনাকে ভাল রাখুক। ধন্যবাদ মাজহার
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh