Home EBooks অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের ইতিহাস

eBooks

Latest Comments

বাংলাদেশঃ মারাত্মক অপপ্রচারণা, ষড়যন্ত্র ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকার - অধ্যায় ১: তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য সম্পর্কিত অলীক কাহিনী ও স্বায়ত্বশাসনের দাবী প্রসঙ্গ PDF Print E-mail
Written by এম, টি, হোসেন   
Friday, 15 November 1996 02:00
Article Index
বাংলাদেশঃ মারাত্মক অপপ্রচারণা, ষড়যন্ত্র ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের শিকার
অধ্যায় ১: তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য সম্পর্কিত অলীক কাহিনী ও স্বায়ত্বশাসনের দাবী প্রসঙ্গ
অধ্যায় ২: ভারতীয় ষড়যন্ত্রের সহায়তায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অর্জন ১৯৭১ সালের বাংলাদেশঃ পরবর্তীতে কী?
অধ্যায় ৩: ১৯৭১ সালের পর থেকে একাত্তরের হত্যাকান্ডের একপেশে কল্পকাহিনী ও মিথ্যাচার
অধ্যায় ৪: বাংলাদেশে মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও স্বার্থ সংঘাতের গতি-প্রকৃতি
অধ্যায় ৫: একবিংশ শতাব্দীর ভারতীয় আধিপত্যঃ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উভয় সংকট
All Pages

তদানীন্তন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার বৈষম্য সম্পর্কিত অলীক কাহিনী ও স্বায়ত্বশাসনের দাবী প্রসঙ্গ

পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার পিছনে প্রধান যে তত্ত্বকথা ও যুক্তি দাঁড় করানো হয়েছিল তা ছিল দু’অঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষেত্রের দৃশ্যমান বৈষম্য ও বিভিন্নতা এবং পূর্ব পাকিস্তানকে দেখানো হয় পশ্চিম পাকিস্তানী জনগোষ্ঠীর শোষণের ক্ষেত্র হিসেবে। পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন না থাকার বিষয়টিকেও সেই কল্পিত বৈষম্যের প্রচারণার সাথে যুক্ত করা হয়।

আপাতদৃষ্টে বৈষম্যের যে চালচিত্র দেখানো হয়, ষাট-এর দশকের শেষ দিকে প্রাপ্ত কিছু সংখ্যা ও সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে। এর মধ্যে উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের তথা কেন্দ্রীয় সুপিরিয়ার সার্ভিস (সিএসএস) ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব তুলনামূলকভাবে কম থাকা। উপস্থাপিত পরিসংখ্যানে এটাও দেখানো হয় যে, পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় উন্নয়ন খাতে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য কম অর্থ বরাদ্দ করা। যদিও উপস্থাপিত ঐ পরিসংখ্যান অসত্য ছিলনা; কিন্তু জনগণের সামনে যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং প্রচারণা সেই পরিসংখ্যান নিয়ে চালানো হয়েছে, তা মোটেই সত্যি ও বাস্তব নির্ভর ছিল না। ঐসব পরিসংখ্যানকেন্দ্রিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও প্রচারণা সর্বোতভাবে সত্যি ছিল না; হয়তো কিয়দাংশ ছিল ব্যতিক্রম এবং তাও ছিল অর্ধ সত্য।

সীমারেখা

কোন ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ এবং প্রকৃত অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ কখনও করা সম্ভব নয়, যদি সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীর ব্যাপক তথ্যপঞ্জী নির্দেশিত না হয়; বিশেষত যথার্থ ও বাস্তব সীমারেখা র্নিনীত না হয়। আসলে বিশ্বাসযোগ্য কোন বিশ্লেষণ এক দেশদর্শী দর্শন দিয়ে সম্ভব নয় এবং সম্ভব নয় কোন শুন্যতার মধ্যেও। দুর্ভাগ্যবশতঃ পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করার পুরো থিসিসটাই এর উদগাতারা প্রণয়ন করে ব্যাপক ভিত্তিক কোন তথ্যপঞ্জী নির্ভর সীমারেখা ছাড়াই। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান ছিল বাস্তবে দুটি অসম ভৌগলিক অবয়ব। কিন্তু ১৯৪৭ সনে পাকিস্তান হবার সময় এই দুটি অসম ভৌগলিক অবয়বকে অস্বীকার করে দুটির সামগ্রিক কাঠামোর সমস্যা চিহ্নিত করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান- যা ব্রিটিশ আমলে পূর্ব বাংলা নামে পরিচিত ছিল এবং যা তদানীন্তন ভারতের যে কোন অঞ্চলের চাইতে ছিল পশ্চাদপদ, যা কারুরই অজানা থাকার কথা নয়। পূর্ব পাকিস্তানের নতুন রাজধানী ঢাকার সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের করাচী, লাহোর ও অন্যান্য শহরের একটি তুলনা করতে গিয়ে এক সময়ের পূর্ব বাংলা সম্পর্কে অনেক অভিজ্ঞ সাংবাদিক-লেখক এইচ.এম আব্বাসী লিখেন: ‘ঢাকা যখন রাজধানীতে পরিণত হয় তখন সেখানে মুসলমান কিংবা হিন্দু মালিকানায় একটি সংবাদপত্রও প্রকাশিত হতোনা। মাত্র ৫ ওয়াটের একটি রেডিও ষ্টেশন ছিল এবং বেশ কয়েক বছর সময় লাগে সেখান থেকে বাংলা দৈনিক আজাদ ও ইংরেজী দৈনিক মনিং নিউজ প্রকাশনা শুরু হতে। আমার একটা বড় দায়িত্ব ছিল পত্রিকার ছবি ব্লক করে করাচী থেকে বিমান যোগে তা ঢাকায় প্রেরণ করা যা নতুন ইংরেজী দৈনিক অবজারভার-এ প্রকাশিত হতো অর্থাৎ ঢাকায় ব্লক বানানোর কোন মেশিনও ছিল না। [এইচ,এম, আব্বাসী (অনলুকার-এ জার্নালিষ্ট), ওভার এ কাপ অব টী, মাশহুর অফসেট প্রেস, করাচী, ১৯৭৪ পৃ : ৪৬২]

এটা রীতিমত অবিশ্বাস্যকর। পূর্ব পাকিস্তান তার জীবন শুরু করে বলা যায় সম্পূর্ণ পথ হাতড়িয়ে, অর্থনৈতিক ও শিল্প ক্ষেত্রে প্রদেশটির কোনই অবকাঠামো ছিল না। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তান ছিল মোটামোটি শিল্প সমৃদ্ধ এবং ছিল সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অব কাঠামো। অর্থাৎ সর্বক্ষেত্রে সর্ব বিবেচনায় পশ্চিম পাকিস্তান ছিল পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় অনেক অগ্রসর।’

উৎপাদনশীলতা

বস্তুতঃ একটি দেশের জনগোষ্ঠীর অভ্যাস ও দৃষ্টিভঙ্গীর উপর সে দেশের উৎপাদন ও উন্নয়নশীল কাজকর্ম নির্ভরশীল। এই ক্ষেত্রে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের আচার, অভ্যাস-এ ছিল মৌলিক ও দুস্তর ব্যবধান; যা আজও একই অবস্থায় রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানীরা ছিল অভ্যাসে অলস প্রকৃতির আর পশ্চিম পাকিস্তানীরা হচ্ছে অভ্যাসগতভাবে অত্যন্ত পরিশ্রমী। যে কোন ধরণের বিজ্ঞানসম্মত এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিতে হবে। কিন্তু এই বাস্তবতা পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে স্পষ্টতই মনে হয় যে, সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবীদ ও তাদের অনুসারীরা সেই বিষয়টি আমলে নেয়নি অথবা কথিত বৈষম্য বা শোষণ বন্ধের দিকে দৃষ্টি না দিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে সেই বাস্তবতা অস্বীকার করা হয়। পরবর্তী অংশে আমি এই সব বিষয়ে আলোকপাত করবো এবং বিশেষভাবে আলোকপাত করবো পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত ২৩ বছর ধরে পূর্ব পাকিস্তানকে তথাকথিত শোষণ করার রহস্য উদঘাটনের দিকে।

বিবেচনার ভিত্তি সাল-১৯৪৭


১৯৪৭ সালের বাস্তব চিত্র কি ছিল? পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উভয় অংশের জনগনই ছিল গরীব। বৃটিশ যুগের পূর্ব বাংলায় বসতি স্থাপনকারীদের জীবনের মান ছিল অতি নীচে। এর সুস্পষ্ট কারণ ছিল পূর্ব বাংলা বৃটিশদের কলোনী হিসেবে শোষিত ও নিগৃহীত হয়েছে ১৯০ বছর তথা ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত।

পক্ষান্তরে পশ্চিম পাকিস্তান অঞ্চলে বৃটিশদের কলোনী ও শোষণের সময়কাল ছিল ৯০ বছর। প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ১৮৫৮ সালে বৃটিশ রাণী ভিক্টোরিয়া পুরো ভারতের কর্তৃত্ব গ্রহণের পর থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত। এটা মোটেই অবিশ্বাস্য নয় যে, বৃটিশদের শাসনামলে পূর্ব বাংলা অর্থনৈতিকভাবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অনেক বেশী শোষিত ও নিগৃহীত হয়েছিল। বিদেশী শাসন-শোষণ ছাড়াও পূর্ব বাংলার জনসাধারণ তাদের স্বদেশীদের দ্বারাও বৃটিশ শোষণ থেকে কম নির্যাতিত ও শোষিত হয়নি। জনসংখ্যার অধিকাংশ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ভূমির প্রায় নিরঙ্কুশ মালিকানা ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দুদের। ১৯৪৭ সাল নাগাদ তারা ৮০ শতাংশ ভূমির মালিক ছিল। [ঐ পৃ: ৪৬১ পোট্রেট অব এ মার্টায়ার জাইকো পাবলিশিং হাউস, বোম্বে, ১৯৬৯ বইতে বি, মাধোক তা উদ্ধৃত করেন]

এই পরিসংখ্যান কোন কল্পিত কিছু নয়। এটা সেই সময়কার হিন্দু মহাসভার নেতা ডা. শ্যামা প্রসাদ মুখার্জীর প্রদত্ত তথ্য থেকেই পাওয়া যায়। বৃটিশ শাসনামলে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের ব্রিটিশ সিভিল সার্ভিস সহ কোন উচ্চ শিক্ষা সম্পর্কিত পেশায় প্রবেশের সুযোগ ছিল না এবং সেনাবাহিনীতে ছিল একেবারেই নগন্য সংখ্যক পূর্ব বাংলার মুসলমান।

১৭৫৭ সালে পলাশী বিপর্যয়ের পর

রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কিত বিষয়াদি পূর্ব বাংলার জন্য কোন অকস্মাৎ ঘটনাপ্রবাহ ছিলনা। বস্তুতঃ এটা ছিল এক ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া- যার পূর্ণতা রূপ লাভ করে ১৭৫৭ সালের পলাশী যুদ্ধে। সেই যুদ্ধে পূর্ব বাংলায় মুসলিম শাসনের পতন ও অবক্ষয়ের সূচনা করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানোর পাশাপাশি তারা তাদের অর্থনৈতিক ক্ষমতাও হারায়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পূর্ব বাংলার মুসলমানদের জীবনে চরম দুরাবস্থা ও বিপর্যয়ের সৃষ্টি করে। এক সময়ের খাজনা আদায়কারীরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সুবাধে রাতারাতি স্থায়ী জমিদারে পরিণত হয়। তারা বছর প্রতি অতি নগণ্য পরিমাণ অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে প্রচুর ভূ সম্পত্তির মালিক বনে গিয়ে সামন্ত প্রথার দ্বারা গরীব কৃষকদের জীবনে অবৈধ শোষক-এর স্থান লাভ করে। এই নতুন ভূ-সম্পত্তির মালিক শ্রেণী ছিল হিন্দুরা। তারা পূর্ব বাংলার কৃষকদের নিষ্ঠুরভাবে শোষণ করে। কৃষকদের মধ্যে বিশেষত ছোট-খাট ভূ-সম্পত্তির মালিকদের মধ্যে বিরাট অংশ ছিল মুসলমান যারা অল্পকালের মধ্যেই তাদের ভূ-সম্পত্তি হারিয়ে জমি হারা সাধারণ কৃষকে পরিণত হয়। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে রায়ত (সাধারণ মানুষ) দেরকে জমিদারদের শোষণ নির্যাতন থেকে রক্ষার কোন ব্যবস্থাই রাখেনি। যার ফলে পূর্ব বাংলার কৃষকরা মারাত্মক শোষণ ও নির্যাতনে সর্বশ্রান্ত হয়ে পড়ে। বিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে স্থাপিত ঋণ সালিসী বোর্ড তাদের এই দুরাবস্থা নিরসনে কিছুটা স্বস্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

১৯৪৭ সালে তুলনামূলকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের ভাল অবস্থা

বৃটিশ শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানের ভূমি ভোগদখল ব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নতর। সেখানে পূর্ব থেকেই একটি শক্তিশালী সামন্ত শ্রেণী ছিল, যারা সেখানকার কৃষক সম্প্রদায়কে নানাবিধভাবে শোষণ করতো। তবে সেখানকার কৃষক সম্প্রদায়ের কিছুটা অনুকূল অবস্থাও ছিল। তাদের জীবন ব্যবস্থায় ছিল অত্যন্ত গতিময়তা। ফলে কোন এলাকা তাদের জীবন-ধারণের জন্য কষ্টকর হয়ে উঠলে তারা নতুন চাষযোগ্য ও চারণ ভূমিতে স্থানান্তরিত হতে পারতো; কেননা পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষক সম্প্রদায় সেখানকার সামন্ত শ্রেণীর শোষণ পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক সম্প্রদায়ের তখানকার জমিদার শ্রেণীর শোষণের চাইতে কমই ভোগ করতো। অর্থাৎ বৃটিশ শাসনামলে পশ্চিম পাকিস্তানের কয়েক সম্প্রদায় পূর্ব পাকিস্তানের কৃষক সম্প্রদায়ের চাইতে অর্থনৈতিকভাবে ভাল অবস্থায় ছিল।

শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানদের অনগ্রসরতা

মুসলমানরা বৃটিশ আমলে সম্মানজনক কোন পেশা লাভের জন্য অপরিহার্য আধুনিক ইংরেজী শিক্ষা গ্রহণ না করায় তাদেরকে কৃষি কাজের উপরই নিজেদের জীবন নির্বাহ করতে হতো। সেই সময় মুসলমানদের পেশাগত অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে ১৯৪০ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলার স্যার আজিজুল হক এই মর্মে একটি তথ্য প্রদান করেন যে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল দুইজন বেতনভোগী মুসলমান কর্মচারী রয়েছেন। একজন তিনি নিজে আর একজন হচ্ছেন তার চাপরাশী। এটা হয়তো কোন বিবেচনায় অতিরগুন বলে মনে হলেও মুসলমানদের পেশাগত দুরাবস্থা যে কত চরমে পৌঁছেছিল তা নিয়ে তো সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

বস্তুতঃ একজন নিরাবেগ ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষক পরিস্থিতির একটা বিশ্বাসযোগ্য তুলনা নিরুপণের স্বার্থে কি এমন রূঢ় বাস্তব তথ্য বিসৃত হতে পারে? একজন পঙ্গু শিশুর উৎপাদনক্ষম যোগ্যতা এবং জীবনী শক্তির সাথে কি শারিরীকভাবে অত্যন্ত সামথ্যবান এবং মানসিকভাবে পরিপক্ক একজন বয়স্ক লোকের ক্ষমতা ও যোগ্যতার সাথে তুলনা হতে পারে ?

পূর্ব পাকিস্তানের প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং উৎপাদন ক্ষমতার বিপর্যয়

বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এবং সাইক্লোন-এর ধকল পূর্ব পাকিস্তানে নিয়মিতভাবে সংঘটিত হওয়ায় এর অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হবার বিষয় সর্বজনবিদিত। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ চরিত্রগতভাবে ছিল অলস যার পরিণাম ছিল অল্প উৎপাদনশীল অর্থনীতি। আবার উষ্ণ আবহাওয়াকে অত্যুল্প শিল্প কারখানা গড়ে তোলার জন্য দায়ী করা হবে প্রকৃত পরিস্থিতি থেকে দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে নেয়া। নতুন নতুন উদ্ভাবনমূখী শিল্প-কারখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ না থাকায় পূর্ব বাংলার উন্নয়নের গতি ছিল অত্যন্ত কম। কম উৎপাদনশীল পূর্ব বাংলার জনগণকে উৎপাদনশীল পশ্চিম পাকিস্তানীদের দ্বারা শোষণ করার অজুহাত ধোপে টেকার মত নয়; কেননা যারা নিজেদের খাওয়া পরার উপযোগী পরিমাণের চাইতে বেশী বা ঊদ্ধৃত্ত কোন কিছু তাদের শ্রম দ্বারা উৎপাদন করতে অভ্যস্থ ছিলনা তাদেরকে অন্য কোন জনগোষ্ঠী এসে শোষণ করবে এটা কোন তথ্য বা পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝানো রীতিমত দুস্কর।

শোষণমূলক আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা এবং বাহ্যিক অবস্থা

যে কোন দেশ বা অঞ্চলের আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা থেকেই সেখানকার শোষণমূলক অবস্থা উৎসারিত হয়। এটা আবার সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়ার সাথেও সরাসরি সম্পৃক্ত। উৎপাদন প্রক্রিয়া, বাজার ব্যবস্থাপনা, বিতরণ পদ্ধতি এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশ শোষণ যন্ত্রকে প্রভাবান্বিত করে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে সব কিছু রাতারাতিভাবে পরিবর্তন করা যায়নি। সত্যিকারভাবে বলতে গেলে বলতে হয় যে উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার পরিবর্তন সংঘটন স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্ভবও নয়। ফলে শোষণমূখী উপনিবেশিক আমলের পদ্ধতিই বহাল থাকে যা শত শত বছর ধরে সক্রিয় ছিল। সন্দেহ নেই যে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ছিল একটি বিপ্লব কিন্তু স্বাধীনতার পর আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনে সেই বিপ্লবের আদর্শকে অব্যাহত রাখা যায়নি আভ্যন্তরীন দুর্বলতা এবং বৈদেশিক চাপ এর কারণে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম লাভের সাথে সাথেই এমন আশাংকা ঘনীভূত হয়ে উঠেছিল যে কয়েক মাসও দেশটি টিকতে পারবে কিনা। কেননা বৈরী ও আগ্রাসী প্রতিবেশী ভারতের অব্যাহত হুমকিতে দেশটির স্থায়িত্ব অনিশ্চিত হয়ে উঠেছিল। ১৯৪৭ সালের পর ভারতের বলপূর্বক জুনাগড়, কাশ্মীর, হায়দারাবাদ সহ বহু রাজ্য দখলের পর পাকিস্তানকে সর্বদাই সর্তক থাকতে হয়েছে তার আভ্যন্তরীণ বিষয়াদি সংহত করা এবং ভারতের সম্ভাব্য আগ্রাসন মোকাবেলায় নিজেদের সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করা।

সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানীদের কম প্রতিনিধিত্ব থাকার পটভূমি

কথিত বৈষম্যের প্রমাণ হিসেবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানীদের কম প্রতিনিধিত্বের অভিযোগ ছিল তখনকার সময়ে একটি জনপ্রিয় শ্লোগান। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩ লক্ষ সদস্যের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার। এই সংখ্যা দেশের দুই অংশের মধ্যে বৈষম্য চিত্রিত করে। কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য ও বাস্তবানুগভাবে বিষয়টির মূল্যায়ন করতে হলে কেহই ১৯৪৭ সালে সেনাবাহিনীতে বাংলাভাষী মুসলমান সৈনিকদের সংখ্যা কত ছিল এই হিসাবের দিকে অবশ্যই দৃষ্টিপাত করবে। পাকিস্তানের শুরুতে ফেডারেল সেনাবাহিনীতে বাংলাভাষী মুসলমান সৈনিকের সংখ্যা ছিল শ’কয়েক বা কোন অবস্থাতেই এক হাজারের বেশী নয়।

সেনাবাহিনীতে বাংলাভাষী মুসলমানদের সংখ্যা অতি নগণ্য হওয়ার ঐতিহাসিক কার্যকরণ রয়েছে। বৃটিশ আমলে বাংলাভাষী মুসলমানদেরকে সেনাবাহিনীতে নেয়া হতোনা। আবার বাঙালি মুসলমানরাও বৃটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে খুব একটা যেতোনা। সেনাবাহিনীতে বাঙালি মুসলমানদের এমনিতর দূরাবস্থার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হেতুই পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাঙালি তথা বাংলাভাষী পূর্ব পাকিস্তানীদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগদান করে সেনা সার্ভিসে তাদের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য অনুরোধ জানান। যাই হোক, পাকিস্তানের ২৩ বছরে এক হাজার বাঙালি থেকে সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ হাজার-এ, যার বৃদ্ধি সূচক হচ্ছে চার হাজার শতাংশ। এই তুলনায় সেনাবাহিনীতে পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির হার ছিল অনেক কম। ঐ সময়ে ৫০ হাজার পশ্চিম পাকিস্তানী সেনা সদস্য বৃদ্ধি পেয়ে ১৯৭১ সনে দাঁড়ায় ২,৬০,০০০ যার বৃদ্ধিসূচক হচ্ছে ১২০০ শতাংশ। অর্থাৎ তুলনামূলক বিবেচনায় সেনাবাহিনীতে অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যা বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ২৮০০ শতাংশ বেশী। বিভিন্ন প্রমাণাদিতে দেখা যায় যে সেনাবাহিনীতে চাকরী নেয়ার ব্যাপারে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে এক ধরণের ভীতি বরাবরই কাজ করতো। ফলে দেশের জনগোষ্ঠীর বড় অংশ হওয়া সত্ত্বেও সেনাবাহিনীতে তাদের তেমন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ছিলনা। ১৯৪৮ সালের হিসাব মতে সেনাবাহিনীতে চাকরীর জন্যে পশ্চিম পাকিস্তানী প্রার্থী ছিল ২৭০৮ জন; আর পূর্ব পাকিস্তানের আবেদনকারী প্রার্থী ছিল মাত্র ৮৭ জন; অর্থাৎ পশ্চিম পাকিস্তানী প্রার্থী ছিল ৩০০ ভাগ বেশী। ১৯৫১ সালে সেনাবাহিনীতে চাকুরী প্রার্থী পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা ছিল ১৩৪ আর পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যা ছিল ১০০৮ জন। ১৯৫৪ সালের পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা একটু বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৬৫ জনে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে পশ্চিম পাকিস্তানীদের সংখ্যা ছিল ২০০ গুণ বেশী অর্থাৎ ৩২০৪ জন। আবেদনপত্র দাখিল কিংবা সেনাবাহিনীতে ভর্তি করার ক্ষেত্রে কোন বৈষম্য কিংবা ডিসক্রিমিনেশান থাকার গালগল্প হয়তো কেউ দাঁড় করাবেন, যা কিছুতেই প্রমাণযোগ্য নয়।

এটা অবশ্যই সবার জানার কথা যে সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে দরকার কঠোর ও অব্যাহত প্রশিক্ষণ যা দিন কয়েক এবং মাস কয়েকের ব্যাপার নয়। পৃথিবীর কোন দেশের পক্ষেই জেনারেল এর চাইতে অনেক নিচের একজন সেনা অফিসারকেও ২৫ বছরের কমে তৈরী করা সম্ভব নয়। ১৯৫০ এর দশকের শেষের দিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানের দুই জন অফিসারের নাম উল্লেখ করার মত হয়ে উঠে এর একজন ছিলেন কর্ণেল ওসমানী এবং আর একজন ছিলেন মেজর গনি। অথচ ঐ সময়ের মধ্যে পাঞ্জাব ও পাঠানদের মধ্য থেকে বহু সৈনিক জেনারেল পদে পর্যন্ত উন্নীত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের জিওসি পদে কর্মরত থাকাকালে আইয়ুব খান ১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রী অর্জনেচ্ছু ছাত্রদের এক সমাবেশে তাদেরকে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হবার আহবান জানান। কিন্তু তাদের নিকট থেকে তেমন উৎসাহব্যাঞ্জক সাড়া পাওয়া যায়নি। এর পরের দুই বছরের পরিসংখ্যানে তা স্পষ্ট। ১৯৫৬ সালে সেনাবাহিনীর অফিসার পদে আবেদনকৃতদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছিল মাত্র ২২ জন; অথচ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ছিল ১১০ জন। ১৯৫৭ সনে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আবেদন করার সংখ্যা ৮০ শতাংশ উন্নীত হয়ে দাঁড়ায় ৩৯ জনে, অথচ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আবেদনকারীদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১০ থেকে ২৯৪-তে। [এইচ,এ, রিজভী, মিলিটারী এন্ড পলিটিক্স ইন পাকিস্তান, প্রগ্রেসিভ পাবলিশার্স, লাহোর (পাকিস্তান), ১৯৭৬ (দ্বিতীয় সংস্করণ) পৃ: ১৮১-৮২]

পাকিস্তান সৃষ্টির ১০ বছর পরও সেনাবাহিনীতে চাকরী নিতে বাঙালি মুসলমানরা ছিল অত্যন্ত লাজুক ও পশ্চাৎমুখী। অথচ ঐতিহ্যগতভাবে যোদ্ধার জাত পাঞ্জাবী, পাঠান আর বেলুচীরা সেনাবাহিনীর চাকরীর প্রতি ছিল অত্যন্ত আগ্রহী। বস্তুতঃ ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে বৃটিশ শাসনের শুরু থেকেই তারা পেশাগতভাবে সেনাবাহিনীর চাকরী গ্রহণে করাতে উৎসাহ জ্ঞাপন করে। সশস্ত্র বাহিনীর চাকরীতে ২৩ বছর ধরে বাঙালি মুসলমানদের অনুৎসাহিত করা কিংবা পরিকল্পিতভাবে বাদ দেয়া হয়ে থাকলে গত ৩৭ বছরেরও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সম সংখ্যক অবস্থায় যেতে পারলনা কেন ? ১৯৯৬ সনে পাকিস্তানের জনসংখ্যা যখন ১৩ কোটি তখন সেখানকার সেনাবাহিনীর সদস্য ছিল যখন ৬ লক্ষ অথচ বাংলাদেশের সেনা সদস্য সেই সময় ছিল বড় জোর এক লক্ষ। পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিজেদের সম্পদ দ্বারা প্রচুর অস্ত্র-সস্ত্র সংগ্রহ এবং আনবিক সামর্থ্যরে অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ কেন সামরিকভাবে এত পিছনে পড়ে থাকলো? ৩৭ বছর পরও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৬ ভাগের একভাগে পর্যবসিত হয়ে থাকলো? এছাড়াও বাংলাদেশের আণবিক শক্তি অর্জনের লক্ষ্য হয়তো আরো বহু দিন ধরেই তিমিরে থেকে যাবে। উল্লেখ্য যে ষাট দশকের ৬-দফা দাবীর সেই ফুলঝুরির কি হলো -যে দাবী নামাতে ভারতীয় আগ্রাসন প্রতিরোধে পূর্ব পাকিস্তানের পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও শক্তিশালী মিলিশিয়া গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছিল ? এটা কি সত্যি নয় যে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর থেকে ভারত কেবল ভয় দেখিয়েই বাংলাদেশের উপর কর্তৃত্ব করে চলছে। কেন বাংলাদেশ ৩৭ বছরেও ভারতের হুমকি মোকাবেলায় পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্ট। রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলেও তেমন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার মত সম্পদ ও সামর্থ বাংলাদেশের নেই। এটা আজ কোন অবস্থাতেই কোন গোপন তথ্য নয় যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যা কিছু সামরিক সরঞ্জাম রয়েছে তার মধ্যে বিরাট অংশ পাকিস্তান থেকে এসেছে প্রায় বিনা পয়সায়। কিন্তু তা সত্ত্বেও ভারতের সামরিক শক্তির সামনে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপদজনক অবস্থায় রয়েছে।

সেনাবাহিনী গড়ে তোলার সম্পদ ও ভিত্তি

কঠিন বাস্তবতা বরাবরই নির্জলা সত্যকে উদঘাটন করে। বাস্তবে বাংলাদেশের রয়েছে সম্পদ সংকট। যার দরণ দেশটির পক্ষে নাগরিকদের জন্য ন্যুনতম পুষ্টির যোগান, স্বাস্থ্যখাতে নাগরিকদের মৌলিক সেবা প্রদান, এমনকি প্রাইমারী পর্যায়ের স্কুল-বয়সী শিশুদের শিক্ষাক্রম চালনাও সম্ভব হয়না। এই যেখানে বাংলাদেশের অবস্থা সেখানে পশ্চিম পাকিস্তান এই অভাবক্লিষ্ট দেশ থেকে কি সম্পদ লুট করেছে?

বস্তুতঃ ষাট এর দশকে তারস্বরে চালানো বৈষ্যম্যের প্রচারণা ও পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করার অভিযোগ ছিল নিদারুণ প্রবঞ্চনা ও প্রতারণামূলক। সে কারণে প্রখ্যাত বৃটিশ ঐতিহাসিক যিনি ভারতে মোঘল শাসনের ইতিহাসের অন্যতম বিশেষজ্ঞ বলে গণ্য, সেই প্রফেসার এল এফ রুশব্রুক উইলিয়াম তার লিখিত দি ইস্ট পাকিস্তান ট্রাজেডী [এল,এফ, রুশব্রুক উইলিয়াম, দি ইষ্ট পাকিস্তান ট্র্যাজেডী টম ষ্ট্যাসি লিঃ, লন্ডন, ১৯৭২, পৃ: ২২] বইয়ে বেশ বাগ্মীতার সাথেই প্রশ্ন করেছেন যে পাকিস্তান যুগের ইতি হওয়ার পরও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ কিংবা শেখ মুজিবের সোনার বাংলা কেন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর জন্য দু-স্বপ্নই রয়ে গেল? বস্তুতঃ এটা পাকিস্তানের তথাকথিত শোষণের জন্যে নয়; এর কারণ ইতিহাস বিধৃত যৌক্তিকতার মধ্যেই নিহিত। আসলে পূর্ব পাকিস্তান ২৪ বছর ধরে সর্বক্ষেত্রেই পশ্চিম পাকিস্তান থেকে অনেক অনগ্রসর ছিল। ১৯৭১ এর পরও দেশটির আর্থিক অবস্থা এবং বিভিন্ন ধরণের আভ্যন্তরীণ শোষণ-এর তেমন কোন পরিবর্তন ঘটেনি। বাংলাদেশ কেবল যে পরিবর্তনটি দেখাতে পারে তাহলো দেশটির পতাকা; কিন্তু তার মধ্যে এমন কিছু পরিস্ফুট করানোর চেষ্টা করা হয়েছে যা দেশের বৃহত্তর মুসলমান জনগোষ্ঠীর চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাসের পরিপন্থী। সাধারণ মানুষের ভয়াবহ দরিদ্রতা অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ইনস্টিটিউটের আশির দশকের এক জরীপ মতে দরিদ্রসীমার নীচে দেশটির ৭৬ শতাংশ মানুষের অবস্থান। [কে, আহমেদ এন্ড এন, হাসান (ইডি), রিপোর্ট অব দি নিউট্রিশান সার্ভে অব ১৯৭৫-৭৬ এন্ড ১৯৮১-৮২, ইনষ্টিউটিউট অব ফুড এন্ড নিউষ্ট্রিশান, ইউনির্ভাসিটি অব ঢাকা, ১৯৮৩ পৃ: ১৫, ২৮ ও ২০০৫] এর সাথে যোগ হবে দেশে অবস্থানকারী আড়াই লক্ষ দুভার্গ্যপীড়িত আটকে পড়া পাকিস্তানীদের নিগ্রহের জীবন; যারা গত ৩৭ বছর ধরে বন্দী শিবিরে মানবেতর জীবন নির্বাহ করছে। আরো লক্ষ লক্ষ বস্তিবাসী একইভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছে দেশের সকল শহরাঞ্চলে, যাদের সংখ্যা এক মাত্র ঢাকা নগরীতেই ৩৫ লক্ষ বলে ধারণা করা হয়। যদিও অতি ক্ষুদ্র একটি স্বচ্ছল অংশের অভ্যুদয় বাংলাদেশে ঘটছে, কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্টীর মাথাপিছু আয় পাকিস্তানীদের মাথাপিছু আয়ের প্রায় অর্ধেকে পর্যবসিত হয়ে আছে। ১৯৯৬ সালের এক পরিসংখ্যান মতে বাংলাদেশের মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ছিল ২২০ ডলার আর পাকিস্তানীদের ছিল ৪৪০ ডলার।

অথচ সেই সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ২৫ বছরে পাকিস্তানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ছিল বাংলাদেশের (২.২%) চাইতে বেশী (২.৪%)। অতি ন্যুনতম মুজুরীতে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক দেশ ও বিদেশে কাজ করছে। বিশ্বের শ্রম বাজারে বাংলাদেশের শ্রম হচ্ছে সব চাইতে সস্তা। পাকিস্তানের করাচীতে প্রায় ১৫ লক্ষ অবৈধ বাংলাদেশী বিভিন্ন ধরণের বিদঘুটে পেশায় অতি অল্প মুজুরীতে দিনাতিপাত করছে।

কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস-এ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব প্রসঙ্গে

কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিসে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ-এর সম্মিলিত প্রতিনিধিত্বের চাইতে অনেক কম। এর পাশাপাশি আর একটি বাস্তবতা ছিল পাঞ্জাবী নয়, পশ্চিম পাকিস্তানীদের এমন প্রতিনিধিত্বের সংখ্যাও ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক কম। এটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা তথা বাঙালি, সিন্ধী, পাঠান ও বেলুচীদের ঐতিহাসিক অনগ্রসরতারই ফল। পাঞ্জাবে বসতি গড়া ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলিম মোহাজেররা ছিল পূর্ব বাংলা, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের জনগোষ্ঠীর চাইতে পড়ালেখায় অনেক অগ্রসর। শিক্ষা-দীক্ষায় শেষোক্ত জনগোষ্ঠীর তুলনামূলক অনগ্রসতার কারণ ছিল অর্থনৈতিক এবং কিছুটা সামাজিক। বস্তুতঃ পূর্ব বাংলা, সিন্ধু, বেলুচিস্তান ও সীমান্ত প্রদেশের মুসলমানরা উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশ করে বিংশ শতাব্দীর প্রথম সিকিতে। কিন্তু পাঞ্জাব ও অন্যান্য অঞ্চলের মোহাজের মুসলমানরা আধুনিক উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের বলা যায় পর পরই। অর্থাৎ তারা পাকিস্তানের অপরাপর অঞ্চলের মুসলমানদের চাইতে শিক্ষা-দীক্ষায় ছিল ৭০ থেকে ৮০ বছরের অগ্রে। এর প্রধান কারণ ছিল উনবিংশ শতাব্দীর ৭০ এর দশকে স্যার সৈয়দ আহমেদেরর নেতৃত্বে আলীগড়ে প্রতিষ্ঠিত এঙ্গলো মহামেডান কলেজ ভারতের বধিষ্ণু অঞ্চলের মুসলমানদেরকে উচ্চ শিক্ষায় আকৃষ্ট করে তোলে। পাশাপাশি লাহোর সরকারী কলেজ এবং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বহু আগে। ১৮৫৭ সালে স্থাপিত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেগুলোতে মুসলমান ছাত্রের সংখ্যা ছিল অনুল্লেখ্য; এমনকি ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মুখ্যত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্যে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও মুসলিম ছাত্র ও শিক্ষকের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা কয়েকজন। হিন্দু ছাত্র ও শিক্ষকরা ছিল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে কেবল ১৯৪৭ সালের পর, যখন পূর্ব বাংলার মুসলমানরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ও শিক্ষকতার ফুরসত পায়। সত্যিকার অর্থে শিক্ষা-দীক্ষায় বাংলার মুসলমানদের অনগ্রসরতার কারণেই বৃটিশ যুগের ভারতীয় সিভিল সার্ভিস তথা আইসিএস-এ কোন বাঙালি মুসলমানের ঢোকার যোগ্যতা ছিলনা; যদিও উক্ত সার্ভিস ১৮৫৩ সালের অধ্যাদেশ বলে ১৮৫৪ সালে প্রবর্তিত হয়েছিল। [আলী আহমেদ রোল অব হায়ার সিভিল সার্ভিস ইন পাকিস্তান, লাহোর, পৃ: ৩৫] ফলে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানের প্রশাসন পায় মাত্র ১০০ জন প্রাক্তন আইসিএস অফিসার আর ভারত পায় ৫০০ জন। প্রাপ্ত ১০০ জনের মধ্যে একজনও বাঙালি কিংবা পাকিস্তানের অন্যান্য অনগ্রসর এলাকার ছিল না।

ঐ ১০০ জনের মধ্যে কেউ কেউ ছিল বৃটিশ বংশোদ্ভুত মুসলমান, কেউ ছিল শিক্ষায় অগ্রসর ভারতের অপরাপর এলাকার মুসলিম জনগোষ্ঠীভূক্ত। সঙ্গত কারণেই তারা ছিল পাঞ্জাব বা ইউপি’র মুসলমান। পাঞ্জাব ও ইউপি’র মুসলমানদের অগ্রসরতা আর পূর্ব বাংলার মুসলমানদের অনগ্রসরতার আরো প্রমাণ আছে। ১৮৮৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় আইসিএস অফিসারদের মধ্যে পাঞ্জাবের ছিল তিন জন মুসলমান, শিখ ছিল দুই জন এবং হিন্দু ছিলনা একজনও; এমনকি মুসলমান সংখ্যালঘিষ্ঠ এলাকা অযোধ্যার ৫ জন মুসলমান ছিল আইসিএস আর তার বিপরীতে ছিল ছয় জন হিন্দু। অথচ বাংলা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও মাত্র দুই জন মুসলমান ছিল আইসিএস, আর ৯ জন ছিল হিন্দু। [ঐ পৃ: ৪৫]

কিন্তু সে সময়ে দুইজন বাঙালি মুসলমান আইসিএস এর পরিসংখ্যান পাওয়া গেলেও তাদের মূল আবাস বা ঠিকানার কোন হদিস পাওয়া যায়নি। তবে এটা মোটামোটি বলা যায় যে, তারা কেউ পূর্ব বাংলার বাসিন্দা ছিলনা। এবং এটাও অনেকটা নিশ্চিত যে তারা হয়তো বাংলাভাষী মুসলমানও ছিলনা। সেই সময়কার বাংলার শিক্ষিত মুসলমান পরিবারসমূহ যেমন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর পরিবার কখনও নিজেদেরকে বাঙালি বলে পরিচয় দিতনা। হয়তো ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত বাঙালি মুসলমান বলে পরিচয় দেওয়াটা ছিল মর্যাদা হানিকর।

১৯৪৭ সালের সিএসএস-এ মনোনীত একজন পূর্ব পাকিস্তানী

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এক সময় আইসিএস সার্ভিসে শুধু মনোনীত একজন বাঙালি মুসলমান জনাব নুরুন্নবী চৌধুরীকে পাওয়া যায়। ফলে পাক প্রশাসনে উদ্ভূত বিশাল শুন্যতা পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের অফিসারদেরকে দিয়ে পুরণ করতে হয়েছে। তবে প্রতিযোগিতা নয় ১৯৪৯-৫০ সালে প্রবর্তিত ৪০ শতাংশ কোটার ভিত্তিতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সার্ভিসের পূর্ব পাকিস্তানীদের স্থান লাভ শুরু হয়। [আর, সায়মন্ডস, দি বৃটিশ এন্ড দেয়ার সাকসেসারস ফেবার এন্ড ফেবার, লন্ডন ১৯৬৬ পৃ: ৮৮-৯০] সেনাবাহিনীতেও একইভাবে পাকিস্তানের অপরাপর অঞ্চলের চাইতে পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক সার্ভিসে নিয়োগ দেয়ার জন্য পূর্ব পাকিস্তান থেকে কাকেও পাওয়া যায়নি; অথচ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আট জনকে পাওয়া যায়।

১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাওয়া যায় দুই জনকে, একজন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট আর পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাওয়া যায় ১৬ জনকে (যার মধ্যে ৭ জন ছিল পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট এবং ১০ জন ছিল ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের। ১৬ বছরের ব্যবধানে ১৯৬৪ সালে সিএসএস-এ পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯ জন (১৫ জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের) আর পশ্চিম পাকিস্তানের সংখ্যা দাঁড়ায় ২০ জন (১৩ জন পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের)। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সার্ভিসে পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা বৃদ্ধি ছিল পশ্চিম পাকিস্তানীদের তুলনায় ১০ গুণ। [রাল্ফ ব্রেনবান্তি (ইডি) দি ব্যুরোক্রেসী অব পাকিস্তান, এশিয়ান ব্যুরোক্রেটিক সিষ্টেম ইমার্জেন্ট ফ্রম বৃটিশ কলোনিয়াল ট্রাডিশান, ডিউক বিশ্ববিদ্যালয় কমনওয়েলথ ষ্টাডি সেন্টার, ইউএসএ, ১৯৬৬ পৃ: ২৬৬-৬৭ এবং ২৭০-৭১]

পূর্ব পাকিস্তানীদের সংখ্যা বৃদ্ধি এত দ্রুত হারে ঘটেছিল যে তারা পশ্চিম পাকিস্তানীদের সামগ্রিক প্রতিনিধিত্বের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে যায়। যার দরুণ ১৯৭০-৭১ সালে বহু বাঙালি অফিসারই পাকিস্তান প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উপনীত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের চীফ সেক্রেটারী ছিল সিএসএস ক্যাডারের একজন বাঙালি। যে হারে পাকিস্তান প্রশাসনে পূর্ব পাকিস্তানীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছিল তাতে এটা প্রায় নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, আরো ১০ বা ২০ বছরের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানীদের প্রতিনিধিত্ব জনসংখ্যা অনুপাতে যথাযথ পর্যায়ে উপনীত হতো।

কেন্দ্র কর্তৃক উন্নয়ন বাজেট হ্রাস এবং বরাদ্দ বাস্তবায়নে অদক্ষতা প্রসঙ্গ

কোন কোন অদূরদর্শী লেখকের প্রণীত পরিসংখ্যানে কেন্দ্র কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে কম বিনিয়োগের কথা সন্নিবেশিত করা হয়। ঐ সব পরিসংখ্যানের কিছু কিছু দৃশ্যত সত্য বটে; কিন্তু ষাট এর দশকের শেষ দিকে উভয় প্রদেশের বরাদ্দের অসমতা ক্রমশই হ্রাস পেতে শুরু করে। [এল.এফ. রুশ বুক উইলিয়ামস পূর্বে উদ্ধৃত বই পৃ: ১০৮-৯]

জনৈক রেহমান সোবহানের মতো কিছু কিছু তথাকথিত ঋজু অর্থনীতিবীদ যারা বিদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী লাভে সমর্থন হয়নি, তারাই বিদ্বেষী মনোভাব প্রসুত মনগড়া ঐ সব পরিসংখ্যান সন্নিবেশন করেছে। এই প্রসঙ্গে প্রথমেই বলা দরকার যে কোন বিনিয়োগ কর্মে দরকার প্রয়োজনীয় জমি। পূর্ব পাকিস্তান ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় সাত গুণ ছোট। স্বভাবতই পশ্চিম পাকিস্তানের দীর্ঘ সড়ক ও রেল পথ নির্মাণ অপরিহার্য হয়ে উঠে। আর সেখানে ছিল শিল্প-কারখানা স্থাপনের অবারিত সুযোগ।

এ ক্ষেত্রে বৃটিশ আমলের শুরু থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষি ব্যবস্থা ও তার সাথে যুক্ত সেচ খাল সমূহের ব্যবস্থাপনায় ও সে সব চালু রাখার জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল প্রচুর অর্থ। পক্ষান্তরে পূর্ব পাকিস্তানের ছোট-খাট কৃষি ইউনিট সমূহেও সাথে সাথে হয়তো আধুনিক প্রযুক্তি নির্ভরতা ও বিনিয়োগের প্রয়োজন হতো।

অর্থাৎ বৃহত্তর এলাকা হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানে তার অবকাঠামো ঠিক রাখার জন্যে যে বিনিয়োগের প্রয়োজন হতো এবং তা তারা কাজেও লাগাতো পারতো। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের সে অবস্থা ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ছিলনা। অর্থাৎ ব্যবস্থাপনায় ও বরাদ্দ ভালোভাবে কাজে লাগানোর জন্য পূর্ব পাকিস্তানের তেমন দক্ষতা ছিলনা। এই ছাড়াও স্থানীয়ভাবে আগ্রহী শিল্প উদ্দেক্তা না থাকায় পূর্ব পাকিস্তানে শিল্প উন্নয়ন বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানে যা কিছু শিল্প উন্নয়ন ঘটে তা প্রধানত সম্ভব হয় ৪৭ এর দেশ বিভাগের পর ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে পূর্ব পাকিস্তানে আসা কিছু সংখ্যক অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিল্প উদ্যোক্তার কারণে। এটা ঐতিহাসিকভাবে সত্যি যে পূর্ব বাংলায় সাতচল্লিশ-এর পূর্বে কোন শিল্প ব্যবস্থাই ছিল না। পূর্ব বাংলা প্রধানত ভারতের অপরাপর এলাকা ও ইউরোপের শিল্প-কলকারখানার কাঁচামাল সরবরাহের উৎস ও পশ্চাদভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পূর্ব বাংলায় পৃথিবীর প্রায় ৮০ শতাংশ পাট উৎপাদন হলেও একটিও পাটকল ছিল না। [এইচ.এম. আব্বাসী, পূর্বে উদ্ধৃত বই পৃ: ৪৬৪]

যে কয়টি পাটকল বৃটিশ আমলে শুরু করা হয় তার সবটাই ছিল কলকাতার আশ-পাশে অর্থাৎ পশ্চিম বাংলায়। পাটের বিপণন ব্যবস্থাও সম্পূর্ণভাবে অমুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। সাতচল্লিশ-এর দেশ বিভাগের পর পূর্ব বাংলার পাট উৎপাদনকারীদের সম্পূর্ণভাবে কলকাতা কেন্দ্রিক পাট ব্যবসায়ীদের দয়ার উপর নির্ভর করতে হয়। পাট সহ বিভিন্ন পণ্যের বিদেশ বাণিজ্য সম্পর্কে পূর্ব বাংলার অধিবাসীদের অনভিজ্ঞতার কারণ এই খাতে তাদের উদ্যোগ ও বিনিয়োগকে অসম্ভব করে তোলে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শিল্প উন্নয়ন দ্রুত বেগে গড়ে উঠার পিছনে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তেমন কোন অবদান ছিলনা। এটার পিছনে ছিল আদমজী-ইস্পাহানীর মত অভিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যবসায়ী মহলের অবদান। ১৯৭১ সালের পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পর পরিস্থিতি উল্টোরূপ পরিগ্রহ করে। যার জন্যে গত ৩৭ বছরে অল্প বিস্তর শিল্প উন্নয়ন দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তরে সম্ভব হয়েছে এবং উৎপাদনমূখী তৈরী পোষাক বাণিজ্যেও যথেষ্ট অগ্রগতি ঘটেছে। তবে পাকিস্তান আমলে পূর্ব পাকিস্তানে ৭৬টি পাটকল চালু করা হয় অথচ বাংলাদেশের ৩৭ বছরে মাত্র ৪টি কল চালু করা হয়, যার কোনটিও পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত আদমজীর মত বড় মাপের শিল্প নয়। পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় নয়টি চিনি কল আর বাংলাদেশ আমলে প্রতিষ্ঠিত হয় মাত্র ১টি। কিন্তু পাকিস্তান আমলের পর কটন, ষ্টীল, রিফাইনারী এবং মেশিন টুলস-এ একটি শিল্পও বাংলাদেশ আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে অত্যন্ত বেদনার বিষয় হচ্ছে পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত মেশিন টুলস ফ্যাক্টরী পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের উৎপাদিত মেশিন টুলস এর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারার অভিযোগে বন্ধ করে দেয়া হয়। এটা যে কারুরই মনে বিস্ময়ের উদ্রেক করে। কারণ যাই থাকুক এটা সত্যি বটে যে বাংলাদেশ তথা ভূতপূর্ব পূর্ব পাকিস্তানে ব্যবস্থাপনায় দক্ষতার অভাব বরাবরই ছিল। ফলে বিশাল উন্নয়ন কর্মসূচীর অভিলাষ ত্যাগ করে বাংলাদেশ সরকার এবং শত শত বেসামরিক প্রতিষ্ঠান (এনজিও) দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে অত্যন্ত ক্ষুদ্রাকৃতির বিনিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের চাহিদা মেটানো এবং আত্মকর্মসংস্থান প্রকল্পের মধ্যেই তাদের কাজকর্ম সন্নিবেশিত করেছে।

দক্ষতা ও আগ্রহী উদ্দেক্তার অভাব

পূর্বেই বলা হয়েছে যে পূর্ব বাংলার পাট চাষীরা মূখ্যত ছিল মুসলমান; কিন্তু পাট ব্যবসা সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করতো অমুসলিম ব্যবসায়ীরা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও এই অবস্থা অব্যাহত ছিল ষাট এর দশকের মাঝামাঝি কাল পর্যন্ত। ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধ গোটা পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনে এবং সেই সময় অমুসলিম ব্যবসায়ীরা চূড়ান্তভাবে তাদের যা অর্থ সম্পদ-সামর্থ ছিল সব নিয়েই ভারতে পাড়ি জমায় এবং পূর্ব পাকিস্তানে তাদের সকল ব্যবসা বন্ধ করে দেয়। পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগকৃত এদের শত সহস্র কোটি টাকার সম্পদ ভারতে পাচার করে নিয়ে যাওয়া হয় সেখানে বিনিয়োগের জন্যে। শেখ মুজিব তার ৬-দফা কর্মসূচীতে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে কথিত পাচারের জন্য নিন্দাবাদ জানালেও পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু ব্যবসায়ীদের দ্বারা ভারতে সম্পদ পাচারের বিষয়ে অত্যন্ত রহস্যজনকভাবে নীরব থাকেন। একাত্তর-উত্তর সময়ে অর্থাৎ বাংলাদেশ আমলে সেই সব হিন্দু ব্যবসায়ীদের কেহ কেহ এ দেশে তাদের গোপন সাঙ্গাতদের সহযোগিতায় বিশেষত মেট্রো শহর ও বড় বড় অন্যান্য শহরগুলোকে জমজমাট ব্যবসা গড়ে তোলে। তাদের পৃষ্টপোষককতায় বহু এনজিও বাংলাদেশের উন্নয়নের নামে নানাবিধ অপতৎপরতা চালাচ্ছে যারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইন ও সরকারকে থোড়াই কেয়ার করে। এই সব এনজিওদের নাকি বাংলাদেশের প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে প্রচুর প্রভাব। বাংলাদেশের প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ভারতের কুখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা RAW (Research and Analysis Wing)-এর অনুপ্রবেশ ঘটেছে যার দরুণ এমন আবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশে ভারতীয় স্বার্থ রক্ষায় তারা নানাবিধভাবে তৎপর। তাদের বিভিন্ন তৎপরতার মধ্যে উল্লেখ্য হচ্ছে বাংলাদেশে শিল্পায়নে বাধার সৃষ্টি করা, যাতে বাংলাদেশে ভারতের উৎপাদিত পণ্যের বাজার নিশ্চিত থাকে। এই বিষয়ে অন্যত্র আলোচনা করা যাবে।

প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য সংক্রান্ত যুক্তিতে মিথ্যাচার

রহমান সোবাহানের মত অর্থনীতিবীদরা প্রাথমিক শিক্ষায় বৈষম্য সৃষ্টির জন্য পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের মুন্ডপাত করেন। এতদসংক্রান্ত যে পরিসংখ্যান রহমান সোবাহানরা তুলে ধরেন তাতে দেখানো হয় যে ১৯৭০ সনে পূর্ব পাকিস্তানে যে পরিমাণ প্রাথমিক স্কুল ছিল তার চাইতে কয়েক হাজার বেশী প্রাথমিক স্কুল ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। কি উদ্ভট যুক্তি ! পূর্ব পাকিস্তানের চাইতে সাতগুন বৃহৎ পশ্চিম পাকিস্তানের বাস্তবতা যাতে অসচেতন পাঠকের নিকট চাপা থাকে। মুখ্যত শিশুদের জন্য প্রাথমিক স্কুল শিক্ষা বিস্তারের শুরু থেকেই প্রতিটি মহল্লায় গড়ে উঠে এবং তা প্রতিষ্ঠা করা হয় প্রতিটি শিশুর পায়ে হেঁটে অতিক্রমনীয় দূরত্বে। ফলে প্রতি ৪/৫ মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে প্রাইমারী স্কুল প্রতিষ্ঠা লাভ করে সন্নিহিত এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠার পর পরই। শিক্ষাবীদদের সংজ্ঞায় যাকে বলা হয় স্কুল মেপিং; এই বাস্তবতায় সাতগুণ বড় পশ্চিম পাকিস্তানে প্রাইমারী স্কুলের সংখ্যা বেশী হবারই কথা। অথচ দুঃখজনক হলেও সত্যি যে ইর্ষান্বিত অর্থনীতিবীদ রহমান সোবহানরা পশ্চিম পাকিস্তানে কেন প্রাইমারী স্কুলের সংখা বেশী হলো তা নিয়ে শোরগোল এবং বৈষম্যের যুক্তি হিসেবে দাঁড় করালেন। অথচ ১৯৭০ সনে পূর্ব পাকিস্তানে শিক্ষিতের হার ছিল ১৯ শতাংশ আর পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল মাত্র ১৭ শতাংশ।

মৌলিক বা প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রসারের মাধ্যমে শিক্ষিতের হার বৃদ্ধির জন্যে উদগ্রীব মহল অবশ্যই এটা স্বীকার করবেন যে এর জন্য প্রয়োজন অতিরিক্ত ভবন কিংবা বিদ্যমান ব্যবস্থাধীনে দুই বা তিন শিফটে শিক্ষাদান। বাংলাদেশের মত গরীব দেশে এমনিতরভাবেই বিদ্যমান ব্যবস্থার সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যেতে পারে; যা সচেতন অর্থনীতিবীদদের ভুলে যাওয়া সমীচিন নয়।

অপ্রশিক্ষিত জনসম্পদের নিম্ন উৎপাদনশীলতা

বাংলাদেশের অনগ্রসরতা আর একটি দৃষ্টিকোন থেকে দেখা যেতে পারে। দেশটিতে সম্পদের সীমাবদ্ধতা, উন্নয়ন-প্রতিকুল আবহ এবং সার্বিক সামাজিক পরিবেশের পাশাপাশি রয়েছে জনশক্তির অদক্ষতা ও স্বল্প উৎপাদন ক্ষমতা। এটাই পাকিস্তানের মাথাপিছু আয়ের তুলনায় পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীকে অনেক পিছনে ফেলে দেয়, যদিও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের দু’ অংশেরই মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় সমান অর্থাৎ ১২০ মার্কিন ডলার। কিন্তু পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হবার পর ৩৭ বছরে বাংলাদেশের অগ্রগতির হাল কি ? বাংলাদেশ ২০০৫ পর্যন্ত বৈদেশিক সাহায্য লাভ করেছে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার [সিরাজুল আলম খান, বাংলাদেশে গণতন্ত্র (এন অল্টারনেটিভ মডেল অব ডেমোক্রাসি ফর বাংলাদেশ) এমএনও পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ১৯৯৫, পৃ : ৫] তথা এক লক্ষাধিক কোটি টাকা যা- পাকিস্তানের ২৩ বছরে সমুদয় প্রাপ্তির চার গুণেরও বেশী। ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তানে বৈদেশিক সাহায্য ২৩ বছরে ছিল মাত্র ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। কিন্তু বাংলাদেশ এর মাথাপিছু আয় কি সে তুলনায় বেড়েছে?

পশ্চিমা পুঁজিবাদী ধাঁচের উন্নয়ন কার্যক্রমের ত্রুটিজনিত প্রতিক্রিয়া

তথাকথিত বৈষম্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আর একটি পয়েন্ট খুব গুরুত্বের সাথে বিবেচনার দাবী রাখে। কিছু ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক কার্যকারণ হেতু পাকিস্তানকে পশ্চিমা পুঁজিবাদী উন্নয়ন নীতিমালা গ্রহণ করতে হয়। এর ফলে পুরনো সামন্তবাদী আর্থ-সামাজিক আভ্যন্তরীণ কাঠামোর কার্যকারীতা প্রায় অব্যাহত থাকে। তেমন অবস্থায় সাধারণ্যে ন্যায়ানুগ সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব ছিল কিনা এটা অবশ্যই বিবেচনার দাবী রাখে। বস্তুতঃ জাতীয় অর্থনীতির উৎপাদনের প্রধান খাত কৃষিতে সামন্তবাদী শোষণমূখী কাঠামো অক্ষুন্ন রেখে কিভাবে জাতীয় জীবনে ন্যায়ানুগ উন্নয়ন প্রতাশা করা যায় ?

বেসরকারী শিল্প খাতে যে উন্নয়ন অর্জিত হয় তাও পশ্চিমা পুঁজিবাদী মডেল এর অনুকরণে অর্জিত হয়। তবে পাকিস্তানের সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিবেশ ও বাজারজাতকরণ পদ্ধতি ছিল পশ্চিমা দুনিয়ার চাইতে ভিন্নতর। ফলে গরীবদের জন্যে ন্যায়ানুগ উন্নয়ন প্রতিষ্ঠা করা ছিল প্রায়ই অনুল্লেখ্য। এটা ছিল সম্পদের সমান বা ন্যায়ানুগ বিতরণের প্রধান অন্তরায়, যদিও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক খাতে অগ্রগতি মোটামোটি দ্রুতই অর্জিত হয়েছিল। সমানুপাতিক উন্নয়ন এবং সম্পদের সুষম বিতরণ পাকিস্তানের সাথে ভৌগলিকভাবে তুলনামূলক অনেক ছোট হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে আজ অবধি তা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে তীব্র বঞ্চনাবোধ (মঙ্গা নামে নতুন টার্ম বা নুন্যতম খাদ্যের সন্ধান করার কোন অবকাশ বছরের এক বিরাট সময় ধরে উক্ত অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর না থাকার কথা; এখন বছরের পর বছর ধরে বলা হয়ে থাকে) -যা বস্তুতঃ পূর্বাঞ্চলীয় জনগোষ্ঠীর সাথে দেশটির বাকী অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর বৈষম্যকে স্পষ্টতই দৃশ্যমান করে তোলে। বাংলাদেশের জন্মের ৩৭ বছর পর আজ এই প্রশ্ন অত্যন্ত প্রকট যে কিভাবে এই বৈষম্যের নিরসন করা সম্ভব ?

১৯৬০ দশকের বৈষম্যের শ্লোগান সাম্প্রতিক সময়ে বেরিয়ে আসা কিছু বাস্তব সত্যির আলোকে বিবেচনা করা যেতে পারে। বর্তমানে পাকিস্তানের মাথাপিছু বার্ষিক আয়-এর পরিমাণ বাংলাদেশের মাথা পিছু আয়ের চাইতে বেশী, অথচ পাকিস্তানের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাংলাদেশের চাইতে অনেক বেশী। বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পাকিস্তানের জনসংখ্যা সাড়ে ছয় কোটি থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১৬ কোটিতে এবং বাংলাদেশের জনসংখ্যা সাত কোটি থেকে ১৪ কোটিতে দাঁড়ায়। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২ কোটি বেশী বৃদ্ধি পায়। আভ্যন্তরীণভাবে খাদ্য উৎপাদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি প্রতি বছর প্রচুর খাদ্য শস্য আমদানী করা সত্ত্বেও বাংলাদেশে মাথাপিছু খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ অনেক হ্রাস পায়। প্রাপ্ত তথ্য মতে বাংলাদেশে ৫ বছরের নিচে ৫৬ শতাংশ শিশু খাদ্য ঘাটতিতে আক্রান্ত যা উপমহাদেশে সর্বোচ্চ (সাইদ সাদ আন্দালিব, ইডি পলিটিক্যাল কালচার অব বাংলাদেশ, ইউপিএল, ঢাকা-১২০৭ পৃঃ ২৮১)

প্রচারণার শিকার পশ্চিম পাকিস্তানের এক শ্রেণী

তথাকথিত বৈষম্যের প্রচারণা কেবল পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতেই ছড়ায়নি; এই উৎকট প্রচারণার শিকারে পড়ে অদূরদর্শী একশ্রেণীর পশ্চিম পাকিস্তানী কায়েমী স্বার্থবাজ চক্র। তারা এই মর্মে যুক্তি উত্থাপন করে যে পূর্ব পাকিস্তান হচ্ছে একটি বোঝা। [হাসান জহীর সেপারেশান অব ইষ্ট পাকিস্তান, অক্সফোর্ড ইউনির্ভাসিটি প্রেস, ১৯৯৪ পৃ: ১৪৬-৪৭]

পূর্ব পাকিস্তান-এর বোঝা তাদের ঘাড় থেকে নামানো হলে তারা অর্থনৈতিকভাবে অনেক স্বচ্ছল হবে। এদের মধ্যে ছিল কিছু আমলা, কিছু পরিকল্পনাবীদ এবং কিছু সামন্ত প্রভু। বিশেষত কয়েকজন সামন্ত প্রভু পূর্ব পাকিস্তান এর বোঝা ঘাড় থেকে নামানোর জন্য অত্যন্ত ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে -এই আশংকায় যে ৬০ এর দশকে পূর্ব পকিস্তানে গণ আন্দোলন যে রূপ পরিগ্রহ করে তা কালক্রমে পশ্চিম পাকিস্তানে এদের সামন্ততান্ত্রিক অবস্থানকে গুড়িয়ে দেবে; যেভাবে ৫০ এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানে সামন্ততন্ত্রের অবসান ঘটেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের এই কায়েমী স্বার্থবাজ চক্র এটা সম্পর্কে মোটেই অবগত ছিলনা যে কিভাবে বাংলার মুসলমানরা ব্রিটিশ ও তাদের স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে এবং ১৯৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে ৯৭ শতাংশ ভোট দিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করেছে; এমনকি শত দুর্বিপাক সত্ত্বেও ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার জন্যে নির্ভীক ভূমিকা গ্রহণ করেছিল (দ্রষ্টব্যঃ উইটনেস টু সারেন্ডার -সিদ্দিক সালিক, ইউপিএল, ১৯৭১ এবং আমি আল বদর বলছি, দ্বিতীয় সংস্করণ ঢাকা ২০০৭ইং)। যদি পাকিস্তান সেনাবাহিনী কোনভাবে প্রভাবিত না হয়ে ১৯৭১ সালে আত্মসমর্পণ না করতো -যা নিয়াজী পরে অনুধাবন করেছিল (এ.কে. নিয়াজী, দি বিট্রায়াল অব ইষ্ট পাকিস্তান-পেপার ব্যাকস, ১৯৯৯ ষষ্ঠ সংস্করণ ২০০৬ , পিপি ২২৬-২৭) তাহলে একাত্তরের পর ইতিহাস অন্যভাবে লিখিত হতো। এটা কোনভাবেই বলা যাবে না যে ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে প্রদত্ত গণরায় পূর্ব পাকিস্তানের ১৯৭০ এর নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে বাতিল হয়ে যায় এবং ভারতের সশস্ত্র আগ্রাসনের দ্বারা পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টায় মুজিব কেন অনেক দেশপ্রেমিকও এটা তাদের ভাগ্যের লিখন বলেই মেনে নেয়।

বৈষম্যত্বত্ত্বের জন্ম দেওয়া হয়েছিল পাকিস্তানকে ভাঙ্গার জন্যে

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে বৈষম্যের প্রকৃত যে পরিসংখ্যান (যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রতারণামূলক বলে প্রমাণিত হয়) তাতে উন্নয়নের যে গতি ছিল তা অব্যাহত থাকলে বৈষম্য সত্ত্বর বিদূরিত হয়ে দুই অংশের অর্থনৈতিক অবস্থা সমান রূপই পরিগ্রহ করতো। সে হিসেবে পাকিস্তান অবিচ্ছিন্ন থাকলে এত দিনে শুধু যে ১২৫ কোটি মুসলিম উম্মার নেতৃত্বেই দেশটি অভিষিক্ত হতো তাই নয়; বিশ্বের অন্যতম বৃহৎশক্তি হিসেবেও পাকিস্তান আবির্ভূত হতো। পাকিস্তানের তেমন সম্ভাবনাই ছিল ভারত ও ইহুদী চক্রের (যারা পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার কাজে সর্বমূখী মদদ যুগিয়েছিল) চক্ষুশুল। তারা দ্রুত গড়ে উঠা মুসলিম শক্তি পাকিস্তান রাষ্ট্রকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য সকল ধরণের ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতায় লিপ্ত হয়।

ভারত, বৃটেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আমেরিকার এক বৃহৎ শ্রেণী ১৯৭১ সালে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রে একাত্ম হয়। তবে পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার জন্যে অন্যদের স্বার্থ যতটুকু ছিল তার চাইতে বেশী স্বার্থ ছিল ভারতের। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানকে বাংলাদেশ-এ পর্যবসিত করার ভারতীয় স্বার্থ ছিল বৃহত্তর ভারতের সাথে তাকে যুক্ত করা, যা তাদের ভূতপূর্ব নেতারা তথা নেহেরু, শ্যামা প্রসাদ, প্যাটেল প্রমুখ চেয়েছিলেন।

যখন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান গোটা পাকিস্তানের প্রায় সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ছিল সমান অংশীদার ঠিক তখনই পূর্ব পাকিস্তানকে পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনী আখ্যায়িত করার প্রচারণা শুরু করে ভারতীয় যড়যন্ত্রের নীল নকশা বানানোর অপতৎপরতা শুরু হয়। এই অপতৎপরতার অংশ হিসেবেই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর মত লোকের মুখ দিয়ে বলানো হয় যে ১৯৫৬ সালেই পূর্ব পকিস্তানের স্বায়ত্বশাসন ছিল ৯৮ ভাগ। যদিও সে সময়ের পূর্বেই বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষার মর্যাদা দেয়া হয় এবং ১৯৫৬ সালে প্রবর্তিত হয় জনপ্রিয় সংবিধান, যাতে দুই পাকিস্তানের সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়। অথচ দুই অংশের মধ্যকার মীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়েই তথাকথিত স্বায়ত্বশাসনের দাবীর আবডালে ভারতীয় ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের সর্বমূখী অপতৎপরতা সেই সময় চালানো হয়। পাকিস্তান শুরুর কয় বছর পাকিস্তান রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে বাংলা ভাষা নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি থাকলেও পূর্ব পাকিস্তানের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কখনও বাংলা ভাষার মর্যাদা বা ব্যবহার হুমকির মুখে ছিল না। কিন্তু স্বায়ত্বশাসনবাদী বিচ্ছিন্নতাবাদীরা সুযোগ পেলেই মীমাংসিত বিষয় নিয়ে হৈ হল্লা করতো। আজকের পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্নটা যদি কেউ করে যে ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তান যদি পাকিস্তানের কলোনী হয়ে থাকে তাহলে আজকের দুই হাজার খৃস্টাব্দের প্রথম দশকে বাংলাদেশ কাদের কলোনী ? ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা পর্যন্ত বলেছেন যে বাংলাদেশ হচ্ছে আজ ভারতীয় পণ্যের অবরুদ্ধ এক বাজার। তথাকথিত পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ১৯৭১ সালে অবসান ঘটার পর অতিবাহিত গত ৩৭ বছরেও কেন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালচিত্র আজও পাকিস্তানের পশ্চাতে রয়ে গেছে ? যে কেহ এমন প্রশ্ন কি করতে পারে না যে ৩৭ বছর আগে পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ লুট করার পথ বন্ধ হয়ে যাবার পরও নব্বই এর দশকের শেষের দিকে কিভাবে পাকিস্তান এটম বোমা বানালো ? বাংলাদেশ কেন অন্তত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমকক্ষ বা কাছাকাছি সেনাবাহিনী গড়ে তুলতে পারলোনা; যা তার অন্তর্জাতিক সীমান্তকে অনেক বৃহৎ ভারতের সম্ভাব্য সেনা আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে পারে? কেননা ১৯৭১ এর পূর্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানের কম প্রতিনিধিত্বে ক্ষুদ্ধ ও ব্যথিত হয়েছিল বাঙালি নেতারা।

কেবলমাত্র অর্থনীতিই নয়; বাংলাদেশে ভারতের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং রাজনৈতিক প্রভূত্বগিরি এত তুঙ্গে পৌঁছেছে যে, ঢাকার সরকার সর্বদাই কম্পমান থাকে যে তাদের কোন কাজ বা কথাবার্তা দিল্লী সরকারকে বিরক্ত করে কিনা।



 

Comments  

 
-2 # 2010-04-19 05:31

I've never seen such a ugly site that corrupts history and truth simutenously. Host of this site need to be punished as they are manipulating our history, which could be dangerous for the new generation. They've no right to manipulate our history. Don't try to show us white part of a black spot,we r nt colour blind

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+2 # 2012-08-11 01:08

I think I am part of that generation what you mentioned here. I am just requesting you very honestly --- "gather much more knowledge before you start commenting to save yourself from becoming a stupid and the new generation from the rubbish history and truth you mentioned above". Try to thing something for, try to thing something for 150 million Bangladeshi. Thanks.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
-3 # 2010-04-19 06:57
কেন এই মিথ্যাচার! কেন অবাঙ্গালীদের জন্য এত কান্না?
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+9 # 2010-04-24 17:14
Honest speaker কি এখনও বুঝেনা ভারতিয় আগ্রাসন। যদি এই ব্যাটা ভারতিয় হয় তাহলে জীবনেও বুঝবে না। আর বাংলাদেশি দেশপ্রেমিক হলে বুঝা উচিৎ। কারণ, ১)ফারাক্কা ২)তিন বিঘা করিডর ৩)বাংলাদেশ ঘিরে ফেনসিডিল কারখানা ৪)কাঁটা তারের বেড়া ৫)ভারত কর্তৃক শান্তি বাহীনি গঠন ৬)BSF দ্বারা বাংলাদেশি খুন ৭)বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার বাজার হিসেবে তৈরি করা ৮)বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ বিরোধি কর্মকান্ড করা ৯)মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালানো etc
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+1 # 2010-04-25 12:21
প্রথম আলোর পাঠককে ধন্যবাদ যার মাধ্যমে এই সাইটটির খোজ পেয়েছি। অত্র বইটির লেখককে মোবারকবাদ জানাই তার এই সত্য ও তথ্যনির্ভর লেখা উপহার দেবার জন্য।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+11 # 2010-04-28 05:02

I would request readers to think and anylise events, in light of history of last 39 years and make your decision.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
-10 # 2010-06-18 21:48

honest speaker go to hell and take your thoughts with you. You are a coward.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+9 # 2010-07-12 15:50


If someone writes the truth and it is against the belief of the reader, their voice is often negative. I suggest commentators should response from the point of very neutral views.

Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2010-08-27 12:16
ধন্যবাদ জনাব এম,টি,হোসেনকে। অনেক না বলা ইতিহাস আমাদের জন্য রেখে যাওয়ায়। একদিন সত্যকথা বের হবেই। ষড়যন্ত্রকারীরা চিরদিন বিজয়ী থাকতে পারেনা। আর অনেস্ট স্পীকারের মত সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদীদের জন্য ঘৃণা।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+2 # 2010-09-23 06:26
লেখক মহোদয়কে ধন্যবাদ। তার এই লেখনির মাধ্যমে জাতি অনেক উপকার পাবে।
Reply | Reply with quote | Quote
 
 
+3 # 2012-06-26 08:17
সাহস করে করে সত্য কথা বলাই মানুষের শেষ্ঠত্ব। প্রত্যোক স্থানে প্রচার করো উচিত।
Reply | Reply with quote | Quote
 

Add comment


Security code
Refresh